এক বুদ্ধিজীবীর মৃত্যু

১৯০৩-এ মারি ক্যুরি, ১৯১১ তেও আবার তিনি – প্রথমবার পদার্থবিদ্যা, দ্বিতীয়রবার রসায়ন; ১৯০৫-এ বার্থা ভন সাটনার – শান্তির জন্য, ১৯০৯-এ সালমা লাগেরলোফ সাহিত্যে, ১৯৪৭ সালে গার্টি  তেরেসা কোরে শারীরবিদ্যায় আর এই সেদিন ২০০৯ সালে এলিনর ওস্ট্রম অর্থনীতিতে – ১১২ বছরের ইতিহাসে এনাদের নাম আলাদা ভাবে উল্লেখ করা দরকার, কারণ নিজেদের বিষয়ে এনারাই প্রথম নোবেল প্রাপক (সর্বমোট ৪৪ জন মহিলা পেয়েছেন এই পুরস্কার)। আর গতকাল, ২০১৪ সালের ১৩ই অগস্ট গণিতশাস্ত্রের নোবেল, ‘ফিল্ডস মেডাল’ প্রথমবারের জন্য তুলে দেওয়া হল এক মহিলার হাতে – স্ট্যানফোর্ডের মারিয়ম মির্জাখানি ঘটিয়ে ফেললেন অভূতপূর্ব কান্ডখানি।

গণিতবিদদের প্রাইম টাইম কুড়ি থেকে চল্লিশের মধ্যে এটা জানার পরেও বলতেই হয় ফিল্ডস মেডাল পাওয়া যেন নোবেলের থেকেও শক্ত ব্যাপার – শুধু যে চল্লিশ বছরের কম বয়সীরাই পেতে পারেন তা নয়, পদকটি দেওয়াও হয় প্রত্যেক চার বছরে একবার। যদিও প্রত্যেকবার চার জন করেই পদকটি পান কিন্তু প্রতি বছরে একজন আর প্রতি চার বছরে চার জন করে পাওয়ার মধ্যে তফাত আছে। ধরুন, আপনিও মারিয়ম মির্জাখানি,  মঞ্জুল ভার্গব, আরতুর আভিলা বা মার্টিন হায়রের এর মতন প্রতিভাবান, কর্মঠ, এবং আউট অফ দিস ওয়ার্ল্ড গোত্রের চিন্তাবিদ । শ্রেষ্ঠ জার্নালগুলি তে অগুন্তি পেপার লিখেছেন, শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয় সেগুলোর ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর-ও বিশাল অর্থাৎ যাকে বলে পাথ ব্রেকিং কাজ, তাই করে দেখিয়েছেন। আরো ধরুন আপনার বয়স ছত্রিশ আর ফিল্ডস মেডাল পাওয়ার ব্যাপারে আপনার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা ঊনিশ। যদি প্রতি বছরে একবার করে ফিল্ডস দেওয়া হত (যেরকমটি নোবেলে হয় আর কি), তাহলে সামনের চার বছরে আপনার পাওয়ার চান্স যথাক্রমে ১/২০, ১/১৯, ১/১৮ ও ১/১৭। তার মানে চার বছরের মধ্যে আপনি ফিল্ডস পাবেন এর প্রোব্যাবিলিটি ০.২২, কিন্তু ফিল্ডসের আসল নিয়ম অনুসারে আপনার পাওয়ার চান্স ০.২ – বলা বাহুল্য যে ঐ ০.০২ সংখ্যাটি এ ক্ষেত্রে কিন্তু নেহাত কম নয়।

মারিয়মকে অসংখ্য অভিনন্দন কিন্তু এবারের ব্লগপোস্টটি মারিয়ম কে নিয়ে নয়। যাঁকে নিয়ে লেখা, তাঁর ওপর লেখার ইচ্ছে অনেকদিনের কিন্তু হয়ে উঠছিল না। মারিয়মের ফিল্ডস মেডাল প্রাপ্তি সেই ইচ্ছেটাকে বাস্তবায়িত করেছে – সত্যিই এর থেকে ভালো সময় আর কিই বা হতে পারে?

