বিশ্বাসঘাতক

(চল্লিশের উত্তাল বার্লিনের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলাম একটী থ্রিলার-ধর্মী বড় গল্প ‘বিশ্বাসঘাতক’। লেখাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে টগবগ পত্রিকার ‘উৎসব’ সংখ্যায়। সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠকদের থেকে মতামত পেলে বাধিত হব। সঙ্গের অলঙ্করণগুলি করেছেন শিল্পী সুমিত রায়।)

 

Tagbag 2017

 ব্র্যান্ডেনবার্গের আততায়ী

ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের কাছেই ছিল আজকের মীটিং। এবার্টস্ট্রাসের যে বাড়িটিতে আজকে সবাই জমায়েত হয়েছিলাম সেটির মালিক নাকি ছিলেন ব্যাভারিয়ার কোনো ব্যারন। তিনি অবশ্য গত হয়েছেন বেশ কিছুদিন, উত্তরাধিকার সূত্রে বাড়িটি পেয়েছেন তাঁর মেয়ে। কিন্তু এলিজা আর এখন জার্মানিতে থাকেন না, সান্যাল ভাইদের বড়জনকে বিয়ে করে তিনি এখন কলকাতায়। রণেন্দ্র সান্যাল-ও আমার মতন পড়াশোনা করতেই বার্লিনে এসেছিলেন, পি-এইচ-ডি শেষ করে বছর ছয়েক আগে দেশে ফিরে গেছেন। আমি তাঁদের দেখিওনি কিন্তু এই বাড়িটায় গেলেই মনে হয় বহু বছর ধরে যেন তাঁদের চিনি।

অসম্ভব ঠান্ডা আজকে। ফেব্রুয়ারীর শুরু, গত সপ্তাহেই টানা বরফ পড়েছে বার্লিনে। সেই জমা বরফ তো এখন গলছেই, উপরন্তু কনকনে উত্তুরে হাওয়া বইছে। আজকে আর হেঁটে বাড়ি ফেরা যাবে না। আমার হোস্টেল সেই উলান্ডস্ট্রাসের কাছে। ব্র্যান্ডেনবার্গ গেট থেকে উলান্ডস্ট্রাস হেঁটে যেতে লাগে প্রায় ঘন্টা খানেক। বিজয়ন বা আলি ভাইয়ের মধ্যে কেউ সঙ্গে থাকলে ঘন্টা খানেক হাঁটতে মন্দ লাগে না। আজকে অবশ্য ওরা থাকলেও এই ঠান্ডায় হাঁটা যেত না, ট্রামই নিতে হত। বিজয়নের কথায় মনে পড়ল ওর দেওয়া খবরটা তাহলে সত্যিই। কালকে ঘুমোতে যাওয়ার সময়ে আমাকে আর আলি ভাইকে বলেছিল, আমরা কেউই বিশ্বাস করিনি। আজকে মীটিং-এ হীরেনদা জানালেন বিজয়ন ঠিকই বলেছে, সুভাষ বোস সত্যিই জার্মানি ছেড়েছেন। জার্মান সেনাবাহিনীর জনা দুয়েক উচ্চপদস্থ অফিসারের সঙ্গে তিনি ইটালিতে পৌঁছেছেন।

দেশকে স্বাধীনতা এনে দেওয়ার জন্য সর্বস্ব পণ করে রণাঙ্গনে নেমেছেন সুভাষ। ভারতবাসী যে কি অপরিসীম প্রত্যাশা নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে! অবশ্য শুধু দেশের মানুষ কেন, বার্লিনের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেস লীগের যে কোনো ভারতীয়কেই সুভাষ বোসের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে দেখুন, শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে তাঁদের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠবে।

“হল্ট”, চোখের সামনে বেয়নেট উঁচিয়ে আসতে দেখে থমকে দাঁড়াতে হল। এই এক নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে। বার্লিনের আনাচে কানাচে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে রাশিয়ার দিকেও জার্মানির নজর পড়তে চলেছে, স্টালিন আর হিটলারের সখ্য নাকি মোটেই নেই আর। বাতাসে যুদ্ধ যুদ্ধ গন্ধটা যত বাড়ছে, শহর বার্লিনে সেনাবাহিনীর কড়াকড়িও ততই বেড়ে চলেছে। আগে পাহারা দিত পুলিশ, কয়েক মাস যাবত সেনাবাহিনীও নেমে পড়েছে।

দু’জন সৈন্যের মধ্যে একজন আমার মুখে টর্চ ফেলল, অন্যজনের হাতে বেয়নেট। আবারো বরফ পড়ার খবর আছে নাকি? নাহলে খামোখা ট্রেঞ্চকোট পরে দাঁড়িয়ে কেন কে জানে।

পাসপোর্টটা টর্চধারীর হাতে দিলাম।

তার চোখ এখন পাসপোর্টের ওপরের রাজকীয় সিলটির ওপর, যার নিচে লেখা ‘ইন্ডিয়ান’ এম্পায়ার আর ওপরে ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট’।

‘ইন্ডিশ?’, বেয়নেটধারী বোধহয় আমার মুখ দেখে বুঝেছে আমি কোন দেশের লোক। টর্চওলা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

বেয়নেটধারীর মুখে একটু হতাশা ফুটে উঠল কি? যেন শিকার হাতছাড়া হয়ে গেল। কুকুরকে যেমন ভাবে তাড়ায় ঠিক সেরকম ভাবেই হাত নাড়ছে, আমি বাক্যব্যয় না করে পাসপোর্টটি ফেরত নিয়ে পা বাড়ালাম।

কয়েক পা এগোতেই মনে হল কানের পাশ দিয়ে কি যেন উড়ে গেল। বন্দুকের আওয়াজটা তো আগেই পাওয়া উচিত ছিল, অথচ কী অদ্ভুত ব্যাপার, গুলিটা যাওয়ার পর মনে হল আওয়াজটা পেলাম। না না, এটা আর একটা গুলি!

এবারের গুলিটা গেল বাঁ পায়ের ইঞ্চি খানেক দূরে।

যা ভেবেছিলাম তাই। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম দু’জনেই হাসছে। বেয়নেটধারীর হাতে রাইফল, টর্চওলার হাতেও এখন টর্চের বদলে একটা রিভলভার। মনে হল সাইলেন্সার লাগানো, তাই জন্যই প্রথমবার আওয়াজটা পাইনি।

এ ওদের নিছক ভয় দেখানোর খেলা। প্রাণে মারবে না জানি, কিন্তু ভয় যে পেয়েছি সেটা তো দেখাতে হবে। পড়ি কি মরি করে দৌড়লাম, পেছন থেকে হাসির আওয়াজটা কী অশ্লীল শোনালো। এবার্টস্ট্রাসের বড় রাস্তা ধরে পাঁচ মিনিট টানা দৌড়ে থামলাম। পেছনে আসছে নাকি এখনো?

নাহ, কেউ কোত্থাও নেই। বড় রাস্তা এই মুহূর্তে জনশূন্য। শীতের রাত্রে এগারোটা বাজতে যায়, সেটাই স্বাভাবিক। রাস্তার গ্যাসলাইটের আলোগুলো না জ্বললে বোঝাই যেত না এত বড় একটা শহরের মধ্যে দিয়ে চলেছি। গ্যাসলাইটের আলো আর কুয়াশা মিলিয়ে একটা ধূসর পর্দা যেন শহরটাকে মুড়ে রেখেছে। বার্লিনের প্রাসাদোপম বাড়িগুলোকেও তাই ভালোভাবে ঠাহর করা যাচ্ছে না।

আবার কিসের একটা শব্দ পাচ্ছি।

কারা যেন দৌড়ে আসছে। তাই কী? নাকি আমার মনের ভুল।

প্রথমবারের জন্য একটু ভয় হল। তবে কি খেলাটা নিছক ভয় দেখানোর নয়?

কিন্তু এখনো কোনো মানুষকেই দেখতে পাচ্ছি না।

পায়ের শব্দটা আবার পাচ্ছি।

দু’জোড়া পা!

শব্দটা স্পষ্ট হয়ে উঠতেই বুঝতে পারলাম বড় রাস্তার সমান্তরালে আমার ডানদিকে যে গলিটা আছে সেটা ধরেই কারা যেন দৌড়চ্ছে। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার পাশেই একটি বিশালাকৃতি বাড়ি, ফলে ডানদিকের গলিতে কারা দৌড়চ্ছে সেটা দেখার উপায় নেই।

আর কয়েক পা এগোতে হবে। দেখতে পাচ্ছি আড়াআড়ি আরেকটা রাস্তা গেছে, বড় রাস্তা আর গলি, দুটোকেই নিশ্চয় এই আড়াআড়ি রাস্তাটা যোগ করেছে।

এগোতে যাব আবার গুলির শব্দ! কার মুখে দেখে উঠেছিলাম আজ! মাঝরাত্রে বিপত্তির একশেষ।

যেদিক থেকে এসেছি সেদিকেই দৌড় লাগাব কিনা ভাবছি এমন সময় কুয়াশার চাদরটা যেন ছিঁড়ে গেল।

টলতে টলতে কে যেন এগিয়ে আসছে। আমি স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে পড়েছি।

‘হেল্প, হেল্প প্লীজ’

শব্দ ক’টা কানে আসতেই সম্বিৎ ফিরল। মানুষটির কাছে পৌঁছতে পারার আগেই অবশ্য দেখতে পেয়েছি তার কাঁধ থেকে রক্তের ধারা নেমে এসে ওভারকোটটিকে ভিজিয়ে তুলেছে।

অন্য পায়ের শব্দটাও এতক্ষণে থামল। দূরের ছায়ামূর্তিটিকে এতক্ষণে দেখতে পেলাম। রাস্তার মোড়ের গ্যাসলাইটের ঠিক পেছনে থেমে আছে সে, হাতের উদ্যত রিভলভারটিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

আহত আগন্তুকের হাত ধরে পেছনের দিকে দৌড়তে শুরু করলাম, মুখ ঘুরিয়ে এক ঝলকে দেখতে পেলাম ছায়ামূর্তিটি স্থির হয়ে গ্যাসলাইটের কাছেই দাঁড়িয়ে, আর এগোবে না বলেই মনে হয়।

এবার্টস্ট্রাসের নাড়িনক্ষত্র আমার চেনা। তিন চার ব্লক পরেই একটা রেস্তোরাঁ যেখানে উত্তর আফ্রিকার বেশ কিছু ছাত্র রাত্রে জমায়েত হয়। মরোক্কান, মিশরীয়, তিউনিসিয়ান ছাত্রদের জমজমাটি আড্ডা বসে এখানে। তবে নাৎসি পুলিশের কড়াকড়ির কারণেই বোধহয় ইদানীং ভিড় একটু কম। রেস্তোরাঁয় অবশ্য ঢুকলাম না, আলো দেখে দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রবল উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছি। আমার সঙ্গের মানুষটিরও অতি ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে, কিন্তু মনে হল সেটা আঘাতের জন্যও হতে পারে। ভদ্রলোক মুখ নিচু করে বোধহয় ক্ষতটা কত গভীর সেটাই বোঝার চেষ্টা করছিলেন।

ইংরেজিতে বললাম, “আপনার এখনই কোনো ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত”।

মানুষটি ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালেন।

“যদিও এত রাত্রে প্রাইভেট কোনো ক্লিনিক খোলা পাবেন না। আপনাকে সরকারী হাসপাতালেই যেতে হবে। ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের কাছেই বার্লিন মিশনারি হাসপাতাল আছে। যদি চান আমি আপনার সঙ্গে যেতে পারি”।

ভদ্রলোক কিছুই বলছেন না দেখে এবার ভালো করে তাকালাম ওনার দিকে।

উনি বিস্ফারিত দৃষ্টিতে আমার দিকেই তাকিয়ে। মুখটাও অল্প হাঁ হয়ে গেছে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কিছু বলবেন?”।

মানুষটি ফিসফিস করে কিছু বললেন। আমি স্পষ্ট শুনতে না পেলেও আমার মুখটাও এবার হাঁ হল।

বাংলা! বাংলাতে কিছু বলার চেষ্টা করছেন ইনি।

আমি তাকিয়ে আছি।

“পনের বছর! পনের বছর পর গোরা মিত্তিরের সঙ্গে দেখা, তাও কিনা মাঝরাতের বার্লিনে!” আমার হাতটা ধরতে গিয়েই বোধহয় যন্ত্রণায় কাতরে উঠলেন।

আমাকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভদ্রলোক এবার টুপিটা খুললেন।

আর খুলতেই স্পষ্ট দেখতে পেলাম ডান চোখের ওপরের কাটা দাগটা।

ফ্রী স্কুল স্ট্রীটের ফ্রী স্কুল

আর্মেনিয়ান কলেজের পাশেই যে ফ্রী স্কুলটা খোলা হয়েছিল সেখানে মূলত পড়তে আসত শহরের যত বাপে তাড়ানো, মায়ে খেদানো ছেলের দল। আরো একটা দল ছিল, তাদেরকে অবশ্য তাড়ানো বা খেদানোর জন্যও সংসারে কেউ ছিল না। বারো বছর বয়সে ওয়েলিংটন অনাথ আশ্রম থেকে আরো জনা পাঁচেক ছেলের সঙ্গে আমাকেও পাঠানো হয় এই ফ্রী স্কুলে। ওয়েলিংটন অনাথ আশ্রমও অবশ্য ওই ফ্রী স্কুল স্ট্রীটেই, আর্মেনিয়ান কলেজকে বাঁ পাশে ফেলে তিনটে মোড় এগোলেই যে ভূতুড়ে তিনতলা বাড়ি সেটাই ছিল আমাদের জন্ম-আস্তানা। জ্ঞান হওয়া ইস্তক ওই ঝুল ধরা, কালি পড়া বাড়িটাকেই নিজের জেনে এসেছি। আরো খান কুড়ি ছেলের সঙ্গে সুখে দুঃখে দিব্যি কেটে যাচ্ছিল, বাবা-মা নেই বলে আলাদা করে মন খারাপ হয়নি কখনো। জন্ম থেকেই তাঁদেরকে দেখিনি, তাই হয়ত অভাব বোধটাই আসেনি।

হয়ত একটু চটপটে ছিলাম, অঙ্ক-ইংরেজিতে বাকিদের থেকে আমাদের তাড়াতাড়ি  মাথা খুলত তাই জন্যই এই সুযোগ এসেছিল। কিন্তু নতুন স্কুলে এসে মাথা খাটানোর সুযোগ পেলে তো! প্রথম দিন থেকেই ফ্রী স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছেলেদের হাতে যখন তখন মার খেতে লাগলাম আমরা। হয়ত বাবা-মা নেই বলেই অত্যাচারের মাত্রাটা বেশি ছিল, ওরা জানত স্কুল বয়ে এসে নালিশ জানানোর কেউ নেই। স্কুলের টিচারদের বলেও কোনো লাভ হত না, অনাথ ছেলেদের নালিশ তাঁরা কানেও তুলতেন না।

মার খাওয়াটাই ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিলাম। তবে কখনো সখনো মারের বদলে এদের কাজ করে দেওয়ার হুকুম মিলত। সেই হুকুম তালিম করলে কিছুদিন মার খাওয়াটা বন্ধ থাকত। অন্যের খাতা দেখে হোমওয়ার্ক টুকে দেওয়া থেকে শুরু করে হাত-পা টিপে দেওয়া, সিগারেট এনে দেওয়া থেকে হোক কী স্কুল থেকে দেওয়া টিফিনের পুরো ভাগটাই তুলে দেওয়া, হুকুমের কমতি ছিল না। এদের খিদমত খাটাটাই আমাদের ভবিতব্য, এমনটাই মেনে নিয়েছিলাম।

বছর ঘুরতে দেখা গেল ভবিতব্যটা একটু অন্যরকম। নতুন বছরে আমরা এক ধাপ ওপরে উঠলাম, স্কুলের নিচু ক্লাসে নতুন ছাত্র এল। টেরও পেলাম না কখন যেন পুরনো পাপীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমরাই অত্যাচার শুরু করেছি নতুন ছাত্রদের ওপর। অবশ্য ‘আমরা’ বললে ভুল বলা হবে, আমি নিজে কোনো অত্যাচার করিনি কিন্তু প্রতিবাদও করতাম না। অত্যাচারে অংশ নিতাম না বলে কখনো সখনো টিটিকিরি শুনতে হত যদিও।

কিন্তু সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেল মাস চারেক পর, যখন আমাদের ঠিক পরের ক্লাসটিতেই এসে ভর্তি হল রোগা দোহারা চেহারার নতুন একটি ছেলে। শোনা গেল পড়াশোনায় তার বিশেষ মন নেই, আগের স্কুলে ফেল করায় তার মামা ভর্তি করে দিয়েছেন এই আর্মেনিয়ান স্কুলে। সংসারে বলতে গেলে আছেন ওই মামা-ই, মা বাবা দু’জনকেই সে হারিয়েছে জন্মানোর পরেই।

কয়েকদিনের মধ্যেই বাপে তাড়ানো, মায়ে খেদানোদের খপ্পরে তাকেও পড়তে হল। হাত-পা টিপে দিতে বলেছিল না সিগারেট আনতে বলেছিল তা আর এতদিন পরে খেয়াল নেই তবে যেই হুকুম করে থাকুক তার বিরুদ্ধে সে একটা কথাও বলেনি, একটা আঙ্গুলও তোলেনি। শুধু নাকি মুচকি হেসে সেখান থেকে সরে গেছিল।

নয়া ছোকরার এহেন স্পর্ধা দেখে সিনিয়র ছাত্ররা এতই অবাক হয়ে গেছিল সেদিন তারা কিছু বলতে পারেনি। যতক্ষণে সম্বিৎ ফিরল ততক্ষণে সে ছেলের টিকির দেখা মেলেনি। পাণ্ডারা সেদিন ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ি ফিরল। পরের দিন টিফিন পিরিয়ডেই দেখা গেল জনা সাত আটেকের একটা দল তাকে ঘিরে ধরেছে। প্রথমটায় তাকে বলা হল স্কুলের বিশাল উঠোনটায় নাকে খত দিতে হবে। আগের দিনের মতনই হেসে চলে যাচ্ছে দেখে এবারে দলটা ঝাঁপিয়ে পড়ল। হিড়হিড় করে ছেলেটাকে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হল স্কুলবাড়ির পেছনের কানা গলিটায়, ভর দুপুরে যেখানে জনপ্রাণীর দেখা মেলে না।

স্কুলের মধ্যে যখন প্রথম ছেলেটাকে ধরা হয়, আমাদের অনাথ আশ্রমের দলটা সামান্য দূরেই ছিল। গলির মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দেখে সামান্য মুচকি হেসে তারা সরে পড়ল, যেন এরকমটিই হওয়া উচিত। একটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে আশঙ্কা করে আমি প্রায় চুপিসাড়ে পেছনের গলিতে গেলাম এবং চুপিসাড়েই ফিরে এসে সোজা হেডমাস্টারের ঘরে ঢুকে গেলাম। পিওন হাঁ হাঁ করে উঠেছিল, কিন্তু তার বাধা উপেক্ষা করেই ঢুকে পড়তে হল। ঢুকতে আমাকে হতই, কারণ পেছনের গলিতে যে হারে নতুন ছেলেটির ওপর কিল, চড়, লাথি পড়ছিল তাতে আমার মনে হয়েছিল প্রাণ না গেলেও ছেলেটির বিকলাঙ্গ হওয়া অনিবার্য।

ফাদার খাটচাটুরিয়ান অন্য শিক্ষকদের মতন নির্বিকার চিত্তে থাকতে পারলেন না। স্কুলের পিওন এবং দরোয়ানকে নিয়ে গিয়ে ছেলেটিকে বাঁচালেন এবং যে সব ছাত্র ছেলেটিকে মেরেছিল পরের দিনই তাদের পত্রপাঠ বিদায় করলেন। ছেলেটিকে অবশ্য বেশ কিছুদিন হাসপাতালে কাটিয়ে আসতে হল। তার ডান চোখের ঠিক ওপরেই খান কয়েক জোরালো ঘুষি পড়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে চোখটি বেঁচে গেলেও চোখের ওপরে একটি চিরস্থায়ী কাটা দাগ রয়ে গেল।

ছেলেটিকে বাঁচাতে গেছিলাম অন্তরের তাগিদেই, তবে তাকে বাঁচানোর পর মনে হয়েছিল বাকি ছেলেদের থেকে সাবাশি পাব। সে নিতান্তই ভুল ধারণা। অবাক হয়ে দেখলাম বাকি ছাত্রদের কাছে কিভাবে যেন আমিই বিশ্বাসঘাতক হয়ে গেছি। সিনিয়র ছাত্রদের হাতে জুনিয়র ছাত্ররা মার খাবে এটাই আর্মেনিয়ান স্কুলের পরম্পরা, সেখানে শিক্ষকদের নাক গলানোর কোনো জায়গা নেই। এমনকি প্রাণসংশয় হলেও।

শুধু যে বিশ্বাসঘাতক ছাপ্পা পড়ল তাই নয়, একদিন বিকালে স্কুলে ফেরার পথে ওয়েলিংটনের পেছনেই আমাকে ঘিরে ধরল সেই সাত-আট জনের দলটি যাদের প্রত্যেককে স্কুল থেকে বার করে দেওয়া হয়েছিল। নতুন ছেলেটিকে হয়ত এরা আধমরা করেই রেখে যেত কিন্তু আমার জন্য তারা যে অন্য কিছু ভেবে এসেছে সেটা বেশ বোঝা গেল যখন দেখলাম তাদের একজনের হাতে ছুরি এবং আরেকজনের হাতে একটা বোতলের ভাঙ্গা টুকরো। সম্ভবত ছুরি দেখেই প্রাণপনে ছুটতে শুরু করেছিলাম, দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে। কোন দিকে দৌড়চ্ছি তা জানি না, শুধু এটুকু জানি যে ভাবেই হোক প্রাণে বাঁচতে হবে।

মিনিট কুড়ি সমানে ছোটার পর একটা প্রায়ান্ধকার গলিতে হোঁচট খেয়ে পড়েছিলাম। অত জোরে দৌড়চ্ছিলাম বলে মাটিতে পড়ে বেশ ভালোরকম একটা চোটও পেলাম। চোখে সর্ষেফুল দেখছি, এমন সময়ে কারা এসে আমার জামার কলার ধরে দাঁড় করল। কোনোক্রমে চোখ খুলে দেখি শিকারীরা হাজির। এতক্ষণ দৌড়ে তারা এতই রেগে গেছে যে সম্ভবত চড়থাপ্পড় মেরে তারা আর সময় নষ্ট করত না। আমি চোখ বুঝে ছুরির প্রথম আঘাতটার জন্য অপেক্ষা করছি, এমন সময়ে শোনা গেল, “রুকো”।

রুখ্ যাও বা রুখো নয়, রুকো। ‘ক’!

সেই বিপদজনক মুহূর্তটিতেও এরকম আধো আধো উচ্চারণ শুনে তীব্র কৌতূহল হল। চোখ খুলে দেখি যারা এগিয়ে আসছে তাদের এমনিতে আধো আধো উচ্চারণ করার কোনো কারণ নেই কিন্তু এ ভাষা তাদের কাছে বিজাতীয়, তাই উচ্চারণে সমস্যা। যে জনা চারেক চীনা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের প্রত্যেকেই স্কুলের বাচ্চা ছেলেদেরকে বোধহয় এক হাতেই তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারবে।

ভয়েই অন্য ইন্দ্রিয়গুলো কাজ এতক্ষণ করছিল না। হঠাৎ একটা তীব্র গন্ধ নাকে এসে ঢুকল। আমার বখে যাওয়া বন্ধুদের দৌলতে এ গন্ধ আমি চিনি, এ গন্ধ গাঁজার। তার সঙ্গে ঝিম ধরানো আফিং এর গন্ধ-ও আছে। মনে হচ্ছে ছুটতে ছুটতে ওয়েলিংটন চত্বরের সেই কুখ্যাত চণ্ডুখানার কাছে এসে পড়েছি, যেখানে নেশা করতে ছুটে আসে সারা কলকাতার লোক।

আর্মেনিয়ান স্কুলে আর যে ক’বছর ছিলাম আমার ভাগ্যে কোনো বন্ধুই জোটেনি, শেষদিন অবধি ওই বিশ্বাসঘাতক ছাপ নিয়েই রয়ে গেছিলাম।

বন্ধু বলতে ছিল খালি ওয়েলিংটন চণ্ডুখানার সেই চীনারা যারা সেদিন আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। সুখদুঃখে তাদের সঙ্গেই দেখা করতে যেতাম। গাঁজায় দম না দিয়েও বড় ভালো কাটত সময়টা।

ওহ্ হ্যাঁ, আরেকজন বন্ধুও হয়েছিল বটে। নতুন ছেলেটি, যাকে আমি বাঁচিয়েছিলাম।

সত্যি-মিথ্যের গোলকধাঁধায়

সেই হারুন। কলকাতা থেকে সাড়ে চার হাজার মাইল দূরে তাকে ফিরে পেলাম।

আমি উত্তেজনায় ওর কাঁধটা চেপে ধরতেই ওর মুখটা ব্যথায় বিকৃত হয়ে উঠল। কয়েক সেকন্ডের জন্য ভুলে গেছিলাম কি পরিস্থিতিতে ওকে আজ খুঁজে পেয়েছি। ওভারকোটের ওপরের রক্তের ধারাটা দেখে মনে হচ্ছে ক্ষতটি খুব গভীর নয়, কিন্তু তাও ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার।

“হারুন, মিশনারি হাসপাতালটা কাছেই। বড় জোর মিনিট দশেক লাগবে। তুই হাঁটতে পারবি তো?”।

হারুন আমার মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিল। ওরও বোধহয় বিশ্বাস হচ্ছে না আজকের রাতটা।

আমি ওর মুখের সামনে হাতটা বার দুয়েক নাড়াতে সম্বিৎ ফিরল।

হারুনের মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া।

“গোরা, হাসপাতালে যাওয়াটা আমার জন্য ঠিক হবে না”।

ওর কথাটা আমার বোধগম্য হল না। সেটা সম্ভবত হারুন বুঝতে পেরেছিল। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল, “রাতটা তোর বাড়িতে কাটানো যাবে? আমার আস্তানাতেও ফিরতে ভয় হচ্ছে”।

“অবশ্যই যাবে। কিন্তু হাসপাতালে যাবি না কেন?”।

হারুনের চোখ দুটো কি কাউকে খুঁজছে? গলির দু’মাথা সাবধানে দেখতে দেখতে বলল, “ভরসা পাচ্ছি না। বার্লিনের হাসপাতালে শুনেছি সাদা চামড়া না হলে মাটিতে ফেলে রেখে দেয়। তা ছাড়া আমি জার্মান ভাষাও জানি না”।

সাদা চামড়ার কথাটা ঠিক নয়। বর্ণবিদ্বেষী জার্মান ডাক্তার আমার চোখে পড়েনি বললেই চলে তবে হ্যাঁ, ভাষার সমস্যাটা সত্যিই আছে।

কিন্তু শুধু ভাষাটাই কী একমাত্র সমস্যা নাকি হারুন নিজেও কিছু লুকোচ্ছে? আমি আর কথা বাড়ালাম না।

ভাগ্যক্রমে শেষ ট্রামটা পাওয়া গেল। দু’টো কামরাই ফাঁকা থাকলেও দ্বিতীয়টাতেই উঠলাম। লেখা না থাকলেও সাদা চামড়া না হলে প্রথম কামরায় ওঠা মুশকিল। দ্বিতীয় কামরায় ওঠাটা অভ্যাস হয়ে গেছে।

হারুন মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল। রক্তক্ষরণটা বন্ধ হওয়া দরকার।

আমি ওর হাতে অল্প চাপ দিলাম।

মৃদু হাসল, “বল্”।

“তুই চিন্তা করিস না। বিজয়ন ডাক্তারি পড়ছে, বাড়ি পৌঁছনো মাত্রই ওকে বলব তোকে ড্রেসিং করে দিতে”।

হারুন ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসল।

“বিজয়ন! বিজয়ন কে?”

“ওহ হো, তোকে বলা হয়নি। আমার ঘরে আরো দু’জন ভারতীয় থাকেন। আলি ভাই বাঙালি, কেমিস্ট্রিতে পি-এইচ-ডি, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। আর বিজয়ন ডাক্তারির ছাত্র”।

হারুনকে রীতিমতন চিন্তান্বিত লাগল, যেন গভীর একটা সমস্যায় পড়ে গেছে। মিনিট খানেক পর মুখ তুলে বলল, “শোন্, আমি তোর বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু বিজয়ন বা আলিকে বলিস না যে তুই আমার বন্ধু। আমার কোনো পরিচয়ই দিস না। আমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই চলে যাব”।

“পরিচয় দেব না?” আমি একটু হকচকিয়ে গেছি।

হারুন অধীর গলায় বলল, “হ্যাঁ, তোর সঙ্গে আমার দেখা হওয়াটা নেহাতই কো-ইনসিডেন্স। নয় কী? তাহলে আর অত ভাবছিস কেন? তোর বন্ধুদের বলিস ফেরার পথে তুই দেখতে পাস আমার ওপর ছিনতাই হচ্ছে। আমি পালাতে গেলে ছিনতাইকারী গুলি চালায়”।

“হুম্। ঠিক আছে, তাই সই। তবে কী জানিস বার্লিনের যা অবস্থা এখন, ছিনতাই হয় না”।

এবার হারুন সামান্য ঘাবড়েছে, “ছিনতাই হয় না?!”

“হ্যাঁ, চতুর্দিকে এমনিতেই যা জুলুমবাজি। ছিনতাই করলে করবে হয় পুলিস নয়তো আর্মির লোকজন”।

হারুনের মুখে মৃদু হাসির আভাস দেখা দিল, “অথবা নাৎসি পার্টির মেম্বররা”।

“চুপ, চুপ – বেফাঁস কথা বলিস না”, যদিও ট্রামের কামরা ফাঁকা, আমিও তাও সচকিতে একবার দেখে নিলাম।

“এরকম ভয়ে ভয়েই তোদের থাকতে হচ্ছে বুঝি? নিজের দেশে ছেড়ে তাহলে কেনই পড়ে আছিস এই বিদেশ বিভূঁই-এ?” হারুনের গলায় দরদ থাকলেও প্রশ্নটা যেন চাবুকের মতন আছড়ে পড়ল।

ট্রামটা একটা সরু রাস্তা ধরে চলেছে এখন। সরু রাস্তা হলেও দু’পাশের বাড়িগুলোতে বিশাল বিশাল পতাকা ঝুলছে, বড় রাস্তার দু’পাশে ঠিক যেমনটি দেখা যায়। মধ্যরাত্রির অন্ধকারে পতাকাগুলোয় স্বস্তিকা চিহ্ন আর ঈগল পাখি খুঁজতে খুঁজতে বললাম, “পি-এইচ-ডি টা শেষ তো করতে হবে। তাছাড়া আমাদের দেশের অবস্থাই বা কী ভালো বল দেখি? ব্রিটিশরা কী অত্যাচারটাই না চালাচ্ছে। মনে হয় শেষের সেদিন দেখতে পাচ্ছে ওরা, আর তাতেই এত বিচলত হয়ে উঠেছে। গত মাসে শুনলাম মেদিনীপুরের গ্রাম উজাড় করে কিশোর আর তরুণদের থানায় নিয়ে গিয়ে অত্যাচার চালাচ্ছে, সবসময় সন্দেহ এই বুঝি আরেক ম্যাজিস্ট্রেট খুন হল”।

“পেডি, ডগলাস, বার্জদের খুনের ইতিহাস ওরা এখনো ভুলতে পারেনি”।

আমি অবাক হয়ে বললাম, “তুই জানিস পেডি-ডগলাসদের কথা?”।

হারুন আরো অবাক হয়ে বলল, “জানব না কেন? এসব বছর সাতেক আগের কথা কিন্তু আমি তো দেশেই ছিলাম। তুই-ও তো তখন দেশেই, তাই না?”।

বছর সাতেক আগে অবশ্য আমি দেশে ছিলাম না কিন্তু সে প্রসঙ্গে আর গেলাম না। আসল কথাটা মনে পড়ল আবার।

“হারুন”।

হারুন ঠোঁট কামড়ে জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল, বোধহয় ব্যথা কমানোর চেষ্টা করছে। আমার ডাকে মুখ ঘোরালো।

“তোর ওপর আজ যে গুলি চালিয়েছে সে বোধহয় সাধারণ ছিনতাইকারী নয়, তাই না?”

হারুন একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে, “তোর এরকম কেন মনে হচ্ছে?”।

কেম মনে হচ্ছে জানি না। জার্মানরা যাকে বখগেফেল এ হল তাই, ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে ব্যাপারটা যেন সাধারণ ছিনতাই নয়।

সেটাই বললাম হারুনকে।

হারুন মাথা নাড়ল।

“আমি জানি না রে লোকটা কেন আমার ওপর হামলা চালিয়েছে। আমার কাছে বিশেষ টাকা পয়সাও ছিল না”।

“কিন্তু তুই অত রাত্রে এবার্টস্ট্রাসে করছিলিস টা কী?”

“এক বন্ধুকে তার বাড়ি পৌঁছিয়ে দিতে গেছিলাম”।

আমি এবার হেসে ফেললাম।

হারুন সামান্য অবাক হল, “হাসছিস কেন?”

“হাসব না? তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে তুই যেন সেই ফ্রী স্কুল স্ট্রীটেই ঘুরে বেড়াচ্ছিস”।

হারুনও হাসছে এবার।

“না রে সত্যিই তাই। তবে হ্যাঁ বন্ধু আমার নয়, আমার মালিকের বন্ধু”।

মালিকের বন্ধু, সে আবার কী?

আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে হারুন এবার খোলসা করে বলল। বম্বেতে ও কাজ করে রুস্তমজি বাটলিওয়ালার কোম্পানিতে। শিশিবোতলের ব্যবসা দিয়ে বাটলিওয়ালাদের শুরু কিন্তু এখান তাঁদের বিশাল পসার। বম্বের সব্জীমান্ডি থেকে শুরু করে বম্বে ডক সর্বত্রই বাটলিওয়ালাদের প্রবল প্রতাপ।

হারুন হাসতে হাসতে বলল, “আর্মেনিয়ান স্কুলে একটা বাংলা প্রবাদ শিখেছিলাম, তোরও মনে আছে নিশ্চয়। আদার ব্যাপারীর আবার জাহাজের খবরে কী কাজ? বাটলিওয়ালাদের সে কথা বললে চলবে না”।

বাটলিওয়ালাদের ব্যবসার কাজেই হারুনের বার্লিন আগমন। বার্লিনে বসবাসকারী তাবড় ভারতীয়দের নাকি রুস্তমজি আজ সন্ধ্যায় পার্টিতে ডেকেছিলেন। পার্টি শেষ হওয়ার পর রুস্তমজির ঘনিষ্ঠ বন্ধু সোহরাব সালদানার বাড়িতে খাবার পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য হারুন এবার্টস্ট্রাসে গেছিল।

“তুই সালদানার বাড়ি থেকে যখন ফিরছিলিস তখনই লোকটা তোর পেছনে লাগে?”।

হারুন ঘাড় নাড়ল, “একেবারে তাই। আমার প্রথম থেকেই সামান্য অস্বস্তি হচ্ছিল। যখন বুঝলাম যে আমার পেছনেই ধাওয়া করেছে তখন থেকেই দৌড়তে শুরু করেছি। বড় রাস্তার কাছে প্রায় যখন এসে পড়েছি তখনই গুলি চালাল”।

হারুনের মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি, “তুই না এসে পড়লে ওখানেই ধনেপ্রাণে মারা যেতাম। গোরা, এ জন্মে মনে হয় আমার প্রাণ বাঁচানোর ঠিকাটা তুই-ই নিয়েছিস”।

ওর প্রাণের আশঙ্কা যে সত্যিই ছিল সে নিয়ে আমার-ও দ্বিমত নেই, তবে আক্রমণকারীকে কেন জানি ছিনতাইকারীর থেকে আততায়ী বলেই বেশি মনে হচ্ছে। যদি ধরেও নি যে ছিনতাইকারী দৌড়ে হারুনকে ধরতে পারেনি তাহলেও সে গুলি চালাবে কেন? গুলিতে আহত করে তারপর ছিনতাই করবে এরকমটাই উদ্দেশ্য ছিল? নাহ, কী যেন মিলছে না।

 

 

আলেকজান্ডারপ্লাটজের অভিশপ্ত বাড়ি

আলি ভাই বাড়ি ছিলেন না। বিজয়ন পুরো ঘটনাটা শুনে সামান্য অবাক হয়েছে বলেই মনে হল তবে মুখে কিছু বলল না।

বিজয়ন হারুনের ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে, ড্রেসিং করে দিয়ে এসে বেসিনে হাত ধুচ্ছিল, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কেমন দেখলে? চিন্তা করার মতন কিছু নয় তো?”

বিজয়ন মাথা নাড়ল।

“নাহ, চামড়াটা ছড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেছে মাত্র। ভদ্রলোককে ভাগ্যবান বলতে হবে, কোনো আনাড়ি ছিনতাইকারীর হাতে পড়েছিলেন”।

আমি এই প্রসঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে বললাম, “আলি ভাই কোথায়?”

বিজয়ন একবার ভেতরের ঘরের দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “হীরেন বসু ডেকে পাঠিয়েছেন। মনে হয় আজকে রাত্রে কাউন্সিলের মীটিং আছে”।

আমি যদিও হীরেন দা’র সঙ্গে দেখা করেই ফিরলাম, মীটিং এর ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ জানতাম না। অবশ্য সে নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কাউন্সিলের মীটিং-এ সবার প্রবেশাধিকার নেই, মীটিং যে ঠিক কখন বসে, কোথায় বসে সেটাও সবার জানা থাকে না। হীরেন বসু, মুনির আলি মানে আমাদের আলি ভাই, নরেন্দ্র খারে, মনমোহন আগরওয়াল, সঞ্জয় সুব্রণ্যহ্মম এই পাঁচ জন সিনিয়র মেম্বরদের নিয়ে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের কাউন্সিল মীটিং বসে। তবে মীটিং বসেছে মানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার পড়েছে।

আমি ভেতরের ঘরে উঁকি মেরে দেখলাম। হারুন ঘুমিয়ে পড়েছে। কী করা উচিত বুঝতে পারছি না। হারুন বলেছিল ও চলে যাবে, এদিকে এমন অকাতরে ঘুমোচ্ছে যে ডাকতেও মন চাইছে না।

বিজয়ন-ও দেখেছে। আমাকে বলল “ভদ্রলোককে ডেকো না, উনি বিশ্রাম নিন। খুব রক্ত না বেরোলেও একটা ধকল তো গেছেই”।

“তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল। সময় হবে এখন?”, বিজয়নের গলায় ব্যস্ততা।

“অবশ্যই, বলো”।

“এখানে না, আমার ঘরে চলো”।

বিজয়নের ঘরটা চিলেকোঠায়, তার ওপর সে ঘরে ফায়ারপ্লেস প্রায় কাজই করে না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঠান্ডায় প্রায় জমে গেলাম। বিজয়নের পড়ার টেবিলে এক কেটলি চা সবসময়ই মজুত থাকে। দু’টো কাপে চা ঢালতে ঢালতে আমার দিকে একবার তাকাল, তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “আমাদের ভোরবেলার দিকে একবার বেরোতে হবে”।

“ভোরবেলা! কোথায়?”।

“আলেকজান্ডারপ্লাটজ এর গোল চক্করটা ছাড়ালেই যে ঘড়িওলা বাড়িটা পড়ে……”

“তার বেসমেন্টে?”

বিজয়ন সম্মতি জানাল।

এ বাড়িও আমি চিনি বই কী। শুনেছি মানবেন্দ্রনাথ রায় থাকার সময়ে এই বাড়িতেই বসত ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের মীটিং। এও শোনা যায় নাৎসি পার্টির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুভাষ বোস ওই বাড়িতেই দেখা করতেন। আমাদের মতন লীগের সাধারণ সদস্যরা অবশ্য কদাচিৎ সে বাড়িতে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে।

আমার হঠাৎ একটা সন্দেহ হল।

“কাউন্সিলের মীটিং কি আজ রাত্রে সান্যাল বাড়িতে না হয়ে আলেকজান্ডারপ্লাটজে হচ্ছে?”।

বিজয়ন মাথা নাড়ল, “ঠিক”।

“কিন্তু তুমি জানলে কী করে? কাউন্সিলের মীটিং কোথায় হবে সে তো টপ সিক্রেট, নয় কী?”

“সে তো বটেই। তবে এবারের ব্যাপারটা সামান্য আলাদা”।

“কিরকম?”

বিজয়নের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। ওর নাকের পাটাটা মনে হল একটু ফুলে উঠল। গলাটা প্রায় খাদে নামিয়ে এনে বলল, “কাউন্সিল আমাদের দু’জনকে কোনো একটা বিশেষ কাজে জার্মানির বাইরে পাঠাচ্ছে”।

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলাম, “জার্মানির বাইরে কোথায়?”

“সে কথা আমিও জানি না। আলি ভাই শুধু বলে গেছেন আমাদের দু’জনকেই সুটকেস গুছিয়ে রাখতে। আলেকজান্ডারপ্লাটজ থেকে গাড়ি করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হবে কিয়েল-এ”।

ভোরবেলায় আমরা বেরনোর আগেই হারুনের ঘুম ভাঙ্গল। বিজয়নকে অনেক ধন্যবাদ দিল আর বেরনোর সময় আমার হাত ধরে বলল, “দেখা হবে আবার, যোগাযোগ রাখিস। বম্বেতে আমার ঠিকানাটা লিখে রেখে গেছি”।

কত কিছুই বলার ছিল হারুনকে, সময়ের অভাবে কিছুই বলা গেল না। ওর হাত দুটো ঝাঁকিয়ে কথা দিলাম বম্বেতে দেখা হবে।

 

আলেকজান্ডারপ্লাটজের বাড়িটায় যখন পৌঁছলাম তখন ভোর সাড়ে ছ’ট বাজে। রোদ ভালো করে ফোটেনি, তাই শীতের জড়তা কাটছে না। কনকনে ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে জমে যাচ্ছি, অথচ দরজা খুলছে না। বিজয়ন বার তিনেক সদরঘন্টি বাজিয়েছে কিন্তু বেসমেন্ট থেকে এখনো অবধি কেউ আসে নি।

দশ মিনিট, পনেরো মিনিট গড়িয়ে আধ ঘন্টা কেটে গেল। বিজয়নকে জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম বাড়ি ফিরে আলি ভাই এর জন্য অপেক্ষা করব কিনা, বিজয়ন হঠাৎ ডান হাতের তর্জনীটা ঠোঁটের ওপর রাখল। সদর দরজা খুলে এক ভদ্রমহিলা বেরোচ্ছেন, মনে হয় ওপরের কোনো ফ্ল্যাটে থাকেন। মুহূর্তের জন্য দরজাটা ফাঁক হয়েছিল, বিজয়ন বিদ্যুৎগতিতে দৌড়ে ঢুকে পড়ল। আমিও ওর পিছু পিছু দৌড়েছি। ভদ্রমহিলা স্তম্ভিত, রাগী গলায় ‘নিখট্, নিখট্’ বলে চলেছেন কিন্তু তাঁর নিষেধাজ্ঞায় আমাদের কান দিলে চলবে কেন!

বেসমেন্টের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে বিজয়ন দাঁড়িয়ে পড়ল। কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছি, দেখি ফ্ল্যাটের দরজাটা সামান্য খোলা।

বিজয়ন আমার দিকে তাকাল, ওর মুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। আমি ইশারা করলাম ফ্ল্যাটের মধ্যে ঢোকার জন্য।

বিজয়ন ঢুকেই ছিটকে বেরিয়ে এসেছে, ওর চোখমুখে অবিশ্বাস ঠিকরে বেরোচ্ছে। মুখটা হাঁ হয়ে গেছে। আমি এক ধাক্কায় ওকে সরিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকলাম।

আমার পা জমে গেছে।

ঘরের বাঁ দিকে রাখা বড় সোফাটার এক কোণে আলি ভাইকে দেখতে পাচ্ছি।

তাঁর দেখে প্রাণ নেই। বুকের বাঁ দিকে একটা ক্ষতচিহ্ন, বেশ বোঝা যাচ্ছে সেটা বুলেটের। আলি ভাই এর পায়ের কাছেই লুটিয়ে রয়েছেন আরেকজন। আলোআঁধারির মধ্যেও বুঝতে পারছি উনি সঞ্জয় সুব্রণ্যহ্মম – তাঁর বিরলকেশ মাথাটি নিয়ে কতই না রঙ্গরসিকতা করেছি, এখন সেই মাথা দেখেই চিনতে পারলাম।

বিজয়ন ফের ঢুকে পাশের ঘরে গেছিল। একটা মর্মান্তিক চিৎকার শুনে বুঝলাম আরো কাউকে হয়ত খুঁজে পেয়েছে ও। পাশের ঘরে নরেন্দ্র এবং মনমোহনকে পাওয়া গেল। দুটো ঘরে শুধু একজনকেই খুঁজে পাওয়া গেল না, তিনি হীরেন বসু, ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের সভাপতি।

ভয়ে, উত্তেজনায় বিজয়নের গলা ধরে গেছে। একটা ফ্যাসফেসে স্বরে বলল, “গোরা, এসব কী? কে করেছে?”

কে করেছে সে খবর যদি আমি জানতাম! স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নিচের দিকে নামছে।

বিজয়ন আরো কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, এমন সময়ে সাইরেনের শব্দ পাওয়া গেল।

বিজয়নের মুখটা আরোই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, “পুলিশ!”।

আমি মাথা নাড়লাম, পুলিশের গাড়িই বটে।

“ওরা কী খবর পেয়েছে?”

“মনে হয় না। আমরা আসার আগে এ বাড়ির আর কেউ বেসমেন্টে নেমেছে বলে মনে হয় না। না হলে আমরা আসার আগেই পুলিশ এসে যেত,  বাড়িতে ঢোকাই যেত না”।

“তাহলে?”

মনে হয় সেই জার্মান ভদ্রমহিলাই পুলিশ ডেকে এনেছেন। ভোরবেলা দুই বাদামী চামড়ার লোককে সুটকেস হাতে চোরের মতন বাড়িতে ঢুকতে দেখলে ভয় পাওয়ারই কথা।

আমি বিজয়নকে বললাম, “বেসমেন্টের পেছন দিক থেকে বাইরে যাওয়ার একটা দরজা আছে না? ওদিকেই চলো। সামনের দরজা দিয়ে বেরনোর কোনো সুযোগ নেই। দৌড়তে পারবে তো?”।

বিজয়ন শুকনো মুখে নরেন্দ্র এবং মনমোহনদের নিথর শরীরগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “তা পারব, আমার সুটকেসে বিশেষ জিনিসপত্র নেই। কিন্তু এঁরা?”

“এনাদের খবর পরে নেওয়া যাবে। এই মুহূর্তে বার্লিন পুলিশ এত ক’টি মৃতদেহের সঙ্গে আমাদের দেখতে পেলে কী করবে বুঝতেই পারছ।”

বেসমেন্টের দরজা দিয়ে বেরোলে ডান দিকে কয়েক পা এগোলেই বড় রাস্তা পড়বে। বিজয়ন সেদিকে পা বাড়াতে যাচ্ছে দেখে আমি ওর হাত চেপে ধরলাম।  বার্লিনের বড় রাস্তা পার হতে যা সময় লাগবে ততক্ষণ পুলিস এবং রাস্তার লোকেদের চোখে আমরা ধরা পড়বই।

বাঁদিকের পাথুরে গলি নেওয়াটাই শ্রেয়। এই গলি আমি চিনি, গোলকধাঁধা বিশেষ। কিন্তু যারা সে গোলকধাঁধার খবর রাখে, তারা জানে ঠিক গলি চিনে চিনে যেতে পারলে গনটারডস্ট্রাস, স্প্যান্ডরস্ট্রাস হয়ে  পৌঁছে দেবে উলান্ডস্ট্রাসের কাছাকাছি। পাথুরে গলি দিয়ে দু’মিনিট দৌড়নোর পরেই দাঁড়িয়ে পড়তে হল। ফেব্রুয়ারীর কুয়াশা ভেদ করে রোদ ঢুকতে শুরু করছে শহরে। আর সেই রোদে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পাথুরে গলিতে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের একটা প্রায় সরলরেখা এগিয়ে গেছে। আর তিন চার পা হাঁটার পরেই দেখা গেল রক্তের রেখাটা একটা আস্তাকুঁড়ের পাশে গিয়ে শেষ হয়েছে, এ আস্তাকুঁড় অবশ্য লোহার তৈরি এক বিশাল ড্রাম।

আর সেই ড্রামেই পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন হীরেন দা। সম্ভবত আততায়ীর হাতে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উনি পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু তাঁর আঘাত তাঁকে বেশিদূর যেতে দেয়নি।

বিজয়ন দৌড়ে গিয়ে হীরেন দা’র পাশে বসে ওনার হাতটা তুলে নিয়েছে। নাড়ি দেখার অবশ্য দরকার পড়ল না, হীরেন দা চোখ খুলেছেন।

আমাদের দেখে চোখটা যেন শেষবারের মতন ঝিকমিকিয়ে উঠল। কোনোক্রমে জামার পকেট হাতড়িয়ে একটা ছোট চিরকুট আমার হাতে তুলে দিলেন, সেখানে একটা ঠিকানা লেখা।

শরীরে কোনো শক্তিই আর অবশিষ্ট ছিল না, মুখ দিয়ে প্রাণপণে হাওয়া টানার চেষ্টা করেও পারলেন না। কোনোরকমে আঙ্গুলটা চিরকুটে ঠেকিয়ে হীরেন দা আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“আমাদেরকে কী এই ঠিকানায় যেতে বলছেন হীরেন দা?”

হীরেন দা আমার দিকে তাকিয়ে, কিন্তু কোনো কথা বলছেন না।

“হীরেন দা……”

বিজয়নের হাতটা হীরেনদার চোখের ওপর নেমে এল। ধীরে ধীরে ওনার চোখের পাতাটা বুজিয়ে দিতে দিতে বলল, “হীরেন দা চলে গেছেন গোরা”।

একটু আগেই বিভীষিকা দেখে এসেছি কিন্তু তখনো যেন এতটা ধাক্কা লাগেনি। হীরেন দা যে নির্নিমেষে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চলে গেছেন এ কথা আমার মাথায় ঢুকছিল না।

বিজয়ন ফিসফিস করে বলল, “আমারো মনে হয় উনি এই ঠিকানাতেই আমাদের যেতে বলছিলেন”।

ভরসার মুখ

ঠিকানাটা এবার্টস্ট্রাসের। আলেকজান্ডারপ্লাটজ থেকে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় ঘন্টাখানেক লেগে গেল। হীরেন দা কে ওই অবস্থায় দেখে ইস্তক আমাদের শরীর আর চলছিল না। কিন্তু হয়ত এই নতুন ঠিকানায় পৌঁছলে রহস্যের একটা সমাধান হতে পারে, সেই আশা নিয়েই দু’জনে চলেছি।

বাড়িটার সামনে এসে চমকে উঠলাম। নেমপ্লেটে যে নামটা দেখছি সেটা কয়েক ঘন্টা আগেই আরেকজনের মুখে শুনেছি – সোহরাব সালদানা।

যে দরজা খুলল তাকে দেখে মনে হল বাটলার। কার সঙ্গে যে ঠিক দেখা করতে এসেছি সে তো আমরাও জানি না, অল্প ভেবে ঠিক করলাম সালদানার নাম নিয়েই দেখা যাক।

কিন্তু সালদানার নাম নিয়েও বিশেষ লাভ হল না, বাটলার জানাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট না থাকলে দেখা করা যাবে না। বলে সাততাড়াতাড়ি আমাদের বিদায় করে দিচ্ছিল, বিজয়ন পা বাড়িয়ে দরজাটা আটকাল। তারপর শান্ত কিন্তু খুব দৃঢ় স্বরে বলল, “আমরা এসেছি এ খবরটা মিস্টার সালদানাকে না দিলে কিন্তু তাঁর বড় ক্ষতি হতে পারে”।

বাটলার দরজা বন্ধ করল না বটে, কিন্তু এক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে।

আমি অধৈর্য হয়ে পড়ছিলাম, বিজয়নের কথার পিঠেই বললাম, “ওনাকে জানান আমাদের পাঠিয়েছেন হীরেন বসু”।

হীরেন দা’র নাম নিতেই লোকটির মুখের কাঠিন্য যেন এক লহমায় সরে গেল।

বসার বিশাল ঘরটিতে আমরা ঢোকার দশ মিনিটের মধ্যে সোহরাব সালদানা এসে হাজির। এক মাথা কাঁচা-পাকা চুল, সামান্য স্থূলকায় চেহারা, বাঁ চোখটা ডান চোখের তুলনায় সামান্য ছোট। কিন্তু মুখের মধ্যে একটা সৌম্যভাব, দেখলে মনে হয় ইনি আমাদের কথা মন দিয়ে শুনবেন।

ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞাসা করলেন, “হীরেন কোথায়?”

বিজয়ন আর আমি একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম, বুঝতে পারছি না কী উত্তর দেওয়া যায়। মিনিট খানেক অপেক্ষা করে সালদানা সামান্য অধৈর্য হয়ে বললেন, “আপনারা বলছেন হীরেন আপনাদের পাঠিয়েছে। কিন্তু আমি যাদের কথা ভাবছি আপনারা যদি তারাই হন, তাহলে তো হীরেনের আপনাদের সঙ্গে থাকার কথা। সে কোথায়?”।

আমি সামান্য ইতস্তত করে বললাম, “আপনি কোন্ কাজের জন্য আমাদের এক্সপেক্ট করছিলেন সেটা কী বলতে পারবেন?”।

আমার কথায় সালদানা সতর্ক হয়ে উঠলেন, “কেন, আপনাদের কিছু বলা হয়নি সে ব্যাপারে?”।

বিজয়ন এবারে বলল, “বলার কথাই ছিল। কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া যায় নি”।

সালদানা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছেন।

“হীরেন বসু খুন হয়েছেন”।

সালদানার জন্যও খবরটা এতই আকস্মিক ছিল যে আধ মিনিট ওনার বাক্যস্ফূর্তি হল না। তারপর জড়ানো গলায় বললেন, “হীরেন খুন হয়েছেন? আর বাকিরা কোথায়?”।

মনে হল কাউন্সিলের বাকি সদস্যদের কথাই বলছেন সালদানা। আমি বললাম, “বাকি বলতে যদি আরো চারজনের কথা জানতে চান, তাহলে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি তাঁদের সবার সঙ্গে হীরেন বসুর পরিণতিই ঘটেছে”।

সালদানার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এল। “সর্বনাশ! তোমরা বলছ কী? এ অসম্ভব। কারা খুন করবে এদের? কেনই বা করবে? তোমাদের কোনো ভুল হচ্ছে না তো?”।

বিজয়ন শান্ত স্বরে বলল, “আমরা আলেকজান্ডারপ্লাটজ থেকেই আসছি। আমাদের আজ ভোরবেলায় ওখানেই যেতে বলা হয়েছিল”।

সালদানা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।

“তোমরা কী…”

“আমার নাম পশুপতি বিজয়ন আর ইনি আমার বন্ধু গোরা মিটার”।

সালদানা ধপ্ করে সোফায় বসে পড়েছেন।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদেরই তো আসার কথা। কিন্তু আজকের দিনে এমন বিপদ। কি ভাবে আমি সামলাব সব?”

আমি আর বিজয়ন একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছি। বিজয়ন খানিকটা মরীয়া গলায় বলল, “দেখুন, আমি শুধু এইটুকুই জানি যে কোনো বিশেষ কাজে আমাদের বার্লিনের বাইরে যাওয়ার কথা। আপনি আমাদের আর কিছু কী বলতে পারেন?”।

সালদানা চুপ করে আছেন, কিছু ভাবছেন যেন।

“তোমাদের পাসপোর্টগুলো দাও। আমি আসছি”।

মিনিট পনেরো পর সালদানা ফিরে এলেন। এখন যেন একটু ধাতস্থ হয়েছেন। “তোমাদের পাসপোর্টগুলো চেক্ করতে হল। সব ঠিকই আছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমাদেরকে বার্লিন থেকে বার করতে হবে”।

“কিন্তু…”।

“বলছি”, সালদানা হাত তুলে থামিয়েছেন আমাকে, “সব বলছি। তার আগে তোমরা একটা প্রশ্নের উত্তর দাও”।

“আবিদ হাসানের নাম শুনেছ?”

ইন্ডিপেন্ডেস লীগের সদস্য হয়ে আবিদ হাসানের নাম না জানার কোনো কারণ নেই। আবিদ হাসান সুভাষ বোসের ব্যক্তিগত সচিব, প্রথম থেকেই সুভাষের সঙ্গে জার্মানিতে রয়েছেন।

সালদানা মাথা নাড়লেন, “ঠিক, সেই আবিদ হাসানের কথাই বলছি বটে। তোমরা হয়ত জানো সুভাষ বোস আপাতত ইটালিতে রয়েছেন। জার্মানি এবং ইটালির সহায়তা নিয়ে ব্রিটিশদের কিভাবে ভারত থেকে তাড়ানো যায় সেই পরিকল্পনায় তিনি মগ্ন। কিন্তু আমাদের এশিয়ার মধ্য থেকেও সাহায্য দরকার। ভৌগোলিক কারণেই জার্মানি বা ইটালির পক্ষে সরাসরি সাহায্য করা কতটা সম্ভব সেটা এখনো বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। সুভাষচন্দ্র তাই জাপানিদের সঙ্গেও কথা বলতে চাইছেন। ওনার দূত হয়ে আবিদ হাসান তাই জাপানে যাবেন”।

সালদানা আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছেন।

“বার্লিনের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেস লীগ যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে সে কথা নিশ্চয় তোমাদের নতুন করে বলতে হবে না। ভারত-জার্মানি-জাপান এই তিন দেশের রণশক্তিকে একত্রিত করার ব্যাপারে ইন্ডিপেন্ডেস লীগের ওপর ভরসা রেখেছেন স্বয়ং সুভাষ বোসও। আর সেই কারণেই আবিদ হাসানের জাপানযাত্রা নির্বিঘ্নে হওয়া দরকার”।

বিজয়নের ভুরূ কুঁচকে গেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনার মনে হচ্ছে সে যাত্রা নির্বিঘ্নে নাই হতে পারে?”।

“হ্যাঁ, আমাদের কাছে খবর এসেছে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস আবিদের জাপান যাত্রা যেনতেন প্রকারেণ ঠেকাবে। আজকে সকালে আলেকজান্ডারপ্লাটজে যা ঘটেছে সেটা যে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের কাজ সে নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই”।

ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস! তারা যে ইন্ডিপেন্ডেস লীগকে ধ্বংস করতে চাইবে সে নিয়ে সন্দেহের কোনো কারণ নেই, কিন্তু খোদ বার্লিনে তাদের হত্যাকারীরা পৌঁছে গেছে এ খবর শিহরণ জাগাতে বাধ্য।

বিজয়ন মুখ নিচু করে কিছু ভাবছিল। এবার সালদানাকে বলল, “যদি কিছু মনে না করেন একটা প্রশ্ন করি। কিন্তু আপনি কে? আপনাকে তো কখনো লীগের মীটিং এ আগে দেখিনি”।

সালদানার মুখে সামান্য হাসি, “আমি সামান্য ব্যবসা করি কিন্তু তা বলে ভেবো না দেশকে আমি তোমাদের থেকে কম ভালোবাসি। ভারতে বসে যাঁরা ব্রিটিশদের তাড়াতে চাইছেন তাঁদের সঙ্গে প্রবাসী ভারতীয়দের যোগসূত্র আমি। অবশ্য আমি একা নই, এরকম ব্যবসায়ী আরো বেশ কয়েক জন। ব্যবসার কাজেই আমাদের ঘন ঘন বিদেশে আসতে হয়, সেটা একটা সুবিধে। এবারে অবশ্য বার্লিনে বেশ অনেকদিন ধরেই ঘাঁটি গেড়ে থাকতে হয়েছে আমাকে”।

আমি জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে কি ভারতের বিপ্লবী সংস্থাগুলিও ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেস লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন?”।

“অবশ্যই। ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে এ কাজ করা অসম্ভব। যাই হোক, এবার কাজের কথা আসা যাক। আশা করি এতক্ষণে আন্দাজ করতে পেরেছ কেন হীরেন বসু তোমাদের পাঠিয়েছেন। আবিদ হাসানের জাপানযাত্রা যাতে সুষ্ঠু ভাবে হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তোমাদের”।

আমরা কারোরই চোখের পলক পড়ছে না।

“বিজয়ন, তুমি ডাক্তার। তোমাকে কেন এ কাজে দরকার সেটা বলাই বাহুল্য। আর গোরা তোমাকে তো খোদ……”

সালদানার কথা শেষ হল না, একটা গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। মনে হল সালদানার বাড়ির সামনেই গাড়িটা এসে দাঁড়িয়েছে।

“ওহ হ্যাঁ, তোমাদের সঙ্গে আরো একজন থাকবেন আবিদ হাসানের নিরাপত্তার দিকটি দেখার জন্য। কলকাতা থেকে তাঁকে পাঠিয়েছেন খোদ রণেন্দ্র সান্যাল। তিনিই এলেন সম্ভবত”।

রণেন্দ্র সান্যাল! তিনিও রয়েছেন এই পরিকল্পনায়!

গাড়ি থেকে যে আগন্তুক নামলেন তিনি আমাদের ঘরের দিকেই আসছেন। মিনিটখানেকের মধ্যে যিনি সালদানার বসার ঘরে পা রাখলেন তাঁকে দেখে বিজয়ন আর আমার দু’জনেরই মুখ হাঁ হয়ে গেল।

“আলাপ করিয়ে দি। হারুন জোসেফ, আগামী দু’মাসের জন্য ইনিই তোমাদের সফরসঙ্গী”।

বিস্ময়ের আতিশয্যে হারুনের চোখের-ও পলক পড়ছে না।

Tagbag 2017_2

উত্তর আটলান্টিকে বিপদ

“সে রাত্রে তোকে যে আক্রমণ করেছিল সেও সম্ভবত ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের-ই লোক”।

হারুন টুনা মাছের একটা ক্যান কাটার চেষ্টা করছিল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “সে তো বটেই। তুই এসে না পড়লে আমার দশাও হয়ত কাউন্সিলের সদস্যদের মতনই হত। কোনো সন্দেহ নেই যে এরা দেশ থেকেই পেছনে লেগেছে। অথচ রণেন্দ্র সান্যাল বল বা বাটলিওয়ালা কারোর কাছেই কোনো খবর ছিল না”।

“বাটলিওয়ালাও তাহলে ইন্ডিপেন্ডেস লীগের সঙ্গে আছেন?”

হারুন হাসল, “বম্বের কত ব্যবসায়ী যে আমাদের সঙ্গে আছেন চিন্তা করতে পারবি না। ব্রিটিশদের বুটের ঠোক্কর খেতে খেতে এরাও মরিয়া হয়ে গেছে। পরাধীন দেশে স্বাধীন ভাবে ব্যবসা করা যায় না।”

আমি মাথা নেড়ে সায় দিতে যাচ্ছিলাম, এমন সময়ে বিজয়ন প্রায় টলতে টলতে এসে ঢুকল।

“এই সাবমেরিনেই আমার শেষশয্যা পাতা, দেখে নিও।”

এখানে বলে রাখি, আবিদ হাসানকে নিয়ে আমরা রওনা দিয়েছি একটি জার্মান সাবমেরিনে। উত্তর আটলান্টিক দিয়ে খোলা জাহাজে আবিদকে নিয়ে যাওয়ার বিপদ কিছুতেই নেওয়া যেত না। অবশ্য শুধু উত্তর আটলান্টিকই যে পাড়ি দেব, তা তো নয়। আটলান্টিকের দক্ষিণেও যেতে হবে আমাদের। দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়িয়ে মাদাগাস্কার অবধি যাবে এই সাবমেরিন। মাদাগাস্কারে পৌঁছে আবিদকে জাপানী সাবমেরিনে তুলে দিতে পারলে আমাদের শান্তি।

তিনদিন হল আমরা কিয়েল থেকে রওনা দিয়েছি। আর তিন দিনেই বিজয়নের ওজন বোধ হয় কিলো পাঁচেক কমে গেছে। নিজে ডাক্তার হলেও সাবমেরিনের এই বদ্ধ জীবন সহ্য করতে পারছে না ও। খাওয়া দাওয়াতেও রুচি নেই, বেশ কয়েকবার বমিও করেছে। আমি আর হারুন দু’জনেই যথাসাধ্য চেষ্টা করছি বিজয়নকে চাঙ্গা করে তোলার কিন্তু এখনো কোনো কাজের কাজ হয়নি।

বিজয়নকে নিজের বাঙ্কে বসতে দিয়ে হারুন বলল, “আজ ক্যাপ্টেনের ঘরে আলাপ হল”।

বলেই চুপ করে গেল।

বিজয়ন অবাক স্বরে প্রশ্ন বলল, “কার সঙ্গে?”

হারুন মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আবিদ হাসান?”

“আবার কে! কী অমায়িক মানুষ চিন্তা করতে পারবি না। উনি নিজেও তো ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের সদস্য ছিলেন। প্রত্যেককে চেনেন”।

“কাউন্সিলের খবরটা বললি?”

“আমাকে আলাদা করে বলতে হয়নি, উনি পরশুদিনই খবরটা পেয়েছেন। খবরটা শোনা ইস্তক অসম্ভব মুষড়ে পড়েছেন”।

বিজয়ন জিজ্ঞাসা করল, “উনি কী জানেন আমরা কে?”

“অবশ্যই”।

হারুন ক্যানটা খুলতে পেরেছে। কয়েকটা শুকনো বিস্কুটের ওপর টুনা মাছ ঢেলে আমাদের খেতে দিল।

ক্যানড টুনার গন্ধ বোধহয় বিজয়নের একেবারেই সহ্য হচ্ছে না। তড়িঘড়ি করে বাথরুমের দিকে দৌড়ল আবার।

“বেচারি”, হারুন এবার আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “তোর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো গোরা?”

আমি মাথা নাড়লাম, “নাহ্, আমি ঠিক আছি। আমার খাবার নিয়ে কখনোই কোনো সমস্যা হয় না”।

হারুন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

“কী ভাবছিস?”

হারুন হাসল, “নাহ্, সেরকম কিছু না। ভাবছিলাম নিয়তি কার কপালে কী যে লিখে রেখেছে। আর্মেনিয়ান স্কুলের শেষ দিনটাতেও কী ভাবতে পেরেছিলাম যে পনের বছর পর একসঙ্গে আটলান্টিক সমুদ্রে পাড়ি দেব, তাও সাবমেরিনে চেপে”।

 

আরো কিছুক্ষণ হারুনের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে নিজের বাঙ্কে শুতে গেলাম। আমার বাঙ্কের নিচেই বিজয়নেরও বাঙ্ক, সে আগেই শুয়ে পড়েছে। কিছু খেয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করাতে বলল হারুনের থেকে শুকনো খাবার নিয়ে আপাতত কাজ চালাচ্ছে। পাস্তা আর বিনস নাকি একেবারেই সহ্য হচ্ছে না বিজয়নের। কফি খাবে কিনা জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম, বিজয়ন হঠাৎ উঠে বসে বলল, “এই জিয়াউদ্দিন লোকটা কে?”

জিয়াউদ্দিন! সে আবার কে?

“তুমিও জানো না তাহলে? আবিদ হাসানের সঙ্গেই এসেছে। আজ কম্যান্ডার  মুসেনবার্গ আমাকে ডেকেছিলেন। লোকটি নাকি সাবমেরিনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সম্ভবত ফুড পয়জনিং। জিয়াউদ্দিনের জন্য মুসেনবার্গ আমার কাছে কিছু ওষুধ চাইলেন।”

“তুমি দেখতে যাওনি?”

“দেখতে যেতে চেয়েছিলাম। কম্যান্ডার  বললেন দরকার পড়লে ডেকে নেবেন। খবরটা শোনা ইস্তক আমার অস্বস্তি হচ্ছে। সালদানা তো এর ব্যাপারে কিছুই বলেননি।”

সালদানা, হীরেন দা – কেউই জিয়াউদ্দিনের ব্যাপারে আমাদের কিছু বলে যান নি।

বিজয়ন চিন্তিত মুখে বলল, “হারুনের সঙ্গে কথা বললাম। তাকেও কলকাতা থেকে কোনো খবর পাঠানো হয়নি জিয়াউদ্দিনের ব্যাপারে”।

আমি অবাক হয়ে বললাম, “হারুনের সঙ্গে কখন কথা হল তোমার এ ব্যাপারে?”

“আরে, ক্যাপ্টেনের ঘর থেকে বেরোতেই দেখি হারুন। কী একটা কাজে মুসেনবার্গের কাছেই যাচ্ছিল। ভাবলাম একবার জিজ্ঞাসা করে দেখি, তা সেও খবরটা শুনে তোমার মতনই অবাক হল। জিয়াউদ্দিনকে নিয়ে ওর কাছেও কোনো খবর নেই।”

আলেকজান্ডারপ্লাটজে যা ঘটেছে তার পর আর কোনো কিছুতেই বিশ্বাস রাখা যায় না। সত্যি কথা বলতে কী সেদিনের পর থেকে যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি আমরা সবাই। সুস্থির হয়ে ভাবতে বসলে আতঙ্কে নীলবর্ণ হয়ে যেতে হয়। ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের ভবিষ্যৎ-ই বা কী? এই মুহূর্তে অবশ্য আবিদ হাসানকে জাপানীদের হাতে সুষ্ঠুভাবে তুলে দেওয়ার কথা ছাড়া আর কোনো চিন্তা মাথায় রাখতে চাই না। তারপর ভবিষ্যৎ এর কথা ভাবা যাবে।

আবিদ হাসান আর জিয়াউদ্দিনের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙ্গল প্রচন্ড শোরগোলের মধ্যে। আধো ঘুম আধো জাগা অবস্থায় প্রথমেই দেখলাম আমাদের বাঙ্কের কোনার দিকে একটা লাল বাতি ক্রমান্বয়ে ঘুরে যাচ্ছে, সঙ্গে একটা কান ফাটানো ট্যাঁ ট্যাঁ আওয়াজ। বিজয়নও হকচকিয়ে উঠে বসেছে।

হারুন প্রায় রুদ্ধশ্বাসে ঘরে এসে ঢুকল।

“মেন কেবিনে এখনই যাওয়া দরকার। ক্যাপ্টেনের অর্ডার।”

বিজয়নের বিমূঢ় মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ আমাদের সাবমেরিনের খবর পেয়েছে। সম্ভবত দশ নটিক্যাল মাইলের মধ্যেই আছে।”

দশ নটিক্যাল মাইল! শত্রুপক্ষে বলতে গেলে ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে।

“আমি আবিদ হাসানের ঘরে যাচ্ছি। ওনার সিকিউরিটির ব্যাপারটা সবার আগে সুনিশ্চিত করা দরকার।”

আমি তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “চলো, আমিও আসছি তোমার সঙ্গে।”

আবিদ হাসান নিজের কামরার ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়েছিলেন। চওড়া কপালে একরাশ ভাঁজ পড়েছে। বোঝা যাচ্ছে গভীর উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন।

আমাদের দেখে বললেন, “স্যোনার তো কাজ করার কথা নয়!”

কথাটা সত্যি। উত্তর আটলান্টিকের যা উথালপাথাল অবস্থা তাতে স্যোনার শব্দতরঙ্গ চালিয়েও কোনো যুদ্ধজাহাজের পক্ষে আমাদের সাবমেরিনকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না।

হারুন মাথা নাড়ল।

“মনে হয় কম্প্রেসড এয়ারট্যাঙ্ক ঠিক ভাবে কাজ করছিল না বলে আমাদের সাবমেরিনকে অনেকটাই উঠে আসতে হয়েছে। তাই জন্য স্যোনার শব্দতরঙ্গে আমরা ধরা পড়ে গেছি। কিন্তু সেসব কথা পরে হবে, আপনাদের এখনই মেন কেবিনে যাওয়া দরকার।”

আবিদ হাসান ইতস্তত করছেন দেখে আমি হারুনকে বললাম, “সালদানা বলেছেন কোড রেড ছাড়া ওনাদের বেরনোর দরকার নেই। আর যতক্ষণ না সাবমেরিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোড রেড জারি করা যাবে না। আবিদ ওনার ঘরেই থাকুন। আমরা বরং ক্যাপ্টেনের কাছে যাই, হয়ত কিছু সাহায্য আমরাও করতে পারি।”

হারুন আর কিছু বলল না, তবে বুঝলাম আবিদ হাসানকে এভাবে ছেড়ে যাওয়াটা ওর যুক্তিযুক্ত ঠেকেনি।

মাঝরাস্তায় বিজয়নের সঙ্গে দেখা, হাঁফাতে হাঁফাতে এদিকেই আসছে।

“ক্যাপ্টনের থেকে কোনো আপডেট পেলে?”

বিজয়ন কোনোক্রমে ঢোঁক গিলে বলল, “কম্প্রেসড এয়ারট্যাঙ্ক কাজ করছে না গোরা। কম্যান্ডার  দু’জন টেকনিসিয়ানকে পাঠিয়েছেন। আর মিনিট দশেকের মধ্যে ওরা এয়ারট্যাঙ্ক ঠিক না করতে পারলে বিপদের অন্ত রইবে না। আর, আর…”

আমরা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে।

“সাবমেরিনের রাডার জানাচ্ছে অন্তত দু’খানা বোমারু প্লেন এদিকেই আসছে।”

হারুনের মুখ শুকিয়ে গেছে। আমি জানি কেন। বোমারু প্লেন মানেই ডেপথ চার্জ, নির্ঘাত মৃত্যু। সমুদ্রের অনেক গভীরে যেতে না পারলে আর রক্ষা নেই।

আমি বিজয়নের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমরা ক্যাপ্টেনের কাছে যাচ্ছি। তুমি আবিদ হাসানের কামরার সামনে থাকো। একজন লোকও যেন তোমার চোখ এড়িয়ে ও কামরায় না ঢুকতে পারে।”

কম্যান্ডার মুসেনবার্গের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তাঁর মনের ভেতর কী চলছে। কন্ট্রোল রুমে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে একের পর এক আদেশ দিয়ে চলেছেন। লোকজনের প্রবল ব্যস্ততা দেখে ভয়ের বদলে কেন জানি একটা ভরসা জন্মাল। ফার্স্ট অফিসার থিয়োডোর পিটারসেন মুসেনবার্গের পাশেই দাঁড়িয়ে, আমাদের দেখে হাসলেন।

“মিস্টার গোরো! চিন্তা নেই, উই উইল বী সেফ। এয়ারট্যাঙ্ক আর কয়েক মিনিটের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে বলেই মনে হচ্ছে।”

বলতে বলতেই একটা শোরগোল শোনা গেল। সাবমেরিনের পেরিস্কোপে যে চোখ লাগিয়ে নজর রাখছিল সেই সৈন্যটি এবার ছুটে এসেছে। মুসেনবার্গ অভিজ্ঞ মানুষ, সৈন্যটির শরীরের ভাষা দেখেই সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন কী ঘটতে চলছে।

“বুঝতে পারছিস?”, হারুন আমার দিকে তাকিয়ে।

“টর্পেডো?”

