কিছু আগুনে বই

১৫ই অগস্টের দিনে রইল পছন্দের কিছু বইয়ের কথা, যে সব বই অগ্নিযুগের ইতিহাসকে হাত ধরে চিনিয়েছে। কিছু বইয়ের ভাষ্য অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ, কিছু বইয়ে কল্পনার অনুপ্রবেশ ঘটেছে কিন্তু সেসবের পরেও আমার বইয়ের তাকে সবসময় আলাদা একটা জায়গা থাকবে এদের জন্য। লিস্টে আজ সেই সব বইগুলোই থাকল যেগুলো বাংলা নন-ফিকশন এবং বাঙ্গালী বিপ্লবীদের নিয়ে লেখা। অফ কোর্স, সমস্ত পছন্দের বই নিয়ে লিখতে গেলে হয়তো তিন-চারটে ব্লগপোস্ট লাগবে, এখানে সেগুলো নিয়েই লিখলাম যেগুলো প্রথমে মনে এল।

১) সুভাষ ঘরে ফেরে নাই – শ্যামল বসু, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন (১৯৫৯)

Subhash ghore fere nai

‘সুভাষ ঘরে ফেরে নাই’ প্রচলিত অর্থে  নন-ফিকশন নয় কিন্তু এ বইয়ের মূল চরিত্র কোনো কাল্পনিক স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, এবং সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে যে আলোচনাটুকু করা হয়েছে সেগুলোও কাল্পনিক নয়। ‘সুভাষ ঘরে ফেরে নাই’ বোধহয় আমার পড়া প্রথম বই যেখানে সুভাষ ফ্যাসিবাদী ছিলেন কি ছিলেন না সে নিয়ে কিছু কথা আছে – উত্তম পুরুষে লেখক  সুভাষকে ফ্যাসিবাদী বলার তীব্র বিরোধিতা করেছেন অবশ্য। চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকে মূলধারার পত্রপত্রিকা বা বইয়ে গান্ধীর সমালোচনা দেখতে পাওয়াও ছিল বেশ দুষ্কর ব্যাপার, শ্যামল বসু কিন্তু সেখানেও স্বতন্ত্র। যদিও এ বইয়ের শেষ হচ্ছে সুভাষ অন্তর্ধান রহস্য সমাধানের আকুলতা নিয়ে, লেখক কিন্তু মুখ্যত দেখাতে চেয়েছেন ব্যক্তিগত স্বার্থের দরুণ  সুভাষকে কি ভাবে জাতীয় রাজনীতিতে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করে ফেলা হয়।

২) সাধক বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ – পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (প্রকাশ ভবন, ১৯৬০)

BAGHA JATIN

বাঘা যতীনকে নিয়ে আজ অবধি যত বই পড়েছি তার সবকটিতেই প্রাধান্য পেয়েছে যতীন্দ্রনাথের লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ। পৃথ্বীন্দ্রনাথের বইটি সেদিন থেকে ব্যতিক্রমী নয়, কিন্তু আমার বইটি পছন্দ অসংখ্য টুকরো গল্পের জন্য। অন্য বইগুলির মতন ছাঁচে ফেলা একঘেয়ে জীবনী নয়, এবং বুড়ীবালমের তীরের বীরগাথা রচনাও বইটির একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। উপরি প্রাপ্তি যতীন্দ্রনাথের শেষ লড়াইয়ের সঙ্গী চিত্তপ্রিয়, নীরেন, মনোরঞ্জনদের সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং অ্যানেকডোটস। বইটি পড়েই জানতে পারি যে নীরেন, চিত্তপ্রিয়রা শুধু আদর্শগত দীক্ষাই যতীনদার থেকে পাননি, যতীন্দ্রনাথ নিজের হাতে এঁদেরকে আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে শিখেছিলেন, তালিম দিয়েছিলেন কুস্তিতে। পৃথ্বীন্দ্রনাথের বইটি পড়তে গিয়ে বারবার যতীন্দ্রনাথের মধ্যে বিবেকানন্দর একটা ছাপ খুঁজে পেয়েছি, কথার ভঙ্গীই হোক কি আদর্শগত ধ্যানধারণা বা কষ্টসহিষ্ণুতা, সবেতেই বড়  মিল।

