মিষ্টান্ন মিতরে জনা

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আজ রসগোল্লার জন্মরহস্য নিয়ে একটি প্রবন্ধ বার করেছে,  অপ্রিয় সত্যটি মধুলিকা দাশ ভারতভূমে ফাঁস করে দিয়েছেন – রসগোল্লার জন্ম বঙ্গভূমিতে নয়, পাশের উৎকল রাজ্যে।  নবীন দাস, কে-সি-দাস এবং তাঁদের তাবৎ ভক্তবৃন্দ যাই মনে করুন না কেন এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু মন খারাপ করবেন না, রসগোল্লাকে হারালেও বাংলার মিষ্টির ইতিহাসের ভাঁড়ার অগাধ – আজকে সেই নিয়েই বরং দু’চার কথা বলি। সেখানে খাস কলকাতা হোক কি জেলা শহর বর্ধমান কি অনামী মুড়াগাছা , কন্ট্রিবিউশনে কেউ পিছিয়ে নেই। লেডি ক্যানিং কে সম্মান জানাতে গিয়ে যে খোদ ভীম নাগ লেডিকেনি (যার আরেক নাম পান্তুয়া) বানিয়েছিলেন সে কথা আজ সর্বজনবিদিত। কিন্তু অনেকেই হয়ত জানেন না যে দরবেশ মিষ্টিটিরও জন্মস্থান কলকাতা – দরবেশদের আলখাল্লা যেহেতু নানা রঙের কাপড়ের টুকরো সেলাই করে তৈরি হত তাই দু-তিন রঙের বোঁদের তৈরি নরম নাড়ুকে আমরা দরবেশ বলে ডাকতে শুরু করলাম। বর্ধমানের সীতাভোগ বা মিহিদানার কথাও সবাই জানেন – সুকুমার সেন অবশ্য বলে গেছেন বানানটি হওয়া উচিত সিতাভোগ, সিতা অর্থে সাদা। আবার সিতা-র মানে মিছরিও হয়, তাই সাদা রঙের মিছরির মতন যে মিষ্টি বর্ধমান রাজবাড়ির হালুইকররা বানালেন তার নাম হয়ে গেল সিতাভোগ। মুড়াগাছা আবার বিখ্যাত ছিল ছানার জিলিপির জন্য, কোনো অজ্ঞাত কারণে মুড়াগাছার ছানার জিলিপি কৃষ্ণনগরের সরভাজা, সরপুরিয়া বা নাটোরের কাঁচাগোল্লা কি জনাইয়ের মনোহরা কি শক্তিগড়ের ল্যাংচার মতন বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারেনি – যদিও ছানার জিলিপি এই ২০১৪ তেও বাঙ্গালীর অন্যতম প্রিয় মিষ্টি।

মিষ্টির নামকরণের ব্যাপারটি রীতিমতন কৌতূহলোদ্দীপক। ধরুন – লুচিতে ক্ষীরের পুর দিয়ে সেটাকে পানের মতন মুড়ে তারপর লবঙ্গ বিঁধিয়ে যদি দেওয়া হয় আপনাকে, কি নামে ডাকবেন? লবঙ্গলতিকা বলাই স্বাভাবিক কিন্তু শুরুর দিকে এর নাম ছিল এমপ্রেস গজা। রাজাগজাদের সন্তুষ্টির জন্য অবশ্য বানানো হয়েছে আরো মিষ্টি – বাঙ্গালীর আপন রাজভোগই বলুন কি উত্তর ভারতীয় দিল্লী দরবার সবই পড়বে এ লিস্টে।  অবশ্য অনেক সময়েই মিষ্টির ইউটিলিটি বা স্রেফ আকার-আকৃতি দিয়েও আমরা নাম রেখে গেছি। গৃহদেবতার মিষ্টির থালা সাজাতে গিয়ে দেখলেন থালা একটু ফাঁকা রয়ে গেছে, তো সেই শূন্যস্থান পূরণে আপনি কাকে বাছবেন? অফ কোর্স, গুঁজিয়া। যদিও নামটা এখন গুজিয়া হয়ে গেছে কিন্তু ওই গুঁজে দেওয়ার নিমিত্তেই ওর জন্ম। গুজিয়ার কথা এলে নিখুতির কথাও অনেকেরই মনে পড়ে যাবে – এখানেও কিন্তু একটা চন্দ্রবিন্দু বাদ পড়েছে। আসল শব্দটা নিখুঁতি, অর্থাৎ যে মিষ্টির আকারে কোনো খুঁত নেই – যত কটাই ভাজুন না কেন, সব এক শেপ ও সাইজে বেরোবে। তারপর ধরুন রথযাত্রা কি দোলের সময় যে মঠ খান, সেটাই বা এল কোথা থেকে? এই মিষ্টিটি অবশ্য নিয়ে এসেছে পর্তুগীজরা, ক্রিসমাসের সময় গির্জার আকারে বানানো হত এই চিনির ড্যালা – আমরা গির্জা দেখে নাম দিয়ে দিয়েছি মঠ।

