সাড়ে চুয়াত্তর

“কনের বয়স কত রে?” শ্রীমতী ক শুধোলেন শ্রীমতী খ-কে।

“শুনছি তো মাঝ তিরিশ”।

“মাঝ তিরিশ শুনছিস মানে ধরে নে চল্লিশের কম হবে না। বলিহারি যাই বাপু, এই বয়সে এসেও গোলাপী নিয়ে আদিখ্যেতা গেল না”।

কলীগের বিয়ে, প্রথমবারের জন্য কোনো তুর্কী বিয়েতে নেমন্তন্ন পেয়েছি। ইস্তানবুলের কুখ্যাত ট্র্যাফিকের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা কয়েকজন একটু আগেভাগেই এসে পড়েছি। বিয়েবাড়িতে ঢোকার অফিসিয়াল টাইম ছিল সাড়ে ছ’টা, আমরা জনা পাঁচেক এসে পৌঁছেছিলাম ছটা চল্লিশে – আসতে আসতেই অবশ্য শুনছিলাম সাড়ে ছ’টা মানে পৌনে আটটা নাগাদ পৌঁছলে ভদ্রতাবোধটা বজায় থাকে । কিন্তু ইস্তানবুলের ট্র্যাফিক সামলে ভদ্রতা রক্ষা করা বেশ কঠিন, পরের দিন ভোর ভোরও ঢুকতে পারেন। পৌঁছে দেখা গেল বিয়েবাড়িটি আদতে একটি মিলিটারি ডেরা। সৈন্যসামন্ত এখন দেখতে পাবেন না অবশ্য, সব ডেস্ক জব। আর সন্ধ্যাবেলাগুলো বিয়ে, জন্মদিন এসবের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়।

শ্রীমতী ক গাড়িতে বসে বসেই মুখ বেঁকিয়েছেন, “হরি, হরি! শেষে আর জায়গা পেল না?”। একেই তো ইস্তানবুল, তার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়টি ভয়ঙ্কর রকম আলট্রা-লিবারল। শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে শাটল ড্রাইভার সবার আর্মি, পুলিশ, ফক্স চ্যানেল, ফতোয়া এবং আরো কোটিখানেক শব্দে ঘোরতর আপত্তি। আমার অবশ্য ঢুকে দিব্যি লাগল, সামনেই মারমারার নীল জল টলটল করছে। শেষ বিকালের হাল্কা আলোয় দেখা যাচ্ছে মারমারার মধ্যে থেকে উঠে আসা ছোট্ট দ্বীপটাকে, অবশ্য দ্বীপ না বলে টিলাও বলা যায়। কমপ্লেক্সের মধ্যে একটা বড় হলঘর, সেখানে অন্য আরেক বিয়েবাড়ি। আমাদেরটা আউটডোরে, জলের পাশেই।

ক হাই হিল সামলাতে সামলাতে বললেন, “বুদ্ধি দেখেছে! এবারে বৃষ্টিটা পড়লে কোথায় যাব শুনি? আর্মি ব্যারাকে?”।

খ-কেও একটু চিন্তিত দেখলাম, তাঁর এক বছরের বাচ্চা এবং হাই-হিল দুটোকে একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে একটু আগেই আছাড় খেয়েছেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হক কথা! তবে আকাশ দেখে মনে হচ্ছে না আজ ঢালবে”।

আর ঠিক তক্ষুনি ক অস্ফুটে চিৎকার করে উঠেছেন। আমরা ঘুরে তাকাতে সামনের লনটা দেখালেন, সেখানে অজস্র টেবল আর টেবল ঘিরে গোল করে রাখা চেয়ারের সারি। টেবল, চেয়ার সবই সাজানো হয়েছে গোলাপী কাপড়ে। আর সেই দেখেই ক শুধিয়েছেন “”কনের বয়স কত রে?”।

