গ্রীক ট্র্যাজেডি

দু-বাংলা মিলিয়ে ইস্তানবুলে বাঙ্গালীর সংখ্যা জনা কুড়ি হবে কিনা সন্দেহ আছে, তাই আমার ইউনিভার্সিটিতে আমাকে ধরে পাঁচ জন বাঙ্গালীর থাকাটা সেলিব্রেট করার মতনই ঘটনা বটে। সুতরাং, উইকএন্ড গেটটুগেদার ঘন ঘনই ঘটে, এবং পপুলার ফিজিক্স থেকে বাংলা লিটল ম্যাগাজিন, জাম্বালয়ার রেসিপি থেকে ভূতের গপ্পো, হেন বিষয় নেই যা নিয়ে আমরা আড্ডা দিই না। আর তার সঙ্গে মাঝে মাঝেই প্ল্যানপ্রোগ্রাম হয় নতুন জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার, একসাথে ঘুরতে না গেলেও অন্যদের পরিকল্পনা শুনতেও দিব্যি লাগে। গত শনিবার কথা হচ্ছিল গ্রীস নিয়ে, বিরিয়ানি-রায়তা এবং লিকর চকোলেটের মাঝখানে বসেও মনোনীতা বিরস বদনে জানাল, “নাহ প্রবীর দা, গ্রীসের ভিসা পাওয়া যাচ্ছে না”। মনোনীতা শুনেছে গ্রীক কনস্যুলেট ভিসা অ্যাপ্লিকেশন নেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে, ট্র্যাভেল এজেন্টরাও পত্রপাঠ জানাচ্ছে অবস্থা সুবিধের দিকে না যাওয়া অবধি গ্রীস ঘুরতে আসার কথা না ভাবাই ভালো।

বিরিয়ানির পর রাত জেগে আবার দেখা হয়েছে ‘কিস মি ডেডলি‘, নেশাহীন হ্যাংওভার হেতু রবিবা্রের সকালে মনোনীতার কথাটা ভুলে গেছিলাম। বিবিসির চ্যানেল জুড়ে শুধু সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমণ, আইসিসের নতুন কীর্তিকলাপ, তাইপের ওয়াটার পার্কের দুর্ঘটনা, সকাল সকাল এত দুর্ঘটনার ঘনঘটা কারই বা ভালো লাগে? বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিলাম, আর ঠিক তক্ষুনি সংবাদপাঠিকা জানালেন আগামী এক সপ্তাহের জন্য গ্রীসের সমস্ত ব্যাঙ্ক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, দিন দুয়েকের জন্য বন্ধ থাকবে গ্রীক স্টক মার্কেট-ও। কারণ? ক্যাপিটাল কন্ট্রোল! অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে যাতে সমস্ত বিনিয়োগ তুলে না নিতে পারেন বা সাধারণ মানুষে ভয়ের চোটে ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্ট থেকে প্রয়োজনের থেকে বেশী টাকা বার করে না নিতে পারেন। এটিএম উইথড্রয়ালের ওপরেও তাই নিষেধাজ্ঞা বসেছে, প্রতি দিন ষাট ইউরোর বেশী টাকা তোলা যাবে না। বিবিসি আরো জানাল যে আমেরিকা, ব্রিটেন সহ বেশ কিছু দেশ গ্রীস অভিমুখী পর্যটকদের জানিয়েছে পুরো ট্যুরের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাশ সঙ্গে রাখা দরকার। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো যে আমেরিকান বা ব্রিটিশ পর্যটকরা ভিসা ছাড়াই গ্রীসে ঢুকতে পারেন, ভারতীয়দের সে সুযোগ নেই।