হাইপেশিয়া নামটির সঙ্গে প্রথম পরিচয় সাত বছর বয়সে, সৌজন্যে দেব সাহিত্য কুটির।  চার্লস কিংসলের হাইপেশিয়াকে নিয়ে লেখা ফিকশনলাইজড জীবনীটিকে অনুবাদ করেছিলেন সম্ভবত সুধীন্দ্রনাথ রাহা, বিদেশী ক্লাসিকসের অনুবাদ সিরিজে আর একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। দেব সাহিত্য কুটিরের এই  বইগুলো পুরো ছেলেবেলাটা জুড়েই আমার সঙ্গী ছিল । খুব উচ্চমানের অনুবাদ নয়, প্রায় সব বইগুলিই অনেক সংক্ষিপ্তাকারে বার করা কিন্তু তার পরেও ভালো বই পড়ার ইচ্ছে জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে এবং ক্লাসিকস পড়ার আগ্রহকে তুমুল করে তোলার পেছনে দেব সাহিত্য কুটিরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেব সাহিত্য কুটির নিয়ে একটা ব্লগপোস্ট লেখা নিতান্তই দরকার,  ভালোবাসা থেকেই হোক বা কৃতজ্ঞতা থেকে  কিন্তু আপাতত হাইপেশিয়ার কাছে ফিরে যাই।

চলুন আপনাকে নিয়ে যাই ৪১৫ খ্রীষ্টাব্দের আলেকজান্দ্রিয়ায়। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন সিজারিয়মে, প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার সবথেকে বিখ্যাত চার্চে। দেখতে পাচ্ছেন চতুর্দিক থেকে ছুটে আসছে মানুষ, মানুষের মাথার ভিড়ে একটু দূরের সজীব কি নির্জীব অবয়বগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে। এই কাতারে কাতারে মানুষের কেউই কিন্তু সিজারিয়মে প্রার্থনা করার জন্য দৌড়ে আসছে না। বরং তারা ঝাঁপিয়ে পড়ছে চার্চের বিশাল প্রাঙ্গণ থেকে উঠে আসা ততোধিক বিশাল সিঁড়িগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই মহিলার ওপর, সবকিছু ছাড়িয়ে যাঁর গর্বিত চোখ দুটিতেই আপনার দৃষ্টি বারবার আটকে যাচ্ছিল। এখন অবশ্য আর তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন না, চার্চের পূজক থেকে শুরু করে  আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরের লস্কর, সাদা পোষাকে রাজার খোঁচর থেকে শুরু করে মেছুনী সবার ভিড়ে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছেন উন্মত্ত জনতার আঘাতে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে তাঁর শরীর, আবার সেই লোকগুলোই  ফের তুলে আনছে সেই শরীরকে পুনরায় আঘাত হানবার জন্য। আঘাতে ক্রমশ বুজে আসতে থাকা চোখ খুলে দু একবার খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর অনুগামীদের, যারা বহু বহু দূরে লুকিয়ে অসহায়ের মতন দেখছে এই নারকীয় তান্ডবলীলা, তারা জানে হাইপেশিয়ার অনুগামীদের ভাগ্যেও নাচছে একই শাস্তি। শেষবারের মতন টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি, নগ্ন শরীরে আব্রু রাখার মতন কিছুই নেই কিন্তু সে নিয়ে তিনি ভাবিত নন – বরং মুখের সামনে ঝুলতে থাকা চুলের গোছাগুলো দু হাতে সরিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন – তাঁর কথা আলেকজান্দ্রিয়াবাসী অনেক শুনেছে, এই শেষ সময়েও গরবিনীর স্পর্ধা দেখে তারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। এখনও কথা, এখনও জ্ঞানের বাণী? কোনো প্রাণভিক্ষা নয়, কোনো কাকুতিমিনতি নয়, চোখের জল নয়? অসহ্য। অনেকগুলো হাত নেমে এল শরীরটার ওপর, এবার আর তিনি পারলেন না – তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠলেন। এতক্ষণে জনতার শান্তি হয়েছে, এই জান্তব চিৎকার জানিয়েছে তাদের প্রতিহিংসা সফল হতে চলেছে। আর কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র, চিৎকার থেকে মৃদু  গোঙানি হয়ে এখন শুধুই উল্লাসধ্বনি।

