সুদিং এফেক্ট, সুধীন এফেক্ট

বছর কয়েক আগে ফেসবুকের সুধীন দাশগুপ্ত কমিউনিটিতে কেউ একজন ‘সাগর ডাকে’ গানটি নিয়ে লিখছিলেন, কথা প্রসঙ্গে জানালেন সুরকার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় সুধীনের সুরারোপিত এই গানটি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন গানের কথাকে বেস ধরে সুধীন কি চমৎকার একটা আবহ তৈরী করেছেন। ‘জীবন সৈকত’ এর সব গানই সুধীনের নিজের লেখা, যদিও সেটা হয়তো খুব প্রাসঙ্গিক নয় এ আলোচনায়।  আশা গাইছেন ‘সাগর ডাকে আয় আয় আয়……”, ‘সাগর’ থেকে ‘আয় আয়’ পথটুকু চড়া থেকে খাদে নেমে আসা, এই অবধিই। সুধীন কিন্তু এই সাগরের রেফারেন্সেই একটা চমৎকার এফেক্ট নিয়ে এলেন, ‘সাগর’ কে বিশাল একটা ঢেউয়ে তুলে ‘আয় আয়’ কে ভাসিয়ে নিয়ে এলেন ছোট ছোট ভেঙ্গে যাওয়া স্রোতে – ঠিক যেন বহু দূর থেকে বড় ঢেউটা এসে ভেঙ্গে ভেঙ্গে লুটিয়ে পড়ছে বালুতীরে। এত ভালো লেগেছিল বিশ্লেষণটা কি বলব, এখন ইউটিউবে গানটা দেখতে বসলে সৌমিত্র আর অপর্ণারা চোখে ধরা পড়েন না, বরং খুঁজতে থাকি সত্যিই ঢেউ এসে পারে ভেঙ্গে পড়ছে কিনা।

এবারের বইমেলায় হাতে এল অভিজিৎ-এরই লেখা একটি বই ‘গানের গল্প, গল্পের গান’ (প্রকাশক – আজকাল, ২০১৪)। আর সেই বই পড়তে গিয়েই এই সুধীন এফেক্টের কথায় ফিরে গেলাম। অভিজিৎ লিখছেন “আবহসঙ্গীত রচনার সময় বা গানে orchestration করার সময় সলিলদা যেমন out and out symphonic, সুধীনদা তা নয় – তিনি effect-এ বেশি বিশ্বাসী”। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অভিজিৎ একটি উদাহরণ-ও দিয়েছেন, “সুধীনদা উৎপলা সেনের গান করলেন ‘পথের ধারে মুক্তো আমি ছড়িয়ে দিলাম’ – কথাটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই accordion এর একটা swell আছে – যেন মুক্তোগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হল। কিন্তু সেই মুক্তোয় কেউ মালা গাঁথল না…”।

‘সাগর ডাকে’ তো মাথায় ঢুকেই ছিল, এবার ‘পথের ধারে মুক্তো আমি ছড়িয়ে দিলাম’ মন দিয়ে শুনে কৌতূহল হল – আর কোন কোন গানে সুধীন গানের কথার রেফারেন্সে এতটা এক্সপ্লিসিট এফেক্ট তৈরী করেছেন? খুঁজতে গিয়ে যা পেলাম তাতে মনে হল একে আর শুধু এফেক্ট বলা যাবে না, সুধীনের গানের প্রসঙ্গে এই এফেক্টকে বোধহয় ‘মোটিফ’ বলাই উচিত।

এরকমই কিছু গান সাজিয়ে দিলাম সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠক-পাঠিকা দের জন্য, আরো কিছু মনে পড়লে অবশ্যই জানিয়ে যাবেন।

১। ‘সাতরঙা এক পাখি’ (কন্ঠ – প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, কথা – সুবীর হাজরা)

“সাতরঙা এক পাখি, পাতার ফাঁকে ডালে ডালে করছে ডাকাডাকি” –  বাঁশি আর Rattle জাতীয় যন্ত্রানুসঙ্গে সুধীন সাতরঙা পাখিটির ডাকটিকে মোক্ষম ধরেছেন, প্রতিমার গলা কানে পৌঁছনোর আগেই কিন্তু সে ডাক শুনে ফেলেছেন আপনি। এবং খানিকটা ইচ্ছাকৃত ভাবেই হয়ত এমন টাইম গ্যাপে এ ডাক ফিরে ফিরে এসেছে, মনে হচ্ছে পাতার ফাঁকে ফাঁকেই মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে সে পাখি।

২। ‘অন্ধকারকে ভয় করি’ (কন্ঠ – বনশ্রী সেনগুপ্ত, কথা – সুধীন দাশগুপ্ত)

এখানেও প্রিল্যুডেই রহস্যজনক অন্ধকারকে ধরে ফেলেছেন সুধীন – যে অন্ধকারকে ভয় করি, তাকে চেনানোর জন্য একটা আনক্যানি এফেক্ট নিয়ে এসেছেন সুধীন। প্রায় প্রতিবার যখনই ‘অন্ধকার’ শব্দ হয়ে শ্রোতার মর্মমূলে পোঁছতে চেয়েছে, তার আগেই ছড় শিউরে শিউরে উঠেছে।

৩। ‘চিৎকার চেঁচামেচি মাথাব্যথা’ (কন্ঠ – অমিত কুমার, কথা – পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়)

