নিয়েন্ডারথালের দেশে – ২

Cave1

আলপাইন পাদদেশ এখান থেকেই শুরু, রাত্রের অন্ধকারে সুউচ্চ পাহাড়গুলোকে ঘুমন্ত দৈত্যের মতন দেখতে লাগছে। ঘোড়সওয়ার তাঁর বাহনের বল্গা ধরে থামালেন,  তাঁর পেছনে সার দিয়ে যারা আসছিল নেতার হাতের ইশারায় থেমে  গেছে তারাও। বাঁদিকে একটা চড়াই রাস্তা উঠে গেছে পাহাড়ী গ্রামের দিকে, কয়েক ঘর মাত্র চাষীর বাস সেখানে, বিকাল-সন্ধ্যার মুখেই সে গ্রাম নিস্তেজ হয়ে গুটিয়ে নেয় নিজেকে। সে রাস্তা ধরে নেমে আসছিল আর এক সারি ঘোড়সওয়ারের দল।  মশালের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে অপেক্ষমান  যোদ্ধাদের মুখ, উত্তেজনায় সুস্পষ্ট প্রায় প্রত্যেকটি মুখাবয়ব। নেমে আসা ঘোড়সওয়ারদের কাছেও শুধু ব্যর্থতা সংবাদ, পাওয়া যায় নি তাকে কোথাও। ফেলে আসা গ্রামের সব কটিতেই শোনা গেছে তার নাম কিন্তু কেউই জানে না সে কোথায় থাকে, সংখ্যাগুরু গ্রাম্য চাষীদের কথা ধরলে মেনে নিতে হয় অতিলৌকিক কোনো অস্তিত্বের কথা। কিন্তু অতিলৌকিক সে মোটেই নয়, ভিয়েনার রাজদরবারে খোদ রোমান সম্রাটের আত্মীয়কে খুন করে এসেছে। দূর দূরান্তের জমিদাররাও হলফ করে বলবেন যে অশরীরী আত্মা নয়, যে দস্যুর হাতে বারংবার লুন্ঠিত হয়েছে তাঁদের ধনসম্পত্তি সে দস্তুরমতন মানুষ – রাগী, একগুঁয়ে এবং নিষ্ঠুর। শোনা যায় এই অঞ্চলেই তার দুর্গ কিন্তু কেউ চাক্ষুষ দেখেনি।

শেষবারের মতন চোখ বুলিয়ে পিছু হটলেন সেনাধ্যক্ষ, সম্রাট ফ্রেডেরিকের দরবারে ফিরে যাওয়ার আগে এখনো খানতল্লাশ নেওয়া বাকি আরো কিছু গ্রামের। যেমন অকস্মাৎ ঢুকে এসেছিল ঘোড়সওয়ারের দল, প্রায় ততটাই তাড়াতাড়ি মিলিয়ে গেল তারা। জানতেও পারল না, কাছেই সেই আলপাইন পাহাড়ের মধ্যের একটি গুহা থেকে সারি সারি চোখ নজর রাখছিল তাদের। সারি সারি চোখের পাশেই প্রস্তুত ছিল সারি সারি কামান। স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের ছোট্ট ঘুলঘুলি থেকে নজর সরিয়ে শুরু হল সাময়িক উল্লাস, ইতিউতি স্বস্তির নিঃশ্বাস। গুহার মধ্যেই লুকিয়ে থাকা প্রায় পাঁচতলা সমান কেল্লার এক তলা থেকে আরেক তলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল খবর, শেষ তলার-ও শেষে যেখানে গুহার নীচে শীতের রাত্রে ঘুমিয়ে আছে হাজার হাজার বাদুড়, সেখানেই কোনো ঘরে অস্থির পায়চারি করছেন দস্যুনেতা এরাজেম, কেল্লার মধ্যে অবশ্য তিনি ব্যারন।

