আবার ব্যোমকেশ – গরলতমসা

Pinup_001_01B_06

ফেলুদা এসে পড়লে ব্যোমকেশের পৌঁছতে আর কত দেরি-ই বা হতে পারে? ‘রাজধানীতে তুলকালাম’ লেখার মাস তিনেকের মধ্যে লেখা হয় ‘গরলতমসা’।  আশা করি সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠকদের এ প্যাস্টিশটিও নিরাশ করবে না। সঙ্গে রইল অভীক কুমার মৈত্রের  করা কিছু অসাধারণ অলঙ্করণ। ব্যোমকেশের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন, চেনা কাউকে খুঁজে  পাচ্ছেন কি? 

ByomkeshHiRes002_Birenbabu

জাপানী বোমার ভয়ে গোটা কলিকাতা মনুষ্যশূন্য বলিয়া বোধ হইতেছে, অবশ্য পৌষের শীতটিও মন্দ পড়েনি এবার। কারণ যাহাই হউক না কেন, সদাচঞ্চল হ্যারিসন রোডে গাড়িঘোড়ার আওয়াজ কদাচিৎ পাওয়া যাইতেছে। শহরের আওয়াজ বিনা,  প্রভাতী চা এবং জলখাবারের সময়টিকে এই শেষ কিছুদিন  যাবৎ অপরিচিত ঠেকিতেছে।

ব্যোমকেশ এ নিয়ে আদৌ মাথা ভার করিতেছে কিনা তা বোঝা দায়। অন্য যে কোনো দিনের মতনই আজও সে খবরের কাগজখানার প্রথম প্রান্ত থেকে শেষ প্রান্তে, এবং পুনরায় শেষ থেকে প্রথমে যাতায়াত করিতেছে। বলিলাম, ‘হিরোহিতোর ভয়ে তোমার মক্কেলরা এখন কতদিন অজ্ঞাতবাসে থাকেন দেখো।’

সমস্ত বিজ্ঞাপনেই বোধ হয় চোখ বোলানো শেষ হইয়াছিল, ব্যোমকেশ কাগজটি গুছাইয়া রাখিতে রাখিতে বলিল, ‘কিছু কিছু নয় বাবা, কিছু কিছু নয়।’

আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম, ‘সে আবার কি?’

‘আশ্চর্য, এ লেখা আগে পড়োনি নাকি?

 

দুনিয়ার মাঝে বাবা কিছু কিছু নয়, কিছু কিছু নয়।

নয়ন মুদিলে সব অন্ধকারময়, বাবা অন্ধকারময়।।

ধন বল জল বল, সহায় সম্পদ বল,

পদ্মদলগত জল, চিহ্ন নাহি রয়।’

 

এ লেখা সত্যই পড়িনি, কার লেখা সে কথা জিজ্ঞাসা করিতে ব্যোমকেশ মুচকি মুচকি হাসিতে লাগিল। আমি তাগাদা দিতে যাইতেছিলাম, এমন সময়ে সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। আমাকে উদগ্রীব হইতে দেখিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ‘চিন্তা নেই। অত ভারী পায়ের আওয়াজ মক্কেলের নয়, পুলিশেরই হয়।’

ডিডাকশনটি সঠিক, মিনিটখানেকের মধ্যে আমাদের পূর্বপরিচিত বীরেনবাবু ঘরে প্রবেশ করিলেন। ভদ্রলোক হাস্যমুখর এমন অপবাদ কেউ দিবে বলিয়া বোধ হয় না, কিন্তু আজকে তাঁহার ভ্রূযুগল যে পরিমাণ কুঞ্চিত হইয়া আছে তাহাতে স্বাভাবিক আদর আপ্যায়ন করাও উচিত বোধ হইল না। চেয়ারে বসিতে বসিতে বললেন, ‘কমিশনার সাহেব আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন, সে খবর দিতেই আসা।’

ব্যোমকেশ একটা সিগারেট ঠোঁটে ধরাইয়া বীরেনবাবুর দিকে প্যাকেটটি আগাইয়া দিল। তিনি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করিতে করিতে বলিলেম, ‘আমি সাহেবকে বলেছিলাম ব্যোমকেশবাবুর কাছে এখনই যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু সে কথা তিনি শুনলে তো! তারপর আজ সকালে যা ঘটেছে…’। বলিতে বলিতে বীরেনবাবুর খেয়াল হইল তাঁর শ্রোতৃবৃন্দ ভূমিকাটুকু সম্বন্ধেও অবহিত নন। আমাদের দিকে তাকাইয়া বলিলেন, ‘এ ঘটনা আপনাদের জানার কথা নয়, কারণ শুরুতে খবরওয়ালারাও টের পায়নি। আর যখন তারা টের পেয়েছে, তখন পুলিশ নিজে তাদের অনুরোধ করেছে খবর না ছাপাতে। যদিও তারা বোধহয় সে অনুরোধ আর রাখবে না।’

ব্যোমকেশ ঠোঁট থেকে সিগারেটটা সরাইয়া বলিয়া উঠিল, ‘বলেন কি? পুলিশকে হাতজোড় করতে হচ্ছে খবরের কাগজের কাছে? অবস্থা তাহলে নিতান্তই বেগতিক।’

হাতজোড় করিবার প্রসঙ্গটি সম্ভবত বীরেনবাবুর মনঃপূত হইল না। একটি অব্যক্ত শব্দ করিয়া বলিয়া উঠিলেন, ‘কারণ আছে। পুরো ঘটনা না শুনলে বুঝতে পারবেন না।’

‘তিন সপ্তাহ আগে রামবাগান অঞ্চলে গলির গলি তস্য গলির মধ্যে একটি মৃতদেহ পাওয়া যায়। অন্য সময়ে মৃতদেহটি নিয়ে আদপেই কোনো হট্টগোল হওয়ার কথা ছিল না। পেশাগত কারণে ও অঞ্চলটিতে মাঝেসাঝেই এ ধরণের অপরাধ ঘটে থাকে।’

ব্যোমকেশ বীরেনবাবুকে বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল, ‘অর্থাৎ খুন যিনি হয়েছেন তাঁর পেশাটি ছিল আদিমতম?’

বীরেনবাবু মাথা নাড়িলেন।

‘ঠিকই বুঝেছেন, রামবাগান বলে কথা। তা যা বলছিলাম, এবারে কিন্তু এই খুন নিয়ে কিছু হইচই হল, যদিও শেষ রাতের ওই লাশ পুলিশ আসার আগে জনা দুয়েক মানুষই দেখেছিল। কিন্তু অপরাধের নৃশংসতা তাদের এতই বিহ্বল করে তুলল যে চেনাশোনাদের ঘটনাটার ব্যাপারে না বলে পারল না।’ কিয়ৎকাল নীরব থাকিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ‘নৃশংসতার ধরণটা জানা যায়?’

‘সে কথাতেই আসছিলাম। পুলিশের কাজ তো আর আজকে শুরু করিনি, কিন্তু এ ধাঁচের হত্যাকান্ড আমার চাকুরীজীবনে দেখিওনি, শুনিওনি। হতভাগিনীর গলা কেটে খুন করা হয়েছে, কিন্তু সেটি নৃশংসতার শুরু মাত্র।

খুন করার পর মহিলার শরীরটিকে হত্যাকারী উন্মুক্ত করে ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গুলি বার করে নিয়েছে।’

হত্যাকান্ডের বিবরণ শুনিয়া শিহরিয়া উঠিলাম। ব্যোমকেশ মুখে বিশেষ রেখাপাত হইল না, দেখিলাম সে নিমগ্ন চিত্তে বীরেনবাবুর কথাই শুনিতেছে।

‘সেই হত্যাকান্ডের তদন্ত চলিতে চলিতেই  গত সপ্তাহে আরেকটি খুন হয়। একই মহল্লা, এবারেও শিকার আরেক দেহোপজীবিনী। এবং……’

‘এনারও শরীরটিকে তছনছ করে গেছে?’

বীরেনবাবু মাথা নাড়িয়া সম্মতি জানাইলেন।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘কিন্তু আজ সকালে বোধহয় দ্বিতীয় খুনের রহস্যোদঘাটনের জন্য সে চত্বরে যান নি?’

বীরেনবাবু একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন, ‘ঠিকই ধরেছেন, আজ সকালেই তৃতীয় একটি লাশ পাওয়া গেছে। অবিকল একই পদ্ধতি। রামবাগানে এখন বিকালের পর থেকে আর লোকজন বেরোচ্ছে না। এদিকে কাগজওলারা আর এ খবর চেপে রাখবে না বলেই আমার ধারণা, হয়ত কাল সকালেই দেখতে পাবেন।’

ব্যোমকেশ অন্যমনে বলিল, ‘জাপানী বোমার ভয়ে রাস্তাঘাট এমনিই ফাঁকা, খুনী তারই ফায়দা তুলছে। তার ওপর এয়ার রেড এর আশঙ্কায় রাস্তায় সামান্য আলোটুকুও থাকছে না।’

‘খুবই সম্ভব। যাই হোক, আমাকে এখনই লালবাজারে ফিরতে হবে। আজকালের মধ্যে একবার কর্তার সঙ্গে দেখা করে আসবেন। বুঝতেই পারছেন, আর্জেন্ট তলব পাঠিয়েছেন।’

 

 

বীরেনবাবু বিদায় নেওয়ার পর ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কি মনে হচ্ছে ব্যোমকেশ? এমনতর নৃশংসতা যে কল্পনা করাও মুশকিল।’

ব্যোমকেশ আরাম-কেদারায় হেলান দিয়া বলিল, ‘মনুষ্যচরিত্র অজিত, আমাদের সীমিত কল্পনাশক্তি দিয়ে তার তল খুঁজে পাবে এ আশা করোই বা কেন? হাজারখানা মোডাস অপারেন্ডি থাকতে পারে। ষড়রিপুর যে কোনোটিই প্রবলতর হয়ে উঠতে পারে।’

‘বলো কি! কাম – ক্রোধ – মোহ নয় তাও বোঝা গেল। কিন্তু বাকিগুলো?’

‘সেও ভাবলে ঠিকই পেয়ে যাবে। হতেই তো পারে অপরাধী তার এই আপাতব্যাখ্যাহীন নৃশংসতার মধ্য দিয়েই একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে, হেঁয়ালির ছন্দটা কেউ মেলাতে পারে কিনা সেটাই দেখতে চায়। এও তো এক ধরণের মদমত্ততাই। এবার যদি মাৎসর্যের কথা ধরো…’

ব্যোমকেশ আরো কিছু বলিতে যাচ্ছিল, এমন সময়ে পুঁটিরাম ঘরে প্রবেশ করিল, ‘বাবু, তার।’

টেলিগ্রামটি পড়িতে পড়িতে ব্যোমকেশের চোখে যেন একপলকের জন্য ঝিলিক খেলিয়া গেল। পড়া হইয়া যাওয়ার পর টেলিগ্রামটি সামনের জলচৌকিতে রাখিয়া বলিল, ‘নাও, এক দিনে দু দুখানা রহস্য। এই না হা মক্কেল, যো মক্কেল করে কাঁদছিলে?’

টেলিগ্রামটি তুলিয়া দেখি জনৈক সুবিমল সান্যাল ব্যোমকেশের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করিয়াছেন। জানাইয়াছেন আজ শেষ অপরাহ্ণে দেখা করিতে চান।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘ভাবছি এখনই একবার কমিশনার সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আসি। যদি তদন্তের ভার নিতেই হয়, তাহলে বীরেনবাবুর থেকে সহযোগিতা যে নিতান্তই কাম্য সেটা সাহেবকে একবার মনে করানো দরকার।’

বলিলাম, ‘রামবাগানেও যাবে নাকি?’

ব্যোমকেশ বিমনা স্বরে বলিল, ‘হয়ত, হয়ত নয়। লালবাজার থেকে কি খবরাখবর পাওয়া যায় তার ওপর নির্ভর করছে সব কিছু।’

আমি আর বাক্যব্যয় না করিয়া লেখার খাতাটি টানিয়া লইলাম। অবস্থাগতিক যা দেখিতেছি, মাসাধিককাল হয়ত রাত্রে লেখালেখি করাই যাইবে না।

ব্যোমকেশের ফিরিতে ফিরিতে দুপুর গড়াইয়া বিকাল হইয়া গেল। জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কি বুঝলে? কূলকিনারা সম্ভব?’

ব্যোমকেশ গায়ের শালটি আলনায় রাখিতে রাখিতে বলিল, ‘লালবাজারের কারোরই মনে হয় না কূলে ওঠার বিশেষ ইচ্ছা আছে। গতিক যা দেখছি, হত্যাকান্ডের প্রকৃতিটি এত নৃশংস না হলে পুলিশ ভুলেও মাথা ঘামাত না।’

আমাকে বিস্মিত হতে দেখিয়া ব্যোমকেশ ততোধিক বিস্মিত হইল, ‘যুদ্ধের বাজার, তায় খুন হয়েছে রামবাগানের বারবধূ । তোমার আক্কেলকেও বলিহারি।’

হতাশ হইয়া বলিলাম, ‘তাহলে সারা সকালের খাটুনি নেহাতই পণ্ডশ্রম?’

ব্যোমকেশ একটা হাই তুলিয়া বলিল, ‘তা বলতে পারো। লালবাজার যা যা পণ্ড করে বসে আছেন, তাকে ঢেলে সাজাতে যথেষ্টই শ্রম দিতে হয়েছে আজকে। ভাবতে পারো তিনজনের একজনেরও নামধাম জানে না পুলিস?মানে রামবাগানের কোন কোঠায় তারা থাকত সেটুকু জানে, কিন্তু কবে তারা সেখানে এসেছে, কোথা থেকে এসেছে সে সব নিয়ে বিন্দুবিসর্গ ধারণা নেই কারোর।

মর্গে গিয়ে দেখি বীরেনবাবুর পর্যবেক্ষণও পুরোপুরি ঠিক নয়। ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোই যে শুধু বার করেছে তা নয়, বীভৎসতার চিহ্ন রয়ে গেছে চামড়ার ওপরেও। যেমন ধরো তৃতীয় ভিকটিমের অনামিকাটিও পাওয়া যাচ্ছে না, মৃতদেহ দেখে বুঝলাম সেটিও কেটেই নিয়ে গেছে।’

বিবমিষা বোধ হইল, বলিলাম, ‘কলকাতায় এই ঘোরতর উন্মাদটি কোথা থেকে এল ব্যোমকেশ? এরকম নরাধমও মানুষ হয়?’

ব্যোমকেশ কিছু বলিল না, শুধু দেখিলাম তার ললাটরেখায় কুঞ্চনের আভাস। এ সময়ে দরজার কড়া নড়িয়া উঠিল। মিনিট দুয়েক পরে পুঁটিরামের পিছন পিছন দোহারা গড়নের এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকিলেন, পরনে ধুতি পাঞ্জাবি, হাতে একটি পোর্টম্যান্টো। প্রথম দর্শনে ছাপোষা বাঙালিই বোধ হয়, যদিও পাঞ্জাবিতে লাগানো একাধিক সোনার বোতাম সাক্ষ্য দিতেছে যে এনার বিত্তটি নেহাত মধ্যমানের নয়। গৌরবর্ণ, বয়স মনে হয় ষাটের কম হইবে না।

পরিচয়পর্বের পর সুবিমল সান্যাল বলিলেন, ‘আশা করি আমার তার পেয়েছিলেন। ব্যোমকেশবাবুর অনুমতি ব্যতিরেকেই চলে এসেছি বলে ক্ষমা করবেন। কিন্তু এমন বিপদে পড়েছি যে অনুমতির জন্য অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। আপনার খবর আমাকে দিয়েছেন আপনার বন্ধু, প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত।’

ব্যোমকেশ একটা চেয়ার আগাইয়া দিয়া বলিল, ‘বসুন। একটু জিরিয়ে নিন, তারপর আপনার বিপদের কথা বিশদে শোনা যাবে।’

‘জিরোনোর সময় যদি থাকত ব্যোমকেশবাবু! প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছে অমিয়কে বুঝি আর দেখতে পাব না। মনকে প্রবোধ দেওয়ার শক্তিটুকুও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে।’

‘অমিয় কে হয় আপনার?’

‘অমিয় আমার ছেলে ব্যোমকেশ বাবু, এক মাত্র ছেলে। আজ এক সপ্তাহ হল সে নিরুদ্দেশ। নিরুদ্দেশ বলছি বটে, আসলে তাকে কেউ বা কারা অপহরণ করেছে।’

ব্যোমকেশ ধীরে ধীরে বলিল, ‘অপহরণ করেছে বুঝলেন কি করে? আপনি কি অনুমান করছেন?’

‘অনুমান নয় ব্যোমকেশ বাবু, এই দেখুন।’ সুবিমল বাবু পোর্টম্যান্টো হইতে একটি লেফাফা বার করিয়া ব্যোমকেশকে দিলেন।

ব্যোমকেশ লেফাফার ভেতরের কাগজটি আলোর সম্মুখে ধরায় অদ্ভুত ধাঁচের ট্যারাবেঁকা কিছু অক্ষরে কতকগুলি শব্দ ফুটিয়া উঠিল – ‘তিন দিনের মধ্যে তিরিশ হাজার টাকার বন্দোবস্ত করার জন্য প্রস্তুত হও, নইলে ইহজীবনে ছেলের মুখ আর দেখবে না।’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘এতে তো কোনো ঠিকানা নেই দেখছি। টাকা কি আদৌ পাঠিয়েছিলেন?’

