ফিফথ ডাইমেনসন এবং তারপর

after death

 

 

ইন্টারস্টেলার সিনেমায় ক্রিস্টোফার নোলান ফিফথ ডাইমেনসন বলতে কি বুঝিয়েছেন সে নিয়ে নেট দুনিয়া সরগরম। আইভি লীগ ফিজিসিস্ট থেকে শুরু করে নতুন সায়েন্স জার্নালিস্ট, তাবড় চলচ্চিত্রবোদ্ধা থেকে শুরু করে চোখে আঙ্গুল দাদা সবাই কিছু না কিছু বক্তব্য রাখছেন – তবে আমার জন্য প্রাপ্তির দিকেই পাল্লা বেশী ঝুঁকে সুতরাং সব বক্তব্যই বেশ মন দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছি। দেখলাম ‘ওয়্যারড’ পত্রিকায় জন মুয়াল্লেম  আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন মৃত্যুকেও এক হিসাবে টাইম ট্র্যাভেলের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সায়েন্স ফিকশনে যে ধরণের টাইম ট্র্যাভেলের কথা পড়ে থাকি তার সঙ্গে অবশ্য এর তফাত আছে – অতীত বা ভবিষ্যৎ এ পৌঁছনোর বদলে  এক দিগশূণ্য অনন্তসীমায় পৌঁছনোর কথা এখানে কল্পনা করা যায়, ত্রিমাত্রিক পৃথিবী থেকে সেই স্থবির সময়-মাত্রায় যাতায়াত করা সাধ্যের বাইরে।

কেন সাধ্যের বাইরে সে নিয়ে অবশ্য জন ভেঙ্গে কিছু লেখেননি; তর্কের খাতিরে হয়ত বলা যায় একমাত্র মৃত্যুতেই আমরা এ ত্রিমাত্রিক বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করতে পারি, ফিফথ ডাইমেনশন যদি থেকেই থাকে তবে সেটা বোঝার জন্য অবশ্যই এই থ্রী ডাইমেনশনের বেড়া ভেঙ্গে বেরনো দরকার। মৃত্যুর পরেও আত্মার অস্তিত্ব আদৌ থাকে কিনা সে নিয়ে তর্কের মধ্যে যাচ্ছি না, কিন্তু জন মুয়াল্লেমের চিন্তাধারাটি বেশ অন্যরকম এ কথা অনস্বীকার্য। আজকের ব্লগপোস্টে এরকমই কিছু আইডিয়ার কথা শোনাবো; হাজার বছরেরও বেশী সময় ধরে এই সমস্ত আইডিয়া মানুষকে ভাবিয়েছে, যদিও প্রথাগত বিজ্ঞানের সূত্র ধরে সে সমস্ত চিন্তাধারা বিশ্লেষণ করার কথা ভুলেও ভাববেন না। উর্বর কল্পনার রস আস্বাদন করাই হোক আপনার একমাত্র অভিপ্রায়।

২০১৪ তে এসে আত্মার টাইম ট্র্যাভেলের কথা উঠলেও শুরুতে কিন্তু ভরসা ছিল শুধুই মই। বাইবল জানাচ্ছে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য জেকবের দরকার হয়েছিল শুধুমাত্র একটি মই। জেকবের মই নিয়েই অবশ্য ব্যাখ্যা হাজারখানেক –   কেউ বলছেন ওই মইতে চড়া মানে সচেতন ও অচেতন অবস্থার মাঝামাঝি কোথাও একটা পৌঁছে যাওয়া, আজকের দিনে ‘আর্টিফিশিয়ালি ইনডিউসড কোমা’ বলতে যা বুঝি, হয়ত তাই। কেউ বলছেন স্বর্গে পৌঁছনোর আগে নরকদর্শন টা ওই মইয়ে চড়েই করে ফেলতে হবে।  অষ্টাদশ শতকের শিল্পী উইলিয়াম ব্লেক অবশ্য সব থেকে চিত্তাকর্ষী ব্যাখ্যাটি দিয়েছিলেন – ব্লেকের আইডিয়া অনুসারে জেকবের মইটি প্যাঁচালো, আমাদের কানের ভেতরের জটিল অ্যানাটমির মতনই এ মই ঘুরে ঘুরে উঠেছে। তাই মইয়ে চড়া মানে এক হিসাবে অন্তর্য়েন্দ্রিয়ের উন্মোচন, উচ্চতর জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের একমাত্র রাস্তা।

