সুদিং এফেক্ট, সুধীন এফেক্ট

বছর কয়েক আগে ফেসবুকের সুধীন দাশগুপ্ত কমিউনিটিতে কেউ একজন ‘সাগর ডাকে’ গানটি নিয়ে লিখছিলেন, কথা প্রসঙ্গে জানালেন সুরকার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় সুধীনের সুরারোপিত এই গানটি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন গানের কথাকে বেস ধরে সুধীন কি চমৎকার একটা আবহ তৈরী করেছেন। ‘জীবন সৈকত’ এর সব গানই সুধীনের নিজের লেখা, যদিও সেটা হয়তো খুব প্রাসঙ্গিক নয় এ আলোচনায়।  আশা গাইছেন ‘সাগর ডাকে আয় আয় আয়……”, ‘সাগর’ থেকে ‘আয় আয়’ পথটুকু চড়া থেকে খাদে নেমে আসা, এই অবধিই। সুধীন কিন্তু এই সাগরের রেফারেন্সেই একটা চমৎকার এফেক্ট নিয়ে এলেন, ‘সাগর’ কে বিশাল একটা ঢেউয়ে তুলে ‘আয় আয়’ কে ভাসিয়ে নিয়ে এলেন ছোট ছোট ভেঙ্গে যাওয়া স্রোতে – ঠিক যেন বহু দূর থেকে বড় ঢেউটা এসে ভেঙ্গে ভেঙ্গে লুটিয়ে পড়ছে বালুতীরে। এত ভালো লেগেছিল বিশ্লেষণটা কি বলব, এখন ইউটিউবে গানটা দেখতে বসলে সৌমিত্র আর অপর্ণারা চোখে ধরা পড়েন না, বরং খুঁজতে থাকি সত্যিই ঢেউ এসে পারে ভেঙ্গে পড়ছে কিনা।

এবারের বইমেলায় হাতে এল অভিজিৎ-এরই লেখা একটি বই ‘গানের গল্প, গল্পের গান’ (প্রকাশক – আজকাল, ২০১৪)। আর সেই বই পড়তে গিয়েই এই সুধীন এফেক্টের কথায় ফিরে গেলাম। অভিজিৎ লিখছেন “আবহসঙ্গীত রচনার সময় বা গানে orchestration করার সময় সলিলদা যেমন out and out symphonic, সুধীনদা তা নয় – তিনি effect-এ বেশি বিশ্বাসী”। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অভিজিৎ একটি উদাহরণ-ও দিয়েছেন, “সুধীনদা উৎপলা সেনের গান করলেন ‘পথের ধারে মুক্তো আমি ছড়িয়ে দিলাম’ – কথাটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই accordion এর একটা swell আছে – যেন মুক্তোগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হল। কিন্তু সেই মুক্তোয় কেউ মালা গাঁথল না…”।

‘সাগর ডাকে’ তো মাথায় ঢুকেই ছিল, এবার ‘পথের ধারে মুক্তো আমি ছড়িয়ে দিলাম’ মন দিয়ে শুনে কৌতূহল হল – আর কোন কোন গানে সুধীন গানের কথার রেফারেন্সে এতটা এক্সপ্লিসিট এফেক্ট তৈরী করেছেন? খুঁজতে গিয়ে যা পেলাম তাতে মনে হল একে আর শুধু এফেক্ট বলা যাবে না, সুধীনের গানের প্রসঙ্গে এই এফেক্টকে বোধহয় ‘মোটিফ’ বলাই উচিত।

এরকমই কিছু গান সাজিয়ে দিলাম সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠক-পাঠিকা দের জন্য, আরো কিছু মনে পড়লে অবশ্যই জানিয়ে যাবেন।

১। ‘সাতরঙা এক পাখি’ (কন্ঠ – প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, কথা – সুবীর হাজরা)

“সাতরঙা এক পাখি, পাতার ফাঁকে ডালে ডালে করছে ডাকাডাকি” –  বাঁশি আর Rattle জাতীয় যন্ত্রানুসঙ্গে সুধীন সাতরঙা পাখিটির ডাকটিকে মোক্ষম ধরেছেন, প্রতিমার গলা কানে পৌঁছনোর আগেই কিন্তু সে ডাক শুনে ফেলেছেন আপনি। এবং খানিকটা ইচ্ছাকৃত ভাবেই হয়ত এমন টাইম গ্যাপে এ ডাক ফিরে ফিরে এসেছে, মনে হচ্ছে পাতার ফাঁকে ফাঁকেই মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে সে পাখি।

২। ‘অন্ধকারকে ভয় করি’ (কন্ঠ – বনশ্রী সেনগুপ্ত, কথা – সুধীন দাশগুপ্ত)

এখানেও প্রিল্যুডেই রহস্যজনক অন্ধকারকে ধরে ফেলেছেন সুধীন – যে অন্ধকারকে ভয় করি, তাকে চেনানোর জন্য একটা আনক্যানি এফেক্ট নিয়ে এসেছেন সুধীন। প্রায় প্রতিবার যখনই ‘অন্ধকার’ শব্দ হয়ে শ্রোতার মর্মমূলে পোঁছতে চেয়েছে, তার আগেই ছড় শিউরে শিউরে উঠেছে।

৩। ‘চিৎকার চেঁচামেচি মাথাব্যথা’ (কন্ঠ – অমিত কুমার, কথা – পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়)