আমার পাশেই বসে ড্যান, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম কোঅরডিনেটর – নিউ ইয়র্কের লোক, কিন্তু ইস্তানবুলে আছে প্রায় বছর পনের। গড়গড় করে তুর্কী ভাষায় বাক্যালাপ করে, বিদেশীদের তুর্কী ভাষায় ট্রেনিং দেয় এবং কারণে অকারণে জানিয়ে দেয় আমেরিকা ছেড়ে ইস্তানবুলে মুভ করাটা (টার্কিতে মুভ করেছি বলে না কিন্তু) ওর জীবনের সব থেকে ভালো ডিসিশন। যদিও নিন্দুকে বলে ওর শ্বশুরের টাকা ছাড়া আর কোনো কারণ ছিল না, ওর বউ-ও আমেরিকায় পড়তে গিয়ে সাদা চামড়া বিয়ে করে এনে গুষ্টির স্টেটাস বেজায় বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আমার ধারণা শ্বশুরবাড়ির লোক যেদিন থেকে টের পেয়েছে ড্যান আমেরিকার ১% এর মধ্যে পড়ে না সেদিন থেকে ইন-লজ দের কাছে পপুলারিটি ক্রমহাসমান। ড্যানের শ্বশুরবাড়ি তুরস্কের ১% কেন, ০.১% এর মধ্যেও পড়তে পারে। ইদানীং সেই সব নিয়ে একটু চিন্তিত থাকলেও এখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। বলল “আমি তো ভাবছিলাম মেহমেত বোধহয় আর বিয়েটা করলই না। আর বছর কয়েক পর একগাদা কালো বেড়াল কিনে নিয়ে আসবে, সকালে পড়াবে আর সারা বিকাল সন্ধ্যা ধরে কালো বেড়ালের গলায় আদর করতে করতে রোমহর্ষক সব থ্রিলার দেখবে”। মেহমেত যে চল্লিশ পেরিয়ে বিয়ে করবে সে আশা বিশেষ কারোরই ছিল না মনে হয়। অপারেশন ম্যানেজমেন্টের সদাহাস্যময় দোয়ুকান একটু আগেই হন্তদন্ত হয়ে এসে বলে গেলেন, “সান্তোরিনি যাওয়ার বন্দোবস্ত করে এলাম”। আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “হঠাৎ গ্রীসে কেন?”। দোয়ুকান মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “হঠাৎ নয় রে ভাই, দশ বছর আগে যাব ভেবেছিলাম। সেবারে আমিই একটা সম্বন্ধ নিয়ে এসেছিলাম মেহমেতের জন্য, ব্যাটা সদ্য পি-এইচ-ডি শেষ করে জয়েন করেছে, ভাবলাম দিই ছ্যামড়াটাকে সারা জীবনের মতন সেটল করিয়ে। ও হরি, মেয়ের পি-এইচ-ডি নেই বলে বাতিল হয়ে গেল। আমারও জেদ চেপে গেল, ঠিক করলাম ওর বিয়ে হলে তবেই সান্তোরিনি যাব। কে জানত দশ বছর লেগে যাবে? দুটো টিকেট আবার এক্সট্রা পড়ল”। বলে দুই মেয়ের হাত ধরে হাসতে হাসতে চলে গেলেন।

খ ফিসফিস করে বললেন, “শেষ বছর ছয়েক অবশ্য মেয়েরা যে শুধু ইন্টেলেকচুয়াল কারণে বাতিল হয়েছে তা নয়। কার নাক খ্যাঁদা, কার আছে সরু গোঁফের রেখা, কার আঙ্গুলগুলো একটু মোটা, দেখে ঠিক পিয়ানোবাদকের আঙ্গুল বলে মনে হয় না……”।

