ইস্তাহারের প্রহসন, প্রহসনের ইস্তাহার

Cong-left_2767317f

‘The writing on the wall’

বাক্যবন্ধটি নেহাতই বাগধারা তবে দেওয়াল লিখন দেখে কখনো সখনো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা আঁচ পাওয়া যায় বটে। ‘বন্দে ইনকিলাব’ হলেও একটা কথা ছিল, ‘মাতরম জিন্দাবাদ’ বললেও একটা ছাড় দেওয়া যেতে পারত কিন্তু ‘ইনক্লাব মাতারম’ (বিপ্লবী মা? মা-কে নিয়ে বিপ্লব? কেই বা জানে!) দেখলে মনে হয় যে অশিক্ষার রাজনীতি বহু বছর ধরে বাংলাকে ভেতরফোঁপরা করে ছেড়ে দিয়েছে তার থেকে আরো বহু যুগ আমাদের মুক্তি নেই, সামনের দিনগুলোয় রাজনৈতিক পরিবর্তন হোক কি না হোক। তবে সে আঁধারের গভীরতাকে ঠাহর করতে গেলে দেওয়াল লিখন ছেড়ে ছাপার অক্ষরে একবার চোখ বোলানো দরকার।

ভোট‘যুদ্ধ’ শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহার খুঁটিয়ে দেখছিলাম। বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে দলগুলির বিশেষ তাপউত্তাপ ছিল এমন অপবাদ কেউ দেবেন না, তবে এই ইস্তেহারগুলির ছত্রে ছত্রে যে পরিমাণ আলস্য, প্রতারণা এবং অবান্তর বাক্যালাপ ঝরে পড়ছে তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে নেতারা ধরেই নিয়েছেন ‘লো লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম ট্র্যাপ’ থেকে বেরোনোর কোনো রাস্তাই নেই। “কর্মসংস্থানের মূল লক্ষ্যে ছোট এবং মাঝারি শিল্পের ওপর গুরুত্ব বজায় থাকবে। বৃহৎ শিল্প গড়ারও চেষ্টা করা হবে”। এমনভাবেই শুরু হচ্ছে সিপি(আই)এম এর নির্বাচনী ইস্তাহারের শিল্পসংস্থান অনুচ্ছেদটি। টোনটা লক্ষ্য করুন, ‘বৃহৎ শিল্প গড়ারও চেষ্টা করা হবে’! একে নিছক সান্ত্বনাপ্রদান বলবেন নাকি সর্বহারার বাস্তববোধ? ষোল পাতার ইস্তাহারের প্রায় প্রতিটি লাইনের শেষে অবধারিত ভাবে থাকছে দুটি শব্দ – ‘হবে’ অথবা ‘হবে না’। কি ভাবে হবে, কেনই বা হবে না, কে হওয়াবে সেসব নিয়ে একটা শব্দও খরচ করেন নি এনারা। বাংলার অর্থনীতিবিদরা ‘ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি’তে লিখে লিখে হদ্দ হয়ে গেলেন যে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ প্রভূত পিছিয়ে, বাম আমলের তুলনায় তৃণমূলের আমলে আদায় সামান্য বেড়েছে বলে জলের উপরে নাকটুকু কোনোমতে ভাসিয়ে রেখেছি মাত্র। সেই রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি নিয়ে কি ভাবছেন লেফট ফ্রন্ট? কোনো উত্তর নেই। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর দিক থেকে সতেরোটি প্রধান রাজ্যের মধ্যে আমরা আছি ষোল নম্বরে। অসীম দাশগুপ্ত, নিরুপম সেনের উত্তরাধিকারীরা এ তথ্য আদৌ জানেন কিনা বোঝা গেল না কারণ বিদ্যুৎ পরিকাঠামো কি ভাবে গড়ে উঠবে সে নিয়ে এক সেকন্ডও বাজে খরচ করেন নি তাঁরা, সোজা লিখে দিয়েছেন ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগে গ্রহণ করা হবে’। মুদ্রণপ্রমাদ টা নজর করবেন, ‘উদ্যোগ’ নয় ‘উদ্যোগে’! খসড়াটা তৈরী হওয়ার পর কেউ যে একবার পড়েও দেখেন নি সেটা বেশ বোঝা গেল।

