এক চিন্তাবিদের সংগ্রাম – জন ন্যাশ প্রসঙ্গে

প্রতি বছর মে মাসে  ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের অর্থনীতি বিভাগ  ‘নোবেল লেকচার’ এর আয়োজন করেন , তার আগের বছরের ডিসেম্বরে যে অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড নোবেল স্মৃতি পুরস্কারটি পেয়েছেন তার কাজের বিশ্লেষণ করেন  অর্থনীতির অধ্যাপকরা। ২০০৮ সালের লেকচারটি ছিল লিওনিড হেরউইসজ, এরিক মাসকিন এবং রজার মায়ারসনের কাজের ওপর,  ‘মেকানিজম ডিজাইন’ এর তাত্ত্বিক কাজের জন্য এনারা ২০০৭-এ পুরস্কারটি পান। সাধারণ দর্শকদের জন্য মেকানিজম ডিজাইনের জটিল তত্ত্ব জলবত তরলম করে বোঝানো চাট্টিখানি কথা নয়, বক্তারা তাই স্বাভাবিক ভাবেই গেম থিয়োরীর বেসিকস দিয়ে শুরু করেছিলেন (এখানে বলে রাখা ভালো যে মাসকিন বা মায়ারসন এনারা সবাই খ্যাতনামা গেম থিয়োরিস্ট)। দেড় ঘন্টা পর লেকচার শেষে দেখা গেল অধিকাংশ শ্রোতাই মনে রেখেছেন শুধু ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়মের কনসেপ্টটি। জনা চারেক অধীর আগ্রহে প্রশ্ন করলেন ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়মের ব্যবহারিক গুরুত্ব নিয়ে, যে অধ্যাপক বোঝাচ্ছিলেন তিনি একটু থমকে গিয়ে বললেন, “এই ধরুন একটা অকশনে আপনার কতটা বিড করা উচিত সেটা আপনি জানতে পারবেন অকশন নামক গেমের ন্যাশ সাম্যাবস্থাটি বুঝতে পারলে”। এক মিনিটের মধ্যে অকশনের ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম বোঝা এবং বোঝানো দুঃসাধ্য ব্যাপার, শ্রোতারা তাই জানতে চাইলেন, “আর?”অধ্যাপক কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তা করে বললেন “না, সেরকম ভাবে তো আর কিছু বলা যাবে না”। অধিকাংশ শ্রোতাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী এবং বর্তমানে উচ্চপদস্থ কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ,  ব্যবহারিক গুরুত্বের দিক থেকে ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম তাঁদেরকে বেশ হতাশ করল দেখলাম, কোঁচকানো ভুরু সোজা হতে বেশ সময় নিল।

২০০৭-এ ন্যাশ যখন দিল্লীতে এসেছিলেন, একইরকম ভাবে হতাশ হয়েছিলেন অধিকাংশ সাংবাদিক। ভারত – পাকিস্তান রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধানের ব্যাপারে ন্যাশ সাম্যাবস্থা কি বলছে? ন্যাশ ‘সে তো জানি না’ ধরণের মন্তব্য করে চলে যান। কিন্তু শুধু সাংবাদিক বা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভরাই এমনটি ভাবেন ভাবলে ভুল হবে, অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এরকম লোকের সংখ্যা কম নয় যারা ভাবেন ন্যাশ সাম্যাবস্থা বলে কোনো জিনিস বাস্তব পৃথিবীতে নেই এবং থাকতে পারে না। জন ন্যাশের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে স্বভাবতই একটু ন্যাশ সাম্যাবস্থা নিয়ে বলা উচিত। নিচের গেমটির কথা ধরা যাক,

halla-shundi প্রতিটি খোপের প্রথম সংখ্যাটি জানাচ্ছে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হাল্লার কত লাভ, একইরকমভাবে দ্বিতীয় সংখ্যাটি শুন্ডীর জন্য প্রযোজ্য। এবার ধরুন হাল্লার রাজা গান ধরলেন, “হাল্লা চলেছে যুদ্ধে”, তাহলে শুন্ডীতে বসে ভালোমানুষ সন্তোষ দত্তের কি করা উচিত? তিনিও যুদ্ধেই যেতে চাইবেন কারণ -৫ এর থেকে -১ ভালো (এখানে আমরা ধরে নিচ্ছি এক দেশ অন্য দেশকে অধিকার করে বসলে প্রথম দেশটির প্রভূত লাভ এবং দ্বিতীয় দেশটি শান্তি চাই বলছে মানে তারা আদৌ যুদ্ধে যাচ্ছে না বা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে না)। আবার হাল্লার রাজা যদি শান্তিপ্রিয় হন তাহলেও কিন্তু শুন্ডীর রাজা যুদ্ধেই যেতে চাইবেন কারণ ১ এর থেকে ৫ ভালো। একই ভাবে শুন্ডীর রাজা যাই সিদ্ধান্ত নিন না কেন, হাল্লার রাজার-ও যুদ্ধে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। দুই রাজাই বুদ্ধি করে নিজেদের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করলেন এবং দেখলেন শেষমেশ দু’জনেই যুদ্ধে যাচ্ছেন। অন্য রাজা যাই করুন না কেন, হাল্লা বা শুন্ডীর রাজারা যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত হবেন না – এই যে সাম্যাবস্থা,  এরই নাম ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম।

তো এই ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম নিয়ে অভিযোগ কম নয়। বহু মানুষ (যাদের মধ্যে অনেক অর্থনীতিবিদরাও রয়েছেন) বলেন বাস্তবে মানুষ এত স্ট্র্যাটেজিক্যালি পরিস্থিতি বিচার করে না, ‘গাট ফিলিং’-ই ভরসা।  অনেকে আবার বলেন একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি থেকে আমার কত লাভ সেটাই অনেক সময় জানা থাকে না। কিছু মানুষের ধারণা আমরা লাভের থেকে ক্ষতির ব্যাপারে বেশী সংবেদনশীল, অর্থাৎ -৫ এবং -১ এর মধ্যে যা তফাৎ, ৫ এবং ১ এর মধ্যে তফাৎ তার থেকে আলাদা, গাণিতিক ভাবে যতই দুটি ক্ষেত্রেই আমরা চার ঘর সরি না কেন।