ক সঙ্গত দিলেন, “তা বলে ভেবো না পি-এইচ-ডির ক্রাইটেরিয়ন চলে গেছে, ওটা মিনিমাম!”।

আমি অবাক হয়ে মেহমেতের এমন দুর্মতি হল কেন জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি এক ভদ্রলোক বেচারা বেচারা মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন – চতুর্দিকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। আমাকে দেখে একটু ম্লান হাসলেন, আর তক্ষুনি মনে পড়ল ইনি আমাদের ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট। বিয়েবাড়িতে এসেছেন বলেই বোধহয় দোর্দণ্ডপ্রতাপ মুখোশটি ছেড়ে এসেছেন কিন্তু সমস্যা হল মুখোশ খুলে ফেলতেই মুখ চেনা যাচ্ছে না। হাই-হ্যালো করার অভিপ্রায়ে উঠছি এমন সময় কানের কাছে “মেরহাবা”, এক সুটেড-বুটেড ভদ্রলোক এসে জড়িয়ে ধরেছেন। মিনিটখানেক ঠাহর হচ্ছিল না, তারপর বুঝলাম আমাদের আর্দালিসাহেব তুরহান সদ্য ঢুকেছেন বিয়েবাড়িতে। আমেরিকার কোনো ইউনিভার্সিটিতে আমি আর্দালি দেখিনি, এখানে এসেই প্রথম দেখলাম প্রফেসরদের জল, চা, কফি এবং অন্যান্য খিদমত খাটার জন্য বেতনভুক এক বান্দা রয়েছেন। তবে কিনা, উপমহাদেশের আর্দালিদের সঙ্গে এঁকে এক না করাই ভালো; হাজারখানা কারণ আছে, যেমন ধরুন হাতে কাজ না থাকলে ইনি স্যামসুং গ্যালাক্সি ট্যাবে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলে থাকেন। ভদ্রলোক অবশ্য এক ফোঁটা ইংরেজী জানেন না, ফলত আজ এক বছর ধরে ডেলি বেসিসে আমরা পরস্পরকে ঠিক দুটো কথাই বলে এসেছি – সকাল নটায় “মেরহাবা” (অর্থাৎ হেল্লো) আর নটা বেজে এক মিনিটে “গুনায়দিন” (অর্থাৎ গুড মরনিং)। এখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় মেরহাবা বলে ওনার খেয়াল হয়েছে গুনায়দিন বলা যাবে না, তাই হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে রয়েছেন (বোধহয় ধরে নিয়েছেন যে আমি গুড ইভনিং এর তুর্কী প্রতিশব্দ জানি না), আমিও হাসি মুখে মূকাভিনয় সহযোগে বোঝালাম, “লুকিং ড্যাপার” ইত্যাদি। এই বোবা তারিফের পালা কতক্ষণ চলত কে জানে, খ এসে ডেকে নিয়ে গেলেন, “কি আশ্চর্য, এন্ট্রি সং নিয়ে বেট লাগছে আর তুমি এখানে দাঁড়িয়ে?”।

দেখি আমাদের টেবলে ভিড় উপছে পড়েছে, লোকে সুরে বেসুরে বিভিন্ন গানের দু’এক কলি আউড়ে যাচ্ছেন। আমাকে বোঝানো হল বর-বউ যখন হাত ধরাধরি করে ঢুকবেন তখন গান বেজে উঠবে, দোঁহে যতটা চমকে ওঠা যায় তার ভান করে বিস্তর র‍্যোমান্টিক সাজা্র চেষ্টা করবেন, কিন্তু বিয়েবাড়িতে উপস্থিত প্রতিটি লোক জানে এ গান বাছা হয়েছে অন্তত মাস চারেক আগে, প্রায় শ’খানেক গানের মধ্য থেকে। ক বললেন, “বলে ফেলো তুমি কিসে বেট লাগাচ্ছ?”। মহা মুশকিল, আমি সাকুল্যে একটিই তুর্কী গান জানি – “উসকুদার-আ গিদের ইকেন আলদি দা বের ইয়ামুর”……প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নজরুল তাঁর তুর্কী সহযোদ্ধাদের থেকে যে গান শুনে লিখেছিলেন “শুকনো পাতার নূপুর পায়ে নাচিছে ঘূর্ণিবায়”।

এক তুর্কী কন্যা তাঁর পুরুষ সঙ্গীকে নিয়ে ইস্তানবুলের কাছে এক গ্রাম উসকুদারে ঘুরতে গেছেন, এই হল গানের প্রেক্ষাপট। এখন বিশেষজ্ঞরা এ গানে রোম্যান্স, বিপ্লব, দেশাত্মবোধ সবই খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু মেহমেত এবং তাঁর ভাবী বউ এই গান বাছবেন এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা বোধহয় কোটিতে এক। তাও কিছু বলতেই হয়, তাই লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই দিলাম। আর অমনি টেবল জুড়ে এমন অট্টহাসির রোল উঠল যে সারা বিয়েবাড়ি মাথা ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়েছে, আমি পালাবার পথ খুঁজে পাই না। খ হাসতে হাসতে বললেন, “আমাদের কতটা গাঁইয়া ভাবো বলো তো? এটা তো একে ফোকসং, তায় লেখা হয়েছে বোধহয় দেড়শ বছর আগে। আর শেষ পঞ্চাশ বছরে বোধহয় কেউ টার্কিশ গান বাছেনি নিজেদের বিয়েতে। “, আমি বললাম, “আচ্ছা, আপনি কিসের বেট লাগাচ্ছেন সেটাই শোনা যাক বরং”। খ বললেন, “আরে পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না গানের নামটা, ওই যে কাউন্টডাউন হতে থাকে, কোন একটা ওয়ার্ল্ড কাপে বাজিয়েছিল না?” বুঝলাম  ব্যান্ড ইউরোপের ‘দ্য ফাইনাল কাউন্টডাউন’ এর কথা বলছেন। সবাই মাথা নাড়তে লাগলেন, “না না, ও গান লক্ষ-কোটিবার বাজানো হয়েছে এর আগে, আবার হয় নাকি?”

