ফ্রয়েড এবং যে ছেলেটি ট্রেন চালাতে চেয়েছিল

এপ্রিলের ঝিরঝির বৃষ্টি চলছেই, ধূসর ভিয়েনার থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ছেলেটির দিকে তাকালেন ফ্রয়েড। ব্যারগাসে অ্যাভিনিউ এর উনিশ নম্বর বাড়িতে ঢোকা ইস্তক তার আড়ষ্ট ভাবটা কাটেনি, মার পাশে একটু জবুথবু হয়েই বসে আছে। ফ্রাউ ওবেরহিউমর কাতর স্বরে বললেন, “প্রফেসর, কি উপায় এখন?”; ফ্রয়েড বললেন “শেষ এক বছরে তাহলে বার কুড়ি আপনাদের ভিয়েনার বাইরে যেতে হয়েছে?”। “হ্যাঁ, এবং প্রত্যেকবারেই ট্রেন নিতে হয়েছে, গাড়ি বা বাসে কাজ দেয় নি – আমরা সে চেষ্টা করেছি।” 

ফ্রয়েড আলতো স্বরে ডাকলেন, “হান্স”, বছর তেরোর ছেলেটি তার অস্বাভাবিক নীল রঙের মণিটি সম্পূর্ণ মেলে ধরে তাকাল। “তোমার এখন ঘুম পাচ্ছে?” ছেলেটি আস্তে আস্তে দু’দিকে মাথা নাড়ল। ফ্রাউ আবার কাতর হয়ে বললেন, “হের ফ্রয়েড, শুধু এখন কেন কখনোই ওর ঘুম পায় না।   আমরা প্রথমে ভাবতাম হান্স বোধহয় ইনসোমনিয়ায় ভুগছে। এত ছোট একটা ছেলের কেন এরকম সমস্যা হবে ভেবে আমরা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিলাম। হের ওসেনবেইককে তো আপনি চেনেন, উনিই এক বছর ধরে হান্সের চিকিৎসা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। কড়া ডোজের ঘুমের দাওয়াই দিলে কাজ হয় বটে কিন্তু এরকম ভাবে কতদিন চলবে? উনিই শেষে আপনার কাছে পাঠালেন”।

“একমাত্র ট্রেনে চাপলে তবেই ঘুম আসে এটা আবিষ্কার করলেন কি করে?”

ফ্রাউ হান্সের দিকে তাকিয়ে বললেন “ওই তো বলল আমাদের। বলল ‘মা আমাকে একবার ট্রেনে করে কোথাও নিয়ে যাবে, মনে হয় ট্রেনে আমার ঘুম আসবে’। ওর কথা শুনেই গ্লগনিটজের ট্রেনে চাপলাম আমরা, ভাবলাম একটু পাহাড়েও ঘুরে আসা হবে আর যদি এ সমস্যাটার-ও কিছু সুরাহা হয়। গ্লগনিটজে একটাবারের জন্যও চোখের পাতা এক করেনি কিন্তু অবাক কান্ড ট্রেনে করে যাতায়তের সময় দু’বারই বড় শান্তিতে ঘুমোল”।

ফ্রয়েড টেবলে চুরুট ঠুকতে ঠুকতে মুখ তুলে তালাকেন হান্সের দিকে; এখনো সে মাথা নামিয়ে বসে আছে, ঘুম না আসার ব্যাপারে যে স্পষ্টতই বিব্রত সেটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?”, হান্স একটা দায়সারা মাথা নাড়ল। “স্কুলের পর কি করবে কিছু ভেবেছ?”, এবারও নেতিবাচক ইঙ্গিত তবে ঘাড় নাড়াটা আরেকটু জোরালো। এই সময় মা ওবেরহিউমর একটু মৃদু  কাশলেন। ফ্রয়েড তাকাতে বললেন, “আমি কিন্তু জানি হান্স কি হতে চায়”।

ফ্রয়েড লক্ষ্য করলেন হান্স প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মার দিকে তাকিয়েছে, মুখে স্পষ্টতই যন্ত্রণার অভিব্যক্তি। এবং এই অভিব্যক্তি তিনি খুব ভালো করে চেনেন, এ অভিব্যক্তি বিশ্বাসহানি হওয়ার, খুব ভরসা করে বলা গোপন কথা ফাঁস হয়ে গেলে মানুষের চোখেমুখে এই যন্ত্রণাটাই ছড়িয়ে পড়ে”।

ফ্রাউ ওবেরহিউমর  অবশ্য হান্সের তাকানোকে মোটেই পাত্তা দিলেন না, বেশ উৎকণ্ঠিত গলায় বললেন, “কি ভূত যে চেপেছে হের ফ্রয়েড, আপনি বাঁচান। ও হতেও চায় ট্রেন ড্রাইভার।”

ফ্রয়েড একটু অবাক হয়েই তাকালেন হান্সের দিকে, “তাই নাকি? ট্রেনেই শুধু ঘুমোতে পারো বলেই ট্রেন চালাতে চাও নাকি আরো কারণ আছে?”

