উত্তম শ্মশ্রুগুম্ফ কথা

২৪শে জুলাই-এর বদলে না হয় ২৫ শে জুলাইতে বেরোল কিন্তু উত্তমকুমারের মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে সাড়ে বত্রিশ ভাজায় উত্তম স্পেশ্যাল লেখা বেরোবে না তা কি কখনো হয়? এই ব্লগে এর আগেও মহানায়ককে নিয়ে লেখা হয়েছে, মিস করে থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন এখানে

১৯৪৮ থেকে ১৯৮০, এই বত্রিশ বছরে গুরুদেব প্রায় দু’শ-র কাছাকাছি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, চরিত্রের খাতিরে নেহাত তরুণ থেকে থুত্থুড়ে বুড়ো সব কিছুই সাজতে হয়েছে।  মনে মনে উত্তমের চেহারাটি ভাবতে বললে হয়ত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী পঞ্চাশ কি ষাটের সেই কচি, শ্মশ্রুগুম্ফহীন মুখটির বাইরে যাবেন না – কপালে চন্দনের ফোঁটা, হাতে মালা, বুকের ঠিক কাছটিতে সুচিত্রা এসে দাঁড়িয়েছেন এবং কি আশ্চর্য সুচিত্রা ফর আ চেঞ্জ উত্তমের দিকেই তাকিয়ে। গুগল মহারাজকে ভাবতে বলুন, সেখানেও অন্যথা হবে না, উত্তমকুমার দিয়ে গুগল ইমেজেস-এ সার্চ করলে বোধহয় ৯০% ছবিতে চাঁদপানা মুখটিতে রোমের রেশমাত্র নেই। এদিকে হয়েছে কি, নয় নয় করে বেশ কিছু ছবিতে উত্তম জম্পেশ সব গোঁফ দাড়ি নিয়ে অভিনয় করেছেন, সেগুলোকে একদম পাত্তা না দেওয়াটা কিন্তু আনফেয়ার।

অতএব, আজকে দু’চার কথা রইল উত্তমের সেই চেনা-অচেনা গোঁফ দাড়ি নিয়ে।

১। সিন্ধুঘোটক –  গুঁফো শব্দটা উচ্চারণ করলেই যে ছবি আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে এ হল সেই গোঁফ। পুরুষ্টু, ঝুপো এবং ঝুলে পড়া গুম্ফরাজিতে ওপরের ঠোঁট তো বটেই সময় সময় নিচের ঠোঁট-ও ঢেকে যায়। যেমন ধরুন ১৯৮০ সালের ‘রাজা সাহেব’ সিনেমায় যেমনটি দেখতে পাই। শেষের দিকের সিনেমাগুলোর অধিকাংশর মতনই এখানেও উত্তমের পার্শ্বচরিত্র,  তারাশঙ্করের কাহিনী অবলম্বনে বানানো সিনেমাটিতে উত্তম এখানে রাঢ়ভূমের এক স্থানীয় জমিদার, লালপাহাড়ীর রাজা সাহেব। অত্যাচারী জমিদারের অবশ্য শেষে রূপান্তর ঘটে এক স্নেহপ্রবণ মানুষে, স্থায়ী বলতে শুধু থেকে যায় ওই গোঁফ। তবে রাঢ়বাংলার মানুষদের এ সিনেমা রেকমেন্ড করবেন না, যারাঁ বর্ধমানের উত্তরে পা বাড়াননি তাঁরাও বিলক্ষণ টের পাবেন উত্তম সহ সমস্ত কুশীলব সেটে পৌঁছে প্রথমবার ওই ভাষা ট্রাই করেছিলেন।

