নষ্টনীড়

মেয়েটি বন্ধুকে বাঁচাতে ছুটে আসছে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি ঘুরে মেয়েটিকে সপাটে  চড় মারল। যন্ত্রণার থেকেও ঘটনার আকস্মিকতা এবং অভাবনীয়তার মেয়েটি বিহ্বল। পাশেই আর একটি মেয়ে, যাকে দেখে এখনো হাই স্কুলের ছাত্রী মনে হতেই পারে, তার ঘাড় ধরে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে আরো একটি নরপশু। তৃতীয় আরেকটি মেয়েকে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে রাতের অন্ধকারে পুলিশ ভ্যানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে আরো তিন-চার জন। ইউটিউবের ভিডিওতে একের পর এক ফুটেজে স্তম্ভিত হয়ে দেখছি কি অসম্ভব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উর্দিবিহীন পুলিশ এবং ঠ্যাঙ্গাড়ে গুন্ডারা যাদবপুরের ছাত্রীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে, ছাত্রদের কথা বাদই দিলাম – একের পর এক ছাত্রকে মাটিতে ফেলে কিল, চড়, ঘুঁষির বন্যা  বইয়ে দেওয়া হচ্ছে, এবং এক এক জনকে মারতে একাধিক বীরপুঙ্গব হাজির।

যাদবপুরের ঘটনা সবাই দেখেছেন, এমনকি প্রবাসী বাঙ্গালীরাও ব্যতিক্রম নন। সিংহভাগ যা দাবী করছেন, আমিও তার সঙ্গে একমত – অস্থায়ী উপাচার্যর যত শীঘ্র সম্ভব পদত্যাগ দরকার। কি করতে পারতেন, কি করেছেন, কেন করেছেন সে সবের মধ্যে না ঢুকেই বলা যায় যিনি পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে ছাত্রছাত্রীদের দাবীকে নস্যাৎ করতে চাইছেন, তাঁর আর যাই হোক উপাচার্যের মতন প্রশাসনিক পদে থাকা চলে না; ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে সহকর্মী সবাই যখন তাঁর সঙ্গ  পরিত্যাগ করছেন, এই প্রশাসনিক কাজ করবেনটাই বা কাকে নিয়ে? কত তাড়াতাড়ি তিনি বোঝেন সেটাই কথা।

যাদবপুরের ঘটনায় আবার ফিরব কিন্তু তার আগে কিছু টুকরো চিত্র আপনাদের দেখাতে চাই।

দৃশ্য এক –  ১৯৯৮ এর ডিসেম্বরের এক সকালবেলা। হাজরার কাছে এক বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটিয়ে ফিরছি, আশুতোষ কলেজের সামনে দেখি খন্ডযুদ্ধ চলছে – যোগমায়ার ডি-এস-ও এবং আশুতোষের এস-এফ-আই ক্যাডারদের মধ্যে। ডি-এস-ও র অনেক মেয়েদেরই দেখছি পোশাক অবিন্যস্ত, মেয়ে বলে তাঁরা এতটুকু রেয়াত পাচ্ছেন না – চোখের সামনে দেখলাম একজনের বেণী ধরে মাটিতে ফেলে মারা হল। উল্টোদিকে এস-এফ-আই য়ের একটি ছেলে্র হাতেও কামড়ে্ দিতে দেখলাম ডি-এস-ও র একটি মেয়েকে।

দৃশ্য দুই –  মধ্য কলকাতার সেন্ট পলস কলেজে গেছি এক বন্ধুর জন্য অ্যাডমিশন ফর্ম তুলতে। হাতে একটু সময় ছিল, কলেজটা একটু ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে সিঁড়ি বেয়ে উঠছি – মাঝপথে আটকে দেওয়া হল। দুটি ষণ্ডামার্কা লোক শুধোলেন আমরা ছাত্র পরিষদ করি কিনা। ছাত্র পরিষদ তো করি না-ই, উপরন্তু কলেজেরও কেউ নই শুনে অকথ্য গালিগালাজ করা হল। বহিরাগত হিসাবে ভুল করেছি ভেবে মুখ চুন করে ফিরে আসছি, কলেজেরই দু-তিনটি ছেলে এসে বলে গেল “মন খারাপ করো না ভাই, ওরা টেনশনে আছে”। আমরা অবাক, কিসের টেনশন? শোনা গেল অ্যাকশনে যাওয়ার জন্য  সমস্ত মালমশলা এখনো মজুত হয়নি।

