জন ন্যাশের উত্তরাধিকার

ন্যাশের গবেষণা প্রসঙ্গে আরো কিছু কথা, অবশ্য এবারের বিষয় জন ন্যাশ নিজে নন – ন্যাশের কাজকে ভিত্তি করে বাকি যাঁরা করে চলেছেন গুরুত্বপূর্ণ  এবং বৈচিত্র্যময় গবেষণা তাঁদের নিয়েই এবারের ব্লগ পোস্ট।

প্রবন্ধটি বেরিয়েছে ‘আরেক রকম’ পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যায়, সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠকদের জন্য এখানে তুলে দেওয়া হল স্ক্যানড ফাইল।

01

02

03

04

John Nash

(জন ন্যাশের স্থিরচিত্র উৎস – গুগল ইমেজেস)

Advertisements

এক চিন্তাবিদের সংগ্রাম – জন ন্যাশ প্রসঙ্গে

প্রতি বছর মে মাসে  ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের অর্থনীতি বিভাগ  ‘নোবেল লেকচার’ এর আয়োজন করেন , তার আগের বছরের ডিসেম্বরে যে অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড নোবেল স্মৃতি পুরস্কারটি পেয়েছেন তার কাজের বিশ্লেষণ করেন  অর্থনীতির অধ্যাপকরা। ২০০৮ সালের লেকচারটি ছিল লিওনিড হেরউইসজ, এরিক মাসকিন এবং রজার মায়ারসনের কাজের ওপর,  ‘মেকানিজম ডিজাইন’ এর তাত্ত্বিক কাজের জন্য এনারা ২০০৭-এ পুরস্কারটি পান। সাধারণ দর্শকদের জন্য মেকানিজম ডিজাইনের জটিল তত্ত্ব জলবত তরলম করে বোঝানো চাট্টিখানি কথা নয়, বক্তারা তাই স্বাভাবিক ভাবেই গেম থিয়োরীর বেসিকস দিয়ে শুরু করেছিলেন (এখানে বলে রাখা ভালো যে মাসকিন বা মায়ারসন এনারা সবাই খ্যাতনামা গেম থিয়োরিস্ট)। দেড় ঘন্টা পর লেকচার শেষে দেখা গেল অধিকাংশ শ্রোতাই মনে রেখেছেন শুধু ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়মের কনসেপ্টটি। জনা চারেক অধীর আগ্রহে প্রশ্ন করলেন ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়মের ব্যবহারিক গুরুত্ব নিয়ে, যে অধ্যাপক বোঝাচ্ছিলেন তিনি একটু থমকে গিয়ে বললেন, “এই ধরুন একটা অকশনে আপনার কতটা বিড করা উচিত সেটা আপনি জানতে পারবেন অকশন নামক গেমের ন্যাশ সাম্যাবস্থাটি বুঝতে পারলে”। এক মিনিটের মধ্যে অকশনের ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম বোঝা এবং বোঝানো দুঃসাধ্য ব্যাপার, শ্রোতারা তাই জানতে চাইলেন, “আর?”অধ্যাপক কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তা করে বললেন “না, সেরকম ভাবে তো আর কিছু বলা যাবে না”। অধিকাংশ শ্রোতাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী এবং বর্তমানে উচ্চপদস্থ কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ,  ব্যবহারিক গুরুত্বের দিক থেকে ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম তাঁদেরকে বেশ হতাশ করল দেখলাম, কোঁচকানো ভুরু সোজা হতে বেশ সময় নিল।

২০০৭-এ ন্যাশ যখন দিল্লীতে এসেছিলেন, একইরকম ভাবে হতাশ হয়েছিলেন অধিকাংশ সাংবাদিক। ভারত – পাকিস্তান রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধানের ব্যাপারে ন্যাশ সাম্যাবস্থা কি বলছে? ন্যাশ ‘সে তো জানি না’ ধরণের মন্তব্য করে চলে যান। কিন্তু শুধু সাংবাদিক বা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভরাই এমনটি ভাবেন ভাবলে ভুল হবে, অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এরকম লোকের সংখ্যা কম নয় যারা ভাবেন ন্যাশ সাম্যাবস্থা বলে কোনো জিনিস বাস্তব পৃথিবীতে নেই এবং থাকতে পারে না। জন ন্যাশের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে স্বভাবতই একটু ন্যাশ সাম্যাবস্থা নিয়ে বলা উচিত। নিচের গেমটির কথা ধরা যাক,

