মস্ত অসুরের গল্প

গত সপ্তাহে মহিষাসুর বিদায় নিয়েছেন কিন্তু এ উপলক্ষে একটু দেখে নিচ্ছিলাম অসুর সমাজের সেলিব্রিটি কারা – বৃত্রাসুর, বকাসুর  থেকে শুরু করে রুক্মাসুর, দুর্গাসুর হয়ে এমনকি ঘ্যাঁঘাসুরকেও মনে পড়ল।  আর তারপরেই মনে পড়ে গেল সেই মস্ত অসুরকে।

এই মস্ত অসুর কে সে কথা বলার আগে একটু খেজুরে কথার দরকার। ভাবুন আপনাদের পাড়ায় দুই পান্ডা, দুজনেরই বিশাল দলবল আছে এবং দু’দলের মধ্যে সদাই ঘোরতর কনফ্রন্টেশন। প্রায় ওয়েস্ট সাইড স্টোরির সেটিং, তবে একটু আলাদা – এখানে আপনার নিউট্রাল হয়ে থেকে মজা দেখার উপায় নেই। কোনো একটা সাইড নিতেই হবে – এবার কার দিকে যাবেন সেটা আপনার ইডিওলজির ওপর নির্ভর করতে পারে, আবার হয়ত কোনো এক পান্ডার দিকে আপনার ছোটকা কি আপনার প্রেয়সীর বড়দা কেউ না কেউ অলরেডি ঝুঁকে আছেন, আপনিও সেই বুঝে দল ভারী করলেন। এবার হল কি দল ভারী করতে করতে পান্ডা নম্বর দুই এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গোদের ওপর বেজায় ক্ষেপে গেলেন, পান্ডা নম্বর ওয়ান এবং তাঁর ডেপুটিদের ভাষণ শুনে শুনে আপনার বদ্ধমূল ধারণা যে পান্ডা নম্বর দুই এবং তাঁর অপোগন্ড শাগরেদরা পৃথিবীর বোঝা বাড়ানো ছাড়া জীবনে কিছুই করে উঠতে পারেননি।  এই পর্যন্ত ঠিক ছিল কিন্তু মুশকিল হল আপনার জিগরি দোস্ত, যে আবার কিনা আপনার নেমসেক-ও তার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায়। শুনলেন যে তিনি ভিড়েছেন পান্ডা নম্বর দুইয়ের দলে, এবং ঠিক আপনার মতনই তাঁরও একটা জোরদার বিশ্বাস আছে – পান্ডা নম্বর ওয়ান এবং তাঁর দলবল যে দেশ এবং দশের পক্ষে নেহাতই অশুভ এক শক্তি সে ব্যাপারে তাঁর কোনো সন্দেহই নেই। আপনি পড়লেন ফাঁপরে; স্কুলের ব্যাকবেঞ্চ থেকে খালাসীটোলার কাঠের বেঞ্চ, প্রদীপ সিনেমাহলের জলে ডোবা মেঝে থেকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ইন্টারভিউ রুম – পাপ, পুণ্য যাই করেছেন একসঙ্গে করেছেন এবং তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল বদ ফন্দী, ভালো ফিকির যাই ভেঁজেছেন দুজনে মিলেই ভেঁজেছেন। সুতরাং, আপনার বিশ্বাসই ঠিক বিশ্বাস কিনা সে নিয়ে একটু সন্দেহ জাগল, কিন্তু ইডিওলজি বা প্রেম বড় বালাই। বন্ধুত্বের মায়া কাটিয়ে আপনি দুই নম্বরের গুষ্টি উদ্ধারে ফের লেগে পড়লেন।

একেবারে হাইপথেটিক্যাল সিচুয়েশন নিশ্চয় নয়, আপনি না পড়লেও আপনার চেনাশোনা অনেকেই হয়ত এরকম বিভ্রাটে পড়েছেন – ফুটবল টিম থেকে রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কর্পোরেট রাইভ্যালরি বহু ক্ষেত্রেই এরকমটি হয়ে এসেছে। কিন্তু আপনিই যে ঠিক আর বাকিরা ভুল, এরকম কনভিকশনের জায়গা কোথায়? জেদাজেদির ব্যাপারটা বাদ দিলে বুকে হাত রেখে কি বলা যায় এক পক্ষ একশ শতাংশ ঠিক, আর এক পক্ষ একশ শতাংশ ভুল? এক দল একশ শতাংশ সৎ, আর অন্য টীমের গোটাটাই অসৎ? এক দল শুধুই প্রতিনিধিত্ব করে শুভশক্তির আর অন্য পার্টির সদস্যরা সব শয়তানের চেলা?

