উগ্র জাতীয়তাবাদ, সমস্যা যখন গোটা পৃথিবীর

২৫শে মে’র আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তর-সম্পাদকীয়তে আমার লেখা   এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে (http://www.anandabazar.com/editorial/violent-nationalism-is-winning-everywhere-1.394601)।

Trump-Putin-1-1024x675

ভারতে মোদী, ইজরায়েলে নেতানইয়াহু, তুরস্কে এরদোয়ান, পোল্যান্ডে দুদা, রাশিয়ায় পুতিন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পৃথিবী জুড়ে এতজন কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতাকে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি রূপে তখতে বসে থাকতে বোধহয় আমরা আগে দেখিনি। অবশ্য পরিস্থিতির চাপে যেখানে আঙ সান সু চি রোহিঙ্গাদের বার্মিজ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করছেন বা এঞ্জেলা মার্কেল জার্মানি তথা ইউরোপীয়ন ইউনিয়নকে সিরিয়ান শরণার্থীদের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তুরস্ককে কোটি কোটি ইউরো দান করছেন সেখানে মেনে নেওয়া ভালো যে আলো ক্রমে নিভিছে। আগামী নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাষ্ট্রপতির পদটি গ্রহণ করলেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয়। এই জাতীয়তাবাদ দেশবাসী নয় দেশকে ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়,  এবং দেশ নামক সেই বিমূর্ত ধারণাটিকে দেশবাসীর মাথায় গেঁথে দেওয়ার জন্য  এমন দিনের গল্প শোনায় যেখানে ইতিহাস, পুরাণ আর কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এ যে নেহাত কথার কথা নয় সেটা দেশে বসে অধিকাংশ মানুষই বিলক্ষণ টের পান কিন্তু সে সমস্যা যে শুধু ভারতের নয় সেটা বোঝার সময় এসেছে।

আন্দ্রেই দুদার কথাই ধরুন। ভদ্রলোকের দয়ার শরীর, কোটি কোটি সিরিয়ান এবং আফ্রিকান শরণার্থীদের মধ্যে জনা দেড়শকে ঠাঁই দিয়েছেন পোল্যান্ডের মাটিতে; যারা ঢুকেছেন তাঁরাও অবশ্য প্রায়ই মারধোর খাচ্ছেন। কিন্তু দুদা শুধু শ্বেতাঙ্গ পোলিশদের ত্রাতা হিসাবেই দেখা দেননি, ইতিহাসকেও দস্তুরমতন নিজের পথে চালাতে চাইছেন। পোলিশ রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন পোল্যান্ডের ইতিহাসের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল হাজার বছর আগের এক পোলিশ রাজার ক্রিশ্চান ধর্মে দীক্ষিত হওয়া। ভেবে দেখুন একবার, এই সেই দেশ যেখানে নাজি অত্যাচারের দগদগে স্মৃতি নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে অসউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, এই সেই দেশ যেখানে স্টালিন এবং তাঁর অনুগামী পোলিশ কম্যুনিস্টরা চল্লিশ বছর ধরে হাজার হাজার মানুষকে জেলে পুরে রেখেছেন, এই সেই দেশ যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও ইহুদীরা বহু বছর ধরে নির্যাতিত হয়ে এসেছেন। কিন্তু না, এত ঘটনাবহুল আধুনিক ইতিহাসের কোনোকিছুই পোলিশ রাষ্ট্রপতির কাছে গুরুত্ব পায় নি (কিছু ঘটনা স্রেফ অস্বীকারও করেছেন), গুরুত্ব পেয়েছে শুধুই ধর্ম।

