ওঃ, ডেভিড!

ফ্লোরেন্স বলতে গেলে বেশ ছোটোই শহর, পায়ে হেঁটেই ঘুরে ফেলতে পারেন পুরোটা। অতএব রবিবারের অলস  বারবেলায় গুটি গুটি হাঁটছেন আর ভাবছেন স্প্যাগেটি, লাসানিয়া, রাভিওলি, নচি, রিগাতোনিদের খপ্পর থেকে ফাইনালি কবে বেরোতে পারব। বাঙ্গালী মুখে কি আর অত চীজ পোষায় রে বাপু, তাও সাতদিন দুবেলা ধরে?  কিন্তু বিধি বাম, ফ্লোরেন্স রোম কি মিলান নয় যে এথনিক ফুডের বাড়বাড়ন্ত দেখতে পাবেন। পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর যে বাংলাদেশী ভাইয়েরা  এসে আপনাকে প্লাস্টিকি অ্যামিবা (একে থপ করে মাটিতে ছুঁড়ে  ফেললেই  অবশ্য চোখ নাক শুদ্ধ একটা  চেহারা আস্তে আস্তে উঠে আসবে) কি গোলাপ ফুল কি পায়রার দানা গছানোর চেষ্টা করছেন তাঁদেরকে শুধিয়েও বিশেষ লাভ হচ্ছে না, এক যদি না তাঁদের ডেরায় গিয়ে সোজা হাজির হন।  এমন সময়ে প্রায় দৈববাণীর মতন শুনলেন এক ফ্লোরেন্সিয়ান তাঁর সদ্য পরিচিত আমেরিকান বন্ধুকে বলছেন – পাস্তা, পিৎজা খেয়ে মুখে চড়া পড়ে গেলে সামনের স্কোয়ারটা পেরিয়ে ডান দিকে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই দিদিমা ভরসা, লা জবাব ইটালিয়ান কারি করে খাওয়াবেন। আমেরিকানটি অফ কোর্স ডমিনো’জ, পাপা জনের দেশের মানুষ; তা ছাড়া বিশ্বাস করেন হোয়েন ইন রোম, বিহেভ লাইক আ রোম্যান – তাই ইটালিতে কারি খাওয়া ঘোরতর অপরাধ। আপনার অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে কান খাড়া, আমেরিকানটি সামনের স্কোয়ার না টপকালেও আপনি কিন্তু দিদিমার কারিশপের দিকে হাঁটা লাগিয়েছেন।

ডানদিকে ঘুরতেই একটা সরু গলি, আদ্যিকালের লম্বা টানা বাড়ি দুদিকেই। অগস্টের ভ্যাপসা গরমে হাওয়া খাওয়ার জন্য দোতলা তিনতলায় বিস্তর খড়খড়ি ফাঁক করে রাখা। গলির মধ্যে কিরকম যেন একটা শ্যালদা-শ্যালদা গন্ধ। সে বিভ্রম বাড়িয়ে দিতেই হয়ত চোখে পড়ল গলির মাঝামাঝি জায়গা থেকে একটা বিশাল লাইন, সে লাইন এঁকেবেঁকে চলেছে তো চলেছেই। ঠিক যেন মিত্র ইন্সটিটউশনের (মেন) সামনেই লাইন পড়েছে সায়েন্স ট্যালেন্ট-ম্যাথ ট্যালেন্ট দিতে আসা ছাত্রছাত্রীদের। এখানে অবশ্য ছাত্রছাত্রীদের চোখমুখে টেনশনের থেকে ঔৎসুক্যটাই বেশী, আর এ ভিড়  শুধু টিনএজারদের নয় – সাত থেকে সত্তর সবাই আছেন। স্কুলবাড়ি স্কুলবাড়ি দেখতে বিল্ডিংটায় আছে কি? লাইনের সামনে যিনি একসঙ্গে দা ভিঞ্চির ভিট্রুভিয়ান ম্যান, বত্তিচেল্লির বার্থ অফ ভেনাস আর টিনটোরেটোর প্যারাডিসোর প্রিন্ট বিক্রি করছেন তাঁকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসাই করে ফেললেন। তিনি একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে ফিরতি প্রশ্ন করলেন – সেকি কথা! গ্যালারিয়া ডেল আকাদেমিয়ার নাম জানা নেই? নামটা শোনা শোনা লাগছে কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলেন না কোথায় শুনেছেন। যাই হোক, নাম শুনে বোঝা যাচ্ছে মিউজিয়ম কাম আর্ট গ্যালারি; তবে কিনা ইউরোপীয়ান মিউজিয়ম বলতেই যে ডি-লা-গ্র্যান্ডি চেহারাটি চোখের সামনে ভেসে আসে, গ্যালারিয়া ডেল আকাদেমিয়া মোটেই সেরকম নয় – সাধে কি আর দূর থেকে মিত্র ইন্সটিটউশন ভাবছিলেন। কিন্তু লাইনের লোকজনকে দেখে মনে হচ্ছে ল্যুভের সামনে তিনদিন তিনরাত ধরে ইঁট পেতে রেখেছেন সব। বিস্তর কৌতূহল, তাছাড়া জানলেন যে পরের দিন গ্যালারিটি বন্ধ থাকে। সুতরাং, পেট চুঁই চুঁই করলেও লাইনে দাঁড়িয়ে পড়তেই হল। রোম-ফ্লোরেন্স-পিজা-ভেনিস-মিলানের এগারোদিনের ট্যুরে যে রেনেসাঁ আর্টের চোঁয়াঢেকুর উঠবে সে আপনার জানাই কথা, কিন্তু  লাইফচেঞ্জিং এক্সপেরিয়েন্স মিস করে যাওয়ার ভয়ও বড় দায়।

