খন্ডহর

জমাট বাঁধা অন্ধকার, মুষলধারে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। গাড়ির মধ্যে বসে থরথর করে কাঁপছে ছেলেমেয়ে গুলো। তানি প্রায় ধরা গলায় ফিসফিসিয়ে উঠল, “এবার কি হবে রে? দ্যাখ, হাতটা কি বিশ্রীরকমের ঠান্ডা হয়ে গেছে”। তানির বাঁদিকে বসে আছে পাপ্পু, ডান হাতের সব কটা আঙ্গুল দিয়ে ঢেকে রেখেছে চোখ আর মাঝে মাঝে দু’আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে। পাপ্পুর-ও বাঁদিকে বসে রুইয়া, টেনশনে সিট থেকে প্রায় আধঝোলা হয়ে রয়েছে আর মাঝে মাঝেই ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে তানিকে বলছে, “চুপ করবি তুই?” ডাইনোসরের বিশাল জ্বলজ্বলে চোখটা গাড়ির জানলার কাঁচে সেঁটে যেতেই অবশ্য তিনজনেই চিৎকার করে উঠল, এতক্ষণের দম বন্ধ করা সাসপেন্স একটা পরিণতি পেয়েছে, রিলিফ! প্রোজেকটরের ঘড়ঘড়ে আওয়াজটা ভেসে আসছে এখনো, কিন্তু এবারে বোধহয় একটু ঘাড় ঘোরানো যায়। রুইয়া ডানদিকে তাকাল – ফুলতলা খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে হলঘরের বাইরে টেবল পাতছে, পেছনের কিচেন থেকে অস্ফুট টুংটাং শব্দ এখানেও এসে জানান দিচ্ছে বিকাল নয় সন্ধ্যাটাই আসল। রুইয়া জানে আরেকটু পরেই মৌভান্ডার থেকে তাজমহল (হ্যাঁ, তাজমহল) পাপ্পু যাকে বলে ‘লাল-নীল জল’ সেই নিয়ে এসে পৌঁছবে। তারপর ফুলতলার ব্যস্ততা আরো বাড়বে, সাহেবদের সবার পছন্দ মনে রেখে টেবল সাজানো খুব সহজ কাজ নয়। তানিকে সিনেমা শেষ হলে জানাতে হবে, তাহলেই ও বলবে “চ, একটু দাঁড়িয়ে যাই”। তারপর পাপ্পুর দিকে তাকিয়ে হি-হি করে হেসে বলবে, “ওই দ্যাখ, তোর লাল নীল জল”। তারপর দু’জনে মিলে পাপ্পুকে নিয়ে পড়বে, “বল্ মদ, বল্”। পাপ্পু পান্ডে বাড়ির ছেলে, হাজার র‍্যাগিং-এও লাল-নীল জল ছেড়ে কিছু বলবে না, খালি  পরিস্থিতি খুব অসহ্য হয়ে উঠলে মুখটা নামিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে। এই চলবে, যতক্ষণ না কোম্পানির ড্রাইভার এসে তাড়া লাগাবে ওদের। তার-ও আজকে প্রচুর কাজ, গাড়ি অনেক কটাই কিন্তু সাহেবদের ছেলেমেয়েদের পৌঁছে দিয়ে আবার সাহেব আর সাহেবদের বৌদের নিয়ে আসতে হবে তো। তারপর একমাস ধরে পোস্টার পড়েছে মৌভান্ডার, মোসাবনী, সুরদা এমনকি ঘাটশিলা স্টেশনের কাছে কোম্পানির যে গেস্টহাউসটা আছে সেখানেও – ইন্টারন্যাশনাল সিনে ক্লাব আজকে ‘চারুলতা’ দেখাবে। স্পেশ্যাল স্ক্রীনিং বলে কথা, কনভেন্ট আর কে-ভি স্কুলের টিচার রাও অনেকে আসবেন হয়ত, কে জানে কোম্পানীর একে তাকে ধরে তাঁরাও হয়ত গাড়ি ম্যানেজ করেছেন।

