মিশন ইম্পসিবল বা একটি সর্বৈব সত্যি কাহিনী

অফিসে বসে লম্বা লম্বা হাই তুলছিলাম এমন সময় শ্রীমতী ও দুদ্দাড় শব্দ করে ঢুকলেন।  ও কে দেখেই তাড়াতাড়ি মুখে হাত চাপা দিতে হল, হাই তুলছি টের পেলেই সঙ্গে সঙ্গে কাউন্সেলিং-এ বসে যাবেন। এত হাই মানে তুরস্ক নিশ্চয় পোষাচ্ছে না, ব্যাটা সটকে পড়ার তাল করছে। দিন কয়েক আগেই মনে হয়েছিল আমি গোমড়া মুখে আছি, ঝাড়া চার ঘন্টা ধরে এসে বারে বারে জিজ্ঞাসা করে গেলেন, “বলো না, কি হয়েছে”, যতই বলি কই কিচ্ছুটি হয়নি তো  ততই সেই এক কথা “কে বকেছে, কে দিয়েছে গাল?” শেষে অনেক ভেবে বললাম বোধহয় ছাত্রছাত্রীদের খাতা দেখতে দেখতে অজান্তেই গালের মাংসপেশি স্টিফ হয়ে গেছে। অপোগন্ড আন্ডারগ্র্যাডরাই যে কারণ সেটা জেনে ভারী খুশি হয়ে চলে গেলেন। কিন্তু বার বার তো  এক কুমীরছানা দেখানো যায় না, মুখে হাত চাপা দিয়েই ভাবতে শুরু করেছি এবারের এক্সকিউজ কি দেওয়া যায়।

ও কিন্তু সেসবের ধার দিয়ে গেলেন না। বেজায় ব্যাজার মুখ করে চেয়ার বসে বললেন , “ভাল্লাগছে না, ভাল্লাগছে না, ভাল্লাগছে না”। আমার প্রথমেই মাথায় এল নিশ্চয় ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স পেপার রিজেক্ট করেছে। দেঁতো হাসি হেসে সহানুভূতি জানাতে যাচ্ছি, ফোঁস করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন “সুখে আছো, খাল কেটে কুমীর ডেকো না”। এতক্ষণে ক্লীয়ার হল ব্যাপারটা, ও-র সাড়ে ছ বছরের চ্যাম্পিয়ন মেয়ে নিশ্চয় পিয়ানো লেসনে যায়নি বা ইংলিশ স্টোরিবুক বাদ দিয়ে তুর্কী গপ্পের বই পড়েছে বা দিদার সঙ্গে দু ঘন্টা অনর্থক আড্ডা দিয়েছে – কিছু একটা গোলমাল নিশ্চয় বাধিয়েছে। ওর পিয়ানো স্কুলের লেসন শেষ করার জন্য আবার একজন প্রাইভেট পিয়ানো টিউটর আছেন, ভাবলাম নিশ্চয় হোমওয়ার্ক  শেষ করেনি। কিন্তু জিজ্ঞাসা করায় হল আরেক বিপত্তি, আবার একটা কাতরানোর শব্দ, “মেয়ে আমার সোনার টুকরো। সব হল আমার দোষ, কি করে যে এত কেয়ারলেস মিসটেক করলাম”। অবস্থা বেগতিক দেখে বললাম “স্টারবাকসে গিয়ে একটু জিঞ্জারব্রেড লাটে খেয়ে এলে হত না?” অত ফেভরিট পানীয়ও দেখলাম আজ হালে পানি পেল না। ও থমথমে মুখে বললেন “না রে বাবা, কালকে পিনারের বাড়িতে  যাওয়া ইস্তক খাওয়াদাওয়ার সব ইচ্ছে চলে গেছে”।  পিনার ও-র বাল্যবন্ধু এবং তাঁর ছেলে এবার স্যাটে চব্বিশতে সাড়ে তেইশ বা এরকম কিছু স্কোর করেছে। ভাববেন না যেন সেই উপলক্ষ্যে খাওয়াদাওয়া ছিল, পঞ্চাশ মার্কস যে কাটা গেছে সেই নিয়ে সান্ত্বনা দিতে পিনারের ক্লোজ কিছু বন্ধু জমায়েত হয়েছিলেন – খানিকটা পেপ টক, খানিকটা “আরে পৃথিবী কি শেষ হয়ে গেল নাকি” ধরণের কথাবার্তা, এই আর কি।  আমি ভয়ে ভয়ে বললাম , “পিনারের ছেলের অ্যাডমিশন ডিসিশন এসে গেছে?” ও রাগ রাগ মুখে তাকালেন এবার, “চুলোয় যাক পিনারের ছেলে। বেটি অ্যাদ্দিনের বন্ধু হয়ে খবরটা বেমালুম চেপে গেল?”