Gnof 1

২। চেশায়ার বাবু –  রৌদ্রছায়া-র (১৯৭৩) একদম শুরুর দৃশ্যে উত্তমকে দেখুন। ঠোঁটের ওপরের দিকে পলক না ফেলে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন ঊনবিংশ শতাব্দীর কোনো বাঙ্গালী বাবুকে। চেশায়ার বেড়ালের হাসির মতন এখানে শুধু মাঝখান থেকে সিঁথি করা চুলটুকুই রয়ে গেছে। পশ্চিমী গোঁফ বিশেষজ্ঞরা মনে হয় একে ‘Handlebar’ বলেই অভিহিত করবেন, যদিও খাঁটি হ্যান্ডলবার হওয়ার জন্য দুদিকের গোঁফের ডগা আরেকটু উঠতে হত।

Gnof 2

৩। পেনসিল – পেনসিল গোঁফ মানে মিহি গোঁফ, আর সে গোঁফের রাজা হলেন হিজ হাইনেস কৃষ্ণেন্দু কর্মকার ওরফে কে-কে।

Gnof 5

চিনতে পেরেছেন তো কে-কে কে? ঠিক, ইনিই সেই হোটেল স্নো ফক্সের বিখ্যাত গাইয়ে, কত কি যে গেয়েছেন – ‘শুক বলে সেই পাখিটা আজ মারা গিয়েছে’, ‘টস টস টস আঙ্গুরেরই রস ঠোঁটে মেখে নাও’  ইত্যাদি ইত্যাদি। ভদ্রলোকের স্যাটায়ারের দিকে বিশেষ ঝোঁক ছিল, ‘বাঁদর থেকে মানুষ’ নাকি ‘মানুষ থেকে বাঁদর’  প্রশ্ন করে স্নো ফক্সের মোদো মাতালদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন।

পেনসিলের মতন পেন্সিল গোঁফের-ও কিন্তু শ্রেনীবিন্যাস আছে;  টু-বি, থ্রী-বি, এইচ-বি র মতন এদিকেও মিহি থেকে আস্তে আস্তে ঠাসবুনোটের দিকে যেতে পারেন, যতক্ষণ একটা লাইন মেন্টেন করা যায় ততক্ষণ পেন্সিল বলে চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। শুকসারী-র (১৯৬৯) বাঁশুরিয়ার গোঁফটা দেখুন, কৃষ্ণেন্দুর গোঁফের থেকে আরেকটু ঘন।

Gnof 3

চাইলে অবশ্য কেকে-র থেকেও মিহি পেন্সিল গোঁফ পেতে পারেন। ‘বউ ঠাকুরানীর হাট’ (১৯৫৩) মনে নেই?

Gnof 13

৪। নবাবী – বলা বাহুল্য যে নবাবী গোঁফের মধ্যে একটা আভিজাত্য লুকিয়ে আছে। মোটা চুলের গোঁফে এ আভিজাত্য কোনোদিন আসবে না, এর জন্য দরকার কোমল, পাতলা গুম্ফতন্তু। না হলে ঢেউটা খেলবে কি করে? বিশ্বাস না হলে একবার তাকিয়ে দেখুন  সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি মীর জুমলার মুখপানে (গড় নাসিমপুর, ১৯৬৮)।

Gnof 8

এ গোঁফের পরিচর্যা করাও চাট্টিখানি কথা নয়, রীতিমতন মোম দিয়ে পালিশ না করলে দুদিকের ওই ছুঁচলো ভাবটি ধরে রাখা অসম্ভব। দুদিকের জুলফি-ও বেশ সমুদ্রঘোটকের ল্যাজের মতন পেঁচিয়ে নেমে প্রায় গোঁফ ছুঁই ছুঁই একটা ব্যাপার, কিন্তু শেষ তক ছোঁবে না। ব্রিটিশরা আসার পর যদিও জুলফি আর গোঁফ গেল মিলে, আর দাড়ির সবটুকু উড়িয়ে দিয়ে এল যে স্টাইল তারই আজ নাম ‘মাটনচপ’ (সত্যি বলছি)।

