পরিচয়পর্ব – ৪

(পরিচয়ের আড্ডার আগের পর্বগুলি এখানে)

“ধুকু, তুই!”

সত্যেন ঘরে ঢুকেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। লখনৌ থেকে ধূর্জটিপ্রসাদ এসেছেন সে খবরটা জানতেন না, বাল্যবন্ধুকে মৌজ করে ফরাসের ওপর বসে থাকতে দেখে সত্যিই চমকেছেন।

সুধীন হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন, “তবে, কেমন সারপ্রাইজটা দিলাম বলো? তবে ধূর্জটিদার সাথে বেশী খুনসুটি আজ করা যাবে না, মুড টা একটু অফ আছে”।

“ধুকুর মুড অফ! কি বলে রে সুধীনটা?”  সত্যেন ধূর্জটির পিঠে একটা বিশাল চাপড় মারলেন।

“কিছু করার নেই সত্যেন দা, ধূর্জটি আসছেন শুনেই গুরুদেব কলকাতা ছেড়ে পরশু বেরিয়ে গেছেন। দীনুদা (দীনু  ঠাকুর) কে নাকি বলে গেছেন এই গরমে এমনিতেই শরীরটা একটু কাহিল, তার ওপর অত তত্বকথা শুনলে একদম ছেড়ে দেবে”।

ধূর্জটি এবারে হেসে ফেললেন, “তোদের তাই মনে হয় বুঝি? ওনার সঙ্গে আমার খালি গুরুগম্ভীর কথার কচকচি চলে?”

সত্যেন বললেন, “তবে গুরুদেব যে ধূর্জটিকে ভয় পান সে আমি নিজের চোখে দেখেছি। শেষবার যখন শান্তিনিকেতনে দেখা করতে গেল, তাড়তাড়ি এক গ্লাস সবুজ শরবৎ ধরিয়ে দিয়েছিলেন ওর হাতে। ধুকু বেচারা সেই খেয়ে কিরকম মিইয়ে গেল, একটা কড়া সমালোচনা নিয়ে এসেছিল, সেটা পকেট থেকে বের-ও করল না”।

“ও বাবা! সেই বিখ্যাত সবুজ শরবৎ নাকি সত্যেনদা?” সুশোভন আঁতকে উঠলেন।

“তবে আর বলছি কি। রোজ কচি নিমপাতার রস পেটে না গেলে এত দৌড়োদৌড়ি করতে পারতেন তোমাদের গুরুদেব? কিন্তু ধুকুকে তো আর ইউনিভার্সিটির তখত থেকে নড়ে বসতে হয় না, বেচারা ও শরবৎ মোটেই নিতে পারল না। ”

ধূর্জটি সত্যেনের দিকে তাকিয়ে বললেন “একটা বছর চ না, একটু লখনৌতে কাটিয়ে যা। আমাদের স্টুডেন্টগুলোর প্যাথেটিক ফিজিক্স চাইল্ডহডটা একটু মেরামত করে দিবি আর সঙ্গে   সঙ্গে দেখে নিবি ধুকুকে সত্যিই নড়ে বসতে হয় কিনা”।

সত্যেন হা হা করে হেসে উঠলেন, অভীষ্টসিদ্ধি হয়ে গেছে। সত্যেন কেন, সারা বাংলার শিক্ষামহল জানে ধূর্জটি প্রায় একার হাতে দাঁড় করিয়েছেন লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়কে। ধূর্জটির নিজের অবশ্য ধারণা ওঁর প্রাণান্তকর পরিশ্রমের খবর বাংলার কেউ রাখে না, সত্যেন ইচ্ছে করেই অভিমানের জায়গাটিতে চিমটি কেটেছেন।

“ক রকমের কাবাব খাওয়াবি বল আগে?”

ধূর্জটি হাসি হাসি মুখে তাকালেন, “তুন্ডে, কাকোরী, পসন্দা, বোটি……কিন্তু শুধু কাবাব কেন? তোকে রোগনি রুটি খাওয়াবো, ময়দা আর দুধ দিয়ে বানানো সেই রুটি এতই মোলায়ম আর এত সময় নিয়ে বানাতে হয় যে একটা দাগ কোথাও খুঁজে পাবি না। সেই রোগনি রুটির সঙ্গে পাতে দেব মিষ্টি ঘি, যার খোঁজ ভূভারতে অন্য কোথাও নেই।”

শ্যামলকান্তি তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, “আর পোলাও?”