অতি জাতীয়তাবাদের একটি প্যাটার্ন বুনে দেওয়ার জন্য বহু মানুষ সমস্যাটিকে ধর্মের ক্যালাইডোস্কোপে দেখতে চান। বর্তমান পৃথিবী অবশ্য সঘোষে জানাচ্ছে অতি জাতীয়তাবাদ কোনো বিশেষ ধর্মের কুক্ষিগত অধিকার নয়। তাকানো যাক ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু মুসলিমপ্রধান তুরস্কের দিকে।  ধর্মনিরপেক্ষতা এবং উদারপন্থার নিরিখে মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপের সমস্ত  দেশগুলির মধ্যে তুরস্ক ছিল সর্বতোভাবে অগ্রগামী।  অটোমান সাম্রাজ্যের শেষের সময়ে আর্মেনিয়ান গণহত্যার বিভীষিকাময় দিনগুলির থেকে দেশটিকে উদারপন্থার দিকে নিয়ে যাওয়াটা মোটেই সহজ কাজ ছিল না কিন্তু কেমাল আতাতুর্ক সেটাই করে দেখিয়েছিলেন।  আতাতুর্ক ক্ষমতায় আসার পর প্রায় একশ বছর হতে চলল, খাতায় কলমে তিনি এখনো এ দেশের জনক অথচ তাঁর ধ্যানধারণার গুরুত্ব যেন ক্রমেই কমে আসছে। শেষ কয়েক বছর ধরে এ দেশের তাবড় নেতারা ঘটা করে পালন করছেন কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনবার্ষিকী। তাঁদের বিশ্বাস গত শতাব্দীতে ঘটা তুরস্কের মুক্তিযুদ্ধ নয়,  ১৪৫৩তে বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্যের পতনই নাকি উন্মেষ ঘটিয়েছে তুর্কী জাতীয়তাবাদের। মনে রাখা ভালো যে আদি অটোমানরা এসেছিলেন তুর্কমেনিস্তান থেকে, ইস্তানবুল থেকে যার দূরত্ব প্রায় হাজার দুয়েক মাইল। একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছেও তুরস্কের মতন আধুনিক একটি দেশে ঔপনিবেশিক জাতীয়তাবাদ প্রাধান্য পাচ্ছে, বিস্ময়াতীত ট্র্যাজেডি ছাড়া কি বলবেন বলুন? তবে সবসময় যে এত স্থূলপদ্ধতিতেই জাতীয়তাবাদ চাগিয়ে তোলা হয় সে কথা ভাবলে ভুল হবে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯১৫-র আর্মেনিয়ান গণহত্যাকে তুরস্কের কোনো সরকারই গণহত্যা বলে স্বীকার করেনি, অথচ বর্তমান সরকারের কর্ণধাররা প্রায় আচম্বিতেই বলতে শুরু করেছেন যে তাঁরা সেই সুদূর অতীতের কথা ভেবে ব্যথিত। তাহলে কি আলো দেখা গেল? না। কারণ যে আর্মেনিয়ানরা খুন হয়েছিলেন তাঁদেরকে এখন বলা হচ্ছে অটোমান আর্মেনিয়ান, অথচ অটোমান রাজপরিষদরাই যেনতেন প্রকারেণ চেয়েছিলেন আর্মেনিয়ানদের  এ দেশ থেকে দূর করতে। সে কথা ভোলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এক বৃহৎ জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে, যেন তুরস্ক রাষ্ট্রে জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবার চিরকাল অক্ষয় স্থান ছিল এবং পনের লাখ মানুষের মৃত্যু স্রেফ কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তির  সংঘাতের ফল।

কেউ নরম গলায় মিষ্টি হেসে উগ্র জাতীয়তাবাদকেই ভবিতব্য বলে চালানোর চেষ্টা করছেন কেউ আবার পেশী ফুলিয়ে গরম বুলি আউড়ে প্রমাণ করতে চাইছেন জোর যার মুলুক তার। আজ আট মাসের বেশী সময় ধরে রাশিয়ার সেনাবাহিনী সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের রাজনৈতিক বিরোধীদের ধ্বংস করার  কাজে সহায়তা করছে অথচ কতজন শরণার্থীকে পুতিন আশ্রয় দিয়েছেন নিজের দেশে? গত বছর চারশ বিরাশি জন সিরিয়ানকে রাশিয়া অস্থায়ী শরণার্থী হিসাবে দেশে ঢুকতে দিয়েছে, আর স্থায়ী শরণার্থী এক জন মানুষও হতে পারেননি। অথচ সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা অনুযায়ী রাশিয়ার প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষ পুতিনের  আগ্রাসনকে সমর্থন করছেন। ২০১৪তেও প্রায় ঊননব্বই শতাংশ রাশিয়ান জানিয়েছিলেন ইউক্রেনের উচিত ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার হাতেই তুলে দেওয়া। পেরেস্ত্রৈকা এবং গ্লাসনস্ত উত্তর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হওয়ায় মধ্য এশিয়া এবং বাল্টিক সাগরের পাশের সোভিয়েত কলোনিরা যতই খুশী হোক না কেন, খোদ রাশিয়ার জাত্যভিমানে যে বড়সড় একটা আঘাত পৌঁছেছিল সেটা বলা বাহুল্য। শুরুর দিকের চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবার অপ্রতুলতায় মানুষ  এসব নিয়ে বড় একটা মাথা ঘামাননি কিন্তু আস্তে আস্তে যেই দেশের অর্থনীতিতে স্থিতি আসতে শুরু করেছে, পশ্চিমী দুনিয়া ‘ইমার্জিং ইকোনমি’ তকমা লাগিয়েছে রাশিয়ার মানুষও হৃতগরিমা কি ভাবে ফিরে পাওয়া যায় সে নিয়ে অল্পবিস্তর ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন। দুঃখের ব্যাপার এই যে এমন এক মানুষের হাতে ততদিনে ক্ষমতা পৌঁছেছে যিনি হৃতগরিমা শুধুই খুঁজে পেয়েছেন উগ্র জাতীয়তাবাদের বিস্তারের মধ্যে। ওদিকে রাশিয়ার অর্থনীতি শেষ দু’তিন বছর ধরেই মুহ্যমান হয়ে আছে। পুতিন যতই তেলের দাম পড়ে যাওয়াকেই দায়ী করুন  না কেন এটা ঘটনা যে বিদেশী বিনিয়োগ আনতে ব্যর্থতা, দুর্নীতি, মাঝারি এবং ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা এই সবকিছু মিলে রাশিয়ার অর্থনীতি এখন ভেতরফোঁপরা। কিন্তু সে নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় বা ইচ্ছা পুতিনের আছে বলে মনে হয় না।