‘অবশ্যই। ওরা আরেকটি চিঠিতে জানিয়েছিল লোহাপট্টির ভেতরের এক গলিতে টাকাটা নিয়ে সন্ধ্যা সাতটার সময় অপেক্ষা করতে হবে। আমার বিশ্বস্ত কাজের লোক মন্মথই নিয়ে গেছিল সে টাকা।’

ব্যোমকেশ শান্ত চক্ষে সুবিমলবাবু কে নিরীক্ষণ করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিল, ‘আপনার কি কোনো জ্ঞাত শত্রু আছে?’

সুবিমল সান্যাল কয়েক মিনিটের জন্য নীরব থাকিয়া বলিলেন, ‘ব্যোমকেশ বাবু – আমি ব্যবসায়ী, ঈশ্বরের দয়ায় আজ বেশ কিছু বছর ধরেই সে ব্যবসা ভালো চলছে। তাতে কার কার চোখ টাটিয়েছে সে কথা তো বলতে পারি না, তবে আমার জানা এমন কোনো লোক নেই যে এরকম ঘৃণ্য কাজ করতে পারে।’

‘কিসের ব্যবসা আপনার?’

‘কাঠের। আমি কিন্তু গরীব ঘরের ছেলে, অনেক কষ্ট করে এ জায়গায় পৌঁছেছি। আমার ভাগ্য খোলে বার্মায় কাঠের ঠিকাদারি করতে গিয়ে।’

‘বার্মা?’, ব্যোমকেশ চকিত স্বরে জিজ্ঞাসা করিল, ‘সে দেশে কত বছর ছিলেন?’

‘তা বছর দশেক তো হবেই। সে দেশ আমাকে দিয়েছে অনেক কিছুই আবার ছিনিয়েও নিয়েছে বই কি। আমার স্ত্রীকে রেঙ্গুনেই দাহ করে এসেছি। সে ছিল আমার ভাগ্যলক্ষ্মী, তার মৃত্যুর পরেই ঠিক করলাম আর নয়, এবার কলকাতায় ফিরতে হবে।’ বলিতে বলিতে সুবিমল সান্যালের গলাটি ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল।

ঘরের পরিবেশটি ভারী হইয়া উঠিয়াছিল, ব্যোমকেশই নীরবতা ভঙ্গ করিয়া বলিল, ‘কি হয়েছিল আপনার স্ত্রীর?’

‘প্লেগ ব্যোমকেশবাবু, সে মহামারীতে তখন রেঙ্গুন সহ সারা বার্মাতেই কাতারে কাতারে লোক মারা যাচ্ছিল। সর্বনাশী আমার পরিবারকেও ছাড়ল না। অমিয় তখন কলকাতায় কলেজে পড়ছে, প্লেগের জন্যই তাকে রেঙ্গুনে আসতে বারণ করে দিয়েছিলাম। মাকে শেষবারের জন্য দেখতেও পায়নি সে।’

অমিয়র প্রসঙ্গ উঠিতেই সুবিমলের চৈতন্য ফিরিল। ব্যোমকেশের হাত দুটি ধরিয়া বলিলেন, ‘টাকা দেওয়ার পর আরও চার দিন কেটে গেছে ব্যোমকেশ বাবু, অমিয়র এখনো কোনো খোঁজ নেই। তার মধ্যে আজ আবার চিঠি এসেছে, এবারে দাবী আরো তিরিশ হাজার টাকার। তিন দিনের মধ্যে জোগাড় করে দিতে হবে।’

ব্যোমকেশ ঈষৎ অবাক হইল, ‘বলেন কি, এক সপ্তাহের মধ্যে আবার তিরিশ হাজার টাকার দাবী? পুলিসে খবর বোধহয় দিয়ে উঠতে পারেন নি?’

সুবিমল সান্যাল মাথা নাড়িলেন, ‘বুঝতেই তো পারছেন। মা মরা একমাত্র ছেলে, তার সামান্যতম ক্ষতিটুকুও যাতে না হয় সে কথা আমাকে অনবরত ভাবতে হচ্ছে। পুলিসে খবর দিলে যদি হিতে বিপরীত হয়। সে জন্যই তো আপনার কাছে ছুটে আসা।’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘অমিয়র বন্ধু কেউ আছে? তার নিরুদ্দেশ হওয়ার কথা আরে কেউ জানে?’

সুবিমল বাবু একটু চিন্তা করিয়া বলিলেন, ‘আমি আর মন্মথ ছাড়া নিরুদ্দেশ হওয়ার খবর আর কেউ জানে না বলেই ধারণা। অমিয় ইদানীং আমার অফিসে বসত, ব্যবসার কাজের দেখাশোনা করত। সেরকম ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু আছে বলে তো জানি না, তবে সন্ধ্যার দিকে মাঝেমাঝে চৌরঙ্গী এলাকার একটি ক্লাবে যেত।’

‘অমিয়র কত বয়স এখন?’

‘পঁচিশ। আপনার জন্য ওর একটি ছবিও এনেছি, এই যে।’

ছবিটি এক ঝলক দেখে বোধ হইল অমিয়র মুখমন্ডলটিতে সামান্য বিষণ্ণতার ইঙ্গিত, উজ্জ্বল এক তরুন কিন্তু তার অন্তরে কোথাও যেন একটি চাপা বেদনা রহিয়া গিয়াছে। ব্যোমকেশ ছবিটি পকেটস্থ করিতে করিতে বলিল, ‘আপনার বাড়ি একবার যাওয়া দরকার সুবিমল বাবু। কাল সকালে একবার ঘুরে আসা যেতে পারে? আর হ্যাঁ, ঐ চিঠিটাও দিয়ে যান।’

‘অতি অবশ্য’, ভদ্রলোক হাঁফ ছাড়িয়া বলিলেন, ‘আমি পারলে এখনই আপনাদের নিয়ে যেতাম। কিন্তু একটু পরেই রাস্তাঘাটের আলো নিভে যাবে, গিয়ে কোনো সুবিধাও হবে না।অমিয়কে খুঁজে পাওয়ার দায়িত্বটি আপনাকে দিতে পেরে কি যে নিশ্চিন্ত বোধ করছি কি বলব।’

সুবিমল সান্যাল প্রস্থান করিলে ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘যুদ্ধের বাজারে শহর তো অপরাধের আখড়া হয়ে উঠল দেখছি।’

সারা দিনের শ্রান্তি ব্যোমকেশকে গ্রাস করিয়াছিল, চোখ বুজিয়া বলিল, ‘তাতে যে আমাদের খুব কিছু সুবিধে হল এমন কথা মোটেও ভেবো না।’

বলিলাম, ‘তার অর্থ?’

‘অর্থ এই যে সব অপরাধেরই সুরাহা হতে হবে এমন দিব্যি কেউ দেয়নি।’

পরের দিন সাতসকালে বাঁটুল সর্দার আসিয়া উপস্থিত। তাহাকে দেখিয়া প্রসন্ন বোধ না করিলেও বুঝিলাম ব্যোমকেশের কার্যসূত্রেই তাহার আগমন। বাঁটুলের গুন্ডামি আমাদের পাড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকিলেও উত্তর ও মধ্য কলিকাতার অপরাধ জগতের ঠিকুজী কুলুজী তার নখদর্পণে। ব্যোমকেশ তাহাকে যথারীতি সিগারেট ও চা সহকারে আপ্যায়ন করিল। সিগারেটের ঘ্রাণে দেখিলাম বাঁটুলের ধূর্ত মুখটিতে বিশেষ সন্তোষের উদয় হইল, পরে চায়ের পেয়ালাটি তুলিয়া লইয়া ব্যোমকেশকে বলিল, ‘আপনার কথামতন কালকে ও চত্বরে গেছিলাম কর্তা।’

ByomkeshHiRes003_Bantul

ব্যোমকেশ বাঁটুলের চোখে চোখ রাখিয়া বলিল, ‘কি খবর পেলে?’

‘খবর পাওয়া কি সোজা কথা, সবাই মুখে কুলুপটি আটকে বসে আছে। তার ওপর রামবাগানের দিকে বহুকাল যাওয়া হয়নি, এবারে গিয়ে দেখি কত যে নতুন মুখ। প্রতি দিন ভিড় বাড়ছে। গ্যাঁটের কড়ি কিছু ফেলতে হল, খবরও মিলেছে কিছু।

প্রথম জনের নাম কুন্তী, রামবাগানে এসেছিল বছর পাঁচেক আগে – মাঝ তিরিশেক বয়স। দ্বিতীয় জনের নাম রমলা, সে রামবাগানেরই মেয়ে। তার মা-ও ওখানেই থাকত, যদিও সে গত হয়েছে প্রায় বছরখানেক হল। রমলার বয়স তুলনায় কম, বছর কুড়িও নয়। আর তৃতীয় শ্যামা, বছর দুই-ও হয়নি ও চত্বরে, চল্লিশের ওপরে বয়স।’

ব্যোমকেশ একটু ভাবিয়া বলিল, ‘কুন্তী আর শ্যামা এর আগে কোথায় থাকত সে নিয়ে কিছু খবর পেলে?’

বাঁটুল সিগারেটে একটি সুখটান দিয়া বলিল, ‘কুন্তীর ব্যাপারে কোনো খবর পাওয়া যায়নি, শ্যামা এসেছিল সিলেট থেকে।’

‘আর কিছু?’

বাঁটুলের বর্তুলাকার চক্ষুদ্বয় কুঞ্চিত হইল, ব্যোমকেশের দিকে ঝুঁকিয়া বলিল, ‘ওই টাকায় আর কত খবর হয় কর্তা? মাগ্যিগন্ডার বাজার, বোঝেনই তো।’

ব্যোমকেশ সম্ভবত একথা শুনিবার জন্য প্রস্তুতই ছিল, শান্ত স্বরে বলিল, ‘টাকা পাবে। কিন্তু শর্ত আছে।’

বাঁটুল থমকাইয়া বলিল, ‘শর্তও আছে? আমি তো ভাবছিলাম আপনারই আমাকে দরকার।’

‘দরকার তো বটেই, তাই জন্যই আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে একবার ও তল্লাটে যেতে চাই।’

বাঁটুলের মুখে একটি বিচিত্র হাসি ফুটিয়া উঠিল। সামান্য ব্যঙ্গের স্বরেই বলিল, ‘আপনারা ভদ্রলোক, ও তল্লাটে গেলে কি ভালো দেখায়?’

দেখিলাম ব্যোমকেশের মুখের একটি মাংসপেশিও নড়িল না, সামান্য কঠিন স্বরে বলিল, ‘বদনাম রটলে তোমাকে সালিশির জন্য ডাকব না বাঁটুল। আজকে সন্ধ্যাবেলাই যাওয়া চাই।’

ব্যোমকেশের দৃঢ় কন্ঠস্বরে বাঁটুল অপ্রস্তুত হইয়াছিল, সন্ধ্যাবেলায় হাজিরা দিবে স্বীকার করিয়া বিদায় লইল। আমি মুখ খুলিবার আগেই ব্যোমকেশ হাসিয়া উঠিল, ‘তোমার মুখের চেহারাটা দেখার মতন হয়েছিল অজিত। বাঁটুল যে তোমার ঠিক প্রীতির পাত্র নয় তা জানি বটে তবে আজ তোমার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল পারলে দু’ঘা কষিয়ে দাও।’

‘ট্যারাব্যাঁকা কথাগুলো শুনলে না? আমার তো গা জ্বলে গেল রীতিমতন।’

ব্যোমকেশ হাসিতে হাসিতেই বলিল, ‘ট্যারাব্যাঁকা নয় হে, ও ওর মতন করে সোজাসুজি কথাই বলেছে। তোমার মার্জিত রুচির সঙ্গে সে কথা খাপ খায় না বটে, কি আর করা।’

আমি একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়িয়া বলিলাম, ‘ক্লাস ডিফারেন্সকে আর অস্বীকার করি কি করে বলো?’

ব্যোমকেশ তড়াক করিয়া উঠিয়া আলমারি থেকে একটি ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি বাহির করিল, ‘ক্লাস ডিফারেন্সের কথা মনে করিয়ে ভালো করলে।’

আমার বিস্ময়মিশ্রিত দৃষ্টি দেখিয়া বলিল, ‘সুবিমল সান্যাল এককালে গরীব ছিলেন বলে এখনো ওনাকে সমতুল্য মনে করছ নাকি?’

গতদিনই সুবিমল সান্যালের সাজসজ্জা দেখিয়া একটা আঁচ পাইয়াছিলাম। কিন্তু আজ বিডন স্ট্রীটের মোড়ে তাঁর প্রাসাদোপম বাড়িটি দেখিয়া হতবাক হইয়া গেলাম। ব্যোমকেশ দরোয়ানকে দিয়া এত্তেলা পাঠাইতেছিল, দরোয়ান যাওয়ার পর বলিলাম, ‘এ বাড়ির ছেলেকে ধরবে না তো কাকে ধরবে বলো দিকিন?’

ব্যোমকেশ চাপা স্বরে বলিল, ‘হুম, বার্মাফেরত ভাগ্যলক্ষ্মীটি ঝাঁপি একেবারে উপুড় করে দিয়েছেন।’

কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুবিমল সান্যাল আসিয়া অভ্যর্থনা জানাইলেন। ভদ্রলোকের চোখ দুটি রক্তাভ, স্লিপিং গাউনটি ছাড়ার সুযোগ পাননি, মুখটি যেন আজ আরো শুষ্ক দেখাইতেছে। ব্যোমকেশ ধীরস্বরে বলিল, ‘যদি অসুবিধা না থাকে তাহলে অমিয়র ঘরটি একবার দেখতে চাই।’ সুবিমল ক্লান্ত স্বরে সম্মতিজ্ঞাপন করিলেন।

অমিয়র ঘরটি দ্বিতলে অবস্থিত, ছিমছাম এবং বেশ পরিপাটি করিয়া সাজানো। একটি বুক শেলফও আছে, সেখানে দর্শন এবং গণিতের কিছু ভারী ভারী বইয়ের পাশে আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যর বইও নজরে আসিল। ব্যোমকেশ অমিয়র পড়ার টেবিলটি দেখিতেছিল, সেখানেও কিছু বই, কিছু কাগজপত্র। ব্যোমকেশ একটি বই হাতে তুলিয়া লইয়া দেখিতেছিল, নাম দেখিয়া বুঝিলাম প্লেগের চিকিৎসা নিয়ে লেখা। সুবিমলও আমাদের সঙ্গে ঘরে প্রবেশ করিয়াছিলেন, ব্যোমকেশ তাঁর দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাইয়া বলিল, ‘এ বইটি দেখছি অমিয় বেশ মন দিয়েই পড়েছে, জায়গায় জায়গায় পেন্সিলের দাগ। প্লেগ নিয়ে কেন চর্চা করছিল তা কিছু জানেন?’

সুবিমল সামান্য চমকিত হইলেন, তারপর মাথা নাড়িলেন, ‘সে তো ঠিক জানি না। তবে আপনাকে বলেছিলাম যে ওর মা প্লেগে মারা গেছিলেন, সেই সূত্রেই বোধ করি ওই রোগ নিয়ে পড়াশোনা করছিল।’

ব্যোমকেশ সম্মতিসূচক মাথা নাড়িল। টেবিলের লাগোয়া একটি দেরাজ, সেটির মধ্যে এক ঝাঁক হ্যান্ডবিল এবং রসিদ দেখা গেল। ব্যোমকেশ রসিদগুলো তদগত চিত্তে উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখিতেছিল। আচমকা প্রশ্ন করিল, ‘দেবদত্ত সাধুখান নামে কাউকে চেনেন নাকি?অমিয় এনাকে বেশ কিছু টাকা দিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে, অন্তত রসিদ তাই বলছে দেখছি।’

সুবিমলের মুখে দেখিলাম যথেষ্ট বিরক্তির উদ্রেক ঘটিল। ‘চিনি বই কি’, কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া সুবিমল বলিলেন, ‘আপনার কাছে লুকোব না ব্যোমকেশ বাবু। সম্প্রতি অমিয়র স্বভাবচরিত্রে কিছু পরিবর্তন এসেছিল, যার ফলে বাবা ছেলের স্বাভাবিক সম্পর্কটি কিছুটা হলেও নষ্ট হয়েছে। এবং সেটার জন্য পুরোপুরি দায়ী এই লোকটি, দেবদত্ত।’

ব্যোমকেশ চকিত হইয়া বলিল, ‘আর একটু বিশদে আলোকপাত করতে পারেন?’