৫। মাস্কেটিয়ার – বুঝতেই পারছেন এ গোঁফে একটা ইউরোপীয়ন খানদানি ব্যাপার আছে। ঠোঁটের ওপরে হাল্কা গোঁফের আভাস থাকতে পারে, আবার বেশ জমকালো গোঁফ রয়ে গেলেও ক্ষতি নেই। যেটা মাস্ট সেটা হল ঠোঁটের নিচ থেকে উল্লম্ব এক ফালি দাড়ি। কখনো সম্বল ওই উল্লম্ব ফালিটুকুই, কখনো বা সে ফালি নিচে নেমে এসে জুড়ে যায় থুতনির নিচের দাড়িটুকুর সঙ্গে। আর মাস্কেটিয়ার স্টাইলের সঙ্গে যিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি আর কেউ নন, আমাদের বহু পরিচিত হেইন্সমান অ্যান্থনি।

Gnof 11

৬। ভ্যান ডাইক –  সপ্তদশ শতকের ফ্লেমিশ শিল্পী অ্যান্থনি ভ্যান ডাইক এ স্টাইলের প্রবক্তা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভ্যান ডাইক স্টাইলের  একাধিক সংস্করণ বেরিয়েছে, তবে মূল চাহিদাটি হল গোঁফ এবং গোটি দুটি’ই থাকতে হবে এবং দু’দিকের গালে বিন্দুমাত্র রোম থাকা চলবে না।

১৯৭৬-র বহ্নিশিখা ছবিতে দিনের বেলা উত্তমের কোনো দাড়ি নেই কারণ সকালে তিনি বিখ্যাত আইনজ্ঞ, পন্ডিত, দানবীর এবং দেশসেবক বিলাস ঘোষ, কিন্তু রাত হলেই ভ্যান ডাইক স্টাইলের দাড়ি গোঁফ নিয়ে তিনি স্মাগলারদের বস যাকে ধরতে সারা ভারতের পুলিশের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে।

Gnof 9

৭। ইংলিশ – পেন্সিল গোঁফের দু’দিকে হাল্কা করে একটু পাক খাইয়ে দিলেই পেয়ে যাবেন ইংলিশ গোঁফ। সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ এবং ব্রিটিশ ভিলেনদের একচেটিয়া এই গোঁফ রাখতে প্রায় মাস তিনেক মতন সময় লেগে যায়। পাক খাওয়ানোর ব্যাপারটা যত সহজে লিখে ফেললাম, করে দেখানোটা কিন্তু তার কয়েক গুণ জটিল, অনাবশ্যক গোঁফকে দৈনন্দিন হিসাবে বাদ দিয়ে দিয়ে ওই সূক্ষ্ম কারুকাজ নিয়ে আসা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। অবশ্য রাজারাজড়াদের এ নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই, তাঁদের গোঁফের পরিচর্যা তো আর নিজেদের করতে হত না।

কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী-র (১৯৮১) রাজাবাবুকেই দেখুন – সারা সকাল ফেন্সিং খেলে, দিনের বেলাটা ঘুমিয়ে  আর রাতে বাইজিদের সান্নিধ্য দিয়েও এই শৈল্পিক গোঁফ আর কি ভাবেই বা রেখে দেওয়া যায়?

Gnof 6

৮। আশ্রমিক – ‘A Cappella’ শব্দবন্ধটির আক্ষরিক অর্থই হল চার্চের মতানুযায়ী। সুতরাং, ‘আ কাপেল্লা’ দাড়ি যে চার্চের ফাদার, কি মিশনারি কলেজের প্রিন্সিপালদেরই ভালো মানাবে সে নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নেই। তারপরেও মন খুঁতখুঁত করছে? চিন্তা নেই, অকাট্য প্রমাণ আছে আমার কাছে। কিন্তু আগে ছবিটা দেখাই।

Gnof 12

সিনেমার নামটা খেয়াল পড়ছে? ‘আনন্দ আশ্রম’।
বলছিলাম না, ‘আ কাপেল্লা’ দাড়ির জন্য আশ্রম জাতীয় কিছুর সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকতেই হবে।

