ডাকিনী ও সিদ্ধপুরুষ

(বিক্রমশীল মহাবিদ্যালয় থেকে তিব্বতে যাওয়ার পথে অতীশ দীপঙ্করকে সম্মুখীন হতে হয়েছিল একাধিক অতিলৌকিক রহস্যর, সেসব গল্পের খোঁজ হয়ত ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’র পাঠকরা ধীরে ধীরে পাবেন। আজকে রইল প্রথম উপাখ্যানটি, ছাপার অক্ষরে এটি প্রথম বেরোয় ‘টগবগ’ পত্রিকার সরল দে সংখ্যায় (২০১৬)। সঙ্গের অনবদ্য ছবিগুলি এঁকেছেন শিল্পী সুমিত রায়। )

tb-dakini-1

এক

জয়শীল কটমট করে তাকালেন, “কী নাম বললি? বায়চং?”

বায়চং হাতে ধরা কমলা লেবুটার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল।

“ফের মিথ্যে কথা। এই ছোঁড়া, এই, তাকা এদিকে”।

বায়চং জয়শীলের দিকে মুখটা ঘোরাতে দেখা গেল ওর কপালটা বেশ ফুলে রয়েছে, একটা স্পষ্ট কালশিটে দাগও দেখা যাচ্ছে। সেই দেখে বীরভদ্র মহা ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়লেন, “দেখেছেন কান্ড! আহা রে, কোন পাষন্ড দুধের শিশুটাকে এমন করে মেরেছে”।

জয়শীল কড়া গলায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কালশিটে দেখে তিনিও এখন থেমে গেলেন। বীরভদ্রকে বললেন, “তাঁবুর মধ্যে ওষুধ আছে। দাঁড়ান, নিয়ে আসি”।

জয়শীলকে তাঁবুর দিকে যেতে দেখে বায়চং-ও গুটি গুটি পায়ে সেদিকেই রওনা দিচ্ছিল। ওর ছেঁড়া কামিজের খুঁট ধরে বীরভদ্র আটকালেন, “সত্যিই তোর নাম বায়চং?”

বায়চং পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বলল, “হুঁ, আর আমার বোনের নাম ডেকি”।

“বোঝো! তোর বাবা মা কেমনতর নাম দিয়েছে রে? ছেলের নাম ছেলে আর মেয়ের নাম মেয়ে?”

“আমার বাবা মা নেই তো”, বলেই চুপ করে গেল বায়চং।

বীরভদ্রও শুনে চুপটি করে বসে রইলেন, খেয়াল রইল না হাতের মগে মাখন চা ঠান্ডা হয়ে আসছে। অনেক অনেক দূরে লাংটাং পাহাড়ের চুড়োয় সোনা রঙ ধরতে শুরু করেছে। কতদিন পর গাঢ় কুয়াশার বদলে মিঠে রোদ দিয়ে দিনটা শুরু হল, কিন্তু মনটা কিরকম চুপসে রয়েছে।

জয়শীল এদিকে তাঁবুর মধ্যে ঢুকতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়েছেন। ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে “সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং বোমানাংসি জানতাম্, দেবাভাগং যথা পূর্বে সং জানানা উপাসতে”। জয়শীল বিক্রমশীল মহাবিদ্যালয়ে সংস্কৃত চর্চা করেছেন, যিনি স্তোত্রপাঠ করছেন তাঁর কাছেই বেদ – বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করেছেন। এ স্তোত্রের মানে তাই তিনি জানেন – সবাইকে একসঙ্গে চলতে বলে হচ্ছে, বলা হচ্ছে একই ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতে।

“ভালো হোক, মঙ্গল হোক, শান্তি বিরাজ করুক”, বলতে বলতে জয়শীলের গুরু বেরিয়ে এসেছেন। এই কথাগুলোর মানে জয়শীল অনেকদিন বুঝতে পারতেন না। এ ভাষা গুরুর মাতৃভাষা। বিক্রমশীলেরও পূর্ব দিকে তাঁর দেশ, সেখানেই নাকি এ ভাষায় মানুষে কথা বলে, সে ভাষার নাম বাংলা। জয়শীল অভ্যস্ত না হলেও বাংলা ভাষা শুনতে তাঁর বেশ লাগে। বীরভদ্রও প্রায়ই বলে থাকেন এ ভাষার মাধুর্যের কথা।

জয়শীল মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালেন, “সুপ্রভাত”।

দীপঙ্কর মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন, এতদিনে বকাঝকার ফল পাওয়া গেছে। জয়শীল আর বীরভদ্র দু’জনেই দীপঙ্করকে দেখলেই ‘প্রভু’ না লাগিয়ে কথা বলতেন না। বীরভদ্র তো বিক্রমশীলায় কতবছর ধরে তাঁর কাছে বৌদ্ধশাস্ত্রের পাঠ নিয়েছেন, প্রভু বলার বদ অভ্যাসটা বেশ চলে গেছিল। দীপঙ্করকে তিব্বতে নিয়ে যাবেন বলে জয়শীল আসা মাত্রই জয়শীলের দেখাদেখি বীরভদ্রও আবার প্রভু বলতে শুরু করেছিলেন। শেষে খানিকটা বাধ্য হয়েই তাঁকে বলতে হয়েছে ফের প্রভু ডাক শুনলে নেপাল মাঝরাস্তা থেকেই ফের বিক্রমশীলার দিকে রওনা দেবেন।

“সুপ্রভাত জয়শীল, রোদ দেখে মন ভালো হয়েছে তো?”

“আপনি যেদিন জানিয়েছিলেন যে আমাদের সঙ্গে তিব্বতে আসবেন সেই দিন থেকেই আমার মনে অসীম সুখ, এক দিনের জন্যও তাতে বাধা পড়েনি”।

দীপঙ্কর জানেন এ শুধু ভক্তির প্রলাপ নয়, জয়শীল হৃদয় থেকে কথাগুলো বলছেন। এত ভালোবাসাকে তিনি তো ছাড়, স্বয়ং বুদ্ধও ফেরাতে পারতেন কিনা সন্দেহ আছে।

জয়শীল বিনীত স্বরে বললেন, “কিন্তু প্রভু, আজ সকালে একটা সমস্যা এসে উপস্থিত হয়েছে”।

“জয়শীল!”

ভুল বুঝতে পেরেই জয়শীল করুণ গলায় বললেন, “ক্ষমা করুন।কিন্তু ভাববাচ্যে সম্বোধন করা এখনো ঠিক আয়ত্তে আসেনি”।

দীপঙ্কর রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেললেন, “আচ্ছা, বলো বলো। আজ আবার কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছ তুমি?”

জয়শীল জানালেন সকাল সকাল তাঁদের ঘোড়াদের ঘাস দিতে গিয়ে দেখেন একটি বাচ্চা ছেলে, বছর ছয় কি সাত তার বয়স, ঘোড়াদের জন্য রাখা একটা খড়ের গাদায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে রয়েছে। সে কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে কিছুই বলছে না, অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর শুধু জানিয়েছে তার নাম বায়চং। জয়শীল ওকে একটা লেবু আর চা দিয়েছেন, কিন্তু সে মুখে কিছুই তুলছে না”।

“আমার ধারণা নামটাও বানানো। বায়চং মানেই ছোট ছেলে, বানানোর সময় মাথায় আর কিছু আসে নি তাই ওই শব্দটাই বলে দিয়েছে”।

মাথা নাড়লেন দীপঙ্কর, “নাও হতে পারে। পাহাড়ি গ্রাম, সব থেকে কাছের ছোট শহরটায় যেতে হলেও হয়ত পাঁচ ছ দিন ঘোড়ায় চড়ে যেতে হবে। নাম রাখাটাই বাহুল্যের ব্যাপার এদের কাছে”।

জয়শীল একটু ইতস্তত করে বললেন, “আর…আর ছেলেটির শরীরে নির্যাতনের কিছু চিহ্ন আছে”।

“সে কি কথা!”, দীপঙ্কর চমকে উঠলেন, “কে মেরেছে কিছু বলেছে নাকি?”

“না প্রভু, আমি ওর কপালের কালশিটে দেখেই দৌড়ে এসেছি ওষুধ নিয়ে যেতে। বীরভদ্র অবশ্য আছেন ছেলেটির সঙ্গে”।

দীপঙ্কর এতই চিন্তায় পড়ে গেছেন যে জয়শীলের ‘প্রভু’ ডাকটি আর কানে পৌঁছল না।

জয়শীলকে নিয়ে দীপঙ্কর ছেলেটিকে দেখার জন্য চললেন। মাঝরাস্তাতেই বীরভদ্রদের সঙ্গে দেখা, বীরভদ্র ছেলেটির হাত ধরে এদিক পানেই নিয়ে আসছেন।

দীপঙ্করকে দেখা মাত্র একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। ছেলেটি বীরভদ্রের হাত থেকে নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে তীরবেগে দীপঙ্করের পায়ে এসে লুটিয়ে পড়ল। জয়শীল বা দীপঙ্কর হাঁ হাঁ করে ওঠার আগেই সে প্রাণপণে দীপঙ্করের পায়ে মাথা ঠুকতে লাগল।

জয়শীল বীরভদ্রের দিকে তাকালেন। দুজনেই স্তম্ভিত, কি বলবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। বীরভদ্র গলাটা একটু খাঁকরিয়ে বললেন, “আপনি চলে আসার কিছুক্ষণ পর থেকেই এমন ফোঁপাতে শুরু করল ভাবলাম এদিকেই নিয়ে আসি”।

দীপঙ্করের চোখও ভিজে এসেছে। তিনি বায়চংকে মাটি থেকে তুলে ধরেছেন। ওর মাথায়, কপালে হাতে বোলাচ্ছেন।

বায়চং এর চোখের জল থামছে না মোটেই। সে অস্ফূট স্বরে বারবার কি যেন কথা বলে চলেছে।

জয়শীল বায়চংকে ভোলাবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, শুনলেন ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে বলে চলেছে “ঠাকুর, তুমি আমার বোনকে এনে দাও”।

দীপঙ্করও শুনতে পেয়েছেন।

বায়চং কে কোলে তুলে নিয়ে তিনি তাঁবুর দিকে রওনা দিলেন, পেছনে জয়শীল এবং বীরভদ্র।

 

দুই

জয়শীল একটু চিন্তিত স্বরে বললেন, “আমাদের সঙ্গের লোকেরা সবাই এগিয়ে গেছে। এখন বায়চং এর গ্রামে ফেরত গিয়ে ওকে দিয়ে আসতেই তো দিন দুই লাগবে। তারপর আবার এই এক পথে ফেরা। মানে কম করে চারটে দিন নষ্ট।

দীপঙ্কর এক দৃষ্টিতে জয়শীলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সে সামান্য কিছু খাবার খেয়ে এখন ঘুমোচ্ছে। বায়চং এর কামিজটা খোলার পরে দেখা গেছে তার পিঠেও অসংখ্য কালচে লাল দাগ।

“আমরা যখন ওদের গ্রাম থেকে রওনা দিই তখনই তাহলে আমাদের পিছু পিছু এসেছে।“, বীরভদ্র নিজের মন্ডিত মুস্তকে হাত বোলাচ্ছিলেন, চিন্তায় পড়েছেন তিনিও।

দীপঙ্কর বীরভদ্রের দিকে তাকালেন, “আমরা কিন্তু এসেছি ঘোড়ায় চড়ে। অতটুকুন ছেলে নিশ্চয় ঘোড়ায় চড়তে পারে না। আর ঘোড়া পাবেই বা কী করে?”