‘এই দেবদত্তের সঙ্গে আমার ছেলের আলাপ রীগ্যালে, চৌরঙ্গীর এই ক্লাবটিতে ও যেতে শুরু করে গত বছরের শুরুর দিকে। শুরু শুরুতে সামান্য গানবাজনা, একটুআধটু টেনিস খেলা এইসবই করত। বিকাল সন্ধ্যা নাগাদ যেত, ঘন্টা দুই আড়াই কাটিয়ে চলে আসত। বছরখানেক আগে থেকে লক্ষ্য করলাম অমিয়র মাঝে মাঝেই বাড়ি ফিরতে বেশ দেরি হচ্ছে, দু’একদিন তো ফিরল প্রায় মাঝরাতের পর। প্রথম প্রথম প্রশ্ন করলে একটু বিব্রত হত, এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। তখনই জেনেছিলাম দেবদত্তই ওকে নিয়ে নানা পাড়ায় ঘুরতে যেত। বাপের মন বুঝতেই পারছেন, নানারকম চিন্তা আসত। কিন্তু ওকে বিব্রত হতে দেখে খুব কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতাম না। যত দিন যেতে লাগল, বিব্রতবোধটা কেটে গিয়ে যেন একটা ঔদ্ধত্য চাগাড় দিতে লাগল, তারপর একদিন…’ সুবিমলকে সামান্য দিশাহারা লাগিল, যেন মনস্থির করিতে পারিছেন না কথাটা আমাদেরকে বলিবেন কিনা।

খানিক চুপ থাকিয়া, সামান্য ধরা গলায় ফের বলিলেন, ‘একদিন ফিরল ভোররাতে, সম্পূর্ণ মাতাল হয়ে। আমি জেগেই ছিলাম। অমিয়র অবস্থা দেখে গা জ্বলে গেল, কিছু কড়া কথা শোনালাম। জীবনে এই প্রথমবার অমিয় আমার ওপর গলা চড়াল। কি বলব ব্যোমকেশবাবু, চাকর বাকরদের সামনে আমার মাথা কাটা গেছিল সেদিন। সবার সামনে চেঁচিয়ে জানাল সারা রাত সে কোথায় কাটিয়েছে, সে খারাপ জায়গার নাম আমি মুখেও আনতে চাই না। আরো কত যে অকথা কুকথা, সে সব আর নাই বা বললাম। সেদিনের পর থেকে আমিও আর কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করি নি ওকে, বাড়ি থেকে কখন বেরোত কখন ঢুকত সে সব নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। বলতে গেলে সেদিনের পর থেকে ওর সঙ্গে আমার আর ভালো করে কথাবার্তাই হয়নি। হয়ত আমারই দোষ, বাপের অহঙ্কার ত্যাগ করে আরেকবার ওর সামনে দাঁড়ালে আজ ওকে হয়ত হারাতে হত না।’

ব্যোমকেশ সহানুভূতিশীল কন্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, ‘এটি কতদিন আগের কথা?’

‘তা ধরুন, মাস তিনেক তো হবেই।’

সুবিমল দাঁতে দাঁত চাপিয়া বলিলেন, ‘ওই দেবদত্ত স্কাউন্ড্রেলটির পাল্লায় না পড়লে এসব কিছুই হত না। আর আপনি তো নিজের চোখেই দেখলেন কিভাবে অমিয়র মাথা মুড়িয়ে চলেছিল। যত টাকা সে নিয়েছে অমিয়র থেকে তার পুরো হিসেবও বোধহয় নেই। কতবার যে বারণ করলাম ওকে, নিজের ছেলে না শুনলে আর কি করব।’

 

‘আপনি দেবদত্তকে দেখেছেন?’

‘হ্যাঁ, একবারই দেখা হয়েছিল। অমিয়ই নিয়ে এসেছিল ওকে এ বাড়িতে। প্রথম দর্শনেই আমার এত বিতৃষ্ণা জেগেছিল যে পরে লোকটি এ বাড়িতে এলেও আমি আর দেখা করিনি।’

ব্যোমকেশ হাতঘড়ির দিকে এক ঝলক দেখিয়া বলিল, ‘এ মুহূর্তে আর কোনো প্রশ্ন নেই, তবে হয়ত দু’এক দিনের মধ্যেই আপনার বাড়িতে একবার ফেরত আসতে হবে। ভালো কথা, ওই প্লেগের বইটি আমি নিয়ে যাচ্ছি। আশা করি আপনার অসুবিধা নেই।’

‘স্বচ্ছন্দে নিয়ে যান। কিন্তু কি বুঝছেন ব্যোমকেশবাবু? অমিয়কে কি ভাবে ফিরে পাব?’

ব্যোমকেশ অন্যমনস্ক স্বরে বলিল, ‘এই মুহূর্তে কিছু বলা মুশকিল। কিছু জায়গায় যাওয়া দরকার, আরো খোঁজখবর চাই।’

সুবিমল সান্যাল সামান্য আশাহত স্বরে বলিলেন, ‘দেখুন কি করতে পারেন। মনে হচ্ছে পরের কিস্তির টাকার ব্যবস্থাও করতেই হবে, দু’দিনই যা সময়।’

ব্যোমকেশ আর বাক্যব্যয় না করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। সিঁড়ি দিয়া নামিতে যাইবার মুখে হঠাৎ সুবিমলের দিকে ফিরিয়া বলিল, ‘ভালো কথা। দ্বিতীয় যে চিঠিটি আপনার কাছে এসেছিল সেটি একবার দেখাতে পারেন?’

‘হাতের কাছে তো নেই। আমি আপনার বাড়িতে আজ বিকালের মধ্যে পাঠিয়ে দেব।’

 

বাড়ি ফিরিয়া ব্যোমকেশের সেই নিশ্চল সমাহিত রূপটি আবার জাগ্রত হইল। দ্বিপ্রহরে আহারাদির সময়টুকু বাদ দিয়া তাহার সহিত আর বিশেষ কথোপকথন হইল না। পাঁচটার দিকে আমার ঘরে আসিয়া বলিল, ‘ওহে, এবার তো গাত্রোত্থান করতে হয়।’ শীতের দুপুরে দিবানিদ্রা দেওয়া ইস্তক শরীরটি খুব একটা জুতের ঠেকিতেছিল না, পুঁটিরাম আনীত এক পেয়ালা চায়ে চুমুক দিয়া শুধাইলাম, ‘সেই তো সন্ধ্যাবেলায় বাঁটুলের সঙ্গে যেতে হবে রামবাগানে। এই অবেলায় আবার টানাটানি কেন?’

ব্যোমকেশ পায়চারি করিতে করিতে বলিল, ‘দু’খানা কেস একসঙ্গে চলছে, সেই হিসাবে এটুকু দৌড়োদৌড়ি তো নস্যি। তবে আমার ধারণা ভাগ্য সহায় থাকলে এই সময়টাতেই দেবদত্তর সঙ্গে দেখা হতে পারে’, আমার দিকে চোরা কটাক্ষ হেনে বলিল, ‘সবাই তো আর শীতের দুপুর বিকেলটা ঘুমিয়ে কাটায় না।’

অগত্যা উঠিতেই হইল। জানালা দিয়া শীতের অপরাহ্ণের মিঠে রোদ আসিতেছিল, ভাবিতেছিলাম বারান্দায় আর এক কাপ চা লইয়া বসিব, সে বাসনা আপাতত জলাঞ্জলি।

চৌরঙ্গীর পৌঁছইবার পর ক্লাব রীগ্যাল খুঁজিয়া পাইতে আদপেই অসুবিধা হইল না। গ্র্যান্ড হোটেলকে বাঁয়ে রাখিয়া হগ সাহেবের মার্কেটের দিকে যাওয়ার পথে ডান দিকের একটি গলির মধ্যে পড়ে। বাহির থেকে বিশেষ কিছু না বোঝা গেলেও ভেতরে ঢুকিলে স্পষ্টই বোঝা যায় সমাজের উচ্চকোটি মানুষ ব্যতীত বাকিদের এ চত্বরে ঢোকা সহজ হইবে না।

ব্যোমকেশ আসিবার পূর্বে ফোন করিয়া ম্যানেজারকে তার আসার অভিপ্রায়টুকু জানিয়েছিল, তাই ঢুকিয়ে কোনো সমস্যা হইল না। ম্যানেজারটিও দেখিলাম বাঙালি, ত্রিদিবেন্দ্র মজুমদার। ত্রিদিবেন্দ্র জানিতেন না অমিয় নিরুদ্দেশ হইয়াছে, খবর পাইয়া অতীব বিস্মিত হইলেও প্রতিশ্রুতি দিলেন তদন্তের কাজে যথাসাধ্য সাহায্য করিবার। ত্রিদিবেন্দ্রর সঙ্গে কথা বলিয়া বুঝিলাম ক্লাবের মধ্যে অন্তত অমিয় কখনই বেচাল কিছু ঘটায়নি, মোটের ওপর সদস্যরা অমিয়র আচারব্যবহারে বেশ প্রীতই বলা যায়।

ব্যোমকেশ একটি আরামকেদারায় বসিয়া সিগারেট ধরাইয়াছিল। খান দুই লম্বা লম্বা টান দিতে দিতে ত্রিদিবেন্দ্রকে শুধাইল, ‘কিন্তু অমিয়র ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে বোধ হয় কেউই নেই, তাই না?’

ত্রিদিবেন্দ্র অল্প ভাবিত মুখে বলিলেন, ‘সে কথা এক প্রকার সত্যি। তবে সবার সঙ্গে পরিচিতি না থাকলেও অন্তত এক জন সদস্যর সঙ্গে অমিয়র কিছুটা অন্তরঙ্গতা ছিল বলেই আমার ধারণা।’

‘কে বলুন তো?’

‘দেবদত্ত সাধুখান। বাগবাজারের বনেদী বাড়ির ছেলে ইনি।’

ব্যোমকেশ ভাবলেশহীন মুখে বলিল, ‘ওহ, তাই নাকি? তা ইনি কি করেন?’

ত্রিদিবেন্দ্র ঈষৎ হাসিয়া কন্ঠস্বরটি খাদে নামাইলেন, ‘তিন চার পুরুষের ব্যবসা মশাই, তবে দেবদত্তর পরের প্রজন্মের জন্য সে ব্যবসা টিঁকে থাকবে কিনা কে জানে। অবশ্য যা হালচাল তাতে পরের প্রজন্ম আদৌ আসে কিনা…’ বলিতে বলিতে ভদ্রলোকের বোধহয় খেয়াল হইল যে প্রথম আলাপচারিতার হিসাবে কিছু বেশীই খবর ফাঁস হইয়া যাইতেছে। নিজেকে সামলাইয়া লইয়া বলিলেন, ‘সে কথা যাক গে। আপনারা কি দেবদত্তর সঙ্গে কথা বলতে চান?’

ব্যোমকেশ সচকিত হইয়া বলিল, ‘তিনি এ মুহূর্তে ক্লাবেই নাকি?’

ত্রিদিবেন্দ্র হাসিয়া উঠিলেন, ‘বলেন কি ব্যোমকেশ বাবু। শীতসন্ধ্যার ছ’টা বাজতে যায়, দেবদত্ত ক্লাবের বারে না এসে কি বাড়ির বৈঠকখানায় বসে চা খাবে? আসুন এদিকে।’

দেবদত্ত সাধুখান যে একটি দ্রষ্টব্য বিশেষ তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ক্লাবের প্রায় সব সদস্যই সাহেবী বেশভূষা পরিহিত, এবং বোঝাও যাইতেছে যে তাঁরা সে পোশাকেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। দেবদত্তর পোশাক বাকিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তার পরনে গিলে করা পাঞ্জাবি এবং চুনোট ধুতি। দুই হস্তের একাধিক অঙ্গুলিতে মূল্যবান কিছু আংটি দেখিতে পাওয়া গেল, বাম হস্তে একটি ততোধিক দামী ছড়ি।

দূর থেকে মনে হইল লোকটি বাকচতুরও বটে, এমন রঙ্গপরিহাস চলিতেছিল যে উপস্থিত বাকি সভ্যরা হাস্যতাড়নায় প্রায় কাতরাইতে শুরু করিয়াছিলেন। এমন সময় ত্রিদিবেন্দ্র যাইয়া দেবদত্তর কানে কানে কিছু বলিলেন। দেবদত্ত তার গল্প থামাইয়া আমাদের দিকে তাকাইয়া দেখিল, মনে হইল মুখে হাসির একটা আভাস পাইলাম।

ব্যোমকেশ কৌতুকপূর্ণ স্বরে বলিল, ‘দশ টাকা বাজি, এ লোক খালি গ্লাস নিয়ে আমাদের সামনে আসবে না।।’

গ্লাস দূরস্থান, দেবদত্তের হস্তে ছড়ি ব্যতীত অন্য কিছু না দেখিয়া ব্যোমকেশের কাছে টাকা দাবী করিতে যাইতেছিলাম। শেষ মুহূর্তে দেখি তার গতিপথ বদলাইয়া গিয়াছে। একটি বেয়ারা ট্রে ভর্তি করিয়া সুরাসামগ্রী নিয়া আসিতেছিল, দেবদত্ত সেখান থেকেই একটি গ্লাস প্রায় ছোঁ মারিয়া তুলিয়া লইল।

ব্যোমকেশ মৃদু হাসিল।

Pic004A_Debdutta_03

‘শুনলাম আপনারা আমার খোঁজেই এসেছেন?’ দেবদত্ত ফিরিয়া আসিয়াছে।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘ঠিক আপনার খোঁজে নয়। ত্রিদিবেন্দ্রবাবু আশা করি আপনাকে বলেছেন যে অমিয়কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে ব্যাপারেই আসা, এসে শুনলাম এ ক্লাবে অমিয়র ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে এক আছেন আপনিই। তাই ভাবলাম আপনার সঙ্গেও একবার কথা বলে দেখা যাক।’

দেবদত্তর মুখে একটি বক্রহাসি ফুটিয়ে উঠিল, ‘আর অমিয়কে খুঁজে বার করবে কে শুনি? আপনি? গোয়েন্দা নাকি?’

ব্যোমকেশ অনুত্তেজিত গলায় বলিল, ‘গোয়েন্দা শব্দটি নিয়ে আমার বিশেষ আপত্তি আছে। আমি নিজেকে সত্যান্বেষী বলিয়া পরিচয় দিই। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী।’

দেবদত্তর মুখের হাসিটি চওড়া হইয়া উঠিল, ‘তা সত্যের অন্বষণে বেরিয়ে মিথ্যা কথা বলাই কি আপনার দস্তুর?’

‘কি বলতে চান আপনি?’

‘আপনি কি বলতে চান ব্যোমকেশ বাবু? এই যে অমিয়র বাবার কাছ থেকে আপনি আমার ব্যাপারে কোনো কথাই শোনেন নি, ক্লাবে আসার পর তবেই আমার ব্যাপারে জেনেছেন?’

আমি প্রমাদ গণিলাম। ব্যোমকেশ অবশ্য এখনো উত্তেজিত হইল না, শান্ত ভাবেই বলিল, ‘হয়ত আপনার নামটাই শুনেছি। কিন্তু চোখে না দেখা অবধি তো জানা যাবে না আপনি আসলে কে। সত্য অন্বেষণের জন্য চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করাটাও দস্তুর বই কি।’

‘বটে!’, দেবদত্ত বলিল, ‘তবে সে কথা আমিও মানি। কোনোরকম প্রি-কনসিভড নোশনস আমিও রাখতে চাই না। তাই অমিয় যখন বলেছিল সে কত দুঃখে আছে, তার কথা আমি মানিনি। তার বাড়ি না গিয়ে, তার বাবাকে না দেখে আমি তার কথা বিশ্বাস করতে চাইনি। কিন্তু যে মুহূর্তে দেখলাম তাতে মনে হল একাকীত্বর নরকযন্ত্রণা থেকে ছেলেটিকে মুক্তি দিতে হবেই, নাহলে সে পাগল হয়ে যাবে।’

ব্যোমকেশ দেবদত্তর পানে কিছুক্ষণ ভ্রূ তুলিয়া চাহিয়া রহিল। মিনিটখানেক পর গম্ভীরস্বরে জিজ্ঞাসা করিল ‘অমিয়র দুঃখে আপনি এত কাতর হয়ে পড়েছিলেন জেনে ভালো লাগল। কিন্তু তার দুঃখ ঘোচাতে গিয়ে নরকের আর কোন কোন দ্বার খুলেছেন আপনি?’

দেবদত্ত ব্যোমকেশের কথায় অট্টহাস্য করিয়া উঠিল। তার কাপ্তান ভাবটি সরিয়া গিয়াছিল, মুহূর্তের জন্য একটি ইতর মানুষকে চোখের সামনে দেখিতে পাইলাম। ‘অত খবরে আপনার দরকার কি ব্যোমকেশ বাবু? সত্যসন্ধানের অছিলায় সে কুহক পৃথিবীর সব খবর মাগনা পেয়ে যাবেন তাও কি হয়? প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও অমিয় ছিল দুধের শিশু, তাকে আমি দুনিয়াটা চিনিয়ে দিয়েছি মাত্র।’

দেবদত্তর চোখের ইশারায় এবার একটি কুশ্রী ইঙ্গিত ধরা পড়িল, ‘ব্যাচেলর নাকি মশায়? যদি নিতান্তই চান তবে সে সুলুকসন্ধান আপনিও পেতে পারেন বই কি, তবে কমিশনটুকু দিতে হবে।’ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ এবং তর্জনীর সাহায্যে একটি বিশেষ মুদ্রা দেখাইল, দেখিলাম দেবদত্তর মুখে সেই কদর্য হাসিটুকু এখনো লাগিয়া রহিয়াছে।

রাগে আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করিতেছিল, ব্যোমকেশ নিতান্তই স্বাভাবিক গলায় বলিল, ‘বৈতরণী যে বিনামূল্যে আপনি পার করান না সে খবর আমি জানি দেবদত্তবাবু। অমিয়র দেরাজে রসিদের পর রসিদ আমাকে সে কথাই বলেছে।’

দেবদত্তর মুখ হইতে সমস্ত ব্যঙ্গবিদ্রূপের চিহ্ন সরিয়া গেল, তীব্র আক্রোশে সে বলিয়া উঠিল, ‘আপনি কি আমাকে জোচ্চোর ঠাউরেছেন নাকি? জোচ্চোর হলে কোথায় পেতেন ওসব রসিদ? অমিয় নিজেই রসিদ লিখতে অস্বীকার করেছে। কিন্তু আমার পাকা কাজ। আর টাকা নেব নাই বা কেন? দিনের পর দিন রামবাগানে যে মেহফিল আর মদের আসর বসেছে তার খরচ কে দেবে? অমিয়র বাপ? তখন তো সে সব টাকা আমার পকেট থেকেই গেছে।’

ত্রিদিবেন্দ্র দূর থেকে আমাদের লক্ষ্য করিতেছিলেন, মনে হইল গন্ডগোলের একটা আঁচ পাইয়া তিনি এদিক পানে আসিতেছেন।

ব্যোমকেশের মেজাজের বলিহারি যাই, সামান্যতম চঞ্চলতা প্রকাশ না করিয়া বলিল, ‘রামবাগানের কোথায়?’