৯। ঘোড়ামামা – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘোড়ামামাকে নিশ্চয় সবার মনে আছে। । ঘোড়ামামার এমনিতে সব ভাল, খালি দোষের মধ্যে দুটো – এক, এ কালের ডাক্তারদের পরিভাষায় ভদ্রলোকের ‘Hoarding Disorder’ ছিল আর দুই, দাড়ি মুখের ‘বেউটি’ বলে পারতপক্ষে কামাতেন না। তো ওই ‘ একরাশ ঝাব্বু দাড়ি’ মানায় শুধু ঘোড়ামামাদের-ই, অর্থাৎ হিমানীশ গোস্বামীর ভাষায় গরমকালে যাঁরা মাথার মধ্যে একটা খট করে শব্দ শুনতে পান।

উত্তম বেচারীকেও ওরকম বিটকেল দাড়ি রাখতে হয়েছিল, নিজের ভাইয়ের চূড়ান্ত অত্যাচারে পাগল হয়ে যাওয়ার পর। ভাইটি কে বলুন দেখি? মনে না পড়লে দেখে ফেলুন ১৯৮১-র ‘প্রতিশোধ’, যে সিনেমায় উত্তম-সৌমিত্র-শুভেন্দু থাকা সত্ত্বেও হিরো ছিলেন বাংলার দাদামণি সুখেন দাস।

Gnof 14

এবারে আসি, আর কিন্তু বলতে পারবেন না ‘গোঁফ জোড়া যে কোথায় গেল কেউ রাখে না খবর’।

Advertisements

সাতসকালে

গরমকালে ইউরোপ ঘুরতে যাওয়া একটা ফ্যাচাং, থিকথিক করছে ট্যুরিস্ট, হোটেলওলারা চড়া দাম হাঁকছে, রেস্তোরাঁতে খুব সাধারণ খাবার পেতেও ঘন্টাখানেকের কাছে সময় লেগে যাচ্ছে। ভেনিসে তো এসব সমস্যা আছেই, তার ওপর সেখানে বাস-ট্যাক্সির গল্প নেই। জলপথে ভ্রমণ শুনতে যতটা রোম্যান্টিক লাগে কার্যক্ষেত্রে আদপেই নয় – ওয়াটার ট্যাক্সিতে চামড়া ছড়ে যাওয়া ভীড় আর গন্ডোলায় চড়ে ‘দো লাফজো কি হ্যায়’ গান গাইতে গাইতে পাড়ার মধ্যে এক চক্কর ঘুরে আসা যায় বটে কিন্তু  পুরো শহর ঘুরে দেখার প্ল্যান মুলতুবি রাখাই ভালো।

লাখখানেক ট্যুরিস্টের ভিড়ে দমবন্ধ অবস্থায়  পিয়াজ্জা সান মার্কো কি সেন্ট মার্ক-এর ব্যাসিলিকাতে ঘুরতে হবে ভেবে রাতে ঘুম হয় নি ভালো। কাকভোরে উঠে  টিনটোরেটোর ‘প্যারাডাইস’ বা দা ভিঞ্চির ‘ভিট্রুভিয়ান ম্যান’ এর কথা ভেবেও খুব একটা কাজের কাজ হল না,  লাভের মধ্যে বিছানায় আর পড়ে থাকতে ইচ্ছে করল না। হোটেলটা আদ্যিকালে ছিল একটা মনাস্ট্রি, লাগোয়া পাথুরে রাস্তা আর সরু গলি দেখেই আন্দাজ করে নিতে ইচ্ছে করে তিন চারশ বছর আগের এরকম এক সকালবেলা মঠের সাধুরা ঠিক কি করতেন। হয়ত সার দিয়ে চলেছেন তাঁরা, প্রত্যেকের হাতে তিন চেনে ঝোলানো ধাতব পাত্র, বৃত্তাকার গতিতে দুলতে থাকা সে পাত্র থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে চারপাশটা ঝাপসা করে তুলেছে। সকালের ‘ব্রেড অফ হেভন’ পাওয়ার আগে পুণ্যধূমে শুদ্ধি হয়ে যাচ্ছে জীব এবং জড়ের। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছেনটাই বা কোথায়? সামনে তাকিয়ে দেখি পাথুরে গলি গিয়ে শেষ হয়েছে হোটেলের নিজের জেটির কাছে। জেটির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ভেনিসের বিখ্যাত গ্র্যান্ড ক্যানাল, আর সেই ক্যানালের পাশ দিয়ে একটি দু’টি করে লোক কোথায় যেন চলেছেন, সবারই গতিমুখ একই দিকে।