halla-shundi প্রতিটি খোপের প্রথম সংখ্যাটি জানাচ্ছে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হাল্লার কত লাভ, একইরকমভাবে দ্বিতীয় সংখ্যাটি শুন্ডীর জন্য প্রযোজ্য। এবার ধরুন হাল্লার রাজা গান ধরলেন, “হাল্লা চলেছে যুদ্ধে”, তাহলে শুন্ডীতে বসে ভালোমানুষ সন্তোষ দত্তের কি করা উচিত? তিনিও যুদ্ধেই যেতে চাইবেন কারণ -৫ এর থেকে -১ ভালো (এখানে আমরা ধরে নিচ্ছি এক দেশ অন্য দেশকে অধিকার করে বসলে প্রথম দেশটির প্রভূত লাভ এবং দ্বিতীয় দেশটি শান্তি চাই বলছে মানে তারা আদৌ যুদ্ধে যাচ্ছে না বা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে না)। আবার হাল্লার রাজা যদি শান্তিপ্রিয় হন তাহলেও কিন্তু শুন্ডীর রাজা যুদ্ধেই যেতে চাইবেন কারণ ১ এর থেকে ৫ ভালো। একই ভাবে শুন্ডীর রাজা যাই সিদ্ধান্ত নিন না কেন, হাল্লার রাজার-ও যুদ্ধে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। দুই রাজাই বুদ্ধি করে নিজেদের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করলেন এবং দেখলেন শেষমেশ দু’জনেই যুদ্ধে যাচ্ছেন। অন্য রাজা যাই করুন না কেন, হাল্লা বা শুন্ডীর রাজারা যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত হবেন না – এই যে সাম্যাবস্থা,  এরই নাম ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম।

তো এই ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম নিয়ে অভিযোগ কম নয়। বহু মানুষ (যাদের মধ্যে অনেক অর্থনীতিবিদরাও রয়েছেন) বলেন বাস্তবে মানুষ এত স্ট্র্যাটেজিক্যালি পরিস্থিতি বিচার করে না, ‘গাট ফিলিং’-ই ভরসা।  অনেকে আবার বলেন একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি থেকে আমার কত লাভ সেটাই অনেক সময় জানা থাকে না। কিছু মানুষের ধারণা আমরা লাভের থেকে ক্ষতির ব্যাপারে বেশী সংবেদনশীল, অর্থাৎ -৫ এবং -১ এর মধ্যে যা তফাৎ, ৫ এবং ১ এর মধ্যে তফাৎ তার থেকে আলাদা, গাণিতিক ভাবে যতই দুটি ক্ষেত্রেই আমরা চার ঘর সরি না কেন।

কিন্তু ন্যাশ সাম্যাবস্থা দিয়ে আমরা ঠিক লাভ ক্ষতির হিসেব করতে বসব না। আমার মতে ন্যাশ সাম্যাবস্থা একটি দার্শনিক ধারণা। কেন? ওপরের ‘গেম’টির কথাই ধরুন – দেখাই যাচ্ছে দুটি দেশ একত্রে সবথেকে বেশী লাভবান হবে যদি দু’জনেই বলে ‘শান্তি চাই’। দুটি দেশের রাজাই কিন্তু যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে সমস্ত পরিস্থিতি বিচার করে ঠিক করছেন কি করণীয়। মানেটা দাঁড়াচ্ছে এই যে দু’জন বুদ্ধিমান মানুষ নিজেদের সেরাটা দিয়েও সব থেকে ভালো পরিস্থিতিতে পৌঁছতে পারছেন না, এটাই ট্র্যাজেডি। এই ট্র্যাজেডিটা তুলে ধরাই হল ন্যাশ সাম্যাবস্থার সব থেকে বড় অবদান – বুদ্ধি দিয়ে সেরা চালটি চাললেই যে অভীষ্ট জায়গায় পৌঁছবো এই গ্যারান্টি নেই আমাদের কাছে, কিন্তু সেটা বোঝে ক’জন।

আর এই সূত্র ধরেই বিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে একটা যুগান্তকারী গবেষণা শুরু হয়। ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদরা সদাই বলে এসেছেন মানুষ ডিশিসন নেয় নিজের সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে, ন্যাশ সাম্যাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই নব্যযুগীয় অর্থনীতিবিদরা বললেন কথাটা ভুল, আমরা আসলে ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’। সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা কখনই ব্যবহার করে উঠতে পারি না বা পারলেও তা হয় কদাচিৎ। আপনার পকেট ঢুঁ ঢুঁ অথচ ফুলের দোকানের সামনে দিয়ে যেতে যেতে টুক করে একটু ফুল কিনে ফেললেন কারণ কবি বলেছেন “জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি, দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী”। তাহলে কি আপনাকে নির্বোধ ঠাওরাব? না, আপনি নেহাতই ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’ – সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে আপনার, এই মাত্র। কি ধরণের প্রতিবন্ধকতা? মায়া, উত্তেজনা, প্রেম, দুঃখ এহেন নানা অনুভূতি।