কলকাতার ট্র্যাফিক নিয়ে যখন গান, সুধীন যে রিক্সার ভেঁপু, ট্যাক্সির হর্ন ব্যবহার করবেন তাতে আর আশ্চর্য কি? কিন্তু সেখানেই সুধীন থামেননি, কোরাসে আসা ‘কলকাতা’র ধরতাই নিয়ে সুধীন একটা জলি মুড গড়ে তুললেন যন্ত্রবাদ্যে, আর সেই টিং টিং শব্দটাই একটু পরে বদলে গেল ট্রামের আওয়াজে। আর তার পরেই অমিত কুমার ধরবেন, “আমি লাইনেতে বাঁধা ট্রাম, টিকি বাঁধা তারে/ বেলাইনে চলে যাই শুধু বারে বারে”।

৪। ‘এই শহরে এই বন্দরে’ (কন্ঠ – শ্যামল মিত্র, কথা – সুধীন দাশগুপ্ত)

মনে করুন যেন একটা নয়্যার সিনেমা দেখছেন, রাত্রের শহরকে চিনতে বেরিয়ে পড়েছে নায়ক বা অ্যান্টিহিরো – আলোকোজ্জ্বল শহরে পশরা সাজিয়ে বসেছে হরেক দোকান, রেস্তরাঁ আর বারে ভিড় করছেন সুবেশ মানুষগুলি, সুর এবং সুরার মহোৎসব এর মধ্যেও দর্শক টের পাচ্ছেন কিসের যেন অভাব, আমাদের অ্যান্টিহিরোর-ও কোথায় যেন অস্থিরতা। এবার চোখ বন্ধ করে শুনুন, “এই শহরে এই বন্দরে, খুঁজেছি কত নিশিদিন ধরে”…মহানগরীকে আপনার চিনতে একটুও ভুল হবে না কারণ শ্যামল শুরু করার আগেই সুধীন মঞ্চ তৈরী করে ফেলেছেন, রাতের উত্তেজনা এমন এক ক্লাইম্যাক্সে শেষ হচ্ছে মনে হবে আপনার চোখের সামনেই কোনো মিস শেফালি তাঁর নাচ শেষ করে উঠলেন।

৫। ‘হারিয়ে যেতে যেতে, অজানা সঙ্কেতে, ছাড়িয়ে গেছি সে পথ’ (কন্ঠ – আরতি মুখোপাধ্যায়, কথা – সুধীন দাশগুপ্ত)

আগের গানে একটি কল্পিত থ্রিলারের কথা বলেছিলাম। ‘হারিয়ে যেতে যেতে’ যে ছবির গান সেটি কিন্তু আসলেই থ্রিলার, হলিউডের ব্লকবাস্টার হিট ‘শারাড’ (১৯৬৩) অবলম্বনে ১৯৬৮ তে তৈরী হয় ‘কখনো মেঘ’। আর সিনেমাটির সার্বিক রহস্যময়তাই যেন ধরা পড়েছে শুরুই এই গানে – চতুর্দিকে পাহাড়, অঞ্জনা ভৌমিকের চোখের সামনে থেকে আস্তে আস্তে কুয়াশা সরে যাচ্ছে, আর কুয়াশার মধ্যেই থেকেই হঠাৎ দেখা দেবেন ছদ্মবেশী উত্তমকুমার। সুধীনের আবহসঙ্গীত-ও তাই বেশ ঢিমে তালেই শুরু হচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে যাচ্ছে; আর তারপরেই উত্তুঙ্গ ক্লাইম্যাক্স, রূপোলী পর্দাতেও দেখতে পেলেন অঞ্জনার চোখের সামনে এতক্ষণে গিরিরাজ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছেন, ‘কখনো মেঘে ঢাকা’ থেকে ‘কখনো আলো মাখা’ তে উত্তোরণ।

৬। ‘এই ঝির ঝির বাতাসে’ (কন্ঠ – ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, কথা – সুধীন দাশগুপ্ত)

আবারো সুধীনের নিজের কথা, আবারো প্রিল্যুডে কারিকুরি – বেহালার ছড়ে স্পষ্টতই হাওয়ার রেশ, ঝির ঝির হাওয়াতেই যেন কেঁপে উঠছে।

৭। ‘নাচে নাচে পুতুল নাচে’ (কন্ঠ – আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, কথা – সুধীন দাশগুপ্ত)

‘পুতুল নেবে গো’ র মতন জনপ্রিয় হয়ত এ গান হয়নি কিন্তু সুধীনের সুরের জাদুতে ‘শোন রে খুকু শোন রে খোকা, নাচ দেখাবে শূর্পণখা’ নেহাত ছেলেভুলনো গল্পকথা হয়ে থাকে না, হারমোনিয়মের বেলো আর ক্ল্যারিওনেটের ছোঁয়ায় ঠিক একটা লোকনৃত্যর ফর্ম পেয়ে যায়।  ‘কুম্ভকর্ণ দিচ্ছে ঘুম, ঘুম ভাঙ্গাবার লাগলো ধুম’ এ আক্ষরিক অর্থেই ট্রাম্পেট ব্যবহার করে সুধীন হাসাতে পেরেছেন নেহাত কচিকাঁচাদের-ও। অথবা ধরুন, ‘ওই কেমন মজা রাবণ রাজা, যেমন কর্ম তেমনি সাজা’র পরেই সুধীন যেন নিয়ে আসতে চেয়েছেন বিবেকের মতন কোন চরিত্রকে, তাই বাদ্যসঙ্গতে-ও ‘ঠিক হয়েছে, বেশ হয়েছে’ বোল।