বলতে বলতেই বুঝতে পারলাম সাবমেরিনে নিচে নামতে শুরু করেছে। সারা কন্ট্রোল রুম জুড়ে একটা থমথমে অবস্থা – প্রবল ব্যস্ততায় যে ঘরটা মিনিট খানেক আগেও গমগম করছিল আকস্মিক বিপদের আশঙ্কায় হঠাৎ সেই ঘরেই হিমশীতল নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে।

আমাদের আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত করে পিটারসেন ততক্ষণে ঘোষণা করেছেন ব্রিটিশ জাহাজ টর্পেডোই ছুঁড়েছে।

হারুন দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে। ফিসফিস করে বলল, “এয়ারট্যাঙ্ক যদি ঠিক না হয় তাহলে নিশ্চিত মৃত্যু, সাবমেরিন যত গভীরে যাবে  জলের চাপ প্রবল থেকে প্রবলতর হবে।”

ঠিক কথা। এদিকে নিচে না নামলেও ব্রিটিশ টর্পেডো এই জার্মান সাবমেরিনকে গুঁড়িয়ে দেবে!

 

বেনামী ডায়েরী  

“তোর নামটা কী এদের কাছে ভুল এসেছে? সারাক্ষণ দেখছি গোরার বদলে গোরো বলে ডাকছে।”

আমি ডাইনিং টেবলের ওপর একটা ম্যাপ বিছিয়ে একমনে বোঝার চেষ্টা করছিলাম মাদাগাস্কার থেকে কতটা দূরে আছে আমাদের সাবমেরিন। হারুনের প্রশ্নটা বুঝতে সামান্য সময় লাগল।

“হ্যাঁ, ভুলই। তবে ভুলটা নতুন নয়। বার্লিন টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার সময়েই অ্যাডমিশন অফিস এই ভুলটা করে। সেই ভুলটা আর ঠিক করা হয়নি, আমারই দোষ বলতে পারিস।”

আবিদ হাসান আমাদের সঙ্গেই বসে ছিলেন। একটা মগ ভর্তি কফিতে আস্তে আস্তে চুমুক দিচ্ছিলেন। অন্যদিন আমাদের আলোচনাতে নিজে থেকেই যোগ দেন, আজকে একটু অন্যমনস্ক লাগছে ওনাকে।

হারুনেরও ব্যাপারটা দেখলাম চোখে পড়েছে।

“আবিদ ভাই, কোনো সমস্যা ঘটেছে কী?”

আবিদ হাসান ঘাড়টা কাত করলেন, “ঠিকই ধরেছ হারুন। আমার সঙ্গে যে এসেছে ওর শরীরটা বেশ খারাপ। একে তো এতদিন ধরে জলের তলায়, তার ওপর খাবার নিয়েও সমস্যা হচ্ছে। খেতে পারছে না একদম, শেষ দু’তিন ধরে শয্যাশায়ী।”

হারুন সহানুভূতিসূচক মাথা নাড়ল, “আপনি চাইলে আমাদের ডাক্তার বন্ধু বিজয়ন ওনাকে একবার দেখে আসতে পারে। যদিও বিজয়নের নিজের শরীরই একদম ভালো নয়। তাও হয়ত ও জিয়াউদ্দিন সাহেবকে সাহায্য করতে পারবে।”

আবিদ সামান্য চমকালেন, “ও তোমরা ওর নাম জানো তাহলে?”।

হারুন হাসল, “কম্যান্ডার মুসেনবার্গশুধু নামটুকুই বলেছেন। আর কিছুই জানি না। উনিও কী বহুদিন ধরেই আপনাদের সঙ্গে বার্লিনে আছেন?”।

আবিদ গলাটা সামান্য নামিয়ে বললেন, “জিয়াউদ্দিন সেই কাবুল থেকেই সুভাষের সঙ্গে আছেন। আফগানিস্থানের যে ক’জন কমিউনিস্ট সুভাষকে সে দেশ থেকে বেরোতে সাহায্য করেছিলেন জিয়াউদ্দিন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। জার্মানি আর রাশিয়ার মধ্যে বোধহয় খুব শীঘ্রই যুদ্ধ লাগবে। এমত অবস্থায় জিয়াউদ্দিনের আসল পরিচয় জার্মানরা পেলে মহা বিপদ, এমনিতেই এরা কমিউনিস্টদের সন্দেহের চোখে দেখে। এদেরকে বলা হয়েছে জিয়াউদ্দিন ভারতীয়, সুভাষের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তোমাদেরকে অনেক বিশ্বাস করে খবরটা দিলাম, আর কাউকে বোলো না।”

হারুন মাথা নাড়ল,“নিশ্চিন্তে থাকুক। বিজয়নকে কী তাহলে খবর দেব?”।

আবিদ হাসানকে এখনো চিন্তাগ্রস্ত লাগছে, “ঠিক আছে। বিজয়নকে একবার আসতে বোলো আমাদের ঘরে। একজন ডাক্তারের সাহায্য পেলে মনে হয় ভালোই হবে।”

আবিদ হাসান উঠে দাঁড়ালেন, “আমাকে একবার কম্যান্ডার মুসেনবার্গের অফিসে যেতে হবে। তোমাদের সঙ্গে পরে কথা হবে আবার।”

আবিদ হাসান চলে যাচ্ছেন। হারুন সে দিকেই তাকিয়ে প্রায় স্বগতোক্তির ঢং-এ বলল, “জিয়াউদ্দিনকে এই সফরে নিয়ে আবিদ বেশ বড় রিস্ক নিয়েছেন। জার্মানরা জানলে কী হবে তাই ভাবছি।”

“যতক্ষণ না আমাদের মধ্যে থেকে কেউ বলছে, ততক্ষণ তো জার্মানদের জানার কথা নয়।”

হারুন আমার দিকে অল্পক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “আমাদের দিক থেকে যে ফাঁস হবে না সে কথা আমিও যেমন জানি তুই-ও জানিস। আমি শুধু ভাবছি জার্মানদের নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স যদি এ ব্যাপারে কিছু জেনে থাকে তাহলে মুসেনবার্গ কী করবেন।”

আমরা নিজেদের কামরার দিকে হাঁটা লাগালাম, বিজয়নকে খবরটা দেওয়া দরকার। হারুন হঠাৎ প্রশ্ন করল, “আচ্ছা গোরা, সেদিন যে এয়ারট্যাঙ্কটা খারাপ হয়ে গেছিল সেটা কী কেউ নিজে থেকে করে থাকতে পারে বলে মনে হয়?”।

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম, “মানে সাবোটাজ? ষড়যন্ত্র? কেন এরকম মনে হচ্ছে তোর?”।

হারুন মাথা নাড়ল, “আমি জানি না রে। আসলে আলেকজান্ডারপ্লাটজের ম্যাসাকারটার পর থেকেই আমি কারোর ওপর ভরসা রাখতে পারছি না, সামান্য কোনো ঘটনাকেও সম্পূর্ণ ভাবে খতিয়ে না দেখে নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। ভেবে দেখ একবার – যে মুহূর্তে এয়ারট্যাঙ্ক খারাপ হল, ব্রিটিশরাও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হামলা চালাল আমাদের সাবমেরিনের ওপর। দুটো ঘটনাকে কাকতালীয় বলা যায়, কিন্তু আমি কাকতালীয় শব্দটাতেই বিশ্বাস করি না।”

“তুই একটু বেশিই ভাবছিস হয়ত” আমি হারুনের পিঠ চাপড়াতে যাচ্ছি এমন সময়ে পর পর দু’বার গুলির শব্দে সাবমেরিনের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

এতই আকস্মিক, এতই অপ্রত্যাশিত সে শব্দ যে আমরা মিনিট খানেকের জন্য স্ট্যাচুর মতন দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপরই হারুন প্রাণপনে দৌড়তে শুরু করল, পেছন পেছন আমি। শব্দটা আমাদের ঘরের দিক থেকেই এসেছে।

আমাদের ঘরের কাছাকাছি এসে দেখি উল্টোদিক থেকে কম্যান্ডার মুসেনবার্গ দৌড়ে আসছেন, সঙ্গে আরো কয়েকজন লোক।

আমাদের ঘরেই ঢুকতে হল!

ঘরের ভেতর ফার্স্ট অফিসার পিটারসেন দাঁড়িয়ে, হাতে উদ্যত রিভলভার। আর সামনেই বিজয়ন, তার হাতেও ধরা রিভলভার।

কিন্তু বিজয়ন দাঁড়িয়ে নেই। তার নিষ্প্রাণ শরীরটা মাটিতে লুটোচ্ছে, বুক থেকে ঝলকে ঝলকে বেরিয়ে আসছে রক্তধারা।

পিটারসেন বিজয়নের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। আমরা ঢুকতে অসীম ঘৃণায় বলে উঠলেন, “ফারেটা! স্পিওন!”।

বিশ্বাসঘাতক!

গুপ্তচর!

এ যে অবিশ্বাস্য!

কিন্তু ততক্ষণে সামনে খোলা সুটকেসের দিকে নজর পড়েছে আমাদের সবার।

জামাকাপড়, কাগজপত্রের মধ্য দিয়ে সেখান থেকে উঁকি মারছে  একটি কালো রঙের ধাতব মেশিন, টাইপরাইটারের চাবির মতন সারি সারি জিনিস লাগানো সেই মেশিনের সঙ্গে।

মুসেনবার্গ অস্ফুটে বলে উঠলেন, “টাইপেক্স সাইফার!”

জার্মানদের সাঙ্কেতিক কোড পাঠানোর মেশিনের নাম যে এনিগমা সে কথা আগেই জানতাম, কিন্তু ব্রিটিশরাও যে এনিগমার মতন মেশিন বার করেছে সে কথা জানা ছিল না। মুসেনবার্গ জানালেন ব্রিটিশ নৌবাহিনী প্রথম এই টাইপেক্স সাইফার মেশিন ব্যবহার করতে শুরু করে। স্পষ্টতই উত্তর আটলান্টিকে ব্রিটিশ জাহাজের কাছে আমাদের সাবমেরিনের খবর এই মেশিন থেকেই গেছিল।

হারুন বিজয়নের বাঙ্কের পাশেই দাঁড়িয়েছিল। মুসেনবার্গের লোকেরা এগিয়ে আসার আগেই মনে হল বিজয়নের বালিশের নিচ থেকে কিছু একটা চকিতে সরিয়ে ফেলল।

 

কম্যান্ডারের লোকেরা আমাদের কামরায় খানাতল্লাশি সেরে ফিরে গেছে। মুসেনবার্গের সামনে পিটারসেন পুরো ঘটনাটা জানায়। সাবমেরিনের রেডিও গতরাতে খারাপ হয়ে যায়। রেডিও অফিসার আজ সকালে সেটি ঠিক করার সময়ে ভুল করে অন্য রেডিও ফ্রীকুয়েন্সিতে মেসেজ পাঠাতে গিয়ে খেয়াল করে একই ফ্রীকুয়েন্সিতে আমাদের সাবমেরিন থেকেই আরেকটি মেশিন খবর পাঠাচ্ছে। পিটারসেন নিজে রেডিও অফিসার ছিলেন বলে তাঁর কাছে খবর যায় এবং এই নতুন মেসেজের উৎসস্থল খুঁজতে খুঁজতে তিনি হাজির হন আমাদের কামরায়। বিজয়ন ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রিভলভার বার করে গুলি চালাতে যায় কিন্তু পিটারসেন প্রস্তুত ছিলেন।

আবিদ হাসান ডেকে পাঠিয়েছিলেন, পিটারসেন যা বলেছে সেই কথাগুলোই ওনাকে জানিয়ে এসেছি।

আমি নিজের বাঙ্কে মুহ্যমান হয়ে বসেছিলাম।  হারুন এসে পাশে বসল।

“ব্রিটিশরা আর কতভাবে ইন্ডিপেন্ডেস লীগের মধ্যে ঢুকে পড়েছে কে জানে। বার্লিনে যারা রয়ে গেল তাদের জন্য আমার ভয় হচ্ছে। গোরা, তুই ভেবে দেখে বার্লিনে ফিরবি কিনা।”

আমি চুপ করে রইলাম। হারুন যা বলছে সেটা সত্যি কথা, কিন্তু এই মুহূর্তে বার্লিনে ফেরা নিয়ে আমি কিছু ভাবতেই পারছি না।

“আমার ধারণা আলেকজান্ডারপ্লাটজে যেই খুনগুলো করে থাকুক সে খবরটা পেয়েছিল বিজয়নের থেকেই। আলি ভাইয়ের উচিত হয়নি বিজয়নকে আগে থেকে খবরটা দেওয়ার। বিজয়ন যখন বাড়িতে ঢুকেছিল তখন ওর ব্যবহার কি অস্বাভাবিক লেগেছিল তোর?”

“একেবারেই না। তবে যে কোনো গুপ্তচরই যে অভিনয়টাও ভালো করবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু উল্টোদিকে এ কথাও সত্যি, বিজয়নকে একটা দিনের জন্যও মনে হয়নি বিশ্বাসঘাতক। স্বাধীন ভারত দেখার জন্য ওর মধ্যে যা জেদ দেখেছি সেটা কৃত্রিম হতে পারে এটা ভাবাটা প্রায় অকল্পনীয়।”

হারুন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে স্পষ্ট একটা উত্তেজনা দেখতে পাচ্ছি।

“আমার ধারণা বিজয়ন প্রথম থেকেই ব্রিটিশদের পক্ষে ছিল না।”

আমি অবাক হয়ে হারুনের দিকে তাকালাম, “কী বলতে চাইছিস?”

হারুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর ওভারকোটের পকেট থেকে একটা ডায়েরী বার করল।

“এটা পড়ে দেখ”।

ডায়েরীতে কোনো নাম নেই, এমনকি কোনো লেখাও নেই, শুধু পাতার পর পাতা জুড়ে খবরের কাগজের কাটিং।

আমি খবরগুলো পড়তে পড়তে চমকে উঠলাম।

জার্মানি এবং জার্মানি অধিকৃত দেশগুলোতে ইহুদীদের নিধনযজ্ঞ চলছে। একের পর এক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে হাজার হাজার ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইহুদীদের ওপর যা অত্যাচার চালানো হচ্ছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

সেই সমস্ত অত্যাচার এবং হত্যাকান্ডের পুঙ্খনাপুঙ্খ খবর অতি যত্ন করে সাজিয়ে রাখা আছে ডায়েরীতে।

কিছু খবরে সঙ্গে ছবিও দেখা যাচ্ছে। জার্মান সৈন্যরা রাস্তায় ইহুদী বৃদ্ধকে ফেলে রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারছে, ইহুদী মহিলার চুল জোরে করে কেটে ফেলছে, লাথি মেরে রাস্তা থেকে ইহুদী বাচ্চাদের সরিয়ে দিচ্ছে।

আমি স্তম্ভিত হয়ে ডায়েরীটা হাতে নিয়ে বসে থাকলাম।

“তুই জানতিস এসব খবর?”

“কিছু কিছু জানতাম। কিন্তু এত ডিটেইলসে জানা ছিল না। আমার ধারণা জার্মানদের অত্যাচারের খবর পেয়েই বিজয়ন বদলে গেছে। যারা এরকম নির্মম অত্যাচার চালাতে পারে তাদের সঙ্গে হাতে মেলাতে চায়নি বিজয়ন।”

আমাদের কামরাটায় শুধু আমাদের তিনজনের জন্যই বাঙ্ক রাখা ছিল, অন্য কেউ নেই। তাও আমি উঠে কামরার দরজাটা বন্ধ করলাম।

“দরজা বন্ধ করছিস কেন?”, হারুন বিস্মিত গলায় জিজ্ঞাসা করল।

“জার্মান সাবমেরিনে বসে জার্মানদের অত্যাচারের কথা নিয়ে যদি আলোচনা করতেই হয় তাহলে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।”

হারুন বুঝতে পেরেছে, মাথা নাড়ল।

আমি ফিসফিস করে বললাম, “এই সব খবর আগে পেলে তুইও কী এই সাবমেরিনে বসে থাকতিস হারুন? সত্যি করে বল্?”

হারুনের চোখের দৃষ্টি তীব্র হয়ে উঠেছে, “না। মনুষ্যত্বর থেকে বড় কিছু হতে পারে না। মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দিয়ে দেশের স্বাধীনতা হয়ত চাইতাম না। কিন্তু নাউ ইটস টু লেট ফর মী। আবিদ হাসানকে বিপন্মুক্ত করাটাই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু গোরা, তুই? তুই কী করতিস?”

আমি ওর প্রশ্নের উত্তর দিলাম না।

অল্প কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, “একটা বিশাল বড় ভুল হয়ে গেছে হারুন”।

হারুন বুঝতে পারছে না আমার কথা, “কোন ভুলের কথা বলছিস তুই?”।

“বিজয়নের সঙ্গে একবার-ও কেন এই নিয়ে কথা বললাম না? বললে আজকে হয়ত ওকে প্রাণটা হারাতে হত না”।

“মানে?”, হারুন আরো অবাক।

“কারণ বিজয়নের জানা উচিত ছিল আমরা দু’জনে একই দিকে”, আমার গলা হিসহিসিয়ে উঠেছে। আমার হাতে এই মুহূর্তে একটা রিভলভার, সেটা এখন হারুনের দিকে তাক্ করা।

“গোরা, কী করছিস তুই?” হারুন প্রায় আর্তনাদ করে উঠেছে।

“ভুল জায়গায় এসে পড়েছিস হারুন। বিজয়নের মতনই আমিও ব্রিটিশ এজেন্ট। কেন যে আমার কাছে খবর ছিল না বিজয়নও ব্রিটিশদের হয়ে কাজ করছে সেটাই প্রশ্ন!”।

“তুই ব্রিটিশ এজেন্ট?” হারুনের চোখ প্রায় ঠিকরে আসছে।

আমি সেফটিক্যাচ সরাতে সরাতে বললাম, “হ্যাঁ। আমরা মাদাগাস্কারের সমুদ্রে ঢুকে পড়েছি সে কথা নিশ্চয় জানিস। আর ঘন্টাখানেকের মধ্যেই জার্মান সাবমেরিনের পাশে এসে ঠেকবে জাপানী সাবমেরিন। তার আগেই কাজ শেষ করতে হবে”।

হারুন একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে, “কোন কাজ? আবিদ হাসানকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া? যেরকম ভাবে সরিয়ে দিয়েছিস ইন্ডিপেন্ডেস কাউন্সিলের সমস্ত মেম্বরদের”।

আমি হেসে উঠলাম।

“আবিদ হাসান? তোর মনে হয় আবিদ হাসানের জন্য এত পরিকল্পনা, এত রক্তপাত? আলেকজান্ডারপ্লাটজের খুন কোন ব্রিটিশ এজেন্ট করেছে সে কথা আমি জানি না কিন্তু এটুকু অবশ্যই জানি যে আবিদ হাসান নন, এই সাবমেরিনে আমাদের আসল টার্গেট হচ্ছেন জিয়াউদ্দিন অর্থাৎ……”

“অর্থাৎ সুভাষ বোস”, হারুনের গলার স্বর বদলে গেছে। গম্ভীর শোনাচ্ছে সে গলা।

“রিভলভার নামা গোরা”, হারুনের গলার স্বরে কর্তৃত্ব ফুটে উঠেছে।

“দেরি করে ফেলেছিস হারুন। এ রিভলভার এখন নামবে না”।

“গোরা পাগলামো থামা”, হারুন প্রায় ধমকে উঠল।

ওর গলার স্বরে আমার একটা খটকা লাগল।

হারুন উঠে দাঁড়িয়েছে, রিভলভারকে অগ্রাহ্য করে আমার সামনে এগিয়ে আসছে।

“আর এক পা-ও এগোবি না হারুন, নইলে…”

“নইলে কী? এখনই রিভলভার চালাবি? কিন্তু তাহলে যে আরেকবার ভুল হবে”।

আমার বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে হারুন হাসছে।

“মীট  অফিসার অ্যারন জোসেফ, ইণ্ডিয়ান পলিটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স অফিস”।

 

শেষ জবানবন্দি

আমি হারুনের বাঙ্কেই ধপ্ করে বসে পড়লাম।

“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। রণেন্দ্র সান্যাল আমাকে এরকম অন্ধকারে কেন রাখলেন? যার সঙ্গে এত বছর একঘরে থাকলাম সেও ব্রিটিশ এজেন্ট, তুই-ও ব্রিটিশ এজেন্ট, অথচ এ কোনো খবরই আমি জানি না।”

হারুনের মুখে ঈষৎ বিস্ময়, “তুই-ও রণেন্দ্র সান্যালের রিক্রুট?”

“অবশ্যই, রণেন্দ্র সান্যাল যেদিন থেকে ব্রিটিশদের দিকে এসেছেন কলকাতার সমস্ত রিক্রুটমেন্টই তাঁর। আই গেস্, তোর সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে।”

হারুন মাথা নাড়াল, “তুই হয়ত আমার আসল নামটা ভুলে যাচ্ছিস। হারুন নামটা কিন্তু এসেছে অ্যারন থেকে, আমিও ইহুদী। ব্রিটিশদের নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, সত্যি কথা বলতে কী তাদেরকে আমি পছন্দ করি বললে সত্যের অপলাপ হবে। আমার আসল কাজ হল ইহুদীদের শত্রুদের শেষ করা। ভারতীয় নেতারা যাঁরাই হিটলারের সঙ্গে হাত মেলাবেন তাঁরাই আমার শত্রু। হ্যাঁ, বার্লিনের কাজে আমার সমস্ত যোগাযোগই রণেন্দ্র সান্যালের সঙ্গে কিন্তু আমি তাঁর রিক্রুট নই, এ কাজ আমি যেচেই নিয়েছি।”

“আর বিজয়ন?”

হারুনের চোখ দুটো সামান্য ব্যথাতুর হয়ে উঠল, “বিজয়ন আমাদের দিকে ছিল না গোরা। ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেস লীগের প্রতি তার আনুগত্য প্রশ্নাতীত। স্লো পয়জনিং কাজ দিচ্ছিল না বলেই বাধ্য হয়ে অন্য পথ দেখতে হল। বলা বাহুল্য যে ডায়েরীটা দেখলি সেটা আমার। বিজয়নের বিছানায় রাখা হয়েছিল যাতে ওটাকে ধোঁকার টাটি হিসাবে তোকে দেখানো যায়।”

আমি কথাগুলো ভালো করে বোঝার চেষ্টা করছি। হারুন যা বলছে তার অর্থ এই সাবমেরিনে হারুনের আরো এক সহযোগী আছে।

“তাহলে পিটারসেন……?”

হারুন মাথা নাড়ল, “ডেনমার্কে জন্ম, ড্যানিশ স্পাই। বহু বছর ধরে জার্মানিতে গোপনে কাজ করে চলেছে।”

হারুনের কথা শেষ হওয়ার আগেই আমার মাথায় বিদ্যুৎচমক খেলে গেছে। বললাম, “এবার্টস্ট্রাসের ব্যাপারটা তাহলে পুরোই সাজানো? পিটারসেন-ই কি তোর ওপরে লোক দেখানো গুলিটা চালায়?”

“থিও কাজের লোক গোরা। অনেক কিছুই করেছে। এবার্টস্ট্রাস হোক কী আলেকজান্ডারপ্লাটজ, ওর সাহায্য ছাড়া কিই বা করা যেত। আমি যখন তোদের বাড়িতে শুয়ে তখন থিও-ই গেছিল আলেকজান্ডারপ্লাটজ-এ। এয়ারট্যাঙ্কটা অবশ্য আমিই অকেজো করেছিলাম, রেডিও মেসেজ পাঠিয়েছিল থিও। আজকেও বিজয়ন কে ওই প্রথমে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দিয়ে মারে। পরে একটা রিভলভার বিজয়নের হাতে ধরিয়ে দিয়ে গুলি চালানোর নাটকটাও ওরই পরিকল্পনা মাফিক ঘটেছে”।

আমি মাথা নাড়লাম, এখন সব জলের মতন পরিষ্কার হচ্ছে। “কাউন্সিল মীটিং এর খবরটা রণেন দা’র দেওয়া, তাই না?”।

“সে তো বটেই, গত কয়েক বছরে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেস লীগ যা যা কাজ করেছে, যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার সব কিছু আমরা জানি, সৌজন্যে রণেন্দ্র সান্যাল”।

“শুধু একটা খবরই আমাকে তিনি দেন নি”, হারুন আমার দিকেই তাকিয়ে।

“আমি জানি কোন খবরের কথা তুই বলছিস। আমার ধারণা রণেন্দ্র সান্যাল তোকে কেন, কোনো ব্রিটিশ অফিসারকেও আমার ব্যাপারে বলেন নি। এই ইন্টেলিজেন্স-কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের খেলায় আমিই তাঁর কিস্তিমাতের চাল”।

হারুন মাথা নাড়ছে।

“সম্ভব, খুবই সম্ভব। রণেন্দ্র সান্যাল যে এফিসিয়েন্সি নিয়ে কাজ করেন তাতে তোর কথা সত্যি হলে আমি আশ্চর্য হব না। কিন্তু তোর কথা আগে যাচাই করা দরকার। আমি দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে যাচ্ছি, কিছুক্ষণের জন্য।”

“বেশ, তাই হোক”, আমি ঘাড় নাড়লাম।

“হারুন”, কামরা ছেড়ে বেরোতে যাচ্ছিল, আমার ডাকে হারুন ঘুরে দাঁড়াল।

“মনে আছে তুই আমাকে বলেছিস তুই কাকতালীয় শব্দটায় বিশ্বাস করিস না? আমিও করি না। আর তাই জন্যই প্রশ্ন দু’টো করছি। এবার্টস্ট্রাসে তুই আমাকে ধাওয়াই করেছিলিস, তাই না? আমার বাড়িতে তোর সময় কাটানোটা যে বিশ্বাসযোগ্যতা পাওয়ার জন্য সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু আজকে তুই খবরটা না জানতে পারলে আমার দশাও কি বিজয়নের মতনই হত?”

হারুনের চোখে ছায়া ঘনিয়ে এল কী? কোনো উত্তর না দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

হাতে আর বড়জোর ঘন্টা খানেক সময় আছে। জীবনে এত বড় অনিশ্চয়তার মুখে এসে পড়িনি। হারুন আর পিটারসেন তো আছেই, কিন্তু আরো কেউ আছে কী? এদিকে সাবমেরিন ভর্তি জার্মান অফিসার।

আমার হাতঘড়ির দিকে নজর পড়ল।

ঘড়িটা খুলতে হবে বলেই মনে হচ্ছে।

আধ ঘন্টা পর দরজার বাইরে পায়ের আওয়াজ শুনলাম। ধাতব ছিটকিনি ঘড়ঘড় শব্দ করে সরে গেল, হারুন ঢুকল। চোখমুখ উত্তেজনায় টকটকে লাল।

সামনে এগিয়ে এসেছে হারুন, দুটো হাত আমার গলার দিকে এগিয়ে আসছে।

আমি পাথরের মতন দাঁড়িয়ে, পা-গুলো যেন আমার বশে নেই। কিছুতেই সরে যেতে পারলাম না।

নাহ, আমারই ভুল।

হারুন দু’হাত দিয়ে আমার গলা নয়, আমার দু’টো গাল চেপে ধরেছে। এই হারুনকে আমি চিনি, এই হারুন আমার আর্মেনিয়ান স্কুলের বন্ধু।

“থিও রণেন্দ্র সান্যালকে মেসেজ পাঠিয়েছিল। পাঁচ মিনিট আগে আমরা উত্তর পেয়েছি। রণেন্দ্র সান্যাল কনফার্ম করেছেন তুই ব্রিটিশ এজেন্ট।”

মনে হচ্ছিল আমার হৃৎপিণ্ড গলা দিয়ে বেরিয়ে আসবে।

“আমাকে মাফ করিস গোরা। বিশ্বাস কর্ এর থেকে বড় সুখবর আমার জীবনে আর কিছু আসেনি। ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেস লীগের লিস্টে যেদিন থেকে তোর নামটা দেখেছি সেদিন থেকে একটা রাত্রি আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারিনি।”

হারুন সত্যি কথা বলছে, আমি জানি।

আমি ওর পিঠে হাত দিলাম, “ওসব কথা ছাড়। কাজের কথাটা বল।”

“হ্যাঁ, সেই কথাতেই আসছি এবার। থিও জানালো জাপানী সাবমেরিন এসে গেছে। দু’জন জাপানী সৈন্য একটা বোট নিয়ে আসছে। ওই বোটেই সুভাষ এবং আবিদ উঠবেন।”

“কতটা সময় আছে আমাদের কাছে?”

“মিনিট পাঁচেক মতন। সুভাষরা ডেকে ওঠার পর ঠিক ওইটুকু সময়ই আমরা পাব।”

“পিটারসেন থাকবে তো?”

“অবশ্যই। ডেকের ওপর সুভাষদের শেষ বিদায় জানাতে জার্মানদের দিক থেকে মুসেনবার্গ আর থিও থাকবে। আর ইন্ডিয়ান ইন্ডেপেন্ডেস লীগের তরফ থেকে আমরা দু’জন। মনে হয় না কোনো সমস্যা হবে।”

‘শেষ বিদায়! কথাটা বেশ জুতসই, কী বলিস?”

হারুন হাসল।

“তারপর?”

“তার আর পর নেই গোরা, একদিকে জার্মান আর অন্যদিকে জাপানী। কী হতে পারে বলে মনে হয় তোর?” হারুন নিজের রিভলভারের ব্যারেলের দিকে তাকিয়ে।

আমি নিঃশব্দে ঘাড় নাড়লাম। কেন জানি শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল এ সুইসাইড মিশন না হয়ে যায় না। যাই হোক, সে নিয়ে আক্ষেপ করার সময়টুকুও নেই।

টের পেলাম সাবমেরিন উঠতে শুরু করেছে।

আমি আর হারুন ডেকে উঠে দেখলাম মুসেনবার্গ আর পিটারসেন আগেই এসে গেছেন। ভোরের আলো ভালো করে ফোটেনি এখনো, কিন্তু তার মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি জাপানী বোটও পৌঁছে গেছে। বোট না বলে রাবারের ভেলে বলাই বধহয় যুক্তিসঙ্গত হবে। মুসেনবার্গ নিজে সাবমেরিনের ডেক থেকে একটা দড়ির মই ঝুলিয়ে দিলেন। মুসেনবার্গ যখন মই ঝোলাতে ব্যস্ত, আমি একবার আড়চোখে পিটারসেনের দিকে তাকালাম।

ফার্স্ট অফিসার থিয়োডোর পিটারসেন ভাবলেশহীন মুখে দাঁড়িয়ে। শুধু তার ডান হাতটা কোমরের কাছে রিভলভারের খাপের ওপর রাখা। ভালো করে তাকালে দেখা যাবে সেই খাপ এখনই খুলে রাখা আছে।

হারুনের চোখটা কুঁচকে আছে। আমার কানে ফিসফিস করে বলল, “বোটটায় পাঁচ-ছ জনের বসার জায়গা হতে পারে। তাহলে দু’জন মাত্র সৈন্য কেন? সুভাষ আর আবিদকে নিয়েও তো চার জন হবে”।

হারুনের কথা শুনতে শুনতে আমার বুকটা ধক্ করে উঠল।

আবিদ এসে দাঁড়িয়েছেন। আর তাঁর পেছনেই উঠে আসছেন যিনি তাঁর ছবি এতবার দেখেছি যে মুখের আদলটি অবধি মুখস্থ হয়ে গেছে। এই আলোআঁধারিতেও সুভাষচন্দ্রকে চিনতে সামান্য অসুবিধাও হল না। সেই গোলাকৃতি প্রাজ্ঞ মুখে গোল রিমের চশমা, মাথায় টুপি। ঠোঁটের ওপরে অবশ্য এখন একটা গোঁফ দেখা যাচ্ছে যেটা চট্ করে তাঁর ছবিতে দেখা যায় না।

সুভাষচন্দ্র ডেকে ওঠা মাত্র আবিদ আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “ক’টা বাজে গোরা?”।

দেখতে পাচ্ছি সুভাষ আবিদের পেছনে প্রায় ঢাকা পড়ে গেছেন, আবিদের সামান্য ডানদিকে মুসেনবার্গ দাঁড়িয়ে, আর তার পাশেই পিটারসেন। আমি আর হারুন আবিদদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

আবিদের প্রশ্নের উত্তর দিতে কয়েক সেকন্ড মাত্র দেরি হল, আর তাতেই মনে হল যেন অনন্তকাল কেটে গেছে। জানি মনের ভুল, কিন্তু মনে হচ্ছে সময় জানার জন্য ডেকের ওপরে দাঁড়ানো প্রত্যেকটা মানুষ আমার দিকেই চেয়ে আছে।

আমি আবিদ হাসানের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আবিদ ভাই, আমার কাছে তো ঘড়ি নেই”।

বলার সঙ্গে সঙ্গে একটা কান ফাটানো শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে।

এক খানা নয়।

দু দু’খানা।

আবিদ হাসান এবং মুসেনবার্গ, দু’জনের হাতেই উঠে এসেছে রিভলভার। আবিদ হাসানের নির্ভুল লক্ষ্যে পিটারসেনের হাতে খাপখোলা রিভলভার উঠে আসার সুযোগ পায়নি। তার নিথর দেহটা ডেকের ওপরেই গড়িয়ে পড়েছে।

ভুল করেন নি ক্যাপ্টেন মুসেনবার্গ-ও। হারুন বুকে হাত দিয়ে বসে পড়েছে, ওর গাঢ় নীল ওভারকোটের রঙ বদলে যাচ্ছে। গাঢ় লাল রক্ত বেরিয়ে আসছে ওভারকোটের ভেতর থেকে।

হারুন আমার দিকে তাকিয়ে। বোবা দৃষ্টি।

“গোরা!”

“গোরা নয় হারুন, গোরো-ই”।

হারুন শুনতে পেল কিনা কে জানে, মুসেনবার্গের রিভলভার আবারো গর্জে উঠেছে।

এই একটা সত্যি কথা হারুনকে শেষ ইস্তক বলে উঠতে পেরেছি।

ফ্রী স্কুল স্ট্রীটের যে চণ্ডুখানায় আমার প্রাণ বেঁচেছিল, তার মালিকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল আমার অন্যান্য চীনা বন্ধুরাই। তিনি জাপানী। তখনও ব্রিটেনের সঙ্গে জাপানের সম্পর্কের অবনতি ঘটেনি, বরং শুরুর দিকে আফিং এর ব্যবসা থেকে একসঙ্গে মুনাফা লুটত দুই দেশ। ভারত আর চীনের কপালেই জুটত ছিটেফোঁটা।

হিদেকি সানাদা আমাকে ভালোবাসতেন, বিদেশী হলেও অনাথ ছেলেটিকে তাঁর মনে ধরেছিল। ভারতে আফিং এর ব্যবসার পুরো মুনাফাই ব্রিটিশরা চায় বুঝতে পেরে পরে তাঁকে কলকাতায় আফিং এর ব্যবসা ছেড়ে জাপানে ফিরে যেতে হয়। আর ফেরার সময়ে সঙ্গে নিয়ে যান অনাথ ছেলেটিকেও। তার স্কুলও শেষ হয়ে গেছে ততদিনে, ভারতবর্ষে কোনো পিছুটানও নেই।

সারা জীবনের না পাওয়া সমস্ত ভালোবাসা ছেলেটি শেষমেশ পেয়েছিল, সানাদা এবং তাঁর স্ত্রী তাঁদের স্নেহ উজাড় করে দিয়েছিলেন। তিনটি সন্তান থাকা সত্ত্বেও দত্তক নিয়েছিলেন আমাকে। বার্লিন টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি আমার নাম ভুল লেখেনি, হিদেকি সানাদা ‘গোরা’ থেকে আমার নাম করে দিয়েছিলেন ‘গোরো’। গোরা মিটার নয়, গোরো সানাদা। জাপানী ভাষায় ‘গোরো’র অর্থ পঞ্চম সন্তান। দত্তক নেওয়ার দিন আমাকে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “আমার তিনটিই সন্তান, কিন্তু তাও তোমার নাম হল গোরো। আরো দু’টি সন্তানকে আমি যতটা ভালোবাসা দিতে পারতাম তার সবটাই তুমি পাবে”। তা তিনি দিয়েছিলেন, অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়েছিল তাঁর পরিবারের বাকি সদস্যরাও। এবং হ্যাঁ, জাপান দেশটিও।

অ্যারন আর আমি প্রায় এক কারণে নিজেদের জীবন বাজি রেখে এই সাবমেরিনে উঠেছিলাম। ব্রিটিশদের শত অত্যাচার সত্ত্বেও সে ইহুদীদের বাঁচানোর জন্য তাদের পক্ষ নিয়েছে, আমিও ঠিক তেমন ভাবেই যে দেশ আমাকে সব দিয়েছে তাদেরকে প্রতিদান দেওয়ার জন্যই জার্মানির সঙ্গে হাত মিলিয়েছি। আটলান্টিক সমুদ্রে ব্রিটিশ টর্পেডোয় তার নিজের মৃত্যু হতে পারে জেনেও খবর পাঠিয়েছিল সে। আমিও আজ যখন সাবমেরিনের ডেকে উঠেছি তখনও জানতাম না প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারব কিনা। আমি যে ব্রিটিশ এজেন্ট নই সেটা হারুন বা পিটারসেন জানতে পারলে সেকন্ডের মধ্যে বুলেট এসে বিঁধত আমার শরীরেই।

হারুনের দেহ নিথর, কিন্তু চোখটা যেন এখনো কিছু বলতে চাইছে। কী বলছে? স্কুলের বাকি ছেলেদের মতন ‘বিশ্বাসঘাতক’? হতে পারে। একদিন তার প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম সত্যি কথা বলে, আজ তার প্রাণ কেড়ে নিতে হল মিথ্যা কথায়। অবশ্য তার জন্য অনুতপ্ত আমি নই। মিথ্যা কথা না বললে প্রাণ যেত আমারই। বন্ধুত্বর থেকেও আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল আদর্শর লড়াই।

ব্রিটিশ এজেন্ট না হলেও, আমি সিক্রেট সার্ভিসেই কাজ করি। তবে সে সিক্রেট সার্ভিস জাপানের। আমি জাপানী রাজবাহিনীর গুপ্তচর। সে কথা ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের কেউ-ও জানতেন না, এমনকি হীরেন দা-ও নন। সুভাষ বসু জাপানে যাবেন ঠিক হওয়ার পর শুধুমাত্র সুভাষ বসু এবং আবিদ হাসানের কাছে আমার আসল পরিচয় দেওয়া হয়, সে খবরও এসেছিল জাপান থেকে। আমাকে কেন সুভাষদের সঙ্গে নেওয়া হয় সে কথা সালদানা বলতে গিয়েও থেমে গেছিলেন। আবিদ হাসান নিজে চেয়েছিলেন আমাকে, তাঁকে সেরকমটাই করতে বলেছিল জাপানী সিক্রেট সার্ভিস।

কাকতালীয় শব্দটা আমি সত্যিই বিশ্বাস করি না। এবার্টস্ট্রাসে হারুনের সঙ্গে দেখা, আলেকজান্ডারপ্লাটজের খুন এবং সালদানার বাড়িতে হারুনকে ফের দেখেই আমি সতর্ক হয়ে গেছিলাম। এও মনে হয়েছিল ইন্ডিপেন্ডেস লীগের নাড়িনক্ষত্র জানেন এরকম কেউ বিশ্বাসঘাতকতা না করলে আলেকজান্ডারপ্লাটজের কাউন্সিল মীটিং এর কথা ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের পক্ষে  জানা সম্ভব ছিল না। কলকাতায় বসে সে খবর একমাত্র একজনই যোগাতে পারেন, তিনি রণেন্দ্র সান্যাল।

সাবমেরিনের প্রথম দিনেই আমি আবিদ হাসানের সঙ্গে দেখা করে আমার সন্দেহের কথা খুলে বলি। আবিদ হাসান আমার আসল পরিচয় জানতেন, তাই আমার কথা তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি মুসেনবার্গের মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছিলেন কলকাতায়।

রণেন্দ্র সান্যাল ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের একজন মাথা, তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা সহজ কাজ নয়। নেহাত আবিদ হাসান এবং জাপান সরকার, দু’পক্ষ থেকেই আলাদা ভাবে খবর যাওয়ার কলকাতায় অপেক্ষাকৃত তাড়াতাড়িই কাজ শুরু হয়। তারপরেও রণেন্দ্র সান্যালের মুখ খুব সহজে খোলানো যায় নি, সময় লেগেছে। তাই উত্তর আটলান্টিকে সুভাষের প্রাণ বিপন্ন হয়েছে, প্রাণ বাঁচানো যায়নি আমার বন্ধু বিজয়নেরও। কিন্তু হারুন এবং পিটারসেন শেষ আঘাত হানার আগেই যে তাঁর মুখ খোলানো গেছে, সেটাই বাঁচোয়া। রণেন্দ্র সান্যালের মেসেজ যখন হারুন আর পিটারসেন দেখেছে তখন হয়ত তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে রণেন্দ্র সেই মুহূর্তে কলকাতার বিপ্লবীদের জিম্মায়।

এবার্টস্ট্রাস এবং আলেকজান্ডারপ্লাটজের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আন্দাজ করেছিলাম হারুনের কোনো সহযোগী সাবমেরিনে আছে, এবং শেষ মুহূর্ত অবধি সে তাকে সাহায্য করবে। আলেকজান্ডারপ্লাটজের বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বিজয়ন জানিয়েছিল তার সুটকেস হালকা তাই দৌড়তে অসুবিধা হবে না, অথচ সেই সুটকেসেই ভারি টাইপেক্স সাইফার মেশিন দেখে আমার সন্দেহ আরো গভীর হয়।  কিন্তু হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল হারুনকে কোনো ভাবে বোঝানো যে আমি তারই দলের লোক।

 

একা হারুন থাকলে তাকে কাবু করতে অসুবিধা হত না, কিন্তু তার সহযোগীও সঙ্গে থাকলে সুভাষের পক্ষে নিরাপদে অন্য সাবমেরিনে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই আবিদ হাসানের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করে ঠিক করে নিয়েছিলাম হাতে ঘড়ি না থাকাটাই হবে সঙ্কেত।

“মিস্টার সানাদা”, মুসেনবার্গ ডাকছেন।

সুভাষ বিক্ষুব্ধ জলের দিকে তাকিয়ে। আবিদ হাসান বোটে নেমে গেলেও সুভাষ এখনো নামেননি। মুসেনবার্গ চিন্তিত মুখে সুভাষের দিকে তাকিয়ে।

সুভাষ কী ভয় পাচ্ছেন? অবশ্য যে পরিমাণ টেনশন তাঁকে অনবরত নিতে হচ্ছে তাতে তিনি এখনো যে সুস্থ মস্তিষ্কে আছেন সেটাই ঢের নয় কী? আমার ধারণা সাবমেরিনের ডেকের ওপর যা ঘটেছে সেটা দেখেও উনি সামান্য বিহ্বল হয়ে পড়েছেন।

আমি এগিয়ে গিয়ে ওনার হাতের ওপর হাত রাখলাম, “কোনো চিন্তা নেই। আপনি আমার হাত ধরে নামুন। কয়েক ধাপ নিচে নামলেই আবিদ আপনাকে নামিয়ে নেবেন। তারপর আমিও আসব, আপনাদের সঙ্গে আমাকেও জাপানেই ফিরতে হবে।”

সুভাষ হাসলেন। সামান্য ম্লান হাসি, যদিও কৃতজ্ঞতায় উজ্জ্বল।

সুভাষ নামছেন, আমার হাতটা আঁকড়ে ধরে আছেন।

ইতিহাস বলবে ওঁর সঙ্গে থেকে ভুল করলাম কিনা। জানি না ইহুদীদের নিয়ে হিটলারের মারণযজ্ঞ দেখেই সুভাষ তাঁর ঘাঁটি বদলে জাপানে চলে যাচ্ছেন কিনা, হিটলারের সঙ্গে হাত মেলানোর জন্য সুভাষ ভবিষ্যৎ-এ অনুতপ্ত হবেন কিনা তাও বলতে পারিনা, এই মুহূর্তে আমি শুধু একজন ক্লান্ত মানুষকে দেখতে পাচ্ছি যাঁর একটা সাহায্যের হাত দরকার।

 

Tagbag 2017_3

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

আত্মগ্লানির অর্থনীতি – প্রসঙ্গ যখন চিট ফান্ড

(গতকাল রিচার্ড থেলার অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়ার পর থেকেই একাধিক বন্ধু ফেসবুকে মেসেজ করে বা ট্যাগ করে ‘বিহেভিয়রাল ইকোনমিক্স’ বা আচরণবাদী অর্থনীতি নিয়ে জানতে চেয়েছেন, প্রশ্ন তুলেছেন নিজেদের দৈনন্দিন চৌহদ্দির মধ্যে থেকেই আচরণবাদী অর্থনীতির তত্ত্বকে কী ভাবে বুঝতে পারবেন। 

বছর দুয়েক আগে ‘আরেক রকম পত্রিকায়’ বাংলার চিট ফান্ডের সমস্যাকে বিহেভিয়রাল ইকোনমিক্সের দৃষ্টিকোণ  থেকে দেখার চেষ্টা করেছিলাম। মনে হল লেখাটি হয়ত বিহেভিয়রাল ইকোনমিক্সের প্রয়োগ সম্পর্কে সামান্য কিছু ধারণা দিতে পারে।  তাই বেশ কিছুদিন বাদে সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাতায় আবার অর্থনীতির অবতারণা, আলোচনার আশায় রইলাম। ) 

কৃষ্ণকান্ত নন্দী বা গোকুল ঘোষাল নামগুলো চেনা নাই ঠেকতে পারে কারণ এঁরা প্রায় আড়াইশ বছর আগের মানুষ – প্রথমজন গোড়াপত্তন করেছিলেন কাশিমবাজার রাজবাড়ির আর দ্বিতীয়জন ভূকৈলাশ রাজবাড়ির।  দুজনেই উদ্যমী পুরুষ এবং বিস্তর ধনসম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন কিন্তু  বাঙ্গালী হিসাবে গর্বিত হওয়ার আগে আপনাদের মনে করিয়ে দিই একাধিক ইতিহাসবিদ মনে করেন এঁদের দৌলতের অনেকটাই সৎ পথে  আসেনি, বিস্তর জমি অসাধু উপায়ে দখল করতে পারাটাই ছিল এঁদের সাফল্যের মূলমন্ত্র। আর এই জমি দখলের কাজটা আরোই সোজা হয়ে গেছিল কৃষ্ণকান্তর সঙ্গে ওয়ারেন হেস্টিংস এবং গোকুলের সঙ্গে হ্যারি ভেরেলস্টের (১৭৬৭ থেকে ১৭৬৯ অবধি ইনি ছিলেন বাংলার গভর্নর) দহরম মহরমের দরুণ – প্রশাসনের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সাহায্যে এনারা গায়ের জোর, জাল কাগজপত্র দাখিল, তহবিল তছরুপ জাতীয় পন্থার কোনোটাই বাকি রাখেননি নিজেদের জমিদারি বাড়াতে গিয়ে।
শুধু কৃষ্ণকান্ত নন্দী বা গোকুল ঘোষাল নন, দু’শ- আড়াই’শ বছর আগের একাধিক বাঙ্গালী এভাবেই গড়ে তুলেছিলেন নিজেদের জমিদারি, সব গল্প লিখতে গেলে আস্ত একখানা বই হয়ে যায়।  টাইম মেশিনে করে আঠারোশ শতকের বাংলায় ফিরে গেলে আপনার ‘Déjà vu’ হতে বাধ্য কারণ সাম্প্রতিক অতীতে এই একই প্রেক্ষাপট দেখে দেখে আপনার চোখ পচে গেছে। সুদীপ্ত সেন-ও প্রায় এক দশক ধরে সমাজের মাথা হয়ে বসেছিলেন এবং বলা বাহুল্য যে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক সঙ্গ ছাড়া চিট ফান্ডের কারবারী সুদীপ্ত রিয়াল এস্টেটের ব্যবসাতেও অসামান্য ‘সাফল্য’ দেখতে পেতেন না। ওপরমহলের দুর্নীতি সেদিন-ও ছিল, আজ-ও আছে, লঙ্কায় যাঁরাই গেছেন তাঁদের কেউই দশ মুখ এবং কুড়ি হাতে ভোগের সুবিধাটুকু ছাড়েননি। কিন্তু তারপরেও একটা চোখে পড়ার মতন তফাৎ রয়ে যায় – কৃষ্ণকান্ত বা গোকুলদের শিকার যাঁরা হয়েছিলেন তাঁদের প্রায় সবাইকেই বাধ্য করা হয়েছিল কিন্তু সারদা এবং হাজারখানা অন্য Chit Fund এর ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষ-ই স্বেচ্ছায় টাকা রেখেছেন। তাঁদেরকে প্রলোভন দেখানো হয়েছে, তাঁদেরকে ঠকানো হয়েছে সব কিছুই সত্যি কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকেই যায় যে পশ্চিমবঙ্গের মতন রাজ্যে যেখানে চিট ফান্ডে টাকা হারানোর ইতিহাস বহু বছরের সেখানে কেন মানুষ জেনেশুনে টাকা রাখেন? কী ভাবেই বা এঁরা বিশ্বাস করেন যে সারদার মতন একটি সংস্থায় সুদের হার কুড়ি থেকে তিরিশ শতাংশ হতে পারে যেখানে প্রাইভেট ব্যাঙ্কে-ও সুদের হার আট শতাংশ-ও ছাড়ায় না? প্রশ্নটা আজ বেশী প্রাসঙ্গিক কারণ দেখা যাচ্ছে ঝুলি থেকে বেড়াল ক্রমেই বেরোচ্ছে, সারদার থেকেও বড় মাপের জালিয়াতি হয়ত ঘটে গেছে আমাদের অজান্তে।

 

গ্রামাঞ্চলে এই জালিয়াতির শিকার বেশী লোকে হয়েছেন, তার অন্যতম একটা কারণ ব্যাঙ্কিং এর সুবিধা সে সব জায়গায় প্রায় নেই। শুনতে অবাক লাগলেও এ কথা সত্যি যে শুধু ‘সারদা’ নামের ওপর বিশ্বাস করে অনেক মানুষ টাকা রেখেছেন কারণ সারদা নামটি বিশ্বাসের প্রতীক, ব্যবসার নয়। এ সব কিছু ধরে নেওয়ার পরেও মনে রাখতে হবে ঠিক একই ধরণের জালিয়াতি কয়েকশ বছর ধরে পৃথিবীর সর্বত্র ঘটে আসছে। যে কোনো জালিয়াত চিট ফান্ডের শুরুর সাফল্য আসে নতুন বিনিয়োগ থেকে আসা টাকার মাধ্যমে পুরনো সুদ মিটিয়ে। ব্যাপারটা এরকম ভাবে ভাবতে পারেন – ভবিষ্যৎ-এ যে টাকা আসবে তার মোতাবেক আপনি বর্তমানের ধার শোধ করছেন এবং এ মুহূর্তে নিজের খরচখরচা মেটাচ্ছেন।  যে অবিশ্বাস্য সুদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তাতে বুঝতেই পারছেন যে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে না বাড়লে এই টাকা চিট ফান্ড পাবে না, আবার বিনিয়োগকারীর সংখ্যা যত বেড়ে চলবে  ততই বাড়বে  সুদের দায়। একটা সময় আসতে বাধ্য যখন ভবিষ্যতের বিনিয়োগ পরিমাণটি বর্তমানের সুদের পরিমাণের তুলনায় নগণ্য হয়ে দেখা দেবে, যেহেতু চিট ফান্ডটির আলাদা করে লাভের মুখ দেখার সম্ভাবনা নেই অতএব পুরো সিস্টেমটি ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য।

 

কিন্তু এই অর্থনৈতিক তত্ত্ব শুধু সুদীপ্ত সেনের পশ্চিমবঙ্গ নয়, বার্নার্ড ম্যাডফের নিউইয়র্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই এ তত্ত্ব জানার পরেও প্রশ্ন থেকে যায় আর পাঁচটা রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এত ঘন ঘন জালিয়াতির শিকার হচ্ছেন কেন? গুজরাট, পাঞ্জাব কী তামিলনাড়ুর মানুষের তুলনায় কী আমরা বেশী লোভী নাকি বেশী বোকা? বলা বাহুল্য যে কোনোটাই  নই।

 

তাই ‘কেন’র উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদের ধ্রুপদী অর্থনীতির বেড়া টপকে একটু বেরোতে হবে, শুনতে হবে নতুন প্রজন্মের অর্থনীতিবিদদের কথা যাঁরা মানুষের দৈনন্দিন আচরণের পুঙ্খনাপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে অর্থনীতির তত্ত্বে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছেন। ধ্রুপদী অর্থনীতি জানায় একজন ধনী আর একজন গরীব দু’জনেই দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্তগুলি নেবেন নিজের লাভের কথা মাথায় রেখে, সম্পদের ফারাক থাকলেও তাঁরা দুজনেই বুদ্ধিমান মানুষ আর তাই গুণগত ভাবে দুজনের সিদ্ধান্তের মধ্যে ফারাক কিছু নেই। বিহেভিয়রাল ইকোনমিস্টরা জানাচ্ছেন কথাটা ভুল – যে মানুষগুলি সর্বক্ষণ দারিদ্র্যের সঙ্গে যুঝছেন তাঁদের বিশেষত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবল প্রতিকূলতা সহ্য করতে হয়। আর সে প্রতিকূলতা কিন্তু বাইরে থেকে আসে না,  এ প্রতিকূলতা মনস্ত্বাত্তিক চাপের। তথাকথিত ‘বিমারু’ রাজ্যগুলি এবং উত্তর পূর্বাঞ্চল বাদ দিলে পশ্চিমবঙ্গের গড় আয় বাকি রাজ্যদের থেকে কম, কিন্তু  দারিদ্র্য শুধু আয়ের হিসাবে নাই আসতে পারে –  আপনার দৈনন্দিন চাহিদাগুলি মেটানোর জন্য দরকারী পরিকাঠামো না থাকলেও কিন্তু আপনি গরীব। তাই শিক্ষা কী স্বাস্থ্য জাতীয় পরিষেবার হাঁড়ির হালের কথা ভেবে যদি সারাক্ষণ আপনার কালঘাম ছোটে,  অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে আপনার চিন্তাহীনতার একটা বড় সম্ভাবনা রয়ে যাবে। দারিদ্র্য মানে শুধু অর্থ সম্পদের অভাব তো নয়, বৌদ্ধিক সম্পদের-ও অভাব আর তাই হয়ত টাকা বিনিয়োগের মতন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা বারংবার ব্যর্থ হচ্ছি। যে মুহূর্তে ‘subjective evaluation’ আপনাকে তূলনামূলক ভাবে গরীব দেখাচ্ছে, এ ব্যর্থতা আসতে বাধ্য। সংসার চালানোর মতন টাকা পকেটে থাকলেও মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত বাঙ্গালীর আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকে গেলে চিট ফান্ড নামক মহামারীর সঙ্গে লড়াই বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। একুশ শতকের কৃষ্ণকান্ত নন্দী বা গোকুল ঘোষালদের প্রশাসনিক মদত পেতে দেখলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার আরোই কোনো সম্ভাবনা নেই।

এ তো গেল মনস্তাত্ত্বিক প্রতিকূলতার কথা, যার দরুণ চিট ফান্ডগুলির বিনিয়োগকারীদের অধিকাংশই অর্থনীতিবিদদের ভাষায় ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’, অর্থাৎ তাঁরা পুরোদস্তুর বিচারক্ষম হয়ে উঠতে পারেন না। আর্থিক বা বৌদ্ধিক সম্পদের অপ্রতুলতার দরুণ আরেক সমস্যা এসে উপস্থিত হয় – অনিচ্ছাকৃত অবহেলা। ছেলের স্কুল ইউনিফর্ম কেনার কথা ভাবতে ভাবতে হয়ত মেয়ের পড়ার বই কেনার কথা মনে রইল না বা অবচেতনে সরিয়ে দিলাম দূরের আরেক তারিখে, বাড়িভাড়ার সংস্থান করতে গিয়ে ভুলে রইলাম স্ত্রীর দরকারী মেডিক্যাল টেস্টের কথা, এ জিনিস আকছারই ঘটে।  উপরন্তু এই মানুষগুলির অধিকাংশর জীবিকাই কায়িক পরিশ্রম নির্ভর, ফলত একাধিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে মনোনিবেশ করার সময় বা ইচ্ছা কোনোটাই বিশেষ থাকে না। চিট ফান্ডের অবাস্তব সুদের প্রতিশ্রুতি কিন্তু এই অবহেলার একটা সমাধান হিসাবে এসে উপস্থিত হয়, আর তাই জন্যই বহু ক্ষেত্রেই চিট ফান্ডে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে পরিবারের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যর সায় থাকে।

বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল হওয়ার দরুণ বহু মানুষ নিজের সঞ্চয়টুকু ফেলে না রেখে কোথাও একটা বিনিয়োগের জন্য উঠেপড়ে লাগেন, এই অতি উৎসাহকে অর্থনীতিবিদ জন কেইন্স ১৯৩৬ সালে ‘অ্যানিম্যাল স্পিরিট’ বলে অভিহিত করে গেছেন। পরবর্তী প্রজন্মের অর্থনীতিবিদরা দেখালেন এই অ্যানিম্যাল স্পিরিট বহুলাংশে নির্ভর করে নিজের সামাজিক গোষ্ঠীর সামগ্রিক সিদ্ধান্তের ওপর। আজকে আমার পাড়ার জনা কুড়ি প্রতিবেশীকে চিট ফান্ডে টাকা রাখতে দেখলে আমিও ভীষণ ভাবেই চাইব একই কাজ করতে; এই অ্যানিম্যাল স্পিরিটের কথা কিন্তু চিট ফান্ডের ম্যানেজাররাও জানেন। তাই অধিকাংশ সময়েই এজেন্টরা ভরসার সূচক হিসাবে দেখাতে থাকেন কতজন পড়শী নাম লিখিয়েছেন খাতায়। সমস্যা আরো ঘনীভূত হয় কারণ সমাজের যে স্তরের মানুষরা চিট ফান্ডগুলোর টার্গেট তাঁদের মধ্যে গোষ্ঠীবদ্ধ থাকার প্রবণতা অন্যদের থেকে অনেকটাই বেশী, চতুর্দিকে নেই নেই রবের মধ্যে কোথাও তো একটা ভরসা থাকা দরকার। অর্থনীতিবিদরা আরো দেখিয়েছেন যে মানুষগুলির বিচারক্ষমতা গড়ের অনেক ওপরে তাঁদের মধ্যেও কিন্তু এই অনুকরণ করার প্রবণতা বিশাল ভাবে রয়ে যায়। সঞ্চয়সংস্থাগুলির প্রতিশ্রুতিগুচ্ছ যে নেহাত অলীক এরকম সন্দেহ করেও বহু মানুষ টাকা রাখেন স্রেফ গরিষ্ঠসংখ্যক বন্ধু বা প্রতিবেশী বা আত্মীয় টাকা রাখছেন বলে।

দরিদ্রসীমার আশেপাশে যে মানুষগুলি ঘোরাফেরা করছেন তাঁদের জন্য সঞ্চয় করার সিদ্ধান্তটি সর্বদা উৎসাহব্যঞ্জক নাই হতে পারে। কোনো বিশেষ একটি দ্রব্য ভোগ করে তাঁরা এই মুহূর্তে যে উপযোগিতা পেতে পারেন তা অধিকাংশ সময়েই সঞ্চয়ের উপযোগিতার থেকে বেশী। এটাও মনে রাখা ভালো যে অধিকাংশ মানুষই ভবিষ্যৎ এর পাওনার থেকে অনেক বেশী অগ্রাধিকার দেন বর্তমানের প্রাপ্তিকে। কিন্তু তার পরেও গরীব মানুষ টাকাটা এজেন্টদের হাতে তুলে দেন কারণ তাঁরা ভাবেন টাকা না জমালে তাঁদের দারিদ্র্য ঘুচবে না বা টাকাটা হাতে থেকে গেলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এমন কিছু কিনে বসবেন যা নিতান্ত দরকারী দ্রব্যসামগ্রীর মধ্যে পড়ে না। গরীবরা জানেন অনায়াস আত্মনিয়ন্ত্রণ সহজ কাজ নয় অথচ সেটা করার তাড়না থেকেই বহু মানুষ দৈনিক রোজগারটুকু এই চিট ফান্ডগুলোতে রেখে দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হন না।

 

সমস্যার একাধিক হাঁ-মুখ কিন্তু সমাধান কোথায়? খেয়াল করলে দেখা যাবে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে মানুষের মধ্যে যে নৈরাশ্য জন্মায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটিই এই সমস্যার উৎসস্থল। তাই নতুন আইন আনলে বা সরকারি নজরদারি বাড়ালেই সমাধান আসবে না, দরকার প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ভরসা জাগানো। ক্ষেত্র যাই হোক –  প্রশাসন বা রাজনীতি, মানুষের সার্বিক ভরসা ফিরে এলে মুষ্টিমেয় দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের সাধ্য হবে না এই জালিয়াতি চালিয়ে যাওয়ার। অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জ্জী এবং এস্থার দুফলো তাঁদের বিখ্যাত বই ‘পুওর ইকোনমিকস’-এ লিখেছিলেন দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে বেরনোর জন্য প্রথমেই দরকার একটু আশার আলো, মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলাটা একটা বড় কাজ। তাই নতুন আইন আনলেই মানুষ ভরসা পাবেন এরকমটি না ভাবাই ভালো, উদ্দীপনা তখনই আসবে যখন তাঁরা দেখবেন পুরনো আইনটির ত্রুটি থাকলেও সেটি ঠিকমতন বলবত হচ্ছে।

 

প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানো নিতান্তই দরকার, কিন্তু তার বাইরে গিয়ে আর কিছু ভাবা যায় কী? হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ সেন্ডিল মুল্লাইনাথন এবং প্রিন্সটনের মনস্তত্ববিদ এলদার শফির তাঁদের বই ‘স্কেয়ারসিটি’ তে এক নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন। সেন্ডিলদের বক্তব্য প্রতিটি দেশে জাতীয় অর্থনৈতিক সম্পদ (Gross national product)  হিসেব করার সময় বার করা হোক সে দেশের জাতীয় মনস্তাত্বিক সম্পদ কত, ওনাদের পরিভাষায় ‘Gross national bandwidth’। জাতীয় মনস্তাত্বিক সম্পদের হিসাব দেশের সরকারকে জানাবে চরম প্রতিকূল অবস্থায় সে দেশের মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে কতটা দড়। মানুষের গড় বৌদ্ধিক সম্পদের পরিমাণ যদি নিতান্তই কম থাকে তাহলে দেশের সরকারকে অর্থসম্পদ বিনিয়োগ করে শিক্ষা দিতে হবে মানুষদের যাতে তাঁরা সঠিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ভারতের কথাই যদি ধরা যায়, এই মুহূর্তে আমাদের কোনো ধারণা নেই দেশের গড় বৌদ্ধিক সম্পদ কত; ফলত ধনী হোন কী গরীব, শহরাঞ্চলের বাসিন্দা হোন কী প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের, ভারতীয়রা কী ভাবে তাঁদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সে ব্যাপারে আমাদের জ্ঞান প্রায় শূন্য।

 

শুধু দেশের সরকারকে নয়, সেন্ডিলরা পরামর্শ দিচ্ছেন প্রতিটি মানুষকেই। ধরুন ওজন কমাতে আপনি হয়রান, আর তাই জন্য প্রতিবার রান্নঘরে ঢুকলেই দোনামোনা করছেন চকোলেট কুকি খাওয়াটা ঠিক হবে কিনা বা অফিস থেকে ফেরার রাস্তায় যে তেলেভাজার দোকানটা পড়ে তার সামনে রোজই দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোচ্ছেন।  সেন্ডিলরা বলছেন প্রতিদিনের এই চাপ আপনার সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে, তাই জন্য একটিবারের সিদ্ধান্তে এই চাপকে নির্মূল করে ফেলুন – দোকান থেকে চকোলেট কুকি আনাই বন্ধ করে দিন বা অফিস থেকে বাড়ি ফিরুন অন্য রাস্তা ধরে। সেন্ডিল এবং এলদারের এই পরামর্শ অনুসরণ করে বলা যায় যে মানুষগুলি চিট ফান্ডে টাকা রেখে প্রায় প্রতিদিনই গভীর আশঙ্কা নিয়ে বাঁচছেন তাঁরা শুরুতেই অন্য পদ্ধতিতে টাকাটি বিনিয়োগ বা সঞ্চয় করলে জীবন কিছুটা সুখের হতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলিকে সনাতনী ব্যাঙ্কিং না হোক অন্তত মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানগুলির আওতায় নিয়ে আসাটা একান্তই দরকার।

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক গবেষণা দেখাচ্ছে দারিদ্র্য মানে শুধু কম রোজগারই নয়, দারিদ্র্য মানে অনিয়মিত রোজগার-ও। পশ্চিমবাংলার মানুষ যে জেনেশুনেও বার বার চিট ফান্ডের ফাঁদে পা দিচ্ছেন তার একটা বড় কারণ গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষ জানেন না অদূর ভবিষ্যৎ-এ আদৌ তাঁরা রোজগার করার সুযোগ পাবেন কিনা। এই মুহূর্তে হয়ত তাঁদের জীবননির্বাহে কোনো অসুবিধা ঘটছে না কিন্তু ভবিষ্যৎ-এর অনিশ্চয়তা মানুষগুলিকে বড়সড় ঝুঁকি নিতে বাধ্য করছে। পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক অর্থনীতির ক্রমাগত অবনতি তো একটা কারণ বটেই, যতদিন না সে ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটছে চিট ফান্ডের সমস্যা থেকে যাবে। কিন্তু সামনের কয়েক বছরে রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যদি বিশেষ তারতম্য না ঘটে তাহলে করণীয় কী কিছুই নেই?

আছে, এ ক্ষেত্রে দরকার একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। সমীক্ষা করলে দেখা যাবে চিট ফান্ডে যাঁরা টাকা রাখছেন তাঁদের অধিকাংশেরই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বলতে কিছু নেই, মুষ্টিমেয় যে কয়েকজন এ ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা করেন তাঁরা আবার পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করে উঠতে পারেন না। দিনের শেষে এজেন্টদের হাতে টাকা তুলে দেওয়াটাই তাঁদের কাছে পরিকল্পনার প্রক্সি। এ কথা সত্যি যে একাধিক কারণে দরিদ্র মানুষদের পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়িত হয়ে উঠতে পারে না এবং আগের অভিজ্ঞতা থেকেই একটা গভীর হতাশা গ্রাস করে, কিন্তু তার পরেও আগাম অর্থনৈতিক পরিকল্পনার (এবং শৃঙ্খলাবোধের) গুরুত্ব কোনোমতেই কমে না। একেবারে হতদরিদ্র মানুষদের এই পরিকল্পনায় সাহায্যের জন্য অবশ্য সরকারের সহযোগিতা নিতান্তই দরকার, ‘আম আদমি বিমা যোজনা’, ‘ইন্দিরা আবাস যোজনা’ বা ‘প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা’ র মতন উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তাই চিট ফান্ডের বাড়বাড়ন্ত মানে হয় পশ্চিমবঙ্গের বেশীরভাগ মানুষ এই প্রকল্পগুলিতে যোগ দিতে পারছেন না অথবা যোগ দিলেও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার হেরফের হচ্ছে না। কেন? সে আলোচনা অন্য আরেকদিনের জন্য তোলা থাকুক কিন্তু এটুকু অন্তত বুঝতে পারা যাচ্ছে যে রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন না এলেও অনেক কিছুই করা সম্ভব, সীমিত সাধ্য দিয়েও মানুষগুলিকে বাঁচানো হয়ত খুব দুরূহ একটা কাজ নয়।

ক্রীড়নক

(টগবগ পত্রিকার ‘কল্পবিজ্ঞান সংখ্যা’-র (২০১৭) জন্য লেখা হয়েছিল ‘ক্রীড়নক’। সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠকদের জন্য ব্লগে তুলে দেওয়া হল। অলঙ্করণের ভার নিয়েছিলেন শিল্পী সুমিত রায়। আপনাদের মতামত এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য অপেক্ষা করে থাকব। )

krironok4

 

 

০১/০৭/২০১৭, সকাল ১০’টা   

প্লেন ছাড়তে নাকি আরো ঘন্টা দেড়েক দেরি।

সমস্যা হল, এই নিয়ে তৃতীয়বারের জন্য সময় বদলানো হল। যে প্লেন দু’ঘন্টা আগে উড়ে যাওয়ার কথা তাকে এখনো টারম্যাকেই দেখা যাচ্ছে না। বহু যাত্রীই অস্থিরতা প্রকাশ করছেন, দু’ঘন্টা আগে উড়ে যেতে পারেন নি বলে নয় ঠিক কখন ওড়া যাবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না বলে।

বি থার্টি-টু গেটের সামনে রীতিমতন ভিড়, আন্তঃমহাদেশীয় উড়ান বলে যাত্রী সংখ্যাও প্রচুর। প্রৌঢ় মানুষটি বেশ কিছুক্ষণ ধরেই উশখুশ করছিলেন। এবার আর থাকতে না পেরে পাশের সিটে বসা তরুণটির দিকে তাকালেন। রেস্টরুমে ঢোকাটা নিতান্তই দরকার, কিন্তু বড় ব্যাগটা নিয়ে যাওয়াও একটা সমস্যা। পাশের তরুণটিকে দেখে মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কানে ইয়ারফোন গুঁজে একমনে গান শুনছে। প্রৌঢ় অপাঙ্গে তার হাতে ধরা স্মার্টফোনটির দিকে একবার তাকালেন, সেখানে গানের নামটি ভেসে ভেসে উঠছে।

কালাকুটা শো, গায়কের নাম…

গায়কের নাম দেখার জন্য অবশ্য ভদ্রলোককে কষ্ট করতে হল না। একচল্লিশ বছর আগে এ গান যখন প্রথম বেরোয় তখন তিনি মার্কিনী বিশ্ববিদ্যালয়ে পি-এইচ-ডি শেষ করছেন। তাঁর নাইজেরিয়ান ল্যাবমেট এ গান শুনিয়েছিল। নাইজেরিয়ায় তো বটেই, আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রজমায়েতে এ গান তখন শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। তিনি অবশ্য বিরোধিতার গান নিয়ে খুব একটা ওয়াকিফহাল ছিলেন না, ‘কালাকুটা’ নামটা শুনেই একটা আগ্রহ জন্মেছিল।

কালাকুটা মানে কী তাঁর আদি শহর?

নাহ, নাইজেরিয়ান গায়ক ফেলা কুটি ‘কালাকুটা’ বলতে আদপেই কলকাতাকে বোঝাননি তবে গানটা নাড়া দিয়ে গেছিল। সেনা অত্যাচারের প্রতিবাদ যে জ্যাজ গান দিয়েও করা যায় কে জানত?

কিন্তু সেটা ছিল ১৯৭৬। ২০১৭ তে বসে এ প্রজন্মের এক তরুণ যে ফেলা কুটির গান শুনছে এই ব্যাপারটাই ভারি আশ্চর্যের ঠেকল তাঁর কাছে। তরুণটি অত্যন্ত ভদ্র। প্রৌঢ় তাঁর সমস্যাটি বলা মাত্রই সে আশ্বস্ত করল তাঁকে – ব্যাগের দিকে অবশ্যই নজর রাখবে সে, অন্য কেউ যাতে সিটের দখল না নেয় সে ব্যাপারেও খেয়াল রাখবে।

রেস্টরুমটি একটু কোণার দিকে বলেই হোক বা যাত্রীরা সবাই গেটের সামনে ভিড় জমিয়েছেন বলেই হোক, ভেতরটা মোটামুটি ফাঁকা। সারি সারি বেসিনের সামনে একটি মাত্রই ছেলে দাঁড়িয়ে। দূর থেকে দেখে ভারতীয় বলেই মনে হচ্ছিল। কাছে আসার পর নিঃসংশয় হওয়া গেল।

দেখে নয়, কথা শুনে।

ছেলেটি ফোনে কথা বলছিল।

“ঠিক শুনেছিস? হার্ট-অ্যাটাক্? কী সর্বনাশ! তাহলে তো প্লেন ছাড়তে এখনো বহু দেরি। এনিওয়ে, তুই ওখানেই বসে থাক। আমি আসছি”।

ছেলেটি তড়িঘড়ি ফোন রেখে দরজার দিকে পা বাড়িয়েছিল, এমন সময় প্রৌঢ় মানুষটি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হার্ট-অ্যাটাক্ হল কার? পাইলটের নাকি?’

ছেলেটি চমকে তাকিয়েছে।

হাসল।

“ওহ, আপনিও বাঙালি? না, পাইলটের নয়। এয়ার-হোস্টেস। উজ্জয়িনী, মানে আমার বন্ধু তো তাই জানাল”।

“ইস্, সকাল সকাল কী খারাপ খবর বলো তো”।

“আর বলবেন না, শুনেই মনটা কী খারাপ হয়ে গেল।  আমাদের আবার দুবাই থেকে কলকাতার কানেক্টিং ফ্লাইট ছিল। সেটা হয়ত আর পাওয়া যাবে না”।

ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন।

“আমারও তো সেই এক সমস্যা। সেরকম হলে অবশ্য তোমাদের সঙ্গেই গল্পগুজব করতে বসে পড়ব”।

ছেলেটি হেসে ফেলল।

“অফ কোর্স, খেয়াল হয়নি আপনিও একই ফ্লাইট ধরতে পারেন। আমি আসলে খবরটা শোনা ইস্তক এমন ঘাবড়ে গেছি…”।

“বুঝতে পারছি। তবে জানো তো আজকাল ইয়ং ছেলেমেয়েদের মধ্যেও কিন্তু হার্ট-অ্যাটাক এর প্রবণতা বাড়ছে”।

“সেটা জানি আঙ্কল। কিন্তু দু’জন একসঙ্গে…”।

ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে পড়েছেন। সবিস্ময়ে বললেন, “দু’জন মানে?”

ছেলেটি অপ্রস্তুত, “ওহ হো, আপনাকে বলা হয়নি। একজন নয়, দু’জন এয়ারহোস্টেসের  হার্ট-অ্যাটাক হয়েছে”।

ভদ্রলোক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন।

“বলো কী? তোমার বন্ধু ভুল শোনেনি তো?”