এবার কষ্ট করে আরেকটু ভাবুন যে – কিছু হাজার বছর আগে ঠিক এমনটিই ঘটেছিল, দু দলের নাম যথাক্রমে দেব আর অসুর। রাগারাগি থেকে মারামারি, মারামারি থেকে কাটাকাটি হতে হতে দু দলেরই শক্তিক্ষয় হতে লাগল; শেষে নিজেদেরকে টিঁকিয়ে রাখার তাগিদে দু দল চলে গেলে দুই বহু দূর দেশে। যে দেশে দেবরা গেল সেখানে বংশানুক্রমে লোকে জেনে এল যে দেব মানে শুভ আর অসুর মানে অশুভ আর উল্টোদিকে অসুরদের দেশে ছেলেপুলেরা শিখতে লাগল ঠিক উল্টোটা।

আদৌ কি এরকম হয়ে থাকতে পারে?

বিংশ শতকের শুরুতেও ইতিহাসবিদ এবং নৃতাত্ত্বিকরা বিশ্বাস করতেন আফগানিস্থান এবং উত্তর পারস্যের মাঝামাঝি কোনো অঞ্চল থেকে তথাকথিত সভ্য  আর্যদের ভারতে আগমন ঘটে। এদেরই আর এক দল ইরানেই থেকে যায়, আর যে ধর্মবিশ্বাসে এনারা নিজেদের জড়িয়ে ফেলেন তারই সামান্য পরিবর্তিত সংস্করণটি হল জরোস্ত্রিয়ানবাদ। এখানে আরেকটা ছোট কথা বলা যায় – ভারতের পার্সীরাও কিন্তু অগ্নি উপাসক এই ইরানিদেরই উত্তরপুরুষ, তার মানে দেশান্তরী হওয়ার প্রক্রিয়াটি একবার ঘটেই থেমে যায়নি কারণ পার্সীদের অনেক আগেই আর্যরা এসে হাজির।  বিশের দশকে হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো প্রভৃতির সন্ধান পাওয়া যাওয়ার পর অবশ্য বহু গবেষকই বলতে থাকেন সভ্য আর্যরা অসভ্য অনার্যদের দেশে আসার বদলে উল্টোটাই ঘটেছে, অনুন্নত আর্যজাতি আক্রমণ করে দখল করেছে তুলনামূলক ভাবে উন্নত অনার্যদের দেশ – তাই migration এর বদলে শুরু হয় invasion শব্দটির ব্যবহার। Migration শব্দটি ফের ফিরে আসে যখন বেশ কিছু ইতিহাসবিদ বলতে শুরু করেন হরপ্পাতে কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ বা বিদেশী আক্রমণের চিহ্নটুকু পাওয়া যায় নি। এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরাও বলতে থাকেন আক্রমণের চিহ্ন না পাওয়ার অর্থ ভারতে কোনোকালেই বিদেশী ঢোকেনি,  আর্যরা এ দেশেরই লোক। ২০০8 সালে বিজ্ঞানী স্টিফেন ওপেনহাইমারের বই “আউট অফ ইডেন” বেরোনোর পর হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা আরো জোর দিয়ে এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন – ওপেনহাইমারের গবেষণা দেখাচ্ছে নব্বই হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে মানুষ লোহিতসাগর পেরিয়ে ভারতে ঢোকেন, এনার আরো দাবী সমস্ত নন-আফ্রিকান মানুষদের পূর্বপুরুষ এঁরাই। কোনটা সঠিক তত্ত্ব সে নিয়ে বিতর্ক এখনো পুরোদমে বহাল। এরই মাঝে আবার  রোমিলা থাপার জানালেন আর্য একটি জাতি এই ধারণাটাই ভুল, আর্য একটি ভাষার নাম। কারা আর্য ভাষা বলতেন সেটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত, আর সেই উত্তর পেলেই হয়ত এই ধাঁধার একটা সমাধান পাওয়া যাবে।