কিন্তু ন্যাশ সাম্যাবস্থা দিয়ে আমরা ঠিক লাভ ক্ষতির হিসেব করতে বসব না। আমার মতে ন্যাশ সাম্যাবস্থা একটি দার্শনিক ধারণা। কেন? ওপরের ‘গেম’টির কথাই ধরুন – দেখাই যাচ্ছে দুটি দেশ একত্রে সবথেকে বেশী লাভবান হবে যদি দু’জনেই বলে ‘শান্তি চাই’। দুটি দেশের রাজাই কিন্তু যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে সমস্ত পরিস্থিতি বিচার করে ঠিক করছেন কি করণীয়। মানেটা দাঁড়াচ্ছে এই যে দু’জন বুদ্ধিমান মানুষ নিজেদের সেরাটা দিয়েও সব থেকে ভালো পরিস্থিতিতে পৌঁছতে পারছেন না, এটাই ট্র্যাজেডি। এই ট্র্যাজেডিটা তুলে ধরাই হল ন্যাশ সাম্যাবস্থার সব থেকে বড় অবদান – বুদ্ধি দিয়ে সেরা চালটি চাললেই যে অভীষ্ট জায়গায় পৌঁছবো এই গ্যারান্টি নেই আমাদের কাছে, কিন্তু সেটা বোঝে ক’জন।

আর এই সূত্র ধরেই বিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে একটা যুগান্তকারী গবেষণা শুরু হয়। ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদরা সদাই বলে এসেছেন মানুষ ডিশিসন নেয় নিজের সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে, ন্যাশ সাম্যাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই নব্যযুগীয় অর্থনীতিবিদরা বললেন কথাটা ভুল, আমরা আসলে ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’। সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা কখনই ব্যবহার করে উঠতে পারি না বা পারলেও তা হয় কদাচিৎ। আপনার পকেট ঢুঁ ঢুঁ অথচ ফুলের দোকানের সামনে দিয়ে যেতে যেতে টুক করে একটু ফুল কিনে ফেললেন কারণ কবি বলেছেন “জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি, দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী”। তাহলে কি আপনাকে নির্বোধ ঠাওরাব? না, আপনি নেহাতই ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’ – সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে আপনার, এই মাত্র। কি ধরণের প্রতিবন্ধকতা? মায়া, উত্তেজনা, প্রেম, দুঃখ এহেন নানা অনুভূতি।

জন ন্যাশ সমাজবিজ্ঞানী ছিলেন না, অর্থনীতিবিদ-ও নন, তিনি গণিতজ্ঞ। কিন্তু সেই গণিতের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম, মুশকিলটা হল অধিকাংশ মানুষ এই ব্যবহারিক গুরুত্বটাকে মাপেন লাভ-ক্ষতির হিসাবে আর তাই মনে হয় ন্যাশ সাম্যাবস্থা একটা ‘ইউটোপিয়ান কনসেপ্ট’। যারা সিলভিয়া নাসারের লেখা জীবনীটি পড়েছেন বা রাসেল ক্রো অভিনীত সিনেমাটি দেখেছেন তাঁদের জন ন্যাশের জীবনযুদ্ধ নিয়ে নতুন করে কিছু শোনানোর দরকার নেই। যারা পড়েন নি বা দেখেন নি তাঁরা গুগল বা উইকি সার্চ করতে পারেন ‘জন ন্যাশ’ বা ‘আ বিউটিফুল মাইন্ড’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে। আমি কিন্তু জন ন্যাশের জীবনসংগ্রামের কথা নিয়ে কিছু লিখছি না,  বুদ্ধিজীবী ন্যাশের দর্শন  এবং চিন্তাধারাকে বিদ্বজনরা কি ভাবে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছেন সে নিয়ে কিছু বলাই আমার উদ্দেশ্য।

এ ইতিহাসের শুরু জন ফন নয়ম্যানকে দিয়ে, যাকে ধরা হয় গেম থিয়োরীর জনক। নয়ম্যান নিজে যখন প্রিন্সটনের সহকর্মী অস্কার মরগেনস্টার্নের সঙ্গে ‘থিয়োরী অফ গেমস অ্যান্ড ইকোনমিক বিহেভিয়র’ লেখেন, অধিকাংশ গণিতবিদ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন এই নতুন গাণিতিক শাখাটিকে – অ্যাপ্লায়েড ম্যাথসের কদর তখন ছিল না বললেই চলে। ন্যাশের ডক্টরাল থিসিসের অনুপ্রেরণা কিন্তু এই বইটিই কিন্তু সেই ন্যাশ নিজে যখন ফন নয়ম্যানের কাজকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন, নয়ম্যান নিজেই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন “সামান্য কাজ”। অথচ ফন নয়ম্যানের ‘কোঅপারেটিভ গেমস’ (যেখানে মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে সিদ্ধান্ত নেন) এর তুলনায় বাস্তবে হয়ত ন্যাশের ‘ননকোঅপারেটিভ গেমস’ (যেখানে অন্যরা কি করছে তার পরোয়া না করে আমি নিজের সেরা সিদ্ধান্তটা নেব) এর সংখ্যাই বেশী। অর্থনীতিবিদরা যেহেতু প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রচুর মাথা ঘামান, ন্যাশের গবেষণা তাঁদেরকে অনেক বেশী প্রভাবিত করেছে। বেশ কিছু অর্থনীতিবিদের কথার সূত্র ধরে ২০০৮-এ জেমস কেস নামের এক সাংবাদিক একটা বইও লিখে ফেলেন ‘Competition: the birth of a new science’ নাম দিয়ে – ন্যাশের কাজ না থাকলে বলা বাহুল্য বিজ্ঞানের এই নতুন শাখাটিকে চিনতে আমাদের বহু দেরী হত।

