মিটিমিটি চোখের ইতিহাস

ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করার পরের দিনেই শ্রীমতী ভ্রূটি বড্ড কুঁচকে ডাকলেন , “শোনো, ওই যে প্রফেসর মেরিলিন মনরোর মুখ আঁকা টাই পরে আসেন, ওনার সঙ্গে আলাপ আছে তোমার?”। আমি শুনে যারপরনাই চমৎকৃত, “সত্যি, এরকম টাই পরে কেউ আসেন নাকি? আমি যদিও চিনি না তাঁকে কিন্তু আলাপ করার বিলক্ষণ ইচ্ছে রইল”। শ্রীমতী বিশদে কিছু ভাঙ্গলেন না খালি যাওয়ার সময় বললেন, “লোকটা সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না”। দাম্পত্য কলহে জড়িয়ে পড়ার ইচ্ছে ছিল না তাও বললাম “মেরিলিনের মুখ আঁকা  টাই-ই তো পরেছেন, কো-অথরের বৌকে নিয়ে তো পালিয়ে যান নি”। শ্রীমতী কিছু একটা প্রত্যুত্তর দিতে গিয়েও দিলেন না, রাগ রাগ মুখে একবার আপাদমস্তক  দেখে চলে গেলেন।

দিন তিনেক পর ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের দিকে চলেছি, বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখি ছোটোখাটো একটি জটলা। চার পাঁচটি ছেলে একটি মেয়েকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে; জটলার মধ্যে থেকেও স্কার্টটি চিনতে ভুল হয়নি এবং স্বভাবতই বুকটি ছ্যাঁত করে উঠেছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি শ্রীমতী একটু হতভম্ব মুখে দাঁড়িয়ে, এবং ছেলেগুলি চোস্ত তুর্কী এবং ভাঙ্গা ইংলিশে প্রভূত ক্ষমা চাইছে। আমাকে দেখেই অবশ্য জটলাটি ভেঙ্গে গেল এবং ছাত্রকুল আরো একবার দুঃখপ্রকাশ করে যে যার ডরমিটরি পানে চলে গেলেন। আমার মুখের অবস্থা দেখে শ্রীমতীর মায়া হল, বললেন “চিন্তার কিছু নেই, আজকে ঘন্টা খানেক ধরে ক্লাস ডিসকাশনের ফল”। আমি অবাক হয়ে বললাম “আজকে তো ক্লাস ছিল বিজনেস এথিকসের। ক্লাসে এমন কি ঘটেছে যে যে সবাই মিলে ক্ষমা চাইতে এসেছে?”। শ্রীমতী একটু চিন্তিত মুখে বললেন “আজকে এরা ক্ষমা চাইল বটে কিন্তু মনে হচ্ছে কালকে আমারও গিয়ে কিছু বলা দরকার”। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তারপর বললেন, “সারাদিন ক্লাস করার পর এখন আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, তার ওপর বাড়িতে হোল চিকেন ডিফ্রস্ট হচ্ছে, আগে কেটে দেবে চলো”।

