ফ্রয়েড এবং ইঁদুর-মানুষ

“অবসেশন প্রফেসর, অবসেশন আমাকে শেষ করে দিচ্ছে”।

“দিনে কতবার আপনি চেক করেন গ্যাস বন্ধ আছে কিনা?”

“ওই তো করি, সারাক্ষণ। শুধু কি গ্যাস, বাড়ি থেকে বেরনোর আগে প্রত্যেকটা ঘরে গিয়ে দেখি আলোর সুইচ অফ করেছি কিনা; রাত্রে ঘুমোতে পারি না যতক্ষণ না প্রত্যেকটা ঘরের খাটের নিচে গিয়ে দেখে আসি……”

“খাটের নিচে কি দেখেন”?

“কেউ লুকিয়ে আছে কিনা। জানেন সারাক্ষণ মনে হয় খাটের নিচে কেউ লুকিয়ে, আমি না দেখলেই রাত্রের অন্ধকারে চুপি চু্পি বেড়িয়ে বাবার ঘরে যাবে সে, আর তারপর তারপর………বাবার চিৎকারে আমি ঘুমোতে পারি না রাতে। উঠে পড়ি, আবার দেখতে যাই………এই চলে সারা রাত”।

ফ্রয়েড একটু আশ্চর্য হয়ে তাকালেন, “কিন্তু……”

“না শুধু বাবার চিৎকারেই যে ঘুম ভেঙ্গে যায় তা নয়, হেলেনকেও দেখি। বড্ড ভয় পেয়ে গেছে, দেখতে পাই একটা সরু নোংরা গলি দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে আসছে………আরো সামনে এলে দেখি হেলেনের সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছে, ডান চোখটা যেন কে খুবলে নিয়েছে। আর আমি যতই ওর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি,পারি না।”

“কেন পারেন না? কেউ আপনাকে আটকে রাখে?”

কাউচের ওপরে যে তরুণটি শুয়ে ছিলেন এতক্ষণ, তিনি এবার উঠে বসলেন “আমি জানি না প্রফেসর, ঠিক ওই সময়েই ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। সব মনে করতে পারি খালি কে যে আটকে রেখেছে সেটাই মনে করতে পারি না। কিছুতেই মুখটা ভেসে ওঠে না।”

ফ্রয়েড নিজের নোটসের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এবার মুখ তুলে বললেন “সামনে সপ্তাহে আর একবার বসি আমরা?”

তরুণটি একটু হতাশ হয়ে মাথা নাড়লেন, “ঠিক আছে……কিন্তু আজকে কি কিছুই বলতে পারবেন না?”

“না, তবে আমার একটা শেষ জিজ্ঞাস্য আছে। আপনার বাবার শরীর কেমন আছে আজকাল?”

অতি বিস্ময়ে চোখমুখ কুঁচকে গেল তরুণ উকিলটির, “কি বলছেন! আমি তো প্রথম দিনেই আপনাকে  জানিয়েছি আমার বাবা মারা গেছেন, বেশ কয়েক বছর হল”।

ফ্রয়েড নোটবুকে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বললেন “আহ, ঠিকই! কেন জানি কথাটা ভুলে গেছিলাম”।

আজকে আরনস্টকে আরো দুর্বল দেখাচ্ছে। মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন, “অবস্থা ক্রমেই আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে হের ফ্রয়েড, আজকে কোর্টেও আমি চিৎকার শুনতে পেয়েছি, বাবা আর হেলেন দুজনেরই। আর ঠিক ওই সময়েই আমি জেরা চালাচ্ছিলাম, সে জেরা আর শেষ করা গেল না”।

ফ্রয়েড হাতে একটা সিগার নিয়ে পায়চারি করছিলেন, এবারে আরনস্টের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন, “আচ্ছা, আপনার ঘনিষ্ট বন্ধু কেউ আছে?”

আরনস্ট দুদিকে মাথা নাড়লেন।

“কোনোদিনই কি আপনার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল না?”

আবারো সেই নেতিবাচক ঘাড় নাড়া, “বন্ধু আমার কোনো কালেই ছিল না বিশেষ। তবে শেষবার যখন যুদ্ধে যাই তখন এক লেফট্যানেন্টের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ওর কাছে আমার কিছু ধার ছিল, ধার শোধের তাগিদ যাতে না আসে সেই ভয়ে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলাম। সেরকম ধরলে আমার জীবনে ওই প্রথম ঘনিষ্ঠ বন্ধু”।

“কিরকম ছিলেন আপনার লেফট্যানেন্ট বন্ধু?”

“কিরকম আর হবে, সেরকম খাস কিছু মনে পড়ছে না। তবে হ্যাঁ, বেশ গল্প বলতে পারত, অদ্ভুতুড়ে মজার সব গল্প।”

“মনে আছে কোনো গল্প?”