জন ন্যাশ সমাজবিজ্ঞানী ছিলেন না, অর্থনীতিবিদ-ও নন, তিনি গণিতজ্ঞ। কিন্তু সেই গণিতের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম, মুশকিলটা হল অধিকাংশ মানুষ এই ব্যবহারিক গুরুত্বটাকে মাপেন লাভ-ক্ষতির হিসাবে আর তাই মনে হয় ন্যাশ সাম্যাবস্থা একটা ‘ইউটোপিয়ান কনসেপ্ট’। যারা সিলভিয়া নাসারের লেখা জীবনীটি পড়েছেন বা রাসেল ক্রো অভিনীত সিনেমাটি দেখেছেন তাঁদের জন ন্যাশের জীবনযুদ্ধ নিয়ে নতুন করে কিছু শোনানোর দরকার নেই। যারা পড়েন নি বা দেখেন নি তাঁরা গুগল বা উইকি সার্চ করতে পারেন ‘জন ন্যাশ’ বা ‘আ বিউটিফুল মাইন্ড’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে। আমি কিন্তু জন ন্যাশের জীবনসংগ্রামের কথা নিয়ে কিছু লিখছি না,  বুদ্ধিজীবী ন্যাশের দর্শন  এবং চিন্তাধারাকে বিদ্বজনরা কি ভাবে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছেন সে নিয়ে কিছু বলাই আমার উদ্দেশ্য।

এ ইতিহাসের শুরু জন ফন নয়ম্যানকে দিয়ে, যাকে ধরা হয় গেম থিয়োরীর জনক। নয়ম্যান নিজে যখন প্রিন্সটনের সহকর্মী অস্কার মরগেনস্টার্নের সঙ্গে ‘থিয়োরী অফ গেমস অ্যান্ড ইকোনমিক বিহেভিয়র’ লেখেন, অধিকাংশ গণিতবিদ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন এই নতুন গাণিতিক শাখাটিকে – অ্যাপ্লায়েড ম্যাথসের কদর তখন ছিল না বললেই চলে। ন্যাশের ডক্টরাল থিসিসের অনুপ্রেরণা কিন্তু এই বইটিই কিন্তু সেই ন্যাশ নিজে যখন ফন নয়ম্যানের কাজকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন, নয়ম্যান নিজেই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন “সামান্য কাজ”। অথচ ফন নয়ম্যানের ‘কোঅপারেটিভ গেমস’ (যেখানে মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে সিদ্ধান্ত নেন) এর তুলনায় বাস্তবে হয়ত ন্যাশের ‘ননকোঅপারেটিভ গেমস’ (যেখানে অন্যরা কি করছে তার পরোয়া না করে আমি নিজের সেরা সিদ্ধান্তটা নেব) এর সংখ্যাই বেশী। অর্থনীতিবিদরা যেহেতু প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রচুর মাথা ঘামান, ন্যাশের গবেষণা তাঁদেরকে অনেক বেশী প্রভাবিত করেছে। বেশ কিছু অর্থনীতিবিদের কথার সূত্র ধরে ২০০৮-এ জেমস কেস নামের এক সাংবাদিক একটা বইও লিখে ফেলেন ‘Competition: the birth of a new science’ নাম দিয়ে – ন্যাশের কাজ না থাকলে বলা বাহুল্য বিজ্ঞানের এই নতুন শাখাটিকে চিনতে আমাদের বহু দেরী হত।