“তাই তো”, বীরভদ্র তড়িঘড়ি উঠে বসলেন…… “তাহলে কি, তাহলে কি…”

মাথা নাড়লেন দীপঙ্কর, “হ্যাঁ, ও কারোর সঙ্গে এসেছে। কিন্তু কে সে? আর আমাদের সামনে সে দেখাই বা দিচ্ছে না কেন?”

জয়শীল বললেন, “ওকেই জিজ্ঞাসা করে দেখা যাক”।

হাত ওঠালেন দীপঙ্কর, “থাক্ জয়শীল, ওকে ঘুমোতে দাও। ওর শরীরের অবস্থা দেখেছ? শুধু এই দু’দিনের পরিশ্রমে নয়, বহুদিনের নির্যাতনে ও অবসন্ন। বরং এখনো অবধি ও আমাদের যা বলেছে সেটুকু নিয়ে ভাবা যাক”।

বীরভদ্র বললেন, “ওর বোনকে কোনো ডাইনীবুড়ি ধরে নিয়ে গেছে, এটুকুই তো শুধু বলেছে। ডাইনীবুড়ি, অ্যাঁ?”

দীপঙ্কর উঠে পায়চারি করছিলেন। বীরভদ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সব কথা যে ওর মুখ থেকেই বেরোবে তা তো নয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা অনুক্ত থাকে, বুদ্ধি খাটিয়ে শুনে নিতে হয়”।

এবারে বীরভদ্র একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। জয়শীলের দিকে আড়চোখে তাকালেন, জয়শীলও মাথা নাড়ছেন, বোঝেন নি।

“দেখো, ও নিজের চোখে দেখেছে কেউ বা কারা ওর বোনকে ধরে নিয়ে গেছে। সে ডাইনী কি অন্য কিছু সে প্রশ্নে এখন যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু কথাটা হল নিজের চোখে দেখেছে মানে তখন ভাই বোন একসঙ্গেই ছিল। তাই যদি হবে, শুধু মেয়েটিকেই ধরে নিয়ে গেল কেন?ওকেও তো ধরতে পারত”।

বীরভদ্র ঘন ঘন মাথা নাড়তে লাগলেন, দীপঙ্কর খাঁটি কথা বলেছেন। অবশ্য সর্বদাই তাই বলে থাকেন।

জয়শীলের মনে অবশ্য শান্তি নেই। বহু বছরের সাধ্যসাধনার ফলে দীপঙ্কর তিব্বতে যেতে রাজি হয়েছেন। যতক্ষণ না দীপঙ্করকে নিয়ে তিব্বতের রাজদরবারে হাজির হচ্ছেন জয়শীলের মনে শান্তি নেই। এমনিতেই বিপদসংকুল পথ, তারপর দীপঙ্কর নিজের মতন করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে চলতে চান। ফলে জনা পঁয়ত্রিশ সহচরকে আগে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। এমনিতেই দুশ্চিন্তার শেষ নেই, তার ওপর এই উটকো ঝামেলা।

দীপঙ্কর জয়শীল কি ভাবছেন সেটা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছেন। জয়শীলকে বললেন, “গুরু কলপের কথা শুনিয়েছিলাম না তোমাকে। সবাই যখন তাঁকে পাগল বলে খেপাত, কলপ বিড়বিড় করে কী বলতেন মনে আছে?”

জয়শীল নতমস্তকে ঘাড় নাড়লেন, “আত্ম ও পর এই দ্বৈতভাব থেকেই জন্ম হয় দুঃখের”। জয়শীলের মুখটি লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, “আমি আসলে……”।

“তোমার চিন্তা নেই জয়শীল। তিব্বতে আমরা ঠিকই পৌঁছব, জ্ঞানের চর্চা ঠিকই শুরু হবে। কিন্তু পথের মানুষকে না চিনে গেলে সে জ্ঞানে কি লাভ বলো তো?”

জয়শীল পালাতে পারলে বাঁচেন, এমন সময় বীরভদ্র একটু গলা খাঁকারি দিলেন। জয়শীল এবং দীপঙ্কর বীরভদ্রের দিকে তাকাতে তিনি ইশারায় বিছানার দিকে দেখালেন।

বায়চং উঠে বসেছে, এক দৃষ্টিতে দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে।

দীপঙ্কর ওর পাশে বসে মাথায় হাত দিলেন।

“এবার আমরা যাব বায়চং, তোমার বোনকে ফিরিয়ে আনতে”।

বায়চং এর চোখ ঝিকমিকিয়ে উঠল, পারলে তখনই দৌড়ে বেরোয়।

দীপঙ্কর ওকে শান্ত করে পাশে বসালেন, কিছুক্ষণ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “কে মেরেছে তোমাকে?”

বায়চং যেন একটু ঘাবড়ে গেল। সবার দিকে এক ঝলক দেখে নিয়ে দীপঙ্করকেই প্রশ্ন করল, “মেরেছে?”

“হ্যাঁ। তোমার কপাল, পিঠে এই দাগগুলো কে করে দিয়েছে?”

“কেউ না”।

জয়শীল বীরভদ্রের কানে কানে বললেন, “নাম বলতে ভয় পাচ্ছে বোধহয়”। বলেই বায়চং এর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভয় কি তোমার? নিশ্চিন্তে বলো, কে মেরেছে তোমাকে”।

বায়চং এর সেই এক কথা, “কেউ না”।

জয়শীল কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, দীপঙ্কর হাত তুলে থামালেন। ওর কপালের কালশিটে দাগটিয়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “তাহলে এই দাগটা হল কী করে?”

দীপঙ্করের কথায় বায়চং এর যেন খেয়াল হল। আপন মনে ফুলে যাওয়া জায়গাটায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “ওহ, ওটা? চোন ডুই…”।

“চোন ডুই কে?”

“চোন ডুই? চোন ডুই আমার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে থাকি যে”।

বীরভদ্র এবারে কৌতূহলী হয়ে বললেন, “তোমার বন্ধু তোমাকে মেরেছে?”

“না মারেনি তো। ও যে কাঠের তক্তা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল”।

বীরভদ্র আরো অবাক, “আর তুমি? তুমি কী করছিলে?”

“আমি তাতে মাথা ঠুকছিলাম”।

দীপঙ্করও হতবাক। বিস্মিত হয়ে বললেন, “তুমি কাঠের তক্তায় মাথা ঠুকছিলে? কেন?”

“সব্বাইকে ঠুকতে হয় ”।

দীপঙ্কর তাঁর শিষ্যদের দিকে তাকালেন, তাঁরাও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। জয়শীল একটু অস্থির গলায় বললেন, “ঠুকতে হয় মানে? কেন ঠুকতে হয়? কে ঠুকতে বলে?”

এত প্রশ্ন শুনেই কি কে জানে, বায়চং এর মুখে কথা নেই।

দীপঙ্কর আরো একবার জয়শীলকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার পিঠে যেরকম দাগ আছে, চোন ডুই এর পিঠেও সেরকম দাগ আছে বুঝি?”

বায়চং এর মুখে এবার হাসি ফুটল। “তুমি জানো? আছে তো। আমিই করে দিয়েছি তো আমার চামড়ার টুকরো দিয়ে, আমার চামড়ার টুকরোয় চোন ডুই এর চামড়ার টুকরোর থেকেও জোরে আওয়াজ হয়”।

দীপঙ্করের মুখ গম্ভীর থেকে গম্ভীরতর হচ্ছিল, আর কিছু না বলে তিনি উঠে পড়লেন। “জয়শীল, এবারে বেরিয়ে পড়া দরকার। আর বায়চং তোমার সঙ্গে থাকবে”।

জয়শীল আর বীরভদ্র ঘোড়াগুলিকে নিয়ে আসতে গেলেন, দীপঙ্কর বায়চংকে নিয়ে তাঁবুর বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। ঘোড়াতে ওঠার আগে দীপঙ্করের মনে হল বায়চং এর চোখ দুটো যেন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

তিন

বায়চং এর গ্রামে দীপঙ্কররা দু’দিন আগেই রাত কাটিয়ে গেছিলেন। গাঁওবুড়ো তো বটেই, গ্রামের বাকি লোকেরাও প্রচুর যত্নআত্তি করেছিল। এইবার কিন্তু গ্রামে পৌঁছে আবহাওয়াটা অন্য রকম লাগল। চট্ করে কেউ সামনে আসতে চাইছে না, অথচ দু’দিন আগেই দীপঙ্করকে প্রণাম করার জন্য চড়াই উতরাই জুড়ে সার দিয়ে অপেক্ষা করছিল লোকেরা। গাঁওবুড়ো তো বায়চংকে দেখে এই মারে কি সেই মারে। বায়চং তাতে আরো ভয় পেয়ে জয়শীলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। দীপঙ্কর ক্রোধান্বিত হচ্ছেন বুঝতে পেতে গাঁওবুড়ো বায়চং এর গায়ে হাত তুলল না বটে কিন্তু সমানে গজগজ করে যেতে লাগল।

দীপঙ্কর গাঁওবুড়োকে ইশারায় ঘরের মধ্যে ঢুকতে বললেন।

“আপনি কী জানেন এর বোন কোথায়?”

গাঁওবুড়ো মহা বিরক্ত হয়ে তাকাল বায়চং এর দিকে, তারপর দীপঙ্করকে বলল, “কী বলি বলুন, এই ছেলে মেয়ে দুটো দিন রাত্তির টোটো করে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝেই কোথায় কোথায় রাত কাটিয়ে আসে, খবর পাওয়া যায় না। ওদের মামা আমাকে দিন চারেক আগে বলেছিল বটে মেয়েটাকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে খবর পেয়ে আমি জনা কয়েক জোয়ানকে পাঠিয়েছিলাম খুঁজে দেখতে, তারাও কিছু পায়নি। পাহাড়ের রাজ্য, ভয় হচ্ছে কোনো খাদে না পড়ে গিয়ে থাকে”।

বীরভদ্র বলে উঠলেন, “ও যে বলছিল ডাইনি ধরে নিয়ে গেছে”।

গাঁওবুড়ো আকাশ থেকে পড়ল, “ডাইনি? না না, আমাদের গ্রামে ওসব কিছু নেই”। বলতে বলতে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিয়েছে বায়চং এর গাল, “তুই হতভাগা কী গল্পকথা সবাইকে বলে বেড়াচ্ছিস রে?”