কিন্তু শুধু পোল্যান্ড, রাশিয়া বা তুরস্ক নয় গোটা ইউরোপ জুড়েই অতি রক্ষণশীল, উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলি মানুষের সমর্থন পাচ্ছে – ফ্রান্স, হল্যান্ড কি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলিতে গড়ে মোট ভোটের দশ থেকে কুড়ি শতাংশ এখন এদের দখলে। সিরিয়া এবং আফ্রিকার শরণার্থী সমস্যা অবশ্যই ইউরোপের মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, এঞ্জেলা মার্কেলের মতন তুলনামূলক ভাবে উদারপন্থী নেতাদের ওপরে আর ভরসা রাখতে পারছেন না তাঁরা। কিন্তু শুধু সেই কারণেই কি উগ্র জাতীয়তাবাদের এত বাড়বাড়ন্ত? মনে হয় না।  বিশ্বায়িত পৃথিবীতেও নিরানব্বই আর এক শতাংশের ফারাক বেড়ে চলতে দেখলে কোন মানুষের আর বিশ্বনাগরিক হিসাবে পরিচয় দিতে ভালো লাগে? একজন তুর্কী দেখছেন বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া কি মাল্টার মতন দেশও ইউরোপীয়ন ইউনিয়নের সদস্যপদ পাচ্ছে স্রেফ ধর্ম ও বর্ণ পরিচয়ে, একজন পোলিশ দেখছেন একমাত্র ইউরোপীয় দেশ হিসাবে মন্দার বাজারে সাফল্যের মুখ দেখলেও লভ্যাংশের সিংহভাগটা সেই চলে যাচ্ছে ইউরোপীয় সুপারপাওয়ারদের কাছেই, একজন সার্বিয়াান দেখছেন শুধু রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় থাকার জন্য যোগ্যতা সত্ত্বেও ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে ঢুকতে পারছেন না। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা হোক বা আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার, রাষ্ট্রপুঞ্জ হোক  বা ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন, সাধারণ মানুষের কাছে এই সংস্থাগুলি যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছিল তার অধিকাংশই পূর্ণ হয় নি। একথা অনস্বীকার্য যে বিশ্বায়নের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত সমাজ পেয়েছে অনেক কিছুই কিন্তু সেই এক কুমীরছানাকে বার বার দেখিয়ে উন্নত দেশগুলি তার ফায়দা তুলেছে হাজার গুণ। স্বভাবতই যে মানুষগুলির ভাগ্যে কিছুই জোটেনি (এবং তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ) তাঁরা নিজেদের প্রাথমিক পরিচয়েই ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন, আর জাতীয়তাবাদের শুরুর কথাও সেখানেই লুকিয়ে। ভুললে চলবে না এমনকি উন্নত দেশগুলিতেও আর্থিক বৈষম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার যে খনিশ্রমিকরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতাবেন বলে পণ করেছেন তাঁদেরকেও কিন্তু ধোঁকার টাটি কম দেখানো হয়নি। মানুষের চরিত্রগত লোভ ও খলতা, হাজার হাজার বছরের সামাজিক ইতিহাস, গণতন্ত্রের সার্বিক বিকাশ না ঘটা এসবের কোনোকিছুকেই অস্বীকার করছি না কিন্তু আশাভঙ্গের আখ্যানটিরও একইরকম গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

 

