অনর্থনীতির ইতিহাস

প্রবাসে থাকলেও ষষ্ঠীর সকালে ট্র্যাজিক ব্যাখ্যান লিখতে আর ভালো লাগে কই, কিন্তু না লিখেও শান্তি নেই।  এরকম অশান্তি থেকেই মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম পরিবর্তন আসুক কিন্তু আপনাদের অনেকের মতনই আমারও “ধূলিসাৎ বটে সে বালখিল্য স্বপ্নরা” এবং আপাতত শুধুই “দগ্ধ হৃদয় হাওয়ায় মেলতে পথ ঘোরা”।

কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতেই বোধহয় বিজনেস টুডে সম্প্রতি দু’পাতা জোড়া গ্রাফিটির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন শিল্পে পশ্চিমবঙ্গের করুণ অবস্থাটি। করুণ অবস্থা নিয়ে বাঙ্গালীদের নতুন করে অবহিত করার কিছু নেই কিন্তু সংখ্যা বড় দায়, তাই সেগুলো একবার জানানো যাক (বলে রাখা ভালো যে সংখ্যারাজি এসেছে বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স এবং প্ল্যানিং কমিশন থেকে)।

১) নতুন শিল্পপ্রকল্পের সংখ্যা ২০১০-এ ছিল ৩২৩, ২০১২ র শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ১২। এমন কি পিছিয়ে যদি ২০০৫-এও যান, তখনও নতুন শিল্পপ্রকল্পের সংখ্যা ছিল ২২৭। প্রশ্ন উঠতে পারে যে এই ২২৭ কি ৩২৩-র অধিকাংশই হয়ত কুটিরশিল্প আর ১২-র অধিকাংশই যাকে বলে হটশট – সেটা খুবই সম্ভব । কিন্তু বিনিয়োগের অঙ্কটা দেখতে গেলেও চোখ জল – ২০১০-এ যেখানে বিনিয়োগ ছিল প্রায় পনের হাজার কোটি, ২০১২ তে সেটা গিয়ে থেমেছে ৩১২ কোটিতে।

২) সারা ভারত জুড়ে আসতে থাকা বৈদেশিক বিনিয়োগের মাত্র ১% শতাংশ ঢুকেছে পশ্চিমবঙ্গে। মুম্বাই, দিল্লী কি ব্যাঙ্গালোরের কথা ছেড়েই দিন, ওদের সঙ্গে কলকাতাকে এক সারিতে রাখার কোনো প্রশ্নই নেই, কিন্তু আমেদাবাদ-ও অনেকটাই এগিয়ে। আবারো মনে করাই এটা ২০১২-র হিসেব, ২০১৩-র হিসেব এখনো হাতে আসেনি কিন্তু মনে হয় না সামগ্রিক চিত্রে ইতরবিশেষ তফাত-ও হবে।

৩) রাজ্যের সামগ্রিক সম্পদে শিল্পের কন্ট্রিবিউশন-ও বাম আমলের তুলনায় কমেছে – ২০০৯ কি ২০১০ এর কনসিস্টেন্ট ২০ শতাংশর জায়গায় সেটা এখন নেমে এসেছে ১৯%-র নিচে।

৪) ইকোনমিক গ্রোথ রেটেও অগ্রগামী রাজ্যগুলির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ এখনো বেশ পিছিয়ে যদিও বিজনেস টুডে বলছেন যে একমাত্র আশার আলো হল ব্যবধান কমছে। কিন্তু অর্থনীতির ছাত্র মানেই জানেন যে একে ঠিক আশার আলো বলা যাবে না, কারণ যে সমস্ত রাজ্য গ্রোথের হিসাবে অনেকটাই এগিয়ে শুরু করেছে তাদের বৃদ্ধির হার পুরনো একই হারে বাড়তে পারে না। তাই জন্য আমেরিকা কি জার্মানির তুলনায় চীন বা ভারতে ইকোনমিক গ্রোথ রেট অনেক সময়েই বেশী হতে দেখবেন। এর মধ্যে আবার যদি সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কথা ধরেন তাহলে কথাই নেই, গুজরাট কি মহারাষ্ট্র যে হারে বাড়ছিল তা কমে আসতে বাধ্য। তাই বরং তাকানো ভালো ভারতের ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং রাজ্যগুলির দিকে – সেখানে প্রথম পাঁচ রাজ্যগুলি যখন ১২ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, আমরা সবে ৭ পেরিয়েছি (এগুলো কিন্তু একদম হালের পরিসংখ্যান)।

এবার শিল্প ছেড়ে দেখা যাক প্রাথমিক শিক্ষা, পানীয় জলের সহজলভ্যতা, স্বাস্থ্য খাতে সরকারী ব্যয়, পাকা রাস্তাওলা পরিকাঠামো – যেদিকেই তাকান, দেখবেন এমন কি ছত্তিশগড়, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান-ও অনেক এগিয়ে। কংগ্রেস হোক কি বিজেপি, রাজনৈতিক মতাদর্শ এখানে আলাদা করে ছাপ ফেলেনি – বহু রাজ্যই শেষ তিন চার বছরে নীরবে অনেক পরিবর্তন এনেছে। অল ইজ অফ কোর্স নট ওয়েল, কিন্তু কাজ হচ্ছে – আমরা স্বীকার করি কি না করি, সংখ্যার ‘পরিবর্তন’ হবে না। ভাবতে পারেন তবে কি আঞ্চলিক দলগুলোই পারছে না? কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের বৈমাতৃক মনোভাব? সে কথাও বলা যাবে না, বিহার মডেলের সাফল্য আমরা দেখেছি এমন কি তুলনামূলক ভাবে পিছিয়ে পড়া রাজ্য উত্তরপ্রদেশেও কাজ হচ্ছে, তামিলনাড়ুর মতন রাজ্যর কথা ছেড়েই দিলাম।

অর্থনীতি আর রাজনীতিকে আলাদা করা বোঝা সম্ভব নয়। অর্থনীতির বেহাল অবস্থা বোঝার জন্য  দরকার রাজনীতির বিশ্লেষণ-ও। আসুন, আজকে কিছু পুরনো গল্প শোনা যাক – যে গল্প মনে করাবে স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির ইতিহাস আদপে অনর্থনীতির, রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা কিভাবে আমাদের ক্রমে ক্রমে নিয়ে গেছে খাদের কিনারায়।

AM_BCR

 

বিধান রায় যে পশ্চিমবঙ্গের রূপকার সে কথা কংগ্রেস, তৃণমূল তো বটেই বহু বামপন্থী নেতাও অস্বীকার করবেন না। দুর্গাপুর, কল্যাণী এমন কি কলকাতার মেট্রো রেলও যাঁর ব্রেন চাইল্ড, তাঁকে এহেন তকমা দেওয়াটা হয়ত অসঙ্গত নয়। কিন্তু অনর্থনীতির শুরু যে বিধান রায়ের আমল থেকেই, সে কথাটাও মনে রাখা দরকার। বাংলা তথা সামগ্রিক পূর্বাঞ্চলে কয়লা এবং ইস্পাতের সহজলভ্যতার ফলে স্বাধীনতার আগে আমাদের একটা কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ ছিল। ১৯৫৬ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ফরমান জারি করেন যে দেশ জুড়ে কয়লা এবং ইস্পাতের দাম এক রাখা হবে, এ ছাড়াও বলা হল কয়লা পরিবহণের জন্য দূরত্ব যত বেশী হবে, কিলোমিটার প্রতি দাম তত কম পড়বে। এহেন পরিপ্রেক্ষিতে এটা এক্সপেক্টেড যে রাইটার্স বিল্ডিং থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠবে, যুক্ততান্ত্রিক পরিকাঠামোয় কেউই নিজের কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ টুকু এমনি এমনি ছেড়ে দেবেন না। কিন্তু প্রতিবাদ আদপেই ওঠেনি, রাইটার্স বিল্ডিং বলতে গেলে নিশ্চুপেই মেনে নিয়েছে এ ডিকটাম – কারণ বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে দুর্গাপুর। বামপন্থী নেতাদের মধ্যেও অনেকেই দুর্গাপুর পাওয়ায় এ নিয়ে বিশেষ রা কাড়েননি, ব্যতিক্রম অশোক মিত্রের মতন কিছু হাতে গোনা নেতা। অশোক মিত্র সবসময়ই বলে এসেছেন দুর্গাপুরের বদলে ওই কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ টুকু বিকিয়ে দেওয়ার মতন বোকামি খুব কমই দেখেছি আমরা। সেটা প্রথমবারের জন্য বোঝা যায় ষাট দশকের শেষে যখন ইস্পাত শিল্পে মন্দা আসে। দুর্গাপুর যেহেতু ইস্পাত শিল্পের পীঠস্থান, এবং স্টীল প্রোডাক্টের মূল্য নির্ধারণে বাংলার ভূমিকা ততদিনে নগণ্য,  বেশ ভালো মতনই মার খেলাম আমরা। এমনই বিড়ম্বনা যে সত্তরের দশক থেকে দুর্গাপুর উল্টে বাংলার মধ্যে পরিচিতি পেতে লাগল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য, সেই ট্র্যাডিশন এখনো চলছে। কিন্তু ইস্পাতনগরীর দুর্গাপুরের শিল্প নিয়ে আর বলার বেশী কিছু রইল না। শুধু রাজনীতিকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, এ নিয়ে তখনকার বাঙ্গালী শিল্পপতিরাও ( এমন কি স্যার বীরেন মুখার্জী-ও) কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। দুর্গাপুর নামক নাড়ুটি মিলল  ঠিকই, কেউই বুঝলেন না মোটের ওপর সেটা হাত ঘুরিয়ে পাওয়া।

Refugee

 

পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক অর্থনীতির বেহাল দশা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই উদ্বাস্তু সমস্যার কথা উঠবেই। উদ্বাস্তু সমস্যা যে পশ্চিমবঙ্গকে ব্যতিব্যস্ত করে এসেছে সে নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই, পাঞ্জাবের মতন রাজ্য যে পরিমাণ সাহায্য পেয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে আমরা সে সব পাইনি। কিন্তু তার পরেও আমাদের অদূরদর্শিতার কথা তুলতেই হবে। পঞ্চাশের মাঝামাঝি থেকে রাজ্য সরকার শিল্পপতিদের উৎসাহ দিতে শুরু করেন উদ্বাস্তুদের জন্য শিল্পপ্রকল্পে বিনিয়োগ করতে, কথা দেওয়া হয় রাজ্য সরকার-ও এ ব্যাপারে আর্থিক সহায়তা করবে। কুড়িখানি এরকম প্রকল্পের আবেদনপত্র মঞ্জুর-ও করা হয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায়, এই সব শিল্পপ্রকল্পগুলিকে রাখা হল সরকারের অধীনে (সবগুলিই হয়ে উঠল পাবলিক সেক্টর প্রোজেক্ট), অর্থাৎ অন্ত্রপ্রেনিওরদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই প্রায় থাকল না। স্বাভাবিক ভাবেই, বিনিয়োগকারী এবং শিল্পপতিরা শুরুর উৎসাহ হারিয়ে ফেললেন। শিল্পপতিরা উৎসাহ হারানোয় সরকারপক্ষ-ও বিশেষ গা করলেন না – শান্তিপুরের তাঁতকল, হুগলীর রবীন্দ্রনগরের রোলিং মিল, ধুবুলিয়ায় চিনির কল, উত্তরবঙ্গের কাঠ চেরাইয়ের কারখানা সব খাতায় কলমে প্রকল্প হয়েই পড়ে থাকল। কেন্দ্রীয় সরকারের পরামর্শে রাজ্য সরকার প্রথমে হিসেব করে দেখলেন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনটুকু দিয়ে এ রাজ্যে রাখা যায় কিনা, তারপর ওপার বাংলা থেকে আগত শরণার্থীদের ঢল দেখে সেসব হিসেবনিকেশ-ও শিকেয় তুললেন। উপরন্তু পূর্ব পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশ থেক আগত শরণার্থীদের নিজের দেশেই সম্মানের সঙ্গে পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করার জন্য যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার দরকার ছিল, সেটা  বাম-ডান কোনো পক্ষই দেখাতে পারলেন না। অতএব, শিল্পের সাহায্যে উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের আইডিয়াকে গুলি মেরে হাজার হাজার শরণার্থীকে পাঠানো হল দন্ডকারণ্যে, বিরোধী দল আবার সেই উদ্বাস্তুদের মধ্যেই ভোটের বেস বানানোর জন্য অনাগত ভবিষ্যৎ এর কথা না ভেবেই ক্যাডার মজুত করতে লাগলেন। ফল হল এই যে উদ্বাস্তু সমস্যায় জেরবার পশ্চিমবঙ্গে প্রায় তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে বেকারি হুহু করে বাড়তে লাগল আর যারা বিরোধীপক্ষের ক্যাডার হওয়ার সুযোগ পেলেন না তাঁরা মরিয়া হয়ে বাংলায় ফিরে এসে দেখলেন সরকার পালটে গেলেও তাঁদের মরিচঝাঁপিতে গুলি খেয়ে মরতে হচ্ছে।

 

 

 

cs_h

উদ্বাস্তু সমস্যা চরম আকার ধারণ করে সত্তরের দশকে, আর ওই সত্তরের দশকের শেষের দিকেই বামফ্রন্টের ‘দুর্গাপুর’ হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের জন্ম। ৭৭ সালে যখন হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের গোড়াপত্তন হয়, বিনিয়োগের জন্য প্রধান ভরসা ছিলেন বামফ্রন্ট সরকারের দুই ঘনিষ্ট শিল্পপতি – রমাপ্রসাদ গোয়েঙ্কা এবং দরবারী শেঠ। কিন্তু বছর আটেক কাজই শুরু হতে পারেনি, কাজ শুরু হওয়ার পরেও এতই শ্লথগতিতে কাজ হতে থাকে যে শুরুর বিনিয়োগকারীদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, প্রায় সবাই সরে আসেন। সরকারের সঙ্গে তাঁদের হৃদ্যতায় কোনো ছাপ না পড়লেও হলদিয়া পড়ে থাকে বিশ-বাঁও-জলে। তারপর ৯৪ সালে পূর্ণেন্দু চ্যাটার্জীর আগমন এবং পরবর্তী ইতিহাস প্রায় সবাই জানেন।  কিন্তু একটা চমৎকার আইডিয়ার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি প্রায় ঘটছিল কি কারণে (যার ফল এখনো টেনে বেড়াতে হচ্ছে)? অন্যতম প্রধান কারণ – ইনফ্রাস্ট্রকচার ছাড়াই মাঠে নেমে পড়া। ইনফ্রস্ট্রাকচার বলতে কিন্তু শুধু যন্ত্রপাতি বুঝবেন না, উৎপাদনের একটি অন্যতম শর্ত জমি। পশ্চিমবঙ্গে জমি যোগাড় করা যে কত কঠিন কাজ সে কথা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের সুবাদে আজ কারোর অজানা নয়, হলদিয়াতেও কিন্তু জমির কারণেই কাজ থমকে থেকেছে বহু বছর। ফলত মিৎসুবিশি, নিশিমেনের মতন সংস্থা উৎসাহ দেখিয়েও কাজ করে উঠতে পারেনি। হলদিয়া যথার্থই বামফ্রন্ট সরকারের ড্রীম প্রোজেক্ট, নয় নয় করে বেশ কিছু দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীকেও তাঁরা টেনে আনতে পেরেছিলেন কিন্তু লাভটা কি হল তাতে?  আপনি স্বপ্ন দেখছেন আপনার ড্রীম প্রোজেক্টকে বাস্তবায়িত করার অথচ গোড়াতেই গলদ। জমিই যদি না থাকে, তাহলে কাজটা হবে কোথায়? এবং তার সঙ্গে আছে সেই চিরাচরিত ‘কস্ট ওভাররান’ এর সমস্যা। একজন বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগের পরিমাণই বলুন বা খরচের, সবই এই আটকে যাওয়া জমির দরুণ হু হু করে বাড়তে থাকবে, আর ঠিক সেই কারণেই একের পর এক শিল্পপতি এই প্রোজেক্ট ছেড়ে চলে গেছেন। নন্দীগ্রাম বা সিঙ্গুর দেখিয়েছে জোর করে জমি অধিগ্রহণের কি ভয়াবহ পরিণাম হতে পারে আর হলদিয়া তার বহু আগেই দেখিয়ে গেছে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিনিয়োগকারীদের টেনে আনলে পস্তানি শুধু বর্তমানের জন্য বরাদ্দ থাকে না, ভবিষ্যৎ-এ প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগটুকুও মেলে না।