প্রেডযামা কেল্লার মধ্যে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য বা বৈভব, ছিল না কোনোটাই কিন্তু সুরক্ষার দিক থেকে এ কেল্লা অতুলনীয়।  প্রেডযামার আক্ষরিক অর্থই হল গুহার সম্মুখবর্তী, অবশ্য বহু বছর ধরে অনেকেই জানতে পারেননি ওই গুহার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি কেল্লা। সম্রাট ফ্রেডেরিকের সৈন্যরাও ব্যতিক্রম নয়। ব্যারন এরাজেম কে বলাই যেতে পারে স্থানীয় রবিনহুড। গোটা অস্ট্রিয়ার বহু ভূস্বামীর কাছে তিনি অতিপরামক্রমী এক দস্যু, স্থানীয় কৃষকদের কাছে মূর্তিমান ভগবান। যদিও আক্ষরিক অর্থে রবিন হুডের যে রোম্যান্টিক ইমেজ ছিল সেজাতীয় কিছু শোনা যায় না এনার ক্ষেত্রে, এবং কেল্লার মধ্যে অবস্থিত টর্চার চেম্বারটি যে শুধু  অপহৃত  ধনী ভূস্বামী বা বিশ্বাসঘাতক সৈন্যদের জন্যই খোলা  থাকত, এমনটাও হলফ করে বলা যায় না। আশ্চর্যের কথা এই যে এরাজেমের তিনশ বছর আগেই তৈরী হয়েছে এ দুর্গ, কিন্তু এ দুর্গের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন খুব কম লোকেই। তাই পনেরশ শতকেও এরাজেমের কেল্লা বার করতে নাজেহাল হয়ে গেছিল ফ্রেডেরিকের সৈন্যরা। অবশ্য খোদ রোমান সম্রাটে যেখানে আদেশ দিয়েছেন, ধরা একদিন না একদিন পড়তেই হত। কিন্তু এক বছর ধরে সেই কেল্লায় ঢুকতে পারেনি রোমান সম্রাটের সৈন্যবাহিনী। আশা ছিল কেল্লা অবরোধ করে বসে থাকলে না খেয়ে মরবে ডাকাতগুলো কিন্তু দিনের পর দিন ধরে এগোতে গেলেই গর্জে উঠেছে কামান। পরে জানা যায় ওই গুহার নিচেই গুপ্তপথে টাটকা খাবার এবং অন্যান্য রসদ যুগিয়ে যেত এরাজেমের সহযোগী হাঙ্গারিয়ান রাজা মাথিয়াস করভিনাসের লোকেরা। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক বীরগাথাই যেভাবে শেষ হয়, এটিও শেষ হয়েছে সেভাবেই – বিশ্বাসঘাতকের ছলনায় মৃত্যু হয় এরাজেমের, শত্রুপক্ষের কামানের গোলায় পতন হয় দস্যু ব্যারন এবং তাঁর গুপ্ত সাম্রাজ্যের।

Cave 2

প্রেডযামা ক্যাসল অবশ্য টিঁকে যায়, ১৫৮৩ তে কাউন্ট ইভান কবেনজল আরো বাড়ান কেল্লাটিকে – তৈরী করেন একটি টাওয়ার সদৃশ প্রবেশপথ। কাউন্টের পছন্দের স্থাপত্যই রয়ে গেছে এখনো, তবে যে অ্যাডভেঞ্চারাস ব্যাপারস্যাপারের সঙ্গে প্রেডযামা প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল সেসবে ইতি পড়ে। শেষ শ’তিনেক বছর ধরেই দুর্গের মালিকানা বদলাতে থাকলেও প্রায় সবাই কেল্লাটিকে হান্টিং লজ হিসাবেই ব্যবহার করে এসেছেন। তার সাক্ষী কেল্লার প্রায় প্রতিটি প্রাঙ্গণ।

Cave 3

যদি কখনো ব্যাকপ্যাকিং করতে করতে একা একাই পৌঁছে যান স্লোভেনিয়া, পোস্তায়না গুহায় যেতে ভুলবেন না – যে গুহার কথা লিখেছিলাম আগের কিস্তিতে। সেখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাগমাইটের অবিস্মরণীয় স্থাপত্য সৌন্দর্য, প্রাগৈতিহাসিক ‘হিউম্যান ফিশ’ আর বাস ভর্তি চাইনীজ এবং কোরিয়ান সহপর্যটক। সে ভিড় থেকে বেরিয়ে একটু একা হতে চাইলে অবশ্যই যেতে হবে প্রেডযামা ক্যাসলে। ভরসা একটিমাত্র ট্যাক্সিই কারণ আপনার মতন ইম্প্রম্পটু ঘুরতে বেরনো পর্যটকের সংখ্যা হাতে গোণা, খরচ-ও একটু আছে কিন্তু তারপরেও কার্পণ্য না করে চলে যাবেন। আটশ বছরের ইতিহাসকে একটা নিভৃত দুপুরে নিজের কল্পনায় বর্তমান করে তুলতে পঁচিশ ইউরো নাহয় বেশী পড়ল; ভেবে নিতে পারেন ও আপনার প্রায়শ্চিত্তের খরচ। কিসের প্রাচিত্তির? বাহ, যে অনর্থক, অচেতন, অবিবেচক ইতিহাস পড়ে এসেছেন স্কুলের সাত-আটটা বছর ধরে, সেটার গুনাগার গুনে দিতে হবে না?