শাটারের শব্দে একটু চমকে উঠেছে রুইয়া, অপু এতক্ষণে একটা ফটো নিতে পেরেছে। পেছনের জঙ্গলে এক ভদ্রলোক ঘটি হাতে বাহ্যিতে যাচ্ছিলেন বোধহয়, ভরদুপুরে রুইয়াদের দেখে তিনি আর নড়তে চান না। এদিকে অপু যে ক্যামেরা ফোকাস করে দাঁড়িয়ে আছে, সে কথা জানায় কে? হঠাৎ মনে পড়ল ইন্টারন্যাশনাল সিনে ক্লাবে অবশ্য হলিউড ছাড়া অন্য কোনো দেশের সিনেমা কস্মিনকালেও আসেনি, যেটা শোনা ইস্তক অপু বেজায় খেপিয়েছে। কিন্তু এ চত্বরে ঢোকা থেকে অপু একটু চুপচাপ। রুইয়া কাঁধে হাত রাখে, “পছন্দ হয়নি বুঝি জায়গাটা ?”। অপু মাথা নাড়ে দু’দিকে, “অপছন্দ নয় মন খারাপ”। রুইয়া হাসে, এতদিনে চিনে গেছে অপুকে।

g1

বেশী লম্বা সিনেমা চললে পাপ্পু একটু অধৈর্য হয়ে পড়ে, উসখুশ করতে থাকে, এদিক ওদিকে চায়। বৃষ্টির রাতে ডাইনোসরদের তান্ডব-ও ওর মনকে এক জায়গায় বেঁধে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। কনুই দিয়ে এক ঠ্যালা মারে রুইয়া কে, “রু দিদি,  উপর কি ইয়ে লাইট কাহাঁ সে আ রহি হ্যায়?”। রুইয়া এর মধ্যে পাপ্পুর সঙ্গে জায়গা চেঞ্জ করে তানির পাশে এসে বসেছিলেন, জুরাসিক যুগের প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের দেখার পাশাপাশি জেনে নিচ্ছিল সিদধারথ ভাইয়া সঞ্চিতাকে আর চিরকুট পাঠিয়েছে কিনা। এসব ইন্টারেস্টিং ডিসকাশনের মধ্যে বাঁদরটার জ্বালাতনে ভারী রাগ হয়ে গেল ওর, মুখ ভেংচে বলল, “বুদ্ধু, প্রোজেক্টরকে বারে মে নহি শুনা হ্যায় কেয়া?”। আরো কিছু প্রশ্ন ছিল বোধহয় পাপ্পুর, রু দিদির ধাতানি খেয়ে চুপ করে গেল। তানি এদিকে চমটি কাটছে, “তারপর শোন না, অভয় ভাইয়া নাকি লাস্ট মনডে পূর্ণাপানি গেছিল, ওখানে নাকি সিদধারথ আর সঞ্চিতা কে হাত ধরাধরি করে বসে থাকতে দেখেছে ঝোরার পাশে”। বলে আবার হি হি করে হাসতে লাগল, “কিন্তু কাউকে বলতে পারছে না। কেন বল তো? অভয় নাকি সিগারেট খেতে খেতে ঝোরাতে টয়লেট করছিল, উলটো দিকের কেন্দু গাছের নিচেই যে সঞ্চিতারা বসে আছে সেটা খেয়াল করে নি – আমাকে জানিস তো সঞ্চিতা-ই বলল”। পূর্ণাপানি বড় প্রিয় জায়গা রুইয়ার – ঝোরাটা অবশ্য নামেই ঝোরা, মোস্ট অফ দ্য টাইম তিরতিরে নালা হয়ে বয়ে চলে। আর দু পাশে শাল, কেন্দুর জঙ্গল – গ্রীষ্মের বিকাল হোক কি শীতের দুপুর, পূর্ণাপানির পাশে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারে ও। অবশ্য সে সুযোগ কদাচিৎ মেলে কিন্তু অভয় ভাইয়ার ওপর বেজায় রাগ হল শুনে, এ কি অসভ্যতা। বাঁদিকে তাকিয়ে দেখল পাপ্পু চুপ করে সিনেমা দেখছে, ওর চুলটা একটু ঘেঁটে দিল। পাপ্পু জানে এবার রুইয়া দিদির সঙ্গে আবার কথাবার্তা চালানো যাবে, একগাল হেসে বলল, “রু দিদি, মুঝে বড়ে হো কর প্রোজেকটর-ম্যান বননা হ্যায়”।

