পরিচয়পর্ব – ৩

“বাংলায় ভালো ডিটেকটিভ গল্প লেখা সম্ভব নয়” – বললেন সুধীন, বর্ষার রাতে পরিচয়ের আড্ডায় আজ শার্লক হোমসকে নিয়ে চায়ের কাপে তুফান উঠেছে। নব্য এবং তরুণ সদস্যদের অনেকেই আগাথা ক্রিস্টির পোয়ারোকে নিয়ে অভিভূত,  বয়স্ক একনিষ্ঠ গোয়েন্দগল্প প্রেমীরা তুমুল ভাবে কন্যান ডয়েলের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন। সুধীন সাধারণত এরকম আলোচনায় কোনো পক্ষই নেন না, মাঝে সাঝে টিপ্পুনী কেটে দু’পক্ষকেই উত্তেজিত করে তোলেন।

শ্যামল ঘোষ বললেন “কেন দাদা? শরদিন্দুবাবু কিন্তু ভারী চমৎকার লিখছেন; ‘পথের কাঁটা’ আর ‘সীমন্ত-হীরা’ দুটোই পাক্কা ইউরোপীয়ান ফিকশন।”

স্টেটসম্যান-এ গান্ধীকে নিয়ে জোর সমালোচনা করা হয়েছে, নীরেন রায় এতক্ষণ বেজায় ভুরু কুঁচকে সেটাই পড়ছিলেন। “রাবিশ” বলে কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে বললেন “ডিটেকটিভ ফিকশন মাত্রেই অল্পবিস্তর ট্র্যাশ তবে দীনেন্দ্রকুমারের রবার্ট ব্লেক এককালে সবাই পড়ত, পপুলারিটি যদি ভালো-খারাপ বিচারের একটা ডাইমেনসন হয় তবে সুধীনকে কাউন্টার করার মতন অন্তত একটা উদাহরণ আছে”।

“হাসাবেন না, শেষে রবার্ট ব্লেক? নামগুলো মনে আছে তো? কুহকিনী রঙ্গিনী, চীনের জুজু, বাটপাড় বামন…ছোঃ”, ব্যোমকেশের বদলে রবার্ট ব্লেক কে দিয়ে নীরেন কাউন্টার করছেন দেখেন শ্যামল ঘোষ একটু উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন কিন্তু সুধীন হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে বললেন “শরদিন্দুর বাবুর লেখা আমার এখনো পড়া হয়ে ওঠেনি বটে তবে বাংলা গোয়েন্দা গল্পের লেখকরা সাধারণত এত ভণিতা করেন এবং নায়িকাদের নিয়ে এত ন্যাকামো,  ও পড়লে আমার বিবমিষা হয়”।

“তাহলে নায়িকাবর্জিত  একটা কাহিনী শুনবেন নাকি সুধীন বাবু?” ঘরের কোণ থেকে কথাটা ভেসে আসতে সবাই ঘুরে তাকিয়ে দেখেন মজিদ করিম বেশ আয়াশ করে সিগারেটে একটা সুখটান দিয়ে হাসছেন। করিম কাস্টমসের কর্তাব্যক্তি, ভারী সুদর্শন দেখতে, গল্প-ও করেন জমিয়ে। সত্যেন বোস আধশোয়া হয়ে ছিলেন, বললেন “সে কি হে, কোনো ড্যামজেল ইন ডিসট্রেস নেই আর তুমি ডিটেকটিভ গপ্পো  ফেঁদে বসেছ?” করিম হাসতে হাসতে বললেন  “শুনেই তো একবার দেখুন”।