Advertisements

রাজনৈতিক লক্ষ্য, অর্থনৈতিক বাস্তব – প্রসঙ্গ যখন নির্বাচন

West Bengal Politics

বাহাত্তর সালে দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগম থেকে বেরিয়ে এসে এম-জি- রামচন্দ্রন প্রতিষ্ঠা করেন নতুন দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগম। তার ঠিক এক বছর আগে তামিলনাড়ুর পঞ্চম বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৪ টি আসনের মধ্যে করুণানিধির দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগম পেয়েছিল ২০৫ টি আসন, নিকটম প্রতিদ্বন্দ্বী কামরাজের জাতীয় কংগ্রেস (অর্গানাইজেশন) পেয়েছিল একুশটি আসন। আরো চার বছর আগে প্রথমবারের জন্য তামিলনাড়ুতে কংগ্রেসকে হটিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে এই ডি-এম-কে। রামচন্দ্রনের এ-আই-এ-ডি-এম-কে ও প্রতিষ্ঠিতে হওয়ার পর প্রথম বিধানসভা নির্বাচন (১৯৭৭) লড়েই ক্ষমতায় চলে আসে।

পাশের রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশে অবশ্য কংগ্রেস সত্তরের দশকেও পূর্ণ ক্ষমতা উপভোগ করে গেছে। কম্যুনিস্টদের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও সে রাজ্যে সিপিএম এবং সিপিআই মিলে খান কুড়ির বেশী আসন কোনোদিনই পায় নি। ১৯৮৩তে প্রথমবারের জন্য রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে যখন এন-টি রামারাও এর তেলেগু দেশম ২৯৪ টি আসনে মধ্যে ২০১ খানি জিতে ক্ষমতায় আসে। তেলেগু দেশমের প্রতিষ্ঠা ১৯৮২ সালে।

হালের আম আদমি পার্টিও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরেই ক্ষমতায় আসে ২০১৩ তে, শেষ হয় দিল্লী বিধানসভা থেকে কংগ্রেসের পনেরো বছরের দীর্ঘ শাসন।

এই দলগুলির পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসকে রাখুন। বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্য কিন্তু তৃণমূল শুরুতেই পায়নি, অপেক্ষা করতে হয়েছে তেরোটি বছর। কেন? জ্যোতি বসুর ক্যারিশমা কি কংগ্রেসের সাবোটাজ জাতীয় থিয়োরীগুলোকে উপেক্ষা করলে দু’টি আপাতসম্ভব ব্যাখ্যা্র ওপর আমরা জোর দিতে পারি – ১) রাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টের কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন, ২) তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক লক্ষ্যটি সাধারণ মানুষের কাছে পরিস্ফুট হয়নি। পুরো আশির দশকের স্থবির অর্থনৈতিক চিত্রটি উনিশশ নব্বইয়ের শেষে বা দু’হাজারের শুরুতেও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চোখে ধরা পড়েনি একথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। উপরন্তু নব্বইয়ের দশক থেকেই প্রায় সমস্ত পরিসংখ্যানের মাপকাঠিতেই কলকাতা প্রথম সারির মহানগরীর মধ্যে জায়গা হারাতে শুরু করে, বেঙ্গালুরু বা হায়দ্রাবাদের উত্থানও সচেতন মানুষদের নজর এড়ায়নি বলেই আমার ধারণা। কলকাতাই পশ্চিমবঙ্গ নয় কিন্তু এ কথা দুর্ভাগ্যজনক ভাবে অনস্বীকার্য যে গরীব রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা – স্বাস্থ্য – শিল্প জনিত সাফল্য প্রথম থেকেই কলকাতা নির্ভর, বিধান রায়ের আমল থেকে শুরু করে জ্যোতি বসুর আমল পর্যন্ত। জ্যোতিবাবুরা যে সাফল্যের সঙ্গে গ্রামবাংলায় ভূমিসংস্কার করতে পেরেছিলেন তার ছিটেফোঁটাও গ্রামের স্বাস্থ্য বা শিক্ষায় দেখাতে পারেননি। এহেন পরিস্থিতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক দল যে ফায়দা তুলতে পারত তৃণমূল তা পারেনি। বলা বাহুল্য যে বহু বছর ধরেই মানুষ সিপিএম বিরোধিতার বাইরে তৃণমূলের রাজনৈতিক লক্ষ্য কিছু দেখতে পাননি।