ষাটের কাছাকাছি চলচ্চিত্রে সুর দিয়েছেন সুধীন, শতাধিক বাংলা আধুনিক গানের-ও তিনি সুরকার – আরো মণিমুক্তো নিঃসন্দেহে লুকিয়ে আছে। পরের বার চেনা গানে সুধীনকে ফিরে পেলে, অচেনা গানের সুর সুধীন-সুধীন ঠেকলে কান খাড়া করে থাকবেন তো একটু।

Advertisements

ভেরেশাগিনের ছবি

কলেজ স্ট্রীটে আনন্দের আউটলেটে ঘুরঘুর করছিলাম, বই কেনার সত্যিই কোনো প্ল্যান ছিল না কিন্তু ‘জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্পসমগ্র’ দেখে হাত কিরকম নিশপিশ করতে শুরু করল। জ্যোতিরিন্দ্র এলেন, ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরী এলেন, বিলেতের স্মৃতি নিয়ে বিকাশ সিংহ চলে এলেন – সবাইকে জায়গা দিয়ে বিল করাতে গিয়ে দেখি দুশো টাকার মতন বই ফ্রীতে পাওয়া যাবে, আনন্দর যা নিয়ম আর কি।  ফ্রী বই বাছা বেশ ঝকমারি ব্যাপার, কিছুতেই আর দুশো টাকা উসুল হয় না; মাথার অনেক ঘাম পায়ে ফেলেও দেখছি পঁচিশ টাকা রয়ে যাচ্ছে। এমত অবস্থায় সাধারণত সিগনেট থেকে বার হওয়া চটি কবিতার বইগুলো ধরিয়ে দেওয়া হয় কিন্তু সে বইগুলো আমার এতই প্রিয় প্রত্যেক কটাই আছে (বিশ্বাস করুন ভালবেসে কেনা!)। যিনি কাউন্টারে ছিলেন তিনি কম্পিউটারে সার্চ করছিলেন, হঠাৎ দেখি মুখচোখ এক্কেবারে উদ্ভাসিত, “আরে, ঠিক পঁচিশ টাকারই বই দেখছি একটা”। বেশ, বই হলেই হল।

কিছুক্ষণ এ তাক, সে তাক ঘোরাঘুরি করে টেনে বার করলেন সেই বই। চটি একটা বই, সামান্য দূর থেকে পেছনের কভারটাও দেখা যাচ্ছে – সুধীর মৈত্র বা সুব্রত চৌধুরী কারোর কাজ। আউটলেটের দরজাটা খুলে কেউ একজন ঢুকছিলেন, বাস-টেম্পো-ট্রাম-ট্যাক্সির কাঁইমাই শব্দ-ও ঢুকে পড়েছে তার সঙ্গে। কিন্তু মিনিটখানেকের জন্য হলেও মনে হল আমি সেন্ট্রাল ক্যালকাটার একটা জনাকীর্ণ অঞ্চলে দাঁড়িয়ে নেই, টালিগঞ্জের ভাড়া বাড়িতে আমার নিজের জন্য থাকা সেই খুপরি ঘরটায় বসে রুদ্ধশ্বাসে পাক্ষিক আনন্দমেলার পাতা ওল্টাচ্ছি।

আনন্দমেলার পাতায় সিদ্ধার্থ ঘোষের বেশী লেখা চোখে পড়ত না, কিন্তু অত কম বয়সেও ঠিক টের পেতাম এনার লেখাটা একটু আলাদা। হয়ত দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বা শৈলেন ঘোষের মতন আলাদা নয় কিন্তু কাকাবাবু-কর্নেল-অর্জুন দের থেকে ঢের আলাদা। ‘ই-টি রহস্য’-ও গোগ্রাসে পড়েছিলাম কিন্তু ‘ভেরেশাগিনের ছবি’র সঙ্গে একটা স্মৃতিমেদুরতা জড়িয়ে, এ উপন্যাসই প্রথম জানায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সাদা বাড়ি, ঘুরন্ত পরী আর সবুজ লনের থেকেও অনেক বেশী কিছু। ভিক্টোরিয়ার মাহাত্ম্য যে শুধু বাইরের সাদা মার্বল পাথর নয়, ভেতরের আর্ট গ্যালারির রন্ধ্রে রন্ধ্রেও লুকিয়ে সে কথা ওই আট বছরের মধ্যে আর কেউ জানান নি তো। কলকাতা নিয়ে   অবশ্য সিদ্ধার্থ ঘোষ (বা আসল নামেই বলা যায়, অমিতাভ ঘোষ)  তার পরেও সাতাশ বছর ধরে অনেক কিছু শিখিয়ে চলেছেন, তিনি না থাকলেও পত্রপত্রিকার পাতায় পাতায় তাঁর লেখা রয়ে গেছে – আর সে সব লেখা সুলভ নয় বলেই একটা চাপা উত্তেজনা থেকে যায়, নতুন কিছু পাব কি?