মুরগীর গরম  ঝোলমাহাত্ম্যে আসল কথাটা বেরোল – চোখ নিয়ে সমস্যা। প্রথম দিন থেকেই আলাপ হওয়া ইস্তক তুর্কী প্রফেসর, সহপাঠী, প্রোগ্রাম কোঅরডিনেটর যে যে পেরেছেন সবাই চোখ টিপে চলেছেন। মেরিলিন-ভক্তই বোধহয় শুরু করেছিলেন, কিন্তু তারপর গাঁ উজাড় করে সবাই এমন চোখে চোখে কথা বলার তাড়না দেখিয়েছেন, আলাদা করে আর ঠগ শ্রীমতী বাছেন কি করে? শেষে বিজনেস এথিকসের ক্লাসে বিভিন্ন ইমারজিং মার্কেটের ভোক্তাদের সোশিওলজিক্যাল ট্রেটসের ওপর প্রেজেন্টেশন দিতে গিয়ে রহস্য উদ্ধার হয়েছে। জানা গেছে তুরস্কে চোখ টেপার অর্থ নিতান্তই হাই-হ্যালো; ইজ এভরিথিং অলরাইট গোছের দৈনন্দিন পাশ কাটানো প্রশ্নের সমতুল্য এই চোখ টেপা। লোকের বড়ই আলস্য অত কথাবার্তা বলায়, চোখ টিপে দিলেই সমস্যা মিটে গেল – শর্ট অ্যান্ড সুইট উপায়। কিন্তু মুশকিল হল শ্রীমতী ক্লাসে ঘোষণা করেছেন উপমহাদেশীয় কালচারে  চোখে টেপা মানেই গন্ডগোলের লক্ষণ, ফ্লার্টেশাস বিহেভিয়রের চুড়ান্ত।  তাতে সায় দিয়েছে পাকিস্তানী ছাত্রছাত্রীরাও। আর তাতেই তুর্কী ছাত্রছাত্রী থেকে প্রফেসর, সবাই ভারী লজ্জিত হয়ে পড়েছেন – গোটা ক্লাসের তরফ থেকেই ওই চার-পাঁচ জনকে পাঠানো হয়েছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য। পুরো ঘটনাটা পরিষ্কার হওয়ার পর শ্রীমতী নিজেই এবার বেশ বিব্রত, যস্মিন দেশে যদাচার আপ্তবাক্যটি স্মরণ করে ভাবছেন ওনারও উল্টে দুঃখপ্রকাশ করা উচিত হবে কিনা।

তুরস্কই এক অর্থে আমার প্রথম বিদেশ, আমেরিকায় দশ বছর কাটালেও কিছু তাৎক্ষণিক কালচার শক ছাড়া খুব কিছু বিজাতীয় অভিজ্ঞতা ঘটেনি। সুতরাং এহেন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হওয়ার সুযোগও খুব বেশী আসেনি আগে। কৌতূহলও হল বেজায় – সত্যি তো, দেশকাল নির্বিশেষে চোখ টেপার দস্তুরকে একইভাবে বিশ্লেষণ নিশ্চয় করা হয়নি।

খোঁজাখুঁজি করে জানা গেল ইংরেজিতে Wink শব্দটির ব্যবহার প্রায় সাতশ বছরের পুরনো। যদিও এই শব্দটি এসেছে আবার ওল্ড জার্মেনিক ভাষা থেকে, ক্রিয়াপদ হিসাবে সেই আদি শব্দের একটি অর্থ হল ঢেউ খেলানো। সুতরাং, কেউ যদি দাবি করেন মধ্যযুগে চোখ টেপার একটা র‍্যোমান্টিক ইতিবৃত্ত রয়ে গেছে, সে দাবী হয়তো খুব সহজে নস্যাৎ করা যাবে না। বাংলা ভাষায় অবশ্য ‘চোখ টেপা’ই বলুন কি ‘চোখ মারা’ সবই হাল আমলের বাক্যবন্ধ। সত্তর – আশি বছর আগেও কি লোকে একই কথা ব্যবহার করত? সে উত্তর পাওয়া একটু শক্ত ব্যাপার, কিন্তু অভিধানকে যদি তৎকালীন সমাজের ভাষার প্রতিচ্ছবি হিসাবে কল্পনা করতে পারেন তাহলে মানতে হবে যে চোখ টেপাটা আগেকার যুগে ছিল নিতান্তই ‘চোখ পিটপিট করা’। ১৯০১ সালের ‘কম্প্রিহেন্সিভ ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনারি’ (প্রণেতা মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশনের ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ এইচ-সি-শূর মহাশয়) জানাচ্ছে Wink এর বাংলা প্রতিশব্দ চক্ষু মিটমিটকরণ। মিটমিটকরণ শব্দটি দেখে অবশ্য অনাবিল আনন্দ লাভ করেছি।

এও জানা গেল যে পৃথিবীর প্রায় সব সভ্যতাতেই ‘চক্ষু মিটমিটকরণ’ প্রক্রিয়াটি বাক্যালাপের অন্যতম বিকল্প হিসাবে পরিগণিত হয়ে এসেছে। আমেরিকান নৃতত্ববিদ ক্লিফোর্ড গার্টজ বলেছেন চোখ টেপার মধ্যে একটা ষড়যন্ত্রের আভাস সবসময়েই থাকে – সেটা অবশ্য খেলাচ্ছলেও হতে পারে। কিন্তু ষড়যন্ত্রটা এখানে বড় কথা নয়, বড় কথা হল আপনি চোখ টিপছেন মানে নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে আপনার একটি নির্দিষ্ট চিন্তাপ্রবাহ কাজ করছে, কোনো  একটা অব্জেক্টিভ আপনি ফুলফিল করতে চাইছেন।

কোন অব্জেকটিভ? কি উদ্দেশ্য?

