কিছু আগুনে বই

১৫ই অগস্টের দিনে রইল পছন্দের কিছু বইয়ের কথা, যে সব বই অগ্নিযুগের ইতিহাসকে হাত ধরে চিনিয়েছে। কিছু বইয়ের ভাষ্য অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ, কিছু বইয়ে কল্পনার অনুপ্রবেশ ঘটেছে কিন্তু সেসবের পরেও আমার বইয়ের তাকে সবসময় আলাদা একটা জায়গা থাকবে এদের জন্য। লিস্টে আজ সেই সব বইগুলোই থাকল যেগুলো বাংলা নন-ফিকশন এবং বাঙ্গালী বিপ্লবীদের নিয়ে লেখা। অফ কোর্স, সমস্ত পছন্দের বই নিয়ে লিখতে গেলে হয়তো তিন-চারটে ব্লগপোস্ট লাগবে, এখানে সেগুলো নিয়েই লিখলাম যেগুলো প্রথমে মনে এল।

১) সুভাষ ঘরে ফেরে নাই – শ্যামল বসু, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন (১৯৫৯)

Subhash ghore fere nai

‘সুভাষ ঘরে ফেরে নাই’ প্রচলিত অর্থে  নন-ফিকশন নয় কিন্তু এ বইয়ের মূল চরিত্র কোনো কাল্পনিক স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, এবং সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে যে আলোচনাটুকু করা হয়েছে সেগুলোও কাল্পনিক নয়। ‘সুভাষ ঘরে ফেরে নাই’ বোধহয় আমার পড়া প্রথম বই যেখানে সুভাষ ফ্যাসিবাদী ছিলেন কি ছিলেন না সে নিয়ে কিছু কথা আছে – উত্তম পুরুষে লেখক  সুভাষকে ফ্যাসিবাদী বলার তীব্র বিরোধিতা করেছেন অবশ্য। চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকে মূলধারার পত্রপত্রিকা বা বইয়ে গান্ধীর সমালোচনা দেখতে পাওয়াও ছিল বেশ দুষ্কর ব্যাপার, শ্যামল বসু কিন্তু সেখানেও স্বতন্ত্র। যদিও এ বইয়ের শেষ হচ্ছে সুভাষ অন্তর্ধান রহস্য সমাধানের আকুলতা নিয়ে, লেখক কিন্তু মুখ্যত দেখাতে চেয়েছেন ব্যক্তিগত স্বার্থের দরুণ  সুভাষকে কি ভাবে জাতীয় রাজনীতিতে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করে ফেলা হয়।

২) সাধক বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ – পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (প্রকাশ ভবন, ১৯৬০)

BAGHA JATIN

বাঘা যতীনকে নিয়ে আজ অবধি যত বই পড়েছি তার সবকটিতেই প্রাধান্য পেয়েছে যতীন্দ্রনাথের লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ। পৃথ্বীন্দ্রনাথের বইটি সেদিন থেকে ব্যতিক্রমী নয়, কিন্তু আমার বইটি পছন্দ অসংখ্য টুকরো গল্পের জন্য। অন্য বইগুলির মতন ছাঁচে ফেলা একঘেয়ে জীবনী নয়, এবং বুড়ীবালমের তীরের বীরগাথা রচনাও বইটির একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। উপরি প্রাপ্তি যতীন্দ্রনাথের শেষ লড়াইয়ের সঙ্গী চিত্তপ্রিয়, নীরেন, মনোরঞ্জনদের সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং অ্যানেকডোটস। বইটি পড়েই জানতে পারি যে নীরেন, চিত্তপ্রিয়রা শুধু আদর্শগত দীক্ষাই যতীনদার থেকে পাননি, যতীন্দ্রনাথ নিজের হাতে এঁদেরকে আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে শিখেছিলেন, তালিম দিয়েছিলেন কুস্তিতে। পৃথ্বীন্দ্রনাথের বইটি পড়তে গিয়ে বারবার যতীন্দ্রনাথের মধ্যে বিবেকানন্দর একটা ছাপ খুঁজে পেয়েছি, কথার ভঙ্গীই হোক কি আদর্শগত ধ্যানধারণা বা কষ্টসহিষ্ণুতা, সবেতেই বড়  মিল।

আর হ্যাঁ, এই প্রথম কোনো বইয়ে পড়েছিলাম যে বাঘের সঙ্গে সম্মুখসমরে যতীন্দ্রনাথ ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছিলেন, প্রাণসংশয়-ও ঘটেছিল রীতিমতন, ডান পা শরীর থেকে প্রায় আলাদা হয়ে যাওয়ার জোগাড়। অকুস্থলে নাকি বন্দুক হাতে উপস্থিত ছিলেন আরো লোকজন, কিন্তু যতীন্দ্রনাথকে পাছে গুলি করে বসেন সেই ভয়ে বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেননি তাঁরা।

৩) মূল নথি থেকে ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকী – চিন্ময় চৌধুরী (দে’জ, ১৯৫৯)

KHUDIRAM O PRAFULLACHAKI

১৯০৮ সাল থেকে ক্ষুদিরামকে নিয়ে কম চর্চা হয়নি (সে তুলনায় প্রফুল্ল চাকীকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক কম), ফলত এ বই থেকে মূল হত্যাকান্ড বা ক্ষুদিরামের জীবন সম্পর্কে আলাদা করে হয়ত কিছু পাওয়ার নেই কিন্তু মজঃফরপুর মামলার গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন কিছু তথ্য উঠে আসে। ক্ষুদিরামের উকিল থাকা সত্ত্বেও ক্ষুদিরাম নিজে সরকারপক্ষের সাক্ষীদের জেরা করেছিলেন এবং লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী ক্ষুদিরাম নিজেই ঠিক জানতেন না যে কি করছিলেন। উকিল থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত নিজেই কেন জেরা করবেন এটা আমার কাছে এখনো পরিষ্কার নয় কিন্তু ক্ষুদিরামের অসংলগ্ন জেরা যে পুরো মামলার মধ্যে একটি অন্যতম দুর্বল জায়গা সে নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। উকিল রবিদাস বাবুও বহু সময়েই আশ্চর্যজনক ভাবে চুপ করে থেকেছেন, মজঃফরপুরের কোর্টে ক্ষুদিরামের পক্ষে প্রায় কিছু বলা হয়নি বললেই চলে। হাইকোর্টে আপীল হওয়ার পর নতুন উকিল নরেন্দ্রকুমার বোস লড়েছিলেন কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে।

মামলার নথি থেকে আরো দেখা যাচ্ছে যে প্রফুল্ল চাকীকে প্রায় সবসময়ই শনাক্ত করা হয়েছে দীনেশ রায় নামে, মজঃফরপুরে থাকাকালীন ওই নামেই প্রফুল্ল নিজের পরিচয় দিতেন। সেই কুখ্যাত ইন্সপেক্টর নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সরকার পক্ষের উনিশতম সাক্ষী, তার আগে পরে সাক্ষী ছিলেন পুলিশের অগুন্তি কর্মচারী; তাঁরা সবাই মিলে একই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, কোনো দু’জনের সাক্ষ্য আলাদা ছিল না। নন্দলাল বাঙ্গালীর চোখে সারাজীবন ভিলেন হয়েই ছিলেন এবং থাকবেন-ও কিন্তু মামলার নথির হিসাবে এটুকু বলাই যায় যে নন্দলালের মতনই সরকারী অনুগত্য দেখিয়েছিলেন অন্য অসংখ্য ভারতীয়রাও, পুলিশি ডিউটির তাগিদেই হয়ত।