আর হ্যাঁ, এই প্রথম কোনো বইয়ে পড়েছিলাম যে বাঘের সঙ্গে সম্মুখসমরে যতীন্দ্রনাথ ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছিলেন, প্রাণসংশয়-ও ঘটেছিল রীতিমতন, ডান পা শরীর থেকে প্রায় আলাদা হয়ে যাওয়ার জোগাড়। অকুস্থলে নাকি বন্দুক হাতে উপস্থিত ছিলেন আরো লোকজন, কিন্তু যতীন্দ্রনাথকে পাছে গুলি করে বসেন সেই ভয়ে বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেননি তাঁরা।

৩) মূল নথি থেকে ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকী – চিন্ময় চৌধুরী (দে’জ, ১৯৫৯)

KHUDIRAM O PRAFULLACHAKI

১৯০৮ সাল থেকে ক্ষুদিরামকে নিয়ে কম চর্চা হয়নি (সে তুলনায় প্রফুল্ল চাকীকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক কম), ফলত এ বই থেকে মূল হত্যাকান্ড বা ক্ষুদিরামের জীবন সম্পর্কে আলাদা করে হয়ত কিছু পাওয়ার নেই কিন্তু মজঃফরপুর মামলার গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন কিছু তথ্য উঠে আসে। ক্ষুদিরামের উকিল থাকা সত্ত্বেও ক্ষুদিরাম নিজে সরকারপক্ষের সাক্ষীদের জেরা করেছিলেন এবং লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী ক্ষুদিরাম নিজেই ঠিক জানতেন না যে কি করছিলেন। উকিল থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত নিজেই কেন জেরা করবেন এটা আমার কাছে এখনো পরিষ্কার নয় কিন্তু ক্ষুদিরামের অসংলগ্ন জেরা যে পুরো মামলার মধ্যে একটি অন্যতম দুর্বল জায়গা সে নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। উকিল রবিদাস বাবুও বহু সময়েই আশ্চর্যজনক ভাবে চুপ করে থেকেছেন, মজঃফরপুরের কোর্টে ক্ষুদিরামের পক্ষে প্রায় কিছু বলা হয়নি বললেই চলে। হাইকোর্টে আপীল হওয়ার পর নতুন উকিল নরেন্দ্রকুমার বোস লড়েছিলেন কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে।

মামলার নথি থেকে আরো দেখা যাচ্ছে যে প্রফুল্ল চাকীকে প্রায় সবসময়ই শনাক্ত করা হয়েছে দীনেশ রায় নামে, মজঃফরপুরে থাকাকালীন ওই নামেই প্রফুল্ল নিজের পরিচয় দিতেন। সেই কুখ্যাত ইন্সপেক্টর নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সরকার পক্ষের উনিশতম সাক্ষী, তার আগে পরে সাক্ষী ছিলেন পুলিশের অগুন্তি কর্মচারী; তাঁরা সবাই মিলে একই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, কোনো দু’জনের সাক্ষ্য আলাদা ছিল না। নন্দলাল বাঙ্গালীর চোখে সারাজীবন ভিলেন হয়েই ছিলেন এবং থাকবেন-ও কিন্তু মামলার নথির হিসাবে এটুকু বলাই যায় যে নন্দলালের মতনই সরকারী অনুগত্য দেখিয়েছিলেন অন্য অসংখ্য ভারতীয়রাও, পুলিশি ডিউটির তাগিদেই হয়ত।