কার্নেগী মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্র থাকাকালীন ন্যাশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর একটি ক্লাস নেন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিষয়ে উৎসাহিত হয়ে একটি নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেন – পরে যার নাম হয় ‘ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান’। মজার ব্যাপার হল ন্যাশ বার্গেনিং পান্ডুলিপির প্রথম পাঠকদ্বয় ছিলেন ফন নয়ম্যান এবং মরগেনস্টার্ন, তাই ন্যাশ যে তাঁদের কাছে নেহাত একটি ভুঁইফোড় নাম ছিল না সেটা বলা বাহুল্য। মনে রাখা ভালো ন্যাশ তখনও ননকোঅপারেটিভ গেমস নিয়ে কাজ শুরু করেন নি, ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান দাঁড়িয়ে ফন নয়ম্যানদের ‘কোঅপারেটিভ গেমস’ এর ওপর ভিত্তি করে। সমস্যাটা খুব সহজ – দু’জন লোকের মধ্যে দশ টাকা ভাগ করে দিতে হবে, আর সেটা করার জন্য প্রত্যেককে বলতে হবে তাঁরা দশের মধ্যে কত টাকা চান, যদি দু’জনের চাওয়া টাকার পরিমাণ দশের বেশী হয় তাহলে কেউই কিছু পাবেন না আর দশের কম হলে যে যা চেয়েছেন তা’ দিয়ে দেওয়া হবে। একটু চিন্তা করলে বোঝা যাবে সমস্যাটা সহজ হলেও উত্তর সহজ নয়, কারণ উত্তর অসংখ্য।

ন্যাশ এখানে দেখালেন কিছু জিনিস অনুমান করে নিলে একটাই উত্তর পাওয়া সম্ভব। কি ধরণের অনুমান? পুরো দশ টাকাই ভাগ হবে, দু’জনের কাছে দশ টাকার মূল্য যদি একই হয় তাহলে দু’জনের দাবিদাওয়াও এক হবে, দু’জন যে সংখ্যাগুলো কোনোদিন বলবেন না সেগুলো আগেভাগেই বাদ দিয়ে দেওয়া যাবে ইত্যাদি।

সমস্যা হল বহু বছর ধরে ন্যাশের এই সমাধানকে আমরা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি মুনাফা ভাগাভাগির কাজে এবং যখনই সে কাজটা করতে পারিনি আদালত, উকিল, কোম্পানীর বড়কর্তা সবাই মিলে দোষারোপ করেছি ন্যাশকে – গাণিতিক জটিলতার সূত্রেই হোক বা অবাস্তব অনুমান ধারণের প্রসঙ্গেই হোক, ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান এর সমালোচনা করা হয়েছে অজস্র বার। গত বছরেই ওরাকল এবং গুগলের মধ্যে পেটেন্ট সংক্রান্ত মামলা চলাকালীন ডিসট্রিক্ট কোর্টের বিচারক ন্যাশ বার্গেনিংকে জটিল এবং পক্ষপাতিত্বপূর্ণ সমাধান বলে নাকচ করে দেন।

ন্যাশ নিজে এই মামলার ফলাফল দেখছিলেন কিনা জানা নেই কিন্তু ন্যাশের পেপারটি যারাই পড়েছেন তাঁরা নির্দ্বিধায় জানাবেন ন্যাশের তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য। একজন প্রকৃত গণিতজ্ঞের মতনই ন্যাশ দেখাতে চেয়েছিলেন অসীম সংখ্যক সমাধানের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া যায় একটি মাত্র সমাধানকে, যদি ভাগীদাররা বুদ্ধি করে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে পারেন। শুধু তাই নয়, কথাবার্তা না চালিয়েও যে মধ্যস্থতা করা যায় এই ধারণার জন্ম-ও কিন্তু ন্যাশের এই তত্ত্বের সূত্রেই। যদি ভাগীদাররা বুদ্ধিমান মানুষ হন তাহলে নিজেদের মধ্যে কথা না চালিয়ে শুধু অঙ্কের সাহায্যেই কিন্তু তাঁরা নিজেদের লভ্যাংশটি ঠিক করে নিতে পারবেন।

কিন্তু যদি ঠিক না করতে পারেন, দোষ কি ন্যাশের? হতেই পারে যে এঁরাও ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’ মানুষ; এও হতে পারে যে সমাধান এল সেটি প্রকৃত অর্থেই ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান কিন্তু এক পক্ষ তাতে বেশী লাভবান হল, ন্যাশ তো কখনই দাবি করেন নি যে তাঁর সমাধান সাম্যও বজায় রাখবে – হয়ত সাম্য বজায় রেখে ন্যাশ বার্গেনিং করার জন্য দরকার আরো উন্নত তত্ত্ব।