আসুন, কিছু  ছবি দেখা যাক।

Messi

ফুটবলের রাজপুত্রকে চিনতে না পারার কোনো কারণ নেই। বেশী ইন্টারেস্টিং প্রশ্নটা হল কাকে চোখ টিপছেন উনি? একটা হিন্ট – দ্বিতীয়জনের জার্সির রঙ সাদা।

এটা ২০১০ এর একটি এল ক্লাসিকো শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে নেওয়া ছবি। অফ কোর্স, দ্বিতীয় জন রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে স্বয়ং রোনাল্ডো। একটা প্লেফুল ব্যাপার তো অবশ্যই ফুটে উঠেছে, সঙ্গে রয়েছে  আরেকটি সাটল অব্জেক্টিভ – মিডিয়া যতই নারদ-নারদ করুক, সে ফাঁদে পা দেওয়ার বান্দা আমি নই। এখন দর্শক বিশ্বাস করল কিনা সেটা পরের কথা।

বিশ্বাসের ব্যাপার, কনভিকশনের ব্যাপারটা অবশ্যই আপনার পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করবে। এইখানে আপনি হাঁ হাঁ করে উঠতেই পারেন “দুর মশাই, চোখ টেপার মধ্যে আবার পারফরম্যান্স কি?” তাহলে পরের ছবিটা দেখা যাক বরং।

Sharapova

কিছু জুনিয়র টেনিস প্লেয়ার বিখ্যাত গ্যাংনাম নাচের একটা ভিডিও বানিয়ে শারাপোভাকে অনুরোধ করেছিলেন সেটাকে প্রোমোট করতে। শারাপোভা করেওছিলেন, কিন্তু ছবিতে খুবই স্পষ্ট যে এ নিতান্তই উপরোধে ঢেঁকি গেলা – অনভ্যাসের ফোঁটা চড়চড় করে ফুটে উঠেছে। শারাপোভাও বুঝতে পেরে বেশ বিব্রত হয়েছিলেন, পরে স্বীকারও করে নেন। ‘কুল’ (আমেরিকান কায়দায়) সবাইকে হতেই হবে, এমন কথা বলে কে?

তবে এর উলটো দিকটাও আছে।

Obama

“আমার মা কানসাসে জন্মেছেন, বাবা কেনিয়ায়। আর আমি? হাওয়াই-এ”, বলতে বলতেই ছোট্ট একটা উইঙ্ক।  বুদ্ধিমান ও বাগ্মী পুরুষের এ পারফরম্যান্স তাবৎ দর্শককুলের কাছে উপরি পাওনা; সবাই গলে জল-  হাসতে হাসতে, বিষম খেতে খেতে অস্থির। যারা রাজনীতি, অর্থনীতির বাঘা বাঘা সমস্যা এড়িয়ে ওবামার জন্মরহস্য নিয়ে পড়েছিলেন তাঁরা দশ গোল খেলেন।

অবশ্য সবাই যে এত স্ট্র্যাটেজিকালি চোখ টিপবেন সেটা ভাবাটা অন্যায়। নিছক চ্যাংড়ামোও একটা উদ্দেশ্য হতেই পারে, হাল্কা ষড়যন্ত্রই বলতে পারেন ক্লিফোর্ডের ভাষায়।

Chinmoy

“শ্যাম কিছু করেছিলিস?”

অত্যন্ত রাগত সৌমিত্র – “মানে?”

“মানে, এই চোখ টোখ মেরেছিলিস?”

যাঁদের বসন্ত বিলাপ দেখে দেখে মুখস্থ হয়ে গেছে তাঁরা নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবেন এখানে – চিন্ময়ের ‘চক্ষু মিটমিটকরণ’ কে চোখ টেপার থেকে চোখ মারা বলাটাই যথার্থ হবে। শুধু তো ছবিই নয়, ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘ট্যাঁ’ করে বেজে ওঠা শব্দটি  একটা সূক্ষ্ম   শালীন-অশালীনের গন্ডীও টেনে দেয়।

আর এই সব কিছুকে ছাড়িয়ে,

Uttam

স্টাইল!