“রুইয়া এ দিকে দেখো, এ দিকে” – চিৎকার করছে অপু। রুইয়া তাকাতে ওপরের দিকে ইশারা করে বলল, “এখান থেকেই বোধহয় প্রোজেকটর অপারেট করত, তাই না?”। রুইয়া ইতিবাচক মাথা নাড়ে, পাপ্পু কোথায় আছে যেন? আরে তাই তো, ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায়। ক’দিন আগেই ফেসবুকে দেখছিল সফদর হাশমির কোন একটা প্রোডাকশনে ওর কাজ খুব প্রশংসা পেয়েছে। পাপ্পু লাস্ট কবে এসেছে সুরদা? পাপ্পুর সব ভাই বোন জামশেদপুরে থাকে তাই হিন্দুস্থান কপার উঠে যাওয়ার পরেও ওর বাবা রয়ে গেছেন এখানে। কবেই তো কোম্পানি প্রাইভেট হয়ে গেছে, হিন্দুস্থান কপারের রমরমা ছেড়েই দাও, তিন চার মাস করে স্যালারি বাকি থাকাটাই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার এখন। পান্ডে আঙ্কল রাজস্থান চলে গেছিলেন, আবার ফিরে এসেছেন সুরদা। কিন্তু কোম্পানির বাংলোয় এখন আগাছা ভর্তি, সারি সারি বাংলো ফাঁকা – আজকে ঘুরতে গিয়ে তো একটা বাংলোর পাশে সাপের খোলস-ও পড়ে থাকতে দেখল, আরেকটা বাংলোর ভাঙ্গা জানলার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল সারি সারি দেশী ধান্যেশ্বরীর বোতল। পাপ্পু আসে? দেখেছে ওর সাধের প্রোজেকশন রুমের অবস্থা?

g2

 

“সিনে ক্লাবের দরজাও খুলে নিয়ে গেছে দেখছি”। রুইয়া দেখেছে আগেই, দরজার বদলে সারি সারি কার্ডবোর্ডের টুকরো। পাঁচ-ছ বছর আগেই শুনেছিল বাংলোর দরজা জানলা খুলে নিয়ে চলে গেছে, কিন্তু মোসাবনীর কেন্দ্রে থেকে যাওয়া সিনে ক্লাবের-ও যে এক দশা হবে সেটা ভাবতে পারেনি। কার্ডবোর্ডের সারির ওপরেই কে আবার মেরে দিয়ে গেছে আগত সাঁওতালি সিনেমার পোস্টার – কেউ ভুলেও এ তল্লাটে পা মাড়ায় না যদিও কিন্তু সুরদা, ঘাটশিলার আদি বাসিন্দাদের কারো কারো মনে এখনো হয়ত সিনে ক্লাবের স্মৃতি অক্ষত। আশাদোলন, আশাদোলন……জন্মে দেখা হবে না এ সিনেমা কিন্তু রুইয়া জানে নামটা মনে থেকে যাবে ঠিক যেমন রয়ে গেছে মৌভান্ডার, মোসাবনী, পূর্ণাপানি, ফুলডুংরি, যাদুগোড়া…সারি সারি লিরিক্যাল শব্দ, সারি সারি মন খারাপ করা ছবি।