কলকাতার ট্র্যাফিক নিয়ে যখন গান, সুধীন যে রিক্সার ভেঁপু, ট্যাক্সির হর্ন ব্যবহার করবেন তাতে আর আশ্চর্য কি? কিন্তু সেখানেই সুধীন থামেননি, কোরাসে আসা ‘কলকাতা’র ধরতাই নিয়ে সুধীন একটা জলি মুড গড়ে তুললেন যন্ত্রবাদ্যে, আর সেই টিং টিং শব্দটাই একটু পরে বদলে গেল ট্রামের আওয়াজে। আর তার পরেই অমিত কুমার ধরবেন, “আমি লাইনেতে বাঁধা ট্রাম, টিকি বাঁধা তারে/ বেলাইনে চলে যাই শুধু বারে বারে”।

৪। ‘এই শহরে এই বন্দরে’ (কন্ঠ – শ্যামল মিত্র, কথা – সুধীন দাশগুপ্ত)

মনে করুন যেন একটা নয়্যার সিনেমা দেখছেন, রাত্রের শহরকে চিনতে বেরিয়ে পড়েছে নায়ক বা অ্যান্টিহিরো – আলোকোজ্জ্বল শহরে পশরা সাজিয়ে বসেছে হরেক দোকান, রেস্তরাঁ আর বারে ভিড় করছেন সুবেশ মানুষগুলি, সুর এবং সুরার মহোৎসব এর মধ্যেও দর্শক টের পাচ্ছেন কিসের যেন অভাব, আমাদের অ্যান্টিহিরোর-ও কোথায় যেন অস্থিরতা। এবার চোখ বন্ধ করে শুনুন, “এই শহরে এই বন্দরে, খুঁজেছি কত নিশিদিন ধরে”…মহানগরীকে আপনার চিনতে একটুও ভুল হবে না কারণ শ্যামল শুরু করার আগেই সুধীন মঞ্চ তৈরী করে ফেলেছেন, রাতের উত্তেজনা এমন এক ক্লাইম্যাক্সে শেষ হচ্ছে মনে হবে আপনার চোখের সামনেই কোনো মিস শেফালি তাঁর নাচ শেষ করে উঠলেন।

৫। ‘হারিয়ে যেতে যেতে, অজানা সঙ্কেতে, ছাড়িয়ে গেছি সে পথ’ (কন্ঠ – আরতি মুখোপাধ্যায়, কথা – সুধীন দাশগুপ্ত)

আগের গানে একটি কল্পিত থ্রিলারের কথা বলেছিলাম। ‘হারিয়ে যেতে যেতে’ যে ছবির গান সেটি কিন্তু আসলেই থ্রিলার, হলিউডের ব্লকবাস্টার হিট ‘শারাড’ (১৯৬৩) অবলম্বনে ১৯৬৮ তে তৈরী হয় ‘কখনো মেঘ’। আর সিনেমাটির সার্বিক রহস্যময়তাই যেন ধরা পড়েছে শুরুই এই গানে – চতুর্দিকে পাহাড়, অঞ্জনা ভৌমিকের চোখের সামনে থেকে আস্তে আস্তে কুয়াশা সরে যাচ্ছে, আর কুয়াশার মধ্যেই থেকেই হঠাৎ দেখা দেবেন ছদ্মবেশী উত্তমকুমার। সুধীনের আবহসঙ্গীত-ও তাই বেশ ঢিমে তালেই শুরু হচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে যাচ্ছে; আর তারপরেই উত্তুঙ্গ ক্লাইম্যাক্স, রূপোলী পর্দাতেও দেখতে পেলেন অঞ্জনার চোখের সামনে এতক্ষণে গিরিরাজ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছেন, ‘কখনো মেঘে ঢাকা’ থেকে ‘কখনো আলো মাখা’ তে উত্তোরণ।

৬। ‘এই ঝির ঝির বাতাসে’ (কন্ঠ – ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, কথা – সুধীন দাশগুপ্ত)

আবারো সুধীনের নিজের কথা, আবারো প্রিল্যুডে কারিকুরি – বেহালার ছড়ে স্পষ্টতই হাওয়ার রেশ, ঝির ঝির হাওয়াতেই যেন কেঁপে উঠছে।

৭। ‘নাচে নাচে পুতুল নাচে’ (কন্ঠ – আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, কথা – সুধীন দাশগুপ্ত)

‘পুতুল নেবে গো’ র মতন জনপ্রিয় হয়ত এ গান হয়নি কিন্তু সুধীনের সুরের জাদুতে ‘শোন রে খুকু শোন রে খোকা, নাচ দেখাবে শূর্পণখা’ নেহাত ছেলেভুলনো গল্পকথা হয়ে থাকে না, হারমোনিয়মের বেলো আর ক্ল্যারিওনেটের ছোঁয়ায় ঠিক একটা লোকনৃত্যর ফর্ম পেয়ে যায়।  ‘কুম্ভকর্ণ দিচ্ছে ঘুম, ঘুম ভাঙ্গাবার লাগলো ধুম’ এ আক্ষরিক অর্থেই ট্রাম্পেট ব্যবহার করে সুধীন হাসাতে পেরেছেন নেহাত কচিকাঁচাদের-ও। অথবা ধরুন, ‘ওই কেমন মজা রাবণ রাজা, যেমন কর্ম তেমনি সাজা’র পরেই সুধীন যেন নিয়ে আসতে চেয়েছেন বিবেকের মতন কোন চরিত্রকে, তাই বাদ্যসঙ্গতে-ও ‘ঠিক হয়েছে, বেশ হয়েছে’ বোল।

ষাটের কাছাকাছি চলচ্চিত্রে সুর দিয়েছেন সুধীন, শতাধিক বাংলা আধুনিক গানের-ও তিনি সুরকার – আরো মণিমুক্তো নিঃসন্দেহে লুকিয়ে আছে। পরের বার চেনা গানে সুধীনকে ফিরে পেলে, অচেনা গানের সুর সুধীন-সুধীন ঠেকলে কান খাড়া করে থাকবেন তো একটু।

Advertisements