শিক্ষা প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে, ‘শিক্ষায় বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং সাম্প্রদায়িককরণ বন্ধ করা হবে’। ভালো কথা কিন্তু মহারাষ্ট্র বা কর্ণাটকের ৩০০০ এর বেশী কলেজের সঙ্গে আমরা চারশ একুশটি সরকারী কলেজ নিয়ে (২০১৪-র হিসাব অনুযায়ী) কি ভাবে পাল্লা দেব সে নিয়ে কোনো হদিশ নেই।অন্য রাজ্যের অধিকাংশ কলেজেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কিন্তু নেই মামার থেকে কানা মামা যে কতটা বেশী গ্রহণযোগ্য সে নিয়ে আর নতুন করে কিছু বলার থাকে না। বেসরকারী কলেজ না থাকার কস্ট-বেনিফিট নিয়ে আলোচনাটুকু তো অন্তত শুনতে চাইবেন আপনি, তাই না? কাকস্য পরিবেদনা! নন্দীগ্রাম এবং সিঙ্গুরের ভূত যে আরো বহুদিন বামেদের তাড়া করে বেড়াবে তা ইস্তাহারে একবার চোখ বোঝালেই টের পাওয়া যায়, ‘শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়া হবে’। এহেন বালখিল্য কথার বাইরে প্রাপ্তি শূন্য। সরকারের ভূমিকাটা ঠিক কি হবে? মধ্যস্থতাকারীর নাকি ক্রেতার? LARR (Right to fair compensation and transparency in land acquisition, rehabilitation and resettlement act) নামক জাতীয় জমি অধিগ্রহণ নীতির সঙ্গে কতটা সাযুজ্য বা সামঞ্জস্য থাকবে রাজ্য সরকারের নীতির? শুধুমাত্র বেসরকারী প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের নীতিই বা কি হওয়া উচিত? কোনো প্রশ্নেরই উত্তর তো পাবেনই না উল্টে মনে হওয়া বাধ্য যে অর্থনৈতিক ভাবে আগের ভুলত্রুটি থেকে কোনো শিক্ষাই এরা নেন নি।

বামেদের মতন চরম ঔদাসীন্য কিন্তু ঘাসফুলের মালীরা দেখাননি। যেটুকু ক্রেডিট তাঁদের প্রাপ্য তা অবশ্যই দিতে হবে। সিপি(আই)এম এর ষোল পাতার জায়গায় তৃণমূলের একশ বিয়াল্লিশ পাতার ইস্তাহার – সেখানে যথেষ্ট তথ্য আছে, ‘কমপেয়ার অ্যান্ড কনট্রাস্ট’ আছে, কি কি প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়েছে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। স্পষ্টতই তৃণমূলের ইস্তাহারটি যারা বানিয়েছেন তাঁরা বামেদের তুলনায় অনেক বেশী খেটেছেন। সমস্যা হল সেসব তথ্য বহুলাংশে অসম্পূর্ণ। তৃণমূলের ইস্তাহারের প্রতিটি চিত্রলেখে দু’টি করে স্তম্ভ – ২০১১’র শেষে মা কি ছিলেন আর ২০১৫’র শেষে মা কি হয়েছে। অথচ তুলনাটা হওয়া উচিত ২০১১’র শেষে বাকি রাজ্যগুলির তুলনায় আমরা কোথায় ছিলাম আর ২০১৫’র শেষে তাদের তুলনাতেই আমরা কোথায় আছি। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক – তৃণমূলের ইস্তাহারের একচল্লিশ নম্বর পাতায় দেখানো হচ্ছে ২০১১-তে যেখানে রাজ্যের উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে gross enrolment ratio ছিল ১২.৬% সেটাই ২০১৫-র শেষে বেড়ে হয়েছে ১৭.৫%। তাহলে ব্রাউনি পয়েন্টস দিই? সেখানেই যে গন্ডগোল। ২০১১তে ৩৫টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে gross enrolment ratio-র হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল সাতাশ, আর ২০১৫ র শেষে সেটা দাঁড়িয়েছে ছাব্বিশ। সুতরাং পাঁচ বছরে বাকি ভারতের তুলনায় আমাদের উন্নতি বলতে গেলে ইতরবিশেষ, সংখ্যাতত্ত্বের পরিভাষায় যাকে হাইপথেসিস টেস্টিং বলে তার নিরিখে হয়ত আদৌ কোনো পরিবর্তনই ঘটেনি। আরো একটা তথ্য দেওয়া যাক যেটা তৃণমূলের ইস্তাহারে পাবেন না – প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য ২০১১ সালে আমাদের ছিল ৮ টি কলেজ, ২০১৫ তে হয়েছে ৯টি; পাঁচ বছর আগেও আমাদের র‍্যাঙ্ক ছিল ৩২/৩৫, এখন ৩৩/৩৬।

