ফ্রয়েড এবং যে ছেলেটি ট্রেন চালাতে চেয়েছিল

এপ্রিলের ঝিরঝির বৃষ্টি চলছেই, ধূসর ভিয়েনার থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ছেলেটির দিকে তাকালেন ফ্রয়েড। ব্যারগাসে অ্যাভিনিউ এর উনিশ নম্বর বাড়িতে ঢোকা ইস্তক তার আড়ষ্ট ভাবটা কাটেনি, মার পাশে একটু জবুথবু হয়েই বসে আছে। ফ্রাউ ওবেরহিউমর কাতর স্বরে বললেন, “প্রফেসর, কি উপায় এখন?”; ফ্রয়েড বললেন “শেষ এক বছরে তাহলে বার কুড়ি আপনাদের ভিয়েনার বাইরে যেতে হয়েছে?”। “হ্যাঁ, এবং প্রত্যেকবারেই ট্রেন নিতে হয়েছে, গাড়ি বা বাসে কাজ দেয় নি – আমরা সে চেষ্টা করেছি।” 

ফ্রয়েড আলতো স্বরে ডাকলেন, “হান্স”, বছর তেরোর ছেলেটি তার অস্বাভাবিক নীল রঙের মণিটি সম্পূর্ণ মেলে ধরে তাকাল। “তোমার এখন ঘুম পাচ্ছে?” ছেলেটি আস্তে আস্তে দু’দিকে মাথা নাড়ল। ফ্রাউ আবার কাতর হয়ে বললেন, “হের ফ্রয়েড, শুধু এখন কেন কখনোই ওর ঘুম পায় না।   আমরা প্রথমে ভাবতাম হান্স বোধহয় ইনসোমনিয়ায় ভুগছে। এত ছোট একটা ছেলের কেন এরকম সমস্যা হবে ভেবে আমরা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিলাম। হের ওসেনবেইককে তো আপনি চেনেন, উনিই এক বছর ধরে হান্সের চিকিৎসা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। কড়া ডোজের ঘুমের দাওয়াই দিলে কাজ হয় বটে কিন্তু এরকম ভাবে কতদিন চলবে? উনিই শেষে আপনার কাছে পাঠালেন”।

“একমাত্র ট্রেনে চাপলে তবেই ঘুম আসে এটা আবিষ্কার করলেন কি করে?”

ফ্রাউ হান্সের দিকে তাকিয়ে বললেন “ওই তো বলল আমাদের। বলল ‘মা আমাকে একবার ট্রেনে করে কোথাও নিয়ে যাবে, মনে হয় ট্রেনে আমার ঘুম আসবে’। ওর কথা শুনেই গ্লগনিটজের ট্রেনে চাপলাম আমরা, ভাবলাম একটু পাহাড়েও ঘুরে আসা হবে আর যদি এ সমস্যাটার-ও কিছু সুরাহা হয়। গ্লগনিটজে একটাবারের জন্যও চোখের পাতা এক করেনি কিন্তু অবাক কান্ড ট্রেনে করে যাতায়তের সময় দু’বারই বড় শান্তিতে ঘুমোল”।

ফ্রয়েড টেবলে চুরুট ঠুকতে ঠুকতে মুখ তুলে তালাকেন হান্সের দিকে; এখনো সে মাথা নামিয়ে বসে আছে, ঘুম না আসার ব্যাপারে যে স্পষ্টতই বিব্রত সেটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?”, হান্স একটা দায়সারা মাথা নাড়ল। “স্কুলের পর কি করবে কিছু ভেবেছ?”, এবারও নেতিবাচক ইঙ্গিত তবে ঘাড় নাড়াটা আরেকটু জোরালো। এই সময় মা ওবেরহিউমর একটু মৃদু  কাশলেন। ফ্রয়েড তাকাতে বললেন, “আমি কিন্তু জানি হান্স কি হতে চায়”।

ফ্রয়েড লক্ষ্য করলেন হান্স প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মার দিকে তাকিয়েছে, মুখে স্পষ্টতই যন্ত্রণার অভিব্যক্তি। এবং এই অভিব্যক্তি তিনি খুব ভালো করে চেনেন, এ অভিব্যক্তি বিশ্বাসহানি হওয়ার, খুব ভরসা করে বলা গোপন কথা ফাঁস হয়ে গেলে মানুষের চোখেমুখে এই যন্ত্রণাটাই ছড়িয়ে পড়ে”।

ফ্রাউ ওবেরহিউমর  অবশ্য হান্সের তাকানোকে মোটেই পাত্তা দিলেন না, বেশ উৎকণ্ঠিত গলায় বললেন, “কি ভূত যে চেপেছে হের ফ্রয়েড, আপনি বাঁচান। ও হতেও চায় ট্রেন ড্রাইভার।”

ফ্রয়েড একটু অবাক হয়েই তাকালেন হান্সের দিকে, “তাই নাকি? ট্রেনেই শুধু ঘুমোতে পারো বলেই ট্রেন চালাতে চাও নাকি আরো কারণ আছে?”