GDA

সরু গলিতে ঘন্টা দুয়েক দাঁড়িয়ে, একবার উলটো ফুটের টিকেট অফিস একবার এ ফুটের চেকিং অফিসে বিস্তর দৌড়োদৌড়ি করে গলদঘর্ম হয়ে ঢুকে তো পড়লেন। সঙ্গে বোধহয় আরো হাজার খানেক মানুষ। তীরচিহ্ন দিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে কোন ঘর থেকে আপনি শুরু করবেন। সেই দেখে দেখে মাপজোক মিলিয়ে ইটালিতে মিলিয়ন্থ টাইমের জন্য দাঁড়ালেন যীশু কাঁখে ম্যাডোনার ছবির সামনে। সেই একাদশ শতাব্দী থেকে শিল্পীরা ভার্জিন মেরির কোলে থাকা যীশুর ছবি এঁকে চলেছেন – সবই দুষ্প্রাপ্য, সবেরই ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম এবং মিউজিয়ম কর্তৃপক্ষরা কাড়াকাড়ি করে সে সব ছবি রেখে দিয়েছেন তাঁদের সংগ্রহে। আপনি অবশ্য মিলিয়নবার বিভিন্ন শেপ ও সাইজের বেবি জেসাসকে (এবং বছরের হিসাবে যত পিছোবেন বেবি জেসাসের মুখে তত বেশী গাম্ভীর্য টের পাবেন) দেখে প্রভুর কাছে মুক্তির আর্জি জানিয়েছেন। যীশুই যখন এসে পড়েছেন তখন ভক্তবৃন্দ বাদ থাকেন কেন? একে একে এসে পড়েছেন সেন্ট ক্যাথরিন, সেন্ট ফ্রান্সিস, সেন্ট বারবারা, সেন্ট ম্যাথিউ। অবশ্য আপনি যে শুধুই ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে থাকলেন তা নয়, ফ্রানচেস্কো গ্র্যানাচির সন্ন্যাসিনী আপনাকে সে সুযোগ দেবেন না।

martyrdom of a female saint

কিন্তু প্রথম ঘরটিতে ঢোকা ইস্তক কি যেন একটা খচ খচ করছিল, আপনি টের পেতে পেতেও পাচ্ছিলেন না। এখন যেহেতু সন্ন্যাসিনীকে শহীদ হতে দেখে প্রারম্ভিক উত্তেজনাটা স্তিমিত হয়ে এসেছে, আপনার খেয়াল পড়ল সঙ্গে আরো যে হাজারখানেক মানুষ ঢুকেছিলেন তাদের কারোর টিকির দেখা মিলছে না। আপনি একটু ভ্যাবাচাকা খেলেন, তারপর এসি ঘরের আরামের চৌহদ্দিতে সত্যিই কারোর দেখা না পেয়ে একটু চিন্তিতই হয়ে পড়লেন। কিছু কি ভুল করলেন? ভুল ঘরেতে ঢুকে পড়েছেন? আদৌ গ্যালারিয়াতে ঢোকেনইনি? কি মুশকিল! তড়িঘড়ি করে ছুটলেন ডানদিকে, যদিও তীরচিহ্ন বলছে এরপর আপনার বাঁ দিকে এগিয়ে ‘Dispute over the immaculate conception’ দেখা উচিত। হন্তদন্ত হয়ে ডানদিকে ঘুরতেই এসে পড়েছেন একটা বিশাল হলঘরে, আর……আর… আপনার সেই হাজারো সহযাত্রী (একদিনের সতীর্থ-ও বলা যায়) কে একসঙ্গে দেখতে পেলেন হলঘরের এক কোণায় – নির্নিমেষে চেয়ে রয়েছেন তাঁরা সবাই। আপনিও ততক্ষণে ট্র্যান্সফিক্সড, চোখ ধাঁধানো এই অপার্থিব পুরুষালি সৌন্দর্য তারিফে বিন্দুমাত্র লিঙ্গবৈষম্য ঘটান নি।