যাঁরা গ্রীস সম্পর্কিত খবরাখবর মন দিয়ে পড়ছেন তাঁরা জানেন যে এই মুহূর্তে মূল প্রশ্ন হল গ্রীস কি ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে থাকতে পারবে? ইউরোপীয়ন সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক বলুন বা আই-এম-এফ কেউই আর গ্রীসকে আগের শর্তে টাকা দিতে রাজি নয়, মূল কারণ গ্রীস আগের ধার নেওয়া টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ধার নেওয়া হয়েছিল দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে কিন্তু অর্থনীতি চাঙ্গা তো হয়ই নি উপরন্তু ধারের টাকার সিংহভাগ গেছে আরো আগে ‘প্রাইভেট মার্কেট’ থেকে নেওয়া ধার মেটাতে। বিনিয়োগকারীরা বহুদিন ধরেই গ্রীসের অর্থনীতির ওপর বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলেছেন, ফলে ২০০৮ এ যেখানে স্বল্পস্থায়ী সরকারী বন্ডে সুদের হার ছিল ৪ শতাংশের কাছাকাছি, ২০১২ র পরবর্তী সময়ে সে সুদের হার দাড়িয়েছে ১৮০ শতাংশ! প্রায় অবিশ্বাস্য সুদের প্রতিশ্রুতি দিয়েও বেসরকারী বাজার থেকে গ্রীস টাকা তুলতে পারেনি, ভরসা তাই পড়শীদের থেকে ধার। শিবরামের সেই ‘ঋণং কৃত্বা’ গল্পটা মনে আছে তো? হর্ষবর্ধনের থেকে টাকা ধার নিয়ে গোবর্ধনকে দেওয়া আর গোবর্ধনের থেকে টাকা নিয়ে হর্ষবর্ধনকে, এ প্রায় সেই দশা! আমার আপনার পাড়ায় এরকম মানুষ খুঁজলে আকছার পাওয়া যাবে যিনি প্রায় সর্বস্বান্ত, ঋণের বোঝায় ডুবে এবং যতদিন পারা যায় ততদিন এই চক্রাকারে ঋণ শোধের বন্দোবস্ত করে চলেছেন। সারদা বা রোজ ভ্যালির মতন সংস্থা-ও আছে বিস্তর যাদের অসুখ এক, কিন্তু আজ অবধি কোনো দেশের কথা শুনেছেন যে দেশ সরকারী ভাবে নিজেকে সর্বস্বান্ত ঘোষণা করতে চলেছে? গ্রীস আজকে সেই অবস্থায় পৌঁছেছে, আপাতত ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে থাকতে পারুক কি না পারুক, এই দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেশটার সঙ্গে অদূর ভবিষ্যৎ-এ জড়িয়ে থাকবেই।

কেন এই হাল? ২০০৮-এ বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দা দেখা দেওয়ার আগে অবধি প্রায় বছর সাতেক ধরে গ্রীস অনেক কম সুদে টাকা ধার করে গেছে, ধারের পরিমাণ নিয়ে না মাথা ঘামিয়েছেন গ্রীক সরকার না চিন্তায় পড়েছেন ইউরোপীয়ন ইউনিয়নের হর্তাকর্তারা। বহু বছর ধরে মরগ্যান স্ট্যানলির মতন সংস্থা গ্রীসের অর্থনীতিকে ‘উন্নত অর্থনীতি’র তকমা দিয়ে এসেছে, আপাতগ্রাহ্য কারণ ছাড়াই। এই ২০১৩ তে এসে জানানো হয়েছে যে গ্রীসকে আর ডেভলপড মার্কেট বলা যাবে না, বলতে হবে ‘ইমার্জিং মার্কেট”। সে খবর জেনে ফোর্বস পত্রিকা টিপ্পুনী কেটেছিল গ্রীসের মতন অতি বৃদ্ধ অর্থনীতি আর ‘ইমার্জ’টা করবে কবে! সে কথা যাক কিন্তু ওই ভুয়ো ‘উন্নত অর্থনীতি’র তকমা এবং ইউরো-র সদস্যপদের দরুণ কম সুদে বছরের পর বছর ধরে ঢালাও টাকা ধার পেতে কোনো সমস্যাই হয়নি। এখন অবশ্য দেখা যাচ্ছে সেই ধারের টাকার যেটুকু দেশজ অর্থনীতিকে মজবুত করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে তা নেহাতই ধূলপরিমাণ, বাকি টাকা কোথায় গেছে সে আপনিই বুঝে নিন।