সচেতন-অচেতনের দ্বন্দ্ব বারেবারেই ফিরে এসেছে দার্শনিক, শিল্পী এমনকি অ্যালকেমিস্টদের দেওয়া থিয়োরীতে। বোহেমিয়ার ড্যানিয়েল স্টোলজ ভন স্টোলজেনবার্গের কথাই ধরা যাক, এই বিখ্যাত অ্যালকেমিস্ট বিশ্বাস করতেন মৃত্যুর মুহূর্তটিতে লড়াই চলে মানুষের সচেতন সত্ত্বার সঙ্গে অবচেতন (অচেতন নয়)  সত্ত্বার – সচেতন সত্ত্বাটি লড়াইয়ে হেরে গেলেই চেতনা ডুবে যায় নিকষ, গভীর অন্ধকারে। এই কালো অন্ধকারের মধ্যে দিয়েই আত্মার নির্গমন ঘটে এরকমটি দেখানোর জন্য ষোলোশ-সতেরশ শতকে বহু শিল্পী রূপক হিসাবে আঁকতেন দাঁড়কাক। এবার থেকে হলিউডি হরর ফিল্মে দাঁড়কাক দেখলে মনে রাখবেন বেচারা পাখিটি মোটেই অশুভের প্রতীক নয়, নেহাতই আপনার আত্মাকে বয়ে নিয়ে চলেছে।

ষোলোশ-সতেরশ শতকে টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে ধারণা না থাকলেও অনেকেই বিশ্বাস করতেন মৃত্যু এক ধরণের সরণ, এক বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করে আর এক বিন্দুতে পৌঁছনো। আর সেই সূত্রেই বহুদিন ধরে বৃত্তকে ধরা হয়েছে পুনর্জন্ম বা অমরত্বের প্রতীক। ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড ডেথলি হ্যালোজ’-এ ডেথলি হ্যালোজ এর প্রতীকটি মনে পড়ছে? ত্রিভুজ, ত্রিভুজের একটি মধ্যমা এবং ত্রিভুজের অন্তর্বৃত্ত –  অন্তর্বৃত্তটি বোঝাত রেজারেকশন স্টোন কে অর্থাৎ যে যাদুপাথর ব্যবহার করে আবার বেঁচে ওঠা যাবে। সপ্তদশ শতকে ফিলোথিয়াসের ‘সিম্বলা ক্রিস্টিনা’ তে দেখতে পাচ্ছি এই অনন্ত বৃত্তকে। তারও আগে অবশ্য জার্মান শিল্পী ড্যানিয়েল ভন জেপকো দাবী করেছেন ত্রিভুজের বহির্বৃত্তের কেন্দ্রেই আদি ব্রহ্মের অবস্থান, যে কোনো সচেতন মানুষের উচিত ওই কেন্দ্রবিন্দুতে লক্ষ্য স্থির রাখা। যাই হোক, অমরত্বের প্রসঙ্গে ফিরে যাই। মধ্যযুগের বহু  ধর্মবিদ বিশ্বাস করতেন অমরত্বের কল্পনা অবাস্তব তো বটেই, উপরন্তু এ  নেহাতই শয়তানি প্রতিশ্রুতি – আত্মাকে বিকিয়ে দেওয়া বই কিছু নয়। তাই অমরত্বের বৃত্ত এনাদের কাছে দেখা দিল এক নতুন প্রতীকে।

serpent

প্লেটো আবার বললেন উলটো দিকটাও ভাবা দরকার – যারা ভাবছেন একবার মরেই বেঁচে গেলেন তাদের জন্য প্লেটো রীতিমতন দুঃসংবাদ বয়ে এনেছেন। প্লেটোর হিসেব মতন হাজার বছর ধরে আপনার আত্মা ঘুরে বেড়াবে অনন্ত ব্রহ্মে বিলীন হওয়ার আগে, আর ওই হাজার বছর ধরেই জন্ম-মৃত্যু বৃত্তাকারেই ঘুরে আসবে। আসা এবং যাওয়ার চিরন্তন প্রবাহ বোঝাতে গিয়ে মধ্যযুগীয় বিদ্বজনরা অবশ্য শুধু বৃত্ত নয়, অগুন্তি আরো জ্যামিতিক প্যাটার্নের সাহায্য নিয়েছেন। আর একটি কৌতূহলোদ্দীপক নকশার কথা বলি – মই!