‘ভেরেশাগিনের ছবি’ একটি রহস্য উপন্যাস, জোব চার্নক মেমোরিয়াল হল থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত শিল্পী ভেরাশাগিনের দুটি অমূল্য ছবি চুরি হয়ে যাবে, আর তা্র তদন্তে নামবেন হ্যালডেন সায়েন্স ক্লাবের সভাপতি মিহির ঘটক, সঙ্গে দুই সহকারী সৌমেন আর রীতা। গল্প নিয়ে আর কিছু বলছি না, কিনে ফেলত পারেন – ‘পঁচিশ টাকা’-য় ‘ভেরেশাগিনের ছবি’র সঙ্গে পেয়ে যাবেন আরো একটি বড় গল্প ‘একটি জলবৎ রহস্য’, এখানেও ওই ত্রয়ীদের কীর্তিকলাপ। তবে হ্যাঁ, ১৯৮৯ এর পর দ্বিতীয় মুদ্রণ হয়েছে হালে ২০০৯-এ, ফের ছাপা হবে কিনা সে নিয়ে একটা সন্দেহ থেকেই যায়, অতএব রসিকজন জলদি যান।

এবার ভেরেশাগিনের কথায় ফিরি। বইটা হাতে পেয়ে অভিভূত হয়েছিলাম কিন্তু পড়তে শুরু করে তার থেকেও বেশী অভিভূত হয়ে পড়লাম কারণ মনে পড়ল গত জুনে মস্কো গিয়ে ত্রেচিকভ আর্ট গ্যালারিতে ভেরেশাগিনের একাধিক ছবি দেখার সুযোগ হয় (যদিও একবারের জন্যও তখন বইটার কথা মনে আসেনি)। ইউরোপীয়ান রেনেসাঁস সংক্রান্ত হাজার হাজার ছবি দেখার ফাঁকে ভেরেশাগিনের তুলির ছোঁয়া একটু নয় অনেকটা রিলিফ এনে দিয়েছিল।

চার্নভ, লেভিতস্কি, কিপরেন্সকি, ব্রিউলোভ এরকম অসংখ্য শিল্পীর মাঝে (যাঁদের নাম আমি কোনোদিন শুনিনি) ভেরেশাগিন-ও কোথায় যেন হারিয়ে গেছিলেন। কিন্তু ‘Appearance of Messiah’ বা ‘The death of Hector’ কি ‘Henserich’s invasion of Rome’ এর মধ্যে হঠাৎ নিচের ছবি দুটিকে পাশাপাশি দেখে চমৎকৃত হয়েছিলাম।

1

2

দ্বিতীয়টি ফকিরদের ছবি সেটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে কিন্তু প্রথমটা কে নেহাত গরুর গাড়ী ঠাউরে অবহেলা করবেন না। ১৮৭৫ সালে দিল্লীর ধনী ব্যক্তিদের প্রধান মোড অফ ট্রান্সপোর্টের ছবিটি এঁকেছেন ভেরেশাগিন। ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৬ এই দু’বছরে ভেরেশাগিন ভারত এবং তিব্বতে টই টই করে ঘুরেছেন – নিসর্গদৃশ্য হোক কি সামাজিক রিচুয়ালস, মন্দির মসজিদের কারুকাজ হোক বা তাজমহল সুলভ রাজকীয় স্থাপত্য, ভেরেশাগিনের চোখ এড়ায় নি কোনো কিছুই। যেমন ধরুন নিচের ছবিটি – ইলোরার ইন্দ্র মন্দিরে অবস্থিত বিষ্ণুমূর্তি।

3

সিদ্ধার্থ ঘোষ কিন্তু এসব দেখে নয়, চমকেছিলেন ছবির মাধ্যমে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ইতিহাসকে ফুটে  উঠতে দেখে। খবরের কাগজের বকলমে সিদ্ধার্থ কি লিখছেন শুনুন, “মন্দির, মসজিদ, তাজমহল ইত্যাদির বহু পেইন্টিং এঁকেছিলেন তিনি, কিন্তু কি ঐতিহাসিক মূল্যের দিক থেকে কি চিত্র সংগ্রহের রোমাঞ্চকর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভেরেশাগিনের অপহৃত চিত্র দুটির মূল্য অপরিসীম। দীর্ঘকাল আমরা জানতাম, বহু ইতিহাসগ্রন্থের সিপাই অভ্যুত্থান অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত কামানের নলের মুখে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড় করানো ও চেন দিয়ে বাঁধা বিদ্রোহী সেপাইদের কামান দেগে উড়িয়ে দেওয়ার সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য একটিই এঁকেছিলেন ভেরেশাগিন। কিন্তু বছর-তিনেক আগে লিয়াওনিং থেকে সিপাই বিদ্রোহ দমনের এই নিষ্ঠুরতম দৃশ্য-বিবরণের আরও দুটি পেন্টিং যখন ঘটনাচক্রে কলকাতার এক অকশন হাউসে এসে পৌঁছয়, বিক্রেতারা তখন চিন্তাও করতে পারেনি তার চিত্রকর ভেরেশাগিন“।

এবার নিচের ছবিটি দেখুন, গায়ে কাঁটা দেবেই।

4

প্রসঙ্গক্রমে জানাই এটি কিন্তু সিপাহি বিদ্রোহের ছবি নয়, ভেরেশাগিন এ ছবি আঁকেন ১৮৮২-৮৩ সালে যখন আবার তিনি ভারতে ফিরে আসেন। সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীদের এরকম ভাবে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলেন এ নিয়ে প্রভূত অভিযোগ আগে থেকেই ছিল, ভেরেশাগিন দেখালেন ১৮৮২ তেও একই জিনিস ঘটছে অর্থাৎ এটাই সে সময়েই কমন প্র্যাকটিস, অস্বীকারের কোনো জায়গাই নেই।