রাজা আসে, রাজা যায় – আমরা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি পাঞ্জাব, গুজরাট, তামিলনাড়ু তো ছাড়, এখন বিহার, উত্তরপ্রদেশ হয়ে এমনকি মেঘালয়, ছত্তিশগড়েও রিফরমের ঘনঘটা। কেউ ঢাক বাজিয়ে করছেন, কেউ নিঃশব্দে – কিন্তু সবাই বর্তমানের কথা ভেবে সুখ পেতে পারেন। আমাদের সুখস্মৃতি সেই ৭৭ এর ল্যান্ড রিফরমেই আটকে আছে, তারপরে ভাঁড় পরিপূর্ণ করতে মা ভবানী ছাড়া আর কেউ এসে পৌঁছননি।

Advertisements

অন্য গ্রহে

ভারতের মঙ্গল গ্রহে সফল অভিযানের খবর এতক্ষণে সবাই জেনে গেছেন, সেলিব্রেশনের ফাঁকে স্মরণ করা যাক বাংলার কিছু সফল মহাকাশযাত্রীকে যাঁরা ইসরোর মঙ্গলযানের  বহু আগেই পাড়ি দিয়ে এসেছেন অন্য গ্রহে (কখনো সখনো উপগ্রহেও)।

Premendra Mitra

 

(প্রেমেন্দ্র মিত্রর ছবি – লেখক)

১) সমর রায় এবং অজয় চক্রবর্তী –  দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কয়েক বছর আগে এক প্রায়োন্মাদ জার্মান বৈজ্ঞানিকের পাল্লায় পড়ে এনারা চলে গেছিলেন শুক্র গ্রহে, যদিও প্রথমে মঙ্গল গ্রহে যাওয়া হচ্ছে এরকম একটা ভুল ধারণা তৈরি হয়ে যায়। শুক্র যে শুধু কাছের গ্রহ তাই জন্যই নয়, জার্মান বৈজ্ঞানিক ডক্টর ব্রুলের ধারণা মঙ্গল মৃতপ্রায় গ্রহ তাই সেখানে এক্সপ্লোর করে বিশেষ লাভ নেই (বলা বাহুল্য যে ইসরোর বিজ্ঞানীরা কর্ণপাত করেননি, আশা করা যায় পরে পস্তাতে হবে না)। জীবন্ত গাছের (সব গাছই জীবন্ত কিন্ত এরা রীতিমতন নড়াচড়া করে) জঙ্গল,  প্রলয়ঙ্কর বৃষ্টি, গন্ডারের মতন দেখতে পাহাড়প্রমাণ জানোয়ার, জগতনাশা ভূমিকম্প – বহু বিপদের মধ্যেই পড়তে হয়েছে শুক্রে গিয়ে তবে ভালো খবরও আছে – যেমন শুক্রের হাওয়া বিষাক্ত নয়, পৃথিবীর থেকে একটু আলাদা হলেও শ্বাস নেওয়াতে সমস্যা নেই। এনাদের অভিযানের কথা বিশদে পড়তে হলে চাই “শুক্রে যারা গিয়েছিল” (প্রেমেন্দ্র মিত্র)।

ghanada

(আদত ছবি – সমীর সরকার; বৈদ্যুতিন  সংস্করণ – লেখক)

২) ঘনশ্যাম দাস –  ঘনশ্যাম দাস ওরফে ঘনাদাকে আপনারা প্রায় সবাই চেনেন, তবে তাঁর মঙ্গলগ্রহের অভিযানের খবরটা সবার মনে আছে কিনা সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। যাওয়ার কথা ছিল দিল্লী থেকে আমেদাবাদ, সর্বনাশা এক ঝড়ের চোটে আমেদাবাদের বদলে গিয়ে উপস্থিত হন মঙ্গল গ্রহে। নেমেই পেয়েছিলেন অস্বাভাবিক এক ধুলোর ঝড়। মঙ্গলের তুলনায় পৃথিবীতে জলীয় বাষ্পের পরিমান প্রায় দু’হাজার গুণ বেশী, স্বাভাবিক ভাবেই বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন এ শুকনো মৃত্যুপুরীতে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব নেই,  কিন্তু ঘনাদার ফার্স্টহ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স সেই প্রচলিত ধ্যানধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে। মঙ্গলেও প্রাণী আছে, জালার মতন চেহারা হলেও তারা বুদ্ধিমান এনং শ্রুতিধর কাম হরবোলা, সুতরাং মঙ্গলে যদি একবার পৌঁছে যান বাংলা ভাষায় কথাবার্তা চালানোটা কোনো ব্যাপারই নয়। আরো ডিটেলস চান? পড়ে ফেলুন “মঙ্গলগ্রহে ঘনাদা” (প্রেমেন্দ্র মিত্র)।

Amaresh1

(ছবি – দেব সাহিত্য কুটীর)

৩) অমরেশ – দেব সাহিত্য কুটীরের বার্ষিকীর গুলোর দৌলতে অমরেশ আপনাদের বেশ পরিচিতই। ১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসে কলকাতা থেকে দিল্লী যেতে গিয়ে প্লেনে করেই চাঁদে পৌছে যান ইনি। চাঁদের কলঙ্ককে যে শুধু সামনাসামনি দেখারই চান্স পেয়েছিলেন তাই নয়, যে ভয়ঙ্কর উল্কাবৃষ্টি  এর কারণ তারও মধ্যে পড়তে হয়েছিল অমরেশ এবং তাঁর থিয়েটার পার্টিকে। তবে কাজের কাজটি করেছিলেন থিয়েটার পার্টির হিরোইন্, শত বিপদের মধ্যেও চাঁদের ক্রেটারের একটু ধুলো ভ্যানিটি ব্যাগে নিয়ে নিতে ভোলেননি। চাঁদে পৌঁছনোর থেকেও অবশ্য রোমাঞ্চকর এপিসোড ছিল ফেরা, ফেরার সময় প্লেনের মেঝে আচম্বিতে খুলে গিয়ে দলবলসুদ্ধ অমরেশ মহাশূন্যে  পড়ে যান; মহাশূন্য থেকে ভেসে ভেসে কলকাতা ফিরে আসার জটিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে পাঠককে ক্লান্ত করে তুলতে চাননি লেখক, স্বপ্নভ্রম বলে শেষ করে দিয়েছেন। কিন্তু “অমরেশ চন্দ্রাহত হলো” পড়লে বিলক্ষণ টের পাবেন ডাল মে কুছ কালা হ্যায়, স্বপ্ন দিয়ে শেষ করাটা নেহাতই পশ্চিমী চক্রান্ত।

NBC

 

(ছবি – আনন্দ পাবলিশার্স)

৪)  দীননাথ – প্রফেসর নাট বল্টু চক্র বা প্রনাবচর সমস্ত কীর্তিকলাপ ব্যাখ্যা করতে গেলে দ্বিতীয় আরেকটি মহাভারত লিখতে হয়, পাঠক বরং আনন্দ থেকে বার হওয়া সমগ্রটি নিয়ে বসে যেতে পারেন। নিজে না গেলেও বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ডক্টর ব্রহ্মবিদের সহায়তায়  চ্যালা দীননাথকে পাঠিয়েছিলেন শুক্রগ্রহে (‘মনের মেশিন’ – অদ্রীশ বর্ধন) – মিউটেশন জেনেটিক্সের সাহায্যে দীননাথের শরীরে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন প্রফেসর যাতে শুক্রের নতুন জগতে মানিয়ে নিতে না অসুবিধা হয়। প্রফেসর ব্রহ্মবিদ আবার হিপনোটাইজ করে রেখেছিলেন দীননাথকে, নাহলে হয়ত শকের পর শকে বেচারী পাগলই হয়ে যেত। আর এসবের জন্যই পৃথিবীর বাতাসের চাপের থেকে হাজারগুণ বেশী চাপ সহ্য করেও, বুক ভরে কার্বন-ডাই-অক্সাইড টেনে নিয়েও সুস্থ অবস্থাতেই ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসতে পেরেছিল। তবে দীননাথ ঠিক নাকি অজয় আর সমর, সেটা এখনো একটা রহস্য। তাই শুক্রে গেলে প্রিকশন নিয়ে যাবেন, হেলমেট খুলে নিঃশ্বাস নিতে পারবেন কিনা সেটা নিয়ে এখনো সন্দেহ আছে।

আরো পরে প্রফেসরের দৌলতে অতি ক্ষুদ্রাকৃতির দীননাথের সৌভাগ্য হবে প্রায় সারা সৌরজগত ঘুরে আসার (‘অণিমা মানুষ’) – চার সূর্যের গ্রহ, প্রাগৈতিহাসিক গ্রহ, সোনালি পাখি-প্রাণীদের গ্রহ, মেশিনদের গ্রহ……কতই বা আর এ ক্ষুদ্র পরিসরে বলা যায়?

Shonku

(আদত ছবি – সত্যজিৎ রায়, বৈদ্যুতিন  সংস্করণ – লেখক)

৫) ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু –  প্রফেসর নাট বল্টু চক্র নিজে না গেলেও প্রফেসর শঙ্কু গেছেন, এবং হ্যাঁ মঙ্গলগ্রহেই (ব্যোমযাত্রীর ডায়রি)! সঙ্গে বেড়াল নিউটন, চাকর প্রহ্লাদ এবং রোবট বিধুশেখর। ঘনশ্যাম দাস যেরকম মঙ্গলকে প্রথম দর্শনে শুকিয়ে যাওয়া মৃত্যুপুরী ভেবেছিলেন, শঙ্কুর অভিজ্ঞতা কিন্তু সেরকম নয় – এ মঙ্গল বড়ই রঙ্গীন। নদীর রঙ লাল, আকাশের রঙ সবুজ, ঘাস আর গাছপালার রঙ নীল! আর  জালামূর্তির বদলে শঙ্কুরা দেখা পেয়েছেন প্রকান্ড সবুজ চোখওলা মানুষ-জন্তু-মাছের সংমিশ্রণে তৈরি এক অদ্ভুত প্রাণীর, যার সারা শরীরে আঁশ আর মুখে বিকট শব্দ ‘তিন্তিড়ি, তিন্তিড়ি, তিন্তিড়ি’। এই প্রাণীদের জন্যই হয়ত সারা মঙ্গল জুড়ে ভারী আঁশটে গন্ধ।

বেঙ্গালুরুতে ইসরোর  হেডকোয়ার্টারে কবে এসব খবর এসে পৌঁছয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

নষ্টনীড়

মেয়েটি বন্ধুকে বাঁচাতে ছুটে আসছে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি ঘুরে মেয়েটিকে সপাটে  চড় মারল। যন্ত্রণার থেকেও ঘটনার আকস্মিকতা এবং অভাবনীয়তার মেয়েটি বিহ্বল। পাশেই আর একটি মেয়ে, যাকে দেখে এখনো হাই স্কুলের ছাত্রী মনে হতেই পারে, তার ঘাড় ধরে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে আরো একটি নরপশু। তৃতীয় আরেকটি মেয়েকে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে রাতের অন্ধকারে পুলিশ ভ্যানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে আরো তিন-চার জন। ইউটিউবের ভিডিওতে একের পর এক ফুটেজে স্তম্ভিত হয়ে দেখছি কি অসম্ভব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উর্দিবিহীন পুলিশ এবং ঠ্যাঙ্গাড়ে গুন্ডারা যাদবপুরের ছাত্রীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে, ছাত্রদের কথা বাদই দিলাম – একের পর এক ছাত্রকে মাটিতে ফেলে কিল, চড়, ঘুঁষির বন্যা  বইয়ে দেওয়া হচ্ছে, এবং এক এক জনকে মারতে একাধিক বীরপুঙ্গব হাজির।

যাদবপুরের ঘটনা সবাই দেখেছেন, এমনকি প্রবাসী বাঙ্গালীরাও ব্যতিক্রম নন। সিংহভাগ যা দাবী করছেন, আমিও তার সঙ্গে একমত – অস্থায়ী উপাচার্যর যত শীঘ্র সম্ভব পদত্যাগ দরকার। কি করতে পারতেন, কি করেছেন, কেন করেছেন সে সবের মধ্যে না ঢুকেই বলা যায় যিনি পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে ছাত্রছাত্রীদের দাবীকে নস্যাৎ করতে চাইছেন, তাঁর আর যাই হোক উপাচার্যের মতন প্রশাসনিক পদে থাকা চলে না; ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে সহকর্মী সবাই যখন তাঁর সঙ্গ  পরিত্যাগ করছেন, এই প্রশাসনিক কাজ করবেনটাই বা কাকে নিয়ে? কত তাড়াতাড়ি তিনি বোঝেন সেটাই কথা।

যাদবপুরের ঘটনায় আবার ফিরব কিন্তু তার আগে কিছু টুকরো চিত্র আপনাদের দেখাতে চাই।

দৃশ্য এক –  ১৯৯৮ এর ডিসেম্বরের এক সকালবেলা। হাজরার কাছে এক বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটিয়ে ফিরছি, আশুতোষ কলেজের সামনে দেখি খন্ডযুদ্ধ চলছে – যোগমায়ার ডি-এস-ও এবং আশুতোষের এস-এফ-আই ক্যাডারদের মধ্যে। ডি-এস-ও র অনেক মেয়েদেরই দেখছি পোশাক অবিন্যস্ত, মেয়ে বলে তাঁরা এতটুকু রেয়াত পাচ্ছেন না – চোখের সামনে দেখলাম একজনের বেণী ধরে মাটিতে ফেলে মারা হল। উল্টোদিকে এস-এফ-আই য়ের একটি ছেলে্র হাতেও কামড়ে্ দিতে দেখলাম ডি-এস-ও র একটি মেয়েকে।

দৃশ্য দুই –  মধ্য কলকাতার সেন্ট পলস কলেজে গেছি এক বন্ধুর জন্য অ্যাডমিশন ফর্ম তুলতে। হাতে একটু সময় ছিল, কলেজটা একটু ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে সিঁড়ি বেয়ে উঠছি – মাঝপথে আটকে দেওয়া হল। দুটি ষণ্ডামার্কা লোক শুধোলেন আমরা ছাত্র পরিষদ করি কিনা। ছাত্র পরিষদ তো করি না-ই, উপরন্তু কলেজেরও কেউ নই শুনে অকথ্য গালিগালাজ করা হল। বহিরাগত হিসাবে ভুল করেছি ভেবে মুখ চুন করে ফিরে আসছি, কলেজেরই দু-তিনটি ছেলে এসে বলে গেল “মন খারাপ করো না ভাই, ওরা টেনশনে আছে”। আমরা অবাক, কিসের টেনশন? শোনা গেল অ্যাকশনে যাওয়ার জন্য  সমস্ত মালমশলা এখনো মজুত হয়নি।