‘কোথায় নয়? যান যান, নিজে খুঁজগে যান। যত্তসব, এই বলে দিলাম অমিয়কে খোঁজার সাধ্যি আপনার সাত পুরুষের নেই।’

ত্রিদিবেন্দ্র আসিয়া পড়িয়াছিলেন, আমরা ধন্যবাদজ্ঞাপন করিয়া বাহিরে আসিলাম। সভ্যরাও একে একে বাহিরে আসিতেছিলেন, ব্ল্যাক আউটের জন্য সন্ধ্যা থেকেই ক্লাবে তালাচাবি পড়বে। ভাগ্যে ব্যোমকেশ বিকাল বিকাল টানিয়া আনিয়াছিল।

চৌরঙ্গী থেকে একটি ট্যাক্সি পাইয়া গেলাম। বিডন স্ট্রীটে আসিয়া অবশ্য গাড়িটি ছাড়িয়া দিতে হইল। শহর কলিকাতায় অকালরাত্রি ঘনাইয়া আসিতেছে, অন্ধকারের মধ্যে গাড়িঘোড়া আপাতত চলিবে না।

 

বিডন স্ট্রীট থেকে রামবাগান হেঁটে যাওয়ার পথে ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘এই কেসেও দেখি রামবাগানের একটা ভূমিকা আছে।’

ব্যোমকেশ শালটি ভালো করিয়া জড়াইতে জড়াইতে বলিল, ‘কাকতালীয় বলেই মনে হয়। বাঁটুল বলছিল বটে যুদ্ধের দরুণ অগুন্তি ভদ্র ঘরের মেয়েকে এই রামবাগানের পথে পা বাড়াতে হয়েছে, হয়ত সে কারণেই দেবদত্ত বা অমিয়র মতন পয়সাওলা বাড়ির ছেলেদেরও এদিকে আনাগোনা বেড়েছে।’

মনটি আর্দ্র হইয়া উঠিয়াছিল, ভাবিতেছিলাম কি গতিক বাংলার এই হতভাগিনীদের। ব্যোমকেশকে প্রশ্ন করিলাম, ‘যুদ্ধ শেষ হলে কি অবস্থা ভালো হবে বলে মনে হয়?’

আবছা অন্ধকারে ঠিক ঠাহর করিতে পারিলাম না কিন্তু মনে হইল ব্যোমকেশের মুখেও একটা বেদনার ছাপ পড়িয়াছে। শুধু বলিল, ‘যুদ্ধ কবে শেষ হয় দেখো আগে। মজুতদাররা যে ভাবে ফুলে ফেঁপে উঠছে, যুদ্ধের পরেও মনে হয় না বাংলার অনটন সহজে ঘুচবে।’

রামবাগানের মুখটিতেই একটি ছায়ামূর্তি দাঁড়াইয়াছিল, আমরা অগ্রসর হইলে সে চাপা গলায় হাঁক দিল, ‘কর্তা নাকি?’

‘কে, বাঁটুল?’

বাঁটুলই বটে। মুখ থেকে চাদর সরাইয়া উত্তেজিত স্বরে বলিল, ‘আজ্ঞে, আমিই। জব্বর খবর আছে। টর্চ আছে আপনাদের কাছে? এই দেখুন।’

মনে হইল বাঁটুল ব্যোমকেশের হস্তে একটি চিরকুট ধরাইল। আমরা তিনজন রাস্তার একপ্রান্তে সরিয়া আসিলাম। খোলা নালার গন্ধে এক মুহূর্ত টেঁকা দায়, ঘিঞ্জি জায়গায় মশককুলও রীতিমতন আক্রমণ শানাইতেছে কিন্তু চিরকুটে কি লেখা তা দেখিবার উত্তেজনায় সেসব সমস্যা গ্রাহ্য করিলাম না। ব্যোমকেশ সন্তর্পণে টর্চটি জ্বালাইয়াছিল, দেখিলাম মেয়েলী হাতে গোটা গোটা ছাঁদে লেখা, ‘বাবুকে বোলো খুনের খবর আমার কাছে আছে।’

ব্যোমকেশ মুখ তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘এ চিরকুট তোমার কে দিয়েছে?’

‘যে দিয়েছে তার কাছেই আপনারা যাবেন এখন’, বলিতে বলিতে বাঁটুল মুখ দিয়া একটি তীক্ষ্ণ শিস্ বাহির করিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে বাঁটুলের যে চ্যালাটি উদয় হইল অন্ধকারে তার মুখ স্পষ্ট দেখিতে না পাইলেও উচ্চতা দেখিয়া বুঝিলাম বছর সাত আটের বেশি তার বয়স নয়।

‘যাঃ, বাবুদের জলদি সেই বাড়িতে নিয়ে যা।’

আমি তড়িঘড়ি প্রশ্ন করিলাম, ‘আর তুমি?’

অন্ধকারে মনে হইল হাসির আওয়াজ হইল, ‘আমিও আসছি বাবু, আপনাদের পেছনেই।’

রামবাগানের বস্তির গোলকধাঁধার মধ্য দিয়ে চক্কর কাটিতে কাটিতে একটি দ্বিতল বাড়ির সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। বাড়িটি দ্বিতল হইলেও অন্ধকারেও বোঝা যাইতেছে প্রায় পোড়ো দশা। গলিঘুপচির মধ্যে এর আগে প্রায় নিভু নিভু কুপির আলো দেখা যাইতেছিল, চাপা স্বরে দরাদরিও কানে আসিতেছিল, কিন্তু বস্তির এই শেষ প্রান্তের নিস্তব্ধতা প্রায় অপ্রাকৃতিক। বাড়ির সম্মুখের দরজাটি খোলাই ছিল, ছেলেটি ইশারায় আমাদের ঢুকিতে বলিয়া চলিয়া গেল। এতক্ষণ পেছন পেছন বাঁটুলের পায়ের শব্দ পাইতেছিলাম, সে শব্দটিও বিলীন হইয়াছে।

বাড়িটিতে প্রবেশ করিয়া স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া পড়িলাম দু’জনে। অন্ধকারের প্রচন্ডতা মনে হইল ব্যোমকেশকেও কিয়ৎক্ষণের জন্য বিহ্বল করিয়া তুলিয়াছিল। মিনিট কয়েক পরে চোখ ধাতস্থ হইয়া আসিলে বুঝিলাম সামনেই একটি সিঁড়ি, সে সিঁড়ি বাঁকিয়া আমাদের মাথার ওপর দিয়েই দ্বিতলে উঠিয়া গিয়াছে। আমি অগ্রসর হইতে যাচ্ছিলাম, ব্যোমকেশ আমার হাত ধরিয়া নিবৃত্ত করিল। তারপর কন্ঠস্বরটি উচ্চগ্রামে তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘কেউ আছেন?’

কোনো উত্তর আসিল না।

ঘড়ির রেডিয়াম ডায়ালটি তুলিয়া দেখিলাম সাতটা বাজিয়া গিয়াছে। ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘বাঁটুল সরে পড়ল কেন বলো তো? ওই লোকটিকে আমি আদৌ বিশ্বাস করি না।’

সিঁড়ির নীচের ঘনীভূত অন্ধকারে ব্যোমকেশকে দেখিতে পাইলাম না, শুধু তার হাসির শব্দ ভাসিয়া আসিল। ‘বাঁটুল সরে পড়ায় তোমার তো খুশী হওয়াই উচিত ছিল অজিত, কিন্তু তা তো হল না। মনে হচ্ছে রামবাগানের এই পোড়োবাড়ির একতলায় তার সান্নিধ্য পেলে আরেকটু নিশ্চিন্ত থাকতে পারতে, নয় কি?’

আমি ক্ষীণ প্রতিবাদ করিতে যাচ্ছিলাম, এমন সময়ে সিঁড়ির উপর থেকে রিনিঠিনি আওয়াজ আসিল। মুহূর্তখানেকের মধ্যে আমাদের চোখের সামনে একটি কালিধরা লন্ঠন দেখা দিল, সিঁড়ির একধাপ উপর হইতে নরম স্বরে প্রশ্ন আসিল, ‘ব্যোমকেশ বাবু?’

ব্যোমকেশ নিজ পরিচয় স্বীকার করিতে প্রশ্নকারিণী লন্ঠনটি সামান্য নত করিল। লন্ঠনের সামান্য আলোতেই তার মুখটি ঘরের ছায়ান্ধকারকে উদ্ভাসিত করিয়া উঠিল। কাজলপরা চোখটি আমাদের দিকেই তাকিয়ে, সে চোখে না দেখিলাম ছলনা, না পাইলাম চটক। নিলাজ চোখে শুধু ধরা পড়েছে প্রচ্ছন্ন আশঙ্কা। রামবাগানের মলিন পরিবেশে এমন অকপট সৌন্দর্য দেখিতে পাওয়ার সম্ভাবনা ব্যোমকেশের মনেও ছিল না, তরুণীকে প্রতিপ্রশ্ন করিতে তারও দেখিলাম কিছু সময় লাগিল।

ByomkeshHiRes004B_Kuhu

‘আপনিই চিরকুটটি পাঠিয়েছিলেন?’

তরুণী বলিল, ‘হ্যাঁ পাঠিয়েছি। আপনারা উপরে উঠে আসুন, তারপর বিশদে বলছি।’

অতি পুরানো বাড়ি, সঙ্কীর্ণ বারান্দাটি দেখলেই বোঝা যায়। তরুণীর লন্ঠনের আলোয় দেখিলাম সারি সারি দরজা, প্রতিটিতেই বাইরে থেকে তালা ঝুলিতেছে। বারান্দার শেষে একটি বড় ঘর, একমাত্র সেটিই উন্মুক্ত রহিয়াছে। সেখানে ঢুকিবা মাত্র একটি ভ্যাপসা গন্ধ নাকে আসিয়া প্রবেশ করিল, শীতকাল হইলেও ঘরটি যেন অতিমাত্রায় স্যাঁতসেঁতে। খান দুই চেয়ার রহিয়াছে, মেঝেতে একটি মাদুর পাতা। তরুণী মেঝের উপরে লন্ঠনটি রাখিয়া বলিল, ‘ক্ষমা করবেন এরকম ঘরে নিয়ে আসার জন্য। আমাদের আর কিই বা সামর্থ্য বলুন, শুনি বাড়িওলাও বোমার ভয়ে শহর ছেড়েছেন বেশ কিছু মাস হয়ে গেল। তাঁর চাকর এসে ভাড়াটুকু নিয়ে যায় শুধু।’

ব্যোমকেশ আর আমাকে চেয়ার দুটি আগাইয়া দিয়া তরুণীটি মাদুরের ওপর বসিল। আপত্তি করিয়াও কোনো ফল হইল না। ব্যোমকেশ ঘরের চারিপাশে চোখ বোলাইয়া বলিল, ‘এ ঘরে নিশ্চয় আপনি থাকেন না।’

তরুণী মাথা নাড়িল, ‘না, আমার ঘর বারান্দার ও প্রান্তে, আরো একটি মেয়ের সঙ্গে থাকতে হয়। তবে  সেখানে আপনাদের নিয়ে যাওয়া যায় না। তা ছাড়া এ মুহূর্তে সে ঘরে…’ বাক্যটি না শেষ করিয়াই চুপ করিয়া গেল।

পুরো পরিবেশটি এত অচেনা যে কথা ঘোরাইবার জন্য প্রায় মরিয়া হয়ে উঠিলাম। বলিলাম, ‘আপনার নামটা?’

সামান্য নীরবতা, তারপর সংক্ষিপ্ত জবাব আসিল, ‘কুহু।’

কুহু ব্যোমকেশের দিকে চক্ষু ফিরাইয়া বলিল ‘ব্যোমকেশ বাবু, আমি বড় বিপন্ন। আপনি সাহায্য না করলে হয়ত প্রাণেও বাঁচব না।’

ব্যোমকেশ একদৃষ্টিতে কুহুর দিকেই তাকাইয়া ছিল, এবার বলিল, ‘আপনি সব কথা খুলে বলুন। আমি যথাসাধ্য করব।’

কুহু একটু ইতস্তত করিয়া বলিল, ‘আমার ধারণা রামবাগানের খুনগুলো কে করেছে তা আমি জানি।’

ব্যোমকেশ একটু নড়িয়া বসিল, ‘কি জানেন আপনি?’

কুহু হঠাৎ ভাঙ্গিয়া পড়িল, মুখে হাত চাপা দিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, ‘আমারই দোষ। শুরুতেই যদি সব কথা বলতাম তাহলে হয়ত আরেকটি প্রাণ বাঁচানো যেত।’

ক্ষণিক পর একটু ধাতস্থ হইল, দেখিলাম তার দুটি চোখ থেকেই জলের ধারা নামিয়া এসেছে। বলিল, ‘এক সপ্তাহ আগে এরকমই এক রাত্রে আমি রমলার ঘরে ছিলাম, সে ছিল আমার সই। এ বাড়ি থেকে দু’পা হাঁটলেই তার বাড়ি। তার আগের রাত থেকে ধুম জ্বর এসেছিল আমার, তাই ঠিক করি সে রাতটা রমলার কাছেই থাকব। যদি কিছু অনর্থ ঘটে তাহলে অন্তত সেবাযত্ন করার একটা মানুষও থাকবে।     সেই রাত্রেই মানুষটা আসে, রমলাকে নিয়ে যেতে চায়।’

রমলা প্রথমে রাজি ছিল না, পরে ফিরে এসে বলল ‘প্রচুর টাকা দিচ্ছে, তায় গাড়ি করে নিয়ে যাবে, নিয়ে আসবে। তুই শুয়ে থাক, আমি ঘন্টা তিনেকের মধ্যে ফিরে আসব।’

‘সারা রাত কেটে গেল ব্যোমকেশ বাবু, রমলা ফিরল না। আমিও জ্বরের ঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠে নিজের বাড়ি চলে আসি, আর সেদিন রাতেই খবরটা পাই।’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘পরের খুনটার খবরও তো পেয়েছিলেন মনে হয়। তার পরেও বলে উঠতে পারেন নি?’

কুহু মাথা নামিয়া বলিল, ‘ভয়, ব্যোমকেশ বাবু। বড় ভয় পেয়েছিলাম। পুলিশকেও বিশ্বাস নেই, কোথা থেকে কি খবর ফাঁস হয়ে যায়।’

‘তাহলে আজ হঠাৎ সব কথা বলতে মনস্থির করলেন কেন?’

কুহু সন্ত্রস্ত চোখে বলিল, ‘সে রাতে আমি জানলা দিয়ে গাড়ি দেখতে পেয়েছিলাম ব্যোমকেশবাবু। আজ সকালে আমি সেই কালো গাড়ি আবার দেখতে পেয়েছি।’

ব্যোমকেশ সচকিত হইয়া বলিল, ‘কিন্তু কালো গাড়ি তো কতই আছে, এ যে সেই গাড়ি তা বুঝলেন কি করে?’

কুহু বলিল, ‘গাড়ির রঙ দেখে নয়। আমি ইংরেজি নম্বর পড়তে জানি, সে গাড়ির নম্বর পুরো দেখতে পারিনি। কিন্তু শেষ দুটো সংখ্যা মনে ছিল – ছয় আর নয়। ছয়কে উলটে দিলেই নয় হয়ে যায়, তাই জন্য আরোই মনে ছিল।’

প্রায়ান্ধকার ঘরেও মনে হইল ব্যোমকেশের মুখটি উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করিতেছে। বলিল, ‘বাহবা! কিন্তু সে গাড়ি দেখলেন কোথায়?’

আতঙ্কে কুহুর মুখ কালিবর্ণ ধারণ করিল, ‘আজকে সে গাড়ির মালিকের থেকেই অগ্রিম নিয়েছি যে। গাড়ি যেই ঘুরল অমনি সেই ছয় আর নয়কে পাশাপাশি দেখতে পেলাম।’

ব্যোমকেশ স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল কিছুক্ষণ, তারপর মুখ তুলিয়া বলিল, ‘আপনাকে কখন যেতে হবে?’

কুহু মুখ নত করিল, ‘রামবাগানে ঢোকার মুখে যে বড়রাস্তা সেখানে আগামীকাল রাত আটটায় আমার দাঁড়ানোর কথা।’ ব্যোমকেশের দিকে তার কাতর চোখ দু’টি তুলে বলল, ‘আপনি থাকবেন তো? আপনি না থাকলে এ যাত্রায় আমাকে কেউ প্রাণে বাঁচাতে পারবে না।’

ব্যোমকেশকে চিন্তামগ্ন দেখিলাম, মিনিটখানেক পর ধীর স্বরে বলিল, ‘তাই হবে কুহু দেবী। আমরা থাকব রাস্তার উল্টোদিকেই, কোনো ভয় নেই আপনার। তিন সপ্তাহ আগে ব্ল্যাক আউট শুরু হয়নি কিন্তু এখন ব্ল্যাক আউট জারি থাকবে, সুতরাং রাত্রিবেলা গাড়ি আসার সম্ভাবনা নেই। খুনীকে পায়ে হেঁটেই আসতে হবে। আপনি তো সে লোককে দেখেছেন বললেন?’

