হালুয়ানামা

বহু বাঙ্গালী বাড়ির মতন আমাদের বাড়িতেও বলা হত সুজি; হালুয়া কথাটা ঠাকুমা বা মা কারোর মুখেই শুনিনি। যাঁদের কাজ ছিল মূলত খাওয়া তাঁদেরকেও সুজির বাইরে কিছু বলতে শুনিনি। কদাচিৎ অন্য বাড়িতে হালুয়া বা সময় সময় মোহনভোগ শুনেছি। সুজি বা ইংলিশে যাকে বলি সেমোলিনা সেটি বাদ দিয়েও যে হালুয়া হতে পারে এ তথ্যটি অবশ্য জেনেছি অনেক বেশী বয়সে। তবে হালুয়ার জন্মস্থানে (যদিও উচ্চারণটা সেখানে হেলভা) এসে ইস্তক এ খাদ্যদ্রব্যটি নিয়ে জ্ঞান লাভ হয়েছে বিস্তর। হেলভা শব্দটি কিন্তু এসেছে আবার আরবী হালওয়া শব্দ থেকে, যেটির মানে হল যে কোনো রকমের মিষ্টান্ন। বাংলায় যেমন আমরা মিষ্টি বলতে সন্দেশ, রসগোল্লা থেকে শুরু করে খাজা, লবঙ্গলতিকা প্রায় সবই বুঝি কতকটা সেরকম। মুশকিল হল তুর্কী হালুয়ার আবার ভ্যারাইটি এতই বেশী যে পন্ডিতেরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সব কিছুইকেই হালুয়া বলা উচিত হবে কিনা।

যেমন ধরুন ফ্রেঞ্চ ভাষাতাত্বিক অ্যান্টন গালান্ড জানিয়েছেন অটোমান সুলতান চতুর্থ মেহমেদের বিশাল সৈন্যবাহিনী যখন পোল্যান্ড জয় করতে চলেছে (সময়টা ১৬৭২) তখন তাদের সঙ্গ দিয়েছিলেন এক রসিক ব্যক্তি, সাদা বাংলায় যাঁকে অবশ্য বলতে হয় ভাঁড়। তো এই ভদ্রলোক পথিধারে উপস্থিত দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য নিজের দাড়ি এবং পোষাকে আচ্ছা করে হালুয়া মেখে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, আরো উৎকটরস যোগানের অভিলাষে নিজের পশ্চাতদেশ থেকে মুঠো মুঠো হালুয়ার তাল বার করে তাই ছুঁড়ে মেরেছেন দর্শকদের দিকে। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে এ হালুয়া ভয়ঙ্কর রকম চটচটে। কিন্তু সেই একই দেশে আবার পাওয়া যেত গেজিলার হেলভা, যার আক্ষরিক বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায় যোদ্ধাদের হালুয়া। এ হালুয়া নাকি এতই শক্ত এবং দুষ্পাচ্য যে যিনি এ হালুয়া হজম করে উঠতে পারবেন তিনিই প্রকৃত বীর। এবং শুধু তাই নয়, যুদ্ধে নিহত কমরেডদের স্মরণে এই হালুয়াই বানানো হত, হয়ত মৃত্যুচেতনার একটা আভাস দিতেই।

কিন্তু এসব হচ্ছে কমনারসদের খাবার। হালুয়া নিয়েই যখন কথা হচ্ছে, তুর্কী সুলতানরা কিরকম হালুয়া খেতেন সে নিয়ে দু’চার কথা না বললে জীবন বৃথা। প্রথমেই বলা যাক বেয়রাম হেলভার কথা – বেয়রাম হল গিয়ে তুরস্কের স্যাক্রিফাইস ফীস্ট (ফেসবুকে আমার এক নব পরিচিত বন্ধু আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন বেয়রামের সময় ইস্তানবুলে এলে রক্তাক্ত রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে হবে কিনা সেই ভেবে, তিনি জেনে আশ্বস্ত হয়েছেন যে বহু বছর ধরে ইস্তানবুলের রাস্তায় কুরবানি নিষেধ)। তো উৎসবের হালুয়া বলে কথা, ইনগ্রেডিয়েন্টসও তাই অফুরন্ত –  চিনি, ঘি, মধু, দুধ, বাদাম, গোলমরিচ কি নেই! এক সুলতান হুকুম দিলেন এর সঙ্গে মজ্জা-সিরাপ আর আখরোট মেশাতে। মজ্জা-সিরাপ শুনে চমকে উঠবেন না, বেসিক্যালি মজ্জাকে মিহি করে কুঁচিয়ে চিনির সিরাপে ঢেলে ক্রমাগত নাড়িয়ে যাওয়া যতক্ষণ না বেশ একটা জেলি-জেলি টেক্সচার আসে। খেতে নাকি বেশ চমৎকার হয়, এবং তুরস্কের দক্ষিণপশ্চিম প্রান্তের শহর বুরদুরে গেলে এখনো এ জিনিসের স্বাদ নিয়ে আসতে পারেন। সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ আবার অর্ডার দিয়েছিলেন রাইস-বিয়ার দিয়ে হেলভা বানাতে। ‘বিজার ফুড’ কি ভাবছিলেন বিংশ শতাব্দীর কনসেপ্ট?