পিনার যে ঠিক কি করেছে সেটা মালুম হচ্ছে না। কৌতূহলও হচ্ছে বিস্তর আবার অবস্থা দেখে সরাসরি জিজ্ঞাসার করারও সাহস পাচ্ছি না – উভয় সঙ্কট। মিনিট দুয়েক চুপচাপ থেকে বললেন, “হার্ভার্ড-স্ট্যানফোর্ড তো ফস্কাল, ডার্টমাউথ ফাউথে হলে হয়”। আমি মাথা চুলকে বললাম “ওর জি-পি-এও তো ফোর পয়েন্ট ও না? ডার্টমাউথ হয়ে যাবে বোধহয়।” ও এবার বোমার মতন ফেটে পড়লেন, “এটা কোথাকার জংলী রে! বলছি না  পিনারের ছেলে কে নিয়ে আমার ঘন্টা যায় আসে, আমার মেয়ের কথা হচ্ছে এখানে।” আমি এক গাল হেসে তাই তো – তাই তো বলতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করলাম শেষ বাক্যাংশ টুকু, “আমার মেয়ের কথা হচ্ছে”। এবার যথার্থ চমকেছি, শ্রীমতীর সঙ্গে প্রতি মোলাকাতের পর পরই ভাবি পৃথিবীতে আর কিছুই আমাকে অবাক করতে পারবে না, কিন্তু সে গুড়ে বালি। শ্রীমতী ও-র পাশের অফিসে থাকতে গিয়ে কত যে আয়ুক্ষয় হল সে খবর রাখে কজন। হার্টের বেগতিক দশা দেখে এমত অবস্থায় সাধারণত চুপচাপ থাকি, আজকে আর না পেরে বললাম “ইয়ে, কিন্তু এখনো বছর বারো দেরি আছে না?” শ্রীমতী কাতর গলায় বললেন “ওরে ও ভূত, তুই যে এমনটাই ভাবিস সে আমি জানি। কিন্তু আমি যে তোর মতন কি করে ভাবলাম সেটাই তো ভেবে পাচ্ছি না।” আমি তাও মাথা চুলকোচ্ছি দেখে কাঁদো কাঁদো গলায় বিস্তারিত খবরটুকু দিলেন।

