নীরস বিজ্ঞান

আর এক  ঘন্টার মধ্যে এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল কারা পেলেন সেটা জানা যাবে, অর্থনীতির ছাত্র হওয়ার সুবাদে প্রতি বছরের মতনই এবারেও আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি খবরটার জন্য। সম্ভাব্য পুরস্কার প্রাপকদের মধ্যে উঠে এসেছে উইলিয়াম বমলের নাম, যাঁর বয়স এখন ৯২, একজন অন্ত্রপ্রেনিওর হিসাবে আপনার নেওয়া সমস্ত সিদ্ধান্তের পেছনেই যে যুক্তিগ্রাহ্য অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা থাকা দরকার সেটা প্রমাণ করতে আজ থেকে চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছর আগেই ইনি উঠেপড়ে লেগেছিলেন। আজকে বিশ্ব জুড়ে যখন স্টার্ট-আপ কোম্পানিগুলোর রমরমা দেখছেন, ফেসবুক থেকে শুরু করে হোয়াটসঅ্যাপ প্রতিটি সফল অন্ত্রপ্রেনিওরাল ভেঞ্চার দেখে অসংখ্য তরুণ-তরুণী উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন তখন বমলের কাজ যেন আরো যুগধর্মী হয়ে উঠেছে। নাম উঠে এসেছে দুই ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদের – অ্যান্থনি অ্যাটকিন্সন এবং অ্যাঙ্গাস ডিটনের (অ্যাঙ্গাস যদিও বহু বছর ধরেই প্রিন্সটনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক), এনারা পেলে সেই ১৯৯৮ সালের পর আবার কোনো  ডেভলপমেন্ট ইকোনমিস্ট নোবেল পাবেন; বলা বাহুল্য যে সে বছর অমর্ত্য সেন নোবেল পেয়েছিলেন। অমর্ত্যর কাজের তুলনায় অ্যাটকিন্সন এবং ডিটনের কাজ অবশ্য অনেক বেশী ডেটা-নির্ভর, অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে দুজনের কাজই যুগান্তকারী। বহু বছর ধরেই ঘোরাফেরা করছে আরেক বাঙ্গালী পার্থ দাশগুপ্তর নাম (যদিও ইনি ব্রিটিশ নাগরিক), প্রথমবার ‘পরিবেশ অর্থনীতি’ পড়তে গিয়ে দেখেছিলাম থিয়োরেটিক্যাল ফ্রেমওয়ার্কের অনেকটাই এনার তৈরি করা – যদি নোবেল পান তো সেই সুবাদেই পাবেন। উঠে এসেছে ফ্রেঞ্চ অর্থনীতিবিদ জঁ টিরোলের নাম, মাইক্রোইকোনমিক ফাউন্ডেশনের সাহায্যে কর্পোরেট ফাইন্যান্সের তাত্ত্বিক বুনিয়াদ গঠন করার জন্য ইনিও পেতে পারেন নোবেল। টিরোল অবশ্য গেম থিয়োরিস্ট-ও, সেই সুবাদে বাকিদের থেকে ওনার কাজ অনেক বেশী পড়ার সুযোগ ঘটেছে আমার – বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ এই অর্থনীতিবিদের এ বছর নোবেল পাওয়ার চান্স একটু কম কিন্তু কোনো একদিন যে পাবেন সে নিয়ে মোটামুটি সবাই একমত।

ইকোনমিক্সকে সাধারণ মানুষ  নীরস বিজ্ঞান (ডিসম্যাল সায়েন্স) বলে জানেন, ২০০৮ এ বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক ধ্বস দেখার পর অনেকে একে বিজ্ঞান বলতেও রাজি নন অবশ্য, কিন্তু আজকে বরং অর্থনীতির নোবেল নিয়ে কিছু মজার ঘটনা শোনাই আপনাদের।

৯৫ সালে নোবেল পেয়েছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট লুকাস, অর্থনীতির ছাত্রছাত্রী মাত্রেই জানেন ইকোনমিক গ্রোথ নিয়ে গবেষণায় লুকাস প্রায় প্রবাদপুরুষ। নোবেল পাওয়ার পর অবশ্য লুকাসের থেকেও বেশী আহ্লাদিত হয়েছিলেন লুকাসের ভূতপূর্ব স্ত্রী। ডিভোর্স নিলেও লুকাসের কাজের ওপর গভীর আস্থা ছিল তাঁর, তাই ডিভোর্সের একটি শর্ত ছিল লুকাস কোনোদিন নোবেল পেলে মোট টাকার অর্ধেক ইনি পাবেন। আরো মজার ব্যাপার লুকাস সেই বছরে নোবেল না পেলে শর্তটি আর খাটত না। যাই হোক, লুকাসকে গুনে দিতে হয় হাফ মিলিয়ন ডলার; “আ ডিল ইজ আ ডিল” বললেও লুকাস পরে বলেছিলেন “আমার নোবেল পাওয়া নিয়ে আমার নিজের অতটা আস্থা থাকলে যেন তেন প্রকারে ওই শর্তটা রদ করতাম”। বুঝতেই পারছেন, বৌদের কথা শোনাটা কত জরুরী, ডিভোর্সের পরেও।