হান্স বলব কি বলব না ভঙ্গীতে মা’র দিকে তাকাল।

“ভয় কি, আমরা তো গল্প করছি। বিশ্বাস করে বলেই দেখো না।” বয়ঃসন্ধি আসতে আরেকটু দেরি হলেও ফ্রয়েড জানেন এ বয়সীদের সঙ্গে সখ্য পাতানোর জন্য বিশ্বাসস্থাপন প্রথম এবং অতি আবশ্যিক একটি শর্ত।

হান্স কতটা বিশ্বাস করেছে সেটা বোঝা না গেলেও দেখা গেল অস্ফূটস্বরে কিছু বলছে।

ফ্রয়েড কানের কাছে হাত এনে শুনতে না পাওয়ার ভান করায় একটু লজ্জা পেয়ে এবার জোরে বলল, “ট্রেনে চড়তে আমার ভালো লাগে”।

“এতে লজ্জা পাওয়ার কি আছে, বোকা ছেলে? সে  তো আমাদের প্রায় সবারই ভালো লাগে। নতুন জায়গায় যাওয়া যায়, কত আরামে  গল্প করতে করতে, নিশ্চিন্তে ঘুমোতে ঘুমোতে।”

ফ্রয়েড দেখলেন ঘুমের কথাটাকে হান্স সেরকম গ্রাহ্য করল না, কিরকম অন্যমনস্ক স্বরে বলল, “ট্রেনের ঝাঁকুনি আমার ভালো লাগে, মনে হয় সারাক্ষণ ওরকম ভাবে দুলতেই থাকি।”

প্রফেসর এবার সোজা হয়ে বসলেন, “ট্রেনের ঝাঁকুনি তোমার ভালো লাগে?”

“খুব ভালো লাগে, খুব।”

“ট্রেনের ঝাঁকুনির জন্যই তোমার ভালো ঘুম হয়?”

“তা তো জানি না, কিন্তু ঘুমের মধ্যেও আমি ট্রেনের দুলুনি টের পাই।”

“আর তাতে তুমি আরো নিশ্চিন্ত বোধ কর?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ।” এই প্রথম হান্সকে সজাগ দেখাল, কেউ যেন প্রথমবারের জন্য ওর কথাটা বুঝতে পেরেছে।

ফ্রয়েড এবার মার দিকে তাকালেন, “হান্স কি ছোট থেকেই একটু অধৈর্য?”

ওবেরহিউমর সস্নেহে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সে কথা আর বলতে। এত শান্ত ছেলে অথচ খাবার খাওয়াতে কি কষ্টই পেতে হত আমাদের। আমাদের পোষা কুকুর, গাছের পাখি, ওর বাবার স্টাডি-টেবলে রাখা কাঠের সিংহ, একটা একটা করে দেখাই আর একটু একটু করে খায়। ডাইনিং টেবলে তো ওকে বসিয়ে রাখাই যেত না” । বলেই যাচ্ছিলেন, কি খেয়াল হওয়ায় কথা থামিয়ে বললেন, “কিন্তু কেন বলুন তো”? 

ফ্রয়েড জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন ভুরু কুঁচকে, কথাটা কানে গেল কিনা বোঝা গেল না। আচম্বিতে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “ওকে নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি করতেন?”

ফ্রাউ একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “ছোঁড়াছুঁড়ি? এরর, মানে সেরকম তো……”

“বলছি, শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে আবার লুফে নেওয়া – এ ধরণের কিছু করতেন”?