৪) অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম – অনন্ত সিংহ (বিদ্যোদয় লাইব্রেরী, ১৯৬৮)

ananta singh-1

নিজে স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন বলেই সম্ভবত অনন্ত সিংহ নির্মোহ  এক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বইটি লিখেছেন। চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুন্ঠন বা জালালাবাদের যুদ্ধ নয়, এ বইয়ে উঠে এসেছে বিশের দশকের চট্টগ্রামের যুবশক্তির কথা,  চীন, রুশ বা তুরস্কের যুব-আন্দোলন দেখে চট্টগ্রামের তরুণরা কিভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তার কথা। এসেছে গোষ্ঠী সংঘর্ষের কথা, হিন্দু বিপ্লবী সংগঠনগুলির অনেক কটিই ধর্মকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা ভাবতে পারেননি, অনন্ত এবং তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে সেই সব সংগঠনের বিবাদের কথাও উঠে এসেছে এ বইয়ে। বিপ্লবীদের দোষত্রুটির কথাও নিঃসঙ্কোচে লিখেছেন অনন্ত, যেমন কিনা “দৈবশক্তির প্রতি আস্থা তখনকার দিনে বিপ্লবী দলগুলিকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করত। বিপ্লবী দাদারা একটা রহস্যের আবরণে নিজেদের ঢেকে রাখতেন; তার ফলেই অনুগামীরা দৈবশক্তি, অদৃশ্য হস্তের ইঙ্গিত প্রভৃতি থাকায় বিশ্বাস করতেন”।

৫) বারীন্দ্রের আত্মকাহিনী (ধরপাকড়ের যুগ) – বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (ডি-এম-লাইব্রেরী, ১৯২৩)

Barindra

অনুশীলন সমিতির অন্যতম সদস্য, যুগান্তর গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা, অরবিন্দের ভাই বারীন্দ্রকে নতুন করে চেনানোর অপেক্ষা রাখে না।  বারীন্দ্রর আত্মজীবনী কিন্তু শুধু তাঁর বৈপ্লবিক কাজকর্মের দলিল নয়, তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতির চেহারাটাও খুব সাবলীল ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বারীন্দ্র এই বইয়ে। কি ভাবে অরবিন্দের ভাবশিষ্যরা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আধিপত্য সহ্য করতে না পেরে তাঁকে প্রাদেশিক কনফারেন্সে অপদস্থ করেন বা সুরেন্দ্রনাথের অনুগামীরা অরবিন্দকে তিলকের বিষ্ঠাগ্রহণের অনুরোধ জানান সে সব কথাই উঠে এসেছে এ বইতে, পড়তে পড়তে মনে হয় বাংলায় আজকের রাজনীতি আর একশো বছর আগের রাজনীতির মধ্যে খুব কিছু পার্থক্য হয়ত ছিল না।

বারীনের বই এও জানায় যে স্রেফ দলের সদস্যদের অদূরদর্শিতার কারণেই বারীনদের পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হয়, ধরা পড়ার আগে বহুবার তাঁরা বুঝতেও পেরেছিলেন যে পুলিশ শীঘ্রই হানা দিতে চলেছে, কিন্তু তারপরেও অনন্ত সিংহের বলা সেই ‘অদৃশ্য শক্তি’র ওপর ভরসা করেই যেন বসেছিলেন যুগান্তরের সদস্যরা।

সত্যেন এবং কানাই কি ভাবে নরেন আলিপুর জেলের মধ্যে নরেন গোঁসাইকে খুন করছিলেন তারও পুঙ্খনাপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন বারীন্দ্রনাথ। কানাইকে পরে যখন বারীন জিজ্ঞাসা করেন, “নিজের জন্য একটা বুলেট রেখে দিতে পারলে না?”, তখন কানাই জানান এতবার তাঁদের শিকাররা পালিয়েছে যে এবারে আরে কোনো রিস্কই কানাই নিতে চাননি। যুগান্তরের তরুণ বিপ্লবীদের হতাশা বারীনের নিজের কথাতেই ধরা পড়ে।

৬) ভগিনী নিবেদিতা এবং বাংলায় বিপ্লববাদ – গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী (জিজ্ঞাসা, ১৯৬০)

220px-Sœur_Nivedita

আইরিশ মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল জন্মেইছিলেন বিপ্লবী পরিবারে, তাঁর বাবা এবং দাদু দুজনেই আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশিষ্ট ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুতরাং, বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনে নিবেদিতার ভূমিকা নেহাত আকস্মিক ছিল না। গিরিজাশঙ্করের প্রামাণ্য বইটিতে  দেখা যায় নিবেদিতা অরবিন্দকে কতটা প্রভাবিত করেছিলেন, কিন্তু শুধু অরবিন্দ নন কংগ্রেসের অহিংস আন্দোলনের পথিকৃৎদের অনেকেই নিবেদিতার আদর্শকে গ্রহণ করেছিলেন। তলিয়ে দেখলে বিস্ময় জাগতে বাধ্য, একজন সন্ন্যাসিনীর মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন সশস্ত্র বিপ্লবের কান্ডারীরা। গিরিজাশঙ্কর জানাচ্ছেন হেমচন্দ্র দাস প্যারিস থেকে বোমা বানানো শিখে ফেরত আসতে পারেননি, বারীন এবং নিবেদিতার উৎসাহে অগ্নিপুরুষ উল্লাসকর নিজেই বোমা বানানোর চেষ্টা করছেন। প্রাথমিক সাফল্য আসতে সেই নিবেদিতাই আবার ব্যবস্থা করে দিলেন জগদীশ বসুর গবেষণাগারে উল্লাসকরের প্রচেষ্টাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে।

স্মৃতি সততই সুখের নয়, গিরিজাশঙ্করের বই থেকে এটাও জানা যাবে যে গুরুতর অসুস্থ নিবেদিতার চিকিৎসার খরচ জোগাতে বাঙ্গালী চরম ঔদাসীন্য দেখিয়েছে, ভিন রাজ্যের কংগ্রেস সভ্যদের থেকে চাঁদা করে তুলতে হয়েছিল খরচের টাকা।

৭) বিনয়-বাদল-দীনেশ : শৈলেশ দে (বিশ্বাস পাবলিশিং হাউস, ১৯৬১)

Binoy-Badal-Dinesh

শৈলেশ দের লেখা সবথেকে বিখ্যাত বই বোধহয় ‘আমি সুভাষ বলছি’ কিন্তু বিনয়-বাদল-দীনেশ ও বলতে গেলে অবশ্যপাঠ্য। বিনয় বসু ডাকাবুকো ছিলেন সেটা নতুন খবর নয় কিন্তু ছদ্মবেশ ধারণ করে পুলিশকে ঘোল খাওয়াতে বিনয় যে প্রায় রাসবিহারী বসুর মতন পারদর্শিতা দেখাতেন সেটা এ বই না পড়লে জানতে পারতাম না। জানতে পারতাম না  নিরাপত্তার কারণে সুভাষ বোস বিনয়কে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বিদেশে, আর সেই বিদেশযাত্রার টাকা তুলতে এগিয়ে এসেছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং জগদীশ বসুর সহধর্মিণী অবলা বসু। বিনয়কে দরকার ছিল বলেই সবাই মিলে চেয়েছিলেন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে, রাজি হননি শুধু বিনয় নিজে। ঢাকায় পুলিশের বড়কর্তা লোম্যান আর হডসনকে মারতে নিজেকে বলিপ্রদত্ত রাখলেন বিনয়, সঙ্গে কে থাকলেন বলুন তো? সেই বাদল আর দীনেশ! হ্যাঁ, রাইটার্সের অলিন্দযুদ্ধের বহু আগে থেকেই তিনজনে ছিলেন সহকর্মী। বিনয়-বাদল-দীনেশ তিনজনেই ছিলেন বিক্রমপুরের ছেলে, হয়ত সে জন্যও একটা আলাদা বন্ডিং ছিল তাঁদের মধ্যে, যদিও তাকে ঠিক সখ্যতা বললে ভুল হবে কারণ তিনজনের মধ্যে বিনয়ের চিরকালই ছিল নেতার ভূমিকা।