দীপঙ্কর এবার গাঁওবুড়োর হাতটা ধরে ফেলেছেন, কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলেন।

গাঁওবুড়ো চোখ নামিয়ে নিল, বায়চংকেও আর কিছু বলল না।

দীপঙ্কর জিজ্ঞাসা করলেন, “আমাদের জন্য আর একটা রাত থাকার বন্দোবস্ত করতে পারবেন?বায়চংকে আমরা কথা দিয়েছি ওর বোনকে ফিরিয়ে আনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব, তাই অন্তত কাল বিকাল অবধি থাকাটা প্রয়োজন”।

“অবশ্যই, অবশ্যই”, মাথা নাড়তে লাগল গাঁওবুড়ো।

এবারে যদিও দীপঙ্করকে দেখতে লোকজন ভিড় করে আসেনি, দীপঙ্কর তাও চাইছিলেন লোকজনে মুখোমুখি না হতে। সন্ধ্যা হওয়ার একটু আগে বায়চং আর জয়শীলকে নিয়ে তিনি বেরোলেন। বায়চং বলেছে বিকালসন্ধ্যা নাগাদ দুই ভাইবোনে কাঠ কুড়িয়ে ফিরছিল, সেই সময়েই নাকি ডেকিকে অপহরণ করা হয়েছে।

দীপঙ্করদের আস্তানাটা গাঁওবুড়োর বাড়ির পিছনেই। বায়চং এর মামা সারা দিন কোনো খবর নিতে আসে নি, দীপঙ্কর তাও বীরভদ্রকে বলে গেলেন মামা এলে যেন দীপঙ্কররা ফিরে আসা না পর্যন্ত তাকে বসিয়ে রাখা হয়।

পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন দীপঙ্কররা, পাশেই অতল খাদ। একটু দূরে তাকালেই মেঘ আর কুয়াশা ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। ক্রোশখানেক হাঁটার পর দেখা গেল রাস্তাটা আচম্বিতেই অতি সরু হয়ে পাহাড়ের পাশ দিয়ে বেঁকে গেছে, যার ফলে দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়টা যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেখান থেকেই খাদের মুখের শুরু। বায়চং জয়শীলের হাতের মুঠোটা শক্ত করে ধরে চেপে দাঁড়িয়ে পড়ল। দীপঙ্কর কিছুটা এগিয়ে গেছিলেন, পেছনে পায়ের আওয়াজ না পেয়ে ফিরে এসে দেখলেন বায়চং আর এক পাও নড়ছে না।

“এখান থেকেই তোমার বোনকে নিয়ে গেছে, বায়চং?” প্রশ্ন করলেন জয়শীল।

“হ,হ্যাঁ”, বায়চং এর গলাটা কাঁপছে।

জয়শীল আরো কয়েকটা প্রশ্ন করার পর বোঝা গেল যে মুহূর্তে পাহাড়ের অন্য দিক থেকে এসে এই বাঁকের মুখে বায়চং আর ডেকি পৌঁছয় তখনই বায়চং এর ডাইনি ডেকিকে তুলে নিয়ে যায়।

এবারে দীপঙ্কর জিজ্ঞাসা করলেন, “তুলে নিয়ে কোনদিকে গেল সে?”

বায়চং চুপ, কোনো উত্তর নেই।

“তুমি দেখতে পাওনি?”

মাথা নাড়ে বায়চং, দেখতে পেয়েছে।

“তাহলে বলো, ডেকিকে নিয়ে কোনদিকে গেল সে?”

বায়চং এর তর্জনী আস্তে আস্তে উঠছে, তার আঙ্গুল এখন সোজা খাদের দিকে ধরা।

জয়শীল হতভম্ব হয়ে বললেন, “এর অর্থ কী? ডাইনি মেয়েটি কে নিয়ে সোজা খাদে নেমে গেছে?”

দীপঙ্করের কপালে চিন্তার ভাঁজ, “তুমি ঠিক দেখেছ বায়চং? খাদের দিকেই গেছিল সে?”

বায়চং মাথা দোলায়, সে ঠিকই দেখেছে।

জয়শীল দীপঙ্করের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললেন, “যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলি। ছেলেটি স্পষ্টতই কল্পনার রাজ্যে বাস করছে”।

দীপঙ্কর কিছু উত্তর না দিয়ে খাদের দিকে তাকিয়েছিলেন। জয়শীল আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় পাহাড়ের ওদিক থেকে একটা গুঞ্জন শোনা গেল। তারপরেই পাহাড়ের বাঁক ধরে সারি ধরে বেরিয়ে আসতে লাগল এক দঙ্গল ছেলে, তারা সবাই কাঠ কুড়িয়ে ফিরছে, একসঙ্গে বলে চলেছে, “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধম্মং শরণং গচ্ছামি, সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি”। বায়চং তাড়াতাড়ি রাস্তা তাদের জন্য রাস্তা ছেড়ে দিয়ে দীপঙ্করের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জয়শীল দেখলেন দীপঙ্করের মুখে হাসি ফুটে উঠছে।

সবার শেষে যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম বয়সের একটি ছেলে। বায়চং তাকে দেখতে পেয়ে ‘চোন ডুই’ বলে ডেকে উঠল। চোন ডুই কিন্তু একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল। বায়চং তাতেও দমেনি, দৌড়ে তার কাছে যাওয়া মাত্র চোন ডুই ধাক্কা মেরে ফেলে দিল বায়চংকে।

ছেলেরা চলে গেছে। বায়চং জয়শীলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দে কাঁদছে। দীপঙ্করের মুখের হাসিও অনেকক্ষণ মিলিয়ে গেছে। দীপঙ্কর পাহাড়ের বাঁকের কাছে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছেন বারবার। বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, “পাহাড়ের ওদিকে আরেকটু হাঁটলেই গভীর জঙ্গল। ছেলেরা বোধহয় জঙ্গল থেকেই কাঠ কুড়িয়ে আনছিল”।

জয়শীল বললেন, “এখন তবে কী করণীয়?”

“চলো ফেরা যাক”, বলতে বলতে হঠাৎ থেমে বায়চংকে প্রশ্ন করলেন, “ডাইনি কী পরে ছিল মনে পড়ছে তোমার?”

“কালো…কালো…”, বলতে বলতে যেন একটু শিউরেই উঠল বায়চং।

দীপঙ্কর আর কোনো প্রশ্ন করলেন না।

দেখা গেল, দীপঙ্কর ঠিকই অনুমান করেছিলেন। ওনারা বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই বায়চং এর মামা লোসাং এসে উপস্থিত, বীরভদ্র দীপঙ্করের নির্দেশ মতন বসিয়েই রেখেছেন তাকে। মামা অবশ্য একা নয়, সঙ্গে একটি বন্ধুও আছে।

বন্ধুটি বেশ বলিষ্ঠ প্রকৃতির, তবে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মতন তার বেশভূষা এবং মাথাটিও সম্পূর্ণ ভাবেই মুন্ডিত। দীপঙ্করকে দেখেই সে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল।

“জয়স্তু”, দীপঙ্কর দুজনকেই আশীর্বাদ প্রদান করে আসন গ্রহণ করলেন।

“আপনার ভাগ্নীর কোনো সন্ধান পেলেন?”

বায়চং এর মামার মুখে স্পষ্টতই একটি বিষণ্ণতার ছাপ পড়ল। মামার বন্ধু দেচানও হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল, “নাহ, বহু খোঁজাখুঁজি করেও কিচ্ছুটি পাওয়া গেল না। আমাদের মনে হচ্ছে হয়ত পা ফসকে কোনো খাদেই পড়ে গেছে সে”।

দীপঙ্কর এক দৃষ্টিতে দু’জনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দেচানের কথা শেষ হওয়ার পর শুধোলেন, “কিন্তু বায়চং কী বলছে সে কথা কি আপনি জানেন?”

“না তো, কী বলছে সে?” অবাক হয়ে বায়চং এর দিকে তাকাল লোসাং।

বায়চং মাথা নিচু করে বসে, লোসাং এর প্রশ্ন তার কানে ঠিকই গেছে কিন্তু মাথা তুলছে না।

দীপঙ্কর বললেন, “থাক্, আমিই বলছি। বায়চং এর বক্তব্য ওর বোনকে কোনো ডাইনি এসে নিয়ে গেছে”।

“ডাইনি?” দু বন্ধুই খুব অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে জোর গলায় হেসে উঠল। লোসাং বলল, “প্রভু, আপনি যাওয়ার আগে ওকে ভালোমতন শিক্ষা দিয়ে যান। বলে যান ডাইনি বলে কিছু হয় না”।

দীপঙ্কর কিছু না বলে চুপ করে রইলেন।

লোসাং হাত কচলাতে কচলাতে বলল, “আমরা তাহলে এখন আসি?”

“আসুন”।

দেচান বায়চং কে নিয়ে যাবে বলে হাত বাড়াচ্ছিল, দীপঙ্কর নরম গলায় বললেন, “ও যদি আজকের রাতটা আমাদের কাছে থাকে তাহলে কোনো অসুবিধা আছে? আমরা কাল বিকালেই চলে যাব। তার আগে যদি ওর কাছ থেকে আরো কিছু তথ্য পাওয়া যায়”।

লোসাং নিজে কিছু না বলে দেচানের দিকে তাকাল। দেচান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আসলে গত চার দিন ধরে ও শিক্ষামন্দিরে আসছে না, তাই ওকে আজ নিয়ে যেতে এসেছিলাম। কিন্তু আপনি যখন বলছেন, তখন থাক্ না হয়”।

দীপঙ্কর ঈষৎ বিস্মিত হয়ে দেচানকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি শিক্ষক?”

“হ্যাঁ, এই গ্রামের ছেলেদের আমরা অতি অল্প বয়স থেকেই বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র নিয়ে শিক্ষা দিতে থাকি”।

বীরভদ্র ভেবেছিলেন দীপঙ্কর হয়ত খুশি হয়ে বিশদে জানতে চাইবেন, কিন্তু দীপঙ্কর আর কোনো প্রশ্ন করলেন না।

দেচান আর লোসাং বেরিয়ে যেতে দীপঙ্কর বীরভদ্রদের বললেন, “তোমরা থাকো। আমি দেখি গাঁওবুড়োর বাড়িতে কিছু খাবার পাওয়া যায় কিনা”।

জয়শীল তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “আপনি কেন যাবেন! আমি যাই?”