৪) অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম – অনন্ত সিংহ (বিদ্যোদয় লাইব্রেরী, ১৯৬৮)

ananta singh-1

নিজে স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন বলেই সম্ভবত অনন্ত সিংহ নির্মোহ  এক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বইটি লিখেছেন। চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুন্ঠন বা জালালাবাদের যুদ্ধ নয়, এ বইয়ে উঠে এসেছে বিশের দশকের চট্টগ্রামের যুবশক্তির কথা,  চীন, রুশ বা তুরস্কের যুব-আন্দোলন দেখে চট্টগ্রামের তরুণরা কিভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তার কথা। এসেছে গোষ্ঠী সংঘর্ষের কথা, হিন্দু বিপ্লবী সংগঠনগুলির অনেক কটিই ধর্মকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা ভাবতে পারেননি, অনন্ত এবং তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে সেই সব সংগঠনের বিবাদের কথাও উঠে এসেছে এ বইয়ে। বিপ্লবীদের দোষত্রুটির কথাও নিঃসঙ্কোচে লিখেছেন অনন্ত, যেমন কিনা “দৈবশক্তির প্রতি আস্থা তখনকার দিনে বিপ্লবী দলগুলিকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করত। বিপ্লবী দাদারা একটা রহস্যের আবরণে নিজেদের ঢেকে রাখতেন; তার ফলেই অনুগামীরা দৈবশক্তি, অদৃশ্য হস্তের ইঙ্গিত প্রভৃতি থাকায় বিশ্বাস করতেন”।

৫) বারীন্দ্রের আত্মকাহিনী (ধরপাকড়ের যুগ) – বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (ডি-এম-লাইব্রেরী, ১৯২৩)

Barindra

অনুশীলন সমিতির অন্যতম সদস্য, যুগান্তর গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা, অরবিন্দের ভাই বারীন্দ্রকে নতুন করে চেনানোর অপেক্ষা রাখে না।  বারীন্দ্রর আত্মজীবনী কিন্তু শুধু তাঁর বৈপ্লবিক কাজকর্মের দলিল নয়, তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতির চেহারাটাও খুব সাবলীল ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বারীন্দ্র এই বইয়ে। কি ভাবে অরবিন্দের ভাবশিষ্যরা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আধিপত্য সহ্য করতে না পেরে তাঁকে প্রাদেশিক কনফারেন্সে অপদস্থ করেন বা সুরেন্দ্রনাথের অনুগামীরা অরবিন্দকে তিলকের বিষ্ঠাগ্রহণের অনুরোধ জানান সে সব কথাই উঠে এসেছে এ বইতে, পড়তে পড়তে মনে হয় বাংলায় আজকের রাজনীতি আর একশো বছর আগের রাজনীতির মধ্যে খুব কিছু পার্থক্য হয়ত ছিল না।

বারীনের বই এও জানায় যে স্রেফ দলের সদস্যদের অদূরদর্শিতার কারণেই বারীনদের পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হয়, ধরা পড়ার আগে বহুবার তাঁরা বুঝতেও পেরেছিলেন যে পুলিশ শীঘ্রই হানা দিতে চলেছে, কিন্তু তারপরেও অনন্ত সিংহের বলা সেই ‘অদৃশ্য শক্তি’র ওপর ভরসা করেই যেন বসেছিলেন যুগান্তরের সদস্যরা।

সত্যেন এবং কানাই কি ভাবে নরেন আলিপুর জেলের মধ্যে নরেন গোঁসাইকে খুন করছিলেন তারও পুঙ্খনাপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন বারীন্দ্রনাথ। কানাইকে পরে যখন বারীন জিজ্ঞাসা করেন, “নিজের জন্য একটা বুলেট রেখে দিতে পারলে না?”, তখন কানাই জানান এতবার তাঁদের শিকাররা পালিয়েছে যে এবারে আরে কোনো রিস্কই কানাই নিতে চাননি। যুগান্তরের তরুণ বিপ্লবীদের হতাশা বারীনের নিজের কথাতেই ধরা পড়ে।

৬) ভগিনী নিবেদিতা এবং বাংলায় বিপ্লববাদ – গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী (জিজ্ঞাসা, ১৯৬০)