তুরস্কের পাশেই পারস্য, জাফরানের আদি দেশ। সুতরাং, পনেরশ শতকের রেশিদিয়ে হেলভা তৈরী হবে জাফরান দিয়ে তাতে আর আশ্চর্য হওয়ার কি আছে?  বলা বাহুল্য যে এই জাফরানি হালুয়াও তৈরী হয়েছিল এক সুলতানের রসনা নিবৃত্তিতে তবে জাফরানের দাম যত বেড়েছে, রেশেদিয়ে হালুয়াতে এর পরিমাণও আস্তে আস্তে কমে এসেছে। এখন খেতে চাইলে স্বপ্নে ঘি থুড়ি জাফরান ঢেলেই খেতে হবে, তবে হালুইকররা একেবারে নির্দয় নন, তাই ছিটিয়ে দেবেন গোলাপজল, সঙ্গে এলাচ আর লবঙ্গ-ও পেয়ে যাবেন। হালুয়ারহস্য যত জানবেন ততই বুঝবেন যে আদত সুলতানী খাবার বলে যদি কিছু থেকে থাকে তো সে এই হালুয়াই। যোদ্ধা হালুয়া শুনে যিনি আঁতকে উঠেছিলেন, তিনিই আবার নিশ্চিন্ত হতে পারেন এই জেনে যে লব-ই-দিলবর হালুয়াও আছে – যার আক্ষরিক অর্থ প্রেয়সীর ঠোঁট। শুধু নাম নয়, আকারটিও দেওয়া হত সেরকমই। আর তার রসিক প্রস্তুতকারকরা সেখানেই থামলেন না, এ হালুয়ার মূল উপাদানটি করে রাখলেন মধু! মশকরাটা ভাবুন একবার। কিন্তু সারাদিনের শেষে ঘাম জবজবে জামায় যখন রবীন্দ্র সদন আর ভবানীপুরের মাঝের টানেলে আটকে আছেন, জানেন না মেট্রোর দরজা কখন খুলবে, তখন যদি অন্তত এটুকু জানতেন যে বাড়ি ফিরেই পাবেন লাল টুকটুকে লব-ই-দিলবর (আহা, নামটিও বড় খাসা) তখন হাফিজকে স্মরণ করে আপনিও কি  বলে উঠবেন না  ” হাফিজ ফিরে উঠে দাঁড়ায়, অন্ধকারের পাড় ঠেলে / ঘনিয়ে যায় সেই যেখানে চুম্বনেরই ঠোঁট মেলে”  (যারা শামসুল হকের অরিজিন্যাল ট্রানস্লেশনটি পড়েছেন তাঁরা ক্ষমা করবেন চুম্বনের পরে ওই এক্সট্রা ই-টির জন্য )।  নিজের কথা ফিরিয়ে নিলাম, মশকরা নয়, খাঁটি রোম্যান্টিসজিম।

তবে কিনা এখানেও একটি আয়রনি আছে, যেটা এতক্ষণ চেপে গেছিলাম। এ হালুয়া প্রথম পরিবেশিত হয় অটোমান রাজপ্রাসাদের বিশাল ব্যাঙ্কোয়েট হলেই। উপলক্ষ্য? আবার কি, যুদ্ধজয়! এবারে তেনারা গ্রীসের রোডস আইল্যান্ড জয় করে ফিরেছেন। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলছেন কি? আমিও।  দিগ্বীজয়ীদের দেশ, প্রোটিনের ছড়াছড়ি চারদিকে। সুতরাং, হালুয়াতেও যে শ্রেডেড চিকেন ব্রেস্ট পড়বে তাতে আর আশ্চর্যের কি? এ হালুয়ার নাম মেমুনিয়ে, প্রথম তৈরি হয় সেই ১৪৩০ সালে। সে হালুয়া আবার গোল গোল করে বলের আকারে বানানো হত। সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ বোধহয় মিটবল আর হালুয়ার তফাত বুঝতে না পেরে কিছু বছর পর থেকেই ব্যাঙ্কোয়েটের মেমুনিয়েতে মাংস দিতে বারণ করে দেন। থ্যাঙ্ক ইউ সার।