দীপঙ্কর বললেন, “না, তোমরা থাকো। গাঁওবুড়োর সাথে আমার কিছু কথা আছে”।

চার

গাঁওবুড়ো বাড়ি ছিল না কিন্তু তার বউ দীপঙ্করকে দেখে শশব্যস্ত হয়ে উঠল। দীপঙ্করের বহু বারণ সত্ত্বেও গরম জলে পা ধুইয়ে তাঁকে এনে বসাল অতিথিকক্ষে। দীপঙ্কর যতই বলেন, “মা, আপনি ব্যস্ত হবেন না” সে ততই অস্থির হয়ে পড়ে দীপঙ্করকে কি ভাবে সেবা করা যায় সেই ভেবে। দীপঙ্কর খাবারের সন্ধানে এসেছেন শুনে বুড়ি তড়িঘড়ি শাম্পা (যবের পরিজ), থেংথুক (একরকম সুপ), নানারকম ফল আরো কত কি নিয়ে হাজির।

এলাহি বন্দোবস্ত দেখে দীপঙ্কর যারপরনাই বিব্রত হলেন। হাতজোড় করে বললেন, “মা, আমরা সন্ন্যাসী মানুষ। এত খাবারের প্রয়োজন নেই”।

গাঁওবুড়োর বউয়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল, বলল “আপনাকে আর একটা দিন সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। দয়া করে বঞ্চিত করবেন না”।

দীপঙ্কর হতাশ হয়ে জয়শীলকে ডেকে আনবেন বলে উঠতে যাচ্ছেন এমন সময়ে বুড়ি জিজ্ঞাসা করল, “বাবা, মেয়েটিকে সত্যিই কী ডাইনি নিয়ে গেছে?”

দীপঙ্কর একটু অবাক হয়ে তাকালেন। “সে কথা এখনো জানি না মা, কিন্তু আপনার স্বামীই তো বলছিলেন এ গ্রামে কখনো কোনো ডাইনি ছিল না”।

বুড়ি চোখ মুছে বলল, “আছে বাবা, ডাইনি আছে। আমার কথা এরা কেউ বিশ্বাস করবে না কিন্তু আমি জানি ডাইনি আছে”।

“আপনি জানেন ডাইনি আছে?” দীপঙ্কর বেশ জোর দিয়েই প্রশ্নটা করলেন।

“হ্যাঁ, সেই যে আমার কোল খালি করে দিয়ে গেছে”। বুড়ির চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরে পড়তে লাগল।

দীপঙ্কর চমকে উঠেছেন, অপলকে তাকিয়ে রয়েছেন বুড়ির দিকে।

চারপাশে একটু দেখে নিয়ে গলাটা খাদে নামিয়ে বুড়ি বলল, “আমারও এক মেয়ে ছিল বাবা। আজ বছর দশেক হয়ে গেছে সে নিরুদ্দেশ। তাকে দিয়েই তো শুরু, তারপর এক এক করে আরো অনেক মেয়েকেই পাওয়া যায় নি। লোকে সবসময়ই ভাবে এরা বুঝি খাদে পড়ে মরেছে কিন্তু আমি জানি বাবা এদের সবাইকেই ডাইনি নিয়ে গেছে”।

ফিসফিস করে বলেই চলে, “আরো লোকে দেখেছে সে ডাইনিকে। কালো পোশাকে সে ভেসে বেড়ায়, কারোর সাধ্যি কি তাকে ধরে!”।

“এরা সবাই কি বাচ্চা মেয়ে? বায়চং এর বোনের মতন?”

“প্রায় সবাই, শুধু আমার মেয়েটাই বড় ছিল। তার তখনই বয়স হবে পনেরো ষোল”।

সান্ত্বনা দিতে যাচ্ছিলেন দীপঙ্কর, বুড়ির পরের কথায় থেমে গেলেন। “বড় বাপন্যাওটা মেয়ে ছিল গো, আমরা তাকে মণি বলে ডাকতাম। শয়তানি ডাইনি তাকে কোথায় তাকে নিয়ে চলে গেল কে জানে। এ গাঁয়ের মেয়েদের ভাগ্যই খারাপ বাবা”।

“একথা কেন বলছেন মা?”

“কেন বলব না? এ গাঁয়ে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই দেখছি কত মেয়ের অপঘাতে মৃত্যু হল”।

“অপঘাতে মৃত্যু?” দীপঙ্কর সচকিত হয়ে বসেন।

“হ্যাঁ বাবা। সে সময় দুপুরের পর থেকেই মেয়েদের রাস্তায় বেরনো বন্ধ হয়ে যেত। তাও প্রায় প্রতি দিনই খবর আসত কার মাথায় পাথর গড়িয়ে এসে পড়েছে, কে পা পিছলে খাদে পড়ে গেছে, কার ঘাড় ভেঙ্গে দিয়ে গেছে কোন অপদেবতা”।

“সেরকম অপঘাতে মৃত্যু এখন আর হয় না?”

“না এখন কমে এসেছে, কিন্তু তাতেই বা কী? এখন যে নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে, ডাইনির”।

দীপঙ্কর উঠলেন, বুড়ির সঙ্গে কথোপকথনের পরে মাথাটা চিন্তায় বোঝাই হয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে। ধ্যানে বসতে পারলে ভাল হত।

দীপঙ্কর বেরোচ্ছেন, আর গাঁওবুড়োও ঢুকছে। গাঁওবুড়োর ঠিক পেছনেই ছিল বায়চং এর মামা লোসাং। দীপঙ্কর আর লোসাং এর কেউই কাউকে দেখতে পাননি, ফলে দু’জনের মুখোমুখি ধাক্কায় দীপঙ্করের হাত থেকে একটি খাবারের পাত্র পড়ে গেল, ভাগ্য ভালো যে পাত্রটিতে কোনো খাদ্যবস্তু ছিল না।

লোসাং তাড়াতাড়ি সেই পাত্র কুড়োতে গিয়ে উহহ করে উঠল, মনে হল মুখোমুখি সংঘর্ষে ভালোই ব্যথা পেয়েছে সে।

দীপঙ্কর পাত্রটি কুড়িয়ে নিয়ে রওনা দিলেন। একটু চিন্তাতেই পড়ে গেলেন যেন, এত রাত্রে গাঁওবুড়ো আর লোসাং এর কিসের বৈঠক?

জয়শীল এবং বীরভদ্র দু’জনেই চিন্তা করছিলেন দীপঙ্করের দেরি দেখে, দু’জনেই হাঁফ ছেড়ে বাচলেন। বায়চং ঘরের এক কোণে চুপটি করে বসে ছিল, সেও দীপঙ্করকে দেখে উঠে এসেছে।

দীপঙ্কর বায়চং এর মাথায় হাত বুলিয়ে খাবার তুলে দিলেন।

রাতের খাওয়ার পর বীরভদ্র শোওয়ার আয়োজন করছেন এমন সময় মনে হল গাঁওবুড়োর ঘরের পাশ থেকে একটা কুকুর ডেকে উঠল। কুকুরের ডাকটা জোর থেকে জোরালো হচ্ছে দেখে দীপঙ্কর এবং জয়শীল দু’জনেই বাইরে বেরিয়ে এলেন। কুকুরটা আরো একবার জোরে ডেকে উঠল, আর মনে হল গাঁওবুড়োর ঘরের পাশ দিয়েই কে যেন হুড়মুড় করে দৌড়ে পালাল।

জয়শীল চিন্তান্বিত মুখে দীপঙ্করের দিকে তাকালেন। দীপঙ্করের ভুরূ কুঁচকে গেছে, “নজরদারির জন্য চর বসেছে। জয়শীল, আজকে রাতটা একটু সজাগ থাকতে হবে”।

“যথা আজ্ঞা”।

ওনাদেরকে ঘরে ঢুকতে দেখে বীরভদ্র বললেন “গাঁওবুড়োর কুকুর আছে জানতাম না তো। চেঁচাচ্ছিল কেন?”

জয়শীল চোখের ইশারায় বীরভদ্রকে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যাতে বায়চং কিছু না বুঝতে পারে। বায়চং জয়শীলকে কথা না বলতে দেখে কি বুঝল কে জানে, বলল “লুম বিন”।

দীপঙ্কর ঘুরে তাকালেন, “কি বলছ বায়চং?”

বায়চং একটু জড়সড় হয়ে বলল, “গাঁওবুড়োর কুকুরকে তোমরা চেন না? বুড়ো কুকুর, ওর নাম লুম বিন্”।

“তাই নাকি? লুম বিন্ নাম?”, দীপঙ্কর বেশ অবাক হয়েছেন বলে মনে হল।

আরো রাতের দিকে বীরভদ্র আর বায়চং ঘুমিয়ে পড়লেন, জয়শীলের চোখও প্রায় বুযে আসছে। মাঝে একবার শুনলেন দীপঙ্কর অস্ফূটে বলে চলেছেন, “মেখলা, মেদিনী, কঙ্খলা”। নামগুলো বড় চেনা চেনা ঠেকল জয়শীলের কিন্তু ঘুমের ঘোরে কিছুতেই খেয়াল করতে পারলেন না কোথায় শুনেছেন। মাঝরাতের দিকে দীপঙ্কর জয়শীলকে জাগিয়ে ঘুমোতে গেলেন। ঘুমনোর আগে শুধু বললেন, “ডাইনি যদি সত্যিই বায়চং এর বোনকে নিয়ে গিয়ে থাকে তো ভালোই করেছে”।

জয়শীল অবাক। প্রভুর হেঁয়ালি এমনিই বুঝতে পারেন না, তার ওপর মাঝরাত দেখে আর বিশেষ চেষ্টা করলেন না।

পাঁচ

জয়শীল সকালে উঠে দেখলেন দীপঙ্কর ঘরে নেই। বীরভদ্রও উঠে পড়েছেন কিন্তু জানালেন দীপঙ্করকে তিনিও দেখতে পান নি। দু’জনেই বেরোলেন গুরুকে খুঁজে বার করতে। খুব দূরে যেতে হল না, কয়েক পা হাঁটতেই দেখা গেল দীপঙ্করকে।

কিন্তু দীপঙ্করকে দেখে দু’জনেরই চক্ষুস্থির হয়ে গেল।

বীরভদ্র বারেবারে গড় হয়ে প্রণাম করতে লাগলেন।

জয়শীল দু’হাত জড়ো করে একবার মাথায় আর একবার বুকে ঠেকাতে লাগলেন।

স্বাভাবিক! দীপঙ্কর মাটি থেকে অল্প ওপরে শূন্যে ভাসছেন। কিছুক্ষণ সেরকম অবস্থায় থেকে আবার মাটিতে নেমে এলেন, পরক্ষণেই আবার শূন্যে ভেসে উঠলেন।

“প্রভু, এ কি লীলা আজ দেখালেন আপনার ভক্তদের”, জয়শীল আর আবেগ চেপে রাখতে পারলেন না। আবেগের চোটেই সম্ভবত দু’জনের চোখও বন্ধ হয়ে গেছিল। চোখ অবশ্য অল্প পরেই খুলে ফেলতে হল কারণ ততক্ষণে দীপঙ্করের গর্জন দু’জনের কানে গিয়েই পৌঁছেছে।

“মূর্খ, মূর্খ, মূর্খ”।

জয়শীল আর বীরভদ্র দু’জনেই থতমত খেয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। দীপঙ্কর এবার সরোষে জিজ্ঞাসা করলেন, “মানুষ শূন্যে ভাসতে পারে?”