শুকনো ইস্কান্দর আর দোনর কাবাব চিবুতে চিবুতে ও  পিনারকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, পিনার-ও কেঁদে কেটে একসা। তারপর একটু সামলে উঠে চোখ মুছতে মুছতে বললেন “আমার কথা ছাড়, আমার তো যা সর্বনাশ হওয়ার হল। কিন্তু তুই হার্ভার্ড পি-এইচ-ডি হয়ে এ ভুল করলি কি করে?” কথাটার মধ্যে কিরকম একটা অশুভ ইঙ্গিত দেখে ও-র কাবাব  চিবুনো বন্ধ হয়ে গেল, তাড়াতাড়ি একটু জল খেয়ে বললেন “কি বলছিস বল তো?”  পিনার তাতে জানালেন  আইভি লীগের টপ স্কুল টার্গেট করে থাকলে ট্রেনিং আইডিয়ালি চার বছর বয়সে শুরু হয়ে যাওয়া উচিত। ও চোখ কপালে তুলে বললেন, “সেকি, ওটা আট বছর নয়?” বন্ধুর ইডিয়সি দেখে পিনার ওই শোকাবহ আবহাওয়াতেও একটু মৃদু হাসলেন “তুই কি পাগল হলি? মরিস কলেজ প্রি-নার্সারি তে ভর্তি করছে তিন বছর বয়সে, তারপর নেবে ক্লাস ওয়ানে, তারপর সেই ক্লাস ফাইভে। অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে ওই দুটো ক্লাসে ঢোকার চান্স যথাক্রমে হাজারে এক এবং পাঁচ হাজারে এক। এদিকে মরিস কলেজের বোর্ড অফ ট্রাস্টি হার্ভার্ডে ডোনেট করেছে কুড়ি মিলিয়ন, স্ট্যানফোর্ডে পনের – দু’জায়গা থেকেই দুটো করে সিট বাঁধা।” তারপর একটু দোনামনা করে বললেন “এই যে মেয়েকে দুম করে সাঁতারে ভর্তি করে দিলি, একবারও ভাবলি না মেয়ে যদি আইভি লীগের বিজনেস স্কুলে যেতে চায় তখন কি হবে? সেখানে বাস্কেটবল প্লেয়ারদের চান্স অনেক বেশী, লীডারশিপ কোয়ালিটি দেখানোর সুযোগ আছে”।

ও টেনশনের চোটে আরো জল খেতে খেতে বললেন, “সব্বোনাশের মাথায় বাড়ি, এসব তো আগে বলিস নি। আচ্ছা, এই যে পিয়ানো শিখছে, এতে কোনো লাভ নেই?” পিনার মাথা নাড়লেন, “আছে, যদি মেয়ে মেডিক্যাল স্কুলে যেতে চায়। অ্যাপারেন্টলি সার্জনদের হাত স্টেডি থাকার জন্য পিয়ানো জানাটা মাস্ট,  আর শেষ বছর দশেকে অ্যাডমিটেড বাচ্চাদের স্টেটমেন্ট অফ পারপস দেখলে বোঝাই যায় এটা নেহাত কথার কথা নয়।” ও-র মুখ একটু জ্বলজ্বল করতে শুরু করেছিল কিন্তু পিনার আবার হতাশ হয়ে মাথা নাড়লেন, “কিন্তু তুই তো সবদিক থেকেই গুব্লেট করে রেখেছিস। মেয়ের ছ’বছর বয়স হয়ে গেল অথচ এখনো অবধি আমেরিকায় একটা সামার স্কুলে পাঠালি না।” ও ভারী কাঁচুমাচু মুখে বললেন, “এই তো, এই সামারেই নর্থ ক্যারোলিনায় একটা সামার স্কুলে যাবে।” পিনার ততোধিক হতাশ হয়ে বললেন, “ওরে অ্যাদ্দিনে অন্তত দু-তিনটে সামার স্কুলে যাওয়া উচিত ছিল। সিলিকন ভ্যালিতে অন্তপ্রেনিওরাল অ্যাকটিভিটিজের যে সামার স্কুল, সেখানে ওয়েটিং লিস্ট অলরেডি বছর পাঁচেক লম্বা। এদিকে অ্যাডমিশনের সময় সি-ভি তে বছর পাঁচেক বয়স থেকে বিজনেস এক্সপেরিয়েন্স না দেখলে সে সি-ভি যাবে সোজা ট্র্যাশক্যানে”। ও ততক্ষণে পিনার হাত দুটো জড়িয়ে ধরেছেন, “বাঁচা পিনার, প্লীজ বাঁচা।”

