ফ্রয়েড এবং ইঁদুর-মানুষ

“অবসেশন প্রফেসর, অবসেশন আমাকে শেষ করে দিচ্ছে”।

“দিনে কতবার আপনি চেক করেন গ্যাস বন্ধ আছে কিনা?”

“ওই তো করি, সারাক্ষণ। শুধু কি গ্যাস, বাড়ি থেকে বেরনোর আগে প্রত্যেকটা ঘরে গিয়ে দেখি আলোর সুইচ অফ করেছি কিনা; রাত্রে ঘুমোতে পারি না যতক্ষণ না প্রত্যেকটা ঘরের খাটের নিচে গিয়ে দেখে আসি……”

“খাটের নিচে কি দেখেন”?

“কেউ লুকিয়ে আছে কিনা। জানেন সারাক্ষণ মনে হয় খাটের নিচে কেউ লুকিয়ে, আমি না দেখলেই রাত্রের অন্ধকারে চুপি চু্পি বেড়িয়ে বাবার ঘরে যাবে সে, আর তারপর তারপর………বাবার চিৎকারে আমি ঘুমোতে পারি না রাতে। উঠে পড়ি, আবার দেখতে যাই………এই চলে সারা রাত”।

ফ্রয়েড একটু আশ্চর্য হয়ে তাকালেন, “কিন্তু……”

“না শুধু বাবার চিৎকারেই যে ঘুম ভেঙ্গে যায় তা নয়, হেলেনকেও দেখি। বড্ড ভয় পেয়ে গেছে, দেখতে পাই একটা সরু নোংরা গলি দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে আসছে………আরো সামনে এলে দেখি হেলেনের সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছে, ডান চোখটা যেন কে খুবলে নিয়েছে। আর আমি যতই ওর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি,পারি না।”

“কেন পারেন না? কেউ আপনাকে আটকে রাখে?”

কাউচের ওপরে যে তরুণটি শুয়ে ছিলেন এতক্ষণ, তিনি এবার উঠে বসলেন “আমি জানি না প্রফেসর, ঠিক ওই সময়েই ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। সব মনে করতে পারি খালি কে যে আটকে রেখেছে সেটাই মনে করতে পারি না। কিছুতেই মুখটা ভেসে ওঠে না।”

ফ্রয়েড নিজের নোটসের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এবার মুখ তুলে বললেন “সামনে সপ্তাহে আর একবার বসি আমরা?”

তরুণটি একটু হতাশ হয়ে মাথা নাড়লেন, “ঠিক আছে……কিন্তু আজকে কি কিছুই বলতে পারবেন না?”

“না, তবে আমার একটা শেষ জিজ্ঞাস্য আছে। আপনার বাবার শরীর কেমন আছে আজকাল?”

অতি বিস্ময়ে চোখমুখ কুঁচকে গেল তরুণ উকিলটির, “কি বলছেন! আমি তো প্রথম দিনেই আপনাকে  জানিয়েছি আমার বাবা মারা গেছেন, বেশ কয়েক বছর হল”।

ফ্রয়েড নোটবুকে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বললেন “আহ, ঠিকই! কেন জানি কথাটা ভুলে গেছিলাম”।

আজকে আরনস্টকে আরো দুর্বল দেখাচ্ছে। মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন, “অবস্থা ক্রমেই আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে হের ফ্রয়েড, আজকে কোর্টেও আমি চিৎকার শুনতে পেয়েছি, বাবা আর হেলেন দুজনেরই। আর ঠিক ওই সময়েই আমি জেরা চালাচ্ছিলাম, সে জেরা আর শেষ করা গেল না”।

ফ্রয়েড হাতে একটা সিগার নিয়ে পায়চারি করছিলেন, এবারে আরনস্টের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন, “আচ্ছা, আপনার ঘনিষ্ট বন্ধু কেউ আছে?”

আরনস্ট দুদিকে মাথা নাড়লেন।

“কোনোদিনই কি আপনার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল না?”

আবারো সেই নেতিবাচক ঘাড় নাড়া, “বন্ধু আমার কোনো কালেই ছিল না বিশেষ। তবে শেষবার যখন যুদ্ধে যাই তখন এক লেফট্যানেন্টের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ওর কাছে আমার কিছু ধার ছিল, ধার শোধের তাগিদ যাতে না আসে সেই ভয়ে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলাম। সেরকম ধরলে আমার জীবনে ওই প্রথম ঘনিষ্ঠ বন্ধু”।

“কিরকম ছিলেন আপনার লেফট্যানেন্ট বন্ধু?”

“কিরকম আর হবে, সেরকম খাস কিছু মনে পড়ছে না। তবে হ্যাঁ, বেশ গল্প বলতে পারত, অদ্ভুতুড়ে মজার সব গল্প।”

“মনে আছে কোনো গল্প?”

“নাহ, একটা গল্পের শেষটুকু মনে আছে খালি”।

” আচ্ছা, সেটাই বলুন”

আরনস্টের মুখে একটু হাসি ফুটে উঠল, “বিপক্ষের সৈন্যরা ধরা পড়লে জানেন তো তাদেরকে নানাপ্রকারে অত্যাচার করা হয় মুখ খোলানোর জন্য। আমার বন্ধুটি বহুবার টর্চার চেম্বারে গেছে, বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলল সব সেরা টর্চারটির খবর বিশেষ কেউ জানে না। কিছুই না, একটা ছোট ইঁদুর ধরে গুহ্যদ্বারে ছেড়ে দিতে হবে; সে নাকি দেখার মতন দৃশ্য, মিনিটের মধ্যে সব খবর বেরিয়ে যায়”।

ফ্রয়েড নির্নিমেষে তাকিয়ে ছিলেন, “গুহ্যদ্বারে?”

আরনস্ট মাথা নাড়ল।

“ইঁদুর?”

“হ্যাঁ”

ফ্রয়েড চিন্তাচ্ছন্ন মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “আর আপনি কি বলতেন তাকে? টর্চার চেম্বারের গল্পই?”

তরুণটি স্মিতমুখে বলল, “না না, আমি গল্প বলতে পারি না। আর জীবনে কখনো টর্চার চেম্বারে যাইওনি। এমনিই কিছু সুখদুঃখের কথা হত।”

“যেমন?”

আরনস্ট হঠাৎ যেন ইলেকট্রিক শক খেয়ে বসল, “নাহ, কিচ্ছু মনে পড়ছে না। কবেকার কথা, কিছু মনে নেই।”

ফ্রয়েড এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আরনস্টের দিকে।

তরুণটি উশখুশ করতে করতে উঠে দাঁড়াল, “হের ফ্রয়েড, আমি আজকে আসি। শরীরটা বড় খারাপ লাগছে।”

আরনস্টের কপাল দিয়ে সত্যিই দরদর করে ঘাম ঝরছে, মুখটা আরো পাংশুবর্ণ হয়ে উঠেছে। বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে ফ্রয়েড ডাকলেন, “আরনস্ট!”

অত্যন্ত চমকে ঘুরে তাকাল আরনস্ট, হয়ত ফ্রয়েড বলবেন “লুকনোর চেষ্টা কোরো না, আমি জানি তুমি কি গল্প করতে”। কিন্তু না, ফ্রয়েড সেসবের দিকে গেলেন না। শান্ত স্বরে বললেন, “পরের বার যখন তোমার বাবার চিৎকার শুনবে বা হেলেনকে দৌড়ে আসতে দেখবে, তখন কে তোমাকে ধরে রেখেছে সেটা দেখার জন্য সামনে বা পেছনে তাকিও না। নিচের দিকে দেখার চেষ্টা কোরো।”

পরের দিক বিকালে ফ্রয়েড নিজের স্টাডিতে লেখালেখি করছিলেন। এমন সময় বিদ্যুৎগতিতে আরনস্ট এসে ঢুকল, আর তার পেছনে পেছনে হাঁ-হাঁ করতে করতে হাউসকিপার ফ্রলাইন হ্যাস্পেল। ফ্রয়েড উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে বললেন, “বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে আমি কারোর সঙ্গে দেখা করি না আরনস্ট, আর অনধিকার প্রবেশ ব্যাপারটাও আমার ঠিক পছন্দ নয়।”

“অনুগ্রহ করুন প্রফেসর, আমার অনেক কিছু বলার আছে, অনেক। আমি দেখতে পেয়েছি শেষমেশ, বীভৎস ব্যাপার। আমাকে বলতেই হবে”।