দৃশ্য তিন – দক্ষিণ কলকাতার একটি বিশিষ্ট কলেজের ক্লাসরুমে বসে, সময় ২০০০ সাল। দুপুর দুটো নাগাদ শুরু হল তুমুল স্লোগান – ” এই কলেজে তৃণমূল করলে ধোলাই হবে, পেটাই হবে”। সারা কলেজ তোলপাড় করে তিন তলা বিল্ডিং ঘুরে ফিরে ক্ষমতাসীন ছাত্র দলের ক্যাডাররা মহোল্লাসে স্লোগান দিতে দিতে ফিরছে, নেতৃত্বে তখনকার ছাত্র সংসদের সেক্রেটারি, এখন নামকরা যুবনেতা যার নাম প্রায়শই কাগজে দেখে থাকবেন। অধ্যাপকরা গম্ভীর মুখে মাথা নাড়তে লাগলেন অথবা এমন ভাব দেখাতে লাগলেন যে এরকম কিছু হচ্ছেই না, কেউ সাহস করে গিয়ে বলে উঠতে পারলেন না “ক্লাস চলছে, রাস্তায় যাও”। পরের দিন আবার কলেজে এসে শুনলাম তৃণমূল করতে পারে এরকম একটা সন্দেহের বশে কোন একটি ছেলেকে ধরে কলেজের পাশেই ভ্যাটে ফেলে দেওয়া হয়েছে (এই সেদিনকে ইউক্রেনের এক সাংসদের একই হাল হতে দেখে আরো বেশী করে ঘটনাটা মনে পড়ল)।

এস-এফ-আই, ছাত্র পরিষদ, ডি-এস-ও কাকে ছেড়ে কাকে ধরবেন? ওপরের ঘটনাগুলো কিন্তু আমার স্যাম্পল পয়েন্ট নয়, এরকম অজস্র স্মৃতি আপনাদেরও আছে, সেগুলো জাগিয়ে তোলার জন্যই বলা। এমনকি নতুন দল তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কীর্তিকলাপের কথা লিখতে গেলেও মহাভারত হয়ে যাবে।

এই যে উপাচার্য পুলিশ লেলিয়ে দিচ্ছেন, অধ্যাপকরা আপাত-ঔদাসীন্য এবং গভীর ভয়ে রা কাড়ছেন না , ছাত্রছাত্রীরা সম্মান তো দেখাচ্ছেনই না বরং টুকতে না দিলে, কোটায় ভর্তি না করালে খুনজখম অবধি করে ফেলছেন, এর শুরুই বা কোথায় আর শেষই বা কোথায়? এখন তো দেখি শুধু কলেজে নয়, স্কুলেও ঘেরাও চলছে আর সবথেকে ভয়ের কথা কি জানেন? সেসব ঘেরাওয়ে দস্তুরমতন সঙ্গ দিচ্ছেন অভিভাবকরা। উপাচার্য নাহয় ধরাছোঁয়ার বাইরে – ইন্সটিটউশনের প্রতীক, ছাত্রছাত্রীদের নাহয় ডিফেন্ড করলেন স্বভাবচাঞ্চল্য বলে, অধ্যাপকরা নাহয় এ কূল রাখি না ও কূল ডিলেমায় আক্রান্ত, কিন্তু এদের সবাইকে ছেড়ে যাদের ওপর ভরসা করবেন ভেবেছিলেন সেই অভিভাবকরাও তো হতাশ করছেন।  হ্যাঁ, জেনেরালাইজড করা হয়ত হচ্ছে কিছুটা কিন্তু যে মুহূর্তে আপনি দেখছেন কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে ভায়োলেন্সের পরিসংখ্যানের বিচারে পশ্চিমবঙ্গ দেশের শীর্ষস্থানে (এবং বেশ কিছু বছর ধরে),  তখন আপনার মনে হতে বাধ্য যে পুরো সিস্টেমটাই ঘুণ ধরা।

অথচ অ্যাকাডেমিক কারিকুলামের বাইরে গিয়ে কিছু করা, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তাভাবনাকে কলেজ চৌহদ্দীর বাইরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা যেভাবে শুরু হয়েছিল তাতে কিন্তু আমাদের গর্ব বোধ করাই উচিত – সেই দশ কি কুড়ির দশকে বন্যাত্রাণের জন্য প্রেসিডেন্সি এবং আরো কিছু কলেজের অধ্যাপকরাই সাহায্য চেয়েছিলেন ছাত্রদের থেকে। ছাত্ররা শুধু বন্যাকবলিত এলাকায় গিয়ে কাজই করেনি, শহরেও মজুত করেছে চালের বস্তা (পুলিশ এবং চোরাকারবারীদের চোখ এড়িয়েই), তুলে দিতে চেয়েছে অভাবী, অনাহারী মুখে অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য। সেই চেতনাও কি রাজনৈতিক চেতনা ছিল না? অবশ্যই ছিল। খাদ্য আন্দোলন, ট্রামের ভাড়া বৃদ্ধির আন্দোলনেই শুধু রাজনৈতিক চেতনা জেগেছে তা তো নয়। কশ্চিত, কদাচিৎ অবশ্য এ ধরণের আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়েই সন্দেহ জেগেছে –  এই যাদবপুরেই লাইব্রেরীর ফাইন এক পয়সা বেড়েছিল বলে ছাত্রসমাজ তুমুল আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু তার পরেও ষাট কি সত্তরের শুরু অবধি হয়ত একটা মূল্যবোধের রাজনীতি হত। পরিবর্তন এল নকশাল আন্দোলনের সময় থেকে – নকশালদের কড়া হাতে দমন করার জন্য কংগ্রেস, সি-পি-এম দু দলই পুষতে শুরু করে গুন্ডা, ওই ক্যাডার শব্দটিরও বোধহয় তখনই আগমন। আতঙ্কে স্থবির হয়ে থাকা মহানগরী এবং শহরতলিগুলি তে কখন যে ছাত্রর বেশে গুন্ডারাও ঢুকতে শুরু করেছে তা শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক কেউই বোধহয় বুঝতে পারেননি। দৈনন্দিন খুনজখম তখন এতটাই গা সওয়া হয়ে গেছে যে তলে তলে একটা প্যারাডিম শিফট ঘটতে চলেছে তার আঁচ বোধহয় খুব কম লোকই পেয়েছেন।

কিন্তু সেখানেই তো শেষ নয়, সত্তরের দশকে ঘটেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-ও। পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থীর ঢল এসেছে স্বাধীনতার পর থেকেই কিন্তু সত্তরের দশকে যে হারে অনুপ্রবেশ ঘটেছে তা অভাবনীয়। আর ক্ষমতাসীন হওয়ার তাগিদে ডান বাম বহু নেতাই এই আক্ষরিক অর্থে সর্বহারা যুবকদের ক্যাডার বানিয়েছেন। ঢাকুরিয়ার রেললাইন থেকে শুরু করে দমদমের কলোনী – মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে কোনোমতে , বহুজনের হাতে এসেছে দুর্মূল্য র‍্যাশন কার্ড-ও। এরা বুঝতে শুরু করেছে রাজনৈতিক ছত্রছায়াই তাদের একমাত্র সম্বল, একমাত্র ভরসা –  আর রাজনীতির আখড়া হওয়ার সবথেকে ভালো জায়গা? বলা বাহুল্য যে কলেজ। আজকেও খোদ কলকাতার বুকে কলেজে গুলোতে গিয়ে একটু খোঁজ নিন, কত ছাত্র যে বছরের পর বছর ধরে রয়ে গেছেন তার ইয়ত্তা নেই। এরকম নয় যে তাঁরা বেরোতে পারছেন না, বেরোতে পারার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বেরোতে চাইছেন না। গ্র্যাজুয়েট হয়ে বেকার বসে থাকার অনিশ্চয়তা তো আছেই, উপরন্তু লীডারশিপ খোয়া যাওয়ার ভয়। আর সেটুকু খোয়ানো মানে পা্টির চোখে নিতান্তই ইনকম্পিটেন্ট বনে যাওয়া।

দোষের ভাগ কি শুধু এদের ঘাড়েই বর্তাবে? বুঝতেই পারছেন উত্তর নেতিবাচক। উপাচার্য থেকে শুরু করে অস্থায়ী অধ্যাপক, প্রাথমিক স্কুলের প্রধানশিক্ষক থেকে শুরু করে রেজিস্টার সামলানোর করণিক – শেষ তিরিশ চল্লিশ বছরে কোন নিয়োগটা আমরা অরাজনৈতিক ভাবে হতে দেখেছি? সমস্যা সেখানেই – একই দলের ছাত্র সংগঠন যখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন সেই দলেরই শিক্ষক সংগঠনের নেতারা কড়া হাতে আর রাশ টানেন কি ভাবে? এই যে আপনার জীবদ্দশায় প্রত্যেকদিন একটা না একটা কলেজে গন্ডগোলের খবর পড়ে পড়ে চোখ পচিয়ে ফেলেছেন, একবারের জন্যও কি দেখেছেন কলেজের অধ্যক্ষ এবং প্রতিজন অধ্যাপক একত্রে দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করেছেন? না, দেখতে পান নি, মনে হয়না বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনোদিন দেখতে পাবেন-ও।

যাদবপুরের ঘটনা তাই ব্যতিক্রম নয়, এখানেও কিন্তু দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে এসে বলতে দেখেননি “ছিঃ, কি ন্যক্কারজনক ঘটনা”। বলছেন, অনেকেই বলছেন, তার কারণ খোদ শহর কলকাতায় পুলিশি অত্যাচারের এত বড় উদাহরণ চট করে পাওয়া যায় না, কিন্তু তারপরেও পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসটা রয়েই গেছে – তাই দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এখনো এগিয়ে আসতে দেখলেন না । কিছু করার নেই, এ দোষ এখন আমাদের রক্তে। পুলিশি অত্যাচার আছে, সেই সঙ্গে এটাও মানতে হবে যে যাদবপুর শহুরে পাঁচ তারা বিশ্ববিদ্যালয় – ট্র্যাডিশনাল মিডিয়া হোক কি সোশ্যাল, এ ব্যাপারে কথা বলার লোকের কমতি পড়বে না। কিন্তু যাদবপুর না হয়ে যখন খবরে থাকে চাঁচল, বেতাই, কালিয়াচক? সেখানে অবশ্য পুলিশের সামনেই মুহুর্মুহু বোমা পড়তে থাকে, পাইপগানের গুলিতেই হোক কি বোমার স্প্লিন্টারে, এক দুটো মৃত্যুও কোনো ব্যাপার নয়।

কলেজ কি ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র রাজনীতি চলা উচিত কিনা সে নিয়ে বিতর্ক চলবে; ক্ষমতাসীন সরকার প্রথম দিন থেকেই এর বিরোধিতা করে এসেছেন, আজও করছেন – হয়ত কনসিস্টেন্সির বিচারে কিছু ব্রাউনি পয়েন্ট এনাদের প্রাপ্য কিন্তু তাঁরা তো এটাও জানেন যে এক হাতে তালি বাজে না। উপাচার্যর এই অমানবিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ যতদিন দলমত নির্বিশেষে সব অধ্যাপকের মুখ থেকে না বেরোচ্ছে, ততদিন জানবেন ওই বিতর্কের কোনো মূল্য নেই।  মুখ্যমন্ত্রী ছোটো ঘটনা বলে এড়িয়ে যেতে পারেন, কিন্তু রাজনৈতিক মোহ কাটিয়ে উঠে যতদিন না তাঁর দলের ঘনিষ্ঠ অধ্যাপকরা এর জবাব দিচ্ছেন, ততদিন আদত প্রাপ্তি শূন্যই। আজ আহত ছাত্রছাত্রীদের দেখতে বামপন্থী নেতারা হাসপাতালে ছুটছেন, তাঁদেরও তো কতজনই শিক্ষক, যতক্ষণ না তাঁরাও ঘুম থেকে উঠে বলছেন “ভুল আমরাও করেছি, এবার সবাই মিলে রুখে দাঁড়াই” ততদিন কোনো আশা রাখবেন না।

আমিও কোনো আশা রাখছি না, খালি এইটুকু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে এ নৈরাজ্য থামাতে অধ্যাপকদের করণীয় অনেক কিছুই ; টিভির চ্যানেলে ‘ছাত্ররা আমার সন্তানতুল্য’ শুধু এইটুকু বলে ছেড়ে দিলে যাদবপুর আবার ফিরে আসবে – ২০০৫, ১০, ১৪ র পরেও।

নায়কের সঙ্গে কিছুক্ষণ

সুয়েড চামড়ার সোফার পুরোটাই হাল্কা হলুদ রঙের সিল্ক দিয়ে মোড়া,  সোফার ব্যাকরেস্টটা প্রায় ফুট তিনেক  উঁচু ; ঠিক উল্টোদিকে এগ-হোয়াইট রঙের একটি ডে-বেড, যার পেছনে দেওয়ালজোড়া কাঁচ। ডে-বেডের সামনে জাহাঙ্গীরি স্বর্ণমুদ্রার ধাঁচে বানানো তিনটি ছোট টিপয়, সেগুলোর পায়া এতই ছোট যে এরিয়াল ভিউ নিলে মনে হবে ঘরের মাঝে তিনটে দৈত্যাকৃতি মোহর ভেসে আছে। তার একটাতে কারুকাজ করা একটি ছাইদান, যেটির ঢাকনাটি আপাতত খোলা নেই – দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে ওপরে কিছু রাজস্থানী কারুকাজ। আর একটির ওপর খান তিনেক বই রাখা, ঘাড় বেঁকিয়ে বেশ চেষ্টাচরিত্র করে দেখতে পেলাম রশ্মি বনসলের ‘স্টে হাংগ্রি, স্টে ফুলিশ’, দুর্জয় দত্তের ‘ইউ ওয়্যার মাই ক্রাশ’……তিন নম্বর পেপারব্যাকটার স্পাইনের লেখাটা বোঝা যাচ্ছে না, মনে হচ্ছে কিছু গাছের পাতা মেন মলাট ছাপিয়ে ওখানে এসে ঢুকেছে। উঠে দেখব কিনা ভাবতে ভাবতেই ঘরের ডানদিকে চোখ পড়ল – সেখানে একটা আয়নার ওপর দু থাক ফ্রেম বসানো, তার একটায় আবার গোলাপী, নীল আর হলুদের কারুকাজ। আয়নার নিচেই সাদা আর গোলাপী রঙের একটা ইনলে চেস্ট, সিন্দুকটির ওপরে আবার একটা পোর্সিলিনের ঘোড়া বসানো। কিন্তু আমার চোখ টানল সিন্দুকের ঠিক পাশেই রাখা তিনটি ট্রাঙ্ক, বোঝাই যাচ্ছে সেট –  নিচ থেকে ওপরে আকার অনুযায়ী সাজানো, কালো এবং সোনালী রঙ দিব্যি মিলমিশ খেয়ে আছে সেখানে।