দ্বিতীয়বারের জন্য বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরের দিন এ কথাগুলো কেন তুলছি সে নিয়ে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। একটাই কারণ, দু’হাজারের তৃণমূলের মতনই দু’হাজার ষোলর কংগ্রেস বা বামফ্রন্টেরও কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য আমরা দেখতে পাই নি, যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতায় আসা অবশ্যই কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য হতে পারে না এবং বাংলার মানুষ সেটা যে বিলক্ষণ জানেন সেটাও টের পাওয়া গেছে। অথচ দু’হাজার ষোল সালের অর্থনৈতিক বাস্তবটিকে মানুষের সামনে পৌঁছে দেওয়াটাই হতে পারত বিরোধীদের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য, এবং আমার বিশ্বাস সেটি সঠিকভাবে করতে পারলে এরকম ভাবে ধুয়েমুয়ে যেতে হত না। অর্থনৈতিক বাস্তবটি কি সেটি এবার একটু দেখে নেওয়া যাক। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রাজ্যওয়াড়ি বাজেট নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে শেষ পাঁচ বছরের (২০১০ – ২০১৪) মতন ২০১৫ তেও ঋণ এবং রাজ্যের উৎপাদন সম্পদের (গ্রস স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) আনুপাতিক হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ special category (অর্থাৎ উত্তর পূর্বাঞ্চল, কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখন্ড) রাজ্যগুলিকে বাদ দিয়ে সারা দেশের মধ্যে সবথেকে খারাপ অবস্থায় আছে। শুধু এটুকু তথ্যে অবশ্য পুরো চিত্রটি ফুটে উঠবে না – ২০১০ সালে যেখানে প্রতি এক টাকা সমতুল্য পণ্য সামগ্রী উৎপাদন করতে গিয়ে আমরা চুয়াল্লিশ পয়সা ধার করেছি, সেটা ২০১৫ সালে নেমে এসেছে সাড়ে পঁয়ত্রিশ পয়সায়। রঘুরাম রাজন এবং তাঁর সহকর্মীদের ধারণা ২০১৬ তে সেটা আরো নেমে তেত্রিশ পয়সা হবে। অর্থাৎ সংখ্যার হিসাবে বাম আমলের তুলনায় তৃণমূল সরকার ধার এবং আয়ের অনুপাত ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে পেরেছে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার যে বেশ বড় একটা ঋণের অঙ্ক খাতায় রেখে বিদায় নিয়েছিলেন সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তৃণমূলের নেতারা কারণে অকারণে সেটা মনে করিয়ে দেন বলে বিরক্তি আসতে পারে কিন্তু এটা ঘটনা যে ২০১১ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় পশ্চিমবঙ্গের ধারের পরিমাণ ছিল এক লাখ চুরানব্বই হাজার কোটি টাকা। পাঁচ বছর পরে সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে দু লাখ চুরাশি হাজার কোটিতে। কিন্তু রাজ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঠিক কতটা প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছে এই সংখ্যাগুলো?

একের পরে ছ সাতটা শূন্য বসলেই যেখানে আমরা সংখ্যাগুলি ধারণা করতে হিমশিম খাই সেখানে দু-তিন লাখ কোটি শব্দবন্ধ প্রায় পরাবাস্তব ঠেকতে পারে। কিন্তু আপনার আমার সংসারের জন্য যেটা সত্যি সেটা একটা রাজ্য বা দেশের ক্ষেত্রে নাও সত্যি হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন ধারের পরিমাণ বেড়ে গেলেই যে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার কমবে এরকম কোনো কথা নেই। ভারতবর্ষের নিজেরই ঋণ এবং জাতীয় আয়ের অনুপাত ৬৫% (অর্থাৎ ১ টাকার পণ্য উৎপাদন করতে ৬৫ পয়সা ধার করতে হচ্ছে) কিন্তু অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারের (৭.৩%) হিসাবে চীন ছাড়া অন্য কোনো উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ ভারতকে ছুঁতে পারেনি। ঋণ এবং আয়ের অনুপাতের দিক থেকে এরকম কোনো ম্যাজিক নাম্বার নেই বলেই অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন যা ছুঁয়ে গেলে বিপদ অবশ্যম্ভাবী। আই-এম-এফ এর ভূতপূর্ব রিসার্চ ডিরেক্টর কেনেথ রোগফের মতন হাতে গোনা যাঁরা বিপরীত মত পোষণ করেন তাঁরাও বলছেন অনুপাতটি উন্নত দেশের ক্ষেত্রে নব্বই এবং উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে সত্তর ছুঁইছুঁই হলে তবেই একটা আশঙ্কা থেকে যায়। অবশ্য একটি দেশের ঋণের সিংহভাগটাই আসে বিদেশী সংস্থার থেকে যেটা পশ্চিমবঙ্গের মতন রাজ্যের জন্য প্রযোজ্য নয়। বিদেশী সংস্থা ঋণ দেওয়ার অর্থ দেশের অর্থনীতি নিয়ে তারা আশাবাদী এবং তাই ডলার, পাউন্ড বা ইয়েন আসতে সমস্যা হচ্ছে না। অবশ্য সব সময় যে কোনো এক সংস্থাই টাকা দেবে এরকম কোনো কথা নেই, অন্য দেশ বা অনাবাসী ভারতীয়রাও টাকা ধার দিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের ঋণের খাতে কিন্তু চোখ বোলালে দেখা যাচ্ছে ওই দু লাখ চুরাশি হাজার কোটি টাকা ঋণের একাশি শতাংশ-ই এসেছে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, ন্যাবার্ড, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মতন সংস্থার থেকে। এর সঙ্গে যদি কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া ধারের পরিমাণটাও জোড়েন তাহলে দেখা যাবে অনুপাতটি ছিয়াশি শতাংশ ছুঁই ছুঁই অর্থাৎ ধারের অধিকাংশটাই অভ্যন্তরীণ। কিন্তু এ ঘটনা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সব রাজ্যের ক্ষেত্রেই সত্যি। ঋণের উৎসগুলি জানার পর স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে ঋণের বোঝা ঘাড়ে নিয়েও পশ্চিমবঙ্গ অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হিসাবে কিরকম করছে? রাজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির তালিকা জানাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সমস্ত রাজ্যগুলির মধ্যে বারো নম্বরে, বৃদ্ধির হার ৭.১৫%। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, পাঞ্জাবের মতন বেশ কিছু তথাকথিত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের থেকে পিছিয়েই আছে।