লেখক অবশ্য বেশীর ভাগ পৃষ্ঠাই বরাদ্দ রেখেছেন বিনয় বসুর জন্য, আঠারো বছরের সদ্য তরুণ বাদলের কথা বিশেষ জানা যায় না। দীনেশের কথা মাঝেমাঝেই এসেছে, কিন্তু সবথেকে ভালো ব্যাপার হল জেল থেকে দীনেশ নিজের আত্মীয়দের যে যে চিঠি লিখেছিলেন তার সবই লেখক বইয়ে রেখেছেন। দীনেশের জীবনদর্শনে মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র-ও,  চিঠিগুলো পড়লে বোঝা যায় কেন সেগুলো নাড়িয়ে দিয়েছিল সুভাষের মতন পোড়খাওয়া মানুষকেও – এক অদ্ভুত উজ্জীবনী শক্তি লেখার ছত্রে ছত্রে ঝরে পড়েছে, বিপ্লবী আন্দোলনের সার্বিক সাফল্য নিয়ে আশাবাদী বোধহয় দীনেশের মতন আর কেউ ছিলেন না। শেষের চিঠিগুলোতে দীনেশকে যদি কিছু ভাবিয়ে তুলে থাকে তবে সে হল ধর্মের নামে বজ্জাতি। আজকের দিনে বোধহয় সেসব লেখা আরোই প্রাসঙ্গিক, “একটা তুচ্ছ গরুর জন্য, না হয় একটু ঢাকের বাদ্য শুনিয়া আমরা ভাই-ভাই খুনোখুনি করিয়া মরিতেছি। এতে কি ভগবান আমাদের জন্য  বৈকুন্ঠের দ্বার খুলিয়া রাখিবেন, না খোদা বেহস্তে আমাদিগকে স্থান দিবেন?”

৮) স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী – কমলা দাশগুপ্ত (বসুধারা প্রকাশনী, ১৯৬১)

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বা কল্পনা দত্ত-র নাম বোধহয় আমরা সবাই জানি।  তার একটা বড় কারণ সম্ভবত এই যে দুজনেই প্রথম জীবনে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের শরিক ছিলেন, মাতঙ্গিনী হাজরাও বাংলার ঘরে বেশ পরিচিত নাম কারণ অত প্রবীণ বয়সে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু পরাধীন ভারতেও কালেভদ্রেই ঘটত। কিন্তু এনারাই যে একমাত্র ডেয়ারডেভিল ছিলেন তা তো নয়, কমলা দাশগুপ্ত (ইনি নিজেও বিপ্লবী ছিলেন) দেখিয়েছেন  অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অজস্র মহিলা চরম দুঃসাহসের পরিচয় দিয়ে গেছেন। আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে বীররসে আপ্লুত থাকতে গিয়ে এনাদের কথা সম্পূর্ণ ভাবেই ভুলে গেছি।

যেমন ধরুন কলকাতার বিখ্যাত জৈন পরিবারের মেয়ে ইন্দুমতী গোয়েঙ্কার কথা। ষোল বছর বয়স থেকে নিয়মিত পিকেটিং করতেন, বিলিতী পণ্য যোগাড় করে পোড়াতেন। সে সময়ে অবশ্য এই সব কাজই অন্য বহু কিশোরী বা তরুণীই করতেন, ইন্দুমতী আরো এক ধাপ এগিয়ে বে-আইনী ইস্তাহার ছাপিয়ে দেশজ পুলিশ কর্মীদের আহ্বান জানান স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা নিতে। ফলে ষোলো বছর বয়সেই ইন্দুমতীকে সরকার গ্রেফতার করে, ন মাসের কারাদন্ড হয়। সারা বড়বাজার জুড়ে বনধ ডাকা হয় ইন্দুমতীর গ্রেফতারের প্রতিবাদে, বন্ধ হয়ে যায় বেথুন কলেজ কারণ ইন্দুমতী ছিলেন সেখানকার ছাত্রী। সরকারের বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেওয়ায় শাস্তি হতে পারত আরো গুরুতর, কারণ এ হল প্রকারান্তরে দেশদ্রোহিতা, কম বয়স এবং মেয়ে বলেই হয়ত ছাড় দেওয়া হয় অনেকটা। অবশ্য শাস্তি চরম হলেও বোধহয় ইন্দুমতীর কিছুই এসে যেত না, পরবর্তী জীবনে প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে বারবার ছুটে গেছেন দাঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায়, ষোলো বছরের বেপরোয়া সাহসকে কোনোদিনই চলে যেতে দেননি।

বগুড়া জেলার মেয়ে ছিলেন দৌলতন্নেসা খাতুন, মাত্র আট বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় দৌলতের। ঘোর পর্দানসীন পরিবারের মেয়ে হয়েও স্রেফ নিজের ইচ্ছায় ইনি আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। কমলা জানিয়েছেন শুধু  দৌলতন্নেসার কথা শুনতেই ভিড়ে ভিড়াক্কার হয়ে থাকত সমস্ত জনসভা। সরকার বাহাদুর যথারীতি নির্যাতনে ত্রুটিটুকু রাখেননি, রাজশাহী, প্রেসিডেন্সি এবং বহরমপুর জেলে দিনের পর দিন কেটেছে দৌলতন্নেসার।

কমলা দাশগুপ্ত এনাদের কথা না লিখলে হয়ত সম্পূর্ণভাবেই বিস্মৃতির অতলে চলে যেতেন ইন্দুমতী বা দৌলতন্নেসা রা। কিন্তু শুধু সেখানেই শেষ নয় – যে সব মহিলারা চিরকাল নেপথ্যে থেকে বিপ্লবীদের আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার যুগিয়েছেন সেই সব মা-মাসিমা-দিদিমা দের নামও কমলা দুই বাংলা থেকে জোগাড় করেছেন, এমনকি জেলা ধরে ধরে।

৯) স্বাধীনতা সংগ্রামে মেদিনীপুর – বসন্তকুমার দাশ (জগদ্ধাত্রী প্রেস, ১৯৮০)