“হায়দ্রাবাদ থেকে এসে পৌঁছেছে,  তিন দিন আগে।” এ গলা ভোলার নয়, আমি তড়িঘড়ির উঠে দাঁড়ালাম। দেখলাম ঘরের মাঝে ঝুলে রয়েছে সেই শিশু ভোলানাথের হাসি যা নিয়ে ইন্ডাস্ট্রির প্রায় পাগলপারা দশা। রাজকীয় সাদা শার্টের মধ্য দিয়ে নির্লোম বুক দেখা যাচ্ছে, সুঠাম নিম্নাঙ্গে একটি কালো ডেনিম, আর তার নিচেই চকচক করছে বিলিতি জুতো, স্টাইল দেখে মনে হচ্ছে জন লব।  “আরে ইয়ার, বসে পড়ো…বসো, বসো” বলতে বলতে নায়ক ডে-বেডে গিয়ে আধশোয়া হয়েছেন। আমি সিংহাসনাকৃতি সোফায় একটু জড়োসড়ো হয়েই বসলাম। একটা অস্বাভাবিক চৌকো সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “চলে তো?”, আমি মাথা নেড়ে একটা তুলে নিলাম। “কতক্ষণ ঠিক হয়েছিল? আধ ঘন্টা না?”……আমি ঠোঁটটা চেপে ধরে একেবারে কোণ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মাথা নাড়লাম, “যাদবপুরের স্টুডেন্টদের ব্যাপারটা দেখেছেন আজ?”………নায়ক নিজে দেখলাম সিগারেট নেন নি, হাতে সকালের টাইমস অফ ইন্ডিয়াটি নিয়ে এ পাতা সে পাতা করছেন, আজকে ওরা আবার একটা পাতাজোড়া ডিবেট রেখেছে দীপিকা পাড়ুকোনের বক্ষসন্ধি প্রদর্শন নিয়ে । মাথা না তুলেই বললেন, “স্টুডেন্টদের জন্য জান কবুল, আর যাদবপুর খুব ফ্রেন্ডলি জায়গা ভাই। ‘ব্যোম শঙ্কর’  সিনেমাটায় ওদের আর্টস ফ্যাকাল্টির ইউনিয়ন রুমটাই তো আমরা ভাড়া নিয়েছিলাম, কতো যে তাদের আবদার কি বলব”।  আমি একটু অবাক হলাম,  মার্চে আনন্দ পটবর্ধন এসেছিলেন জানি, অগস্টে সঞ্জয় কাক, গত বছর আবার তিন ফ্যাতাড়ু মায় দন্ডবায়স অবধি সভা করেছেন কিন্তু ব্যোম শঙ্করের খবরটা পাইনি তো। যাকগে, আসল প্রশ্নে যাই, “কিন্তু স্টুডেন্টরা যে ক্লেম করছে আপনাদের পার্টির ক্যাডাররা পুলিশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের বেধড়ক পিটিয়েছে?” শিশু ভোলানাথ চমকে উঠলেন, “আররররে………এটা কবেকার খবর?”……”এই তো কাল ভোররাতে ঘটেছে”……”সরি, নো কমেন্টস – ডিটেলস না নিয়ে কিছু বলতে পারছি না”।

“কিন্তু আপনার ভক্তরা একটা জিনিস ডেফিনিটলি জানতে চায় – এই যে আপনার পার্টির কিছু কিছু নেতা বলছেন পেড়ে ফেলব, মেরে ফেলব, পার্টির ক্যাডা্র পৈতৃক সম্পত্তির পুরোটা না পেলে মাকে সুদ্ধ ঝেড়ে ফেলব      ………..এই ভায়োলেন্ট কথাবার্তা কে কি আপনি সাপোর্ট করেন?”

“হে হে হে………তুমি তো ভাই অর্ণবের মতন সওয়াল করছ। ভক্তরা জানতে চায়, দেশ জানতে চায় – কারা এরা? আমার সঙ্গে তো দেখা হলে একটাই কোয়েশ্চন আওড়ায় “গুরু, রূপশ্রীকে কবে আনছ?”

আগের প্রশ্নটাকে চু কিত কিত করে পেরিয়ে যাচ্ছেন দেখেও আমার বিশেষ তাপউত্তাপ হল না, মেঘ না চাইতেই জল পেয়ে গেছি।  এডিটর বার বার ভয় দেখিয়েছেন রূপশ্রীকে নিয়ে অন্তত খান তিন চারেক প্রশ্নের উত্তর না নিয়ে ফিরলে জোড়া গির্জার কাছের কোন একটা রাস্তায়  ইন্টারভিউ নিতে পাঠাবেন – কোন এক দলের নেতারা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের মতামত জানানোর জন্য তৈরী হয়ে বসে আছেন, এদিকে সাংবাদিকদের দেখা নেই।

“রূপশ্রীকে তাহলে কবে নিয়ে যাচ্ছেন?”

নায়কে ভুরূটা একটু কেঁপে উঠল কি? “জানেন তো সব কিছুই, আবার কেন বেকার প্রশ্ন এসব?” হঠাৎ তুমি থেকে আপনিতে শিফট করতে করতেই তুলে নিয়েছেন সেই তৃতীয় বইটি যার নামটা দেখতে পাচ্ছিলাম না। “আমরা এখন শুধুই ভালো বন্ধু, এই দেখুন না বইটা গিফট করেছে………কি সুন্দর বই।” দেখলাম ‘চাঁদের পাহাড়’। শুধোলাম, “এত ব্যস্ততার মধ্যে বই পড়ার সময় পান?”………”নাহ, আমি না বুঝলেন খুব একটা পড়ুয়া না, আর বাংলা খুব একটা ভালো জানি না। এই বইটা তো আবার স্টুডিও থেকে দিয়েছে”………বলে দুর্জয় দত্তের বইটা দেখালেন। ও বাবা, স্কুপ নিউজ! “তাহলে আপনার নেক্সট প্রোজেক্ট দুর্জয় দত্তের বইয়ের ওপর বেস করে?”

“না না,  খেপলেন নাকি আপনি? আগে সাউথ থেকে মুভি হয়ে আসুক………”

“সে কি, এ তো দিল্লীর বই……”

“তাতে হলটা কি। দিল্লী, মুম্বই কেউ এখন স্ক্রিপ্ট নিজে লেখে না, সাউথ আগে পথ দেখাবে……তবে না।” বলে সেই মনভোলানো হাসিটা হাসলেন।

চাঁদের পাহাড়ের কভারটা মনে হয় খুব পছন্দ হয়েছে, আনমনেও দেখলাম বার বার হাত বোলাচ্ছেন।

“ওটা সত্যজিৎ রায়ের করা, সেটা জানেন তো?”

“মানিকদা করেছিলেন? বাব্বাহ………কি গ্র্যান্ড জিনিস না!”

আমি একটু দোনামনা করে বলেই ফেললাম, “আপনার সঙ্গে ওনার  আলাপ ছিল নাকি?”

এবার একটু লজ্জিত, “আরে না না, আমি তখন কোথায়! তবে হয়েছেটা কি, স্টুডিও পাড়ায় কিন্তু সবাই মানিকদা বলেই ডাকে, এখনো……”

ভাবলাম জিজ্ঞাসা করি “এখনো না এখনই?”, কিন্তু সেদিকে না গিয়ে বললাম, “একটা হাইপথেটিকাল প্রশ্ন করি, আপনার কি মনে হয় সত্যজিৎ যে ধরণের সিনেমা করে গেছেন তাতে আপনার মতন মেনস্ট্রীম নায়কের জায়গা হত?”

“আমার তো মনে হয় হত – একটু চাপ পড়ত হয়ত কিন্তু আয়াম আ গুড স্টুডেন্ট,  মানিকদা একটু দেখিয়ে দিলেই হয়ে যেত। আফটার অল, পুলুদাও তাই করেছেন।”

“তাহলে ঋতুপর্ণের সঙ্গে কোনো কাজ করলেন না কেন?”

“আররে, ঋতুদা ওয়জ মায় ফ্রেন্ড, ফিলোজফার অ্যান্ড গাইড। আমার সঙ্গে তো দেখা হলেই বলতেন – তুই হিন্দিটা এত ভাল বলিস যে তোর ডেট পাওয়াই মুশকিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আমার জন্য একটু সময় কর।”

“হিন্দি……?”

“আরে ইয়ার, লেগ পুল আর কি। তবে এখনকার জেনারেশন হিন্দি, ইংলিশ, বাংলা মিলিয়েই কথা বলে – তো হল কি, আগের দিনের মতন হিন্দি বললে আর চলবে না, এটা কিন্তু ফ্যাক্ট।”

“গানও কি তাই জন্য বদলাচ্ছে? এই ধরুন রিসেন্টলি একটা গান শুনতে পেলাম – জিগর খুলে করতে পারি ড্যান্স………”

নায়ক এবার একটু দার্শনিক হয়ে পড়লেন, “দেখুন……আমার মতে হ্যাপিনেস হল একটা স্টেট অফ মাইন্ড। তো, লোকে যদি ওরকম লিরিক্স শুনে হ্যাপি থাকে, ক্ষতি কি? ফ্রী মার্কেটের জমানা এমনিতেও……”।

“পলিটিকসেও কি এলেন এই স্টেট অফ মাইন্ডের কথা ভেবেই?”

“না না, এত ভালোবাসা পাই; মনে হল এবার ফিরিয়ে দেওয়া দরকার, কিছু করতে হবে। এই দেখুন না শিলিগুড়িতে সেলিব্রিটি ক্রিকেট লীগের ম্যাচ হচ্ছিল, আমি আউট হয়ে ফিরছি দেখি দুজন টিনএজার মেয়ে গ্যালারির জালি ধরে একদম আছড়েপিছড়ে কাঁদছে……ইউ নো, হোয়েন দেয়ার ইজ সো মাচ ইমোশন ইনভলভড, ইউ ডোন্ট হ্যাভ আ চয়েস।”

রূপশ্রীর কোটা এখনো বাকি, প্রশ্ন করলাম, “ইন্ডাস্ট্রির ভেতরেও তো আপনার ফ্যান ফলোয়িং কম নয়। রূপশ্রী কি তাতেই ভুল বুঝলেন?”

“আরে আবার রূপশ্রী কেন, দিব্যি তো গানটান নিয়ে কথা হচ্ছিল। দাঁড়াও, তোমাকে একটা জোর খবর দি……”

দেখলাম রূপশ্রীর কথা উঠলেই কিরকম খেই হারিয়ে আপনি আর তুমির মাঝে টানাটানি চলছে।

“আমার নেক্সট ছবিতে লিরিক্স দিচ্ছেন ডিংডং গাঙ্গোলি, ইউ নো ডিংডং……না? তো হল কি, এর ডিরেক্টর রানাঘাটের ছেলে, বলে দিয়েছে ওসব জানু-খিলাড়ী-মওলা কিস্যু চলবে না, পিওর বাংলা রাখতে হবে। তো দু মাস কাজ করে ডিংডং কি গান নামিয়েছে গুরু, তুমি ভাবতে পারবে না। আমার তো মাঝে মাঝেই এত আপসেটিং লাগে এত সুন্দর ভাষাটা জানলাম না ঠিক করে……”

“দু’একটা গান বলা যাবে?”

“আরে, বলব বলেই তো মুখ খুললাম। তো হয়েছে কি এটাতে একটা লাভ ট্র্যাঙ্গল আছে – সিনটায় আছি আমি, দোয়েল আর রোহন…”

“তাই নাকি, রোহন এখনো আছেন বাজারে?”

“ভাই, গ্রামের দিকে একবার মাচা শো দিতে গিয়ে দেখ না…… ওর পেপসিকোলা গান না থাকলে লোকে ইঁট ছোঁড়ে  রে ভাই, ইঁট। তো, আমরা ডাল লেকে স্পীডবোট চালাব আর গান হবে – ” ছিপখান তিন-দাঁড় তিনজন মাল্লা… চৌপর দিন-ভর দেয় দূর-পাল্লা!” গানটার রিদমটার ভাবো একবার,  মিউজিক ডিরেকটর দুঃখ করে বললেন বাঙ্গালীর মেলোডি নিয়ে এত বাজে ক্রেজ না থাকলে বাংলার বেস্ট র‍্যাপ হতে পারত। তারপর ধরো,  আমার সঙ্গে দোয়েলের একটা দুষ্টু সিন আছে,  সেখানে দোয়েল গাইছে ” আড়ি আড়ি আড়ি, কাল যাব বাড়ি, পরশু যাব ঘর।” এর মধ্যে আবার ডিরেক্টরের স্পেশ্যাল রিকুয়েস্ট ছিল, “খোকাবাবু যায়” টাইপের কিছু রাখতে…ডিংডং সেটাও নামিয়ে দিয়েছে পাতি বাংলায়, ক্যালি আছে বস। বেঁটে ভিলেনের খানদান নিয়ে টন্ট করার জন্য একটা কোরাস আসছে, ” আঁটুল বাঁটুল শ্যামলা শাঁটুল, শামলা গেল হাটে/ শামলাদের মেয়েগুলো পথে বসে কাঁদে”। বহোত খেটেছে কিন্তু, বহোত…”

“হিট করবে বলছেন? বাজারে খবর আপনার নেক্সট সিনেমা আর সৃজিত মুখার্জীর পরের সিনেমা একই দিনে রিলিজ করছে, সৃজিতের ছবির গানের সঙ্গে এসব কম্পিট করতে পারবে?”

নায়ক একটু অফেন্স নিতে গিয়েও নিলেন না। কোত্থেকে একটা নেল-ফাইল বার করে ঘষতে শুরু করলেন মধ্যমাটি, “দেখো সৃজিত ডেডলি ছবি বানায় তবে ওর অডিয়েন্স আলাদা, যাকে বলে ইন্টেলেকচুয়ালস। আমাদের অনেক ডাউন টু আর্থ ফিল্ম, কোনো ঝাম নেই।”

“তাহলে সৃজিত ডাকলে ওনার সঙ্গে কাজ করবেন না বলছেন?”

“আররে, সে কথা কোথায় বললাম” (হাত নেড়ে টেপ বন্ধ করতে বলছেন)……

“কেন মিছিমিছি কথা ডিসটর্ট করছ ভাইটি? আজকে যেখানেই থাকি না কেন, অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। তোমাদের এরকম একটা কথায় বেকার ইন্ডাস্ট্রিতে বাওয়াল হয়ে যেতে পারে।”

স্ট্রাগলের কথা উঠতেই বোধহয় একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন, যতই হোক বাঙ্গালী রক্ত বইছে ধমনীতে। গলার সরু সোনার চেনটা উলটে গেছিল, সেটা ঠিক করতে করতে বললেন, “এই যে আয়নাটা দেখছ, এটা স্পেন থেকে আনানো।  তোমরা রূপশ্রী করে মরো, কিন্তু আমি জানি আমার একমাত্র বন্ধু এই স্প্যানিশ আয়না। যেদিন দেখব আয়না মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, আমিও ছুটি নেব”।

“গিরীশ ঘোষ-ও বলেছিলেন “দেহপট সনে নট সকলি হারায়”, তাই না?”