আবার মই? কি বলি বলুন, স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে মই নিয়ে  সে সময় ভারী উৎসাহ ছিল – সত্যজিত রায়ের ট্রেন যেমন অপু-দুর্গার  কাছে বৃহত্তর পৃথিবীর প্রতীক হয়ে দেখা দিয়েছে সেরকম ভাবেই হয়ত ঊর্ধ্বগামী মই দেখলেই লোকে দো’তলা তিনতলা ছাড়িয়ে সোজা ছায়াপথের কথা ভাবতে শুরু করতেন। যাই হোক, এ মই নিয়ে এসেছিলেন ইংলিশ চিকিৎসক রবার্ট ফ্লাড। ফ্লাড অবশ্য শুধু চিকিৎসক নন – জ্যোতিষী, গণিতবিদ,  অতিপ্রাকৃত-বিশারদ, একই অঙ্গে অনেক রূপ। ফ্লাডের তত্ত্ব অনুযায়ী মইয়ে উঠে গুনে গুনে ঠিক ন’টি সিঁড়ি চড়লেই আপনার আত্মা পৌঁছে যাবে সূক্ষ্মতর ব্রহ্মান্ডে, কিছু সময় বিশ্রাম, তারপর ফের পাশে রাখা দ্বিতীয় মই দিয়ে নেমে আসা। আবারো জগৎসংসারের ঠ্যালা সামলানোর পালা, তারপর ফের মইয়ে চড়া। ফ্লাডের যেহেতু অঙ্কে ছিল বিষম উৎসাহ, উনি দাবী করেছিলেন এই ন’টি স্টেপ নেহাত গাঁজাখুরি ব্যাপার নয়। রীতিমতন পাইথাগোরিয়ান গণিতের সাহায্য নিয়ে তৈরি হয়েছে এ মই, প্রতিটি সিঁড়ি কতটা চওড়া, কতটাই বা লম্বা সবেরই ফিরিস্তি দেওয়া যাবে অঙ্কের হিসাবে।

পাইথাগোরাস (বা পিথাগোরাস) জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে কম চর্চা করেন নি, পাইথাগোরাসের সব গবেষণা একত্র করে প্লেটো একটি বই লিখেছিলেন – ‘টাইমিয়স’। তো সেই টাইমিয়স বইয়ের একটি প্রধান বিষয়বস্তু হল ল্যাম্বডা। ল্যাম্বডা তো জানেনই কি বস্তু, প্লেটোর বইয়ে ল্যাম্বডা কিন্তু শুধু একটি গ্রীক বর্ণ নয় – গাণিতিক বিস্ময়। প্লেটো এবং তৎকালীন বহু দার্শনিক বিশ্বাস করতেন জাগতিক বিশ্বের স্রষ্টা ( যাঁর নাম ডেমিয়ারজ) বিশ্বব্রহ্মান্ড বানাতে গিয়ে ব্যবহার করেছেন একটি বিশেষ গাণিতিক সূত্র। এ সূত্র পরে ফিরে এসেছে সঙ্গীতের স্বরগমে।

lambda

স্বরমূর্ছনা বা আরো সহজ করে বললে গানের স্কেল নিয়ন্ত্রিত হয় সংখ্যার অনুপাতের হিসাবে। গ্রীক বিজ্ঞানীরা হিসেব কষে দেখিয়েছিলেন ওপরের দশটি সংখ্যাই এই অনুপাত গণিতের প্রধান চরিত্র। প্লেটো বললেন (যদিও প্লেটোর বক্তব্য অনুযায়ী আদতে বলছেন পাইথাগোরাস) শুধু সঙ্গীত নয়,  জন্ম-মৃত্যু-পুনর্জন্ম এই চক্রটিকে বুঝতে গেলেও ওই সংখ্যাগুলিই ভরসা। সংখ্যাগুলিকে ‘টাইমিয়স’ বইতে এমন ভাবে সাজালেন যে দুই এবং তিন এর উচ্চতর বর্গগুলি যেন ত্রিভুজের দুই বাহু ধরে নেমে এল, আর মনে হল ঠিক যেন ল্যাম্বডা অক্ষরটিই উঠে এসেছে – বিশেষ এক জ্যামিতিক আকৃতির জন্য এর নাম ল্যাম্বডা টেট্রাকটিস।