যুদ্ধ এবং বিদ্রোহ-বিক্ষোভ দমন নিয়ে ভেরেশাগিন বহু ছবি এঁকে গেছেন, কিছু ছবি ঐতিহাসিক দলিল আর কিছু দলিল না হয়েও বিষয়বস্তুর নির্বাচন হেতু অসম্ভব বাঙ্ময়।

5

ওপরের ছবিটি আঁকা ১৮৯৭ নাগাদ – ক্রেমলিনের দেওয়ালে সার দিয়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হচ্ছে বিদ্রোহীদের যারা আগুন লাগিয়েছিল প্রাসাদে।

নিচের ছবিটির নাম ‘The apotheosis of war’ – ভেরেশাগিন এঁকেছিলেন ১৮৭১ সালে, এখনো দেখতে পাওয়া যাবে ত্রেচিকভ গ্যালারিতে। ১৮৬৯ এর শেষে ভেরেশাগিন সাইবেরিয়া হয়ে ঢোকেন তুর্কিস্তানে। তৈমুর লং এর খুলি দিয়ে পিরামিড সাজানোর ট্রাডিশন তখনো অব্যাহত সে অঞ্চলে, সম্ভবত সমরকন্দের কাছাকাছি কোথাও ভেরেশাগিন দেখেও থাকতে পারেন এহেন দৃশ্য। তবে এটি তৈমুরের নৃশংস হত্যাকান্ডকেই মাথায় রেখে আঁকা। সিদ্ধার্থ ঘোষ অবশ্য এখানে একটা ভুল তথ্য দিয়েছেন – অ্যাপোথিওসিস অব ওয়ার কে বলেছেন নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণের সময়কার ছবি।

6

তার পরের বছরেই আঁকলেন ‘Present Trophies’, যেটা আগেরটির মতন অত বিখ্যাত না হলেও  বিষয়বস্তুর তীব্রতায় কোনো মতেই কম যায় না। দেখুন তৈমুরের পায়ের কাছে কি দিয়ে ভেট রাখা হয়েছে।

7

সিদ্ধার্থর গল্পে একটা চূড়ান্ত টাইম প্রেশার-ও কাজ করছে, যেহেতু ছবি চুরি যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই রুশ ডেলিগেশনের আসার কথা কলকাতায়, স্বাভাবিক ভাবেই তাঁরা আসার আগেই খুঁজে বার করতে হবে ভেরেশাগিনের ছবি। বাস্তবে অবশ্য দেখা যায় দেশের বাইরে্র যুদ্ধ, বিদ্রোহ নিয়ে ভেরেশাগিনের কাজ যতটা সমাদৃত হয়েছে রাশিয়ার প্রায় ততটাই খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে (সময় বিশেষে অনুমতিও দেওয়া হয় নি ছবি প্রদর্শনীর) যখনই ভেরেশাগিন তাঁর ছবির বিষয়বস্তু করে তুলেছেন রুশ সৈন্যদের। সিপাহী বিদ্রোহের বদলে নিচের তিনটে ছবির সিরিজ ভিক্টোরিয়া থেকে খোয়া গেলে হয়ত মিহিরদের হাতে আরো একটু সময় থাকত – কোন হিপোক্রিটের দলই বা আর দেখাতে চাইবে যুদ্ধে পঙ্গু সৈন্যের অসহায়তা।

8

শেষ করি একটা অন্যরকম ছবি দিয়ে। আগেই বলেছি সিদ্ধার্থ ঘোষ ভুল করে অ্যাপোথিওসিস অব ওয়ার কে  নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণ নিয়ে আঁকা ছবিগুলির মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন কিন্তু ভেরেশাগিন সত্যিই নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণ নিয়ে একাধিক ছবি এঁকে গেছেন। সেখান থেকেই তুলে দিলাম নিচের ছবিটি – একটা কুয়াশা ঘেরা জায়গায় দাঁড়িয়ে চিন্তামগ্ন নেপোলিয়ন, হয়ত অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছুই ডিডিউস করে উঠতে পারছেন না বলেই এত চিন্তা। হায়, যদি দেখতে পেতেন!

দেখুন, শত জয়ধ্বনিও নেপোলিয়নের চিন্তাকে দূর করতে পারছে না, হয়ত একটা অশনি সঙ্কেত ধরা পড়েছে এই খর্বকায় যুদ্ধনায়কের চোখে।  ভেরেশাগিন না থাকলে ধরা পড়ত না আমাদের চোখেও।

9

(স্থিরচিত্র ঋণ – ত্রেচিকভ গ্যালারি, ইয়াতসেক মিহালাক)