IMG_0737

 

এতক্ষণে আপনার মনে পড়েছে মিকেলেঞ্জেলোর (মাইকেল এঞ্জেলো নয়) পৃথিবীবিখ্যাত ভাস্কর্য ডেভিডের জন্যই গ্যালারিয়া ডেল আকাদেমিয়ার নাম আপনি শুনেছিলেন। সেই ডেভিড, নিরাবরণ ডেভিড এ মুহূর্তে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে; আপনার দিকে অবশ্য তাকানোর ফুরসত নেই তার। একটু পরেই শুরু হবে গোলিয়াথের সঙ্গে মহারণ, সেই অসম যুদ্ধে কি হবে তা আপনি জানেন, আমি জানি কিন্তু ডেভিড এখনো জানে না। চোখ উত্তেজনার সামান্য আভাস, বাঁ হাতে লুকিয়ে রয়েছে গুলতি, অস্বাভাবিক বড় ডান হাতের মুঠোয় ধরা আছে পাথর – বাঁদিকে তাকিয়ে রয়েছেন ডেভিড শত্রুর প্রতীক্ষায়। রেনেসাঁর স্বর্ণযুগেও এহেন পাথর-ছেনা কাজ স্তম্ভিত করে দিয়েছিল তাবৎ শিল্পীসমাজকে, সাধারণ মানুষের কথা না ধরাই ভালো। ডেভিডের ছবি অবশ্য তার কয়েকশ বছর আগে থেকেই ইটালিয়ান শিল্পীরা আঁকতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু সে ছবি জয়োদীপ্ত বীরের ছবি যার হাতের মুঠোয় ধরা থাকত কিম্বা পায়ের তলায় লুটোত গোলিয়াথের ছিন্ন শির। মিকেলেঞ্জেলো সেই ট্র্যাডিশনাল ছবিটিকে শুধু বাস্তব নয়, দর্শকের অবচেতন থেকেও সরিয়ে দিলেন ডেভিডের এই নতুন অবতারে। কিন্তু বাইবলীয় আখ্যানকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার জন্য নয়, ডেভিডকে পাঁচশ বছর ধরে মানুষ মনে রেখেছেন অদম্য যৌন অবদানের জন্যও।

আর তাই আপনার চতুর্দিক থেকে, থেকে থেকে ট্যুর গাইডদের কাছে দর্শকদের কাতর প্রশ্ন শুনতে পাচ্ছেন – প্লীজ বলুন না, আসল মডেলটি কে? গাইডরা যতই স্মিত হেসে বলুন সত্যিকারের কোনো মডেল ছিল না, দর্শকরা সে কথা থোড়াই মানেন। সত্যি কোনো মডেল না থাকলে পাথরে এত নিখুঁত করে শিরা ফুটিয়ে তোলা যায়?

D1

নাকি হাঁটুর মাংসপেশী হয়ে ওঠে এত জীবন্ত?

D2

গোড়ালিটাই বা এত সুঠাম করে বানানো যায়  কি করে?

D3

গাইড মাথা নাড়তে থাকেন – কি বলব বলুন, ধরে নিন  মিকেলেঞ্জেলো ঈশ্বরের বরপুত্র ছিলেন। রেনেসীঁয় ভক্তির খাসমহলে দাঁড়িয়েও দর্শকরা মেনে নিতে পারেন না এহেন মিরাকল তত্ত্ব। কয়েকজন এতই বিমর্ষ হয়ে পড়েন যে পিছন দিক থেকে ঘুরে যেতে ভুলে যান। আপনি অবশ্যই সে বান্দা নন, আপনি যাবেন এবং সোৎসাহে বলে উঠবেন – ফুঃ, কোথায় লাগে ব্র্যাড পিট।