দৃশ্য তিন – দক্ষিণ কলকাতার একটি বিশিষ্ট কলেজের ক্লাসরুমে বসে, সময় ২০০০ সাল। দুপুর দুটো নাগাদ শুরু হল তুমুল স্লোগান – ” এই কলেজে তৃণমূল করলে ধোলাই হবে, পেটাই হবে”। সারা কলেজ তোলপাড় করে তিন তলা বিল্ডিং ঘুরে ফিরে ক্ষমতাসীন ছাত্র দলের ক্যাডাররা মহোল্লাসে স্লোগান দিতে দিতে ফিরছে, নেতৃত্বে তখনকার ছাত্র সংসদের সেক্রেটারি, এখন নামকরা যুবনেতা যার নাম প্রায়শই কাগজে দেখে থাকবেন। অধ্যাপকরা গম্ভীর মুখে মাথা নাড়তে লাগলেন অথবা এমন ভাব দেখাতে লাগলেন যে এরকম কিছু হচ্ছেই না, কেউ সাহস করে গিয়ে বলে উঠতে পারলেন না “ক্লাস চলছে, রাস্তায় যাও”। পরের দিন আবার কলেজে এসে শুনলাম তৃণমূল করতে পারে এরকম একটা সন্দেহের বশে কোন একটি ছেলেকে ধরে কলেজের পাশেই ভ্যাটে ফেলে দেওয়া হয়েছে (এই সেদিনকে ইউক্রেনের এক সাংসদের একই হাল হতে দেখে আরো বেশী করে ঘটনাটা মনে পড়ল)।

এস-এফ-আই, ছাত্র পরিষদ, ডি-এস-ও কাকে ছেড়ে কাকে ধরবেন? ওপরের ঘটনাগুলো কিন্তু আমার স্যাম্পল পয়েন্ট নয়, এরকম অজস্র স্মৃতি আপনাদেরও আছে, সেগুলো জাগিয়ে তোলার জন্যই বলা। এমনকি নতুন দল তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কীর্তিকলাপের কথা লিখতে গেলেও মহাভারত হয়ে যাবে।

এই যে উপাচার্য পুলিশ লেলিয়ে দিচ্ছেন, অধ্যাপকরা আপাত-ঔদাসীন্য এবং গভীর ভয়ে রা কাড়ছেন না , ছাত্রছাত্রীরা সম্মান তো দেখাচ্ছেনই না বরং টুকতে না দিলে, কোটায় ভর্তি না করালে খুনজখম অবধি করে ফেলছেন, এর শুরুই বা কোথায় আর শেষই বা কোথায়? এখন তো দেখি শুধু কলেজে নয়, স্কুলেও ঘেরাও চলছে আর সবথেকে ভয়ের কথা কি জানেন? সেসব ঘেরাওয়ে দস্তুরমতন সঙ্গ দিচ্ছেন অভিভাবকরা। উপাচার্য নাহয় ধরাছোঁয়ার বাইরে – ইন্সটিটউশনের প্রতীক, ছাত্রছাত্রীদের নাহয় ডিফেন্ড করলেন স্বভাবচাঞ্চল্য বলে, অধ্যাপকরা নাহয় এ কূল রাখি না ও কূল ডিলেমায় আক্রান্ত, কিন্তু এদের সবাইকে ছেড়ে যাদের ওপর ভরসা করবেন ভেবেছিলেন সেই অভিভাবকরাও তো হতাশ করছেন।  হ্যাঁ, জেনেরালাইজড করা হয়ত হচ্ছে কিছুটা কিন্তু যে মুহূর্তে আপনি দেখছেন কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে ভায়োলেন্সের পরিসংখ্যানের বিচারে পশ্চিমবঙ্গ দেশের শীর্ষস্থানে (এবং বেশ কিছু বছর ধরে),  তখন আপনার মনে হতে বাধ্য যে পুরো সিস্টেমটাই ঘুণ ধরা।