“না, ফ্রলাইন হ্যাস্পেল – ওকে নিচে নিয়ে যান আর সেক্রেটারিকে বলুন আরনস্টকে ঠিক এক সপ্তাহ পরে একটা  অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে।”

আরনস্ট অত্যন্ত মুষড়ে পড়েছিল, সিঁড়ি দিয়ে ওকে নেমে যেতে দেখতে দেখতে অস্ফুটে বললেন, “এই একটা সপ্তাহ দরকার ছিল আরনস্ট, ঘুমের জন্য।”

এক সপ্তাহ পর আরনস্ট এসেছিল, অনেক ঝরঝরে চেহারায়। তিন ঘন্টার এক লম্বা সেশনে স্বীকার করেছিল ছোটো থেকেই তার মাথার মধ্যে বাবার মৃত্যুচিন্তা ঘুরপাক খেত, ধনী বাবার অকালমৃত্যু আরনস্টকে অল্প বয়সেই কতটা অর্থবান করে তুলতে পারে সে নিয়ে ডে-ড্রিমিং এর শেষ ছিল না। অবশ্য অনুশোচনাও আসত তার ঠিক পরে পরেই  কিন্তু সে অনুশোচনা থামাতে পারেনি এ দিবাস্বপ্নকে।

ফ্রয়েডের দিকে তাকিয়ে কাতর গলায় বলেছিল, “কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি মন থেকে কোনোদিন চাইনি আমার বাবা মারা যান। বাবার সত্যি অকালমৃত্যুতে আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম “।

“জানি  আরনস্ট আর এও জানি এ দিবাস্বপ্ন যদি সত্যি কারোর ক্ষতি করে থাকে তবে সে হল তুমি। তোমার এই গিল্ট তোমাকে তিলে তিলে শেষ করার দিকে নিয়ে গেছে। আর তাই সারাক্ষণ তুমি  দেখতে পাও তোমার বাবার ঘরে ঢুকে কে যেন অত্যাচার করছে, পড়ে থাকছে তাঁর রক্তাক্ত মৃতদেহ”।

“কে যেন নয় প্রফেসর, কি যেন!”

“হ্যাঁ, আর তুমিও জান সেটি কি। টর্চার চেম্বারের বীভৎসতা তোমার মনে দাগ কেটে গেছে, সাবকন্সাসে তুমি জান কিন্তু সেই প্রায় পরাবাস্তব অভিজ্ঞতা এতই ভীতিপ্রদ তুমি তাকে অস্বীকার করে এসেছ। কিন্তু যেদিন থেকে দেখতে পেরেছ অসংখ্য ইঁদুর কিলবিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে তোমার পায়ের কাছে, তোমার শরীরের আনাচে কানাচে উঁকি মারছে তাদের হিলহিলে শরীর, তাদের হলদে গোলাপী থাবা ছোট ছোট দাগ ফেলে যাচ্ছে তোমার নিম্নাঙ্গে সেদিন থেকে এটাও দেখতে পেরেছ যে তোমার বাবা আর হেলেন দুজনকেই খুবলে খাচ্ছে সেই একই ইঁদুরের দল। তোমার অবচেতনায় তাই ইঁদুররা ইঁদুর নয়, তারা আরনস্ট।”

“কিন্তু হেলেন কেন, কেন হেলেন?”

“এখানে দুটো ব্যাপার আছে আরনস্ট। প্রথমত,  তুমি তো তোমার বাবাকে ভালইবেসেছ, তাই না? দিবাস্বপ্ন নেহাতই দিবাস্বপ্ন, সেটা কিন্তু তোমার প্রকৃত অনুভূতিগুলোকে বদলে ফেলে না। রাত্রির দুঃস্বপ্ন কিন্তু এসেছে সেই ভালোবাসার মানুষের ইনসিকিওরিটির কারণেই, তোমার সব থেকে কাছের মানুষকে তুমি নিরাপত্তা দিতে পারছ না। হেলেন-ও দুঃস্বপ্নে এসেছে সেই একই কারণে, সেও তোমার অত্যন্ত কাছে মানুষ। নিরাপত্তাহীনতা কখন যেন তোমার বাবাকে ছাড়িয়ে গ্রাস করে নিয়েছে তোমার বাকি কাছের মানুষদের-ও।

আর একটা কারণ-ও আছে অবশ্য। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি যে হেলেন বেশ নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে, তোমাদের অর্থপ্রাচুর্যের পাশে তাদের অর্থসঙ্গতির কোনো তুলনাই চলে না। তোমার বাবা চিরকাল চেয়ে এসেছেন তোমারও বিয়ে হোক কোনো বিত্তশালী পরিবারে, ঠিক যেমন পরিবার থেকে এসেছেন তোমার মা। এই কনফ্লিক্ট নিয়ে তুমি পূর্ণ মাত্রায় সচেতন ছিলে আর বারেবারেই তোমার মনে হয়েছে হেলেনকে পছন্দ করে তুমি তোমার বাবাকে অমান্য করছ, আর একই সঙ্গে অন্যায় করছ হেলেনের সঙ্গেও। সেই অপরাধবোধ থেকেই বারে বারে দেখেছ হেলেনকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে ইঁদুরের দল, কিন্তু তুমি কিছুই করতে পারছ না। করতে পারছ না নাকি করতে চাইছ না সেটা বড় ব্যাপার নয় এখানে, তোমার ইনভলভমেন্টটাই বড় কথা।”

ম্লান হেসেছিল আরনস্ট কিন্তু অনেক চাঙ্গা লাগছিল তাকে। বহু ধন্যবাদ দিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেছিল ফ্রয়েড তাকে জীবনের সব থেকে বড় দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি দিয়েছেন।

পাঁচ বছর পর আবার আরনস্টের খোঁজ পেয়েছিলেন ফ্রয়েড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন শত্রুর গুলিতে মারা যায় সে।

ট্রেঞ্চের মধ্যে একা পড়েছিল আরনস্ট আর কি আশ্চর্য, তার লাশের পাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল কয়েকটা ইঁদুর।

(ফ্রয়েড কেসফাইলস ১)

sigmund-freud

Advertisements

এক বুদ্ধিজীবীর মৃত্যু

১৯০৩-এ মারি ক্যুরি, ১৯১১ তেও আবার তিনি – প্রথমবার পদার্থবিদ্যা, দ্বিতীয়রবার রসায়ন; ১৯০৫-এ বার্থা ভন সাটনার – শান্তির জন্য, ১৯০৯-এ সালমা লাগেরলোফ সাহিত্যে, ১৯৪৭ সালে গার্টি  তেরেসা কোরে শারীরবিদ্যায় আর এই সেদিন ২০০৯ সালে এলিনর ওস্ট্রম অর্থনীতিতে – ১১২ বছরের ইতিহাসে এনাদের নাম আলাদা ভাবে উল্লেখ করা দরকার, কারণ নিজেদের বিষয়ে এনারাই প্রথম নোবেল প্রাপক (সর্বমোট ৪৪ জন মহিলা পেয়েছেন এই পুরস্কার)। আর গতকাল, ২০১৪ সালের ১৩ই অগস্ট গণিতশাস্ত্রের নোবেল, ‘ফিল্ডস মেডাল’ প্রথমবারের জন্য তুলে দেওয়া হল এক মহিলার হাতে – স্ট্যানফোর্ডের মারিয়ম মির্জাখানি ঘটিয়ে ফেললেন অভূতপূর্ব কান্ডখানি।