সোশ্যাল সায়েন্স নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাদের মধ্যে অর্থনীতিবিদদের ‘ফিজিক্স এনভি’ দেখবার মতন, অর্থাৎ ফিজিক্সের মডেল বা যে কোনো হার্ডকোর গাণিতিক মডেল দিয়ে অর্থনৈতিক তত্ত্ব বিশ্লেষনের অভ্যাস এনাদের বহুদিনের, সে নিয়ে অবশ্য কম সমালোচনা-ও হয় না। পদার্থবিদ বা গণিতবিদদের কাছে অবশ্য সে সবই বেশ বালখিল্য কাজ।  হার্ভার্ডের গবেষক  ভ্যাসিলি লিওনটিয়েফ পুরস্কার পেয়েছিলেন ৭৩-এ, নোবেল ডিনারে সে বছরের ফিজিক্স নোবেল লরিয়েট শুধোলেন “কি নিয়ে আপনার কাজ?” লিওনটিয়েফ জানালেন তিনি তৈরি করেছেন ইনপুট-আউটপুট মডেল যা দিয়ে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে অর্থনৈতিক আদানপ্রদানের পদ্ধতি জলের মতন বোঝা যাবে। মুশকিল হল সেটার টেকনিক্যাল দিকটুকু বোঝাতে গিয়ে; শুনে টুনে ফিজিক্স লরিয়েট পাশেই বসে থাকা কেমিস্ট্রি লরিয়েট কে ফিসফিস করে বললেন, “কান্ড দেখেছ? একটা ম্যাট্রিক্সের ইনভার্স বার করার জন্য  কমিটি এনাকে নোবেল দিয়ে দিয়েছে”।

অঙ্কটা যাঁরা অর্থনীতিবিদদের থেকেও ভালো বোঝেন সমস্যা শুধু তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতাতেই নয়, সাধারণ মানুষদের ‘লেম্যান টার্মস’-এ গবেষনার কাজ বোঝাতে গিয়েও মাঝে মধ্যেই হাঁড়ির হাল হয় অর্থনীতিবিদদের। ৮১ সালে নোবেল পেয়েছিলেন ইয়েলের জেমস টবিন, তাঁর কাজ পোর্টফোলিও থিয়োরী নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে তিনি যতই প্রাঞ্জল করে তাঁর কাজ বোঝানোর চেষ্টা করেন, সাংবাদিকরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না। শেষমেশ টবিন বললেন, “এক লাইনে যদি আমার কাজ বলতে বলেন তাহলে হয়ত বলব – don’t put all your eggs in one basket”। সাংবাদিকরা ভারী খুশী হয়ে চলে গেলেন, ফল হল এই যে পরের দিন স্থানীয় কাগজে লেখা  হল পরের বছর “An apple a day, keeps the doctor away” বলার জন্য চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল দেওয়া হবে।

তবে সব থেকে খারাপ অবস্থা হয়েছিল ৯৭ সালের পুরস্কার প্রাপক রবার্ট মার্টন এবং মায়রন শোলসের – ফাইন্যান্সের যে তত্ত্বের উদ্ভাবনের জন্য তাঁরা নোবেল পেলেন, সেই তত্ত্ব খাটাতে গিয়েই এক বছরের মধ্যে উঠে গেল তখনকার দিনের নামজাদা হেজ ফান্ড, লং টার্ম ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট। মার্টন এবং  শোলস দুজনেই বহু বছর ধরে বোঝানোর চেষ্টা করে এসেছেন এটা তাঁদের তত্ত্বের দোষ নয় কিন্তু ভবি কি আর ভোলে? দুজনের প্রাণান্তকর চেষ্টা জনমতে বিশেষ ছাপ ফেলতে পারেনি আরো একটা কারণে – দুজনেই ছিলেন লং টার্ম ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টর কন্সাল্ট্যান্ট রিসার্চার, অফিসিয়াল পদমর্যাদার হিসাবেও যা প্রায় ডিরেক্টরের সমতুল্য।

দেখা যাক ২০১৪ এরকমই কোনো নাটক নিয়ে আসে কিনা।

Nobel_Prize

Advertisements

One thought on “নীরস বিজ্ঞান

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s