“বছর দুয়েক আগের ঘটনা, আমার বন্ধু অমিয় তখন লালবাজারের গোয়েন্দা দপ্তরে পোস্টেড। কাস্টমসের কিছু কাজে লালবাজারে যেতে হয়েছিল, কাজ শেষ হতে হতে প্রায় রাত নটা বেজে গেছে। ভাবলাম একবার অমিয়র ঘরে ঢুঁ মেরে যাই, গোয়েন্দা দপ্তরে প্রায়শই মাঝরাত অবধি কাজকর্ম চলে। অমিয়র ঘরে ঢুকে দেখি সে জনা দুই অধস্তন কর্মচারীকে বিস্তর বকাবকি করছে। আমাকে ঢুকতে দেখে অমিয় বলল “এই সব ওয়ার্থলেস লোকজনকে কাস্টমসে নিয়ে যা দিকিন; আবগারি দপ্তরে বসে নেশা করুক কেউ কিছু বলবে না, ওটাই দস্তুর কিন্তু খোদ লালবাজারে বসে এসব মাতালদের নিয়ে চলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” একজন রোগা করে, চশমা পরা ভদ্রলোক তাঁর ব্যাকব্রাশ করা মাথায় আনমনে হাত চালিয়ে কাঁচুমাচু মুখে বললেন “সত্যি বলছি সার, কিচ্ছুটি মিলল না”।  অমিয় হতাশ হয়ে বসে পড়ে বলল, “একটা বন্ধ ঘর, একটা ছোট্ট ঘুলঘুলি ছাড়া কিচ্ছু নেই; সে ঘুলঘুলি দিয়েও একটা চড়ুই পাখি ছাড়া অন্য কিছু গলতে পারবে না – বৌবাজারের সস্তা মেস, বুঝলে কিনা? নেহাত গন্ধটা সুবিধের ঠেকছিল না বলে মেসের মালিক এসে দরজা ভাঙ্গেন, নাহলে কে জানত ভদ্রলোকের ডেডবডি তিনদিন ধরে ওখানে পড়ে আছে?  নাকমুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়েছে, ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু।  আর চোখদুটো প্রায় ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে।”

শ্যামল ঘোষ বলে উঠলেন “ভয় পেয়েই মারা গেছেন বলছ?”। করিম বললেন “তাই তো মনে হয়। কিন্তু প্রশ্নটা হল চতুর্দিক থেকে বন্ধ ঘরে কেই বা ঢুকে ভয় দেখাল, আর কিভাবেই বা ঢুকল?”; সত্যেন বোস সোৎসাহে উঠে বসে বললেন ” তাই বলো, লকড রুম মিস্ট্রি! অ্যাদ্দিন এডগার পো’র লেখাতেই পড়ে এসেছি শুধু, কলকেতা শহরেও যে এসব রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটেছে, জানা ছিল না তো। বলো হে করিম, তারপর হলটা কি?”।

“আমি অমিয়কে বললাম “ঘরটা ভালো করে দেখেছ নিশ্চয়? আফটার অল, বৌবাজার চত্বরের পুরনো বাড়ি, গুপ্ত সিঁড়ি টিড়ি থাকা কিছু অস্বাভাবিক নয়”। অমিয় মাথা নাড়তে নাড়তে বলল , “সে সব দিক থেকে কোনো ধোঁয়াশা নেই; বাড়ির মালিক নিজেও বলেছেন আর আমরা তন্ন তন্ন করে দেখেছি – ঘরে সত্যিই অন্য কোনো ভাবে ঢোকা সম্ভব নয়”।  রোগা ভদ্রলোক গলা খাঁকরে বললেন “সে কথাই তো বলছিলাম সার, সবাই তাজ্জব বনে গেছে। ঘরের কুটোটি নড়েনি; হাতের ছাপ, পায়ের ছাপ কিচ্ছুটি নেই – এমনতর রহস্য জম্মে দেখিনি।”

অমিয় বলল “নীচের উঠোন পেরিয়ে হোটেলের সদর দরজা, উঠোনে ওদের উড়ে বামুন, নেপালি দারোয়ান, আরো কে কে শুয়েছিল। সবাই দিব্যি গেলে বলেছে মাঝরাতের পর কেউ হোটেলের চৌহদ্দি ছেড়ে বেরোয়নি, আর এদিকে ভদ্রলোক মারা গেছেন রাত তিনটের দিকে”। আমি রোগা ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, “ঘরের সামনে কিছু ছিল?” “না সার, কিচ্ছু না ; শুধু ধোপা নিয়ে যাবে বলে ডাঁই করে রাখা কিছু কাপড় চোপড়,  তো সেই গাদাতেও সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় নি ।” শোনা গেল আমতা পেরিয়ে কোন ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরে ভদ্রলোকের বাড়ি, ওই দিন তিনেক আগেই ফিরেছিলেন।” করিম একটু থেমে সিগারেটের ছাই ঝাড়ছিলেন, সুধীন বললেন,  “পোস্ট মরটেমেও কিছু পাওয়া গেল না?”

