অন্য গ্রহে

ভারতের মঙ্গল গ্রহে সফল অভিযানের খবর এতক্ষণে সবাই জেনে গেছেন, সেলিব্রেশনের ফাঁকে স্মরণ করা যাক বাংলার কিছু সফল মহাকাশযাত্রীকে যাঁরা ইসরোর মঙ্গলযানের  বহু আগেই পাড়ি দিয়ে এসেছেন অন্য গ্রহে (কখনো সখনো উপগ্রহেও)।

Premendra Mitra

 

(প্রেমেন্দ্র মিত্রর ছবি – লেখক)

১) সমর রায় এবং অজয় চক্রবর্তী –  দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কয়েক বছর আগে এক প্রায়োন্মাদ জার্মান বৈজ্ঞানিকের পাল্লায় পড়ে এনারা চলে গেছিলেন শুক্র গ্রহে, যদিও প্রথমে মঙ্গল গ্রহে যাওয়া হচ্ছে এরকম একটা ভুল ধারণা তৈরি হয়ে যায়। শুক্র যে শুধু কাছের গ্রহ তাই জন্যই নয়, জার্মান বৈজ্ঞানিক ডক্টর ব্রুলের ধারণা মঙ্গল মৃতপ্রায় গ্রহ তাই সেখানে এক্সপ্লোর করে বিশেষ লাভ নেই (বলা বাহুল্য যে ইসরোর বিজ্ঞানীরা কর্ণপাত করেননি, আশা করা যায় পরে পস্তাতে হবে না)। জীবন্ত গাছের (সব গাছই জীবন্ত কিন্ত এরা রীতিমতন নড়াচড়া করে) জঙ্গল,  প্রলয়ঙ্কর বৃষ্টি, গন্ডারের মতন দেখতে পাহাড়প্রমাণ জানোয়ার, জগতনাশা ভূমিকম্প – বহু বিপদের মধ্যেই পড়তে হয়েছে শুক্রে গিয়ে তবে ভালো খবরও আছে – যেমন শুক্রের হাওয়া বিষাক্ত নয়, পৃথিবীর থেকে একটু আলাদা হলেও শ্বাস নেওয়াতে সমস্যা নেই। এনাদের অভিযানের কথা বিশদে পড়তে হলে চাই “শুক্রে যারা গিয়েছিল” (প্রেমেন্দ্র মিত্র)।

ghanada

(আদত ছবি – সমীর সরকার; বৈদ্যুতিন  সংস্করণ – লেখক)

২) ঘনশ্যাম দাস –  ঘনশ্যাম দাস ওরফে ঘনাদাকে আপনারা প্রায় সবাই চেনেন, তবে তাঁর মঙ্গলগ্রহের অভিযানের খবরটা সবার মনে আছে কিনা সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। যাওয়ার কথা ছিল দিল্লী থেকে আমেদাবাদ, সর্বনাশা এক ঝড়ের চোটে আমেদাবাদের বদলে গিয়ে উপস্থিত হন মঙ্গল গ্রহে। নেমেই পেয়েছিলেন অস্বাভাবিক এক ধুলোর ঝড়। মঙ্গলের তুলনায় পৃথিবীতে জলীয় বাষ্পের পরিমান প্রায় দু’হাজার গুণ বেশী, স্বাভাবিক ভাবেই বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন এ শুকনো মৃত্যুপুরীতে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব নেই,  কিন্তু ঘনাদার ফার্স্টহ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স সেই প্রচলিত ধ্যানধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে। মঙ্গলেও প্রাণী আছে, জালার মতন চেহারা হলেও তারা বুদ্ধিমান এনং শ্রুতিধর কাম হরবোলা, সুতরাং মঙ্গলে যদি একবার পৌঁছে যান বাংলা ভাষায় কথাবার্তা চালানোটা কোনো ব্যাপারই নয়। আরো ডিটেলস চান? পড়ে ফেলুন “মঙ্গলগ্রহে ঘনাদা” (প্রেমেন্দ্র মিত্র)।

Amaresh1

(ছবি – দেব সাহিত্য কুটীর)

৩) অমরেশ – দেব সাহিত্য কুটীরের বার্ষিকীর গুলোর দৌলতে অমরেশ আপনাদের বেশ পরিচিতই। ১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসে কলকাতা থেকে দিল্লী যেতে গিয়ে প্লেনে করেই চাঁদে পৌছে যান ইনি। চাঁদের কলঙ্ককে যে শুধু সামনাসামনি দেখারই চান্স পেয়েছিলেন তাই নয়, যে ভয়ঙ্কর উল্কাবৃষ্টি  এর কারণ তারও মধ্যে পড়তে হয়েছিল অমরেশ এবং তাঁর থিয়েটার পার্টিকে। তবে কাজের কাজটি করেছিলেন থিয়েটার পার্টির হিরোইন্, শত বিপদের মধ্যেও চাঁদের ক্রেটারের একটু ধুলো ভ্যানিটি ব্যাগে নিয়ে নিতে ভোলেননি। চাঁদে পৌঁছনোর থেকেও অবশ্য রোমাঞ্চকর এপিসোড ছিল ফেরা, ফেরার সময় প্লেনের মেঝে আচম্বিতে খুলে গিয়ে দলবলসুদ্ধ অমরেশ মহাশূন্যে  পড়ে যান; মহাশূন্য থেকে ভেসে ভেসে কলকাতা ফিরে আসার জটিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে পাঠককে ক্লান্ত করে তুলতে চাননি লেখক, স্বপ্নভ্রম বলে শেষ করে দিয়েছেন। কিন্তু “অমরেশ চন্দ্রাহত হলো” পড়লে বিলক্ষণ টের পাবেন ডাল মে কুছ কালা হ্যায়, স্বপ্ন দিয়ে শেষ করাটা নেহাতই পশ্চিমী চক্রান্ত।