টেট্রাকটিস তত্ত্ব অনুযায়ী অনাদি কাল ধরে আত্মার যাতায়াত চারটি স্তরেই সীমাবদ্ধ (৮-২৭, ৪-৯, ২-৩ এবং ১)। চতুর্থ স্তরে (৮-২৭) আত্মা জাগতিক পৃথিবী এবং দেহের মধ্যে আটকে, পঞ্চেন্দ্রিয়  যা যা অনুভব করছে সম্ভবত সে সব কিছুই ভৌতবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব । দ্বিতীয় স্তরটি সূক্ষ্মতর –  এখানে আত্মা শরীরের ঘেরাটোপে আটকে নেই, স্বভাবতই ভৌতবিজ্ঞানের ব্যাখ্যাও খাটবে না । বলা বাহুল্য যে তৃতীয় স্তরটি দ্বিতীয় এবং চতুর্থর মাঝামাঝি অবস্থিত, যেখানে আত্মা যা ছিল থেকে যা হতে চলেছে এরকম একটি ট্র্যানজিশন পিরিয়ডে রয়েছে (সম্ভত ‘near death experience’ ধরণের কিছু বোঝাতে চেয়েছেন প্লেটো) । আর প্রথম স্তরটি হল গিয়ে সুপ্রীম, সেখানে কি আছে, কি নেই, কি হয়, কি হয় না এ নিয়ে চিন্তা করার মতন স্কিলসেটই আমাদের নেই।

ইহুদী ধর্মমত কাবালাতেও এই টেট্রাকটিস দেখতে পাই আমরা, সেখানে অবশ্য এর নাম ‘ট্রি অফ লাইফ’। আরো বলা হয়েছে টেট্রাকটিসের প্রতিটি বিন্দুতে আত্মচেতনার উপলব্ধি আলাদা আলাদা , আপনি চতুর্থ স্তরে থেকেও  ৮-এ আছেন নাকি ২৭-এ সেটাও দেখার বিষয়। কল্পনাকে আরেকটু লাগামছাড়া হতে দিলে মনে হতেই পারে এ নেহাতই ‘মাল্টিভারস থিয়োরী’র-ই আরেক রূপ, একই সময়ে একাধিক বিশ্বে থেকে যাচ্ছে একাধিক আমি। আর যদি চতুর্থ থেকে তৃতীয়,  তৃতীয় থেকে দ্বিতীয়ে উত্তোরণ ঘটে? আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় আপনি ডাইমেনসনের বাধা টপকে এগোচ্ছেন।

আধুনিক অতিপ্রাকৃতবিদ রা আরো একধাপ এগিয়ে বলছেন ল্যাম্বডা টেট্রাকটিস নিয়ে বিজ্ঞানীদের আরেকটু মাথা ঘামানো উচিত, ওর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সার সত্য। কেন বলুন তো? সুপারস্ট্রিং থিয়োরীকে ভ্যালিড দেখাতে গেলে দরকার দশটি ডাইমেনসন, টেট্রাকটিস-ও তো তাই বলছে!

বিজ্ঞানীরা আদৌ মাথা ঘামাবেন কিনা জানি না তবে কল্পবিজ্ঞান লেখকরা ভেবে দেখতে পারেন; সত্যি বলতে কি ইন্টারস্টেলার-ও দিনের শেষে নিছক কল্পবিজ্ঞানই, কিছু জায়গায় তো ফিকশন নয় ফ্যান্টাসি পর্যায়েই পৌঁছেছে – না হলে আর ব্ল্যাক হোলের মধ্যে দিয়ে হৈ হৈ করে নেমে আসা যায়?

Advertisements

অ্যাকিলে সান্নিধ্যে – পর্ব জোয়ান মিরো

অ্যাকিলে আমার বন্ধু। এবার জিজ্ঞাসা করুন – ও কি করে? করুন, করুন! উত্তর –  প্রেসিডেন্ট ওবামার ওপর রাগ করে । মানে ওটাই ওর কাজ, ওটাই ওর প্যাশন। আমেরিকাকে যে ওবামা সোশ্যালিজমের নষ্ট পথে পাঠাতে চলেছেন সে নিয়ে ওর কোনো সন্দেহই নেই; সে সন্দেহ এতটাই বদ্ধমূল যে তিন বছর আগে ওর আইরিশ থিসিস অ্যাডভাইসর যখন আমেরিকায় ওকে পোস্ট-ডক করতে পাঠানোর জন্য হাতে পায়ে ধরছিলেন, নিষ্ঠুর অ্যাকিলে ভদ্রলোককে কাঁদিয়ে চলে গেছিল সিঙ্গাপুরে। আমেরিকা না গিয়েও এত প্রবল আমেরিকা বিদ্বেষী কাউকে আমি জীবনে প্রথম দেখলাম, সত্যি কথা বলতে গিয়ে এত কট্টর ক্যাপিটালিস্টও আমি আগে দেখিনি, এমনকি আমেরিকাতেও খুঁজে পাইনি। অথচ অ্যাকিলে নিজে ইটালিয়ান, একরাশ দাড়ি গোঁফ নিয়ে যখন নিমাঙ্গে একটা রঙ চটা জিনসের প্যান্টের মধ্যে সেঁধিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মনস্তত্ত্ব পড়ায় তখন কিন্তু ওকে দেখে বারলুসকোনি নয়, মনে পড়বে আন্তোনিও গ্রামশির  কথা। মোদ্দা ব্যাপার হল অ্যাকিলে পরস্পরবিরোধিতার মতন একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট কনসেপ্টকে একটা থ্রী-ডাইমেনসনাল চেহারা দিয়েছে।