এইটা নিয়ে বরং বেশী বাক্যব্যয় না করে দেখে নি আসল ভিডিওটা

এবার ফিরে যাওয়া যাক চোখ টেপা নিয়ে মূল আলোচনায়। একটা কথা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে – যখনই কেউ চোখ টিপছেন, তাঁর উদ্দেশ্য থাকছে অন্যজনের সঙ্গে একটা যোগাযোগ বা ভাব আদানপ্রদান করা, কিন্তু কোনোরকম শব্দের সাহায্য নিয়ে নয়। শব্দ থাকছে না বলেই যিনি গ্রহীতা, তাঁর জন্য যোগাযোগের এই মাধ্যমটা একটু শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। সোজা কথায় – কেউ যদি আপনার দিকে তাকিয়ে চোখ টেপেন, আপনি কি করবেন?

১) দৃকপাত করবেন না

২) পুলিশে খবর দেবেন

৩) হাসবেন

৪) আপনিও চোখ টিপবেন

সমস্যা, তাই না? ভাষা নিয়ে যে সমস্ত নৃতত্ববিদরা মাথা ঘামান তাঁদের অনেকেরই বক্তব্য নীরব হেসে প্রত্যুত্তর দেওয়াটাই সব থেকে সেফ অপশন, অভদ্রতাও হল না আবার অত্যধিক এনগেজড হয়ে পড়ারও স্কোপ নেই।  হাসার অপশন থাকাটা নিতান্তই গুরুত্বপূর্ণ  আরেকটি কারণে – আপনার নিজের দেশে কি নিজের শহরে আপনি ভালোই জানেন যে চোখ টেপার অর্থ কি, কিন্তু যে মুহূর্তে অন্য একটা সমাজ, অন্য একটা সংস্কৃতিতে সেই একই ঘটনা ঘটতে দেখছেন তখন আপনার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যটি। সেখানে এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চোখ টেপা, নাকি নেহাতই যান্ত্রিক চোখ পিটপিট করা নাকি একটা ক্যাজুয়াল শারীরভাষ্য সেটা বোঝা দুষ্কর।

জার্মান দার্শনিক হাইডেগারের মতে এই অনিশ্চয়তাই চোখ টেপা প্রক্রিয়াটির সবসেরা বৈশিষ্ট্য, অন্য যে কোনো যোগাযোগের মাধ্যমে কিন্তু এই অনিশ্চয়তা দেখতে পাবেন না। হাইডেগার আর একটি চমৎকার পয়েন্ট তুলে এনেছেন – প্রক্রিয়াটির সঙ্গে বর্তমানের কোনো সম্পর্ক নেই। চোখ টেপা কাজটি বর্তমানে হতে দেখলেও, এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যটি কিন্তু হয় অতীতে হয়ে যাওয়া কোনো ঘটনা অথবা ভবিষ্যৎ-এ হতে চলা  কোনো ঘটনার সঙ্গেই যুক্ত। এবং আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ইতিহাসের জন্ম।  হাইডেগারের কাছে wink এর অর্থ অবশ্য সঙ্কেত, কি ধরণের সঙ্কেত সেটা কিছুটা হলেও অপ্রাসঙ্গিক। শব্দ  সাজিয়ে বাক্য গঠন যেদিন থেকে শুরু করেছি, মৌখিক ইতিহাসের শুরুও সেদিন থেকেই (লিখিত ইতিহাস আসবে আরো পরে) – কিন্তু সঙ্কেত যেহেতু শব্দেরও আগে এসেছে, তাই মৌখিক ইতিহাসের আগের ইতিহাস লুকিয়ে আছে ওই চোখের চাহনিতেই।

নিল ম্যাকয়ের কাছে অবশ্য এ সঙ্কেত শুধুই আশার প্রতীক। হোক, তাই হোক। প্রিয় পাঠক, পরের বার কেউ চোখের ইশারায় যোগাযোগ করতে চাইলে ভেবড়ে যাবেন না, দেখলেন তো ইতিহাস, র‍্যোমান্স, আশা-আকাঙ্খা কোনটা জড়িয়ে নেই!

Advertisements