“গিরীশ ঘোষকে চিনি না ভাই, মানেটাও ঠিক বুঝলাম না। তবে বাঙ্গালী যখন নিশ্চয় কাজের কথাই কিছু বলেছেন।”

হঠাৎ হাত দুটো ধরে বলে উঠলেন, “এই একটা কথা লিখো তো ভাই, বাংলা আর বাঙ্গালীকে আমি জান দিয়ে ভালোবাসি, বহুত ভালোবাসা আছে এদের জন্য এ বুকে। বাঙ্গালী যদি নাও বোঝে তো কিছু এসে যায় না তাতে, ভালোবাসা থাকবে। ”

আমার প্রায় চোখ ছলছল করে উঠছিল, তাতেই বোধহয় হুঁশ ফিরল। তাড়াতাড়ি সানগ্লাস পড়তে পড়তে বললেন, “এখন বেরোতে হবে, ওঠা যাক তা’লে? আর হ্যাঁ, যা বললাম সেসব নিয়ে বেশী ভাববেন না। ফিল্মের লোক আমরা, কখন কি বলি ঠিক নেই।”

বলে চোখ টিপে চলে গেলেন ভেতরের ঘরে। আর পোর্সিলিনের ঘোড়া,  স্প্যানিশ আয়না, হায়দ্রাবাদী ট্রাঙ্ক, রাজস্থানী অ্যাশট্রের সাজানো জঙ্গলে বসে ভাবতে লাগলাম কোনটাকে সত্যি সাজাবো আর কোনটাকে মিথ্যে।

মিষ্টান্ন মিতরে জনা

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আজ রসগোল্লার জন্মরহস্য নিয়ে একটি প্রবন্ধ বার করেছে,  অপ্রিয় সত্যটি মধুলিকা দাশ ভারতভূমে ফাঁস করে দিয়েছেন – রসগোল্লার জন্ম বঙ্গভূমিতে নয়, পাশের উৎকল রাজ্যে।  নবীন দাস, কে-সি-দাস এবং তাঁদের তাবৎ ভক্তবৃন্দ যাই মনে করুন না কেন এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু মন খারাপ করবেন না, রসগোল্লাকে হারালেও বাংলার মিষ্টির ইতিহাসের ভাঁড়ার অগাধ – আজকে সেই নিয়েই বরং দু’চার কথা বলি। সেখানে খাস কলকাতা হোক কি জেলা শহর বর্ধমান কি অনামী মুড়াগাছা , কন্ট্রিবিউশনে কেউ পিছিয়ে নেই। লেডি ক্যানিং কে সম্মান জানাতে গিয়ে যে খোদ ভীম নাগ লেডিকেনি (যার আরেক নাম পান্তুয়া) বানিয়েছিলেন সে কথা আজ সর্বজনবিদিত। কিন্তু অনেকেই হয়ত জানেন না যে দরবেশ মিষ্টিটিরও জন্মস্থান কলকাতা – দরবেশদের আলখাল্লা যেহেতু নানা রঙের কাপড়ের টুকরো সেলাই করে তৈরি হত তাই দু-তিন রঙের বোঁদের তৈরি নরম নাড়ুকে আমরা দরবেশ বলে ডাকতে শুরু করলাম। বর্ধমানের সীতাভোগ বা মিহিদানার কথাও সবাই জানেন – সুকুমার সেন অবশ্য বলে গেছেন বানানটি হওয়া উচিত সিতাভোগ, সিতা অর্থে সাদা। আবার সিতা-র মানে মিছরিও হয়, তাই সাদা রঙের মিছরির মতন যে মিষ্টি বর্ধমান রাজবাড়ির হালুইকররা বানালেন তার নাম হয়ে গেল সিতাভোগ। মুড়াগাছা আবার বিখ্যাত ছিল ছানার জিলিপির জন্য, কোনো অজ্ঞাত কারণে মুড়াগাছার ছানার জিলিপি কৃষ্ণনগরের সরভাজা, সরপুরিয়া বা নাটোরের কাঁচাগোল্লা কি জনাইয়ের মনোহরা কি শক্তিগড়ের ল্যাংচার মতন বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারেনি – যদিও ছানার জিলিপি এই ২০১৪ তেও বাঙ্গালীর অন্যতম প্রিয় মিষ্টি।

মিষ্টির নামকরণের ব্যাপারটি রীতিমতন কৌতূহলোদ্দীপক। ধরুন – লুচিতে ক্ষীরের পুর দিয়ে সেটাকে পানের মতন মুড়ে তারপর লবঙ্গ বিঁধিয়ে যদি দেওয়া হয় আপনাকে, কি নামে ডাকবেন? লবঙ্গলতিকা বলাই স্বাভাবিক কিন্তু শুরুর দিকে এর নাম ছিল এমপ্রেস গজা। রাজাগজাদের সন্তুষ্টির জন্য অবশ্য বানানো হয়েছে আরো মিষ্টি – বাঙ্গালীর আপন রাজভোগই বলুন কি উত্তর ভারতীয় দিল্লী দরবার সবই পড়বে এ লিস্টে।  অবশ্য অনেক সময়েই মিষ্টির ইউটিলিটি বা স্রেফ আকার-আকৃতি দিয়েও আমরা নাম রেখে গেছি। গৃহদেবতার মিষ্টির থালা সাজাতে গিয়ে দেখলেন থালা একটু ফাঁকা রয়ে গেছে, তো সেই শূন্যস্থান পূরণে আপনি কাকে বাছবেন? অফ কোর্স, গুঁজিয়া। যদিও নামটা এখন গুজিয়া হয়ে গেছে কিন্তু ওই গুঁজে দেওয়ার নিমিত্তেই ওর জন্ম। গুজিয়ার কথা এলে নিখুতির কথাও অনেকেরই মনে পড়ে যাবে – এখানেও কিন্তু একটা চন্দ্রবিন্দু বাদ পড়েছে। আসল শব্দটা নিখুঁতি, অর্থাৎ যে মিষ্টির আকারে কোনো খুঁত নেই – যত কটাই ভাজুন না কেন, সব এক শেপ ও সাইজে বেরোবে। তারপর ধরুন রথযাত্রা কি দোলের সময় যে মঠ খান, সেটাই বা এল কোথা থেকে? এই মিষ্টিটি অবশ্য নিয়ে এসেছে পর্তুগীজরা, ক্রিসমাসের সময় গির্জার আকারে বানানো হত এই চিনির ড্যালা – আমরা গির্জা দেখে নাম দিয়ে দিয়েছি মঠ।

বহু সময়েই অবশ্য নামের বাহারে আমরা ভুলে যাই যে বাহারী মিষ্টিটি অন্য আরেকটি মিষ্টির  দামী এবং পরিমার্জিত সংস্করণ বই আর কিছু নয়। হাতের কাছে উদাহরণ রয়েছে চন্দ্রপুলির। চন্দ্রপুলির আদত ভার্সনটির নাম রসকরা, বহু যুগ ধরে গ্রাম বাংলার মানুষ ব্রেকফাস্টে মুড়ি-মুড়কির সঙ্গে রসকরা খেয়ে এসেছেন; সময় সময় অন্য মিষ্টির (যেমন পেরাকি) পুর হিসাবেও ব্যবহার করা হয়েছে এই রসকরাকে। চিত্রকূটের কথাও ধরতে পারেন, গোল লেডিকেনি থেকে লম্বা ল্যাংচা হয়ে চৌকোতে পৌঁছনোর পর খেয়াল পড়েছে এবার একটু ভালো নাম দেওয়া দরকার – সত্যি কথা বলতে কি আই ডোন্ট মাইন্ড, মনে রাখা দরকার ল্যাংচা শব্দটি এসেছে ‘লিঙ্গ’ শব্দটির প্রাকৃত রূপ থেকেই। গুলাবজামুনের বাংলা ভার্সন গোলাপ জামের (গোলাপ জামের সঙ্গে পরিচিতি খুব বেশী না থাকলে কালো জামের কথা ভাবতে পারেন) কথাও এসে পড়ে এ প্রসঙ্গে –  এও সেই পান্তুয়ারই রকমফের, খোয়া আর এসেন্সের দৌলতে বনেদী হাবভাব এসেছে মাত্র। রসগোল্লা হাতছাড়া হলেও স্পঞ্জ রসগোল্লা কিন্তু বাংলারই অবদান, তফাৎটা কি বলুন তো? আদি রসগোল্লাতে সুজি বা সমগোত্রীয় অন্য পদার্থ ব্যবহার করা হত জমাট করে তোলার জন্য, স্পঞ্জ রসগোল্লাতে ওসবের ব্যবহার নৈব নৈব চ। এ ছাড়া স্পঞ্জ রসগোল্লার জন্য ছানা এবং দুধ যত টাটকা হয় ততই ভালো। রসগোল্লারই আরেক বনেদী অবতার পুরনো ক্ষীরমোহন – এখন অবশ্য  ক্ষীরমোহন খুব একটা দেখা যায় না, দেখা যায় ওরই টোনড ডাউন ভার্সন ক্ষীরকদম্ব। ক্ষীরমোহনেও খোয়া মাস্ট, তার সঙ্গে পড়বে বাদাম, পেস্তা এবং কিসমিস। ক্ষীরমোহনের মতনই আরেক দুষ্প্রাপ্য মিষ্টি হল নবাবভোগ, আকারে রাজভোগের থেকেও বড় এবং ভেতরে থাকত চার ধরণের পুর, প্রতিটি পুরের আবার সুবাস আলাদা। এই ক্যাটেগরির আরেকটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ লালমোহন – এসেন্সিয়ালি ছানাবড়া, খালি ছানাবড়া আপনি আগে ভেজে তারপর রসে চোবাচ্ছেন আর লালমোহনের বেলায় ফুটন্ত রসে ফেলে দিতে হচ্ছে। তবে ছানাবড়া থেকে লালমোহন বানানোয় বেশী কেরামতি দরকার কারণ ভাজা হয় না বলে ছেতরে যাওয়ার বেশী চান্স, তো না ছেতরে যিনি গরম গরম লালমোহন তুলে আনতে পারবেন তিনিই ধন্য।

তবে নামের কথাই যদি আসে তবে আলোচনার সেরা টপিক হল সন্দেশ। বলা বাহুল্য যে সন্দেশ একটা জেনেরিক নাম – আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে (বিশেষত বৈবাহিক সূত্রে পাওয়া কুটুম্ববাড়িতে) খোঁজখবর নিতে যাওয়ার সময় যে মিষ্টি নিয়ে যাওয়া হত তাকেই বলা হত সন্দেশ, যেহেতু কুশলসন্দেশ নেওয়ার অভিপ্রায়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে আসা। কিছু সন্দেশের নাম বেশ স্ট্রেটফরোয়ার্ড, নামেই বুঝে যাবেন কি ধরণের দেখতে – শাঁখ সন্দেশ, আতা সন্দেশ, তালশাঁস ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু র‍্যোমান্টিক বাঙ্গালী বেশ কিছু নামে এক ধরণের দুর্বোধ্যতা ঝুলিয়ে রেখেছে, নামটি বড়ই সুখশ্রাব্য কিন্তু বোঝার উপায় নেই আদতে খাদ্যবস্তুটি ঠিক কিরকম দেখতে বা কিরকম খেতে – আবার খাবো, দেদার খাবো, মনোহরা, মনোরঞ্জন, মনমোহন, দেলখোশ, সুখে থেকো, ফুলশয্যা, পতি পরম গুরু…… লিস্টি নেহাত ছোটো নয়। শেষের নামগুলোয় অবশ্যই স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে এগুলো বিয়েবাড়ি স্পেশ্যাল – বাঙ্গালীর বিয়েতে ভিয়েনের চল যবে থেকে উঠে গেছে, সন্দেশের কৌলীন্যও অনেকটাই পড়ে গেছে। বহু সন্দেশই তৈরি হয়েছে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিয়ে উপলক্ষ্যে এবং রেসিপি দেখলে বেশ বোঝা যায় যে কারিগরদের বেশ মাথা খাটিয়ে বার করতে হত নতুন নতুন আইটেম।

যেমন ধরুন মনোহরা – এই সন্দেশে ছানা এবং খোয়া দুটোই থাকছে। ছানা দিয়ে মূল মন্ডটি বানানো হচ্ছে আর তার সঙ্গে সঙ্গেই মেশানো হচ্ছে জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে নরম করা খোয়ার টুকরোর দলা। কড়াইতে দিয়ে নাড়তে নাড়তে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে একটা উপযুক্ত শক্ত ভাব আসার দরকার, যাতে দ্বিতীয় দফায় ওর মধ্যে ঢোকানো যায় এলাচচূর্ণ। বেশী শক্ত হয়ে গেলে এলাচ ঢোকানো যাবে না আবার অপেক্ষাকৃত নরম থাকলে সন্দেশের আঁটসাঁট ব্যাপারটা ধরে রাখা যাবে না, মনোহরার যায়গায় মনোহর গোল্লাতেই আপনাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আবার ‘আবার খাবো’র কথা যদি ভাবেন, সেখানে কিন্ত খোয়ার দলা নয়, দিতে হবে খোয়ার গুঁড়ো। আবার খাবোতে বাই ডেফিনিশন  এলাচ পড়লে চলবে না, সেখানে দিতে হবে পেস্তা। মনমোহনেও কিন্তু পেস্তা পড়ছে, কিন্তু আখ্যান সেখানেই শেষ নয় – তার সঙ্গে আপনাকে দিতে হবে জাফরান, মনমোহন বানানোর সময় দুধও লাগবে একটু বেশী। আর শেষকালে গোলাপজল ছিটিয়ে হীরের আকারে কেটে নিতে হবে এই সন্দেশ।
শেষ করি তিনটি চমকপ্রদ বাঙ্গালী পদকে স্মরণ করে – পদ বললাম কারণ  সবগুলোকে মিষ্টি বলা যায় না অথচ বাঙ্গালী মিষ্টির ইতিহাস না থাকলে এসব খাদ্যবস্তু কোনোকালেই তৈরী হতে পারত না।

দেবেন্দ্রনাথের নাতনী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর রান্নার বই “আমিষ ও নিরামিষ আহার” ছাড়া বাঙ্গালী রান্নার ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। এই বইয়েই প্রজ্ঞাসুন্দরী একটি বিশেষ পদ দ্বারকানাথের নামে উৎসর্গ করেন, যার নাম দ্বারকানাথ ফির্নি পোলাও (আজকাল আমরা ফিরনী লিখলেও এখানে প্রজ্ঞাসুন্দরীর বানানটাই রাখলাম)। নামেই মালুম যে এ পোলাওয়ের জন্য প্রথমেই আপনাকে ফির্নি  বানাতে হবে। কিন্তু সব থেকে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল এ ফির্নি  পোলাও তৈরি হবে প্রায় বিরিয়ানির কায়দায়। প্রথমে এক থাক ফির্নি , তার সঙ্গে কুমড়োমেঠাই, কিশমিশ ইত্যাদি; তার ওপর এক থাক ভাত, তার ওপর আবার এক থাক ফির্নি , এবার সঙ্গে খোপানি (খোবানি), তার ওপর আবার ভাত। সবার ওপরে আবার চারদিক থেকে ছড়ানো থাকবে ফির্নি , কিন্তু মাঝখানটি থাকবে ফাঁকা যেখান থেকে দেখা যাবে পোলাওয়ের জাফরানি রঙটি।

দু নম্বরটি হল – ম্যাচা। ম্যাচা হচ্ছে হাতে গোনা মশলাদার মিষ্টির একটি, সময়বিশেষে যা খেয়ে ঝালও লাগতে পারে। এ বানাতে গেলে ঘি, চিনি কি তিলের সঙ্গে  আপনার চাই গোলমরিচ এবং মৌরি। আদি ম্যাচা দেখতে ডিম্বাকৃতি, ভেতরে থাকবে রসকরা যার কথা আগেই বলেছি। ভেতরে রসকরার পুরের পাশেই ম্যাচার দেওয়ালে থাকতে হবে মৌরি এবং গোলমরিচের সঙ্গত। কিন্তু শেষমেশ ম্যাচা মিষ্টিই, তাই এর ওপরে ছড়িয়ে দিতে হবে সিরাপ –  ঝাল এবং মিষ্টির এই অনায়াস কম্বিনেশন মোটেই সহজলভ্য নয়।