কার্নেগী মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্র থাকাকালীন ন্যাশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর একটি ক্লাস নেন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিষয়ে উৎসাহিত হয়ে একটি নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেন – পরে যার নাম হয় ‘ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান’। মজার ব্যাপার হল ন্যাশ বার্গেনিং পান্ডুলিপির প্রথম পাঠকদ্বয় ছিলেন ফন নয়ম্যান এবং মরগেনস্টার্ন, তাই ন্যাশ যে তাঁদের কাছে নেহাত একটি ভুঁইফোড় নাম ছিল না সেটা বলা বাহুল্য। মনে রাখা ভালো ন্যাশ তখনও ননকোঅপারেটিভ গেমস নিয়ে কাজ শুরু করেন নি, ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান দাঁড়িয়ে ফন নয়ম্যানদের ‘কোঅপারেটিভ গেমস’ এর ওপর ভিত্তি করে। সমস্যাটা খুব সহজ – দু’জন লোকের মধ্যে দশ টাকা ভাগ করে দিতে হবে, আর সেটা করার জন্য প্রত্যেককে বলতে হবে তাঁরা দশের মধ্যে কত টাকা চান, যদি দু’জনের চাওয়া টাকার পরিমাণ দশের বেশী হয় তাহলে কেউই কিছু পাবেন না আর দশের কম হলে যে যা চেয়েছেন তা’ দিয়ে দেওয়া হবে। একটু চিন্তা করলে বোঝা যাবে সমস্যাটা সহজ হলেও উত্তর সহজ নয়, কারণ উত্তর অসংখ্য।

ন্যাশ এখানে দেখালেন কিছু জিনিস অনুমান করে নিলে একটাই উত্তর পাওয়া সম্ভব। কি ধরণের অনুমান? পুরো দশ টাকাই ভাগ হবে, দু’জনের কাছে দশ টাকার মূল্য যদি একই হয় তাহলে দু’জনের দাবিদাওয়াও এক হবে, দু’জন যে সংখ্যাগুলো কোনোদিন বলবেন না সেগুলো আগেভাগেই বাদ দিয়ে দেওয়া যাবে ইত্যাদি।

সমস্যা হল বহু বছর ধরে ন্যাশের এই সমাধানকে আমরা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি মুনাফা ভাগাভাগির কাজে এবং যখনই সে কাজটা করতে পারিনি আদালত, উকিল, কোম্পানীর বড়কর্তা সবাই মিলে দোষারোপ করেছি ন্যাশকে – গাণিতিক জটিলতার সূত্রেই হোক বা অবাস্তব অনুমান ধারণের প্রসঙ্গেই হোক, ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান এর সমালোচনা করা হয়েছে অজস্র বার। গত বছরেই ওরাকল এবং গুগলের মধ্যে পেটেন্ট সংক্রান্ত মামলা চলাকালীন ডিসট্রিক্ট কোর্টের বিচারক ন্যাশ বার্গেনিংকে জটিল এবং পক্ষপাতিত্বপূর্ণ সমাধান বলে নাকচ করে দেন।

ন্যাশ নিজে এই মামলার ফলাফল দেখছিলেন কিনা জানা নেই কিন্তু ন্যাশের পেপারটি যারাই পড়েছেন তাঁরা নির্দ্বিধায় জানাবেন ন্যাশের তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য। একজন প্রকৃত গণিতজ্ঞের মতনই ন্যাশ দেখাতে চেয়েছিলেন অসীম সংখ্যক সমাধানের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া যায় একটি মাত্র সমাধানকে, যদি ভাগীদাররা বুদ্ধি করে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে পারেন। শুধু তাই নয়, কথাবার্তা না চালিয়েও যে মধ্যস্থতা করা যায় এই ধারণার জন্ম-ও কিন্তু ন্যাশের এই তত্ত্বের সূত্রেই। যদি ভাগীদাররা বুদ্ধিমান মানুষ হন তাহলে নিজেদের মধ্যে কথা না চালিয়ে শুধু অঙ্কের সাহায্যেই কিন্তু তাঁরা নিজেদের লভ্যাংশটি ঠিক করে নিতে পারবেন।

কিন্তু যদি ঠিক না করতে পারেন, দোষ কি ন্যাশের? হতেই পারে যে এঁরাও ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’ মানুষ; এও হতে পারে যে সমাধান এল সেটি প্রকৃত অর্থেই ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান কিন্তু এক পক্ষ তাতে বেশী লাভবান হল, ন্যাশ তো কখনই দাবি করেন নি যে তাঁর সমাধান সাম্যও বজায় রাখবে – হয়ত সাম্য বজায় রেখে ন্যাশ বার্গেনিং করার জন্য দরকার আরো উন্নত তত্ত্ব।

ন্যাশ সাম্যাবস্থা (ইকুইলিব্রিয়ম) হোক কি ন্যাশ চুক্তি (বার্গেনিং), বহু বছর ধরে সমালোচকরা বলে এসেছেন বাস্তব পৃথিবীতে এগুলোর ভিত্তি নেই। এখনও বহু অর্থনীতিবিদ বলে থাকেন বাস্তবে দু’জন মানুষ হাল্লা-শুন্ডী ধরণের ‘গেম’ (যার পোশাকি নাম ‘প্রিজনার’স ডিলেমা) খেলতে বসলে মোটেও ‘যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ চাই’ সাম্যাবস্থা তৈরী হবে না। মনে রাখা দরকার হাল্লার রাজা এবং শুন্ডীর রাজা কিন্তু খেলাটা একবারই খেলেছিলেন, দু’জনে যদি বারবার একই খেলা খেলতেন তাহলে কিন্তু যুদ্ধ ব্যাপারটাকে এড়ানো যেতেই পারত – একবার খেলা এবং বারবার খেলার মধ্যে পার্থক্য আছে বৈকি, গেম থিয়োরী সেটা স্বীকার-ও করে নেয়।

বাস্তবে এই খেলাকে ভালো করে বুঝতে গেলে কিন্তু দরকার ভালো পরীক্ষা পদ্ধতি (experimental design) –  আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে জন ন্যাশ নিজেই কিছু অত্যন্ত জরুরী উপদেশ দিয়ে গেছেন এই পরীক্ষা পদ্ধতি কেমন হতে পারে সে ব্যাপারে। ন্যাশ বলেছিলেন একই প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে বার বার না খেলিয়ে খেলানো হোক ভিন্ন ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে, এবং এই যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে খেলতে হবে এই ব্যাপারটাকে প্রথমেই বলে দেওয়া হোক, তারপর দেখা যাক সাম্যাবস্থায় কি দাঁড়ায়। দ্বিতীয়টি উপদেশটি আরো গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেক খেলোয়াড়ের লাভ ক্ষতির হিসেবটা যেন আলাদা করা হয়, অর্থাৎ হাল্লা যুদ্ধে গেলে আর শুন্ডী শান্তি চাইলে হাল্লার লাভ হয়ত ৫ আর শুন্ডীর ক্ষতি -৫ কিন্তু উল্টোটা ঘটলে যেন বলে দেওয়া হয় হাল্লার ক্ষতি -৩ এবং শুন্ডীর লাভ ২। কেন? কারণ লাভক্ষতির হিসাবে পুরোপুরি ভারসাম্য থাকলে খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রতিযোগিতাকে এড়িয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা দেখা দেয়। যেহেতু আমরা  ‘ননকোঅপারেটিভ গেমস’ বিশ্লেষণ করছি, তাই ভারসাম্য বজায় না রাখাটাই বাঞ্ছনীয়।