“নাহ, একটা গল্পের শেষটুকু মনে আছে খালি”।

” আচ্ছা, সেটাই বলুন”

আরনস্টের মুখে একটু হাসি ফুটে উঠল, “বিপক্ষের সৈন্যরা ধরা পড়লে জানেন তো তাদেরকে নানাপ্রকারে অত্যাচার করা হয় মুখ খোলানোর জন্য। আমার বন্ধুটি বহুবার টর্চার চেম্বারে গেছে, বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলল সব সেরা টর্চারটির খবর বিশেষ কেউ জানে না। কিছুই না, একটা ছোট ইঁদুর ধরে গুহ্যদ্বারে ছেড়ে দিতে হবে; সে নাকি দেখার মতন দৃশ্য, মিনিটের মধ্যে সব খবর বেরিয়ে যায়”।

ফ্রয়েড নির্নিমেষে তাকিয়ে ছিলেন, “গুহ্যদ্বারে?”

আরনস্ট মাথা নাড়ল।

“ইঁদুর?”

“হ্যাঁ”

ফ্রয়েড চিন্তাচ্ছন্ন মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “আর আপনি কি বলতেন তাকে? টর্চার চেম্বারের গল্পই?”

তরুণটি স্মিতমুখে বলল, “না না, আমি গল্প বলতে পারি না। আর জীবনে কখনো টর্চার চেম্বারে যাইওনি। এমনিই কিছু সুখদুঃখের কথা হত।”

“যেমন?”

আরনস্ট হঠাৎ যেন ইলেকট্রিক শক খেয়ে বসল, “নাহ, কিচ্ছু মনে পড়ছে না। কবেকার কথা, কিছু মনে নেই।”

ফ্রয়েড এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আরনস্টের দিকে।

তরুণটি উশখুশ করতে করতে উঠে দাঁড়াল, “হের ফ্রয়েড, আমি আজকে আসি। শরীরটা বড় খারাপ লাগছে।”

আরনস্টের কপাল দিয়ে সত্যিই দরদর করে ঘাম ঝরছে, মুখটা আরো পাংশুবর্ণ হয়ে উঠেছে। বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে ফ্রয়েড ডাকলেন, “আরনস্ট!”

অত্যন্ত চমকে ঘুরে তাকাল আরনস্ট, হয়ত ফ্রয়েড বলবেন “লুকনোর চেষ্টা কোরো না, আমি জানি তুমি কি গল্প করতে”। কিন্তু না, ফ্রয়েড সেসবের দিকে গেলেন না। শান্ত স্বরে বললেন, “পরের বার যখন তোমার বাবার চিৎকার শুনবে বা হেলেনকে দৌড়ে আসতে দেখবে, তখন কে তোমাকে ধরে রেখেছে সেটা দেখার জন্য সামনে বা পেছনে তাকিও না। নিচের দিকে দেখার চেষ্টা কোরো।”

পরের দিক বিকালে ফ্রয়েড নিজের স্টাডিতে লেখালেখি করছিলেন। এমন সময় বিদ্যুৎগতিতে আরনস্ট এসে ঢুকল, আর তার পেছনে পেছনে হাঁ-হাঁ করতে করতে হাউসকিপার ফ্রলাইন হ্যাস্পেল। ফ্রয়েড উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে বললেন, “বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে আমি কারোর সঙ্গে দেখা করি না আরনস্ট, আর অনধিকার প্রবেশ ব্যাপারটাও আমার ঠিক পছন্দ নয়।”

“অনুগ্রহ করুন প্রফেসর, আমার অনেক কিছু বলার আছে, অনেক। আমি দেখতে পেয়েছি শেষমেশ, বীভৎস ব্যাপার। আমাকে বলতেই হবে”।

“না, ফ্রলাইন হ্যাস্পেল – ওকে নিচে নিয়ে যান আর সেক্রেটারিকে বলুন আরনস্টকে ঠিক এক সপ্তাহ পরে একটা  অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে।”

আরনস্ট অত্যন্ত মুষড়ে পড়েছিল, সিঁড়ি দিয়ে ওকে নেমে যেতে দেখতে দেখতে অস্ফুটে বললেন, “এই একটা সপ্তাহ দরকার ছিল আরনস্ট, ঘুমের জন্য।”

এক সপ্তাহ পর আরনস্ট এসেছিল, অনেক ঝরঝরে চেহারায়। তিন ঘন্টার এক লম্বা সেশনে স্বীকার করেছিল ছোটো থেকেই তার মাথার মধ্যে বাবার মৃত্যুচিন্তা ঘুরপাক খেত, ধনী বাবার অকালমৃত্যু আরনস্টকে অল্প বয়সেই কতটা অর্থবান করে তুলতে পারে সে নিয়ে ডে-ড্রিমিং এর শেষ ছিল না। অবশ্য অনুশোচনাও আসত তার ঠিক পরে পরেই  কিন্তু সে অনুশোচনা থামাতে পারেনি এ দিবাস্বপ্নকে।