অথচ অ্যাকাডেমিক কারিকুলামের বাইরে গিয়ে কিছু করা, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তাভাবনাকে কলেজ চৌহদ্দীর বাইরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা যেভাবে শুরু হয়েছিল তাতে কিন্তু আমাদের গর্ব বোধ করাই উচিত – সেই দশ কি কুড়ির দশকে বন্যাত্রাণের জন্য প্রেসিডেন্সি এবং আরো কিছু কলেজের অধ্যাপকরাই সাহায্য চেয়েছিলেন ছাত্রদের থেকে। ছাত্ররা শুধু বন্যাকবলিত এলাকায় গিয়ে কাজই করেনি, শহরেও মজুত করেছে চালের বস্তা (পুলিশ এবং চোরাকারবারীদের চোখ এড়িয়েই), তুলে দিতে চেয়েছে অভাবী, অনাহারী মুখে অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য। সেই চেতনাও কি রাজনৈতিক চেতনা ছিল না? অবশ্যই ছিল। খাদ্য আন্দোলন, ট্রামের ভাড়া বৃদ্ধির আন্দোলনেই শুধু রাজনৈতিক চেতনা জেগেছে তা তো নয়। কশ্চিত, কদাচিৎ অবশ্য এ ধরণের আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়েই সন্দেহ জেগেছে –  এই যাদবপুরেই লাইব্রেরীর ফাইন এক পয়সা বেড়েছিল বলে ছাত্রসমাজ তুমুল আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু তার পরেও ষাট কি সত্তরের শুরু অবধি হয়ত একটা মূল্যবোধের রাজনীতি হত। পরিবর্তন এল নকশাল আন্দোলনের সময় থেকে – নকশালদের কড়া হাতে দমন করার জন্য কংগ্রেস, সি-পি-এম দু দলই পুষতে শুরু করে গুন্ডা, ওই ক্যাডার শব্দটিরও বোধহয় তখনই আগমন। আতঙ্কে স্থবির হয়ে থাকা মহানগরী এবং শহরতলিগুলি তে কখন যে ছাত্রর বেশে গুন্ডারাও ঢুকতে শুরু করেছে তা শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক কেউই বোধহয় বুঝতে পারেননি। দৈনন্দিন খুনজখম তখন এতটাই গা সওয়া হয়ে গেছে যে তলে তলে একটা প্যারাডিম শিফট ঘটতে চলেছে তার আঁচ বোধহয় খুব কম লোকই পেয়েছেন।

কিন্তু সেখানেই তো শেষ নয়, সত্তরের দশকে ঘটেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-ও। পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থীর ঢল এসেছে স্বাধীনতার পর থেকেই কিন্তু সত্তরের দশকে যে হারে অনুপ্রবেশ ঘটেছে তা অভাবনীয়। আর ক্ষমতাসীন হওয়ার তাগিদে ডান বাম বহু নেতাই এই আক্ষরিক অর্থে সর্বহারা যুবকদের ক্যাডার বানিয়েছেন। ঢাকুরিয়ার রেললাইন থেকে শুরু করে দমদমের কলোনী – মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে কোনোমতে , বহুজনের হাতে এসেছে দুর্মূল্য র‍্যাশন কার্ড-ও। এরা বুঝতে শুরু করেছে রাজনৈতিক ছত্রছায়াই তাদের একমাত্র সম্বল, একমাত্র ভরসা –  আর রাজনীতির আখড়া হওয়ার সবথেকে ভালো জায়গা? বলা বাহুল্য যে কলেজ। আজকেও খোদ কলকাতার বুকে কলেজে গুলোতে গিয়ে একটু খোঁজ নিন, কত ছাত্র যে বছরের পর বছর ধরে রয়ে গেছেন তার ইয়ত্তা নেই। এরকম নয় যে তাঁরা বেরোতে পারছেন না, বেরোতে পারার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বেরোতে চাইছেন না। গ্র্যাজুয়েট হয়ে বেকার বসে থাকার অনিশ্চয়তা তো আছেই, উপরন্তু লীডারশিপ খোয়া যাওয়ার ভয়। আর সেটুকু খোয়ানো মানে পা্টির চোখে নিতান্তই ইনকম্পিটেন্ট বনে যাওয়া।