আর ঠিক তক্ষুনি ঢোকার মুখে রাখা সারি সারি সাদা রঙের পোলগুলোর পাশ দিয়ে রঙ বেরঙ এর তুবড়ি ঝলসে উঠল, পোল থেকে ঝুলতে থাকা খাঁচাগুলোর মধ্যে তুলো দিয়ে তৈরি করা পায়রাগুলো সেই আলোয় কিরকম জীবন্ত ঠেকতে লাগল। আর মারমারার জল ও হাওয়ার আওয়াজ ছাপিয়ে ভেসে উঠল অ্যাডেলের রাগী গলা, “দেয়ার ইজ আ ফায়ার স্টার্টিং ইন মাই হার্ট”………

সবাই হতচকিত, ক প্রায় চোখ কপালে তুলে বললেন, “শেষে রোলিং ইন দি ডীপ, কি আনইউজুয়াল চয়েস বাবা! এ গানের সঙ্গে আবার লাভি-ডাভি হওয়া যায় নাকি?”।

ততক্ষণে বর-বউ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসেছেন এবং বোঝা গেল লাভি-ডাভি হওয়ার এই মুহূর্তে বিশেষ ইচ্ছে নেই তাঁদের। “উই ক্যুড হ্যাভ হ্যাড ইট অল” এর সঙ্গে দু হাত তুলে নাচতে নাচতে বর ঢুকলেন, সারা লন তখন তালে তালে হাততালি দিতে ব্যস্ত। কেবল ক একটি ছোট্ট চিমটি কেটে বললেন, “বৌয়ের জুতো দেখ, আর হাতে ধরা ফুলের তোড়ার রঙটাও”। বলা বাহুল্য, সবই গোলাপী।

বিয়েটা অবশ্য দশ মিনিটের-ও কমে সারা হয়ে যায়, কোনো ধার্মিক রিচুয়ালের বিশেষ বালাই নেই। রেজিস্ট্রার এসে বরের নাম, কনের নাম, তাঁদের মা-বাবার নাম বলে শুধু একটাই প্রশ্ন করবেন, “আপনার পরস্পরকে বিয়ে করতে রাজি?” যে কেউ একজন এভেত (হ্যাঁ)  বলে দিলেই হল। তারপর শুধুই গান, নাচ আর খাওয়া-দাওয়া।

এভেত বলে দিতেই লনে অপেক্ষারত ব্যান্ডের লীড ভোকাল  শুরু করে দিলেন যে কোনো তুর্কী পার্টির অবশ্যবাদ্য গানটি,

Now you found the secret code
I use to wash away my lonely blues (well)
So I can’t deny or lie cause you’re the only one to make me fly
Sexbomb sexbomb you’re a sexbomb uh, huh!

টম জোনসের গমগমে গলার মধ্যে আড়াল খুঁজে নিয়ে ক নতুন কনেকে নিয়ে প্রাণপণে পি-এন-পি-সি করছিলেন খ-র সঙ্গে, খেয়াল করেননি কখন ভিডিয়োগ্রাফাররা অজান্তেই সেসব আলোচনা রেকর্ড করে নিয়েছে – সে আরেক গল্প।

ক ছাড়া বাকি তিনশ উনপঞ্চাশ লোক নাচছেন – ঘুরে-ফিরে, টুইস্ট দিতে দিতে, জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে এলভিস স্টাইলে, মেদের বাহুল্যে বলরুম পোজে্‌………আমি গুটি গুটি এগোলাম নতুন বর-কনের গন্ধ নিতে।

Advertisements