করিম  বললেন, “মেডিক্যাল কলেজের  র‍্যাডনার সাহেব তখন ছিলেন না। তাঁর সহকারী সারা শরীর কাটাছেঁড়া করে কিছু পান নি।”

শ্যামল ঘোষ বললেন, “বাবা, এই বেলা বলে ফেলো দিকিন এটা ভূতের গপ্পো কিনা।” সত্যেন বোস বেজায় ভুরূ কুঁচকে ভাবছিলেন, করিমের দিকে ঘুরে বললেন, “দ্যাখ করিম, লকড রুমকে যদি ভূত বানাস তাহলে কিন্তু আজ বেঁচে ফিরবি না।”

করিম হেসে ফেললেন, “সবুর দাদা, সবুর। র‍্যাডনার সাহেব কিন্তু এখনো অকুস্থলে এসে পৌঁছন নি।”

সত্যেন বিরক্ত হয়ে বললেন, “তো চটপট নিয়ে আয় না বাপু। এত ধানাইপানাই মোটেই সয় না আমার।”

“সেই কথাই তো বলছি। শুনলাম র‍্যাডনার সাহেব পরদিন কলকাতায় এসে পৌঁছচ্ছেন, অমিয় সেকন্ড আরেকটা পোস্ট মরটেম করাতে চায় সাহেব থাকতে থাকতে। আমারো এত কৌতূহল হচ্ছিল, পরের দিন দুপুরবেলা অমিয়র সঙ্গে লাশকাটা ঘরে গেলাম। গিয়ে দেখি বেজায় লালমুখো সাহেব কিন্তু আমাদের দেখে ভারী মিষ্টি হাসি হাসলেন। আগেরদিনের সেই রোগা ভদ্রলোক-ও ছিলেন, আমাদের দিকে সরে এসে ফিসফিস করে বললেন “স্যার, সাহেব কাঁঠাল খেতে চাইছেন।”

অমিয়র চিরকালই মাথা গরম, সে তো রেগে একসা – এত গুরুত্বপূর্ণ  একটা কাজ আর ইনি কাঁঠাল খেতে চাইছেন? মামার বাড়ি? রোগা ভদ্রলোক মিনমিন করতে লাগলেন, আমি মনে করালাম আর  যাই হোক সাহেব চটিয়ে তোর কাজ উদ্ধার হবে না। তাই পেছনের বাজার থেকে কাঁঠাল এল;  সাহেব কাঁঠাল সমেত অটোপ্সি রুমে সেঁধোলেন, আমাদের ঢুকতেও দিলেন না। মিনিট দশেক পর পাকা কাঁঠালের রস মাখামাখি হাতে শিস দিতে দিতে বেরোলেন, সঙ্গে গোটাকয়েক নীলমাছি। অমিয় কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, ওকে ইশারায় চুপ করতে বলে হাত ধুতে চলে গেলেন। অমিয় ফুঁসতে লাগল, রোগা ভদ্রলোক আমাকে বললেন ” দেখলেন তো স্যার, দশ মিনিটে আস্ত একটা কাঁঠাল খেয়ে ফেলল – এ সব সাহেবসুবোরাই পারে।”

ঘন্টাখানেক পর সাহেব আবার দেখা দিলেন, এবার মৃদুমন্দ হাসতে হাসতে নিজের হাতে অটোপ্সি রুমের দরজা খুলে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। অমিয় অস্ফুটে ‘ঢং’ বা ওরকম কিছু একটা বলতে বলতে ঢুকল। টেবলে দেখি লাশ পড়ে, মাথায় বিশাল ব্যান্ডেজ। সাহেব আস্তে আস্তে ব্যান্ডেজ খুলতে লাগলেন। শেষ প্যাঁচটা খুলতেই চোখের সামনে যা জিনিস দেখলাম সে জীবনে ভুলতে পারব না।”

করিম থামলেন, আর যথারীতি ঘরে প্রশ্নের ঝড় বইতে লাগল, “কি, কি, কি?” সত্যেন বোস হতাশ হয়ে বললেন, “ক্লাইম্যাক্সের আগে থামতেই হবে, এই মাথার দিব্যিটা তোদের কে দিয়েছে একটু বলবি?”