আর সব শেষে ‘চপ সন্দেশ’ – কলকাতায় যার আবির্ভাব ঘটেছে বিংশ শতকের শুরুর দিকেই, এর খবর পাওয়া যাচ্ছে ১৯২০ নাগাদ। মাটন চপের মিষ্টি অবতার বানাতে গেলে প্রথমেই কি দরকার পড়বে বলুন তো? ভাবছেন কি, গরম মশলা! এ বোধহয় একমাত্র বাঙ্গালী সন্দেশ যেখানে গরম মশলার জয়জয়কার। কুঁচনো মাটনের পরিবর্তে অবশ্য থাকবে কুঁচি কুঁচি করে কাটা মেওয়া এবং খোয়ার গুঁড়ো। আর ওপরের কোটিং-এ দেখতে পাবেন  পোস্তর ছোট ছোট দানা।

রসগোল্লা হাতছাড়া হল তো ভারী বয়েই গেছে।

সাড়ে চুয়াত্তর

“কনের বয়স কত রে?” শ্রীমতী ক শুধোলেন শ্রীমতী খ-কে।

“শুনছি তো মাঝ তিরিশ”।

“মাঝ তিরিশ শুনছিস মানে ধরে নে চল্লিশের কম হবে না। বলিহারি যাই বাপু, এই বয়সে এসেও গোলাপী নিয়ে আদিখ্যেতা গেল না”।

কলীগের বিয়ে, প্রথমবারের জন্য কোনো তুর্কী বিয়েতে নেমন্তন্ন পেয়েছি। ইস্তানবুলের কুখ্যাত ট্র্যাফিকের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা কয়েকজন একটু আগেভাগেই এসে পড়েছি। বিয়েবাড়িতে ঢোকার অফিসিয়াল টাইম ছিল সাড়ে ছ’টা, আমরা জনা পাঁচেক এসে পৌঁছেছিলাম ছটা চল্লিশে – আসতে আসতেই অবশ্য শুনছিলাম সাড়ে ছ’টা মানে পৌনে আটটা নাগাদ পৌঁছলে ভদ্রতাবোধটা বজায় থাকে । কিন্তু ইস্তানবুলের ট্র্যাফিক সামলে ভদ্রতা রক্ষা করা বেশ কঠিন, পরের দিন ভোর ভোরও ঢুকতে পারেন। পৌঁছে দেখা গেল বিয়েবাড়িটি আদতে একটি মিলিটারি ডেরা। সৈন্যসামন্ত এখন দেখতে পাবেন না অবশ্য, সব ডেস্ক জব। আর সন্ধ্যাবেলাগুলো বিয়ে, জন্মদিন এসবের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়।

শ্রীমতী ক গাড়িতে বসে বসেই মুখ বেঁকিয়েছেন, “হরি, হরি! শেষে আর জায়গা পেল না?”। একেই তো ইস্তানবুল, তার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়টি ভয়ঙ্কর রকম আলট্রা-লিবারল। শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে শাটল ড্রাইভার সবার আর্মি, পুলিশ, ফক্স চ্যানেল, ফতোয়া এবং আরো কোটিখানেক শব্দে ঘোরতর আপত্তি। আমার অবশ্য ঢুকে দিব্যি লাগল, সামনেই মারমারার নীল জল টলটল করছে। শেষ বিকালের হাল্কা আলোয় দেখা যাচ্ছে মারমারার মধ্যে থেকে উঠে আসা ছোট্ট দ্বীপটাকে, অবশ্য দ্বীপ না বলে টিলাও বলা যায়। কমপ্লেক্সের মধ্যে একটা বড় হলঘর, সেখানে অন্য আরেক বিয়েবাড়ি। আমাদেরটা আউটডোরে, জলের পাশেই।

ক হাই হিল সামলাতে সামলাতে বললেন, “বুদ্ধি দেখেছে! এবারে বৃষ্টিটা পড়লে কোথায় যাব শুনি? আর্মি ব্যারাকে?”।

খ-কেও একটু চিন্তিত দেখলাম, তাঁর এক বছরের বাচ্চা এবং হাই-হিল দুটোকে একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে একটু আগেই আছাড় খেয়েছেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হক কথা! তবে আকাশ দেখে মনে হচ্ছে না আজ ঢালবে”।

আর ঠিক তক্ষুনি ক অস্ফুটে চিৎকার করে উঠেছেন। আমরা ঘুরে তাকাতে সামনের লনটা দেখালেন, সেখানে অজস্র টেবল আর টেবল ঘিরে গোল করে রাখা চেয়ারের সারি। টেবল, চেয়ার সবই সাজানো হয়েছে গোলাপী কাপড়ে। আর সেই দেখেই ক শুধিয়েছেন “”কনের বয়স কত রে?”।

আমার পাশেই বসে ড্যান, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম কোঅরডিনেটর – নিউ ইয়র্কের লোক, কিন্তু ইস্তানবুলে আছে প্রায় বছর পনের। গড়গড় করে তুর্কী ভাষায় বাক্যালাপ করে, বিদেশীদের তুর্কী ভাষায় ট্রেনিং দেয় এবং কারণে অকারণে জানিয়ে দেয় আমেরিকা ছেড়ে ইস্তানবুলে মুভ করাটা (টার্কিতে মুভ করেছি বলে না কিন্তু) ওর জীবনের সব থেকে ভালো ডিসিশন। যদিও নিন্দুকে বলে ওর শ্বশুরের টাকা ছাড়া আর কোনো কারণ ছিল না, ওর বউ-ও আমেরিকায় পড়তে গিয়ে সাদা চামড়া বিয়ে করে এনে গুষ্টির স্টেটাস বেজায় বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আমার ধারণা শ্বশুরবাড়ির লোক যেদিন থেকে টের পেয়েছে ড্যান আমেরিকার ১% এর মধ্যে পড়ে না সেদিন থেকে ইন-লজ দের কাছে পপুলারিটি ক্রমহাসমান। ড্যানের শ্বশুরবাড়ি তুরস্কের ১% কেন, ০.১% এর মধ্যেও পড়তে পারে। ইদানীং সেই সব নিয়ে একটু চিন্তিত থাকলেও এখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। বলল “আমি তো ভাবছিলাম মেহমেত বোধহয় আর বিয়েটা করলই না। আর বছর কয়েক পর একগাদা কালো বেড়াল কিনে নিয়ে আসবে, সকালে পড়াবে আর সারা বিকাল সন্ধ্যা ধরে কালো বেড়ালের গলায় আদর করতে করতে রোমহর্ষক সব থ্রিলার দেখবে”। মেহমেত যে চল্লিশ পেরিয়ে বিয়ে করবে সে আশা বিশেষ কারোরই ছিল না মনে হয়। অপারেশন ম্যানেজমেন্টের সদাহাস্যময় দোয়ুকান একটু আগেই হন্তদন্ত হয়ে এসে বলে গেলেন, “সান্তোরিনি যাওয়ার বন্দোবস্ত করে এলাম”। আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “হঠাৎ গ্রীসে কেন?”। দোয়ুকান মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “হঠাৎ নয় রে ভাই, দশ বছর আগে যাব ভেবেছিলাম। সেবারে আমিই একটা সম্বন্ধ নিয়ে এসেছিলাম মেহমেতের জন্য, ব্যাটা সদ্য পি-এইচ-ডি শেষ করে জয়েন করেছে, ভাবলাম দিই ছ্যামড়াটাকে সারা জীবনের মতন সেটল করিয়ে। ও হরি, মেয়ের পি-এইচ-ডি নেই বলে বাতিল হয়ে গেল। আমারও জেদ চেপে গেল, ঠিক করলাম ওর বিয়ে হলে তবেই সান্তোরিনি যাব। কে জানত দশ বছর লেগে যাবে? দুটো টিকেট আবার এক্সট্রা পড়ল”। বলে দুই মেয়ের হাত ধরে হাসতে হাসতে চলে গেলেন।

খ ফিসফিস করে বললেন, “শেষ বছর ছয়েক অবশ্য মেয়েরা যে শুধু ইন্টেলেকচুয়াল কারণে বাতিল হয়েছে তা নয়। কার নাক খ্যাঁদা, কার আছে সরু গোঁফের রেখা, কার আঙ্গুলগুলো একটু মোটা, দেখে ঠিক পিয়ানোবাদকের আঙ্গুল বলে মনে হয় না……”।

ক সঙ্গত দিলেন, “তা বলে ভেবো না পি-এইচ-ডির ক্রাইটেরিয়ন চলে গেছে, ওটা মিনিমাম!”।

আমি অবাক হয়ে মেহমেতের এমন দুর্মতি হল কেন জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি এক ভদ্রলোক বেচারা বেচারা মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন – চতুর্দিকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। আমাকে দেখে একটু ম্লান হাসলেন, আর তক্ষুনি মনে পড়ল ইনি আমাদের ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট। বিয়েবাড়িতে এসেছেন বলেই বোধহয় দোর্দণ্ডপ্রতাপ মুখোশটি ছেড়ে এসেছেন কিন্তু সমস্যা হল মুখোশ খুলে ফেলতেই মুখ চেনা যাচ্ছে না। হাই-হ্যালো করার অভিপ্রায়ে উঠছি এমন সময় কানের কাছে “মেরহাবা”, এক সুটেড-বুটেড ভদ্রলোক এসে জড়িয়ে ধরেছেন। মিনিটখানেক ঠাহর হচ্ছিল না, তারপর বুঝলাম আমাদের আর্দালিসাহেব তুরহান সদ্য ঢুকেছেন বিয়েবাড়িতে। আমেরিকার কোনো ইউনিভার্সিটিতে আমি আর্দালি দেখিনি, এখানে এসেই প্রথম দেখলাম প্রফেসরদের জল, চা, কফি এবং অন্যান্য খিদমত খাটার জন্য বেতনভুক এক বান্দা রয়েছেন। তবে কিনা, উপমহাদেশের আর্দালিদের সঙ্গে এঁকে এক না করাই ভালো; হাজারখানা কারণ আছে, যেমন ধরুন হাতে কাজ না থাকলে ইনি স্যামসুং গ্যালাক্সি ট্যাবে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলে থাকেন। ভদ্রলোক অবশ্য এক ফোঁটা ইংরেজী জানেন না, ফলত আজ এক বছর ধরে ডেলি বেসিসে আমরা পরস্পরকে ঠিক দুটো কথাই বলে এসেছি – সকাল নটায় “মেরহাবা” (অর্থাৎ হেল্লো) আর নটা বেজে এক মিনিটে “গুনায়দিন” (অর্থাৎ গুড মরনিং)। এখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় মেরহাবা বলে ওনার খেয়াল হয়েছে গুনায়দিন বলা যাবে না, তাই হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে রয়েছেন (বোধহয় ধরে নিয়েছেন যে আমি গুড ইভনিং এর তুর্কী প্রতিশব্দ জানি না), আমিও হাসি মুখে মূকাভিনয় সহযোগে বোঝালাম, “লুকিং ড্যাপার” ইত্যাদি। এই বোবা তারিফের পালা কতক্ষণ চলত কে জানে, খ এসে ডেকে নিয়ে গেলেন, “কি আশ্চর্য, এন্ট্রি সং নিয়ে বেট লাগছে আর তুমি এখানে দাঁড়িয়ে?”।

দেখি আমাদের টেবলে ভিড় উপছে পড়েছে, লোকে সুরে বেসুরে বিভিন্ন গানের দু’এক কলি আউড়ে যাচ্ছেন। আমাকে বোঝানো হল বর-বউ যখন হাত ধরাধরি করে ঢুকবেন তখন গান বেজে উঠবে, দোঁহে যতটা চমকে ওঠা যায় তার ভান করে বিস্তর র‍্যোমান্টিক সাজা্র চেষ্টা করবেন, কিন্তু বিয়েবাড়িতে উপস্থিত প্রতিটি লোক জানে এ গান বাছা হয়েছে অন্তত মাস চারেক আগে, প্রায় শ’খানেক গানের মধ্য থেকে। ক বললেন, “বলে ফেলো তুমি কিসে বেট লাগাচ্ছ?”। মহা মুশকিল, আমি সাকুল্যে একটিই তুর্কী গান জানি – “উসকুদার-আ গিদের ইকেন আলদি দা বের ইয়ামুর”……প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নজরুল তাঁর তুর্কী সহযোদ্ধাদের থেকে যে গান শুনে লিখেছিলেন “শুকনো পাতার নূপুর পায়ে নাচিছে ঘূর্ণিবায়”।

এক তুর্কী কন্যা তাঁর পুরুষ সঙ্গীকে নিয়ে ইস্তানবুলের কাছে এক গ্রাম উসকুদারে ঘুরতে গেছেন, এই হল গানের প্রেক্ষাপট। এখন বিশেষজ্ঞরা এ গানে রোম্যান্স, বিপ্লব, দেশাত্মবোধ সবই খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু মেহমেত এবং তাঁর ভাবী বউ এই গান বাছবেন এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা বোধহয় কোটিতে এক। তাও কিছু বলতেই হয়, তাই লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই দিলাম। আর অমনি টেবল জুড়ে এমন অট্টহাসির রোল উঠল যে সারা বিয়েবাড়ি মাথা ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়েছে, আমি পালাবার পথ খুঁজে পাই না। খ হাসতে হাসতে বললেন, “আমাদের কতটা গাঁইয়া ভাবো বলো তো? এটা তো একে ফোকসং, তায় লেখা হয়েছে বোধহয় দেড়শ বছর আগে। আর শেষ পঞ্চাশ বছরে বোধহয় কেউ টার্কিশ গান বাছেনি নিজেদের বিয়েতে। “, আমি বললাম, “আচ্ছা, আপনি কিসের বেট লাগাচ্ছেন সেটাই শোনা যাক বরং”। খ বললেন, “আরে পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না গানের নামটা, ওই যে কাউন্টডাউন হতে থাকে, কোন একটা ওয়ার্ল্ড কাপে বাজিয়েছিল না?” বুঝলাম  ব্যান্ড ইউরোপের ‘দ্য ফাইনাল কাউন্টডাউন’ এর কথা বলছেন। সবাই মাথা নাড়তে লাগলেন, “না না, ও গান লক্ষ-কোটিবার বাজানো হয়েছে এর আগে, আবার হয় নাকি?”

আর ঠিক তক্ষুনি ঢোকার মুখে রাখা সারি সারি সাদা রঙের পোলগুলোর পাশ দিয়ে রঙ বেরঙ এর তুবড়ি ঝলসে উঠল, পোল থেকে ঝুলতে থাকা খাঁচাগুলোর মধ্যে তুলো দিয়ে তৈরি করা পায়রাগুলো সেই আলোয় কিরকম জীবন্ত ঠেকতে লাগল। আর মারমারার জল ও হাওয়ার আওয়াজ ছাপিয়ে ভেসে উঠল অ্যাডেলের রাগী গলা, “দেয়ার ইজ আ ফায়ার স্টার্টিং ইন মাই হার্ট”………

সবাই হতচকিত, ক প্রায় চোখ কপালে তুলে বললেন, “শেষে রোলিং ইন দি ডীপ, কি আনইউজুয়াল চয়েস বাবা! এ গানের সঙ্গে আবার লাভি-ডাভি হওয়া যায় নাকি?”।

ততক্ষণে বর-বউ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসেছেন এবং বোঝা গেল লাভি-ডাভি হওয়ার এই মুহূর্তে বিশেষ ইচ্ছে নেই তাঁদের। “উই ক্যুড হ্যাভ হ্যাড ইট অল” এর সঙ্গে দু হাত তুলে নাচতে নাচতে বর ঢুকলেন, সারা লন তখন তালে তালে হাততালি দিতে ব্যস্ত। কেবল ক একটি ছোট্ট চিমটি কেটে বললেন, “বৌয়ের জুতো দেখ, আর হাতে ধরা ফুলের তোড়ার রঙটাও”। বলা বাহুল্য, সবই গোলাপী।

বিয়েটা অবশ্য দশ মিনিটের-ও কমে সারা হয়ে যায়, কোনো ধার্মিক রিচুয়ালের বিশেষ বালাই নেই। রেজিস্ট্রার এসে বরের নাম, কনের নাম, তাঁদের মা-বাবার নাম বলে শুধু একটাই প্রশ্ন করবেন, “আপনার পরস্পরকে বিয়ে করতে রাজি?” যে কেউ একজন এভেত (হ্যাঁ)  বলে দিলেই হল। তারপর শুধুই গান, নাচ আর খাওয়া-দাওয়া।

এভেত বলে দিতেই লনে অপেক্ষারত ব্যান্ডের লীড ভোকাল  শুরু করে দিলেন যে কোনো তুর্কী পার্টির অবশ্যবাদ্য গানটি,

Now you found the secret code
I use to wash away my lonely blues (well)
So I can’t deny or lie cause you’re the only one to make me fly
Sexbomb sexbomb you’re a sexbomb uh, huh!