আমিও কাতর গলায় বললাম, “অতঃ কিম?” ও শুকনো মুখে জানালেন পিনার কোনো ভরসা দেয়নি তবে বলেছে যে পাঁচটি কনসালটেন্সি ফার্ম এতটা লেট স্টেজেও কিছু ব্যবস্থাপত্র করতে পারে তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখবে। সেই সুবাদেই ফোন আসার কথা ছিল দুপুর দুটোয়, অথচ এখন বাজে দুটো দশ। টেনশনে দেখলাম নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, গাল লাল হয়ে উঠেছে, জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন। আমি একটা বাবল র‍্যাপ এগিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম, যদি ফাটাতে ফাটাতে একটু টেনশন কমে। এমন সময় শোনা গেল ও-র অফিসে ফোন বাজছে, ও তিড়িং করে লাফিয়ে উঠেই দৌড় মারলেন।

দিন পাঁচেক ও-র দেখা পাইনি, আজ আবার দেখা হল। এসে জড়িয়ে ধরে বললেন “তুই ছেলেটা নেহাত অপয়া নস, এ যাত্রা বেঁচে গেলাম তোকে সাতকাহন শুনিয়ে”। আমি কাষ্ঠ হাসি হেসে শুধোলাম, “অন্ত্রপ্রেনিওরাল সামার স্কুলে তাহলে যাচ্ছে?” ও মাথা নাড়লেন “নাহ, সেটার ওয়েটিং লিস্ট সত্যিই পাঁচ বছর লম্বা কিন্তু ইউনেস্কো ডিজাস্টার রিলিফ সামার ক্যাম্পে ঠিক একটাই জায়গা ছিল, থ্যাঙ্ক আল্লা, সেটা পেয়ে গেলাম”।

আমিও হাঁফ  ছাড়লাম, “কনগ্র্যাচুলেশন্স। এবার তাহলে একটু রিল্যাক্স করতে পারেন।”

ও চোখ  পাকালেন, “সাধে তোকে গাঁইয়া বলি, কি দেখে যে চাকরিটা দিলাম! অ্যাডমিশনের সময় ষোল পাতা সি-ভি লাগবে তা জানিস? ভাবছি রমজান ব্রেকে তুর্কী-সিরিয়া বর্ডারে আন্ডার এইট এজ গ্রুপের  মেয়েদের নিয়ে একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু করব। কাউকে আবার এ আইডিয়াটা বলে দিস না, দুর্ভাগা  মধ্যপ্রাচ্যের  অন্ধকার আকাশে দুরকম আলোর ঝলক – অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান আর এই ফুটবল টুর্নামেন্ট। সেই নিয়ে এসে লিখলেও হার্ভার্ড গলবে না বলছিস?”

IvyCrests

Advertisements

9 thoughts on “মিশন ইম্পসিবল বা একটি সর্বৈব সত্যি কাহিনী

  1. ঘটনাটা কি সত্যি, নাকি সম্পূর্ণ মস্তিষ্কপ্রসূত, নাকি সত্যি ঘটনার ওপর কল্পনার তুলি? যদি নির্জলা সত্যি বা তার কাছাকাছিও হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে যে দি এন্ড ইজ নিয়ার 🙂

    ভাল লাগল।

    Like

    • প্রায় নির্জলা সত্যি, প্লাস মাইনাস ৫ পারসেন্ট ধরতে পারেন। প্লাস এই জন্য বলছি যে ওই কনসালটেন্সি ফার্মের নতুন মেম্বরদের মধ্যে এমনকি প্রেগন্যান্ট মহিলারাও আছেন, যেটা আর ব্লগে লিখিনি।

      Like

  2. ওরে বাবারে, কি সাংঘাতিক! ছোট্ট মেয়েটির কথা ভেবে বেশ কষ্ট হচ্ছে। 😦
    লেখাটা দারুণ লাগলো। 🙂

    Like

  3. এই জন্যেই এই পোড়া দেশটার কিছু হবে না। আমেরিকা কত্ত এগিয়ে গেছে, আর এখানে আইআইটির প্রস্তুতি এখনও মোটে ক্লাস নাইনে শুরু হয়। 😛

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s