করিম বললেন, “ব্যান্ডেজের মধ্য থেকে বেরিয়ে এল অজস্র কাঁঠালের কোয়া আর তাতে, তাতে………”

সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। নীরেন রায়ের মতন গম্ভীর মানুষ অবধি অধৈর্য হয়ে পড়লেন, “বলি দেখলেটা কি?”

“আর কি,  গোটা দশেক জাম্বো সাইজের মিলিপিড!”

“মানে, মানে………”

“হ্যাঁ দাদা, বাংলায় যাকে বলে কেন্নো, থিকথিক করছে। ভদ্রলোক গ্রামের পুকুরে চান করতে নেমেছিলেন, টের পান নি কখন কান দিয়ে ঢুকে পড়েছে।”

সকলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন খালি সত্যেন বোস বেদম রেগে বললেন, “আমার গপ্পোটা শোন, অন্তত কেন্নোকে লকড রুমের খুনী বানাব না।”

“কেম্ব্রিজ থেকে তিন কিলোমিটার দূরের শেলফোর্ড গ্রামের থানায় ফোন এল – মিস্টার ম্যাকিনটশকে চার দিন ধরে  খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফোন করেছিলেন মিসেস ম্যাকিনটশ,  ফোন পেয়েই ছোকরা ডিটেকটিভরা দৌড়েছে ম্যাকিনটশ লজের দিকে। ভদ্রলোক যেমনি বদমেজাজী খিটখিটে তেমনি বিটকেল দেখতে, ভদ্রমহিলা আবার ততোটাই নম্র আর যাকে বলে ডানাকাটা সুন্দরী। বুড়োর ভয়ে কেউ বাড়ির ধারেকাছে ঘেঁষত না, এখন প্রথম সুযোগেই দে দৌড় – যতই জানুয়ারীর রাতের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা হোক না কেন । মিসেস ম্যাকিনটশ  অত টেনশনের মধ্যেও যত্নআত্তির ত্রুটি রাখলেন না। গরম টোস্ট, মাংসের চপ, স্টু, পুডিং অনেক কিছু খাওয়ালেন। ডিটেকটিভদ্বয় অত চর্ব্য চোষ্যের মধ্যেও মাথা ঠান্ডা রেখে অনেক নোটস নিলেন, হাজার গন্ডা প্রশ্ন করলেন, আর ঘন্টা দুয়েক পর সর্বতোভাবে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নিলেন। ঠান্ডার মধ্যে কাঁপতে কাঁপতে বাগান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অনেকক্ষণ ধরে হাত নেড়ে মিসেস ম্যাকিনটশকে বাই বাই করলেন। খালি দেখতে পেলেন না, সুন্দরীর বাঁ হাতটি জানলার চালের ওপর থেকে একের পর একে আইসিকল ভেঙ্গে চলেছে।”

সবাই প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে সত্যেন বোসের দিকে তাকিয়ে, খালি করিম অবাক হয়ে বললেন “এটা কি হল সত্যেন দা?”

সত্যেন বোস উঠে দাঁড়িয়ে চপ্পলে পা গলাতে গলাতে বললেন, ” মার্ডার ওয়েপন বলে দিলাম তো কি হল। ডেডবডিটার কি হল সেটা ভাব।”

আবার মিনিট খানেকের স্তব্ধতা; বাকিরা কি হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করছেন এমন সময় করিম চেঁচিয়ে  উঠলেন “সত্যেন দা, জঘন্য। পুরো বিকেলটা মাটি করলেন।” বলতে বলতেই করিম ছুটেছেন  বাথরুমের দিকে।

সত্যেন বোসে দরজার কপাট খুলতে খুলতে মুচকি হাসলেন, “লকড রুম মিস্ট্রিটাকেই মার্ডার করবি আর এটুকু শাস্তি পাবি না, তাও কি হয়?”

(পরিচয়পর্ব – ২, পরিচয়পর্ব – ১)

 

 

 

 

 

Advertisements

One thought on “পরিচয়পর্ব – ৩

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s