ন্যাশের উপদেশের পরেও সে সময় এহেন এক্সপেরিমেন্ট ন্যাশের থিয়োরীকে সাপোর্ট করেনি। অ্যালভিন রথ (যিনি ২০১২ সালে  নোবেল পান পরীক্ষামূলক অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য) জানান সমর্থন না পাওয়ার জন্য বিদ্বমহল গেম থিয়োরীকেই প্রায় ছুঁড়ে ফেলতে গেছিলেন। অথচ তার বহু বছর বাদে ন্যাশের দেখানো পথেই পরীক্ষা করে দেখা গেল ন্যাশের থিয়োরী দিব্যি সমর্থন পাচ্ছে, যে ব্যাপারটা বোঝা যায়নি সে সময় সেটা হল বাস্তবে দু’জন খেলোয়াড় অপরিচিত হলেও লাভক্ষতির সমতা নিয়ে অনেক বেশী ভাবেন এবং সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেন। ন্যাশের থিয়োরীতে সমতার কথা কোথাও বলা নেই সুতরাং সেই থিয়োরীর পরীক্ষায় এমন বন্দোবস্ত করা দরকার যাতে খেলোয়াড়দের সমতা নিয়ে মাথা ঘামাতে না হয়।

ন্যাশের দর্শন বুঝতে আমরা অধিকাংশ সময়েই ব্যর্থ হয়েছি, থিয়োরিস্টের অলীক কল্পনা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছি তাঁর তত্ত্বসমূহকে অথচ রথ নিজেই জানাচ্ছেন এমন কি এক্সপেরিমেন্টাল ইকোনমিকসের ভিত্তিতেও সেই ন্যাশের কাজ। প্রশ্ন উঠতেই পারে কিন্তু তার মানে এই নয় যে গন্ডগোলটা ন্যাশের তত্ত্বে, গন্ডগোল আছে আমাদের নিজ নিজ ব্যাখ্যায়।

John Nash

(স্থিরচিত্র উৎস – গুগল ইমেজেস)

Advertisements

তুরস্ক-দর্শন বা সিঁদুরে মেঘের পূর্বাভাস

আর এক মাসের মধ্যেই এ দেশের জাতীয় নির্বাচন – সে কথা মাথায় রেখে লিখেছিলাম একটি প্রবন্ধ, আজকের আনন্দবাজার পত্রিকায় (২১/০৫/২০১৫) বেরি্যেছে সেটি।

পাশের ওয়েব-লিঙ্ক থেকে  অনলাইনে লেখাটি পড়া যাবে – http://goo.gl/vZ2dNG

Erdogan-Ataturk

(স্থিরচিত্র – গুগল ইমেজেস)

রুপো গলা কবিতার সামনে

উজ্জ্বল সাদা যত মানিকের মধ্যে     তিরতিরে রুপো-গলা সংশয়

বইছে কি?

নাকি যেন জমাট বেঁধে নিবিড়ে ঘনিয়ে আসা কোনো ভয়?

ভরা চোখ টলমল, বিশ্বাসে-ধন্দে     ভালোবাসা নয়, শুধু হার জয়

ঝরবে কি?

ঝরল তো, অঝোরে ঝরছে দেখ, উছলিয়ে পড়া ক’টা ফোঁটা নয়।

চতুর্দশ শতকের আরবি কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ থাকার চান্স বড়ই কম, তাই অন্ত্যমিলেই ভাবানুবাদটা সেরে ফেললাম। ইবন জামরাকের আদি কবিতার লাইন ক’টির অবশ্য ইংরেজীতে অনুবাদ অমিত্রাক্ষর ছন্দেই (যাকে বলে ব্ল্যাঙ্ক ভার্স) করা – ‘A silver melts and flows among jewels appearing pure white liker her in beauty./A flowing (substance) appears to the eyes like a solid so that I can not discern which of the two is flowing./ Don’t you see how the water spills on the basin, but its spouts hide it immediately?/ It is a lover whose eyelids are brimming over with tears, tears that it hides from fear of a betrayer.’

উঠোনেও মার্বেল পাথর,  উঠোনের চারপাশের বারান্দাতেও ১২৪ খানা মার্বেলের থাম, আর উঠোনের ঠিক মাঝখানে বারোটা সিংহমূর্তির ওপরে যে জলাধারটি বসানো সেটিও, হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন, সাধু ভাষায় যাকে বলে মর্ম্মর প্রস্তর তাই কুঁদেই তৈরী হয়েছে। সেই জলাধারেই খোদাই করা রয়েছে কবি ইবন জামরাকের লেখা বারোখানা ছত্র।

a4

কি নিয়ে লেখা এই কবিতা?