খন্ডহর

জমাট বাঁধা অন্ধকার, মুষলধারে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। গাড়ির মধ্যে বসে থরথর করে কাঁপছে ছেলেমেয়ে গুলো। তানি প্রায় ধরা গলায় ফিসফিসিয়ে উঠল, “এবার কি হবে রে? দ্যাখ, হাতটা কি বিশ্রীরকমের ঠান্ডা হয়ে গেছে”। তানির বাঁদিকে বসে আছে পাপ্পু, ডান হাতের সব কটা আঙ্গুল দিয়ে ঢেকে রেখেছে চোখ আর মাঝে মাঝে দু’আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে। পাপ্পুর-ও বাঁদিকে বসে রুইয়া, টেনশনে সিট থেকে প্রায় আধঝোলা হয়ে রয়েছে আর মাঝে মাঝেই ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে তানিকে বলছে, “চুপ করবি তুই?” ডাইনোসরের বিশাল জ্বলজ্বলে চোখটা গাড়ির জানলার কাঁচে সেঁটে যেতেই অবশ্য তিনজনেই চিৎকার করে উঠল, এতক্ষণের দম বন্ধ করা সাসপেন্স একটা পরিণতি পেয়েছে, রিলিফ! প্রোজেকটরের ঘড়ঘড়ে আওয়াজটা ভেসে আসছে এখনো, কিন্তু এবারে বোধহয় একটু ঘাড় ঘোরানো যায়। রুইয়া ডানদিকে তাকাল – ফুলতলা খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে হলঘরের বাইরে টেবল পাতছে, পেছনের কিচেন থেকে অস্ফুট টুংটাং শব্দ এখানেও এসে জানান দিচ্ছে বিকাল নয় সন্ধ্যাটাই আসল। রুইয়া জানে আরেকটু পরেই মৌভান্ডার থেকে তাজমহল (হ্যাঁ, তাজমহল) পাপ্পু যাকে বলে ‘লাল-নীল জল’ সেই নিয়ে এসে পৌঁছবে। তারপর ফুলতলার ব্যস্ততা আরো বাড়বে, সাহেবদের সবার পছন্দ মনে রেখে টেবল সাজানো খুব সহজ কাজ নয়। তানিকে সিনেমা শেষ হলে জানাতে হবে, তাহলেই ও বলবে “চ, একটু দাঁড়িয়ে যাই”। তারপর পাপ্পুর দিকে তাকিয়ে হি-হি করে হেসে বলবে, “ওই দ্যাখ, তোর লাল নীল জল”। তারপর দু’জনে মিলে পাপ্পুকে নিয়ে পড়বে, “বল্ মদ, বল্”। পাপ্পু পান্ডে বাড়ির ছেলে, হাজার র‍্যাগিং-এও লাল-নীল জল ছেড়ে কিছু বলবে না, খালি  পরিস্থিতি খুব অসহ্য হয়ে উঠলে মুখটা নামিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে। এই চলবে, যতক্ষণ না কোম্পানির ড্রাইভার এসে তাড়া লাগাবে ওদের। তার-ও আজকে প্রচুর কাজ, গাড়ি অনেক কটাই কিন্তু সাহেবদের ছেলেমেয়েদের পৌঁছে দিয়ে আবার সাহেব আর সাহেবদের বৌদের নিয়ে আসতে হবে তো। তারপর একমাস ধরে পোস্টার পড়েছে মৌভান্ডার, মোসাবনী, সুরদা এমনকি ঘাটশিলা স্টেশনের কাছে কোম্পানির যে গেস্টহাউসটা আছে সেখানেও – ইন্টারন্যাশনাল সিনে ক্লাব আজকে ‘চারুলতা’ দেখাবে। স্পেশ্যাল স্ক্রীনিং বলে কথা, কনভেন্ট আর কে-ভি স্কুলের টিচার রাও অনেকে আসবেন হয়ত, কে জানে কোম্পানীর একে তাকে ধরে তাঁরাও হয়ত গাড়ি ম্যানেজ করেছেন।

শাটারের শব্দে একটু চমকে উঠেছে রুইয়া, অপু এতক্ষণে একটা ফটো নিতে পেরেছে। পেছনের জঙ্গলে এক ভদ্রলোক ঘটি হাতে বাহ্যিতে যাচ্ছিলেন বোধহয়, ভরদুপুরে রুইয়াদের দেখে তিনি আর নড়তে চান না। এদিকে অপু যে ক্যামেরা ফোকাস করে দাঁড়িয়ে আছে, সে কথা জানায় কে? হঠাৎ মনে পড়ল ইন্টারন্যাশনাল সিনে ক্লাবে অবশ্য হলিউড ছাড়া অন্য কোনো দেশের সিনেমা কস্মিনকালেও আসেনি, যেটা শোনা ইস্তক অপু বেজায় খেপিয়েছে। কিন্তু এ চত্বরে ঢোকা থেকে অপু একটু চুপচাপ। রুইয়া কাঁধে হাত রাখে, “পছন্দ হয়নি বুঝি জায়গাটা ?”। অপু মাথা নাড়ে দু’দিকে, “অপছন্দ নয় মন খারাপ”। রুইয়া হাসে, এতদিনে চিনে গেছে অপুকে।