ন্যাশ সাম্যাবস্থা (ইকুইলিব্রিয়ম) হোক কি ন্যাশ চুক্তি (বার্গেনিং), বহু বছর ধরে সমালোচকরা বলে এসেছেন বাস্তব পৃথিবীতে এগুলোর ভিত্তি নেই। এখনও বহু অর্থনীতিবিদ বলে থাকেন বাস্তবে দু’জন মানুষ হাল্লা-শুন্ডী ধরণের ‘গেম’ (যার পোশাকি নাম ‘প্রিজনার’স ডিলেমা) খেলতে বসলে মোটেও ‘যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ চাই’ সাম্যাবস্থা তৈরী হবে না। মনে রাখা দরকার হাল্লার রাজা এবং শুন্ডীর রাজা কিন্তু খেলাটা একবারই খেলেছিলেন, দু’জনে যদি বারবার একই খেলা খেলতেন তাহলে কিন্তু যুদ্ধ ব্যাপারটাকে এড়ানো যেতেই পারত – একবার খেলা এবং বারবার খেলার মধ্যে পার্থক্য আছে বৈকি, গেম থিয়োরী সেটা স্বীকার-ও করে নেয়।

বাস্তবে এই খেলাকে ভালো করে বুঝতে গেলে কিন্তু দরকার ভালো পরীক্ষা পদ্ধতি (experimental design) –  আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে জন ন্যাশ নিজেই কিছু অত্যন্ত জরুরী উপদেশ দিয়ে গেছেন এই পরীক্ষা পদ্ধতি কেমন হতে পারে সে ব্যাপারে। ন্যাশ বলেছিলেন একই প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে বার বার না খেলিয়ে খেলানো হোক ভিন্ন ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে, এবং এই যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে খেলতে হবে এই ব্যাপারটাকে প্রথমেই বলে দেওয়া হোক, তারপর দেখা যাক সাম্যাবস্থায় কি দাঁড়ায়। দ্বিতীয়টি উপদেশটি আরো গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেক খেলোয়াড়ের লাভ ক্ষতির হিসেবটা যেন আলাদা করা হয়, অর্থাৎ হাল্লা যুদ্ধে গেলে আর শুন্ডী শান্তি চাইলে হাল্লার লাভ হয়ত ৫ আর শুন্ডীর ক্ষতি -৫ কিন্তু উল্টোটা ঘটলে যেন বলে দেওয়া হয় হাল্লার ক্ষতি -৩ এবং শুন্ডীর লাভ ২। কেন? কারণ লাভক্ষতির হিসাবে পুরোপুরি ভারসাম্য থাকলে খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রতিযোগিতাকে এড়িয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা দেখা দেয়। যেহেতু আমরা  ‘ননকোঅপারেটিভ গেমস’ বিশ্লেষণ করছি, তাই ভারসাম্য বজায় না রাখাটাই বাঞ্ছনীয়।

ন্যাশের উপদেশের পরেও সে সময় এহেন এক্সপেরিমেন্ট ন্যাশের থিয়োরীকে সাপোর্ট করেনি। অ্যালভিন রথ (যিনি ২০১২ সালে  নোবেল পান পরীক্ষামূলক অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য) জানান সমর্থন না পাওয়ার জন্য বিদ্বমহল গেম থিয়োরীকেই প্রায় ছুঁড়ে ফেলতে গেছিলেন। অথচ তার বহু বছর বাদে ন্যাশের দেখানো পথেই পরীক্ষা করে দেখা গেল ন্যাশের থিয়োরী দিব্যি সমর্থন পাচ্ছে, যে ব্যাপারটা বোঝা যায়নি সে সময় সেটা হল বাস্তবে দু’জন খেলোয়াড় অপরিচিত হলেও লাভক্ষতির সমতা নিয়ে অনেক বেশী ভাবেন এবং সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেন। ন্যাশের থিয়োরীতে সমতার কথা কোথাও বলা নেই সুতরাং সেই থিয়োরীর পরীক্ষায় এমন বন্দোবস্ত করা দরকার যাতে খেলোয়াড়দের সমতা নিয়ে মাথা ঘামাতে না হয়।

ন্যাশের দর্শন বুঝতে আমরা অধিকাংশ সময়েই ব্যর্থ হয়েছি, থিয়োরিস্টের অলীক কল্পনা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছি তাঁর তত্ত্বসমূহকে অথচ রথ নিজেই জানাচ্ছেন এমন কি এক্সপেরিমেন্টাল ইকোনমিকসের ভিত্তিতেও সেই ন্যাশের কাজ। প্রশ্ন উঠতেই পারে কিন্তু তার মানে এই নয় যে গন্ডগোলটা ন্যাশের তত্ত্বে, গন্ডগোল আছে আমাদের নিজ নিজ ব্যাখ্যায়।

John Nash

(স্থিরচিত্র উৎস – গুগল ইমেজেস)