কুহু দু’পাশে মাথা নাড়িল।

‘দেখেননি?’

‘আমার ধারণা যে টাকা দিয়েছে সে গাড়ির মালিক নয়। চাকরস্থানীয় দেখতে, যে টাকা পাঠিয়েছে তাকে বাবু বলে ডাকছিল।’

কুহু আমাদেরকে সদর দরজা অবধি আগাইয়া দিতে আসিয়াছিল, ব্যোমকেশ বাহির হইবার পূর্বে আরো একবার অভয়প্রদান করিতে সে আর নিজেকে সামলাইতে পারিল না। ঝরঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল, ব্যোমকেশের হস্তদ্বয় স্পর্শ করিয়া বলিল, ‘এ দুখিনীকে আপনি নতুন জীবন দিলেন, আমি চিরকৃতজ্ঞ রইলাম।’

ঘটনার নাটকীয়তায় আমরা দু’জনেই অল্পক্ষণের জন্য বাক্যরহিত হইলাম, কুহুও তাড়াতাড়ি সামলাইয়া লইয়া বলিল, ‘মাফ করবেন, আমি আসি এখন।’

বাহির হইয়া ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘গাড়ির চালকও তাহলে এই খুনের সঙ্গে জড়িত? সেই বিকৃতকাম পশুটির সাগরেদ?’

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল, ‘খুবই সম্ভব। অর্থের লোভ বা প্রাণের ভয়, সেও হয়ত কিছু বলে উঠতে পারছে না।’, বলিতে বলিতে ব্যোমকেশ পিছনে ঘুরিয়া কি যেন দেখিল। কুয়াশাও পড়িয়াছে আজ, দু’হাত দূরের জিনিসও ভালো ঠাহর হয় না, তাও মনে হল সে পিছনের পোড়ো বাড়িটিকেই দেখার চেষ্টা করিতেছে।

ব্যোমকেশকে পুনরায় চিন্তামগ্ন দেখিয়া বলিলাম, ‘কি ভাবছ?’

‘বাড়িওলার কথা।’

বাড়িওলা আবার কি করিল? ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করিতে যাব এমন সময় আমাদের ঠিক পাশটি থেকে কে যেন বলিয়া উঠিল, ‘কর্তা এসে গেছেন?’

বাঁটুল।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল ‘তুমি ছিলে কোথায়? আমি তো ভাবলাম তুমি বাড়ি চলে গেছ।’

বাঁটুলের খলখলে হাসি ভাসিয়া আসিল, ‘যাব আর কোন চুলোয়, আপনাদের এখান থেকে বার না করেই বা যাই কই? এ চত্বরেই ঘোরাফেরা করছিলাম।’

 

পরদিন সকাল দশটা নাগাদ বীরেনবাবুর দেখা মিলিল। তাঁর মুখ অস্বাভাবিক রকমের গম্ভীর, ‘কমিশনার সাহেব জানতে চাইলেন আপনার তদন্ত কিছু এগোল কিনা?’।

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল, ‘তদন্ত চলছে তার নিজের গতিতে, এখনো সাহেবকে বলার মতন কোনো জায়গায় পৌঁছয়নি।’

বীরেনবাবুর অধরে ক্ষণিকের জন্য বক্রহাসির আভাস পাইলাম, বলিলেন, ‘দেখুন তাহলে কবে রহস্য উদঘাটন করতে পারেন। তবে ও তল্লাটে আপাতত আপনাদের না যাওয়াই ভালো, যা খুনজখম চলছে।’

বীরেনবাবুর কথায় ব্যোমকেশ আরামকেদারার হেলান ছাড়িয়া উঠিয়া বসিল, ‘আবারো কিছু ঘটেছে নাকি?’

‘ঘটেছে, কাল রাত্রে ওই চত্বরেই আবার খুন হয়েছে। তবে এ খুনের সঙ্গে আগের তিন খুনের কোনো সম্পর্ক নেই, রাতের অন্ধকারে পেছন থেকে পিঠে ছোরা বিঁধিয়ে মারা হয়েছে। পোস্ট মরটেম রিপোর্ট অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে এ খুন হয়েছে।’

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে আটটা! ওই সময়েই তো আমরা কুহুর আস্তানায় ছিলাম।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, ‘রামবাগানেরই কেউ?’

বীরেনবাবু বলিলেন, ‘নাহ, তবে এ লোকটির রামবাগান চত্বরে ভালোই যাতায়াত ছিল। বাগবাজারের ব্যবসায়ী সাধুখান বাড়ির ছেলে, নাম দেবদত্ত।’
খবর শুনিয়া কিছুক্ষণ আমাদের দু’জনের মুখেই কথা যোগাইল না। বীরেনবাবু আমাদের অবস্থা দেখিয়া পুনরায় বলিলেন, ‘ভয় পাওয়ার মতনই কথা। আপনারা আর নিজের প্রাণ বিপন্ন করবেন না, যা করার পুলিশই করবে।’

ব্যোমকেশ কিয়ৎক্ষণ স্থাণুবৎ বসিয়া রহিল, তারপর বীরেনবাবুর দিকে ফিরিয়া বলিল, ‘দেবদত্ত সাধুখান কি চৌরঙ্গী থেকে সরাসরি রামবাগানে এসেছিল?’

বীরেনবাবু মহা বিস্ময়ে বলিয়া উঠিলেন, ‘আপনি সে কথা জানলেন কি করে? হ্যাঁ, চৌরঙ্গীর একটি ক্লাব থেকে এসেছিল বলেই এখনো অবধি খবর পাওয়া গেছে।’

‘কিভাবে জানলাম সে কথা পরে হবে। কেন গেছিল সে ব্যাপারে কিছু জানেন?’

‘দেবদত্তর পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা নোট পাওয়া গেছে, তাকে কেউ ডেকে পাঠিয়েছিল বলেই মনে হয়।’

‘সে লেখা একবার দেখতে পাওয়া যেতে পারে?’

বীরেনবাবু অসহিষ্ণু মুখে বলিলেন, ‘আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি আগের কেসের কোনো সুরাহা না করে আবার এই কেস নিয়ে পড়লেন কেন?’

ব্যোমকেশ কঠিন স্বরে বলিল, ‘ভুলে যাবেন না এই খুনও রামবাগানেই হয়েছে। আপনি যতক্ষণ না কাগজে কলমে প্রমাণ করতে পারছেন এ অন্য খুনী ততক্ষণ আমার সঙ্গে সহযোগিতা করা ছাড়া আপনার গতি নেই।’

বীরেনবাবু দ্বিরুক্তি না করে ব্যোমকেশের হাতে একটি ভেজা ভেজা কাগজের টুকরো তুলে দিলেন, উঁকি মারিয়া দেখিলাম তাতে লেখা ‘ওলাবিবির মন্দিরের সামনে অপেক্ষা করব, সাড়ে সাতটা নাগাদ। জরুরী দরকার, সাক্ষাৎ এর কথা গোপন রেখ।’

জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘ওলাবিবির মন্দির আছে নাকি রামবাগানে?’

বীরেনবাবু বলিলেন, ‘হ্যাঁ, পুরনো মন্দির। তিরিশ চল্লিশ বছর আগে কলেরায় ছারখার হয়ে গেছিল ও চত্বর, তখনই বানানো হয়।’

ব্যোমকেশের দিকে তাকিয়ে দেখি সে কতকটা মুহ্যমান হইয়া বসিয়া রহিয়াছে। আধ মিনিট পর পর ক্ষীণস্বরে কহিল, ‘আপনি কাগজটা রেখে যান বীরেনবাবু, আমি কাল সকালে এ কাগজ ফেরত দেব আপনাকে।’

বীরেনবাবু নিজের অসন্তুষ্টি গোপন করবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া বিড়বিড় করিতে করিতে বিদায় নিলেন। বীরেনবাবু দরজা দিয়ে অদৃশ্য হওয়া মাত্র ব্যোমকেশ ডাকিল, ‘পুঁটিরাম’।

পুঁটিরাম বীরেনবাবুর জন্য চা করিয়া আনিয়াছিল, ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিল, ‘ও বাবু চলে গেলেন?’

‘হ্যাঁ, চা রেখে যাও। অজিত খেয়ে নেবে। তোমার মনে আছে দু’দিন আগে এক ভদ্রলোক বিকালবেলা বাড়ি এসেছিলেন?’

পুঁটিরাম ঘাড় নাড়িল।

‘তিনি কি কাল কিছু আমার জন্য পাঠিয়েছেন?’

‘আজ্ঞা বাবু, কাল অত রাতে ফিরেছিলেন বলে আর দিইনি’।

কয়েক মিনিটের মধ্যে পুঁটিরাম একটি সীলবন্ধ খাম আনিয়া ব্যোমকেশের হাতে দিল। খামের ভিতরে দেখি একটি চিঠি, অমিয়র অপহরণকারীর পাঠানো দ্বিতীয় চিঠি।

ব্যোমকেশ বীরেনবাবুর কাগজ আর এই চিঠি দুটি পাশাপাশি রেখে পরীক্ষা করিতেছিল। আমার মাথায় হঠাৎ বিদ্যুৎচমক খেলিয়া গেল।

বলিলাম, ‘ব্যোমকেশ, দুটি চিঠি কি একই হাতের লেখা?’

ব্যোমকেশ ধীরে ধীরে মাথা নাড়িল, ‘না এক হাতের লেখা নয়। আর রহস্যটা সেখানেই’। বলিতে বলিতে উঠিয়া গিয়া নিজের দেরাজ থেকে তৃতীয় একটি কাগজ বাহির করিয়া আনিল, দেখিলাম এটি অপহরণকারীর প্রথম চিঠি।

অপহরণকারীর দু’টি চিঠি পাশাপাশি রাখিয়া বলিল, ‘এ দুটি চিঠিও এক হাতের লেখা নয়।’

আমি হতবুদ্ধি হইয়া বসিয়া রহিলাম, বলিলাম, ‘তবে কি দু’জন মিলে অমিয়কে অপহরণ করেছে? দু’জনেই একটি একটি করে চিঠি লিখে পাঠিয়েছে?’

ব্যোমকেশ কিছুই বলিল না, শুধু অপহরণকারীর দ্বিতীয় চিঠিটা নামাইয়া লইয়া তার স্থানে দেবদত্তর পাঞ্জাবির পকেট থেকে পাওয়া কাগজটি রাখিল। বলিল, ‘এবার দেখো।’

দেখিলাম, দুটি চিঠির হাতের লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র মিল নেই। প্রথম চিঠিটি দেখলে মনে হয় যেন কোনো বাচ্চা ছেলে লিখিয়াছে, দেবদত্তর পাওয়া কাগজের লেখায় কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক সুলভ মুন্সীয়ানা রহিয়াছে।

ব্যোমকেশ কে বলিলাম, ‘এ দু’টিও তো এক নয়, তার মানে তিন জন বিভিন্ন ব্যক্তি চিঠি তিনটে লিখেছে।’

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিয়া বলিল, ‘এ দু’টি কিন্তু এক লোকের লেখা।’

আমি এতই বিভ্রান্ত বোধ করিলাম যে এই প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকে রেহাই নিতে হল।

ব্যোমকেশের মুখ থেকে অবশ্য হাসি সরিয়া গিয়াছে, আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, ‘রহস্য বড় গভীর অজিত, ভেবো না শুধু তুমিই বিভ্রান্ত হয়ে আছ।’

দেখিলাম ব্যোমকেশ বাহিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হইতেছে। অবাক হইয়া বলিলাম, ‘এখন আবার চললে কোথায়?’

‘ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরী’, গায়ে শাল ফেলিয়া ব্যোমকেশ বাহির হইয়া গেল। মিনিট খানেকের মধ্যে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, ‘ওহ, তোমাকেও একটা কাজ করতে হবে। মনে আছে তো আগামীকাল সুবিমল সান্যালের টাকা দিতে যাওয়ার কথা? তুমি একবার ওনার বাড়িতে গিয়ে কথা বলে এস। জানিও ওঁর সঙ্গে আমরাও থাকতে চাই, সময়টা ঠিক করে নেওয়া দরকার।’

 

সুবিমল সান্যাল আমাকে দেখিয়া যেন একটু অপ্রস্তুত হইলেন, ‘ওহ আপনি। তা ব্যোমকেশ বাবু এলেন না?’

জানাইলাম তদন্তের অভিপ্রায়ে আমার আগমন ঘটেনি, আগামীকল্য তাঁর সঙ্গে কখন মিলিত হইব সেটি জানিতেই আসা।

সুবিমল মিনিটখানেক চুপ করিয়া রইলেন, তারপর বলিলেন, ‘আপনারা কি ছদ্মবেশে যাবেন?’

আমি আমতা আমতা করিয়া বলিলাম, ‘সেরকম তো এখনো কিছু জানি না। ব্যোমকেশ বলিতে পারিবে।’

‘আমার মনে হয় ছদ্মবেশ ধারণ করাই ভালো। কোনো কারণে যদি লোকগুলি আপনাদের দেখতে পায়, কে বলতে পারে তারা অমিয়র কোনো ক্ষতি করবে না?’

যুক্তিসঙ্গত কথাই বটে। বলিলাম ব্যোমকেশের সঙ্গে কথা বলিয়া ওনাকে জানাইব।

সুবিমলের থেকে বিদায় লইয়া গেটের বাহিরে যাব এমন সময় মনে হল উনি পিছন থেকে ‘অজিতবাবু’ বলে একবার ডাকিলেন। আর ঠিক সে সময়েই দ্বিতীয় এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটিল। ইনি অবশ্য আমার পরিচিত, নাম শ্রীশ সামন্ত, আমাদের পাড়ার ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। শ্রীশ বাবুর হাতে একটি বড় সুটকেস, বুঝিলাম টাকার বন্দোবস্ত চলিতেছে। আমি ঘুরিয়া সুবিমলকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কিছু বলছেন?’

সুবিমল মাথা নাড়িলেন, ‘নাহ, কিছু না। মিছিমিছিই আপনার পিছু ডাকলাম।’

 

ব্যোমকেশ ফিরিল বিকাল নাগাদ, দেখিলাম প্লেগের বইটিও সঙ্গে লইয়া গেছিল। সুবিমল ছদ্মবেশের প্রসঙ্গ তুলিয়াছেন শুনে কেন জানি ভ্রূকুঞ্চন করিল।

বলিলাম, ‘টাকার বন্দোবস্ত যে হয়ে গেছে তাও দেখে এলাম। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার শ্রীশ সামন্ত নিজে টাকার সুটকেস নিয়ে ঢুকছিলেন’।

ব্যোমকেশ প্রথমটায় ভালো করিয়া শুনতে পায় নাই, বলিল, ‘সুবিমল সান্যাল টাকার বন্দোবস্ত যে ঠিকই করতে পারবেন তা অপহরণকারী জানে’।

বলিতে বলিতে আমার দিকে ঘুরিয়া সবিস্ময়ে বলিল, ‘কি বললে? শ্রীশ সামন্ত নিজে টাকা নিয়ে গেছেন?’

স্বীকার করিলাম।

‘কিন্তু ব্যাঙ্ক ম্যানেজার নিজে কেন টাকা নিয়ে যাবে সুবিমল সান্যালের বাড়ি?’

‘দেখো, হয়ত এত বড় ক্লায়েন্ট বলে নিজেই সেবা দিচ্ছেন।’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘তা হতে পারে, কিন্তু কি যেন মিলছে না।’ বলিয়া একটি সাদা কাগজে হিজিবিজি কাটিতে শুরু করিল। বুঝিলাম আপাতত কথোপকথন বন্ধ রাখিতে হইবে। আধ ঘন্টা পর ঝড়ের গতিতে বাহির হইয়া গেল, শুনিলাম রান্নাঘরে পুঁটিরামের সঙ্গে কি কথাবার্তা চলিতেছে।

 

বেরনোর সময় ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘খুনী যেরকম নৃশংস প্রকৃতির তার সঙ্গে সামনাসামনি মোলাকাতের জন্য তো সশস্ত্র থাকা প্রয়োজন। তুমি কিছু ব্যবস্থা করেছ নাকি?’

‘সে আর বলতে, এই যে’, দেখি ব্যোমকেশের হাতে মস্ত একখানি টর্চ। আমি রাগত স্বরে অনুযোগ জানাইতে যাচ্ছিলাম, ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া অভয় প্রদান করিল।

রামবাগানের বড়রাস্তার উল্টোদিকের গলিতে যখন দু’জনে পৌঁছাইলাম তখন আটটা বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি। ব্যোমকেশকে ফিসফিস করিয়া বলিলাম, ‘ব্ল্যাকআউটের বাজারে রোজ যে এরকম রাত্রে বেরোচ্ছ, পুলিশ ধরলে বলবে কি?’