আপনি একবিংশ শতাব্দীর মানুষ, এসব আপনার গা সওয়া, অনিতা দেওয়ানের স্মৃতি এখনো টাটকাই আছে। তাও চোখের সামনে এরকম খুন দেখে একটু শিউরোলেন,  কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য, আপনার মনে বরং প্রশ্ন জাগছে – কেন? কোন অপরাধে একটা শহর ভেঙ্গে পড়ে একজন মহিলাকে পিটিয়ে মারতে? আপনি অনেকটা সিওর যে মহিলার দোষের পাল্লাই বেশী, এ আপনি ঘন ঘন দেখেছেন। মনে নেই এই কয়েক বছর আগেই আমেরিকায় পি-এইচ-ডি করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হতে দেখেছিলেন আপনার দুই সহপাঠিনীকে, এক সপ্তাহের মাথায় সেই ছোট্ট জনপদের প্রবাসী মহল জুড়ে ফিসফাস – আরে এই চব্বিশ পঁচিশ বছরের মেয়েগুলো রাত্রে ছেলেদের সঙ্গে বসে মদ গেলে, এসব ওদের সঙ্গে ঘটবে না তো কাদের সঙ্গে হবে শুনি? আসল ঘটনা জেনেশুনে কতদিন আর ন্যাকা সহানুভূতি দেখানো যায়? কিন্তু এখানে ব্যাপারটা একটু জটিল, মদ জাতীয় বেল্লেলাপনা বরং কোনো ইস্যুই ছিল না, জনদপদবধূ জাতীয় ট্যাগ লেগে গেলেও প্রাণহানির কোনো চান্স নেই। কিন্তু না, হাইপেশিয়া সেসব করেন নি, উল্টে তত্ত্ব আওড়েছেন।

আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক থিওনের মেয়ে ছিলেন তিনি, ছোট থেকে দেখে এসেছেন বাবার তত্ত্বাবধানে ছাত্রের দল বসে সমাধান করছে জ্যামিতির কঠিন কঠিন সমস্যা।  হ্যাঁ, জ্যামিতি। আর হবে নাই বা কেন? অঙ্কের অধ্যাপক হিসাবে থিওনের খ্যাতিই তো ছড়ায় ইউক্লিডের ‘এলিমেন্টস’ বইটির সম্পাদনা করার পর। থিওনের মেয়েও গণিত ভালোবাসেন কিন্তু তাঁর কাজের ব্যাপ্তি বিশাল। তিনি দার্শনিক-ও বটে আবার তিনি তাঁর অনুগামীদের মধ্যে  সার্বিক  বিজ্ঞানচেতনা নিয়ে আসতে চান যার দৌলতে তারা চার্চের চাপিয়ে দেওয়া যে কোনো ডিকটামকেই কাটা-ছেঁড়া  করতে পারে; তিনি লজিশিয়ান-ও, স্তরে স্তরে গড়ে ওঠা যুক্তি দিয়েই তিনি স্বীকার বা খন্ডন করেন প্রতিপক্ষের মতবাদ; শুধু কি তাই? তিনি চেষ্টা করেন যাতে তাঁর ছাত্ররা ভালো লিখতে পারে, একজন যুক্তিবাদীর ম্যানুস্ক্রিপ্টে মুন্সিয়ানা থাকা দরকার যখন আসল অবজেক্টিভ হল এই যুক্তিবাদের সার্বিক বিস্তার। দর্শন আর গণিতের গন্ডী ছাড়িয়ে তিনি  সময় সময় উৎসাহ দেখিয়েছেন স্থানীয় রাজনীতিতেও।