বহু সময়েই অবশ্য নামের বাহারে আমরা ভুলে যাই যে বাহারী মিষ্টিটি অন্য আরেকটি মিষ্টির  দামী এবং পরিমার্জিত সংস্করণ বই আর কিছু নয়। হাতের কাছে উদাহরণ রয়েছে চন্দ্রপুলির। চন্দ্রপুলির আদত ভার্সনটির নাম রসকরা, বহু যুগ ধরে গ্রাম বাংলার মানুষ ব্রেকফাস্টে মুড়ি-মুড়কির সঙ্গে রসকরা খেয়ে এসেছেন; সময় সময় অন্য মিষ্টির (যেমন পেরাকি) পুর হিসাবেও ব্যবহার করা হয়েছে এই রসকরাকে। চিত্রকূটের কথাও ধরতে পারেন, গোল লেডিকেনি থেকে লম্বা ল্যাংচা হয়ে চৌকোতে পৌঁছনোর পর খেয়াল পড়েছে এবার একটু ভালো নাম দেওয়া দরকার – সত্যি কথা বলতে কি আই ডোন্ট মাইন্ড, মনে রাখা দরকার ল্যাংচা শব্দটি এসেছে ‘লিঙ্গ’ শব্দটির প্রাকৃত রূপ থেকেই। গুলাবজামুনের বাংলা ভার্সন গোলাপ জামের (গোলাপ জামের সঙ্গে পরিচিতি খুব বেশী না থাকলে কালো জামের কথা ভাবতে পারেন) কথাও এসে পড়ে এ প্রসঙ্গে –  এও সেই পান্তুয়ারই রকমফের, খোয়া আর এসেন্সের দৌলতে বনেদী হাবভাব এসেছে মাত্র। রসগোল্লা হাতছাড়া হলেও স্পঞ্জ রসগোল্লা কিন্তু বাংলারই অবদান, তফাৎটা কি বলুন তো? আদি রসগোল্লাতে সুজি বা সমগোত্রীয় অন্য পদার্থ ব্যবহার করা হত জমাট করে তোলার জন্য, স্পঞ্জ রসগোল্লাতে ওসবের ব্যবহার নৈব নৈব চ। এ ছাড়া স্পঞ্জ রসগোল্লার জন্য ছানা এবং দুধ যত টাটকা হয় ততই ভালো। রসগোল্লারই আরেক বনেদী অবতার পুরনো ক্ষীরমোহন – এখন অবশ্য  ক্ষীরমোহন খুব একটা দেখা যায় না, দেখা যায় ওরই টোনড ডাউন ভার্সন ক্ষীরকদম্ব। ক্ষীরমোহনেও খোয়া মাস্ট, তার সঙ্গে পড়বে বাদাম, পেস্তা এবং কিসমিস। ক্ষীরমোহনের মতনই আরেক দুষ্প্রাপ্য মিষ্টি হল নবাবভোগ, আকারে রাজভোগের থেকেও বড় এবং ভেতরে থাকত চার ধরণের পুর, প্রতিটি পুরের আবার সুবাস আলাদা। এই ক্যাটেগরির আরেকটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ লালমোহন – এসেন্সিয়ালি ছানাবড়া, খালি ছানাবড়া আপনি আগে ভেজে তারপর রসে চোবাচ্ছেন আর লালমোহনের বেলায় ফুটন্ত রসে ফেলে দিতে হচ্ছে। তবে ছানাবড়া থেকে লালমোহন বানানোয় বেশী কেরামতি দরকার কারণ ভাজা হয় না বলে ছেতরে যাওয়ার বেশী চান্স, তো না ছেতরে যিনি গরম গরম লালমোহন তুলে আনতে পারবেন তিনিই ধন্য।