g1

বেশী লম্বা সিনেমা চললে পাপ্পু একটু অধৈর্য হয়ে পড়ে, উসখুশ করতে থাকে, এদিক ওদিকে চায়। বৃষ্টির রাতে ডাইনোসরদের তান্ডব-ও ওর মনকে এক জায়গায় বেঁধে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। কনুই দিয়ে এক ঠ্যালা মারে রুইয়া কে, “রু দিদি,  উপর কি ইয়ে লাইট কাহাঁ সে আ রহি হ্যায়?”। রুইয়া এর মধ্যে পাপ্পুর সঙ্গে জায়গা চেঞ্জ করে তানির পাশে এসে বসেছিলেন, জুরাসিক যুগের প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের দেখার পাশাপাশি জেনে নিচ্ছিল সিদধারথ ভাইয়া সঞ্চিতাকে আর চিরকুট পাঠিয়েছে কিনা। এসব ইন্টারেস্টিং ডিসকাশনের মধ্যে বাঁদরটার জ্বালাতনে ভারী রাগ হয়ে গেল ওর, মুখ ভেংচে বলল, “বুদ্ধু, প্রোজেক্টরকে বারে মে নহি শুনা হ্যায় কেয়া?”। আরো কিছু প্রশ্ন ছিল বোধহয় পাপ্পুর, রু দিদির ধাতানি খেয়ে চুপ করে গেল। তানি এদিকে চমটি কাটছে, “তারপর শোন না, অভয় ভাইয়া নাকি লাস্ট মনডে পূর্ণাপানি গেছিল, ওখানে নাকি সিদধারথ আর সঞ্চিতা কে হাত ধরাধরি করে বসে থাকতে দেখেছে ঝোরার পাশে”। বলে আবার হি হি করে হাসতে লাগল, “কিন্তু কাউকে বলতে পারছে না। কেন বল তো? অভয় নাকি সিগারেট খেতে খেতে ঝোরাতে টয়লেট করছিল, উলটো দিকের কেন্দু গাছের নিচেই যে সঞ্চিতারা বসে আছে সেটা খেয়াল করে নি – আমাকে জানিস তো সঞ্চিতা-ই বলল”। পূর্ণাপানি বড় প্রিয় জায়গা রুইয়ার – ঝোরাটা অবশ্য নামেই ঝোরা, মোস্ট অফ দ্য টাইম তিরতিরে নালা হয়ে বয়ে চলে। আর দু পাশে শাল, কেন্দুর জঙ্গল – গ্রীষ্মের বিকাল হোক কি শীতের দুপুর, পূর্ণাপানির পাশে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারে ও। অবশ্য সে সুযোগ কদাচিৎ মেলে কিন্তু অভয় ভাইয়ার ওপর বেজায় রাগ হল শুনে, এ কি অসভ্যতা। বাঁদিকে তাকিয়ে দেখল পাপ্পু চুপ করে সিনেমা দেখছে, ওর চুলটা একটু ঘেঁটে দিল। পাপ্পু জানে এবার রুইয়া দিদির সঙ্গে আবার কথাবার্তা চালানো যাবে, একগাল হেসে বলল, “রু দিদি, মুঝে বড়ে হো কর প্রোজেকটর-ম্যান বননা হ্যায়”।

“রুইয়া এ দিকে দেখো, এ দিকে” – চিৎকার করছে অপু। রুইয়া তাকাতে ওপরের দিকে ইশারা করে বলল, “এখান থেকেই বোধহয় প্রোজেকটর অপারেট করত, তাই না?”। রুইয়া ইতিবাচক মাথা নাড়ে, পাপ্পু কোথায় আছে যেন? আরে তাই তো, ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায়। ক’দিন আগেই ফেসবুকে দেখছিল সফদর হাশমির কোন একটা প্রোডাকশনে ওর কাজ খুব প্রশংসা পেয়েছে। পাপ্পু লাস্ট কবে এসেছে সুরদা? পাপ্পুর সব ভাই বোন জামশেদপুরে থাকে তাই হিন্দুস্থান কপার উঠে যাওয়ার পরেও ওর বাবা রয়ে গেছেন এখানে। কবেই তো কোম্পানি প্রাইভেট হয়ে গেছে, হিন্দুস্থান কপারের রমরমা ছেড়েই দাও, তিন চার মাস করে স্যালারি বাকি থাকাটাই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার এখন। পান্ডে আঙ্কল রাজস্থান চলে গেছিলেন, আবার ফিরে এসেছেন সুরদা। কিন্তু কোম্পানির বাংলোয় এখন আগাছা ভর্তি, সারি সারি বাংলো ফাঁকা – আজকে ঘুরতে গিয়ে তো একটা বাংলোর পাশে সাপের খোলস-ও পড়ে থাকতে দেখল, আরেকটা বাংলোর ভাঙ্গা জানলার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল সারি সারি দেশী ধান্যেশ্বরীর বোতল। পাপ্পু আসে? দেখেছে ওর সাধের প্রোজেকশন রুমের অবস্থা?

g2

 

“সিনে ক্লাবের দরজাও খুলে নিয়ে গেছে দেখছি”। রুইয়া দেখেছে আগেই, দরজার বদলে সারি সারি কার্ডবোর্ডের টুকরো। পাঁচ-ছ বছর আগেই শুনেছিল বাংলোর দরজা জানলা খুলে নিয়ে চলে গেছে, কিন্তু মোসাবনীর কেন্দ্রে থেকে যাওয়া সিনে ক্লাবের-ও যে এক দশা হবে সেটা ভাবতে পারেনি। কার্ডবোর্ডের সারির ওপরেই কে আবার মেরে দিয়ে গেছে আগত সাঁওতালি সিনেমার পোস্টার – কেউ ভুলেও এ তল্লাটে পা মাড়ায় না যদিও কিন্তু সুরদা, ঘাটশিলার আদি বাসিন্দাদের কারো কারো মনে এখনো হয়ত সিনে ক্লাবের স্মৃতি অক্ষত। আশাদোলন, আশাদোলন……জন্মে দেখা হবে না এ সিনেমা কিন্তু রুইয়া জানে নামটা মনে থেকে যাবে ঠিক যেমন রয়ে গেছে মৌভান্ডার, মোসাবনী, পূর্ণাপানি, ফুলডুংরি, যাদুগোড়া…সারি সারি লিরিক্যাল শব্দ, সারি সারি মন খারাপ করা ছবি।