হান্স বলব কি বলব না ভঙ্গীতে মা’র দিকে তাকাল।

“ভয় কি, আমরা তো গল্প করছি। বিশ্বাস করে বলেই দেখো না।” বয়ঃসন্ধি আসতে আরেকটু দেরি হলেও ফ্রয়েড জানেন এ বয়সীদের সঙ্গে সখ্য পাতানোর জন্য বিশ্বাসস্থাপন প্রথম এবং অতি আবশ্যিক একটি শর্ত।

হান্স কতটা বিশ্বাস করেছে সেটা বোঝা না গেলেও দেখা গেল অস্ফূটস্বরে কিছু বলছে।

ফ্রয়েড কানের কাছে হাত এনে শুনতে না পাওয়ার ভান করায় একটু লজ্জা পেয়ে এবার জোরে বলল, “ট্রেনে চড়তে আমার ভালো লাগে”।

“এতে লজ্জা পাওয়ার কি আছে, বোকা ছেলে? সে  তো আমাদের প্রায় সবারই ভালো লাগে। নতুন জায়গায় যাওয়া যায়, কত আরামে  গল্প করতে করতে, নিশ্চিন্তে ঘুমোতে ঘুমোতে।”

ফ্রয়েড দেখলেন ঘুমের কথাটাকে হান্স সেরকম গ্রাহ্য করল না, কিরকম অন্যমনস্ক স্বরে বলল, “ট্রেনের ঝাঁকুনি আমার ভালো লাগে, মনে হয় সারাক্ষণ ওরকম ভাবে দুলতেই থাকি।”

প্রফেসর এবার সোজা হয়ে বসলেন, “ট্রেনের ঝাঁকুনি তোমার ভালো লাগে?”

“খুব ভালো লাগে, খুব।”

“ট্রেনের ঝাঁকুনির জন্যই তোমার ভালো ঘুম হয়?”

“তা তো জানি না, কিন্তু ঘুমের মধ্যেও আমি ট্রেনের দুলুনি টের পাই।”

“আর তাতে তুমি আরো নিশ্চিন্ত বোধ কর?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ।” এই প্রথম হান্সকে সজাগ দেখাল, কেউ যেন প্রথমবারের জন্য ওর কথাটা বুঝতে পেরেছে।

ফ্রয়েড এবার মার দিকে তাকালেন, “হান্স কি ছোট থেকেই একটু অধৈর্য?”

ওবেরহিউমর সস্নেহে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সে কথা আর বলতে। এত শান্ত ছেলে অথচ খাবার খাওয়াতে কি কষ্টই পেতে হত আমাদের। আমাদের পোষা কুকুর, গাছের পাখি, ওর বাবার স্টাডি-টেবলে রাখা কাঠের সিংহ, একটা একটা করে দেখাই আর একটু একটু করে খায়। ডাইনিং টেবলে তো ওকে বসিয়ে রাখাই যেত না” । বলেই যাচ্ছিলেন, কি খেয়াল হওয়ায় কথা থামিয়ে বললেন, “কিন্তু কেন বলুন তো”? 

ফ্রয়েড জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন ভুরু কুঁচকে, কথাটা কানে গেল কিনা বোঝা গেল না। আচম্বিতে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “ওকে নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি করতেন?”

ফ্রাউ একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “ছোঁড়াছুঁড়ি? এরর, মানে সেরকম তো……”

“বলছি, শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে আবার লুফে নেওয়া – এ ধরণের কিছু করতেন”?

ওবেরহিউমরের মুখে এবার হাসি দেখা দিল, “ওঃ, তাই বলুন। ওর বাবা তো ওই করত ওকে নিয়ে, ওই করেই ভুলিয়ে রাখতে হত, নাহলেই কান্না।”

ফ্রয়েডের মুখে মৃদু হাসির ছোঁয়া, “অফ কোর্স, অফ কোর্স। তা তো হবেই।”