“ওকে আট বছর ধরে চিনি আঙ্কল, মনে হয় না ভুল শুনবে। ও নাকি খোদ এয়ারপোর্ট ম্যানেজারের কাছেই চলে গেছিল। আমিও অবশ্য দু’জনের একসঙ্গে হার্ট-অ্যাটাক হয়েছে শুনে খুব অবাক হয়েছি”।

“স্ট্রেঞ্জ! চলো তো, আমিও একবার উজ্জয়িনীর সঙ্গে কথা বলে আসি। ভালো কথা, আঙ্কল টা বাদ দাও, কেমন? দরকার পড়লে জেঠু বলতে পারো। বুড়ো সাজতে চাইছি না, কিন্তু বিশ্বসুদ্ধ সবাই সবার কাকু দেখে ওই ডাকটাও আজকাল আর নিতে পারি না”।

ভদ্রলোক হাত বাড়ালেন, “আর তোমার নামটা? হাতটা ধুলে তো, তাই না?”

ছেলেটি হেসে ফেলেছে।

“ধুয়েছি জেঠু, আমি আরাফ। আর আপনি…”

বাইরে থেকে একটা মর্মান্তিক চিৎকার শোনা গেল। কোনো মহিলা চিৎকার করে উঠেছেন।

এনারা দু’জনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন।

আবার চিৎকার শোনা গেল, এবার মনে হচ্ছে একটি বাচ্চা ছেলেও সঙ্গে কাঁদছে।

“ওহ গড, নো নো! নোওও…। হেল্প, এনিবডি হেয়ার? হেল্প্। এডি, এডিই……”

দু’জনেই প্রায় ছুটে বার হয়েই স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে পড়েছেন।

বি থার্টি-টু ওয়েটিং এরিয়ায় এখনো প্রচুর লোক। কিন্তু দাঁড়িয়ে আছেন সাকুল্যে জনা তিনেক মানুষ। এক মহিলা উদভ্রান্তের মতন এগিয়ে চলেছেন সামনে। সেখানে একটি বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছে। আর ঠিক গেটের সামনে আর একটি মানুষকে দেখা যাচ্ছে, তাঁর চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।

বাকিরা সবাই লুটিয়ে পড়েছেন – কেউ চেয়ারে বসেই, কেউ বা মাটিতে। মনে হচ্ছে এতজন মানুষ একসঙ্গেই যেন ঘুমিয়ে পড়েছেন। কারোর মুখে কোনো বিকার নেই, কোনো যন্ত্রণার অভিব্যক্তি নেই, চোখ বন্ধ করে যেন বিশ্রাম নিচ্ছেন প্রত্যেকে।

প্রৌঢ়ের হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে, মনে হচ্ছে হাঁটু দুমড়ে ওখানেই পড়ে যাবেন।

আরো একটা আর্তনাদ ভেসে এল।

এ গলা প্রৌঢ় চেনেন।

আরাফ। পাগলের মতন চিৎকার করছে। কাঁদছে।

বান্ধবীকে খুঁজে পেয়েছে সে,  নিজের সিটেই লুটিয়ে পড়ে আছে উজ্জয়িনীও। দেখে মনে হচ্ছে ঠেলা দিলেই উঠে বসবে।
০৪/০৭/২০১৮, সকাল ন’টা

সকালের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিল স্রোতস্বিনী। মোহনবাগান এই নিয়ে পর পর তিন বছর জাতীয় লিগে রানার্স হল। বছর দুয়েক আগে হলেও বাবা এ খবর দেখে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিতেন। স্রোত (পুরো নামে ওকে আর কেই বা ডাকে?) নিজে বার্সেলোনার সাপোর্টার, কলকাতার ফুটবল নিয়ে থোড়াই ওর মাথাব্যথা। কিন্তু বাবার রাগটা দেখার জন্যই ঠিক ব্রেকফাস্ট টেবলে খবরটা দিত। অবধারিত ভাবে চেঁচামেচি, বাবা ব্রেকফাস্ট না করেই উঠে পড়বেন, মা’র রক্তচক্ষু – সব মিলিয়ে একদম জমজমাটি ব্যাপার।

স্রোত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইদানীং ব্রেকফাস্ট ও নিজের ঘরেই করে।

খবরের কাগজের সামনের পাতায় ও কদাচিৎ চোখ বোলায়। আজকেও সামনের পাতায় থমকে দাঁড়াত না, মেক্সিকোর খবরটা না দেখলে। মেক্সিকো সিটির কোন এক হাসপাতালে নাকি দু’দিনের মধ্যে সদ্যোজাত শ’দুয়েক শিশু মারা গেছে।  হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সে খবর চেষ্টা করেও ধামাচাপা দিতে পারেননি, সারা পৃথিবী জুড়ে হইচই পড়ে গেছে।

একটা চরম হতাশায় ওর মনটা ভরে উঠল। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো শিক্ষা আর স্বাস্থ্য কতটা অবহেলিত। ২০১৮ তেও একটা সভ্য দেশে শয়ে শয়ে শিশু মারা যাচ্ছে এ কী কল্পনাতেও ভাবা সম্ভব! মেক্সিকো কেন, এ বছরে ভারতবর্ষেই কম সদ্যোজাত শিশু প্রাণ হারিয়েছে? সকালের কাগজ খুললেই দেশের শহর আর গ্রাম থেকে ভেসে আসছে একের পর এক মর্মান্তিক খবর। দেশ জুড়ে কঠোর সমালোচনা চলছে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারগুলোর কিন্তু কোনো লাভই হচ্ছে না।

কাগজটা দলামোচা করে ছুঁড়ে ফেলতে যাচ্ছিল এমন সময় ঘরের দরজায় আওয়াজ।

‘এসো’, ওই আলতো টোকা একজনই দেন। মা। বাবা টোকা দেন না, বাইরে থেকে গম্ভীর গলায় ডাকেন। আর একজন ছিল অবশ্য, সে ডাকাডাকি কী টোকা দেওয়া কোনো কিছুই ধর্তব্যের মধ্যে আনত না। স্রোতকে রাগানোর জন্যই সবসময় না বলে কয়েই ঢুকে পড়বে।

মা’র হাতে লুচি ভর্তি থালা।

স্রোত অবাক হল, ভীষণ অবাক। তারপরই ঝেঁপে এল রাগ।

ওর মুখ রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।

“কেন মা? কেন? এ জিনিস কী আর কোনোদিন মুখে উঠবে আমাদের?”

মা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন।

“তুই না খেলে খাস না। কিন্তু বাড়িতে অতিথি আসছে যখন তখন তাকে কিছু খেতে দেব না?”

অতিথি? কে?

জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রয়েছে স্রোত।

‘মীর’, মা’র চোখ টা ছলছল করছে যেন।

মীর! মীর তাদের বাড়িতে আসছে?

“তুমি আমাকে জানাওনি কেন মা?”

“কালকেই তো এসেছে। অনেক রাত্রে ফোন করেছিল। খবরটা পেয়ে তোকে দিতে এলাম কিন্তু ঘর অন্ধকার দেখে আর বিরক্ত করিনি তোকে।”

বলতে বলতেই কলিং বেলের আওয়াজ। মা শশব্যস্ত হয়ে সদর দরজার দিকে এগোলেন।

স্রোতের গলার কাছটা কিরকম দলা পাকিয়ে উঠতে থাকে। আবার বছর খানেক পর মীরকে দেখবে ও। ভাবতেই পারেনি যে মীর ওদের মনে রেখেছে।

কিন্তু সঙ্গে অভিমানও হচ্ছে। খুব অভিমান। এক বছরের মধ্যে একটা ই-মেলও পায়নি। ফেসবুকেও অ্যাকাউন্ট উধাও হয়ে গেছে, হোয়াটসঅ্যাপ-এও দেখা পায়নি আর।

বেরোবেই না আজ, দেখাই করবে না।

বেরোলই না।

কিন্তু তাতেই বা উপায় কি?

আধ ঘন্টা হয়েছে কী হয়নি, দরজায় ফের টোকা। স্রোত বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে।

পাঁচ মিনিট পর অবশ্য টোকা পড়ল না। বাবার গম্ভীর গলাটা শোনা গেল, “দরজাটা খোলো। দরকার আছে”।

বাবার গলায় কিছু একটা ছিল যার জন্য স্রোতকে উঠতেই হল।

বাবা দাঁড়িয়ে, আর বাবার পাশেই মীর। মীরের হাতে একটা ডায়েরি, সঙ্গে কিছু চিঠিপত্র।

ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল স্রোত।

মীরের চোখও ছলছল করছে, কোনোরকমে চোখের জল সামলে বলল, “ইউনিভার্সিটির লকারে এগুলো ছিল। দু’মাস আগে ডিপার্টমেন্ট চেয়ার আমাকেই দিলেন তোমাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। আর চিঠিগুলো তোমার লেখা”।

স্রোত এক দৃষ্টিতে চিঠিগুলোর দিকে তাকিয়ে। হ্যাঁ, ওরা দু’জনেই দু’জনকে চিঠি লিখত। সেই পুরনো দিনের মতন। বন্ধুবান্ধব তো বটেই এমনকি মা-বাবাও সে নিয়ে মজা করতে ছাড়েন নি কিন্তু চার বছর ধরে একটা মাসের জন্যও ব্যতিক্রম ঘটেনি। স্রোতের লেখা চিঠি পৌঁছত মাসের পনের তারিখ নাগাদ, আর তার দিন দশেকের মধ্যেই স্রোতের পাওনা চিঠি এসে পৌঁছত।

সেইসব ছেলেমানুষি, ‘হ্যালো’ না লিখে ‘হালুম’ লেখা।

নিজের দিদিকে অবশ্য কে’ই বা হ্যালো লেখে? আবার ‘প্রিয় দিদি’ শুনতেই কী বোকা বোকা লাগে না? ‘ডিয়ার’-ও বলা যাবে না, প্রতিটা ইংলিশ শব্দের জন্য দশ টাকা ফাইন!

‘স্রোত, স্রোত…”, কত দূর থেকে থেকে ডাকটা ভেসে আসছে। স্রোত একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছিল।

‘স্রোত’, এবার শব্দটা অনেক কাছ থেকে ভেসে এল।

মীর ডাকছে।

একটা সাদা খাম বাড়িয়ে ধরেছে, “উজ্জয়িনী এই চিঠিটা তোমার জন্যই লিখছিল কিন্তু শেষ করতে পারেনি। বাড়িই আসছিল বলে লকারে রেখে এসেছিল মনে হয়”।

সাদা খাম!

ওহ্, মীরই দিয়েছে বোধ হয়, চিঠিটাই তো শেষ হয়নি। উজ্জয়িনীর হাজার খানা গুণের মধ্যে একটা ছিল নিজের চিঠির খাম নিজেই বানাত।

নিজের ভাবনায় এমন তন্ময় হয়ে গেছিল স্রোত, মীর যে না বসে চলেই গেল সেটাও খেয়াল করেনি।

হঠাৎ করিডরে পায়ের আওয়াজ শুনে দেখলে মীর ফিরে আসছে। মীর, মীর মহম্মদ আরাফ, ন’বছর ধরে দিদির সবথেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল যে।

“একটা কথা বলতে এলাম স্রোত”, মীরকে সামান্য অস্থির লাগছে যেন।

স্রোতস্বিনী তাকিয়ে আছে।

প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘চিঠিটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, পড়ে ফেলো। পারলে এখনই।” বলেই ফিরে গেছে সদর দরজার দিকে।

মীরের গলায় এমন একটা আকুতি ছিল স্রোত দরজায় দাঁড়িয়েই খাম থেকে চিঠিটা বার করে ফেলল।

এবং অবাক হয়ে সাদা কাগজে তাড়াহুড়ো করে লেখা লাইন ক’খানার দিকে তাকিয়ে রইল।

এ চিঠি তো দিদির লেখা নয়।

এ চিঠি লিখেছে মীর।

নাম দেয়নি কিন্তু চিঠিখানা মীরের না হয়ে যায় না – “আজ বিকালে দেখা করা দরকার। বিকাল পাঁচটায় এশিয়াটিক সোসাইটির সামনে দাঁড়িও। উজ্জয়িনীর জন্যই তোমার আসাটা জরুরী”।

০৪/০৭/২০১৮, বিকাল সোয়া চারটে

 মেট্রোরেল বন্ধ! ট্যাক্সি ধরা ছাড়া গতি নেই। স্রোত প্রায় তীরগতিতে স্টেশন ছেড়ে বেরোচ্ছিল এমন সময়ে ইতিউতি দাঁড়িয়ে থাকা জটলা থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল, “আহা রে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েগুলো”।

শুনেই মন এমন কু ডাকল যে স্রোতকে ফিরে আসতে হল।

কে যে কথাটা বলেছেন সেটা ঠিক ঠাহর হয়নি কিন্তু জটলার সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কোনো অ্যাক্সিডেন্ট ঘটেছে কী?”।

“আর বলবেন না ম্যাডাম”, সিগারেটের ছাই মেঝেতেই ঝাড়তে ঝাড়তে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক বললেন, “দমদমের ট্রেনটায় এক দল ছেলেমেয়ে উঠেছিল। স্কুলের বাচ্চা, বুঝলেন কিনা। মেট্রোয় এমন ভিড় ছিল যে রবীন্দ্র সদনের কাছাকাছি এসে ভিড়ের চোটে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। দম বন্ধ হয়ে এসেছিল বোধহয়”।

খবরটা এতই অস্বাভাবিক যে স্রোত স্টেশনটা নোংরা করার জন্য ভদ্রলোককে বকতেও ভুলে গেল।

“অজ্ঞান হয়ে গেছে? সবাই?”

“তবে আর বলছি কি। আরো খারাপ খবর হল, কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে বেশ কয়েকজনের জ্ঞান হয়ত আর কোনোদিনই ফিরবে না। ও কি, ও কি ম্যাডাম!”।

মাথাটা মুহূর্তের জন্য ঘুরে উঠেছিল, পড়ে যাওয়ার আগেই অবশ্য স্রোত সামলে নিয়েছে। একটু বসতে পারলে ভালো হত কিন্তু পার্ক স্ট্রীটে পৌঁছতেই হবে।

গা গুলোতে শুরু করেছিল স্রোতের, ট্যাক্সিতে উঠেও শরীরটা ঠিক হল না। এ কী হাল হয়েছে তার শহরের, ভিড়ের চাপে স্কুলের বাচ্চাদের দমবন্ধ হয়ে আসছে? চতুর্দিকে যেন শুধু মৃত্যুযজ্ঞ, কেবলই ধবংসলীলা।

শেষ এক বছরে কোনো ভালো খবর শুনেছে কী স্রোত? দিদির চলে যাওয়া ইস্তক যেন পৃথিবীটাই বদলে গেছে।

০৪/০৭/২০১৮, বিকাল পাঁচটা

রাসবিহারীর মোড়ে এমন ভয়ঙ্কর জ্যামে পড়তে হল পাঁচটার সময় এক্সাইডের মোড়ে আটকে রয়েছে ট্যাক্সি। মীর পৌঁছে গেছে কিনা ভাবতে ভাবতেই স্রোতের মোবাইল বেজে উঠেছে।

“তুমি আসছ তো?” মীরের গলায় সেই আরজেন্সিটা ফের টের পেল স্রোত।

“হ্যাঁ, আসছি। মেট্রো বন্ধ বলে দেরি হয়ে গেল। শুনেছ কী ঘটেছে?”

“শুনেছি স্রোত, আর তাই জন্যেই তোমার তাড়াতাড়ি পৌঁছনোটা খুব জরুরী। তুমি এক কাজ করো, এশিয়াটিক সোসাইটির সামনে আর দাঁড়াতে হবে না। তুমি কারনানি ম্যানসন চেনো?”।

কারনানি ম্যানসন নামটাই আবছা আবছা মনে পড়ছে। কিন্তু গুগল ম্যাপ তো আছেই।

মীর বলল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কারনানি ম্যানসনের সামনে পৌঁছে ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিতে।

“কিন্তু কারনানি ম্যানসনে কেন যাচ্ছি আমরা? আমি ভেবেছিলাম দিদির ব্যাপারে তুমি আমাকে কিছু বলবে”।

“হ্যাঁ স্রোত, উজ্জয়িনীর কথাই বলব। বলব আরো অনেকের কথা। একটু ধৈর্য ধরে থাকো”।

এ কী হেঁয়ালি! একটা যেন রহস্যের ইঙ্গিত, কিন্তু সে রহস্য নিয়ে স্রোতস্বিনীর মাথাব্যথা নেই। উজ্জয়িনীর সঙ্গে কী ঘটেছিল সেটাই শুধু জানতে চায় স্রোত। ব্রিটিশ সরকারের তদন্ত এখনো চলছে, তাই সরকারী ভাবে কিছুই জানার উপায় নেই। কিন্তু হিথরো বিমানবন্দরে গত বছরের পয়লা জুলাই একশ কুড়ি জন যাত্রী কেন মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছিলেন তা নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। কতরকম গুজবই শোনা যাচ্ছে তবে টাইমস এবং আরো কয়েকটি পত্রিকা দাবি করেছে কোনো সন্ত্রাসবাদী সংস্থাই বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে এই কাজটি করেছে। সমস্যা হল পোস্টমর্টেম রিপোর্টে কিন্তু বিষাক্ত গ্যাসের ছিটেফোঁটা পাওয়া যায় নি।

তার রোল মডেল, তার সবথেকে কাছের বন্ধু, তার সমস্ত খুনসুটির শরিক, দিদিকে আর একটি দিনের জন্যও দেখতে পাবে না এই ব্যাপারটাই স্রোতের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকে। মনে হয় বছর ঘুরলেই আমেরিকা থেকে এসে হাজির হবে উজ্জয়িনী। গত চার বছর ধরে তো তাই চলছিল। গরমের ছুটিতে মাস খানেক, মাস দুয়েকের জন্য ঘুরে যেত দিদি। বছরের ওই একটা সময়েই যা দেখা পাওয়া।

কারনানি ম্যানসনের সামনে পৌঁছতেই দেখা গেল মীর দাঁড়িয়ে আছে। স্রোতস্বিনীকে নামতে দেখে হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল, “চলো চলো, পাঁচ তলায় উঠতে হব এক্ষুনি। প্রফেসর রাও অপেক্ষা করছেন”।

“প্রফেসর রায়? তিনি কে?”।

“রায় নয়, রাও। শিগগির চলো”।

০৪/০৭/২০১৮, বিকাল পাঁচটা কুড়ি

ফাইভ বি-র দরজা খুলে যিনি বেরিয়ে এলেন তাঁকে এক ঝলক দেখেই কিন্তু স্রোতস্বিনী চিনতে পেরেছে। কম্পিউটার এঞ্জিনীয়ারিং এর ছাত্রী হওয়ার দরুণ এই মুখ আদপেই অপরিচিত নয়। গোবিন্দ সুব্বারাও, ক্যালটেকের প্রথিতযশা প্রফেসর, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ করে যিনি বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন। কিন্তু তিনি কলকাতার পার্ক স্ট্রীটে কী করছেন?

সুব্বারাও বোধহয় স্রোত কী ভাবছে তা আঁচ করতে পেরেছিলেন। হাত বাড়িয়ে ঝরঝরে বাংলায় বললেন, “ভেতর এসো। আমি কিন্তু কলকাতার ছেলে, আর এই ফ্ল্যাটেই আমার জীবনের প্রথম একুশটা বছর কেটেছে”।

স্রোত অন্য সময় হলে রীতিমন ফ্যানগার্ল সুলভ আচরণ করত। এই মুহূর্তে অবশ্য শুধুই অপলকে তাকিয়ে রয়েছে মীর আর সুব্বারাও এর দিকে।

এই ঘরটি স্পষ্টতই বসার ঘর হলেও তিন দিক জোড়া বিশাল বিশাল আলমারি যাতে হাজার হাজার বই গাদাগাদি করে রাখা। ঘরের মাঝখানে দুটো সোফা যেগুলো দেখলেই মনে হয় দায়সারা ভাবে রেখে দেওয়া হয়েছে। তারই একটাতে বসতে বসতে সুব্বারাও বললেন, “বসো স্রোতস্বিনী। তোমার দিদিকেও আমি চিনতাম”।

“আপনি চিনতেন আমার দিদিকে?”, অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল স্রোত।

সুব্বারাও একটু বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়লেন, “আমার ঠিক ও ভাবে বলা উচিত হয়নি। ইয়েস, অন দ্যাট ফেটফুল ডে আই ওয়জ দেয়র কিন্তু না উজ্জয়িনীর সঙ্গে আমার আলাপ কখনোই ঘটে নি। কিন্তু গত এক বছর ধরে আরাফের থেকে আমি এত কিছু জেনেছি উজ্জয়িনীর ব্যাপারে এখন মনে হয় সে যেন আমার কত দিনের পরিচিত”।

স্রোতস্বিনী মাথা নামিয়ে বসে, যেন এক মনে মেঝেতে পাতা কার্পেট দেখে চলেছে। কিন্তু সুব্বারাও জানেন ওর মনে কী ঝড় উঠেছে এখন। স্নেহের স্বরেই বললেন, “তোমার দিদির ব্যাপারে কথা বলব বলেই তোমাকে ডেকে এনেছি আমি। ভেবো না যেন তোমার সময় অনর্থক নষ্ট হবে। ভয়ের কথা বরং এটাই যে সময় হয়ত হাতে বিশেষ নেই, তাই এত তড়িঘড়ি করে তোমাকে ডেকে আনা”।

ফের সেই রহস্যের আভাস, স্রোত খেই পাচ্ছে না। সুব্বারাও হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার দিদি কী রকম সিনেমা দেখতে পছন্দ করত স্রোতস্বিনী?”

বেমক্কা প্রশ্নে স্রোত সামান্য হকচকিয়ে গেলেও বলল, “সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দেখতে ভালোবাসত খুব। উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পুরনো সিনেমাগুলোও বারবার দেখত”।

“শুধু বাংলা সিনেমাই দেখত বলছ?”

“না, চল্লিশ-পঞ্চাশের হলিউডের থ্রিলার দেখতেও খুব ভালোবাসত”।

সুব্বারাও কী যেন ভাবছেন। ভুরূটা সামান্য কুঁচকে উঠল, “আচ্ছা, আর গান কী  শুনতো বলো তো? মান্না দে –  শ্যামল মিত্র – হেমন্ত এনাদের গান?”

সুব্বারাও এনাদের নাম জানেন ভেবে একটু অবাক হচ্ছিল, তারপর মনে পড়ল উনি কলকাতারই লোক। যা স্পষ্ট বাংলা বলছেন তাতে সুব্বারাওকে বাঙালিই বলা উচিত। স্রোত ঘাড় নেড়ে বলল, “গানের ব্যাপারে দিদির চয়েজটা খুব আনইউজুয়াল ছিল, এমনকি বাবা-মার তুলনাতেও খুব পুরনোপন্থী। ও শুনত উস্তাদ আমির খাঁ-র কিংবা কানন দেবী বা সায়গলের গান”।

সুব্বারাও মীরের দিকে তাকালেন, “হিথরো এয়ারপোর্টেও উজ্জয়িনী গান শুনছিল, তাই না?”

মীর ঘাড় নাড়ল, “হ্যাঁ, কনক দাসের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত”।

এইবারে স্রোত অস্থির হয়ে উঠেছে, থাকতে না পেরে বলেই ফেলল, “কিন্তু গানের সঙ্গে এই ট্র্যাজেডির কী সম্পর্ক?”

সুব্বারাও একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “গানের সঙ্গে সম্পর্ক নেই কিন্তু ওর পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। বলব তোমাকে সবই। কিন্তু তার আগে মীরকে একটা প্রশ্ন করার আছে”।

মীর যেন তৈরিই ছিল, প্রশ্ন আসার আগেই বলল, “আমি খোঁজ নিয়েছি। সব ক’জন বাচ্চাই সুতানুটি পরিষদের উৎসবে গেছিল, দ্বিজেন্দ্রলাল আর অতুলপ্রসাদের গানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিল ওরা”।

স্রোত বিমূঢ় হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কাদের কথা বলছেন আপনারা? যে বাচ্চাগুলো আজ মেট্রোতে জ্ঞান হারিয়েছে তাদের?”।

“হ্যাঁ স্রোতস্বিনী”, সুব্বারাও ওর দিকেই তাকিয়ে। কয়েক সেকন্ড চুপ করে থেকে বললেন, “গত বছর পয়লা জুলাই আমিও লন্ডন থেকে কলকাতাতেই আসছিলাম। তোমার দিদি বা মীর যে কনফারেন্সের জন্য লন্ডনে গেছিল আমিও সেখানেই ছিলাম। কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিন এক তরুণ জাপানী তার গবেষণার কাজ স্লাইডে দেখাতে দেখাতেই অজ্ঞান হয়ে যায়”।

স্রোত নির্নিমেষে তাকিয়ে। যেন এর পরের কথাটাও সে জানে।

“তার জ্ঞান আর ফিরে আসেনি”, বলে চলেন সুব্বারাও।

“জ্ঞান ফেরেনি অ্যান্ড্রু ম্যাকগিনেস এর-ও। হিথরো এয়ারপোর্টে সে আমার পাশের সিটেই বসে ছিল। সেদিন অবশ্য শুধু অ্যান্ড্রু নয়, জ্ঞান ফেরেনি আরো একশ উনিশ জনের যাদের মধ্যে দুর্ভাগ্যবশত ছিল তোমার দিদিও। আমার ট্র্যাজেডি কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি স্রোতস্বিনী। দু’হাজার সতেরোর অগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আমার আরো চার ছাত্রছাত্রীর জ্ঞান আর কোনদিনই ফিরে আসেনি”।

“কী বলছেন এসব?” প্রায় চিৎকার করে উঠল স্রোত, “আপনি কী বলতে চাইছেন এই সমস্ত ট্র্যাজেডি গুলোর মধ্যে কোনো কমন কানেকশন আছে? কিছু ভাবে এই মৃত্যুগুলির মধ্যে রয়ে গেছে কোনো সম্পর্ক?”

সুব্বারাও স্রোতের প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর দিলেন না। একটা হাত সামান্য তুলে তারপর বললেন, ‘হিথরোর দুর্ঘটনা আমাকে বিহ্বল করে তুলেছিল। কেন এতগুলো মানুষ মারা গেলেন তার কোনো প্রামাণ্য উত্তর না পেয়ে আমি অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। কেন আমি বা মীর তোমার দিদির জায়গায় থাকলাম না সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়াটা আমার একান্তই দরকার ছিল। লন্ডনের কনফারেন্সের যে সেশনটিতে ফুহিতো কোজিমা মারা যায় আমি সেখানেও ছিলাম, সে দুর্ঘটনার রেশও আমাকে ছাড়েনি। তারপর যখন একে একে আমার চার ছাত্রছাত্রী মারা গেল আমি অধীর হয়ে পড়েছিলাম”।

সুব্বারাও একটু অন্যমনস্ক স্বরে বললেন, “হ্যাঁ অধীর হয়ে পড়েছিলাম, তবে শোকই তার একমাত্র কারণ নয়। থেকে থেকেই মনে হচ্ছিল চারপাশের এই ধ্বংসলীলার মধ্যে কোথাও যেন একটা গোপন যোগসূত্র আছে। আর সেই যোগসূত্রটা কী সেটা ধরতে না পেরেই অস্থিরতা দিন কে দিন বাড়ছিল। অথচ এ কথা কাউকে বলার উপায় নেই। আমার বন্ধু বা সহকর্মীরা শুনলে পাগল ভাবতো, অথচ প্রত্যেকটা দিন খালি মনে হচ্ছে এক চুলের জন্য বেঁচে যাচ্ছি। যে কোনোদিন মৃত্যুর অদৃশ্য কোপ আমার ওপরেও নেমে আসতে পারে”।

“আচ্ছা স্রোতস্বিনী, তুমি কি জানো আমি কে বা আমার কাজ কী?”

স্রোতস্বিনী ঘাড় নাড়ল।

সুব্বারাও মাথা নাড়লেন, “ভাবছিলাম হয়ত চিনতে পারো, যেহেতু তোমার একই বিষয়। আমার গবেষণার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘প্যাটার্ন রেকগনিশন’ অর্থাৎ একাধিক ঘটনাবলীর মধ্য থেকে সাযুজ্য খুঁজে বার করা। যে সাযুজ্য হয়ত চট করে আমাদের চোখে ধরা পড়ে না, গিগাবাইট টেরাবাইট আয়তনের ডেটা বিশ্লেষণ করে তবে সে প্যাটার্ন ধরা পড়ে”।

“আমি গোয়েন্দা নই, ডাক্তার-ও নই কাজের মধ্যে পারি ওই ‘প্যাটার্ন রেকগনিশন’। কেন জানি মনে হল নিজের কাজটাই করে দেখি না, হয়ত মিললেও কিছু মিলতে পারে। আরো ছ’মাস ধরে সে কাজ চালিয়ে গেছি আমি। বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ছুটি নিয়ে ছুটে গেছি আমার ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে, কথা বলেছি তাদের বাবা-মার সঙ্গে। এশিয়া ইউরোপ আমেরিকা চষে বেড়িয়েছি হিথরোর সেই একশ কুড়ি জন যাত্রীর সম্পর্কে বিশদে জানার জন্য। আর সেই এক কারণে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছি মীরের সঙ্গে দেখা করতে, যাতে উজ্জয়িনীকে নিয়ে আরো কিছু জানতে পারি। কে ছিল উজ্জয়িনী? কী করতে ভালোবাসত সে? কেমন মেজাজের মানুষ ছিল সে? কতই না প্রশ্ন!”।

সুব্বারাও থামেন, একটানা কথা বলতে বলতে হাঁফিয়ে উঠেছিলেন।

স্রোতের কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমেছে, উত্তেজনায় নাকের পাটাটি সামান্য স্ফীত। “পেলেন কোনো প্যাটার্ন?”

“পেলাম স্রোতস্বিনী, সে প্যাটার্ন দেখাব বলেই তোমাকে ডেকে এনেছি। এসো আমার সঙ্গে”, উঠে পড়েছেন সুব্বারাও। উঠে দাঁড়িয়েছে মীর-ও। ভেতরের ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল স্রোত।

০৪/০৭/২০১৮, বিকাল ছ’টা

পাঁচ তলার দুটো ফ্ল্যাট জুড়ে একটা বিশাল স্টাডিরুম বানিয়েছেন সুব্বারাও। এই মুহূর্তে সে ঘরেই দাঁড়িয়ে তাঁরা তিনজন। স্টাডিরুমে রাখা টেবিলগুলোতে রাখা একাধিক সর্বাধুনিক কম্পিউটার, তার প্রায় প্রতিটিতেই কাজ চলছে। অগুন্তি সফটওয়্যারে বিশ্লেষিত হচ্ছে অসংখ্য ডেটা, লেখা হয়ে চলেছে লাখ লাখ কোড, কম্পিউটারের স্ক্রিন জুড়ে ফুটে উঠছে নানা গাণিতিক চিত্র।

সুব্বারাও একটি রিমোট কন্ট্রোলের লাল বোতামটি টিপলেন।

ঘরের একপাশের সাদা দেওয়ালটিতে  ফুটে উঠল এক জাপানী তরুণের ছবি।

“এই হল ফুহিতো কোজিমা। ফুহিতোকে নিয়ে যা যা জানতে পেরেছি তার সব কিছু এবারে দেখতে পাবে”।

সত্যিই তাই, কিয়োটোর কোন প্রাইমারি স্কুলে ফুহিতো পড়েছিল থেকে শুরু করে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ সেমেস্টারে টোপোলজিতে কী গ্রেড পেয়েছিল কোন তথ্য যে সেখানে নেই!

“ফুহিতোর হবি কী ছিল দেখতে পেয়েছ  স্রোতস্বিনী?”।

পেয়েছে বই কি, অবাক হয়ে সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে স্রোত। কম্পিউটার জানাচ্ছে কাবুকি’র নামে ফুহিতো পাগল। কাবুকি, সেই সুপ্রাচীন জাপানী নাটক।  নিজের উদ্যমেই ফুহিতো টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তোলে কাবুকি গ্রুপ। বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কাবুকির জনপ্রিয়তা বাড়াতে ফুহিতোর কাজ টোকিওর মানুষ নাকি বহুদিন মানে রাখবেন।

ফুহিতোর ছবি মুছে যেতেই ভেসে উঠেছে এক স্বর্ণকেশী আইরিশ তরুণের ছবি –  অ্যান্ড্রু ম্যাকগিনেস।  আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা বিপ্লবীদের গান যোগাড় করে শোনাটা ছিল অ্যান্ড্রু-র নেশা। আফ্রিকার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণসঙ্গীতের-ও এক অসাধারণ সংগ্রহ ছিল তার কাছে।  অ্যান্ড্রুর পরেই দেখা দিল ইলাইজা আর শ্যারন, দু’জনেই পরস্পরের বাল্যবন্ধু। পেশায় দু’জনেই বিমানসেবিকা, এবং নেশাটিও দু’জনের এক, হয়ত বাল্যবন্ধুর হওয়ার সূত্রেই । দু’জনে মিলে যোগাড় করে বেড়াত মধ্যযুগীয় সব রূপকথা, যা গ্রীম ভাইরাও খুঁজে পান নি।

ইলাইজাদের ছবিও চলে গেছে, এবারে এক এক করে পর্দায় ফুটে উঠেছে প্রায় জনা পঁয়ষট্টি মানুষের ছবি। এনাদের কী পরিচয়? পেছন থেকে সুব্বারাও এর গলা ভেসে উঠল, “ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন এনারা প্রত্যেকেই। ভিয়েতনামের একটি কনফারেন্সে যোগ দিতে চলেছিলেন সেদিন। কনফারেন্সের বিষয় ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে কি ভাবে পুনর্স্থাপিত করা যায়”।

দেওয়ালে মুখের মিছিল চলেছে, স্রোতের মনে সংশয় আরোই বাড়ছে।

“কী বুঝছ স্রোত?”

স্রোত নীরবে সুব্বারাও এর দিকে তাকিয়ে।

“তুমি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মেয়ে স্রোতস্বিনী। যা ভাবছ বলে ফেলো, কোনোরকম দ্বিধা না রেখে”।

স্রোত মাথা নাড়ল, “আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না। শুধু এটুকু বুঝেছি  এদের পেশা হোক বা নেশা, আর পাঁচটা মানুষের পেশা বা নেশার সঙ্গে চট করে মেলে না”।

সুব্বারাও এর মুখে যেন মৃদু হাসি ফুটে উঠছে, “আর কিছু?”

“আর, আর…ইতিহাস নিয়ে এদের সবার যেন একটা ফ্যাসিনেশন আছে। তাই না?”।

সুব্বারাও এবার মীরের দিকে তাকিয়ে।

মীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে বলল, “ইতিহাস নয় স্রোত, অতীত। কিছু না কিছু ভাবে এদের প্রত্যেকেই অতীত নিয়ে বড় বেশি মুগ্ধ। বর্তমান বা ভবিষ্যৎ এর তুলনায় অতীতেই ঘুরে বেড়াতে এনারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন”।

স্রোতস্বিনী ভাবছিল, মৃদু স্বরে বলল, “দিদি-ও…”।

“তা তো বটেই স্রোত। আমাদের প্রজন্মের ক’জন ছেলেমেয়েই বা কনক দাসের নাম জানে? ক’জনই বা অরিজিত সিং বা অনুপম রায়ের গান ফেলে সায়গল কী কানন দেবীর গান শোনার জন্য ছটফট করে?”

“কিন্তু সেটা তো কোনো দোষ নয়?”

“দোষ নয় স্রোতস্বিনী, প্রতিবন্ধকতা”, এগিয়ে এসেছেন সুব্বারাও।

প্রতিবন্ধকতা? অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে স্রোত। উজ্জয়িনী যদি কানন দেবীর গান শোনে তাতে সমস্যা কার?

সুব্বারাও এর মুখটি অস্বাভাবিক গম্ভীর। ধীরে ধীরে বললেন,  “তোমার দিদি এবং অন্যান্য মানুষগুলি আর কোনোদিনই আমাদের মধ্যে ফিরে আসবে না স্রোত। আমাদের জন্য এ অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু এই ট্র্যাজেডির থেকেও ভয়ঙ্কর কোনো ট্র্যাজেডি আমাদের অজান্তেই ঘটে চলেছে। সে কথা আমরা এতদিন জানতে পারিনি, হয়ত না জেনেই ভালো ছিলাম”।

কোন অসম্ভব ট্র্যাজেডির কথা বলছেন সুব্বারাও?

“মানুষের বুদ্ধির ওপর তোমার কতটা আস্থা স্রোত?”।

মানুষের বুদ্ধি? আমরাই কী সবথেকে বুদ্ধিমান প্রাণী নই এ পৃথিবীতে?

সুব্বারাও যেন স্রোতের মনের দোলাচলটা বুঝতে পারলেন।

“যতটা বুদ্ধিমান আমরা ভাবি ততটা আমরা কী সত্যিই বুদ্ধিমান? এই যে এখনো হাজার হাজার শিশু অনাহারে মারা যাচ্ছে, রাজনৈতিক হিংসায় ঘরছাড়া হচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ, সামান্যতম শিক্ষার ব্যবস্থাও করে উঠতে পারছি না অসংখ্য কিশোর কিশোরীর জন্য, তোমার মনে হয় না যে মানুষ যথেষ্ট বুদ্ধিমান হলে এই সমস্যাগুলো এখন আর থাকত না?”।

স্রোত মাথা নাড়ে, খানিকটা যেন না বুঝতে পেরেই।

সুব্বারাও এর চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ন হয়ে উঠেছে, “তুমি কী ঈশ্বরে বিশ্বাস করো স্রোতস্বিনী?”

“আমি, আমি ঠিক জানি না। কখনো মনে হয় ঈশ্বর আছেন, কখনো মনে হয় নেই”।

“বেশ। কিন্তু এক মিনিটের জন্য ধরে নাও ঈশ্বর আছেন, মানুষের এই অক্ষমতা দেখলে তাঁর কী প্রতিক্রিয়া হত বলে তোমার মনে হয়?”।

স্রোত ভাবে, তারপর যেন খানিকটা অভিযোগের সুরেই বলে ওঠে, “কিন্তু সেক্ষেত্রে তো দোষটা ঈশ্বরেরই, তাই নয় কী? তিনিই তো মানুষকে যথেষ্ট বুদ্ধি দিয়ে পাঠান নি”।

“তাহলে বলছ বুদ্ধি ব্যাপারটা আমাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ-র মতন? দুটো হাতের জায়গায় চারটে হাত থাকলে হয়ত যতটা সুবিধা হত এক কিলো চারশ গ্রামের মস্তিষ্কর জায়গায় তিন কিলোর মস্তিষ্ক থাকলেও সুবিধেটা ওই সমানুপাতিক হারেই বাড়ত? সেক্ষেত্রে অবশ্য একটা প্রতিযুক্তি থাকে, মস্তিষ্কের ওজন বাড়লেই যে বুদ্ধিও বাড়বে সে কথা বলা যায় না। কিছু কিছু তিমি মাছের মাথার ওজন প্রায় সাড়ে সাত কিলো কিন্তু এমন কোনো প্রমান পাওয়া যায় না যে তাদেরকে মানুষের থেকে বেশি বুদ্ধিমান আমরা বলতে পারি।

তোমার কথাটা উড়িয়ে দিচ্ছি না। কিন্তু ধরো, যদি অন্য কোনো পদ্ধতি ঈশ্বর রেখে দেন? সেটা যে ঠিক কী তা হয়ত মানুষ এখন জানে না, কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সেই বিকল্প খুঁজে বার করবে এমনটাই আশা। আর যখন সে পদ্ধতি তার করায়ত্ত হবে যে কোনো মানুষের বেঁচে থাকার কাজটাও অনেক সহজ হয়ে যাবে, তাই না?”।

স্রোত দ্বিধাভরে মাথা নাড়ল, “হতেই পারে। কিন্তু সেদিনটা আসবে কবে?”।

“এখানেই যে সমস্যা স্রোত। হতেই তো পারে, হয়ত পাঁচশ বছর আগেই সে দিনটা এসে পৌঁছনোর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হল না।”

কোনো একটা কম্পিউটার থেকে যেন বিপদ্ঘন্টির মতন থেকে থেকে সঙ্কেত আসতে শুরু করেছে। সুব্বারাও-এর ইশারায় মীর এগিয়ে গেল কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে।

সুব্বারাও স্রোতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হয়ত নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নেওয়ার যাদুমন্ত্রটা একটা ধাঁধার মতন দেওয়া আছে। মানুষকে নিজেই বার করে নিতে হত অভীষ্টে পৌঁছনোর রাস্তাটা। কিন্তু কোনো কারণে সে সেই রাস্তায় ঢুকতেই পারছে না, নিজের ভুলেই হয়ত বার বার পিছিয়ে পড়ছে”।

স্রোত সুব্বারাও এর দিকে তাকিয়ে আছে। ধীরে ধীরে বলল, “তত্ত্বের খাতিরে কত কিছুই তো হতে পারে প্রফেসর রাও। কিন্তু ঈশ্বর থাকলেও  আমি আইনস্টাইনের কথাটা মানি, তিনি জুয়া খেলেন না”।

সুব্বারাও এর মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল, “তোমার সঙ্গে আমিও একমত। আর তাই জন্যই আমার ধারণা ব্যর্থতাটা তাঁর নয়, ব্যর্থতাটা আমাদেরই। কিন্তু সেটাই আমাদের আলোচনার মূল বিষয় নয়। মূল বিষয়টা অন্য”।

স্রোত সামান্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। উজ্জয়িনীকে কেন আর সে ফিরে পাবে না এ কথাই জানতে এসেছিল, কিন্তু এখনো কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। সুব্বারাওকে সে কথা বলতে গিয়ে খেয়াল করল ভদ্রলোকে রগ চেপে ধরে বসে পড়েছেন একটা চেয়ারে।

“আর যদি মঙ্গলময় ঈশ্বর আদৌ না থাকেন? কোনো এক সুপারপাওয়ার আছে কিন্তু  সেই অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন সত্ত্বাটি ঠিক পথে গেলে তবেই পুরস্কৃত করেন, আর বেচাল দেখলেই কড়া শাস্তি?”।

“শাস্তি?”, স্রোত হতভম্ব, “কোন শাস্তির কথা বলছেন প্রফেসর রাও?”

মানুষটি চুপ করে আছেন।

মীর এগিয়ে এসেছে, “ভেনেজুয়েলার খবর। বিশাল মিছিল বার হয়েছিল, অন্তত শ দুয়েক মানুষ জ্ঞান হারিয়েছেন”।

স্রোতের হাত পা কাঁপছে।

ছুটে গিয়ে গোবিন্দ সুব্বারাও এর হাত ধরে চিৎকার করে উঠল, “এই শাস্তির কথাই কী বলছিলেন আপনি? চরম শাস্তি? এও কি সম্ভব? কোথায় সেই সুপারপাওয়ার? মহাকাশের কোথায় আপনি তাঁর খোঁজ পেলেন?”

মীর এবং সুব্বারাও নিঃশব্দে একে অপরের দিকে তাকিয়ে।

মীর ধীরে ধীরে বলল, “তাকে তো দেখতে পাবে না স্রোত”।

“কেন নয়?”, ডুকরে উঠেছে স্রোত, “কত? কত আলোকবর্ষ দূরে তাকে পাওয়া যাবে?”

“এ মহাবিশ্বের কোথাওই তাকে যে পাবে না স্রোতস্বিনী। কারণ এই মহাবিশ্বটাই যে ভাঁওতা, আর আমাদের সাধ্য কি সেই ভাঁওতাবাজি বুঝেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসার?” পেছন থেকে সুব্বারাও এর গলা ভেসে এল।

স্রোতের বাক্যস্ফূর্তি হল না। কোনো শব্দই তার কানে ঢুকছে না যেন। এ কি অসম্ভব কথা শোনালেন সুব্বারাও।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আবার শব্দ শুরু হল কম্পিউটার টার্মিনালে।

“আমি দেখছি প্রফেসর রাও”, মীর ফের দৌড়েছে।

সুব্বারাও এক দৃষ্টিতে স্রোতের দিকেই তাকিয়ে।

“প্রমান যে পেয়েছি আমি স্রোতস্বিনী। যে কোড চালিয়ে ইন্টারনেটকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে সেই কোডই যে বার বার খুঁজে পাচ্ছি ইলেকট্রন, প্রোটন, কোয়ার্কের সমীকরণে। আবারো সেই প্যাটার্ন রেকগনিশনের পাল্লায় পড়ে গেছি”।

স্রোতের বোবা চোখে পলক পড়ছে না।

“কোনো কিছুই যে বাস্তব নয় স্রোতস্বিনী। অথবা বলতে পারো আমাদের  বাস্তব এটাই, শুধু আমরা বাস্তব বলতে যা বুঝে এসেছি এতদিন তার সঙ্গে প্রকৃত বাস্তবের কোনো মিল নেই”।

“আপনি কি মাল্টিভার্সের কথা বলছেন? আমাদের চেতনায় রয়েছি এক বিশ্বে অথচ শারীরিক ভাবে রয়ে গেছি অন্য আরেক বিশ্বে?”

সুব্বারাও অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

“তুমি এখনও বুঝতে পারছ না স্রোতস্বিনী? কোনো বিশ্বই নেই, এক হোক বা একাধিক। রয়েছে শুধু অসম্ভব শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার আর সে কম্পিউটারে সামনে বসে থাকা কোনো প্রোগ্রামার”।

স্রোত বুঝতে পারছে।

বুঝেছে।

তাই তার গলায় অপরিসীম ভয়, “আর আমরা?”

“আমরা ত্রিমাত্রিক কম্পিউটার সিমুলেশন মাত্র। আমাদের শরীরের প্রিন্ট আউট গুলো নেহাত কাগজ আর কালির জায়গায় প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন দিয়ে বানানো”।

“প্রফেসর রাও, প্রফেসর রাও……এদিকে, এদিকে”, মিরের গলা ভেসে আসছে। অসম্ভব ব্যাকুল সে গলা।

Krironok3

০৪/০৭/২০১৮, সন্ধ্যা সাত’টা 

অজ্ঞান ঠিক হয়নি, কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত হয়ে বসেছিল স্রোতস্বিনী। সম্বিৎ ফিরল যখন দেখল ও সুব্বারাও এর বৈঠকখানায় বসে। ওকে নড়েচড়ে বসতে দেখেই ভদ্রলোক এক কাপ কফি ধরিয়ে দিলেন ওর হাতে।

ঠোঁটের কাছে কফির কাপ এনেও তাতে চুমুক দিতে পারল না স্রোত।

“এই মুহূর্তটাও মিথ্যা, তাই না? এই যে কফির কাপটা ধরে বসে আছি এটা আমার বা আপনার ইচ্ছায় ঘটছে না?”

সুব্বারাও মাথা নাড়লেন, “না স্রোতস্বিনী, তুমি কফি খাবে তোমার ইচ্ছাতেই। প্রোগ্রামিং টা এমন ভাবে করা যে এই মুহূর্তে তুমি কফি না খেয়ে আরো হাজারখানা কাজ করতে পারতে, যেটা করলে তোমার সবথেকে ভালো লাগত তুমি তাই করছ। তুমি নিজের অজান্তেই যেন একটা স্কোরকার্ডে স্কোর তুলে যাচ্ছ, সবথেকে বেশি স্কোর কি ভাবে আসবে সে নিয়েই তোমার মস্তিষ্ক অনবরত ভেবে চলেছে”।

“স্কোর?”

“তা তো বটেই। তবে একে ক্রিকেট খেলার স্কোরবোর্ড  ভেব না, এখানে তোমার প্রতিযোগী তুমি নিজেই। এ হল বেঁচে থাকার লড়াই”।

‘বেঁচে থাকার লড়াই’ শুনেই শিউরে উঠেছে স্রোত, ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ‘দিদি…”।

সুব্বারাও খানিক চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “বাগ্ স্রোতস্বিনী, প্রোগ্রামিং বাগ্। সম্ভবত উন্নত থেকে উন্নততর হয়ে ওঠার খেলায় আমাদেরকে এমন ভাবে প্রোগ্রামিং করা হয়েছে যাতে অতীত নিয়ে আমাদের নস্টালজিয়ার কোনো স্থান নেই। তুমি অতীতকে জানো, সেখান থেকে শিক্ষা নাও, নিয়ে ভবিষ্যৎ এর কথা ভেবে এগিয়ে চলো। সোভিয়েত ইউনিয়ন তো আর ফিরে আসবে না, তাই না? সোভিয়েত ইউনিয়নের বিকল্প নিয়ে মাথা ঘামালে অসুবিধা নেই কিন্তু যে মুহূর্তে তুমি আদি ও অকৃত্রিম  সোভিয়েত ইউনিয়নকেই ফিরিয়ে আনতে চাইছ সেখানে ধরতে হবে প্রোগ্রামিং এর গলদ। আর তাছাড়া…”

কি যেন ভাবছেন মানুষটি।

“কী প্রফেসর, তাছাড়া কী?”

“আমার ধারণা উজ্জয়িনীর মতন চরিত্ররা এক অর্থে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। জেনেশুনে করেনি হয়ত কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না। নিজেকে সেই অমিত ক্ষমতাশালী প্রোগ্রামারের জায়গায় বসিয়ে দেখো একবার। তোমার ক্রীড়নকরা, তোমার হাতের পুতুলরা নিজেদের মাথা খাটিয়ে ভাবছে। তুমি তাদেরকে যা শিখিয়েছ তার বাইরে গিয়ে ভাবছে। হ্যাঁ, টেকনিক্যাল ত্রুটিই হয়ত কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও কী তোমার আতঙ্ক হবে না? স্মৃতিরোমন্থন তাদের প্রগতির পক্ষে ক্ষতিকারক জেনেও তোয়াক্কা করেনি। একে কি বলবে তুমি? আত্মহত্যা?”।

বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়েন সুব্বারাও, “হ্যাঁ, আত্মহত্যা-ই, কিন্তু প্রতিবাদী আত্মহত্যা। সদর্পে ঘোষণা করা আমরা আর খেলার পুতুল নই, নই কম্পিঊটার সিমুলেশনের মামুলি চরিত্র। সে জায়গা থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটেছে। আমরা নিজে থেকে ভাবছি, নিজেরাই নিজেদের শেখাচ্ছি। হাজারখানা বিকল্প যা নিয়ন্ত্রিত সমাজ ভাবতে পারে তার বাইরে গিয়েও আরো অনেক উপায় দেখতে পাচ্ছি”।

স্রোতের চোখ ধিকিধিকি করে জ্বলতে থাকে, “তাহলে এই এতগুলো মানুষের মৃত্যু নিছক প্রতিহিংসার ফল?”

“ডিবাগিং মাত্র, বিগড়ে যাওয়া মেশিনকে যেরকম কারখানা থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। বা কম্পিউটার গেমস খেলার সময় তুমি যেরকম ভাবে তোমার দুর্বল খেলোয়াড়দের সবার আগে বিপদের মুখে এগিয়ে দাও, এও ঠিক তাই। স্ট্র্যাটেজি মাত্র”।

“স্ট্র্যাটেজি!”, শব্দটা এই মুহূর্তে কিরকম অশালীন শোনায় স্রোতের কাছে।

সুব্বারাও এর মুখে একটা করুণ হাসি ফুটে উঠে, “আমি মাঝে মাঝে কল্পনায় দেখার চেষ্টা করি সেই সুপ্রিম প্রোগ্রামার বা প্রোগ্রামারদের চোখে কিরকম ভয় ফুটে উঠছে! কিরকম তড়িঘড়ি করে তারা তাদের কোয়ান্টাম কম্পিউটারে মিলিয়ে দেখছে জেনেটিক কোডিং এ কোনো ভুলচুক করে ফেলেছে কিনা!”

কিছু একটা মনে পড়ে স্রোতস্বিনীর শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নামতে থাকে। তাড়াতাড়ি নিজের স্মার্টফোন বার করে কি যেন খুঁজতে থাকে। অবশেষে খুঁজেও পায়।

সকালেই সেই খবর, মেক্সিকোর হাসপাতালে শয়ে শয়ে সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যুর খবর।

সুব্বারাও এর হাতে নিজের ফোনটি তুলে দিলে তিনি ঘাড় নাড়েন।

“যা ভয় করছ সেটাই ঘটেছে। হ্যাঁ, জেনেটিক কোডিং এর ভুল গোড়াতেই শুধরানোর চেষ্টা। আমার ধারণা সামনের কিছু বছর হয়ত পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি অস্বাভাবিক হারে কমবে। যদিও…”

স্রোত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।

“সামনের বছরগুলো দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য নাই ঘটতে পারে”।

সুব্বারাও এর মুখ ভাবলেশহীন, কিন্তু স্রোত উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ায়।

“কেন প্রফেসর? আপনি সব জেনে ফেলেছেন বলে? সিমুলেশনের মধ্যে থেকে সিমুলেশনের সম্বন্ধে জেনে ফেলার শাস্তিও কি কন্ট্রোল – অলট – ডিলিট?”

“আমার মনে হয় না। মানুষ উন্নত থেকে উন্নততর হয়ে উন্নততমে উত্তীর্ণ হলে তাদের পক্ষে সিমুলেশনের ব্যাপারে জেনে ফেলা স্বাভাবিক। কিন্তু যতক্ষণ না তারা প্রোগ্রামারের আদেশ অমান্য করছে ততক্ষণ হয়ত তাদের খেলে যাওয়ার সুযোগ থাকবেই। আমি কিন্তু নিতান্তই ছাপোষা সিমুলেশন চরিত্র, উজ্জয়িনীর মতন অ্যাডভান্সড লার্নার নই”।

“তাহলে…?”

“আমাদের আরেকবার স্টাডিরুমে যেতে হবে। এসো”।

০৪/০৭/২০১৮, রাত্রি আট’টা বাজতে পাঁচ

মীর ঠায় কম্পিউটার টার্মিনালের সামনেই বসে ছিল। সুব্বারাও কে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল, ওর চোখে ভয়, কিন্তু তার থেকেও বেশি যেন হতাশা।

“দেখো স্রোতস্বিনী”।

দেখছে স্রোত।

একের পর এক খবর ভেসে উঠছে কম্পিউটারের স্ক্রিনে। বাসে, গাড়িতে, মেট্রোরেলে অসংখ্য মানুষের জ্ঞান হারানোর খবর মুহুর্মুহু ভেসে আসছে। একটানা বেজে যাওয়া কম্পিউটারের বিপ বিপ শব্দকে মনে হচ্ছে যেন জেলখানার পাগলাঘন্টি। সিপাইসান্ত্রী ছুটে এলেও সে ঘন্টি যেন কোনোদিন থামবে না।

কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বড় ভয় হল স্রোতস্বিনীর।

এতক্ষণে আসল বস্তুটি দেখতে পেয়েছে সে।

শেষ এক ঘন্টায় যা খবরই ফুটে উঠেছে তা সবই কলকাতা সংক্রান্ত।

অসীম আতঙ্কে স্রোত ঘুরে তাকায় সুব্বারাও এর দিকে। সুব্বারাও ওর হাতে সকালের খবরের কাগজটি ধরিয়ে দিলেন। প্রথম পাতার নিচের দিকেই একটি খবর লালকালি দিয়ে আন্ডারলাইন করা।

আজ রাত্রেই দু’টি প্রধান ধর্ম সংগঠন বিশাল সভার আয়োজন করেছে – একটির জমায়েত বাগবাজার আর অন্যটি পার্ক সার্কাসে। সনাতনী এবং সুপ্রাচীন ধর্মবোধ কেন এবং কিভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে সেই নিয়ে বক্তব্য রাখবেন একাধিক ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতারা।

স্রোতের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে।

প্রায় ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “তাহলে?”

সুব্বারাও একটা হাত স্রোতের কাঁধে রাখেন, অন্য হাত মীরের মাথায়, “আর পাঁচ মিনিট। দু’জায়গাতেই ঠিক রাত আটটায় সভা শুরু হওয়ার কথা”।

সারা ঘর জুড়ে শুধু কম্পিউটার স্ক্রিনে ফুটে ওঠা খবরের আওয়াজ।

না, আরো একটা আওয়াজ আসছে।

স্রোত প্রথমে ধরতে পারেনি, তারপর দেখলে মীর ফোঁপাচ্ছে।

না, দু’টো আওয়াজ তো নয়। একটাই আওয়াজ।

কম্পিউটারের আওয়াজ কোথায়?

“প্রফেসর…” মীরের গলা চরম আতঙ্কে প্রায় শ্বাসরুদ্ধ, ফ্যাসফ্যাস করে একটা বিশ্রী স্বর বেরোল।

প্রফেসর দেখেছেন, দেখেছে স্রোত-ও।

কম্পিউটার টার্মিনাল আর কাজ করছে না, এই মুহূর্তে সব কটা স্ক্রিন জুড়েই শুধু কৃষ্ণ-শূন্যতা।

স্রোতের ঘড়ির রেডিয়াম ডায়ালে মিনিটের কাঁটাটা এই সদ্য বারোর ঘর ছুঁল।

 

আবার ব্যোমকেশ – গরলতমসা

Pinup_001_01B_06

ফেলুদা এসে পড়লে ব্যোমকেশের পৌঁছতে আর কত দেরি-ই বা হতে পারে? ‘রাজধানীতে তুলকালাম’ লেখার মাস তিনেকের মধ্যে লেখা হয় ‘গরলতমসা’।  আশা করি সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠকদের এ প্যাস্টিশটিও নিরাশ করবে না। সঙ্গে রইল অভীক কুমার মৈত্রের  করা কিছু অসাধারণ অলঙ্করণ। ব্যোমকেশের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন, চেনা কাউকে খুঁজে  পাচ্ছেন কি? 

ByomkeshHiRes002_Birenbabu

জাপানী বোমার ভয়ে গোটা কলিকাতা মনুষ্যশূন্য বলিয়া বোধ হইতেছে, অবশ্য পৌষের শীতটিও মন্দ পড়েনি এবার। কারণ যাহাই হউক না কেন, সদাচঞ্চল হ্যারিসন রোডে গাড়িঘোড়ার আওয়াজ কদাচিৎ পাওয়া যাইতেছে। শহরের আওয়াজ বিনা,  প্রভাতী চা এবং জলখাবারের সময়টিকে এই শেষ কিছুদিন  যাবৎ অপরিচিত ঠেকিতেছে।

ব্যোমকেশ এ নিয়ে আদৌ মাথা ভার করিতেছে কিনা তা বোঝা দায়। অন্য যে কোনো দিনের মতনই আজও সে খবরের কাগজখানার প্রথম প্রান্ত থেকে শেষ প্রান্তে, এবং পুনরায় শেষ থেকে প্রথমে যাতায়াত করিতেছে। বলিলাম, ‘হিরোহিতোর ভয়ে তোমার মক্কেলরা এখন কতদিন অজ্ঞাতবাসে থাকেন দেখো।’

সমস্ত বিজ্ঞাপনেই বোধ হয় চোখ বোলানো শেষ হইয়াছিল, ব্যোমকেশ কাগজটি গুছাইয়া রাখিতে রাখিতে বলিল, ‘কিছু কিছু নয় বাবা, কিছু কিছু নয়।’

আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম, ‘সে আবার কি?’

‘আশ্চর্য, এ লেখা আগে পড়োনি নাকি?

 

দুনিয়ার মাঝে বাবা কিছু কিছু নয়, কিছু কিছু নয়।

নয়ন মুদিলে সব অন্ধকারময়, বাবা অন্ধকারময়।।

ধন বল জল বল, সহায় সম্পদ বল,

পদ্মদলগত জল, চিহ্ন নাহি রয়।’

 

এ লেখা সত্যই পড়িনি, কার লেখা সে কথা জিজ্ঞাসা করিতে ব্যোমকেশ মুচকি মুচকি হাসিতে লাগিল। আমি তাগাদা দিতে যাইতেছিলাম, এমন সময়ে সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। আমাকে উদগ্রীব হইতে দেখিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ‘চিন্তা নেই। অত ভারী পায়ের আওয়াজ মক্কেলের নয়, পুলিশেরই হয়।’

ডিডাকশনটি সঠিক, মিনিটখানেকের মধ্যে আমাদের পূর্বপরিচিত বীরেনবাবু ঘরে প্রবেশ করিলেন। ভদ্রলোক হাস্যমুখর এমন অপবাদ কেউ দিবে বলিয়া বোধ হয় না, কিন্তু আজকে তাঁহার ভ্রূযুগল যে পরিমাণ কুঞ্চিত হইয়া আছে তাহাতে স্বাভাবিক আদর আপ্যায়ন করাও উচিত বোধ হইল না। চেয়ারে বসিতে বসিতে বললেন, ‘কমিশনার সাহেব আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন, সে খবর দিতেই আসা।’

ব্যোমকেশ একটা সিগারেট ঠোঁটে ধরাইয়া বীরেনবাবুর দিকে প্যাকেটটি আগাইয়া দিল। তিনি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করিতে করিতে বলিলেম, ‘আমি সাহেবকে বলেছিলাম ব্যোমকেশবাবুর কাছে এখনই যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু সে কথা তিনি শুনলে তো! তারপর আজ সকালে যা ঘটেছে…’। বলিতে বলিতে বীরেনবাবুর খেয়াল হইল তাঁর শ্রোতৃবৃন্দ ভূমিকাটুকু সম্বন্ধেও অবহিত নন। আমাদের দিকে তাকাইয়া বলিলেন, ‘এ ঘটনা আপনাদের জানার কথা নয়, কারণ শুরুতে খবরওয়ালারাও টের পায়নি। আর যখন তারা টের পেয়েছে, তখন পুলিশ নিজে তাদের অনুরোধ করেছে খবর না ছাপাতে। যদিও তারা বোধহয় সে অনুরোধ আর রাখবে না।’

ব্যোমকেশ ঠোঁট থেকে সিগারেটটা সরাইয়া বলিয়া উঠিল, ‘বলেন কি? পুলিশকে হাতজোড় করতে হচ্ছে খবরের কাগজের কাছে? অবস্থা তাহলে নিতান্তই বেগতিক।’

হাতজোড় করিবার প্রসঙ্গটি সম্ভবত বীরেনবাবুর মনঃপূত হইল না। একটি অব্যক্ত শব্দ করিয়া বলিয়া উঠিলেন, ‘কারণ আছে। পুরো ঘটনা না শুনলে বুঝতে পারবেন না।’

‘তিন সপ্তাহ আগে রামবাগান অঞ্চলে গলির গলি তস্য গলির মধ্যে একটি মৃতদেহ পাওয়া যায়। অন্য সময়ে মৃতদেহটি নিয়ে আদপেই কোনো হট্টগোল হওয়ার কথা ছিল না। পেশাগত কারণে ও অঞ্চলটিতে মাঝেসাঝেই এ ধরণের অপরাধ ঘটে থাকে।’

ব্যোমকেশ বীরেনবাবুকে বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল, ‘অর্থাৎ খুন যিনি হয়েছেন তাঁর পেশাটি ছিল আদিমতম?’

বীরেনবাবু মাথা নাড়িলেন।

‘ঠিকই বুঝেছেন, রামবাগান বলে কথা। তা যা বলছিলাম, এবারে কিন্তু এই খুন নিয়ে কিছু হইচই হল, যদিও শেষ রাতের ওই লাশ পুলিশ আসার আগে জনা দুয়েক মানুষই দেখেছিল। কিন্তু অপরাধের নৃশংসতা তাদের এতই বিহ্বল করে তুলল যে চেনাশোনাদের ঘটনাটার ব্যাপারে না বলে পারল না।’ কিয়ৎকাল নীরব থাকিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ‘নৃশংসতার ধরণটা জানা যায়?’

‘সে কথাতেই আসছিলাম। পুলিশের কাজ তো আর আজকে শুরু করিনি, কিন্তু এ ধাঁচের হত্যাকান্ড আমার চাকুরীজীবনে দেখিওনি, শুনিওনি। হতভাগিনীর গলা কেটে খুন করা হয়েছে, কিন্তু সেটি নৃশংসতার শুরু মাত্র।

খুন করার পর মহিলার শরীরটিকে হত্যাকারী উন্মুক্ত করে ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গুলি বার করে নিয়েছে।’

হত্যাকান্ডের বিবরণ শুনিয়া শিহরিয়া উঠিলাম। ব্যোমকেশ মুখে বিশেষ রেখাপাত হইল না, দেখিলাম সে নিমগ্ন চিত্তে বীরেনবাবুর কথাই শুনিতেছে।

‘সেই হত্যাকান্ডের তদন্ত চলিতে চলিতেই  গত সপ্তাহে আরেকটি খুন হয়। একই মহল্লা, এবারেও শিকার আরেক দেহোপজীবিনী। এবং……’

‘এনারও শরীরটিকে তছনছ করে গেছে?’

বীরেনবাবু মাথা নাড়িয়া সম্মতি জানাইলেন।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘কিন্তু আজ সকালে বোধহয় দ্বিতীয় খুনের রহস্যোদঘাটনের জন্য সে চত্বরে যান নি?’

বীরেনবাবু একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন, ‘ঠিকই ধরেছেন, আজ সকালেই তৃতীয় একটি লাশ পাওয়া গেছে। অবিকল একই পদ্ধতি। রামবাগানে এখন বিকালের পর থেকে আর লোকজন বেরোচ্ছে না। এদিকে কাগজওলারা আর এ খবর চেপে রাখবে না বলেই আমার ধারণা, হয়ত কাল সকালেই দেখতে পাবেন।’

ব্যোমকেশ অন্যমনে বলিল, ‘জাপানী বোমার ভয়ে রাস্তাঘাট এমনিই ফাঁকা, খুনী তারই ফায়দা তুলছে। তার ওপর এয়ার রেড এর আশঙ্কায় রাস্তায় সামান্য আলোটুকুও থাকছে না।’

‘খুবই সম্ভব। যাই হোক, আমাকে এখনই লালবাজারে ফিরতে হবে। আজকালের মধ্যে একবার কর্তার সঙ্গে দেখা করে আসবেন। বুঝতেই পারছেন, আর্জেন্ট তলব পাঠিয়েছেন।’

 

 

বীরেনবাবু বিদায় নেওয়ার পর ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কি মনে হচ্ছে ব্যোমকেশ? এমনতর নৃশংসতা যে কল্পনা করাও মুশকিল।’

ব্যোমকেশ আরাম-কেদারায় হেলান দিয়া বলিল, ‘মনুষ্যচরিত্র অজিত, আমাদের সীমিত কল্পনাশক্তি দিয়ে তার তল খুঁজে পাবে এ আশা করোই বা কেন? হাজারখানা মোডাস অপারেন্ডি থাকতে পারে। ষড়রিপুর যে কোনোটিই প্রবলতর হয়ে উঠতে পারে।’

‘বলো কি! কাম – ক্রোধ – মোহ নয় তাও বোঝা গেল। কিন্তু বাকিগুলো?’

‘সেও ভাবলে ঠিকই পেয়ে যাবে। হতেই তো পারে অপরাধী তার এই আপাতব্যাখ্যাহীন নৃশংসতার মধ্য দিয়েই একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে, হেঁয়ালির ছন্দটা কেউ মেলাতে পারে কিনা সেটাই দেখতে চায়। এও তো এক ধরণের মদমত্ততাই। এবার যদি মাৎসর্যের কথা ধরো…’

ব্যোমকেশ আরো কিছু বলিতে যাচ্ছিল, এমন সময়ে পুঁটিরাম ঘরে প্রবেশ করিল, ‘বাবু, তার।’

টেলিগ্রামটি পড়িতে পড়িতে ব্যোমকেশের চোখে যেন একপলকের জন্য ঝিলিক খেলিয়া গেল। পড়া হইয়া যাওয়ার পর টেলিগ্রামটি সামনের জলচৌকিতে রাখিয়া বলিল, ‘নাও, এক দিনে দু দুখানা রহস্য। এই না হা মক্কেল, যো মক্কেল করে কাঁদছিলে?’

টেলিগ্রামটি তুলিয়া দেখি জনৈক সুবিমল সান্যাল ব্যোমকেশের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করিয়াছেন। জানাইয়াছেন আজ শেষ অপরাহ্ণে দেখা করিতে চান।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘ভাবছি এখনই একবার কমিশনার সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আসি। যদি তদন্তের ভার নিতেই হয়, তাহলে বীরেনবাবুর থেকে সহযোগিতা যে নিতান্তই কাম্য সেটা সাহেবকে একবার মনে করানো দরকার।’

বলিলাম, ‘রামবাগানেও যাবে নাকি?’

ব্যোমকেশ বিমনা স্বরে বলিল, ‘হয়ত, হয়ত নয়। লালবাজার থেকে কি খবরাখবর পাওয়া যায় তার ওপর নির্ভর করছে সব কিছু।’

আমি আর বাক্যব্যয় না করিয়া লেখার খাতাটি টানিয়া লইলাম। অবস্থাগতিক যা দেখিতেছি, মাসাধিককাল হয়ত রাত্রে লেখালেখি করাই যাইবে না।

ব্যোমকেশের ফিরিতে ফিরিতে দুপুর গড়াইয়া বিকাল হইয়া গেল। জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কি বুঝলে? কূলকিনারা সম্ভব?’

ব্যোমকেশ গায়ের শালটি আলনায় রাখিতে রাখিতে বলিল, ‘লালবাজারের কারোরই মনে হয় না কূলে ওঠার বিশেষ ইচ্ছা আছে। গতিক যা দেখছি, হত্যাকান্ডের প্রকৃতিটি এত নৃশংস না হলে পুলিশ ভুলেও মাথা ঘামাত না।’

আমাকে বিস্মিত হতে দেখিয়া ব্যোমকেশ ততোধিক বিস্মিত হইল, ‘যুদ্ধের বাজার, তায় খুন হয়েছে রামবাগানের বারবধূ । তোমার আক্কেলকেও বলিহারি।’

হতাশ হইয়া বলিলাম, ‘তাহলে সারা সকালের খাটুনি নেহাতই পণ্ডশ্রম?’

ব্যোমকেশ একটা হাই তুলিয়া বলিল, ‘তা বলতে পারো। লালবাজার যা যা পণ্ড করে বসে আছেন, তাকে ঢেলে সাজাতে যথেষ্টই শ্রম দিতে হয়েছে আজকে। ভাবতে পারো তিনজনের একজনেরও নামধাম জানে না পুলিস?মানে রামবাগানের কোন কোঠায় তারা থাকত সেটুকু জানে, কিন্তু কবে তারা সেখানে এসেছে, কোথা থেকে এসেছে সে সব নিয়ে বিন্দুবিসর্গ ধারণা নেই কারোর।

মর্গে গিয়ে দেখি বীরেনবাবুর পর্যবেক্ষণও পুরোপুরি ঠিক নয়। ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোই যে শুধু বার করেছে তা নয়, বীভৎসতার চিহ্ন রয়ে গেছে চামড়ার ওপরেও। যেমন ধরো তৃতীয় ভিকটিমের অনামিকাটিও পাওয়া যাচ্ছে না, মৃতদেহ দেখে বুঝলাম সেটিও কেটেই নিয়ে গেছে।’

বিবমিষা বোধ হইল, বলিলাম, ‘কলকাতায় এই ঘোরতর উন্মাদটি কোথা থেকে এল ব্যোমকেশ? এরকম নরাধমও মানুষ হয়?’

ব্যোমকেশ কিছু বলিল না, শুধু দেখিলাম তার ললাটরেখায় কুঞ্চনের আভাস। এ সময়ে দরজার কড়া নড়িয়া উঠিল। মিনিট দুয়েক পরে পুঁটিরামের পিছন পিছন দোহারা গড়নের এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকিলেন, পরনে ধুতি পাঞ্জাবি, হাতে একটি পোর্টম্যান্টো। প্রথম দর্শনে ছাপোষা বাঙালিই বোধ হয়, যদিও পাঞ্জাবিতে লাগানো একাধিক সোনার বোতাম সাক্ষ্য দিতেছে যে এনার বিত্তটি নেহাত মধ্যমানের নয়। গৌরবর্ণ, বয়স মনে হয় ষাটের কম হইবে না।

পরিচয়পর্বের পর সুবিমল সান্যাল বলিলেন, ‘আশা করি আমার তার পেয়েছিলেন। ব্যোমকেশবাবুর অনুমতি ব্যতিরেকেই চলে এসেছি বলে ক্ষমা করবেন। কিন্তু এমন বিপদে পড়েছি যে অনুমতির জন্য অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। আপনার খবর আমাকে দিয়েছেন আপনার বন্ধু, প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত।’

ব্যোমকেশ একটা চেয়ার আগাইয়া দিয়া বলিল, ‘বসুন। একটু জিরিয়ে নিন, তারপর আপনার বিপদের কথা বিশদে শোনা যাবে।’

‘জিরোনোর সময় যদি থাকত ব্যোমকেশবাবু! প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছে অমিয়কে বুঝি আর দেখতে পাব না। মনকে প্রবোধ দেওয়ার শক্তিটুকুও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে।’

‘অমিয় কে হয় আপনার?’

‘অমিয় আমার ছেলে ব্যোমকেশ বাবু, এক মাত্র ছেলে। আজ এক সপ্তাহ হল সে নিরুদ্দেশ। নিরুদ্দেশ বলছি বটে, আসলে তাকে কেউ বা কারা অপহরণ করেছে।’

ব্যোমকেশ ধীরে ধীরে বলিল, ‘অপহরণ করেছে বুঝলেন কি করে? আপনি কি অনুমান করছেন?’

‘অনুমান নয় ব্যোমকেশ বাবু, এই দেখুন।’ সুবিমল বাবু পোর্টম্যান্টো হইতে একটি লেফাফা বার করিয়া ব্যোমকেশকে দিলেন।

ব্যোমকেশ লেফাফার ভেতরের কাগজটি আলোর সম্মুখে ধরায় অদ্ভুত ধাঁচের ট্যারাবেঁকা কিছু অক্ষরে কতকগুলি শব্দ ফুটিয়া উঠিল – ‘তিন দিনের মধ্যে তিরিশ হাজার টাকার বন্দোবস্ত করার জন্য প্রস্তুত হও, নইলে ইহজীবনে ছেলের মুখ আর দেখবে না।’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘এতে তো কোনো ঠিকানা নেই দেখছি। টাকা কি আদৌ পাঠিয়েছিলেন?’

‘অবশ্যই। ওরা আরেকটি চিঠিতে জানিয়েছিল লোহাপট্টির ভেতরের এক গলিতে টাকাটা নিয়ে সন্ধ্যা সাতটার সময় অপেক্ষা করতে হবে। আমার বিশ্বস্ত কাজের লোক মন্মথই নিয়ে গেছিল সে টাকা।’

ব্যোমকেশ শান্ত চক্ষে সুবিমলবাবু কে নিরীক্ষণ করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিল, ‘আপনার কি কোনো জ্ঞাত শত্রু আছে?’

সুবিমল সান্যাল কয়েক মিনিটের জন্য নীরব থাকিয়া বলিলেন, ‘ব্যোমকেশ বাবু – আমি ব্যবসায়ী, ঈশ্বরের দয়ায় আজ বেশ কিছু বছর ধরেই সে ব্যবসা ভালো চলছে। তাতে কার কার চোখ টাটিয়েছে সে কথা তো বলতে পারি না, তবে আমার জানা এমন কোনো লোক নেই যে এরকম ঘৃণ্য কাজ করতে পারে।’

‘কিসের ব্যবসা আপনার?’

‘কাঠের। আমি কিন্তু গরীব ঘরের ছেলে, অনেক কষ্ট করে এ জায়গায় পৌঁছেছি। আমার ভাগ্য খোলে বার্মায় কাঠের ঠিকাদারি করতে গিয়ে।’

‘বার্মা?’, ব্যোমকেশ চকিত স্বরে জিজ্ঞাসা করিল, ‘সে দেশে কত বছর ছিলেন?’