Cave 4

তবে সব ক্যাসলে গিয়েই ইতিহাসের সঙ্গে রোম্যান্স করবেন ভাবলে কিন্তু স্লোভেনিয়ানরা আবার অ্যানথ্রোপলজিক্যাল গালি দিতে পারে, মনে আছে তো? যেমন ধরুন ব্লেড ক্যাসলের কথা। লোনলি প্ল্যানেট থেকে শুরু করে অমরেন্দ্র চক্রবর্তী (আমি পড়িনি কিন্তু ধারণা করছি ভ্রমণের কোনো একটা সংখ্যায় নিশ্চয় লেখা আছে) অবধি বলছেন লেক ব্লেডের নীল রঙ দেখে না থাকলে আপনার জীবন বৃথা, এমনকি অরেগনের পৃথিবীবিখ্যাত ক্রেটার লেক দেখে প্রক্সি দিলেও চলবে না। তো লুবলিয়ানা থেকে ঘন্টাখানেকের ট্রেনজার্নি  করে পৌঁছলেন ব্লেড স্টেশনে (আগের দিন লিখেছিলাম লুবলিয়ানার মধ্যে সব জায়গা যেতে লাগে দশ মিনিট, আর আজকে জানিয়ে রাখি লুবলিয়ানা থেকে স্লোভেনিয়ার বাকি যে কোনো জায়গা যেতে মোটামুটি এক ঘন্টা) – ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে খেজুরে করতে করতে আরো মিনিট পনেরো পরে পৌঁছে  তো গেলেন লেকে। কিন্তু মন তো কিছুতেই ভরছে না; মনে হচ্ছে এ আর কি লেক, এমনটা তো হামেশাই দেখে থাকি – জলের রংটাও খাস কিছু লাগছে না । একবার মনে পড়ে গেল ট্যাক্সি ড্রাইভার বলছিল য়ুগোস্লাভিয়া হয়ে থাকার সময় এ চত্বর অত বিখ্যাত হয়নি অথচ ইনকাম ইনইকুয়ালিটি ছিল বিস্তর কম – তাহলে কি সবই ক্যাপিটালিস্ট চক্রান্ত? জার্মান  ব্যাটারা ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে ঢুকিয়ে দিয়ে মার্কিনী কায়দায় আউট্রাম ঘাটকে হর কি পৌরী বলে চালিয়ে দিচ্ছে? সবুর, সবুর।

ওই দেখুন, পাহাড়ের ওপরে দেখা যাচ্ছে ব্লেড ক্যাসল। কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগে খাড়াই রাস্তা ধরে একটু কষ্ট করে ঘুরতে ঘুরতে উঠে পড়ুন। ক্যাসলের ভেতরে ঢুকে আদ্যিকালের ছাপাখানা পাবেন, ওয়াইনারি পাবেন, একটা মিউজিয়ম-ও পাবেন। কিন্তু কোন টুয়েলফথ সেঞ্চুরিতে কোন জর্মন রাজা প্রথমবারের জন্য ব্লেড ক্যাসলের কথা বহির্বিশ্বকে জানান সেসব জানতে আপনি এত ক্যালরি খরচ করেননি, ওসব উপলক্ষ্য মাত্র।  আপনি এসেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্রকে ঝালিয়ে নিতে, সুধীন দাশগপ্তের সুর মনে না থাকলেও চলবে।

নীল, নীল!
সবুজের ছোঁয়া কিনা তা বুঝিনা
ফিকে গাঢ় হরেকরকম কম-বেশী নীল

তবে লেক কিনা, শূন্যে আনমনা গাঙচিলদের দেখতে পেলে অবাকই হবেন।

Lake Bled

তাই বলছিলাম, সব দুর্গপ্রাকারেই কি আর কামান গর্জন করবে ? কিছু প্রাকার থেকে জয়মালা-ও ফেলা যায়, হাতে  হাতে তালি মেরে উড়ে যাওয়ার আগে কিছু প্রাকারে দেখা দিয়ে যায় কম পড়ে যাওয়া রাজকন্যারা আবার কিছু প্রাকারের পাশে হাতে গড়া রুটির মতন ফুলকো এবং গরম পাউরুটি ছিঁড়ে হরিণের মাংস খেতে খেতে মনে হয় গলা ছেড়ে বলে উঠি “অগর ফিরদৌস বারুয়ে জমীন অস্ত/ হামিনস্তো, হামিনস্তো, হামিন অস্ত্”।

Advertisements

5 thoughts on “নিয়েন্ডারথালের দেশে – ২

  1. গত মার্চে কয়েকদিন এক স্লোভেনীয় পরিবারের অতিথি হয়ে লুবলিয়ানা আর ব্লেড-এর মাঝে প্রেদভোর বলে এক জায়গায় থাকার সুযোগ ঘটেছিলো। পোস্তোয়না, প্রেডয়ামা, ব্লেড – সবই ঘুরে দেখেছি তাঁদের তত্ত্বাবধানে, আর স্থানীয় ইতিহাসের বুকনিতে ভরপুর হয়ে। ভেবেছিলাম, সেই গল্প লিখবো। এটা পড়ার পর মনে হলো, বাংলা ভাষায় স্লোভেনিয়া নিয়ে এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। তাই ও পথে আর যাচ্ছি না। আমার কেবল আক্ষেপ হছে আমার স্লোভেনীয় বন্ধুটির জন্য। এমন ভালো একটা লেখা সে পড়তে পারলো না বলে!

    কুর্নিশ!

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s