এ প্রশ্নের কি উত্তর হয়!

জয়শীল চুপ করে রইলেন, বীরভদ্র আমতা আমতা করে বললেন, “আজ্ঞে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় কিন্তু আপনি ভগবান বুদ্ধের বরপুত্র”।

দীপঙ্কর মাথা নাড়তে নাড়তে এদের দিকে এগিয়ে এলেন, “আমি ভগবান বুদ্ধের বরপুত্র কিনা তা জানি না তবে বুদ্ধ যে তোমাদের মতন ফাঁপা মগজ দিয়ে আমাকে পৃথিবীতে পাঠান নি তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ”।

“জয়শীল, তুমি আমার বাঁ পাশে এসে দাঁড়াও আর বীরভদ্র তুমি থাকো ডানদিকে”।

বীরভদ্র দেখলেন দীপঙ্কর তাঁর ডান পায়ের জুতো থেকে অতি সন্তর্পণে পা’টি বার বার করে জুতোর সঙ্গে আড়াআড়ি করে পা’টি বাইরে রাখলেন। ফলে ডান পায়ের জুতোটি এখন দীপঙ্করের ডান পায়ের পাতা এবং বাঁ পায়ের জুতোর মধ্যে আটকে রইল। দীপঙ্কর এবার বাঁ পা’টিকে শূন্যে তুলে ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালেন।

বাঁ দিক থেকে জয়শীল অবশ্য শুধুই দেখতে পেলেন তার প্রভুর একজোড়া জুতো আরো একবারের জন্য হাওয়ায় ভেসে উঠল। দীপঙ্করের নির্দেশে জয়শীলও ডান দিকে আসতে তবে রহস্য উদ্ধার হল।

বীরভদ্র এবং জয়শীল দু’জনেই কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। বীরভদ্র নাকের ভেতর থেকে ফোঁৎ করে একটা শব্দ করে বলে উঠলেন, “বুঝলাম। এতেও অবশ্য সাধনার ব্যাপার আছে”।

দীপঙ্কর জুতোয় পা গলাতে গলাতে বললেন, “সে কথা আর বলতে। ক’টার সময় ঘুম থেকে উঠেছি বলে তোমার মনে হয়?”

“কিন্তু প্রভু, এই যাদুবিদ্যা দিয়ে কী উদ্দেশ্য সিদ্ধি হবে?”

দীপঙ্কর মুচকি হাসলেন, “সব সময় কি আর উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যই জ্ঞান আহরণ করতে হবে? এই যে সকাল সকাল নির্ভেজাল আনন্দ পেলে, তার দাম নেই?”

বলতে বলতে হঠাৎ ঘুরে তাকিয়েছেন বীরভদ্রের দিকে, “মেখলা কে ছিলেন? কে ছিলেন মেদিনী? আর কঙ্খলাই বা কে?”

আচম্বিতে প্রশ্নবাণ ধেয়ে আসায় বীরভদ্র একটু ঘাবড়ে গেছিলেন কিন্তু বিক্রমশীলে খোদ দীপঙ্করের কাছেই তিনি পাঠ নিয়েছেন প্রাচীন তিব্বতী পুঁথির। এই নামগুলোর সঙ্গে তিনি পরিচিত। একটু ভেবে বললেন, “এনারা সবাই পূর্বভারতীয় ডাকিনী। বিশেষ বিশেষ সিদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন এনারা, প্রত্যেকেরই শিষ্যসংখ্যাও ছিল প্রচুর”।

“ঠিক বলেছ বীরভদ্র। এই তিনজনের সঙ্গে আর কারোর নাম মনে পড়ছে?”

বীরভদ্র তাঁর মন্ডিত মুস্তকে বহু হাত বুলিয়েও খেয়াল করতে পারলেন না। দীপঙ্কর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “বয়স হচ্ছে বীরভদ্র তোমার। ভঙ্গালের বিক্রমপুরে যেখানে আমার বাড়ি ছিল, তার আশেপাশের সমস্ত জলাশয় এক বিশেষ শাকে ছেয়ে থাকত। লোকে বলে সে শাক খেলে বুদ্ধি বাড়ে, স্মৃতি ফিরে আসে। তোমার শুকনো দেশে তো সে শাক পাওয়া যাবে না, নাহলে প্রত্যহ ওই শাক বেটেই তোমার খাওয়াতাম”।

কি বলবেন বুঝতে না পেরে বীরভদ্র মাথা চুলকোতে লাগলেন। দীপঙ্কর জয়শীলের দিকে ফিরে বললেন, “আমাকে এখন একটু বেরোতে হবে। আমি ফিরে আসার আগে বায়চংকে তৈরি করে রেখো, এসেই আবার আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে। আর হ্যাঁ, সঙ্গে প্রচুর পরিমানে নুন নিও”।

“নুন?!”

জয়শীলের বিস্মিত প্রশ্নে দীপঙ্কর বললেন, “চিন্তা নেই, গাঁওবুড়োর বাড়ি থেকে কাল নুনও নিয়ে এসেছি”।

“আজ্ঞে, সে কথা বলছি না। নুন দিয়ে কী হবে?”

“তোমার কেশহীন মুন্ডে যখন জলৌকা টুপ টুপ করে পড়বে তখন ব্যবস্থা করতে হবে না? নাকি কুচকুচে কালো মাথায় যৌবন ফিরে পেতে চাও?” বলে হাসতে হাসতে দীপঙ্কর ঘরে ঢুকে গেলেন।

জয়শীল মনে মনে শব্দকোষ হাতড়াচ্ছেন দেখে বীরভদ্র বললেন, “জোঁক, জোঁক”।

“ওহ্ জোঁক, তাই বলুন”, বলতে গিয়ে খেয়াল পড়ল জোঁক বস্তুটি কি। জয়শীল টের পেলে গলা শুকিয়ে আসছে। ওদিকে বীরভদ্রও অস্থির হয়ে পড়েছেন, বহু বছর ধরে গুম্ফা আর মহাবিদ্যালয়ে থেকে থেকে সামান্য প্রাকৃতিক সমস্যার কথা ভেবেও চিন্তায় পড়ে যান। দুর্ভাবনার চোটে দু’জনেই জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেলেন দীপঙ্কর কোথায় যাচ্ছেন।

ছয়

দীপঙ্কর অবশ্য বেশী দূরে যান নি, গেছেন পাশেই গাঁওবুড়োর বাড়িতে। সাতসকালে দীপঙ্করকে দেখে গাঁওবুড়ো একটু হকচকিয়েই গেল। কুশলাদি বিনিময়ের পর দীপঙ্কর বললেন, “আমরা আজই চলে যাচ্ছি। কিন্তু চলে যাওয়ার আগে আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল, জরুরী কথা”।

গাঁওবুড়ো একটু বাঁকা হাসল কী? দীপঙ্করের চোখে চোখ রেখে বলল, “আপনাকে তো আগেই বলেছি বায়চং এর বোনের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। সে হারিয়ে গেছে খুবই দুঃখের কথা, কিন্তু খাদে পড়ে গেলে আর কিই বা করার আছে?”

দীপঙ্কর মৃদু হাসলেন, “বায়চং এর বোনকে নিয়ে আমি এখন কোনো কথা বলতে আসিনি। কিন্তু হ্যাঁ, ওই খাদে নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়েই দু’চার কথা ছিল”। মনে হল অন্দরমহল থেকে এক জোড়া চোখ যেন দীপঙ্করের কথায় আরো উৎসুক হয়ে উঠল।

গাঁওবুড়ো একটু ব্যাজার মুখে দীপঙ্করকে অতিথিকক্ষে নিয়ে এল, তারপর দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বলল, “বলুন কি বলতে চান”।

দীপঙ্কর দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তার আগে আপনার স্ত্রীকে ডেকে নিন”।

“আমার স্ত্রীকে? কেন কেন?” ভারী চমকে উঠল গাঁওবুড়ো।

“উনি দরজার ওপারেই দাঁড়িয়ে আছেন যে। আর সেটা বড় কথা নয়, যে কথা বলব সেটা শোনা ওনারও প্রয়োজন”।

গাঁওবুড়োকে আর কিছু বলতে হল না, বুড়ি দরজা খুলে সঙ্গে সঙ্গেই ঢুকে পড়েছে। গাঁওবুড়ো গর্জন করে উঠতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে পাত্তা না দিয়ে বুড়ি দীপঙ্করের পা জড়িয়ে ধরল, “আপনি কাল চলে যাওয়ার পর থেকেই মন বড় উচাটন হয়ে আছে বাবা, আমাকে শান্তি দিন”।

“উঠুন মা”, দীপঙ্কর সস্নেহে বুড়িকে তুলে ধরলেন, “আপনাকে শান্তি দেবেন পরম করুণাময় ভগবান বুদ্ধ। আমি শুধু কিছু রহস্যের ওপর যবনিকাপাত ঘটাতে এসেছি”।

গাঁওবুড়োর সেই হম্বিতম্বি উড়ে গেছে, সে এখন নির্নিমেষে দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে।

“আপনারা জানেন, আমি ভারতবর্ষের মানুষ। তিব্বতের রাজার আমন্ত্রণে এই প্রথম চলেছি সে দেশে। কিন্তু তা বলে ভাববেন না সে দেশ আমার সম্পূর্ণ অজানা। বিক্রমশীল মহাবিদ্যালয়ে আমরা বহু বছর ধরে অতি আগ্রহের সঙ্গে তিব্বতী পুঁথি অধ্যয়ন করে চলেছি। সেরকম ই এক পুঁথিতে আমি হদিশ পেয়েছিলাম নাম পেয়েছিলাম পূর্ব ভারতীয় কিছু মহিলার – মেখলা, মেদিনী, কঙ্খলা। এনাদেরকে সেই পুঁথিতে ডাকিনী বলে সম্বোধন করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে এনারা সিদ্ধিলাভ করেছিলেন, তারপর দীক্ষা দিয়েছিলেন বেশ কিছু পুরুষকেও। ডাকিনী হিসাবে এনারা নাকি জানতেন অনেক তন্ত্রমন্ত্রও”।

বুড়ি ফিসফিসিয়ে উঠল, “ডাইনি?”