পরিকাঠামো গড়ে না ওঠার দরুণ, নতুন চাকরীর সংস্থান না হওয়ার দরুণ দেশটার উৎপাদনক্ষমতাও কমেছে বছরের পর বছর ধরে। চাহিদ বাড়ছে অথচ যোগান নেই, ফলত মূল্যবৃদ্ধির হার-ও অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। ২০০৯-এ যখন প্রথমবারের জন্য বোঝা গেল কতটা ভেতরফোঁপরা গ্রীসের অর্থনীতি ততদিনে মূল্যবৃদ্ধি এবং অস্বভাবিক দেনার দায়ে জর্জরিত এ দেশ। পরের পাঁচ-ছ বছর ধরে গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে দেখা দিয়েছে বেকারত্ব, এই মুহূর্তে প্রতি একশো জনে প্রায় ছাব্বিশ জন কর্মহীন। তাও যাঁরা হতাশ হয়ে চাকরি খোঁজাই বন্ধ করে দিয়েছেন তাঁরা এই সংখ্যাতত্ত্বের আওতায় পড়েন না, তাঁদেরকে ধরলে তো আর কথাই নেই!

কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি ওপরের কারণগুলোও ঠিক কারণ নয়, এগুলো-ও এক হিসাবে ফলাফল। আসল রহস্য লুকিয়ে আরো গভীরে। ২০০১ সালে যখন গ্রীসকে ইউরোর আওতায় নিয়ে আসা হয় তখন কিন্তু গ্রীসের অর্থনীতি বলতে গেলে অপরিণতই, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বলতে গেলে কিছুই ঘটেনি, অর্থনৈতিক কারণ নয় রাজনৈতিক কারণেই প্রায় জোর করে গ্রীসকে অনুমতি দেওয়া হয় দ্রাকমার বদলে ইউরো ব্যবহারের। ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ডের মতন দেশগুলি ইউরোর সদস্যপদ না নিতে চাওয়ায় বা তুরস্কের মতন দেশকে খানিকটা ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে বাইরে রাখতে হওয়ায় গ্রীসের মতন কমজোরি দেশের বরাত খুলে যায়, কারণ ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন এবং ইউরোর গুরুত্ব বোঝানোর জন্য সংখ্যার জোর অতি দরকারী। দু’খানা বিশ্বযুদ্ধে হারার পর প্রায় তিন দশক ধরে আমেরিকা এবং রাশিয়ার দাদাগিরি সহ্য করতে হয়েছে জার্মানিকে, ইউরো সুযোগ এনে দিয়েছিল জার্মান জাত্যভিমানকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার; পূর্ব এবং পশ্চিম জার্মানি একত্রীকরণের সময় থেকেই ইউরোর কথা মাথায় ছিল জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট কোলের। তৎকালীন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া মিতেরের সমর্থন পেয়ে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করতে খুব বেশী সময় নেয় নি জার্মানি। কিন্তু ইউরো প্রসঙ্গে জনসাধারণের সমর্থন ঘরে বাইরে কোথাওই বিশেষ ছিল না, অতএব যত বেশী সংখ্যক দেশকে টানা যায় ততই মঙ্গল।

ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে ঢোকার ছাড়পত্র পাওয়ার ফলে গ্রীসের অর্থনীতি একটা গতি পায় ঠিকই কিন্তু অতি উল্লসিত গ্রীক সরকার তখন খেয়াল করেননি (বা খেয়াল করলেও চেপে গেছেন) যে সেই ঘুরে ফিরে কৃষি, আবাসন, জল পরিবহণের মতন ক্ষেত্রগুলিই ভরসা। নতুন শিল্প প্রায় আসেই নি, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার-ও ছিল অন্যান্য উন্নত দেশগুলির তুলনায় চোখে পড়ার মতন কম। আর এসবের মধ্যেই বড়লোকের বখাটে ছেলে যেরকম ভাবে টাকা ওড়ায় কতকটা সেই ধাঁচেই গ্রীস দায়িত্ব নেয় ২০০৪ সালের অলিম্পিক আয়োজনের – আজকের হিসাবে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার খরচ করা হয় এথেন্স অলিম্পিক গেমসের জন্য। গ্রীস তো আর চীন নয়, ফল যা হওয়ার তাই হল, অলিম্পিকসের পর পরেই পড়শীদের মুখ কালো করে জানাতে হল ধারের পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে গেছে। চিন্তার কথা এই যে আজকে যে প্রতিবেশী দেশগুলি উঠতে বসতে বাপান্ত করছেন গ্রীসকে তখন কিন্তু এনারা কেউই সাবধানবাণী  শোনান নি। আমার আশ্চর্য লাগে আরো একটা ব্যাপারেও, ২০০৪ সালে যে দেশটা অলিম্পিক গেমসের আয়োজক তারা কিন্তু খবরটা জানে বহু আগে থেকেই, নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ে গ্রীসের অর্থনীতি এমন কিই বা চাঙ্গা ছিল যাতে এহেন দুঃসাহসিক একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়? সরকার অবশ্য ভাবছিলেন আরো বেশী করে পর্যটকরা আসবেন,  পর্যটকরা এসেওছিলেন কিন্তু সে শুধু অলিম্পকিসের সময়টাতেই। তুলনামূলক ভাবে সস্তার জায়গা বলে তুরস্ক বা বলকান দেশগুলি ততদিনে টেনে নিতে শুরু করেছে ভূমধ্যসাগরাঞ্চল অভিমুখী বহু পর্যটকদের। অদূরদর্শিতার সেই শুরু, লেখার শুরুতে ওই যে জানিয়েছিলাম গ্রীস এখন পর্যটকদের আসতেই বারণ করছে এক হিসাবে দেখলে এ সেই অদূরদর্শিতারই রেশ।

তবে মাসুল আরোই গুনতে হবে, এবং গ্রীস ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে থাকুক কি না থাকুক আগামী ভবিষ্যৎ-এর জন্য আদৌ আশার বাণী শোনানো যাচ্ছে না। যদিও গ্রীসের বর্তমান সরকার চাইছেন ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসতে, কিন্তু পঞ্চাশ শতাংশের বেশী মানুষ চাইছেন যেনতেন প্রকারেণ থেকে যেতে। সমস্যা হল, থেকে যাওয়ার দামটা অধিকাংশ মানুষ বুঝতে পেরেছেন কিনা সেটা পরিষ্কার নয়।  সে ক্ষেত্রে ইউরোপীয়ন ইউনিয়িন, আই-এম-এফ এবং ইউরোপীয়ন সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের নির্দেশ মেনে প্রভুত পরিমাণে বাড়াতে হবে করের পরিমাণ, সাঙ্ঘাতিক ভাবে কমিয়ে ফেলতে হবে সরকারের খরচ-ও; অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান জানিয়েছেন এই পুরো টাকার পরিমাণ আমেরিকান ডলারের হিসাবে বছরে তিন ট্রিলিয়ন! সরকারের খরচের একটা বড় অংশ যায় সরকারী কর্মচারীদের বেতন এবং অবসপ্রাপ্তদের পেনশন যোগাতে – বুঝতেই পারছেন বিশেষত বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দের জন্য কি ভয়ঙ্কর দুর্দিন অপেক্ষা করছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকরা খোদ এথেন্সের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন এখনই জ্বালানি তেলের দাম সাত-আট বছর আগের তুলনায় বেড়ে গেছে প্রায় চারশ শতাংশ, মানুষ বাধ্য হয়ে কাঠ নিয়ে আসছেন বাড়িতে। বহু মানুষের কাঠ কেনার আর্থিক ক্ষমতাটুকুও চলে গেছে, তাঁরা চেষ্টা করছেন গাছের পড়ে থাকা ডালপালা পাওয়া যায় কিনা। মাথায় রাখুন এঁরা কিন্তু নিম্নবিত্ত-ও নন, এহেন সমস্যা এঁদের জীবনে তুলনামূলক ভাবে নতুন। আর শুধু কি জ্বালানি? দরকারী ওষুধ কেনার টাকা নেই, ছেলেমেয়েদের কলেজে পাঠানোর টাকা নেই, এরকম দুর্দিন ২০০৮ এর পরপরেও দেখা যায়নি। গ্রীক জাত্যভিমান-ও অবশ্য খুবই বেশী, নিজেদের দুরবস্থার কথা বাইরের জগতকে খুব একটা টের পেতে দিচ্ছিলেন না এতদিন কিন্তু এখন সমস্যা এতই প্রকট, বিবিসি বা সিএনএন এর মতন বাইরের মিডিয়ার কাছে মুখ খুলতে দ্বিধা বোধ করছেন না।