‘তা বছর দশেক তো হবেই। সে দেশ আমাকে দিয়েছে অনেক কিছুই আবার ছিনিয়েও নিয়েছে বই কি। আমার স্ত্রীকে রেঙ্গুনেই দাহ করে এসেছি। সে ছিল আমার ভাগ্যলক্ষ্মী, তার মৃত্যুর পরেই ঠিক করলাম আর নয়, এবার কলকাতায় ফিরতে হবে।’ বলিতে বলিতে সুবিমল সান্যালের গলাটি ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল।

ঘরের পরিবেশটি ভারী হইয়া উঠিয়াছিল, ব্যোমকেশই নীরবতা ভঙ্গ করিয়া বলিল, ‘কি হয়েছিল আপনার স্ত্রীর?’

‘প্লেগ ব্যোমকেশবাবু, সে মহামারীতে তখন রেঙ্গুন সহ সারা বার্মাতেই কাতারে কাতারে লোক মারা যাচ্ছিল। সর্বনাশী আমার পরিবারকেও ছাড়ল না। অমিয় তখন কলকাতায় কলেজে পড়ছে, প্লেগের জন্যই তাকে রেঙ্গুনে আসতে বারণ করে দিয়েছিলাম। মাকে শেষবারের জন্য দেখতেও পায়নি সে।’

অমিয়র প্রসঙ্গ উঠিতেই সুবিমলের চৈতন্য ফিরিল। ব্যোমকেশের হাত দুটি ধরিয়া বলিলেন, ‘টাকা দেওয়ার পর আরও চার দিন কেটে গেছে ব্যোমকেশ বাবু, অমিয়র এখনো কোনো খোঁজ নেই। তার মধ্যে আজ আবার চিঠি এসেছে, এবারে দাবী আরো তিরিশ হাজার টাকার। তিন দিনের মধ্যে জোগাড় করে দিতে হবে।’

ব্যোমকেশ ঈষৎ অবাক হইল, ‘বলেন কি, এক সপ্তাহের মধ্যে আবার তিরিশ হাজার টাকার দাবী? পুলিসে খবর বোধহয় দিয়ে উঠতে পারেন নি?’

সুবিমল সান্যাল মাথা নাড়িলেন, ‘বুঝতেই তো পারছেন। মা মরা একমাত্র ছেলে, তার সামান্যতম ক্ষতিটুকুও যাতে না হয় সে কথা আমাকে অনবরত ভাবতে হচ্ছে। পুলিসে খবর দিলে যদি হিতে বিপরীত হয়। সে জন্যই তো আপনার কাছে ছুটে আসা।’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘অমিয়র বন্ধু কেউ আছে? তার নিরুদ্দেশ হওয়ার কথা আরে কেউ জানে?’

সুবিমল বাবু একটু চিন্তা করিয়া বলিলেন, ‘আমি আর মন্মথ ছাড়া নিরুদ্দেশ হওয়ার খবর আর কেউ জানে না বলেই ধারণা। অমিয় ইদানীং আমার অফিসে বসত, ব্যবসার কাজের দেখাশোনা করত। সেরকম ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু আছে বলে তো জানি না, তবে সন্ধ্যার দিকে মাঝেমাঝে চৌরঙ্গী এলাকার একটি ক্লাবে যেত।’

‘অমিয়র কত বয়স এখন?’

‘পঁচিশ। আপনার জন্য ওর একটি ছবিও এনেছি, এই যে।’

ছবিটি এক ঝলক দেখে বোধ হইল অমিয়র মুখমন্ডলটিতে সামান্য বিষণ্ণতার ইঙ্গিত, উজ্জ্বল এক তরুন কিন্তু তার অন্তরে কোথাও যেন একটি চাপা বেদনা রহিয়া গিয়াছে। ব্যোমকেশ ছবিটি পকেটস্থ করিতে করিতে বলিল, ‘আপনার বাড়ি একবার যাওয়া দরকার সুবিমল বাবু। কাল সকালে একবার ঘুরে আসা যেতে পারে? আর হ্যাঁ, ঐ চিঠিটাও দিয়ে যান।’

‘অতি অবশ্য’, ভদ্রলোক হাঁফ ছাড়িয়া বলিলেন, ‘আমি পারলে এখনই আপনাদের নিয়ে যেতাম। কিন্তু একটু পরেই রাস্তাঘাটের আলো নিভে যাবে, গিয়ে কোনো সুবিধাও হবে না।অমিয়কে খুঁজে পাওয়ার দায়িত্বটি আপনাকে দিতে পেরে কি যে নিশ্চিন্ত বোধ করছি কি বলব।’

সুবিমল সান্যাল প্রস্থান করিলে ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘যুদ্ধের বাজারে শহর তো অপরাধের আখড়া হয়ে উঠল দেখছি।’

সারা দিনের শ্রান্তি ব্যোমকেশকে গ্রাস করিয়াছিল, চোখ বুজিয়া বলিল, ‘তাতে যে আমাদের খুব কিছু সুবিধে হল এমন কথা মোটেও ভেবো না।’

বলিলাম, ‘তার অর্থ?’

‘অর্থ এই যে সব অপরাধেরই সুরাহা হতে হবে এমন দিব্যি কেউ দেয়নি।’

পরের দিন সাতসকালে বাঁটুল সর্দার আসিয়া উপস্থিত। তাহাকে দেখিয়া প্রসন্ন বোধ না করিলেও বুঝিলাম ব্যোমকেশের কার্যসূত্রেই তাহার আগমন। বাঁটুলের গুন্ডামি আমাদের পাড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকিলেও উত্তর ও মধ্য কলিকাতার অপরাধ জগতের ঠিকুজী কুলুজী তার নখদর্পণে। ব্যোমকেশ তাহাকে যথারীতি সিগারেট ও চা সহকারে আপ্যায়ন করিল। সিগারেটের ঘ্রাণে দেখিলাম বাঁটুলের ধূর্ত মুখটিতে বিশেষ সন্তোষের উদয় হইল, পরে চায়ের পেয়ালাটি তুলিয়া লইয়া ব্যোমকেশকে বলিল, ‘আপনার কথামতন কালকে ও চত্বরে গেছিলাম কর্তা।’

ByomkeshHiRes003_Bantul

ব্যোমকেশ বাঁটুলের চোখে চোখ রাখিয়া বলিল, ‘কি খবর পেলে?’

‘খবর পাওয়া কি সোজা কথা, সবাই মুখে কুলুপটি আটকে বসে আছে। তার ওপর রামবাগানের দিকে বহুকাল যাওয়া হয়নি, এবারে গিয়ে দেখি কত যে নতুন মুখ। প্রতি দিন ভিড় বাড়ছে। গ্যাঁটের কড়ি কিছু ফেলতে হল, খবরও মিলেছে কিছু।

প্রথম জনের নাম কুন্তী, রামবাগানে এসেছিল বছর পাঁচেক আগে – মাঝ তিরিশেক বয়স। দ্বিতীয় জনের নাম রমলা, সে রামবাগানেরই মেয়ে। তার মা-ও ওখানেই থাকত, যদিও সে গত হয়েছে প্রায় বছরখানেক হল। রমলার বয়স তুলনায় কম, বছর কুড়িও নয়। আর তৃতীয় শ্যামা, বছর দুই-ও হয়নি ও চত্বরে, চল্লিশের ওপরে বয়স।’

ব্যোমকেশ একটু ভাবিয়া বলিল, ‘কুন্তী আর শ্যামা এর আগে কোথায় থাকত সে নিয়ে কিছু খবর পেলে?’

বাঁটুল সিগারেটে একটি সুখটান দিয়া বলিল, ‘কুন্তীর ব্যাপারে কোনো খবর পাওয়া যায়নি, শ্যামা এসেছিল সিলেট থেকে।’

‘আর কিছু?’

বাঁটুলের বর্তুলাকার চক্ষুদ্বয় কুঞ্চিত হইল, ব্যোমকেশের দিকে ঝুঁকিয়া বলিল, ‘ওই টাকায় আর কত খবর হয় কর্তা? মাগ্যিগন্ডার বাজার, বোঝেনই তো।’

ব্যোমকেশ সম্ভবত একথা শুনিবার জন্য প্রস্তুতই ছিল, শান্ত স্বরে বলিল, ‘টাকা পাবে। কিন্তু শর্ত আছে।’

বাঁটুল থমকাইয়া বলিল, ‘শর্তও আছে? আমি তো ভাবছিলাম আপনারই আমাকে দরকার।’

‘দরকার তো বটেই, তাই জন্যই আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে একবার ও তল্লাটে যেতে চাই।’

বাঁটুলের মুখে একটি বিচিত্র হাসি ফুটিয়া উঠিল। সামান্য ব্যঙ্গের স্বরেই বলিল, ‘আপনারা ভদ্রলোক, ও তল্লাটে গেলে কি ভালো দেখায়?’

দেখিলাম ব্যোমকেশের মুখের একটি মাংসপেশিও নড়িল না, সামান্য কঠিন স্বরে বলিল, ‘বদনাম রটলে তোমাকে সালিশির জন্য ডাকব না বাঁটুল। আজকে সন্ধ্যাবেলাই যাওয়া চাই।’

ব্যোমকেশের দৃঢ় কন্ঠস্বরে বাঁটুল অপ্রস্তুত হইয়াছিল, সন্ধ্যাবেলায় হাজিরা দিবে স্বীকার করিয়া বিদায় লইল। আমি মুখ খুলিবার আগেই ব্যোমকেশ হাসিয়া উঠিল, ‘তোমার মুখের চেহারাটা দেখার মতন হয়েছিল অজিত। বাঁটুল যে তোমার ঠিক প্রীতির পাত্র নয় তা জানি বটে তবে আজ তোমার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল পারলে দু’ঘা কষিয়ে দাও।’

‘ট্যারাব্যাঁকা কথাগুলো শুনলে না? আমার তো গা জ্বলে গেল রীতিমতন।’

ব্যোমকেশ হাসিতে হাসিতেই বলিল, ‘ট্যারাব্যাঁকা নয় হে, ও ওর মতন করে সোজাসুজি কথাই বলেছে। তোমার মার্জিত রুচির সঙ্গে সে কথা খাপ খায় না বটে, কি আর করা।’

আমি একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়িয়া বলিলাম, ‘ক্লাস ডিফারেন্সকে আর অস্বীকার করি কি করে বলো?’

ব্যোমকেশ তড়াক করিয়া উঠিয়া আলমারি থেকে একটি ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি বাহির করিল, ‘ক্লাস ডিফারেন্সের কথা মনে করিয়ে ভালো করলে।’

আমার বিস্ময়মিশ্রিত দৃষ্টি দেখিয়া বলিল, ‘সুবিমল সান্যাল এককালে গরীব ছিলেন বলে এখনো ওনাকে সমতুল্য মনে করছ নাকি?’

গতদিনই সুবিমল সান্যালের সাজসজ্জা দেখিয়া একটা আঁচ পাইয়াছিলাম। কিন্তু আজ বিডন স্ট্রীটের মোড়ে তাঁর প্রাসাদোপম বাড়িটি দেখিয়া হতবাক হইয়া গেলাম। ব্যোমকেশ দরোয়ানকে দিয়া এত্তেলা পাঠাইতেছিল, দরোয়ান যাওয়ার পর বলিলাম, ‘এ বাড়ির ছেলেকে ধরবে না তো কাকে ধরবে বলো দিকিন?’

ব্যোমকেশ চাপা স্বরে বলিল, ‘হুম, বার্মাফেরত ভাগ্যলক্ষ্মীটি ঝাঁপি একেবারে উপুড় করে দিয়েছেন।’

কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুবিমল সান্যাল আসিয়া অভ্যর্থনা জানাইলেন। ভদ্রলোকের চোখ দুটি রক্তাভ, স্লিপিং গাউনটি ছাড়ার সুযোগ পাননি, মুখটি যেন আজ আরো শুষ্ক দেখাইতেছে। ব্যোমকেশ ধীরস্বরে বলিল, ‘যদি অসুবিধা না থাকে তাহলে অমিয়র ঘরটি একবার দেখতে চাই।’ সুবিমল ক্লান্ত স্বরে সম্মতিজ্ঞাপন করিলেন।

অমিয়র ঘরটি দ্বিতলে অবস্থিত, ছিমছাম এবং বেশ পরিপাটি করিয়া সাজানো। একটি বুক শেলফও আছে, সেখানে দর্শন এবং গণিতের কিছু ভারী ভারী বইয়ের পাশে আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যর বইও নজরে আসিল। ব্যোমকেশ অমিয়র পড়ার টেবিলটি দেখিতেছিল, সেখানেও কিছু বই, কিছু কাগজপত্র। ব্যোমকেশ একটি বই হাতে তুলিয়া লইয়া দেখিতেছিল, নাম দেখিয়া বুঝিলাম প্লেগের চিকিৎসা নিয়ে লেখা। সুবিমলও আমাদের সঙ্গে ঘরে প্রবেশ করিয়াছিলেন, ব্যোমকেশ তাঁর দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাইয়া বলিল, ‘এ বইটি দেখছি অমিয় বেশ মন দিয়েই পড়েছে, জায়গায় জায়গায় পেন্সিলের দাগ। প্লেগ নিয়ে কেন চর্চা করছিল তা কিছু জানেন?’

সুবিমল সামান্য চমকিত হইলেন, তারপর মাথা নাড়িলেন, ‘সে তো ঠিক জানি না। তবে আপনাকে বলেছিলাম যে ওর মা প্লেগে মারা গেছিলেন, সেই সূত্রেই বোধ করি ওই রোগ নিয়ে পড়াশোনা করছিল।’

ব্যোমকেশ সম্মতিসূচক মাথা নাড়িল। টেবিলের লাগোয়া একটি দেরাজ, সেটির মধ্যে এক ঝাঁক হ্যান্ডবিল এবং রসিদ দেখা গেল। ব্যোমকেশ রসিদগুলো তদগত চিত্তে উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখিতেছিল। আচমকা প্রশ্ন করিল, ‘দেবদত্ত সাধুখান নামে কাউকে চেনেন নাকি?অমিয় এনাকে বেশ কিছু টাকা দিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে, অন্তত রসিদ তাই বলছে দেখছি।’

সুবিমলের মুখে দেখিলাম যথেষ্ট বিরক্তির উদ্রেক ঘটিল। ‘চিনি বই কি’, কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া সুবিমল বলিলেন, ‘আপনার কাছে লুকোব না ব্যোমকেশ বাবু। সম্প্রতি অমিয়র স্বভাবচরিত্রে কিছু পরিবর্তন এসেছিল, যার ফলে বাবা ছেলের স্বাভাবিক সম্পর্কটি কিছুটা হলেও নষ্ট হয়েছে। এবং সেটার জন্য পুরোপুরি দায়ী এই লোকটি, দেবদত্ত।’

ব্যোমকেশ চকিত হইয়া বলিল, ‘আর একটু বিশদে আলোকপাত করতে পারেন?’

‘এই দেবদত্তের সঙ্গে আমার ছেলের আলাপ রীগ্যালে, চৌরঙ্গীর এই ক্লাবটিতে ও যেতে শুরু করে গত বছরের শুরুর দিকে। শুরু শুরুতে সামান্য গানবাজনা, একটুআধটু টেনিস খেলা এইসবই করত। বিকাল সন্ধ্যা নাগাদ যেত, ঘন্টা দুই আড়াই কাটিয়ে চলে আসত। বছরখানেক আগে থেকে লক্ষ্য করলাম অমিয়র মাঝে মাঝেই বাড়ি ফিরতে বেশ দেরি হচ্ছে, দু’একদিন তো ফিরল প্রায় মাঝরাতের পর। প্রথম প্রথম প্রশ্ন করলে একটু বিব্রত হত, এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। তখনই জেনেছিলাম দেবদত্তই ওকে নিয়ে নানা পাড়ায় ঘুরতে যেত। বাপের মন বুঝতেই পারছেন, নানারকম চিন্তা আসত। কিন্তু ওকে বিব্রত হতে দেখে খুব কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতাম না। যত দিন যেতে লাগল, বিব্রতবোধটা কেটে গিয়ে যেন একটা ঔদ্ধত্য চাগাড় দিতে লাগল, তারপর একদিন…’ সুবিমলকে সামান্য দিশাহারা লাগিল, যেন মনস্থির করিতে পারিছেন না কথাটা আমাদেরকে বলিবেন কিনা।

খানিক চুপ থাকিয়া, সামান্য ধরা গলায় ফের বলিলেন, ‘একদিন ফিরল ভোররাতে, সম্পূর্ণ মাতাল হয়ে। আমি জেগেই ছিলাম। অমিয়র অবস্থা দেখে গা জ্বলে গেল, কিছু কড়া কথা শোনালাম। জীবনে এই প্রথমবার অমিয় আমার ওপর গলা চড়াল। কি বলব ব্যোমকেশবাবু, চাকর বাকরদের সামনে আমার মাথা কাটা গেছিল সেদিন। সবার সামনে চেঁচিয়ে জানাল সারা রাত সে কোথায় কাটিয়েছে, সে খারাপ জায়গার নাম আমি মুখেও আনতে চাই না। আরো কত যে অকথা কুকথা, সে সব আর নাই বা বললাম। সেদিনের পর থেকে আমিও আর কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করি নি ওকে, বাড়ি থেকে কখন বেরোত কখন ঢুকত সে সব নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। বলতে গেলে সেদিনের পর থেকে ওর সঙ্গে আমার আর ভালো করে কথাবার্তাই হয়নি। হয়ত আমারই দোষ, বাপের অহঙ্কার ত্যাগ করে আরেকবার ওর সামনে দাঁড়ালে আজ ওকে হয়ত হারাতে হত না।’

ব্যোমকেশ সহানুভূতিশীল কন্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, ‘এটি কতদিন আগের কথা?’

‘তা ধরুন, মাস তিনেক তো হবেই।’

সুবিমল দাঁতে দাঁত চাপিয়া বলিলেন, ‘ওই দেবদত্ত স্কাউন্ড্রেলটির পাল্লায় না পড়লে এসব কিছুই হত না। আর আপনি তো নিজের চোখেই দেখলেন কিভাবে অমিয়র মাথা মুড়িয়ে চলেছিল। যত টাকা সে নিয়েছে অমিয়র থেকে তার পুরো হিসেবও বোধহয় নেই। কতবার যে বারণ করলাম ওকে, নিজের ছেলে না শুনলে আর কি করব।’

 

‘আপনি দেবদত্তকে দেখেছেন?’

‘হ্যাঁ, একবারই দেখা হয়েছিল। অমিয়ই নিয়ে এসেছিল ওকে এ বাড়িতে। প্রথম দর্শনেই আমার এত বিতৃষ্ণা জেগেছিল যে পরে লোকটি এ বাড়িতে এলেও আমি আর দেখা করিনি।’

ব্যোমকেশ হাতঘড়ির দিকে এক ঝলক দেখিয়া বলিল, ‘এ মুহূর্তে আর কোনো প্রশ্ন নেই, তবে হয়ত দু’এক দিনের মধ্যেই আপনার বাড়িতে একবার ফেরত আসতে হবে। ভালো কথা, ওই প্লেগের বইটি আমি নিয়ে যাচ্ছি। আশা করি আপনার অসুবিধা নেই।’

‘স্বচ্ছন্দে নিয়ে যান। কিন্তু কি বুঝছেন ব্যোমকেশবাবু? অমিয়কে কি ভাবে ফিরে পাব?’

ব্যোমকেশ অন্যমনস্ক স্বরে বলিল, ‘এই মুহূর্তে কিছু বলা মুশকিল। কিছু জায়গায় যাওয়া দরকার, আরো খোঁজখবর চাই।’

সুবিমল সান্যাল সামান্য আশাহত স্বরে বলিলেন, ‘দেখুন কি করতে পারেন। মনে হচ্ছে পরের কিস্তির টাকার ব্যবস্থাও করতেই হবে, দু’দিনই যা সময়।’

ব্যোমকেশ আর বাক্যব্যয় না করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। সিঁড়ি দিয়া নামিতে যাইবার মুখে হঠাৎ সুবিমলের দিকে ফিরিয়া বলিল, ‘ভালো কথা। দ্বিতীয় যে চিঠিটি আপনার কাছে এসেছিল সেটি একবার দেখাতে পারেন?’

‘হাতের কাছে তো নেই। আমি আপনার বাড়িতে আজ বিকালের মধ্যে পাঠিয়ে দেব।’

 

বাড়ি ফিরিয়া ব্যোমকেশের সেই নিশ্চল সমাহিত রূপটি আবার জাগ্রত হইল। দ্বিপ্রহরে আহারাদির সময়টুকু বাদ দিয়া তাহার সহিত আর বিশেষ কথোপকথন হইল না। পাঁচটার দিকে আমার ঘরে আসিয়া বলিল, ‘ওহে, এবার তো গাত্রোত্থান করতে হয়।’ শীতের দুপুরে দিবানিদ্রা দেওয়া ইস্তক শরীরটি খুব একটা জুতের ঠেকিতেছিল না, পুঁটিরাম আনীত এক পেয়ালা চায়ে চুমুক দিয়া শুধাইলাম, ‘সেই তো সন্ধ্যাবেলায় বাঁটুলের সঙ্গে যেতে হবে রামবাগানে। এই অবেলায় আবার টানাটানি কেন?’

ব্যোমকেশ পায়চারি করিতে করিতে বলিল, ‘দু’খানা কেস একসঙ্গে চলছে, সেই হিসাবে এটুকু দৌড়োদৌড়ি তো নস্যি। তবে আমার ধারণা ভাগ্য সহায় থাকলে এই সময়টাতেই দেবদত্তর সঙ্গে দেখা হতে পারে’, আমার দিকে চোরা কটাক্ষ হেনে বলিল, ‘সবাই তো আর শীতের দুপুর বিকেলটা ঘুমিয়ে কাটায় না।’

অগত্যা উঠিতেই হইল। জানালা দিয়া শীতের অপরাহ্ণের মিঠে রোদ আসিতেছিল, ভাবিতেছিলাম বারান্দায় আর এক কাপ চা লইয়া বসিব, সে বাসনা আপাতত জলাঞ্জলি।

চৌরঙ্গীর পৌঁছইবার পর ক্লাব রীগ্যাল খুঁজিয়া পাইতে আদপেই অসুবিধা হইল না। গ্র্যান্ড হোটেলকে বাঁয়ে রাখিয়া হগ সাহেবের মার্কেটের দিকে যাওয়ার পথে ডান দিকের একটি গলির মধ্যে পড়ে। বাহির থেকে বিশেষ কিছু না বোঝা গেলেও ভেতরে ঢুকিলে স্পষ্টই বোঝা যায় সমাজের উচ্চকোটি মানুষ ব্যতীত বাকিদের এ চত্বরে ঢোকা সহজ হইবে না।

ব্যোমকেশ আসিবার পূর্বে ফোন করিয়া ম্যানেজারকে তার আসার অভিপ্রায়টুকু জানিয়েছিল, তাই ঢুকিয়ে কোনো সমস্যা হইল না। ম্যানেজারটিও দেখিলাম বাঙালি, ত্রিদিবেন্দ্র মজুমদার। ত্রিদিবেন্দ্র জানিতেন না অমিয় নিরুদ্দেশ হইয়াছে, খবর পাইয়া অতীব বিস্মিত হইলেও প্রতিশ্রুতি দিলেন তদন্তের কাজে যথাসাধ্য সাহায্য করিবার। ত্রিদিবেন্দ্রর সঙ্গে কথা বলিয়া বুঝিলাম ক্লাবের মধ্যে অন্তত অমিয় কখনই বেচাল কিছু ঘটায়নি, মোটের ওপর সদস্যরা অমিয়র আচারব্যবহারে বেশ প্রীতই বলা যায়।

ব্যোমকেশ একটি আরামকেদারায় বসিয়া সিগারেট ধরাইয়াছিল। খান দুই লম্বা লম্বা টান দিতে দিতে ত্রিদিবেন্দ্রকে শুধাইল, ‘কিন্তু অমিয়র ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে বোধ হয় কেউই নেই, তাই না?’

ত্রিদিবেন্দ্র অল্প ভাবিত মুখে বলিলেন, ‘সে কথা এক প্রকার সত্যি। তবে সবার সঙ্গে পরিচিতি না থাকলেও অন্তত এক জন সদস্যর সঙ্গে অমিয়র কিছুটা অন্তরঙ্গতা ছিল বলেই আমার ধারণা।’

‘কে বলুন তো?’

‘দেবদত্ত সাধুখান। বাগবাজারের বনেদী বাড়ির ছেলে ইনি।’

ব্যোমকেশ ভাবলেশহীন মুখে বলিল, ‘ওহ, তাই নাকি? তা ইনি কি করেন?’

ত্রিদিবেন্দ্র ঈষৎ হাসিয়া কন্ঠস্বরটি খাদে নামাইলেন, ‘তিন চার পুরুষের ব্যবসা মশাই, তবে দেবদত্তর পরের প্রজন্মের জন্য সে ব্যবসা টিঁকে থাকবে কিনা কে জানে। অবশ্য যা হালচাল তাতে পরের প্রজন্ম আদৌ আসে কিনা…’ বলিতে বলিতে ভদ্রলোকের বোধহয় খেয়াল হইল যে প্রথম আলাপচারিতার হিসাবে কিছু বেশীই খবর ফাঁস হইয়া যাইতেছে। নিজেকে সামলাইয়া লইয়া বলিলেন, ‘সে কথা যাক গে। আপনারা কি দেবদত্তর সঙ্গে কথা বলতে চান?’

ব্যোমকেশ সচকিত হইয়া বলিল, ‘তিনি এ মুহূর্তে ক্লাবেই নাকি?’

ত্রিদিবেন্দ্র হাসিয়া উঠিলেন, ‘বলেন কি ব্যোমকেশ বাবু। শীতসন্ধ্যার ছ’টা বাজতে যায়, দেবদত্ত ক্লাবের বারে না এসে কি বাড়ির বৈঠকখানায় বসে চা খাবে? আসুন এদিকে।’

দেবদত্ত সাধুখান যে একটি দ্রষ্টব্য বিশেষ তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ক্লাবের প্রায় সব সদস্যই সাহেবী বেশভূষা পরিহিত, এবং বোঝাও যাইতেছে যে তাঁরা সে পোশাকেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। দেবদত্তর পোশাক বাকিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তার পরনে গিলে করা পাঞ্জাবি এবং চুনোট ধুতি। দুই হস্তের একাধিক অঙ্গুলিতে মূল্যবান কিছু আংটি দেখিতে পাওয়া গেল, বাম হস্তে একটি ততোধিক দামী ছড়ি।

দূর থেকে মনে হইল লোকটি বাকচতুরও বটে, এমন রঙ্গপরিহাস চলিতেছিল যে উপস্থিত বাকি সভ্যরা হাস্যতাড়নায় প্রায় কাতরাইতে শুরু করিয়াছিলেন। এমন সময় ত্রিদিবেন্দ্র যাইয়া দেবদত্তর কানে কানে কিছু বলিলেন। দেবদত্ত তার গল্প থামাইয়া আমাদের দিকে তাকাইয়া দেখিল, মনে হইল মুখে হাসির একটা আভাস পাইলাম।

ব্যোমকেশ কৌতুকপূর্ণ স্বরে বলিল, ‘দশ টাকা বাজি, এ লোক খালি গ্লাস নিয়ে আমাদের সামনে আসবে না।।’

গ্লাস দূরস্থান, দেবদত্তের হস্তে ছড়ি ব্যতীত অন্য কিছু না দেখিয়া ব্যোমকেশের কাছে টাকা দাবী করিতে যাইতেছিলাম। শেষ মুহূর্তে দেখি তার গতিপথ বদলাইয়া গিয়াছে। একটি বেয়ারা ট্রে ভর্তি করিয়া সুরাসামগ্রী নিয়া আসিতেছিল, দেবদত্ত সেখান থেকেই একটি গ্লাস প্রায় ছোঁ মারিয়া তুলিয়া লইল।

ব্যোমকেশ মৃদু হাসিল।

Pic004A_Debdutta_03

‘শুনলাম আপনারা আমার খোঁজেই এসেছেন?’ দেবদত্ত ফিরিয়া আসিয়াছে।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘ঠিক আপনার খোঁজে নয়। ত্রিদিবেন্দ্রবাবু আশা করি আপনাকে বলেছেন যে অমিয়কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে ব্যাপারেই আসা, এসে শুনলাম এ ক্লাবে অমিয়র ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে এক আছেন আপনিই। তাই ভাবলাম আপনার সঙ্গেও একবার কথা বলে দেখা যাক।’

দেবদত্তর মুখে একটি বক্রহাসি ফুটিয়ে উঠিল, ‘আর অমিয়কে খুঁজে বার করবে কে শুনি? আপনি? গোয়েন্দা নাকি?’

ব্যোমকেশ অনুত্তেজিত গলায় বলিল, ‘গোয়েন্দা শব্দটি নিয়ে আমার বিশেষ আপত্তি আছে। আমি নিজেকে সত্যান্বেষী বলিয়া পরিচয় দিই। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী।’

দেবদত্তর মুখের হাসিটি চওড়া হইয়া উঠিল, ‘তা সত্যের অন্বষণে বেরিয়ে মিথ্যা কথা বলাই কি আপনার দস্তুর?’

‘কি বলতে চান আপনি?’

‘আপনি কি বলতে চান ব্যোমকেশ বাবু? এই যে অমিয়র বাবার কাছ থেকে আপনি আমার ব্যাপারে কোনো কথাই শোনেন নি, ক্লাবে আসার পর তবেই আমার ব্যাপারে জেনেছেন?’

আমি প্রমাদ গণিলাম। ব্যোমকেশ অবশ্য এখনো উত্তেজিত হইল না, শান্ত ভাবেই বলিল, ‘হয়ত আপনার নামটাই শুনেছি। কিন্তু চোখে না দেখা অবধি তো জানা যাবে না আপনি আসলে কে। সত্য অন্বেষণের জন্য চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করাটাও দস্তুর বই কি।’

‘বটে!’, দেবদত্ত বলিল, ‘তবে সে কথা আমিও মানি। কোনোরকম প্রি-কনসিভড নোশনস আমিও রাখতে চাই না। তাই অমিয় যখন বলেছিল সে কত দুঃখে আছে, তার কথা আমি মানিনি। তার বাড়ি না গিয়ে, তার বাবাকে না দেখে আমি তার কথা বিশ্বাস করতে চাইনি। কিন্তু যে মুহূর্তে দেখলাম তাতে মনে হল একাকীত্বর নরকযন্ত্রণা থেকে ছেলেটিকে মুক্তি দিতে হবেই, নাহলে সে পাগল হয়ে যাবে।’

ব্যোমকেশ দেবদত্তর পানে কিছুক্ষণ ভ্রূ তুলিয়া চাহিয়া রহিল। মিনিটখানেক পর গম্ভীরস্বরে জিজ্ঞাসা করিল ‘অমিয়র দুঃখে আপনি এত কাতর হয়ে পড়েছিলেন জেনে ভালো লাগল। কিন্তু তার দুঃখ ঘোচাতে গিয়ে নরকের আর কোন কোন দ্বার খুলেছেন আপনি?’

দেবদত্ত ব্যোমকেশের কথায় অট্টহাস্য করিয়া উঠিল। তার কাপ্তান ভাবটি সরিয়া গিয়াছিল, মুহূর্তের জন্য একটি ইতর মানুষকে চোখের সামনে দেখিতে পাইলাম। ‘অত খবরে আপনার দরকার কি ব্যোমকেশ বাবু? সত্যসন্ধানের অছিলায় সে কুহক পৃথিবীর সব খবর মাগনা পেয়ে যাবেন তাও কি হয়? প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও অমিয় ছিল দুধের শিশু, তাকে আমি দুনিয়াটা চিনিয়ে দিয়েছি মাত্র।’

দেবদত্তর চোখের ইশারায় এবার একটি কুশ্রী ইঙ্গিত ধরা পড়িল, ‘ব্যাচেলর নাকি মশায়? যদি নিতান্তই চান তবে সে সুলুকসন্ধান আপনিও পেতে পারেন বই কি, তবে কমিশনটুকু দিতে হবে।’ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ এবং তর্জনীর সাহায্যে একটি বিশেষ মুদ্রা দেখাইল, দেখিলাম দেবদত্তর মুখে সেই কদর্য হাসিটুকু এখনো লাগিয়া রহিয়াছে।

রাগে আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করিতেছিল, ব্যোমকেশ নিতান্তই স্বাভাবিক গলায় বলিল, ‘বৈতরণী যে বিনামূল্যে আপনি পার করান না সে খবর আমি জানি দেবদত্তবাবু। অমিয়র দেরাজে রসিদের পর রসিদ আমাকে সে কথাই বলেছে।’

দেবদত্তর মুখ হইতে সমস্ত ব্যঙ্গবিদ্রূপের চিহ্ন সরিয়া গেল, তীব্র আক্রোশে সে বলিয়া উঠিল, ‘আপনি কি আমাকে জোচ্চোর ঠাউরেছেন নাকি? জোচ্চোর হলে কোথায় পেতেন ওসব রসিদ? অমিয় নিজেই রসিদ লিখতে অস্বীকার করেছে। কিন্তু আমার পাকা কাজ। আর টাকা নেব নাই বা কেন? দিনের পর দিন রামবাগানে যে মেহফিল আর মদের আসর বসেছে তার খরচ কে দেবে? অমিয়র বাপ? তখন তো সে সব টাকা আমার পকেট থেকেই গেছে।’

ত্রিদিবেন্দ্র দূর থেকে আমাদের লক্ষ্য করিতেছিলেন, মনে হইল গন্ডগোলের একটা আঁচ পাইয়া তিনি এদিক পানে আসিতেছেন।

ব্যোমকেশের মেজাজের বলিহারি যাই, সামান্যতম চঞ্চলতা প্রকাশ না করিয়া বলিল, ‘রামবাগানের কোথায়?’

‘কোথায় নয়? যান যান, নিজে খুঁজগে যান। যত্তসব, এই বলে দিলাম অমিয়কে খোঁজার সাধ্যি আপনার সাত পুরুষের নেই।’

ত্রিদিবেন্দ্র আসিয়া পড়িয়াছিলেন, আমরা ধন্যবাদজ্ঞাপন করিয়া বাহিরে আসিলাম। সভ্যরাও একে একে বাহিরে আসিতেছিলেন, ব্ল্যাক আউটের জন্য সন্ধ্যা থেকেই ক্লাবে তালাচাবি পড়বে। ভাগ্যে ব্যোমকেশ বিকাল বিকাল টানিয়া আনিয়াছিল।

চৌরঙ্গী থেকে একটি ট্যাক্সি পাইয়া গেলাম। বিডন স্ট্রীটে আসিয়া অবশ্য গাড়িটি ছাড়িয়া দিতে হইল। শহর কলিকাতায় অকালরাত্রি ঘনাইয়া আসিতেছে, অন্ধকারের মধ্যে গাড়িঘোড়া আপাতত চলিবে না।

 

বিডন স্ট্রীট থেকে রামবাগান হেঁটে যাওয়ার পথে ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘এই কেসেও দেখি রামবাগানের একটা ভূমিকা আছে।’

ব্যোমকেশ শালটি ভালো করিয়া জড়াইতে জড়াইতে বলিল, ‘কাকতালীয় বলেই মনে হয়। বাঁটুল বলছিল বটে যুদ্ধের দরুণ অগুন্তি ভদ্র ঘরের মেয়েকে এই রামবাগানের পথে পা বাড়াতে হয়েছে, হয়ত সে কারণেই দেবদত্ত বা অমিয়র মতন পয়সাওলা বাড়ির ছেলেদেরও এদিকে আনাগোনা বেড়েছে।’

মনটি আর্দ্র হইয়া উঠিয়াছিল, ভাবিতেছিলাম কি গতিক বাংলার এই হতভাগিনীদের। ব্যোমকেশকে প্রশ্ন করিলাম, ‘যুদ্ধ শেষ হলে কি অবস্থা ভালো হবে বলে মনে হয়?’

আবছা অন্ধকারে ঠিক ঠাহর করিতে পারিলাম না কিন্তু মনে হইল ব্যোমকেশের মুখেও একটা বেদনার ছাপ পড়িয়াছে। শুধু বলিল, ‘যুদ্ধ কবে শেষ হয় দেখো আগে। মজুতদাররা যে ভাবে ফুলে ফেঁপে উঠছে, যুদ্ধের পরেও মনে হয় না বাংলার অনটন সহজে ঘুচবে।’

রামবাগানের মুখটিতেই একটি ছায়ামূর্তি দাঁড়াইয়াছিল, আমরা অগ্রসর হইলে সে চাপা গলায় হাঁক দিল, ‘কর্তা নাকি?’

‘কে, বাঁটুল?’

বাঁটুলই বটে। মুখ থেকে চাদর সরাইয়া উত্তেজিত স্বরে বলিল, ‘আজ্ঞে, আমিই। জব্বর খবর আছে। টর্চ আছে আপনাদের কাছে? এই দেখুন।’

মনে হইল বাঁটুল ব্যোমকেশের হস্তে একটি চিরকুট ধরাইল। আমরা তিনজন রাস্তার একপ্রান্তে সরিয়া আসিলাম। খোলা নালার গন্ধে এক মুহূর্ত টেঁকা দায়, ঘিঞ্জি জায়গায় মশককুলও রীতিমতন আক্রমণ শানাইতেছে কিন্তু চিরকুটে কি লেখা তা দেখিবার উত্তেজনায় সেসব সমস্যা গ্রাহ্য করিলাম না। ব্যোমকেশ সন্তর্পণে টর্চটি জ্বালাইয়াছিল, দেখিলাম মেয়েলী হাতে গোটা গোটা ছাঁদে লেখা, ‘বাবুকে বোলো খুনের খবর আমার কাছে আছে।’

ব্যোমকেশ মুখ তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘এ চিরকুট তোমার কে দিয়েছে?’

‘যে দিয়েছে তার কাছেই আপনারা যাবেন এখন’, বলিতে বলিতে বাঁটুল মুখ দিয়া একটি তীক্ষ্ণ শিস্ বাহির করিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে বাঁটুলের যে চ্যালাটি উদয় হইল অন্ধকারে তার মুখ স্পষ্ট দেখিতে না পাইলেও উচ্চতা দেখিয়া বুঝিলাম বছর সাত আটের বেশি তার বয়স নয়।

‘যাঃ, বাবুদের জলদি সেই বাড়িতে নিয়ে যা।’

আমি তড়িঘড়ি প্রশ্ন করিলাম, ‘আর তুমি?’

অন্ধকারে মনে হইল হাসির আওয়াজ হইল, ‘আমিও আসছি বাবু, আপনাদের পেছনেই।’

রামবাগানের বস্তির গোলকধাঁধার মধ্য দিয়ে চক্কর কাটিতে কাটিতে একটি দ্বিতল বাড়ির সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। বাড়িটি দ্বিতল হইলেও অন্ধকারেও বোঝা যাইতেছে প্রায় পোড়ো দশা। গলিঘুপচির মধ্যে এর আগে প্রায় নিভু নিভু কুপির আলো দেখা যাইতেছিল, চাপা স্বরে দরাদরিও কানে আসিতেছিল, কিন্তু বস্তির এই শেষ প্রান্তের নিস্তব্ধতা প্রায় অপ্রাকৃতিক। বাড়ির সম্মুখের দরজাটি খোলাই ছিল, ছেলেটি ইশারায় আমাদের ঢুকিতে বলিয়া চলিয়া গেল। এতক্ষণ পেছন পেছন বাঁটুলের পায়ের শব্দ পাইতেছিলাম, সে শব্দটিও বিলীন হইয়াছে।

বাড়িটিতে প্রবেশ করিয়া স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া পড়িলাম দু’জনে। অন্ধকারের প্রচন্ডতা মনে হইল ব্যোমকেশকেও কিয়ৎক্ষণের জন্য বিহ্বল করিয়া তুলিয়াছিল। মিনিট কয়েক পরে চোখ ধাতস্থ হইয়া আসিলে বুঝিলাম সামনেই একটি সিঁড়ি, সে সিঁড়ি বাঁকিয়া আমাদের মাথার ওপর দিয়েই দ্বিতলে উঠিয়া গিয়াছে। আমি অগ্রসর হইতে যাচ্ছিলাম, ব্যোমকেশ আমার হাত ধরিয়া নিবৃত্ত করিল। তারপর কন্ঠস্বরটি উচ্চগ্রামে তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘কেউ আছেন?’

কোনো উত্তর আসিল না।

ঘড়ির রেডিয়াম ডায়ালটি তুলিয়া দেখিলাম সাতটা বাজিয়া গিয়াছে। ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘বাঁটুল সরে পড়ল কেন বলো তো? ওই লোকটিকে আমি আদৌ বিশ্বাস করি না।’

সিঁড়ির নীচের ঘনীভূত অন্ধকারে ব্যোমকেশকে দেখিতে পাইলাম না, শুধু তার হাসির শব্দ ভাসিয়া আসিল। ‘বাঁটুল সরে পড়ায় তোমার তো খুশী হওয়াই উচিত ছিল অজিত, কিন্তু তা তো হল না। মনে হচ্ছে রামবাগানের এই পোড়োবাড়ির একতলায় তার সান্নিধ্য পেলে আরেকটু নিশ্চিন্ত থাকতে পারতে, নয় কি?’

আমি ক্ষীণ প্রতিবাদ করিতে যাচ্ছিলাম, এমন সময়ে সিঁড়ির উপর থেকে রিনিঠিনি আওয়াজ আসিল। মুহূর্তখানেকের মধ্যে আমাদের চোখের সামনে একটি কালিধরা লন্ঠন দেখা দিল, সিঁড়ির একধাপ উপর হইতে নরম স্বরে প্রশ্ন আসিল, ‘ব্যোমকেশ বাবু?’

ব্যোমকেশ নিজ পরিচয় স্বীকার করিতে প্রশ্নকারিণী লন্ঠনটি সামান্য নত করিল। লন্ঠনের সামান্য আলোতেই তার মুখটি ঘরের ছায়ান্ধকারকে উদ্ভাসিত করিয়া উঠিল। কাজলপরা চোখটি আমাদের দিকেই তাকিয়ে, সে চোখে না দেখিলাম ছলনা, না পাইলাম চটক। নিলাজ চোখে শুধু ধরা পড়েছে প্রচ্ছন্ন আশঙ্কা। রামবাগানের মলিন পরিবেশে এমন অকপট সৌন্দর্য দেখিতে পাওয়ার সম্ভাবনা ব্যোমকেশের মনেও ছিল না, তরুণীকে প্রতিপ্রশ্ন করিতে তারও দেখিলাম কিছু সময় লাগিল।

ByomkeshHiRes004B_Kuhu

‘আপনিই চিরকুটটি পাঠিয়েছিলেন?’

তরুণী বলিল, ‘হ্যাঁ পাঠিয়েছি। আপনারা উপরে উঠে আসুন, তারপর বিশদে বলছি।’

অতি পুরানো বাড়ি, সঙ্কীর্ণ বারান্দাটি দেখলেই বোঝা যায়। তরুণীর লন্ঠনের আলোয় দেখিলাম সারি সারি দরজা, প্রতিটিতেই বাইরে থেকে তালা ঝুলিতেছে। বারান্দার শেষে একটি বড় ঘর, একমাত্র সেটিই উন্মুক্ত রহিয়াছে। সেখানে ঢুকিবা মাত্র একটি ভ্যাপসা গন্ধ নাকে আসিয়া প্রবেশ করিল, শীতকাল হইলেও ঘরটি যেন অতিমাত্রায় স্যাঁতসেঁতে। খান দুই চেয়ার রহিয়াছে, মেঝেতে একটি মাদুর পাতা। তরুণী মেঝের উপরে লন্ঠনটি রাখিয়া বলিল, ‘ক্ষমা করবেন এরকম ঘরে নিয়ে আসার জন্য। আমাদের আর কিই বা সামর্থ্য বলুন, শুনি বাড়িওলাও বোমার ভয়ে শহর ছেড়েছেন বেশ কিছু মাস হয়ে গেল। তাঁর চাকর এসে ভাড়াটুকু নিয়ে যায় শুধু।’

ব্যোমকেশ আর আমাকে চেয়ার দুটি আগাইয়া দিয়া তরুণীটি মাদুরের ওপর বসিল। আপত্তি করিয়াও কোনো ফল হইল না। ব্যোমকেশ ঘরের চারিপাশে চোখ বোলাইয়া বলিল, ‘এ ঘরে নিশ্চয় আপনি থাকেন না।’

তরুণী মাথা নাড়িল, ‘না, আমার ঘর বারান্দার ও প্রান্তে, আরো একটি মেয়ের সঙ্গে থাকতে হয়। তবে  সেখানে আপনাদের নিয়ে যাওয়া যায় না। তা ছাড়া এ মুহূর্তে সে ঘরে…’ বাক্যটি না শেষ করিয়াই চুপ করিয়া গেল।

পুরো পরিবেশটি এত অচেনা যে কথা ঘোরাইবার জন্য প্রায় মরিয়া হয়ে উঠিলাম। বলিলাম, ‘আপনার নামটা?’

সামান্য নীরবতা, তারপর সংক্ষিপ্ত জবাব আসিল, ‘কুহু।’

কুহু ব্যোমকেশের দিকে চক্ষু ফিরাইয়া বলিল ‘ব্যোমকেশ বাবু, আমি বড় বিপন্ন। আপনি সাহায্য না করলে হয়ত প্রাণেও বাঁচব না।’

ব্যোমকেশ একদৃষ্টিতে কুহুর দিকেই তাকাইয়া ছিল, এবার বলিল, ‘আপনি সব কথা খুলে বলুন। আমি যথাসাধ্য করব।’

কুহু একটু ইতস্তত করিয়া বলিল, ‘আমার ধারণা রামবাগানের খুনগুলো কে করেছে তা আমি জানি।’

ব্যোমকেশ একটু নড়িয়া বসিল, ‘কি জানেন আপনি?’

কুহু হঠাৎ ভাঙ্গিয়া পড়িল, মুখে হাত চাপা দিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, ‘আমারই দোষ। শুরুতেই যদি সব কথা বলতাম তাহলে হয়ত আরেকটি প্রাণ বাঁচানো যেত।’

ক্ষণিক পর একটু ধাতস্থ হইল, দেখিলাম তার দুটি চোখ থেকেই জলের ধারা নামিয়া এসেছে। বলিল, ‘এক সপ্তাহ আগে এরকমই এক রাত্রে আমি রমলার ঘরে ছিলাম, সে ছিল আমার সই। এ বাড়ি থেকে দু’পা হাঁটলেই তার বাড়ি। তার আগের রাত থেকে ধুম জ্বর এসেছিল আমার, তাই ঠিক করি সে রাতটা রমলার কাছেই থাকব। যদি কিছু অনর্থ ঘটে তাহলে অন্তত সেবাযত্ন করার একটা মানুষও থাকবে।     সেই রাত্রেই মানুষটা আসে, রমলাকে নিয়ে যেতে চায়।’

রমলা প্রথমে রাজি ছিল না, পরে ফিরে এসে বলল ‘প্রচুর টাকা দিচ্ছে, তায় গাড়ি করে নিয়ে যাবে, নিয়ে আসবে। তুই শুয়ে থাক, আমি ঘন্টা তিনেকের মধ্যে ফিরে আসব।’

‘সারা রাত কেটে গেল ব্যোমকেশ বাবু, রমলা ফিরল না। আমিও জ্বরের ঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠে নিজের বাড়ি চলে আসি, আর সেদিন রাতেই খবরটা পাই।’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘পরের খুনটার খবরও তো পেয়েছিলেন মনে হয়। তার পরেও বলে উঠতে পারেন নি?’

কুহু মাথা নামিয়া বলিল, ‘ভয়, ব্যোমকেশ বাবু। বড় ভয় পেয়েছিলাম। পুলিশকেও বিশ্বাস নেই, কোথা থেকে কি খবর ফাঁস হয়ে যায়।’

‘তাহলে আজ হঠাৎ সব কথা বলতে মনস্থির করলেন কেন?’

কুহু সন্ত্রস্ত চোখে বলিল, ‘সে রাতে আমি জানলা দিয়ে গাড়ি দেখতে পেয়েছিলাম ব্যোমকেশবাবু। আজ সকালে আমি সেই কালো গাড়ি আবার দেখতে পেয়েছি।’

ব্যোমকেশ সচকিত হইয়া বলিল, ‘কিন্তু কালো গাড়ি তো কতই আছে, এ যে সেই গাড়ি তা বুঝলেন কি করে?’

কুহু বলিল, ‘গাড়ির রঙ দেখে নয়। আমি ইংরেজি নম্বর পড়তে জানি, সে গাড়ির নম্বর পুরো দেখতে পারিনি। কিন্তু শেষ দুটো সংখ্যা মনে ছিল – ছয় আর নয়। ছয়কে উলটে দিলেই নয় হয়ে যায়, তাই জন্য আরোই মনে ছিল।’

প্রায়ান্ধকার ঘরেও মনে হইল ব্যোমকেশের মুখটি উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করিতেছে। বলিল, ‘বাহবা! কিন্তু সে গাড়ি দেখলেন কোথায়?’

আতঙ্কে কুহুর মুখ কালিবর্ণ ধারণ করিল, ‘আজকে সে গাড়ির মালিকের থেকেই অগ্রিম নিয়েছি যে। গাড়ি যেই ঘুরল অমনি সেই ছয় আর নয়কে পাশাপাশি দেখতে পেলাম।’

ব্যোমকেশ স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল কিছুক্ষণ, তারপর মুখ তুলিয়া বলিল, ‘আপনাকে কখন যেতে হবে?’

কুহু মুখ নত করিল, ‘রামবাগানে ঢোকার মুখে যে বড়রাস্তা সেখানে আগামীকাল রাত আটটায় আমার দাঁড়ানোর কথা।’ ব্যোমকেশের দিকে তার কাতর চোখ দু’টি তুলে বলল, ‘আপনি থাকবেন তো? আপনি না থাকলে এ যাত্রায় আমাকে কেউ প্রাণে বাঁচাতে পারবে না।’

ব্যোমকেশকে চিন্তামগ্ন দেখিলাম, মিনিটখানেক পর ধীর স্বরে বলিল, ‘তাই হবে কুহু দেবী। আমরা থাকব রাস্তার উল্টোদিকেই, কোনো ভয় নেই আপনার। তিন সপ্তাহ আগে ব্ল্যাক আউট শুরু হয়নি কিন্তু এখন ব্ল্যাক আউট জারি থাকবে, সুতরাং রাত্রিবেলা গাড়ি আসার সম্ভাবনা নেই। খুনীকে পায়ে হেঁটেই আসতে হবে। আপনি তো সে লোককে দেখেছেন বললেন?’

কুহু দু’পাশে মাথা নাড়িল।

‘দেখেননি?’

‘আমার ধারণা যে টাকা দিয়েছে সে গাড়ির মালিক নয়। চাকরস্থানীয় দেখতে, যে টাকা পাঠিয়েছে তাকে বাবু বলে ডাকছিল।’

কুহু আমাদেরকে সদর দরজা অবধি আগাইয়া দিতে আসিয়াছিল, ব্যোমকেশ বাহির হইবার পূর্বে আরো একবার অভয়প্রদান করিতে সে আর নিজেকে সামলাইতে পারিল না। ঝরঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল, ব্যোমকেশের হস্তদ্বয় স্পর্শ করিয়া বলিল, ‘এ দুখিনীকে আপনি নতুন জীবন দিলেন, আমি চিরকৃতজ্ঞ রইলাম।’

ঘটনার নাটকীয়তায় আমরা দু’জনেই অল্পক্ষণের জন্য বাক্যরহিত হইলাম, কুহুও তাড়াতাড়ি সামলাইয়া লইয়া বলিল, ‘মাফ করবেন, আমি আসি এখন।’

বাহির হইয়া ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘গাড়ির চালকও তাহলে এই খুনের সঙ্গে জড়িত? সেই বিকৃতকাম পশুটির সাগরেদ?’

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল, ‘খুবই সম্ভব। অর্থের লোভ বা প্রাণের ভয়, সেও হয়ত কিছু বলে উঠতে পারছে না।’, বলিতে বলিতে ব্যোমকেশ পিছনে ঘুরিয়া কি যেন দেখিল। কুয়াশাও পড়িয়াছে আজ, দু’হাত দূরের জিনিসও ভালো ঠাহর হয় না, তাও মনে হল সে পিছনের পোড়ো বাড়িটিকেই দেখার চেষ্টা করিতেছে।

ব্যোমকেশকে পুনরায় চিন্তামগ্ন দেখিয়া বলিলাম, ‘কি ভাবছ?’

‘বাড়িওলার কথা।’

বাড়িওলা আবার কি করিল? ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করিতে যাব এমন সময় আমাদের ঠিক পাশটি থেকে কে যেন বলিয়া উঠিল, ‘কর্তা এসে গেছেন?’

বাঁটুল।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল ‘তুমি ছিলে কোথায়? আমি তো ভাবলাম তুমি বাড়ি চলে গেছ।’

বাঁটুলের খলখলে হাসি ভাসিয়া আসিল, ‘যাব আর কোন চুলোয়, আপনাদের এখান থেকে বার না করেই বা যাই কই? এ চত্বরেই ঘোরাফেরা করছিলাম।’

 

পরদিন সকাল দশটা নাগাদ বীরেনবাবুর দেখা মিলিল। তাঁর মুখ অস্বাভাবিক রকমের গম্ভীর, ‘কমিশনার সাহেব জানতে চাইলেন আপনার তদন্ত কিছু এগোল কিনা?’।

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল, ‘তদন্ত চলছে তার নিজের গতিতে, এখনো সাহেবকে বলার মতন কোনো জায়গায় পৌঁছয়নি।’

বীরেনবাবুর অধরে ক্ষণিকের জন্য বক্রহাসির আভাস পাইলাম, বলিলেন, ‘দেখুন তাহলে কবে রহস্য উদঘাটন করতে পারেন। তবে ও তল্লাটে আপাতত আপনাদের না যাওয়াই ভালো, যা খুনজখম চলছে।’

বীরেনবাবুর কথায় ব্যোমকেশ আরামকেদারার হেলান ছাড়িয়া উঠিয়া বসিল, ‘আবারো কিছু ঘটেছে নাকি?’

‘ঘটেছে, কাল রাত্রে ওই চত্বরেই আবার খুন হয়েছে। তবে এ খুনের সঙ্গে আগের তিন খুনের কোনো সম্পর্ক নেই, রাতের অন্ধকারে পেছন থেকে পিঠে ছোরা বিঁধিয়ে মারা হয়েছে। পোস্ট মরটেম রিপোর্ট অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে এ খুন হয়েছে।’

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে আটটা! ওই সময়েই তো আমরা কুহুর আস্তানায় ছিলাম।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, ‘রামবাগানেরই কেউ?’

বীরেনবাবু বলিলেন, ‘নাহ, তবে এ লোকটির রামবাগান চত্বরে ভালোই যাতায়াত ছিল। বাগবাজারের ব্যবসায়ী সাধুখান বাড়ির ছেলে, নাম দেবদত্ত।’
খবর শুনিয়া কিছুক্ষণ আমাদের দু’জনের মুখেই কথা যোগাইল না। বীরেনবাবু আমাদের অবস্থা দেখিয়া পুনরায় বলিলেন, ‘ভয় পাওয়ার মতনই কথা। আপনারা আর নিজের প্রাণ বিপন্ন করবেন না, যা করার পুলিশই করবে।’

ব্যোমকেশ কিয়ৎক্ষণ স্থাণুবৎ বসিয়া রহিল, তারপর বীরেনবাবুর দিকে ফিরিয়া বলিল, ‘দেবদত্ত সাধুখান কি চৌরঙ্গী থেকে সরাসরি রামবাগানে এসেছিল?’

বীরেনবাবু মহা বিস্ময়ে বলিয়া উঠিলেন, ‘আপনি সে কথা জানলেন কি করে? হ্যাঁ, চৌরঙ্গীর একটি ক্লাব থেকে এসেছিল বলেই এখনো অবধি খবর পাওয়া গেছে।’

‘কিভাবে জানলাম সে কথা পরে হবে। কেন গেছিল সে ব্যাপারে কিছু জানেন?’

‘দেবদত্তর পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা নোট পাওয়া গেছে, তাকে কেউ ডেকে পাঠিয়েছিল বলেই মনে হয়।’

‘সে লেখা একবার দেখতে পাওয়া যেতে পারে?’

বীরেনবাবু অসহিষ্ণু মুখে বলিলেন, ‘আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি আগের কেসের কোনো সুরাহা না করে আবার এই কেস নিয়ে পড়লেন কেন?’

ব্যোমকেশ কঠিন স্বরে বলিল, ‘ভুলে যাবেন না এই খুনও রামবাগানেই হয়েছে। আপনি যতক্ষণ না কাগজে কলমে প্রমাণ করতে পারছেন এ অন্য খুনী ততক্ষণ আমার সঙ্গে সহযোগিতা করা ছাড়া আপনার গতি নেই।’

বীরেনবাবু দ্বিরুক্তি না করে ব্যোমকেশের হাতে একটি ভেজা ভেজা কাগজের টুকরো তুলে দিলেন, উঁকি মারিয়া দেখিলাম তাতে লেখা ‘ওলাবিবির মন্দিরের সামনে অপেক্ষা করব, সাড়ে সাতটা নাগাদ। জরুরী দরকার, সাক্ষাৎ এর কথা গোপন রেখ।’

জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘ওলাবিবির মন্দির আছে নাকি রামবাগানে?’

বীরেনবাবু বলিলেন, ‘হ্যাঁ, পুরনো মন্দির। তিরিশ চল্লিশ বছর আগে কলেরায় ছারখার হয়ে গেছিল ও চত্বর, তখনই বানানো হয়।’

ব্যোমকেশের দিকে তাকিয়ে দেখি সে কতকটা মুহ্যমান হইয়া বসিয়া রহিয়াছে। আধ মিনিট পর পর ক্ষীণস্বরে কহিল, ‘আপনি কাগজটা রেখে যান বীরেনবাবু, আমি কাল সকালে এ কাগজ ফেরত দেব আপনাকে।’

বীরেনবাবু নিজের অসন্তুষ্টি গোপন করবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া বিড়বিড় করিতে করিতে বিদায় নিলেন। বীরেনবাবু দরজা দিয়ে অদৃশ্য হওয়া মাত্র ব্যোমকেশ ডাকিল, ‘পুঁটিরাম’।

পুঁটিরাম বীরেনবাবুর জন্য চা করিয়া আনিয়াছিল, ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিল, ‘ও বাবু চলে গেলেন?’

‘হ্যাঁ, চা রেখে যাও। অজিত খেয়ে নেবে। তোমার মনে আছে দু’দিন আগে এক ভদ্রলোক বিকালবেলা বাড়ি এসেছিলেন?’

পুঁটিরাম ঘাড় নাড়িল।

‘তিনি কি কাল কিছু আমার জন্য পাঠিয়েছেন?’

‘আজ্ঞা বাবু, কাল অত রাতে ফিরেছিলেন বলে আর দিইনি’।

কয়েক মিনিটের মধ্যে পুঁটিরাম একটি সীলবন্ধ খাম আনিয়া ব্যোমকেশের হাতে দিল। খামের ভিতরে দেখি একটি চিঠি, অমিয়র অপহরণকারীর পাঠানো দ্বিতীয় চিঠি।

ব্যোমকেশ বীরেনবাবুর কাগজ আর এই চিঠি দুটি পাশাপাশি রেখে পরীক্ষা করিতেছিল। আমার মাথায় হঠাৎ বিদ্যুৎচমক খেলিয়া গেল।

বলিলাম, ‘ব্যোমকেশ, দুটি চিঠি কি একই হাতের লেখা?’

ব্যোমকেশ ধীরে ধীরে মাথা নাড়িল, ‘না এক হাতের লেখা নয়। আর রহস্যটা সেখানেই’। বলিতে বলিতে উঠিয়া গিয়া নিজের দেরাজ থেকে তৃতীয় একটি কাগজ বাহির করিয়া আনিল, দেখিলাম এটি অপহরণকারীর প্রথম চিঠি।

অপহরণকারীর দু’টি চিঠি পাশাপাশি রাখিয়া বলিল, ‘এ দুটি চিঠিও এক হাতের লেখা নয়।’

আমি হতবুদ্ধি হইয়া বসিয়া রহিলাম, বলিলাম, ‘তবে কি দু’জন মিলে অমিয়কে অপহরণ করেছে? দু’জনেই একটি একটি করে চিঠি লিখে পাঠিয়েছে?’

ব্যোমকেশ কিছুই বলিল না, শুধু অপহরণকারীর দ্বিতীয় চিঠিটা নামাইয়া লইয়া তার স্থানে দেবদত্তর পাঞ্জাবির পকেট থেকে পাওয়া কাগজটি রাখিল। বলিল, ‘এবার দেখো।’

দেখিলাম, দুটি চিঠির হাতের লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র মিল নেই। প্রথম চিঠিটি দেখলে মনে হয় যেন কোনো বাচ্চা ছেলে লিখিয়াছে, দেবদত্তর পাওয়া কাগজের লেখায় কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক সুলভ মুন্সীয়ানা রহিয়াছে।

ব্যোমকেশ কে বলিলাম, ‘এ দু’টিও তো এক নয়, তার মানে তিন জন বিভিন্ন ব্যক্তি চিঠি তিনটে লিখেছে।’

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিয়া বলিল, ‘এ দু’টি কিন্তু এক লোকের লেখা।’

আমি এতই বিভ্রান্ত বোধ করিলাম যে এই প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকে রেহাই নিতে হল।

ব্যোমকেশের মুখ থেকে অবশ্য হাসি সরিয়া গিয়াছে, আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, ‘রহস্য বড় গভীর অজিত, ভেবো না শুধু তুমিই বিভ্রান্ত হয়ে আছ।’

দেখিলাম ব্যোমকেশ বাহিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হইতেছে। অবাক হইয়া বলিলাম, ‘এখন আবার চললে কোথায়?’

‘ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরী’, গায়ে শাল ফেলিয়া ব্যোমকেশ বাহির হইয়া গেল। মিনিট খানেকের মধ্যে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, ‘ওহ, তোমাকেও একটা কাজ করতে হবে। মনে আছে তো আগামীকাল সুবিমল সান্যালের টাকা দিতে যাওয়ার কথা? তুমি একবার ওনার বাড়িতে গিয়ে কথা বলে এস। জানিও ওঁর সঙ্গে আমরাও থাকতে চাই, সময়টা ঠিক করে নেওয়া দরকার।’

 

সুবিমল সান্যাল আমাকে দেখিয়া যেন একটু অপ্রস্তুত হইলেন, ‘ওহ আপনি। তা ব্যোমকেশ বাবু এলেন না?’

জানাইলাম তদন্তের অভিপ্রায়ে আমার আগমন ঘটেনি, আগামীকল্য তাঁর সঙ্গে কখন মিলিত হইব সেটি জানিতেই আসা।

সুবিমল মিনিটখানেক চুপ করিয়া রইলেন, তারপর বলিলেন, ‘আপনারা কি ছদ্মবেশে যাবেন?’

আমি আমতা আমতা করিয়া বলিলাম, ‘সেরকম তো এখনো কিছু জানি না। ব্যোমকেশ বলিতে পারিবে।’

‘আমার মনে হয় ছদ্মবেশ ধারণ করাই ভালো। কোনো কারণে যদি লোকগুলি আপনাদের দেখতে পায়, কে বলতে পারে তারা অমিয়র কোনো ক্ষতি করবে না?’

যুক্তিসঙ্গত কথাই বটে। বলিলাম ব্যোমকেশের সঙ্গে কথা বলিয়া ওনাকে জানাইব।

সুবিমলের থেকে বিদায় লইয়া গেটের বাহিরে যাব এমন সময় মনে হল উনি পিছন থেকে ‘অজিতবাবু’ বলে একবার ডাকিলেন। আর ঠিক সে সময়েই দ্বিতীয় এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটিল। ইনি অবশ্য আমার পরিচিত, নাম শ্রীশ সামন্ত, আমাদের পাড়ার ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। শ্রীশ বাবুর হাতে একটি বড় সুটকেস, বুঝিলাম টাকার বন্দোবস্ত চলিতেছে। আমি ঘুরিয়া সুবিমলকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কিছু বলছেন?’

সুবিমল মাথা নাড়িলেন, ‘নাহ, কিছু না। মিছিমিছিই আপনার পিছু ডাকলাম।’

 

ব্যোমকেশ ফিরিল বিকাল নাগাদ, দেখিলাম প্লেগের বইটিও সঙ্গে লইয়া গেছিল। সুবিমল ছদ্মবেশের প্রসঙ্গ তুলিয়াছেন শুনে কেন জানি ভ্রূকুঞ্চন করিল।

বলিলাম, ‘টাকার বন্দোবস্ত যে হয়ে গেছে তাও দেখে এলাম। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার শ্রীশ সামন্ত নিজে টাকার সুটকেস নিয়ে ঢুকছিলেন’।

ব্যোমকেশ প্রথমটায় ভালো করিয়া শুনতে পায় নাই, বলিল, ‘সুবিমল সান্যাল টাকার বন্দোবস্ত যে ঠিকই করতে পারবেন তা অপহরণকারী জানে’।

বলিতে বলিতে আমার দিকে ঘুরিয়া সবিস্ময়ে বলিল, ‘কি বললে? শ্রীশ সামন্ত নিজে টাকা নিয়ে গেছেন?’

স্বীকার করিলাম।

‘কিন্তু ব্যাঙ্ক ম্যানেজার নিজে কেন টাকা নিয়ে যাবে সুবিমল সান্যালের বাড়ি?’

‘দেখো, হয়ত এত বড় ক্লায়েন্ট বলে নিজেই সেবা দিচ্ছেন।’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘তা হতে পারে, কিন্তু কি যেন মিলছে না।’ বলিয়া একটি সাদা কাগজে হিজিবিজি কাটিতে শুরু করিল। বুঝিলাম আপাতত কথোপকথন বন্ধ রাখিতে হইবে। আধ ঘন্টা পর ঝড়ের গতিতে বাহির হইয়া গেল, শুনিলাম রান্নাঘরে পুঁটিরামের সঙ্গে কি কথাবার্তা চলিতেছে।

 

বেরনোর সময় ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘খুনী যেরকম নৃশংস প্রকৃতির তার সঙ্গে সামনাসামনি মোলাকাতের জন্য তো সশস্ত্র থাকা প্রয়োজন। তুমি কিছু ব্যবস্থা করেছ নাকি?’

‘সে আর বলতে, এই যে’, দেখি ব্যোমকেশের হাতে মস্ত একখানি টর্চ। আমি রাগত স্বরে অনুযোগ জানাইতে যাচ্ছিলাম, ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া অভয় প্রদান করিল।

রামবাগানের বড়রাস্তার উল্টোদিকের গলিতে যখন দু’জনে পৌঁছাইলাম তখন আটটা বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি। ব্যোমকেশকে ফিসফিস করিয়া বলিলাম, ‘ব্ল্যাকআউটের বাজারে রোজ যে এরকম রাত্রে বেরোচ্ছ, পুলিশ ধরলে বলবে কি?’

‘বলব বীরেনবাবু বলেছেন দু’দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।’

হাসিয়া ফেলিলাম, এমন সময়ে ব্যোমকেশ একটি মৃদু ধাক্কা দিল। দেখি কুহু আসিয়া ল্যাম্পপোস্টের তলায় দাঁড়াইয়াছে, চাঁদের আলোয় আজ তাহার অন্য রূপ দেখিলাম। ভরা শীতের রাত্রেও তাহাকে রঙ্গিণী সাজিতে হইয়াছে – তার চড়া প্রসাধন, ফিনফিনে শাড়ী সবই রাস্তার এই পার থেকেও দেখা যাইতেছে। কাঁধে আলগোছে একটি চাদর ফেলা।

ব্যোমকেশ এদিক থেকে হাত তুলিল। কুহুও আমাদের দেখিতে পাইয়াছে।

ByomkeshHiRes001_Stakeout

আমি রুদ্ধ-নিশ্বাসে অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। আমার ঘড়ির কাঁটার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই কানে আসিতেছে না, এয়ার রেইডের ভয়ে রাস্তার ঘড়িগুলিও খুলিয়া ফেলা হইয়াছে। মিনিট পাঁচেক পর খেয়াল হইল ব্যোমকেশের দিক থেকে সাড়া শব্দ আসিতেছে না। ঘুরিয়া দেখি ব্যোমকেশ উদগ্রীব হইয়া চাহিয়া রহিয়াছে, কিন্তু বড় রাস্তার দিকে নয় বরং আমাদের গলির ভিতরের দিকে।

কয়েক হাত পরেই গলিটি বাঁকিয়া গিয়াছে। মনে হইল একটি ছায়ামূর্তি অগ্রসর হইতেছে। ডাকিলাম, ‘ব্যোমকেশ!’

উত্তর এল, ‘চিন্তা নেই, তুমি রাস্তার দিকে দেখো।’

মিনিটখানেকের মধ্যে সে ছায়ামূর্তি এসে ব্যোমকেশের পিছনে দাঁড়াইল।

‘বাঁটুল কোথায় পুঁটিরাম?’

‘আজ্ঞে, আপনার কথা মতন সে অন্য গলির সামনে নজর রাখছে।’

আমি অধীর হইয়া ফিসফিস করিয়া বলিলাম, ‘ব্যোমকেশ, কি হচ্ছে বলো তো?’

ব্যোমকেশ চাপা স্বরে বলিল, ‘এখন ব্যাখ্যা করার সময় নেই অজিত। আর কি হচ্ছে বা হতে চলেছে তা আমি নিজেও পুরোপুরি জানি না। পুঁটিরাম, তোমার বন্ধু কোথায়?’

‘ওই যে, এসে গেছে।’

দেখিলাম ল্যাম্পপোস্টের নীচে আর একটি লোক উদয় হইয়াছে, কুহুকে কিছু বলিতেছে। রাস্তার এপার থেকে না বোঝা গেলেও মনে হইল একটি তর্কাতর্কি বাধিয়া উঠিতেছে। কুহুও যাইবে না, আর এ ব্যক্তিও নাছোড়বান্দা।

ব্যোমকেশ সজোরে হাত ধরে টানিল, ‘অজিত এসো।’

ব্যোমকেশ প্রায় দৌড়াইতে শুরু করিল, বাধ্য হয়ে আমিও। গলি ত্যাগ করিবার পূর্বে দেখিলাম পুঁটিরাম আমাদের জায়গাটি লইয়াছে, ব্যোমকেশের শাল দিয়া তার মস্তক আবৃত।

ব্যোমকেশকে বলিলাম, “কুহুকে যে বিরক্ত করিতেছে সেই লোকটির কি হবে?’

ব্যোমকেশ মাথা না ঘুরাইয়াই জবাব দিল, ‘চিন্তা নেই, ও আমারই লোক। আর মিনিট দুয়েক পরেই চলে যাবে।’

অন্য গলি দিয়া বার হইয়া দ্রুতবেগে বড় রাস্তা অতিক্রম করিলাম দু’জনে। দূরে ডান দিকে দেখিলাম ল্যাম্পপোস্টের নীচে কুহু এখনো দাঁড়িয়ে, পুঁটিরামের বন্ধু বাকবিতণ্ডা শেষ করিয়া চলিয়া যাইতেছে। বড় রাস্তা অতিক্রম করিয়া উল্টোদিকের গলিতে ঢোকা মাত্র আরেক ব্যক্তি ছুটিয়া আসিল।

‘কর্তা, উনি মিনিট পাঁচেক হল এ গলিতে ঢুকেছেন।’

‘সর্বনাশ, অজিত এসো।’

এই গলি ধরিয়া ছুটিতে ছুটিতে অনুধাবন করিলাম পূর্বদিন এখানেই এসেছিলাম। গলিঘুঁজি পার হইয়া কখন সেই পোড়োবাড়ির কাছে আসিয়া পড়েছি। ব্যোমকেশ টর্চের আলো ফেলিল, কেউ নেই। কিন্তু ব্যোমকেশ দেখিলাম উৎকণ্ঠিত হয়ে কি যেন শুনিবার চেষ্টা করিতেছে। এইবার আমিও শুনতে পাইয়াছি, ক্ষীণ শব্দ কিন্তু মনে হচ্ছে কাছেই কোথাও ধ্বস্তাধ্বস্তি চলিতেছে।

‘এদিকে অজিত, শিগগির’, পোড়ো বাড়িটির পাশ দিয়ে আর একটা ছোট্ট গলি চলে গেছে। সেই গলির অন্য পাশে টানা পাঁচিল।

ব্যোমকেশের টর্চের জোরালো আলো গিয়া গলির শেষপ্রান্তে পড়িল। চোখের সামনে উন্মোচিত হইল একটি বীভৎস অপরাধের প্রেক্ষাপট।

নোনাধরা দেওয়ালের পাশটিতেই একটি পুরুষদেহ পড়িয়া রহিয়াছে, আর তার পাশেই হাঁটু মুড়ে বসিয়া আছে প্রেতবৎ একটি মূর্তি।

পতিত পুরুষটির গলার কাছটিতেই ঝিকমিকিয়ে উঠিয়াছে শ্বাপদনখের ন্যায় বক্র একটি ছোরা। ছোরার মালিকের ঊর্ধ্বাঙ্গটি চাদরাবৃত, শুধু চোখ দুটি দেখা যাইতেছে। পাশবিক হিংস্রতায় সেগুলিও শ্বাপদচক্ষুর মতনই জ্বলজ্বল করিতেছে। আমাদের দেখিয়াও মূর্তিটি নড়িল না, শুধু গলা দিয়া একটা অব্যক্ত আওয়াজ বাহির হইল। সে আওয়াজ বড়ই জান্তব।

ByomkeshHiRes005_Ghoul

ব্যোমকেশ দুঃখিতস্বরে বলিল, ‘প্রতিহিংসারও রকমফের আছে, এ পথ বেছে কিই বা পেলেন?’