তাই আর্য কি বা কারা সেই নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও হাজার তিন – সাড়ে তিন বছর আগে যে উত্তর ভারতীয় এবং পারস্যের মানুষদের ভাষা এবং ধর্মবিশ্বাসে অনেকটাই মিল ছিল সে নিয়ে সন্দেহ নেই। জরথুষ্ট্রের কথাই ধরুন, নামটির মধ্যে লুকিয়ে আছে দুটি শব্দ –  জরত এবং উষ্ট্র। উষ্ট্র আমাদের উটই, তবে জরত শব্দের মানে নিয়ে একাধিক মত থাকলেও একটি ডমিন্যান্ট মত হল সংস্কৃত হারীত শব্দেরই সহোদর এটি। অর্থাৎ, যিনি সোনালী রঙের উটে চড়ে এসেছেন বা যিনি সোনালী উটদের দেখাশোনা করেন তিনিই  জরথুষ্ট্র। হাজার হাজার এরকম ফার্সি শব্দে আপনি সংস্কৃত বা সংস্কৃত শব্দে ফার্সি লুকিয়ে থাকতে দেখবেন। সেরকই আরেকটি শব্দগুচ্ছ হল –  আহুর মাজদা। আহুর বলা বাহুল্য যে অসুর এবং মাজদা হল সংস্কৃত মেধারই শব্দান্তর। সুতরাং, মেধাবী বা জ্ঞানী অসুরই হলেন আহুর মাজদা। প্রাচীন পারস্যে কিন্তু আহুর মাজদা পূজ্য ভগবান, যিনি জ্ঞান এবং সত্যের পথ দেখান; আর যাঁরা সাধারণ মানুষের বুদ্ধিবিভ্রম ঘটান, শঠতার পথ দেখান তাঁরাই দেভা। আধুনিক ভাষাতত্ত্ব অনুযায়ী ভারত এবং পারস্য দু দেশেই এই এক দল যতটাই ভালো, অন্য দল ততোটাই খারাপ এই ডাইকোটমি এসেছে আদি বৈদিক যুগের অনেক পরে।  আদি বৈদিক যুগ বা জরথুষ্ট্রের আমলে কিন্তু দু জায়গাতেই এই ডাইকটোমি ছিল না, ভালো-খারাপের হিসেব আমরা তখনো করে বসি নি। তাই ঋকবেদে অসুররাই আদি দেব,  আমরা যাঁদের দেবতা বলে চিনে এসেছি তাঁদের আগমন ঘটতে তখনো বেশ দেরী। ম্যাক্সমুলার জানিয়েছিলেন শুরুতে দেব কথাটির অর্থ ছিল উজ্জ্বল – আকাশ, তারা, সূর্য, দিন সব কিছুর ঔজ্জ্বল্য বোঝাতেই এই শব্দটি ব্যবহৃত হত। কে জানে তারুণ্যের দীপ্তি বোঝাতেই দেব কথাটি চলে এসেছিল কিনা।  এখন এই চ্যাংড়া দেবতাদের লীডারটিকে আমরা সবাই চিনি – ইন্দ্র। কিন্তু আদি দেব অর্থাৎ অসুরদের প্রধান কে বলুন তো? বাহনটি দেখে শনাক্ত করতে পারেন কিনা দেখুন।

 