NBC

 

(ছবি – আনন্দ পাবলিশার্স)

৪)  দীননাথ – প্রফেসর নাট বল্টু চক্র বা প্রনাবচর সমস্ত কীর্তিকলাপ ব্যাখ্যা করতে গেলে দ্বিতীয় আরেকটি মহাভারত লিখতে হয়, পাঠক বরং আনন্দ থেকে বার হওয়া সমগ্রটি নিয়ে বসে যেতে পারেন। নিজে না গেলেও বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ডক্টর ব্রহ্মবিদের সহায়তায়  চ্যালা দীননাথকে পাঠিয়েছিলেন শুক্রগ্রহে (‘মনের মেশিন’ – অদ্রীশ বর্ধন) – মিউটেশন জেনেটিক্সের সাহায্যে দীননাথের শরীরে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন প্রফেসর যাতে শুক্রের নতুন জগতে মানিয়ে নিতে না অসুবিধা হয়। প্রফেসর ব্রহ্মবিদ আবার হিপনোটাইজ করে রেখেছিলেন দীননাথকে, নাহলে হয়ত শকের পর শকে বেচারী পাগলই হয়ে যেত। আর এসবের জন্যই পৃথিবীর বাতাসের চাপের থেকে হাজারগুণ বেশী চাপ সহ্য করেও, বুক ভরে কার্বন-ডাই-অক্সাইড টেনে নিয়েও সুস্থ অবস্থাতেই ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসতে পেরেছিল। তবে দীননাথ ঠিক নাকি অজয় আর সমর, সেটা এখনো একটা রহস্য। তাই শুক্রে গেলে প্রিকশন নিয়ে যাবেন, হেলমেট খুলে নিঃশ্বাস নিতে পারবেন কিনা সেটা নিয়ে এখনো সন্দেহ আছে।

আরো পরে প্রফেসরের দৌলতে অতি ক্ষুদ্রাকৃতির দীননাথের সৌভাগ্য হবে প্রায় সারা সৌরজগত ঘুরে আসার (‘অণিমা মানুষ’) – চার সূর্যের গ্রহ, প্রাগৈতিহাসিক গ্রহ, সোনালি পাখি-প্রাণীদের গ্রহ, মেশিনদের গ্রহ……কতই বা আর এ ক্ষুদ্র পরিসরে বলা যায়?

Shonku

(আদত ছবি – সত্যজিৎ রায়, বৈদ্যুতিন  সংস্করণ – লেখক)

৫) ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু –  প্রফেসর নাট বল্টু চক্র নিজে না গেলেও প্রফেসর শঙ্কু গেছেন, এবং হ্যাঁ মঙ্গলগ্রহেই (ব্যোমযাত্রীর ডায়রি)! সঙ্গে বেড়াল নিউটন, চাকর প্রহ্লাদ এবং রোবট বিধুশেখর। ঘনশ্যাম দাস যেরকম মঙ্গলকে প্রথম দর্শনে শুকিয়ে যাওয়া মৃত্যুপুরী ভেবেছিলেন, শঙ্কুর অভিজ্ঞতা কিন্তু সেরকম নয় – এ মঙ্গল বড়ই রঙ্গীন। নদীর রঙ লাল, আকাশের রঙ সবুজ, ঘাস আর গাছপালার রঙ নীল! আর  জালামূর্তির বদলে শঙ্কুরা দেখা পেয়েছেন প্রকান্ড সবুজ চোখওলা মানুষ-জন্তু-মাছের সংমিশ্রণে তৈরি এক অদ্ভুত প্রাণীর, যার সারা শরীরে আঁশ আর মুখে বিকট শব্দ ‘তিন্তিড়ি, তিন্তিড়ি, তিন্তিড়ি’। এই প্রাণীদের জন্যই হয়ত সারা মঙ্গল জুড়ে ভারী আঁশটে গন্ধ।

বেঙ্গালুরুতে ইসরোর  হেডকোয়ার্টারে কবে এসব খবর এসে পৌঁছয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Advertisements

3 thoughts on “অন্য গ্রহে

  1. …আর এঁদের সব্বার পূর্বে বিম্ল, কুমার, রামহরি, বাঘা [‘মেঘদূতের মর্ত্যে আগ্মন’]…

    Like

  2. সৌরভ, তথাগত – মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ 🙂 মেঘদূতের মর্ত্যে আগমনের কথা একদম ভুলে গেছিলাম!

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s