“সে পুঁথিতে নাম ছিল আরো এক ডাকিনীর”, দীপঙ্কর থামেন।

বুড়ো বুড়ি দু’জনেই চুপ।

“তাঁর নাম মণিভদ্রা। মণি তো তিব্বতি নাম নয়, তাই না?”

গাঁওবুড়ো আমতা আমতা করে থাকে।

“শোনা যায় মণিভদ্রার শিষ্যদের গোপন একটি সংঘ ছিল লুম্বিনীতে, যেখানে গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আপনার মেয়ের প্রিয় কুকুরের নাম লুম বিন হওয়ার বোধহয় একটা কার্যকারণ সম্পর্ক আছে, তাই না?”।

বুড়ি গাঁওবুড়োর দিকে ফিরে তাকায়, মহা আক্রোশে চেঁচিয়ে ওঠে, “কোথায় নিয়ে গেছ তুমি আমাদের মেয়েকে? কেন আমার কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছ তাকে?” বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।

বুড়ো মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর অতি ধীর স্বরে বলে, “আমি নিয়ে যাইনি বউ, সে নিজেই চলে গেছে। আমি শুধু তাকে পৌঁছে দিয়ে এসেছি”।

“পৌঁছে দিয়ে এসেছে? কোথায়? কোথায় রেখে এসেছ তাকে? কেন দশ বছর ধরে তাকে একটাবারের জন্যও দেখা করতে দাওনি আমার সঙ্গে?”, বুড়ি থরথর করে কাঁপতে থাকে।

গাঁওবুড়ো দু’হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে, ফিসফিস করে বলে, “নাহলে যে তোমায় মেয়েও কোনো একদিন খাদের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যেত অথবা অথবা……”

“অথবা পাহাড় থেকে তার ওপর গড়িয়ে পড়তে কোনো পাথর”।

দীপঙ্করের কথা শুনে বুড়ি এবার তার দিকেই ঘুরে তাকায়, দু’হাত জড়ো করে বলে, “প্রভু, আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন। এ জীবনে আর ক’টা দিনই বা আছে? শুধু তাকে ফিরে পেতে চাই, আর কিছু চাই না”।

দীপঙ্কর ব্যথিত মুখে চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর বুড়িকে বলেন, “মা, আমার ধারণা আপনার মেয়ে অনেক বড় এক কাজে হাত দিয়েছে। সে কাজ চলবে আমৃত্যু, আর তাই অতি কষ্টে সে ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছে সমস্ত সাংসারিক মায়া”।

বলতে বলতে গাঁওবুড়োর দিকে ফিরে চান দীপঙ্কর, “আমার ধারণা কি ঠিক?”।

গাঁওবুড়ো কাঁপতে কাঁপতে হাত জড়ো করে, বলে “প্রভু, আপনি সর্বজ্ঞ। মণি আজ মণিভদ্রা, এ গ্রামের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার দায়িত্ব সে একার হাতে তুলে নিয়েছে। আর সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছে এ পাপ আশপাশের আরো অজস্র গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। তার কাজ তাই শেষ হওয়ার নয়”।

“মণি, আমার মণি ডাইনি হয়ে গেছে? এ নিশ্চয় সেই সর্বনাশী ডাইনির কাজ, যে তাকে ধরে নিয়ে গেছিল”,  হাহাকার করে ওঠে বুড়ি।

গাঁওবুড়ো আবার জড়িয়ে ধরে বুড়িকে, “শান্ত হও। তোমাকে কি বললাম একটু আগে?মণিকে কোনো ডাইনি ধরে নিয়ে যায়নি, সে স্বেচ্ছা- নির্বাসনে গেছে”।

এবার দীপঙ্কর বলেন, “আপনি প্রথম থেকেই শুরু করুন। হয়তো তবেই আপনার স্ত্রী ঘটনাপ্রবাহটি বুঝতে পারবেন, আমিও পাব কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর”।

“তাই হোক”, ধপ্ করে মাটিতে বসে পড়ে গাঁওবুড়ো, “এ পাপের কথা আজ নয় কাল নিজের মুখেই বলতে হত”।

সাত

“আমাদের পরিবারের পুরুষরা যুগ যুগ ধরে এ গ্রামকে শাসন করে এসেছে। এ কথা কত পুরুষ আগের, সে ঠিক আমিও জানি না। ঠিস্রোং ছিলেন তাঁর মা – বাবার নয়নের মণি, গ্রামেরও সবাই তাঁকে বড় ভালবাসত। ছবি আঁকতে পারতেন, বাঁশি বাজাতে পারতেন, এ তল্লাটের সব আঞ্চলিক ভাষায় তিনি ছিলেন সমান দড়। সকাল সন্ধ্যা ঘোড়ায় চড়ে যখন গ্রামের পাহাড়ি পথ ধরে যেতেন তখন ছেলেমেয়ে সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকত, এত সুপুরুষ ছিলেন ঠিস্রোং।

কিন্তু সব থেকে বেশী খাতির তিনি পেতেন তাঁর ধার্মিকতার দরুণ। ছোটো থেকেই প্রবল বুদ্ধভক্ত ছিলেন ঠিস্রোং, গ্রামের সমস্ত বাচ্চা ছেলেমেয়েদের বসিয়ে বুদ্ধের জীবনকাহিনী শোনাতেন। শোনা যায় বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে নাকি কিছু পুঁথিও লিখেছিলেন।

তাঁর বাবা-মা যখন ঠিস্রোং এর বিয়ের তোরজোড় শুরু করলেন তখন ঠিস্রোং করজোড়ে তাঁদের কাছে ছ’টি মাস সময় প্রার্থনা করলেন। ইচ্ছে, বিয়ের আগে বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী দর্শন করে আসবেন, সেখানকার বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কাছে ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করবেন। একমাত্র ছেলের কথা বাবা-মা ফেলতে পারলেন না, সানন্দেই অনুমতি দিলেন। এক সকালে নিজের প্রিয় ঘোড়া, কিছু পাথেয় আর কয়েকটি পুঁথি নিয়ে ঠিস্রোং এ গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেন।

ছ’মাস কেটে গেল, ঠিস্রোং ফিরে এলেন না। বাবা – মা উদ্বিগ্ন হলেন কিন্তু ভাবলেন হয়ত পড়াশোনা এখনও শেষ হয়নি। আরো মাস চারেক কাটবার পর ঠিস্রোং এর বাবা মরীয়া হয়ে গ্রামেরই কিছু লোককে পাঠালেন খবর আনতে। তারা ফিরে এসে খবর দিল কেউ ঠিস্রোং এর হদিশ জানে না, লুম্বিনীতে তিনি গেছিলেন ঠিকই কিন্তু তিন মাস পর থেকেই তাঁকে আর কেউ দেখেনি।

মরীয়া হয়ে ঠিস্রোং এর বাবা আরো লোকজন নিয়ে নিজেই গেলেন লুম্বিনী, ততদিনে প্রায় এক বছর কেটে গেছে। বহু সময় এবং অর্থ ব্যয় করার পর খবর পাওয়া গেল ঠিস্রোং দীক্ষা নিয়েছেন, তাঁর দীক্ষাগুরু স্বয়ং ডাকিনী মণিভদ্রা। বহু কষ্ট করে ঠিস্রোং এর বাবা ছেলের সঙ্গে নাকি দেখা করতে গেছিলেন, তারপর কি হয়েছিল কেউ জানে না। অনেকে বলে ঠিস্রোং বাবাকে শেষবারের জন্য প্রণাম করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছিলেন, আর কেউ কোনোদিন তাঁকে দেখেনি। অনেকে আবার বলেন ঠিস্রোং মণিভদ্রাকে ছেড়ে আসতে রাজি না হওয়ার তাঁর বাবা রাগে অন্ধ হয়ে পুত্রহত্যা করে আসেন।

ঠিস্রোং না ফিরলেও লোকজন নিয়ে ঠিস্রোং এর বাবা ফিরে আসেন। এসে দত্তক নেন গ্রামেরই এক ছেলেকে”।

একটানা কথা বলে গাঁওবুড়ো এবার থামল, কিন্তু শ্রান্তিতে নয়, পরবর্তী কথাগুলো বলার আগে যেন তার শ্রোতাদের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করাটাই উদ্দেশ্য। করুণ চোখে বুড়ি আর দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর তারপরের ইতিহাস বড়ই ভয়ঙ্কর। মেয়েদের সমস্তরকম স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হল। এর আগে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ না হলেও মেয়েরা সমান অধিকার ভোগ করতেন। এখন গ্রামের প্রায় সব মেয়েদের বাড়িতে বন্দী করে রাখা হল”।

“যত দিন যেতে লাগল মেয়েদের প্রতি অত্যাচারের সীমা পরিসীমা রইল না। আর সেই সঙ্গে মেয়ে ধর্মগুরুরা আর ডাকিনী রইলেন না, তাঁরা হয়ে গেলেন ডাইনি। অন্ধকারের দূত, পাপাচারের প্রতীক। অহরহ ডাইনি অপবাদ দিয়ে গ্রামের মহিলাদের পুড়িয়ে মারা শুরু হল”।

দীপঙ্কর পাথর হয়ে শুনছিলেন, গাঁওবুড়ো থেমে গেছে দেখে জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, “সে ইতিহাস তো কখনই শেষ হয়নি, তাই না?”

গাঁওবুড়ো লজ্জায়, অনুশোচনায় যেন কুঁকড়ে গেল। মাথা নেড়ে বলল, “না, সে ইতিহাস ভয়াল থেকে ভয়ালতর হয়ে উঠেছে। মেয়েরা বড় হওয়া মাত্র তাদেরকে ছেলেদের থেকে সরিয়ে নেওয়া হত, ছেলেদের বা অন্য মেয়েদের সঙ্গে যাতে তারা মিশতে না পারে তাই জন্য বাড়ির একটা ছোট্ট ঘরে রেখে দেওয়া হত তাদের। আর পারতপক্ষে যদি বাইরে কেউ যেত তাহলেই ঘনিয়ে আসত মৃত্যু”।

বুড়ি শিউরে শিউরে উঠছিল। গাঁওবুড়োর কথায় শুনে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে এই অপদেবতারা সব আমাদের বন্ধু প্রতিবেশী? তারাই তাহলে খুনী?”