220px-Sœur_Nivedita

আইরিশ মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল জন্মেইছিলেন বিপ্লবী পরিবারে, তাঁর বাবা এবং দাদু দুজনেই আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশিষ্ট ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুতরাং, বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনে নিবেদিতার ভূমিকা নেহাত আকস্মিক ছিল না। গিরিজাশঙ্করের প্রামাণ্য বইটিতে  দেখা যায় নিবেদিতা অরবিন্দকে কতটা প্রভাবিত করেছিলেন, কিন্তু শুধু অরবিন্দ নন কংগ্রেসের অহিংস আন্দোলনের পথিকৃৎদের অনেকেই নিবেদিতার আদর্শকে গ্রহণ করেছিলেন। তলিয়ে দেখলে বিস্ময় জাগতে বাধ্য, একজন সন্ন্যাসিনীর মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন সশস্ত্র বিপ্লবের কান্ডারীরা। গিরিজাশঙ্কর জানাচ্ছেন হেমচন্দ্র দাস প্যারিস থেকে বোমা বানানো শিখে ফেরত আসতে পারেননি, বারীন এবং নিবেদিতার উৎসাহে অগ্নিপুরুষ উল্লাসকর নিজেই বোমা বানানোর চেষ্টা করছেন। প্রাথমিক সাফল্য আসতে সেই নিবেদিতাই আবার ব্যবস্থা করে দিলেন জগদীশ বসুর গবেষণাগারে উল্লাসকরের প্রচেষ্টাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে।

স্মৃতি সততই সুখের নয়, গিরিজাশঙ্করের বই থেকে এটাও জানা যাবে যে গুরুতর অসুস্থ নিবেদিতার চিকিৎসার খরচ জোগাতে বাঙ্গালী চরম ঔদাসীন্য দেখিয়েছে, ভিন রাজ্যের কংগ্রেস সভ্যদের থেকে চাঁদা করে তুলতে হয়েছিল খরচের টাকা।

৭) বিনয়-বাদল-দীনেশ : শৈলেশ দে (বিশ্বাস পাবলিশিং হাউস, ১৯৬১)

Binoy-Badal-Dinesh

শৈলেশ দের লেখা সবথেকে বিখ্যাত বই বোধহয় ‘আমি সুভাষ বলছি’ কিন্তু বিনয়-বাদল-দীনেশ ও বলতে গেলে অবশ্যপাঠ্য। বিনয় বসু ডাকাবুকো ছিলেন সেটা নতুন খবর নয় কিন্তু ছদ্মবেশ ধারণ করে পুলিশকে ঘোল খাওয়াতে বিনয় যে প্রায় রাসবিহারী বসুর মতন পারদর্শিতা দেখাতেন সেটা এ বই না পড়লে জানতে পারতাম না। জানতে পারতাম না  নিরাপত্তার কারণে সুভাষ বোস বিনয়কে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বিদেশে, আর সেই বিদেশযাত্রার টাকা তুলতে এগিয়ে এসেছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং জগদীশ বসুর সহধর্মিণী অবলা বসু। বিনয়কে দরকার ছিল বলেই সবাই মিলে চেয়েছিলেন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে, রাজি হননি শুধু বিনয় নিজে। ঢাকায় পুলিশের বড়কর্তা লোম্যান আর হডসনকে মারতে নিজেকে বলিপ্রদত্ত রাখলেন বিনয়, সঙ্গে কে থাকলেন বলুন তো? সেই বাদল আর দীনেশ! হ্যাঁ, রাইটার্সের অলিন্দযুদ্ধের বহু আগে থেকেই তিনজনে ছিলেন সহকর্মী। বিনয়-বাদল-দীনেশ তিনজনেই ছিলেন বিক্রমপুরের ছেলে, হয়ত সে জন্যও একটা আলাদা বন্ডিং ছিল তাঁদের মধ্যে, যদিও তাকে ঠিক সখ্যতা বললে ভুল হবে কারণ তিনজনের মধ্যে বিনয়ের চিরকালই ছিল নেতার ভূমিকা।