জল।

স্পেনের দক্ষিণপ্রান্তের শহর গ্রানাডা প্রকৃতিগতভাবেই রুখাশুকা, না সাহারা কি গোবির মতন রুখাশুকা নয় বটে কিন্তু তার পরেও জল সেখানে আরাধ্য বিষয়। সেই গ্রানাডার রাজপ্রাসাদে বসে ইবন জামরাক বাংলাদেশের কবির দু’লাইন শুনতে পেলে নিশ্চয় বিস্মিত হতেন, “জল শুধু জল, দেখে দেখে চিত্ত তার হয়েছে বিকল”। না, জল দেখে চিত্ত বিকল হওয়ার জন্যই শুধু নয়, জলের দেবতাকে বাঙ্গালী কবি এত নির্মম ভাবে  কল্পনা করেছেন দেখে।  গ্রানাডার রাজপ্রাসাদে জল বলতে গেলে নিজেই দেবতা, কিন্তু সে দেবমাহাত্ম্য নান্দনিকতার।

আলহামব্রা সেই রাজপ্রাসাদের নাম, নাসরিদ সুলতানদের বানানো স্বপ্নপুরী।  জ্যামিতিক শিল্পকর্ম এবং মার্বেল পাথরের স্থাপত্যের জন্য সে প্রাসাদের আজ-ও পৃথিবীজোড়া খ্যাতি।

a6

প্রাসাদের ঘরে ঘরে এমন আলোআঁধারির খেলা মাঝে মাঝে মনে হবে যেন মধ্যযুগের প্ল্যানেটোরিয়ামে বসে আছেন কিংবা কোপারনিকাস বা টাইকো ব্রাহের নোটবুকের পাতা থেকে গ্রহনক্ষত্রের ছবি উঠে এসেছে ঘরের সিলিং-এ।

a7

দশম শতকে বাগদাদে সৃষ্ট ‘মুকারনাস’ স্থাপত্যরীতিতে তৈরী সুষম বহুভুজের নিখুঁত মুন্সীয়ানা দেখলে মনে হতেই পারে আলহামব্রার অধিবাসীরা  রূপকার্থে একে স্বর্গের সঙ্গে তুলনা করে ভুল করে কিছু করেন নি, জ্যামিতিক সৌন্দর্য সত্যি সত্যিই অপার্থিব। সাধে সরোজিনী নাইডুর মতন ব্যক্তিত্ব-ও বলেছিলেন, “The Alhambra of Spain that stands even today peerless, even than the Taj Mahal in comparison, was the outcome of the genius of the Arab.”।

a1

প্রাসাদের ভেতরের বহু কাজই হয়ত শুধুমাত্র দেখানোর জন্য, প্রকৌশলগত ভাবে তার মূল্য সামান্যই। কিন্তু দর্শকরা তাতেও বলেন, ‘ভাগ্যিস’!

a3

a5

তবে আলহামব্রার সবসেরা বৈশিষ্ট্য অন্য জায়গায় –  জল এবং জলের ব্যবহারকে এমন ওতপ্রোত ভাবে স্থাপত্যকলার সঙ্গে মেশানো হয়েছে এ প্রাসাদে তার তুলনা পাওয়া ভার, সারা পৃথিবীর সাপেক্ষেই। ওই যে ইবন জামরাক বলছিলেন, ঝরে পড়ছে না জমাট বেঁধে আছে তা বুঝতে পারছেন না, সেটা শুধু কবির কল্পনা নয়। সিংহফোয়ারার কথাই ধরা যাক, গ্রানাডার তেজী সূর্যের আলোর প্রতিফলনের জন্যই সিংহগুলিকে অনেক জীবন্ত লাগে, প্রাণবন্ত লাগে। কিন্তু সেই প্রতিফলনের জন্য লাগবে জল। চারদিক থেকে যে চারটি ধারা এসে মিশছে সিংহফোয়ারায়  সেগুলোকে সরিয়ে নেওয়া যাক, মনে হবে পাথরের পুতুল মাত্র।

কিন্তু এই শুকনো দেশে জল পাওয়া বড় সহজ কথা নয়। মুর প্রাসাদের প্রযুক্তিবিদরা মাথা খাটিয়ে এমন স্থাপত্যরীতি নিয়ে এলেন যাতে প্রাসাদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে একই জলের ধারা বয়ে চলবে; প্রতিটি ফোয়ারা, প্রতিটি জলাধার এমনভাবে বানানো হল যাতে জল এক জায়গায় কোনোভাবেই জমে না থাকে। ‘চরৈবেতি’-ই মন্ত্র, জল এখানে সদা চলমান, স্থবিরতার প্রশ্ন নেই।

পাথর আর জলের এহেন পরিপূরক সম্পর্ক আর কোথায় দেখতে পাবেন?

a9

তবে দক্ষিণী সূর্যের আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে পাথরকে জীবন্ত করে তোলার জন্যই শুধু নয়, সূর্যের তেজকে প্রতিহত করার জন্যও আলহামব্রার জলের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কড়া রোদের মধ্যেও ফোয়ারার সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রণালীগুলো শান বাঁধানো চত্বরকে ঠান্ডা রাখে, কখনো সখনো সাদা রঙের দেওয়ালে ঠান্ডা ছায়া বইয়ে দিয়ে তপ্ত প্রাণকে জুড়োতে কিছু বিভ্রম-ও ঘটায়। তপ্ত শরীর জুড়নোর জন্য অবশ্য  ছিল হামামের ব্যবস্থা, তবে মনে রাখা দরকার হামাম সাধারণ স্নানাগার নয় – নিজেকে শুদ্ধ করার  একটা আত্মিক প্রচেষ্টা থাকত হামামে ঢোকার পর, সেটা শুধু ধর্ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা উচিত হবে না। সেই প্রচেষ্টার জন্য আলহামব্রার জলের থেকে ভালো উপাদান কিই বা হতে পারে? রিলিজিয়ন আর স্পিরিচুয়ালিটি এক জিনিস নয় সে আলহামব্রায় ঢুকে বেশ টের পাওয়া যায়।

a10

ও হ্যাঁ, ইবন জামরাকের কবিতায় জলের ব্যাপারটা বাদ দিলে যে রহস্যময়তা পড়ে থাকে সেটা  বুঝতে গেলেও একবার আলহামব্রা ঘুরে আসতে হবে। মুঘল কি অটোমানদের মতন নাসরিদদের প্রাসাদেও রহস্য রোমাঞ্চের রসদ কম ছিল না।

ফ্রয়েড এবং যে ছেলেটি ঘোড়াকে ভয় পেত

“হার্বার্টকে কি নিয়ে এলেই ভালো হত?” শুধোলেন ম্যাক্স, বড্ড অস্থির লাগছে তাঁকে।

মাথা নাড়লেন ফ্রয়েড, বন্ধুর অস্থিরতা দেখে তিনিও একটু বিচলিত “না এখনই ওকে সামনাসামনি না আনলেও চলবে। আর রাস্তাতেই যখন বেরোতে ভয় পাচ্ছে বাড়ির মধ্যেই থাকুক”।

ম্যাক্স হতাশ গলায় বললেন, “কিন্তু এর তো একটা বিহিত করা দরকার, প্রায় মানসিক অসুখের পর্যায়ে চলে গেছে ব্যাপারটা। বাড়ির মধ্যেও যখন থাকছে, ঘোড়ার ছবি দেখলেই বইয়ের পাতা বন্ধ করে দিচ্ছে। আমি সবসময় জানতে পারি না কিন্তু আমার স্ত্রী বেশ কয়েকবার এটা হতে দেখেছেন”।

“কিন্তু আপনি বলছিলেন না ঘোড়ার ছবি আঁকতে ও বেশ ভালোবাসে?”