প্রেতমূর্তির অস্বাভাবিক উজ্জ্বল চোখ দুটি যেন একপলকের জন্য স্তিমিত হইল, পর মুহূর্তেই মর্মান্তিক আর্তনাদে রাত্রির নৈঃশব্দ চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া গেল। ব্যোমকেশ গলির প্রান্তে দৌড়াইয়া গেল, আমার পা আর উঠিল না। মূর্তিটি নিজের গলাতেই আড়াআড়ি ছোরা চালাইয়াছে, কালো চাদরের ওপর দিয়া ঝলকে ঝলকে রক্তের স্রোত বহিতে দেখিয়া আমার প্রাণশক্তি একেবারে নিঃশেষ হইয়া গেছিল।

ব্যোমকেশ যতক্ষণে পৌঁছাইল ততক্ষণে সব শেষ। দেহটি কয়েকবার কাঁপিয়া উঠিয়া নিথর হইয়া গেল। ব্যোমকেশ অন্য পুরুষটির নাড়ী পরীক্ষা করিতে করিতে বলল, ‘অজিত, আমি সুবিমলবাবুকে দেখছি। তুমি বাঁটুলকে নিয়ে অবিলম্বে বড় রাস্তায় যাও। কুহুকে ধরা চাই।’

কিছুই বুঝিলাম না, কিন্তু ব্যোমকেশের গলায় এমন উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেল যে শরীরের সব শক্তি জড়ো করিয়া ছুটিলাম বড় রাস্তার দিকে। মাঝ পথে বাঁটুলের সঙ্গে দেখা, তাহাকে কোনোপ্রকারে বুঝাইলাম আমার পিছনে পিছনে আসিতে।

আমাকে দৌড়াইয়া আসিতে দেখিয়াই কুহু কিছু আঁচ করিয়াছিল। পাশের গলিতে ঢুকিবার সুযোগ অবশ্য ছিল না। আমাকে দৌড়াইতে দেখিয়া কুহুর উল্টোদিকের গলি থেকে বাহির হইয়া আসিয়াছে পুঁটিরাম, আর কুহুর বাঁদিক থেকে ভোজবাজির মতন ফের উদয় হইয়াছে পুঁটিরামের বন্ধু। চব্বিশ ঘন্টা আগে যে কুহুকে দেখিয়াছিলাম তার সঙ্গে এর আকাশ পাতাল তফাত, ফাঁদে পড়া বাঘিনীর মতন তাহাকে ভয়ঙ্কর দেখাইতেছিল।

কি ভাবে সে বাঘিনীকে বাগে আনতাম জানি না, কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া গেল না।

কুহুর দিকে আর একপা মাত্র অগ্রসর হইয়াছি, এমন সময় মনে হইল পায়ের নিচ থেকে মাটি সরিয়া যাইতেছে। দু’পাশের ঘরবাড়ি দুলিতে লাগিল, কানে আসিল মেদিনী বিদীর্ণ কারী এক ভয়াবহ শব্দ। হতভম্ব হইয়া বোঝার চেষ্টা করিতেছি ঠিক কি ঘটিতেছে, বাঁটুল পিছন হইতে আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, ‘মাথা নিচু করুন কর্তা, শুয়ে পড়ুন, শুয়ে পড়ুন’।আর ঠিক সেই মুহূর্তে শোনা গেল জাপানী বোমারু বিমানের গর্জন, মাসাধিককালের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত করিয়া কলিকাতার আকাশ এখন শত্রুপক্ষের দখলে।

ব্ল্যাক আউটের মধ্যেই জাপানীরা বোমা ফেলা শুরু করিয়াছে। বোমার অভিঘাতে যেন সারা শহর টলিতে শুরু করিল।

দশটি মিনিট মাত্র, কিন্তু প্রতি পলে মনে হইতে লাগিল এ যাত্রায় প্রাণ নিয়ে আর ফেরা গেল না। মানুষের আর্তনাদ, বোমার শব্দ, ধ্বংসস্তূপের ধোঁয়া সবকিছু মিলিয়া এক অতিপ্রাকৃত ব্যাপার চোখের সম্মুখে ঘটিয়া গেল।

বোমারু বিমান মিলিয়ে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর যখন মাথা তুলিলাম, দেখিলাম কুহুর চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু কুহুর কথা চিন্তা করিবার মতন অবসর আমার কাছে ছিল না। পড়ি কি মরি করে দৌড়াইয়া সেই পোড়ো বাড়ির কাছে ফের ফিরিলাম, সৌভাগ্যবশতঃ বিমানহানায় ব্যোমকেশ বা সুবিমল কেউই আহত হন নাই।

ব্যোমকেশ আমাকে দেখিয়াই বলিল, ‘তাকে ধরতে পারলে না?’

আমাকে নিরুত্তর দেখিয়া মাথা নাড়িল, ‘ভাগ্যের মার, তুমি আমি নিমিত্ত মাত্র। নাহলে এনারই বা এ অবস্থা হয় কেন?’

এতক্ষণে আমার নজর পড়িল আততায়ীর মৃতদেহের দিকে। কিছুক্ষণ আগের স্মৃতি পুঙ্খনাপুঙ্খ মনে পড়িয়া গেল, শিহরিয়া উঠিলাম।

জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘এ কে ব্যোমকেশ?’

ব্যোমকেশ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া মৃতের মুখ হইতে চাদরটি সরাইয়া দিল, ‘চিনতে পারছ?’

বিলক্ষণ, এনার ছবি শেষ তিন দিনে বেশ কয়েকবার দেখিতে হইয়াছে। ইনি অমিয় সান্যাল, সুবিমল সান্যালের একমাত্র পুত্র।

বিস্মিত হইয়া ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘কিন্তু ইনি ছিলেন কোথায়? আর এসবের অর্থই বা কি?’

‘কুহু যেখানে ছিল অমিয় সান্যালও সেখানেই ছিল, অর্থাৎ…’ বলিয়া সামনের বাড়িটির দিকে তাকাইয়া রহিল। তারপর বাড়িটির দিকে অগ্রসর হইতে হইতে বলিল, ‘অর্থ খোঁজার জন্য এ বাড়ির ভিতর আরেকবার না গেলেই নয়। অজিত তুমি বাঁটুল কে নিয়ে বাইরে থাকো, পুঁটিরাম গিয়ে পুলিশে খবর দিক।’

 

বাকি রাত্রির হাঙ্গামা মিটিবার পর পরদিন সকালে বীরেনবাবু দু’জন কনস্টেবল লইয়া উপস্থিত হইলেন, পুলিশের জীপগাড়িতেই সুবিমল সান্যালের বাড়ি যাইতে হইল। প্রবেশ করিবার সময় সুবিমলের ভৃত্যটি কিছু বলিবার উপক্রম করিতেছিল কিন্তু পুলিশ দেখিয়া সরিয়া পড়িবার চেষ্টা করিল। বীরেনবাবু প্রকান্ড এক হুঙ্কার দিয়া বলিলেন, ‘তোর বাবু কোথায়?’

সে কাঁপিতে কাঁপিতে বৈঠকখানার ঘরের দিকে ইশারা করিল। ব্যোমকেশ পা বাড়াইতে বাড়াইতে বীরেনবাবুকে বলিল ‘একে যেতে দেবেন না, দরকার পড়বে।’

বৈঠকখানার ঘরে প্রবেশ করিয়া মনে হইল রাতারাতি সুবিমলের বয়স পনের কুড়ি বছর বাড়িয়া গিয়াছে, যেন অশীতিপর এক বৃদ্ধর দিকে তাকাইয়া রহিয়াছি।

বীরেনবাবু ব্যোমকেশের দিকে একবার তাকাইলেন তারপর সুবিমলের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, ‘আমি দুঃখিত আপনাকে এই সময়ে বিরক্ত করতে হচ্ছে। কিন্তু আপনার জবানবন্দী নেওয়া নিতান্তই প্রয়োজন।’

সুবিমল যেন কথাটা ঠিক বুঝিতে পারিলেন না, ‘কিসের জবানবন্দী?’

বীরেনবাবু অসহিষ্ণু গলায় বলিলেন, ‘আশা করি আপনি জেনেছেন যে আপনার ছেলেই অপরাধী। সে একটা দুটো নয়, চার চারটে খুন করেছে। ব্যোমকেশ বাবু না পৌঁছলে সেটা পাঁচটা হত, নিজের ছেলের হাতেই খুন হতেন। অপরাধী কেন একাজ করল সেটা সবিস্তারে জানা প্রয়োজন।’

ব্যোমকেশ এতক্ষণ চুপ করিয়া ছিল, এবার বলিল, ‘কিন্তু অপরাধ তো একটা নয়, অপরাধীও এক জন নয়। তাই অপরাধীর মোটিভ নিয়ে আলোচনা করার আগে একবার অপরাধের ফিরিস্তি নিয়ে আলোচনা হোক।’

বীরেনবাবু বিস্মিত হইয়া পড়িলেন, ‘আমি জানি মেয়েটিকে ধরা যায়নি এখনো। কিন্তু সে আলাদা করে কি অপরাধ করেছে ব্যোমকেশ বাবু? সে ছিল নেহাতই অমিয়র দোসর।’

ব্যোমকেশ নির্লিপ্ত স্বরে বলিল, ‘বীরেনবাবু, আশা করছি এই মুহূর্তে আপনার হাতে কিছুটা সময় আছে।’

বীরেনবাবু অধিকতর অবাক হইয়া বলিলেন, ‘তা আছে। কিন্তু কেন বলুন তো?’

ব্যোমকেশের দৃষ্টি সুবিমল সান্যালকে ছুঁইয়া গেল, ‘কারণ অপরাধের ফিরিস্তি দিতে একটু সময় লাগবে। এটাও মনে রাখা দরকার যে এই নৃশংস অপরাধের সূত্রপাত কলিকাতায় নয়, রেঙ্গুনে।’

‘রেঙ্গুন, মানে বার্মা?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। আমাদের কাছে আজ সকালেই শুনেছেন যে সুবিমল সান্যাল বার্মায় কাঠের ব্যবসা করতে গিয়ে ভাগ্য ফিরিয়েছিলেন। কিন্তু আমার ধারণা শুধু কাঠের ব্যবসা করে সুবিমল সান্যাল এত অর্থ উপার্জন করেননি।’

ব্যোমকেশ সুবিমলের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়া বলিল, ‘আপনি নিজে থেকে কি কিছু বলতে চান সুবিমল বাবু?’

সুবিমল উত্তর দিলেন না, শুধু শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকাইয়া রহিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘বেশ, আমি নিজেই বলছি তাহলে। কিছু জায়গায় আমার নিজের থিয়োরী আছে বটে কিন্তু আমার ধারণা সে থিয়োরী নির্ভুল’।

কাঠের ব্যবসা করে সুবিমল সান্যাল দু’পয়সার মুখ ঠিকই দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি অতি দ্রুত বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। আর সেই স্বপ্ন সার্থক করতে তিনি লগ্নি করেছিলেন কিছু বেআইনি ব্যবসায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার বেশ কিছু বছর আগের কথা, কিন্তু রেঙ্গুনের অবস্থা পড়তে শুরু করেছে। অথচ বাংলায় তার থেকেও খারাপ অবস্থা, দলে দলে মানুষ বার্মাতে পাড়ি জমাচ্ছেন সামান্য কিছু অর্থোপার্জনের আশায়।

সুবিমল ঠিক এই সুযোগটাই নিলেন। রেঙ্গুনের ব্রথেলগুলোতে টাকা খাটাতে শুরু করলেন তিনি, সেই সঙ্গে সুবিমলের লোকেরা অসংখ্য বাঙালি মহিলাদের ঠকিয়ে, পয়সার লোভ দেখিয়ে এই ব্রথেলগুলোতে নিয়ে আ্সতে শুরু করল। আর একই সাথে শুরু হল ড্রাগের চোরাচালান। চীন থেকে যে ড্রাগ ভারতে আসে তার মালিকানা অনেকের, দামও অনেক বেশী। সুবিমল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকে অনেক সস্তায় কোকেন কিনে ভায়া রেঙ্গুন চালান করতে লাগলেন কলকাতায়’।

ব্যোমকেশ আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, ‘মনে আছে কুহু কি বলেছিল? রমলা ছিল তার সই। কিন্তু যেটা সে বলেনি তা হল কুন্তী এবং শ্যামা দু’জনকেই সম্ভবত সে আগে থেকে চিনত। এবং চিনেছিল ওই রেঙ্গুনেই।’

আমি অবাক হইয়া বলিলাম, ‘কুহুও রেঙ্গুনের মেয়ে?’

‘কুহুর কথায় পরে আসছি। কিন্তু আমার ধারণা কুন্তী এবং শ্যামা দু’জনেই কলকাতায় এসেছিল রেঙ্গুন থেকেই। শ্যামা হয়ত সত্যিই সিলেটের মেয়ে কিন্তু পুরোদস্তুর খোঁজখবর নিলে দেখা যাবে কলকাতায় আসার আগে সে রেঙ্গুনেই ছিল।’

বীরেনবাবু অধৈর্য হইয়া বলিলেন ‘কিন্তু অমিয় সান্যাল এদের খুন করল কেন?’

‘সে কথাতেই আসছি বীরেনবাবু। কিন্তু তার আগে রেঙ্গুনের কথা শেষ করতে হবে। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয় বছর পাঁচ ছয় আগে বার্মা প্লেগে ছারখার হয়ে গেছিল, খোদ রেঙ্গুনেও নয় নয় করে কম মানুষ মারা যান নি। সুবিমল সান্যাল মানুষের এই দুর্যোগেও নিজের লাভ এবং লোভের কথা ভুলতে পারলেন না’।

‘উধাও হওয়ার আগে অমিয় সান্যাল প্লেগের চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি বই গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েছিল। সে বই আমার হাতে আসে, দেখি জায়গায় জায়গায় অমিয় নোট নিয়েছে, বইয়ের কিছু কিছু জায়গা আবার পেনসিল দিয়ে দাগানো। এরকমই একটি জায়গায় একটি অদ্ভুত অথ্য পাই যেখানে বইয়ের লেখক বেলাডোনা বিষের কথা বলেছেন, বেলাডোনা বিষে মানুষ মরলে নাকি মৃতের শরীরে প্লেগের মতনই লক্ষণ দেখা যায়। ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরী গিয়ে খোঁজ করতেও একই তথ্য পাওয়া গেল, সেখানে অবশ্য একাধিক বই জানিয়েছে বেলাডোনার সঙ্গে আরো কিছু বিষ মিশিয়ে এক ধরনের সিরাম তৈরি করা যায় যা দিয়ে মানুষ মারলে তিন চার দিনের জন্য বোঝা যাবে না মানুষটি প্লেগে মরেছে না বিষক্রিয়ায়।’

ব্যোমকেশ বীরেনবাবুর দিকে তাকাইয়া বলিল, ‘আর ঠিক এই সময়টিতেই বার্মা ভারতের থেকে আলাদা হয়ে গেল, ফলে স্থলসীমান্ত দিয়ে কোকেন চোরাচালানে সুবিমল সান্যালের বিস্তর অসুবিধা ঘটছিল। সেই সময় কিছু ভাবে ইনি বেলাডোনা বিষের হদিশ পান।’

সুবিমল সান্যালের এতক্ষণে যেন সম্বিৎ ফিরিল, ব্যোমকেশের দিকে তাকাইয়া সরোষে বলিলেন, ‘আমার এই চূড়ান্ত দুঃখের সময়ে রাশি রাশি আজগুবি কথা বানিয়ে আপনার কি লাভ হচ্ছে ব্যোমকেশ বাবু?’

ব্যোমকেশ তীব্র স্বরে বলিল, ‘আজগুবি কিনা সে কথা আদালত বিচার করবেন। কিন্তু নিজের ছেলে কেন খুন করতে চেয়েছিল আপনাকে, সে কথা কি নিতান্তই জানতে চাইবেন না?’

জোঁকের মুখে যেন নুন পড়িল, সুবিমল সান্যাল চুপ করিয়া গেলেন।

‘বেলাডোনা বিষের কথায় ফিরছি, কিন্তু তার আগে আপনার কাজের লোকটিকে একটি প্রশ্ন করতে চাই’, ব্যোমকেশ সুবিমলের ভৃত্যর দিকে তাকাইয়া বলিল, ‘রামবাগানের বাড়ি থেকে ভাড়া আদায় করতে তুমিই তো যেতে?’

ভৃত্যটি চুপ করিয়া আছে দেখে ব্যোমকেশ তার দিকে তর্জনী উত্থাপন করিয়া বলিল, ‘চার চারটি খুনের মামলা। এখন কথা নাই বলতে পারো কিন্তু মনে রেখো আদালতে তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য লোপাটের দোষ প্রমাণিত হলে ফাঁসি না হলেও আট দশ বছরের জেল তো হবেই। খুনী থাকত ওই বাড়িতেই। এ বাড়ি ভাড়া বোধহয় তুমি তোমার বাবুকে জানিয়ে দাওনি?’

ভৃত্যটি ভয়ে ডুকরাইয়া উঠিল, ‘কর্তা জানতেন না। টাকার লোভে করে ফেলেছি বাবু।’

ব্যোমকেশের দৃষ্টি তীক্ষ্ন হইয়া উঠিল ‘কিন্তু কর্তা যে যে বাড়ির কথা জানতেন তার সংখ্যাও তো কম নয়। রামবাগান এলাকায় সুবিমল ক’টা ঝুপড়িঘরে ভাড়া খাটাতেন?’

সুবিমলের দিকে একবার ভীত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া ভৃত্যটি বলিল, ‘খান পঞ্চাশেক হবে।’

ঘরে উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হইয়া গেলাম। ব্যোমকেশ বীরেনবাবুকে বলিল, ‘বুঝেছেন তো? রেঙ্গুনের মতন কলকাতার ব্রথেলেও ইনি যথেষ্ট লগ্নি করেছিলেন। আমার ধারণা ওই বস্তির শেষের পোড়ো বাড়িটি ওনার ড্রাগ চোরাচালানের গুদাম, সে কারণেই প্রায় সব ঘরই বন্ধ।’

‘যাই হোক, বেলাডোনা বিষের কথায় ফিরি। আমার অনুমান সুবিমল রেঙ্গুনের ব্রথেল থেকে অপেক্ষাকৃত বেশী বয়সী কিছু মহিলাকে হাত করেন। এই মহিলারা বেছে বেছে অনভিজ্ঞ, নতুন কম বয়সী বাঙালি মেয়েদের সুবিমলের কাছে পাঠাত। সুবিমল এদেরকে যথেষ্ট টাকা পয়সা দিতেন, তাই নতুন মেয়েগুলি সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেলেও এরা টুঁ শব্দটি করত না। কুন্তী এবং শ্যামা, এই দু’জনেই সম্ভবত ছিল সুবিমলের অপকর্মের দোসর। তবে তাদের ধারণা ছিল সুবিমল নিজের লালসা চরিতার্থ করে এদের অন্য কোথাও বেচে দেন, হয়ত সুবিমল নিজেই তাই বুঝিয়েছিলেন।’

ব্যোমকেশ একবারের জন্য থামিল, আমাদের সবার দিকে তাকাইয়া সামান্য নাটকীয় ভঙ্গীতে বলিল, ‘কিন্তু সুবিমল বিকৃতকাম মানুষ নন।’

‘তিনি তার থেকেও বড় পিশাচ।’

‘এই মেয়েগুলিকে তিনি বেলাডোনা এবং আরো কিছু বিষের সিরাম দিয়ে প্রাণে মারতেন। আর তারপর তাদের শরীর ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বার করে নিয়ে ভরতেন কোকেনের প্যাকেট। সেই দেহগুলিকে কফিনে পুরে জাহাজে চাপিয়ে নিয়ে আসা হত মাঝসমুদ্রে। সমুদ্রের অতলে চিরবিলীন হওয়ার আগে তাদের শরীর কেটে কোকেনের প্যাকেটগুলোকে পুনরুদ্ধার করা হত। প্লেগের লাশ দেখে পুলিশ বা কাস্টমস কেউই অন্য কিছু ভাবত না।’

অমিয় সান্যালের নৃশংসতাকেও যেন এ কাহিনী হার মানায়, ঘরসুদ্ধ লোক আতঙ্কে সুবিমল সান্যালের দিকে ঘাড় ঘুরাইল।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘কিন্তু শুধু এই মেয়েগুলিই নয়, বেলাডোনা বিষ প্রাণ কেড়েছিল আরও একজনের। সেখানে অবশ্য লোভ কাজ করেনি, কাজ করেছিল ভয়।’

দেখিলাম সুবিমল সান্যালের রগ দপদপ করিতেছে।

ব্যোমকেশ গাঢ়স্বরে বলিল, ‘আপনার অনেক অপরাধই আপনার স্ত্রী মেনে নিয়েছিলেন কিন্তু মানুষ খুন অবধি আর সহ্য করতে পারেন নি। পুলিশে যাওয়ার ভয় দেখিয়েছিলেন কি?’

সুবিমল উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

বীরেনবাবু এবং তাঁর দুই কনস্টেবলও লাফ দিয়া উঠিলেন। সুবিমল ক্লান্ত স্বরে বলিলেন, ‘আমি কোথাও যাচ্ছি না। কিন্তু ব্যোমকেশ বাবুর এই অনৃতভাষণ আমার শরীর আর নিতে পারছে না। আমাকে মাফ করবেন, কিন্তু আমার চোখেমুখে জল দেওয়া নিতান্তই দরকার।’

বীরেনবাবু একবার ব্যোমকেশের দিকে তাকাইলেন, তারপর কি ভেবে বলিলেন, ‘যান। কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসবেন।’

সুবিমল প্রায় টলিতে টলিতে বৈঠকখানার পাশের বাথরুমটিতে ঢুকিলেন।

বীরেনবাবু বলিলেন, ‘কিন্তু অমিয় সান্যাল বাপের পথটি কেন ধরল?’

ব্যোমকেশ ক্ষণেক তাঁহার দিকে চাহিয়া বলিল, ‘এখনও বুঝলেন না? এ যে নিতান্তই প্রতিহিংসা।’

বীরেনবাবু অবাক হইয়া বলিলেন, ‘প্রতিহিংসা?’

ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িল, ‘বাপের প্রতি। সে জানতে পেরেছিল সুবিমল সান্যালের হাতেই তার মা খুন হয়েছেন। সে এও জানতে পেরেছিল যে শ্যামা আর কুন্তী দু’জনেই ছিল সুবিমলের ডান হাত। খেয়াল করুন, হত্যার পর দু’জনের শরীরের ভেতর থেকেই কিভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বার করে নেওয়া হয়েছিল। ঠিক যে ভাবে বার করে নেওয়া হয়েছিল রেঙ্গুনের নিরীহ বাঙালি মেয়েগুলির শরীর থেকে।’

বীরেনবাবু চিন্তিত স্বরে বলিলেন, ‘বুঝতে পারছি। কিন্তু সে খবর অমিয় পেল কোথা থেকে?’

ব্যোমকেশ একটি ক্ষুদ্র শ্বাস ফেলিয়া বলিল, ‘কুহু তাকে খবর দিয়েছিল বীরেনবাবু। কিন্তু কুহু যে কে সে নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই, শুধু মনে হয় সুবিমলের অসংখ্য পাপকাজে তার জীবনটিও কিছু ভাবে সর্বস্বান্ত হয়েছিল।’

এই সময় বীরেনবাবুর কনস্টেবলদের একজন আসিয়া বলিলেন, ‘স্যার, বাথরুমের কল থেকে একটানা জল পড়ার শব্দ হচ্ছে।’

‘সে কি হে, বাথরুমের মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে গেল নাকি লোকটা?’

ব্যোমকেশ হঠাৎ ‘সর্বনাশ’ বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। তারপর দৌড়াইয়া গিয়া বাথরুমের দরজায় ক্রমান্বয়ে ধাক্কা দিতে লাগিল। ব্যোমকেশের চিৎকারে কিছু একটা ছিল, বীরেনবাবু এবং কনস্টেবলরাও দৌড়াইয়া আসিলেন, চার জন মানুষ সর্বশক্তি দিয়া দরজায় ধাক্কা দিতে লাগিলেন। মিনিট তিন চার পর বাথরুমের দরজার পাল্লাটি খুলিয়া এল।

আমরা হুড়মুড় করিয়া বাথরুমে ঢুকিয়া পড়িলাম।

বাথরুমের মাটিতে সুবিমল সান্যাল পড়িয়া রহিয়াছেন, বাঁ হাতে ধরা একটি সিরিঞ্জ। মুখ থেকে গ্যাঁজলা ফেনাইয়া উঠিতেছে। সুবিমলের ডান পাশে একটি সিরামের বোতল, তার ভিতরে আর কোনো পদার্থ নেই বলেই বোধ হল।

ব্যোমকেশ এক ঝলক দেখিয়া বলিল, ‘নিজের শাস্তিটি যথাযোগ্য বেছেছেন ভদ্রলোক। এ সেই বেলাডোনা বিষের সিরাম।’

সপ্তাহখানেক পরের কথা, কলিকাতা শহরে এখনো জাপানী বোমাবর্ষণ ছাড়া আর কোনো কথা নাই। কিন্তু আশঙ্কাটি বাস্তবায়িত হওয়ার জন্যই হোক বা ক্ষয়ক্ষতি সেরকম না হওয়ার জন্যই হোক, মানুষজন শহরে ফিরিয়া আসিতে শুরু করিয়াছেন। হ্যারিসন রোডও ধীরে ধীরে তার প্রাণচঞ্চলতা ফিরিয়া পাইতেছে।

ব্যোমকেশ প্রভাতী সংবাদপত্রটি টেবলের উপর ছুঁড়িয়া দিয়া বলিল, ‘কাগজওলারা এখন সুবিমল সান্যালের চোদ্দ গুষ্টিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।’

বলিলাম, ‘তারা যে তোমার চোদ্দ গুষ্টিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে না এই ঢের।’

কথাটির মধ্যে কিছু সারবত্তা আছে, অমিয় এবং সুবিমল দু’জনেই মারা গেলেও কমিশনার সাহেব ব্যোমকেশের প্রভূত প্রশংসা করিয়া সাংবাদিকদের জানাইয়াছিলেন ব্যোমকেশের সাহায্য ব্যতীত রামবাগানের রহস্য সমাধান সম্ভব হইত না। ফলে বীরেনবাবুর প্রভূত জ্বলন ঘটিয়াছিল, কাগজেও পর পর দুই তিন দিন ব্যোমকেশের নাম উঠিয়াছিল।

হঠাৎ মনে পড়িল সেই হাতের লেখার রহস্য নিয়ে ব্যোমকেশ আর আলোকপাত করেনি। জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘অমিয় সান্যাল যে কুহুর সঙ্গে পরিচিত হয় দেবদত্তর সূত্রেই সে নিয়ে তো সন্দেহ নেই। এই ছদ্ম-অপহরণের প্ল্যানটিও কি তাহলে কুহুরই?’

ব্যোমকেশ একটি চায়ের কাপটি নামাইয়া বলিল, ‘কুহু যে কে, কি তার আসল উদ্দেশ্য ছিল সে তো জানার উপায় নেই। সুবিমলের ওই বাড়িটি ড্রাগ চোরাচালানের কাজেই ব্যবহৃত হত, ওখানে থাকার ব্যবস্থা শুরুতে ছিল না। আমি জেনেছি ও বাড়িতে কুহু উঠে এসেছিল অতি সম্প্রতি। মনে হয় অমিয়র ছদ্ম-অপহরণের প্ল্যানটি বানানোর পর, যাতে অমিয়রও লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে সুবিধে হয়। এবং তুমি শুনলে বিস্মিত হবে, এ কাজে কুহুকে সাহায্য করেছিল বাঁটুল।’

আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম, ‘বলো কি? বাঁটুল?’

ব্যোমকেশ হাসিল, ‘আমাদের বাঁটুলও যে পঞ্চশরে কাবু হতে পারে এবারে সেই প্রমাণটুকুই হাতেনাতে পেলুম। ও বাড়িতে অসংখ্য ঘর সে কথা বাঁটুল জানত, সুবিমলের চাকরকে সে হাত করেছিল কুহুর জন্য একটি ঘর ছেড়ে দিতে। সুবিমল জানতেন না, চাকরটির উপরি পাওনা হত। এ ভাবেই সে আরো কয়েকটি ঘর ভাড়া দেয় ওই বাড়িতে, অমিয় এরকমই একটি ঘরে খদ্দের সেজে লুকিয়ে থাকত।’

‘তোমার কি মনে হয় সুবিমল কুহুকে চিনতেন?’

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল, ‘তা তো জানি না। তবে মনে হয় না কলকাতায় সুবিমলের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ঘটেছিল, যদিও সুবিমল এবং শ্যামা – কুন্তীদের ওপর প্রতিহিংসা নিতেই তার কলকাতা আসা। সে আটঘাট বেঁধেই নেমেছিল, আমার ধারণা অমিয়কে প্রলুব্ধ করে কুহু-ই।’

‘শুধু কুহুর কথাতেই তাহলে অমিয় খুনগুলো করে?’

ব্যোমকেশ চিন্তামগ্ন স্বরে বলিল, ‘শুধু কথা তো নয়, কুহু যেরকম প্ল্যান করে এসেছিল তার কাছে যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকারই কথা। সেসব দেখে এবং মা’র খুন হওয়ার কথা জানতে পেরে অমিয় যেনতেন প্রকারেণ প্রতিহিংসা নিতে চেয়েছিল।’

বলিলাম, ‘চিঠিগুলি কার লেখা? কুহুর?’

‘উঁহু, কুহুর হাতের লেখা তো তুমি চেনো। তিনটি চিঠিই লিখেছিল অমিয়। সুবিমল সান্যাল আমাকে প্রথম যে চিঠিটি দিয়েছিলেন সেটায় একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেয়েছিলাম – ও’কারের ওপর মাত্রা দেওয়া। সেই এক জিনিস দেখতে পাই দেবদত্তর পকেট থেকে পাওয়া চিঠিতে। প্রথম চিঠিটি বেঁকাচোরা ভাবে লেখা হয়েছিল কারণ বাবার কাছে নিজের হাতের লেখা লুকনোর জন্য অমিয় বাঁ হাতে লিখেছিল সে চিঠি। কিন্তু দেবদত্তর চিঠিতে ওই মাত্রাওলা ও’কার দেখেই চমকে উঠেছিলাম, বুঝেছিলাম অমিয় নিজেই যখন চিঠি লিখেছে দেবদত্তকে তখন সে স্বেচ্ছায় লুকিয়ে রয়েছে কোনোখানে। নিজের অপহরণকান্ড নিজেই কেন সাজিয়েছে সে ব্যাপারটা প্রথমে ধরতে পারিনি। আমি টাকাপয়সার সূত্রে ভাবছিলাম, ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরীতে বেলাডোনা বিষের কথাটা জানার পর থেকেই বুঝতে পারি টাকাপয়সা নয়, প্রতিহিংসাই এখানে মোটিভ। দেবদত্তর খুনটা অবশ্য অন্য কারণে, বীরেনবাবু ওই একটি ব্যাপারে নিজের অজান্তেই ঠিক বলে ফেলেছিলেন – কুহুর সঙ্গে অমিয়র আলাপ দেবদত্তই করিয়েছিল, সুতরাং তাকে পৃথিবী থেকে সরাতেই হত।’

আমি কিন্তু কিন্তু করিয়া বলিলাম, ‘তাহলে সেদিন যে বড় বললে মুক্তিপণের দাবী জানিয়ে দ্বিতীয় যে চিঠিটি এসেছিল তার হস্তাক্ষরের সঙ্গে প্রথম চিঠির হস্তাক্ষরের কোনো মিল নেই?’

ব্যোমকেশ মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল, ‘নেই-ই তো।’

‘তার মানে?’

‘তার মানে এই যে আমাদের আসল চিঠিটি সুবিমল বাবু দেখান নি। যেটি দেখিয়েছিলেন সেটি জাল, ওনার নিজের হাতে লেখা। বীরেন বাবু কয়েকদিন আগে আসল চিঠিটি সুবিমলের দেরাজ থেকে উদ্ধার করেছেন। সে চিঠিতে লেখা ছিল নিজের কৃত পাপের পরিণাম চুকনোর জন্য তিরিশ হাজার টাকা নিয়ে দেখা করবে। স্বাভাবিক ভাবেই সুবিমল সে চিঠি আমাকে দেখাতে ভরসা পান নি, কারণ কোন পাপের কথা বলা হচ্ছে সে নিয়ে প্রশ্ন উঠত।’

‘কিন্তু আরো একটা কথা ব্যোমকেশ। সুবিমলের তো টাকা নিয়ে আরো একদিন পরে যাওয়ার কথা ছিল, নয় কি?’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘সে নেহাত ধোঁকা। কুহুকে যে মুহূর্তে আমি কথা দিলাম তাকে রক্ষা করার জন্য রাস্তার মোড়ে দাঁড়াব, তখনই অমিয় নতুন একটি চিঠি তৈরি করে সুবিমলকে সেদিনকেই বস্তির ওই নির্জন প্রান্তটিতে ডেকে পাঠাল। সুবিমল নিজের প্রাণহানির আশঙ্কা বোধহয় করেছিলেন, কিন্তু তিনি ছেলেকে সত্যিই ভালোবাসতেন। ছেলেকে ছাড়ানোর জন্য যে বিপদই আসুক না কেন তার সম্মুখীন হতে চেয়েছিলেন। এমনই নিয়তি যে জানতেও পারলেন না সেই ছেলেই তাঁকে খুন করার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে।’

মনে পড়িল বাড়ি থেকে বেরনোর সময় সুবিমল ‘অজিতবাবু’ বলিয়া ডাকিয়া উঠিয়াছিলেন। সে কথা বলাতে ব্যোমকেশ বলিল ‘শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বোধহয় দোলাচলে ভুগছিলেন। চিঠিতেও তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে জানাতে বারণ করা হয়েছিল, বলা হয়েছিল নাহলে ছেলের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।’

‘কিন্তু তোমার সন্দেহ হল কি করে?’

‘ওই যে তুমি বললে ব্যাঙ্ক ম্যানেজার নিজে বাড়িতে টাকা নিয়ে এসেছিল। সুবিমল সেদিন দুপুর বিকাল নাগাদ ব্যাঙ্কে গিয়ে পরের দিনের জন্য টাকা তুলে আনবেন ঠিক করেছিলেন। কিন্তু সকালে চিঠি পেয়ে দেখলেন সেদিনকেই টাকা নিয়ে যেতে হবে, সম্ভবত প্যানিক করে ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকেই টাকা যোগাড় করে চলে আসতে বলেছিলেন।

আমার অবশ্য নিছক সন্দেহই হয়েছিল, তাই পুঁটিরামকে বলেছিলাম বাঁটুলকে নিয়ে সুবিমলের বাড়ির সামনে পাহারা দিতে। সুবিমল না বেরোলে তো কোনো সমস্যাই নেই। বেরোলে যেন বাঁটুল তাকে ফলো করে, আর পুঁটিরাম এসে রামবাগানের গলির মোড়ে আমাকে খবর দেয়। আমরা গায়েব হলে কুহুর সন্দেহ হতে পারে এই ভেবে ওকে আরো একটা কাজ দিয়েছিলাম, কোনো একটি বন্ধুকে দিয়ে কুহুকে কিছুক্ষণের জন্য ব্যস্ত রাখতে।’

হাসিয়া বলিলাম, ‘পুঁটিরাম তো দেখছি এ যাত্রা আমার থেকেও বেশী সার্ভিস দিয়েছে তোমায়।’
ব্যোমকেশ একটি কটাক্ষ হানিয়া বলিল, ‘তাই তো দেখছি। ভাবছি পরের অভিযানগুলো থেকে তোমাকে শুধু লেখালেখির দায়িত্বটুকুই দেব। এই যে পুঁটিরাম, তোমাকে নিয়েই কথা হচ্ছিল।’

পুঁটিরাম একগাল হাসিল, বলিল, ‘চিঠি দিতে এলাম বাবু।’

‘চিঠি, এলো কখন?’

‘এক্ষুনি এল বাবু।’

ব্যোমকেশ অবাক হইয়া বলিল, ‘এই সাতসকালেই পিওন চিঠি দিতে শুরু করেছে?’

‘আজ্ঞে পিওন না বাবু, একটি অল্পবয়স্ক ছেলে এসে দিয়ে গেল।’

আমি উৎসাহভরে বললাম, ‘খোলো খোলো, কাগজওলাদের দৌলতে তোমার তো এখন পোয়া বারো। মনে হচ্ছে নতুন মক্কেল।’

ব্যোমকেশ খামটি ছিঁড়তে বেরিয়ে এল একটি চিঠি এবং একটি আংটি। চিঠিতে এক ঝলক চোখ বুলিয়েই উত্তেজনায় ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল। তারপর শশব্যস্ত হইয়া ডাকিল, ‘পুঁটিরাম, পুঁটিরাম।’

পুঁটিরাম দৌড়াইয়া আসিতে ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, ‘একটি অল্পবয়স্ক ছেলে দিয়েছে বললে এ চিঠি?’

পুঁটিরাম ঘাড় চুলকাইয়া বলিল, ‘আজ্ঞা হাঁ, প্যান্ট শার্ট পরা ছেলে। তবে মুখটা বড় কচি দেখতে।’

ব্যোমকেশ অস্ফূটে বলিয়া উঠিল, ‘কুহু’।

আমি হতভম্ব হইয়া বলিলাম, ‘কুহু?’

ব্যোমকেশ হাতের চিঠিটি আমার দিকে আগাইয়া দিল।

দেখিলার কুহুর হস্তাক্ষরই বটে।

লিখিয়াছে, ‘ব্যোমকেশ বাবু – সুবিমল সান্যালকে সপরিবারে নাশ করিব, এই পণ করিয়া আসিয়াছিলাম। সে সপরিবারেই গত হল বটে কিন্তু আমার কোনো ইচ্ছাই পূর্ণ হইল না। না পারিলাম সুবিমলকে মারিতে, না পারিলাম অমিয়কে রাখিতে। অমিয়কে দেবদত্তর সঙ্গে রামবাগানে আসিতে দেখিয়া ধরিয়া লইয়াছিলাম সে তার বাবার মতনই নরপিশাচ। আমার সে ধারণা ভাঙ্গিতে বেশী সময় লাগেনি। প্রথম দিন থেকেই তাকে ভালোবাসিয়া ফেলিয়াছিলাম, আমার আসল পরিচয় যখন সে জানিত না তখনো একটি দিনের জন্যও সে আমায় অসম্মান করে নাই। সে সততই একাকী ছিল, মার মৃত্যু তাকে মানসিক ভাবে নিঃশেষ  করিয়াছিল। তার মার মৃত্যুর প্রতিশোধ আমরা একসাথে নেওয়ার শপথ লইয়াছিলাম, তার কারণও ছিল। অমিয়র মার জন্যই সুবিমল সান্যাল আমাকে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন প্রয়োগে মারিতে পারেন নাই। তাঁর সাহায্যেই আমি পলাইতে সক্ষম হই, কিন্তু সুবিমলের হাতে তাঁর প্রাণ যায়। রেঙ্গুনের পাদ্রিদের দয়ায় লেখাপড়া শিখিতেছিলাম, হয়ত সুস্থ জীবন যাপন করিতে পারিতাম। কিন্তু প্রতিহিংসার আগুন সে ইচ্ছা গ্রাস করিল। তাই অমিয় নিজেও যখন প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হইয়া খুন করিতে শুরু করিল আমি তাহাকে বাধা দিই নাই। কুন্তী বা শ্যামার প্রতি আমার সামান্যতম সহানুভূতিটুকুও ছিল না, রেঙ্গুনের মেয়েরা আজও এদের নাম শুনিলে শিহরিয়া ওঠে। রমলা যথার্থই আমার সই ছিল, কিন্তু শ্যামাকে খুন করিবার সময় সে অমিয়কে দেখিয়া ফেলিয়াছিল। অমিয়র সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা সে জানিত না, বেচারী আমাকে এসেই তার গোপন কথাটি বলে। তাই আর কোনো উপায় রহিল না।

আমাকে সুবিমলের কাছে বেচিয়া শ্যামা একটি সোনার আংটি পাইয়াছিল। অমিয় তাই প্রবল আক্রোশে খুনের পর তার অনামিকাটি কাটিয়া লয়। সে অনামিকায় তখনো একটি আংটি ছিল, যা আমার কোনো কাজে লাগিবে না। আপনার জিম্মায় রাখিয়া গেলাম।

যতদিন না ফের দেখা হয় ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন। কিন্তু দেখা আর একটিবার হবেই, সে দিনের জন্য প্রস্তুত থাকিবেন। অমিয়কে আমার জীবন থেকে আপনিই কাড়িয়া লইয়াছেন, সে মূল্য না গুনিয়া লইয়া এ পৃথিবী ছাড়ি কি করে বলুন?’।

চিঠিটি পড়িয়া মিনিটখানেক বাক্যস্ফূর্তি হইল না। তারপর ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘কি বুঝলে? তোমার কি প্রাণহানির সম্ভাবনা দেখা দিল?’

ব্যোমকেশ আংটিটি ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিতেছিল, আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, ‘কিছু কিছু নয় বাবা, কিছু কিছু নয়।’

আমাকে উত্তেজিত হইতে দেখিয়া এবার সে হাসিয়া ফেলিল। আমার হাত থেকে চিঠিটি লইয়া ভাঁজ করিতে করিতে বলিল, ‘বিচলিত হয়ো না। কুহুর যদি ইচ্ছা হয় তবে নিশ্চয় আমাদের আবার দেখা হবে তবে আমার ধারণা খুব শীঘ্র তা হওয়ার নয়। রেঙ্গুল – কলকাতা মিলিয়ে সুবিমলের সাহায্যকারীর সংখ্যা খুব কম হবে না, কুহু আপাতত যাবে তাদের থেকে এক এক করে ভবনদী পারের কড়ি বুঝে নিতে। ও নিয়ে ভেবে মাথা খারাপ কোরো না, তুমি বরং কাগজটা আরেকবার বাড়াও।’

কুহুর কথাগুলি আমার মাথা থেকে বেরোচ্ছিল না, বিক্ষিপ্ত মনের কিছু বিনোদন আবশ্যিক। কাগজে চোখ বুলাইয়া বলিলাম, ‘সিনেমা দেখতে যাবে? নতুন সিনেমা এসেছে, বিষবৃক্ষ’।
ব্যোমকেশ একটি হাই তুলিয়া বলিল, ‘বেলাডোনাতেও মন ভরেনি দেখছি, আরো বিষ চাইছ। তা আছেন কে?’

‘আছেন অনেকেই এবং নবাগতা সুনয়না দেবী’।

ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইল, ‘সুনয়না দেবীর সঙ্গে মোলাকাত পরে কখনো হবে। বরং চলো, হাতিবাগান ঘুরে আসি। না ফাটা বোমার সন্ধানে সে চত্বরে নাকি মেলা বসে গেছে’।

 

 

 

ফের ফেলুদা – ‘রাজধানীতে তুলকালাম’

Pinup_001_01F_06

ফেলুদার প্রথম গল্পের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে  ‘টগবগ’ পত্রিকার উৎসব সংখ্যার  (২০১৬/ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ)জন্য লিখেছিলাম ফেলুদার নতুন গল্প ‘রাজধানীতে তুলকালাম’। ফ্যান ফিকশনই বটে তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে ‘প্যাস্টিশ’ (Pastiche) শব্দটি ব্যবহার করতে ইচ্ছুক। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠবে ফ্যান ফিকশন এবং প্যাস্টিশের মধ্যে কি তফাৎ? প্যাস্টিশ লিখতে হলে লেখকের অরিজিন্যাল স্টাইলটি মেনে চলতেই হবে, ফ্যান ফিকশন লিখিয়ে দের থেকে সেরকম কোনো চাহিদা থাকে না। বুঝতেই পারছেন একটি সফল প্যাস্টিশ লেখার জন্য গবেষণা করা অত্যন্ত জরুরী। পাঠক হয়ে যখন তরতর করে পড়ে চলেছেন তখন এক কথা, আর যখন লেখকের জুতোয় পা গলিয়ে তাঁকে যথাযথ ভাবে অনুকরণ করার চেষ্টা করছেন সে আরেক কথা। কাজটি বলতে গেলে অপরিসীম কঠিন। হয়ত সে কারণেই ‘ফ্যান ফিকশন’ শব্দবন্ধটি একটু তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই ব্যবহৃত হয়, ‘প্যাস্টিশ’ শব্দটি কিন্তু বনেদী ঘরানার। অবশ্য লেখক বা প্রকাশক নিজে বললেই তো হবে না, একটা ফ্যান ফিকশন প্যাস্টিশে উন্নীত হয়েছে কিনা তা বলবেন সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠকরাই।  নতুন প্লটের সঙ্গে পুরনো স্টাইল মানিয়ে গেল কিনা সে বিচারের দায়িত্বও নিতান্তই পাঠকের। ‘রাজধানীতে তুলকালাম’ সেই বিচারে ফ্যানফিকশন না প্যাস্টিশ সে কথা বিচারের ভার সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠকদের ওপরেই ছেড়ে দিলাম।  বন্ধুবর এবং সৃষ্টিসুখের কর্ণধার রোহণ কুদ্দুসকে ধন্যবাদ জানাই লেখাটি ব্লগে প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়ার জন্য। অনবদ্য ছবিগুলি এঁকেছেন  ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং শিল্পী অভীক কুমার মৈত্র (টগবগ উৎসব সংখ্যার জন্য অবশ্য ছবি এঁকেছিলেন আরেক প্রতিভাবান শিল্পী সুমিত রায়)। ফেলুদা প্যাস্টিশ কেমন লাগল সে কথা জানাতে ভুলবেন না যেন, ব্লগ পোস্টে  আপনাদের মন্তব্যের জন্য অপেক্ষা করে থাকব।  

FeludaHiRes001_Qutub 

‘হ্যারি হুডিনি চাইলে জবরদস্ত গোয়েন্দাও হতে পারতেন’, মশলার কৌটো থেকে বেছে বেছে কয়েকটা মৌরি তুলতে তুলতে বলল ফেলুদা। রোববারের গোটা সকালটাই ও হুডিনির অটোবায়োগ্রাফি পড়ে কাটিয়েছে তাই আঁচ করছিলাম খাওয়ার টেবলে ম্যাজিক নিয়ে দু’চার কথা বলবে। সেটা অবশ্য হয় নি, এখন খাওয়ার পর বৈঠকখানার ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই এই কথা।

আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘বইতে তাই লিখেছেন বুঝি?’

‘দূর বোকা, উনি লিখবেন কেন! এটা আমার ডিডাকশন। যে কায়দায় একের পর এক আধ্যাত্মিক বুজরুকদের মুখোশ খুলে গেছেন, পাকা গোয়েন্দারাও পারবে না। একটা কথা অবশ্য লিখেছেন – যে যত বড় ভণ্ড, তার ভক্তিও তত বেশী।’

বোঝো কান্ড, আমি শুধু জানতাম ভদ্রলোক দারুণ দারুণ সব এসকেপ ম্যাজিক দেখিয়ে গেছেন। এই হাতকড়া খুলে ফেলছেন, ওই নদীর তলায় থাকা বাক্সর মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে দর্শকদের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। ফেলুদাকে বলাতে ও বলল আমেরিকাতেও খুব কম লোকেই জানে যে হুডিনি ভণ্ড ধর্মগুরুদের পেছনে সারা জীবন লেগে ছিলেন।

হুডিনিকে নিয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময়ে কলিং বেলটা বেজে উঠল। আমি তড়িঘড়ি উঠতে যাচ্ছিলাম, ফেলুদা একটা হাই তুলে তুড়ি দিতে দিতে বলল, ‘উত্তেজিত হোস না। মক্কেল নয়, জটায়ু এসেছেন।’

আমি অবাক হয়ে তাকাচ্ছি দেখে বলল, ‘ভদ্রলোকের গাড়ির নতুন হর্নটা এই প্রথম শুনলি বোধহয়, না?’

তাই তো! মিনিট দুয়েক আগেই গলির মধ্যে থেকে ‘জয় জগদীশ হরে’র সুর শুনতে পাচ্ছিলাম। ফেলুদার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে খেয়াল করিনি যে ওটা গাড়ির হর্ন।

আমাকে যেতে হল না, শ্রীনাথ তার আগেই দরজা খুলে দিয়েছে। লালমোহনবাবু দেখি এক গাল হেসে শ্রীনাথের হাতে একটা বড় প্যাকেট ধরালেন।

ভদ্রলোক ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘নাহুমের কেক মশাই। গত মাসে প্রথম চাখলাম, তারপর থেকে আর কিছু মনেই ধরছে না। এসব সাহেবী কেকের পাশে বাঙালি টিফিন কেক পাত্তা পায় বলুন তো? ছ্যা।’

ফেলুদা ভুরূ তুলে বলল, ‘সাহেবটি যে রাণীর দেশের নন সে খবরটা আশা করি জানেন।’

লালমোহনবাবু একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন, ‘রাণী? মানে ভি…ভিক্টোরিয়া? বিলেতের নয় বলছেন, আমেরিকান বুঝি?’

ফেলুদা মাথা নেড়ে বলল, ‘একশ বছর মতন দেরী করে ফেললেন। এখনো যে আপনি রাণী বলতে ভিক্টোরিয়াকেই বোঝেন সে খবরে এলিজাবেথ কতটা প্রসন্ন হবেন সে নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে সাহেবটি ইহুদী, এবং এসেছিলেন বাগদাদ থেকে।’
জটায়ুর মুখটা দেখার মতন হল। আধ মিনিট মতন গোল গোল চোখে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে  থেকে বললেন,  ‘বাগদাদের সাহেব! বলেন কী ফেলুবাবু?’

‘নোট করে নিন, পরের উপন্যাসে প্রখর রুদ্রর মোকাবিলা কোনো বাগদাদী সাহবের সঙ্গে করিয়ে দেবেন।’

‘হেঁ হেঁ, যা বলেছেন স্যার। তবে নেক্সট লেখাটা ভাবছি দিল্লীর ব্যাকগ্রাউন্ডে রাখব’, জানালেন লালমোহনবাবু।

ফেলুদা চারমিনারের প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করতে গিয়ে থেমে গেল, ‘দিল্লী চললেন নাকি? কবে?’

লালমোহনবাবু হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘শুধু আমি নই, আপনারাও। কিন্তু পুজোর সময় কলকাতা ছাড়তে অসুবিধা নেই তো?’

আমি ফেলুদার দিকে তাকালাম। ফেলুদা উত্তর না দিয়ে সিগারেটটা প্যাকেটের উপর ঠুকতে লাগল। আমি জানি ও কী ভাবছে। পুজোর সময়টা ঠিক কলকাতা ছেড়ে নড়তে চায় না ফেলুদা, রাস্তায় পারতপক্ষে না বেরোলেও বলে পুজোর ফীল টা কলকাতা ছাড়া কোথাও পাওয়া মুশকিল।

‘উপলক্ষটা কী শুনি?’, লালমোহনবাবুকে জিজ্ঞাসা করল ফেলুদা।

ভদ্রলোক একটা কান এঁটো করা হাসি হাসলেন, ‘ইয়ে, দিল্লীর বাঙালি অ্যাসোশিয়েশন একটা সাহিত্যমেলা করছে পুজোর সময়। আমাকে বিশেষ ভাবে ধরেছে যাওয়ার জন্য’। তারপর আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘বুঝলে তপেশ, দিল্লীতেও যে প্রখর রুদ্রর এত খ্যাতি ছড়িয়েছে তা জানতাম না। বললে কিনা গত বছর পুজোর সময় ওদের স্টল থেকেই নাকি ‘ফুজিয়ামার ফৌজ’ এর খান সত্তর কপি বিক্রি হয়েছে।’

এখানে বলে রাখা ভালো ‘ফুজিয়ামার ফৌজ’ বিক্রিবাটার দিক থেকে গত বছর রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসগুলির মধ্যে টানা চার মাস এক নম্বরে ছিল। এ বছর সে বইয়ের পরের খন্ড আসছে, নাম ‘তাইহোকুর তান্ত্রিক’।

ফেলুদা সিক্যুয়েলের খবরটা জানত না,  শুনে জিজ্ঞাসা করল ‘ফুজিয়ামা থেকে সটাং তাইহোকু চলে গেলেন কেন? নিদেনপক্ষে টোকিওতে এক বছর কাটিয়ে গেলে হত না?’

তাতে লালমোহনবাবু বললেন, ‘আরে মশাই, টোকিও – ফুজিয়ামা – তাইহোকু সবই তো জাপানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানীরা কী ফাইটটাই দিয়েছিল বলুন তো, অ্যাকশন সিনে কিন্তু ওদের টেক্কা দেওয়া মুশকিল’।

ফেলুদা লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাইহোকুকে জাপানে নিয়ে গেলে হিন্দি আর চিনি দুই ভাই-ই যে বেদম চটবেন সেটা যেন খেয়াল থাকে।’

লালমোহনবাবু কিছুই বুঝতে পারছিলেন না, বাধ্য হয়ে ওনাকে বলতে হল তাইহোকু শহরটা জাপানে নয়, তাইওয়ানে। ওখানেই সুভাষচন্দ্রের প্লেনটা দুর্ঘটনায় পড়েছিল।

এইবারে এক গাল হেসে বললেন, ‘দেকেচ কান্ড, আমিও তো সুভাষ বোসের জন্যই নামটা শুনেছিলাম। এদিকে লেখার সময়ে কিছুতেই মনে পড়ল না নামটা কেন চেনা লাগছে’।

‘কিন্তু আপনি দিল্লী যাবেন তো ফেলুবাবু?’ একটু উদগ্রীব হয়েই জিজ্ঞাসা করলেন লালমোহনবাবু।

‘যাবি নাকি তোপসে?’

আমি তো যাকে বলে এক পায়ে খাড়া,  পুরো পুজোর ছুটিটা কলকাতায় কাটানোর মানে হয় না। তা ছাড়া দিল্লীর পুজোও দেখা যাবে।

ফেলুদা বলল, ‘আমারও এমনিতে আপত্তি নেই, তবে একটা কন্ডিশন আছে।’

‘এনিথিং ফর ইউ’, বললেন লালমোহনবাবু।

‘আপনার গাড়ির হর্নটি চেঞ্জ করতে হবে। যাওয়ার দিন রজনী সেন রোডে জয় জগদীশ হরে শুনতে পেলে আমি বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে ফের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ব।’

ভদ্রলোক বিস্তর জিভটিভ কেটে বললেন, ‘আরে না না। আসলে নভেল লিখে টু পাইস মন্দ আসছে না তো, তাই ভাবছিলাম ঠাকুরদেবতাকে খুশি রাখাটা দরকার। তবে আপনি যখন বলছেন…’

‘বাই দ্য ওয়ে, তোপসে আর আমার খরচটা…’

‘প্লীজ ফেলুবাবু’ লালমোহনবাবু হাত তুলে থামালেন ফেলুদাকে। ‘এ শর্মা থাকতে আপনি পয়স খরচ করবেন তা কখনো হয়? হরিপদ কালকে গিয়েই রাজধানীতে তিনটে টিকেট কেটে আনবে। আপনাদের দয়াতেই তো একটু করেকম্মে খাচ্ছি।’

 

 

যাওয়ার আগের দিন ফেলুদা বলল ‘তোপসে, চট্ করে তৈরি হয়ে নে তো, একবার সিধুজ্যাঠার বাড়ি ঘুরে আসি। দিল্লীর আসল ইতিহাস জানার জন্য কোন অলিগলিতে ঘুরতে হবে সেটা উনি ছাড়া আর কে বলবেন?’

তৈরি হওয়ার জন্য ভেতরের ঘরে যেতে গিয়ে  হঠাৎ হুডিনির বইটা চোখে পড়ায় মনে হল রাজধানীতেও কী ফেলুদার বরাতে গোয়েন্দাগিরি নাচছে?

কে জানত যে দিল্লী পৌঁছনোর আগেই  ফেলুদার হাতে মোক্ষম এক কেস এসে পড়বে।

 

 

সিধুজ্যাঠা বাড়িতেই ছিলেন, বিশেষ দরকার না পড়লে এমনিতেও পারতপক্ষে ঘর ছেড়ে নড়েন না। আমরা দিল্লী যাচ্ছি শুনে প্রায় চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘একেই বলে সমাপতন। আজকেই ভাবছিলাম ফেলুরামের বাড়িতে একবার যাওয়া দরকার, আর ভাবতে না ভাবতেই তোমরা এসে হাজির। দরকারটা যে দিল্লী যাওয়া নিয়েই। ’

ফেলুদা একটু হেসে বলল, ‘উল্টোটাই সাধারণত হয়ে থাকে বলে মনে হচ্ছে একটা আরজেন্সি আছে। তাই কী?’

‘আরজেন্সি তো বটেই। আর তুমি ছাড়া এ সমস্যার সমাধান কেউ করতে পারবে বলে মনে হয় না, তোমার হাতে সময় আছে কিনা সেটা জানাটাও খুব জরুরী।’

‘নিশ্চয়, আপনি বলুন কী সমস্যা।’

সিধুজ্যাঠা তক্তপোষে বসতে বসতে বললেন, ‘তার আগে বলো জয়পুরের রুবি-আইড প্যারট এর  নাম শুনেছো কিনা?’

‘নাহ, সেরকম তো কিছু খেয়াল পড়ছে না।’

‘১৮৭৩ সালে জয়পুরের মহারাজের জন্য এই টিয়া বানিয়েছিলেন প্যারিসের এক মণিকার। মহারাজার কালেকশনের স্টার আইটেম এই রুবি-আইড প্যারট। এর পুরো শরীরটাই প্রায় নিখাদ সোনা দিয়ে বানানো। চোখ, ঝুঁটি আর পাখায় বসানো রয়েছে দুর্মূল্য রুবি। পান্নাসবুজ এনামেলের কারুকাজ রয়েছে পুরো শরীরটায়। টিয়াপাখি বসে আছে একটা ডালের ওপরে, আর তার মুখে ধরা একটা ফুল। এগুলোতেও হীরে, পান্না, রুবির ছড়াছড়ি। টিয়াপাখিটি দেখে মহারাজের এতই ভালো লেগে যায় যে তিনি সেই ফরাসী শিল্পীকে দিয়ে আর এক পিস বানিয়েছিলেন। তো দু’খানা টিয়ার মধ্যে একটি এখনো জয়পুরের প্যালেসেই আছে, অন্যটি গেছে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়মে।’

‘আমার এই বিষয়ে একটু পড়াশোনা ছিল বলে দু’বছর আগে একটা আর্ট জার্নালে এই টিয়াপাখিদের নিয়ে বিশদে লিখি। তখন কিছু চিঠিপত্র পেয়েছিলাম কিন্তু ওই পর্যন্তই, তারপর সে নিয়ে আর বিশেষ কোনো চর্চার কারণ ঘটেনি। কয়েক মাস আগে হঠাৎই আমি দিল্লী থেকে একটি ট্রাঙ্ককল পাই, ফোনটি যিনি করেছিলেন তাঁর নাম অনুকূল ভদ্র।’

ফেলুদা মাঝখানে বলল, ‘অনুকূল ভদ্র নামটা কিরকম চেনা চেনা ঠেকছে।’

‘চেনা চেনা ঠেকতেই পারে। এককালে বরোদার সয়াজিরাও ইউনিভার্সিটির ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর ছিলেন, বেশ নামটামও হয়েছিল। তারপর খানিকটা আচমকাই রিটায়ারমেন্ট নিয়ে চলে যান, কোথায় যে চলে যান কেউ জানত না। এই এবারে ফোনে বলল এখন ও দিল্লীতে থাকে। আমার আগের পাড়াতেই ওর বাড়ি ছিল, কিন্তু ওকে শেষ দেখেছি তা প্রায় বছর দশেক তো হবেই।’

‘অনুকূল আমাকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল, বুঝলে। বলল জয়পুরের মহারাজার জন্য আরো একটি টিয়া বানানো হয়েছিল এরকম কোনো খবর আমার কাছে আছে কিনা?’

‘মানে তিন নম্বর টিয়া?’

‘একজ্যাক্টলি সো, তিন নম্বর টিয়া। আমি অনুকূলকে বললাম আমার কাছে এরকম কোনো খবর নেই, আমি যতদূর জানি দু’টো টিয়াই বানানো হয়েছিল। ওকে আমার লেখাটার রেফারেন্সও দিলাম, বলল লেখাটা পড়েছিল বলেই আমাকে ফোন করেছে।’

‘যাই হোক অনুকূল তারপর ফোন রেখে দিল, আমিও টিয়ার কথা ভুলে গেছি। তারপর হঠাৎ হপ্তাখানেক আগে আবার তার ফোন, বলল দু’জন ভদ্রলোককে আমার কাছে পাঠাচ্ছে কি এক আর্জেন্ট দরকারে। দু’দিন পরেই তারা এসে হাজির – একজনের নাম পবনদেও জয়সওয়াল আর অন্যজন মাধবরাও যোশী। যোশীর হাতে একটা অ্যাটাচি কেস।’

‘বললে বিশ্বাস করবে না, সেই অ্যাটাচি কেস থেকে কি বেরলো জানো? তিন নম্বর টিয়া। আমি তো দেখে থ।’

ফেলুদা জিজ্ঞাসা করল, ‘টিয়াটি উদয় হল কোথা থেকে?’

‘সে কথাতেই যাচ্ছি। মাধবরাও যোশী গুজরাটের একজন আর্ট কালেক্টর এবং পেশার খাতিরে অনুকূলের পূর্বপরিচিত। ছ’মাস আগে উদয়পুরে ঘুরতে গিয়ে এই টিয়ার খবর পান পবনদেও জয়সওয়াল এর কাছে। জয়পুরের মহারাজার পার্সোনাল ফিজিসিয়ানের বংশধর হলেন এই পবনদেও  জয়সওয়াল।

পবনদেও  জানালেন মহারাজার চিকিৎসক অন্তত দু’বার ওনাকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে  এনেছিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মহারাজ তাই তিন নম্বর টিয়াটি সেই চিকিৎসকের হাতে তুলে দেন। জয়পুরের  রাজা মারা যাওয়ার পর তিনি উদয়পুরের মহারাজার কাছে চাকরি নিয়ে চলে যান। পবনদেওর রিয়াল এস্টেটের বিজনেসে মন্দা চলছে বলে টিয়াটি যোশীর কাছে বেচতে চান। কিন্তু বুঝতেই পারছ টিয়া আসল কিনা সেটা আগে ভেরিফাই করা দরকার। যোশী তাই অনূকুলের সাজেশনে জয়সওয়াল এবং টিয়া দু’জনকে নিয়েই আমার কাছে ভেরিফাই করতে চলে এসেছেন। সোনাদানা খাঁটি কিনা সে তো যে কোনো স্যাকরাই বলে দেবে কিন্তু আসল কথাটা হল প্যারিসের সেই শিল্পীই এই টিয়া বানিয়েছিলেন কিনা সেটা জানা দরকার।’

‘পেলেন প্রমাণ?’

‘দাঁড়াও, তোমাকে সে টিয়ার একটা ছবি দেখাই। জয়সওয়ালই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল’, তক্তপোষে রাখা গাদাখানেক বইয়ের একটার ভেতর থেকে সিধুজ্যাঠা একটা ফটোগ্রাফ টেনে বার করলেন, “ফেলু, ওদিক থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা দাও তো”।

কালারড ছবিতেই টিয়া পাখিকে দেখে আমার মাথা প্রায় ঘুরে যাচ্ছিল, এরকম চোখধাঁধা্নো শিল্পকর্ম  আমি আগে দেখিনি। টিয়ার দু’টো চোখের রুবিগুলো ছবিতেও যেন ঝলসে ঝলসে উঠছে, ডানায় অর্ধচন্দ্রাকারে সার দিয়ে বসানো হীরেগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে এ জিনিস অমূল্য।

FeludaHiRes002_SidhuJyatha

টিয়াপাখির মুখে ধরা যে ফুল তার ওপর এবার ম্যাগনিফাইং গ্লাস ফেললেন সিধুজ্যাঠা, ‘কিছু দেখতে পাচ্ছ ফেলু?’

‘পেয়েছি। ফুলের তিনটি পাপড়ির ওপর সোনার জলে তিনটি ইংরেজি অক্ষর খোদাই করা – এইচ, এম, ভি। খুবই ছোট করে খোদাই করা যদিও।’

‘ফ্যান্টাসটিক। এই এইচ – এম – ভি’র মানে কিন্তু হিজ মাস্টার্স ভয়েজ নয়। এই তিন আদ্যক্ষরের মানে হেনরিয়েটা মারিয়া ভিনসেন্ট।’

ফেলুদা একটু অবাক হয়ে বলল, ‘শিল্পী তাহলে মহিলা ছিলেন?’

‘উঁহু, হেনরিয়েটা মারিয়া ছিলেন শিল্পীর স্ত্রী। জয়পুরের মহারাজা নিজেই অনুরোধ করেছিলেন শিল্পীকে তাঁর নামের আদ্যক্ষরগুলো কাজটিতে রেখে দিতে; ভদ্রলোক নিজের নামের জায়গায় তাঁর স্ত্রীর নামটি অমর করে দিয়ে গেছেন। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষই শিল্পীর এই কেরামতির খবরটুকু রাখেন।’

‘এ তো বিশাল খবর! তাহলে মাধবরাও যোশী এই তৃতীয় টিয়ার বর্তমান মালিক ?’

সিধুজ্যাঠা বসে পড়লেন, ‘সেখানেই যে সমস্যা ফেলু, জিনিসটা থাকলে তবে তো মালিক। সে টিয়া মিসিং।’

‘মিসিং?’ ফেলুদার চোখের পলক নড়ছে না।

‘খুবই রহস্যজনক ব্যাপার ফেলু। কাগজে দেখেছ বোধহয় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের এমপ্লয়ীরা সারা সপ্তাহ ধরে স্ট্রাইক ডেকেছে। তাই খানিকটা বাধ্য হয়েই ওদের বিকালবেলার রাজধানী এক্সপ্রেস নিতে হয়েছিল। সকালবেলা উঠে দেখছে অ্যাটাচি কেস যেমনকার তেমন আছে, শুধু ভেতরে টিয়াটাই নেই। অথচ অ্যাটাচি কেসের চাবি যোশীর কোটের ভেতরের পকেট থেকে এক চুলও নড়েনি।

‘ভেরি স্ট্রেঞ্জ। কিন্তু আপনি জানলেন কি করে?’

‘গতকাল জয়সওয়াল ফোন করেছিল। সেই জানাল সব খবর। বলা বাহুল্য যে যোশী এবং জয়সওয়াল দু’জনেই অত্যন্ত ওরিড, যেনতেনপ্রকারেণ তারা টিয়াটি ফেরত পেতে চায়। জয়সওয়াল পার্সোন্যালি রিকুয়েস্ট করেছে তুমি যাতে কেসটা নাও।’

‘জয়সওয়াল আমাকে চেনেন নাকি?’ ফেলুদার মুখ দেখেই বোঝা গেল এ খবরটা সত্যিই সারপ্রাইজিং।

সিধুজ্যাঠা হাসলেন, ‘চিনত না। এই এবারে আমার বাড়ি এসেই চিনেছে। ওদের কাছে গল্প করছিলাম রেসকোর্সের খুনের মামলাটা তুমি কী ব্রিলিয়ান্টলি সলভ করেছ। বুঝতেই পারছ তোমার কীর্তিকলাপ জয়সওয়ালকে কতটা ইনফ্লুয়েন্স করেছে। আর পুলিশের ব্যাপার তো জানোই, তাদের আঠারো মাসে বছর।’

ফেলুদা চুপ করে কিছু একটা ভাবছিল, সিধুজ্যাঠার কথা শেষ হলে বলল, ‘আপনি ওনাকে জানিয়ে দিন আমি আসছি। আজ বিষ্যুতবার, শনিবার আমরা দিল্লী পৌঁছব রাজধানী এক্সপ্রেসে। সেরকম হলে নয় রবিবারেই জয়সওয়ালের সঙ্গে দেখা করা যাবে।’

‘বাঁচালে ফেলু’, সিধুজ্যাঠা ফেলুর হাত ধরে বললেন, ‘জয়সওয়াল উঠেছে হোটেল মেট্রোপলিটানে, আমি তোমাকে হোটেলের অ্যাড্রেস আর ফোন নম্বরটা দিয়ে দিচ্ছি। তুমি দিল্লী পৌঁছেই ওর সাথে দেখা করে  নিও।’

রাজধানীতে জটায়ু এই বোধহয় প্রথম চড়লেন। সিটের গদিতে যে ভাবে বারকয়েক হাত বোলালেন তাতে বোঝাই গেল দারুণ ইম্প্রেসড হয়েছেন।

‘বুঝলেন, আমাদের পাড়ার নগেন সমাদ্দার বলছিল লালুদা ওই ট্রেনে চড়ার পর আর অন্য সব ট্রেন মনে হবে মার্টিনের ন্যারোগেজের ছ্যাকড়াগাড়ি। ছোঁড়া একদম খাঁটি কথা বলেছে।’ এই সময় ট্রেনের অ্যাটেন্ডান্ট আমাদের কুপে ঢুকে প্রত্যেককে একটা করে গোলাপ ফুল দিয়ে গেলেন।

লালমোহনবাবু ফুলটা ধরে বললেন, ‘নিজেকে শাহাজান শাহাজান মনে হচ্ছে মশাই। উফফ! গাড়িতে উঠতে না উঠতেই কী খাতির যত্ন।’

ফেলুদা সুটকেসটা সীটের তলার ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, ‘তাহলেই ভাবুন, শাহাজানেই এই। শাজাহান বললে না জানি আরো কত আদর আপ্যায়ন পাবেন’।

লালমোহনবাবু একটু থমকে গেছিলেন, তারপর গদিতে একটা জোর চাপড় দিয়ে হেসে উঠতে গিয়েও থেমে গেলেন। কুপের চতুর্থ যাত্রীটি ঢুকে পড়েছেন। লালমোহনবাবু আমার দিকে তাকিয়ে যেরকম মুখভঙ্গি করলেন তাতে বেশ টের পাওয়া গেল আমরা তিনজন ছাড়াও যে আরেকজন যাবেন সেই সম্ভাবনার কথাটা ওনার মাথাতেই ছিল না।

ভদ্রলোক আমাদের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘গুড ইভনিং।’ চল্লিশ পেরিয়ে গেছেন বলেই মনে হল, মাথার চুলে যদিও সামান্য পাক ধরেছে।

‘গুড ইভনিং মিস্টার সোলাঙ্কি’, বলল ফেলুদা।

ভদ্রলোক এবার স্পষ্ট বাংলায় বললেন, ‘আপনি কী গাঙ্গুলি না মিটার?’

লালমোহনবাবু দু’জনের কথাবার্তা শুনে প্রায় হাঁ হয়ে গেছিলেন। আমাকে তাই বলতে হল কামরার বাইরে রাখা রিজার্ভেশন লিস্টে চোখ বোলালেই সবার পদবীগুলো দেখে নেওয়া যায়।

‘মিটার, আমার নাম প্রদোষ মিত্র। এ আমার খুড়তুতো ভাই তপেশরঞ্জন মিত্র, আর ইনি আমাদের বন্ধু লালমোহন গাঙ্গুলী।’

সোলাঙ্কি ফেলুদা আর লালমোহনবাবু দু’জনকেই একটা করে ভিজিটিং কার্ড দিলেন। ফেলুদা কার্ডে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘লিটল রাসেল স্ট্রীটের সোলাঙ্কি জুয়েলার্সটা কী আপনারই দোকান?’

‘গ্রেট, একদম ঠিক ধরেছেন’, জানালেন সত্যেন্দ্র সোলাঙ্কি, ‘জুয়েলারি নিয়ে আমাদের চার পুরুষের ব্যবসা। কলকাতায় ব্যবসাটা আমিই দেখি। নর্থ ইন্ডিয়ায় ব্যবসা চালায় আমার ভাইরা। দিল্লীতে বিজনেসের কাজেই যাচ্ছি যদিও, ভাইদের সঙ্গেও দেখা হয়ে যাবে। আপনাদেরও বিজনেস নাকি ঘুরতে চললেন?’

ফেলুদাকে খানিকটা বাধ্য হয়েই নিজের কার্ডটা দিতে হল। কার্ড দেখে সোলাঙ্কি বললেন, ‘কি বলব মিস্টার মিটার, জীবনে এই প্রথম কোনো প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের সঙ্গে আলাপ হল। তা দিল্লী চললেন কী কোনো কেসের কাজে?’

ফেলুদা লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এনার জন্যই দিল্লী যাওয়া। কলকাতায় বসে যা যা প্লট ভাবার ছিল সব ভেবে ফেলেছেন, এখন শহরের বাইরে যাওয়া ছাড়া গতি নেই।’

‘কেয়া বাত মিস্টার গাঙ্গুলি, আপনি রাইটার নাকি?’

‘হেঃ, ওই একটু আধটু’, লালমোহনবাবু দেখলাম বিনয় দেখাতে গিয়ে প্রায় চোখ বুজে ফেললেন। সোলাঙ্কি বাঙালি রাইটারদের ভুরি ভুরি প্রশংসা করে বললেন, ‘আমি একটু টয়লেট থেকে ফ্রেশ হয়ে আসি। এসে কিন্তু আপনার লেখার গল্প শুনব। কাস্টমারদের বায়নাক্কা শুনে শুনেই জীবন কেটে গেল, কোনো উত্তেজনা নেই মশাই লাইফে। একটু থ্রিল না হলে চলে বলুন তো?’

সোলাঙ্কি বেরোলে লালমোহনবাবু বললেন, ‘দিব্যি লোক। একজন অবাঙালি বাংলা সাহিত্য নিয়ে এত খোঁজখবর রেখেছে, ভাবাই যায় না। কি বলেন?’

ফেলুদা ভুরু কুঁচকে কি যেন ভাবছিল। লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হুঁ, একটু বেশিই খবর রাখেন।’

লালমোহনবাবু ধড়মড় করে উঠে বসে বললেন, ‘কী ব্যাপার মশাই? এর মধ্যেই সাসপিশাস কিছু দেখলেন নাকি?’

‘নাহ, সেরকম কিছু নয়। আপনারা বসুন, আমি একটু ঘুরে আসি’। ফেলুদার গলাটা একটু অন্যমনস্ক কি?

লালমোহনবাবু ঝিম মেরে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার দাদার কী ব্যাপার বলো তো তপেশ? আমার কিন্তু সোলাঙ্কিকে দিব্যি লাগল।’ ফেলুদা যে কি ভাবছে সে নিয়ে আমারও কোনো আইডিয়া নেই, সেটাই বললাম ভদ্রলোককে।

‘অনেকদিন হাতে কেস আসেনি বলে বোধহয় তোমার দাদা একটু উত্তেজিত হয়ে আছেন’। লালমোহনবাবুর কথায় খেয়াল পড়ল ফেলুদা এখনো ওকে জয়পুরী টিয়া নিয়ে কিছু বলেনি।

ফেলুদা একটু পরেই ফিরে এল, এখন একেবারে স্বাভাবিক মুখ। আর একটু পরেই সোলাঙ্কিও এসে ঢুকলেন।  চান করে এলেন বোঝা যাচ্ছে, গা থেকে ভুরভুর করে পারফিউমের গন্ধ বেরোচ্ছে। বাকি সময়টুকু গল্পগুজবেই কেটে গেল, সোলাঙ্কি লালমোহনবাবুর প্লট শুনে কখনো বললেন, ‘গুড গড’, কখনো বললেন ‘লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে মশাই’। ফেলুদা সেরকম ভাবে আড্ডায় না ঢুকলেও টুকটাক কথা বলছিল অবশ্য।

খাওয়ার পরে সোলাঙ্কি বললেন, ‘দুটো আপারই তো আপনাদের। আমি যদি একটা লোয়ারে শুয়ে পড়ি, উড ইউ মাইন্ড? আমার আবার কালকে দিল্লী পৌঁছেই ছোটাছুটি করতে হবে, একটা ভালো ঘুম দরকার।’

আমাদের কারোরই অসুবিধা নেই। সোলাঙ্কির ওপরের আপার বার্থে গেলাম আমি; লালমোহনবাবু নিলেন অন্য আপার বার্থ, বললেন ইদানীং আপার বার্থেই নাকি ওনার ভালো ঘুম হয়।

মাঝরাতের দিকে একবার ঘুমটা ভেঙ্গে যেতে নীচে কোনাকুনি নজর গেল।

কুপের হাল্কা নীলচে আলোতেও দেখতে পেলাম ফেলুদার চোখ দুটো খোলা।

সোলাঙ্কি ভালোই ঘুমোচ্ছেন, হাল্কা নাক ডাকার একটা আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।

আবার কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই, সকালে ব্রেকফাস্ট নিয়ে অ্যাটেন্ডান্ট আসার পর ঘুম ভাঙ্গল।

সকাল দশটা কুড়িতে পৌঁছনোর কথা, নিউ দিল্লী স্টেশনে রাজধানী ঢুকে গেল দশটা পনেরোয়। লালমোহনবাবু বললেন, ‘ভারতবর্ষে একটা ট্রেন বিফোর টাইম পৌঁছচ্ছে, এটা ভাবতে পারেন? ধন্য রাজধানী এক্সপ্রেস’। সোলাঙ্কি যাওয়ার আগে হ্যান্ডশেক করে গেলেন, ফেলুদাকে বললেন ‘কলকাতায় ফিরলে একবার আসবেন আমাদের দোকানে, খুব ভালো লাগবে।’

জনপথের কাছে লালমোহনবাবুই হোটেলের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। ফেলুদা হোটেলে ঢুকেই আগে রিসেপশনে গেল ফোন করতে, বুঝলাম জয়সওয়ালকে পৌঁছনোর সংবাদটা দেবে। আমাকে বলে গেল জটায়ুর ঘরে ওয়েট করতে।

লালমোহনবাবু বিছানায় আয়েশ করে ঠেস দিয়ে বসে বললেন, ‘সেই সিমলা যাওয়ার সময়ে দিল্লী এসেছিলাম, মনে আছে তপেশ?’