গাঁওবুড়ো চুপ করে থাকে।

দীপঙ্করে বুড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন, “হ্যাঁ মা, চরম নারীবিদ্বেষে এই গ্রামের শয়ে শয়ে মেয়ে খুন হয়েছে। যাদের বাইরের গ্রামে ঠিক সময়ে বিয়ে হয়েছে তারাই শুধু বেঁচে গেছে”।

“খুন তো বোধহয় আপনিও করেছেন, তাই না?”

গাঁওবুড়োর অন্তরাত্মা যেন কেঁপে উঠল। দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলল, “কিন্তু মণি চলে যাওয়ার পর করিনি। বিশ্বাস করুন প্রভু, ভগবান বুদ্ধের দিব্যি”।

গাঁওবুড়োর কপাল ফেটে অঝোরে রক্ত ঝরছে, কিন্তু বুড়ির চোখে এক ফোঁটা করুণা দেখতে পেলেন না দীপঙ্কর, সে চোখ জুড়ে শুধুই জিঘাংসা।

“আমার আরো ধারণা পৌরুষতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য আপনারা বহু বছর ধরেই বাচ্চা ছেলেদের সামরিক শিক্ষালয়ে পাঠাতে থাকেন। সেখানে তারা শেখে যার গায়ের জোর বেশী, যার কষ্টসহিষ্ণুতা বেশী, সেই একমাত্র পুরুষ। যারা কষ্ট সহ্য করতে পারে না তাদের মানুষ বলে গণ্য করা হয় না, তারা নিকৃষ্ট প্রজাতি। এ গ্রামের বায়চং রা আরেকটু বড় হলেই শিখবে মেয়েদের কোনো স্থান নেই এ সমাজে। তাই না? বায়চং এর কালশিটে দাগগুলো দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। আগের দিন যখন ছেলেরা জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে ফিরছিল তখন প্রায় সবারই পিঠে, মুখে সেই একই কালশিটে দাগ দেখে আমি নিশ্চিত হই। ভালো কথা, কত বছর হলে এ গ্রামের বাচ্চাদের দেচানের শিক্ষালয়ে পাঠানো হয়?”।

গাঁওবুড়ো মিনমিন করে বলে, “পাঁচ বছর”।

বুড়ি বাঘিনীর মতন লাফিয়ে পড়ে গাঁওবুড়োর ওপর। তার মাথা ধরে ঠুকতে থাকে দেওয়ালে। দীপঙ্কর বুড়ির সামনে গিয়ে হাতজোড় করতে বুড়ি এবার কান্নায় ভেঙ্গে ফেলে। দীপঙ্করের দিকে আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “আমাকে সত্যি করে বলুন বাবা, আমার মেয়েকেও কি এই পাষন্ডরা মেরে ফেলেছে?”

সৌম্যসুন্দর হেসে বুড়ির দিকে তাকান দীপঙ্কর। “আপনি এখনো বুঝতে পারেন নি মা? আপনার মেয়েই যে এদের হয়ে প্রায়শ্চিত্তটা করছে। সে যে মণিভদ্রার নতুন অবতার, ডাইনির ছদ্মবেশে এসে সে গ্রামের বাচ্চা মেয়েগুলোরই প্রাণ বাঁচাচ্ছে। সে ডাইনি নয়, ডাকিনী। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করে তুলছে এ গ্রামের মেয়েদের, তাদেরকে নতুন করে বাঁচার হদিশ দেখাচ্ছে”।

দীপঙ্কর এবার ফিরে তাকান গাঁওবুড়োর দিকে, “আমি জানি পাহাড়ের ওপারের জঙ্গলের মধ্যেই কোথাও থাকেন মণিভদ্রা। বায়চং এর চোখে ধুলো দিতে পারলেও আমাকে ঠকাতে পারবেন না। মাটি থেকে শূন্যে উঠে যেতে দেখে বায়চং ভেবেছিল মণিভদ্রা বোধহয় ভেসে ভেসে খাদের দিকেই যাচ্ছেন। উনি কিন্তু বায়চং এর বোনকে ধরে ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বায়চং যা দেখেছে তা শুধুই দৃষ্টিবিভ্রম, এক অভিজ্ঞ যাদুকরীর হাতের কাজ, থুড়ি পায়ের কাজ।

আমাকে কিন্তু মণিভদ্রার সঙ্গে যে একবার দেখা করতেই হবে। আপনি নিয়ে যাবেন আমাকে?”।

গাঁওবুড়োর চোখে যেন দৃষ্টি নেই। হাহাকার ভরা গলায় বলে চলে, “পাথরটা গড়িয়ে ফেলার সময় দেখতে পাইনি দোহনার পেছনে মণিও আসছে। ওই পাহাড়ের বাঁকেই ঘটেছিল, শেষ মুহূর্তের চেষ্টাতেও আমি মণির থেকে আড়াল হতে পারিনি। দেখে ফেলেছিল আমাকে। দেখেছিল ওর প্রাণের বন্ধু দোহনাকে আমি খুন করেছি। সে রাত্রে মণিকেও সব বলতে হয়েছিল, সব শোনার পর যেভাবে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে সে দৃষ্টি আমি এখনো ভুলতে পারি না। তার চোখ বলছিল তুমি নরকের কীট, আমি সত্যিই নরকের কীট”।

বলতে বলতে ফের কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে গাঁওবুড়ো। দীপঙ্কর কিছুই বলেন না, একবারের জন্যও চেষ্টা করেন না কোনো সান্ত্বনাবাক্য শোনানোর।

“আর আমার কথা একবারও বলেনি মণি মা?”, চোখ ছলছল করে ওঠে বুড়ির।

“তোমার কথাই বলছিল শুধু”, বুড়ো বুড়ির দিকে তাকানোরও সাহসটুকু পায় না, “বলেছিল যে দিন তোমার পাপের কথা মা’র কাছে ধরা পড়বে তখন তাকে বলো মণির জীবনে কোনো বাবা নেই, আছে শুধু মা। মার থেকে বিচ্ছেদযন্ত্রণা মণিকে সারাজীবন ভোগ করতে হবে, কিন্তু তাকে বলো মণির কোনো উপায় নেই”……বলতে বলতে এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় গাঁওবুড়ো, তারপর বলে, “সে বলেছে তোমাকে বলতে অজস্র জীবন বাঁচানোর জন্য সে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে”।

হয়ত নিজের কানেই নিজের কথাগুলো অবিশ্বাস্য ঠেকে, তাই বুড়িকে আর কিছু বলে না গাঁওবুড়ো। দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে বলে, “এখন তো হবে না। আজ সন্ধ্যায় নিয়ে যান আপনাকে সে জঙ্গলে। কিন্তু জানি না সে আসবে কিনা। তার চোখ সর্বত্র, কিন্তু তার নিজের ইচ্ছা না হলে সে দেখা দেবে না। আমি মাস দু’মাসে একবার জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে কিছু খাবারের রসদ দিয়ে আসি শুধু। সে রাত্রের পর আর তাকে দেখিনি। না, দেখেছি, কিন্তু অনেক দূর থেকে। তার কিছু নির্দেশ থাকলে শুধু সেটুকুই শুনেছি”।

আট

জঙ্গল থেকে বেরিয়ে চলেছেন দীপঙ্কর। তার ঠিক পেছনের ঘোড়াতেই রয়েছেন জয়শীল, তাঁর কোলের কাছে বসে বায়চং, তারও পেছনে আসছেন বীরভদ্র। গাঁওবুড়ো ঠিকই তাঁদেরকে পথ দেখিয়ে জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে গেছিল। বীরভদ্র এবং জয়শীলকে জঙ্গলের ঠিক বাইরে রেখে গাঁওবুড়োর সঙ্গে ভেতরে ঢুকেছিলেন শুধু দীপঙ্কর। দু’টি ঘন্টা অপেক্ষা করেছেন কিন্তু মণিভদ্রা আসেনি। নিজেকে শাপশাপান্ত করতে করতে গাঁওবুড়ো শুধু কপাল চাপড়েছে, কিন্তু দেখা মেলেনি ডাকিনীর। অবসন্ন গাঁওবুড়ো দীপঙ্করের সঙ্গে আর ফিরতে চায়নি। রাত্রের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যেই এক পাথরের ওপর শয্যা নিয়েছে সে, দীপঙ্করের মনে হল এই প্রথম যেন অপরাধের বিস্তৃতিটা গাঁওবুড়োর কাছে স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এক বিষাদক্লান্ত মানুষ যার অবসাদ কোনোকালেই সারবে না, আর তাই হয়ত বাঁচার ইচ্ছাটুকুও চলে গেছে।

জয়শীল আর বীরভদ্র এখনো কিছু জানেন না, উদগ্র কৌতূহলে তাঁরা পাগল হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দীপঙ্করের মুখ দেখে তাঁকে প্রশ্ন করার সাহস হচ্ছে না কারোরই। বায়চং এর অবশ্য কোনো কৌতূহল নেই, সে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে। দীপঙ্কর জঙ্গলে ঢোকা মাত্র সে ভেবে এসেছে ঠাকুর তার বোনকে নিয়ে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু দীপঙ্করকে খালি হাতে বেরিয়ে আসতে দেখে তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। বায়চং এর দুঃখ যেন গ্রাস করেছে জয়শীল আর বীরভদ্রকেও।

জয়শীল একবার মুখ ঘুরিয়ে পেছনের জঙ্গলটা দেখার চেষ্টা করলেন। কেন অতীশ ঢুকেছিলেন ওই জঙ্গলে? গাঁওবুড়োই বা গেল কোথায়? হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ চিৎকারে তাঁর সম্বিত ফিরে এলে। চেঁচিয়ে উঠেছে বায়চং, থরথর করে কাঁপছে। ওনারা পাহাড়ের সেই বাঁকটিতে এসে হাজির হয়েছেন কিন্তু সামনেই থেমে আছে দীপঙ্করের ঘোড়া।

কেন থেমে আছে তা দেখতে পেয়েছে বায়চং, এখন জয়শীলও দেখতে পেয়েছেন। বাঁকের ঠিক মুখটিতেই এসে দাঁড়িয়েছে যেন এক প্রেতিনী, কালো পোশাকে তার সর্বাঙ্গ আচ্ছাদিত। এক পলকের জন্য মনে হল বা সে শূন্যে ভাসছে।