“পোলাও তো হবেই। ওয়াজিদ আলি শাহের দস্তরখানে সত্তর রকমের পোলাও থাকত, আমার বাবুর্চিটি সত্তর রকম না পারলেও দশ রকম তো পারবেই”।

সুধীন কোনোকালেই রসনাবিলাসী ছিলেন না, শ্যামলকান্তির পোলাও নিয়ে উৎকণ্ঠা তাঁর চোখে একটু বেখাপ্পাই লাগল। বললেন, “আমি একটা কথা ভেবে পাই না, ওয়াজিদ আলি শাহর মতন এরকম সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ কি করে এত খাই খাই করতেন? আপনার মনে হয় ধূর্জটিদা গ্লাটনি আর এলিগ্যান্স কখনো এক সারিতে বসতে পারে?”

ধূর্জটি মৃদু হেসে বললেন, “ওয়াজিদ আলি শাহ কতটা খেতেন সে নিয়ে জানি না, কিন্তু খাদ্যসম্বন্ধীয় সব কিছুই তাঁর কাছে শিল্পকলা বিশেষ। কোন পাত্রে রান্না হবে, কি রান্না হবে, রান্না হওয়ার পর কি ভাবে সাজানো হবে এসবই তাঁর কাছে শিল্পের অঙ্গ। শুধু কি তাই, দিন-কাল-সময়ের ওপর নির্ভর করে ঠিক করতে হবে টেবলের ওপরের গুলদস্তায় ঠিক কি কি ফুল থাকবে।”
“একটু বিশদে বলুন না ধূর্জটি দা”, সুশোভন-ও বেশ উৎসুক।

“নবাবী খানা নিয়ে বলতে গেলে কিন্তু প্রথমেই খোঁজ পড়বে দস্তরখানের, অর্থাৎ খাবার টেবলটিকে কি কি আইটেম দিয়ে সাজানো হয়েছে? কোয়ান্টিটি অর্থাৎ ক’পদ দিয়ে সাজানো হল সেটা তো গুরুত্বপূর্ণ বটেই কিন্তু তার থেকেও বেশী দরকারী জিনিস হল সেই সব পদের বাহ্যিক রূপটি। যেমন ধরো, আনারদানা পোলাও তৈরীই হয়েছিল দস্তরখানের কথা ভেবে।”

আনারদানা পোলাও নিয়ে পরিচয়ের সভ্যরা বিশেষ ওয়াকিবহাল নন বুঝতে পেরে ধূর্জটি ব্যাখ্যা করলেন, “ও পোলাও এর প্রতিটি চাল হবে অর্ধেক লাল আর অর্ধেক সাদা, রুবির মতন জ্বলবে আর কাঁচের মতন ঝকমক করবে”।

সুধীন ফুট কাটলেন, “শেষে কাঁচ? আমি তো ভাবলাম নিদেনপক্ষে হীরেটিরে বলবেন”।

ধূর্জটি রাগ না করে বললেন, “ওহে সুধীন্দ্রনাথ, লখনৌর গানকে তুমি অত্যুত্তম শিল্প বলে কনসিডার করবে তো?”

সুধীন প্রসঙ্গটা কোন দিকে যাচ্ছে সেটা ঠিক বুঝলেন না তবে ইতিবাচক ঘাড় নাড়লেন।

“তবে শোনো দিকিন, লখনৌর গানা আর লখনৌর খানা কিরকম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে – একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটাকে ঠাহর করা মুশকিল। ধরো লখনৌর কোনো শিয়া দরবারে ডাক পড়ল কোনো সোযখোয়ানীর, মন্দ্রস্বরের ওই  আলাপ কি তোমার ডাল ভাত খেয়ে খুলবে? নবাবকেই রীতিমতন ভাবতে হবে কি খাবার খাওয়ানো যায়। তো  তখন হয়ত বাবুর্চির ডাক পড়ল জবরদস্ত ইয়াখনি পোলাও বানানোর জন্য, সের সের গোস্তের মধ্যে মিষ্টি যরদা চাল দিয়ে এমন পোলাও বানানো হল যে জিভে পড়া মাত্র গলে গেল, খেয়ে উঠে শিল্পী হাঁসফাঁস-ও করছেন না অথচ ওই গুরুগম্ভীর স্বর বের করে আনার জন্য রসদ পেটে ঢুকে গেছে”।