কেন মেদিনীপুর? বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা উঠলে মেদিনীপুরের নাম আলাদা ভাবে আসবেই। কলকাতার কথা বোঝা যায়, হয়ত ঢাকার কথাও, কিন্তু অন্য সব জেলাকে ছাড়িয়ে মেদিনীপুর কিভাবে বিপ্লবের পীঠস্থল হয়ে দাঁড়াল এ প্রশ্ন বহুদিন ধরেই ভেবেছি। স্কুলের ইতিহাসে এসব পড়ানো হয় না, সুতরাং নিজের ইচ্ছা না থাকলে এ নিয়ে জানার সুযোগ অত্যন্তই কম। বসন্তকুমার দাশের বইটি শুধু এই কারণের আমার লিস্টে থাকবে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করে লেখক দেখিয়েছেন কৃষক অধ্যুষিত জেলা বলেই বিলেতী পণ্য বর্জনে একটা সামগ্রিক সাড়া পাওয়া গেছিল মেদিনীপুরে। দেশী করকচ লবণ কি গুড় থেকে তৈরী লালচে চিনি সরবরাহে কৃষকদের অর্থনৈতিক তাগিদ একটা বড় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। অধুনা অর্থনীতিবিদরা যাকে বলেন সাপ্লাই ক্রিয়েটেড ডিম্যান্ড, প্রায় সেরকমই কিছু ঘটেছিল এ জেলায়। ঘাটালের মতন জায়গায় তাঁতশিল্পের রমরমার জন্য বিদেশী কাপড় ফেলে দিতেও খুব অসুবিধা হয়নি মেদিনীপুরের মানুষদের।

পরাধীন ভারতেও অন্যান্য জেলার তুলনায় মেদিনীপুরের শিক্ষার প্রসার ছিল বেশী, ফলে স্কুল বা কলেজ থেকে অসংখ্য তরুণ-তরুণী স্বদেশীয়ানায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ফিরতেন, বহু ক্ষেত্রে তরুণ শিক্ষকরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

বসন্তকুমার এটাও দেখিয়েছেন মেদিনীপুরের বিদ্রোহী আন্দোলনের একটা ঐতিহাসিক ট্র্যাডিশন রয়েছে। চোয়াড় বিদ্রোহ থেকে নায়েক বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে নীল বিদ্রোহ – জুলুমের প্রতিবাদ করতে মেদিনীপুরের মানুষরা ঐতিহাসিক ভাবেই যেন এক পা এগিয়ে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সেই ইতিহাসই ওনাদের উজ্জীবিত করেছে।

১০) বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি – যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় (অ্যাকাডেমিক পাবলিশার্স, ১৯৬০)

বিখ্যাত লেখক ধনগোপাল মুখোপাধ্যায়ের দাদা বিপ্লবী যাদুগোপালের বাড়ি ছিল মেদিনীপুরের তমলুকে। ন নম্বর বইয়ের সূত্র ধরেই মনে পড়ল যাদুগোপালের আত্মজীবনীর কথা। মেদিনীপুরে থাকতে থাকতে কিশোর বয়সেই যাদুগোপালের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়, বাবা এবং মেজদা মাখনগোপালের থেকে সোশ্যালিজমের একটা ধারণা তৈরি হয়। মেজদা বলতেন “স্বাধীনতা মানে ইংরেজ তাড়িয়ে সাধারণ লোক, চাষী-মজুরদের হাতে আধিপত্য আনা”। পাড়ার গুরুজনদের কাছ থেকেও অনুপ্রেরণা পেতেন নেপালের স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প শুনে। যাদুগোপালের লেখা পড়লে বোঝা যায় মেদিনীপুরের শিক্ষিত সমাজ বাড়ির ছেলেদের মধ্যে একটা আদর্শ বা ন্যায়ের ধারণা বেশ গোড়াতেই ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। সারা ভারত জুড়ে কি ধরণের আন্দোলন গড়ে উঠছে সে নিয়েও মুখোপাধ্যায় বাড়ির ছেলেদের বিশদ জ্ঞান ছিল, বরিশালে অশ্বিনীকুমার দত্ত কি করছেন বা পুনের ফারগুসন কলেজে তিলক সবই ঠোঁটস্থ থাকত যাদুগোপালদের।

পরে কলকাতার ডাফ স্কুলে পড়তে গিয়ে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে যাদুগোপালের। যতীন্দ্রনাথের (বাঘা যতীন)  সংস্পর্শে এসে যাদুগোপালের জীবনদর্শন পালটে যায়, সশস্ত্র বিপ্লবে যাদুগোপালের দীক্ষা যতীন্দ্রনাথের হাত ধরেই। এতটাই অনুপ্রাণিত ছিলেন যাদুগোপাল যে আত্মজীবনীতে যতীন্দ্রনাথকে শিবাজীর সঙ্গে তুলনা করেছেন, বলেছেন যতীন্দ্রনাথের অকালপ্রয়াণে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম একটা জোর ধাক্কা খেতে পারত কিন্তু বাঘা যতীনের আত্মত্যাগে যারা এতদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন তাঁরাও বসে থাকতে পারলেন না – বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবে সেটা একটা টার্নিং পয়েন্ট।

যাদুগোপালের বইটি আরো একটা কারণে উল্লেখযোগ্য, বিশ্ব ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিশ্লেষণ করেছেন। দেখিয়েছেন বাংলা তো বটেই ভারতের অন্য রাজ্যের বিপ্লবীদের মধ্যেও অধিকাংশই সোশ্যালিজমে বিশ্বাস করতেন, চীনের স্বাধীনতা সংগ্রাম তাই বহুজনকেই উদ্বুদ্ধ করেছিল, খানিকটা ওই সূত্রেই একাধিক তাত্ত্বিক বিপ্লবী ঝুঁকে পড়েছিলেন রাশিয়ার কমিউনিজমের দিকে। যে তরুণ বিপ্লবীরা প্রলেতারিয়েতদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন তাঁরা স্বভাবতই স্বাধীনোত্তর ভারতের চেহারা দেখে অসম্ভব হতাশ হয়েছিলেন। ষাট-সত্তরের অস্থিরতার গোড়ার কথাটা যাদুগোপালের বইয়ে যেন স্পষ্ট বোঝা যায়।

Advertisements

ঊনচল্লিশের এক এবং অন্যান্য – বাংলাদেশ প্রসঙ্গে

(আমরা কেউ ধর্মে বিশ্বাস করি, কেউ হয়ত ধর্মকে পরিত্যাগ করিনি কিন্তু ধর্ম নিয়ে মাথাও ঘামাই না, কেউ কট্টর নাস্তিক আবার কেউ বা ধর্মনিরপেক্ষ – কিন্তু একটা জায়গায় আমাদের গভীর মিল আছে, আমরা সবাই বাকস্বাধীনতায়  প্রবল ভাবে বিশ্বাসী। আর সেই জন্যই রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাস, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়রা যে কথাগুলো বলতে চেয়ে প্রাণ হারালেন সে কথাগুলো যাতে হারিয়ে না যায় তার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাব, ওনাদের সঙ্গে আমাদের মতাদর্শের মিল আছে কি নেই সেটা এই মুহূর্তে অবান্তর প্রশ্ন। কথাগুলো পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়েই সা্রা বিশ্ব জুড়ে একাধিক ব্লগার কীবোর্ড নিয়ে বসেছেন, সেই লেখাগুলো সঙ্কলিত করে দেওয়া হল পাঠকদের জন্য – তালিকাটি দেখা যাবে এই ব্লগপোস্টের শেষে।)

ঊনচল্লিশের এক – “চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল”।

ঊনচল্লিশের দুই – “রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।

বাংলাদেশের সংবিধানের কথা, কথা অমৃতসমান। মানুষই রাষ্ট্র বানিয়েছে, রাষ্ট্র মানুষ নয় কিন্তু শুধু বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সংবিধান পড়লেই একটা মেকী নিরাপত্তার ছলনায় বিহ্বল হয়ে পড়তে বেশী সময় লাগে না আমাদের, রাষ্ট্র যেন অতিলৌকিক এক শক্তি – “নিশ্চয়তা দান করা হইল”।