‘বলব বীরেনবাবু বলেছেন দু’দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।’

হাসিয়া ফেলিলাম, এমন সময়ে ব্যোমকেশ একটি মৃদু ধাক্কা দিল। দেখি কুহু আসিয়া ল্যাম্পপোস্টের তলায় দাঁড়াইয়াছে, চাঁদের আলোয় আজ তাহার অন্য রূপ দেখিলাম। ভরা শীতের রাত্রেও তাহাকে রঙ্গিণী সাজিতে হইয়াছে – তার চড়া প্রসাধন, ফিনফিনে শাড়ী সবই রাস্তার এই পার থেকেও দেখা যাইতেছে। কাঁধে আলগোছে একটি চাদর ফেলা।

ব্যোমকেশ এদিক থেকে হাত তুলিল। কুহুও আমাদের দেখিতে পাইয়াছে।

ByomkeshHiRes001_Stakeout

আমি রুদ্ধ-নিশ্বাসে অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। আমার ঘড়ির কাঁটার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই কানে আসিতেছে না, এয়ার রেইডের ভয়ে রাস্তার ঘড়িগুলিও খুলিয়া ফেলা হইয়াছে। মিনিট পাঁচেক পর খেয়াল হইল ব্যোমকেশের দিক থেকে সাড়া শব্দ আসিতেছে না। ঘুরিয়া দেখি ব্যোমকেশ উদগ্রীব হইয়া চাহিয়া রহিয়াছে, কিন্তু বড় রাস্তার দিকে নয় বরং আমাদের গলির ভিতরের দিকে।

কয়েক হাত পরেই গলিটি বাঁকিয়া গিয়াছে। মনে হইল একটি ছায়ামূর্তি অগ্রসর হইতেছে। ডাকিলাম, ‘ব্যোমকেশ!’

উত্তর এল, ‘চিন্তা নেই, তুমি রাস্তার দিকে দেখো।’

মিনিটখানেকের মধ্যে সে ছায়ামূর্তি এসে ব্যোমকেশের পিছনে দাঁড়াইল।

‘বাঁটুল কোথায় পুঁটিরাম?’

‘আজ্ঞে, আপনার কথা মতন সে অন্য গলির সামনে নজর রাখছে।’

আমি অধীর হইয়া ফিসফিস করিয়া বলিলাম, ‘ব্যোমকেশ, কি হচ্ছে বলো তো?’

ব্যোমকেশ চাপা স্বরে বলিল, ‘এখন ব্যাখ্যা করার সময় নেই অজিত। আর কি হচ্ছে বা হতে চলেছে তা আমি নিজেও পুরোপুরি জানি না। পুঁটিরাম, তোমার বন্ধু কোথায়?’

‘ওই যে, এসে গেছে।’

দেখিলাম ল্যাম্পপোস্টের নীচে আর একটি লোক উদয় হইয়াছে, কুহুকে কিছু বলিতেছে। রাস্তার এপার থেকে না বোঝা গেলেও মনে হইল একটি তর্কাতর্কি বাধিয়া উঠিতেছে। কুহুও যাইবে না, আর এ ব্যক্তিও নাছোড়বান্দা।

ব্যোমকেশ সজোরে হাত ধরে টানিল, ‘অজিত এসো।’

ব্যোমকেশ প্রায় দৌড়াইতে শুরু করিল, বাধ্য হয়ে আমিও। গলি ত্যাগ করিবার পূর্বে দেখিলাম পুঁটিরাম আমাদের জায়গাটি লইয়াছে, ব্যোমকেশের শাল দিয়া তার মস্তক আবৃত।

ব্যোমকেশকে বলিলাম, “কুহুকে যে বিরক্ত করিতেছে সেই লোকটির কি হবে?’

ব্যোমকেশ মাথা না ঘুরাইয়াই জবাব দিল, ‘চিন্তা নেই, ও আমারই লোক। আর মিনিট দুয়েক পরেই চলে যাবে।’

অন্য গলি দিয়া বার হইয়া দ্রুতবেগে বড় রাস্তা অতিক্রম করিলাম দু’জনে। দূরে ডান দিকে দেখিলাম ল্যাম্পপোস্টের নীচে কুহু এখনো দাঁড়িয়ে, পুঁটিরামের বন্ধু বাকবিতণ্ডা শেষ করিয়া চলিয়া যাইতেছে। বড় রাস্তা অতিক্রম করিয়া উল্টোদিকের গলিতে ঢোকা মাত্র আরেক ব্যক্তি ছুটিয়া আসিল।

‘কর্তা, উনি মিনিট পাঁচেক হল এ গলিতে ঢুকেছেন।’

‘সর্বনাশ, অজিত এসো।’

এই গলি ধরিয়া ছুটিতে ছুটিতে অনুধাবন করিলাম পূর্বদিন এখানেই এসেছিলাম। গলিঘুঁজি পার হইয়া কখন সেই পোড়োবাড়ির কাছে আসিয়া পড়েছি। ব্যোমকেশ টর্চের আলো ফেলিল, কেউ নেই। কিন্তু ব্যোমকেশ দেখিলাম উৎকণ্ঠিত হয়ে কি যেন শুনিবার চেষ্টা করিতেছে। এইবার আমিও শুনতে পাইয়াছি, ক্ষীণ শব্দ কিন্তু মনে হচ্ছে কাছেই কোথাও ধ্বস্তাধ্বস্তি চলিতেছে।

‘এদিকে অজিত, শিগগির’, পোড়ো বাড়িটির পাশ দিয়ে আর একটা ছোট্ট গলি চলে গেছে। সেই গলির অন্য পাশে টানা পাঁচিল।

ব্যোমকেশের টর্চের জোরালো আলো গিয়া গলির শেষপ্রান্তে পড়িল। চোখের সামনে উন্মোচিত হইল একটি বীভৎস অপরাধের প্রেক্ষাপট।

নোনাধরা দেওয়ালের পাশটিতেই একটি পুরুষদেহ পড়িয়া রহিয়াছে, আর তার পাশেই হাঁটু মুড়ে বসিয়া আছে প্রেতবৎ একটি মূর্তি।

পতিত পুরুষটির গলার কাছটিতেই ঝিকমিকিয়ে উঠিয়াছে শ্বাপদনখের ন্যায় বক্র একটি ছোরা। ছোরার মালিকের ঊর্ধ্বাঙ্গটি চাদরাবৃত, শুধু চোখ দুটি দেখা যাইতেছে। পাশবিক হিংস্রতায় সেগুলিও শ্বাপদচক্ষুর মতনই জ্বলজ্বল করিতেছে। আমাদের দেখিয়াও মূর্তিটি নড়িল না, শুধু গলা দিয়া একটা অব্যক্ত আওয়াজ বাহির হইল। সে আওয়াজ বড়ই জান্তব।

ByomkeshHiRes005_Ghoul

ব্যোমকেশ দুঃখিতস্বরে বলিল, ‘প্রতিহিংসারও রকমফের আছে, এ পথ বেছে কিই বা পেলেন?’

প্রেতমূর্তির অস্বাভাবিক উজ্জ্বল চোখ দুটি যেন একপলকের জন্য স্তিমিত হইল, পর মুহূর্তেই মর্মান্তিক আর্তনাদে রাত্রির নৈঃশব্দ চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া গেল। ব্যোমকেশ গলির প্রান্তে দৌড়াইয়া গেল, আমার পা আর উঠিল না। মূর্তিটি নিজের গলাতেই আড়াআড়ি ছোরা চালাইয়াছে, কালো চাদরের ওপর দিয়া ঝলকে ঝলকে রক্তের স্রোত বহিতে দেখিয়া আমার প্রাণশক্তি একেবারে নিঃশেষ হইয়া গেছিল।

ব্যোমকেশ যতক্ষণে পৌঁছাইল ততক্ষণে সব শেষ। দেহটি কয়েকবার কাঁপিয়া উঠিয়া নিথর হইয়া গেল। ব্যোমকেশ অন্য পুরুষটির নাড়ী পরীক্ষা করিতে করিতে বলল, ‘অজিত, আমি সুবিমলবাবুকে দেখছি। তুমি বাঁটুলকে নিয়ে অবিলম্বে বড় রাস্তায় যাও। কুহুকে ধরা চাই।’

কিছুই বুঝিলাম না, কিন্তু ব্যোমকেশের গলায় এমন উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেল যে শরীরের সব শক্তি জড়ো করিয়া ছুটিলাম বড় রাস্তার দিকে। মাঝ পথে বাঁটুলের সঙ্গে দেখা, তাহাকে কোনোপ্রকারে বুঝাইলাম আমার পিছনে পিছনে আসিতে।

আমাকে দৌড়াইয়া আসিতে দেখিয়াই কুহু কিছু আঁচ করিয়াছিল। পাশের গলিতে ঢুকিবার সুযোগ অবশ্য ছিল না। আমাকে দৌড়াইতে দেখিয়া কুহুর উল্টোদিকের গলি থেকে বাহির হইয়া আসিয়াছে পুঁটিরাম, আর কুহুর বাঁদিক থেকে ভোজবাজির মতন ফের উদয় হইয়াছে পুঁটিরামের বন্ধু। চব্বিশ ঘন্টা আগে যে কুহুকে দেখিয়াছিলাম তার সঙ্গে এর আকাশ পাতাল তফাত, ফাঁদে পড়া বাঘিনীর মতন তাহাকে ভয়ঙ্কর দেখাইতেছিল।

কি ভাবে সে বাঘিনীকে বাগে আনতাম জানি না, কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া গেল না।

কুহুর দিকে আর একপা মাত্র অগ্রসর হইয়াছি, এমন সময় মনে হইল পায়ের নিচ থেকে মাটি সরিয়া যাইতেছে। দু’পাশের ঘরবাড়ি দুলিতে লাগিল, কানে আসিল মেদিনী বিদীর্ণ কারী এক ভয়াবহ শব্দ। হতভম্ব হইয়া বোঝার চেষ্টা করিতেছি ঠিক কি ঘটিতেছে, বাঁটুল পিছন হইতে আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, ‘মাথা নিচু করুন কর্তা, শুয়ে পড়ুন, শুয়ে পড়ুন’।আর ঠিক সেই মুহূর্তে শোনা গেল জাপানী বোমারু বিমানের গর্জন, মাসাধিককালের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত করিয়া কলিকাতার আকাশ এখন শত্রুপক্ষের দখলে।

ব্ল্যাক আউটের মধ্যেই জাপানীরা বোমা ফেলা শুরু করিয়াছে। বোমার অভিঘাতে যেন সারা শহর টলিতে শুরু করিল।

দশটি মিনিট মাত্র, কিন্তু প্রতি পলে মনে হইতে লাগিল এ যাত্রায় প্রাণ নিয়ে আর ফেরা গেল না। মানুষের আর্তনাদ, বোমার শব্দ, ধ্বংসস্তূপের ধোঁয়া সবকিছু মিলিয়া এক অতিপ্রাকৃত ব্যাপার চোখের সম্মুখে ঘটিয়া গেল।

বোমারু বিমান মিলিয়ে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর যখন মাথা তুলিলাম, দেখিলাম কুহুর চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু কুহুর কথা চিন্তা করিবার মতন অবসর আমার কাছে ছিল না। পড়ি কি মরি করে দৌড়াইয়া সেই পোড়ো বাড়ির কাছে ফের ফিরিলাম, সৌভাগ্যবশতঃ বিমানহানায় ব্যোমকেশ বা সুবিমল কেউই আহত হন নাই।

ব্যোমকেশ আমাকে দেখিয়াই বলিল, ‘তাকে ধরতে পারলে না?’

আমাকে নিরুত্তর দেখিয়া মাথা নাড়িল, ‘ভাগ্যের মার, তুমি আমি নিমিত্ত মাত্র। নাহলে এনারই বা এ অবস্থা হয় কেন?’

এতক্ষণে আমার নজর পড়িল আততায়ীর মৃতদেহের দিকে। কিছুক্ষণ আগের স্মৃতি পুঙ্খনাপুঙ্খ মনে পড়িয়া গেল, শিহরিয়া উঠিলাম।

জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘এ কে ব্যোমকেশ?’

ব্যোমকেশ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া মৃতের মুখ হইতে চাদরটি সরাইয়া দিল, ‘চিনতে পারছ?’

বিলক্ষণ, এনার ছবি শেষ তিন দিনে বেশ কয়েকবার দেখিতে হইয়াছে। ইনি অমিয় সান্যাল, সুবিমল সান্যালের একমাত্র পুত্র।

বিস্মিত হইয়া ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘কিন্তু ইনি ছিলেন কোথায়? আর এসবের অর্থই বা কি?’

‘কুহু যেখানে ছিল অমিয় সান্যালও সেখানেই ছিল, অর্থাৎ…’ বলিয়া সামনের বাড়িটির দিকে তাকাইয়া রহিল। তারপর বাড়িটির দিকে অগ্রসর হইতে হইতে বলিল, ‘অর্থ খোঁজার জন্য এ বাড়ির ভিতর আরেকবার না গেলেই নয়। অজিত তুমি বাঁটুল কে নিয়ে বাইরে থাকো, পুঁটিরাম গিয়ে পুলিশে খবর দিক।’

 

বাকি রাত্রির হাঙ্গামা মিটিবার পর পরদিন সকালে বীরেনবাবু দু’জন কনস্টেবল লইয়া উপস্থিত হইলেন, পুলিশের জীপগাড়িতেই সুবিমল সান্যালের বাড়ি যাইতে হইল। প্রবেশ করিবার সময় সুবিমলের ভৃত্যটি কিছু বলিবার উপক্রম করিতেছিল কিন্তু পুলিশ দেখিয়া সরিয়া পড়িবার চেষ্টা করিল। বীরেনবাবু প্রকান্ড এক হুঙ্কার দিয়া বলিলেন, ‘তোর বাবু কোথায়?’

সে কাঁপিতে কাঁপিতে বৈঠকখানার ঘরের দিকে ইশারা করিল। ব্যোমকেশ পা বাড়াইতে বাড়াইতে বীরেনবাবুকে বলিল ‘একে যেতে দেবেন না, দরকার পড়বে।’

বৈঠকখানার ঘরে প্রবেশ করিয়া মনে হইল রাতারাতি সুবিমলের বয়স পনের কুড়ি বছর বাড়িয়া গিয়াছে, যেন অশীতিপর এক বৃদ্ধর দিকে তাকাইয়া রহিয়াছি।

বীরেনবাবু ব্যোমকেশের দিকে একবার তাকাইলেন তারপর সুবিমলের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, ‘আমি দুঃখিত আপনাকে এই সময়ে বিরক্ত করতে হচ্ছে। কিন্তু আপনার জবানবন্দী নেওয়া নিতান্তই প্রয়োজন।’

সুবিমল যেন কথাটা ঠিক বুঝিতে পারিলেন না, ‘কিসের জবানবন্দী?’

বীরেনবাবু অসহিষ্ণু গলায় বলিলেন, ‘আশা করি আপনি জেনেছেন যে আপনার ছেলেই অপরাধী। সে একটা দুটো নয়, চার চারটে খুন করেছে। ব্যোমকেশ বাবু না পৌঁছলে সেটা পাঁচটা হত, নিজের ছেলের হাতেই খুন হতেন। অপরাধী কেন একাজ করল সেটা সবিস্তারে জানা প্রয়োজন।’

ব্যোমকেশ এতক্ষণ চুপ করিয়া ছিল, এবার বলিল, ‘কিন্তু অপরাধ তো একটা নয়, অপরাধীও এক জন নয়। তাই অপরাধীর মোটিভ নিয়ে আলোচনা করার আগে একবার অপরাধের ফিরিস্তি নিয়ে আলোচনা হোক।’

বীরেনবাবু বিস্মিত হইয়া পড়িলেন, ‘আমি জানি মেয়েটিকে ধরা যায়নি এখনো। কিন্তু সে আলাদা করে কি অপরাধ করেছে ব্যোমকেশ বাবু? সে ছিল নেহাতই অমিয়র দোসর।’

ব্যোমকেশ নির্লিপ্ত স্বরে বলিল, ‘বীরেনবাবু, আশা করছি এই মুহূর্তে আপনার হাতে কিছুটা সময় আছে।’

বীরেনবাবু অধিকতর অবাক হইয়া বলিলেন, ‘তা আছে। কিন্তু কেন বলুন তো?’

ব্যোমকেশের দৃষ্টি সুবিমল সান্যালকে ছুঁইয়া গেল, ‘কারণ অপরাধের ফিরিস্তি দিতে একটু সময় লাগবে। এটাও মনে রাখা দরকার যে এই নৃশংস অপরাধের সূত্রপাত কলিকাতায় নয়, রেঙ্গুনে।’

‘রেঙ্গুন, মানে বার্মা?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। আমাদের কাছে আজ সকালেই শুনেছেন যে সুবিমল সান্যাল বার্মায় কাঠের ব্যবসা করতে গিয়ে ভাগ্য ফিরিয়েছিলেন। কিন্তু আমার ধারণা শুধু কাঠের ব্যবসা করে সুবিমল সান্যাল এত অর্থ উপার্জন করেননি।’

ব্যোমকেশ সুবিমলের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়া বলিল, ‘আপনি নিজে থেকে কি কিছু বলতে চান সুবিমল বাবু?’