তবে নামের কথাই যদি আসে তবে আলোচনার সেরা টপিক হল সন্দেশ। বলা বাহুল্য যে সন্দেশ একটা জেনেরিক নাম – আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে (বিশেষত বৈবাহিক সূত্রে পাওয়া কুটুম্ববাড়িতে) খোঁজখবর নিতে যাওয়ার সময় যে মিষ্টি নিয়ে যাওয়া হত তাকেই বলা হত সন্দেশ, যেহেতু কুশলসন্দেশ নেওয়ার অভিপ্রায়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে আসা। কিছু সন্দেশের নাম বেশ স্ট্রেটফরোয়ার্ড, নামেই বুঝে যাবেন কি ধরণের দেখতে – শাঁখ সন্দেশ, আতা সন্দেশ, তালশাঁস ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু র‍্যোমান্টিক বাঙ্গালী বেশ কিছু নামে এক ধরণের দুর্বোধ্যতা ঝুলিয়ে রেখেছে, নামটি বড়ই সুখশ্রাব্য কিন্তু বোঝার উপায় নেই আদতে খাদ্যবস্তুটি ঠিক কিরকম দেখতে বা কিরকম খেতে – আবার খাবো, দেদার খাবো, মনোহরা, মনোরঞ্জন, মনমোহন, দেলখোশ, সুখে থেকো, ফুলশয্যা, পতি পরম গুরু…… লিস্টি নেহাত ছোটো নয়। শেষের নামগুলোয় অবশ্যই স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে এগুলো বিয়েবাড়ি স্পেশ্যাল – বাঙ্গালীর বিয়েতে ভিয়েনের চল যবে থেকে উঠে গেছে, সন্দেশের কৌলীন্যও অনেকটাই পড়ে গেছে। বহু সন্দেশই তৈরি হয়েছে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিয়ে উপলক্ষ্যে এবং রেসিপি দেখলে বেশ বোঝা যায় যে কারিগরদের বেশ মাথা খাটিয়ে বার করতে হত নতুন নতুন আইটেম।

যেমন ধরুন মনোহরা – এই সন্দেশে ছানা এবং খোয়া দুটোই থাকছে। ছানা দিয়ে মূল মন্ডটি বানানো হচ্ছে আর তার সঙ্গে সঙ্গেই মেশানো হচ্ছে জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে নরম করা খোয়ার টুকরোর দলা। কড়াইতে দিয়ে নাড়তে নাড়তে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে একটা উপযুক্ত শক্ত ভাব আসার দরকার, যাতে দ্বিতীয় দফায় ওর মধ্যে ঢোকানো যায় এলাচচূর্ণ। বেশী শক্ত হয়ে গেলে এলাচ ঢোকানো যাবে না আবার অপেক্ষাকৃত নরম থাকলে সন্দেশের আঁটসাঁট ব্যাপারটা ধরে রাখা যাবে না, মনোহরার যায়গায় মনোহর গোল্লাতেই আপনাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আবার ‘আবার খাবো’র কথা যদি ভাবেন, সেখানে কিন্ত খোয়ার দলা নয়, দিতে হবে খোয়ার গুঁড়ো। আবার খাবোতে বাই ডেফিনিশন  এলাচ পড়লে চলবে না, সেখানে দিতে হবে পেস্তা। মনমোহনেও কিন্তু পেস্তা পড়ছে, কিন্তু আখ্যান সেখানেই শেষ নয় – তার সঙ্গে আপনাকে দিতে হবে জাফরান, মনমোহন বানানোর সময় দুধও লাগবে একটু বেশী। আর শেষকালে গোলাপজল ছিটিয়ে হীরের আকারে কেটে নিতে হবে এই সন্দেশ।
শেষ করি তিনটি চমকপ্রদ বাঙ্গালী পদকে স্মরণ করে – পদ বললাম কারণ  সবগুলোকে মিষ্টি বলা যায় না অথচ বাঙ্গালী মিষ্টির ইতিহাস না থাকলে এসব খাদ্যবস্তু কোনোকালেই তৈরী হতে পারত না।

