ভেরেশাগিনের ছবি

কলেজ স্ট্রীটে আনন্দের আউটলেটে ঘুরঘুর করছিলাম, বই কেনার সত্যিই কোনো প্ল্যান ছিল না কিন্তু ‘জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্পসমগ্র’ দেখে হাত কিরকম নিশপিশ করতে শুরু করল। জ্যোতিরিন্দ্র এলেন, ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরী এলেন, বিলেতের স্মৃতি নিয়ে বিকাশ সিংহ চলে এলেন – সবাইকে জায়গা দিয়ে বিল করাতে গিয়ে দেখি দুশো টাকার মতন বই ফ্রীতে পাওয়া যাবে, আনন্দর যা নিয়ম আর কি।  ফ্রী বই বাছা বেশ ঝকমারি ব্যাপার, কিছুতেই আর দুশো টাকা উসুল হয় না; মাথার অনেক ঘাম পায়ে ফেলেও দেখছি পঁচিশ টাকা রয়ে যাচ্ছে। এমত অবস্থায় সাধারণত সিগনেট থেকে বার হওয়া চটি কবিতার বইগুলো ধরিয়ে দেওয়া হয় কিন্তু সে বইগুলো আমার এতই প্রিয় প্রত্যেক কটাই আছে (বিশ্বাস করুন ভালবেসে কেনা!)। যিনি কাউন্টারে ছিলেন তিনি কম্পিউটারে সার্চ করছিলেন, হঠাৎ দেখি মুখচোখ এক্কেবারে উদ্ভাসিত, “আরে, ঠিক পঁচিশ টাকারই বই দেখছি একটা”। বেশ, বই হলেই হল।

কিছুক্ষণ এ তাক, সে তাক ঘোরাঘুরি করে টেনে বার করলেন সেই বই। চটি একটা বই, সামান্য দূর থেকে পেছনের কভারটাও দেখা যাচ্ছে – সুধীর মৈত্র বা সুব্রত চৌধুরী কারোর কাজ। আউটলেটের দরজাটা খুলে কেউ একজন ঢুকছিলেন, বাস-টেম্পো-ট্রাম-ট্যাক্সির কাঁইমাই শব্দ-ও ঢুকে পড়েছে তার সঙ্গে। কিন্তু মিনিটখানেকের জন্য হলেও মনে হল আমি সেন্ট্রাল ক্যালকাটার একটা জনাকীর্ণ অঞ্চলে দাঁড়িয়ে নেই, টালিগঞ্জের ভাড়া বাড়িতে আমার নিজের জন্য থাকা সেই খুপরি ঘরটায় বসে রুদ্ধশ্বাসে পাক্ষিক আনন্দমেলার পাতা ওল্টাচ্ছি।

আনন্দমেলার পাতায় সিদ্ধার্থ ঘোষের বেশী লেখা চোখে পড়ত না, কিন্তু অত কম বয়সেও ঠিক টের পেতাম এনার লেখাটা একটু আলাদা। হয়ত দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বা শৈলেন ঘোষের মতন আলাদা নয় কিন্তু কাকাবাবু-কর্নেল-অর্জুন দের থেকে ঢের আলাদা। ‘ই-টি রহস্য’-ও গোগ্রাসে পড়েছিলাম কিন্তু ‘ভেরেশাগিনের ছবি’র সঙ্গে একটা স্মৃতিমেদুরতা জড়িয়ে, এ উপন্যাসই প্রথম জানায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সাদা বাড়ি, ঘুরন্ত পরী আর সবুজ লনের থেকেও অনেক বেশী কিছু। ভিক্টোরিয়ার মাহাত্ম্য যে শুধু বাইরের সাদা মার্বল পাথর নয়, ভেতরের আর্ট গ্যালারির রন্ধ্রে রন্ধ্রেও লুকিয়ে সে কথা ওই আট বছরের মধ্যে আর কেউ জানান নি তো। কলকাতা নিয়ে   অবশ্য সিদ্ধার্থ ঘোষ (বা আসল নামেই বলা যায়, অমিতাভ ঘোষ)  তার পরেও সাতাশ বছর ধরে অনেক কিছু শিখিয়ে চলেছেন, তিনি না থাকলেও পত্রপত্রিকার পাতায় পাতায় তাঁর লেখা রয়ে গেছে – আর সে সব লেখা সুলভ নয় বলেই একটা চাপা উত্তেজনা থেকে যায়, নতুন কিছু পাব কি?