লেখক অবশ্য বেশীর ভাগ পৃষ্ঠাই বরাদ্দ রেখেছেন বিনয় বসুর জন্য, আঠারো বছরের সদ্য তরুণ বাদলের কথা বিশেষ জানা যায় না। দীনেশের কথা মাঝেমাঝেই এসেছে, কিন্তু সবথেকে ভালো ব্যাপার হল জেল থেকে দীনেশ নিজের আত্মীয়দের যে যে চিঠি লিখেছিলেন তার সবই লেখক বইয়ে রেখেছেন। দীনেশের জীবনদর্শনে মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র-ও,  চিঠিগুলো পড়লে বোঝা যায় কেন সেগুলো নাড়িয়ে দিয়েছিল সুভাষের মতন পোড়খাওয়া মানুষকেও – এক অদ্ভুত উজ্জীবনী শক্তি লেখার ছত্রে ছত্রে ঝরে পড়েছে, বিপ্লবী আন্দোলনের সার্বিক সাফল্য নিয়ে আশাবাদী বোধহয় দীনেশের মতন আর কেউ ছিলেন না। শেষের চিঠিগুলোতে দীনেশকে যদি কিছু ভাবিয়ে তুলে থাকে তবে সে হল ধর্মের নামে বজ্জাতি। আজকের দিনে বোধহয় সেসব লেখা আরোই প্রাসঙ্গিক, “একটা তুচ্ছ গরুর জন্য, না হয় একটু ঢাকের বাদ্য শুনিয়া আমরা ভাই-ভাই খুনোখুনি করিয়া মরিতেছি। এতে কি ভগবান আমাদের জন্য  বৈকুন্ঠের দ্বার খুলিয়া রাখিবেন, না খোদা বেহস্তে আমাদিগকে স্থান দিবেন?”

৮) স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী – কমলা দাশগুপ্ত (বসুধারা প্রকাশনী, ১৯৬১)

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বা কল্পনা দত্ত-র নাম বোধহয় আমরা সবাই জানি।  তার একটা বড় কারণ সম্ভবত এই যে দুজনেই প্রথম জীবনে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের শরিক ছিলেন, মাতঙ্গিনী হাজরাও বাংলার ঘরে বেশ পরিচিত নাম কারণ অত প্রবীণ বয়সে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু পরাধীন ভারতেও কালেভদ্রেই ঘটত। কিন্তু এনারাই যে একমাত্র ডেয়ারডেভিল ছিলেন তা তো নয়, কমলা দাশগুপ্ত (ইনি নিজেও বিপ্লবী ছিলেন) দেখিয়েছেন  অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অজস্র মহিলা চরম দুঃসাহসের পরিচয় দিয়ে গেছেন। আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে বীররসে আপ্লুত থাকতে গিয়ে এনাদের কথা সম্পূর্ণ ভাবেই ভুলে গেছি।

যেমন ধরুন কলকাতার বিখ্যাত জৈন পরিবারের মেয়ে ইন্দুমতী গোয়েঙ্কার কথা। ষোল বছর বয়স থেকে নিয়মিত পিকেটিং করতেন, বিলিতী পণ্য যোগাড় করে পোড়াতেন। সে সময়ে অবশ্য এই সব কাজই অন্য বহু কিশোরী বা তরুণীই করতেন, ইন্দুমতী আরো এক ধাপ এগিয়ে বে-আইনী ইস্তাহার ছাপিয়ে দেশজ পুলিশ কর্মীদের আহ্বান জানান স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা নিতে। ফলে ষোলো বছর বয়সেই ইন্দুমতীকে সরকার গ্রেফতার করে, ন মাসের কারাদন্ড হয়। সারা বড়বাজার জুড়ে বনধ ডাকা হয় ইন্দুমতীর গ্রেফতারের প্রতিবাদে, বন্ধ হয়ে যায় বেথুন কলেজ কারণ ইন্দুমতী ছিলেন সেখানকার ছাত্রী। সরকারের বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেওয়ায় শাস্তি হতে পারত আরো গুরুতর, কারণ এ হল প্রকারান্তরে দেশদ্রোহিতা, কম বয়স এবং মেয়ে বলেই হয়ত ছাড় দেওয়া হয় অনেকটা। অবশ্য শাস্তি চরম হলেও বোধহয় ইন্দুমতীর কিছুই এসে যেত না, পরবর্তী জীবনে প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে বারবার ছুটে গেছেন দাঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায়, ষোলো বছরের বেপরোয়া সাহসকে কোনোদিনই চলে যেতে দেননি।