আবার ধরুন বত্রিশের পাতায় দেখা যাচ্ছে ২০১১ সালে যেখানে বামফ্রন্ট সরকার মাত্র ১০৪০ কোটি টাকা খরচ করেছিলেন স্বাস্থ্য পরিষেবায়, তৃণমূলের আমলে চার বছরে সেটাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১৫৯ কোটি টাকা। খুশী হবেন কি? প্লীজ না। যে মাপকাঠিতে দেখা উচিত সেটা হল রাজ্যের মোট বাজেটের কত শতাংশ আমরা স্বাস্থ্যের জন্য খরচ করছি? ২০১১-র শেষে সংখ্যাটা ছিল ৭.১৪%, ২০১৫তে সেটা দাঁড়িয়েছে ৫.২%। পাঁচ বছর আগে আমরা শতাংশের এই হিসাবে সারা ভারতের মধ্যে ছিলাম পাঁচ নম্বরে, এখন পিছিয়ে হয়েছি সাত (নতুন রাজ্য তেলেঙ্গানাকে না ধরেই)। প্রধান বিরোধী দল হিসাবে হয়ত ভাববেন বামফ্রন্ট এইখানে জোর চেপে ধরবে শাসক দলকে। সে গুড়ে বালি, ষোল পাতায় কোনোরকমে দায় মেটাতে হলে যা হয় তাই হয়েছে। কিছু অতীব সুপারফিসিয়াল কথা ছাড়া বামেদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ইস্তাহারে ভাবিয়ে তোলার মতন একটা কথা পাবেন না – ‘নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রয় বন্ধ করতে হবে’, ‘সরকারি চিকিৎসকদের হয়রানি বন্ধ করা হবে’, ‘ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করা হবে’ ইত্যাদি ইত্যাদি…সেই একঘেয়ে ‘হবে’, ‘হবে’, ‘হবে’ অর্থাৎ কিচ্ছুটি হবে না।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেখেছিলাম ছাত্রনির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জনৈক জাঠ ছাত্র ঘোষণা করেছিল তাকে নির্বাচিত করলেই প্রত্যেকটি হোস্টেল নিজস্ব সুইমিং পুল পাবে। বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহার দেখে ছোকরাটির কথা মনে পড়ে গেল। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যেখানে পশ্চিমবঙ্গের তিন লাখ কোটি টাকা ঋণের একটা নয়াও মকুব করছে না সেখানে রাজ্য নেতৃত্ব দাবী করছেন সমস্ত সরকারী হাসপাতালে অন্ততপক্ষে কুড়ি শতাংশ বেড বাড়ানো হবে, সঙ্গে থাকবে অত্যাধুনিক চিকিৎসাসামগ্রী। কে দেবে এই টাকা? গৌতম আদানি? তা না হলে মুশকিল আছে কারণ রাজস্ব আদায় কিভাবে বাড়বে সেই প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ জানিয়েছেন, “we propose better tax compliance”। ব্রিলিয়ান্ট! স্বপ্নে পোলাও খেলে বেশী ঘি দিয়ে খাওয়াটাই দস্তুর, সুতরাং আরো জানিয়েছেন দু’বছরের মধ্যে রাজ্য কর্মচারীদের কেন্দ্রের সমতুল্য মহার্ঘ ভাতা দেওয়া হবে, মাইনে এবং পেনশন বাড়ানো হবে, রাজ্য জুড়ে তৈরী হবে নতুন নতুন রাস্তা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র, পঞ্চাশ শতাংশ বেশী পুলিশ থানা বসবে, রাজ্য জুড়ে কোল্ডস্টোরেজের ধারণ ক্ষমতা দ্বিগুণ করে ফেলা হবে, প্রত্যেক কন্যাসন্তানের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকার ফিক্সড ডেপোজিট রাখা হবে, প্রাইমারি স্কুলের সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে বই – পোষাক এবং জুতো দেওয়া হবে, ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষায় আশি শতাংশ মার্কস পেলেই পাওয়া যাবে বিনামূল্যের ল্যাপটপ…আরো কত কি! স্বয়ং মধুসূদন দাদাও দু’বার ভাবতেন এহেন প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়ার আগে। এর সঙ্গে সঙ্গে আরো জানানো হচ্ছে যে বিদ্যুৎশুল্ক কমানো হবে, সার্বিক ভাবেই শুল্ক মাসুলের ক্ষেত্রে বন্ধুত্বপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ আয় কি ভাবে হবে তা নিয়ে সম্যক কোনো ধারণাই নেই, এদিকে ব্যয়ের ক্ষেত্রে রীতিমতন পঞ্চবর্ষীয় পরিকল্পনা। এই ইস্তাহার নিয়ে বিজেপির অন্তত তিন লাখ কোটি দেনার ব্যাপারে মুখ খোলা উচিত নয় কারণ জাদুবলে যদি এই সব কিছু বাস্তবায়িত হয়ও রাজ্যের ঋণ অনায়াসে আরো তিন লাখ কোটি ছুঁয়ে যেতে পারে।

ইস্তাহারেই যেখানে এত অবহেলা, আসল সময়ে আরো কত দুর্দশা অপেক্ষা করছে কে জানে। দোষ তো আমাদেরও, সারদা – নারদ – নন্দীগ্রাম – কানহাইয়া কুমার – মুনমুন সেন – চাষার ব্যাটা এবং আরো হাজারখানা ফাঁড়া কাটিয়ে আজও জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারছি না আলোচনাটা কবে হবে?

(স্থিরচিত্র – অশোক চক্রবর্তী, ‘The Hindu’)

Advertisements