তবে সময় সময় আমার এটা খেয়াল থাকে না। যেমন এক্ষুনি ঘটল।

মিনিট দশেক ধরে ছবিটা দেখে টেখে বলল “ফাকিং রিটার্ড”।

আমিও দশ মিনিট ধরেই বোঝা চেষ্টা করছি এটা কার ছবি, ক্যাঙ্গারু না বাইসন না রামপাখি। কিন্তু তা বলে এতটা স্ট্রং ওপিনিয়ন আমি দেব না। বিখ্যাত স্প্যানিশ স্যুররিয়ালিস্ট শিল্পী জোয়ান মিরোর প্রদর্শনী দেখতে এসেছি,  নামের ভারে এ চত্বরে ঢোকা ইস্তক কুঁজো হয়ে আছি।

JM2

আমি বললাম “কিছু একটা মানে আছে, আরেকটু ভালো করে দেখা দরকার মনে হয়।”

অ্যাকিলের এবার একটু ভাবুক দশা “হ্যাঁ, মানে বোঝাটা বেশ কঠিন, ছবিটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে কিন্তু আন্ডারলাইং ইনটেনশন টা কি সে বোঝা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়।”

আমি একটু হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বললাম, “না মানে, ‘মানে’ বলতে ছবিটা যে কি সেটাই বলতে চাইছিলাম”।

অ্যাকিলে আমার দিকে তাকাল, “আমি বুঝতে পেরেছি তোমার পয়েন্টটা। ছবিটায় একজন টুপি পরা ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু সেটা একটা ইল্যুশন। দেখো ওঁর বাঁ দিকে একটা তারা, কিন্তু তারাটা নেমে এসেছে কোমরের কাছে। তার মানে উনি মোস্ট প্রব্যাবলি দাঁড়িয়ে নেই, ভাসছেন সম্ভবত। পায়ের থেকে দেখো একটা পেরেক মতন উঠে আছে, এটাও হতে পারে যে ওনাকে একটা ক্রুশে গেঁথে রেখেছেন আমাদের শিল্পী।”

আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “এটাও হতে পারে তারাটা সেই তারা যেটা যীশু জন্মানোর সময় দেখা গেছিল। আরেকটা এক্সপ্ল্যানেশন হতে পারে যে নারীচেতনা আসলে একটা ক্রুশবিদ্ধ এনটিটি, আমরা শুধু মেয়েদের সুন্দর টুপি পরিয়ে সব যন্ত্রণা ভোলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।”

অ্যাকিলের একটা সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে পিঠে বিশাল চাপ্পড় মেরে বলল, “ফাকিং……”

আর তক্ষুণি বুঝলাম ‘ফাকিং রিটার্ড’ আসলে ফাকিং রিটার্ড নয়, জিনিয়াস।

ততক্ষণে অবশ্য অ্যাকিলে পরের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

JM 3

এবারে অবশ্য আমার আগেরবারের মতন পারফরম্যান্স নয়, বুঝতেই পারলাম শিল্পী  এক মহিলা, এক পাখি এবং  একাধিক তারাকে একসঙ্গে ফ্রেমবন্দী করেছেন।

আমি ফিসফিস করে শুধোলাম, “এই যে মহিলার সারা শরীর জুড়ে শুধুই ওনার ব্রেস্ট, এটা নিয়ে কি বক্তব্য?”