গণিতবিদদের প্রাইম টাইম কুড়ি থেকে চল্লিশের মধ্যে এটা জানার পরেও বলতেই হয় ফিল্ডস মেডাল পাওয়া যেন নোবেলের থেকেও শক্ত ব্যাপার – শুধু যে চল্লিশ বছরের কম বয়সীরাই পেতে পারেন তা নয়, পদকটি দেওয়াও হয় প্রত্যেক চার বছরে একবার। যদিও প্রত্যেকবার চার জন করেই পদকটি পান কিন্তু প্রতি বছরে একজন আর প্রতি চার বছরে চার জন করে পাওয়ার মধ্যে তফাত আছে। ধরুন, আপনিও মারিয়ম মির্জাখানি,  মঞ্জুল ভার্গব, আরতুর আভিলা বা মার্টিন হায়রের এর মতন প্রতিভাবান, কর্মঠ, এবং আউট অফ দিস ওয়ার্ল্ড গোত্রের চিন্তাবিদ । শ্রেষ্ঠ জার্নালগুলি তে অগুন্তি পেপার লিখেছেন, শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয় সেগুলোর ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর-ও বিশাল অর্থাৎ যাকে বলে পাথ ব্রেকিং কাজ, তাই করে দেখিয়েছেন। আরো ধরুন আপনার বয়স ছত্রিশ আর ফিল্ডস মেডাল পাওয়ার ব্যাপারে আপনার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা ঊনিশ। যদি প্রতি বছরে একবার করে ফিল্ডস দেওয়া হত (যেরকমটি নোবেলে হয় আর কি), তাহলে সামনের চার বছরে আপনার পাওয়ার চান্স যথাক্রমে ১/২০, ১/১৯, ১/১৮ ও ১/১৭। তার মানে চার বছরের মধ্যে আপনি ফিল্ডস পাবেন এর প্রোব্যাবিলিটি ০.২২, কিন্তু ফিল্ডসের আসল নিয়ম অনুসারে আপনার পাওয়ার চান্স ০.২ – বলা বাহুল্য যে ঐ ০.০২ সংখ্যাটি এ ক্ষেত্রে কিন্তু নেহাত কম নয়।

মারিয়মকে অসংখ্য অভিনন্দন কিন্তু এবারের ব্লগপোস্টটি মারিয়ম কে নিয়ে নয়। যাঁকে নিয়ে লেখা, তাঁর ওপর লেখার ইচ্ছে অনেকদিনের কিন্তু হয়ে উঠছিল না। মারিয়মের ফিল্ডস মেডাল প্রাপ্তি সেই ইচ্ছেটাকে বাস্তবায়িত করেছে – সত্যিই এর থেকে ভালো সময় আর কিই বা হতে পারে?

হাইপেশিয়া নামটির সঙ্গে প্রথম পরিচয় সাত বছর বয়সে, সৌজন্যে দেব সাহিত্য কুটির।  চার্লস কিংসলের হাইপেশিয়াকে নিয়ে লেখা ফিকশনলাইজড জীবনীটিকে অনুবাদ করেছিলেন সম্ভবত সুধীন্দ্রনাথ রাহা, বিদেশী ক্লাসিকসের অনুবাদ সিরিজে আর একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। দেব সাহিত্য কুটিরের এই  বইগুলো পুরো ছেলেবেলাটা জুড়েই আমার সঙ্গী ছিল । খুব উচ্চমানের অনুবাদ নয়, প্রায় সব বইগুলিই অনেক সংক্ষিপ্তাকারে বার করা কিন্তু তার পরেও ভালো বই পড়ার ইচ্ছে জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে এবং ক্লাসিকস পড়ার আগ্রহকে তুমুল করে তোলার পেছনে দেব সাহিত্য কুটিরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেব সাহিত্য কুটির নিয়ে একটা ব্লগপোস্ট লেখা নিতান্তই দরকার,  ভালোবাসা থেকেই হোক বা কৃতজ্ঞতা থেকে  কিন্তু আপাতত হাইপেশিয়ার কাছে ফিরে যাই।

চলুন আপনাকে নিয়ে যাই ৪১৫ খ্রীষ্টাব্দের আলেকজান্দ্রিয়ায়। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন সিজারিয়মে, প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার সবথেকে বিখ্যাত চার্চে। দেখতে পাচ্ছেন চতুর্দিক থেকে ছুটে আসছে মানুষ, মানুষের মাথার ভিড়ে একটু দূরের সজীব কি নির্জীব অবয়বগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে। এই কাতারে কাতারে মানুষের কেউই কিন্তু সিজারিয়মে প্রার্থনা করার জন্য দৌড়ে আসছে না। বরং তারা ঝাঁপিয়ে পড়ছে চার্চের বিশাল প্রাঙ্গণ থেকে উঠে আসা ততোধিক বিশাল সিঁড়িগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই মহিলার ওপর, সবকিছু ছাড়িয়ে যাঁর গর্বিত চোখ দুটিতেই আপনার দৃষ্টি বারবার আটকে যাচ্ছিল। এখন অবশ্য আর তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন না, চার্চের পূজক থেকে শুরু করে  আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরের লস্কর, সাদা পোষাকে রাজার খোঁচর থেকে শুরু করে মেছুনী সবার ভিড়ে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছেন উন্মত্ত জনতার আঘাতে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে তাঁর শরীর, আবার সেই লোকগুলোই  ফের তুলে আনছে সেই শরীরকে পুনরায় আঘাত হানবার জন্য। আঘাতে ক্রমশ বুজে আসতে থাকা চোখ খুলে দু একবার খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর অনুগামীদের, যারা বহু বহু দূরে লুকিয়ে অসহায়ের মতন দেখছে এই নারকীয় তান্ডবলীলা, তারা জানে হাইপেশিয়ার অনুগামীদের ভাগ্যেও নাচছে একই শাস্তি। শেষবারের মতন টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি, নগ্ন শরীরে আব্রু রাখার মতন কিছুই নেই কিন্তু সে নিয়ে তিনি ভাবিত নন – বরং মুখের সামনে ঝুলতে থাকা চুলের গোছাগুলো দু হাতে সরিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন – তাঁর কথা আলেকজান্দ্রিয়াবাসী অনেক শুনেছে, এই শেষ সময়েও গরবিনীর স্পর্ধা দেখে তারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। এখনও কথা, এখনও জ্ঞানের বাণী? কোনো প্রাণভিক্ষা নয়, কোনো কাকুতিমিনতি নয়, চোখের জল নয়? অসহ্য। অনেকগুলো হাত নেমে এল শরীরটার ওপর, এবার আর তিনি পারলেন না – তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠলেন। এতক্ষণে জনতার শান্তি হয়েছে, এই জান্তব চিৎকার জানিয়েছে তাদের প্রতিহিংসা সফল হতে চলেছে। আর কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র, চিৎকার থেকে মৃদু  গোঙানি হয়ে এখন শুধুই উল্লাসধ্বনি।

আপনি একবিংশ শতাব্দীর মানুষ, এসব আপনার গা সওয়া, অনিতা দেওয়ানের স্মৃতি এখনো টাটকাই আছে। তাও চোখের সামনে এরকম খুন দেখে একটু শিউরোলেন,  কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য, আপনার মনে বরং প্রশ্ন জাগছে – কেন? কোন অপরাধে একটা শহর ভেঙ্গে পড়ে একজন মহিলাকে পিটিয়ে মারতে? আপনি অনেকটা সিওর যে মহিলার দোষের পাল্লাই বেশী, এ আপনি ঘন ঘন দেখেছেন। মনে নেই এই কয়েক বছর আগেই আমেরিকায় পি-এইচ-ডি করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হতে দেখেছিলেন আপনার দুই সহপাঠিনীকে, এক সপ্তাহের মাথায় সেই ছোট্ট জনপদের প্রবাসী মহল জুড়ে ফিসফাস – আরে এই চব্বিশ পঁচিশ বছরের মেয়েগুলো রাত্রে ছেলেদের সঙ্গে বসে মদ গেলে, এসব ওদের সঙ্গে ঘটবে না তো কাদের সঙ্গে হবে শুনি? আসল ঘটনা জেনেশুনে কতদিন আর ন্যাকা সহানুভূতি দেখানো যায়? কিন্তু এখানে ব্যাপারটা একটু জটিল, মদ জাতীয় বেল্লেলাপনা বরং কোনো ইস্যুই ছিল না, জনদপদবধূ জাতীয় ট্যাগ লেগে গেলেও প্রাণহানির কোনো চান্স নেই। কিন্তু না, হাইপেশিয়া সেসব করেন নি, উল্টে তত্ত্ব আওড়েছেন।

আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক থিওনের মেয়ে ছিলেন তিনি, ছোট থেকে দেখে এসেছেন বাবার তত্ত্বাবধানে ছাত্রের দল বসে সমাধান করছে জ্যামিতির কঠিন কঠিন সমস্যা।  হ্যাঁ, জ্যামিতি। আর হবে নাই বা কেন? অঙ্কের অধ্যাপক হিসাবে থিওনের খ্যাতিই তো ছড়ায় ইউক্লিডের ‘এলিমেন্টস’ বইটির সম্পাদনা করার পর। থিওনের মেয়েও গণিত ভালোবাসেন কিন্তু তাঁর কাজের ব্যাপ্তি বিশাল। তিনি দার্শনিক-ও বটে আবার তিনি তাঁর অনুগামীদের মধ্যে  সার্বিক  বিজ্ঞানচেতনা নিয়ে আসতে চান যার দৌলতে তারা চার্চের চাপিয়ে দেওয়া যে কোনো ডিকটামকেই কাটা-ছেঁড়া  করতে পারে; তিনি লজিশিয়ান-ও, স্তরে স্তরে গড়ে ওঠা যুক্তি দিয়েই তিনি স্বীকার বা খন্ডন করেন প্রতিপক্ষের মতবাদ; শুধু কি তাই? তিনি চেষ্টা করেন যাতে তাঁর ছাত্ররা ভালো লিখতে পারে, একজন যুক্তিবাদীর ম্যানুস্ক্রিপ্টে মুন্সিয়ানা থাকা দরকার যখন আসল অবজেক্টিভ হল এই যুক্তিবাদের সার্বিক বিস্তার। দর্শন আর গণিতের গন্ডী ছাড়িয়ে তিনি  সময় সময় উৎসাহ দেখিয়েছেন স্থানীয় রাজনীতিতেও।

মুশকিলটা হল,  কার্যকলাপের  প্রাচুর্যে হাইপেশিয়ার বিষয়ভিত্তিক অবদানগুলো কিরকম আবছা হয়ে এসেছে। হাজার, দেড় হাজার বছরের ইতিহাস ঘেঁটেও সেই অবদানের যথাযথ তালিকা নির্মাণ প্রায় অসম্ভব। বহু ঐতিহাসিক বলেন হাইপেশিয়ার মূল অবদান বীজগণিতে, ডিওফ্যান্টাসের বিখ্যাত  ‘এরিথমেটিকা’ বইয়ের বহু সূত্রের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। থিওনের মেয়ে বলেই হয়ত অনেকে আবার বিশ্বাস করেন জ্যামিতিতেও হাইপেশিয়ার ছিল অগাধ দক্ষতা। তাঁরা এও বিশ্বাস করেন যে ‘এলিমেন্টস’ এর সহ-সম্পাদক ছিলেন হাইপেশিয়া, যদিও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। শোনা যায় টলেমির জ্যোতির্বিদ্যা  আর ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির সম্পর্ক বোঝাতে লিখে ফেলেছিলেন আস্ত একটি বই (ইংলিশে যার নাম অ্যাস্ট্রোনমিকাল ক্যানন), কিন্তু সে বইও কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। এই বই নিয়েও বিতর্ক, কিছু ঐতিহাসিকের ধারণা বইটির সঙ্গে জ্যামিতির বিশেষ সম্পর্ক নেই, জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত কিছু সংখ্যা ও তালিকার সমাহার মাত্র। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল মারিয়ম মির্জাখানির কাজের অনেকটাই নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি নিয়ে –  বাস্তবে আর কটা ত্রিভুজের কোণের সমষ্টি একশ আশি ডিগ্রী হয়? চোখের সামনে যে ত্রিভুজ দেখছেন সেগুলো তো আর সরলরেখা দিয়ে তৈরি নয়, তাহলে আর ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির উপপাদ্য-প্রতিপাদ্য খাটবে কি করে? যাই হোক, ‘এরিথমেটিকা’ ছাড়া হাইপেশিয়ার আর একটি কাজেরই সন্ধান এখনো পাওয়া যায় – অ্যাপোলোনিয়াসের ‘কনিকস’ বইটির ওপর লেখা তাঁর ব্যাখ্যা। ‘কনিকস’ এবং ‘এরিথমেটিকা’ দুটি বইই হায়ার অর্ডার ইকুয়েশনের তাত্ত্বিক আলোচনায় ভরপুর, কিন্তু প্রথম বইটিতে সেই আলোচনা এসেছে বীজগণিত নয়, জ্যামিতির হাত ধরে।

গণিত নিয়ে হাইপেশিয়ার কাজের আলোচনা থেকে একটা ধারণা আসে যে আজ থেকে ষোলোশ বছর আগেই হাইপেশিয়া  একটা শাশ্বত সত্যের খোঁজ করেছেন,  কোনো  একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির নিগড়ে বাঁধা না থেকে। আর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি ফুটে উঠেছে হাইপেশিয়ার ছাত্রদের লেখাতেও। ইসিডোর, সিনেসিয়াস দের লেখা জানাচ্ছে হাইপেশিয়া যেমন ক্রিশ্চান ছিলেন না, ক্রিশ্চান ধর্মের বিরোধিতাও কখনো করেননি। আর এখানেই রহস্য – কারণ হাজার বছর ধরে মানুষ ভেবে এসেছে হাইপেশিয়ার মৃত্যু ঘটে চার্চের বিরোধিতা করতে গিয়ে, সিজারিয়মের বিশপ সিরিলই ষড়যন্ত্র করে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলেন।

কিন্তু আসলে যা ঘটেছে তা হল হাইপেশিয়ার দর্শনতত্ত্বের ভুল ব্যাখ্যা  দিয়ে একটা  শ্রেণী-বিভাজনের সফল প্রয়াস। হাইপেশিয়া বিশ্বাস করতেন নিও-প্লেটোনিজমে, সে তত্ত্ব একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু এখানে এই ‘এক’ কোনো সুপ্রিম পাওয়ার নয়, এই ‘এক’ বোঝায় আত্মার পূর্ণ চেতনাকে। এই ‘এক’ এর কোনো দৈবিক শক্তি নেই, পূর্ণ  বৌদ্ধিক বিকাশই এই ‘এক’ এর একমাত্র শক্তি। স্বাভাবিক ভাবেই যারা নিও-প্লেটোনিজমের বিশ্বাসী তাঁদের অধিকাংশ সময়ই কাটবে গণিত এবং দর্শনের আখড়া্য, স্বাভাবিক ভাবেই হাইপেশিয়া এবং থিওনের বাড়িই হয়ে উঠবে এঁদের তীর্থক্ষেত্র।  কিন্তু এঁরা কারা? র‍্যাশনালি ভাবলে মনে হয় এঁরা মূলত বুদ্ধিজীবী; এবং এঁরা যদি ক্রিশ্চিয়ান ধর্মকে উপহাস করেও থাকেন সেটা ব্রেনওয়াশড হয়ে বা সুপ্ত বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে নয়। গণিতজ্ঞ, চিন্তাবিদ, যুক্তিবিদদের কাছে ক্রিশ্চিয়ান ধর্ম পাত্তা পায়নি কারণ একেশ্বরবাদী হয়েও সেখানে অনুপ্রবেশ ঘটেছে এক সুপ্রিম পাওয়ারের, এ যেন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এক  অজ্ঞাত গাণিতিক রাশি,  এ যেন n খানা সমীকরণ থেকে n+1 খানা গাণিতিক রাশির মান খুঁজে বার করার অসম্ভব প্রচেষ্টা। হাইপেশিয়া এঁদের শিক্ষক, এঁদের নেত্রী – স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নেওয়া যায় হয়ত এই কমজোরী তত্ত্বের কারণেই নেত্রী নিজেও অল্পবিস্তর উপহাস করে থাকবেন মেনস্ট্রীম ধর্মটিকে। কিন্তু তত্ত্বের দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসিতে না থেমে এ যে পুরোদস্তুর ক্লাস স্ট্রাগলে চলে গেল, ট্র্যাজেডি সেখানেই। মনে করুন সিজারিয়মের উন্মত্ত জনতার মধ্যে কাদের কাদের দেখতে পেয়েছিলেন। সাধারণ মানুষদের কাছে টানতে চার্চের কোনো অসুবিধাই হয়নি কারণ দেশকাল নির্বিশেষে বুদ্ধিজীবীরা কখনই মাসকে সঙ্গে পাননি – একটা তীব্র অবিশ্বাস সবসময় দেওয়াল হয়ে দেখা দিয়েছে দু দলের মধ্যে। যে মুহূর্তে ধার্মিক বা রাজনৈতিক সাপোর্ট সরে গেছে বুদ্ধিজীবীদের পাশ থেকে, মাসের হাতে লাঞ্ছিতই হতে হয়েছে তাঁদের।

বিখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক গিবন্ বিশ্বাস করতেন হাইপেশিয়ার মৃত্যুক্ষণই হল আলেকজান্দ্রিয়ার উৎকর্ষ যুগের শেষের শুরু, মিশরের-ও। এ অভিশাপ গ্রাস করে গ্রীক সাম্রাজ্যকেও এবং ফলত গোটা ইউরোপকেই, যে অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ পেতে লেগে যায় প্রায় আরো হাজার বছর।

হাইপেশিয়া বেঁচে থাকলে অবশ্য প্রতিবাদ করে বলতেন –  অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ পেতে নয়, চেতনার বিকাশ ঘটতেই সময় লেগেছে হাজার বছর। কিন্তু  চেতনার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটতে আরো কত হাজার বছর লাগবে? আরো কত যুগ লাগবে সেই ‘এক’ কে খুঁজে পেতে? বড় কঠি্ন প্রশ্ন –  অন্তত এটুকু তো জানিই যে হাইপেশিয়ার ছাত্রদের নাম জানলেও কোনো ছাত্রীর নাম আমরা খুঁজে পাই নি,  দু বছরের মাথায় মারি ক্যুরি পথ দেখানোর পরেও আর মাত্র তেতাল্লিশ জনই নোবেল পোডিয়ামে উঠতে পেরেছেন, হাইপেশিয়া-মারিয়া আগনেসি-সোফি জারমেন দের ইতিহাস নিয়েও আমাদের আটাত্তর বছর লেগে গেছে মারিয়মকে খুঁজে পেতে। ঈশ্বরদর্শন কি মুখের কথা, নিজের চেতনার রঙে রাঙিয়ে তুলতে চাইলেও?

hypatia

পুনশ্চ –  আর এক বিদুষী কে নিয়ে বহুকাল আগে একটা ধাঁধা দিয়েছিলাম, সময় থাকলে ছোট গ্রে সেল গুলোকে একটু খাটিয়ে ফেলুন।

এক যে ছিলেন কন্যে,

যাঁর বাবার জন্যে,

আকাশ থেকে যাইবা হারায়

কমে বেড়ে একই দাঁড়ায়

কারণটা কি? সেটা ভেবেই হন্যে।

 

কারণ যদি মেলে

(তাকে) n-এর সাধ্যসীমায় ফেলে,

ইনভার্স আর এক কে ধর গে

দুয়ের যোগের n-th  বর্গে,

ইরর‍্যাশনাল কে পেলে।

 

তাতেই কি দ্যায় ক্ষান্তি?

পাই, না পাই শান্তি

ডানদিকে যার বর্গ,

সেই হাতে দ্যায় স্বর্গ

ইকুয়েশন মিলিয়ে দিল অবাস্তব এক ভ্রান্তি।

হালুয়ানামা

বহু বাঙ্গালী বাড়ির মতন আমাদের বাড়িতেও বলা হত সুজি; হালুয়া কথাটা ঠাকুমা বা মা কারোর মুখেই শুনিনি। যাঁদের কাজ ছিল মূলত খাওয়া তাঁদেরকেও সুজির বাইরে কিছু বলতে শুনিনি। কদাচিৎ অন্য বাড়িতে হালুয়া বা সময় সময় মোহনভোগ শুনেছি। সুজি বা ইংলিশে যাকে বলি সেমোলিনা সেটি বাদ দিয়েও যে হালুয়া হতে পারে এ তথ্যটি অবশ্য জেনেছি অনেক বেশী বয়সে। তবে হালুয়ার জন্মস্থানে (যদিও উচ্চারণটা সেখানে হেলভা) এসে ইস্তক এ খাদ্যদ্রব্যটি নিয়ে জ্ঞান লাভ হয়েছে বিস্তর। হেলভা শব্দটি কিন্তু এসেছে আবার আরবী হালওয়া শব্দ থেকে, যেটির মানে হল যে কোনো রকমের মিষ্টান্ন। বাংলায় যেমন আমরা মিষ্টি বলতে সন্দেশ, রসগোল্লা থেকে শুরু করে খাজা, লবঙ্গলতিকা প্রায় সবই বুঝি কতকটা সেরকম। মুশকিল হল তুর্কী হালুয়ার আবার ভ্যারাইটি এতই বেশী যে পন্ডিতেরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সব কিছুইকেই হালুয়া বলা উচিত হবে কিনা।

যেমন ধরুন ফ্রেঞ্চ ভাষাতাত্বিক অ্যান্টন গালান্ড জানিয়েছেন অটোমান সুলতান চতুর্থ মেহমেদের বিশাল সৈন্যবাহিনী যখন পোল্যান্ড জয় করতে চলেছে (সময়টা ১৬৭২) তখন তাদের সঙ্গ দিয়েছিলেন এক রসিক ব্যক্তি, সাদা বাংলায় যাঁকে অবশ্য বলতে হয় ভাঁড়। তো এই ভদ্রলোক পথিধারে উপস্থিত দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য নিজের দাড়ি এবং পোষাকে আচ্ছা করে হালুয়া মেখে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, আরো উৎকটরস যোগানের অভিলাষে নিজের পশ্চাতদেশ থেকে মুঠো মুঠো হালুয়ার তাল বার করে তাই ছুঁড়ে মেরেছেন দর্শকদের দিকে। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে এ হালুয়া ভয়ঙ্কর রকম চটচটে। কিন্তু সেই একই দেশে আবার পাওয়া যেত গেজিলার হেলভা, যার আক্ষরিক বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায় যোদ্ধাদের হালুয়া। এ হালুয়া নাকি এতই শক্ত এবং দুষ্পাচ্য যে যিনি এ হালুয়া হজম করে উঠতে পারবেন তিনিই প্রকৃত বীর। এবং শুধু তাই নয়, যুদ্ধে নিহত কমরেডদের স্মরণে এই হালুয়াই বানানো হত, হয়ত মৃত্যুচেতনার একটা আভাস দিতেই।

কিন্তু এসব হচ্ছে কমনারসদের খাবার। হালুয়া নিয়েই যখন কথা হচ্ছে, তুর্কী সুলতানরা কিরকম হালুয়া খেতেন সে নিয়ে দু’চার কথা না বললে জীবন বৃথা। প্রথমেই বলা যাক বেয়রাম হেলভার কথা – বেয়রাম হল গিয়ে তুরস্কের স্যাক্রিফাইস ফীস্ট (ফেসবুকে আমার এক নব পরিচিত বন্ধু আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন বেয়রামের সময় ইস্তানবুলে এলে রক্তাক্ত রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে হবে কিনা সেই ভেবে, তিনি জেনে আশ্বস্ত হয়েছেন যে বহু বছর ধরে ইস্তানবুলের রাস্তায় কুরবানি নিষেধ)। তো উৎসবের হালুয়া বলে কথা, ইনগ্রেডিয়েন্টসও তাই অফুরন্ত –  চিনি, ঘি, মধু, দুধ, বাদাম, গোলমরিচ কি নেই! এক সুলতান হুকুম দিলেন এর সঙ্গে মজ্জা-সিরাপ আর আখরোট মেশাতে। মজ্জা-সিরাপ শুনে চমকে উঠবেন না, বেসিক্যালি মজ্জাকে মিহি করে কুঁচিয়ে চিনির সিরাপে ঢেলে ক্রমাগত নাড়িয়ে যাওয়া যতক্ষণ না বেশ একটা জেলি-জেলি টেক্সচার আসে। খেতে নাকি বেশ চমৎকার হয়, এবং তুরস্কের দক্ষিণপশ্চিম প্রান্তের শহর বুরদুরে গেলে এখনো এ জিনিসের স্বাদ নিয়ে আসতে পারেন। সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ আবার অর্ডার দিয়েছিলেন রাইস-বিয়ার দিয়ে হেলভা বানাতে। ‘বিজার ফুড’ কি ভাবছিলেন বিংশ শতাব্দীর কনসেপ্ট?