g3

“এবারে আর জামশেদপুর যেতে পারছি না।” তানির কথায় মনে পড়ল আর তিন সপ্তাহ পরেই পিকনিক, মৌভান্ডারের গ্রুপ অবশ্য এতে যাবে না, শুধুই সুরদা। পাঁচ-ছ টা  গাড়িতে চেপে দু পাশের শাল, ইউক্যালিপটাসের জঙ্গল দেখতে দেখতে যাওয়া – মাঝে মাঝে গুলমোহর চোখে পড়লেই সব হৈ হৈ করে উঠবে। গুলমোহর নিয়ে সবারই দুর্বলতা, এমনকি পেছনের গাড়ির ওভারটেক করে গেলেও তখন কেউ মাইন্ড করবে না। রাখা মাইনস পড়বে, তারপর আসবে যাদুগোড়া, তারপর সেই রঙ্কিণী দেবীর মন্দিরে গিয়ে থামা – তুমি পুজো নিতে না চাইলেও গাড়ি একটুক্ষণের জন্য থামাতেই হবে। অবশ্য এ গ্রুপের সবাই রঙ্কিণী দেবীর বড় ভক্ত, পুজো ঠিকই দেবে। একবার তো মন্দিরের পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে সামনের পাহারটার চুড়োয় উঠেছিল সবাই, সেখানেও আছে একটা ছোট্ট মন্দির। তারপর পুজো টুজো দিয়ে সোজা পাকা রাস্তা ধরে জামশেদপুর – ডিমনা লেক, জুবিলী পার্ক। রুইয়া বলল, “চ, বুড়ুডি ড্যাম যাই এবার”। তানি ভারী হতাশ, “তুই যা, বুরুডি আমার বার দশেক ঘোরা”। পাপ্পু দাঁত দিয়ে নখ কাটছিল, বলল, “ড্রাইভার আঙ্কল সে পুছতে হ্যায় না…”, রুইয়া চোখ পাকিয়ে বলল, “তুই থামবি? কোথায় যাব সেটা আমরা ঠিক করব”। তানির অবশ্য পাপ্পুর কথাটা পছন্দই হয়েছে, এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজছে ড্রাইভারকে। গেটের সামনে অগুন্তি গাড়ির ভিড়, তার মধ্যে ওদের গাড়ি কোথায়? সিনেমা তো বেশ কিছুক্ষণ ভেঙ্গেছে।

সত্যজিৎ তখনো প্রবাসী বাঙ্গালীদের ঘাড় ধরে নিয়ে আসতেন, তাই সিনে ক্লাবের অ্যাটেনডান্সে কমতি পড়লেই হয় ‘চারুলতা’ নয় ‘জন অরণ্য’-র আবির্ভাব। বাঙ্গালীদের পাল্লায় পড়ে চলে আসতেন অনেক মিশ্রা, শর্মা, পান্ডে, সেনাপতিরাও। তবে ‘সোনার কেল্লা’ কি ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ হলে জমত না, বাচ্চাদের বেশী পছন্দ ‘ছোটা চেতন’। ওয়ার্কারদের জন্যও ছিল একটা ক্লাব, সেখানকার খবর মাঝে মাঝে পাওয়া যেত ক্লাসের ছেলেমেয়েদের থেকে। দীনেশ মাঝে মাঝে যেত বাবার সঙ্গে, এসে সুর করে করে শোনাত ‘টিপ টিপ বরসা পানি’ কি ‘ দিল জিগর নজর কেয়া হ্যায়”। অপু বহুবার পেছনে লেগেছে, “বাঙ্গালী আছে আর ক্লাস ডিফারেন্স থাকবে না তাও কি হয়?” সেটা হক কথা যদিও, মোসাবনীর সিনে ক্লাবে ওয়ার্কাররা পারতপক্ষে ঢুকতে পারত না। সে নিয়ে কস্মিনকালেও কেউ প্রতিবাদ জানায়নি অবশ্য, এটাই স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছিল সবাই। “গাড়িটা কোথায় রেখেছে? এর পর রঙ্কিণী মন্দির……তাই তো?” অপু খুঁজতে গেল, রুইয়া দাঁড়িয়ে আছে সিনে ক্লাবের দরজার সামনে। সেই চেনা লাল-হলুদ রঙ, কিন্তু যেন বিবর্ণ হয়ে আসছে রঙগুলো। মন খারাপ নয়, একটা আপাত-উদাসীনতা ছেয়ে রয়েছে। সিনে ক্লাব নিয়ে ভেবে লাভ কি, যেখানে টাউনশিপটাই আর রইল না। বা হয়তো রইল-ও, ধুলো পড়া বাঙ্গালী মিষ্টির দোকান, শুকিয়ে যাওয়া সুবর্ণরেখা আর বন্ধ হয়ে যাওয়া খনির রাশিরাশি মেশিনস নিয়ে।

g4

Advertisements