D4

এত অ্যাথলেটিক চেহারা দেখেও আপনার অবশ্য ইনফিয়রিটি কমপ্লেক্স দেখা দেয়নি , বরং চতুর্দিকে বিজাতীয় ভাষায় আফশোস শুনে একটু বিরক্তই হয়েছেন ডেভিডকে এরা শুধু মডেল বানিয়ে রেখেছে দেখে। ডেভিড তো স্বাধীনতার-ও প্রতীক, প্রতীক সেই সব স্বাধীনচেতা মানুষদেরও যারা ফ্লোরেন্সের অটোক্র্যাটিক রাজপরিবারকে উৎখাত করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। বাইবলে বর্ণিত সেই কিশোর মেষপালকের সঙ্গে তাই আদতে এই ডেভিডের মিল খুব নগণ্যই, গল্পটুকু শুধু খাড়া করা হয়েছিল হয়ত  চার্চকে সন্তুষ্ট করতেই। গুলতি-পাথর নিয়েও ডেভিডের লক্ষ্য তাই শুধু গোলিয়াথ বধ নয়, স্বাধীনচেতা মানুষের প্রাপ্য মর্যাদাটুকু ফিরিয়ে আনার।পাশ থেকে আবার গাইড ফিসফিস করে কন্সপিরেসি থিয়োরী ফাঁস করার কায়দায় জানিয়েছেন ডেভিডের চোখ কিন্তু রোমের দিকে ফেরানো, সেরকম ভাবেই ভাস্কর্যটিকে রাখা হয়েছে। আর হঠাৎই আপনার মনে পড়ে যাবে  আরেক বীরপুরুষকে, যদিও গল কিন্তু তিনিও জানতেন সব রাস্তাই নিয্যস রোমে যায়। তাই হিচহাইকিং করতে যাওয়ার সময় হাতের বুড়ো আঙ্গুলের ডিরেকশন ঈশান হোক কি নৈঋত, কোনো একটা দিকে থাকলেই হল – মনে পড়ছে?

 

শেষবারের মতন   অপাঙ্গে দেখে নিতে গিয়ে আপনার নজরে পড়বে সিল্কি চুলের সেই ইস্ট এশিয়ান জুড়িকে যারা নিজেদের সেলফি তুলতে ব্যস্ত। এ সেলফি অবশ্য যেমন তেমন সেলফি নয়,  তোলার জন্য  কসরত দরকার  –  চোদ্দ ফুটের ডেভিডের বিশেষ  বডিপার্টটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে ছবি তুললেই তো হবে না, মুখের সঙ্গে নিজেদের  টি- শার্টের ছবিটিকেও নিয়ে আসতে হবে যে। ছবির নিচেই সেখানে জ্বলজ্বল করছে – Wow, David!

Wow? বিলক্ষণ!

 

Advertisements

3 thoughts on “ওঃ, ডেভিড!

  1. Moumita says:

    সাড়ে বত্রিশ ভাজার সব লেখাই আমার বেশ ভালো লাগে। কিন্তু এইটা যেন সবকটাকে ছাপিয়ে গেছে রে।
    লেখ। তোর চোখ দিয়ে ডেভিড কে চাক্ষুষ করে এত আনন্দ পেলাম যে বলার নয়। এমন জব্বর লেখা যে কৌতুহলী হয়ে সেই থেকে ‘ডেভিড গোলিয়াথ ব্যাটল’, ‘ডেড সী স্ক্রোল ‘, ‘জীউইশ রোমান ওয়ার’, Francesco Granacci ইন্টারনেট ঘেঁটে পড়লাম।
    তুই আরো ঘোর আর আরো আরো লেখ। অনেক আশির্বাদ রইলো।

    হিজি-দি

    Like

  2. হিজি দি – কি আর বলি! নিজের খেয়ালেই ব্লগ লিখতে শুরু করেছিলাম, রেয়ার অকেশন ছাড়া ব্লগ নিয়ে খুব একটা প্রচার-ও করি না (ফেসবুকের বাংলা আড্ডা গ্রুপটায় লিঙ্ক শেয়ার করা ছাড়া)। তার মধ্যেও তোমরা সময় বার করে সাড়ে বত্রিশ ভাজাতে ঢুঁ মারো দেখে বড় আনন্দ পাই।

    Like

  3. আর হ্যাঁ, পোস্ট পড়ে এই এক্সটেন্টে ফলো-আপ করেছ দেখে আরো ভালো লাগল, নলেজ ডিসসেমিনেশনের মতন তৃপ্তিদায়ক কাজ আর কটাই বা হয়!

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s