ভেনিসে এসে ইস্তক এত ফাঁকা রাস্তা পাইনি, বড় ফুর্তি হল। সাতসকালে আমিও চললাম গ্র্যান্ড ক্যানালের পাশটি ধরে। মিনিট দশেক হাঁটার পর দেখি যে গুটিকতক লোকজনের পিছু নিয়েছিলাম তারা সবাই ওভারব্রিজ ধরে খালের উল্টোদিকে যাচ্ছেন। ওভারব্রিজের নিচেই গন্ডোলা স্টেশন আর হয়ত সে কারণেই সকাল থেকে এই প্রথমবারের জন্য কিছু পর্যটকের দেখা পাওয়া গেল, ওভারব্রিজের সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে গ্র্যান্ড ক্যানালের ছবি তুলছেন।

1

কিন্তু স্থানীয়দের উৎসাহটা উল্টোদিকের ওভারব্রিজ পেরিয়ে উল্টোদিকের চত্বরে। দূর দেখে দেখা যাচ্ছে সে চত্বরের মাঝখানেই একটি বিশাল দেওয়ালঘড়ি, আর ঠিক ওপরে গম্ভীর আওয়াজে থেকে থেকে বেজে উঠছে তিনটে ঘন্টা।

ওভারব্রিজের সিঁড়ি দিয়ে নেমে ডানদিকে ওই দেওয়ালঘড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে দু’মিনিট হাঁটা, চোখ জুড়িয়ে গেল।

মাছের বাজার!

লেটুস পাতার ওপর বিছিয়ে রাখা হয়েছে সদ্য কাটা স্যামন স্টেক, হাল্কা গোলাপী মেশানো তাজা কমলা রঙ জানান দিচ্ছে এ নরওয়ে থেকে বরফবন্দী হয়ে আসা মাছ নয়, ঠাসবুনোট মাংসটুকুর সঙ্গে আটকানো কালো ছালে ঝলক দিয়ে যাচ্ছে রূপোলী আঁশ।

1

নরওয়ের কথা মনে আসা মাত্র দেখি স্যামনের পাশেই রাখা নরওয়ের লবস্টার, যার পোশাকি নাম স্ক্যাম্পি – দূর থেকে দেখলে অবশ্য মনে হতে পারে যেন লুইসিয়ানার ক্রফিশ। সাদা দাঁড়া আর টকটকে কমলা রঙ এর শুঁড় নিয়ে রাশি রাশি স্ক্যাম্পি পড়ে আছে, সন্ধ্যাবেলার মধ্যেই অবশ্য সব মিশে যাবে ভেনিসের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ঢেউ খেলানো লিঙ্গুইনির মধ্যে, ওপরে ছড়িয়ে দেওয়া হবে গুঁড়ো অরেগানো, সঙ্গত দিতে হাজির থাকবে গার্লিক বাটার আর সাদা ওয়াইন।

2

আর শুধু কি লবস্টার,  টাটকা কালো বাগদা চিংড়ি-ও হাজির ভেনিসের বাজারে, তার পাশেই বিশাল বিশাল পাত্র থেকে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে রাশি রাশি কুঁচো চিংড়ি, কাঁচা চিংড়ির-ই সে কি লাল রঙ! তবে পুঁই শাক কি কুমড়োর সঙ্গে এ চিংড়ি যে পাতে আসবে না সেটা বুঝতেই পারছেন, এর আনাগোনা মূলত শ্রিম্প ককটেলে – বরফের ওপর বাহার করে সাজিয়ে দেওয়া হবে এ কুঁচো চিংড়ি, সঙ্গে থাকবে হট সস। আর ভাগ্যক্রমে বনেদী রেস্তোরাঁর চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বেরোতে পারলে পেয়েও যেতে পারেন ঠোঙ্গায় থাকা গরমাগরম কুঁচো চিংড়ি ভাজা।

কিন্তু শুধু চিংড়ি ব্যাখ্যানেই মন ভরিয়ে ফেলবেন না। তাহলে কাপ্পেসান্তের গল্প করব কার কাছে?