অ্যাকিলে বেজায় চমকাল, “হোলি মোলি! ইউ আর রাইট, আমি তো ভাবছিলাম হার্ট টাকে উলটো করে আঁকা হয়েছে।”

আমি চমকালাম ততোধিক, সত্যিই তো! অ্যাকিলে বলার পর স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছি মহিলার হৃদয়টিকে। কিন্তু গোল বেধেছে আমার বন্ধুকে নিয়ে, আমার ইন্টারপ্রিটেশন শোনার পর থেকেই সে হিসেব কষছে ফের কবে আসা যায়। একদিনে সব ছবির মর্মোদ্ধার করা অসম্ভব ব্যাপার।

অ্যাকিলে বলল, “তোমাকে তো কনজিউমার বিহেভিয়ার পড়াতে হয়। নিশ্চয় জানো ফ্রয়েড বলে গেছেন একটা জিনিস কেনার পেছনে ভোক্তা যে কারণটা দেখায়, আসল কারণ আদৌ সেটা নয়। তার অন্তত দু লেয়ার নিচে পৌঁছলে বোঝা যাবে আদত কারণটি কি।”

আমি ঘাড় নাড়লাম, “সে কথা আর বলতে! এই ধরো একজন আমেরিকান বেবি বুমার হঠাৎ বুড়ো বয়সে এসে স্পোর্টস কার কিনতে গেল কেন? সার্ভে বলছে স্পীড, বুড়োর সাবকনশাস বলছে যযাতি।”

‘যযাতি’ শুনে একটুও ভুরূ কোঁচকাল না – আমাদের মধ্যে এরকম রেফারেন্সের হরদম আদানপ্রদান চলতে থাকে, আক্ষরিক অর্থ না বুঝলেও কিছু এসে যায় না ভাবার্থ বুঝলেই চলবে।

“এক্স্যাক্টলি সো, এবার ভেবে দেখো ছবিটা আঁকা হয়েছে ১৯৪২ সালে। তার মানে স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের তিন বছর পরেই, ওই যুদ্ধ নিয়ে কিছু একটা ব্যঞ্জনা থাকার হাই চান্স। ওই পাখিটাকে জেনারল ফ্র্যাঙ্কো ভাবলে কেমন হয়? দেশমাতৃকার বুক (এই জায়গায় আমি গলা খাঁকরে বললাম “ইয়ে, হৃদয়”) খুবলে নিতে আসছে……”

বলতে বলতে একটু থেকে গেল অ্যাকিলে, তারপর চোখ বড় বড় করে বলল, “আরে স্পেন নয়, স্পেন নয়। ইনি ২০১৪-র পৃথিবী, আর ওই কালো পাখিটা হল……”

অ্যালেগরিক্যাল ভয়ের চোটে আমি পা বাড়ালাম, “এগোনো যাক, নাহলে চার-পাঁচ টা ছবি দেখেই বাড়ি ফিরতে হবে।” টার্কি বর্ডারে যুদ্ধু বেধেছে, কোথায় কোথায় সি-আই-এ, এফ-বি-আই রা ঘাপটি মেরে আছে কে জানে।

JM4

তৃতীয় ছবিটি মোটের ওপর বেশ বিখ্যাত, আমরা একজিবিশনে ঢোকার আগেই জোয়ান মিরোর ওপর গুগল সার্চ করতে গিয়ে পেয়েছি। সেই সুবাদে নামটিও জানা –  ”Women dreaming of escape”।  এখন আপনি যদি প্রশ্ন করেন রমণীকূল কোথায় তাহল একটু বিপদে পড়তে হতে পারে। দূর থেকে দেখলে ছবির মাঝখানে তিনটে শিংওলা গরুর মাথার মতন যে বস্তুটি দেখতে পাচ্ছেন, অ্যাকিলের ধারণা  সেটি আসলে এক ভগ্নহৃদয়া নারী। সমস্যাটা হল ছবি পরিচিতিতে বলা হয়েছে জোয়ান শুধু ছবিই আঁকেন নি এ ক্ষেত্রে, ছবির মধ্যে রেখে দিয়েছেন অসামান্য সব ক্যালিগ্রাফি। কিন্তু ভগ্নহৃদয়া নারী আদৌ কোনো শাব্দিক দ্যোতনা ছড়াচ্ছেন কিনা সেকথা ‘অক্ষরে অক্ষরে’ মেলানো গেল না। আমি একটু হতাশ হয়ে পিছিয়ে এসে ইতিউতি তাকাচ্ছিলাম, যদি মিউজিয়ম কিউরেটর বা অন্তত পক্ষে কোনো গাইডের সন্ধান পাই। সেরকম কাউকে দেখতে পেলাম না, অ্যাকিলেকে ডাকতে গিয়ে ছবিটার ওপর আবার চোখ পড়ল। আর তক্ষুনি বুঝলাম ইউরেকা মোমেন্ট কাকে বলে।