মাথা নাড়লেন ম্যাক্স, “ঘোড়া নয়, জিরাফের ছবি এঁকেছে। এই যে, আমি নিয়েও এসেছি”।

হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিলেন ফ্রয়েড, পাঁচ বছরের হিসাবে বেশ কনফিডেন্ট ছোট্ট ছোট্ট স্ট্রোকে আঁকা ছবি। জিরাফের আউটলাইন টি খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ থমকে গেলেন, মুখ তুলে দেখলেন ম্যাক্স মাথা নাড়ছেন, “আমারও সবার আগে ওটা চোখেই পড়েছে কিন্তু। এবং আমার ধারণা এখানেই রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে”।

অধ্যাপক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।

“সিগমুন্ড, আমার ধারণা ঘোড়ার অস্বাভাবিক লম্বা যৌনাঙ্গই ওর ভয়ের কারণ; আমার স্ত্রীও এই থিয়োরীকে সমর্থন করেন। সেই ভয়ের কারণটাই এ ছবিতে ধরা পড়েছে, নাহলে ওর বয়সী ক’জন বাচ্চা জিরাফের যৌনাঙ্গটিকে এত প্রমিনেন্টলি আঁকবে? আমার মনে হয় এটাই কারণ, আপনার কাছে আসা এই ভয়কে কি ভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় সে নিয়ে জানতে”।

ফ্রয়েডকে চুপ করে থাকতে দেখে ম্যাক্স গ্রাফ আবারো বিচলিত হয়ে পড়লেন, “আপনার কি অন্য কিছু মনে হয়?”

ফ্রয়েড ছবিটা আবারো দেখছিলেন। দেখতে দেখতে বললেন, “না না, আপনি হয়ত ঠিকই বলছেন হের গ্রাফ, তবে আমি সমস্ত পরিস্থিতিটা খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি। আচ্ছা, আপনাদের একটি কন্যাসন্তান হয়েছে না সম্প্রতি?”

ম্যাক্সের মুখে এবারে মৃদু হাসি ফুটে উঠল, “হ্যাঁ, হানার বয়স এখন সাতদিন “। বলতে বলতে ম্যাক্স একটু থমকে গেলেন, ” হার্বার্টের এই ভয়টা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে ওর বোনকে দেখতে গিয়েও কাল নাকি ওর মাকে জিজ্ঞাসা করেছে বোনের ওই জায়গাটি কতদিনে বড় হয়ে উঠবে। এ তো যাকে বলে প্রায় হ্যালুসিনেশন”।

মাথা নাড়লেন ফ্রয়েড, “নাও হতে পারে। ক্লিটোরিসকে খুব ছোট পুরুষাঙ্গ অনেক বাচ্চা ছেলেই ভাবে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু এটা সত্যি যে কতদিনে সেটি বড় হয়ে উঠবে এমনতর ভাবনা চট করে বাচ্চাদের মাথায় আসে না”।

ম্যাক্সের দিকে তাকালেন ফ্রয়েড, “হয়ত আপনিই ঠিক, ম্যাক্স। কিন্তু আমি তাও একটু সময় চাই। কিন্তু এর মধ্যে যদি কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে তাহলে অবশ্যই জানাবেন”।

সে রাত্রে ম্যাক্সের লেখা পুরনো চিঠিপত্র ঘাঁটতে বসে ফ্রয়েডের নোটবই ভরে উঠল। একটি চিঠি বিশেষত বড়ই ভাবিয়ে তুলেছে তাঁকে – কয়েক সপ্তাহ আগে ম্যাক্সের স্ত্রী জানিয়েছেন স্নান করানোর সময় হার্বার্টকে তিনি বেশ কয়েকবার বকাবকি করেছেন নিজের যৌনাঙ্গে হাত দেওয়ার জন্য, মার বকুনি খেয়ে হার্বার্টের রীতিমতন অভিমান-ও হয়েছে।

আরো কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করলেন  ফ্রয়েড।

ইতিমধ্যে ম্যাক্স জানিয়েছেন নিজের কাজে খুব কম সময়েই বাড়িতে ছিলেন তিনি, কিন্তু একদিন সময় করে ছেলেকে নিয়ে চিড়িয়াখানা বেড়াতে গেছিলেন। হার্বার্ট শুধু ঘোড়া নয়, জিরাফ বা হাতিরা যে জায়গায় থাকে সেগুলো এড়িয়ে চলেছে। তাতে নিজের থিয়োরী নিয়ে ম্যাক্সের বিশ্বাস আরোই দৃঢ় হয়েছে।

উত্তর দিলেন ফ্রয়েড, “ম্যাক্স, আপনি একবার হার্বার্টকে জিজ্ঞাসা করুন ঘোড়া দেখে ওর ঠিক কেন ভয় হয়? এই সামান্য প্রশ্নটা হয়ত অনেক আগেই জিজ্ঞাসা করা দরকার ছিল”।

তিন দিনের মধ্যে ম্যাক্সের উত্তর এসে গেল, পাঁচ বছরের হার্বার্ট জানিয়েছে ঘোড়া দেখলেই তার মনে হয় ঘোড়ার কামড়ে সে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

ফ্রয়েডের চিঠি পেয়ে পরের সপ্তাহে ম্যাক্স দেখা করতে এলেন। হয়ত নিজের থিয়োরী নিয়ে বিশ্বাসটা জোরদার হওয়ার জন্যই আগের দিনের সেই অস্থিরতাটা আর নেই। ধূমায়িত কফির কাপ ম্যাক্সের হাতে তুলে দিতে দিতে ফ্রয়েড শুধোলেন, “কাজের জন্য আপনাকে বেশ ঘন ঘনই বাইরে যেতে হয়, তাই না?”