g3

“এবারে আর জামশেদপুর যেতে পারছি না।” তানির কথায় মনে পড়ল আর তিন সপ্তাহ পরেই পিকনিক, মৌভান্ডারের গ্রুপ অবশ্য এতে যাবে না, শুধুই সুরদা। পাঁচ-ছ টা  গাড়িতে চেপে দু পাশের শাল, ইউক্যালিপটাসের জঙ্গল দেখতে দেখতে যাওয়া – মাঝে মাঝে গুলমোহর চোখে পড়লেই সব হৈ হৈ করে উঠবে। গুলমোহর নিয়ে সবারই দুর্বলতা, এমনকি পেছনের গাড়ির ওভারটেক করে গেলেও তখন কেউ মাইন্ড করবে না। রাখা মাইনস পড়বে, তারপর আসবে যাদুগোড়া, তারপর সেই রঙ্কিণী দেবীর মন্দিরে গিয়ে থামা – তুমি পুজো নিতে না চাইলেও গাড়ি একটুক্ষণের জন্য থামাতেই হবে। অবশ্য এ গ্রুপের সবাই রঙ্কিণী দেবীর বড় ভক্ত, পুজো ঠিকই দেবে। একবার তো মন্দিরের পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে সামনের পাহারটার চুড়োয় উঠেছিল সবাই, সেখানেও আছে একটা ছোট্ট মন্দির। তারপর পুজো টুজো দিয়ে সোজা পাকা রাস্তা ধরে জামশেদপুর – ডিমনা লেক, জুবিলী পার্ক। রুইয়া বলল, “চ, বুড়ুডি ড্যাম যাই এবার”। তানি ভারী হতাশ, “তুই যা, বুরুডি আমার বার দশেক ঘোরা”। পাপ্পু দাঁত দিয়ে নখ কাটছিল, বলল, “ড্রাইভার আঙ্কল সে পুছতে হ্যায় না…”, রুইয়া চোখ পাকিয়ে বলল, “তুই থামবি? কোথায় যাব সেটা আমরা ঠিক করব”। তানির অবশ্য পাপ্পুর কথাটা পছন্দই হয়েছে, এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজছে ড্রাইভারকে। গেটের সামনে অগুন্তি গাড়ির ভিড়, তার মধ্যে ওদের গাড়ি কোথায়? সিনেমা তো বেশ কিছুক্ষণ ভেঙ্গেছে।

সত্যজিৎ তখনো প্রবাসী বাঙ্গালীদের ঘাড় ধরে নিয়ে আসতেন, তাই সিনে ক্লাবের অ্যাটেনডান্সে কমতি পড়লেই হয় ‘চারুলতা’ নয় ‘জন অরণ্য’-র আবির্ভাব। বাঙ্গালীদের পাল্লায় পড়ে চলে আসতেন অনেক মিশ্রা, শর্মা, পান্ডে, সেনাপতিরাও। তবে ‘সোনার কেল্লা’ কি ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ হলে জমত না, বাচ্চাদের বেশী পছন্দ ‘ছোটা চেতন’। ওয়ার্কারদের জন্যও ছিল একটা ক্লাব, সেখানকার খবর মাঝে মাঝে পাওয়া যেত ক্লাসের ছেলেমেয়েদের থেকে। দীনেশ মাঝে মাঝে যেত বাবার সঙ্গে, এসে সুর করে করে শোনাত ‘টিপ টিপ বরসা পানি’ কি ‘ দিল জিগর নজর কেয়া হ্যায়”। অপু বহুবার পেছনে লেগেছে, “বাঙ্গালী আছে আর ক্লাস ডিফারেন্স থাকবে না তাও কি হয়?” সেটা হক কথা যদিও, মোসাবনীর সিনে ক্লাবে ওয়ার্কাররা পারতপক্ষে ঢুকতে পারত না। সে নিয়ে কস্মিনকালেও কেউ প্রতিবাদ জানায়নি অবশ্য, এটাই স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছিল সবাই। “গাড়িটা কোথায় রেখেছে? এর পর রঙ্কিণী মন্দির……তাই তো?” অপু খুঁজতে গেল, রুইয়া দাঁড়িয়ে আছে সিনে ক্লাবের দরজার সামনে। সেই চেনা লাল-হলুদ রঙ, কিন্তু যেন বিবর্ণ হয়ে আসছে রঙগুলো। মন খারাপ নয়, একটা আপাত-উদাসীনতা ছেয়ে রয়েছে। সিনে ক্লাব নিয়ে ভেবে লাভ কি, যেখানে টাউনশিপটাই আর রইল না। বা হয়তো রইল-ও, ধুলো পড়া বাঙ্গালী মিষ্টির দোকান, শুকিয়ে যাওয়া সুবর্ণরেখা আর বন্ধ হয়ে যাওয়া খনির রাশিরাশি মেশিনস নিয়ে।

g4