আমার ডাকাডাকিতে অ্যাকিলেও পিছিয়ে এসেছে, ওকেও দেখালাম কেন সামনে থেকে এ ছবি বুঝতে অসুবিধা আছে। সামনে থেকে যা মনে হচ্ছে ভেঙ্গে যাওয়া হৃদয়, দূর থেকে দেখলে সেটাই বোঝা যাচ্ছে আস্ত একটা শরীর। আগেরবারকে হার্টকে ব্রেস্ট ভেবেছিলাম, এবারে প্রায় উল্টোটা – হার্ট আই মীন শরীরের মধ্যে ব্রেস্টের আভাসটুকুও দিব্যি বোঝা গেল এবার। কানের পাশ থেকে শিং এর মতন তিনটে যে লাইন বেরিয়েছে অ্যাকিলে পাঠোদ্ধার করে বলল ওগুলো নেহাতই চুল।  আর ওর পাশেই যে গোল্লা আর সরলরেখার কম্বিনেশনটা দেখতে পাচ্ছেন সেটা আর কিছুই নয় – মই। এবারে এসকেপ রহস্য বোঝা গেল তো?

অ্যাকিলে এদিকে দেখি খুঁতখুঁত করছে, হাত দুটো মুঠো করে বেশ উত্তেজিত ভঙ্গীতে নাড়ানাড়ি করছে। ইটালিয়ানরা হাত দিয়েই কথা বলে, সেটা ইটালি ঘুরতে গিয়েও দেখেছি। অ্যাকিলের হাতের ভাষা আক্ষরিক অর্থে বুঝতে না পারলেও বেশ বোঝা গেল স্পীচ বাবলে ওকে কনভার্ট করতে গেলে মড়ার খুলি, বাজ, স্পাইর‍্যাল এসব দিয়েই কিছু বোঝাতে হবে। আমার দিকে ঘুরে বলল “এই ছেলেমানুষি দেখার জন্যই কি পয়সা খরচ করে এলুম?” আরো চটে যাবে ভেবে ওকে আর মনে করালাম না যে প্রফেসরদের ঢোকাটা ফ্রী, তার ওপর আবার ইউনিভার্সিটিরই অ্যালুমনি মীট ওই মিউজিয়মের ওপর তলাতেই হচ্ছে বলে শরাব এবং আনুসঙ্গিক চাটপত্র-ও নিখরচায় পাওয়া যাচ্ছে। ওর উত্তেজনার কারণটা বোঝার চেষ্টা করছি, অ্যাকিলে বলল “মইটা কোথায় পৌঁছেছে দেখো? পাখিটার কাছে।” বুঝলাম ওই ঢেউ খেলানো রিবনের মতন জিনিসটা পাখি। “কোন মহিলা স্বপ্নে পাখি হয়ে উড়ে যেতে চায়? স্বপ্ন নিয়ে ফক্কুড়ি করলেই হল?” আমি চুপ করে গেলাম, ফ্রয়েড- ইয়ান ওয়ালেস গুলে খাওয়া সাইকোলজির প্রফেসরের সঙ্গে স্বপ্ন নিয়ে আলোচনার ধৃষ্টতাই নেই, তার কথায় সন্দেহ করা তো দূরস্থান। ভাবলাম একবার বলি – মই হয়ত নিয়ে যাবে অন্য কোনো দুনিয়ায়, পাখিটা নেহাতই এ পৃথিবীর শেষ সিম্বল। কিন্তু কি দরকার বাবা ঘাঁটিয়ে; ইদানীং বার বার স্বপ্ন দেখছি হায়ার সেকন্ডারির কেমিস্ট্রী সেকন্ড পেপারের পরীক্ষা দিতে বসেছি, এদিকে ইকোনমিক্সের থিয়োরী ছাড়া কিছুই মনে পড়ছে না। একদিন তো ক্ষেপে গিয়ে শেষে অগস্ট কেকুলে স্বপ্নে একটা সাপকে নিজের লেজ চিবিয়ে খেতে দেখে কিভাবে বেঞ্জিনের রিং আবিষ্কার করেছিলেন সেই গপ্পোটাই লিখে দিয়ে এলাম কিন্তু যে ভাবে বারবার পরীক্ষার স্বপ্ন ফিরে আসছে তাতে বোঝা যাচ্ছে পরীক্ষক ও গল্প পড়ে সন্তুষ্ট হন নি। এখন এ বিদেশ বিভূঁই-এ ফ্রী তে কাউন্সেলিং করাতে গেলে ওই অ্যাকিলেই ভরসা, চটে গেলেই কম্মো শেষ।

 