কিন্তু অর্থনৈতিক বৃদ্ধি আর উন্নয়ন সমার্থক নয়, আর তাই জন্যই শুধু ৭.১৫% সংখ্যাটি ধরে বসে থাকলে চলবে না। দেখা যাক উন্নয়নের খাতে বাকি রাজ্যগুলির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ কতটা বেশী বা কম খরচ করছে। ২০১৪ সালে রাজ্যগুলির সর্বমোট খরচের শতাংশের হিসাবে শিক্ষা এবং সংস্কৃতি খাতে পশ্চিমবঙ্গের স্থান মহারাষ্ট্র ও বিহারের পরেই। স্বাস্থ্যের খাতেও দেখা যাচ্ছে প্রথম পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। দুটি চিত্রই আশাব্যঞ্জক যদিও সংস্কৃতির খাতে কিছুটা কমিয়ে শিক্ষার খাতে খরচটা আরো বাড়ালে রাজ্যের মানুষ হয়ত অখুশি হবেন না। কিন্তু যে মুহূর্তে রাস্তা, সেতু বা বিদ্যুৎ সংক্রান্ত পরিকাঠামোর খরচের দিকে নজর পড়বে, বোঝা যাবে এই ভালো লাগাটা নেহাতই তাৎক্ষণিক। বিবেকানন্দ উড়ালপুল বা উল্টোডাঙ্গা উড়ালপুলের মতন দুর্ঘটনার পেছনে যে বেশ একটা কার্যকারণ সম্পর্ক আছে সেটা ঠাহর হয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট টি দেখলে। প্রধান সতেরোটি রাজ্যের মধ্যে রাস্তা বা সেতু খাতে সবথেকে কম খরচ করেছে পাঞ্জাব, আর তার পরেই রয়েছে আমাদের রাজ্য। রাস্তা, সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর প্রারম্ভিক খরচটিই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতন, আর তারপর তো ‘কস্ট ওভাররান’ অর্থাৎ সময়ের মধ্যে শেষ করতে না পারার গুনাগার আছেই। তাই এই ধরণের গুরুত্বপূর্ণ ভৌত পরিকাঠামোগুলি গড়ে তোলার জন্য দরকার বড় বিনিয়োগের। আর ঠিক সেই জায়গাটিতেই রাজ্য সরকার ব্যর্থ।

কিন্তু কেন?