মুশকিলটা হল,  কার্যকলাপের  প্রাচুর্যে হাইপেশিয়ার বিষয়ভিত্তিক অবদানগুলো কিরকম আবছা হয়ে এসেছে। হাজার, দেড় হাজার বছরের ইতিহাস ঘেঁটেও সেই অবদানের যথাযথ তালিকা নির্মাণ প্রায় অসম্ভব। বহু ঐতিহাসিক বলেন হাইপেশিয়ার মূল অবদান বীজগণিতে, ডিওফ্যান্টাসের বিখ্যাত  ‘এরিথমেটিকা’ বইয়ের বহু সূত্রের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। থিওনের মেয়ে বলেই হয়ত অনেকে আবার বিশ্বাস করেন জ্যামিতিতেও হাইপেশিয়ার ছিল অগাধ দক্ষতা। তাঁরা এও বিশ্বাস করেন যে ‘এলিমেন্টস’ এর সহ-সম্পাদক ছিলেন হাইপেশিয়া, যদিও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। শোনা যায় টলেমির জ্যোতির্বিদ্যা  আর ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির সম্পর্ক বোঝাতে লিখে ফেলেছিলেন আস্ত একটি বই (ইংলিশে যার নাম অ্যাস্ট্রোনমিকাল ক্যানন), কিন্তু সে বইও কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। এই বই নিয়েও বিতর্ক, কিছু ঐতিহাসিকের ধারণা বইটির সঙ্গে জ্যামিতির বিশেষ সম্পর্ক নেই, জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত কিছু সংখ্যা ও তালিকার সমাহার মাত্র। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল মারিয়ম মির্জাখানির কাজের অনেকটাই নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি নিয়ে –  বাস্তবে আর কটা ত্রিভুজের কোণের সমষ্টি একশ আশি ডিগ্রী হয়? চোখের সামনে যে ত্রিভুজ দেখছেন সেগুলো তো আর সরলরেখা দিয়ে তৈরি নয়, তাহলে আর ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির উপপাদ্য-প্রতিপাদ্য খাটবে কি করে? যাই হোক, ‘এরিথমেটিকা’ ছাড়া হাইপেশিয়ার আর একটি কাজেরই সন্ধান এখনো পাওয়া যায় – অ্যাপোলোনিয়াসের ‘কনিকস’ বইটির ওপর লেখা তাঁর ব্যাখ্যা। ‘কনিকস’ এবং ‘এরিথমেটিকা’ দুটি বইই হায়ার অর্ডার ইকুয়েশনের তাত্ত্বিক আলোচনায় ভরপুর, কিন্তু প্রথম বইটিতে সেই আলোচনা এসেছে বীজগণিত নয়, জ্যামিতির হাত ধরে।

গণিত নিয়ে হাইপেশিয়ার কাজের আলোচনা থেকে একটা ধারণা আসে যে আজ থেকে ষোলোশ বছর আগেই হাইপেশিয়া  একটা শাশ্বত সত্যের খোঁজ করেছেন,  কোনো  একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির নিগড়ে বাঁধা না থেকে। আর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি ফুটে উঠেছে হাইপেশিয়ার ছাত্রদের লেখাতেও। ইসিডোর, সিনেসিয়াস দের লেখা জানাচ্ছে হাইপেশিয়া যেমন ক্রিশ্চান ছিলেন না, ক্রিশ্চান ধর্মের বিরোধিতাও কখনো করেননি। আর এখানেই রহস্য – কারণ হাজার বছর ধরে মানুষ ভেবে এসেছে হাইপেশিয়ার মৃত্যু ঘটে চার্চের বিরোধিতা করতে গিয়ে, সিজারিয়মের বিশপ সিরিলই ষড়যন্ত্র করে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলেন।

কিন্তু আসলে যা ঘটেছে তা হল হাইপেশিয়ার দর্শনতত্ত্বের ভুল ব্যাখ্যা  দিয়ে একটা  শ্রেণী-বিভাজনের সফল প্রয়াস। হাইপেশিয়া বিশ্বাস করতেন নিও-প্লেটোনিজমে, সে তত্ত্ব একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু এখানে এই ‘এক’ কোনো সুপ্রিম পাওয়ার নয়, এই ‘এক’ বোঝায় আত্মার পূর্ণ চেতনাকে। এই ‘এক’ এর কোনো দৈবিক শক্তি নেই, পূর্ণ  বৌদ্ধিক বিকাশই এই ‘এক’ এর একমাত্র শক্তি। স্বাভাবিক ভাবেই যারা নিও-প্লেটোনিজমের বিশ্বাসী তাঁদের অধিকাংশ সময়ই কাটবে গণিত এবং দর্শনের আখড়া্য, স্বাভাবিক ভাবেই হাইপেশিয়া এবং থিওনের বাড়িই হয়ে উঠবে এঁদের তীর্থক্ষেত্র।  কিন্তু এঁরা কারা? র‍্যাশনালি ভাবলে মনে হয় এঁরা মূলত বুদ্ধিজীবী; এবং এঁরা যদি ক্রিশ্চিয়ান ধর্মকে উপহাস করেও থাকেন সেটা ব্রেনওয়াশড হয়ে বা সুপ্ত বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে নয়। গণিতজ্ঞ, চিন্তাবিদ, যুক্তিবিদদের কাছে ক্রিশ্চিয়ান ধর্ম পাত্তা পায়নি কারণ একেশ্বরবাদী হয়েও সেখানে অনুপ্রবেশ ঘটেছে এক সুপ্রিম পাওয়ারের, এ যেন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এক  অজ্ঞাত গাণিতিক রাশি,  এ যেন n খানা সমীকরণ থেকে n+1 খানা গাণিতিক রাশির মান খুঁজে বার করার অসম্ভব প্রচেষ্টা। হাইপেশিয়া এঁদের শিক্ষক, এঁদের নেত্রী – স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নেওয়া যায় হয়ত এই কমজোরী তত্ত্বের কারণেই নেত্রী নিজেও অল্পবিস্তর উপহাস করে থাকবেন মেনস্ট্রীম ধর্মটিকে। কিন্তু তত্ত্বের দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসিতে না থেমে এ যে পুরোদস্তুর ক্লাস স্ট্রাগলে চলে গেল, ট্র্যাজেডি সেখানেই। মনে করুন সিজারিয়মের উন্মত্ত জনতার মধ্যে কাদের কাদের দেখতে পেয়েছিলেন। সাধারণ মানুষদের কাছে টানতে চার্চের কোনো অসুবিধাই হয়নি কারণ দেশকাল নির্বিশেষে বুদ্ধিজীবীরা কখনই মাসকে সঙ্গে পাননি – একটা তীব্র অবিশ্বাস সবসময় দেওয়াল হয়ে দেখা দিয়েছে দু দলের মধ্যে। যে মুহূর্তে ধার্মিক বা রাজনৈতিক সাপোর্ট সরে গেছে বুদ্ধিজীবীদের পাশ থেকে, মাসের হাতে লাঞ্ছিতই হতে হয়েছে তাঁদের।

বিখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক গিবন্ বিশ্বাস করতেন হাইপেশিয়ার মৃত্যুক্ষণই হল আলেকজান্দ্রিয়ার উৎকর্ষ যুগের শেষের শুরু, মিশরের-ও। এ অভিশাপ গ্রাস করে গ্রীক সাম্রাজ্যকেও এবং ফলত গোটা ইউরোপকেই, যে অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ পেতে লেগে যায় প্রায় আরো হাজার বছর।

হাইপেশিয়া বেঁচে থাকলে অবশ্য প্রতিবাদ করে বলতেন –  অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ পেতে নয়, চেতনার বিকাশ ঘটতেই সময় লেগেছে হাজার বছর। কিন্তু  চেতনার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটতে আরো কত হাজার বছর লাগবে? আরো কত যুগ লাগবে সেই ‘এক’ কে খুঁজে পেতে? বড় কঠি্ন প্রশ্ন –  অন্তত এটুকু তো জানিই যে হাইপেশিয়ার ছাত্রদের নাম জানলেও কোনো ছাত্রীর নাম আমরা খুঁজে পাই নি,  দু বছরের মাথায় মারি ক্যুরি পথ দেখানোর পরেও আর মাত্র তেতাল্লিশ জনই নোবেল পোডিয়ামে উঠতে পেরেছেন, হাইপেশিয়া-মারিয়া আগনেসি-সোফি জারমেন দের ইতিহাস নিয়েও আমাদের আটাত্তর বছর লেগে গেছে মারিয়মকে খুঁজে পেতে। ঈশ্বরদর্শন কি মুখের কথা, নিজের চেতনার রঙে রাঙিয়ে তুলতে চাইলেও?

hypatia

পুনশ্চ –  আর এক বিদুষী কে নিয়ে বহুকাল আগে একটা ধাঁধা দিয়েছিলাম, সময় থাকলে ছোট গ্রে সেল গুলোকে একটু খাটিয়ে ফেলুন।

এক যে ছিলেন কন্যে,

যাঁর বাবার জন্যে,

আকাশ থেকে যাইবা হারায়

কমে বেড়ে একই দাঁড়ায়

কারণটা কি? সেটা ভেবেই হন্যে।

 

কারণ যদি মেলে

(তাকে) n-এর সাধ্যসীমায় ফেলে,

ইনভার্স আর এক কে ধর গে

দুয়ের যোগের n-th  বর্গে,

ইরর‍্যাশনাল কে পেলে।

 

তাতেই কি দ্যায় ক্ষান্তি?

পাই, না পাই শান্তি

ডানদিকে যার বর্গ,

সেই হাতে দ্যায় স্বর্গ

ইকুয়েশন মিলিয়ে দিল অবাস্তব এক ভ্রান্তি।

Advertisements