দান করার অঙ্গীকার তো এল কিন্তু কাজটা করবে কারা? রাষ্ট্র? কি এই রাষ্ট্র, কে এই রাষ্ট্র? রাষ্ট্র একটা আদর্শগত ধারণা, মানুষের ব্যক্তিগত বৌদ্ধিক বিকাশের ফসল। আদর্শগত ধারণা বলেই রাষ্ট্রের আদত কাজটা কি সে নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে তীব্র বিতর্ক হয়ে এসেছে, কিন্তু একটা জায়গায় চিন্তাবিদরা একমত হয়েছেন যে সব কিছুর শেষে রাষ্ট্রের আসল কাজটা হল মানুষকে যতটা সম্ভব ভালো রাখা। প্রকৃতি মানুষের কাছে বহু সময়েই প্রবল প্রতিকূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দেখা দেয় – খরা হোক কি বন্যা, ক্যানসার হোক কি দারিদ্র্য, ঘরোয়া জঙ্গী হোক কি বিদেশী হানাদার, প্রতিকূলতা যে ভাবেই আসুক না কেন দেশের নাগরিকদের সেই প্রতিকূলতার মুখে যতরকম ভাবে সাহায্য করা যায় রাষ্ট্র সেটা করবে। এবার এই কাজটা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের হাতে কতটা ক্ষমতা থাকা উচিত, রাষ্ট্রের কার্যপদ্ধতি নিয়ে আদৌ সমালোচনার জায়গা আছে কিনা এসব নিয়ে তাত্ত্বিক কিন্তু জরুরী বিতর্ক সেই আদিকাল থেকেই হচ্ছে। কিন্তু সেই বিতর্কে ঢোকার দরকার নেই, আজকে আপাতত এটুকু জানলেই চলবে নিজের নাগরিকদের ভালো রাখাই যে রাষ্ট্রের প্রধান কাজ সে নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এটুকু বলে নেওয়া দরকার ছিল কারণ যে মুহূর্তে একটি জনগোষ্ঠী জানাচ্ছে তারা একটি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত, ধরে নিতেই হবে যে সেই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পুরোধারা রাষ্ট্র বলতে কি বোঝায় সেই তত্ত্বটি সঠিক ভাবে অনুধাবন করেছেন। আর বাংলাদেশের মতন নবীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের সেটা বোঝার জন্য যে প্রামাণ্য রেফারেন্সের অভাব ঘটেনি সেটা নিশ্চয় অনুমান করে নেওয়া যায়।

কিন্তু তাহলে কেন রাজীব হায়দার, অভিজিত রায়, ওয়াশিকুর রহমানকে আততায়ীদের হাতে প্রাণ দিতে হল? রাষ্ট্র যদি প্রথম বা দ্বিতীয় হত্যাকান্ডটির সময়ে প্রতিকূলতার মাত্রা নিয়ে ওয়াকিবহাল নাও থাকে ওয়াশিকুর হত্যাকান্ডের পর নিশ্চয় নিজেদের ধ্যানধারণা, বিশ্বাসকে আপ-টু-ডেট করে নেওয়া উচিত ছিল। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে সেটা হয় নি কারণ ওয়াশিকুরের পরেও খুন হয়ে গেলেন অনন্তবিজয় দাস, রাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েও বাঁচতে পারলেন না নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়।

সমস্যাটা কোথায় তাহলে? দুটো সম্ভাবনা – রাষ্ট্র নাগরিকদের ভালো চেয়েও রাখতে পারছে না,  তারা শক্তিহীন অথবা নাগরিকদের ভালো রাখা আর রাষ্ট্রের মৌলিক এবং প্রধান দায়িত্ব হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে না।

প্রথম সম্ভাবনাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কারণ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে নীলাদ্রি পুলিশের কাছে যখন এফ-আই-আর করতে গেছেন তখন পুলিশ জানিয়েছে যে তারা এফ-আই-আর নিতে অপারগ এবং নীলাদ্রির পক্ষে বাঁচার একমাত্র উপায় হল দেশে ছেড়ে চলে যাওয়া। দুই বাংলার লাখ লাখ মানুষ এবং বহু বিদেশীও এ কথা শুনে চমকে গেছেন, তসলিমা নাসরিন বা আসিফ মহিউদ্দিনের মতন যারা ভাগ্যজোরে আততায়ীদের হাত থেকে বেঁচে গেছেন তারা বহুবারের পর আরো একবার জানিয়েছেন  অবাক হওয়ার কিছু নেই, এটাই ঘোর বাস্তব। সারা পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বলে যে আর কিছু থাকছে না এটা রাষ্ট্রশক্তি বুঝতে পারছে না সেটাও হয় না, কিন্তু তার পরেও একের পর এক খুন এবং সংশ্লিষ্ট আততায়ীদের শাস্তিপ্রদানে অক্ষমতা রাষ্ট্রের সার্বিক ব্যর্থতাকেই প্রকট করে।

সিয়েরা লিওন কি সোমালিয়া কি বসনিয়ার মতন ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলির পতনের শুরু কিন্তু এই পথেই, যেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা প্রদানে রাষ্ট্রের সার্বিক ব্যর্থতা বাকি পৃথিবীকে জানিয়েছে এই দেশগুলির সার্বভৌমত্ব নষ্ট হওয়ার পথে। কিন্তু বাংলাদেশকে এই দেশগুলির সঙ্গে এক সারিতে বসানো যাবে না; তার একটা বড় কারণ হল ক্ষমতাসীন সরকার ব্লগারদের আততায়ীদের শাস্তি দিলে  সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর যে ঝুঁকি  থাকে তার থেকে অনেক বেশী ঝুঁকি নিয়েই সাম্প্রতিক কালে ফাঁসিকাঠে চড়িয়েছেন একাধিক মৌলবাদীদের, যাদের প্রধান পরিচয় হল ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী’। দেশব্যাপী দাঙ্গা হাঙ্গামাকে তোয়াক্কা না করে যে রাষ্ট্র মৌলবাদীদের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে তাদের তাহলে ব্লগার খুনের রহস্য সমাধানে কিসের এত অনীহা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কিন্তু মনে হয় দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই অনেক জোরদার – নাগরিকদের ভালো রাখা আর রাষ্ট্রের মৌলিক এবং প্রধান দায়িত্ব হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে না। এখানে কিন্তু নাগরিক অর্থে শুধুমাত্র নাস্তিক বা প্রতিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকদেরই বোঝাচ্ছি।

অন্য ভাবে বলা যায় নাস্তিক বা প্রতিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ মানুষগুলি যে দেশের নাগরিক এই কথাটিকেই প্রকারান্তরে অস্বীকার করা হচ্ছে। দেশের ৯৫% মানুষ (এটা কথার কথা, সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়) যে কথাগুলো শুনলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠছেন সেগুলো বললে রাষ্ট্র তোমার নিরাপত্তার ভার নিতে পারবে না, এটাই হল মূল কথা।

হায় ঊনচল্লিশের এক!

কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান খুঁটিয়ে দেখলে হয়ত এতটা বিলাপ করার জায়গা থাকে না।

রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে কি বলছে এই সংবিধান?