‘ভেরেশাগিনের ছবি’ একটি রহস্য উপন্যাস, জোব চার্নক মেমোরিয়াল হল থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত শিল্পী ভেরাশাগিনের দুটি অমূল্য ছবি চুরি হয়ে যাবে, আর তা্র তদন্তে নামবেন হ্যালডেন সায়েন্স ক্লাবের সভাপতি মিহির ঘটক, সঙ্গে দুই সহকারী সৌমেন আর রীতা। গল্প নিয়ে আর কিছু বলছি না, কিনে ফেলত পারেন – ‘পঁচিশ টাকা’-য় ‘ভেরেশাগিনের ছবি’র সঙ্গে পেয়ে যাবেন আরো একটি বড় গল্প ‘একটি জলবৎ রহস্য’, এখানেও ওই ত্রয়ীদের কীর্তিকলাপ। তবে হ্যাঁ, ১৯৮৯ এর পর দ্বিতীয় মুদ্রণ হয়েছে হালে ২০০৯-এ, ফের ছাপা হবে কিনা সে নিয়ে একটা সন্দেহ থেকেই যায়, অতএব রসিকজন জলদি যান।

এবার ভেরেশাগিনের কথায় ফিরি। বইটা হাতে পেয়ে অভিভূত হয়েছিলাম কিন্তু পড়তে শুরু করে তার থেকেও বেশী অভিভূত হয়ে পড়লাম কারণ মনে পড়ল গত জুনে মস্কো গিয়ে ত্রেচিকভ আর্ট গ্যালারিতে ভেরেশাগিনের একাধিক ছবি দেখার সুযোগ হয় (যদিও একবারের জন্যও তখন বইটার কথা মনে আসেনি)। ইউরোপীয়ান রেনেসাঁস সংক্রান্ত হাজার হাজার ছবি দেখার ফাঁকে ভেরেশাগিনের তুলির ছোঁয়া একটু নয় অনেকটা রিলিফ এনে দিয়েছিল।

চার্নভ, লেভিতস্কি, কিপরেন্সকি, ব্রিউলোভ এরকম অসংখ্য শিল্পীর মাঝে (যাঁদের নাম আমি কোনোদিন শুনিনি) ভেরেশাগিন-ও কোথায় যেন হারিয়ে গেছিলেন। কিন্তু ‘Appearance of Messiah’ বা ‘The death of Hector’ কি ‘Henserich’s invasion of Rome’ এর মধ্যে হঠাৎ নিচের ছবি দুটিকে পাশাপাশি দেখে চমৎকৃত হয়েছিলাম।

1

2

দ্বিতীয়টি ফকিরদের ছবি সেটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে কিন্তু প্রথমটা কে নেহাত গরুর গাড়ী ঠাউরে অবহেলা করবেন না। ১৮৭৫ সালে দিল্লীর ধনী ব্যক্তিদের প্রধান মোড অফ ট্রান্সপোর্টের ছবিটি এঁকেছেন ভেরেশাগিন। ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৬ এই দু’বছরে ভেরেশাগিন ভারত এবং তিব্বতে টই টই করে ঘুরেছেন – নিসর্গদৃশ্য হোক কি সামাজিক রিচুয়ালস, মন্দির মসজিদের কারুকাজ হোক বা তাজমহল সুলভ রাজকীয় স্থাপত্য, ভেরেশাগিনের চোখ এড়ায় নি কোনো কিছুই। যেমন ধরুন নিচের ছবিটি – ইলোরার ইন্দ্র মন্দিরে অবস্থিত বিষ্ণুমূর্তি।

3

সিদ্ধার্থ ঘোষ কিন্তু এসব দেখে নয়, চমকেছিলেন ছবির মাধ্যমে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ইতিহাসকে ফুটে  উঠতে দেখে। খবরের কাগজের বকলমে সিদ্ধার্থ কি লিখছেন শুনুন, “মন্দির, মসজিদ, তাজমহল ইত্যাদির বহু পেইন্টিং এঁকেছিলেন তিনি, কিন্তু কি ঐতিহাসিক মূল্যের দিক থেকে কি চিত্র সংগ্রহের রোমাঞ্চকর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভেরেশাগিনের অপহৃত চিত্র দুটির মূল্য অপরিসীম। দীর্ঘকাল আমরা জানতাম, বহু ইতিহাসগ্রন্থের সিপাই অভ্যুত্থান অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত কামানের নলের মুখে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড় করানো ও চেন দিয়ে বাঁধা বিদ্রোহী সেপাইদের কামান দেগে উড়িয়ে দেওয়ার সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য একটিই এঁকেছিলেন ভেরেশাগিন। কিন্তু বছর-তিনেক আগে লিয়াওনিং থেকে সিপাই বিদ্রোহ দমনের এই নিষ্ঠুরতম দৃশ্য-বিবরণের আরও দুটি পেন্টিং যখন ঘটনাচক্রে কলকাতার এক অকশন হাউসে এসে পৌঁছয়, বিক্রেতারা তখন চিন্তাও করতে পারেনি তার চিত্রকর ভেরেশাগিন“।

এবার নিচের ছবিটি দেখুন, গায়ে কাঁটা দেবেই।

4

প্রসঙ্গক্রমে জানাই এটি কিন্তু সিপাহি বিদ্রোহের ছবি নয়, ভেরেশাগিন এ ছবি আঁকেন ১৮৮২-৮৩ সালে যখন আবার তিনি ভারতে ফিরে আসেন। সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীদের এরকম ভাবে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলেন এ নিয়ে প্রভূত অভিযোগ আগে থেকেই ছিল, ভেরেশাগিন দেখালেন ১৮৮২ তেও একই জিনিস ঘটছে অর্থাৎ এটাই সে সময়েই কমন প্র্যাকটিস, অস্বীকারের কোনো জায়গাই নেই।