টম জোনসের গমগমে গলার মধ্যে আড়াল খুঁজে নিয়ে ক নতুন কনেকে নিয়ে প্রাণপণে পি-এন-পি-সি করছিলেন খ-র সঙ্গে, খেয়াল করেননি কখন ভিডিয়োগ্রাফাররা অজান্তেই সেসব আলোচনা রেকর্ড করে নিয়েছে – সে আরেক গল্প।

ক ছাড়া বাকি তিনশ উনপঞ্চাশ লোক নাচছেন – ঘুরে-ফিরে, টুইস্ট দিতে দিতে, জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে এলভিস স্টাইলে, মেদের বাহুল্যে বলরুম পোজে্‌………আমি গুটি গুটি এগোলাম নতুন বর-কনের গন্ধ নিতে।

সাদা ফ্রেম, কালো ফ্রেম

বিধিসম্মত সতর্কীকরণ – এটা ফ্যানবয় পোস্ট, ফ্যানবয়দের আতিশয্যে যদি গা জ্বালা জ্বালা করে বা উত্তমকুমারকে যদি জেনারেলি অপছন্দ করেন তাহলে এ পোস্ট না পড়াই ভালো।

মহানায়কের জন্মদিন আজ (3rd September) সুতরাং সাড়ে বত্রিশ ভাজায় একটা পোস্ট দিতেই হত। কলকাতার স্কুল-কলেজে, জে-এন-ইউর ধাবায় এমনকি সিয়াটলে পি-এইচ-ডি স্টুডেন্টদের জমায়েতে যখনই একাধিক বাঙ্গালী (সময় সময়ে বাংলাদেশীরাও) থেকেছেন, উত্তম ভার্সাস সৌমিত্র টপিকটি অবধারিত ভাবে এসেছে – একবারের জন্যও ব্যতিক্রম ঘটতে দেখিনি। ছেলেমানুষি? হয় তো তাই কিন্তু আড্ডা জমিয়ে দেওয়ার জন্য এর থেকে ভালো বিষয় হয় না। এ আড্ডা শুরু হলে সব থেকে মুখচোরা তরুণ বা তরুণীটিও কথা না বলে উঠে পারেন না, ফ্রেশার্সদের জড়তা কাটানোর জন্য এ দাওয়াই র‍্যাগিং এর থেকে ঢের ভালো  । মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নিয়েও লোকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন কিন্তু উত্তম বনাম সৌমিত্র নিয়ে কথা হচ্ছে না, এমনটি নৈব নৈব চ।  অর্কুট কি ফেসবুকে অবশ্য এ ঝগড়া অনেক উদ্দাম, দু পক্ষই বাছা বাছা যা সব বিশেষণ ঢালেন সেসব শুনলে আমাদের ভূতপূর্ব ম্যাটিনি আইডলরা (কবিতা সিংহের অনুবাদ ছিল ‘বৈকালিক বিগ্রহ’, আমার অবশ্য এই শব্দগুচ্ছটি একদমই পোষায়নি) হার্টফেল করতেন।

তো এহেন ঝগড়া যখন অভিনয় ক্ষমতার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে লুকস-এ গিয়ে পৌঁছয় তখন সৌমিত্র সাপোর্টাররা উইদাউট ফেল চড়া লিপস্টিক লাগানো সপ্তপদীর উত্তমকে মনে করিয়ে দিয়ে মহা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসেন। এই লিপস্টিককে কাউন্টার করার জন্য আমি বোধহয় আজ বছর পনের ধরে চশমার শরণাপন্ন। হ্যাঁ, চশমা চোখে উত্তম (স্পেশ্যালি সে চশমা যদি মোটা ফ্রেমের হয়) বাঙ্গালী আভিজাত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক। এ আভিজাত্যের সঙ্গে অবশ্য বংশ, অর্থ, সাফল্য কোনো কিছুর সম্পর্ক নেই – একজন অতি মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীও অভিজাত হয়ে উঠতে পারেন  স্রেফ পার্সোনালিটি দিয়ে। অবশ্যই বলা যত সহজ, করে দেখানো তার চেয়ে হাজার গুণ কঠিন। উত্তম সেই কাজটা যে কি অবলীলায় করে গেছেন তা বলে বোঝানোর নয়; এই অবতারে উত্তমকে দেখলেই মনে হয় লাস্ট ম্যান স্ট্যান্ডিং, সিনেমাটা শেষ হবে আর তারপরেই খেয়াল পড়বে যে এ আর হল না, বাঙ্গালীর জীবদ্দশায় হয়ত হবেও না।

আজকে সেই চশমা আঁটা উত্তমের কিছু ঝলক রইল সাড়ে বত্রিশ ভাজায়।

কালো ফ্রেম

১) চিড়িয়াখানা (১৯৬৭) –  বহু সমালোচকই বলে থাকেন  সত্যজিৎ এ সিনেমায় ব্যোমকেশের প্রতি সুবিচার করেননি। কিন্তু পরিচালকের কথা এখানে ধরছি না, অভিনেতা উত্তম অনন্য – স্বয়ং সৌমিত্র বলেছেন চিড়িয়াখানায় উত্তমের পারফরম্যান্স প্রায় একমেবাদ্বিতীয়ম।  শরদিন্দু নিজে চশমা চোখে ব্যোমকেশকে একদমই পছন্দ করতে পারেননি (আদত ব্যোমকেশের চশমা নেই) কিন্তু চশমা এখানে ব্যোমকেশকে আলাদা একটা গ্র্যাভিটি দিয়েছে। চিন্তামগ্ন সত্যান্বষীকে চশমা ছাড়া দেখতেই বরং একটু অদ্ভুত লাগত না?

Chiryakhana

২) হার মানা হার (১৯৭২) –  তারাশঙ্করের ‘মহাশ্বেতা’ অবলম্বনে বানানো সলিল সেনের এই সিনেমায় উত্তমকুমারের নাম বিনোদা সেন। পেশায় শিল্পী, যদিও দেশসেবার জন্য প্রায় সব শিল্পই অসমাপ্ত। শিল্পীর বোহেমিয়ানা, একাকীত্ব এবং অসহায়তা সবই ফুটে বেরিয়েছে কালো ফ্রেমের ভেতর দিয়ে।

haar mana haar

৩) যদি জানতেম (১৯৭৪) – উত্তম আরো একবার গোয়েন্দার ভূমিকায়, এবার নারায়ণ সান্যাল সৃষ্ট ব্যারিস্টার পি-কে-বাসু। নারায়ণ সান্যালের কাঁটা সিরিজের প্রথম বই ‘নাগচম্পা’ অবলম্বনে বানানো এই সিনেমায় অবশ্য উত্তমের থেকে স্ক্রিনে বেশীক্ষণ থেকেছেন সৌমিত্র। কিন্তু সৌমিত্র এবং সুপ্রিয়াকে খুনের দায় থেকে বাঁচানোর জন্য উত্তমই ভরসা। দাপুটে ব্যারিস্টারকে একবার চশমা ছাড়া ভাবার চেষ্টা করে দেখুন তো।

jodi jantem

৪) যদুবংশ (১৯৭৪) – বিমল করের উপন্যাস অবলম্বনে বানানো এ সিনেমায় উত্তমের চরিত্রের নাম গণনাথ। উত্তমের চরিত্রটি এখানে পার্শ্বচরিত্র এবং ছবি শুরুর প্রায় আধ ঘন্টা পর গণনাথকে প্রথমবারের জন্য দেখা যায়। উত্তমের সেরা কাজের লিস্ট বানাতে গেলে বহুজনই প্রথম পাঁচে যদুবংশকে রাখবেন। বদলে যাওয়া সমাজের প্রতি নিষ্ফল নীরব আক্রোশে ফুঁসতে থাকা গণাদার চোখে কিন্তু গোল ফ্রেমের চশমা, ট্র্যাডিশনাল চৌকো ফ্রেমের জায়গায়। গোল ফ্রেমের চশমা সাধারণত শৌখিনতার প্রতীক, সিনেমায় তুলে ধরা আয়রনি যেন কখন অজান্তে ছুঁয়ে গেছে সিনেমার prop কেও।

jadu bangsha

৫) দুই পৃথিবী (১৯৮০) – আমার লিস্টে উত্তমের সেরা তিন সিনেমার একটি, উত্তমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছিলেন ভিক্টর ব্যানার্জ্জীও। নুভো রিচ ছোটো ভাই ভিক্টরের টাকা যখন পৃথিবীসুদ্ধ সবার বোধবুদ্ধি গুলিয়ে দিয়েছে (এমন কি বাবা মায়েরও) তখনো আদর্শে অবিচল থেকেছেন উত্তমের বড়দা। কিন্তু কালো ফ্রেমের নিচে থাকা আপাতশান্ত একজোড়া চোখ যে ফুঁসেও উঠতে পারে তার প্রমাণ এই ক্লিপটি। ভ্রাতৃবধূকে জড়িয়ে কুৎসাক্ষেপণে রত ভিক্টরের নীচতা দেখে এক পলকের জন্য থমকে যাওয়া বড়দা বলে উঠছেন, “ইউ স্কাউন্ড্রেল!”। এর পর প্রায় এক মিনিট লম্বা একটি দৃশ্যে উত্তম ভিক্টরকে চাবুকপেটা করবেন, অত মাচো অ্যাকশন সিন বাংলা সিনেমাতে দুর্লভ।

dui prithibi

সাদা ফ্রেম 

১) বাঘবন্দী খেলা (১৯৭৫) – তর্কাতীতভাবে উত্তমের করা সেরা খল চরিত্র, এত দাপুটে অভিনয় উত্তম ছাড়া আর কেউ করতে পারতেন বা বলেই আমার ধারণা। অনুতাপের বিন্দুমাত্র রেশ না দেখিয়ে স্বেচ্ছাচারের যে নমুনা বাঘবন্দীর ‘বড় সাহেব’ রেখেছেন তা বাংলা সিনেমায় অভূতপূর্ব। সাদা ফ্রেমের মধ্যের চোখ দুটো কিন্তু এখানে অসম্ভব ক্রূর, নিজের ছেলেকে ঠকিয়ে শেষ করে দিতেও যে চোখের পাতা একবারের জন্যও কাঁপবে না।

baghbandi khela

২) অগ্নীশ্বর (১৯৭৫) – বনফুলের সেই আদর্শবান  ডাক্তার; যাঁর  আপাতরুক্ষ ব্যবহারে দুঃখ পেয়ে লাভ নেই, বরং মানুষটির আসল চরিত্রটিকে বুঝতে গেলে কিছু সময় কাটানো নিতান্তই দরকার। সিনেমারর বাকি চরিত্রদের সে সুযোগ না মিললেও দর্শকদের মিলেছে, এবং সে জন্য তাঁরা চিরকৃতজ্ঞ।

agnishwar

৩) ব্রজবুলি (১৯৭৯) – এবারে উত্তম গৌরকিশোর ঘোষ বা রূপদর্শীর বিখ্যাত চরিত্র গুল্পবাজ ব্রজদার ভূমিকায়। মেক আপটি ঠিক জমেনি, সময় সময় চিড়িয়াখানার জাপানীজ হারাকিরির কথা মনে করিয়ে দেয় কিন্তু সাদা ফ্রেমে আড্ডাটি দেদার জমিয়ে দিয়ে গেছেন উত্তম। আর এ আড্ডার উপরি পাওনা ভবানীপুরের আদি বাসিন্দা উত্তমের খাঁটি কলকাত্তাইয়া চালে ‘খেলুম, গেলুম, ছিলুম’ বুলি।

Brajabuli

8) দুই পুরুষ (১৯৭৮) – আবারো তারাশঙ্কর, বাঘবন্দী খেলার পর আবারো পার্থ মুখোপাধ্যায় ছেলে, এবং আবারো ছেলের সঙ্গে চূড়ান্ত কনফ্রন্টেশন। একদা আদর্শবান বাবা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, শুধু ছেলেই রুখে দাঁড়িয়েছে বাবার হাজারো একটা ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। বাবার ঠিক করা মেয়েকে বিয়েতে রাজি না হওয়ায় বাবা ছেলেকে পরিত্যাগ করেন, সগর্বে জানিয়ে দেন “তিল তিল করে গড়ে তোলা এ সাম্রাজ্য আমার, আমি এখানে সম্রাট, এখানে কোনো অবাধ্যতা আমি বরদাস্ত করি না”। বাংলা সিনেমার বাবা ছেলের মধ্যের ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা দৃশ্যগুলির অন্যতম একটি দৃশ্য এ ছবির – উত্তমকে যথার্থ সঙ্গত দিয়েছিলেন পার্থ, এত নাটকীয় একটি দৃশ্যকে পারফেক্ট করে তোলার জন্য দুই অভিনেতার অনুরোধেই বেশ  কয়েকবার রিটেক করতে হয়েছিল পরিচালককে।

dui purush

৫) আলো আমার আলো (১৯৭১) – যদিও ‘সানগ্লাসে উত্তম’ একটা আলাদা ব্লগপোস্ট হবে, কিন্তু এই পোস্টেও একটা ক্লিপ দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।

Aalo aamar aalo


ফ্রেম কিন্তু সাদাই, বিশ্বাস না হলে একবার দেখে নিন, “এই এত আলো, এত আকাশ………”

তবে চশমার কথাই যদি ওঠে তবে সবার আগে কিন্তু মনে পড়ে ইন্সপেকটর তিনকড়ি হালদারকে।

Thana theke aaschi

মিটিমিটি চোখের ইতিহাস

ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করার পরের দিনেই শ্রীমতী ভ্রূটি বড্ড কুঁচকে ডাকলেন , “শোনো, ওই যে প্রফেসর মেরিলিন মনরোর মুখ আঁকা টাই পরে আসেন, ওনার সঙ্গে আলাপ আছে তোমার?”। আমি শুনে যারপরনাই চমৎকৃত, “সত্যি, এরকম টাই পরে কেউ আসেন নাকি? আমি যদিও চিনি না তাঁকে কিন্তু আলাপ করার বিলক্ষণ ইচ্ছে রইল”। শ্রীমতী বিশদে কিছু ভাঙ্গলেন না খালি যাওয়ার সময় বললেন, “লোকটা সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না”। দাম্পত্য কলহে জড়িয়ে পড়ার ইচ্ছে ছিল না তাও বললাম “মেরিলিনের মুখ আঁকা  টাই-ই তো পরেছেন, কো-অথরের বৌকে নিয়ে তো পালিয়ে যান নি”। শ্রীমতী কিছু একটা প্রত্যুত্তর দিতে গিয়েও দিলেন না, রাগ রাগ মুখে একবার আপাদমস্তক  দেখে চলে গেলেন।