বলছে “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম  ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে”। রাষ্ট্রীয় ধর্ম না বলে রাষ্ট্রধর্ম বলাটা বর্তমান পরিস্থিতে বেশ ironic শোনাচ্ছে বটে কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হল কোনো প্রকার ধর্ম পালনেই আমার অনীহা থাকলে রাষ্ট্র আমাকে কি চোখে দেখবে সে নিয়ে একটিও কথা নেই।  কোনো প্রকার ধর্মপালনে  অনীহা বা যে কোনো ধর্মকেই খুঁটিয়ে বিচার করতে চাওয়াটা ইউরোপীয়ন নবজাগরণের অঙ্গ হিসাবে ধরা যায় – ইউরোপীয়ন নবজাগরণ শেষ হচ্ছে সপ্তদশ শতকে আর আর অষ্টদশ শতকের মোটামুটি শুরুর দিকেই আমরা পাচ্ছি জঁ মেলি (Jean Meslier) , জুলিয়েন ওফরে ডেলা মেত্রি (Julien Offray de La Mettrie), এটিয়েন বনু ডে কন্ডিয়াক (Etienne Bonnot de Condillac) এর মতন নাস্তিক্যবাদের আদি প্রবক্তাদের। পৃথিবী জুড়েই নাস্তিকদের যে প্রবল প্রতিরোধের সামনে পড়তে হয়েছে তাতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তে নবজাগরণের আলো ১৯৭২ সালে নাই এসে পৌঁছে থাকতে পারে, কিন্তু নাগরিক স্বার্থেই এখন বোধহয় সময় এসেছে সংবিধান সংশোধন করে যারা ধর্ম পালন করতে চায় না তাদের নিয়েও দুটো কথা বলার।

ইরানের মতন ঘোষনা করে দেওয়া যেতে পারে যে সমস্ত নাগরিককে চারটি বিশেষ ধর্মের একটি বেছে নিতে হবে বা সৌদি আরবের মতন একবাক্যে বলে দেওয়া যেতে পারে যে নাস্তিক্যবাদের পরিণাম মৃত্যু, কিন্তু কিছু একটা বলা হোক যাতে এই তান্ডবলীলা বন্ধ হয়, নাস্তিক বা প্রতিবাদী ধর্মনিরপেক্ষরা যাতে বুঝতে পারেন যে দেশে আদৌ তাঁদের জন্য জায়গা আছে কি নেই।

আবারো বলি, মানুষের জন্য রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের জন্য মানুষ নয়। আর তাই ব্যক্তিগত ভাবেও আমাদের কিছু দায়বদ্ধতা থেকে যায়। সেই প্রসঙ্গেও কয়েকটা কথা বলা দরকার। বহু মানুষ এই নয়া নাস্তিক্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করছেন,  বলছেন এই নাস্তিক্যবাদ আর ধর্মীয় গোঁড়ামি একই কয়েনের এপিঠ-ওপিঠ। হয়ত তাঁরা ঠিক, হয়ত তাঁরা ভুল কিন্তু এই মুহূর্তে ওই জাতীয় বিরোধিতা নেহাতই মৌলবাদীদের হাত শক্ত করছে। রাজীব-অভিজিত-ওয়াশিকুর-অনন্ত-নীলাদ্রি যে কথাগুলো বলতে চেয়েছিলেন  সে কথাগুলো বলার সম্পূর্ণ অধিকার তাঁদের থাকার কথা ছিল, আমরা যারা সে কথাগুলো শুনতে চেয়েছি তাদেরও সেগুলো শুনতে পাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার থাকা উচিত। মতাদর্শের বিরোধ যাই থাকুক না কেন, এই সহজ কথাটা যে কোনো মানুষেরই না বোঝার কথা নয়, যারা বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁদের বোঝানোটা আমাদের দায়িত্ব।

আরো একটা খুন আটকাতেই হবে, রাষ্ট্রশক্তি অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারুক আর না পারুক শেষমেশ দায়টা আমাদেরই।

অন্য ব্লগারদের পোস্টগুলি

অভিষেক মুখার্জ্জী  – আইডিয়াKausik Datta – Plight of secular bloggers in Bangladeshতন্ময় মুখার্জ্জী – ধর্ম, ব্লগ আর একঘেয়ে খুন-টুন, তপোব্রত ব্যানার্জ্জী – আহত কলম, রোহন কুদ্দুস – আমার মহানবী, অমৃতরূপা – Know that you have won, সৌরাংশু –  (১৪০) ফিসফাস

পুরনো লেখা

তন্ময় মুখার্জ্জী – ধর্ম, প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় – অভিজিৎ রায় হত্যা প্রসঙ্গেশিঞ্জিনী সেনগুপ্ত – আজকের খবরে অভিজিৎ মৃত, শিঞ্জিনী সেনগুপ্ত – এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, কৌশিক দত্ত – Never A Reason To Stop Fighting To Make The World Better,
Nope, not going to write again, অনির্বাণ গুহ – অভিজিৎ vs. অভিজিৎ

পরিচয়পর্ব – ৪

(পরিচয়ের আড্ডার আগের পর্বগুলি এখানে)

“ধুকু, তুই!”

সত্যেন ঘরে ঢুকেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। লখনৌ থেকে ধূর্জটিপ্রসাদ এসেছেন সে খবরটা জানতেন না, বাল্যবন্ধুকে মৌজ করে ফরাসের ওপর বসে থাকতে দেখে সত্যিই চমকেছেন।

সুধীন হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন, “তবে, কেমন সারপ্রাইজটা দিলাম বলো? তবে ধূর্জটিদার সাথে বেশী খুনসুটি আজ করা যাবে না, মুড টা একটু অফ আছে”।

“ধুকুর মুড অফ! কি বলে রে সুধীনটা?”  সত্যেন ধূর্জটির পিঠে একটা বিশাল চাপড় মারলেন।

“কিছু করার নেই সত্যেন দা, ধূর্জটি আসছেন শুনেই গুরুদেব কলকাতা ছেড়ে পরশু বেরিয়ে গেছেন। দীনুদা (দীনু  ঠাকুর) কে নাকি বলে গেছেন এই গরমে এমনিতেই শরীরটা একটু কাহিল, তার ওপর অত তত্বকথা শুনলে একদম ছেড়ে দেবে”।

ধূর্জটি এবারে হেসে ফেললেন, “তোদের তাই মনে হয় বুঝি? ওনার সঙ্গে আমার খালি গুরুগম্ভীর কথার কচকচি চলে?”

সত্যেন বললেন, “তবে গুরুদেব যে ধূর্জটিকে ভয় পান সে আমি নিজের চোখে দেখেছি। শেষবার যখন শান্তিনিকেতনে দেখা করতে গেল, তাড়তাড়ি এক গ্লাস সবুজ শরবৎ ধরিয়ে দিয়েছিলেন ওর হাতে। ধুকু বেচারা সেই খেয়ে কিরকম মিইয়ে গেল, একটা কড়া সমালোচনা নিয়ে এসেছিল, সেটা পকেট থেকে বের-ও করল না”।

“ও বাবা! সেই বিখ্যাত সবুজ শরবৎ নাকি সত্যেনদা?” সুশোভন আঁতকে উঠলেন।

“তবে আর বলছি কি। রোজ কচি নিমপাতার রস পেটে না গেলে এত দৌড়োদৌড়ি করতে পারতেন তোমাদের গুরুদেব? কিন্তু ধুকুকে তো আর ইউনিভার্সিটির তখত থেকে নড়ে বসতে হয় না, বেচারা ও শরবৎ মোটেই নিতে পারল না। ”

ধূর্জটি সত্যেনের দিকে তাকিয়ে বললেন “একটা বছর চ না, একটু লখনৌতে কাটিয়ে যা। আমাদের স্টুডেন্টগুলোর প্যাথেটিক ফিজিক্স চাইল্ডহডটা একটু মেরামত করে দিবি আর সঙ্গে   সঙ্গে দেখে নিবি ধুকুকে সত্যিই নড়ে বসতে হয় কিনা”।

সত্যেন হা হা করে হেসে উঠলেন, অভীষ্টসিদ্ধি হয়ে গেছে। সত্যেন কেন, সারা বাংলার শিক্ষামহল জানে ধূর্জটি প্রায় একার হাতে দাঁড় করিয়েছেন লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়কে। ধূর্জটির নিজের অবশ্য ধারণা ওঁর প্রাণান্তকর পরিশ্রমের খবর বাংলার কেউ রাখে না, সত্যেন ইচ্ছে করেই অভিমানের জায়গাটিতে চিমটি কেটেছেন।

“ক রকমের কাবাব খাওয়াবি বল আগে?”