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দেওয়া তথ্য নিয়ে কিছু মৌলিক বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে উন্নয়ন খাতে রাজ্য সরকার যা টাকা রাখতে পারত তার অনেকটাই চলে যাচ্ছে ওই অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ মেটাতে। একথাটা আমাদের কাছে নতুন নয়, তৃণমূলের নেতারা বেশ কয়েক বছর ধরেই এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন। কিন্তু অবস্থাটা যে কত খারাপ সেটা তথ্যগুলো না দেখলে বোঝা যায় না। গত আর্থিক বছরে প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ের থেকে শুধুমাত্র সুদের খরচ মেটাতেই গেছে ২০ টাকারও বেশী। তার আগের দুই বছরে ওই সংখ্যাটি ছিল তেইশ থেকে পঁচিশের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গকে বাদ দিয়ে ভারতের অন্য রাজ্যগুলির গড় সুদের খরচ সেখানে মাত্রই ১০ টাকা। অর্থ দফতরের কর্তারা যা বলছেন তাতে মনে হয় না অদূর ভবিষ্যতে অন্য কোনো চিত্র দেখা যাবে। ব্যয় যেখানে বেড়েই চলেছে সেখানে অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য আয় বাড়াটাও জরুরী, কিন্তু সেখানেই বা আশার আলো কোথায় দেখা যাচ্ছে? এ বছরের ফেব্রুয়ারীতেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, তৃণমূলের ঘরের লোক সুগত মারজিত ‘ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি’ তে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে জানিয়েছেন রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের দুরবস্থা চোখে পড়ার মতন। যদিও সুগতবাবুর প্রবন্ধটি ২০১১-১২ আর্থিক বছরের তথ্যের ভিত্তিতে লেখা, কিন্তু শেষ তিন বছরে এমন কিছু গঠনমূলক পরিবর্তন এ রাজ্যে দেখা যায়নি যাতে সে প্রবন্ধের মূল সিদ্ধান্তগুলিকে উড়িয়ে দেওয়া যায়। সুগতবাবু এবং তাঁর সহ-লেখকদের বক্তব্য অনুযায়ী শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায় বহু বছর ধরে পিছিয়ে থাকার জন্য শুল্ক আদায়ের জায়গাটিই সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে সঞ্চয় করার প্রবণতাও অনেকটাই বেশী, ভোগ্যবস্তু তাঁরা কম কিনছেন বলে সেখানেও শুল্কের মাধ্যমে রাজস্ব বিশেষ আদায় করা যাচ্ছে না। কেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ খরচ কম করছেন সেটা এ প্রবন্ধ থেকে বোঝা না গেলেও ‘ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে’ তে চোখ বোলালে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের শহর এবং গ্রামে ভোগ্যবস্তুর পেছনে খরচের ব্যবধান একশ শতাংশেরও বেশী। পশ্চিমবঙ্গ ধনী রাজ্য নয়, এমনকি মাঝারি আয়ের বাকি রাজ্যগুলির তুলনাতেও বহু বছর ধরে আমরা ভালো ফল দেখাতে পারিনি কিন্তু তার পরেও অর্থনৈতিক বৈষম্যের এই তীব্রতা আমাদেরকে স্তম্ভিত করে তোলে। আর এই তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের জন্যই পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের মানুষরা দীর্ঘদিন ধরে চিট ফান্ডগুলির শিকার হচ্ছেন। চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবেতেই শহরের তুলনায় গ্রামবাংলায় এতটাই দৈন্য যে মানুষগুলি প্রাণপাত করে সঞ্চয় করে চলেছেন একটা মিরাকলের আশায়। আর ওই যে ৭.১৫% হারে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির কথা বলছিলাম সেটিও কিন্তু এই বৈষম্যের কথা বলে না। সংখ্যাটা একটা ওপর ওপর আশ্বাস দেয় বটে কিন্তু ওই পর্যন্তই।

ঋণের বোঝা আবশ্যিক ভাবে খারাপ নয় কিন্তু ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নের ঘরে কিছুই জমা না পড়লে ঘোর দুর্দিন আসতে বাধ্য। পূর্ব এশিয়া বা দক্ষিণ আমেরিকার অর্থনৈতিক ইতিহাস দেখায় এই একই পরিস্থিতিতে একটি দেশ বা রাজ্যের আর্থসামাজিক স্থিতিটুকু নষ্ট হয়ে যায়, দেখা দেয় তুমুল রাজনৈতিক অস্থিরতা। পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি দেখলে আশাবাদী হওয়ার বিশেষ কিছু থাকে না, তৃণমূলের আমলে যৎসামান্য উন্নতিটুকুও নেহাত জলের উপর নাকটুকু ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। বিদেশী বা দেশী বিনিয়োগ আনতে পারলে একটা কাজের কাজ হয় বটে কিন্তু সেক্ষেত্রে বর্তমান এবং ভূতপূর্ব সরকারদ্বয়ের ব্যর্থতার ইতিহাস কোনো বাঙ্গালীরই অজানা নয়। তাহলে করণীয় কি? ঋণ মকুব অবশ্যই একটি আপৎকালীন উপায়। মুখ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী সহ তৃণমূলের সমস্ত নেতারা বারম্বার কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ঋণ মকুবের জন্য, একে শুধু হতাশার প্রতিফলন হিসাবে দেখলে ভুল হবে। ওই যে শুরুতেই জানিয়েছিলাম পশ্চিমবঙ্গের ঋণের প্রায় ছিয়াশি শতাংশই অভ্যন্তরীণ ঋণ, তাই কেন্দ্রের পক্ষে ঋণ মকুব করা সত্যিই সম্ভব। ভুললে চলবে না যে শেষ তিন বছরে প্রায় সওয়া এক লাখ কোটির মতন কর্পোরেট ঋণ মকুব হয়েছে এই ভারতবর্ষেই। এই একটা জায়গায় সমস্ত রাজনৈতিক দলের এককাট্টা হওয়া উচিত। জাতীয় গড়ের থেকে দশ শতাংশেরও বেশী হারে যেখানে আমরা সুদ মেটাচ্ছি সেখানে অবান্তর রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকা উচিত নয়। যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন এ নিয়ে মতবিরোধের আদৌ সুযোগ আছে কি? কিন্তু ঋণ মকুব নেহাতই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রারম্ভিক স্ট্র্যাটেজি মাত্র, ঘুরে দাঁড়ানোটা বাস্তবায়িত করতে গেলে দরকার আশু অর্থনৈতিক সংস্কারের। সেই সংস্কার কিভাবে আসতে পারে সে নিয়ে বিশেষ আলোকপাত বিদায়ী সরকার করতে পারেননি। আগামী সরকারও তো সেই proverbial নতুন বোতলে পুরনো মদ, সুতরাং সেই এক লোকেরাই আচম্বিতে দিশা দেখাবেন এটা আমি অন্তত ভাবতে পারছি না।

