রুপো গলা কবিতার সামনে

উজ্জ্বল সাদা যত মানিকের মধ্যে     তিরতিরে রুপো-গলা সংশয়

বইছে কি?

নাকি যেন জমাট বেঁধে নিবিড়ে ঘনিয়ে আসা কোনো ভয়?

ভরা চোখ টলমল, বিশ্বাসে-ধন্দে     ভালোবাসা নয়, শুধু হার জয়

ঝরবে কি?

ঝরল তো, অঝোরে ঝরছে দেখ, উছলিয়ে পড়া ক’টা ফোঁটা নয়।

চতুর্দশ শতকের আরবি কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ থাকার চান্স বড়ই কম, তাই অন্ত্যমিলেই ভাবানুবাদটা সেরে ফেললাম। ইবন জামরাকের আদি কবিতার লাইন ক’টির অবশ্য ইংরেজীতে অনুবাদ অমিত্রাক্ষর ছন্দেই (যাকে বলে ব্ল্যাঙ্ক ভার্স) করা – ‘A silver melts and flows among jewels appearing pure white liker her in beauty./A flowing (substance) appears to the eyes like a solid so that I can not discern which of the two is flowing./ Don’t you see how the water spills on the basin, but its spouts hide it immediately?/ It is a lover whose eyelids are brimming over with tears, tears that it hides from fear of a betrayer.’

উঠোনেও মার্বেল পাথর,  উঠোনের চারপাশের বারান্দাতেও ১২৪ খানা মার্বেলের থাম, আর উঠোনের ঠিক মাঝখানে বারোটা সিংহমূর্তির ওপরে যে জলাধারটি বসানো সেটিও, হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন, সাধু ভাষায় যাকে বলে মর্ম্মর প্রস্তর তাই কুঁদেই তৈরী হয়েছে। সেই জলাধারেই খোদাই করা রয়েছে কবি ইবন জামরাকের লেখা বারোখানা ছত্র।

a4

কি নিয়ে লেখা এই কবিতা?

জল।

স্পেনের দক্ষিণপ্রান্তের শহর গ্রানাডা প্রকৃতিগতভাবেই রুখাশুকা, না সাহারা কি গোবির মতন রুখাশুকা নয় বটে কিন্তু তার পরেও জল সেখানে আরাধ্য বিষয়। সেই গ্রানাডার রাজপ্রাসাদে বসে ইবন জামরাক বাংলাদেশের কবির দু’লাইন শুনতে পেলে নিশ্চয় বিস্মিত হতেন, “জল শুধু জল, দেখে দেখে চিত্ত তার হয়েছে বিকল”। না, জল দেখে চিত্ত বিকল হওয়ার জন্যই শুধু নয়, জলের দেবতাকে বাঙ্গালী কবি এত নির্মম ভাবে  কল্পনা করেছেন দেখে।  গ্রানাডার রাজপ্রাসাদে জল বলতে গেলে নিজেই দেবতা, কিন্তু সে দেবমাহাত্ম্য নান্দনিকতার।

আলহামব্রা সেই রাজপ্রাসাদের নাম, নাসরিদ সুলতানদের বানানো স্বপ্নপুরী।  জ্যামিতিক শিল্পকর্ম এবং মার্বেল পাথরের স্থাপত্যের জন্য সে প্রাসাদের আজ-ও পৃথিবীজোড়া খ্যাতি।

a6

প্রাসাদের ঘরে ঘরে এমন আলোআঁধারির খেলা মাঝে মাঝে মনে হবে যেন মধ্যযুগের প্ল্যানেটোরিয়ামে বসে আছেন কিংবা কোপারনিকাস বা টাইকো ব্রাহের নোটবুকের পাতা থেকে গ্রহনক্ষত্রের ছবি উঠে এসেছে ঘরের সিলিং-এ।

a7

দশম শতকে বাগদাদে সৃষ্ট ‘মুকারনাস’ স্থাপত্যরীতিতে তৈরী সুষম বহুভুজের নিখুঁত মুন্সীয়ানা দেখলে মনে হতেই পারে আলহামব্রার অধিবাসীরা  রূপকার্থে একে স্বর্গের সঙ্গে তুলনা করে ভুল করে কিছু করেন নি, জ্যামিতিক সৌন্দর্য সত্যি সত্যিই অপার্থিব। সাধে সরোজিনী নাইডুর মতন ব্যক্তিত্ব-ও বলেছিলেন, “The Alhambra of Spain that stands even today peerless, even than the Taj Mahal in comparison, was the outcome of the genius of the Arab.”।

a1

প্রাসাদের ভেতরের বহু কাজই হয়ত শুধুমাত্র দেখানোর জন্য, প্রকৌশলগত ভাবে তার মূল্য সামান্যই। কিন্তু দর্শকরা তাতেও বলেন, ‘ভাগ্যিস’!