আর যদি সরকারের কথা শুনে মানুষ আসন্ন রেফারেন্ডামের মাধ্যমে জানান যে ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়াতেই তাঁদের মত, কি ঘটতে পারে? ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলেও গ্রীসকে বিশাল ঋণের বোঝা ঠিকই ঘাড় থেকে নামাতে হবে, এই দেনা মেটাতে ক’বছর লাগতে পারে সে কথা ভাবতে যাওয়াও দুঃসাধ্য ব্যাপার। আর পুরনো মুদ্রা দ্রাকমায় ফিরে গিয়ে ইউরোতে নেওয়া বিশাল ঋণ আদৌ মেটানো সম্ভব হবে কিনা প্রশ্ন সেখানেই। গ্রীক সরকার জানেন দ্রাকমায় পুরো টাকা ফিরিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, তাই অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ ঋণ মকুব করার জন্য তাঁরা এখনই অনুরোধ জানাচ্ছেন (বাকি পঞ্চাশ শতাংশের জন্য অবশ্য তাঁরা বেশী সুদ দিতে রাজি)। কিন্তু পাওনাদাররা মনে হয় না এ প্রস্তাবে আদপেই রাজি হবেন। ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া মানে গ্রীসের মানুষরা আর ইউ-র অন্য দেশগুলিতে কাজ খুঁজতে পারবেন না, তার মানে ব্লু-কলার হোক বা হোয়াইট কলার, যে কোনো পেশার মানুষের জন্যই চাকরি খোঁজার বিড়ম্বনা আরো বাড়বে – আগেই লিখেছিলাম এই মুহূর্তে প্রতি একশো জনে ছাব্বিশ জনের চাকরি নেই, সংখ্যাটা আরো বাড়বে বই কমবে না। গ্রীসের ব্যাঙ্কগুলিও ইউরোপীয়ন সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক থেকে আর কোনোরকম আপৎকালীন সাহায্য পাবে না। তবে আশা করা যায় যে পেনশন ফান্ডটি রক্ষা পাবে। গ্রীক সরকার এও বলছেন যে ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরোতে পারলে করের হার আর বাড়বে না, আর তাই ভবিষ্যৎ-এ মানুষের হাতে অপেক্ষাকৃত বেশী টাকা থাকবে। কিন্তু এ সব কিছুই নির্ভর করছে গ্রীক অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে তার ওপর। এই মুহূর্তে সে অর্থনীতির এমনই ঘুণ ধরা কাঠামো যে কিছু আশাই প্রায় রাখা যাচ্ছে না, ধরে রাখাই ভালো যে সামনের কয়েক বছরে মানুষগুলির জন্য অপেক্ষা করবে আরো সমস্যা।

তবে আশার আলো এক জায়গাতেই, দ্রাকমায় ফিরে গেলে গ্রীসকে কেঁচে গণ্ডূষ করতে হবে, আর সেটা নিতান্তই খারাপ খবর নয়। ইউরো থেকে দ্রাকমায় যাওয়া মানে গ্রীক শ্রমিকদের বাজারমূল্য অনেকটাই কমবে, উন্নত দেশগুলি চাইবে এই সস্তার শ্রম কিনতে। ঠিক যে ফর্মুলায় চীন, ভারত বা তুরস্ক সাফল্যের মুখ দেখে এসেছে সেটাই ঘটতে পারে গ্রীসের ক্ষেত্রেও। কিন্তু শুরুর সময়ে এই দেশগুলির কোনোটির গায়েই উন্নত অর্থনীতির তকমা ছিল না, সমস্ত গর্ব ধূলিসাৎ হয়ে প্রায় শূন্য থেকে ফের শুরু করার চ্যালেঞ্জ এদের কাউকেই নিতে হয়নি। গ্রীস পারে কিনা, কোটি ইউরোর (বা দ্রাকমার) প্রশ্ন সেটাই।

greek_financial_crisis__svitalskybros
(Cartoon by Richard and Slavomir Svitalsky : http://www.cartoonmovement.com/cartoon/2402)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s