ম্যাক্স মাথা নাড়লেন, “সে আর বলতে, ইদানীং সেমিনার দেওয়ার  চাপটা বড় বেড়ে গেছে”।

“অবশ্যই”, হাসলেন ফ্রয়েড, “রেনেসাঁর সময়ে গানের বিবর্তন নিয়ে যে কাজটা করেছেন সেটা লোকে বহুদিন মনে রাখবে”।

ম্যাক্স-ও হাসছেন, “ধন্যবাদ সিগমুন্ড, ভাবতেও পারছি না এত ব্যস্ততার মধ্যেও বইটা পড়েছেন”।

“রেনেসাঁ চর্চা নিয়ে আমার নিজের-ও উৎসাহ আছে, কিছুদিন হল রেনেসাঁ ট্রাজেডি নিয়ে একটু মাথা ঘামাতে হচ্ছে। জানেন তো, গ্রীক ট্রাজেডিগুলোকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করা হয় রেনেসাঁ-র সময়েই”।

ইতিবাচক মাথা নাড়লেন ম্যাক্স, যদিও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না ফ্রয়েড কেন রেনেসাঁ নিয়ে পড়লেন হঠাৎ।

ফ্রয়েড বুঝতে পারছিলেন ম্যাক্সের মনের অবস্থাটা, স্টাডি টেবলে টোকা দিতে দিতে বললেন, “হের গ্রাফ, আপনার সমস্যার জন্যই রেনেসাঁ ট্র্যাজেডি নিয়ে ফের পড়তে হল”।

“আমার সমস্যার জন্য?”, ম্যাক্স চমকে তাকালেন।

হাত তুললেন ফ্রয়েড, “সে কথা পরে। আগে বলুন তো, ছেলের সঙ্গে আপনার কেমন সম্পর্ক? বাড়িতে যখন থাকেন তখন দুজনের কেমন সময় কাটে?”

ম্যাক্সের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল, “আমার তো মনে হয় আমি বোধহয় ওর সব থেকে ভালো বন্ধু। বাড়িতে না থাকলে ও যে কতটা মিস করে আমাকে সেটা আমি জানি। ওর দু’বছর বয়স থেকেই কতরকম যে খেলা খেলেছি ওর সঙ্গে, লুকোচুরি বলুন কি ঘোড়া-ঘোড়া……ওর ছবি আঁকার পার্টনার-ও তো আমি”।

ফ্রয়েড এর মধ্যে উঠে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যেন ব্যারগ্যাসে অ্যাভিনিউ দিয়ে হেঁটে চলা মানুষজনের দিকেই তাঁর লক্ষ্য। ম্যাক্স কথা থামিয়ে এখন ফ্রয়েডের দিকেই তাকিয়ে। ফ্রয়েড যেন খানিকটা আপনমনেই বলে উঠলেন, “এই যে এত মানুষ হেঁটে চলেছে ম্যাক্স কেউ আপনার মতন ভাগ্যবান নন”।

বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন হের গ্রাফ।

ফ্রয়েড ঘুরলেন, “হ্যাঁ, আপাতদৃষ্টিতে এটা একটা ট্র্যাজেডি-ই, আধুনিকতার বহিরাঙ্গে  ফিরে এসেছে  ধ্রুপদী এক ট্র্যাজেডি। কিন্তু ম্যাক্স, আজ আমরা ট্র্যাজেডিটা উদঘাটন করব বলেই আপনি ভাগ্যবান, আপনার ছেলেকে আরো হাজারখানা মানুষের মতন গভীর গোপন অভিশাপ নিয়ে রাস্তায় হেঁটে বেড়াতে হবে না”।

তাকিয়ে আছেন ফ্রয়েড, তাকিয়ে আছেন ম্যাক্সের দিকে।

“হের গ্রাফ, ঘোড়া নয়, আপনার ছেলে পৃথিবীতে একজনকেই ভয় পায়……”

ম্যাক্সের চোখের পলক পড়ছে না।

“সে আপনি”, একটু কি বিষণ্ণ হাসি হাসলেন ফ্রয়েড?

ম্যাক্স গ্রাফ দৃশ্যতই স্তম্ভিত, কথা বলতেও ভুলে গেছেন।

“গ্রীক ট্র্যাজেডির কথা বলছিলাম আপনাকে, রাজা ইডিপাসের কথা নিশ্চয় জানেন আপনি। রেনেসাঁর সময়ে যে নতুন বিশ্লেষণ করা হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এখন জানি  রাজা ইডিপাস একজন রহস্যময় চরিত্র। ভাগ্যের দুর্বিপাকে সে তার মাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল এতটা সহজ নয় ইডিপাসের গল্প, তার সমস্ত heroics এর পরেও মনে রাখবেন ইডিপাসের বাবা এবং মা দু’জনেই তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, তাঁর মা তো একাধিকবার। সারা জীবন বেঁচে থাকার শক্তি তার পরেও কি ভাবে পেয়েছিলেন ইডিপাস? দৈব শক্তি থাকলেও কার সঙ্গে ছিল, একজন সাহসী পুরুষের নাকি একজন হতভাগ্য আমআদমির? ”

চকিতে ম্যাক্সের দিকে তাকালেন ফ্রয়েড, “কিন্তু আপনি কি এই দুটোর একটা ভূমিকাতেও হার্বার্টকে দেখতে চান হের গ্রাফ?”

ধীরে ধীরে মাথা নাড়েন ম্যাক্স।

” ম্যাক্স, হার্বার্ট ঘোড়াকে অবশ্যই ভয় পায় কিন্তু সে ঘোড়া একটা প্রতীক মাত্র, হয়ত আপনার পিঠে চেপে খেলা করত বলেই ঘোড়াকেই অবচেতন মনে বেছে নিয়েছে হার্বার্ট”।

“কিন্তু আমি তো ওর কোনো অনিষ্ট করিনি, ওকে আমি প্রাণের থেকে ভালোবাসি”। হাহাকার করে ওঠেন ম্যাক্স।

মাথা নাড়েন ফ্রয়েড, “সে কথা হার্বার্ট-ও জানে আর তাই এখনো আপনি তার সব থেকে ভালো বন্ধু, এমনকি মা’র থেকেও কাছের মানুষ। কিন্তু তার অবচেতনে আপনার অস্তিত্ব শুধুমাত্র হার্বার্টকে তার মার থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য; প্রতিটিবার আপনি বিদেশ থেকে ফিরে আসেন, আর তাকে মার বিছানা থেকে সরে গিয়ে জায়গা নিতে হয় অন্য ঘরে, অন্য বিছানায়”।