দোষের ভাগ কি শুধু এদের ঘাড়েই বর্তাবে? বুঝতেই পারছেন উত্তর নেতিবাচক। উপাচার্য থেকে শুরু করে অস্থায়ী অধ্যাপক, প্রাথমিক স্কুলের প্রধানশিক্ষক থেকে শুরু করে রেজিস্টার সামলানোর করণিক – শেষ তিরিশ চল্লিশ বছরে কোন নিয়োগটা আমরা অরাজনৈতিক ভাবে হতে দেখেছি? সমস্যা সেখানেই – একই দলের ছাত্র সংগঠন যখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন সেই দলেরই শিক্ষক সংগঠনের নেতারা কড়া হাতে আর রাশ টানেন কি ভাবে? এই যে আপনার জীবদ্দশায় প্রত্যেকদিন একটা না একটা কলেজে গন্ডগোলের খবর পড়ে পড়ে চোখ পচিয়ে ফেলেছেন, একবারের জন্যও কি দেখেছেন কলেজের অধ্যক্ষ এবং প্রতিজন অধ্যাপক একত্রে দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করেছেন? না, দেখতে পান নি, মনে হয়না বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনোদিন দেখতে পাবেন-ও।

যাদবপুরের ঘটনা তাই ব্যতিক্রম নয়, এখানেও কিন্তু দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে এসে বলতে দেখেননি “ছিঃ, কি ন্যক্কারজনক ঘটনা”। বলছেন, অনেকেই বলছেন, তার কারণ খোদ শহর কলকাতায় পুলিশি অত্যাচারের এত বড় উদাহরণ চট করে পাওয়া যায় না, কিন্তু তারপরেও পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসটা রয়েই গেছে – তাই দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এখনো এগিয়ে আসতে দেখলেন না । কিছু করার নেই, এ দোষ এখন আমাদের রক্তে। পুলিশি অত্যাচার আছে, সেই সঙ্গে এটাও মানতে হবে যে যাদবপুর শহুরে পাঁচ তারা বিশ্ববিদ্যালয় – ট্র্যাডিশনাল মিডিয়া হোক কি সোশ্যাল, এ ব্যাপারে কথা বলার লোকের কমতি পড়বে না। কিন্তু যাদবপুর না হয়ে যখন খবরে থাকে চাঁচল, বেতাই, কালিয়াচক? সেখানে অবশ্য পুলিশের সামনেই মুহুর্মুহু বোমা পড়তে থাকে, পাইপগানের গুলিতেই হোক কি বোমার স্প্লিন্টারে, এক দুটো মৃত্যুও কোনো ব্যাপার নয়।

কলেজ কি ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র রাজনীতি চলা উচিত কিনা সে নিয়ে বিতর্ক চলবে; ক্ষমতাসীন সরকার প্রথম দিন থেকেই এর বিরোধিতা করে এসেছেন, আজও করছেন – হয়ত কনসিস্টেন্সির বিচারে কিছু ব্রাউনি পয়েন্ট এনাদের প্রাপ্য কিন্তু তাঁরা তো এটাও জানেন যে এক হাতে তালি বাজে না। উপাচার্যর এই অমানবিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ যতদিন দলমত নির্বিশেষে সব অধ্যাপকের মুখ থেকে না বেরোচ্ছে, ততদিন জানবেন ওই বিতর্কের কোনো মূল্য নেই।  মুখ্যমন্ত্রী ছোটো ঘটনা বলে এড়িয়ে যেতে পারেন, কিন্তু রাজনৈতিক মোহ কাটিয়ে উঠে যতদিন না তাঁর দলের ঘনিষ্ঠ অধ্যাপকরা এর জবাব দিচ্ছেন, ততদিন আদত প্রাপ্তি শূন্যই। আজ আহত ছাত্রছাত্রীদের দেখতে বামপন্থী নেতারা হাসপাতালে ছুটছেন, তাঁদেরও তো কতজনই শিক্ষক, যতক্ষণ না তাঁরাও ঘুম থেকে উঠে বলছেন “ভুল আমরাও করেছি, এবার সবাই মিলে রুখে দাঁড়াই” ততদিন কোনো আশা রাখবেন না।

আমিও কোনো আশা রাখছি না, খালি এইটুকু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে এ নৈরাজ্য থামাতে অধ্যাপকদের করণীয় অনেক কিছুই ; টিভির চ্যানেলে ‘ছাত্ররা আমার সন্তানতুল্য’ শুধু এইটুকু বলে ছেড়ে দিলে যাদবপুর আবার ফিরে আসবে – ২০০৫, ১০, ১৪ র পরেও।

Advertisements