“আবার ধরো কায়সরবাগের রাসে স্বয়ং ওয়াজিদ আলি শাহ কৃষ্ণ সেজেছেন। সে পারফরম্যান্সের রেশ থেকে গেছে মনের মধ্যে, খাবার টেবলে মোটেই গাদা গাদা মাংস দেখতে ইচ্ছে করছে না। ওদিকে নবাবের বাবুর্চি এটাও বিলক্ষণ জানেন যে নিরামিষ আহারের কথা নবাব ভাবতেই পারেন না। কিংকর্তব্য? বাবুর্চি করল কি, এমন মোরব্বা বানাল যে দস্তরখানের ওপর সে মোরব্বা চোখে পড়া মাত্র সবার প্রাণ আকুলিবিকুলি করতে লাগল কিন্তু কামড় দেওয়া মাত্র তাজ্জব ব্যাপার, বেরিয়ে এল তরল আর শক্তের মাঝামাঝি একটা অবস্থায় থাকা মাংসের কোর্মা”।

শ্যামলকান্তি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, সুধীন একটু বিরক্ত হয়ে তাকালন তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “সত্যেন দা, এসরাজ বাজানোর সময় আপনার খিদে পায়?”

সত্যেন প্লেটে রাখা ফুলুরি তুলতে তুলতে বললেন, “পায় বই কি, বেজায় পায়। কিন্তু তার একটা বড় কারণ হল ইদানীং আমি এসরাজ  বাজানোর সময় পাচ্ছি প্রায় মাঝরাতে গিয়ে, তার আগে সারা বিকালসন্ধ্যা জুড়ে এত আঁক কষতে হচ্ছে যে মাঝে মাঝে খেতেই ভুলে যাচ্ছি”।

সুধীন হাত তুলে বললেন, “আহা, সে কথা হচ্ছে না। ধরুন আপনি এসরাজে মন দিয়ে রাগ দরবারী তুুলছেন, তা তুলতে তুলতে যদি খাওয়ার কথা ভাবেন দরবারীটা আদৌ আসবে?”

এবার ধূর্জটি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “ওরে বাবা, সত্যেন পরিচয়ের আড্ডার নবাব হতে পারে কিন্তু লখনৌর হিসাবে নেহাতই কমনার। রাজাগজার মর্জি কি ওকে ধরে বোঝা যাবে? তাছাড়া বিভিন্ন মানুষের সোর্স  অফ ইন্সপিরেশন বিভিন্নরকম। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের তড়িচ্চুম্বক দেখে সত্যেন হয়ত এস্রাজে ভূপালী বাজিয়ে ফেলল কিন্তু ওয়াজিদ আলি শাহ যখন নতুন রাগ ‘শাহপসন্দ’ তৈরী করছেন তখন ওর কানে তড়িৎ বা চুম্বকের মতন কটকটে শব্দ ঢুকিয়ে দেখো দিকিন কি হয়?”

সত্যেন হেসে ফেললেন, “তাহলে নবাব বাহাদুরের কানে কি শব্দ ঢোকাতে হবে?”

“এই ধরো ‘দুধ কি পুঁরিয়া’ মানে যে পুরীতে আটার নামগন্ধ নেই, দুধ থেকে পনীর তৈরী করে ময়দার মতন ঠেসে বানানো হয়েছে সে পুরী। বা, ফিসফিস করে ‘মিঠাই কে আনার’-ও বলে দেখতে পারো, যে ডালিমের বীজগুলো হত বাদাম কি পেস্তার আর ওপরের খোসা, ভেতরের বীজপর্দা সব বানানো হত ক্ষীর দিয়ে”।

অপূর্ব চন্দ লেটে ঢুকেছিলেন আজকে, শেষের কথাগুলো শুনতে শুনতে বললেন, “ওসব বাঙ্গালী বাড়িতে বানানো সম্ভব নয় ধূর্জটি  দা”।

শ্যামলকান্তি বোধহয় কথাটা মনঃপূত হল না, “বাঙ্গালী হালুইকরদের বেশী অবজ্ঞা করবেন না দাদা, খোদ লেডি ক্যানিংকে অবধি হাত চাটিয়েছেন”।

“দূর দূর, ও সব গল্প কথা। এই তো ইতিহাসবিদ সুশোভন আছে, ধূর্জটি দা-ও রয়েছেন, কেউ বলতে পারবেন লেডি ক্যানিং লেডিকেনি আদৌ খেয়েছিলেন কিনা? সে কথা যাক গে, কিন্তু আমার বক্তব্য হল বাঙ্গালী যত সুস্বাদুই রাঁধুক গিয়ে, ইভেনচুয়ালি সব ঘ্যাঁট। মাংস প্রাণপনে সেদ্ধ করতে হবে, মাছ কড়া করে ভাজতে হবে, সব্জী গলিয়ে ফেলে তবে শান্তি – লখনৌর শিল্প বাঙ্গালী হেঁসেলের ত্রিসীমানায় ঢুকতে পারবে না”।