রুদ্ধশ্বাসে শুনতে থাকেন ম্যাক্স গ্রাফ।

“হার্বার্টের ভয় অস্বাভাবিক লম্বা যৌনাঙ্গ নয়, ওর ভয় শিশ্নচ্ছেদে। প্রতিটিবার ঘোড়া বা জিরাফ বা হাতির যৌনাঙ্গ হার্বার্টের অবচেতনকে জানায় ওর বিপদ আসন্ন”।

“কি বলছেন প্রফেসর?”, ককিয়ে ওঠেন ম্যাক্স, “এ যে অবিশ্বাস্য”।

“অবিশ্বাস্য নয় ম্যাক্স, ওর অবচেতন যাকে শিশ্নচ্ছেদ ভাবছে সে আসলে ওর মা’র থেকে দূরে সরে যাওয়ার আসন্ন সম্ভাবনা। মনে করুন, আপনি চিঠিতে কি লিখেছিলেন? আপনার স্ত্রী ভেবেছিলেন বাচ্চা ছেলে নিজের খেয়ালে স্নানের সময় তার যৌনাঙ্গ নিয়ে খেলা করছে। তা তো নয় ম্যাক্স”।

“তবে? তবে কি?”

ফ্রয়েড এক মুহূর্ত থামেন, চকিতে দেখে নেন ম্যাক্সের বিস্ফারিত মুখটি, “এও অবচেতনের খেলা ম্যাক্স, হার্বার্টের অবচেতন দেখাতে চেয়েছে সে আপনার মতনই বয়স্ক পুরুষ। হার্বার্ট খেলা করেনি ম্যাক্স, সে দেখাতে চেয়েছিল নিজের পৌরুষ। মা’র প্রত্যাখানে তাই সে অস্বাভাবিক দুঃখ পেয়েছে”।

বিষণ্ণ, গম্ভীর মুখে বসে থাকেন ম্যাক্স, ফ্রয়েড বলে চলেন, “ভেবে দেখুন যতবার আপনি বা আপনার স্ত্রী বলেছেন ছোট্ট হানাকে বক পাখি ঝোলায় করে ফেলে গেছে হার্বার্ট মানতে চায়নি, সে জানে এটা বানানো গল্প। হয়তো নরনারীর যৌনসঙ্গমের ব্যাপারটি ঠিক কি ভাবে ঘটে তা আপনার ছেলে জানে না কিন্তু তার অবচেতন সবসময় জানিয়ে এসেছে হানাকে পৃথিবীতে আনার ব্যাপারে শিশ্নের একটা ভূমিকা আছে”।

“যবে থেকে হানা এসেছে হার্বার্টের মনে হয়েছে পৌরুষের প্রতিযোগিতায় কোথায় যেন সে হেরে গেছে, হ্যাঁ অবশ্যই অবচেতনে। তাই তড়িঘড়ি দেখে নিতে চেয়েছে বাড়িতে আসা নতুন প্রতিযোগীর কাছেও তার হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা। তাই বারংবার আপনাদের প্রশ্ন করেছে হানার যৌনাঙ্গ নিয়ে”।

“ইডিপাস কমপ্লেক্স হের গ্রাফ, আমি একে বলব ইডিপাস কমপ্লেক্স। যুগ যুগ ধরে এ কমপ্লেক্স কাজ করে এসেছে, প্রত্যেক বাবাই তাঁর অগোচরে নিজের ছেলের প্রতিযোগী হয়ে উঠেছেন”।

ম্যাক্স গ্রাফ যেন বিদ্রোহ করে উঠলেন, “কিন্তু প্রতিটি সমাজের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে, কিছু পবিত্র বন্ধন……”

“পবিত্রতার কথা এখানে অবান্তর ম্যাক্স”, বাধা দেন ফ্রয়েড, “আপনি সমাজের নিয়মের কথা বলছেন, কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম-ও তো আছে। আর সেই প্রকৃতির নিয়মেই আপনার ছেলের অবচেতন-ও খুব শীঘ্রই আপনাকে প্রতিযোগী হিসাবে ভাবা বন্ধ করবে। যতদিন সেটা না ঘটে ততদিন চেষ্টা করুন প্রকৃতির এই নিয়মগুলোকেই নিজের মতন করে হার্বার্টকে বোঝাতে, আর ভুলবেন না আপনি এখন-ও কিন্তু ওর সব থেকে প্রিয় মানুষ”।

ম্যাক্সের সঙ্গে আরো বেশ কিছু বছর ধরে আদানপ্রদান চলবে চিঠিপত্রর। শীঘ্রই ম্যাক্স জানাবেন বয়সে কিছু বড় একটি মেয়েকে ভালো লাগতে শুরু করেছে হার্বার্টের, ম্যাক্স-ও বন্ধুর মতনই শুনেছেন সেই ভালো লাগার কথা। ম্যাক্স এবং তাঁর স্ত্রী একসঙ্গে বসে ছেলেকে এও বুঝিয়েছেন ন’মাস ধরে কতটা যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় মায়েদের।

“জানতে চায়নি কেন কিভাবে এই যন্ত্রণার শুরু?” লিখলেন ফ্রয়েড।

“চেয়েছে তো”।

“কি বললেন?” প্রশ্ন পাঠালেন ফ্রয়েড

একটু দেরীতে উত্তর এল, ইতস্তত উত্তর, “জানালাম ঈশ্বরের ইচ্ছা হলে তবেই ঘটবে সব কিছু”।

উত্তর পড়তে পড়তে মুচকি হাসলেন আমাদের অধ্যাপক, তিনি বিলক্ষণ জানেন হার্বার্ট বিশ্বাস করেনি সে কথা। কিন্তু তিনি এও জানেন ঘোড়া দেখে আর কোনোদিনই ভয় পাবে না ছোট্ট হার্বার্ট।

(ফ্রয়েড কেসফাইলস এর বাকি গল্প – ফ্রয়েড এবং যে ছেলেটি ট্রেন চালাতে চেয়েছিল, ফ্রয়েড এবং ইঁদুর-মানুষ)

sigmund-freud