ধূর্জটি হাসি হাসি মুখে তাকালেন, “তুন্ডে, কাকোরী, পসন্দা, বোটি……কিন্তু শুধু কাবাব কেন? তোকে রোগনি রুটি খাওয়াবো, ময়দা আর দুধ দিয়ে বানানো সেই রুটি এতই মোলায়ম আর এত সময় নিয়ে বানাতে হয় যে একটা দাগ কোথাও খুঁজে পাবি না। সেই রোগনি রুটির সঙ্গে পাতে দেব মিষ্টি ঘি, যার খোঁজ ভূভারতে অন্য কোথাও নেই।”

শ্যামলকান্তি তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, “আর পোলাও?”

“পোলাও তো হবেই। ওয়াজিদ আলি শাহের দস্তরখানে সত্তর রকমের পোলাও থাকত, আমার বাবুর্চিটি সত্তর রকম না পারলেও দশ রকম তো পারবেই”।

সুধীন কোনোকালেই রসনাবিলাসী ছিলেন না, শ্যামলকান্তির পোলাও নিয়ে উৎকণ্ঠা তাঁর চোখে একটু বেখাপ্পাই লাগল। বললেন, “আমি একটা কথা ভেবে পাই না, ওয়াজিদ আলি শাহর মতন এরকম সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ কি করে এত খাই খাই করতেন? আপনার মনে হয় ধূর্জটিদা গ্লাটনি আর এলিগ্যান্স কখনো এক সারিতে বসতে পারে?”

ধূর্জটি মৃদু হেসে বললেন, “ওয়াজিদ আলি শাহ কতটা খেতেন সে নিয়ে জানি না, কিন্তু খাদ্যসম্বন্ধীয় সব কিছুই তাঁর কাছে শিল্পকলা বিশেষ। কোন পাত্রে রান্না হবে, কি রান্না হবে, রান্না হওয়ার পর কি ভাবে সাজানো হবে এসবই তাঁর কাছে শিল্পের অঙ্গ। শুধু কি তাই, দিন-কাল-সময়ের ওপর নির্ভর করে ঠিক করতে হবে টেবলের ওপরের গুলদস্তায় ঠিক কি কি ফুল থাকবে।”
“একটু বিশদে বলুন না ধূর্জটি দা”, সুশোভন-ও বেশ উৎসুক।

“নবাবী খানা নিয়ে বলতে গেলে কিন্তু প্রথমেই খোঁজ পড়বে দস্তরখানের, অর্থাৎ খাবার টেবলটিকে কি কি আইটেম দিয়ে সাজানো হয়েছে? কোয়ান্টিটি অর্থাৎ ক’পদ দিয়ে সাজানো হল সেটা তো গুরুত্বপূর্ণ বটেই কিন্তু তার থেকেও বেশী দরকারী জিনিস হল সেই সব পদের বাহ্যিক রূপটি। যেমন ধরো, আনারদানা পোলাও তৈরীই হয়েছিল দস্তরখানের কথা ভেবে।”

আনারদানা পোলাও নিয়ে পরিচয়ের সভ্যরা বিশেষ ওয়াকিবহাল নন বুঝতে পেরে ধূর্জটি ব্যাখ্যা করলেন, “ও পোলাও এর প্রতিটি চাল হবে অর্ধেক লাল আর অর্ধেক সাদা, রুবির মতন জ্বলবে আর কাঁচের মতন ঝকমক করবে”।

সুধীন ফুট কাটলেন, “শেষে কাঁচ? আমি তো ভাবলাম নিদেনপক্ষে হীরেটিরে বলবেন”।

ধূর্জটি রাগ না করে বললেন, “ওহে সুধীন্দ্রনাথ, লখনৌর গানকে তুমি অত্যুত্তম শিল্প বলে কনসিডার করবে তো?”

সুধীন প্রসঙ্গটা কোন দিকে যাচ্ছে সেটা ঠিক বুঝলেন না তবে ইতিবাচক ঘাড় নাড়লেন।

“তবে শোনো দিকিন, লখনৌর গানা আর লখনৌর খানা কিরকম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে – একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটাকে ঠাহর করা মুশকিল। ধরো লখনৌর কোনো শিয়া দরবারে ডাক পড়ল কোনো সোযখোয়ানীর, মন্দ্রস্বরের ওই  আলাপ কি তোমার ডাল ভাত খেয়ে খুলবে? নবাবকেই রীতিমতন ভাবতে হবে কি খাবার খাওয়ানো যায়। তো  তখন হয়ত বাবুর্চির ডাক পড়ল জবরদস্ত ইয়াখনি পোলাও বানানোর জন্য, সের সের গোস্তের মধ্যে মিষ্টি যরদা চাল দিয়ে এমন পোলাও বানানো হল যে জিভে পড়া মাত্র গলে গেল, খেয়ে উঠে শিল্পী হাঁসফাঁস-ও করছেন না অথচ ওই গুরুগম্ভীর স্বর বের করে আনার জন্য রসদ পেটে ঢুকে গেছে”।

“আবার ধরো কায়সরবাগের রাসে স্বয়ং ওয়াজিদ আলি শাহ কৃষ্ণ সেজেছেন। সে পারফরম্যান্সের রেশ থেকে গেছে মনের মধ্যে, খাবার টেবলে মোটেই গাদা গাদা মাংস দেখতে ইচ্ছে করছে না। ওদিকে নবাবের বাবুর্চি এটাও বিলক্ষণ জানেন যে নিরামিষ আহারের কথা নবাব ভাবতেই পারেন না। কিংকর্তব্য? বাবুর্চি করল কি, এমন মোরব্বা বানাল যে দস্তরখানের ওপর সে মোরব্বা চোখে পড়া মাত্র সবার প্রাণ আকুলিবিকুলি করতে লাগল কিন্তু কামড় দেওয়া মাত্র তাজ্জব ব্যাপার, বেরিয়ে এল তরল আর শক্তের মাঝামাঝি একটা অবস্থায় থাকা মাংসের কোর্মা”।

শ্যামলকান্তি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, সুধীন একটু বিরক্ত হয়ে তাকালন তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “সত্যেন দা, এসরাজ বাজানোর সময় আপনার খিদে পায়?”