ফ্রয়েডের দিকে তাকিয়ে কাতর গলায় বলেছিল, “কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি মন থেকে কোনোদিন চাইনি আমার বাবা মারা যান। বাবার সত্যি অকালমৃত্যুতে আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম “।

“জানি  আরনস্ট আর এও জানি এ দিবাস্বপ্ন যদি সত্যি কারোর ক্ষতি করে থাকে তবে সে হল তুমি। তোমার এই গিল্ট তোমাকে তিলে তিলে শেষ করার দিকে নিয়ে গেছে। আর তাই সারাক্ষণ তুমি  দেখতে পাও তোমার বাবার ঘরে ঢুকে কে যেন অত্যাচার করছে, পড়ে থাকছে তাঁর রক্তাক্ত মৃতদেহ”।

“কে যেন নয় প্রফেসর, কি যেন!”

“হ্যাঁ, আর তুমিও জান সেটি কি। টর্চার চেম্বারের বীভৎসতা তোমার মনে দাগ কেটে গেছে, সাবকন্সাসে তুমি জান কিন্তু সেই প্রায় পরাবাস্তব অভিজ্ঞতা এতই ভীতিপ্রদ তুমি তাকে অস্বীকার করে এসেছ। কিন্তু যেদিন থেকে দেখতে পেরেছ অসংখ্য ইঁদুর কিলবিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে তোমার পায়ের কাছে, তোমার শরীরের আনাচে কানাচে উঁকি মারছে তাদের হিলহিলে শরীর, তাদের হলদে গোলাপী থাবা ছোট ছোট দাগ ফেলে যাচ্ছে তোমার নিম্নাঙ্গে সেদিন থেকে এটাও দেখতে পেরেছ যে তোমার বাবা আর হেলেন দুজনকেই খুবলে খাচ্ছে সেই একই ইঁদুরের দল। তোমার অবচেতনায় তাই ইঁদুররা ইঁদুর নয়, তারা আরনস্ট।”

“কিন্তু হেলেন কেন, কেন হেলেন?”

“এখানে দুটো ব্যাপার আছে আরনস্ট। প্রথমত,  তুমি তো তোমার বাবাকে ভালইবেসেছ, তাই না? দিবাস্বপ্ন নেহাতই দিবাস্বপ্ন, সেটা কিন্তু তোমার প্রকৃত অনুভূতিগুলোকে বদলে ফেলে না। রাত্রির দুঃস্বপ্ন কিন্তু এসেছে সেই ভালোবাসার মানুষের ইনসিকিওরিটির কারণেই, তোমার সব থেকে কাছের মানুষকে তুমি নিরাপত্তা দিতে পারছ না। হেলেন-ও দুঃস্বপ্নে এসেছে সেই একই কারণে, সেও তোমার অত্যন্ত কাছে মানুষ। নিরাপত্তাহীনতা কখন যেন তোমার বাবাকে ছাড়িয়ে গ্রাস করে নিয়েছে তোমার বাকি কাছের মানুষদের-ও।

আর একটা কারণ-ও আছে অবশ্য। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি যে হেলেন বেশ নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে, তোমাদের অর্থপ্রাচুর্যের পাশে তাদের অর্থসঙ্গতির কোনো তুলনাই চলে না। তোমার বাবা চিরকাল চেয়ে এসেছেন তোমারও বিয়ে হোক কোনো বিত্তশালী পরিবারে, ঠিক যেমন পরিবার থেকে এসেছেন তোমার মা। এই কনফ্লিক্ট নিয়ে তুমি পূর্ণ মাত্রায় সচেতন ছিলে আর বারেবারেই তোমার মনে হয়েছে হেলেনকে পছন্দ করে তুমি তোমার বাবাকে অমান্য করছ, আর একই সঙ্গে অন্যায় করছ হেলেনের সঙ্গেও। সেই অপরাধবোধ থেকেই বারে বারে দেখেছ হেলেনকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে ইঁদুরের দল, কিন্তু তুমি কিছুই করতে পারছ না। করতে পারছ না নাকি করতে চাইছ না সেটা বড় ব্যাপার নয় এখানে, তোমার ইনভলভমেন্টটাই বড় কথা।”

ম্লান হেসেছিল আরনস্ট কিন্তু অনেক চাঙ্গা লাগছিল তাকে। বহু ধন্যবাদ দিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেছিল ফ্রয়েড তাকে জীবনের সব থেকে বড় দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি দিয়েছেন।

পাঁচ বছর পর আবার আরনস্টের খোঁজ পেয়েছিলেন ফ্রয়েড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন শত্রুর গুলিতে মারা যায় সে।

ট্রেঞ্চের মধ্যে একা পড়েছিল আরনস্ট আর কি আশ্চর্য, তার লাশের পাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল কয়েকটা ইঁদুর।

(ফ্রয়েড কেসফাইলস ১)

sigmund-freud

Advertisements