যুদ্ধ এবং বিদ্রোহ-বিক্ষোভ দমন নিয়ে ভেরেশাগিন বহু ছবি এঁকে গেছেন, কিছু ছবি ঐতিহাসিক দলিল আর কিছু দলিল না হয়েও বিষয়বস্তুর নির্বাচন হেতু অসম্ভব বাঙ্ময়।

5

ওপরের ছবিটি আঁকা ১৮৯৭ নাগাদ – ক্রেমলিনের দেওয়ালে সার দিয়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হচ্ছে বিদ্রোহীদের যারা আগুন লাগিয়েছিল প্রাসাদে।

নিচের ছবিটির নাম ‘The apotheosis of war’ – ভেরেশাগিন এঁকেছিলেন ১৮৭১ সালে, এখনো দেখতে পাওয়া যাবে ত্রেচিকভ গ্যালারিতে। ১৮৬৯ এর শেষে ভেরেশাগিন সাইবেরিয়া হয়ে ঢোকেন তুর্কিস্তানে। তৈমুর লং এর খুলি দিয়ে পিরামিড সাজানোর ট্রাডিশন তখনো অব্যাহত সে অঞ্চলে, সম্ভবত সমরকন্দের কাছাকাছি কোথাও ভেরেশাগিন দেখেও থাকতে পারেন এহেন দৃশ্য। তবে এটি তৈমুরের নৃশংস হত্যাকান্ডকেই মাথায় রেখে আঁকা। সিদ্ধার্থ ঘোষ অবশ্য এখানে একটা ভুল তথ্য দিয়েছেন – অ্যাপোথিওসিস অব ওয়ার কে বলেছেন নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণের সময়কার ছবি।

6

তার পরের বছরেই আঁকলেন ‘Present Trophies’, যেটা আগেরটির মতন অত বিখ্যাত না হলেও  বিষয়বস্তুর তীব্রতায় কোনো মতেই কম যায় না। দেখুন তৈমুরের পায়ের কাছে কি দিয়ে ভেট রাখা হয়েছে।

7

সিদ্ধার্থর গল্পে একটা চূড়ান্ত টাইম প্রেশার-ও কাজ করছে, যেহেতু ছবি চুরি যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই রুশ ডেলিগেশনের আসার কথা কলকাতায়, স্বাভাবিক ভাবেই তাঁরা আসার আগেই খুঁজে বার করতে হবে ভেরেশাগিনের ছবি। বাস্তবে অবশ্য দেখা যায় দেশের বাইরে্র যুদ্ধ, বিদ্রোহ নিয়ে ভেরেশাগিনের কাজ যতটা সমাদৃত হয়েছে রাশিয়ার প্রায় ততটাই খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে (সময় বিশেষে অনুমতিও দেওয়া হয় নি ছবি প্রদর্শনীর) যখনই ভেরেশাগিন তাঁর ছবির বিষয়বস্তু করে তুলেছেন রুশ সৈন্যদের। সিপাহী বিদ্রোহের বদলে নিচের তিনটে ছবির সিরিজ ভিক্টোরিয়া থেকে খোয়া গেলে হয়ত মিহিরদের হাতে আরো একটু সময় থাকত – কোন হিপোক্রিটের দলই বা আর দেখাতে চাইবে যুদ্ধে পঙ্গু সৈন্যের অসহায়তা।

8

শেষ করি একটা অন্যরকম ছবি দিয়ে। আগেই বলেছি সিদ্ধার্থ ঘোষ ভুল করে অ্যাপোথিওসিস অব ওয়ার কে  নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণ নিয়ে আঁকা ছবিগুলির মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন কিন্তু ভেরেশাগিন সত্যিই নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণ নিয়ে একাধিক ছবি এঁকে গেছেন। সেখান থেকেই তুলে দিলাম নিচের ছবিটি – একটা কুয়াশা ঘেরা জায়গায় দাঁড়িয়ে চিন্তামগ্ন নেপোলিয়ন, হয়ত অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছুই ডিডিউস করে উঠতে পারছেন না বলেই এত চিন্তা। হায়, যদি দেখতে পেতেন!

দেখুন, শত জয়ধ্বনিও নেপোলিয়নের চিন্তাকে দূর করতে পারছে না, হয়ত একটা অশনি সঙ্কেত ধরা পড়েছে এই খর্বকায় যুদ্ধনায়কের চোখে।  ভেরেশাগিন না থাকলে ধরা পড়ত না আমাদের চোখেও।

9

(স্থিরচিত্র ঋণ – ত্রেচিকভ গ্যালারি, ইয়াতসেক মিহালাক)

Advertisements