কাপ্পেসান্তে হল ইংরেজী ভাষার স্ক্যালপ আর আমাদের দেশী ঝিনুক। কিন্তু কাপ্পেসান্তের সঙ্গে যে কোনো স্ক্যালপ কি যে কোনো ঝিনুককে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। ভেনিস থেকে প্রায় একশ ষাট মাইল দূরের উফিজি গ্যালারিতে বত্তীচেল্লির সেই বিখ্যাত পেইন্টিং ‘বার্থ অফ ভেনাস’-এ দেখা যাবে কাপ্পেসান্তেকে। চ্যাপ্টা, জাপানি হাতপাখার মতন ছড়িয়ে থাকা এ ঝিনুকের মধ্যে বত্তীচেল্লি দেখতে পেয়েছিলেন প্রেমের দেবীকে, আপনি অতদূর নাও যদি ভাবতে পারেন এ ঝিনুক দেখলেই কিন্তু মনে হবে ভেতরে রয়ে গেছে নিটোল একটি মুক্তো।

4

কাপ্পেসান্তের শৈল্পিক মূল্য যাই হোক না কেন, আসল দামের দিক থেকে কিন্তু একে টেক্কা দিয়ে গেছে ক্যানেস্ত্রেল্লি স্গুসিয়াতি অর্থাৎ কিনা দেশে আমরা যাকে বলি শামুক। এ শামুকে মাংসের পরিমাণটা বেশ ভালো মতন থাকে আর তাই জন্যই সীফুড ফ্রায়েডরাইস-ই বলুন কি ক্যালাব্রিজ নামক পাস্তা, শামুকের চাহিদা সবসময়ই তুঙ্গে। প্রতি কেজির দাম বারো ইউরো টা যদি একটু বাড়াবাড়ি থাকে তাহলে এর ঠিক অর্ধেক দামে গেঁড়িগুগলি ট্রাই করে দেখতে পারেন। দোকানদার অবশ্য বলে দেবেন যে ছয় ইউরোটা বলতে গেলে প্রায় দান করে দেওয়া, ও গুগলির স্যুপ যে ‘পালং তোড়’ সেটা ধরতে হবে না?

শামুক-ঝিনুক পেরোলেই দেখা পাওয়া যাবে ডাঁই করে রাখা স্কুইড আর কাটলফিশ-এর। দুটি প্রাণীর শরীরেই নিকষ কালো কালির থলি রয়েছে, ভয় পেলে বা শত্রুকে ধোঁকা খাওয়াবার জন্য এরা নিজের শরীর থেকে ছুঁড়ে দেয় এই কালি। ভেনিসে অবশ্য এই কালির জন্যই দুটি প্রাণীরই অস্বাভাবিক চাহিদা – কোন কালে যে এদের কালিকেই রান্নার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল তার খবর কেউ রাখে না কিন্তু সেই কালিতে তৈরী পাস্তা খাওয়ার জন্য পর্যটকরা একদম মুখিয়ে থাকেন। রান্নার পর একটু গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে পাস্তাময় ছড়িয়ে পড়ে এ কালো তরল, আর কালো পাস্তার মধ্যে থেকে মুহুর্মুহু জিভে পড়তে থাকে স্কুইড বা কাটলফিশের সাদাটে মাংস। সে স্বাদ নেওয়ার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলিকে একবার শুধিয়ে আসতে পারেন, “কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেন?”।