তুরস্কের পাশেই পারস্য, জাফরানের আদি দেশ। সুতরাং, পনেরশ শতকের রেশিদিয়ে হেলভা তৈরী হবে জাফরান দিয়ে তাতে আর আশ্চর্য হওয়ার কি আছে?  বলা বাহুল্য যে এই জাফরানি হালুয়াও তৈরী হয়েছিল এক সুলতানের রসনা নিবৃত্তিতে তবে জাফরানের দাম যত বেড়েছে, রেশেদিয়ে হালুয়াতে এর পরিমাণও আস্তে আস্তে কমে এসেছে। এখন খেতে চাইলে স্বপ্নে ঘি থুড়ি জাফরান ঢেলেই খেতে হবে, তবে হালুইকররা একেবারে নির্দয় নন, তাই ছিটিয়ে দেবেন গোলাপজল, সঙ্গে এলাচ আর লবঙ্গ-ও পেয়ে যাবেন। হালুয়ারহস্য যত জানবেন ততই বুঝবেন যে আদত সুলতানী খাবার বলে যদি কিছু থেকে থাকে তো সে এই হালুয়াই। যোদ্ধা হালুয়া শুনে যিনি আঁতকে উঠেছিলেন, তিনিই আবার নিশ্চিন্ত হতে পারেন এই জেনে যে লব-ই-দিলবর হালুয়াও আছে – যার আক্ষরিক অর্থ প্রেয়সীর ঠোঁট। শুধু নাম নয়, আকারটিও দেওয়া হত সেরকমই। আর তার রসিক প্রস্তুতকারকরা সেখানেই থামলেন না, এ হালুয়ার মূল উপাদানটি করে রাখলেন মধু! মশকরাটা ভাবুন একবার। কিন্তু সারাদিনের শেষে ঘাম জবজবে জামায় যখন রবীন্দ্র সদন আর ভবানীপুরের মাঝের টানেলে আটকে আছেন, জানেন না মেট্রোর দরজা কখন খুলবে, তখন যদি অন্তত এটুকু জানতেন যে বাড়ি ফিরেই পাবেন লাল টুকটুকে লব-ই-দিলবর (আহা, নামটিও বড় খাসা) তখন হাফিজকে স্মরণ করে আপনিও কি  বলে উঠবেন না  ” হাফিজ ফিরে উঠে দাঁড়ায়, অন্ধকারের পাড় ঠেলে / ঘনিয়ে যায় সেই যেখানে চুম্বনেরই ঠোঁট মেলে”  (যারা শামসুল হকের অরিজিন্যাল ট্রানস্লেশনটি পড়েছেন তাঁরা ক্ষমা করবেন চুম্বনের পরে ওই এক্সট্রা ই-টির জন্য )।  নিজের কথা ফিরিয়ে নিলাম, মশকরা নয়, খাঁটি রোম্যান্টিসজিম।

তবে কিনা এখানেও একটি আয়রনি আছে, যেটা এতক্ষণ চেপে গেছিলাম। এ হালুয়া প্রথম পরিবেশিত হয় অটোমান রাজপ্রাসাদের বিশাল ব্যাঙ্কোয়েট হলেই। উপলক্ষ্য? আবার কি, যুদ্ধজয়! এবারে তেনারা গ্রীসের রোডস আইল্যান্ড জয় করে ফিরেছেন। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলছেন কি? আমিও।  দিগ্বীজয়ীদের দেশ, প্রোটিনের ছড়াছড়ি চারদিকে। সুতরাং, হালুয়াতেও যে শ্রেডেড চিকেন ব্রেস্ট পড়বে তাতে আর আশ্চর্যের কি? এ হালুয়ার নাম মেমুনিয়ে, প্রথম তৈরি হয় সেই ১৪৩০ সালে। সে হালুয়া আবার গোল গোল করে বলের আকারে বানানো হত। সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ বোধহয় মিটবল আর হালুয়ার তফাত বুঝতে না পেরে কিছু বছর পর থেকেই ব্যাঙ্কোয়েটের মেমুনিয়েতে মাংস দিতে বারণ করে দেন। থ্যাঙ্ক ইউ সার।

তবে সবার সেরা হালুয়া হল হেলভা হাকানি, আক্ষরিক অর্থই হল রাজকীয় হালুয়া। রাজারা খেতেন বলে নয়, হালুয়াদের রাজা বলে। ইনগ্রেডিয়েন্টস সব মোটামুটি এক, কিন্তু এখানে আছে পহলে দর্শনধারীর গল্প। খেজুর, গোলাপ, রাজপ্রাসাদ কতরকমের শেপেই যে একে বানানো হত, সঙ্গে আলাদা করে সার্ভ করা হত ফ্রেশ ক্রীম।  হালুয়ার জেনারল টেক্সচারটার কথা যদি চিন্তা করেন তাহলে বুঝতে পারবেন গোলাপফুলের শেপে হালুয়া বানানো নিতান্ত সহজ কাজ নয়! আপনাদের ভাগ্যি ভালো, এ জিনিস এখনো কালেভদ্রে এ দেশে তৈরী হয়। হয়ত সেই সব রইস খানদানের জন্য যাদের কাছে কেক এখনো পশ্চিমী ইনভেসন বলে অপাংক্তেয়। যদ্দিন না সেরকম বাড়ি থেকে নেমন্তন্ন আসছে, ছবি দেখেই খুশী থাকুন।

helvai hakani

(ইমেজ সোর্স )

শুরুতেই বলছিলাম সুজি বাদ দিয়েও হালুয়া হতে পারে। সেই সূত্রেই জানাই চালের গুঁড়ো দিয়েও হালুয়া তৈরী হয়েছে।  হুঁ হুঁ , ভাবছেন কি। তার নাম ইশাকিয়ে হেলভা, চালের গুঁড়োর সঙ্গে দুধ আর বাদাম গুঁড়ো মিশিয়ে তৈরি করা হত আর ছাঁচের জন্য ব্যবহার করা হত কফি কাপ। যারা ইশিকিয়ে হেলভা খেয়েছেন তাঁরা দিব্যি গেলে বলেছেন খেলে এর সঙ্গে ইশক হবেই। প্রসঙ্গত বলি টার্কিতে এলে দেখবেন এখানে যে কোনো কাপে আপনাকে কফি দেওয়া হবে না, কফির জন্য রাখা আছে নির্দিষ্ট সাইজ এবং শেপের কাপ। তবে হ্যাঁ, এসব হালুয়া যাকে বলে ফ্যান্সি। এখন যদি কোনো শ্রাদ্ধবাড়িতে যান বা শোকসভা, সেখানে দেওয়া হবে কিন্তু সোল ফুড হালুয়াই, এবং সেটি তৈরি হবে ওই সুজি দিয়েই।

এতসব হালুয়ার মধ্যে কটা আদৌ খাওয়া হয়ে উঠবে সে নিয়ে সন্দেহ আছে তবে টার্কি যখন আসবেন (আসবেন তো বটেই) তখন কিন্তু রাস্তার পাশের ফাস্ট ফুড সেন্টার থেকেও এদের সেমোলিনা হেলভা খেতে ভুলবেন না। নানা দোকানে হেলভা বার-ও পাবেন কিন্তু তার কথা বলছি না।  এ দেশের ডেজার্ট এমনিতেই মনোহরা আর তার মধ্যে বেসিক সেমোলিনা যেন সবাইকে ছাপিয়ে গেছে। ডোম শেপের গরম হালুয়াতে (তার সর্বাঙ্গে আবার পেস্তাকুচি আটকানো, ওপরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আস্ত আখরোট) যখন আস্তে করে ছোট্ট চামচের একটা ঘা বসাবেন, আর অবাক হয়ে দেখবেন ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে প্রাণ জুড়িয়ে দেওয়া ঠান্ডা আইসক্রীমের লাভা, তখন পাঠক সাড়ে বত্রিশ ভাজাকে একবার স্মরণ করবেন।

dugun_helvasi_610

(ইমেজ সোর্স)

তথ্যঋণ :  শেরবত অ্যান্ড স্পাইস – মেরি ইশিন (২০১৩)

পুনশ্চ – মিষ্টিখোর বাঙ্গালী, তাই নোনতা সুজি আই মীন হালুয়া নিয়ে কিছু লিখলাম না যদিও খেতে খারাপ লাগে না। আর তারপরেও বাই চান্স যদি তার তরে আপনার প্রাণ কেঁদে ওঠে, বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের সেই আদি অকৃত্রিম  পাক-প্রণালীর রেসিপি দিয়ে দিলাম।

সুজি –  এক পোয়া, জল – দেড় ছটাক, দুগ্ধ – দেড় পোয়া, ডিম্ব – দুইটা

”সুজিগুলি জলে ভিজাইয়া তাহাতে ক্রমে দুগ্ধ ঢালিয়া ডিম্ব দুইটার কুসুম ও এক চা চামচ লবণ মিশাইয়া লইবে। তাহার পর একখানি তাওয়ায় কিঞ্চিৎ ঘৃত মাখাইয়া ডিম্ব দুইটির শ্বেত ভাগ উত্তমরূপে ফেটাইয়া তাওয়ায় ঢালিয়া দিবে। পরে তাহাতে সুজি ও দুগ্ধ ঢালিয়া একখানি পরিষ্কার নেকড়া ঢাকা দিয়া সওয়া ঘন্টা কাল সিদ্ধ করিয়া নামাইয়া লইবে।”

বুঝেছ পাঠক – কেন হালুয়া নিয়ে লিখতেই হত?  pegatina-vinilo-smiley-wink

 

ওঃ, ডেভিড!