বগুড়া জেলার মেয়ে ছিলেন দৌলতন্নেসা খাতুন, মাত্র আট বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় দৌলতের। ঘোর পর্দানসীন পরিবারের মেয়ে হয়েও স্রেফ নিজের ইচ্ছায় ইনি আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। কমলা জানিয়েছেন শুধু  দৌলতন্নেসার কথা শুনতেই ভিড়ে ভিড়াক্কার হয়ে থাকত সমস্ত জনসভা। সরকার বাহাদুর যথারীতি নির্যাতনে ত্রুটিটুকু রাখেননি, রাজশাহী, প্রেসিডেন্সি এবং বহরমপুর জেলে দিনের পর দিন কেটেছে দৌলতন্নেসার।

কমলা দাশগুপ্ত এনাদের কথা না লিখলে হয়ত সম্পূর্ণভাবেই বিস্মৃতির অতলে চলে যেতেন ইন্দুমতী বা দৌলতন্নেসা রা। কিন্তু শুধু সেখানেই শেষ নয় – যে সব মহিলারা চিরকাল নেপথ্যে থেকে বিপ্লবীদের আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার যুগিয়েছেন সেই সব মা-মাসিমা-দিদিমা দের নামও কমলা দুই বাংলা থেকে জোগাড় করেছেন, এমনকি জেলা ধরে ধরে।

৯) স্বাধীনতা সংগ্রামে মেদিনীপুর – বসন্তকুমার দাশ (জগদ্ধাত্রী প্রেস, ১৯৮০)

কেন মেদিনীপুর? বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা উঠলে মেদিনীপুরের নাম আলাদা ভাবে আসবেই। কলকাতার কথা বোঝা যায়, হয়ত ঢাকার কথাও, কিন্তু অন্য সব জেলাকে ছাড়িয়ে মেদিনীপুর কিভাবে বিপ্লবের পীঠস্থল হয়ে দাঁড়াল এ প্রশ্ন বহুদিন ধরেই ভেবেছি। স্কুলের ইতিহাসে এসব পড়ানো হয় না, সুতরাং নিজের ইচ্ছা না থাকলে এ নিয়ে জানার সুযোগ অত্যন্তই কম। বসন্তকুমার দাশের বইটি শুধু এই কারণের আমার লিস্টে থাকবে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করে লেখক দেখিয়েছেন কৃষক অধ্যুষিত জেলা বলেই বিলেতী পণ্য বর্জনে একটা সামগ্রিক সাড়া পাওয়া গেছিল মেদিনীপুরে। দেশী করকচ লবণ কি গুড় থেকে তৈরী লালচে চিনি সরবরাহে কৃষকদের অর্থনৈতিক তাগিদ একটা বড় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। অধুনা অর্থনীতিবিদরা যাকে বলেন সাপ্লাই ক্রিয়েটেড ডিম্যান্ড, প্রায় সেরকমই কিছু ঘটেছিল এ জেলায়। ঘাটালের মতন জায়গায় তাঁতশিল্পের রমরমার জন্য বিদেশী কাপড় ফেলে দিতেও খুব অসুবিধা হয়নি মেদিনীপুরের মানুষদের।

পরাধীন ভারতেও অন্যান্য জেলার তুলনায় মেদিনীপুরের শিক্ষার প্রসার ছিল বেশী, ফলে স্কুল বা কলেজ থেকে অসংখ্য তরুণ-তরুণী স্বদেশীয়ানায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ফিরতেন, বহু ক্ষেত্রে তরুণ শিক্ষকরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