5

পরের আইটেমটি কিন্তু ভেনিসের নিজস্ব নয়, সোর্ডফিশ খাওয়ার চল টি এসেছে ইটালির দক্ষিণপ্রান্তের সিসিলি বা ক্যালাব্রিয়া থেকে। সুপে দিয়ে খান, গ্রিলড মাছে লেবু টিপে খান, পুত্তানেস্কা সস ঢেলে খান, যাই করুন না কেন শুরুতে একটা জিনিস-ই দেখে নেওয়ার, কতটা নিটোল রয়েছে আপনার সোর্ডফিশের স্টেকটি। স্যামনের মতন গোটা মাছটিকে পিস পিস করে কেটে রেখে দেখানো যাবে না কারণ সবথেকে প্রাজ্ঞ খদ্দেরটিও সোর্ডফিশের  সোর্ডটি দেখতে না পেলে ছেলেমানুষের মতন অভিমান করবেন, আবার গোটা মাছটিকেই রেখে দিলে স্টেকটির তারুণ্য সম্পর্কে আঁচ পাওয়া যাবে না – সুতরাং প্রত্যেক দোকানদারই গোটা মাছটিকে আধাআধি কেটে মাথার লাগোয়া অংশটি ডিসপ্লেতে রেখে দেন, জায়গা বাঁচানোর জন্য নিম্নাংশটি থাকে নিচের ডেকচিতে।

6

দেশে থাকার সময় শঙ্করমাছের ল্যাজের চাবুকের কথাই শুনেছি, খাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। ইটালিতে অবশ্য স্টিং-রে পরম উপাদেয় খাদ্যবস্তু, ল্যাজটাকে নিয়ে ঠিক কি করে জানা নেই বটে তবে ডানাগুলো কুচি কুচি করে কেটে স্যুপে ফেলতে দেখেছি। স্টিং-রে এর বিশেষত্ব হচ্ছে অধিকাংশ সময়েই এ মাছ মেন ডিশের সাইডকিক হয়ে আসে। যেমন ধরুন আসল খাবারটা হল হয়ত হাঁসের যকৃৎ দিয়ে বানানো সেই সুখাদ্য ফোয়ে গ্রা, রে-র সরু ফালিগুলোকে গার্লিক বাটার কি ড্রাই হোয়াইট ওয়াইনে ভেজে ওপরে পার্সলে পাতা ছড়িয়ে সাজিয়ে দেওয়া হল। কখনো হয়ত তাজা সালাডের মধ্যে দেখলেন টুকরো টুকরো রে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আবার কখনো চোখ বুজে ফুলো ফুলো নকিতে (ইটালিয়ান ডাম্পলিং) কামড় দিতে গিয়ে টের পাবেন আরে পুরের মধ্যে একটা মেছো মেছো ব্যাপার না!

7

সারি সারি মাছের দোকান, সকালের কর্মব্যস্ততার মধ্যে জেগে উঠছে পুরনো ভেনিসের বাজার। ঠেলা গাড়িতে করে এসেই যাচ্ছে বড় বড় বাক্স, নেমে আসছে রূপোলী ব্র্যানজিনি (সী-বাস), হাল্কা গোলাপী পিওভরা (বড় অক্টোপাস),  উজ্জ্বল গোলাপী টোন্নো (টুনা), আরও কত কি।

আমার কিন্তু চোখটা সরে গেছে।

হাত দশেক দূরে যেখানে মাজের বাজার শেষ হচ্ছে তার পরেই এক নামগোত্রহীন  স্টলের পাশটিতে দেখা যাচ্ছে তাকে, কয়েকটিই মাত্র পড়ে।

ভেনিসের সকাল কালো হয়ে আসছে, মেঘলা দিনে এ জিনিস কিনে হোটেলের রান্নাঘরে একবার ঢুঁ মারলে কি রাঁধুনিরা খুব বিরক্ত হবেন?

মনে হয় না, যা আড্ডাবাজ এবং খাদ্যরসিক জাত কুমড়ো ফুলের বড়াকে অ্যাপ্রিসিয়েট না করে উপায় কি।

8