মনে আর থাকবে না? এখনো ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। খুব অল্প সময়ের জন্যই দিল্লীতে ছিলাম, কিন্তু তার মাঝেই ফেলুদার ওপর হামলা হয়েছিল।

হামলার কথা লালমোহনবাবুর খেয়াল আছে কিনা বোঝা গেল না, আমাকে বললেন, ‘দিল্লী নিয়ে এথিনিয়াম ইস্কুলের বৈকুন্ঠ মল্লিক এমন কবিতা লিখেছিলেন, এখনো আবৃত্তি করলে লোম খাড়া হয়ে ওঠে। শুনবে নাকি?’, বলে অবশ্য আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই চোখ বুজে আবৃত্তি শুরু করলেন –

নিখিল বিশ্ব ক্রন্দনরত, ভেসেছে যমুনা তীর

তৈমুর নামে ঘাতকে তোমার ছিন্ন করেছে শির।

হৃদিমূলে মম জ্বলেছে বহ্নি, রুষিয়া উঠেছে তেজ,

তবু দেখি ঠাঁই পেয়েছে হেথায় মুঘল আর ইংরেজ।

অহো দিল্লী, তুমিই সেই জনগণরাজধানী

হিংসারে ফেলি রেখেছ যতনে চিরশান্তির বাণী।

 

লালমোহনবাবু চোখ বন্ধ করেই বললেন, ‘শহরটা নিয়ে কবির আবেগ দেখেছ তপেশ? আর প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসাই যে আসল কথা সেটা দু লাইনেই কেমন মনে করিয়ে দিলেন বলো?’

‘খুব ভালোবেসে বোধ হয় মুঘল বা ইংরেজ কাউকেই এ শহর ঠাঁই  দেয় নি’, ফেলুদা যে কখন ফিরে এসেছে খেয়াল করিনি।

লালমোহনবাবু প্রতিবাদের ভঙ্গীতে হাতটা ওঠালেন, ‘কী বলছেন মশাই? কত বছর ধরে রাজত্ব করে গেল সব।’

‘সেটাই কথা লালমোহনবাবু, রাজত্ব করার জন্যই তো এসেছিল। ভালোবাসা পেতে এসেছিল কী?’

লালমোহনবাবু খুব একটা কনভিন্সড হয়েছেন বলে মনে হল না। ফেলুদা অবশ্য তাতে পাত্তা না দিয়ে বলল, ‘চলুন খাওয়াদাওয়াটা সেরে ফেলা যাক। আপনার সাহিত্যমেলা তো শুরু হচ্ছে আজ বিকালে, তাই না? দিল্লী শহরটা ঘোরার মতন এখনো কিছু সময় আছে তাহলে’।

আমার মনটা ছটফট করছিল ফোনে কী কথা হল শোনার জন্য কিন্তু ফেলুদা দেখলাম সেসবের ধারেকাছে গেল না।

 

অক্টোবরের শুরু বলে দুপুরের দিকটাতেও বেশ চমৎকার আবহাওয়া। আমরা জনপথ থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা চলে এসেছি কুতব মিনারে। ঘুরতে আসার প্ল্যানটা ফেলুদারই। লালমোহনবাবু ট্যাক্সিতে আসতে আসতেই বলছিলেন, ‘গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ভাই তপেশ, কুতুব মিনার দেখার শখ কী আজকের? ফরটি টু’তে জ্যাঠা মোহিনীমোহন দিল্লী ঘুরতে এসেছিলেন। গড়পারের বাড়িতে বসে কুতুব মিনারের কত গপ্পো যেই শুনিচি, ওফ! বেলাডোনা পালসেটিলা খেতাম আর স্বপ্ন দেখতাম আমিও একদিন ঘুরতে আসব। তা সে স্বপ্ন অ্যাদ্দিনে সত্যি হতে চলেছে।’

প্রায় সাড়ে সাতশ বছর আগে কুতব উদ দিন আয়বক যে মিনার বানিয়ে গেছিলেন সেটা অবশ্য এখন দেখা যাবে না। প্রথমে বাজ পড়ে, তারপর ভূমিকম্পে আসল মিনার প্রায় বেপাত্তা হয়ে আছে। এখন যা রয়ে গেছে তা মূলত ব্রিটিশ আমলে বানানো। কুতব মিনারের প্রায় পাশেই বিখ্যাত লৌহস্তম্ভ; শোনা যায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ,যাঁকে আমরা বিক্রমাদিত্য নামে জানি, নাকি বানিয়েছিলেন এই লোহার পিলারটি।

লালমোহনবাবু খানিকক্ষণ হাঁ করে থেকে বললেন, ‘এক ফোঁটা মরচে নেই। ভাবতে পারো? অথচ সেই যে রাজস্থানে নেপালি কুকরিটা নিয়ে গেছিলাম তাতে অলরেডি জং ধরে গেছে। কলিযুগে বেঁচে থেকে সুখ নেই ভায়া।’

ফেলুদা সবে প্রশ্ন করেছে ‘বিক্রমাদিত্য কোন যুগের রাজা ছিলেন বলে আপনার মনে হয়’, আর ঠিক সেই সময় একটা ঢিল এসে লালমোহনবাবুর কাঁধে থাকা ঝোলায় লেগে পড়ে গেল। লালমোহনবাবু চমকে উঠে পড়েই যাচ্ছিলেন, আমি তাড়াতাড়ি ধরে না ফেললে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। ফেলুদাকে ডাকব বলে ঘুরে দেখি ফেলুদা বাহারী কাজ করা খিলানগুলোর দিকে সোজা দৌড় দিয়েছে।

‘ভাই তপেশ, এটা কী ব্যাপার বলো তো?’, ঘুরে দেখি লালামোহনবাবুর হাতে ধরা একটা ছোট্ট চিরকুট, ভদ্রলোকের মুখটা পুরো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

চিরকুটটা হাতে নিয়ে দেখি ইংরেজিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, ‘টিয়ার হদিশ ছেড়ে কলকাতা ফিরে যাও, নইলে ঘোর বিপদ।’

মিনিট পাঁচেক বাদে ফেলুদা ফিরল। ওকে চিরকুটটা দিতে শুধু এক ঝলক দেখে গম্ভীর গলার বলল ‘হুঁ।’

তারপর লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি ঠিক আছেন তো? আমাদের এখানে আরো ঘন্টাখানেক কাটানো দরকার।’

লালমোহনবাবু ঘাড় নাড়লেন, খুব একটা ইচ্ছা নেই বলেই মনে হল যদিও। এরকম একটা দুর্ঘটনার পরেও ফেলুদা থাকার জন্য ইনসিস্ট করছে দেখে আমিও একটু অবাক হলাম।

‘আপনাকে আজ রাত্রেই ধীরে সুস্থে বলব ভেবেছিলাম। কিন্তু ঘটনা যে দিকে মোড় নিয়েছে তাতে আপনাকে আর অপেক্ষা করিয়ে লাভ নেই।’  আমরা চিত্তরঞ্জন পার্কের একটা চায়ের দোকানে এখন বসে। জটায়ুর মূহ্যমান ভাবটা এখনো ঠিক কাটেনি, ফেলুদার কথায় এবার একটু নড়েচড়ে উঠলেন। ‘কী ব্যপার বলুন তো ফেলুবাবু?’

ফেলুদার থেকে জয়পুরের টিয়ার ঘটনাটা শোনার পরে লালমোহনবাবু বেশ অবাকই হলেন। ‘কিন্তু মশাই, আপনি তো কেসটা বলতে গেলে হাতেই নেন নি। অকুস্থলে গিয়েই উঠতে পারলেন না অথচ এর মধ্যেই পেছনে লোক লেগে গেল?’

‘লোক যে লেগেছে সেটা পরিষ্কার, কিন্তু কখন থেকে লেগেছে সেটাই প্রশ্ন।’

‘তার মানে বলছেন আমরা হোটেল থেকে বেরনো ইস্তক ফলো করছিল?’

ফেলুদা মাথা নাড়ল, ‘লোকটাকে এক ঝলকই দেখতে পেয়েছিলাম, দূর থেকে মনে হল একটা ট্যুইডের জ্যাকেট পরেছিল। হোটেল থেকে বেরনোর সময় এরকম কাউকে চোখে পড়েনি। হতেই পারে যে ফলো করছিল তার চোখে ধূলো দেওয়ার অসীম ক্ষমতা। যদি না……’

‘যদি না কী মশাই?’

‘কলকাতা থেকেই পিছু নিয়ে থাকে।’

লালমোহনবাবু কপালের ঘাম মুছে বললেন, ‘বলেন কী? ক্ক-কলকাতা থেকেই?’

ফেলুদা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল, ‘সম্ভব সবই। আমাকে আরো একটা জিনিস ভাবাচ্ছে।’ বলে চুপ করে গেল।

আমি আর লালমোহনবাবু দু’জনেই তাকিয়ে আছি বুঝতে পেরে তারপর অবশ্য মুখ খুলল, ‘জয়সওয়াল কেন এলেন না।’

আমি অবাক। জয়সওয়ালেরও তাহলে কুতব মিনারে আসার কথা ছিল?

‘সকালে উনিই তো সাজেস্ট করলেন। বললেন দিল্লীর ওই দিকটাই একটু নিরিবিলি আছে, আর দুপুরের দিকে একটু কম লোক থাকে’, বলল ফেলুদা।

আমি বললাম, ‘আর কী বললেন জয়সওয়াল?’

‘বেশী কিছু নয়, তবে গলাটা শুনে মনে হল বেশ ঘাবড়ে আছে। আমাকে বললেন যোশীর সঙ্গে মীট করানোর আগে উনি আলাদা করে আমার সঙ্গে দেখা করতে চান, কিছু জরুরী কথা আছে। ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না, দেখি হোটেলে ফিরে আবার ফোন করতে হবে।’

লালমোহনবাবু এতক্ষণে একটু চাঙ্গা হয়েছেন বলে মনে হল। হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘আপনি রহস্যকে ছাড়তে চাইলেও মশাই রহস্য আপনাকে ছাড়বে না। আপনার কাছে যদিও এ রহস্য নস্যি। চুরির মাল ফেরত পেতে বেশী সময় লাগবে না।’

ফেলুদা চারমিনারে আগুন ধরাতে ধরাতে বলল, ‘আপনার মুখে আবার খাবো দেদার পড়ুক, সিধুজ্যাঠাকে আশাহত হতে দেখলে সত্যিই খারাপ লাগবে।’

 

চায়ের দোকান থেকে বেঙ্গলি অ্যাসোশিয়েশনের অফিস কাম পুজোর জায়গাটা হেঁটে আরো মিনিট দশেক মতন। লালমোহনবাবু ওই দশ মিনিট হাঁটতে গিয়ে একেবারে ছেলেমানুষের মতন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে শুরু করলেন। শুরু হয়েছিল ‘কমলা ভান্ডার’ নামের একটা মুদির দোকানে দশকর্মার জিনিসপত্র দেখে। তারপর ‘বেঙ্গল স্যুইটস হোম’-এ রসগোল্লা আর পান্তুয়ার সাজানো ট্রে দেখে বেজায় খুশী হলেন, শেষে বৈকালিক মাছের বাজারে ঢাউস ঢাউস রুই আর কাতলা মাছ কাটা হচ্ছে দেখে উত্তেজনার চোটে  ফেলুদার জামার আস্তিন ধরে বললেন, ‘বাঙালিরা করেছে কী মশাই? পুরো দিল্লী তো আমাদেরই দখলে।’

ফেলুদা বলল, ‘তাও তো দুর্গাপুজোর কথাটাই বাদ গেল। তবে দিল্লীর পুজো শুধু বাঙালির নয় সেটা মনে রাখা দরকার।’

আজকে পঞ্চমী কিন্তু শনিবার পড়েছে বলে পুজোর জায়গায় মেলা লোক। লালমোহনবাবু গিয়ে হাজির হতে বেশ সাড়াই পড়ে গেল।  বাঙালি অ্যাসোশিয়েনশনের তরফ থেকে যিনি চিঠি পাঠিয়েছিলেন তিনি লালমোহনবাবুর পূর্বপরিচিত, নাম প্রণব পাইন। প্রণববাবু দু’হাত জড়ো করে বললেন, ‘স্বনামধন্য গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্র আমাদের পুজোয় এসেছেন, এটা ভাবাই যাচ্ছে না।’

ফেলুদা নমস্কার ফিরিয়ে বলল, ‘আমি যে গোয়েন্দা সে কথা আপনি জানলেন কী করে? লালমোহনবাবু বলেছেন নাকি?’

‘কি বলছেন মশাই, আপনি এখানে লালমোহনবাবুর মতনই সেলিব্রিটি। আনন্দবাজারটা আমরা সবাই পড়ি এখানে, হ্যাঁ সকালের টাটকা খবর পেতে পেতে সন্ধ্যা হয়ে যায় কিন্তু তাও পড়া চাই। রেসকোর্সে খুন বলুন বা  উইলিয়াম ড্যানিয়েলের ছবি চুরি, রিসেন্ট টাইমসে যা যা কেস আপনি সলভ করেছেন তা আমাদের মুখস্থ।’

ফেলুদা একটা বিব্রত হাসি দিতে যাচ্ছিল, আচমকা কিছু একটা মনে পড়ায় প্রণববাবুকে বলল, ‘ওহ হো, একটা কথা ছিল। অনুকূল ভদ্র নামে কাউকে চেনেন কী? দিল্লীতে বছর দশেক হল আছেন।’

প্রণববাবু আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘অনুকূল দা’র সঙ্গে আপনার আলাপ আছে নাকি? আমার তো ধারণা ছিল বেঙ্গলি অ্যাসোশিয়নের লোকজন ছাড়া কেউই ওনাকে চেনেন না। উনি তো এখানেই আছেন এখন।’

বলে প্রণববাবু ভেতরের দিকে তাকিয়ে হাঁক ছাড়লেন, ‘অনুকূলদা কে একটু পাঠিয়ে দাও তো এদিকে। বলো ওনার সঙ্গে দেখা করতে কয়েকজন ভদ্রলোক এসেছেন।’

প্রণববাবুর কথা শুনে আমি আর লালমহনবাবু দু’জনেই বেশ চমকেছি। ফেলুদা শান্ত স্বরেই জিজ্ঞাসা করল, ‘দিল্লীর বাঙালিরা তাহলে মোটামুটি সবাই সবাইকে চেনেন?’

প্রণববাবু হেসে ফেললেন, ‘আজ্ঞ তা ঠিক নয়। তবে অনুকূল বাবু আমাদের সম্মানীয় সদস্য, প্রায় সাত আট বছর হল অ্যাসোশিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত।’

ভেতর থেকে একটি ছেলে এসে খবর দিয়ে গেল অনুকূল বাবু কি কাজে ব্যস্ত আছেন, আসতে একটু দেরী হবে। প্রণববাবু বললেন, ‘আপনারা ততক্ষণ একটু বিশ্রাম নিন।অনুকূলদা বোধহয় কালকে আমাদের যে নাটকটা হবে তার সাজসজ্জার তদারকি করছেন।’

ফেলুদা বলল ততক্ষণে বরং প্রতিমা দেখে আসা যাক।

একচালার প্রতিমাটা বেশ লাগল আমার। অবশ্য শুধু মূর্তি নয়, আন্তরিকতার দিক থেকেও এখানে একটা ঘরোয়া ব্যাপার খুঁজে পেলাম। আজকে যদিও অ্যাসোশিয়েশনের সদস্যরা বেশী ব্যস্ত সাহিত্যমেলার ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

লালমোহনবাবু যে দিল্লী নিয়ে থরোলি ইম্প্রেসড সেটা বেশ বোঝা গেল যখন উনি বললেন, ‘অসুরকে কিরকম তেজীয়ান বানিয়েছে দেখছেন, দেখলেই মনে হয় মা দুর্গার সঙ্গে সমানে ফাইট দিয়ে যাবে। কলকাতার অসুরগুলোকে মশাই দেখলে মনে হয় সদ্য ম্যালেরিয়া থেকে উঠে এসেছে।

‘ইয়ে, এ প্রতিমা কিন্তু কুমোরটুলির শিল্পীরাই বানিয়েছেন। প্রত্যেকবারই ওনারা দিল্লীতে এসে প্রতিমা বানিয়ে দিয়ে যান।’

FeludaHiRes003_Pujo

পেছন থেকে কথাগুলো ভেসে আসতে ঘুরে দেখি হাই পাওয়ারের চশমা পরা এক ক্লীন শেভড ভদ্রলোক  দাঁড়িয়ে। আমাদের দেখে হেসে বললেন, ‘নমস্কার, আশা করি কিছু মনে করেন নি আগ বাড়িয়ে কথা বলার জন্য।’

‘মনে করার কোনো প্রশ্নই নেই, তবে এ অসুর কলকাত্তাইয়া শুনে আমার বন্ধুটি সম্ভবত নিরাশ হয়েছেন। আপনার পরিচয় টা?’

ভদ্রলোক হাসলেন, ‘আমার নাম হয়ত আপনারা সিদ্ধেশ্বরবাবুর থেকে শুনে থাকবেন, অনুকূল ভদ্র।’

‘অফ কোর্স, আমি তো ভাবছিলাম আজকে রাত্রেই না একবার আপনার কাছে যেতে হয়।’

ভদ্রলোক একটু আশ্চর্য হলেন, ‘আমার কাছে? কোনো দরকার ছিল কী?’

ফেলুদা বলল, ‘তার আগে বলুন তো আপনি কি শুনেছেন জয়পুরের সেই টিয়াটি মিসিং?’

অনুকূল ভদ্র আকাশ থেকে পড়লেন, ‘কী বলছেন? কবে ঘটল এ কান্ড? আমি তো কিছুই জানি না’।

‘পবনদেও বা মাধবরাও কেউই তাহলে আপনাকে এ ব্যাপারে কিছু জানান নি?’

‘নাহ্, ইন ফ্যাক্ট সিদ্ধেশ্বরবাবুর কাছে ওরা যাওয়ার পর থেকে আর কোনো কথাই হয় নি।’

‘হুম।’

ফেলুদা আর কিছু বলল না দেখে অনুকূল বাবু জটায়ুর দিকে ঘুরে বললেন, ‘আপনার বক্তৃতা শোনার জন্য কিন্তু মুখিয়ে আছি মশাই।’

লালমোহনবাবু হাসতে যাচ্ছিলেন, আচম্বিতে মুখটা কিরকম শুকিয়ে গেল। আমি জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি কী হয়েছে, এমন সময়ে প্রণব পাইন এসে হাজির। ‘এবার তাহলে প্রোগ্রামটা শুরু করি লালমোহনবাবু? আপনাকে দিয়েই শুরু, তারপর সাহিত্যপাঠের আসর শুরুর হবে।’ এই সময় অনুকুল বাবুর দিকে চোখ পড়াতে বলে উঠলেন, ‘অনুকূল দা, কালকের নাটকের জন্য সব রেডি তো?’

‘নাটক নিয়ে কোনো চিন্তা নেই ভাই, সব তৈরি। মেক আপের সরঞ্জামগুলো খালি বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে হবে কাল। তোমার নাটককে উতরিয়ে দিয়ে তবে আমার ছুটি।’

প্রণববাবু ফেলুদার দিকে হেসে বললেন, ‘অনুকূল দা যবে থেকে দিল্লীতে আস্তানা গেড়েছেন বেঙ্গলি অ্যাসোশিয়েশনকে বাৎসরিক নাটক নিয়ে আর চিন্তা করতে হয় না। স্টেজ ডেকরেশন বলুন, কস্টিউম, মেক আপ সব কিছুর দায়িত্ব অনুকূলদার।’

অনুকূল বাবুকে দেখে ইস্তক আমার কি একটা অস্বস্তি হচ্ছিল, প্রণব পাইনের সঙ্গে ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর ফেলুদাকে সে কথা বলতে উত্তর এল, ‘সিঁথি।’

যাঃ বাবা, সে আবার কী?

‘ভদ্রলোকের চুলের সিঁথিটা ডানদিকে করা। আপনিও কী উল্টোদিকে সিঁথি দেখেই নার্ভাস হয়ে পড়লেন লালমোহনবাবু?’

ফেলুদার কথায় একেবারে হাঁইমাই করে উঠলেন ভদ্রলোক ‘আরে মশাই, আমাকে যে কিছু বলতে হবে সেটাই ভুলে গেছিলাম। এখন পা কাঁপছে।’

‘এটা একটা কথা হল! এত প্লট গজগজ করছে মাথায়, মিনিট কুড়ি তিরিশ ম্যানেজ করতে পারবেন না?’

ফেলুদা যে নেহাতই মজা করছে সেটা বুঝতে জটায়ুর অসুবিধা হয় নি, তবে স্লাইট খোঁচাটা বোধহয় ধরতে পারেননি। বিনীত স্বরে অভিযোগ করলেন, ‘মাঝে মাঝে এত লজ্জায় ফেলে দেন ফেলুবাবু।’

খারাপ অবশ্য বললেন না ভদ্রলোক। কিশোর কিশোরীদের জন্য কল্পনার রাজ্য উন্মুক্ত করে দিতে রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসেরও যে অবদান আছে  সেটাই ছিল ওনার মূল বক্তব্য। শুরুতে খালি রবীন্দ্রনাথের ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা’ লাইনটা বার দুয়েক রিপিট করে হাল ছেড়ে দিলেন, বোধহয় বাকিটা মনে ছিল না। আর শেষের দিকে ওনার আণবিক দানব উপন্যাসে আইনস্টাইনের কি প্রভাব ছিল সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আপেলগাছের কথা টেনে  এনেছিলেন। আমি বক্তৃতার শেষে ভুলটা ধরিয়ে দিতে জটায়ু মোটেও মাইন্ড করলেন না, বেশ খুশ মেজাজেই বললেন, ‘তপেশ ভাই, আপেলটা কার মাথায় পড়েছিল সেটা আসল কথা নয়, কথাটা হল আপেলটা পড়েছিল বলেই না আইডিয়াটা এসেছিল। ভালো কথা, ফেলুবাবু কই?’

তাকিয়ে দেখি ফেলুদা অনুকূল ভদ্রের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমাদের দিকেই আসছে। এসে বলল, ‘হোটেল মেট্রোপলিটানে ফোন করে জয়সওয়ালকে পাওয়া গেল না। ওনার রুমে ফোন বেজেই যাচ্ছে। ভাবছি একবার হোটেলটা ঘুরেই আসি। হয়ত কোথাও বেরিয়েছেন, আমরা আসতে আসতে চলে আসবেন। অনুকূল বাবু বললেন মেট্রোপলিটান হোটেলটা গ্রেটার কৈলাশে, এখান থেকে মিনিট পনেরোর পথ। উনিও আমাদের সঙ্গে আসছেন। তাই তো, অনুকূল বাবু?’

ভদ্রলোক সাগ্রহে ঘাড় নাড়লেন, ‘সে কথা আর বলতে মশাই। এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে অথচ ওরা কেউ কিছু জানাল না, ভেবে খুব অবাক হচ্ছি। আমিও একবার দেখা করে আসি।’

 

বাইরে বেরিয়ে টের পেলাম বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়েছে। লালমোহনবাবু দেখলাম ওনার ঝোলা থেকে একটা মাঙ্কি ক্যাপ বার করে সেটা চাপিয়ে নিলেন। অনুকূল বাবু চিত্তরঞ্জন পার্কের ভেতরের রাস্তা দিয়ে নিয়ে চললেন আমাদের।

গলিঘুঁজির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে খারাপ লাগছিল না। মাঝে মাঝে দেখলাম এক একটা বাড়ি থেকে ‘সা রে গা মা’-র আওয়াজও ভেসে আসছে, বাঙালি পাড়া বলেই বোধহয় সন্ধের রেওয়াজের চলটা এ চত্বরেও আছে। মাঝ রাস্তায় একটা চপের দোকান দেখে লালমোহনবাবু প্রায় দাঁড়িয়ে  পড়েছিলেন, ফেলুদা ঘড়ি দেখে রায় দিল ফেরার পথে দাঁড়ালেই বেটার হয়।

সত্যিই দেখি মিনিট পনেরো হাঁটার পর আমরা গ্রেটার কৈলাশে পৌঁছে গেছি। আর সব থেকে ভালো ব্যাপার, বড় রাস্তার ওপর থেকেই হোটেল মেট্রোপলিটানের নিওন বোর্ডটা দেখা যাচ্ছে।

হোটেলের রিসেপশন থেকে ফের ফোন করা হল জয়সওয়ালের রুমে। রিসেপশনিস্ট বেশ কিছুক্ষণ রিসিভার কানে ঠেকিয়ে রেখে ঘাড় নাড়ল, এখনো ফোন বেজে যাচ্ছে।

মিনিট পনেরো কুড়ি হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করার পর লালমোহনবাবু বললেন, ‘এই ঠান্ডায় মশাই আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী? ভদ্রলোক যে এক্ষুনি ফিরবেন এরকমও তো জানা নেই। কালকে সকালে এসে দেখলে হয় না?’

অনুকূল বাবুও একটু অবাক, ‘এই শীতের রাত্রে গেলেন কোথায় ভদ্রলোক?’

ফেলুদার কপালে একাধিক ভাঁজ, কি ভাবছে কে জানে।

আরও মিনিট দশেক পর লালমোহনবাবু আর ধৈর্য ধরতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ভাবছেন ফেলুবাবু?’

ফেলুদা দেখি উত্তর না দিয়ে হনহন করে ফের রিসেপশনের দিকে যাচ্ছে। গিয়ে হিন্দিতে যা বলল তার মর্মার্থ জয়সওয়াল যে অজ্ঞান হয়ে ঘরেই পড়ে নেই এরকম কোনো গ্যারান্টি কি হোটেল ম্যানেজার দিতে পারবে? হোটেলের জানা উচিত ভদ্রলোকের কী সাঙ্ঘাতিক হার্টের প্রবলেম।

ফেলুদার গলায় এমন কিছু একটা ছিল যে রিসেপশনিস্ট বিনা বাক্যব্যয়ে হোটেলের মাস্টার-কী টি নিয়ে তিনতলার জয়সওয়ালের ঘরের দিকে রওনা দিল। ফেলুদা চাপা গলায় বলল, ‘মিথ্যাচারণ করতে হল বটে, কিন্তু একটা দুশ্চিন্তা মনটাকে ছেয়ে ফেলছে। একবার ঘরে গিয়ে না দেখা অবধি শান্তি পাচ্ছি না’।

৩০৫ নম্বর ঘরের কাছে গিয়ে দেখা গেল দরজা বন্ধ। রিসেপশনিস্ট ভদ্রলোক বেশ কয়েকবার নক করার পরেও সাড়া না পেয়ে মাস্টার-কী দিয়ে ঘরের দরজা খুলে ফেললেন।

ভেতরটা নিকষ অন্ধকার, জানলার পর্দাগুলোও সব টানা।

লালমোহনবাবু রিসেপশনিস্ট ভদ্রলোককেও ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছিলেন, হঠাৎ ‘উরে বাবা…গেলুম’ বলে একটা বিকট চিৎকার করে উঠলেন।

‘নির্ঘাত হোঁচট খেয়েছেন। তোপসে, এদিকে আয়। মিস্টার মালহোত্রা, আপ জারা দেখিয়ে না ইয়ে সুইচবোর্ড কিস দিওয়ার পে হ্যায়।’

আলো জ্বলে উঠতে দেখা গেল লালমোহনবাবু প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন। আমরা বাকি চারজনই অবশ্য দাঁড়িয়ে পড়েছি।

লালমোহনবাবুকে দেখে নয়।

লালমোহনবাবুর পাশেই আর এক জোড়া পা দেখা যাচ্ছে। ওই পায়ে ধাক্কা লেগেই ভদ্রলোক পড়ে গেছেন।

এবং স্পষ্টতই সে পা জোড়ার মালিকের শরীরে কোনো প্রাণ নেই।

‘ফেলুদা!’

‘এগোস না আর। লালমোনবাবু, আপনিও উঠে আসুন।’

‘লাশ! কি সর্বনাশ’,  লালমোহনবাবু যদিও উঠে দাঁড়িয়েছেন কিন্তু মুখের চেহারা দেখে মনে হল আবার টলে পড়ে যাবেন।

লাশই বটে, বুকের বাঁদিক থেকে উঠে থাকা ছোরার হাতলটি দেখে আরোই সন্দেহ থাকার কথা নয়।

আমারও হার্টবীট মারাত্মক রকম বেড়ে গেছে। ফেলুদাকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘জয়সওয়াল কতক্ষণ খুন হয়েছেন বলে মনে হয়?’

‘পোস্ট মরটেম রিপোর্ট না আসা অবধি সেটা বোঝা যাবে না।’

‘কিন্তু খুন তো উনি হন নি,’ বলে উঠলেন অনুকূল ভদ্র।

দেখি ভদ্রলোক ভয়ঙ্কর ফ্যাকাশে মুখে মৃতদেহর দিকে তাকিয়ে আছেন। আমাদের হতবাক মুখগুলোর দিকে নজর পড়তেই বোধহয় সম্বিৎ ফিরল ওনার, ‘জয়সওয়াল নয়, এ লাশ মাধবরাও যোশীর’।

এক সেকন্ডের জন্য মনে হল আমার হার্টবীট বন্ধই হয়ে গেছে।

FeludaHiRes004_Hotel

কাল রাতে হোটেল ফিরতে বেশ দেরী হল। পুলিশকে খবর দেওয়ার ব্যাপার তো ছিলই, পুলিশ আসার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও বেশ কিছুটা সময় যায়। ভাগ্যক্রমে গ্রেটার কৈলাশ থানার ইন্সপেকটরটিও বাঙালি, রবীন তরফদার। মাস ছয়েক আগে পাশের চিত্তরঞ্জন পার্ক থানা থেকে বদলি হয়ে এসেছেন। এবং সবথেকে বড় কথা তিনি ফেলুদার নাম জানেন। জিজ্ঞাসাবাদের শেষে হ্যান্ডশেক করে বলে গেলেন ফেলুদার দিল্লী থাকাকালীন কোনো অসুবিধা হলে সবার আগে ওনাকে জানাতে।

সমস্যা হল দিল্লীতে আর ক’দিন থাকা হবে, আদৌ থাকা হবে কিনা সেটা নিয়েই ফেলুদা নিশ্চিত নয়। জয়সওয়াল উধাও হওয়ার ফলে আগের সব প্ল্যানই ভেস্তে গেছে। দুপুরবেলা যিনি রিসেপশনে ছিলেন তিনি কনফার্ম করেছেন দুপুর একটা নাগাদ জয়সওয়ালকে হোটেল থেকে বেরোতে দেখা গেছিল।

সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ নাগাদ ফেলুদার নামে ফোন এল হোটেলে। ফেলুদা ঘুরে এসে ধপ্ করে বিছানায় বসে পড়ল।

‘কি হল মশাই? কার ফোন?’, উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞাসা করলেন জটায়ু।

‘ইন্সপেকটর রবীন তরফদারের, জানালেন খুনটা হয়েছে দুপুর বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে।’

‘সর্বনাশের মাথায় বাড়ি। আপনি তো প্রায় ওই সময়েই জয়সওয়ালকে ফোন করেছিলেন, তাই না?’

‘সে তো বটেই। কিন্তু জয়সওয়াল আমার ফোনটা ধরতেই বা গেল কেন সেটা তো বুঝতে পারছি না? যে লোকটা সদ্য একটা খুন করেছে তার তো ফোন ধরার কোনো কারণই নেই।’

‘আর জয়পুরের টিয়া?’

‘সেটাও আরেকটা প্রশ্ন। জয়সওয়ালের নিজেরই যখন টিয়াটা ছিল সেটার জন্য নিশ্চয় যোশীকে খুন ও করবে না। তাহলে ধরে নেওয়া যায় যে টিয়াটা সত্যিই চুরি হয়েছে। এবং করেছে অন্য কেউ, যে কলকাতা থেকে ওদের ফলো করেছে। এবং একই ট্রেনে দিল্লী অবধি এসেছে।’

লালমোহনবাবু হেঁচকি তো্লার মতন একটা আওয়াজ করে বললেন ‘এ যে রহস্যের খাসমহল মশাই। আমার মাথা এখনই ভোঁ ভোঁ করছে।’

 

লাঞ্চের পর ফেলুদা বলল কনট প্লেসের কেমব্রিজ বুক স্টোরে ওর কি দরকার আছে, সেটা সেরে রবীনবাবুর সঙ্গেও একবার দেখা করতে যাবে। ফিরতে ফিরতে বিকেল। যাওয়ার আগে বলে গেল, ‘তুই চাইলে জটায়ুকে নিয়ে আরেকবার চিত্তরঞ্জন পার্কের পুজোয় ঘুরে আসতে পারিস।’

জটায়ু কালকের ভয়াবহ ঘটনাটা দেখার পর থেকে কিরকম চুপসে আছেন। ফেলুদার কথা শুনে মনে হল চিত্তরঞ্জন পার্কে ওনাকে নিয়ে গেলে মন্দ হয় না, হয়ত একটু চাঙ্গা হয়ে উঠবেন। লালমোহনবাবু যদিও বললেন তার আগে একবার সফদরজং এনক্লেভের কালীবাড়িতে ঘুরে আসতে চান। ‘এত দূর এসে কালীবাড়ির দুর্গাপুজোটা না দেখলে বড় আফশোস থেকে যাবে ভাই। সময় তো অফুরন্ত, একবার ঘুরেই আসা যাক, কী বলো?’

আমারও আপত্তির কোনো কারণ নেই। আর হোটেলের ম্যানেজার জানালেন হোটেলের সামনে থেকেই ৫০৫ নম্বর বাস সোজা যায় সফদরজং এনক্লেভ, সেখান থেকে অল্প একটু হাঁটা।

ষষ্ঠীর দিন হলেও দুপুর বলেই বোধহয় খুব একটা বেশী ভিড় নেই কালীবাড়িতে। লালমোহনবাবু কালীমূর্তি দেখে মহা আহ্লাদিত, দেখলাম প্রায় সাষ্টাঙ্গে  একটা প্রণাম করলেন। প্রণাম করে ওঠার সময় যদিও দেখা গেল ব্যাপারটা অল্প বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে; ‘আহহ্’ বলে এমন কাতরে উঠলেন তাতে বেশ বোঝা গেল বেকায়দায় উঠতে গিয়ে কোমরে লেগেছে।

ভদ্রলোককে ধরে ধরে বাইরে নিয়ে আসছি, হঠাৎ শুনি ‘কী ব্যাপার মিস্টার গাঙ্গুলি?আপনি ঠিক আছেন?’

মুখ তুলে দেখি সামনে দাঁড়িয়ে সত্যেন্দ্র সোলাঙ্কি।

লালমোহনবাবু বোধহয় ভাবতেই পারেননি সোলাঙ্কির সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যাবে, একটু থতমত মুখে বললেন, ‘এই কোমরটায় একটু……হেঁ হেঁ……ওই আর কী।’

‘আমার গাড়ি দাঁড় করানো আছে। আপনাদের অসুবিধা না থাকলে আমি কিন্তু আপনাদের হোটেল অবধি ছেড়ে দিতে পারি। আমার ভেতরে জাস্ট পাঁচ মিনিটের কাজ আছে।’

লালমোহনবাবুর কোমরের যা অবস্থা দেখছি তাতে চিত্তরঞ্জন পার্ক যাওয়াটা ঠিক হবে বলে মনে হল না। ভালোই হয়েছে সোলাঙ্কির সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়ে। সোলাঙ্কি মন্দিরের ভেতরে যাওয়ার পর জটায়ু বললেন, ‘লোকটিকে বড় পছন্দ হয়েছে তপেশ। এরকম হেল্পফুল সোল আজকালকার দিনে আর ক’টা পাওয়া যায় বলো?’

পাঁচ মিনিটও অবশ্য লাগল না, সোলাঙ্কি দু’মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলেন। মুখটা অসম্ভব গম্ভীর।

গাড়িতে উঠে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সোলাঙ্কি বললেন, ‘আমি ভাবতেই পারিনি আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। আমার প্ল্যান ছিল আজকে সন্ধ্যার দিকে চিত্তরঞ্জন পার্কের পুজোয় যাওয়ার।’

‘আপনিও সাহিত্যমেলা নিয়ে ইন্টারেস্টেড বুঝি?’, শুধোলেন জটায়ু।

‘মেলা নয় মিস্টার গাঙ্গুলি, আমার দরকার মিস্টার মিটার কে। ওনার প্রফেশনাল হেল্প চাই আমার।’

জটায়ু আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’

‘আজ দু’দিন হল আমার বিজনেস পার্টনারকে পাওয়া যাচ্ছে না’, একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন সত্যেন্দ্র সোলাঙ্কি।

‘মি…মিসিং?’ জটায়ুর প্রায় বাক্যস্ফূর্তি হচ্ছিল না।

‘হ্যাঁ। প্রথমে ওর হোটেলে টেলিফোন করেছিলাম, পেলাম না। কাল রাত্রে গিয়ে শুনলাম হোটেলে ফেরেনি। আজকে সকাল থেকে বসে ছিলাম হোটেলে, দেখা নেই। শেষে হোটেলের ম্যানেজার সাজেশন দিল কালীবাড়িতে এসে একবার খুঁজতে, ও দিল্লী এলেই নাকি একবার কালীবাড়ি ঘুরে যাবেই।’

‘কালীবাড়িতেও পেলেন না?’

‘নাহ, এখানেও আসে নি। থ্যাঙ্কফুলি ওর একটা পাসপোর্ট ফটো আমার কাছে ছিল, সেটাই দেখালাম। কেউই আইডেন্টিফাই করতে পারল না।’

‘আঁ…আঁ…আঁ’।

আমি জানি জটায়ুর গলা থেকে কেন আর্তনাদ ছিটকে বেরোচ্ছে। ফটোর মধ্যে থেকে যে ভদ্রলোক আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন তাঁকে কালীবাড়ির কেউ না চিনলেও আমরা বিলক্ষণ চিনি।

হোটেল মেট্রোপলিটানের ঘরের মেঝেতে কাল এনারই নিঃস্পন্দ শরীর আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম, ইনিই মাধবরাও যোশী।

 

সোলাঙ্কি আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন গ্রেটার কৈলাশ থানায়, যাওয়ার আগে বলে গেলেন পরের দিন দুপুরে আসবেন ফেলুদার সঙ্গে দেখা করার জন্য। ভদ্রলোক শকড বললেও কিছুই বলা হয় না, আমাদের কাছ থেকে খারাপ খবরটা পাওয়ার পর বাকি রাস্তা আর কথাই বলতে পারলেন না।  বিড়বিড় করে দু’তিনবার খালি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আর ইউ অ্যাবসোলিউটলি সার্টেন? ঠিক দেখেছেন আপনারা?’

ঘরে ঢুকে দেখি ফেলুদাও ফিরে এসেছে। বিছানার ওপর একটা মস্ত বই ফেলে মন দিয়ে কি যেন দেখছে।

‘মশাই, এদিকে কী সর্বনেশে কান্ড ঘটেছে আপনি ভাবতেই পারবেন না’, ফেলুদাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠলেন লালমোহনবাবু। ‘একের পর এক থ্রিলিং ব্যাপারস্যপার ঘটে চলেছে’ বলতে বলতে ভদ্রলোক প্রায় লাফিয়ে উঠেছিলেন, তারপর ‘উফ্’ বলে কোমর ধরে বিছানাতেই বসে পড়লেন।

লালমোহনবাবুকে একটু ধাতস্থ হতে দিয়ে ফেলুদা মন দিয়ে আমাদের কাছে শুনল পুরো ঘটনাটা। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘থ্রিলিং নিঃসন্দেহে, তবে এবারে হয়ত আরেকটু আলো দেখা যাবে। সোলাঙ্কি কেন যোশীকে মীট করতে দিল্লী এসেছেন সেটাও একটা প্রশ্ন বটে।’

লালমোহনবাবু হাত তুলে বললেন, ‘ওই যে বললাম, ওনারা দু’জনে বিজনেস পার্টনার ছিলেন।’

ফেলুদা টেবলে রাখা অ্যাশট্রেটা তুলে নিয়ে সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‘বিজনেসটা কী নিয়ে সেটাই ভাবাচ্ছে লালমোহনবাবু। যোশী নয় এসেছিলেন জয়সওয়ালের থেকে টিয়াটা কিনতে, সোলাঙ্কির আসার কারণটা কি?’

আমি এর মধ্যে বিছানায় রাখা বইটার নামটা দেখে নিয়েছি, ‘প্রিন্সলি রাজস্থান : আর্ট অ্যান্ড স্কালপ্চর’।

‘তুমি এই বইটা কিনতেই কনট প্লেস গেছিলে?’

‘ঠিক ধরেছিস। সেদিনকে সিধুজ্যাঠার পড়ার টেবলে এই বইটাই দেখেছিলাম, কাল থেকে কেন জানি মনে হচ্ছিল এই বইটা একবার দেখা দরকার। গাট ফীলিং টা আদৌ অমূলক ছিল না, ২৩৫ নম্বর পাতায় গিয়ে দ্যাখ।’

ঠিক কথা। ২৩৫ থেকে শুরু করে ২৪৫, এই দশ পাতা জুড়ে লেখকের আলোচনার বিষয়বস্তু একটাই। জয়পুরের মহারাজার দ্য রুবি আইড প্যারট। লেখক গর্ডন উইলসন, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়মের কিউরেটর – জয়পুরের টিয়াপাখি নিয়ে কেন এতটা উৎসাহ সেটা এবার বেশ বোঝা যাচ্ছে।

ফেলুদা সিগারেটটা শেষ করেই ফের বইটা পড়তে শুরু করল। আমি আর লালমোহনবাবু ফল-ফুল-পাখি-নাম-দেশ খেলতে শুরু করলাম। চার রাউন্ড খেলার পর পাঁচ নম্বর রাউন্ডে অক্ষর পড়ল ট। লালমোহনবাবু ট দিয়ে পাখির নাম কি লিখবেন সেটা মোটামুটি জানাই ছিল, আমাকে তাই অন্য নাম ভাবতে হল।

‘ট দিয়ে আমার পাখি টুনটুনি। লালমোহনবাবু, আপনার কি টিয়া?’

লালমোহনবাবু ভারিক্কী চালে বললেন, ‘অত বোকা আমাকে পাওনি তপেশ। আমি অবশ্য ভাবছিলাম তুমিই টিয়া লিখবে।’

এই রে, আমিও দেখছি বেকুব বনেছি। ‘তাহলে আপনার পাখির কি নাম?’

‘টেরোড্যাকটিল।’

টেরোড্যাকটিল শুনে বেজায় হাসি পাচ্ছিল, কিন্তু ভদ্রলোক কিছুতেই মানবেন না যে টেরোড্যাকটিল পাখি নয়। শেষে ঠিক হল ফেলুদাকেই জিজ্ঞাসা করা হবে।

ফেলুদাকে ডাকতে গিয়ে দেখি ও কপালের রগ ধরে বসে আছে, শিরাগুলো দপদপ করছে। এখন ওর হাতে বইটা নেই, বরং আছে জয়পুরের টিয়ার সেই ছবি যেটা ও সিধুজ্যাঠার থেকে নিয়ে এসেছে।

‘ফেলুদা, ফেলুদা’।

ফেলুদা কিরকম একটা ঘোরের মধ্যে থেকে বলল, ‘সমস্ত হিসেব গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। সিধুজ্যাঠাকে এক্ষুনি একটা ট্রাঙ্ককল করা দরকার। লালমোহনবাবু, আপনি ঘরেই থাকুন। তোপসে, তুই চট করে হাওয়াই চপ্পলটা গলিয়ে আমার সঙ্গে নীচে চল, আর সঙ্গে একটা কাগজ – পেন্সিল রাখিস।’

ফেলুদা প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে দু’টো করে সিঁড়ি একসঙ্গে টপকাতে টপকাতে নীচে নামল। ট্রাঙ্ককল পেতে বিশেষ অসুবিধা হল না। ফোনে অবশ্য এক দিকের কথাই শুনতে পাওয়া গেল, আর সেটাই সুবিধের জন্য এখানে তুলে দিলাম –

‘সিধুজ্যাঠা, ফেলু বলছি দিল্লী থেকে। আপনার সঙ্গে একটা জরুরী দরকার আছে।’

———

‘বলছি, প্রিন্সলি রাজস্থান বইটার ২৪৩ নম্বর পাতার সেকন্ড প্যারাটা একটু পড়ুন। আমি ফোন হোল্ড করছি।’

———

‘সে কী? আপনি অলরেডি জানেন!

———

‘কিন্তু আপনার লেখাটা যখন বেরোয় তখন এই খবরটা জানা ছিল না?’

———

‘তাই নাকি? আপনি অলরেডি ফোন করে জানিয়েছিলেন? সেদিন সকালেই?’

———

‘ওহ, জয়সওয়াল কি বলল?’

———

‘আচ্ছা, জয়সওয়ালকে কেমন দেখতে বলুন তো?’

———

‘না, এখনো দেখা হয়নি। আমি পরে বিশদে জানাচ্ছি আপনাকে।’

———

‘হ্যাঁ, এক সেকন্ড ধরুন…’, বলে মাউথপিসে হাত চাপা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল ‘সিধুজ্যাঠা জয়সওয়ালের ডেসক্রিপশন দিচ্ছেন। আমি রিপিট করব কথাগুলো, তুই লিখে রাখবি। ঠিক হ্যায়?’

আমি ঘাড় নাড়তে ফের ফোন ধরে বলল, ‘হ্যাঁ, বলুন সিধুজ্যাঠা।’

‘লম্বায় পাঁচ-নয়? আচ্ছা। পেন্সিল গোঁফ? ইন্টারেস্টিং!’

———

‘চোখের রঙ কটা বললেন? ওকে। চোখে চশমা ছিল?’

———

‘ছিল না? ওহ, সানগ্লাসটা পকেটে রাখা ছিল বলছেন?’

———

আচ্ছা, অনেক ধন্যবাদ সিধুজ্যাঠা। আমি কাল পরশুর মধ্যেই আবার ফোন করব আপনাকে।’

 

 

‘কী ব্যাপার মশাই? হঠাৎ এরকম তড়িঘড়ি ফোন করতে ছুটলেন যে?’, আমাদের ঘরে ঢুকতে দেখে জটায়ু উঠে বসেছেন।

ফেলুদা পাতাটা খুলে লালমোহনবাবুকে বলল, ‘সেকন্ড প্যারাগ্রাফটা পড়ে ফেলুন চট করে।’

মিনিট পাঁচেক পর লালমহনবাবু মুখ তুলে বললেন, ‘তাই নাকি মশাই?এ খবরটা তাহলে আগে আপনার কাছে ছিল না?’

‘নাহ, বইটা পড়েই তো জানলাম। এবার আপনি ছবিটা নিয়ে মেলান।’

ফেলুদা এবার আমার দিকে ঘুরে বলল, ‘উইলসন সাহেব জানাচ্ছেন ১৯০৮ সালে টিয়াটি চুরির চেষ্টা হয়, নিরাপত্তারক্ষীরা টের পেয়ে চোরকে গুলি করে এবং চোরের রক্ত ছিটকে রুবি আইড প্যারটের ডানার একটি হীরেতে লাগে। অমঙ্গলের আশঙ্কায় জয়পুর স্টেটের তৎকালীন মহারাজা সেই হীরেটিকে রিপ্লেস করেন হীরের মতন দেখতে কিন্তু হীরের থেকেও দামী এক টুকরো ময়সেনাইট ক্রিস্টাল দিয়ে। ময়সেনাইট এখন গবেষণাগারে তৈরি হলেও সে সময় প্রাকৃতিক ময়সেনাইট একবারই পাওয়া গেছিল, তাও একটা উল্কার মধ্যে। বুঝতেই পারছিস কতটা রেয়ার এই ক্রিস্টাল।’

ফেলুদা একটু থেমে বলল, ‘হীরে আর ময়সেনাইটের তফাৎ চট করে খালি চোখে ধরা পড়া মুশকিল। কিন্তু আলোর মধ্যে ধরে দেখলে দেখা যাবে ময়সেনাইটের একটা হাল্কা সবজে আভা আছে।’

‘লালমোহনবাবু, কিছু দেখতে পেলেন?’

‘পেলাম বই কি, ওপর থেকে চার নম্বর পাথরটায় সত্যি একটা সবজে আভা দেখা যাচ্ছে। ওইটেই তাহলে ময়সেনাইট?’

‘ঠিক। কিন্তু আসল খবর তো সেটা নয় লালমোহনবাবু। আসল খবরটা কী বলুন?’

লালমোহনবাবু চুপ কিন্তু আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘তার মানে…তার মানে…তিন নম্বর টিয়া?’

‘এক্সেলেন্ট, তোপসে। মানে দাঁড়াচ্ছে, যে টিয়ার ছবি আমরা দেখছি সেটা এসেছে জয়পুর প্যালেস থেকেই। অর্থাৎ তিন নম্বর টিয়া নেই, বানানোই হয় নি।’

লালমোহনবাবু অবাক হয়ে বললেন, ‘কিমাশ্চর্যম! তাহলে জয়সওয়াল?’

‘একটি চীট এবং একটি চোর। মাধবরাও যোশীকে চোরাই মাল বেচার চেষ্টা করছিল জয়সওয়াল। আমাদের এখন অবিলম্বে পুলিশকে খবর দিতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভেরিফাই করা দরকার জয়পুর প্যালেসে অরিজিনাল টিয়া বলে যেটি এখন শোভা পাচ্ছে সেটি নকল কিনা।’

লালমোহনবাবু এত ইনফরমেশনের ধাক্কাতে একটু কাবু হয়ে পড়েছিলেন, হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘কিন্তু তিন নম্বর টিয়া না থাকুক, এক নম্বরটাও এখনো মিসিং। সেটা কার কাছে গেল?’

‘সেটাই তো লাখ টাকার প্রশ্ন । ওখানেই একটা বড় খটকা রয়ে যাচ্ছে। জয়সওয়াল তো নিজেই টিয়াটা যোশীকে বেচার চেষ্টা করছিল। সে একটা চিটিংবাজ হলেও নিজের জিনিস তো আর নিজে চুরি করবে না? এনিওয়ে, আমি ফোন করতে গেলাম। রবীনবাবুকে খবরটা দিতে হবে।’

 

পরের দিন দুপুর একটা নাগাদ সোলাঙ্কি দেখা করতে এলেন। ভদ্রলোককে বিধ্বস্ত লাগছিল, যোশীর খুনের খবরটা এখনো সামলে উঠতে পারেন নি। ফেলুদার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললেন, ‘ভাবতেই পারছি না মিস্টার মিটার এরকম কিছু ঘটে যেতে পারে। কে খুন করল, কেন খুন করল কিছুই তো বুঝতে পারছি না।’

ফেলুদা সহানুভূতির স্বরে বলল, ‘আমাদের সবার মনেই সেই এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মিস্টার সোলাঙ্কি। কিন্তু আপনি ঠিক কি কারণে দিল্লী এসেছিলেন?’

সোলাঙ্কি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘যোশীর থেকে একটা পেমেন্ট পাওয়ার কথা ছিল আমার। বেশ কয়েক হাজার টাকা।’

ফেলুদা একদৃষ্টে সোলাঙ্কির দিকে তাকিয়ে, ‘কয়েক হাজার টাকা?’

‘হ্যাঁ, তাই। যোশী আমার অনেকদিনের ক্লায়েন্ট, দু’তিন বছর আগে অবধিও রীতিমতন ভালো বিজনেস পেতাম ওনার থেকে। তারপর থেকে বোধহয় ওর ফাইন্যান্সিয়াল কন্ডিশন খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। মাস ছয়েক আগে এসে আমাকে একটা আইটেম ডেলিভার করতে বললেন। এও বললেন যে আইটেমটা বানিয়ে দিলে উনি ফিফটি পারসেন্ট টাকা দিয়ে দেবেন। বাকি ফিফটি পারসেন্ট পাওয়া যাবে তার মাস দুয়েক পরে। টাকার অ্যামাউন্টটাও খারাপ ছিল না, প্লাস পুরনো ক্লায়েন্ট, আমিও রাজি হয়ে গেলাম। সেই ফিফটি পারসেন্ট নেওয়ার জন্যই দিল্লী আসা।’

ফেলুদার কি শরীর খারাপ লাগছে? মাথা নিচু করে বসে আছে কেন?

‘কি বোকাই না বনলাম রে তোপসে’, ফেলুদা আবার সোজা হয়ে বসেছে। টেবলের ওপর রাখা টিয়ার ছবিটা এক ঝটকায় টেনে নিয়ে সোলাঙ্কির দিকে ছুঁড়ে দিল।

‘মিস্টার সোলাঙ্কি, ভালো করে দেখুন তো। যোশী আপনাকে এই ধরণের কিছু বানাতে দিয়েছিলেন কিনা?’

সোলাঙ্কি ছবিটা দেখে উত্তেজনার চোটে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ‘এই তো, এই তোতা পাখিটাই তো বানিয়ে দিলাম যোশীকে। অফ কোর্স, এত দামী কাজ ছিল না। কিন্তু আপনি কি করে জানলেন?’

ফেলুদা সে কথার জবাব না দিয়ে তাকিয়ে রইল সোলাঙ্কির দিকে। ‘আপনি কি জানতেন আপনার ক্লায়েন্টটি ঠিক সাধুপুরুষ নন?’

সোলাঙ্কি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘সে কথা আমারো মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে। কিন্তু আমার এখানে কি যায় আসে মিস্টার মিটার? উনি টাকা দিচ্ছেন, আমি আমার কাজ করে দিচ্ছি। এর বাইরে গিয়ে আমি কেন ভাবব বলুন তো?’

‘ভাবা উচিত ছিল মিস্টার সোলাঙ্কি। আর কিছু না হোক, টাকার লোভটা না করে যোশীর হয়ে কাজ না করাই উচিত ছিল। এখন যে আপনাকে বহু জবাবদিহি দিতে হবে। আমার ধারণা মাধবরাও যোশী আপনাকে দিয়ে জয়পুর প্যালেসের একটি মহামূল্যবান শিল্পকর্মের নকল বানিয়ে আসল জিনিসটিকে কোনো ভাবে সরিয়েছেন।’

সোলাঙ্কির মুখটা ছাইয়ের মতন সাদা হয়ে গেছে। ‘কি বলছেন প্রদোষ বাবু, আমি এর বিন্দু বিসর্গ জানতাম না।’

ফেলুদা ছবিটা ফেরত নিতে নিতে বলল, ‘আমি আপনাকে বিশ্বাস করার চেষ্টা করছি কিন্তু পুলিশ সে কথা মানলে হয়। যাই হোক, আপনি আপনার হোটেলের ঠিকানাটা দিয়ে যান, আর দিল্লী থেকে এখন বেরোবেন না। বুঝতেই পারছেন দিল্লী এবং জয়পুরের পুলিশের প্রচুর প্রশ্ন থাকবে আপনার কাছে, আমার সাজেশন হল যা জানেন সব স্পষ্টাস্পষ্টি বলে দিন।’

সোলাঙ্কিকে দেখে মনে হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক হতে চলেছে। অতি কষ্টে মাথা নাড়ালেন ফেলুদার কথায় সায় দেওয়ার জন্য।

সোলাঙ্কি বেরোতে যাবেন এই সময়ে ফেলুদা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল, ‘আমার বন্ধুটিকে বোধ হয় আপনি আগে থেকেই চিনতেন, তাই না?’ সোলাঙ্কি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, ‘আপনার বন্ধু?’

ফেলুদার আঙুল লালমোহনবাবুর দিকে, ‘এই ইনি। স্বয়ং লালমোহন গাঙ্গুলি।’

সোলাঙ্কি আমতা আমতা করে বললেন ‘মিস্টার মিটার, আপনাদের সবার সঙ্গেই তো প্রথম দেখা রাজধানী এক্সপ্রেসে। এর আগে সত্যিই আমাদের দেখা হয়নি কোথাও।’

‘চেনার জন্য কি সব সময় দেখা হওয়া জরুরী? আমার ধারণা আপনি শ্রী জটায়ুকে মুখে না চিনলেও নামে চেনেন। নাহলে জটায়ু যে থ্রিলার লেখেন সে কথা আপনি জানবেন কেমন করে? মনে পড়ছে ট্রেনে আলাপ হতে না হতেই কি বলেছিলেন? লাইফে কোনো থ্রিল নেই মশাই। যিনি জটায়ুকে চেনেনই না তিনি হঠাৎ থ্রিলের প্রসঙ্গ টানবেন এটা একটু বড় ধরণের কো-ইনসিডেন্স নয় কি? তা ছাড়া ট্রেন অ্যাটেন্ডান্টের সঙ্গে কথা বলে আমি জেনেছি আপনি শেষ মুহূর্তে আপনার অরিজিন্যাল কামরা বদল করে আমাদেরটাতে এসে ঢোকেন।’

সোলাঙ্কি চুপ করে দাঁড়িয়ে। ফেলুদা বলল, ‘আমার ধারণা আপনি এখনো সব কথা খুলে বলছেন না। মিথ্যাচারণ করে আপনার কোনো লাভ নেই মিস্টার সোলাঙ্কি, এখন একমাত্র সত্যি কথাই আপনাকে বাঁচাতে পারে।’

ভদ্রলোক এবার সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়লেন, ‘মিস্টার মিটার, আমাকে বাঁচান। আমি চুরি করিনি।’

‘কিন্তু চুরির টাকার ভাগ পাবেন এরকমই কথা হয়েছিল, তাই নয় কি? যোশীর প্ল্যান আপনি জানতেন?’

‘জানতাম। গোটা আইডিয়াটাই ও পেয়েছিল একটা হিন্দি বই থেকে। অথরের ছবি সেই বইয়েই ছিল। সেদিন তাই হাওড়া স্টেশনে অথরকে দেখে আর কৌতূহল সামলাতে পারিনি।’

জটায়ু এতক্ষণ টেনিস ম্যাচ দেখার মতন এদিক থেকে ওদিক আর ওদিক থেকে এদিক ঘাড় ঘোরাচ্ছিলেন। এবার খাটের ওপর একটা বিশাল থাপ্পড় মেরে বললেন, ‘আরররে…কহানী ঝুটি হীরা কি।’

তারপর প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার ‘হিড়িম্বা মন্দিরের হীরে’র হিন্দি অনুবাদ মশাই, এই ফেব্রুয়ারীতে বেরিয়েছে। ভিলেন হিড়িম্বা দেবীর মন্দিরে রাখা আসল হীরেটা গায়েব করে দেবে, বদলে রেখে আসবে একটা নকল হীরে। পুরো কাজটাই করবে রাত্রিবেলা স্কাইলাইটের ভেতর দিয়ে গলে, দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে।’

 

সোলাঙ্কি বিদায় নিয়েছেন বেশ কিছুক্ষণ, ভদ্রলোকের চোখমুখের অবস্থা দেখে মায়াই হচ্ছিল। ফেলুদা লালমোহনবাবু কে বলল, ‘আপনার উপন্যাসগুলো বান্ডিল ধরে সব রজনী সেন রোডের বাড়িতে রেখে যাবেন তো। কলকাতায় ফিরেই প্রত্যেকটা বই ধরে ধরে পড়তে হবে। আপনার গাঁজা যে হারে বাস্তব হয়ে উঠছে, ঐ গাঁজাতেই দম না দিলে ফেলু মিত্তিরে ভাত জুটবে না।’

‘মাই প্লেজার ফেলুবাবু’, জটায়ু এবার টেনশন মাখানো গলায় বলে উঠলেন ‘কিন্তু এদিকে কী হয়ে চলেছে বলুন তো?কিচ্ছুটি মাথায় ঢুকছে না।’

ফেলুদা চাপা গলায় বলে উঠল, ‘আমরা আসলে প্রথম থেকেই ভুল পথে চলছিলাম লালমোহনবাবু, সেটাই সমস্যা। সিধুজ্যাঠা বলুন বা আমি, সবাই প্রথম থেকেই জেনে আসছি যে এ টিয়া বেচছিল জয়সওয়াল আর কিনছিল যোশী। এখন তো বুঝতেই পারছেন যে ঘটনাটা উল্টো, কিনছিল আসলে জয়সওয়ালই আর বেচছিল যোশী। জয়পুর প্যালেস থেকে আসল টিয়াটি বাগানোর সময় মনে হয় প্যালেসের এক বা একাধিক কর্মচারীকে হাত করেছিলেন যোশী।’

‘কিন্তু খুনটা?’

ফেলুদা খাটের সঙ্গে লাগোয়া একটা চেয়ারে বসে পড়েছে, ওর নজর এখন সিলিং এর দিকে। ‘সিধুজ্যাঠা কাল ফোনে বললেন আমরা যেদিন দিল্লী রাজধানীতে উঠলাম উনি সেদিন রাত্রেই উইলসন সাহেবের বইটা পড়তে গিয়ে ময়সেনাইটের ব্যাপারটা লক্ষ্য করেন। পরের দিন সাতসকালেই উনি জয়সওয়ালকে ফোন করেন। জয়সওয়াল পুরো ব্যাপারটা অস্বীকার করে ফোন কেটে দেয়। উনি ভাবছিলেন আমাকে টেলিগ্রাম করবেন কিন্তু তখনই আমার ফোনটা যায়।’

আমি বললাম, ‘জয়সওয়ালও নিশ্চয় জানত যে টিয়াটা জয়পুর থেকে চুরি করা হয়েছে?’

‘সেটা হওয়াই সম্ভব, যোশীর মতন জয়সওয়াল-ও যখন একটি নিখাদ চিটিংবাজ। কিন্তু খুনটা কেন করতে যাবে সেটাই তো স্পষ্ট হচ্ছে না?’

লালমোহনবাবু বললেন, ‘এরকম একটা খুনী লোক দিল্লীর রাস্তায় ওপেন ঘুরে বেড়াচ্ছে এটা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে কিন্তু।’

‘সে কি আর নিজের চেহারায় ঘুরে বেড়াচ্ছে লালমোহনবাবু? সম্ভবত কোনো ছদ্মবেশ নিয়েছে। ছদ্মবেশ…… মূর্খ, মূর্খ!’

শেষের কথাটায় লালমোহনবাবু একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘আজ্ঞে?’

‘আপনাকে বলিনি লালমোহনবাবু, কথাটা নিজেকে বললাম। ফেলুদার চোখ জ্বলজ্বল করছে, ‘কি আশ্চর্য, এই কথাটা আগে মাথায় আসেনি।’

‘কোন কথাটা মশাই?’ লালমোহনবাবু আরোই হতভম্ব, আমিও।

‘পরে বলছি আপনাদের। তোপসে, চট্ করে আমার ওয়ালেটটা দে তো।কলকাতায় আরো একটা ট্রাঙ্ককল করা দরকার।’

‘কাকে ফোন করবে ফেলুদা?’

ফেলুদা ঝড়ের গতিতে বেরোতে বেরোতে বলল, ‘আমার বন্ধু দেবরাজকে, দেবরাজ গোস্বামী। রবীন্দ্রভারতীর ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক।’

দেবরাজ গোস্বামীকে ফোন করার পর পরেই বোধহয় রবীন তরফদারকেও ফোন করেছিল ফেলুদা। আধ ঘন্টার মধ্যেই দেখি জীপে চড়ে রবীন বাবু আমাদের হোটেলে এসে হাজির, সঙ্গে আবার দু’জন কনস্টেবল। ফেলুদাকে দেখে বললেন, ‘পাখি উড়ে গেছে বলেই মনে হচ্ছে।’

‘কিন্তু উড়ে বেশি দূর যেতে পারবে না। তার জন্য ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সেরও একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য।’

ফেলুদা একটা ট্যাক্সি ডাকতে যাচ্ছিল, তাতে রবীনবাবু বললেন জিপেই তিনজনের জায়গা হয়ে যাবে। লালমোহনবাবু বেশ কিছুক্ষণ ধরে উসখুস করছিলেন, জিপে উঠে বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছি মশাই?’

‘সবুর, লালমোহনবাবু সবুর। একটু পরেই দেখতে পাবেন।’

লালমোহনবাবু অবশ্য পাঁচ মিনিটও চুপ করে থাকতে পারলেন না, ‘আপনার বন্ধুর সঙ্গে কথা হল?’

‘দেবরাজের কথা বলছেন? হ্যাঁ, কথা হয়েছে। দু’টো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন দিয়েছে সে।’

জিপটা যখন যন্তর মন্তরকে বাঁ দিকে রেখে গোল চক্করে পড়ল তখনই একটা সন্দেহ হচ্ছিল। ফেলুদাকে বললাম ‘আজমেরি গেটের দিকে যাচ্ছি, তাই না?’

ফেলুদা আমার পিঠে একটা চাপড় দিতে যাচ্ছে আর ঠিক সেই সময় জিপটা বিশ্রী একটা ব্রেক কষল। ফলে চাপড়টা যতটা জোরে আসার কথা ছিল তার প্রায় দ্বিগুণ জোরে এসে পিঠে পড়ল।

‘কী হল রবীনবাবু?’

‘এই দেখুন না, সামনে অযথা ঝঞ্ঝাট।’

ঝঞ্ঝাট বলে ঝঞ্ঝাট! কোথা থেকে একটি ষাঁড় এসে রাস্তার ওপর বসে পড়েছে। ষাঁড়বাবাজীবনের যা চেহারা দেখা গেল, রবীনবাবু ওনার কনস্টেবলদের পাঠাতেও বিশেষ ভরসা পেলেন না। চারপাশ থেকে বাইক, বাস এবং গাড়ির অসংখ্য হর্নেও দেখা গেল তার ভ্রুক্ষেপ নেই।

মিনিট কুড়ি অপেক্ষা করার পর ফেলুদা বলল, ‘রবীনবাবু, হাত থেকে সময় বেরিয়ে যাচ্ছে। অন্য রাস্তা নেই?’

‘আছে, পঞ্চকুইয়া রোড ধরে গিয়ে পাহাড়গঞ্জ দিয়ে ঢোকা যেতে পারে। কিন্তু তাতে আরো আধ ঘন্টা  মতন লাগবে ধরুন।’

‘সর্বনাশ’, ফেলুদা বার বার রিস্টওয়াচের দিকে দেখছে, ‘ড্রাইভার সাব, হামে পাঁচ বাজে তক পঁহচনা হ্যায়। জারা জলদি চলিয়ে।’

‘জি, জরুর।’ একে পুলিশের জিপ, তায় ফেলুদার অনুরোধ। আমাদের গাড়ি এত জোরে চলতে শুরু করল যে মিনিট খানেকের জন্য জটায়ুর মুখ থেকে সব রক্ত সরে গেল। ‘কী চালাচ্ছে ভাই তপেশ, পেটের মধ্যে মনে হচ্ছে হাজারখানা প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে।’

ফেলুদা একবার আমাদের দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘আরতুরো কারতোফোলি।’

‘কার কথা বলছেন মশাই? আড় কে?’

আমি জানি ফেলুদা কার কথা বলছে। টিনটিনের অ্যাডভেঞ্চার ‘দ্য ক্যালকুলাস অ্যাফেয়ার’ এর সেই ইটালিয়ান ড্রাইভার যার গাড়িতে করে টিনটিন প্রায় উড়ে উড়ে বরডুরিয়ান এজেন্টদের ধাওয়া করেছিল। কিন্তু জটায়ুকে অত কিছু বোঝানোর মতন সময় নেই এখন।

নিউ দিল্লী স্টেশনে যখন আমরা পৌঁছলাম, তখন পাঁচটা বাজতে মিনিট কুড়ি মতন বাজে।

রবীনবাবু জিপ থেকে নামতে নামতে বললেন, ‘রাজধানী আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়ছে।’

‘হ্যাঁ, আর কাকে খুঁজতে হবে আপনি জানেন নিশ্চয়। মনে রাখবেন স্বনামে সে থাকবে না। সুতরাং রিজার্ভেশন লিস্ট চেক করে লাভ নেই, অযথা সময় নষ্ট’ ফুটব্রিজে উঠতে উঠে জিজ্ঞাসা করল ফেলুদা।

‘কোনো চিন্তা করবেন না, তপেশের লেখা কাগজটাও তো আমাকে দিয়েই রেখেছেন।

সেই ডেসক্রিপশনওলা চিরকুট? তাহলে কী জয়সওয়ালের খোঁজ পাওয়া গেছে?

ফেলুদাকে অবশ্য সে কথা জিজ্ঞাসা করার উপায় নেই; ফেলুদা আট নম্বর প্ল্যাটফর্মে নেমে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় ঠেলাগাড়ি, কুলি, কলার খোসা সব কাটিয়ে কাটিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়চ্ছে। প্ল্যাটফর্মে নামার আগে চিৎকার করে বলে গেল, ‘আমি সামনের কামরা থেকে উঠছি, রবীনবাবুরা শেষেরটা থেকে। চেয়ারকারগুলো মাঝে আছে, তুই ওখান থেকে দেখতে শুরু কর তোপসে। মনে রাখিস চোখের রঙ কটা।’

আমিও দৌড়চ্ছি, একজন কুলিকে জিজ্ঞাসা করাতে বলল সাত নম্বর কামরা থেকে চেয়ারকার শুরু। লালমোহনবাবু পেছন থেকে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, ‘তোমরা এগিয়ে যাও তপেশ, আমি আসছি।’

একের পর এক  কামরা পার হয়ে যাচ্ছি, না চোখে পড়ছে পেন্সিল গোঁফ, না কটা চোখ। তাও ভাগ্য ভালো রাজধানী বলে এক কামরা থেকে অন্য কামরায় খুব সহজেই যাওয়া যায়। দশ মিনিটের মাথায় উল্টো দিক থেকে ফেলুদাকে আসতে দেখা গেল।

ফেলুদা দু’দিকে তাকাতে তাকাতে আসছে।

আমাকে দেখতে পেয়েছে, হাত নাড়ল।

আমি চট করে ঘড়ির দিকে তাকালাম, আর পাঁচ মিনিট মতনই হাতে আছে। কোথায় বসে আছে জয়সওয়াল? রবীনবাবুই বা কোথায়?

ফেলুদা বোধহয় রবীনবাবুর কথাই জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল আমাকে। কিন্তু ওর দৃষ্টি এখন অন্য দিকে। যে দিক থেকে এসেছিল সেদিকেই আবার ঘুরে গেছে।

তিন নম্বর সিট থেকে এক ভদ্রলোক উঠে দরজার দিকে এগোচ্ছেন। হাতে অ্যাটাচি কেস।

আমরা দু’জনেই ভদ্রলোকের পেছনে, কিন্তু এক ঝলকে দেখতে পেলাম ভদ্রলোকের চোখে সানগ্লাস।

আমি এখন ফেলুদার পাশে, ফেলুদা একটা চাপা হিসহিসে স্বরে বলল, ‘বিকাল পাঁচটার সময় ট্রেনের ভেতর কে সানগ্লাস পরে?’

ভদ্রলোক কি ট্রেন থেকে নামার চেষ্টা করছেন? বাথরুমের দজার সামনে পৌঁছেছেন, ফেলুদা পেছন থেকে ডাকল, ‘এক্সকিউজ মী, মিস্টার জয়সওয়াল?’

ভদ্রলোক ঘুরে তাকিয়েছেন। এনার মুখের সঙ্গে জয়সওয়ালের মুখ মিলছে না, পেন্সিল গোঁফের বদলে এনার মুখে ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। সানগ্লাস থাকার জন্য অবশ্য চোখের রঙটা বোঝা যাচ্ছে না। আমি জানি এনাকে কোনোদিন আমি দেখিনি কিন্তু তাও যেন মনে হচ্ছে চিনি।

ঘড়ঘড়ে গলায় ইংরেজিতে জবাব এল, ‘আপনি ভুল করছেন। আমার নাম মোহনলাল সোমানি।’

ফেলুদা স্বর ইস্পাতের মতন কঠিন, ‘আমি জানি আপনি জয়সওয়াল নন। কিন্তু আপনি যে সোমানিও নন।’

সানগ্লাসের পেছনে চোখটা কি একটু নড়ে উঠল?

‘আমি জানি না আপনি কি বলছেন, আমি জানতেও চাই না। কিন্তু আমাকে এবারে ট্রেন থেকে নামতে হবে। উড ইউ মাইন্ড?’

‘সার্টেনলি আই উড।’

ফেলুদা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে।

‘মেকআপটা ভালোই করেছিলেন, কিন্তু তাড়াহুড়োয় সিঁথিটা ডান দিক থেকে আর সরানো হয়নি।’

চোখের নিমেষে ভদ্রলোকের হাতে একটা পিস্তল উঠে এসেছে।

‘আমি দুঃখিত প্রদোষবাবু, আপনি চান কী না চান তাতে আমার কিছু যায় আসে না। এ ট্রেন থেকে নামতেই হবে আমাকে।’

‘কিন্তু খুন? খুনটা করলেন কেন?’