a3

a5

তবে আলহামব্রার সবসেরা বৈশিষ্ট্য অন্য জায়গায় –  জল এবং জলের ব্যবহারকে এমন ওতপ্রোত ভাবে স্থাপত্যকলার সঙ্গে মেশানো হয়েছে এ প্রাসাদে তার তুলনা পাওয়া ভার, সারা পৃথিবীর সাপেক্ষেই। ওই যে ইবন জামরাক বলছিলেন, ঝরে পড়ছে না জমাট বেঁধে আছে তা বুঝতে পারছেন না, সেটা শুধু কবির কল্পনা নয়। সিংহফোয়ারার কথাই ধরা যাক, গ্রানাডার তেজী সূর্যের আলোর প্রতিফলনের জন্যই সিংহগুলিকে অনেক জীবন্ত লাগে, প্রাণবন্ত লাগে। কিন্তু সেই প্রতিফলনের জন্য লাগবে জল। চারদিক থেকে যে চারটি ধারা এসে মিশছে সিংহফোয়ারায়  সেগুলোকে সরিয়ে নেওয়া যাক, মনে হবে পাথরের পুতুল মাত্র।

কিন্তু এই শুকনো দেশে জল পাওয়া বড় সহজ কথা নয়। মুর প্রাসাদের প্রযুক্তিবিদরা মাথা খাটিয়ে এমন স্থাপত্যরীতি নিয়ে এলেন যাতে প্রাসাদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে একই জলের ধারা বয়ে চলবে; প্রতিটি ফোয়ারা, প্রতিটি জলাধার এমনভাবে বানানো হল যাতে জল এক জায়গায় কোনোভাবেই জমে না থাকে। ‘চরৈবেতি’-ই মন্ত্র, জল এখানে সদা চলমান, স্থবিরতার প্রশ্ন নেই।

পাথর আর জলের এহেন পরিপূরক সম্পর্ক আর কোথায় দেখতে পাবেন?

a9

তবে দক্ষিণী সূর্যের আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে পাথরকে জীবন্ত করে তোলার জন্যই শুধু নয়, সূর্যের তেজকে প্রতিহত করার জন্যও আলহামব্রার জলের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কড়া রোদের মধ্যেও ফোয়ারার সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রণালীগুলো শান বাঁধানো চত্বরকে ঠান্ডা রাখে, কখনো সখনো সাদা রঙের দেওয়ালে ঠান্ডা ছায়া বইয়ে দিয়ে তপ্ত প্রাণকে জুড়োতে কিছু বিভ্রম-ও ঘটায়। তপ্ত শরীর জুড়নোর জন্য অবশ্য  ছিল হামামের ব্যবস্থা, তবে মনে রাখা দরকার হামাম সাধারণ স্নানাগার নয় – নিজেকে শুদ্ধ করার  একটা আত্মিক প্রচেষ্টা থাকত হামামে ঢোকার পর, সেটা শুধু ধর্ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা উচিত হবে না। সেই প্রচেষ্টার জন্য আলহামব্রার জলের থেকে ভালো উপাদান কিই বা হতে পারে? রিলিজিয়ন আর স্পিরিচুয়ালিটি এক জিনিস নয় সে আলহামব্রায় ঢুকে বেশ টের পাওয়া যায়।

a10

ও হ্যাঁ, ইবন জামরাকের কবিতায় জলের ব্যাপারটা বাদ দিলে যে রহস্যময়তা পড়ে থাকে সেটা  বুঝতে গেলেও একবার আলহামব্রা ঘুরে আসতে হবে। মুঘল কি অটোমানদের মতন নাসরিদদের প্রাসাদেও রহস্য রোমাঞ্চের রসদ কম ছিল না।

Advertisements

4 thoughts on “রুপো গলা কবিতার সামনে

  1. সই says:

    ভীষণ ভাল লাগল পড়ে। সাথে ছবিগুলোর জন্য একপ্রস্থ বেশি থ্যাঙ্কু।

    Like

  2. আপনার লেখার জন্যে মাঝে মাঝে হা পিত্যেশ করে বসে থাকতে থাকতে রেগে যাই আপনার ওপর। কেন লিখছেন না…… কেন লিখছেন না… অবশেষে আসে একটা লেখা। আর সে কি উমদা চিজ। তখন বুঝি, ফল পাকতে একটু সময় দিতে হয়। কার্বাইডে নয়, গাছপাকা। তবেই না এমন সুতার মোলায়েম অথচ জমাটি তথ্যে ঠাসা লেখাটি পাই।

    কুর্নিশ আপনাকে। অদ্ভুত সুন্দর ভাবে দেখালেন। ঠিক যে টুকু দরকার সেইটুকু। আপনার লেখার মধ্যে একটা চিনে ছবির মত ব্যাপার আছে জানেন? এখানে একটা আঁচড়, ওখানে দুটো ফুটকি। বাকিটা পাঠক নিজেই তৈরি করে নিতে পারেন, আর আলহাম্ব্রা প্রাসাদের অলিন্দে ঘোরাফেরা করতে পারেন।

    সেলাম।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s