কিন্তু মূল সমস্যা অন্য জায়গায়। অর্থনৈতিক বাস্তবকে সবার সামনে আনতে গেলে বামফ্রন্টকে তাঁদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করতেই হবে। ২০১৬-র নির্বাচনী প্রচার থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে সেরকম কোনো ইচ্ছাই তাঁদের ছিল না, হয়ত ভবিষ্যৎ-এও হবে না। জোটসঙ্গী হিসাবে কংগ্রেসকেও বাধ্য হয়ে একই রাস্তা নিতে হয়েছে। বাকি থাকে বিজেপি, তাঁরা নরেন্দ্র মোদীকে জগৎভূষণ, বিপত্তারণ রূপে দেখাতেই এমন ব্যস্ত যে পশ্চিমবঙ্গের নির্দিষ্ট সমস্যাগুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগই পান নি।

পরের পাঁচ বছরে বামফ্রন্ট, কংগ্রেস কি বিজেপির রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজী কি হবে তা আমি জানি না। এও জানি না যে তৃণমূলের নেতৃবৃন্দ কি লং টার্ম প্ল্যানিং এর কথা ভাববেন। শুধু এইটুকু বলতে পারি যে এটাই যদি পশ্চিমবঙ্গের ‘স্টেডি স্টেট ইকুইলিব্রিয়াম’ হয়ে থাকে তাহলে নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তির উঠে আসার জমি কিন্তু প্রস্তুত। রামচন্দ্রন, রামারাও বা কেজরিওয়ালের মতন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উঠে আসবেন কিনা, উঠে এলেও কর্পোরেট অর্থশক্তি ছাড়া দাঁড়াতে পারবেন কিনা, অর্থের সুরাহা হলেও মমতার মতন টেনাসিটি দেখাতে পারবেন কিনা সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনই মিলবে না কিন্তু আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির ভারতীয় ইতিহাসটিকে দেখলে এহেন ভবিষ্যৎকে আষাঢ়ে গল্প বলে হয়ত উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

ফিদেল, বারাক এবং বর্ণবাদের উত্তরাধিকার

Fidel-Castro-vs-Barack-Obama

অশোক মিত্র সম্পাদিত ‘আরেক রকম’ পত্রিকায় সম্প্রতি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার ঐতিহাসিক হাভানা সফর উপলক্ষ্যে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, আরো আলোচনার অবকাশ রাখে, সেই ভেবেই ব্লগে তুলে দিলাম লেখাটি। সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠকদের মতামত এবং আলোচনা পেলে বড়ই ভালো লাগবে। ধন্যবাদ প্রাপ্য বন্ধু এবং আনন্দবাজার পত্রিকার  সাংবাদিক অমিতাভ গুপ্তকে, ওর উৎসাহ ছাড়া লেখাটি হয়ত আদৌ লিখে উঠতে পারতাম না । আরেক বন্ধু, অর্থনীতিবিদ শুভনীল চৌধুরীকেও ধন্যবাদ লেখাটি সযত্নে স্ক্যান করে পাঠানোর জন্য।

(ফিদেল কাস্ত্রো এবং বারাক ওবামার স্থিরচিত্র উৎস – Google images)

1

2

3