সত্যেন প্লেটে রাখা ফুলুরি তুলতে তুলতে বললেন, “পায় বই কি, বেজায় পায়। কিন্তু তার একটা বড় কারণ হল ইদানীং আমি এসরাজ  বাজানোর সময় পাচ্ছি প্রায় মাঝরাতে গিয়ে, তার আগে সারা বিকালসন্ধ্যা জুড়ে এত আঁক কষতে হচ্ছে যে মাঝে মাঝে খেতেই ভুলে যাচ্ছি”।

সুধীন হাত তুলে বললেন, “আহা, সে কথা হচ্ছে না। ধরুন আপনি এসরাজে মন দিয়ে রাগ দরবারী তুুলছেন, তা তুলতে তুলতে যদি খাওয়ার কথা ভাবেন দরবারীটা আদৌ আসবে?”

এবার ধূর্জটি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “ওরে বাবা, সত্যেন পরিচয়ের আড্ডার নবাব হতে পারে কিন্তু লখনৌর হিসাবে নেহাতই কমনার। রাজাগজার মর্জি কি ওকে ধরে বোঝা যাবে? তাছাড়া বিভিন্ন মানুষের সোর্স  অফ ইন্সপিরেশন বিভিন্নরকম। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের তড়িচ্চুম্বক দেখে সত্যেন হয়ত এস্রাজে ভূপালী বাজিয়ে ফেলল কিন্তু ওয়াজিদ আলি শাহ যখন নতুন রাগ ‘শাহপসন্দ’ তৈরী করছেন তখন ওর কানে তড়িৎ বা চুম্বকের মতন কটকটে শব্দ ঢুকিয়ে দেখো দিকিন কি হয়?”

সত্যেন হেসে ফেললেন, “তাহলে নবাব বাহাদুরের কানে কি শব্দ ঢোকাতে হবে?”

“এই ধরো ‘দুধ কি পুঁরিয়া’ মানে যে পুরীতে আটার নামগন্ধ নেই, দুধ থেকে পনীর তৈরী করে ময়দার মতন ঠেসে বানানো হয়েছে সে পুরী। বা, ফিসফিস করে ‘মিঠাই কে আনার’-ও বলে দেখতে পারো, যে ডালিমের বীজগুলো হত বাদাম কি পেস্তার আর ওপরের খোসা, ভেতরের বীজপর্দা সব বানানো হত ক্ষীর দিয়ে”।

অপূর্ব চন্দ লেটে ঢুকেছিলেন আজকে, শেষের কথাগুলো শুনতে শুনতে বললেন, “ওসব বাঙ্গালী বাড়িতে বানানো সম্ভব নয় ধূর্জটি  দা”।

শ্যামলকান্তি বোধহয় কথাটা মনঃপূত হল না, “বাঙ্গালী হালুইকরদের বেশী অবজ্ঞা করবেন না দাদা, খোদ লেডি ক্যানিংকে অবধি হাত চাটিয়েছেন”।

“দূর দূর, ও সব গল্প কথা। এই তো ইতিহাসবিদ সুশোভন আছে, ধূর্জটি দা-ও রয়েছেন, কেউ বলতে পারবেন লেডি ক্যানিং লেডিকেনি আদৌ খেয়েছিলেন কিনা? সে কথা যাক গে, কিন্তু আমার বক্তব্য হল বাঙ্গালী যত সুস্বাদুই রাঁধুক গিয়ে, ইভেনচুয়ালি সব ঘ্যাঁট। মাংস প্রাণপনে সেদ্ধ করতে হবে, মাছ কড়া করে ভাজতে হবে, সব্জী গলিয়ে ফেলে তবে শান্তি – লখনৌর শিল্প বাঙ্গালী হেঁসেলের ত্রিসীমানায় ঢুকতে পারবে না”।

ধূর্জটি ঘাড় নাড়লেন, “অপূর্ব কথাটা মন্দ বলেনি। তবে সে হিসাবে শুধু বাংলা নয়, ভূভারতের কটা জায়গাতেই বা ওরকম রাঁধা যাবে সে নিয়ে সন্দেহ আছে।  ‘মোতি পোলাও’ এর মোতি বানানো হত সোনা আর রূপোর ফিনফিনে পাত আচ্ছা করে ফেটিয়ে নিয়ে, এবার মিশ খেয়ে নিটোল  মোতি হওয়ার জন্য সেই ফেটানো ধাতু-তরলকে রাখা হত মুর্গীর গলার নলীর মধ্যে। নলী সেলাই করে বন্ধ করে দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ সেদ্ধ করার পর চিরে দিলেই টুপটুপ করে ঝরে পড়তো সোনালী-রূপোলী মুক্তো। আবার মুরগী-ও কি যে সে হলে চলবে? এমন মুরগী হতে হবে যে কেশর আর কস্তুরী খেয়ে খেয়ে বড় হয়েছে, যাতে কিনা সে মুরগীর মাংস পাতে পড়লে ওই দুটো গন্ধ স্পষ্ট নাকে এসে লাগে।”

সত্যেন আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বললেন, “বড় হ্যাঙ্গামের কাজ সব! বাবুর্চিরা মাসে মাইনে কত পেত রে?”

“তা ধর, খোদ ওয়াজিদ আলি শাহের হেড বাবুর্চি তখনকার দিনেই পেত বারোশ থেকে পনেরশ টাকা।”

“সেইটা বল বাবু”, সত্যেন হৈহৈ করে উঠলেন, “ঢাকায় আমাকে দেয় হাজার টাকা, সময় সময় তাও পাওয়া যায় না। আজ থেকে সত্তর আশি বছর আগেই অত টাকা পেত, মোতি পুলাও না রেঁধে যাবে কোথায় ব্যাটা?”

ধূর্জটিপ্রসাদ অর্থনীতিবিদ-ও বটে, বন্ধুকে চেপে ধরলেন, “ভুল করছিস। ওরকম রাঁধতে পারে বলেই টাকাটা পেত, টাকাটা পেত বলে রাঁধত না”, চোখটা একটু সরু করে বললেন, “আজ ধর তোকে যদি ওই টাকা দি, তুই পারবি রাঁধতে?”।

সত্যেন মুচকি হাসলেন, “দিয়েই দেখ না, তোর হেঁসেল আর ফিজিক্স ল্যাব একসঙ্গে সামলে নেব। তুই দেখছিস চালের মধ্যে রুবি আর হীরে, আমি দেখছি অসমোসিস, তুই দেখছিস মুর্গীর গলা থেকে টুপটাপ মুক্তো ঝরছে আর আমি দেখছি গলানো সোনা মুরগীর গলার মধ্যে কত কম উষ্ণতাতেই জমে যাচ্ছে, বাইরে সে সোনা জমাতে গেলে নবাবের প্রাসাদেই আগুন লেগে যেত।
সবই তো অণু-পরমাণুর খেলা রে। ওইজন্য বলেছিলাম ফিজিক্সটা পড়, বাকি সব ফাউ”।

ধূর্জটি হতাশ হয়ে সুশোভনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ” কই হে, মেটাফিজিক্সের-ও যে কিছু রোল আছে সেটা সত্যেনকে বলো।”

সুশোভন মাথা নাড়লেন, ” দাঁড়ান, আগের সপ্তাহের মার্ক্সের ডায়ালেকটিক নিয়ে আলোচনাটাই শেষ করতে দিলেন না সত্যেন দা”।

ধূর্জটি অবাক হয়ে মাথা ঘোরালেন, “কেন রে?”

আলুর বড়াটা মুখের মধ্যে পাঠিয়ে চুলে হাত মুছতে মুছতে সত্যেন বললেন, “নিউটনের থার্ড ল কখন ফেল করে সেটা আগে বলুক, ওটা না বুঝলে আর মার্ক্স আউড়ে লাভ কি? সুধীন, এবার একরাউন্ড চা হোক না কি? “।