সুবিমল উত্তর দিলেন না, শুধু শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকাইয়া রহিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘বেশ, আমি নিজেই বলছি তাহলে। কিছু জায়গায় আমার নিজের থিয়োরী আছে বটে কিন্তু আমার ধারণা সে থিয়োরী নির্ভুল’।

কাঠের ব্যবসা করে সুবিমল সান্যাল দু’পয়সার মুখ ঠিকই দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি অতি দ্রুত বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। আর সেই স্বপ্ন সার্থক করতে তিনি লগ্নি করেছিলেন কিছু বেআইনি ব্যবসায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার বেশ কিছু বছর আগের কথা, কিন্তু রেঙ্গুনের অবস্থা পড়তে শুরু করেছে। অথচ বাংলায় তার থেকেও খারাপ অবস্থা, দলে দলে মানুষ বার্মাতে পাড়ি জমাচ্ছেন সামান্য কিছু অর্থোপার্জনের আশায়।

সুবিমল ঠিক এই সুযোগটাই নিলেন। রেঙ্গুনের ব্রথেলগুলোতে টাকা খাটাতে শুরু করলেন তিনি, সেই সঙ্গে সুবিমলের লোকেরা অসংখ্য বাঙালি মহিলাদের ঠকিয়ে, পয়সার লোভ দেখিয়ে এই ব্রথেলগুলোতে নিয়ে আ্সতে শুরু করল। আর একই সাথে শুরু হল ড্রাগের চোরাচালান। চীন থেকে যে ড্রাগ ভারতে আসে তার মালিকানা অনেকের, দামও অনেক বেশী। সুবিমল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকে অনেক সস্তায় কোকেন কিনে ভায়া রেঙ্গুন চালান করতে লাগলেন কলকাতায়’।

ব্যোমকেশ আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, ‘মনে আছে কুহু কি বলেছিল? রমলা ছিল তার সই। কিন্তু যেটা সে বলেনি তা হল কুন্তী এবং শ্যামা দু’জনকেই সম্ভবত সে আগে থেকে চিনত। এবং চিনেছিল ওই রেঙ্গুনেই।’

আমি অবাক হইয়া বলিলাম, ‘কুহুও রেঙ্গুনের মেয়ে?’

‘কুহুর কথায় পরে আসছি। কিন্তু আমার ধারণা কুন্তী এবং শ্যামা দু’জনেই কলকাতায় এসেছিল রেঙ্গুন থেকেই। শ্যামা হয়ত সত্যিই সিলেটের মেয়ে কিন্তু পুরোদস্তুর খোঁজখবর নিলে দেখা যাবে কলকাতায় আসার আগে সে রেঙ্গুনেই ছিল।’

বীরেনবাবু অধৈর্য হইয়া বলিলেন ‘কিন্তু অমিয় সান্যাল এদের খুন করল কেন?’

‘সে কথাতেই আসছি বীরেনবাবু। কিন্তু তার আগে রেঙ্গুনের কথা শেষ করতে হবে। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয় বছর পাঁচ ছয় আগে বার্মা প্লেগে ছারখার হয়ে গেছিল, খোদ রেঙ্গুনেও নয় নয় করে কম মানুষ মারা যান নি। সুবিমল সান্যাল মানুষের এই দুর্যোগেও নিজের লাভ এবং লোভের কথা ভুলতে পারলেন না’।

‘উধাও হওয়ার আগে অমিয় সান্যাল প্লেগের চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি বই গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েছিল। সে বই আমার হাতে আসে, দেখি জায়গায় জায়গায় অমিয় নোট নিয়েছে, বইয়ের কিছু কিছু জায়গা আবার পেনসিল দিয়ে দাগানো। এরকমই একটি জায়গায় একটি অদ্ভুত অথ্য পাই যেখানে বইয়ের লেখক বেলাডোনা বিষের কথা বলেছেন, বেলাডোনা বিষে মানুষ মরলে নাকি মৃতের শরীরে প্লেগের মতনই লক্ষণ দেখা যায়। ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরী গিয়ে খোঁজ করতেও একই তথ্য পাওয়া গেল, সেখানে অবশ্য একাধিক বই জানিয়েছে বেলাডোনার সঙ্গে আরো কিছু বিষ মিশিয়ে এক ধরনের সিরাম তৈরি করা যায় যা দিয়ে মানুষ মারলে তিন চার দিনের জন্য বোঝা যাবে না মানুষটি প্লেগে মরেছে না বিষক্রিয়ায়।’

ব্যোমকেশ বীরেনবাবুর দিকে তাকাইয়া বলিল, ‘আর ঠিক এই সময়টিতেই বার্মা ভারতের থেকে আলাদা হয়ে গেল, ফলে স্থলসীমান্ত দিয়ে কোকেন চোরাচালানে সুবিমল সান্যালের বিস্তর অসুবিধা ঘটছিল। সেই সময় কিছু ভাবে ইনি বেলাডোনা বিষের হদিশ পান।’

সুবিমল সান্যালের এতক্ষণে যেন সম্বিৎ ফিরিল, ব্যোমকেশের দিকে তাকাইয়া সরোষে বলিলেন, ‘আমার এই চূড়ান্ত দুঃখের সময়ে রাশি রাশি আজগুবি কথা বানিয়ে আপনার কি লাভ হচ্ছে ব্যোমকেশ বাবু?’

ব্যোমকেশ তীব্র স্বরে বলিল, ‘আজগুবি কিনা সে কথা আদালত বিচার করবেন। কিন্তু নিজের ছেলে কেন খুন করতে চেয়েছিল আপনাকে, সে কথা কি নিতান্তই জানতে চাইবেন না?’

জোঁকের মুখে যেন নুন পড়িল, সুবিমল সান্যাল চুপ করিয়া গেলেন।

‘বেলাডোনা বিষের কথায় ফিরছি, কিন্তু তার আগে আপনার কাজের লোকটিকে একটি প্রশ্ন করতে চাই’, ব্যোমকেশ সুবিমলের ভৃত্যর দিকে তাকাইয়া বলিল, ‘রামবাগানের বাড়ি থেকে ভাড়া আদায় করতে তুমিই তো যেতে?’

ভৃত্যটি চুপ করিয়া আছে দেখে ব্যোমকেশ তার দিকে তর্জনী উত্থাপন করিয়া বলিল, ‘চার চারটি খুনের মামলা। এখন কথা নাই বলতে পারো কিন্তু মনে রেখো আদালতে তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য লোপাটের দোষ প্রমাণিত হলে ফাঁসি না হলেও আট দশ বছরের জেল তো হবেই। খুনী থাকত ওই বাড়িতেই। এ বাড়ি ভাড়া বোধহয় তুমি তোমার বাবুকে জানিয়ে দাওনি?’

ভৃত্যটি ভয়ে ডুকরাইয়া উঠিল, ‘কর্তা জানতেন না। টাকার লোভে করে ফেলেছি বাবু।’

ব্যোমকেশের দৃষ্টি তীক্ষ্ন হইয়া উঠিল ‘কিন্তু কর্তা যে যে বাড়ির কথা জানতেন তার সংখ্যাও তো কম নয়। রামবাগান এলাকায় সুবিমল ক’টা ঝুপড়িঘরে ভাড়া খাটাতেন?’

সুবিমলের দিকে একবার ভীত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া ভৃত্যটি বলিল, ‘খান পঞ্চাশেক হবে।’

ঘরে উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হইয়া গেলাম। ব্যোমকেশ বীরেনবাবুকে বলিল, ‘বুঝেছেন তো? রেঙ্গুনের মতন কলকাতার ব্রথেলেও ইনি যথেষ্ট লগ্নি করেছিলেন। আমার ধারণা ওই বস্তির শেষের পোড়ো বাড়িটি ওনার ড্রাগ চোরাচালানের গুদাম, সে কারণেই প্রায় সব ঘরই বন্ধ।’

‘যাই হোক, বেলাডোনা বিষের কথায় ফিরি। আমার অনুমান সুবিমল রেঙ্গুনের ব্রথেল থেকে অপেক্ষাকৃত বেশী বয়সী কিছু মহিলাকে হাত করেন। এই মহিলারা বেছে বেছে অনভিজ্ঞ, নতুন কম বয়সী বাঙালি মেয়েদের সুবিমলের কাছে পাঠাত। সুবিমল এদেরকে যথেষ্ট টাকা পয়সা দিতেন, তাই নতুন মেয়েগুলি সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেলেও এরা টুঁ শব্দটি করত না। কুন্তী এবং শ্যামা, এই দু’জনেই সম্ভবত ছিল সুবিমলের অপকর্মের দোসর। তবে তাদের ধারণা ছিল সুবিমল নিজের লালসা চরিতার্থ করে এদের অন্য কোথাও বেচে দেন, হয়ত সুবিমল নিজেই তাই বুঝিয়েছিলেন।’

ব্যোমকেশ একবারের জন্য থামিল, আমাদের সবার দিকে তাকাইয়া সামান্য নাটকীয় ভঙ্গীতে বলিল, ‘কিন্তু সুবিমল বিকৃতকাম মানুষ নন।’

‘তিনি তার থেকেও বড় পিশাচ।’

‘এই মেয়েগুলিকে তিনি বেলাডোনা এবং আরো কিছু বিষের সিরাম দিয়ে প্রাণে মারতেন। আর তারপর তাদের শরীর ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বার করে নিয়ে ভরতেন কোকেনের প্যাকেট। সেই দেহগুলিকে কফিনে পুরে জাহাজে চাপিয়ে নিয়ে আসা হত মাঝসমুদ্রে। সমুদ্রের অতলে চিরবিলীন হওয়ার আগে তাদের শরীর কেটে কোকেনের প্যাকেটগুলোকে পুনরুদ্ধার করা হত। প্লেগের লাশ দেখে পুলিশ বা কাস্টমস কেউই অন্য কিছু ভাবত না।’

অমিয় সান্যালের নৃশংসতাকেও যেন এ কাহিনী হার মানায়, ঘরসুদ্ধ লোক আতঙ্কে সুবিমল সান্যালের দিকে ঘাড় ঘুরাইল।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘কিন্তু শুধু এই মেয়েগুলিই নয়, বেলাডোনা বিষ প্রাণ কেড়েছিল আরও একজনের। সেখানে অবশ্য লোভ কাজ করেনি, কাজ করেছিল ভয়।’

দেখিলাম সুবিমল সান্যালের রগ দপদপ করিতেছে।

ব্যোমকেশ গাঢ়স্বরে বলিল, ‘আপনার অনেক অপরাধই আপনার স্ত্রী মেনে নিয়েছিলেন কিন্তু মানুষ খুন অবধি আর সহ্য করতে পারেন নি। পুলিশে যাওয়ার ভয় দেখিয়েছিলেন কি?’

সুবিমল উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

বীরেনবাবু এবং তাঁর দুই কনস্টেবলও লাফ দিয়া উঠিলেন। সুবিমল ক্লান্ত স্বরে বলিলেন, ‘আমি কোথাও যাচ্ছি না। কিন্তু ব্যোমকেশ বাবুর এই অনৃতভাষণ আমার শরীর আর নিতে পারছে না। আমাকে মাফ করবেন, কিন্তু আমার চোখেমুখে জল দেওয়া নিতান্তই দরকার।’

বীরেনবাবু একবার ব্যোমকেশের দিকে তাকাইলেন, তারপর কি ভেবে বলিলেন, ‘যান। কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসবেন।’

সুবিমল প্রায় টলিতে টলিতে বৈঠকখানার পাশের বাথরুমটিতে ঢুকিলেন।

বীরেনবাবু বলিলেন, ‘কিন্তু অমিয় সান্যাল বাপের পথটি কেন ধরল?’

ব্যোমকেশ ক্ষণেক তাঁহার দিকে চাহিয়া বলিল, ‘এখনও বুঝলেন না? এ যে নিতান্তই প্রতিহিংসা।’

বীরেনবাবু অবাক হইয়া বলিলেন, ‘প্রতিহিংসা?’

ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িল, ‘বাপের প্রতি। সে জানতে পেরেছিল সুবিমল সান্যালের হাতেই তার মা খুন হয়েছেন। সে এও জানতে পেরেছিল যে শ্যামা আর কুন্তী দু’জনেই ছিল সুবিমলের ডান হাত। খেয়াল করুন, হত্যার পর দু’জনের শরীরের ভেতর থেকেই কিভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বার করে নেওয়া হয়েছিল। ঠিক যে ভাবে বার করে নেওয়া হয়েছিল রেঙ্গুনের নিরীহ বাঙালি মেয়েগুলির শরীর থেকে।’

বীরেনবাবু চিন্তিত স্বরে বলিলেন, ‘বুঝতে পারছি। কিন্তু সে খবর অমিয় পেল কোথা থেকে?’

ব্যোমকেশ একটি ক্ষুদ্র শ্বাস ফেলিয়া বলিল, ‘কুহু তাকে খবর দিয়েছিল বীরেনবাবু। কিন্তু কুহু যে কে সে নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই, শুধু মনে হয় সুবিমলের অসংখ্য পাপকাজে তার জীবনটিও কিছু ভাবে সর্বস্বান্ত হয়েছিল।’

এই সময় বীরেনবাবুর কনস্টেবলদের একজন আসিয়া বলিলেন, ‘স্যার, বাথরুমের কল থেকে একটানা জল পড়ার শব্দ হচ্ছে।’

‘সে কি হে, বাথরুমের মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে গেল নাকি লোকটা?’

ব্যোমকেশ হঠাৎ ‘সর্বনাশ’ বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। তারপর দৌড়াইয়া গিয়া বাথরুমের দরজায় ক্রমান্বয়ে ধাক্কা দিতে লাগিল। ব্যোমকেশের চিৎকারে কিছু একটা ছিল, বীরেনবাবু এবং কনস্টেবলরাও দৌড়াইয়া আসিলেন, চার জন মানুষ সর্বশক্তি দিয়া দরজায় ধাক্কা দিতে লাগিলেন। মিনিট তিন চার পর বাথরুমের দরজার পাল্লাটি খুলিয়া এল।

আমরা হুড়মুড় করিয়া বাথরুমে ঢুকিয়া পড়িলাম।

বাথরুমের মাটিতে সুবিমল সান্যাল পড়িয়া রহিয়াছেন, বাঁ হাতে ধরা একটি সিরিঞ্জ। মুখ থেকে গ্যাঁজলা ফেনাইয়া উঠিতেছে। সুবিমলের ডান পাশে একটি সিরামের বোতল, তার ভিতরে আর কোনো পদার্থ নেই বলেই বোধ হল।

ব্যোমকেশ এক ঝলক দেখিয়া বলিল, ‘নিজের শাস্তিটি যথাযোগ্য বেছেছেন ভদ্রলোক। এ সেই বেলাডোনা বিষের সিরাম।’

সপ্তাহখানেক পরের কথা, কলিকাতা শহরে এখনো জাপানী বোমাবর্ষণ ছাড়া আর কোনো কথা নাই। কিন্তু আশঙ্কাটি বাস্তবায়িত হওয়ার জন্যই হোক বা ক্ষয়ক্ষতি সেরকম না হওয়ার জন্যই হোক, মানুষজন শহরে ফিরিয়া আসিতে শুরু করিয়াছেন। হ্যারিসন রোডও ধীরে ধীরে তার প্রাণচঞ্চলতা ফিরিয়া পাইতেছে।

ব্যোমকেশ প্রভাতী সংবাদপত্রটি টেবলের উপর ছুঁড়িয়া দিয়া বলিল, ‘কাগজওলারা এখন সুবিমল সান্যালের চোদ্দ গুষ্টিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।’

বলিলাম, ‘তারা যে তোমার চোদ্দ গুষ্টিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে না এই ঢের।’

কথাটির মধ্যে কিছু সারবত্তা আছে, অমিয় এবং সুবিমল দু’জনেই মারা গেলেও কমিশনার সাহেব ব্যোমকেশের প্রভূত প্রশংসা করিয়া সাংবাদিকদের জানাইয়াছিলেন ব্যোমকেশের সাহায্য ব্যতীত রামবাগানের রহস্য সমাধান সম্ভব হইত না। ফলে বীরেনবাবুর প্রভূত জ্বলন ঘটিয়াছিল, কাগজেও পর পর দুই তিন দিন ব্যোমকেশের নাম উঠিয়াছিল।

হঠাৎ মনে পড়িল সেই হাতের লেখার রহস্য নিয়ে ব্যোমকেশ আর আলোকপাত করেনি। জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘অমিয় সান্যাল যে কুহুর সঙ্গে পরিচিত হয় দেবদত্তর সূত্রেই সে নিয়ে তো সন্দেহ নেই। এই ছদ্ম-অপহরণের প্ল্যানটিও কি তাহলে কুহুরই?’

ব্যোমকেশ একটি চায়ের কাপটি নামাইয়া বলিল, ‘কুহু যে কে, কি তার আসল উদ্দেশ্য ছিল সে তো জানার উপায় নেই। সুবিমলের ওই বাড়িটি ড্রাগ চোরাচালানের কাজেই ব্যবহৃত হত, ওখানে থাকার ব্যবস্থা শুরুতে ছিল না। আমি জেনেছি ও বাড়িতে কুহু উঠে এসেছিল অতি সম্প্রতি। মনে হয় অমিয়র ছদ্ম-অপহরণের প্ল্যানটি বানানোর পর, যাতে অমিয়রও লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে সুবিধে হয়। এবং তুমি শুনলে বিস্মিত হবে, এ কাজে কুহুকে সাহায্য করেছিল বাঁটুল।’

আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম, ‘বলো কি? বাঁটুল?’

ব্যোমকেশ হাসিল, ‘আমাদের বাঁটুলও যে পঞ্চশরে কাবু হতে পারে এবারে সেই প্রমাণটুকুই হাতেনাতে পেলুম। ও বাড়িতে অসংখ্য ঘর সে কথা বাঁটুল জানত, সুবিমলের চাকরকে সে হাত করেছিল কুহুর জন্য একটি ঘর ছেড়ে দিতে। সুবিমল জানতেন না, চাকরটির উপরি পাওনা হত। এ ভাবেই সে আরো কয়েকটি ঘর ভাড়া দেয় ওই বাড়িতে, অমিয় এরকমই একটি ঘরে খদ্দের সেজে লুকিয়ে থাকত।’

‘তোমার কি মনে হয় সুবিমল কুহুকে চিনতেন?’