ফ্লোরেন্স বলতে গেলে বেশ ছোটোই শহর, পায়ে হেঁটেই ঘুরে ফেলতে পারেন পুরোটা। অতএব রবিবারের অলস  বারবেলায় গুটি গুটি হাঁটছেন আর ভাবছেন স্প্যাগেটি, লাসানিয়া, রাভিওলি, নচি, রিগাতোনিদের খপ্পর থেকে ফাইনালি কবে বেরোতে পারব। বাঙ্গালী মুখে কি আর অত চীজ পোষায় রে বাপু, তাও সাতদিন দুবেলা ধরে?  কিন্তু বিধি বাম, ফ্লোরেন্স রোম কি মিলান নয় যে এথনিক ফুডের বাড়বাড়ন্ত দেখতে পাবেন। পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর যে বাংলাদেশী ভাইয়েরা  এসে আপনাকে প্লাস্টিকি অ্যামিবা (একে থপ করে মাটিতে ছুঁড়ে  ফেললেই  অবশ্য চোখ নাক শুদ্ধ একটা  চেহারা আস্তে আস্তে উঠে আসবে) কি গোলাপ ফুল কি পায়রার দানা গছানোর চেষ্টা করছেন তাঁদেরকে শুধিয়েও বিশেষ লাভ হচ্ছে না, এক যদি না তাঁদের ডেরায় গিয়ে সোজা হাজির হন।  এমন সময়ে প্রায় দৈববাণীর মতন শুনলেন এক ফ্লোরেন্সিয়ান তাঁর সদ্য পরিচিত আমেরিকান বন্ধুকে বলছেন – পাস্তা, পিৎজা খেয়ে মুখে চড়া পড়ে গেলে সামনের স্কোয়ারটা পেরিয়ে ডান দিকে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই দিদিমা ভরসা, লা জবাব ইটালিয়ান কারি করে খাওয়াবেন। আমেরিকানটি অফ কোর্স ডমিনো’জ, পাপা জনের দেশের মানুষ; তা ছাড়া বিশ্বাস করেন হোয়েন ইন রোম, বিহেভ লাইক আ রোম্যান – তাই ইটালিতে কারি খাওয়া ঘোরতর অপরাধ। আপনার অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে কান খাড়া, আমেরিকানটি সামনের স্কোয়ার না টপকালেও আপনি কিন্তু দিদিমার কারিশপের দিকে হাঁটা লাগিয়েছেন।

ডানদিকে ঘুরতেই একটা সরু গলি, আদ্যিকালের লম্বা টানা বাড়ি দুদিকেই। অগস্টের ভ্যাপসা গরমে হাওয়া খাওয়ার জন্য দোতলা তিনতলায় বিস্তর খড়খড়ি ফাঁক করে রাখা। গলির মধ্যে কিরকম যেন একটা শ্যালদা-শ্যালদা গন্ধ। সে বিভ্রম বাড়িয়ে দিতেই হয়ত চোখে পড়ল গলির মাঝামাঝি জায়গা থেকে একটা বিশাল লাইন, সে লাইন এঁকেবেঁকে চলেছে তো চলেছেই। ঠিক যেন মিত্র ইন্সটিটউশনের (মেন) সামনেই লাইন পড়েছে সায়েন্স ট্যালেন্ট-ম্যাথ ট্যালেন্ট দিতে আসা ছাত্রছাত্রীদের। এখানে অবশ্য ছাত্রছাত্রীদের চোখমুখে টেনশনের থেকে ঔৎসুক্যটাই বেশী, আর এ ভিড়  শুধু টিনএজারদের নয় – সাত থেকে সত্তর সবাই আছেন। স্কুলবাড়ি স্কুলবাড়ি দেখতে বিল্ডিংটায় আছে কি? লাইনের সামনে যিনি একসঙ্গে দা ভিঞ্চির ভিট্রুভিয়ান ম্যান, বত্তিচেল্লির বার্থ অফ ভেনাস আর টিনটোরেটোর প্যারাডিসোর প্রিন্ট বিক্রি করছেন তাঁকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসাই করে ফেললেন। তিনি একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে ফিরতি প্রশ্ন করলেন – সেকি কথা! গ্যালারিয়া ডেল আকাদেমিয়ার নাম জানা নেই? নামটা শোনা শোনা লাগছে কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলেন না কোথায় শুনেছেন। যাই হোক, নাম শুনে বোঝা যাচ্ছে মিউজিয়ম কাম আর্ট গ্যালারি; তবে কিনা ইউরোপীয়ান মিউজিয়ম বলতেই যে ডি-লা-গ্র্যান্ডি চেহারাটি চোখের সামনে ভেসে আসে, গ্যালারিয়া ডেল আকাদেমিয়া মোটেই সেরকম নয় – সাধে কি আর দূর থেকে মিত্র ইন্সটিটউশন ভাবছিলেন। কিন্তু লাইনের লোকজনকে দেখে মনে হচ্ছে ল্যুভের সামনে তিনদিন তিনরাত ধরে ইঁট পেতে রেখেছেন সব। বিস্তর কৌতূহল, তাছাড়া জানলেন যে পরের দিন গ্যালারিটি বন্ধ থাকে। সুতরাং, পেট চুঁই চুঁই করলেও লাইনে দাঁড়িয়ে পড়তেই হল। রোম-ফ্লোরেন্স-পিজা-ভেনিস-মিলানের এগারোদিনের ট্যুরে যে রেনেসাঁ আর্টের চোঁয়াঢেকুর উঠবে সে আপনার জানাই কথা, কিন্তু  লাইফচেঞ্জিং এক্সপেরিয়েন্স মিস করে যাওয়ার ভয়ও বড় দায়।

GDA

সরু গলিতে ঘন্টা দুয়েক দাঁড়িয়ে, একবার উলটো ফুটের টিকেট অফিস একবার এ ফুটের চেকিং অফিসে বিস্তর দৌড়োদৌড়ি করে গলদঘর্ম হয়ে ঢুকে তো পড়লেন। সঙ্গে বোধহয় আরো হাজার খানেক মানুষ। তীরচিহ্ন দিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে কোন ঘর থেকে আপনি শুরু করবেন। সেই দেখে দেখে মাপজোক মিলিয়ে ইটালিতে মিলিয়ন্থ টাইমের জন্য দাঁড়ালেন যীশু কাঁখে ম্যাডোনার ছবির সামনে। সেই একাদশ শতাব্দী থেকে শিল্পীরা ভার্জিন মেরির কোলে থাকা যীশুর ছবি এঁকে চলেছেন – সবই দুষ্প্রাপ্য, সবেরই ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম এবং মিউজিয়ম কর্তৃপক্ষরা কাড়াকাড়ি করে সে সব ছবি রেখে দিয়েছেন তাঁদের সংগ্রহে। আপনি অবশ্য মিলিয়নবার বিভিন্ন শেপ ও সাইজের বেবি জেসাসকে (এবং বছরের হিসাবে যত পিছোবেন বেবি জেসাসের মুখে তত বেশী গাম্ভীর্য টের পাবেন) দেখে প্রভুর কাছে মুক্তির আর্জি জানিয়েছেন। যীশুই যখন এসে পড়েছেন তখন ভক্তবৃন্দ বাদ থাকেন কেন? একে একে এসে পড়েছেন সেন্ট ক্যাথরিন, সেন্ট ফ্রান্সিস, সেন্ট বারবারা, সেন্ট ম্যাথিউ। অবশ্য আপনি যে শুধুই ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে থাকলেন তা নয়, ফ্রানচেস্কো গ্র্যানাচির সন্ন্যাসিনী আপনাকে সে সুযোগ দেবেন না।