ধূর্জটি ঘাড় নাড়লেন, “অপূর্ব কথাটা মন্দ বলেনি। তবে সে হিসাবে শুধু বাংলা নয়, ভূভারতের কটা জায়গাতেই বা ওরকম রাঁধা যাবে সে নিয়ে সন্দেহ আছে।  ‘মোতি পোলাও’ এর মোতি বানানো হত সোনা আর রূপোর ফিনফিনে পাত আচ্ছা করে ফেটিয়ে নিয়ে, এবার মিশ খেয়ে নিটোল  মোতি হওয়ার জন্য সেই ফেটানো ধাতু-তরলকে রাখা হত মুর্গীর গলার নলীর মধ্যে। নলী সেলাই করে বন্ধ করে দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ সেদ্ধ করার পর চিরে দিলেই টুপটুপ করে ঝরে পড়তো সোনালী-রূপোলী মুক্তো। আবার মুরগী-ও কি যে সে হলে চলবে? এমন মুরগী হতে হবে যে কেশর আর কস্তুরী খেয়ে খেয়ে বড় হয়েছে, যাতে কিনা সে মুরগীর মাংস পাতে পড়লে ওই দুটো গন্ধ স্পষ্ট নাকে এসে লাগে।”

সত্যেন আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বললেন, “বড় হ্যাঙ্গামের কাজ সব! বাবুর্চিরা মাসে মাইনে কত পেত রে?”

“তা ধর, খোদ ওয়াজিদ আলি শাহের হেড বাবুর্চি তখনকার দিনেই পেত বারোশ থেকে পনেরশ টাকা।”

“সেইটা বল বাবু”, সত্যেন হৈহৈ করে উঠলেন, “ঢাকায় আমাকে দেয় হাজার টাকা, সময় সময় তাও পাওয়া যায় না। আজ থেকে সত্তর আশি বছর আগেই অত টাকা পেত, মোতি পুলাও না রেঁধে যাবে কোথায় ব্যাটা?”

ধূর্জটিপ্রসাদ অর্থনীতিবিদ-ও বটে, বন্ধুকে চেপে ধরলেন, “ভুল করছিস। ওরকম রাঁধতে পারে বলেই টাকাটা পেত, টাকাটা পেত বলে রাঁধত না”, চোখটা একটু সরু করে বললেন, “আজ ধর তোকে যদি ওই টাকা দি, তুই পারবি রাঁধতে?”।

সত্যেন মুচকি হাসলেন, “দিয়েই দেখ না, তোর হেঁসেল আর ফিজিক্স ল্যাব একসঙ্গে সামলে নেব। তুই দেখছিস চালের মধ্যে রুবি আর হীরে, আমি দেখছি অসমোসিস, তুই দেখছিস মুর্গীর গলা থেকে টুপটাপ মুক্তো ঝরছে আর আমি দেখছি গলানো সোনা মুরগীর গলার মধ্যে কত কম উষ্ণতাতেই জমে যাচ্ছে, বাইরে সে সোনা জমাতে গেলে নবাবের প্রাসাদেই আগুন লেগে যেত।
সবই তো অণু-পরমাণুর খেলা রে। ওইজন্য বলেছিলাম ফিজিক্সটা পড়, বাকি সব ফাউ”।

ধূর্জটি হতাশ হয়ে সুশোভনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ” কই হে, মেটাফিজিক্সের-ও যে কিছু রোল আছে সেটা সত্যেনকে বলো।”

সুশোভন মাথা নাড়লেন, ” দাঁড়ান, আগের সপ্তাহের মার্ক্সের ডায়ালেকটিক নিয়ে আলোচনাটাই শেষ করতে দিলেন না সত্যেন দা”।

ধূর্জটি অবাক হয়ে মাথা ঘোরালেন, “কেন রে?”

আলুর বড়াটা মুখের মধ্যে পাঠিয়ে চুলে হাত মুছতে মুছতে সত্যেন বললেন, “নিউটনের থার্ড ল কখন ফেল করে সেটা আগে বলুক, ওটা না বুঝলে আর মার্ক্স আউড়ে লাভ কি? সুধীন, এবার একরাউন্ড চা হোক না কি? “।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s