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল, ‘তা তো জানি না। তবে মনে হয় না কলকাতায় সুবিমলের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ঘটেছিল, যদিও সুবিমল এবং শ্যামা – কুন্তীদের ওপর প্রতিহিংসা নিতেই তার কলকাতা আসা। সে আটঘাট বেঁধেই নেমেছিল, আমার ধারণা অমিয়কে প্রলুব্ধ করে কুহু-ই।’

‘শুধু কুহুর কথাতেই তাহলে অমিয় খুনগুলো করে?’

ব্যোমকেশ চিন্তামগ্ন স্বরে বলিল, ‘শুধু কথা তো নয়, কুহু যেরকম প্ল্যান করে এসেছিল তার কাছে যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকারই কথা। সেসব দেখে এবং মা’র খুন হওয়ার কথা জানতে পেরে অমিয় যেনতেন প্রকারেণ প্রতিহিংসা নিতে চেয়েছিল।’

বলিলাম, ‘চিঠিগুলি কার লেখা? কুহুর?’

‘উঁহু, কুহুর হাতের লেখা তো তুমি চেনো। তিনটি চিঠিই লিখেছিল অমিয়। সুবিমল সান্যাল আমাকে প্রথম যে চিঠিটি দিয়েছিলেন সেটায় একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেয়েছিলাম – ও’কারের ওপর মাত্রা দেওয়া। সেই এক জিনিস দেখতে পাই দেবদত্তর পকেট থেকে পাওয়া চিঠিতে। প্রথম চিঠিটি বেঁকাচোরা ভাবে লেখা হয়েছিল কারণ বাবার কাছে নিজের হাতের লেখা লুকনোর জন্য অমিয় বাঁ হাতে লিখেছিল সে চিঠি। কিন্তু দেবদত্তর চিঠিতে ওই মাত্রাওলা ও’কার দেখেই চমকে উঠেছিলাম, বুঝেছিলাম অমিয় নিজেই যখন চিঠি লিখেছে দেবদত্তকে তখন সে স্বেচ্ছায় লুকিয়ে রয়েছে কোনোখানে। নিজের অপহরণকান্ড নিজেই কেন সাজিয়েছে সে ব্যাপারটা প্রথমে ধরতে পারিনি। আমি টাকাপয়সার সূত্রে ভাবছিলাম, ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরীতে বেলাডোনা বিষের কথাটা জানার পর থেকেই বুঝতে পারি টাকাপয়সা নয়, প্রতিহিংসাই এখানে মোটিভ। দেবদত্তর খুনটা অবশ্য অন্য কারণে, বীরেনবাবু ওই একটি ব্যাপারে নিজের অজান্তেই ঠিক বলে ফেলেছিলেন – কুহুর সঙ্গে অমিয়র আলাপ দেবদত্তই করিয়েছিল, সুতরাং তাকে পৃথিবী থেকে সরাতেই হত।’

আমি কিন্তু কিন্তু করিয়া বলিলাম, ‘তাহলে সেদিন যে বড় বললে মুক্তিপণের দাবী জানিয়ে দ্বিতীয় যে চিঠিটি এসেছিল তার হস্তাক্ষরের সঙ্গে প্রথম চিঠির হস্তাক্ষরের কোনো মিল নেই?’

ব্যোমকেশ মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল, ‘নেই-ই তো।’

‘তার মানে?’

‘তার মানে এই যে আমাদের আসল চিঠিটি সুবিমল বাবু দেখান নি। যেটি দেখিয়েছিলেন সেটি জাল, ওনার নিজের হাতে লেখা। বীরেন বাবু কয়েকদিন আগে আসল চিঠিটি সুবিমলের দেরাজ থেকে উদ্ধার করেছেন। সে চিঠিতে লেখা ছিল নিজের কৃত পাপের পরিণাম চুকনোর জন্য তিরিশ হাজার টাকা নিয়ে দেখা করবে। স্বাভাবিক ভাবেই সুবিমল সে চিঠি আমাকে দেখাতে ভরসা পান নি, কারণ কোন পাপের কথা বলা হচ্ছে সে নিয়ে প্রশ্ন উঠত।’

‘কিন্তু আরো একটা কথা ব্যোমকেশ। সুবিমলের তো টাকা নিয়ে আরো একদিন পরে যাওয়ার কথা ছিল, নয় কি?’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘সে নেহাত ধোঁকা। কুহুকে যে মুহূর্তে আমি কথা দিলাম তাকে রক্ষা করার জন্য রাস্তার মোড়ে দাঁড়াব, তখনই অমিয় নতুন একটি চিঠি তৈরি করে সুবিমলকে সেদিনকেই বস্তির ওই নির্জন প্রান্তটিতে ডেকে পাঠাল। সুবিমল নিজের প্রাণহানির আশঙ্কা বোধহয় করেছিলেন, কিন্তু তিনি ছেলেকে সত্যিই ভালোবাসতেন। ছেলেকে ছাড়ানোর জন্য যে বিপদই আসুক না কেন তার সম্মুখীন হতে চেয়েছিলেন। এমনই নিয়তি যে জানতেও পারলেন না সেই ছেলেই তাঁকে খুন করার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে।’

মনে পড়িল বাড়ি থেকে বেরনোর সময় সুবিমল ‘অজিতবাবু’ বলিয়া ডাকিয়া উঠিয়াছিলেন। সে কথা বলাতে ব্যোমকেশ বলিল ‘শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বোধহয় দোলাচলে ভুগছিলেন। চিঠিতেও তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে জানাতে বারণ করা হয়েছিল, বলা হয়েছিল নাহলে ছেলের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।’

‘কিন্তু তোমার সন্দেহ হল কি করে?’

‘ওই যে তুমি বললে ব্যাঙ্ক ম্যানেজার নিজে বাড়িতে টাকা নিয়ে এসেছিল। সুবিমল সেদিন দুপুর বিকাল নাগাদ ব্যাঙ্কে গিয়ে পরের দিনের জন্য টাকা তুলে আনবেন ঠিক করেছিলেন। কিন্তু সকালে চিঠি পেয়ে দেখলেন সেদিনকেই টাকা নিয়ে যেতে হবে, সম্ভবত প্যানিক করে ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকেই টাকা যোগাড় করে চলে আসতে বলেছিলেন।

আমার অবশ্য নিছক সন্দেহই হয়েছিল, তাই পুঁটিরামকে বলেছিলাম বাঁটুলকে নিয়ে সুবিমলের বাড়ির সামনে পাহারা দিতে। সুবিমল না বেরোলে তো কোনো সমস্যাই নেই। বেরোলে যেন বাঁটুল তাকে ফলো করে, আর পুঁটিরাম এসে রামবাগানের গলির মোড়ে আমাকে খবর দেয়। আমরা গায়েব হলে কুহুর সন্দেহ হতে পারে এই ভেবে ওকে আরো একটা কাজ দিয়েছিলাম, কোনো একটি বন্ধুকে দিয়ে কুহুকে কিছুক্ষণের জন্য ব্যস্ত রাখতে।’

হাসিয়া বলিলাম, ‘পুঁটিরাম তো দেখছি এ যাত্রা আমার থেকেও বেশী সার্ভিস দিয়েছে তোমায়।’
ব্যোমকেশ একটি কটাক্ষ হানিয়া বলিল, ‘তাই তো দেখছি। ভাবছি পরের অভিযানগুলো থেকে তোমাকে শুধু লেখালেখির দায়িত্বটুকুই দেব। এই যে পুঁটিরাম, তোমাকে নিয়েই কথা হচ্ছিল।’

পুঁটিরাম একগাল হাসিল, বলিল, ‘চিঠি দিতে এলাম বাবু।’

‘চিঠি, এলো কখন?’

‘এক্ষুনি এল বাবু।’

ব্যোমকেশ অবাক হইয়া বলিল, ‘এই সাতসকালেই পিওন চিঠি দিতে শুরু করেছে?’

‘আজ্ঞে পিওন না বাবু, একটি অল্পবয়স্ক ছেলে এসে দিয়ে গেল।’

আমি উৎসাহভরে বললাম, ‘খোলো খোলো, কাগজওলাদের দৌলতে তোমার তো এখন পোয়া বারো। মনে হচ্ছে নতুন মক্কেল।’

ব্যোমকেশ খামটি ছিঁড়তে বেরিয়ে এল একটি চিঠি এবং একটি আংটি। চিঠিতে এক ঝলক চোখ বুলিয়েই উত্তেজনায় ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল। তারপর শশব্যস্ত হইয়া ডাকিল, ‘পুঁটিরাম, পুঁটিরাম।’

পুঁটিরাম দৌড়াইয়া আসিতে ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, ‘একটি অল্পবয়স্ক ছেলে দিয়েছে বললে এ চিঠি?’

পুঁটিরাম ঘাড় চুলকাইয়া বলিল, ‘আজ্ঞা হাঁ, প্যান্ট শার্ট পরা ছেলে। তবে মুখটা বড় কচি দেখতে।’

ব্যোমকেশ অস্ফূটে বলিয়া উঠিল, ‘কুহু’।

আমি হতভম্ব হইয়া বলিলাম, ‘কুহু?’

ব্যোমকেশ হাতের চিঠিটি আমার দিকে আগাইয়া দিল।

দেখিলার কুহুর হস্তাক্ষরই বটে।

লিখিয়াছে, ‘ব্যোমকেশ বাবু – সুবিমল সান্যালকে সপরিবারে নাশ করিব, এই পণ করিয়া আসিয়াছিলাম। সে সপরিবারেই গত হল বটে কিন্তু আমার কোনো ইচ্ছাই পূর্ণ হইল না। না পারিলাম সুবিমলকে মারিতে, না পারিলাম অমিয়কে রাখিতে। অমিয়কে দেবদত্তর সঙ্গে রামবাগানে আসিতে দেখিয়া ধরিয়া লইয়াছিলাম সে তার বাবার মতনই নরপিশাচ। আমার সে ধারণা ভাঙ্গিতে বেশী সময় লাগেনি। প্রথম দিন থেকেই তাকে ভালোবাসিয়া ফেলিয়াছিলাম, আমার আসল পরিচয় যখন সে জানিত না তখনো একটি দিনের জন্যও সে আমায় অসম্মান করে নাই। সে সততই একাকী ছিল, মার মৃত্যু তাকে মানসিক ভাবে নিঃশেষ  করিয়াছিল। তার মার মৃত্যুর প্রতিশোধ আমরা একসাথে নেওয়ার শপথ লইয়াছিলাম, তার কারণও ছিল। অমিয়র মার জন্যই সুবিমল সান্যাল আমাকে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন প্রয়োগে মারিতে পারেন নাই। তাঁর সাহায্যেই আমি পলাইতে সক্ষম হই, কিন্তু সুবিমলের হাতে তাঁর প্রাণ যায়। রেঙ্গুনের পাদ্রিদের দয়ায় লেখাপড়া শিখিতেছিলাম, হয়ত সুস্থ জীবন যাপন করিতে পারিতাম। কিন্তু প্রতিহিংসার আগুন সে ইচ্ছা গ্রাস করিল। তাই অমিয় নিজেও যখন প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হইয়া খুন করিতে শুরু করিল আমি তাহাকে বাধা দিই নাই। কুন্তী বা শ্যামার প্রতি আমার সামান্যতম সহানুভূতিটুকুও ছিল না, রেঙ্গুনের মেয়েরা আজও এদের নাম শুনিলে শিহরিয়া ওঠে। রমলা যথার্থই আমার সই ছিল, কিন্তু শ্যামাকে খুন করিবার সময় সে অমিয়কে দেখিয়া ফেলিয়াছিল। অমিয়র সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা সে জানিত না, বেচারী আমাকে এসেই তার গোপন কথাটি বলে। তাই আর কোনো উপায় রহিল না।

আমাকে সুবিমলের কাছে বেচিয়া শ্যামা একটি সোনার আংটি পাইয়াছিল। অমিয় তাই প্রবল আক্রোশে খুনের পর তার অনামিকাটি কাটিয়া লয়। সে অনামিকায় তখনো একটি আংটি ছিল, যা আমার কোনো কাজে লাগিবে না। আপনার জিম্মায় রাখিয়া গেলাম।

যতদিন না ফের দেখা হয় ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন। কিন্তু দেখা আর একটিবার হবেই, সে দিনের জন্য প্রস্তুত থাকিবেন। অমিয়কে আমার জীবন থেকে আপনিই কাড়িয়া লইয়াছেন, সে মূল্য না গুনিয়া লইয়া এ পৃথিবী ছাড়ি কি করে বলুন?’।

চিঠিটি পড়িয়া মিনিটখানেক বাক্যস্ফূর্তি হইল না। তারপর ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘কি বুঝলে? তোমার কি প্রাণহানির সম্ভাবনা দেখা দিল?’

ব্যোমকেশ আংটিটি ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিতেছিল, আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, ‘কিছু কিছু নয় বাবা, কিছু কিছু নয়।’

আমাকে উত্তেজিত হইতে দেখিয়া এবার সে হাসিয়া ফেলিল। আমার হাত থেকে চিঠিটি লইয়া ভাঁজ করিতে করিতে বলিল, ‘বিচলিত হয়ো না। কুহুর যদি ইচ্ছা হয় তবে নিশ্চয় আমাদের আবার দেখা হবে তবে আমার ধারণা খুব শীঘ্র তা হওয়ার নয়। রেঙ্গুল – কলকাতা মিলিয়ে সুবিমলের সাহায্যকারীর সংখ্যা খুব কম হবে না, কুহু আপাতত যাবে তাদের থেকে এক এক করে ভবনদী পারের কড়ি বুঝে নিতে। ও নিয়ে ভেবে মাথা খারাপ কোরো না, তুমি বরং কাগজটা আরেকবার বাড়াও।’

কুহুর কথাগুলি আমার মাথা থেকে বেরোচ্ছিল না, বিক্ষিপ্ত মনের কিছু বিনোদন আবশ্যিক। কাগজে চোখ বুলাইয়া বলিলাম, ‘সিনেমা দেখতে যাবে? নতুন সিনেমা এসেছে, বিষবৃক্ষ’।
ব্যোমকেশ একটি হাই তুলিয়া বলিল, ‘বেলাডোনাতেও মন ভরেনি দেখছি, আরো বিষ চাইছ। তা আছেন কে?’

‘আছেন অনেকেই এবং নবাগতা সুনয়না দেবী’।

ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইল, ‘সুনয়না দেবীর সঙ্গে মোলাকাত পরে কখনো হবে। বরং চলো, হাতিবাগান ঘুরে আসি। না ফাটা বোমার সন্ধানে সে চত্বরে নাকি মেলা বসে গেছে’।

 

 

 

Advertisements

14 thoughts on “আবার ব্যোমকেশ – গরলতমসা

  1. একটানে পড়ে ফেলে দিলাম – প্রবীরবাবু, লাস্টের টুইস্টগুলো মারাত্মক!! আচ্ছা – একটা সুখবর শুনছিলাম যেন 😉 সেটা যদি হয় তো অনুরোধ ডিটেকশন নয়, থ্রিলার ফরম্যাটে হোক|

    Like

  2. Sudeep Chatterjee says:

    শরদিন্দুও এই লেখা পড়লে হাততালি দিয়ে উঠতেন। ব্রাভো।

    Like

  3. Debankur Bhowmik says:

    Prabirendra da byomkesh o feluda dutoi khub bhalo hoyeche .Aro lekhar oppekhay thakbo .
    Tomar lekha Quiz book Quizzhotika pdf link ta Pele khub bhalo hoto.
    Pele khub khushi hobo .Ami tomar lekhar fan hoye gelam.

    Like

  4. দারুন, সিনেমা মেটেরিয়াল। তবে প্লেগের রোগীদের কফিনে করে রেঙ্গুন থেকে কলকাতা পাঠানো হতো এটা বোধহয় তখনকার প্লেগ নিয়ে প্যানিক মনে রাখলে অসম্ভব বলে মনে হয়। কিন্তু ব্যোমকেশের একটি মহিলা প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে জেনে ওসব নিয়ে মাথা ঘামাবো না

    Like

  5. bhabatosh naik says:

    Golpo ta khub tara tari chole jache.fole tan tan utejona bhab ta paba jache na.khub halka ekta golpo hoy jache.bomkes thik hoy uthche na.

    Like

  6. Subhajyoti chanda says:

    Twist gulo darun laglo.. purono byomkesh k Fire pelam.. saradindu Babu nije apnar pith chapre diten moshai… darun laglo… ritimato gograse gillam galpota.. aro byomkesher ashay roilam apnar theke. Akta request Jodi samvob hoy porer galpo guloy pls tag kore deben. Anek samay miss hoye jay..

    Like

  7. Somnath dutta says:

    Khyb valo laglo feluda aar byomkesh dutoi pore…tobe amr ektu fast mone hoyeche specially byomkesh ta.aaro opekhay roilam….

    Like

  8. মৌসুমী says:

    শরদিন্দু শরদিন্দুতেই (শারদ শশী)পড়লাম। যেভাবে তিনি সে সময়ের কোলকাতার পথঘাট চিনিয়েছিলেন, একালেও সেই পথেরই অলিগলিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলাম। আরও লিখুন।

    Like

Leave a Reply to scorpydesign Cancel reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s