ভদ্রমহিলার একবার  মনে হল ‘তা তো হবেই’ এর মধ্যেও কিছু ব্যঞ্জনা আছে, তারপর ভাবলেন কে জানে, বেশী ভাবছেন বোধহয়। সত্যি কথা বলতে কি ফ্রয়েডের কাছে আসতে হবে শোনা অবধি বেশ টেনশনে ছিলেন। যতই ডাক্তার ওসেনবেইক বলুন “ইনি আপনার ধরাবাঁধা মনস্তত্তবিদ নন”, মন থেকে কু-চিন্তা কখনই যায় না। তারপর ওই মর্মভেদী দৃষ্টি, ওহ্ – শুরু থেকেই এমন তাকিয়ে যেন ফ্রলাইন নিজেই চুরির দায়ে ধরা পড়েছেন। মুখে হাসির ছোঁয়া দেখে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করতে শুরু করলেন।

কিন্তু হা হতোস্মি, আবার মেঘমন্দ্র স্বরে প্রশ্ন, “আপনারা নিশ্চয় ক্যাথলিক?”

ফ্রাউ ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়লেন।

“হান্স বোধহয় স্কুলেও বন্ধুদের সঙ্গে খুব একটা মেশে না?”

প্রশ্নটা যেন ঠিক প্রশ্ন নয়, একটু বক্রোক্তি মেশানো। ওবেরহিউমর মাথা নাড়তে গিয়েও থেমে গেলেন, সত্যি কথা বললে কি দোষটা ওনার ওপরেই আসবে? অবশ্য আদৌ যদি কিছু দোষ থেকে থাকে, সমস্যাটাই তো বুঝছেন না।

হের ফ্রয়েড অবশ্য উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছিলেন না, বেশ আয়েস করে চুরুটে টান দিচ্ছিলেন – যেন উত্তরটা ওনার জানাই আছে।

সেরাত্রে নিজের কেসফাইল আপডেট করতে গিয়ে লিখলেন, ”the existence, then, of these pleasurable sensations, caused by forms of mechanical agitation of the body, is confirmed by the fact that children are so fond of games of passive movement, such as swinging and being thrown up in the air, and insist on such games being incessantly repeated. It is well known that rocking is habitually used to induce sleep in restless children. The shaking produced by driving in carriages and later by railway-travel exercises such as fascinating effect upon older children that every boy, at any rate, has at one time or other in his life wanted to be an engine-driver or a coachman. It is a puzzling fact that boys take such an extraordinary intense interest in things connected with railways, and at the age at which the production of fantasies is most active (shortly before puberty), use those things as the nucleus of a symbolism that is peculiarly sexual. A compulsive link of this kind between railway-travel and sexuality is clearly derived from the pleasurable character of the sensations of the movement. “।

প্রথম যৌনচেতনার অনুভূতি হান্সের জন্য খুব একটা সুখপ্রদ হয়নি। একটা সুপ্ত তাড়না সর্বদা তাকে জাগিয়ে রেখেছে, একমাত্র মুক্তির পথ এসেছে ট্রেন জার্নিতে। কিশোর হান্সের অবচেতন স্পষ্টতই সুখ পেয়েছে ট্রেনের ঝাঁকুনিতে; গোঁড়া ক্যাথলিক পরিবেশ হান্সকে পারিপার্শ্বিক সাহায্যগুলো পেতে দেয়নি। সমবয়সীদের সঙ্গে কথোপকথনই হোক কি নিষিদ্ধ বই, হান্সের জন্য দরকারী হয়ে উঠতে পারত অনেক কিছুই।

লিখতে লিখতে আরেকবার হাসি ফুটে উঠল প্রফেসরের মুখে, মনে পড়ে গেল ফ্রাউ ওবেরহিউমরের স্তম্ভিত মুখটি। এ ব্যাখ্যা যেন কিছুতেই মন থেকে মানতে পারছিলেন না, বেরনোর সময়েও এমন গজগজ করতে করতে বেরোলেন যে বোঝাই যাচ্ছিল বাড়িতে গিয়ে হের ওবেরহিউমরের কাছে প্রফেসরের মুন্ডপাত করা ইস্তক শান্তি নেই। কিন্তু ফ্রয়েড জানেন হান্সের জীবনে একটা পরিবর্তন আসতে চলেছে,  ফ্রলাইনকে যতটা চিনেছেন তাতে অনুমান করতে পারেন  যে নিজের ছেলের জীবনের থেকে ধার্মিক অনুশাসনকে তিনি বড় হয়ে উঠতে দেবেন না।

“সুইট ড্রীমস হান্স”, ডায়েরী বন্ধ করলেন ফ্রয়েড। কাল সকালে ইটালী যেতে হবে, ট্রেনের ঝাঁকুনির কথা ভেবে আজকে রাতে নাও ঘুম আসতে পারে।

sigmund-freud

Advertisements

4 thoughts on “ফ্রয়েড এবং যে ছেলেটি ট্রেন চালাতে চেয়েছিল

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s