দীপঙ্কর ঘোড়া থেকে নেমে পড়েছেন কিন্তু এগোচ্ছেন না।

বীরভদ্রের ঘোড়াটি এখন জয়শীলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে, দু’জনে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন দীপঙ্কর নতজানু হয়ে প্রণাম জানাচ্ছেন সেই প্রেতিনীকে।

কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র, তারপরেই হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল কান্নার শব্দ। না, সে কান্না কোনো ভৌতিক কান্না নয়, নয় কোনো অলৌকিক কান্না। জয়শীল বা বীরভদ্র হয়ত ভাবলেন দীপঙ্করের অতিলৌকিক শক্তিতে পরাভূত হয়েছে অপশক্তি, হয়ত মায়ার বাঁধন কেটে গেছে বলেই শোনার গেছে এক মানুষের কান্না।

কিন্তু তা তো নয়।

দীপঙ্কর জানেন তা নয়।

এ কান্না মণিভদ্রা শুধু নিজের জন্য কাঁদছেন না, কাঁদছেন সেই সমস্ত মেয়ের জন্য যাঁদের রক্তে ভেসে গেছে এই পাহাড়ি গ্রাম, কাঁদছেন সেই সব মেয়ের জন্য যারা প্রাণ না খুইয়েও যুগ যুগ ধরে অত্যাচারিত হয়ে এসেছেন নিজভূমে। কাঁদছেন কারণ হয়ত এই প্রথমবার এ গ্রামের মাটিতে কোনো পুরুষ প্রণাম জানালেন কোনো নারীকে।

দীপঙ্কর দেখলেন মণিভদ্রার পেছনে কে যেন নড়ে উঠল, তারপরেই মণিভদ্রা দু পা পিছিয়ে গেলেন। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একটি ছোট মেয়ে, পেছনে জয়শীলের লন্ঠনের আলোয় তার মুখের একাংশ দেখা যাচ্ছে, বায়চং এর সঙ্গে তার মুখের মিল খুঁজে পেতে সমস্যা হচ্ছে না।

দীপঙ্করের ইশারায় পেছন থেকে এগিয়ে এসেছে বায়চং, বোনের কাছে দৌড়ে যাচ্ছিল সে। মণিভদ্রার ছায়ামূর্তিকে নড়ে উঠতে দেখে দীপঙ্কর বায়চংকে দৌড়তে বারণ করলেন। ঠিক যে জায়গাটিতে ভাই বোনের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছিল সেখানেই আবার তারা দাঁড়িয়ে। ডেকি কিন্তু দাদার দিকে এগিয়ে এল না, একটা দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটু ভেঙ্গে অভিবাদন জানাল শুধু। তারপর এক পা, দু পা করে পিছোতে পিছোতে ফের ফিরে গেল মণিভদ্রার কাছে। দীপঙ্করের দূর থেকে বুঝতে পারলেন না, কিন্তু মনে হল এক মুহূর্তের জন্য মণিভদ্রা তাঁর দিকে তাকালেন। কিন্তু সেটা বিভ্রমও হতে পারে, কারণ অন্ধকার আর গাঢ় কুয়াশার মধ্যে মুহূর্তের মধ্যেই ডেকিকে নিয়ে মিলিয়ে গেছেন মণিভদ্রা।

দীপঙ্কররা আবার রওনা দিয়েছেন।

জয়শীল এবার সাহস করে জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রভু, বায়চং কে কি গাঁওবুড়োর বাড়িতে রেখে যাব আমরা?” বোনকে একবার ছুঁতেও না পেরে কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অজ্ঞানই হয়ে গেছিল বায়চং, জয়শীল জলের ঝাপটা দিয়ে তাকে জাগিয়েছেন। এখন সে চুপ করে আছে, বায়চং এর দুখী মুখ এর আগে বহুবার দেখেছেন জয়শীল রা কিন্তু এই প্রথম যেন তাকে বড় গম্ভীর লাগছে। মনে হচ্ছে নিমেষের মধ্যে তার বয়স বেড়ে গেছে।

দীপঙ্কর উত্তর দিলেন, “হয়ত তার দরকার পড়বে না। গ্রামের ঠিক বাইরে একজনের থাকার কথা, সে না এলে তখন ভাবা যাবে”।

দীপঙ্কর যেমনটি বলেছিলেন ঠিক তেমনটিই ঘটল, গ্রামের শেষ বাড়িটি ছাড়িয়ে আরেকটি পাহাড়ের কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল অন্ধকারে অপেক্ষা করছেন কোন এক ঘোড়সওয়ার।

“আমার চিঠি আপনার হাতেই পৌঁছেছিল লোসাং?”।

সামনে এগিয়ে এলেন লোসাং, বায়চং এর মামা। ঘোড়া থেকে নেমে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানালেন দীপঙ্করকে, “হ্যাঁ, গাঁওবুড়ো নিজে এসে আমাকে সে চিঠি দিয়ে গেছে”।

“বেশ”, দীপঙ্কর লোসাং এর মুখের দিকে তাকালেন, “বায়চং কে আপনার বন্ধুর চোখ এড়িয়ে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন আপনিই তো?”।

সম্মতি জানালেন লোসাং।

“সেদিন বায়চং কে নিতে এসেও যখন জিজ্ঞাসা করলেন না সে কিভাবে আমার কাছে পৌঁছল তখনই অল্পবিস্তর সন্দেহ হচ্ছিল। কালকে আপনাকে ব্যথায় কাতর হতে দেখে নিঃসন্দেহ হলাম। টানা চার দিন ধরে ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছোটালে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীরপুঙ্গবদেরও গায়ে ব্যথা হওয়াইর কথা”। দীপঙ্কর যেন একটু ব্যঙ্গাত্মক, একটু আক্রমণাত্মকও বটে, “সব থেকে কাছের বন্ধুটি জানতে পারলে কী হত লোসাং? আপনাকেও মেয়েদের মতন দুর্বল ভাবত কী? একটা বাচ্চা মেয়েই তো হারিয়েছে, সে আর এমন কী অঘটন!”।

লোসাং মাথা নিচু করে ছিলেন, এবার দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বায়চং এর মা আমার সবথেকে ছোটো বোন। পাশের গ্রামে বিয়ে হয়েছিল তার। নিরন্তর অত্যাচারে তার শরীর দুর্বল হয়ে এসেছিল, ডেকিকে জন্ম দিতে গিয়ে সে মারা যায়। মৃত্যুর সময় আমি তার কাছে ছিলাম না, কিন্তু তার কষ্টে ভরা দুটি চোখ আমি বহুবার দেখেছি। যে কয়েকবার পালিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম সে কিছুই বলত না, শুধু চুপ করে চেয়ে থাকত আমার দিকে। জানত আমারও তাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু সে মারা যাওয়ার পর আমি শপথ নিয়েছিলাম তার ছেলে মেয়েদের কোনো অনিষ্ট আমি হতে দেব না, ডেকি হারিয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল হয়ত আপনিই এর সুরাহা করতে পারেন, তাই চুপি চুপি গিয়ে বায়চংকে রেখে এসেছিলাম আপনাদের তাঁবুর সামনে। ও-ও কথা দিয়েছিল ঘুণাক্ষরেও আমার নাম নেবে না”।

কথা বলতে বলতে লোসাং অস্থির হয়ে ওঠেন, “আর সে শপথের জন্যই আজ আরো একবার আপনার শরণাপন্ন আমি। বায়চংকে নিয়ে যান এখান থেকে, আপনার কাছে রেখে প্রকৃত শিক্ষা দিন, বুদ্ধের ক্ষমাসুন্দর বাণীগুলি ওকে শোনান যাতে কোনো একদিন সে নিজের গ্রামে ফিরে আসতে পারে প্রকৃত বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক হয়ে। এসে মানুষের অন্ধ অহংবোধকে ঘুচিয়ে তুলতে পারে, ফের সাম্যের জয়গান শোনাতে পারে”।

দীপঙ্কর ক্ষণিকের জন্য চুপ করে থাকেন তারপর বলেন, “আমি এত বড় দায়িত্ব তো নিতে পারি না। তিব্বতে আমার জন্য যে কাজ পড়ে রয়েছে তাই যথেষ্ট, তার বাইরে আর কোনো গুরুভার নেওয়ার সামর্থ্য আমার কাছে নেই। কিন্তু আমার বিশ্বাস এখানে না হোক, আরো কয়েকশ বা কয়েক হাজার ক্রোশ দূরে এমন শিক্ষালয় নিশ্চয় আছে যেখানে বায়চং মানুষের মতন মানুষ হয়ে উঠতে পারে। সেরকম প্রতিষ্ঠান খুঁজে না পাওয়া অবধি বায়চং আমার সঙ্গে থাকবে”।

তারপরই তাঁর খেয়াল পড়ে, “কিন্তু বায়চং? সে কী আসতে চায়?”

সে আসতে চায়, জয়শীলের কোলছাড়া হওয়ার কোনো ইচ্ছাই বায়চং দেখায় না।

……………………………………………………………………………………………………

মধ্যরাত্রি, তিন সন্ন্যাসী আর এক বালক ঘোড়ার পিঠে চড়ে দ্রুত পাহাড়ের উতরাই বেয়ে নেমে আসছেন। অনেক পথ যাওয়া বাকি, তাও তো তাঁরা জানেন না আরো কত বিভীষিকা অপেক্ষা করে আছে তাঁদের জন্য। এই মুহূর্তে অবশ্য তাঁরা সে নিয়ে ভাবিত নন। সামনের সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করলেন, “জয়শীল ঘুমিয়ে পড়ো নি তো?”

দ্বিতীয় জন ঘুম জড়ানো চোখে উত্তর দিলেন, “না প্রভু”।

ঠান্ডা হাওয়ার কনকনে শব্দের মধ্যেই প্রথম জনের গলা শোনা গেল ফের, এবারে একটু কঠোর, “এই শেষ সুযোগ তোমার। পরের বারেও খেয়াল না থাকলে আমি বিক্রমশীলেই ফেরত যাব। এখন শোনো, একটা গল্প বলি…… বহু বহু বছর আগে এক তরুণ থাকতেন এরকমই এক পাহাড়ি গ্রামে, তাঁর নাম ঠিস্রোং”।

উত্তুরে হাওয়া এক পলকের জন্য থমকে দাঁড়াল, তারপর ফের হু হু করে ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে।

(তথ্যঋণ কৃতজ্ঞতা –  চুরাশি সিদ্ধর কাহিনী (অলকা চট্টোপাধ্যায়, অনুষ্টুপ), অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (অলকা চট্টোপাধ্যায়, নবপত্র প্রকাশন))

tb-dakini-2