তবে সবার সেরা হালুয়া হল হেলভা হাকানি, আক্ষরিক অর্থই হল রাজকীয় হালুয়া। রাজারা খেতেন বলে নয়, হালুয়াদের রাজা বলে। ইনগ্রেডিয়েন্টস সব মোটামুটি এক, কিন্তু এখানে আছে পহলে দর্শনধারীর গল্প। খেজুর, গোলাপ, রাজপ্রাসাদ কতরকমের শেপেই যে একে বানানো হত, সঙ্গে আলাদা করে সার্ভ করা হত ফ্রেশ ক্রীম।  হালুয়ার জেনারল টেক্সচারটার কথা যদি চিন্তা করেন তাহলে বুঝতে পারবেন গোলাপফুলের শেপে হালুয়া বানানো নিতান্ত সহজ কাজ নয়! আপনাদের ভাগ্যি ভালো, এ জিনিস এখনো কালেভদ্রে এ দেশে তৈরী হয়। হয়ত সেই সব রইস খানদানের জন্য যাদের কাছে কেক এখনো পশ্চিমী ইনভেসন বলে অপাংক্তেয়। যদ্দিন না সেরকম বাড়ি থেকে নেমন্তন্ন আসছে, ছবি দেখেই খুশী থাকুন।

helvai hakani

(ইমেজ সোর্স )

শুরুতেই বলছিলাম সুজি বাদ দিয়েও হালুয়া হতে পারে। সেই সূত্রেই জানাই চালের গুঁড়ো দিয়েও হালুয়া তৈরী হয়েছে।  হুঁ হুঁ , ভাবছেন কি। তার নাম ইশাকিয়ে হেলভা, চালের গুঁড়োর সঙ্গে দুধ আর বাদাম গুঁড়ো মিশিয়ে তৈরি করা হত আর ছাঁচের জন্য ব্যবহার করা হত কফি কাপ। যারা ইশিকিয়ে হেলভা খেয়েছেন তাঁরা দিব্যি গেলে বলেছেন খেলে এর সঙ্গে ইশক হবেই। প্রসঙ্গত বলি টার্কিতে এলে দেখবেন এখানে যে কোনো কাপে আপনাকে কফি দেওয়া হবে না, কফির জন্য রাখা আছে নির্দিষ্ট সাইজ এবং শেপের কাপ। তবে হ্যাঁ, এসব হালুয়া যাকে বলে ফ্যান্সি। এখন যদি কোনো শ্রাদ্ধবাড়িতে যান বা শোকসভা, সেখানে দেওয়া হবে কিন্তু সোল ফুড হালুয়াই, এবং সেটি তৈরি হবে ওই সুজি দিয়েই।

এতসব হালুয়ার মধ্যে কটা আদৌ খাওয়া হয়ে উঠবে সে নিয়ে সন্দেহ আছে তবে টার্কি যখন আসবেন (আসবেন তো বটেই) তখন কিন্তু রাস্তার পাশের ফাস্ট ফুড সেন্টার থেকেও এদের সেমোলিনা হেলভা খেতে ভুলবেন না। নানা দোকানে হেলভা বার-ও পাবেন কিন্তু তার কথা বলছি না।  এ দেশের ডেজার্ট এমনিতেই মনোহরা আর তার মধ্যে বেসিক সেমোলিনা যেন সবাইকে ছাপিয়ে গেছে। ডোম শেপের গরম হালুয়াতে (তার সর্বাঙ্গে আবার পেস্তাকুচি আটকানো, ওপরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আস্ত আখরোট) যখন আস্তে করে ছোট্ট চামচের একটা ঘা বসাবেন, আর অবাক হয়ে দেখবেন ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে প্রাণ জুড়িয়ে দেওয়া ঠান্ডা আইসক্রীমের লাভা, তখন পাঠক সাড়ে বত্রিশ ভাজাকে একবার স্মরণ করবেন।

dugun_helvasi_610

(ইমেজ সোর্স)

তথ্যঋণ :  শেরবত অ্যান্ড স্পাইস – মেরি ইশিন (২০১৩)

পুনশ্চ – মিষ্টিখোর বাঙ্গালী, তাই নোনতা সুজি আই মীন হালুয়া নিয়ে কিছু লিখলাম না যদিও খেতে খারাপ লাগে না। আর তারপরেও বাই চান্স যদি তার তরে আপনার প্রাণ কেঁদে ওঠে, বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের সেই আদি অকৃত্রিম  পাক-প্রণালীর রেসিপি দিয়ে দিলাম।

সুজি –  এক পোয়া, জল – দেড় ছটাক, দুগ্ধ – দেড় পোয়া, ডিম্ব – দুইটা

”সুজিগুলি জলে ভিজাইয়া তাহাতে ক্রমে দুগ্ধ ঢালিয়া ডিম্ব দুইটার কুসুম ও এক চা চামচ লবণ মিশাইয়া লইবে। তাহার পর একখানি তাওয়ায় কিঞ্চিৎ ঘৃত মাখাইয়া ডিম্ব দুইটির শ্বেত ভাগ উত্তমরূপে ফেটাইয়া তাওয়ায় ঢালিয়া দিবে। পরে তাহাতে সুজি ও দুগ্ধ ঢালিয়া একখানি পরিষ্কার নেকড়া ঢাকা দিয়া সওয়া ঘন্টা কাল সিদ্ধ করিয়া নামাইয়া লইবে।”

বুঝেছ পাঠক – কেন হালুয়া নিয়ে লিখতেই হত?  pegatina-vinilo-smiley-wink

 

Advertisements