বসন্তকুমার এটাও দেখিয়েছেন মেদিনীপুরের বিদ্রোহী আন্দোলনের একটা ঐতিহাসিক ট্র্যাডিশন রয়েছে। চোয়াড় বিদ্রোহ থেকে নায়েক বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে নীল বিদ্রোহ – জুলুমের প্রতিবাদ করতে মেদিনীপুরের মানুষরা ঐতিহাসিক ভাবেই যেন এক পা এগিয়ে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সেই ইতিহাসই ওনাদের উজ্জীবিত করেছে।

১০) বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি – যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় (অ্যাকাডেমিক পাবলিশার্স, ১৯৬০)

বিখ্যাত লেখক ধনগোপাল মুখোপাধ্যায়ের দাদা বিপ্লবী যাদুগোপালের বাড়ি ছিল মেদিনীপুরের তমলুকে। ন নম্বর বইয়ের সূত্র ধরেই মনে পড়ল যাদুগোপালের আত্মজীবনীর কথা। মেদিনীপুরে থাকতে থাকতে কিশোর বয়সেই যাদুগোপালের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়, বাবা এবং মেজদা মাখনগোপালের থেকে সোশ্যালিজমের একটা ধারণা তৈরি হয়। মেজদা বলতেন “স্বাধীনতা মানে ইংরেজ তাড়িয়ে সাধারণ লোক, চাষী-মজুরদের হাতে আধিপত্য আনা”। পাড়ার গুরুজনদের কাছ থেকেও অনুপ্রেরণা পেতেন নেপালের স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প শুনে। যাদুগোপালের লেখা পড়লে বোঝা যায় মেদিনীপুরের শিক্ষিত সমাজ বাড়ির ছেলেদের মধ্যে একটা আদর্শ বা ন্যায়ের ধারণা বেশ গোড়াতেই ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। সারা ভারত জুড়ে কি ধরণের আন্দোলন গড়ে উঠছে সে নিয়েও মুখোপাধ্যায় বাড়ির ছেলেদের বিশদ জ্ঞান ছিল, বরিশালে অশ্বিনীকুমার দত্ত কি করছেন বা পুনের ফারগুসন কলেজে তিলক সবই ঠোঁটস্থ থাকত যাদুগোপালদের।

পরে কলকাতার ডাফ স্কুলে পড়তে গিয়ে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে যাদুগোপালের। যতীন্দ্রনাথের (বাঘা যতীন)  সংস্পর্শে এসে যাদুগোপালের জীবনদর্শন পালটে যায়, সশস্ত্র বিপ্লবে যাদুগোপালের দীক্ষা যতীন্দ্রনাথের হাত ধরেই। এতটাই অনুপ্রাণিত ছিলেন যাদুগোপাল যে আত্মজীবনীতে যতীন্দ্রনাথকে শিবাজীর সঙ্গে তুলনা করেছেন, বলেছেন যতীন্দ্রনাথের অকালপ্রয়াণে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম একটা জোর ধাক্কা খেতে পারত কিন্তু বাঘা যতীনের আত্মত্যাগে যারা এতদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন তাঁরাও বসে থাকতে পারলেন না – বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবে সেটা একটা টার্নিং পয়েন্ট।

যাদুগোপালের বইটি আরো একটা কারণে উল্লেখযোগ্য, বিশ্ব ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিশ্লেষণ করেছেন। দেখিয়েছেন বাংলা তো বটেই ভারতের অন্য রাজ্যের বিপ্লবীদের মধ্যেও অধিকাংশই সোশ্যালিজমে বিশ্বাস করতেন, চীনের স্বাধীনতা সংগ্রাম তাই বহুজনকেই উদ্বুদ্ধ করেছিল, খানিকটা ওই সূত্রেই একাধিক তাত্ত্বিক বিপ্লবী ঝুঁকে পড়েছিলেন রাশিয়ার কমিউনিজমের দিকে। যে তরুণ বিপ্লবীরা প্রলেতারিয়েতদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন তাঁরা স্বভাবতই স্বাধীনোত্তর ভারতের চেহারা দেখে অসম্ভব হতাশ হয়েছিলেন। ষাট-সত্তরের অস্থিরতার গোড়ার কথাটা যাদুগোপালের বইয়ে যেন স্পষ্ট বোঝা যায়।

Advertisements