দিন তিনেক পর ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের দিকে চলেছি, বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখি ছোটোখাটো একটি জটলা। চার পাঁচটি ছেলে একটি মেয়েকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে; জটলার মধ্যে থেকেও স্কার্টটি চিনতে ভুল হয়নি এবং স্বভাবতই বুকটি ছ্যাঁত করে উঠেছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি শ্রীমতী একটু হতভম্ব মুখে দাঁড়িয়ে, এবং ছেলেগুলি চোস্ত তুর্কী এবং ভাঙ্গা ইংলিশে প্রভূত ক্ষমা চাইছে। আমাকে দেখেই অবশ্য জটলাটি ভেঙ্গে গেল এবং ছাত্রকুল আরো একবার দুঃখপ্রকাশ করে যে যার ডরমিটরি পানে চলে গেলেন। আমার মুখের অবস্থা দেখে শ্রীমতীর মায়া হল, বললেন “চিন্তার কিছু নেই, আজকে ঘন্টা খানেক ধরে ক্লাস ডিসকাশনের ফল”। আমি অবাক হয়ে বললাম “আজকে তো ক্লাস ছিল বিজনেস এথিকসের। ক্লাসে এমন কি ঘটেছে যে যে সবাই মিলে ক্ষমা চাইতে এসেছে?”। শ্রীমতী একটু চিন্তিত মুখে বললেন “আজকে এরা ক্ষমা চাইল বটে কিন্তু মনে হচ্ছে কালকে আমারও গিয়ে কিছু বলা দরকার”। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তারপর বললেন, “সারাদিন ক্লাস করার পর এখন আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, তার ওপর বাড়িতে হোল চিকেন ডিফ্রস্ট হচ্ছে, আগে কেটে দেবে চলো”।

মুরগীর গরম  ঝোলমাহাত্ম্যে আসল কথাটা বেরোল – চোখ নিয়ে সমস্যা। প্রথম দিন থেকেই আলাপ হওয়া ইস্তক তুর্কী প্রফেসর, সহপাঠী, প্রোগ্রাম কোঅরডিনেটর যে যে পেরেছেন সবাই চোখ টিপে চলেছেন। মেরিলিন-ভক্তই বোধহয় শুরু করেছিলেন, কিন্তু তারপর গাঁ উজাড় করে সবাই এমন চোখে চোখে কথা বলার তাড়না দেখিয়েছেন, আলাদা করে আর ঠগ শ্রীমতী বাছেন কি করে? শেষে বিজনেস এথিকসের ক্লাসে বিভিন্ন ইমারজিং মার্কেটের ভোক্তাদের সোশিওলজিক্যাল ট্রেটসের ওপর প্রেজেন্টেশন দিতে গিয়ে রহস্য উদ্ধার হয়েছে। জানা গেছে তুরস্কে চোখ টেপার অর্থ নিতান্তই হাই-হ্যালো; ইজ এভরিথিং অলরাইট গোছের দৈনন্দিন পাশ কাটানো প্রশ্নের সমতুল্য এই চোখ টেপা। লোকের বড়ই আলস্য অত কথাবার্তা বলায়, চোখ টিপে দিলেই সমস্যা মিটে গেল – শর্ট অ্যান্ড সুইট উপায়। কিন্তু মুশকিল হল শ্রীমতী ক্লাসে ঘোষণা করেছেন উপমহাদেশীয় কালচারে  চোখে টেপা মানেই গন্ডগোলের লক্ষণ, ফ্লার্টেশাস বিহেভিয়রের চুড়ান্ত।  তাতে সায় দিয়েছে পাকিস্তানী ছাত্রছাত্রীরাও। আর তাতেই তুর্কী ছাত্রছাত্রী থেকে প্রফেসর, সবাই ভারী লজ্জিত হয়ে পড়েছেন – গোটা ক্লাসের তরফ থেকেই ওই চার-পাঁচ জনকে পাঠানো হয়েছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য। পুরো ঘটনাটা পরিষ্কার হওয়ার পর শ্রীমতী নিজেই এবার বেশ বিব্রত, যস্মিন দেশে যদাচার আপ্তবাক্যটি স্মরণ করে ভাবছেন ওনারও উল্টে দুঃখপ্রকাশ করা উচিত হবে কিনা।

তুরস্কই এক অর্থে আমার প্রথম বিদেশ, আমেরিকায় দশ বছর কাটালেও কিছু তাৎক্ষণিক কালচার শক ছাড়া খুব কিছু বিজাতীয় অভিজ্ঞতা ঘটেনি। সুতরাং এহেন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হওয়ার সুযোগও খুব বেশী আসেনি আগে। কৌতূহলও হল বেজায় – সত্যি তো, দেশকাল নির্বিশেষে চোখ টেপার দস্তুরকে একইভাবে বিশ্লেষণ নিশ্চয় করা হয়নি।

খোঁজাখুঁজি করে জানা গেল ইংরেজিতে Wink শব্দটির ব্যবহার প্রায় সাতশ বছরের পুরনো। যদিও এই শব্দটি এসেছে আবার ওল্ড জার্মেনিক ভাষা থেকে, ক্রিয়াপদ হিসাবে সেই আদি শব্দের একটি অর্থ হল ঢেউ খেলানো। সুতরাং, কেউ যদি দাবি করেন মধ্যযুগে চোখ টেপার একটা র‍্যোমান্টিক ইতিবৃত্ত রয়ে গেছে, সে দাবী হয়তো খুব সহজে নস্যাৎ করা যাবে না। বাংলা ভাষায় অবশ্য ‘চোখ টেপা’ই বলুন কি ‘চোখ মারা’ সবই হাল আমলের বাক্যবন্ধ। সত্তর – আশি বছর আগেও কি লোকে একই কথা ব্যবহার করত? সে উত্তর পাওয়া একটু শক্ত ব্যাপার, কিন্তু অভিধানকে যদি তৎকালীন সমাজের ভাষার প্রতিচ্ছবি হিসাবে কল্পনা করতে পারেন তাহলে মানতে হবে যে চোখ টেপাটা আগেকার যুগে ছিল নিতান্তই ‘চোখ পিটপিট করা’। ১৯০১ সালের ‘কম্প্রিহেন্সিভ ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনারি’ (প্রণেতা মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশনের ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ এইচ-সি-শূর মহাশয়) জানাচ্ছে Wink এর বাংলা প্রতিশব্দ চক্ষু মিটমিটকরণ। মিটমিটকরণ শব্দটি দেখে অবশ্য অনাবিল আনন্দ লাভ করেছি।

এও জানা গেল যে পৃথিবীর প্রায় সব সভ্যতাতেই ‘চক্ষু মিটমিটকরণ’ প্রক্রিয়াটি বাক্যালাপের অন্যতম বিকল্প হিসাবে পরিগণিত হয়ে এসেছে। আমেরিকান নৃতত্ববিদ ক্লিফোর্ড গার্টজ বলেছেন চোখ টেপার মধ্যে একটা ষড়যন্ত্রের আভাস সবসময়েই থাকে – সেটা অবশ্য খেলাচ্ছলেও হতে পারে। কিন্তু ষড়যন্ত্রটা এখানে বড় কথা নয়, বড় কথা হল আপনি চোখ টিপছেন মানে নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে আপনার একটি নির্দিষ্ট চিন্তাপ্রবাহ কাজ করছে, কোনো  একটা অব্জেক্টিভ আপনি ফুলফিল করতে চাইছেন।

কোন অব্জেকটিভ? কি উদ্দেশ্য?

আসুন, কিছু  ছবি দেখা যাক।

Messi

ফুটবলের রাজপুত্রকে চিনতে না পারার কোনো কারণ নেই। বেশী ইন্টারেস্টিং প্রশ্নটা হল কাকে চোখ টিপছেন উনি? একটা হিন্ট – দ্বিতীয়জনের জার্সির রঙ সাদা।

এটা ২০১০ এর একটি এল ক্লাসিকো শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে নেওয়া ছবি। অফ কোর্স, দ্বিতীয় জন রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে স্বয়ং রোনাল্ডো। একটা প্লেফুল ব্যাপার তো অবশ্যই ফুটে উঠেছে, সঙ্গে রয়েছে  আরেকটি সাটল অব্জেক্টিভ – মিডিয়া যতই নারদ-নারদ করুক, সে ফাঁদে পা দেওয়ার বান্দা আমি নই। এখন দর্শক বিশ্বাস করল কিনা সেটা পরের কথা।

বিশ্বাসের ব্যাপার, কনভিকশনের ব্যাপারটা অবশ্যই আপনার পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করবে। এইখানে আপনি হাঁ হাঁ করে উঠতেই পারেন “দুর মশাই, চোখ টেপার মধ্যে আবার পারফরম্যান্স কি?” তাহলে পরের ছবিটা দেখা যাক বরং।

Sharapova

কিছু জুনিয়র টেনিস প্লেয়ার বিখ্যাত গ্যাংনাম নাচের একটা ভিডিও বানিয়ে শারাপোভাকে অনুরোধ করেছিলেন সেটাকে প্রোমোট করতে। শারাপোভা করেওছিলেন, কিন্তু ছবিতে খুবই স্পষ্ট যে এ নিতান্তই উপরোধে ঢেঁকি গেলা – অনভ্যাসের ফোঁটা চড়চড় করে ফুটে উঠেছে। শারাপোভাও বুঝতে পেরে বেশ বিব্রত হয়েছিলেন, পরে স্বীকারও করে নেন। ‘কুল’ (আমেরিকান কায়দায়) সবাইকে হতেই হবে, এমন কথা বলে কে?

তবে এর উলটো দিকটাও আছে।

Obama

“আমার মা কানসাসে জন্মেছেন, বাবা কেনিয়ায়। আর আমি? হাওয়াই-এ”, বলতে বলতেই ছোট্ট একটা উইঙ্ক।  বুদ্ধিমান ও বাগ্মী পুরুষের এ পারফরম্যান্স তাবৎ দর্শককুলের কাছে উপরি পাওনা; সবাই গলে জল-  হাসতে হাসতে, বিষম খেতে খেতে অস্থির। যারা রাজনীতি, অর্থনীতির বাঘা বাঘা সমস্যা এড়িয়ে ওবামার জন্মরহস্য নিয়ে পড়েছিলেন তাঁরা দশ গোল খেলেন।

অবশ্য সবাই যে এত স্ট্র্যাটেজিকালি চোখ টিপবেন সেটা ভাবাটা অন্যায়। নিছক চ্যাংড়ামোও একটা উদ্দেশ্য হতেই পারে, হাল্কা ষড়যন্ত্রই বলতে পারেন ক্লিফোর্ডের ভাষায়।

Chinmoy

“শ্যাম কিছু করেছিলিস?”

অত্যন্ত রাগত সৌমিত্র – “মানে?”

“মানে, এই চোখ টোখ মেরেছিলিস?”

যাঁদের বসন্ত বিলাপ দেখে দেখে মুখস্থ হয়ে গেছে তাঁরা নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবেন এখানে – চিন্ময়ের ‘চক্ষু মিটমিটকরণ’ কে চোখ টেপার থেকে চোখ মারা বলাটাই যথার্থ হবে। শুধু তো ছবিই নয়, ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘ট্যাঁ’ করে বেজে ওঠা শব্দটি  একটা সূক্ষ্ম   শালীন-অশালীনের গন্ডীও টেনে দেয়।

আর এই সব কিছুকে ছাড়িয়ে,

Uttam

স্টাইল!

এইটা নিয়ে বরং বেশী বাক্যব্যয় না করে দেখে নি আসল ভিডিওটা

এবার ফিরে যাওয়া যাক চোখ টেপা নিয়ে মূল আলোচনায়। একটা কথা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে – যখনই কেউ চোখ টিপছেন, তাঁর উদ্দেশ্য থাকছে অন্যজনের সঙ্গে একটা যোগাযোগ বা ভাব আদানপ্রদান করা, কিন্তু কোনোরকম শব্দের সাহায্য নিয়ে নয়। শব্দ থাকছে না বলেই যিনি গ্রহীতা, তাঁর জন্য যোগাযোগের এই মাধ্যমটা একটু শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। সোজা কথায় – কেউ যদি আপনার দিকে তাকিয়ে চোখ টেপেন, আপনি কি করবেন?

১) দৃকপাত করবেন না

২) পুলিশে খবর দেবেন

৩) হাসবেন

৪) আপনিও চোখ টিপবেন

সমস্যা, তাই না? ভাষা নিয়ে যে সমস্ত নৃতত্ববিদরা মাথা ঘামান তাঁদের অনেকেরই বক্তব্য নীরব হেসে প্রত্যুত্তর দেওয়াটাই সব থেকে সেফ অপশন, অভদ্রতাও হল না আবার অত্যধিক এনগেজড হয়ে পড়ারও স্কোপ নেই।  হাসার অপশন থাকাটা নিতান্তই গুরুত্বপূর্ণ  আরেকটি কারণে – আপনার নিজের দেশে কি নিজের শহরে আপনি ভালোই জানেন যে চোখ টেপার অর্থ কি, কিন্তু যে মুহূর্তে অন্য একটা সমাজ, অন্য একটা সংস্কৃতিতে সেই একই ঘটনা ঘটতে দেখছেন তখন আপনার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যটি। সেখানে এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চোখ টেপা, নাকি নেহাতই যান্ত্রিক চোখ পিটপিট করা নাকি একটা ক্যাজুয়াল শারীরভাষ্য সেটা বোঝা দুষ্কর।

জার্মান দার্শনিক হাইডেগারের মতে এই অনিশ্চয়তাই চোখ টেপা প্রক্রিয়াটির সবসেরা বৈশিষ্ট্য, অন্য যে কোনো যোগাযোগের মাধ্যমে কিন্তু এই অনিশ্চয়তা দেখতে পাবেন না। হাইডেগার আর একটি চমৎকার পয়েন্ট তুলে এনেছেন – প্রক্রিয়াটির সঙ্গে বর্তমানের কোনো সম্পর্ক নেই। চোখ টেপা কাজটি বর্তমানে হতে দেখলেও, এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যটি কিন্তু হয় অতীতে হয়ে যাওয়া কোনো ঘটনা অথবা ভবিষ্যৎ-এ হতে চলা  কোনো ঘটনার সঙ্গেই যুক্ত। এবং আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ইতিহাসের জন্ম।  হাইডেগারের কাছে wink এর অর্থ অবশ্য সঙ্কেত, কি ধরণের সঙ্কেত সেটা কিছুটা হলেও অপ্রাসঙ্গিক। শব্দ  সাজিয়ে বাক্য গঠন যেদিন থেকে শুরু করেছি, মৌখিক ইতিহাসের শুরুও সেদিন থেকেই (লিখিত ইতিহাস আসবে আরো পরে) – কিন্তু সঙ্কেত যেহেতু শব্দেরও আগে এসেছে, তাই মৌখিক ইতিহাসের আগের ইতিহাস লুকিয়ে আছে ওই চোখের চাহনিতেই।

নিল ম্যাকয়ের কাছে অবশ্য এ সঙ্কেত শুধুই আশার প্রতীক। হোক, তাই হোক। প্রিয় পাঠক, পরের বার কেউ চোখের ইশারায় যোগাযোগ করতে চাইলে ভেবড়ে যাবেন না, দেখলেন তো ইতিহাস, র‍্যোমান্স, আশা-আকাঙ্খা কোনটা জড়িয়ে নেই!