দেবেন্দ্রনাথের নাতনী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর রান্নার বই “আমিষ ও নিরামিষ আহার” ছাড়া বাঙ্গালী রান্নার ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। এই বইয়েই প্রজ্ঞাসুন্দরী একটি বিশেষ পদ দ্বারকানাথের নামে উৎসর্গ করেন, যার নাম দ্বারকানাথ ফির্নি পোলাও (আজকাল আমরা ফিরনী লিখলেও এখানে প্রজ্ঞাসুন্দরীর বানানটাই রাখলাম)। নামেই মালুম যে এ পোলাওয়ের জন্য প্রথমেই আপনাকে ফির্নি  বানাতে হবে। কিন্তু সব থেকে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল এ ফির্নি  পোলাও তৈরি হবে প্রায় বিরিয়ানির কায়দায়। প্রথমে এক থাক ফির্নি , তার সঙ্গে কুমড়োমেঠাই, কিশমিশ ইত্যাদি; তার ওপর এক থাক ভাত, তার ওপর আবার এক থাক ফির্নি , এবার সঙ্গে খোপানি (খোবানি), তার ওপর আবার ভাত। সবার ওপরে আবার চারদিক থেকে ছড়ানো থাকবে ফির্নি , কিন্তু মাঝখানটি থাকবে ফাঁকা যেখান থেকে দেখা যাবে পোলাওয়ের জাফরানি রঙটি।

দু নম্বরটি হল – ম্যাচা। ম্যাচা হচ্ছে হাতে গোনা মশলাদার মিষ্টির একটি, সময়বিশেষে যা খেয়ে ঝালও লাগতে পারে। এ বানাতে গেলে ঘি, চিনি কি তিলের সঙ্গে  আপনার চাই গোলমরিচ এবং মৌরি। আদি ম্যাচা দেখতে ডিম্বাকৃতি, ভেতরে থাকবে রসকরা যার কথা আগেই বলেছি। ভেতরে রসকরার পুরের পাশেই ম্যাচার দেওয়ালে থাকতে হবে মৌরি এবং গোলমরিচের সঙ্গত। কিন্তু শেষমেশ ম্যাচা মিষ্টিই, তাই এর ওপরে ছড়িয়ে দিতে হবে সিরাপ –  ঝাল এবং মিষ্টির এই অনায়াস কম্বিনেশন মোটেই সহজলভ্য নয়।

আর সব শেষে ‘চপ সন্দেশ’ – কলকাতায় যার আবির্ভাব ঘটেছে বিংশ শতকের শুরুর দিকেই, এর খবর পাওয়া যাচ্ছে ১৯২০ নাগাদ। মাটন চপের মিষ্টি অবতার বানাতে গেলে প্রথমেই কি দরকার পড়বে বলুন তো? ভাবছেন কি, গরম মশলা! এ বোধহয় একমাত্র বাঙ্গালী সন্দেশ যেখানে গরম মশলার জয়জয়কার। কুঁচনো মাটনের পরিবর্তে অবশ্য থাকবে কুঁচি কুঁচি করে কাটা মেওয়া এবং খোয়ার গুঁড়ো। আর ওপরের কোটিং-এ দেখতে পাবেন  পোস্তর ছোট ছোট দানা।

রসগোল্লা হাতছাড়া হল তো ভারী বয়েই গেছে।

Advertisements

5 thoughts on “মিষ্টান্ন মিতরে জনা

  1. ভারী ‘মিষ্টি’ পোস্ট, বলাই বাহুল্য। আচ্ছা, ওপরে পোস্তর দানা দেওয়া মিষ্টি আরেক রকম বলতে রসকদম্ব বা ক্ষীরকদম্ব অথবা এদের কোন একটা ভ্যারিয়েশন আছে না?

    Like

  2. malabika says:

    এত মিষ্টি লেখা !এটা তো পড়তে পড়তেই সুগার বেড়ে চারশতে পৌঁছে যাবে।

    Like

  3. কৌশিক দা – হ্যাঁ, রসকদম্বর একটা ভ্যারাইটিতে পোস্তর দানা দেওয়া হয়, ভীষণ বাঙ্গালী একটা কন্সেপ্ট।

    মালবিকা – একটু অপেক্ষা করুন, বাঙ্গলার তেতো খাবার নিয়ে আর একটা পোস্ট আসছে, ব্যালান্স হয়ে যাবে। 🙂

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s