সে দেখি ততক্ষণে ঘরের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে অন্য সব ছবি না দেখেই, কারণ সেখানে বিশাল একটি স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে মিরোর বিখ্যাত ‘ফ্যান্টাসম্যাগোরিক’ ভিনগ্রহীদের একজন – সেইসব ভিনগ্রহী যাদের শুধুমাত্র আপনার কল্পনা অবচেতন মনের পাথর কুঁদে কুঁদে তৈরী করতে পারে।

 

JM_Alien

 

দূর থেকেই দেখতে পেলাম অ্যাকিলে হাতের মুঠো ঝাঁকাচ্ছে। আমি নিঃশব্দে সরে গিয়ে আরো তারা, আরো পাখি, আরো বিশালহৃদয়া নারীদের সান্নিধ্যে বাকি সময়টুকু কাটানোর চেষ্টা করছিলাম, আচম্বিতে কানের কাছে ভারী হাঁই-মাঁই আওয়াজ। তাকিয়ে দেখি আমার বন্ধু, বেজায় উত্তেজিত। মুঠো ভাষায় টের পেলাম আমি কিছু একটা বিশাল বোকামি করে ফেলেছি।  হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেল ফ্যান্টাসম্যাগোরিক মনস্টারের সামনে। “কি বুঝছ?”

আমি ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থায় দাঁড়িয়ে।

“ক্রেজি বাস্টার্ড ম্যান, ক্রেজি বাস্টার্ড!”

আমি আরেকটু ভালো করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম ভিনগ্রহীকে আদৌ ক্রেজি বাস্টার্ড সুলভ দেখতে লাগছে কিনা। আর আবারো ঠাহর হল ভুল করেছি।

ওহেন মধুর সম্ভাষণ সৃষ্টি নয়, বরাদ্দ হয়েছে স্রষ্টার জন্য।

বেজায় উত্তেজিত অবস্থাতেই জিজ্ঞাসা করল, “কি দেখতে পাচ্ছি স্কাল্পচার টার মধ্যে?”

আমি ইতস্তত করে বললাম “কুমড়োপটাশ”।

ইয়ার্কি নয়, জোয়ান মিরোর ভিনগ্রহীর হাত-পা ঠিক সুকুমারের কুমড়োপটাশের মতনই। কিন্তু অ্যাকিলে এই মুহূর্তে বাঙ্গালী রেফারেন্স নিয়ে রঙ্গরসিকতার করার পক্ষে একটু বেশীই উত্তেজিত হয়ে আছে। “নো ফটাশ ম্যান, লুক অ্যাট হিজ পিনাস”।

তাকালাম; জায়গাটা প্রায় পেট আর তলপেটের মাঝখানে হলেও মনে হল অ্যাকিলে ধরেছে ঠিকই।

অ্যাকিলের চোখ গোল গোল হয়ে গেছে, ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে “বুঝলে না? ভাস্কর এখানে নিজেই ছেলেমানুষ হয়ে গেছেন, ছেলেমানুষী খেয়ালে গড়ে তুলেছেন এক ছেলেমানুষী দৈত্য।”

আমি ভয়ে ভয়ে শুধোলাম “কিন্তু পিনাস”?

“আহ হা, ওটাই তো কথা। সারা শরীরের মধ্যে তোমার ওটাই চোখে পড়ছে কিনা?  হবেই তো। অস্বস্তিও হচ্ছে কিনা? তাও তো হবেই। কারণ তুমি একটা ধেড়ে। আজ তুমি একটা শিশু হলে এ সমস্যা হত না। শিশুদের থেকে ইনোসেন্ট আর কে আছে, আর তাই জন্য একমাত্র তারাই পারে নির্দ্বিধায় তাদের যৌনাঙ্গকে একজিবিট বানাতে। সেই সঙ্গে এটাও মনে রেখো যে ফ্রয়েড বলে গেছেন শিশুদের যৌনচেতনার প্রথম উন্মেষ ঘটে স্তন্যপানের সঙ্গে সঙ্গেই”।

এই প্রথমবারের জন্য ওকে স্পষ্টাস্পষ্টি বলতে শুনলাম, “ব্রিলিয়ান্ট, ব্রিলিয়ান্ট, ব্রিলিয়ান্ট”। ভারী খুশী হয়ে দু মুঠো ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে এগিয়ে গেল অ্যাকিলে।

মাথা নেড়ে জোয়ার মিরোর তারিফ করতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ খেয়াল হল বার বার তিনবার একই ভুল করছি না তো!

কাকে বলল ব্রিলিয়ান্ট? জোয়ান মিরো নাকি নিজেকেই?

JM1