Varuna

হ্যাঁ, মকরাসীন বরুণ-ই অসুরপ্রধান। বরুণ যে জলের দেবতা সে তো আমরা জানি আর ওদিকে যে আহুর মাজদার কথা বলছিলাম তিনিও কিন্তু celestial ocean এর দায়িত্বে, সেই অলৌকিক সমুদ্র যা নাকি পৃথিবীকে চারপাশ থেকে ঘিরে রয়েছে। পারস্যের আহুর মাজদা এবং ভারতের বরুণের এই সাদৃশ্য চমকপ্রদ; কেউ কেউ শুক্রাচার্যকে (যেহেতু অসুরদের গুরু) আহুর মাজদা বললেও, বরুণই যে সেই মস্ত অসুর সে নিয়ে সন্দেহ নেই। ও হ্যাঁ, জ্ঞানের বিশাল পরিধির জন্যই হয়ত অনেক সাধারণ ভক্তদের কাছেই মাজদা শব্দটি দাঁড়িয়েছে ‘বিশাল’, এ বিশালের সঙ্গে অবশ্যই আকারআকৃতির  কোনো সম্পর্ক নেই।  যাই হোক, পুরাণ জানাচ্ছে নতুনের কাছে পুরনোকে হার স্বীকার করতে হয় – ইন্দ্রের নেতৃত্বে দেবতারা বিদ্রোহ করলে অসুরদের সরে যেতে হয়। আর বেদ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বরুণ এবং অন্যান্য অসুর যেমন মিত্র, পৃথ্বী কি ঊষাদের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে সাঙ্ঘাতিক ভাবে (তখনো কিন্তু ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর রা প্রায় অজানা)। এমন কি একটা সময়  মিত্র এবং বরুণকে একসঙ্গে মিলিয়ে এক নতুন অবতারেরই সৃষ্টি করে ফেলা হয়েছে, যাঁর নাম মিত্রাবরুণ (জরথুষ্ট্রর আভেস্তা তেও কিন্তু এক মিথ্রা রয়েছেন যাঁকে আহুর মাজদা নিজের হাতে তৈরী করেছেন) । ঊষাকে শুরুতে দেবতাদের মা বলা হলেও পরের দিকে বলা হচ্ছে ইন্দ্র নিজেই নাকি নিজের মা-বাবাকে সৃষ্টি করেছেন। আমার মনে হয় অবাস্তবতা এখানে ফ্যাক্টর নয়, কি ভাবে নতুন রক্ত যেন তেন প্রকারে ওল্ড অর্ডারকে অস্বীকার করছে সেটাই দেখার।

বহু পরে অসুর শব্দটির সঙ্গেই জড়িয়ে দেওয়া হয় এক অশুভ অর্থ, হয়ত এই ইয়ং ব্লাডের আদেশেই। আরো একটি জিনিস লক্ষ্য করার – আদি অসুরদের কারোর নামের সঙ্গেই কিন্তু অসুর শব্দটি জড়িয়ে নেই অথচ পরে প্রত্যেক অসুরের নামের মধ্যেই অসুর শব্দটি রয়েছে, যেমন মহিষাসুর। দু’ভাবে ব্যাপারটিকে বিশ্লেষণ করা যায় –  ক) পুরাণ প্রণেতারা উইচ হান্টিং শুরু করে দিয়ে গেছেন, রাজত্বের ব্যাপারে দেবতাদের সঙ্গে যারাই যুদ্ধে জড়িয়েছেন প্রত্যেককে ট্যাগ করা হয়েছে অসুর বলে, খ) যারাঁ পুরুষানুক্রমে ওল্ড অর্ডারের প্রতি আস্থা রেখেছেন বা আনুগত্য দেখিয়েছেন, তাঁরা সাধ করে নিজেরাই অসুর নামটি ঢুকিয়ে নিয়েছেন নিজেদের নামের মধ্যে – বৃত্র নামটি তো এমনিই থাকতে পারত, তাই নয় কি? কিন্তু হতেই পারে যে বৃত্রের কাছে অসুর শব্দটি একটি গর্বের প্রতীক।

পরের পুজোয় বৃষ্টি পড়তে দেখলে একবারের জন্য কি মনে হবে না ওল্ড অর্ডার  সেই মস্ত অসুরের নেতৃত্বে প্রতিহিংসা নিতে নেমেছেন? যতই হোক, মা দুর্গাও ইয়ং ব্লাডের দলেই পড়েন।

 

Advertisements

3 thoughts on “মস্ত অসুরের গল্প

  1. Superb! একসঙ্গে তথ্য, ও জমজমাট লেখা পড়তে এত ভাল লাগে | অসাধারণ, বার বার বলতে হয়!

    Like

  2. Tandra says:

    Brilliant! One suggestion/request, can you please start giving a reference book list at the end of each post? I’d like to read some of your research books..

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s