প্রায় একটা চাপা গর্জন বেরিয়ে এল ভদ্রলোকের মুখ থেকে, ‘এক ভুল কতবার সইতে পারে মানুষ? যে ভুলের জন্য আপনি অতীতে সব কিছু খুইয়েছেন? সব কিছু! টাকাপয়সা, মান ইজ্জত – সব। দ্যাট স্কাউন্ড্রেল, আমার কোনো আফশোস নেই ওর জন্য।’

রাজধানীর ইঞ্জিনের ভোঁ শোনা গেল, ট্রেন ছাড়ার সময় হয়েছে।

কিন্তু সেই আওয়াজ ছাপিয়ে ফেলুদার কথা শোনা যাচ্ছে, ‘সেটা যে পুরোপুরি সত্যি কথা নয়। মাধবরাও যোশীর দ্বিতীয়বার বিশ্বাসঘাতকতার খবর আপনি পেয়েছেন মাত্র দু’দিন হল। অথচ চুরির গল্প ফেঁদেছিলেন তার কত আগেই, তাই না? আপনি যে খুনের মতলব অনেক দিন ধরেই ভেঁজে রেখেছেন, না হলে আগ বাড়িয়ে কেন ফেলু মিত্তিরকে চুরির গল্প বলে ডেকে পাঠাবেন? কিন্তু ঘোলা জলে যে মাছ আপনি ধরেছেন সে যে নেহাতই রেড হেরিং তা বুঝতে আমার বাকি নেই।’

‘আপনি অনেক বড় বড় কথা বলেছেন মিস্টার মিটার। আপনাকে আর কথা বলতে আমি দেব না। সরুন সরুন, যান ওদিকে। যান বলছি। এক পা এগোলেও গুলি করতে আমার হাত কাঁপবে না।’

ফেলুদাকে ধমক দিতে গিয়ে ভদ্রলোকের সেই ঘড়ঘড়ে গলার স্বর উধাও হয়ে গেছে। আর এই নতুন গলার স্বর আমি চিনি।

ভদ্রলোক পিস্তল উঁচিয়ে এক পা এক পা করে পিছোচ্ছিলেন। ট্রেনের দরজাটা খুলবেন বলে হ্যান্ডলে হাত রেখেছেন আর ঠিক এই সময়ে বাইরের দিক থেকে দরজাটা দমাস করে খুলে গেল। দরজাটা এত জোরে এসে লাগল ভদ্রলোকের মাথায়, ভদ্রলোক ট্রেনের ভেতরে মুখ থুবড়ে পড়লেন। যদিও তার আগে ভদ্রলোকের আঙ্গুল পিস্তলের ঘোড়ায় চাপ দিয়ে গেছে। আমাদের ভাগ্য ভালো সে গুলি ট্রেনের সিলিং এ গিয়ে লেগেছে।

কামরার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন শ্রী লালমোহন গাঙ্গুলি।

আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কোথায় ছিলেন আপনারা? কতক্ষণ ধরে প্ল্যাটফর্ম ধরে ছুটতে ছুটতে জানলার ভেতর দিয়ে দেখছি। কিছুতেই পাই না। এই কামরার প্রথম জানলাটাতে উঁকি মারতে গিয়ে মনে হল ফেলুবাবুর গলা শুনছি। তাই কপালে যা থাকে বলে উঠে পড়লাম।’

ফেলুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এবারের ঘটনাটা যখন লিখবি পাঠকদের আগেভাগে জানিয়ে দিস ফেলু মিত্তিরের কোনো রোলই এবার নেই। সবই জটায়ুর দয়া।’

লালমোহনবাবু হেঁঃ হেঁঃ করে হাসতে গিয়ে বিষম খেলেন, ওনার এতক্ষণে নজর পড়েছে মেঝের দিকে। গুলির আওয়াজ শুনেই রবীনবাবুরাও এসে পড়েছেন।

‘ইনিই জয়সওয়াল?’

‘ওরফে মোহনলাল সোমানি। তবে আপনারা এনাকে অন্য আরেকটি নামে চেনেন, অনুকূল ভদ্র। রবীনবাবু, সানগ্লাসটা খুলে নিলে দেখবেন কটা রঙের একটি কনট্যাক্ট লেন্স আছে ওনার চোখে। অত হাই পাওয়ারের চশমা লুকনোর জন্য লেন্স ছাড়া উপায় ছিল না।’

জটায়ুর হাঁ-মুখ আর বন্ধ হল না।

FeludaHiRes005_Train

রবীনবাবুর কনস্টেবলরা অনুকূলবাবুকে নিয়ে গেছে ওনার বাড়িতেই, সেখানে খানাতল্লাশী হওয়ার পর যাবে হোটেল মেট্রোপলিটান।

আমরা এখন দিল্লীর বাঙালি অ্যাসোশিয়েনের অফিসঘরে বসে। আমরা তিনজন ছাড়াও আছেন রবীনবাবু এবং প্রণব পাইন। প্রণব পাইন শুনে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। ‘এ তো মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া খবর মশাই। কে বিশ্বাস করবে অনুকূল ভদ্র খুনী আসামী? আমরা তো ওনাকে শিল্পী মানুষ বলেই জানতাম, তা ছাড়া আড্ডাবাজও ছিলেন, প্রত্যেক বছর নাটক মঞ্চস্থ করতে সাহায্য করতেন।’

ফেলুদা প্রণববাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যার কথার সূত্রে এই কেসে আমার জড়িয়ে পড়া সেই সিদ্ধেশ্বর বোস ওরফে আমার সিধুজ্যাঠা জানিয়েছিলেন অনুকূল ভদ্র বরোদার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ছিলেন কিন্তু আচমকা রিটায়ারমেন্ট নিয়ে দিল্লীতে এসে সেটল করেন। আজ কলকাতায় আমার এক বন্ধুকে ফোন করে জানতে পারি অনুকূল ভদ্র বরোদা এমনি এমনি ছাড়েন নি। বরোদার পুলিশে খাতায় ওনার নাম উঠেছিল স্মাগলিং এর কারণে।’

‘স্মাগলিং?’ চমকে উঠলেন প্রণববাবু।

‘হ্যাঁ, আর্ট আইটেম স্মাগলিং। তবে অনুকূল বাবু আর্ট স্মাগলার ছিলেন না। আমার ধারণা ওনাকে এই স্মাগলিং চক্রের চাঁই মোটা টাকার অফার দিয়েছিল একটি চোরাই মাল বেচে দেওয়ার জন্য। প্রফেশনাল কারণেই ভদ্রলোকের বহু বিদেশী আর্ট কালেক্টরের সঙ্গে আলাপ ছিল। অনুকূল বাবু জানতেন না যে জিনিসটি চোরাই, ভেবেছিলেন উনি স্রেফ মিডিয়েটরের কাজ করছেন। এবং এই ভেবে না জেনেই জড়িয়ে পড়েছিলেন এই চক্রের সঙ্গে। ওনার দুর্ভাগ্য যে বরোদা পুলিশ এই চোরাই মালের কারবারটি ধরে ফেলে। যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে আদালতে ওনার এগেন্সটে কেস টেঁকেনি, কিন্তু ওনার চাকরিটি যায়। বলা বাহুল্য যে ভদ্রলোকের কলীগ এবং বন্ধুরাও ওকে একঘরে করেন। ফলে বরোদার পাট উঠিয়ে চলে আসতে হয় ওনাকে।’

ভালো কথা, এই স্মাগলিং চক্রের চাঁইটিকে কিন্তু আপনারা চেনেন।’

ফেলুদা দম নেওয়ার জন্য একটু থেমেছিল, আমি সেই ফাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মাধবরাও যোশী?’

‘ভেরি গুড তোপসে, হ্যাঁ মাধবরাও যোশী-ই। সেই যোশী যে দিল্লী এলেই কালীবাড়ি ছুটত। হুডিনির কথাটা মনে পড়ছে তোর?’

আমি ঘাড় নাড়লাম। সত্যিই, যে যত ভণ্ড তার ভক্তিও তত বেশী।

‘বরোদার পাট চুকিয়ে দিল্লী আসার পরেও যোশীর সঙ্গে অনুকূল ভদ্রের যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি, সম্ভবত যোশীর কথাতেই ওনার দিল্লী আসা। যোশীর এনে দেওয়া আর্ট আইটেম বিক্রি করেই ওনার থাকাখাওয়ার খরচ উঠে আসত। অনুকূল বাবুকে জিজ্ঞাসা করলে সবই জানা যাবে তবে আমার ধারণা এগুলো চোরাই মাল নয়।’

রবীনবাবু বললেন, ‘তার মানে বলছেন বরোদার ঘটনা নিয়ে যোশী এবং অনুকূল ভদ্রের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য ঘটেনি?’

‘মনোমালিন্য ঘটেনি কিন্তু সেটা অনুকূল বাবু কিছু বুঝতে দেননি বলেই। যোশীর শয়তানিতে অনুকূল ভদ্রের জীবন প্রায় শেষ হয়ে গেছিল, উনি চরম প্রতিহিংসা নেবেন বলে ঠিকই করে রেখেছিলেন। খালি সুযোগ খুঁজছিলেন সঠিক সময় এবং সুযোগের। এদিকে যোশীর সময়ও ভালো যাচ্ছিল না, সেও একটা মোটা দাঁও মারার অপেক্ষায় ছিল। এমন সময়ে যোশীকে অজান্তে প্ল্যান দিয়ে বসলেন লালমোহন বাবু।’

লালমোহনবাবুকে দেখে মনে হল দুষ্কর্মটি করার জন্য তিনি সত্যিই লজ্জিত। প্রণব পাইন ঘটনাটা জানতেন না, তাঁকে বলার পর এতক্ষণে মুখে হাসি ফুটে উঠল।

‘যোশীর এবারের আর্ট আইটেমটি দেখে অনুকূল বাবুর প্রথম থেকেই সন্দেহ হয়। সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয় যখন যোশী ওনাকে স্পেশ্যালি আমেরিকান আর্ট কালেক্টরদের অ্যাপ্রোচ করতে বলে। অনুকূল বাবু নিজেও তিন নম্বর টিয়ার কথা বিশ্বাস করেন নি। ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানের গল্পটা যোশীরই বানানো, অনুকূল সেটা বুঝেওছিলেন। কিন্তু যোশীকে কিছু না বলে তিনি একটা ডিটেইলড প্ল্যান ভাঁজেন। নিয়ে আসেন তাঁর নতুন অবতার পবনদেও জয়সওয়ালকে, যে নাকি জয়পুরের মহারাজার ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানের বংশধর। যোশীকে সম্ভবত বুঝিয়েছিলেন যে পুরনো ঘটনার জন্যই অনুকুল ভদ্রকে তিনি সবার চোখের আড়ালে রাখতে চান। যোশীর স্বভাবতই আপত্তি করার কিছু ছিল না।’

‘কিন্তু টিয়াটা জয়সওয়াল চুরি করলেন কখন?’, জিজ্ঞাসা করলেন জটায়ু।

‘টিয়া তো চুরিই হয়নি মশাই।’

লালমোহনবাবু হাঁ করে তাকিয়ে আছেন দেখে ফেলুদা বলল, ‘সে কথাতেই আসছিলাম। কলকাতা থেকে ফিরে আসার পর অনুকূল ভদ্র জয়সওয়াল সেজে ফের ফোন করেন সিধুজ্যাঠাকে। সিধুজ্যাঠার পক্ষে অফ কোর্স এত কিছু জানা সম্ভব নয়। তিনি চুরির কথা সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করলেন, অথচ সেই টিয়া তখন বহাল তবিয়তে যোশীর কাছেই আছে।’

প্রণব পাইন এবার হাত তুলে বললেন, ‘কিন্তু যেচে একজন গোয়েন্দাকে এর মধ্যে টেনে আনার কারণ কী মিত্তির মশাই?’

‘এটাই তো অনুকূল ভদ্রর সবথেকে বড় চাল। তিনি খুনে মোটিভটা দেখাতে চেয়েছিলেন লোভ। যোশীকে খুন করে জয়সওয়াল উধাও হলে প্রথমেই মোটিভের প্রশ্ন আসবে। রাজধানী এক্সপ্রেসে চুরির ঘটনাটা থাকলে সেখানে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ব্যক্তিই চুরি করে থাকুক, জয়সওয়ালের তার সঙ্গে সাঁট ছিল। সিধুজ্যাঠাকে যে গল্পই দু’জনে বলে আসুক না কেন, অনুকূল জানতেন যে তদন্ত শুরু হলে এ কথা প্রকাশ পাবেই যে টিয়াটা কেনার কথা ছিল জয়সওয়ালের। সিধুজ্যাঠাকে যদিও বলা হয়েছে জয়সওয়াল সেই চিকিৎসকের বংশধর, কিন্তু তদন্ত শুরু হলে দেখা যাবে সেটা ভুয়ো খবর। তাহলে এই জয়সওয়াল আসলে কে? কোনো একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি, যে যোশীকে ঠকিয়ে এবং খুন করে পালিয়েছে।’

ঘরে দমবন্ধকরা উত্তেজনা, জটায়ুর কপালে দেখলাম বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।

‘কিন্তু অনুকূল তো খুন করছেন স্রেফ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য, টিয়া তিনি পেলেন কি পেলেন না সেটা ম্যাটার করে না।’

ফেলুদা এবার থেমে আমার আর জটায়ুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সোলাঙ্কির বাড়ি কলকাতায় হওয়া সত্ত্বেও যোশী ওকে কেন দিল্লী আসতে বলেছিল বল্ দেখি? টাকাটা তো সে সোলাঙ্কিকে কলকাতায় দিলেই পারত।’

আমি বোকার মতন মাথা নাড়লাম, সত্যিই কোনো উত্তর নেই আমার কাছে।

ফেলুদা বলল, ‘দুঃখ করিস না, এটা যে একটা ইম্পরট্যান্ট পয়েন্ট সেটা আমার মাথাতেও আসেনি। আজ সকালে দেবরাজ বলল দিল্লীতে নাকি গত শুক্রবার থেকে এক বিশাল আর্ট কনভেনশন শুরু হয়েছে, দেশ বিদেশের অসংখ্য আর্ট কালেক্টর সেখানে এসেছেন।’

‘যোশী এই কনভেনশনটাকেই টার্গেট করেছিল। প্ল্যান ছিল এখানেই কোনো বিদেশী আর্ট কালেক্টরকে টিয়াটা বেচে দিয়ে সোলাঙ্কি এবং অনুকূলকে তাদের টাকার ভাগ দিয়ে দেবেন। অনুকূল অবশ্য সোলাঙ্কির ব্যাপারে কিছু জানতেন না।’

‘আচ্ছা, কুতব মিনারে তাহলে আমাদের ভয় কি অনুকূলই দেখিয়েছিলেন?’

‘সে কথা আর বলতে। অবশ্য তখন উনি ছিলেন জয়সওয়ালের অবতারে। একটা রিস্ক অবশ্যই নিয়েছিলেন কিন্তু চুরির মোটিভটাকে শক্ত করার জন্যই এই রিস্ক নেওয়া। মনে করে দেখুন সেই হুমকি চিরকুটে কি লেখা ছিল?’

 

‘রবীনবাবু, অনুকূল ভদ্রের বাড়ি থেকে একটা ট্যুইডের জ্যাকেট পাওয়ার কথা আপনাদের। জয়সওয়াল ওটা পরেই মেট্রোপলিটান হোটেল থেকে কুতব মিনার গেছিলেন আমাদের ভয় দেখাতে’, বলল ফেলুদা।

প্রণব পাইন একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লেন, ‘কি শক্ত নার্ভ মশাই। জলজ্যান্ত একটা খুন করে এসে আপনাদের ভয় দেখালেন, তারপর পুজোর এখানে এসে সারাদিন কাটালেন, এমনকি পরের দিন নাটকের মঞ্চসজ্জা-মেকআপ সব কাজই করে দিলেন।’

‘খুনের দিনক্ষণ অনেক আগে থেকেই ঠিক হয়ে গেছিল প্রণববাবু। সিধুজ্যাঠার ফোনে আসা খবরটা ওনাকে একটা বাড়তি অ্যাডভান্টেজ দিয়েছিল মাত্র। দ্বিতীয়বার বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলে অনুকূল ভদ্র যোশীকে ডিসট্র্যাক্ট করে দেন, ফলে যোশীর অসতর্ক মুহূর্তে ওর বুকে ছোরা বসাতে আরোই সুবিধা হয়ে যায় অনুকূলের।’

‘ভালোই আটঘাট বেঁধেই কাজে নেমেছিলেন ভদ্রলোক’, বললেন জটায়ু।

‘বিলক্ষণ। শনিবার দিন জয়সওয়াল আর যোশীর একসঙ্গেই আর্ট কনভেনশনে যাওয়ার কথা ছিল। জয়সওয়াল যোশীকে খুন করে টিয়া পাখিটা নিয়ে ফের অনুকূল ভদ্র হয়ে গেলেন। যদিও টিয়া বিক্রি করার কোনো ইচ্ছে ওনার ছিল না। প্ল্যান ছিল প্রথম সুযোগেই এ শহর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া। শনিবারে খুন, রবিবারে নাটক, আজ অর্থাৎ সোমবার দিনই ওনাকে বেরোতে হত।’

‘কিন্তু ফেলুদা, উনি যে হাওড়া রাজধানীতেই যাবেন সেটা তুমি জানতে?’

‘এটা নেহাতই অনুমান। সবুজ তোতাকে নিয়ে নতুন কোন শহরেই বা আচম্বিতে হাজির হতেন অনুকূল বাবু? সেফ অপশন হল কলকাতায় ফিরে যাওয়া। সমস্ত অতীত ভুলে, নিজের শহরেই আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চাইছিলেন ভদ্রলোক। আর অত দামী একটা জিনিস নিয়ে সাধারণ কোনো ট্রেনে চড়বেন বলে মনে হয়নি আমার।’

জটায়ু শেষ কয়েক মিনিটে একটু কিন্তু কিন্তু ভাব করছিলেন। এবারে খানিকটা মরীয়া হয়েই বলে ফেললেন, ‘ফেলুবাবু সেই টিয়াটা একবার দেখা যাবে না?’

‘যাবে বই কি। থানায় নিয়ে যাওয়ার আগে আপনাদের দেখাবো বলেই তো এটা বয়ে নিয়ে এলাম’, বলে উঠলেন রবীন তরফদার। ওনার হাতে জয়সওয়ালের সেই অ্যাটাচি কেস। কম্বিনেশন লকের নম্বর অনুকূল ভদ্রই বলে দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী পর পর নম্বর ডায়াল করে একটা মোক্ষম মোচড় দিতেই খুলে গেল অ্যাটাচি কেস।

রবীনবাবুর হাতে অবশেষে উঠে এসেছে রুবি আইড প্যারট। সবুজ টিয়ার ডানায় বসানো হীরের সারি ঝিকমিক করে উঠল, আর আধো অন্ধকার ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল এক অপার্থিব সবুজ আভা। ফেলুদার দৌলতে আমি জানি এ সেই ময়সেনাইট, কত আলোকবর্ষ দূর থেকে উল্কায় করে একদিন এসে পড়েছিল পৃথিবীর বুকে।

ফেলুদা ফিসফিস করে বলল, ‘প্রাণ ভরে দেখে নে তোপসে, এ জিনিস দেখার আর স্কোপ পাবি না।’

আমাদের সবার চোখই উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছে। জ্বলজ্বল করছে টিয়ার চোখ দুটোও, সেও বোধহয় জানে একশ বছরের পুরনো আস্তানাতে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে এবার।

 

ডাকিনী ও সিদ্ধপুরুষ

(বিক্রমশীল মহাবিদ্যালয় থেকে তিব্বতে যাওয়ার পথে অতীশ দীপঙ্করকে সম্মুখীন হতে হয়েছিল একাধিক অতিলৌকিক রহস্যর, সেসব গল্পের খোঁজ হয়ত ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’র পাঠকরা ধীরে ধীরে পাবেন। আজকে রইল প্রথম উপাখ্যানটি, ছাপার অক্ষরে এটি প্রথম বেরোয় ‘টগবগ’ পত্রিকার সরল দে সংখ্যায় (২০১৬)। সঙ্গের অনবদ্য ছবিগুলি এঁকেছেন শিল্পী সুমিত রায়। )

tb-dakini-1

এক

জয়শীল কটমট করে তাকালেন, “কী নাম বললি? বায়চং?”

বায়চং হাতে ধরা কমলা লেবুটার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল।

“ফের মিথ্যে কথা। এই ছোঁড়া, এই, তাকা এদিকে”।

বায়চং জয়শীলের দিকে মুখটা ঘোরাতে দেখা গেল ওর কপালটা বেশ ফুলে রয়েছে, একটা স্পষ্ট কালশিটে দাগও দেখা যাচ্ছে। সেই দেখে বীরভদ্র মহা ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়লেন, “দেখেছেন কান্ড! আহা রে, কোন পাষন্ড দুধের শিশুটাকে এমন করে মেরেছে”।

জয়শীল কড়া গলায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কালশিটে দেখে তিনিও এখন থেমে গেলেন। বীরভদ্রকে বললেন, “তাঁবুর মধ্যে ওষুধ আছে। দাঁড়ান, নিয়ে আসি”।

জয়শীলকে তাঁবুর দিকে যেতে দেখে বায়চং-ও গুটি গুটি পায়ে সেদিকেই রওনা দিচ্ছিল। ওর ছেঁড়া কামিজের খুঁট ধরে বীরভদ্র আটকালেন, “সত্যিই তোর নাম বায়চং?”

বায়চং পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বলল, “হুঁ, আর আমার বোনের নাম ডেকি”।

“বোঝো! তোর বাবা মা কেমনতর নাম দিয়েছে রে? ছেলের নাম ছেলে আর মেয়ের নাম মেয়ে?”

“আমার বাবা মা নেই তো”, বলেই চুপ করে গেল বায়চং।

বীরভদ্রও শুনে চুপটি করে বসে রইলেন, খেয়াল রইল না হাতের মগে মাখন চা ঠান্ডা হয়ে আসছে। অনেক অনেক দূরে লাংটাং পাহাড়ের চুড়োয় সোনা রঙ ধরতে শুরু করেছে। কতদিন পর গাঢ় কুয়াশার বদলে মিঠে রোদ দিয়ে দিনটা শুরু হল, কিন্তু মনটা কিরকম চুপসে রয়েছে।

জয়শীল এদিকে তাঁবুর মধ্যে ঢুকতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়েছেন। ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে “সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং বোমানাংসি জানতাম্, দেবাভাগং যথা পূর্বে সং জানানা উপাসতে”। জয়শীল বিক্রমশীল মহাবিদ্যালয়ে সংস্কৃত চর্চা করেছেন, যিনি স্তোত্রপাঠ করছেন তাঁর কাছেই বেদ – বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করেছেন। এ স্তোত্রের মানে তাই তিনি জানেন – সবাইকে একসঙ্গে চলতে বলে হচ্ছে, বলা হচ্ছে একই ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতে।

“ভালো হোক, মঙ্গল হোক, শান্তি বিরাজ করুক”, বলতে বলতে জয়শীলের গুরু বেরিয়ে এসেছেন। এই কথাগুলোর মানে জয়শীল অনেকদিন বুঝতে পারতেন না। এ ভাষা গুরুর মাতৃভাষা। বিক্রমশীলেরও পূর্ব দিকে তাঁর দেশ, সেখানেই নাকি এ ভাষায় মানুষে কথা বলে, সে ভাষার নাম বাংলা। জয়শীল অভ্যস্ত না হলেও বাংলা ভাষা শুনতে তাঁর বেশ লাগে। বীরভদ্রও প্রায়ই বলে থাকেন এ ভাষার মাধুর্যের কথা।

জয়শীল মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালেন, “সুপ্রভাত”।

দীপঙ্কর মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন, এতদিনে বকাঝকার ফল পাওয়া গেছে। জয়শীল আর বীরভদ্র দু’জনেই দীপঙ্করকে দেখলেই ‘প্রভু’ না লাগিয়ে কথা বলতেন না। বীরভদ্র তো বিক্রমশীলায় কতবছর ধরে তাঁর কাছে বৌদ্ধশাস্ত্রের পাঠ নিয়েছেন, প্রভু বলার বদ অভ্যাসটা বেশ চলে গেছিল। দীপঙ্করকে তিব্বতে নিয়ে যাবেন বলে জয়শীল আসা মাত্রই জয়শীলের দেখাদেখি বীরভদ্রও আবার প্রভু বলতে শুরু করেছিলেন। শেষে খানিকটা বাধ্য হয়েই তাঁকে বলতে হয়েছে ফের প্রভু ডাক শুনলে নেপাল মাঝরাস্তা থেকেই ফের বিক্রমশীলার দিকে রওনা দেবেন।

“সুপ্রভাত জয়শীল, রোদ দেখে মন ভালো হয়েছে তো?”

“আপনি যেদিন জানিয়েছিলেন যে আমাদের সঙ্গে তিব্বতে আসবেন সেই দিন থেকেই আমার মনে অসীম সুখ, এক দিনের জন্যও তাতে বাধা পড়েনি”।

দীপঙ্কর জানেন এ শুধু ভক্তির প্রলাপ নয়, জয়শীল হৃদয় থেকে কথাগুলো বলছেন। এত ভালোবাসাকে তিনি তো ছাড়, স্বয়ং বুদ্ধও ফেরাতে পারতেন কিনা সন্দেহ আছে।

জয়শীল বিনীত স্বরে বললেন, “কিন্তু প্রভু, আজ সকালে একটা সমস্যা এসে উপস্থিত হয়েছে”।

“জয়শীল!”

ভুল বুঝতে পেরেই জয়শীল করুণ গলায় বললেন, “ক্ষমা করুন।কিন্তু ভাববাচ্যে সম্বোধন করা এখনো ঠিক আয়ত্তে আসেনি”।

দীপঙ্কর রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেললেন, “আচ্ছা, বলো বলো। আজ আবার কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছ তুমি?”

জয়শীল জানালেন সকাল সকাল তাঁদের ঘোড়াদের ঘাস দিতে গিয়ে দেখেন একটি বাচ্চা ছেলে, বছর ছয় কি সাত তার বয়স, ঘোড়াদের জন্য রাখা একটা খড়ের গাদায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে রয়েছে। সে কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে কিছুই বলছে না, অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর শুধু জানিয়েছে তার নাম বায়চং। জয়শীল ওকে একটা লেবু আর চা দিয়েছেন, কিন্তু সে মুখে কিছুই তুলছে না”।

“আমার ধারণা নামটাও বানানো। বায়চং মানেই ছোট ছেলে, বানানোর সময় মাথায় আর কিছু আসে নি তাই ওই শব্দটাই বলে দিয়েছে”।

মাথা নাড়লেন দীপঙ্কর, “নাও হতে পারে। পাহাড়ি গ্রাম, সব থেকে কাছের ছোট শহরটায় যেতে হলেও হয়ত পাঁচ ছ দিন ঘোড়ায় চড়ে যেতে হবে। নাম রাখাটাই বাহুল্যের ব্যাপার এদের কাছে”।

জয়শীল একটু ইতস্তত করে বললেন, “আর…আর ছেলেটির শরীরে নির্যাতনের কিছু চিহ্ন আছে”।

“সে কি কথা!”, দীপঙ্কর চমকে উঠলেন, “কে মেরেছে কিছু বলেছে নাকি?”

“না প্রভু, আমি ওর কপালের কালশিটে দেখেই দৌড়ে এসেছি ওষুধ নিয়ে যেতে। বীরভদ্র অবশ্য আছেন ছেলেটির সঙ্গে”।

দীপঙ্কর এতই চিন্তায় পড়ে গেছেন যে জয়শীলের ‘প্রভু’ ডাকটি আর কানে পৌঁছল না।

জয়শীলকে নিয়ে দীপঙ্কর ছেলেটিকে দেখার জন্য চললেন। মাঝরাস্তাতেই বীরভদ্রদের সঙ্গে দেখা, বীরভদ্র ছেলেটির হাত ধরে এদিক পানেই নিয়ে আসছেন।

দীপঙ্করকে দেখা মাত্র একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। ছেলেটি বীরভদ্রের হাত থেকে নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে তীরবেগে দীপঙ্করের পায়ে এসে লুটিয়ে পড়ল। জয়শীল বা দীপঙ্কর হাঁ হাঁ করে ওঠার আগেই সে প্রাণপণে দীপঙ্করের পায়ে মাথা ঠুকতে লাগল।

জয়শীল বীরভদ্রের দিকে তাকালেন। দুজনেই স্তম্ভিত, কি বলবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। বীরভদ্র গলাটা একটু খাঁকরিয়ে বললেন, “আপনি চলে আসার কিছুক্ষণ পর থেকেই এমন ফোঁপাতে শুরু করল ভাবলাম এদিকেই নিয়ে আসি”।

দীপঙ্করের চোখও ভিজে এসেছে। তিনি বায়চংকে মাটি থেকে তুলে ধরেছেন। ওর মাথায়, কপালে হাতে বোলাচ্ছেন।

বায়চং এর চোখের জল থামছে না মোটেই। সে অস্ফূট স্বরে বারবার কি যেন কথা বলে চলেছে।

জয়শীল বায়চংকে ভোলাবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, শুনলেন ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে বলে চলেছে “ঠাকুর, তুমি আমার বোনকে এনে দাও”।

দীপঙ্করও শুনতে পেয়েছেন।

বায়চং কে কোলে তুলে নিয়ে তিনি তাঁবুর দিকে রওনা দিলেন, পেছনে জয়শীল এবং বীরভদ্র।

 

দুই

জয়শীল একটু চিন্তিত স্বরে বললেন, “আমাদের সঙ্গের লোকেরা সবাই এগিয়ে গেছে। এখন বায়চং এর গ্রামে ফেরত গিয়ে ওকে দিয়ে আসতেই তো দিন দুই লাগবে। তারপর আবার এই এক পথে ফেরা। মানে কম করে চারটে দিন নষ্ট।

দীপঙ্কর এক দৃষ্টিতে জয়শীলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সে সামান্য কিছু খাবার খেয়ে এখন ঘুমোচ্ছে। বায়চং এর কামিজটা খোলার পরে দেখা গেছে তার পিঠেও অসংখ্য কালচে লাল দাগ।

“আমরা যখন ওদের গ্রাম থেকে রওনা দিই তখনই তাহলে আমাদের পিছু পিছু এসেছে।“, বীরভদ্র নিজের মন্ডিত মুস্তকে হাত বোলাচ্ছিলেন, চিন্তায় পড়েছেন তিনিও।

দীপঙ্কর বীরভদ্রের দিকে তাকালেন, “আমরা কিন্তু এসেছি ঘোড়ায় চড়ে। অতটুকুন ছেলে নিশ্চয় ঘোড়ায় চড়তে পারে না। আর ঘোড়া পাবেই বা কী করে?”

“তাই তো”, বীরভদ্র তড়িঘড়ি উঠে বসলেন…… “তাহলে কি, তাহলে কি…”

মাথা নাড়লেন দীপঙ্কর, “হ্যাঁ, ও কারোর সঙ্গে এসেছে। কিন্তু কে সে? আর আমাদের সামনে সে দেখাই বা দিচ্ছে না কেন?”

জয়শীল বললেন, “ওকেই জিজ্ঞাসা করে দেখা যাক”।

হাত ওঠালেন দীপঙ্কর, “থাক্ জয়শীল, ওকে ঘুমোতে দাও। ওর শরীরের অবস্থা দেখেছ? শুধু এই দু’দিনের পরিশ্রমে নয়, বহুদিনের নির্যাতনে ও অবসন্ন। বরং এখনো অবধি ও আমাদের যা বলেছে সেটুকু নিয়ে ভাবা যাক”।

বীরভদ্র বললেন, “ওর বোনকে কোনো ডাইনীবুড়ি ধরে নিয়ে গেছে, এটুকুই তো শুধু বলেছে। ডাইনীবুড়ি, অ্যাঁ?”

দীপঙ্কর উঠে পায়চারি করছিলেন। বীরভদ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সব কথা যে ওর মুখ থেকেই বেরোবে তা তো নয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা অনুক্ত থাকে, বুদ্ধি খাটিয়ে শুনে নিতে হয়”।

এবারে বীরভদ্র একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। জয়শীলের দিকে আড়চোখে তাকালেন, জয়শীলও মাথা নাড়ছেন, বোঝেন নি।

“দেখো, ও নিজের চোখে দেখেছে কেউ বা কারা ওর বোনকে ধরে নিয়ে গেছে। সে ডাইনী কি অন্য কিছু সে প্রশ্নে এখন যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু কথাটা হল নিজের চোখে দেখেছে মানে তখন ভাই বোন একসঙ্গেই ছিল। তাই যদি হবে, শুধু মেয়েটিকেই ধরে নিয়ে গেল কেন?ওকেও তো ধরতে পারত”।

বীরভদ্র ঘন ঘন মাথা নাড়তে লাগলেন, দীপঙ্কর খাঁটি কথা বলেছেন। অবশ্য সর্বদাই তাই বলে থাকেন।

জয়শীলের মনে অবশ্য শান্তি নেই। বহু বছরের সাধ্যসাধনার ফলে দীপঙ্কর তিব্বতে যেতে রাজি হয়েছেন। যতক্ষণ না দীপঙ্করকে নিয়ে তিব্বতের রাজদরবারে হাজির হচ্ছেন জয়শীলের মনে শান্তি নেই। এমনিতেই বিপদসংকুল পথ, তারপর দীপঙ্কর নিজের মতন করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে চলতে চান। ফলে জনা পঁয়ত্রিশ সহচরকে আগে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। এমনিতেই দুশ্চিন্তার শেষ নেই, তার ওপর এই উটকো ঝামেলা।

দীপঙ্কর জয়শীল কি ভাবছেন সেটা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছেন। জয়শীলকে বললেন, “গুরু কলপের কথা শুনিয়েছিলাম না তোমাকে। সবাই যখন তাঁকে পাগল বলে খেপাত, কলপ বিড়বিড় করে কী বলতেন মনে আছে?”

জয়শীল নতমস্তকে ঘাড় নাড়লেন, “আত্ম ও পর এই দ্বৈতভাব থেকেই জন্ম হয় দুঃখের”। জয়শীলের মুখটি লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, “আমি আসলে……”।

“তোমার চিন্তা নেই জয়শীল। তিব্বতে আমরা ঠিকই পৌঁছব, জ্ঞানের চর্চা ঠিকই শুরু হবে। কিন্তু পথের মানুষকে না চিনে গেলে সে জ্ঞানে কি লাভ বলো তো?”

জয়শীল পালাতে পারলে বাঁচেন, এমন সময় বীরভদ্র একটু গলা খাঁকারি দিলেন। জয়শীল এবং দীপঙ্কর বীরভদ্রের দিকে তাকাতে তিনি ইশারায় বিছানার দিকে দেখালেন।

বায়চং উঠে বসেছে, এক দৃষ্টিতে দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে।

দীপঙ্কর ওর পাশে বসে মাথায় হাত দিলেন।

“এবার আমরা যাব বায়চং, তোমার বোনকে ফিরিয়ে আনতে”।

বায়চং এর চোখ ঝিকমিকিয়ে উঠল, পারলে তখনই দৌড়ে বেরোয়।

দীপঙ্কর ওকে শান্ত করে পাশে বসালেন, কিছুক্ষণ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “কে মেরেছে তোমাকে?”

বায়চং যেন একটু ঘাবড়ে গেল। সবার দিকে এক ঝলক দেখে নিয়ে দীপঙ্করকেই প্রশ্ন করল, “মেরেছে?”

“হ্যাঁ। তোমার কপাল, পিঠে এই দাগগুলো কে করে দিয়েছে?”

“কেউ না”।

জয়শীল বীরভদ্রের কানে কানে বললেন, “নাম বলতে ভয় পাচ্ছে বোধহয়”। বলেই বায়চং এর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভয় কি তোমার? নিশ্চিন্তে বলো, কে মেরেছে তোমাকে”।

বায়চং এর সেই এক কথা, “কেউ না”।

জয়শীল কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, দীপঙ্কর হাত তুলে থামালেন। ওর কপালের কালশিটে দাগটিয়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “তাহলে এই দাগটা হল কী করে?”

দীপঙ্করের কথায় বায়চং এর যেন খেয়াল হল। আপন মনে ফুলে যাওয়া জায়গাটায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “ওহ, ওটা? চোন ডুই…”।

“চোন ডুই কে?”

“চোন ডুই? চোন ডুই আমার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে থাকি যে”।

বীরভদ্র এবারে কৌতূহলী হয়ে বললেন, “তোমার বন্ধু তোমাকে মেরেছে?”

“না মারেনি তো। ও যে কাঠের তক্তা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল”।

বীরভদ্র আরো অবাক, “আর তুমি? তুমি কী করছিলে?”

“আমি তাতে মাথা ঠুকছিলাম”।

দীপঙ্করও হতবাক। বিস্মিত হয়ে বললেন, “তুমি কাঠের তক্তায় মাথা ঠুকছিলে? কেন?”

“সব্বাইকে ঠুকতে হয় ”।

দীপঙ্কর তাঁর শিষ্যদের দিকে তাকালেন, তাঁরাও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। জয়শীল একটু অস্থির গলায় বললেন, “ঠুকতে হয় মানে? কেন ঠুকতে হয়? কে ঠুকতে বলে?”

এত প্রশ্ন শুনেই কি কে জানে, বায়চং এর মুখে কথা নেই।

দীপঙ্কর আরো একবার জয়শীলকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার পিঠে যেরকম দাগ আছে, চোন ডুই এর পিঠেও সেরকম দাগ আছে বুঝি?”

বায়চং এর মুখে এবার হাসি ফুটল। “তুমি জানো? আছে তো। আমিই করে দিয়েছি তো আমার চামড়ার টুকরো দিয়ে, আমার চামড়ার টুকরোয় চোন ডুই এর চামড়ার টুকরোর থেকেও জোরে আওয়াজ হয়”।

দীপঙ্করের মুখ গম্ভীর থেকে গম্ভীরতর হচ্ছিল, আর কিছু না বলে তিনি উঠে পড়লেন। “জয়শীল, এবারে বেরিয়ে পড়া দরকার। আর বায়চং তোমার সঙ্গে থাকবে”।

জয়শীল আর বীরভদ্র ঘোড়াগুলিকে নিয়ে আসতে গেলেন, দীপঙ্কর বায়চংকে নিয়ে তাঁবুর বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। ঘোড়াতে ওঠার আগে দীপঙ্করের মনে হল বায়চং এর চোখ দুটো যেন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

তিন

বায়চং এর গ্রামে দীপঙ্কররা দু’দিন আগেই রাত কাটিয়ে গেছিলেন। গাঁওবুড়ো তো বটেই, গ্রামের বাকি লোকেরাও প্রচুর যত্নআত্তি করেছিল। এইবার কিন্তু গ্রামে পৌঁছে আবহাওয়াটা অন্য রকম লাগল। চট্ করে কেউ সামনে আসতে চাইছে না, অথচ দু’দিন আগেই দীপঙ্করকে প্রণাম করার জন্য চড়াই উতরাই জুড়ে সার দিয়ে অপেক্ষা করছিল লোকেরা। গাঁওবুড়ো তো বায়চংকে দেখে এই মারে কি সেই মারে। বায়চং তাতে আরো ভয় পেয়ে জয়শীলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। দীপঙ্কর ক্রোধান্বিত হচ্ছেন বুঝতে পেতে গাঁওবুড়ো বায়চং এর গায়ে হাত তুলল না বটে কিন্তু সমানে গজগজ করে যেতে লাগল।

দীপঙ্কর গাঁওবুড়োকে ইশারায় ঘরের মধ্যে ঢুকতে বললেন।

“আপনি কী জানেন এর বোন কোথায়?”

গাঁওবুড়ো মহা বিরক্ত হয়ে তাকাল বায়চং এর দিকে, তারপর দীপঙ্করকে বলল, “কী বলি বলুন, এই ছেলে মেয়ে দুটো দিন রাত্তির টোটো করে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝেই কোথায় কোথায় রাত কাটিয়ে আসে, খবর পাওয়া যায় না। ওদের মামা আমাকে দিন চারেক আগে বলেছিল বটে মেয়েটাকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে খবর পেয়ে আমি জনা কয়েক জোয়ানকে পাঠিয়েছিলাম খুঁজে দেখতে, তারাও কিছু পায়নি। পাহাড়ের রাজ্য, ভয় হচ্ছে কোনো খাদে না পড়ে গিয়ে থাকে”।

বীরভদ্র বলে উঠলেন, “ও যে বলছিল ডাইনি ধরে নিয়ে গেছে”।

গাঁওবুড়ো আকাশ থেকে পড়ল, “ডাইনি? না না, আমাদের গ্রামে ওসব কিছু নেই”। বলতে বলতে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিয়েছে বায়চং এর গাল, “তুই হতভাগা কী গল্পকথা সবাইকে বলে বেড়াচ্ছিস রে?”

দীপঙ্কর এবার গাঁওবুড়োর হাতটা ধরে ফেলেছেন, কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলেন।

গাঁওবুড়ো চোখ নামিয়ে নিল, বায়চংকেও আর কিছু বলল না।

দীপঙ্কর জিজ্ঞাসা করলেন, “আমাদের জন্য আর একটা রাত থাকার বন্দোবস্ত করতে পারবেন?বায়চংকে আমরা কথা দিয়েছি ওর বোনকে ফিরিয়ে আনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব, তাই অন্তত কাল বিকাল অবধি থাকাটা প্রয়োজন”।

“অবশ্যই, অবশ্যই”, মাথা নাড়তে লাগল গাঁওবুড়ো।

এবারে যদিও দীপঙ্করকে দেখতে লোকজন ভিড় করে আসেনি, দীপঙ্কর তাও চাইছিলেন লোকজনে মুখোমুখি না হতে। সন্ধ্যা হওয়ার একটু আগে বায়চং আর জয়শীলকে নিয়ে তিনি বেরোলেন। বায়চং বলেছে বিকালসন্ধ্যা নাগাদ দুই ভাইবোনে কাঠ কুড়িয়ে ফিরছিল, সেই সময়েই নাকি ডেকিকে অপহরণ করা হয়েছে।

দীপঙ্করদের আস্তানাটা গাঁওবুড়োর বাড়ির পিছনেই। বায়চং এর মামা সারা দিন কোনো খবর নিতে আসে নি, দীপঙ্কর তাও বীরভদ্রকে বলে গেলেন মামা এলে যেন দীপঙ্কররা ফিরে আসা না পর্যন্ত তাকে বসিয়ে রাখা হয়।

পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন দীপঙ্কররা, পাশেই অতল খাদ। একটু দূরে তাকালেই মেঘ আর কুয়াশা ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। ক্রোশখানেক হাঁটার পর দেখা গেল রাস্তাটা আচম্বিতেই অতি সরু হয়ে পাহাড়ের পাশ দিয়ে বেঁকে গেছে, যার ফলে দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়টা যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেখান থেকেই খাদের মুখের শুরু। বায়চং জয়শীলের হাতের মুঠোটা শক্ত করে ধরে চেপে দাঁড়িয়ে পড়ল। দীপঙ্কর কিছুটা এগিয়ে গেছিলেন, পেছনে পায়ের আওয়াজ না পেয়ে ফিরে এসে দেখলেন বায়চং আর এক পাও নড়ছে না।

“এখান থেকেই তোমার বোনকে নিয়ে গেছে, বায়চং?” প্রশ্ন করলেন জয়শীল।

“হ,হ্যাঁ”, বায়চং এর গলাটা কাঁপছে।

জয়শীল আরো কয়েকটা প্রশ্ন করার পর বোঝা গেল যে মুহূর্তে পাহাড়ের অন্য দিক থেকে এসে এই বাঁকের মুখে বায়চং আর ডেকি পৌঁছয় তখনই বায়চং এর ডাইনি ডেকিকে তুলে নিয়ে যায়।

এবারে দীপঙ্কর জিজ্ঞাসা করলেন, “তুলে নিয়ে কোনদিকে গেল সে?”

বায়চং চুপ, কোনো উত্তর নেই।

“তুমি দেখতে পাওনি?”

মাথা নাড়ে বায়চং, দেখতে পেয়েছে।

“তাহলে বলো, ডেকিকে নিয়ে কোনদিকে গেল সে?”

বায়চং এর তর্জনী আস্তে আস্তে উঠছে, তার আঙ্গুল এখন সোজা খাদের দিকে ধরা।

জয়শীল হতভম্ব হয়ে বললেন, “এর অর্থ কী? ডাইনি মেয়েটি কে নিয়ে সোজা খাদে নেমে গেছে?”

দীপঙ্করের কপালে চিন্তার ভাঁজ, “তুমি ঠিক দেখেছ বায়চং? খাদের দিকেই গেছিল সে?”

বায়চং মাথা দোলায়, সে ঠিকই দেখেছে।

জয়শীল দীপঙ্করের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললেন, “যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলি। ছেলেটি স্পষ্টতই কল্পনার রাজ্যে বাস করছে”।

দীপঙ্কর কিছু উত্তর না দিয়ে খাদের দিকে তাকিয়েছিলেন। জয়শীল আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় পাহাড়ের ওদিক থেকে একটা গুঞ্জন শোনা গেল। তারপরেই পাহাড়ের বাঁক ধরে সারি ধরে বেরিয়ে আসতে লাগল এক দঙ্গল ছেলে, তারা সবাই কাঠ কুড়িয়ে ফিরছে, একসঙ্গে বলে চলেছে, “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধম্মং শরণং গচ্ছামি, সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি”। বায়চং তাড়াতাড়ি রাস্তা তাদের জন্য রাস্তা ছেড়ে দিয়ে দীপঙ্করের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জয়শীল দেখলেন দীপঙ্করের মুখে হাসি ফুটে উঠছে।

সবার শেষে যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম বয়সের একটি ছেলে। বায়চং তাকে দেখতে পেয়ে ‘চোন ডুই’ বলে ডেকে উঠল। চোন ডুই কিন্তু একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল। বায়চং তাতেও দমেনি, দৌড়ে তার কাছে যাওয়া মাত্র চোন ডুই ধাক্কা মেরে ফেলে দিল বায়চংকে।

ছেলেরা চলে গেছে। বায়চং জয়শীলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দে কাঁদছে। দীপঙ্করের মুখের হাসিও অনেকক্ষণ মিলিয়ে গেছে। দীপঙ্কর পাহাড়ের বাঁকের কাছে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছেন বারবার। বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, “পাহাড়ের ওদিকে আরেকটু হাঁটলেই গভীর জঙ্গল। ছেলেরা বোধহয় জঙ্গল থেকেই কাঠ কুড়িয়ে আনছিল”।

জয়শীল বললেন, “এখন তবে কী করণীয়?”

“চলো ফেরা যাক”, বলতে বলতে হঠাৎ থেমে বায়চংকে প্রশ্ন করলেন, “ডাইনি কী পরে ছিল মনে পড়ছে তোমার?”

“কালো…কালো…”, বলতে বলতে যেন একটু শিউরেই উঠল বায়চং।

দীপঙ্কর আর কোনো প্রশ্ন করলেন না।

দেখা গেল, দীপঙ্কর ঠিকই অনুমান করেছিলেন। ওনারা বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই বায়চং এর মামা লোসাং এসে উপস্থিত, বীরভদ্র দীপঙ্করের নির্দেশ মতন বসিয়েই রেখেছেন তাকে। মামা অবশ্য একা নয়, সঙ্গে একটি বন্ধুও আছে।

বন্ধুটি বেশ বলিষ্ঠ প্রকৃতির, তবে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মতন তার বেশভূষা এবং মাথাটিও সম্পূর্ণ ভাবেই মুন্ডিত। দীপঙ্করকে দেখেই সে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল।

“জয়স্তু”, দীপঙ্কর দুজনকেই আশীর্বাদ প্রদান করে আসন গ্রহণ করলেন।

“আপনার ভাগ্নীর কোনো সন্ধান পেলেন?”

বায়চং এর মামার মুখে স্পষ্টতই একটি বিষণ্ণতার ছাপ পড়ল। মামার বন্ধু দেচানও হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল, “নাহ, বহু খোঁজাখুঁজি করেও কিচ্ছুটি পাওয়া গেল না। আমাদের মনে হচ্ছে হয়ত পা ফসকে কোনো খাদেই পড়ে গেছে সে”।

দীপঙ্কর এক দৃষ্টিতে দু’জনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দেচানের কথা শেষ হওয়ার পর শুধোলেন, “কিন্তু বায়চং কী বলছে সে কথা কি আপনি জানেন?”

“না তো, কী বলছে সে?” অবাক হয়ে বায়চং এর দিকে তাকাল লোসাং।

বায়চং মাথা নিচু করে বসে, লোসাং এর প্রশ্ন তার কানে ঠিকই গেছে কিন্তু মাথা তুলছে না।

দীপঙ্কর বললেন, “থাক্, আমিই বলছি। বায়চং এর বক্তব্য ওর বোনকে কোনো ডাইনি এসে নিয়ে গেছে”।

“ডাইনি?” দু বন্ধুই খুব অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে জোর গলায় হেসে উঠল। লোসাং বলল, “প্রভু, আপনি যাওয়ার আগে ওকে ভালোমতন শিক্ষা দিয়ে যান। বলে যান ডাইনি বলে কিছু হয় না”।

দীপঙ্কর কিছু না বলে চুপ করে রইলেন।

লোসাং হাত কচলাতে কচলাতে বলল, “আমরা তাহলে এখন আসি?”

“আসুন”।

দেচান বায়চং কে নিয়ে যাবে বলে হাত বাড়াচ্ছিল, দীপঙ্কর নরম গলায় বললেন, “ও যদি আজকের রাতটা আমাদের কাছে থাকে তাহলে কোনো অসুবিধা আছে? আমরা কাল বিকালেই চলে যাব। তার আগে যদি ওর কাছ থেকে আরো কিছু তথ্য পাওয়া যায়”।

লোসাং নিজে কিছু না বলে দেচানের দিকে তাকাল। দেচান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আসলে গত চার দিন ধরে ও শিক্ষামন্দিরে আসছে না, তাই ওকে আজ নিয়ে যেতে এসেছিলাম। কিন্তু আপনি যখন বলছেন, তখন থাক্ না হয়”।

দীপঙ্কর ঈষৎ বিস্মিত হয়ে দেচানকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি শিক্ষক?”

“হ্যাঁ, এই গ্রামের ছেলেদের আমরা অতি অল্প বয়স থেকেই বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র নিয়ে শিক্ষা দিতে থাকি”।

বীরভদ্র ভেবেছিলেন দীপঙ্কর হয়ত খুশি হয়ে বিশদে জানতে চাইবেন, কিন্তু দীপঙ্কর আর কোনো প্রশ্ন করলেন না।

দেচান আর লোসাং বেরিয়ে যেতে দীপঙ্কর বীরভদ্রদের বললেন, “তোমরা থাকো। আমি দেখি গাঁওবুড়োর বাড়িতে কিছু খাবার পাওয়া যায় কিনা”।

জয়শীল তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “আপনি কেন যাবেন! আমি যাই?”

দীপঙ্কর বললেন, “না, তোমরা থাকো। গাঁওবুড়োর সাথে আমার কিছু কথা আছে”।

চার

গাঁওবুড়ো বাড়ি ছিল না কিন্তু তার বউ দীপঙ্করকে দেখে শশব্যস্ত হয়ে উঠল। দীপঙ্করের বহু বারণ সত্ত্বেও গরম জলে পা ধুইয়ে তাঁকে এনে বসাল অতিথিকক্ষে। দীপঙ্কর যতই বলেন, “মা, আপনি ব্যস্ত হবেন না” সে ততই অস্থির হয়ে পড়ে দীপঙ্করকে কি ভাবে সেবা করা যায় সেই ভেবে। দীপঙ্কর খাবারের সন্ধানে এসেছেন শুনে বুড়ি তড়িঘড়ি শাম্পা (যবের পরিজ), থেংথুক (একরকম সুপ), নানারকম ফল আরো কত কি নিয়ে হাজির।

এলাহি বন্দোবস্ত দেখে দীপঙ্কর যারপরনাই বিব্রত হলেন। হাতজোড় করে বললেন, “মা, আমরা সন্ন্যাসী মানুষ। এত খাবারের প্রয়োজন নেই”।

গাঁওবুড়োর বউয়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল, বলল “আপনাকে আর একটা দিন সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। দয়া করে বঞ্চিত করবেন না”।

দীপঙ্কর হতাশ হয়ে জয়শীলকে ডেকে আনবেন বলে উঠতে যাচ্ছেন এমন সময়ে বুড়ি জিজ্ঞাসা করল, “বাবা, মেয়েটিকে সত্যিই কী ডাইনি নিয়ে গেছে?”

দীপঙ্কর একটু অবাক হয়ে তাকালেন। “সে কথা এখনো জানি না মা, কিন্তু আপনার স্বামীই তো বলছিলেন এ গ্রামে কখনো কোনো ডাইনি ছিল না”।

বুড়ি চোখ মুছে বলল, “আছে বাবা, ডাইনি আছে। আমার কথা এরা কেউ বিশ্বাস করবে না কিন্তু আমি জানি ডাইনি আছে”।

“আপনি জানেন ডাইনি আছে?” দীপঙ্কর বেশ জোর দিয়েই প্রশ্নটা করলেন।

“হ্যাঁ, সেই যে আমার কোল খালি করে দিয়ে গেছে”। বুড়ির চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরে পড়তে লাগল।

দীপঙ্কর চমকে উঠেছেন, অপলকে তাকিয়ে রয়েছেন বুড়ির দিকে।

চারপাশে একটু দেখে নিয়ে গলাটা খাদে নামিয়ে বুড়ি বলল, “আমারও এক মেয়ে ছিল বাবা। আজ বছর দশেক হয়ে গেছে সে নিরুদ্দেশ। তাকে দিয়েই তো শুরু, তারপর এক এক করে আরো অনেক মেয়েকেই পাওয়া যায় নি। লোকে সবসময়ই ভাবে এরা বুঝি খাদে পড়ে মরেছে কিন্তু আমি জানি বাবা এদের সবাইকেই ডাইনি নিয়ে গেছে”।

ফিসফিস করে বলেই চলে, “আরো লোকে দেখেছে সে ডাইনিকে। কালো পোশাকে সে ভেসে বেড়ায়, কারোর সাধ্যি কি তাকে ধরে!”।

“এরা সবাই কি বাচ্চা মেয়ে? বায়চং এর বোনের মতন?”

“প্রায় সবাই, শুধু আমার মেয়েটাই বড় ছিল। তার তখনই বয়স হবে পনেরো ষোল”।

সান্ত্বনা দিতে যাচ্ছিলেন দীপঙ্কর, বুড়ির পরের কথায় থেমে গেলেন। “বড় বাপন্যাওটা মেয়ে ছিল গো, আমরা তাকে মণি বলে ডাকতাম। শয়তানি ডাইনি তাকে কোথায় তাকে নিয়ে চলে গেল কে জানে। এ গাঁয়ের মেয়েদের ভাগ্যই খারাপ বাবা”।

“একথা কেন বলছেন মা?”

“কেন বলব না? এ গাঁয়ে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই দেখছি কত মেয়ের অপঘাতে মৃত্যু হল”।

“অপঘাতে মৃত্যু?” দীপঙ্কর সচকিত হয়ে বসেন।

“হ্যাঁ বাবা। সে সময় দুপুরের পর থেকেই মেয়েদের রাস্তায় বেরনো বন্ধ হয়ে যেত। তাও প্রায় প্রতি দিনই খবর আসত কার মাথায় পাথর গড়িয়ে এসে পড়েছে, কে পা পিছলে খাদে পড়ে গেছে, কার ঘাড় ভেঙ্গে দিয়ে গেছে কোন অপদেবতা”।

“সেরকম অপঘাতে মৃত্যু এখন আর হয় না?”

“না এখন কমে এসেছে, কিন্তু তাতেই বা কী? এখন যে নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে, ডাইনির”।

দীপঙ্কর উঠলেন, বুড়ির সঙ্গে কথোপকথনের পরে মাথাটা চিন্তায় বোঝাই হয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে। ধ্যানে বসতে পারলে ভাল হত।

দীপঙ্কর বেরোচ্ছেন, আর গাঁওবুড়োও ঢুকছে। গাঁওবুড়োর ঠিক পেছনেই ছিল বায়চং এর মামা লোসাং। দীপঙ্কর আর লোসাং এর কেউই কাউকে দেখতে পাননি, ফলে দু’জনের মুখোমুখি ধাক্কায় দীপঙ্করের হাত থেকে একটি খাবারের পাত্র পড়ে গেল, ভাগ্য ভালো যে পাত্রটিতে কোনো খাদ্যবস্তু ছিল না।

লোসাং তাড়াতাড়ি সেই পাত্র কুড়োতে গিয়ে উহহ করে উঠল, মনে হল মুখোমুখি সংঘর্ষে ভালোই ব্যথা পেয়েছে সে।

দীপঙ্কর পাত্রটি কুড়িয়ে নিয়ে রওনা দিলেন। একটু চিন্তাতেই পড়ে গেলেন যেন, এত রাত্রে গাঁওবুড়ো আর লোসাং এর কিসের বৈঠক?

জয়শীল এবং বীরভদ্র দু’জনেই চিন্তা করছিলেন দীপঙ্করের দেরি দেখে, দু’জনেই হাঁফ ছেড়ে বাচলেন। বায়চং ঘরের এক কোণে চুপটি করে বসে ছিল, সেও দীপঙ্করকে দেখে উঠে এসেছে।

দীপঙ্কর বায়চং এর মাথায় হাত বুলিয়ে খাবার তুলে দিলেন।

রাতের খাওয়ার পর বীরভদ্র শোওয়ার আয়োজন করছেন এমন সময় মনে হল গাঁওবুড়োর ঘরের পাশ থেকে একটা কুকুর ডেকে উঠল। কুকুরের ডাকটা জোর থেকে জোরালো হচ্ছে দেখে দীপঙ্কর এবং জয়শীল দু’জনেই বাইরে বেরিয়ে এলেন। কুকুরটা আরো একবার জোরে ডেকে উঠল, আর মনে হল গাঁওবুড়োর ঘরের পাশ দিয়েই কে যেন হুড়মুড় করে দৌড়ে পালাল।

জয়শীল চিন্তান্বিত মুখে দীপঙ্করের দিকে তাকালেন। দীপঙ্করের ভুরূ কুঁচকে গেছে, “নজরদারির জন্য চর বসেছে। জয়শীল, আজকে রাতটা একটু সজাগ থাকতে হবে”।

“যথা আজ্ঞা”।

ওনাদেরকে ঘরে ঢুকতে দেখে বীরভদ্র বললেন “গাঁওবুড়োর কুকুর আছে জানতাম না তো। চেঁচাচ্ছিল কেন?”

জয়শীল চোখের ইশারায় বীরভদ্রকে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যাতে বায়চং কিছু না বুঝতে পারে। বায়চং জয়শীলকে কথা না বলতে দেখে কি বুঝল কে জানে, বলল “লুম বিন”।

দীপঙ্কর ঘুরে তাকালেন, “কি বলছ বায়চং?”

বায়চং একটু জড়সড় হয়ে বলল, “গাঁওবুড়োর কুকুরকে তোমরা চেন না? বুড়ো কুকুর, ওর নাম লুম বিন্”।

“তাই নাকি? লুম বিন্ নাম?”, দীপঙ্কর বেশ অবাক হয়েছেন বলে মনে হল।

আরো রাতের দিকে বীরভদ্র আর বায়চং ঘুমিয়ে পড়লেন, জয়শীলের চোখও প্রায় বুযে আসছে। মাঝে একবার শুনলেন দীপঙ্কর অস্ফূটে বলে চলেছেন, “মেখলা, মেদিনী, কঙ্খলা”। নামগুলো বড় চেনা চেনা ঠেকল জয়শীলের কিন্তু ঘুমের ঘোরে কিছুতেই খেয়াল করতে পারলেন না কোথায় শুনেছেন। মাঝরাতের দিকে দীপঙ্কর জয়শীলকে জাগিয়ে ঘুমোতে গেলেন। ঘুমনোর আগে শুধু বললেন, “ডাইনি যদি সত্যিই বায়চং এর বোনকে নিয়ে গিয়ে থাকে তো ভালোই করেছে”।

জয়শীল অবাক। প্রভুর হেঁয়ালি এমনিই বুঝতে পারেন না, তার ওপর মাঝরাত দেখে আর বিশেষ চেষ্টা করলেন না।

পাঁচ

জয়শীল সকালে উঠে দেখলেন দীপঙ্কর ঘরে নেই। বীরভদ্রও উঠে পড়েছেন কিন্তু জানালেন দীপঙ্করকে তিনিও দেখতে পান নি। দু’জনেই বেরোলেন গুরুকে খুঁজে বার করতে। খুব দূরে যেতে হল না, কয়েক পা হাঁটতেই দেখা গেল দীপঙ্করকে।

কিন্তু দীপঙ্করকে দেখে দু’জনেরই চক্ষুস্থির হয়ে গেল।

বীরভদ্র বারেবারে গড় হয়ে প্রণাম করতে লাগলেন।

জয়শীল দু’হাত জড়ো করে একবার মাথায় আর একবার বুকে ঠেকাতে লাগলেন।

স্বাভাবিক! দীপঙ্কর মাটি থেকে অল্প ওপরে শূন্যে ভাসছেন। কিছুক্ষণ সেরকম অবস্থায় থেকে আবার মাটিতে নেমে এলেন, পরক্ষণেই আবার শূন্যে ভেসে উঠলেন।

“প্রভু, এ কি লীলা আজ দেখালেন আপনার ভক্তদের”, জয়শীল আর আবেগ চেপে রাখতে পারলেন না। আবেগের চোটেই সম্ভবত দু’জনের চোখও বন্ধ হয়ে গেছিল। চোখ অবশ্য অল্প পরেই খুলে ফেলতে হল কারণ ততক্ষণে দীপঙ্করের গর্জন দু’জনের কানে গিয়েই পৌঁছেছে।

“মূর্খ, মূর্খ, মূর্খ”।

জয়শীল আর বীরভদ্র দু’জনেই থতমত খেয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। দীপঙ্কর এবার সরোষে জিজ্ঞাসা করলেন, “মানুষ শূন্যে ভাসতে পারে?”

এ প্রশ্নের কি উত্তর হয়!

জয়শীল চুপ করে রইলেন, বীরভদ্র আমতা আমতা করে বললেন, “আজ্ঞে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় কিন্তু আপনি ভগবান বুদ্ধের বরপুত্র”।

দীপঙ্কর মাথা নাড়তে নাড়তে এদের দিকে এগিয়ে এলেন, “আমি ভগবান বুদ্ধের বরপুত্র কিনা তা জানি না তবে বুদ্ধ যে তোমাদের মতন ফাঁপা মগজ দিয়ে আমাকে পৃথিবীতে পাঠান নি তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ”।

“জয়শীল, তুমি আমার বাঁ পাশে এসে দাঁড়াও আর বীরভদ্র তুমি থাকো ডানদিকে”।

বীরভদ্র দেখলেন দীপঙ্কর তাঁর ডান পায়ের জুতো থেকে অতি সন্তর্পণে পা’টি বার বার করে জুতোর সঙ্গে আড়াআড়ি করে পা’টি বাইরে রাখলেন। ফলে ডান পায়ের জুতোটি এখন দীপঙ্করের ডান পায়ের পাতা এবং বাঁ পায়ের জুতোর মধ্যে আটকে রইল। দীপঙ্কর এবার বাঁ পা’টিকে শূন্যে তুলে ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালেন।

বাঁ দিক থেকে জয়শীল অবশ্য শুধুই দেখতে পেলেন তার প্রভুর একজোড়া জুতো আরো একবারের জন্য হাওয়ায় ভেসে উঠল। দীপঙ্করের নির্দেশে জয়শীলও ডান দিকে আসতে তবে রহস্য উদ্ধার হল।

বীরভদ্র এবং জয়শীল দু’জনেই কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। বীরভদ্র নাকের ভেতর থেকে ফোঁৎ করে একটা শব্দ করে বলে উঠলেন, “বুঝলাম। এতেও অবশ্য সাধনার ব্যাপার আছে”।

দীপঙ্কর জুতোয় পা গলাতে গলাতে বললেন, “সে কথা আর বলতে। ক’টার সময় ঘুম থেকে উঠেছি বলে তোমার মনে হয়?”

“কিন্তু প্রভু, এই যাদুবিদ্যা দিয়ে কী উদ্দেশ্য সিদ্ধি হবে?”

দীপঙ্কর মুচকি হাসলেন, “সব সময় কি আর উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যই জ্ঞান আহরণ করতে হবে? এই যে সকাল সকাল নির্ভেজাল আনন্দ পেলে, তার দাম নেই?”

বলতে বলতে হঠাৎ ঘুরে তাকিয়েছেন বীরভদ্রের দিকে, “মেখলা কে ছিলেন? কে ছিলেন মেদিনী? আর কঙ্খলাই বা কে?”

আচম্বিতে প্রশ্নবাণ ধেয়ে আসায় বীরভদ্র একটু ঘাবড়ে গেছিলেন কিন্তু বিক্রমশীলে খোদ দীপঙ্করের কাছেই তিনি পাঠ নিয়েছেন প্রাচীন তিব্বতী পুঁথির। এই নামগুলোর সঙ্গে তিনি পরিচিত। একটু ভেবে বললেন, “এনারা সবাই পূর্বভারতীয় ডাকিনী। বিশেষ বিশেষ সিদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন এনারা, প্রত্যেকেরই শিষ্যসংখ্যাও ছিল প্রচুর”।

“ঠিক বলেছ বীরভদ্র। এই তিনজনের সঙ্গে আর কারোর নাম মনে পড়ছে?”

বীরভদ্র তাঁর মন্ডিত মুস্তকে বহু হাত বুলিয়েও খেয়াল করতে পারলেন না। দীপঙ্কর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “বয়স হচ্ছে বীরভদ্র তোমার। ভঙ্গালের বিক্রমপুরে যেখানে আমার বাড়ি ছিল, তার আশেপাশের সমস্ত জলাশয় এক বিশেষ শাকে ছেয়ে থাকত। লোকে বলে সে শাক খেলে বুদ্ধি বাড়ে, স্মৃতি ফিরে আসে। তোমার শুকনো দেশে তো সে শাক পাওয়া যাবে না, নাহলে প্রত্যহ ওই শাক বেটেই তোমার খাওয়াতাম”।

কি বলবেন বুঝতে না পেরে বীরভদ্র মাথা চুলকোতে লাগলেন। দীপঙ্কর জয়শীলের দিকে ফিরে বললেন, “আমাকে এখন একটু বেরোতে হবে। আমি ফিরে আসার আগে বায়চংকে তৈরি করে রেখো, এসেই আবার আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে। আর হ্যাঁ, সঙ্গে প্রচুর পরিমানে নুন নিও”।

“নুন?!”

জয়শীলের বিস্মিত প্রশ্নে দীপঙ্কর বললেন, “চিন্তা নেই, গাঁওবুড়োর বাড়ি থেকে কাল নুনও নিয়ে এসেছি”।

“আজ্ঞে, সে কথা বলছি না। নুন দিয়ে কী হবে?”

“তোমার কেশহীন মুন্ডে যখন জলৌকা টুপ টুপ করে পড়বে তখন ব্যবস্থা করতে হবে না? নাকি কুচকুচে কালো মাথায় যৌবন ফিরে পেতে চাও?” বলে হাসতে হাসতে দীপঙ্কর ঘরে ঢুকে গেলেন।

জয়শীল মনে মনে শব্দকোষ হাতড়াচ্ছেন দেখে বীরভদ্র বললেন, “জোঁক, জোঁক”।

“ওহ্ জোঁক, তাই বলুন”, বলতে গিয়ে খেয়াল পড়ল জোঁক বস্তুটি কি। জয়শীল টের পেলে গলা শুকিয়ে আসছে। ওদিকে বীরভদ্রও অস্থির হয়ে পড়েছেন, বহু বছর ধরে গুম্ফা আর মহাবিদ্যালয়ে থেকে থেকে সামান্য প্রাকৃতিক সমস্যার কথা ভেবেও চিন্তায় পড়ে যান। দুর্ভাবনার চোটে দু’জনেই জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেলেন দীপঙ্কর কোথায় যাচ্ছেন।

ছয়

দীপঙ্কর অবশ্য বেশী দূরে যান নি, গেছেন পাশেই গাঁওবুড়োর বাড়িতে। সাতসকালে দীপঙ্করকে দেখে গাঁওবুড়ো একটু হকচকিয়েই গেল। কুশলাদি বিনিময়ের পর দীপঙ্কর বললেন, “আমরা আজই চলে যাচ্ছি। কিন্তু চলে যাওয়ার আগে আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল, জরুরী কথা”।

গাঁওবুড়ো একটু বাঁকা হাসল কী? দীপঙ্করের চোখে চোখ রেখে বলল, “আপনাকে তো আগেই বলেছি বায়চং এর বোনের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। সে হারিয়ে গেছে খুবই দুঃখের কথা, কিন্তু খাদে পড়ে গেলে আর কিই বা করার আছে?”

দীপঙ্কর মৃদু হাসলেন, “বায়চং এর বোনকে নিয়ে আমি এখন কোনো কথা বলতে আসিনি। কিন্তু হ্যাঁ, ওই খাদে নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়েই দু’চার কথা ছিল”। মনে হল অন্দরমহল থেকে এক জোড়া চোখ যেন দীপঙ্করের কথায় আরো উৎসুক হয়ে উঠল।

গাঁওবুড়ো একটু ব্যাজার মুখে দীপঙ্করকে অতিথিকক্ষে নিয়ে এল, তারপর দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বলল, “বলুন কি বলতে চান”।

দীপঙ্কর দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তার আগে আপনার স্ত্রীকে ডেকে নিন”।

“আমার স্ত্রীকে? কেন কেন?” ভারী চমকে উঠল গাঁওবুড়ো।

“উনি দরজার ওপারেই দাঁড়িয়ে আছেন যে। আর সেটা বড় কথা নয়, যে কথা বলব সেটা শোনা ওনারও প্রয়োজন”।

গাঁওবুড়োকে আর কিছু বলতে হল না, বুড়ি দরজা খুলে সঙ্গে সঙ্গেই ঢুকে পড়েছে। গাঁওবুড়ো গর্জন করে উঠতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে পাত্তা না দিয়ে বুড়ি দীপঙ্করের পা জড়িয়ে ধরল, “আপনি কাল চলে যাওয়ার পর থেকেই মন বড় উচাটন হয়ে আছে বাবা, আমাকে শান্তি দিন”।

“উঠুন মা”, দীপঙ্কর সস্নেহে বুড়িকে তুলে ধরলেন, “আপনাকে শান্তি দেবেন পরম করুণাময় ভগবান বুদ্ধ। আমি শুধু কিছু রহস্যের ওপর যবনিকাপাত ঘটাতে এসেছি”।

গাঁওবুড়োর সেই হম্বিতম্বি উড়ে গেছে, সে এখন নির্নিমেষে দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে।

“আপনারা জানেন, আমি ভারতবর্ষের মানুষ। তিব্বতের রাজার আমন্ত্রণে এই প্রথম চলেছি সে দেশে। কিন্তু তা বলে ভাববেন না সে দেশ আমার সম্পূর্ণ অজানা। বিক্রমশীল মহাবিদ্যালয়ে আমরা বহু বছর ধরে অতি আগ্রহের সঙ্গে তিব্বতী পুঁথি অধ্যয়ন করে চলেছি। সেরকম ই এক পুঁথিতে আমি হদিশ পেয়েছিলাম নাম পেয়েছিলাম পূর্ব ভারতীয় কিছু মহিলার – মেখলা, মেদিনী, কঙ্খলা। এনাদেরকে সেই পুঁথিতে ডাকিনী বলে সম্বোধন করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে এনারা সিদ্ধিলাভ করেছিলেন, তারপর দীক্ষা দিয়েছিলেন বেশ কিছু পুরুষকেও। ডাকিনী হিসাবে এনারা নাকি জানতেন অনেক তন্ত্রমন্ত্রও”।

বুড়ি ফিসফিসিয়ে উঠল, “ডাইনি?”

“সে পুঁথিতে নাম ছিল আরো এক ডাকিনীর”, দীপঙ্কর থামেন।

বুড়ো বুড়ি দু’জনেই চুপ।

“তাঁর নাম মণিভদ্রা। মণি তো তিব্বতি নাম নয়, তাই না?”