martyrdom of a female saint

কিন্তু প্রথম ঘরটিতে ঢোকা ইস্তক কি যেন একটা খচ খচ করছিল, আপনি টের পেতে পেতেও পাচ্ছিলেন না। এখন যেহেতু সন্ন্যাসিনীকে শহীদ হতে দেখে প্রারম্ভিক উত্তেজনাটা স্তিমিত হয়ে এসেছে, আপনার খেয়াল পড়ল সঙ্গে আরো যে হাজারখানেক মানুষ ঢুকেছিলেন তাদের কারোর টিকির দেখা মিলছে না। আপনি একটু ভ্যাবাচাকা খেলেন, তারপর এসি ঘরের আরামের চৌহদ্দিতে সত্যিই কারোর দেখা না পেয়ে একটু চিন্তিতই হয়ে পড়লেন। কিছু কি ভুল করলেন? ভুল ঘরেতে ঢুকে পড়েছেন? আদৌ গ্যালারিয়াতে ঢোকেনইনি? কি মুশকিল! তড়িঘড়ি করে ছুটলেন ডানদিকে, যদিও তীরচিহ্ন বলছে এরপর আপনার বাঁ দিকে এগিয়ে ‘Dispute over the immaculate conception’ দেখা উচিত। হন্তদন্ত হয়ে ডানদিকে ঘুরতেই এসে পড়েছেন একটা বিশাল হলঘরে, আর……আর… আপনার সেই হাজারো সহযাত্রী (একদিনের সতীর্থ-ও বলা যায়) কে একসঙ্গে দেখতে পেলেন হলঘরের এক কোণায় – নির্নিমেষে চেয়ে রয়েছেন তাঁরা সবাই। আপনিও ততক্ষণে ট্র্যান্সফিক্সড, চোখ ধাঁধানো এই অপার্থিব পুরুষালি সৌন্দর্য তারিফে বিন্দুমাত্র লিঙ্গবৈষম্য ঘটান নি।

IMG_0737

 

এতক্ষণে আপনার মনে পড়েছে মিকেলেঞ্জেলোর (মাইকেল এঞ্জেলো নয়) পৃথিবীবিখ্যাত ভাস্কর্য ডেভিডের জন্যই গ্যালারিয়া ডেল আকাদেমিয়ার নাম আপনি শুনেছিলেন। সেই ডেভিড, নিরাবরণ ডেভিড এ মুহূর্তে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে; আপনার দিকে অবশ্য তাকানোর ফুরসত নেই তার। একটু পরেই শুরু হবে গোলিয়াথের সঙ্গে মহারণ, সেই অসম যুদ্ধে কি হবে তা আপনি জানেন, আমি জানি কিন্তু ডেভিড এখনো জানে না। চোখ উত্তেজনার সামান্য আভাস, বাঁ হাতে লুকিয়ে রয়েছে গুলতি, অস্বাভাবিক বড় ডান হাতের মুঠোয় ধরা আছে পাথর – বাঁদিকে তাকিয়ে রয়েছেন ডেভিড শত্রুর প্রতীক্ষায়। রেনেসাঁর স্বর্ণযুগেও এহেন পাথর-ছেনা কাজ স্তম্ভিত করে দিয়েছিল তাবৎ শিল্পীসমাজকে, সাধারণ মানুষের কথা না ধরাই ভালো। ডেভিডের ছবি অবশ্য তার কয়েকশ বছর আগে থেকেই ইটালিয়ান শিল্পীরা আঁকতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু সে ছবি জয়োদীপ্ত বীরের ছবি যার হাতের মুঠোয় ধরা থাকত কিম্বা পায়ের তলায় লুটোত গোলিয়াথের ছিন্ন শির। মিকেলেঞ্জেলো সেই ট্র্যাডিশনাল ছবিটিকে শুধু বাস্তব নয়, দর্শকের অবচেতন থেকেও সরিয়ে দিলেন ডেভিডের এই নতুন অবতারে। কিন্তু বাইবলীয় আখ্যানকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার জন্য নয়, ডেভিডকে পাঁচশ বছর ধরে মানুষ মনে রেখেছেন অদম্য যৌন অবদানের জন্যও।

আর তাই আপনার চতুর্দিক থেকে, থেকে থেকে ট্যুর গাইডদের কাছে দর্শকদের কাতর প্রশ্ন শুনতে পাচ্ছেন – প্লীজ বলুন না, আসল মডেলটি কে? গাইডরা যতই স্মিত হেসে বলুন সত্যিকারের কোনো মডেল ছিল না, দর্শকরা সে কথা থোড়াই মানেন। সত্যি কোনো মডেল না থাকলে পাথরে এত নিখুঁত করে শিরা ফুটিয়ে তোলা যায়?

D1

নাকি হাঁটুর মাংসপেশী হয়ে ওঠে এত জীবন্ত?

D2

গোড়ালিটাই বা এত সুঠাম করে বানানো যায়  কি করে?

D3

গাইড মাথা নাড়তে থাকেন – কি বলব বলুন, ধরে নিন  মিকেলেঞ্জেলো ঈশ্বরের বরপুত্র ছিলেন। রেনেসীঁয় ভক্তির খাসমহলে দাঁড়িয়েও দর্শকরা মেনে নিতে পারেন না এহেন মিরাকল তত্ত্ব। কয়েকজন এতই বিমর্ষ হয়ে পড়েন যে পিছন দিক থেকে ঘুরে যেতে ভুলে যান। আপনি অবশ্যই সে বান্দা নন, আপনি যাবেন এবং সোৎসাহে বলে উঠবেন – ফুঃ, কোথায় লাগে ব্র্যাড পিট।

D4

এত অ্যাথলেটিক চেহারা দেখেও আপনার অবশ্য ইনফিয়রিটি কমপ্লেক্স দেখা দেয়নি , বরং চতুর্দিকে বিজাতীয় ভাষায় আফশোস শুনে একটু বিরক্তই হয়েছেন ডেভিডকে এরা শুধু মডেল বানিয়ে রেখেছে দেখে। ডেভিড তো স্বাধীনতার-ও প্রতীক, প্রতীক সেই সব স্বাধীনচেতা মানুষদেরও যারা ফ্লোরেন্সের অটোক্র্যাটিক রাজপরিবারকে উৎখাত করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। বাইবলে বর্ণিত সেই কিশোর মেষপালকের সঙ্গে তাই আদতে এই ডেভিডের মিল খুব নগণ্যই, গল্পটুকু শুধু খাড়া করা হয়েছিল হয়ত  চার্চকে সন্তুষ্ট করতেই। গুলতি-পাথর নিয়েও ডেভিডের লক্ষ্য তাই শুধু গোলিয়াথ বধ নয়, স্বাধীনচেতা মানুষের প্রাপ্য মর্যাদাটুকু ফিরিয়ে আনার।পাশ থেকে আবার গাইড ফিসফিস করে কন্সপিরেসি থিয়োরী ফাঁস করার কায়দায় জানিয়েছেন ডেভিডের চোখ কিন্তু রোমের দিকে ফেরানো, সেরকম ভাবেই ভাস্কর্যটিকে রাখা হয়েছে। আর হঠাৎই আপনার মনে পড়ে যাবে  আরেক বীরপুরুষকে, যদিও গল কিন্তু তিনিও জানতেন সব রাস্তাই নিয্যস রোমে যায়। তাই হিচহাইকিং করতে যাওয়ার সময় হাতের বুড়ো আঙ্গুলের ডিরেকশন ঈশান হোক কি নৈঋত, কোনো একটা দিকে থাকলেই হল – মনে পড়ছে?

 

শেষবারের মতন   অপাঙ্গে দেখে নিতে গিয়ে আপনার নজরে পড়বে সিল্কি চুলের সেই ইস্ট এশিয়ান জুড়িকে যারা নিজেদের সেলফি তুলতে ব্যস্ত। এ সেলফি অবশ্য যেমন তেমন সেলফি নয়,  তোলার জন্য  কসরত দরকার  –  চোদ্দ ফুটের ডেভিডের বিশেষ  বডিপার্টটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে ছবি তুললেই তো হবে না, মুখের সঙ্গে নিজেদের  টি- শার্টের ছবিটিকেও নিয়ে আসতে হবে যে। ছবির নিচেই সেখানে জ্বলজ্বল করছে – Wow, David!

Wow? বিলক্ষণ!