গাঁওবুড়ো আমতা আমতা করে থাকে।

“শোনা যায় মণিভদ্রার শিষ্যদের গোপন একটি সংঘ ছিল লুম্বিনীতে, যেখানে গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আপনার মেয়ের প্রিয় কুকুরের নাম লুম বিন হওয়ার বোধহয় একটা কার্যকারণ সম্পর্ক আছে, তাই না?”।

বুড়ি গাঁওবুড়োর দিকে ফিরে তাকায়, মহা আক্রোশে চেঁচিয়ে ওঠে, “কোথায় নিয়ে গেছ তুমি আমাদের মেয়েকে? কেন আমার কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছ তাকে?” বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।

বুড়ো মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর অতি ধীর স্বরে বলে, “আমি নিয়ে যাইনি বউ, সে নিজেই চলে গেছে। আমি শুধু তাকে পৌঁছে দিয়ে এসেছি”।

“পৌঁছে দিয়ে এসেছে? কোথায়? কোথায় রেখে এসেছ তাকে? কেন দশ বছর ধরে তাকে একটাবারের জন্যও দেখা করতে দাওনি আমার সঙ্গে?”, বুড়ি থরথর করে কাঁপতে থাকে।

গাঁওবুড়ো দু’হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে, ফিসফিস করে বলে, “নাহলে যে তোমায় মেয়েও কোনো একদিন খাদের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যেত অথবা অথবা……”

“অথবা পাহাড় থেকে তার ওপর গড়িয়ে পড়তে কোনো পাথর”।

দীপঙ্করের কথা শুনে বুড়ি এবার তার দিকেই ঘুরে তাকায়, দু’হাত জড়ো করে বলে, “প্রভু, আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন। এ জীবনে আর ক’টা দিনই বা আছে? শুধু তাকে ফিরে পেতে চাই, আর কিছু চাই না”।

দীপঙ্কর ব্যথিত মুখে চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর বুড়িকে বলেন, “মা, আমার ধারণা আপনার মেয়ে অনেক বড় এক কাজে হাত দিয়েছে। সে কাজ চলবে আমৃত্যু, আর তাই অতি কষ্টে সে ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছে সমস্ত সাংসারিক মায়া”।

বলতে বলতে গাঁওবুড়োর দিকে ফিরে চান দীপঙ্কর, “আমার ধারণা কি ঠিক?”।

গাঁওবুড়ো কাঁপতে কাঁপতে হাত জড়ো করে, বলে “প্রভু, আপনি সর্বজ্ঞ। মণি আজ মণিভদ্রা, এ গ্রামের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার দায়িত্ব সে একার হাতে তুলে নিয়েছে। আর সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছে এ পাপ আশপাশের আরো অজস্র গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। তার কাজ তাই শেষ হওয়ার নয়”।

“মণি, আমার মণি ডাইনি হয়ে গেছে? এ নিশ্চয় সেই সর্বনাশী ডাইনির কাজ, যে তাকে ধরে নিয়ে গেছিল”,  হাহাকার করে ওঠে বুড়ি।

গাঁওবুড়ো আবার জড়িয়ে ধরে বুড়িকে, “শান্ত হও। তোমাকে কি বললাম একটু আগে?মণিকে কোনো ডাইনি ধরে নিয়ে যায়নি, সে স্বেচ্ছা- নির্বাসনে গেছে”।

এবার দীপঙ্কর বলেন, “আপনি প্রথম থেকেই শুরু করুন। হয়তো তবেই আপনার স্ত্রী ঘটনাপ্রবাহটি বুঝতে পারবেন, আমিও পাব কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর”।

“তাই হোক”, ধপ্ করে মাটিতে বসে পড়ে গাঁওবুড়ো, “এ পাপের কথা আজ নয় কাল নিজের মুখেই বলতে হত”।

সাত

“আমাদের পরিবারের পুরুষরা যুগ যুগ ধরে এ গ্রামকে শাসন করে এসেছে। এ কথা কত পুরুষ আগের, সে ঠিক আমিও জানি না। ঠিস্রোং ছিলেন তাঁর মা – বাবার নয়নের মণি, গ্রামেরও সবাই তাঁকে বড় ভালবাসত। ছবি আঁকতে পারতেন, বাঁশি বাজাতে পারতেন, এ তল্লাটের সব আঞ্চলিক ভাষায় তিনি ছিলেন সমান দড়। সকাল সন্ধ্যা ঘোড়ায় চড়ে যখন গ্রামের পাহাড়ি পথ ধরে যেতেন তখন ছেলেমেয়ে সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকত, এত সুপুরুষ ছিলেন ঠিস্রোং।

কিন্তু সব থেকে বেশী খাতির তিনি পেতেন তাঁর ধার্মিকতার দরুণ। ছোটো থেকেই প্রবল বুদ্ধভক্ত ছিলেন ঠিস্রোং, গ্রামের সমস্ত বাচ্চা ছেলেমেয়েদের বসিয়ে বুদ্ধের জীবনকাহিনী শোনাতেন। শোনা যায় বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে নাকি কিছু পুঁথিও লিখেছিলেন।

তাঁর বাবা-মা যখন ঠিস্রোং এর বিয়ের তোরজোড় শুরু করলেন তখন ঠিস্রোং করজোড়ে তাঁদের কাছে ছ’টি মাস সময় প্রার্থনা করলেন। ইচ্ছে, বিয়ের আগে বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী দর্শন করে আসবেন, সেখানকার বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কাছে ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করবেন। একমাত্র ছেলের কথা বাবা-মা ফেলতে পারলেন না, সানন্দেই অনুমতি দিলেন। এক সকালে নিজের প্রিয় ঘোড়া, কিছু পাথেয় আর কয়েকটি পুঁথি নিয়ে ঠিস্রোং এ গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেন।

ছ’মাস কেটে গেল, ঠিস্রোং ফিরে এলেন না। বাবা – মা উদ্বিগ্ন হলেন কিন্তু ভাবলেন হয়ত পড়াশোনা এখনও শেষ হয়নি। আরো মাস চারেক কাটবার পর ঠিস্রোং এর বাবা মরীয়া হয়ে গ্রামেরই কিছু লোককে পাঠালেন খবর আনতে। তারা ফিরে এসে খবর দিল কেউ ঠিস্রোং এর হদিশ জানে না, লুম্বিনীতে তিনি গেছিলেন ঠিকই কিন্তু তিন মাস পর থেকেই তাঁকে আর কেউ দেখেনি।

মরীয়া হয়ে ঠিস্রোং এর বাবা আরো লোকজন নিয়ে নিজেই গেলেন লুম্বিনী, ততদিনে প্রায় এক বছর কেটে গেছে। বহু সময় এবং অর্থ ব্যয় করার পর খবর পাওয়া গেল ঠিস্রোং দীক্ষা নিয়েছেন, তাঁর দীক্ষাগুরু স্বয়ং ডাকিনী মণিভদ্রা। বহু কষ্ট করে ঠিস্রোং এর বাবা ছেলের সঙ্গে নাকি দেখা করতে গেছিলেন, তারপর কি হয়েছিল কেউ জানে না। অনেকে বলে ঠিস্রোং বাবাকে শেষবারের জন্য প্রণাম করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছিলেন, আর কেউ কোনোদিন তাঁকে দেখেনি। অনেকে আবার বলেন ঠিস্রোং মণিভদ্রাকে ছেড়ে আসতে রাজি না হওয়ার তাঁর বাবা রাগে অন্ধ হয়ে পুত্রহত্যা করে আসেন।

ঠিস্রোং না ফিরলেও লোকজন নিয়ে ঠিস্রোং এর বাবা ফিরে আসেন। এসে দত্তক নেন গ্রামেরই এক ছেলেকে”।

একটানা কথা বলে গাঁওবুড়ো এবার থামল, কিন্তু শ্রান্তিতে নয়, পরবর্তী কথাগুলো বলার আগে যেন তার শ্রোতাদের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করাটাই উদ্দেশ্য। করুণ চোখে বুড়ি আর দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর তারপরের ইতিহাস বড়ই ভয়ঙ্কর। মেয়েদের সমস্তরকম স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হল। এর আগে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ না হলেও মেয়েরা সমান অধিকার ভোগ করতেন। এখন গ্রামের প্রায় সব মেয়েদের বাড়িতে বন্দী করে রাখা হল”।

“যত দিন যেতে লাগল মেয়েদের প্রতি অত্যাচারের সীমা পরিসীমা রইল না। আর সেই সঙ্গে মেয়ে ধর্মগুরুরা আর ডাকিনী রইলেন না, তাঁরা হয়ে গেলেন ডাইনি। অন্ধকারের দূত, পাপাচারের প্রতীক। অহরহ ডাইনি অপবাদ দিয়ে গ্রামের মহিলাদের পুড়িয়ে মারা শুরু হল”।

দীপঙ্কর পাথর হয়ে শুনছিলেন, গাঁওবুড়ো থেমে গেছে দেখে জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, “সে ইতিহাস তো কখনই শেষ হয়নি, তাই না?”

গাঁওবুড়ো লজ্জায়, অনুশোচনায় যেন কুঁকড়ে গেল। মাথা নেড়ে বলল, “না, সে ইতিহাস ভয়াল থেকে ভয়ালতর হয়ে উঠেছে। মেয়েরা বড় হওয়া মাত্র তাদেরকে ছেলেদের থেকে সরিয়ে নেওয়া হত, ছেলেদের বা অন্য মেয়েদের সঙ্গে যাতে তারা মিশতে না পারে তাই জন্য বাড়ির একটা ছোট্ট ঘরে রেখে দেওয়া হত তাদের। আর পারতপক্ষে যদি বাইরে কেউ যেত তাহলেই ঘনিয়ে আসত মৃত্যু”।

বুড়ি শিউরে শিউরে উঠছিল। গাঁওবুড়োর কথায় শুনে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে এই অপদেবতারা সব আমাদের বন্ধু প্রতিবেশী? তারাই তাহলে খুনী?”

গাঁওবুড়ো চুপ করে থাকে।

দীপঙ্করে বুড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন, “হ্যাঁ মা, চরম নারীবিদ্বেষে এই গ্রামের শয়ে শয়ে মেয়ে খুন হয়েছে। যাদের বাইরের গ্রামে ঠিক সময়ে বিয়ে হয়েছে তারাই শুধু বেঁচে গেছে”।

“খুন তো বোধহয় আপনিও করেছেন, তাই না?”

গাঁওবুড়োর অন্তরাত্মা যেন কেঁপে উঠল। দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলল, “কিন্তু মণি চলে যাওয়ার পর করিনি। বিশ্বাস করুন প্রভু, ভগবান বুদ্ধের দিব্যি”।

গাঁওবুড়োর কপাল ফেটে অঝোরে রক্ত ঝরছে, কিন্তু বুড়ির চোখে এক ফোঁটা করুণা দেখতে পেলেন না দীপঙ্কর, সে চোখ জুড়ে শুধুই জিঘাংসা।

“আমার আরো ধারণা পৌরুষতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য আপনারা বহু বছর ধরেই বাচ্চা ছেলেদের সামরিক শিক্ষালয়ে পাঠাতে থাকেন। সেখানে তারা শেখে যার গায়ের জোর বেশী, যার কষ্টসহিষ্ণুতা বেশী, সেই একমাত্র পুরুষ। যারা কষ্ট সহ্য করতে পারে না তাদের মানুষ বলে গণ্য করা হয় না, তারা নিকৃষ্ট প্রজাতি। এ গ্রামের বায়চং রা আরেকটু বড় হলেই শিখবে মেয়েদের কোনো স্থান নেই এ সমাজে। তাই না? বায়চং এর কালশিটে দাগগুলো দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। আগের দিন যখন ছেলেরা জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে ফিরছিল তখন প্রায় সবারই পিঠে, মুখে সেই একই কালশিটে দাগ দেখে আমি নিশ্চিত হই। ভালো কথা, কত বছর হলে এ গ্রামের বাচ্চাদের দেচানের শিক্ষালয়ে পাঠানো হয়?”।

গাঁওবুড়ো মিনমিন করে বলে, “পাঁচ বছর”।

বুড়ি বাঘিনীর মতন লাফিয়ে পড়ে গাঁওবুড়োর ওপর। তার মাথা ধরে ঠুকতে থাকে দেওয়ালে। দীপঙ্কর বুড়ির সামনে গিয়ে হাতজোড় করতে বুড়ি এবার কান্নায় ভেঙ্গে ফেলে। দীপঙ্করের দিকে আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “আমাকে সত্যি করে বলুন বাবা, আমার মেয়েকেও কি এই পাষন্ডরা মেরে ফেলেছে?”

সৌম্যসুন্দর হেসে বুড়ির দিকে তাকান দীপঙ্কর। “আপনি এখনো বুঝতে পারেন নি মা? আপনার মেয়েই যে এদের হয়ে প্রায়শ্চিত্তটা করছে। সে যে মণিভদ্রার নতুন অবতার, ডাইনির ছদ্মবেশে এসে সে গ্রামের বাচ্চা মেয়েগুলোরই প্রাণ বাঁচাচ্ছে। সে ডাইনি নয়, ডাকিনী। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করে তুলছে এ গ্রামের মেয়েদের, তাদেরকে নতুন করে বাঁচার হদিশ দেখাচ্ছে”।

দীপঙ্কর এবার ফিরে তাকান গাঁওবুড়োর দিকে, “আমি জানি পাহাড়ের ওপারের জঙ্গলের মধ্যেই কোথাও থাকেন মণিভদ্রা। বায়চং এর চোখে ধুলো দিতে পারলেও আমাকে ঠকাতে পারবেন না। মাটি থেকে শূন্যে উঠে যেতে দেখে বায়চং ভেবেছিল মণিভদ্রা বোধহয় ভেসে ভেসে খাদের দিকেই যাচ্ছেন। উনি কিন্তু বায়চং এর বোনকে ধরে ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বায়চং যা দেখেছে তা শুধুই দৃষ্টিবিভ্রম, এক অভিজ্ঞ যাদুকরীর হাতের কাজ, থুড়ি পায়ের কাজ।

আমাকে কিন্তু মণিভদ্রার সঙ্গে যে একবার দেখা করতেই হবে। আপনি নিয়ে যাবেন আমাকে?”।

গাঁওবুড়োর চোখে যেন দৃষ্টি নেই। হাহাকার ভরা গলায় বলে চলে, “পাথরটা গড়িয়ে ফেলার সময় দেখতে পাইনি দোহনার পেছনে মণিও আসছে। ওই পাহাড়ের বাঁকেই ঘটেছিল, শেষ মুহূর্তের চেষ্টাতেও আমি মণির থেকে আড়াল হতে পারিনি। দেখে ফেলেছিল আমাকে। দেখেছিল ওর প্রাণের বন্ধু দোহনাকে আমি খুন করেছি। সে রাত্রে মণিকেও সব বলতে হয়েছিল, সব শোনার পর যেভাবে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে সে দৃষ্টি আমি এখনো ভুলতে পারি না। তার চোখ বলছিল তুমি নরকের কীট, আমি সত্যিই নরকের কীট”।

বলতে বলতে ফের কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে গাঁওবুড়ো। দীপঙ্কর কিছুই বলেন না, একবারের জন্যও চেষ্টা করেন না কোনো সান্ত্বনাবাক্য শোনানোর।

“আর আমার কথা একবারও বলেনি মণি মা?”, চোখ ছলছল করে ওঠে বুড়ির।

“তোমার কথাই বলছিল শুধু”, বুড়ো বুড়ির দিকে তাকানোরও সাহসটুকু পায় না, “বলেছিল যে দিন তোমার পাপের কথা মা’র কাছে ধরা পড়বে তখন তাকে বলো মণির জীবনে কোনো বাবা নেই, আছে শুধু মা। মার থেকে বিচ্ছেদযন্ত্রণা মণিকে সারাজীবন ভোগ করতে হবে, কিন্তু তাকে বলো মণির কোনো উপায় নেই”……বলতে বলতে এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় গাঁওবুড়ো, তারপর বলে, “সে বলেছে তোমাকে বলতে অজস্র জীবন বাঁচানোর জন্য সে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে”।

হয়ত নিজের কানেই নিজের কথাগুলো অবিশ্বাস্য ঠেকে, তাই বুড়িকে আর কিছু বলে না গাঁওবুড়ো। দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে বলে, “এখন তো হবে না। আজ সন্ধ্যায় নিয়ে যান আপনাকে সে জঙ্গলে। কিন্তু জানি না সে আসবে কিনা। তার চোখ সর্বত্র, কিন্তু তার নিজের ইচ্ছা না হলে সে দেখা দেবে না। আমি মাস দু’মাসে একবার জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে কিছু খাবারের রসদ দিয়ে আসি শুধু। সে রাত্রের পর আর তাকে দেখিনি। না, দেখেছি, কিন্তু অনেক দূর থেকে। তার কিছু নির্দেশ থাকলে শুধু সেটুকুই শুনেছি”।

আট

জঙ্গল থেকে বেরিয়ে চলেছেন দীপঙ্কর। তার ঠিক পেছনের ঘোড়াতেই রয়েছেন জয়শীল, তাঁর কোলের কাছে বসে বায়চং, তারও পেছনে আসছেন বীরভদ্র। গাঁওবুড়ো ঠিকই তাঁদেরকে পথ দেখিয়ে জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে গেছিল। বীরভদ্র এবং জয়শীলকে জঙ্গলের ঠিক বাইরে রেখে গাঁওবুড়োর সঙ্গে ভেতরে ঢুকেছিলেন শুধু দীপঙ্কর। দু’টি ঘন্টা অপেক্ষা করেছেন কিন্তু মণিভদ্রা আসেনি। নিজেকে শাপশাপান্ত করতে করতে গাঁওবুড়ো শুধু কপাল চাপড়েছে, কিন্তু দেখা মেলেনি ডাকিনীর। অবসন্ন গাঁওবুড়ো দীপঙ্করের সঙ্গে আর ফিরতে চায়নি। রাত্রের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যেই এক পাথরের ওপর শয্যা নিয়েছে সে, দীপঙ্করের মনে হল এই প্রথম যেন অপরাধের বিস্তৃতিটা গাঁওবুড়োর কাছে স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এক বিষাদক্লান্ত মানুষ যার অবসাদ কোনোকালেই সারবে না, আর তাই হয়ত বাঁচার ইচ্ছাটুকুও চলে গেছে।

জয়শীল আর বীরভদ্র এখনো কিছু জানেন না, উদগ্র কৌতূহলে তাঁরা পাগল হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দীপঙ্করের মুখ দেখে তাঁকে প্রশ্ন করার সাহস হচ্ছে না কারোরই। বায়চং এর অবশ্য কোনো কৌতূহল নেই, সে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে। দীপঙ্কর জঙ্গলে ঢোকা মাত্র সে ভেবে এসেছে ঠাকুর তার বোনকে নিয়ে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু দীপঙ্করকে খালি হাতে বেরিয়ে আসতে দেখে তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। বায়চং এর দুঃখ যেন গ্রাস করেছে জয়শীল আর বীরভদ্রকেও।

জয়শীল একবার মুখ ঘুরিয়ে পেছনের জঙ্গলটা দেখার চেষ্টা করলেন। কেন অতীশ ঢুকেছিলেন ওই জঙ্গলে? গাঁওবুড়োই বা গেল কোথায়? হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ চিৎকারে তাঁর সম্বিত ফিরে এলে। চেঁচিয়ে উঠেছে বায়চং, থরথর করে কাঁপছে। ওনারা পাহাড়ের সেই বাঁকটিতে এসে হাজির হয়েছেন কিন্তু সামনেই থেমে আছে দীপঙ্করের ঘোড়া।

কেন থেমে আছে তা দেখতে পেয়েছে বায়চং, এখন জয়শীলও দেখতে পেয়েছেন। বাঁকের ঠিক মুখটিতেই এসে দাঁড়িয়েছে যেন এক প্রেতিনী, কালো পোশাকে তার সর্বাঙ্গ আচ্ছাদিত। এক পলকের জন্য মনে হল বা সে শূন্যে ভাসছে।

দীপঙ্কর ঘোড়া থেকে নেমে পড়েছেন কিন্তু এগোচ্ছেন না।

বীরভদ্রের ঘোড়াটি এখন জয়শীলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে, দু’জনে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন দীপঙ্কর নতজানু হয়ে প্রণাম জানাচ্ছেন সেই প্রেতিনীকে।

কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র, তারপরেই হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল কান্নার শব্দ। না, সে কান্না কোনো ভৌতিক কান্না নয়, নয় কোনো অলৌকিক কান্না। জয়শীল বা বীরভদ্র হয়ত ভাবলেন দীপঙ্করের অতিলৌকিক শক্তিতে পরাভূত হয়েছে অপশক্তি, হয়ত মায়ার বাঁধন কেটে গেছে বলেই শোনার গেছে এক মানুষের কান্না।

কিন্তু তা তো নয়।

দীপঙ্কর জানেন তা নয়।

এ কান্না মণিভদ্রা শুধু নিজের জন্য কাঁদছেন না, কাঁদছেন সেই সমস্ত মেয়ের জন্য যাঁদের রক্তে ভেসে গেছে এই পাহাড়ি গ্রাম, কাঁদছেন সেই সব মেয়ের জন্য যারা প্রাণ না খুইয়েও যুগ যুগ ধরে অত্যাচারিত হয়ে এসেছেন নিজভূমে। কাঁদছেন কারণ হয়ত এই প্রথমবার এ গ্রামের মাটিতে কোনো পুরুষ প্রণাম জানালেন কোনো নারীকে।

দীপঙ্কর দেখলেন মণিভদ্রার পেছনে কে যেন নড়ে উঠল, তারপরেই মণিভদ্রা দু পা পিছিয়ে গেলেন। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একটি ছোট মেয়ে, পেছনে জয়শীলের লন্ঠনের আলোয় তার মুখের একাংশ দেখা যাচ্ছে, বায়চং এর সঙ্গে তার মুখের মিল খুঁজে পেতে সমস্যা হচ্ছে না।

দীপঙ্করের ইশারায় পেছন থেকে এগিয়ে এসেছে বায়চং, বোনের কাছে দৌড়ে যাচ্ছিল সে। মণিভদ্রার ছায়ামূর্তিকে নড়ে উঠতে দেখে দীপঙ্কর বায়চংকে দৌড়তে বারণ করলেন। ঠিক যে জায়গাটিতে ভাই বোনের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছিল সেখানেই আবার তারা দাঁড়িয়ে। ডেকি কিন্তু দাদার দিকে এগিয়ে এল না, একটা দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটু ভেঙ্গে অভিবাদন জানাল শুধু। তারপর এক পা, দু পা করে পিছোতে পিছোতে ফের ফিরে গেল মণিভদ্রার কাছে। দীপঙ্করের দূর থেকে বুঝতে পারলেন না, কিন্তু মনে হল এক মুহূর্তের জন্য মণিভদ্রা তাঁর দিকে তাকালেন। কিন্তু সেটা বিভ্রমও হতে পারে, কারণ অন্ধকার আর গাঢ় কুয়াশার মধ্যে মুহূর্তের মধ্যেই ডেকিকে নিয়ে মিলিয়ে গেছেন মণিভদ্রা।

দীপঙ্কররা আবার রওনা দিয়েছেন।

জয়শীল এবার সাহস করে জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রভু, বায়চং কে কি গাঁওবুড়োর বাড়িতে রেখে যাব আমরা?” বোনকে একবার ছুঁতেও না পেরে কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অজ্ঞানই হয়ে গেছিল বায়চং, জয়শীল জলের ঝাপটা দিয়ে তাকে জাগিয়েছেন। এখন সে চুপ করে আছে, বায়চং এর দুখী মুখ এর আগে বহুবার দেখেছেন জয়শীল রা কিন্তু এই প্রথম যেন তাকে বড় গম্ভীর লাগছে। মনে হচ্ছে নিমেষের মধ্যে তার বয়স বেড়ে গেছে।

দীপঙ্কর উত্তর দিলেন, “হয়ত তার দরকার পড়বে না। গ্রামের ঠিক বাইরে একজনের থাকার কথা, সে না এলে তখন ভাবা যাবে”।

দীপঙ্কর যেমনটি বলেছিলেন ঠিক তেমনটিই ঘটল, গ্রামের শেষ বাড়িটি ছাড়িয়ে আরেকটি পাহাড়ের কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল অন্ধকারে অপেক্ষা করছেন কোন এক ঘোড়সওয়ার।

“আমার চিঠি আপনার হাতেই পৌঁছেছিল লোসাং?”।

সামনে এগিয়ে এলেন লোসাং, বায়চং এর মামা। ঘোড়া থেকে নেমে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানালেন দীপঙ্করকে, “হ্যাঁ, গাঁওবুড়ো নিজে এসে আমাকে সে চিঠি দিয়ে গেছে”।

“বেশ”, দীপঙ্কর লোসাং এর মুখের দিকে তাকালেন, “বায়চং কে আপনার বন্ধুর চোখ এড়িয়ে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন আপনিই তো?”।

সম্মতি জানালেন লোসাং।

“সেদিন বায়চং কে নিতে এসেও যখন জিজ্ঞাসা করলেন না সে কিভাবে আমার কাছে পৌঁছল তখনই অল্পবিস্তর সন্দেহ হচ্ছিল। কালকে আপনাকে ব্যথায় কাতর হতে দেখে নিঃসন্দেহ হলাম। টানা চার দিন ধরে ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছোটালে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীরপুঙ্গবদেরও গায়ে ব্যথা হওয়াইর কথা”। দীপঙ্কর যেন একটু ব্যঙ্গাত্মক, একটু আক্রমণাত্মকও বটে, “সব থেকে কাছের বন্ধুটি জানতে পারলে কী হত লোসাং? আপনাকেও মেয়েদের মতন দুর্বল ভাবত কী? একটা বাচ্চা মেয়েই তো হারিয়েছে, সে আর এমন কী অঘটন!”।

লোসাং মাথা নিচু করে ছিলেন, এবার দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বায়চং এর মা আমার সবথেকে ছোটো বোন। পাশের গ্রামে বিয়ে হয়েছিল তার। নিরন্তর অত্যাচারে তার শরীর দুর্বল হয়ে এসেছিল, ডেকিকে জন্ম দিতে গিয়ে সে মারা যায়। মৃত্যুর সময় আমি তার কাছে ছিলাম না, কিন্তু তার কষ্টে ভরা দুটি চোখ আমি বহুবার দেখেছি। যে কয়েকবার পালিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম সে কিছুই বলত না, শুধু চুপ করে চেয়ে থাকত আমার দিকে। জানত আমারও তাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু সে মারা যাওয়ার পর আমি শপথ নিয়েছিলাম তার ছেলে মেয়েদের কোনো অনিষ্ট আমি হতে দেব না, ডেকি হারিয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল হয়ত আপনিই এর সুরাহা করতে পারেন, তাই চুপি চুপি গিয়ে বায়চংকে রেখে এসেছিলাম আপনাদের তাঁবুর সামনে। ও-ও কথা দিয়েছিল ঘুণাক্ষরেও আমার নাম নেবে না”।

কথা বলতে বলতে লোসাং অস্থির হয়ে ওঠেন, “আর সে শপথের জন্যই আজ আরো একবার আপনার শরণাপন্ন আমি। বায়চংকে নিয়ে যান এখান থেকে, আপনার কাছে রেখে প্রকৃত শিক্ষা দিন, বুদ্ধের ক্ষমাসুন্দর বাণীগুলি ওকে শোনান যাতে কোনো একদিন সে নিজের গ্রামে ফিরে আসতে পারে প্রকৃত বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক হয়ে। এসে মানুষের অন্ধ অহংবোধকে ঘুচিয়ে তুলতে পারে, ফের সাম্যের জয়গান শোনাতে পারে”।

দীপঙ্কর ক্ষণিকের জন্য চুপ করে থাকেন তারপর বলেন, “আমি এত বড় দায়িত্ব তো নিতে পারি না। তিব্বতে আমার জন্য যে কাজ পড়ে রয়েছে তাই যথেষ্ট, তার বাইরে আর কোনো গুরুভার নেওয়ার সামর্থ্য আমার কাছে নেই। কিন্তু আমার বিশ্বাস এখানে না হোক, আরো কয়েকশ বা কয়েক হাজার ক্রোশ দূরে এমন শিক্ষালয় নিশ্চয় আছে যেখানে বায়চং মানুষের মতন মানুষ হয়ে উঠতে পারে। সেরকম প্রতিষ্ঠান খুঁজে না পাওয়া অবধি বায়চং আমার সঙ্গে থাকবে”।

তারপরই তাঁর খেয়াল পড়ে, “কিন্তু বায়চং? সে কী আসতে চায়?”

সে আসতে চায়, জয়শীলের কোলছাড়া হওয়ার কোনো ইচ্ছাই বায়চং দেখায় না।

……………………………………………………………………………………………………

মধ্যরাত্রি, তিন সন্ন্যাসী আর এক বালক ঘোড়ার পিঠে চড়ে দ্রুত পাহাড়ের উতরাই বেয়ে নেমে আসছেন। অনেক পথ যাওয়া বাকি, তাও তো তাঁরা জানেন না আরো কত বিভীষিকা অপেক্ষা করে আছে তাঁদের জন্য। এই মুহূর্তে অবশ্য তাঁরা সে নিয়ে ভাবিত নন। সামনের সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করলেন, “জয়শীল ঘুমিয়ে পড়ো নি তো?”

দ্বিতীয় জন ঘুম জড়ানো চোখে উত্তর দিলেন, “না প্রভু”।

ঠান্ডা হাওয়ার কনকনে শব্দের মধ্যেই প্রথম জনের গলা শোনা গেল ফের, এবারে একটু কঠোর, “এই শেষ সুযোগ তোমার। পরের বারেও খেয়াল না থাকলে আমি বিক্রমশীলেই ফেরত যাব। এখন শোনো, একটা গল্প বলি…… বহু বহু বছর আগে এক তরুণ থাকতেন এরকমই এক পাহাড়ি গ্রামে, তাঁর নাম ঠিস্রোং”।

উত্তুরে হাওয়া এক পলকের জন্য থমকে দাঁড়াল, তারপর ফের হু হু করে ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে।

(তথ্যঋণ কৃতজ্ঞতা –  চুরাশি সিদ্ধর কাহিনী (অলকা চট্টোপাধ্যায়, অনুষ্টুপ), অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (অলকা চট্টোপাধ্যায়, নবপত্র প্রকাশন))

tb-dakini-2

মুদ্রা অবলুপ্তি – কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা

500-note

(Photo Courtesy : Dekh bhai meme)

গুগল অনুবাদ দেখাল demonetization বাংলা মুদ্রারহিতকরণ। কথাটা খটমট ত বটেই  তা ছাড়া রহিতকরণ শব্দটির গায়ে এমনই পরিভাষা পরিভাষা গন্ধ যে মনস্থির করলাম সাদাসিধে ‘অবলুপ্তি’ বলাই ভালো। ভারতে ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট  তুলে দেওয়ার প্রসঙ্গেই এই ব্লগপোস্টটির অবতারণা। গত দেড় সপ্তাহে পত্রপত্রিকায় নেহাত কম লেখালেখি হয়নি এ নিয়ে (যদিও বাংলায় বিশ্লেষণী লেখা চোখে পড়ার মতন কম), কিন্তু অধিকাংশ লেখাতেই অর্থনীতির তত্ত্বকে সন্তর্পণে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অর্থনীতিরই ছাত্র, তাই ভাবলাম দু’কলম লিখে ফেলি। আরো একটা কথা বলা দরকার, মুদ্রা অবলুপ্তি আদৌ কালোবাজারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হবে কিনা সে নিয়ে কিছু লেখা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু দেখতে চাইব এই অবলুপ্তিকে ধরে নিয়েও আগের স্থিতাবস্থায় পৌঁছনো আদৌ সম্ভব কিনা।

শুরু করব অপেক্ষাকৃত সহজ একটি তত্ত্ব দিয়ে যার পোশাকি নাম ‘কোয়ান্টিটি থিয়োরী অফ মানি’। তত্ত্বটির দীর্ঘ একটি ইতিহাস আছে, তবে এই মুহূর্তে সেই ইতিহাস নিয়ে কথা না বললেও চলবে। আমেরিকান অর্থনীতিবিদ আরভিং ফিশারকেই এই তত্ত্বের জনক বলে ধরা হয়। কলেজে যাঁরা ন্যূনতম অর্থনীতির পাঠ নিয়েছেন তাঁদের হয়ত নামটি মনে পড়ে যেতে পারে। ফিশার খুব সহজ একটি সমীকরণের মাধ্যমে মুদ্রার যোগান, পণ্য মূল্য এবং  পণ্যসম্পদের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। সমীকরণটি এরকম,

m (মুদ্রার যোগান) X v (মুদ্রার গতিবেগ) = p (সমস্ত পণ্যের গড় মূল্য) X Q (বিক্রিত পণ্যের পরিমাণ)

v আদতে velocity, তাই পদার্থবিদ্যার ছাত্রছাত্রীদের থেকে আগেভাগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি গতি এবং বেগকে মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য।

ধরা যাক  ভারতবর্ষের এক মিনিয়েচার সংস্করণে ১ দিনে মোট ১০০০ খানা জিনিসপত্র লেনদেন হয়েছে। আরো ধরা যাক সেই সমস্ত জিনিসের গড় মূল্য ৩ টাকা এবং দেশে সেই মুহূর্তে মোট ৫০০ টি ১ টাকার নোট আছে। ফিশারের সমীকরণের হিসাবে, ওই ৫০০ টি নোটের প্রতিটিকে তাহলে ৬ বার ব্যবহৃত হতে হবে (মানে আপনার হাত থেকে সে নোট গেল বইয়ের দোকানে, দোকানীর স্ত্রী আবার সেই নোটটি দিয়ে কিনে আনলেন ফলস পাড়, ফলস পাড় যিনি বেচলেন তাঁর ছেলে আবার সেই একই নোট নিয়ে কিনতে গেল চপ, এরকম আর কি)।

একবার চট করে মিলিয়ে হিসেবটা মিলিয়ে নিতে পারেন।

৫০০ X ৬  = ৩ X ১০০০

যদি ৫০০ টি ১ টাকার নোট না থেকে ২০০ টি ১ টাকা আর ৫০ টি ২ টাকার নোটে থাকে, তখন?  সমীকরণ থেকে ফের বার করে ফেলতে পারেন উত্তর,

(২০০ X ১ + ৫০ X ২) X মুদ্রার গতিবেগ = ৩ X ১০০০

পাওয়া গেল মুদ্রার গতিবেগ = ১০, অর্থাৎ প্রতিটি নোটকে এবার ১০ বার হাত বদল হতে হবে। এবার আপনি বলতেই পারেন কিন্তু কে মাথার দিব্যি দিয়েছে যে ১ টাকা আর ২ টাকার নোটকে একই সংখ্যায় হাত বদল হতে হবে? নাহ, সত্যিই সে দিব্যি কেউ দেয়নি। তখন অবশ্য সমীকরণটা একটু বদলে যাবে।

(২০০ X ১ X x) + (৫০ X ২ X y) = ৩ X ১০০০

বুঝতেই পারছেন x (১ টাকার নোটের গতিবেগ ) আর y (২ টাকার নোটের গতিবেগ) এর মানের ওপর কোনো শর্ত আরোপ না করলে এ ক্ষেত্রে অনেক কটা সমাধানই হতে পারে – যেমন, (x = ৪ , y = ২২ ), (x = ১৫  , y = ০), (x = ০ , y = ৩০ ) এবং আরো অজস্র।

এবার এই তিন নম্বর সমাধানটি নিয়ে একটু মাথা খাটানো যাক – (x = ০ , y = ৩০ )।

ধরা যাক, ৮ই নভেম্বরের মতনই কোনো এক দিন ওই মিনিয়েচার ভারতের জনগণ সকালে উঠে দেখলেন ১ টাকার নোট রাতারাতি বাতিল হয়ে গেছে।  নোট বাতিলের পরেও কি মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে  ব্যাঘাত না ঘটা সম্ভব? সম্ভব, অনেক রকম ভাবেই সে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায়। ওই তিন নম্বর সমাধানটি এরকমই একটি প্রতিশ্রুতি – অর্থাৎ দেশের মানুষকে ২ টাকার নোট নিয়ে ১০ বারের জায়গায় ৩০ বার দোকানে যেতে হবে। সামগ্রিক ভাবে পণ্যসম্পদের পরিমাণ একই থাকছে কিন্তু এখন মানুষকে নানা বাহানা বানিয়ে দোকানে যেতে হবে।  এত বার এবং এত বিভিন্ন দোকানে যাওয়ার দরকার আমাদের নাই থাকতে পারে।

তাহলে উপায়?

দ্বিতীয় উপায় হল, নোটের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া যাক। ৫০টা ২ টাকার নোট তো থাকল, সরকার যদি আরও ১০০ খানা ২ টাকার নোট সরবরাহ করতে পারেন তাহলেই কেল্লা ফতে, ১০ বারের বেশী দোকানে মোটেই যেতে হবে না। এটাই বোধহয় সবথেকে সহজ উপায়, কিন্তু সবথেকে সহজ উপায়ও যদি সরকার কার্যকর না করে উঠতে পারেন? তখন কি করা?

আরো একটা উপায় আছে, যদি গড় পণ্যমূল্য কোনো ভাবে কমে যায়। ৩ টাকার জায়গায় যদি কোন ম্যাজিকে জিনিসপত্রের দাম ১ টাকা হয়ে যায়, তাহলেও ওই দশবার দোকানে গেলেই চলবে। কিন্তু কে করবে এই অসাধ্য সাধন? আর কে, দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক!  কিন্তু ধরা যাক, সে ব্যাঙ্কের রকস্টার  গভর্নর সবাইকে কাঁদিয়ে কয়েকদিন আগেই আলবিদা বলেছেন, ব্যাঙ্কের কাজকর্মে মন নেই।  অতঃ কিম?

আচ্ছা আচ্ছা, ভুরূ কুঁচকোবেন না। ধরে নিলাম ব্যাঙ্কের যথারীতি কাজকর্ম চলছে, কিন্তু দামটা কমবে কি ভাবে? দু’টো প্রধান উপায়। এক হল, বাজারে টাকার যোগান কমিয়ে দেওয়া যাতে পণ্যের চাহিদা কমে যায় (মানুষের হাতে নগদ টাকা যেহেতু বেশী থাকছে না) কিন্তু মনে রাখা দরকার আমাদের সমস্যা শুরুই হয়েছে  টাকার যোগান কমে গিয়ে, আরো যোগান কমিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হবে। মানুষজনের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কেনার জন্যও টাকা থাকবে না।

দু নম্বর রাস্তা হল – টাকা যোগান এক রেখে সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া। ফলে হবে কি, মানুষ খরচ করার থেকে ওই নগদ টাকা ব্যাঙ্কে রাখতে বা বিনিয়োগ করতে বেশী উৎসাহী হবেন।  কিন্তু এক্ষেত্রেও একটা সমস্যা থেকে যাচ্ছে, কি বলুন তো? মানুষজন না কিনছেন বই, না কিনছেন ফলস পাড় এমনকি চপ তেলেভাজা দেখলেও আসল শিল্প চাই বলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছেন।

আরেকবার সমীকরণ টা মনে করাই,

m (মুদ্রার যোগান) X v (মুদ্রার গতিবেগ) = p (সমস্ত পণ্যের গড় মূল্য) X Q (বিক্রিত পণ্যের পরিমাণ)

m কমে গেছে, v আর বাড়া মুশকিল – ফলে p ও যদি না কমে আগের স্থিতাবস্থা একমাত্র তখনই ফিরবে যদি  Q নিজেই কমে যায়।

বুঝতেই পারছেন Q কমে যাওয়াটা কাজের কথা নয়। এই পণ্যসামগ্রী যদি আবশ্যিক নাও হয়, পণ্যসম্পদের পরিমাণ কমে যাওয়াটা যে কোনো অর্থনীতির পক্ষেই বড় ধাক্কা। একটা দেশের অর্থনীতি তো শুধু এক দিনের ‘কোয়ান্টিটি থিয়োরী অফ মানি’ দিয়ে চলে না, পরবর্তী দিনগুলোতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি আনার জন্য Q কে শুধু স্থির রাখলেই হবে না, যতটা সম্ভব বাড়ানো উচিত। সে কথা মাথায় রেখেই শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক মিল্টন ফ্রীডম্যান বলেছিলেন ঘোরতর মন্দার বাজারে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কদের উচিত হেলিকপ্টার থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মানুষকে টাকা বিলোনো। বলা বাহুল্য যে হেলিকপ্টার এখানে রূপক মাত্র।  ফ্রীডম্যান বলতে চেয়েছিলেন মন্দা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রধান উপায় হল মানুষদের হাতে সরাসরি নগদ টাকা পৌঁছিয়ে দেওয়া।

ফ্রীডম্যানের আইডিয়াটি বিতর্কসাপেক্ষ, আমরা আপাতত হেলিকপ্টার ছেড়ে মাটির কাছাকাছিই ফিরে আসি। ওপরের পুরো আলোচনাটাই করা হয়েছে ফিশারের সমীকরণটি বাস্তবিক এরকমটি মেনে নিয়ে। কিন্তু  হতে পারেই যে ফিশারের তত্ত্বটি পুরোপুরি ঠিক নয়। আধুনিক অর্থনীতির আর এক পন্ডিত জন মেইনার্ড কেইনস এমনটিই বলেছিলেন। কেইনসের মূল বক্তব্য ছিল  মানুষ কিছু টাকা সবসময়ই নিজের হাতে রেখে দিতে চাইবেন। কেন? কারণ অনেক। আচম্বিতে কোনো বিপদ আসতে পারে, পুরনো ঋণের ওপর সুদের হার বেড়ে যেতে পারে বা ভবিষ্যৎ-এর কোনো বড় খরচের জন্য (ছেলেমেয়ের পড়াশোনা কি বাবা-মার চিকিৎসার খরচ) তিল তিল করে কিছু টাকা এখন থেকেই জমাতে হতে পারে।

অর্থাৎ, কেইনস বলছেন মানুষের কত টাকার প্রয়োজন তা নির্ধারিত হবে শুধু তার আয় দিয়ে নয়, বাজারের সুদ দিয়েও। যারা অঙ্কের ভাষা ভালো বোঝেন তাদের জন্য এই থিয়োরীও সমীকরণের মাধ্যমেই লেখা যায়,

Demand for money = M = M1 (y) + M2 (r) যেখানে y হল আয় আর r সুদের হার।

কেইনসের তত্ত্ব সত্যি হলে দু’টি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় – প্রথমত, কিছু মানুষের কাছে আগের দিনের বা আগের মাসের বা আগের বছরের m এর কিছু অংশ রয়ে গেছে অর্থাৎ হয়ত ১ টাকা আর ২ টাকার নোটের আসল সংখ্যা আরো বেশী; আর দ্বিতীয়ত  ‘কোয়ান্টিটি থিয়োরী অফ মানি’-র ওই v অর্থাৎ মুদ্রার গতিবেগ এক এক মানুষের জন্য এক এক রকম হবে।

এবার একবার চট করে মিনিয়েচার ভারত থেকে আসল ভারতে ফিরে আসা যাক। দেশের মুদ্রার ৮৬ শতাংশই ছিল ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোটে, তাই আগের  m রয়ে গেলেও সম্ভাবনা খুবই বেশী যে সে টাকাও রয়ে গেছে ওই ৫০০ আর ১০০০ হয়েই। সুতরাং, খুব কিছু কাজের কাজ হবে না।

আর v? কেইনসের বক্তব্য ধরলে এটা মেনে নেওয়াই স্বাভাবিক যে যারা একটু বেশীই ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে ভালোবাসেন তাদের জন্য v কম হওয়াটাই দস্তুর। তাহলে এরকম মানুষ কি আদৌ আছেন যাদের v গড়ের থেকেও বেশী? যাঁরা আছেন বলে মুদ্রা অবলুপ্তি ঘটলেও আগের স্থিতাবস্থায় ঠিকই ফেরত যাওয়া যাবে?

আছেন।

যাঁরা ‘প্লাস্টিক মানি’ অর্থাৎ ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন।

কিন্তু মনে রাখা দরকার আমরা মিনিয়েচার ভারত থেকে বেরিয়ে এসেছি। আসল ভারতের জনসংখ্যার কত শতাংশ প্লাস্টিক মানি ব্যবহার করে থাকেন? সবথেকে আশাবাদী পরিসংখ্যান বলছে মেরেকেটে দুই শতাংশের কাছাকাছি।  অতএব, কেইনসের তত্ত্বকে মেনে নিলেও আমাদের জন্য কোনো সুখবরই অপেক্ষা করে নেই। আরোই ভয়ের কথা এই যে, সরকার টাকার জোগান দিতে যদি অস্বাভাবিক বেশি সময় নেন এবং ততদিনে পণ্যসম্পদ ক্রয়বিক্রয়ের পরিমাণ অত্যন্ত কমে যায় তাহলে সেই সব পণ্যের যোগানদাররাও দোকান বন্ধ করে অন্য কাজে মন দেবেন। কি কাজ? সে চাষবাসও হতে পারে, বাপ-ঠাকুরদার রেখে যাওয়া পয়সা ওড়ানোও হতে পারে এমন কি চাইলে মুদ্রা অবলুপ্তির কারণ নিয়ে পি-এইচ-ডিও করতে যেতে পারেন। কিন্তু আখেরে ক্ষতি হবে এই যে পণ্যসম্পদের যোগান কমে গেলে বাজারে দাম বাড়বে বই কমবে না!

গত বছর হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ তাঁর বিতর্কিত বই ‘দ্য কার্স অফ ক্যাশ’ এ সওয়াল করেছিলেন কাগুজে টাকার ব্যবস্থাটিকেই সম্পূর্ণ ভাবে তুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই সওয়াল করতে গিয়ে এটাও জানিয়েছিলেন যে আমেরিকার মতন উন্নত  অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর দেশেও দশ থেকে পনের বছর ধরে এই কাজটি হওয়া উচিত। রোগফ আরো বলেছেন  সর্বদরিদ্র মানুষগুলির জন্য বিনামূল্যে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং মোবাইল ফোন পরিষেবার বন্দোবস্ত না করে এ কাজ করা যাবে না। নরেন্দ্র মোদী অবশ্যই এই মুহূর্তে ভারতবর্ষ থেকে কাগুজে টাকা তুলে দিতে চান নি, কিন্তু তারপরেও রোগফের কথাগুলি দেখায় কেন যে কোনো রকম মুদ্রা অবলুপ্তিকরণের আগেই দরকার দীর্ঘ প্রস্তুতি। কালোবাজারিদের রোখার জন্য আকস্মিক ঘোষণা যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ, কিন্তু বিন্দুমাত্রই প্রস্তুতি নিয়ে একাজে পা বাড়ালে পা ফালাফালা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।

যাঃ কলা!

ওয়াশিংটন ডিসি-র চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষর মতে ভারতীয় হাতি দিনে প্রায় দেড়শ কেজি খাবার খায়, তার মধ্যে একশ পঁচিশ কেজি খড়। ফল সেখানে নিতান্তই সাড়ে চার কেজি, আর তার পুরোটাই কলা নয়। পাকস্থলী দিয়ে হৃদয় জয়ের থিয়োরীটি যদি দেবতাদের জন্যও ভ্যালিড হয়, তাহলে বলতেই হচ্ছে যে প্রেয়সী পদে অধিকতর দাবী ছিল খড় বউয়ের। কিন্তু সে আর হল কই? শুকনো প্রায় পুড়ে যাওয়া চামড়ার খড়বউ নয়, গণেশের পাশে দিব্যি জায়গা করে নিলেন সতেজ, তন্বী, হরিৎবর্ণা কলাবউ। সাধে লীলা মজুমদার বলে গেছেন ‘পৃথিবীটাই অসাড়’।

পুরাণ জানাবে  হস্তীমুন্ড গণেশের কিউটনেস নিয়ে এ যুগের বালখিল্যরা যতই লাফালাফি করুক না কেন, সে যুগে পাত্রী খুঁজে পেতে হয়রান হতে হয়েছিল। গার্গী, লোপামুদ্রা, অপালাদের সময়, সাত চড়ে রা কাড়বে না এরকম দেবী বা মানবী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর সাত চড়ে রা না কাড়া পাত্রী ছাড়া কেই বা ওহেন কিম্ভূতকিমাকার বরকে পছন্দ করবে? পোটেনশিয়াল পাত্রীরা শাস্ত্র গুলে খেয়ে থাকলে আরোই সমস্যা, সেখানে কোনো পুঁথি জানাচ্ছে গণেশের আজীবন ব্রহ্মচারী হয়ে থেকে যাওয়ার কথা, কোথাও আবার লক্ষ্মী সরস্বতীর সঙ্গে গণেশের সম্পর্কটি আদৌ ভাই বোনের কিনা সে নিয়ে বিস্তর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। সুতরাং, ব্রীড়াভারে দোদুল্যমান কলাবউ ছাড়া গতি কি? ও হ্যাঁ, ভাঙ্গা দাঁতটিকেও ভুলে গেলে চলবে না। দক্ষিণী শাস্ত্রর কথা অনুযায়ী অতিভোজনের ফলে পেট ফেটে মিষ্টি বেরিয়ে এলে চাঁদ সেই দেখে বিস্তর হাসাহাসি করছিল, চাঁদকে শায়েস্তা করার জন্যই নিজের দাঁত নিজে ভেঙ্গে ছুঁড়ে দেন গণেশ। পরিমিতিবোধের অভাব, অতি উত্তেজনা ইত্যাদি ইত্যাদি।

নৃতত্ববিদরা অবশ্য বলবেন নবপত্রিকার অপরিহার্য অঙ্গ কলাবউকে পুজো করা কৃষিপ্রধান গ্রামবাংলার স্বাভাবিক রিচুয়াল। শুধু তো  কলাগাছ নয়, তার সঙ্গে পুজো পাচ্ছে কচু, বেল, ধান, মান, হলুদ, ডালিম,  অশোক, জয়ন্তী গাছও। কিন্তু এত গাছ থাকতে কলাকেই কেন প্রাধান্য দেওয়া হল? লজিস্টিকস একটা কারণ অবশ্যই হতে পারে – একটা বেল বা ডালিম গাছকে তো মণ্ডপে তোলা যায় না, আবার ধান বা কচু এনে হাজির করলে তা চোখেই ধরবে না। সেদিক থেকে কলাবউ এর সাইজ ও শেপ (আহেম্) এর সঙ্গে টক্কর দেওয়া মুশকিল। কিন্তু শুধুই কি লজিস্টিকস? পুরাণ জানাচ্ছে কলাগাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম ব্রহ্মাণী। ব্রহ্মার মতনই দুর্গার এই অবতারেরও তিনটি মুখ – অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ এর পরিচায়ক। এবং হ্যাঁ, ব্রহ্মার মতনই ইনিও সৃষ্টির দেবতা।

সৃষ্টি এবং কলা?

‘Kali’s Child’ বইয়ে জেফ্রি ক্রিপাল লিখেছেন বাংলার তন্ত্রসাধনায় ব্রহ্মাণী পুজোয় বরাদ্দ থাকত রক্তমাখানো কলা। এখানে কলা যে পুরুষ লিঙ্গর প্রক্সি সে কথা বলাটাই বাহুল্য। কলা গাছ যেন বাংলার অর্ধনারীশ্বর, পুরুষ এবং প্রকৃতির অভূতপূর্ব  সহাবস্থান।  মনে রাখা ভালো পুরাণ হোক বা উপনিষদ, গণেশকে কিন্তু সবসময়ই স্বয়ম্ভূ হিসাবেই দেখানো হয়েছে। এমনকি যে সব পুরাণে বলা হয়েছে দুর্গা নিজেই গণেশকে বানিয়েছেন সেখানেও ফুটনোটে লেখা থাকছে চানের সময় ঝরে পড়া ধুলো থেকেই গণেশের জন্ম, অর্থাৎ গণেশের জন্মের উপাখ্যানটিও যেন আরেক প্রক্সি, উর্বর সুজলা সুফলা পৃথিবীর।

অবশ্য সৃষ্টিরহস্য নিয়ে মাথা যখনই ঘামানো হয়েছে, কলাকে সরিয়ে রাখা যায় নি। অন্তত যে সব দেশে কলাগাছ পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়, সেই দেশের মানুষরা কলাকে ভুলে থাকতে পারেন নি।

পলিনেশিয়ান দ্বীপগুলির কথাই ধরুন, ডাঙ্গায় রইল কিছু ফলের গাছ আর তার বাইরে জল। সুতরাং, এই দ্বীপের মানুষগুলির অন্যতম প্রধান দেবতা কানালোয়া কি ভাবে পূজিত হবেন? জলে থাকলে অক্টোপাস হিসাবে। আর ডাঙ্গায় এলে? ঠিক ধরেছেন, কলাই বটে। মিশরের শিল্পকলায় প্রায়শই দেখা যেত পুনর্জন্মের দেবতা ওসিরিসের কপালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ছোট কলাপাতা, হ্যাঁ প্রাচীন মিশরেও কলাগাছ প্রজননক্ষমতার প্রতীক। উৎসাহীরা হয়ত এও জানবেন যে কলা নিয়ে আদিখ্যেতা স্রেফ পেগান পূজারীদের নয়। আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক সুইডিশ বৈজ্ঞানিক কার্ল লিনিয়াস বিশ্বাস করতেন সাপের সঙ্গে মোলাকাতের পর আদম আর ইভ যা পরেছিলেন তা নেহাতই কলা গাছের পাতা।  লিনিয়াস অবশ্য আইডিয়াটি পেয়েছিলেন ইসলামিক মিথ থেকে, যেখানে আপেল নয় কলাকেই বলা হয়েছে স্বর্গের ফল।

কলাবউকে নিয়ে বেশ কিছু  কথা হল, গণেশের কাছে একবার ফিরি। মনে রাখা ভালো বৈদিক সাহিত্যে গণেশের কোনোরকম উল্লেখ নেই। মহাভারতে যে গণেশকে আমরা দেখি তিনি শ্রুতিধর লেখক, যাকে ব্যস্ত রাখতে বেদব্যাস হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলেন। মহাভারত বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যাসদেব এবং গণেশের এই গল্প আদি মহাভারতে ছিল না, অনেক পরে সংযোজিত হয়েছে। ইরাবতী কার্ভে-র অসাধারণ বই ‘যুগান্ত’ পড়লে একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যায় কিভাবে হাজার হাজার বছর ধরে আর্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষরা ক্রমান্বয়ে মহাভারত (এবং রামায়ণ) কে নিজেদের মর্জি অনুযায়ী বাড়িয়ে গেছেন, গণেশের গল্প সেই অনৃতভাষণের অংশ বিশেষ। হয়ত মহা শ্রুতিধর কোনো লেখক (যাঁর নাম সত্যিই গণেশ) আদতেই লিখতে বসেছিলেন মহাভারতের গল্প, পারিশ্রমিক হিসাবে চেয়ে নিয়েছিলেন নিজের অমরত্ব। কি আর করা, যিনি বলছিলেন তাঁকে রাজি হতে হল। তবে অমরত্বের বায়নাক্কায় কথক বোধহয় সামান্য বিরক্তই হয়েছিলেন। নিজের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জুড়ে দিলেন হাতির মাথা (হাতিই কেন? সে আরেক থিয়োরী, পরে কখনো আড্ডায় বসা যাবে)। সম্ভবত মস্তিষ্কের সাইজ দেখে এবং বুদ্ধিধর, সিদ্ধিদাতা সুলভ প্রভূত বিশেষণের পাল্লায় পড়ে লেখক গণেশ এহেন ফ্যান্টাসি ফিকশন নিয়ে আর বাক্যব্যয় করেন নি।

গণেশ এলেন।

কিন্তু কলাবউয়ের আসতে তখনো ঢের দেরী।

পাণ্ডববর্জিত জায়গা নাম দিয়ে আর্যভাষীরা যে বাংলায় আসতে অস্বীকার করেছিলেন সেখানেই যে এরকম বিবাহবিভ্রাটে পড়তে হবে তা বোধহয় গণেশ বা ব্যাসদেব কেউই কল্পনা করতে পারেননি, নইলে বিয়েটা ওই হাজার বছর আগেই চুকিয়ে ফেলা যেত। আসলে দেখতে পেতেন আর্যভাষীদের পৌরুষতন্ত্র নয়, আমরা আপন করেছিলাম কালী ও ব্রহ্মাণীর নারীশক্তিকে।  উড়ে এসে জুড়ে বসা গণেশের জন্য আমাদের পছন্দের পাত্রীকে অন্তত লজিক দিয়ে হঠানো যাবে না।

সুতরাং?

আর কি, যাঃ কলা!

kola-bou

(স্থিরচিত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা, চিত্রগ্রাহক – রণজিৎ নন্দী)

মেমবউ

ফেসবুকের বন্ধুদের দৌলতে এ সপ্তাহে প্রায় অবিশ্বাস্য একটি ট্রেলর দেখলাম, বাংলা সিরিয়ালের। অবিশ্বাস্য কেন? কারণ ৩৬ সেকন্ডের জন্য ভুলে গেছিলাম সালটা ২০১৬। সাড়ে বত্রিশ ভাজার যেসব পাঠকরা এখনো এ ট্রেলর দেখে উঠতে পারেননি তাঁদের জন্য রইল ইউটিউবের লিঙ্ক,

ক্যারলকে ধন্যবাদ, অপ্রাকৃত চুল এবং অসম্ভব উচ্চারণ নিয়ে উদয় হওয়ার পরেও ওনার দৌলতে বেশ কিছু বিস্মৃতপ্রায় মানুষের কথা মনে পড়ে গেল। আজ সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাতায় তাঁদের কে নিয়েই দু’চার কথা থাকল, সেই সব বাঙালি মেমবউ কদাচিৎ স্মরণে আসেন যে !

 রেবেকা ম্যাকভিটিস এবং  এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া

শুরুতে বলে রাখা ভালো, উইকিপিডিয়ায় গেলে দেখবেন হেনরিয়েটার বদলে লেখা আছে আঁরিয়েতা। কিন্তু গোলাম মুরশিদ ‘আশার ছলনে ভুলি’ বইটিতে যথেষ্ট যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন হেনরিয়েটা আদৌ ফরাসী ছিলেন না। আমিও গোলাম মুরশিদকে অনুকরণ করে হেনরিয়েটাই লিখলাম।

মাইকেল মধুসূদনের প্রথম স্ত্রী ছিলেন রেবেকা ম্যাকটিভিস, আর দ্বিতীয়া স্ত্রী হেনরিয়েটা। অন্তঃসত্ত্বা রেবেকা স্বাস্থ্য ফেরানোর অভিপ্রায়ে যখন দূরদেশে তখনই মধুসূদনের সঙ্গে হেনরিয়েটার প্রণয়ের সূত্রপাত। রেবেকার জন্য তো ট্রাজেডি বটেই, হয়ত হেনরিয়েটার ট্রাজেডিরও এখান থেকেই শুরু। গোলাম মুরশিদ জানিয়েছেন অনাথ রেবেকার শিক্ষা বেশিদূর এগোয়নি, কিন্তু হেনরিয়েটা শিক্ষিতা ছিলেন। হয়ত সে কারণেই মাইকেল ক্রমে ক্রমেই রেবেকার থেকে দূরে সরে গেছিলেন। চার সন্তান সহ অসহায়া রেবেকাকে ছেড়ে হেনরিয়েটার সঙ্গে ঘর বেঁধে মাইকেল যা অন্যায় করেছিলেন তার তুলনা মেলা ভার। মাইকেল মধুসূদনের আরেক জীবনীকার যোগীন্দ্রনাথ বসু জানিয়েছেন রেবেকার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ছিল। স্বামীর খামখেয়ালিপনা নিয়ে কথা শোনাতেন, শেষে মধুসূদনের বিশ্বাসঘাতকতা ধরা পড়ে যাওয়ার পর তিনি নিজেই সংসারে থাকতে অস্বীকার করেন। হেনরিয়েটা কিন্তু মাইকেলের সব সিদ্ধান্তই মুখ বুজে মেনে নিতেন। শুধু তাই নয়, মাইকেলের সাহিত্যসঙ্গিনী হওয়ার লক্ষ্যে হেনরিয়েটা বাংলাও শিখতে শুরু করেছিলেন। হেনরিয়েটা না থাকলে মধুসূদন নির্বিঘ্নে সাহিত্যসৃষ্টি  আদৌ করতে পারতেন কিনা সে নিয়েও বহু গবেষক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

রেবেকা এবং হেনরিয়েটা দু’জনের সঙ্গেই মধুসূদনের আলাপ মাদ্রাজে, সেই মাদ্রাজ থেকেই হেনরিয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে মধুসূদন কলকাতায় আসেন ১৮৫৫ সালে। রেবেকা অতি কষ্টে চার সন্তানকে বড় করেছিলেন কিন্তু আর বিয়ে করেননি।  ১৮৯২ সালে রেবেকা মারা যান টিবি রোগে, তাঁর নামের পেছনে তখনো লাগানো ছিল ‘ডাট’ পদবীটি। অথচ তারও উনিশ বছর আগেই মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে মারা গেছেন হেনরিয়েটা এবং মধুসূদন, কপর্দকশূন্য অবস্থায়। মধুসূদনের অমিতব্যয়িতাকে হেনরিয়েটা কোনোদিনই শুধরোতে পারেন নি, উপরন্তু কবির খামখেয়ালিপনা এবং কদাচিৎ দুর্ব্যবহারে বিদ্যাসাগরের মতন শুভানুধ্যায়ীরাও সরে গেছিলেন। হেনরিয়েটার সঙ্গে বিদ্যাসাগরের একটি প্রীতিমধুর সম্পর্ক ছিল, খানিকটা হেনরিয়েটার কারণেই বিদ্যাসাগর বহুদিন ধরে মাইকেলকে আর্থিক সাহায্য করে গেছিলেন। কিন্তু বিধি বাম, হেনরিয়েটা যখনই সংসারকে সামান্যটুকুও স্থিতি দিতে চেয়েছেন, মধুসূদন নিজেই একটা দুর্দম ঝড়ের মতন এসে সেই স্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দিয়ে  গেছেন।

নেলী সেনগুপ্ত

ns

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাউনিং কলেজে বি-এ ডিগ্রী নিতে এসেছিলেন যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। আর সেখানেই আলাপ এডিথ এলেন গ্রে-র সঙ্গে। অবশ্য এডিথের সঙ্গে আলাপ হওয়ার সময় যতীন্দ্রনাথ আইনের ডিগ্রীও নিয়ে নিয়েছেন। এডিথকে আইনের পাঠ না দিলেও সন্দেহ নেই যতীন্দ্রমোহনের স্মার্ট পারসোনা টি এডিথের মনে বিশেষ ছাপ ফেলেছিল। বিয়েতে কোনো পক্ষেরই মত থাকার কথা নয়, তাই বিয়ে মুলতুবি রেখে যতীন্দ্রনাথ ফিরে আসছিলেন দেশে। পরে মত বদলে এডেন থেকে ফিরে যান কেম্ব্রিজে, এবং এডিথকে বিয়ে করেই কলকাতায় ফেরেন। যতীন্দ্রমোহন মধুসূদনের মতন খামখেয়ালি ছিলেন না কিন্তু রাজনীতি এবং দেশোদ্ধারের টানে হাইকোর্টের তুমুল পসার ছেড়ে দেন। সেই সময় হেনরিয়েটার মতনই নেলীকেও দাঁতে দাঁত চেপে সংসার চালাতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক কারণে যতীন্দ্রমোহন কলকাতা ছেড়ে চলে যান চট্টগ্রামে, এবং সেখানে বহুবার কারাবরণ করেন। যতীন্দ্রমোহনের সঙ্গে নেলীকেও তখন বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছিল জেলে। আর এই সময় থেকেই নেলীরও একটি নিজস্ব রাজনৈতিক সত্ত্বা বিকশিত হতে থাকে। তারই ফল, ১৯৩৩ সালে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হওয়া। নেলির আগে মাত্র দু’জন মহিলাই কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের পদ পেয়েছিলেন, অ্যানি বেসান্ত এবং সরোজিনী নাইডু।

ছেচল্লিশের সেই ভয়াবহ দিনগুলির সময় নেলী দাঙ্গা থামাতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। হয়ত সেই কারণেই এবং চট্টগ্রামের সঙ্গে তাঁর একটা আত্মিক সম্পর্ক থাকার কারণে নেহরু দেশভাগের পরে নেলীকে চট্টগ্রামেই থাকতে অনুরোধ করেন। নোয়াখালির দাঙ্গার পর সংখ্যালঘুদের ভরসা দেওয়ার জন্য নেলী সেনগুপ্তর মতন কোনো ব্যক্তিত্বকেই দরকার ছিল। প্রায় আমৃত্যু ছিলেন সেখানে, জীবনের শেষ বছরটায় কলকাতার ফিরে আসেন চিকিৎসার কারণে।

লীলা রায়

lila-ray

‘মেমবউ’ এর ক্যারলের উচ্চারণ শুনে আমার সবার আগে লীলা রায়ের কথাই মনে পড়ল। না লীলা রায় ওরকম অবাস্তব অ্যাক্সেন্ট নিয়ে কথা বলতেন না, বরং সাধারণ কথোপকথনের সময়েও সাধু ভাষাতেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন। তবে ওনার কথা বলার ভঙ্গীটি নিয়ে সেই বিখ্যাত গল্পটি মনে পড়ে গেল (যেটি আমি সম্ভবত পড়েছিলাম কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘মজলিশ’ বইটিতে)। মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনে দেখা করতে গেছেন অন্নদাশঙ্করের সঙ্গে, বাইরের বাগানে দেখেন লীলা রায় কাজ করছেন। লীলা জানালেন অন্নদাশঙ্কর দেখা করতে পারবেন না। কেন? ‘উনি সৃষ্টির কাজে ব্যাপৃত আছেন।’ মুজতবা একটু মনঃক্ষুণ্ণ সম্ভবত, মনে মনে বললেন, ‘তাহলে আপনি এখানে কি করছেন?’।

লীলা রায়কে নিয়ে একটি চমৎকার লেখা পাওয়া যায় অন্তর্জালে, যেটি লিখেছেন স্বয়ং আনন্দরূপ রায়, অন্নদাশঙ্কর এবং লীলার পুত্র। উৎসাহীরা এখানে দেখতে পারেন। টেক্সাসের মেয়ে অ্যালিস ভার্জিনিয়া অর্নডর্ফের নাম লীলা রেখেছিলেন অন্নদাশঙ্কর নিজেই। নামকরণ প্রসঙ্গে ‘মনস্বী অন্নদাশঙ্কর’ বইয়ে ‘জীবন কথা’ প্রবন্ধে সুরজিৎ দাশগুপ্ত  লিখেছেন, ”লীলা হল সৃষ্টি আর সৃষ্টির মধ্যেই স্রষ্টার প্রকাশ। আর এই স্রষ্টাই হলেন পরমসত্তা। এখন থেকে ঘরনির মধ্যে অন্নদাশঙ্কর দেখলেন অন্যতম সৃষ্টির লীলা।’ এই সময় অন্নদাশঙ্কর ‘লীলাময় রায়’ ছদ্মনামেও লেখালেখি করেছেন। দেশে পুরোপুরি থিতু হয়ে যাওয়ার পর পশ্চিমী আদবকায়দাগুলো ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য লীলা রায়ের শরণাপন্ন হতেন অন্নদাশঙ্কর, অথচ এই লীলাই বাড়িতে দিব্যি শাড়ি আর কার্ডিগান পরে ঘুরে বেড়াতেন।

লীলা কলকাতায় এসেছিলেন ১৯৩০ সালে, তারপর প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে সাহিত্যচর্চার নিরলস সাধনা করে গেছেন। ক্ষিতিমোহন সেনের বাংলার বাউল নিয়ে বইয়েরও যেমন অনুবাদ করেছেন, তেমনই অনুবাদ করেছেন সত্যজিৎ রায়ের ‘ফটিকচাঁদ’। কবিতাও যেমন লিখেছেন, লিখেছেন ‘ইংরেজি সহজ পাঠ’। লীলা রায়ের কাজের ব্যাপ্তিকে আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি, তাঁর লেখালেখি এবং অনুবাদ নিয়ে খুব একটা ওয়াকিফ-হাল ও নই। হয়ত ভবিষ্যৎ-এও অন্নদাশঙ্করের সহধর্মিণী হিসাবেই পরিচিতি থেকে যাবে লীলার।

মিলাডা গঙ্গোপাধ্যায়

mg

লীলা রায়ের ন’বছর পর চেকোস্লোভাকিয়া থেকে ভারতে এসে পৌঁছন মিলাডা। অবনীন্দ্রনাথের নাতবৌ তিনি, শিশুসাহিত্যিক এবং সংখ্যাতত্ত্ববিদ মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্ত্রী। উচ্চশিক্ষার্থে লন্ডনে গেছিলেন দু’জনেই, সেখানেই মোহনলালের সঙ্গে মিলাডার আলাপ। মিলাডারও কাজের পরিসরটি অত্যন্ত বিস্তৃত। মৌচাক এর মতন ছোটদের পত্রিকায়  গল্পও লিখেছেন, আবার নাগাল্যান্ডের আদিবাসীদের জীবনযাত্রা নিয়ে বিস্তর ডকুমেন্টেশনও করে গেছেন (পিলগ্রিমেজ টু দ্য নাগাজ বোধহয় ওনার সবথেকে বিখ্যাত বই)। নাগাল্যান্ডে গিয়ে কিছু চমৎকার ফটোও তুলেছিলেন মিলাডা, তার কিছু দেখা যাবে এখানে। সাহিত্য এবং সমাজ চর্চার পাশাপাশি সংসারটিও দিব্যি চালিয়ে গেছেন মিলাডা, ঠিক লীলা রায়ের ধাঁচেই। বন্ধু এবং শ্রদ্ধাস্পদ ইন্দিরা চক্রবর্তীর কাছে শুনেছি মিলাডা তাঁর মেয়ে ঊর্মিলাকে পৌঁছতে এবং নিয়ে আসতে প্রায়ই উপস্থিত হতেন ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে।

লীলা রায় শোনা যায় তাঁর সন্তানদের দশ বছর হওয়ার আগে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা শিখতে দেন নি। ঊর্মিলা কিন্তু জানিয়েছেন মা’র দৌলতে তিনি এবং তাঁর সহোদর মিতেন্দ্র চেক এবং বাংলা দুটো ভাষাই শিখেছিলেন। মিলাডা এবং মোহনলালের জন্যই অবশ্য গড়পড়তা বাঙালিরও চেক্ সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে। মিলাডার জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সাউথ পয়েন্ট স্কুল। প্রতিষ্ঠাতা সতীকান্ত গুহর অনুরোধে মিলাডা সাউথ পয়েন্ট  স্কুলের নার্সারি বিভাগে শিক্ষকতার ভার নেন। যে সময় শিশুদের ডায়েট নিয়ে সচেতনতা ছিল না বললেই চলে, মিলাডা তখন স্বেচ্ছায় কচিকাঁচাদের জন্য ডায়েট প্ল্যানও বানিয়ে গেছেন। এ দেশে আসার এক বছরের মধ্যেই দ্য ক্যালকাটা মিউনিসিপাল গেজেট-এ মিলাডা এই নিয়ে একটি প্রবন্ধও লেখেন, ‘দ্য অ্যাকটিভ চাইল্ড – দ্য হেলদি চাইল্ড’।

তিন বছর আগে চলে গেছে মিলাডার জন্মশতবর্ষ,  আনন্দবাজারের কলকাতা কড়চায় দু’টি পরিচ্ছেদ ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পেলাম না ইন্টারনেটে।

এলেন রায়

er

এলেন গটসচাকের সঙ্গে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের আলাপ জার্মানিতে। এলেনের জন্ম অবশ্য প্যারিসে, এবং জন্মেছিলেন এক ইহুদী পরিবারে। কুমারী জয়াবর্ধনে তাঁর ‘দ্য হোয়াইট ওম্যান’স আদার বার্ডন’ বইয়ে জানিয়েছেন মানবেন্দ্রনাথ রায়ের মতনই এলেন-এরও ঝোঁক ছিল র‍্যাডিকাল পলিটিক্সের দিকে, এবং এই ঝোঁক সেই কুড়ি একুশ বয়স থেকেই। ২০১৬ তে যখন দেশ জুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে, তখন এলেনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটি  আমাদের আরোই ভাবিয়ে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সারা ইউরোপের দুর্দশার এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে এলেন দায়ী করেছিলেন ‘the absurdity of hostile patriotisms’ কে। এ বৈষম্য ঘোচানোর জন্য এলেন বিশ্বাস করতেন বিপ্লব ছাড়া পথ নেই। মনে রাখা ভালো যে এলেনের সঙ্গে আলাপের কিছুদিন আগেই জার্মান ভাষাতেই প্রকাশিত হয়েছে মানবেন্দ্রনাথের লেখা বই, ‘রেভলিউশন অ্যান্ড কাউন্টার রেভলিউশন ইন চায়না’।

১৯৩০-এ মানবেন্দ্রনাথ দেশে ফিরে আসেন, ৩১ সালে রাজদ্রোহের অভিযোগে বারো বছরের কারাদন্ড হয় মানবেন্দ্রনাথের। পরে মেয়াদ কমে সাজা দাঁড়ায় ছ’বছরের, মানবেন্দ্রনাথ ছাড়া পান ১৯৩৬-এ। সাজা কমে যাওয়ার পেছনেও এলেনের কিছু অবদান থাকতে পারে,  এলেনের অনুরোধেই একাধিক ভারতীয় এবং ইউরোপীয়ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চিঠি লিখে মানবেন্দ্রনাথের কারাদন্ড কমানোর অনুরোধ জানান।  এলেন মুম্বই এসে পৌঁছন ১৯৩৭-এ, সেই বছরের বিয়ে করে দু’জনে দেরাদুনে চলে যান। আর এই সময় থেকেই দু’জনেই কমিউনিজম থেকে সরে আসতে থাকেন, প্রচার করতে শুরু করেন ‘র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম’ বা ‘নব মানবতাবাদ’ নামক এক নতুন রাজনৈতিক মতবাদের। মানবেন্দ্রনাথ জেল থেকে বার্লিনে এলেনকে অনেক কটি চিঠি লিখেছিলেন, এলেনের প্রায় একার উদ্যোগেই ১৯৪৩-এ সেই সব চিঠি একত্রিত হয়ে প্রকাশিত হয় ‘লেটারস ফ্রম জেল’ নামে। কয়েক বছর পর থেকেই বেরোতে শুরু করে সেই বিখ্যাত পত্রিকা ‘র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট’, ৫৪ সালে মানবেন্দ্রনাথ মারা যাওয়ার পর প্রায় ছ’বছর ধরে এলেন ছিলেন সেই পত্রিকার সম্পাদক।

বিপ্লবী তরুণী এলেনের মানবিক দিকগুলো নিয়ে মানবেন্দ্রনাথের শিষ্য এবং জীবনীকার শিবনারায়ণ রায় অনেক কিছু বলেছেন। তাঁকে একটু উদ্ধৃত করি এখানে, ”মানবেন্দ্রনাথের সঙ্গে কোনো অমিলই যে কখনো বিরোধের আকার নেয় নি তার একটা কারণ তাঁর অসামান্য ব্যক্তিত্বের প্রতি আমার সুগভীর শ্রদ্ধা, এবং অন্য কারণ মানবেন্দ্রপত্নী এলেনের সতর্ক স্নেহ’। মানবেন্দ্রনাথ মারা যাওয়ার পরেও এলেনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় ছিল মানবেন্দ্রনাথের প্রায় সব রাজনৈতিক সতীর্থ এবং শিষ্যদের। হয়ত লীলা রায় বা মিলাডা গঙ্গোপাধ্যায়ের মতনই এলেন-ও পণ করেছিলেন সারা জীবন ধরে নিজেকে অফুরন্ত কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত রাখার, সে সুযোগ অবশ্য তিনি পাননি। ১৯৬০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর দেরাদুনেই রহস্যজনক ভাবে খুন হন এলেন, আততায়ী ছিল তাঁর এবং মানবেন্দ্রনাথের পূর্বপরিচিত। রাজনৈতিক হত্যাকান্ড না নিছক ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ড তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে এখনো।

 

একটি তিতকুটে লেখা

৬ই জুলাই প্রকাশিত হয়েছে খাদ্যসংস্কৃতি বিষয়ক সঙ্কলন ‘নুনেতে ভাতেতে’। বইটির প্রকাশক ‘The Cafe Table’, সম্পাদনা করেছেন বাংলাদেশের অনার্য তাপস এবং পশ্চিমবঙ্গের রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল। অনার্য তাপসের অনুরোধে আমিও একটি ছোট প্রবন্ধ লিখেছিলাম সঙ্কলনটির জন্য, সেটিই আজকে তুলে দিলাম ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’ ব্লগে।

পাকপ্রণালীর বই দু’ বাংলাতেই প্রচুর আছে কিন্তু বাংলা কি বিশ্বের খাবারদাবার নিয়ে মজলিশি বা বিশ্লেষণধর্মী লেখা চট করে পাওয়া যায় না। রাধাপ্রসাদ গুপ্ত কি প্রতাপকুমার রায়ের মতন ব্যতিক্রমী লেখকদের সংখ্যা এতই কম যে তাঁদের অনবদ্য প্রবন্ধগুলি  অধিকংশ সচেতন বাঙালি পাঠকেরও চোখ এড়িয়ে গেছে।  আবার সময় সময় শুধুমাত্র হেঁসেলের চৌহদ্দি পেরোতে না পারায় চেখে উঠতে পারিনি কল্যাণী দত্তের ‘থোড় বড়ি খাড়া’ বা সামরান হুদার ‘পুবালি পিঞ্জিরা’ ও ‘অতঃপর অন্তঃপুরে’-র মতন বইগুলি, যেখানে মর্মস্পর্শী স্মৃতিকথনে উঠে এসেছে রান্না বা খাবারদাবারের প্রসঙ্গ। ‘নুনেতে ভাতেতে’র লেখাগুলি রাধাপ্রসাদ কি কল্যাণী কি সামরানের লেখার সমগোত্রীয় এ কথা বলছি না কিন্তু এনারা যে লেগ্যাসি রেখে গেছেন সেটাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সাধু ও গুরুত্বপূর্ণ  পদক্ষেপ। আমার ধারণা সমমনস্ক বন্ধুদের এই প্রচেষ্টাটি ভালো লাগবে, নজর কেড়ে নেবে বিষয়বৈচিত্র্যও।

বইটি পড়তে চাইলে প্রকাশকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন ফেসবুকের মাধ্যমে – https://www.facebook.com/nunetebhatete/?fref=ts

Nunete Bhatete