ওবেরহিউমরের মুখে এবার হাসি দেখা দিল, “ওঃ, তাই বলুন। ওর বাবা তো ওই করত ওকে নিয়ে, ওই করেই ভুলিয়ে রাখতে হত, নাহলেই কান্না।”

ফ্রয়েডের মুখে মৃদু হাসির ছোঁয়া, “অফ কোর্স, অফ কোর্স। তা তো হবেই।”

ভদ্রমহিলার একবার  মনে হল ‘তা তো হবেই’ এর মধ্যেও কিছু ব্যঞ্জনা আছে, তারপর ভাবলেন কে জানে, বেশী ভাবছেন বোধহয়। সত্যি কথা বলতে কি ফ্রয়েডের কাছে আসতে হবে শোনা অবধি বেশ টেনশনে ছিলেন। যতই ডাক্তার ওসেনবেইক বলুন “ইনি আপনার ধরাবাঁধা মনস্তত্তবিদ নন”, মন থেকে কু-চিন্তা কখনই যায় না। তারপর ওই মর্মভেদী দৃষ্টি, ওহ্ – শুরু থেকেই এমন তাকিয়ে যেন ফ্রলাইন নিজেই চুরির দায়ে ধরা পড়েছেন। মুখে হাসির ছোঁয়া দেখে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করতে শুরু করলেন।

কিন্তু হা হতোস্মি, আবার মেঘমন্দ্র স্বরে প্রশ্ন, “আপনারা নিশ্চয় ক্যাথলিক?”

ফ্রাউ ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়লেন।

“হান্স বোধহয় স্কুলেও বন্ধুদের সঙ্গে খুব একটা মেশে না?”

প্রশ্নটা যেন ঠিক প্রশ্ন নয়, একটু বক্রোক্তি মেশানো। ওবেরহিউমর মাথা নাড়তে গিয়েও থেমে গেলেন, সত্যি কথা বললে কি দোষটা ওনার ওপরেই আসবে? অবশ্য আদৌ যদি কিছু দোষ থেকে থাকে, সমস্যাটাই তো বুঝছেন না।

হের ফ্রয়েড অবশ্য উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছিলেন না, বেশ আয়েস করে চুরুটে টান দিচ্ছিলেন – যেন উত্তরটা ওনার জানাই আছে।

সেরাত্রে নিজের কেসফাইল আপডেট করতে গিয়ে লিখলেন, ”the existence, then, of these pleasurable sensations, caused by forms of mechanical agitation of the body, is confirmed by the fact that children are so fond of games of passive movement, such as swinging and being thrown up in the air, and insist on such games being incessantly repeated. It is well known that rocking is habitually used to induce sleep in restless children. The shaking produced by driving in carriages and later by railway-travel exercises such as fascinating effect upon older children that every boy, at any rate, has at one time or other in his life wanted to be an engine-driver or a coachman. It is a puzzling fact that boys take such an extraordinary intense interest in things connected with railways, and at the age at which the production of fantasies is most active (shortly before puberty), use those things as the nucleus of a symbolism that is peculiarly sexual. A compulsive link of this kind between railway-travel and sexuality is clearly derived from the pleasurable character of the sensations of the movement. “।

প্রথম যৌনচেতনার অনুভূতি হান্সের জন্য খুব একটা সুখপ্রদ হয়নি। একটা সুপ্ত তাড়না সর্বদা তাকে জাগিয়ে রেখেছে, একমাত্র মুক্তির পথ এসেছে ট্রেন জার্নিতে। কিশোর হান্সের অবচেতন স্পষ্টতই সুখ পেয়েছে ট্রেনের ঝাঁকুনিতে; গোঁড়া ক্যাথলিক পরিবেশ হান্সকে পারিপার্শ্বিক সাহায্যগুলো পেতে দেয়নি। সমবয়সীদের সঙ্গে কথোপকথনই হোক কি নিষিদ্ধ বই, হান্সের জন্য দরকারী হয়ে উঠতে পারত অনেক কিছুই।

লিখতে লিখতে আরেকবার হাসি ফুটে উঠল প্রফেসরের মুখে, মনে পড়ে গেল ফ্রাউ ওবেরহিউমরের স্তম্ভিত মুখটি। এ ব্যাখ্যা যেন কিছুতেই মন থেকে মানতে পারছিলেন না, বেরনোর সময়েও এমন গজগজ করতে করতে বেরোলেন যে বোঝাই যাচ্ছিল বাড়িতে গিয়ে হের ওবেরহিউমরের কাছে প্রফেসরের মুন্ডপাত করা ইস্তক শান্তি নেই। কিন্তু ফ্রয়েড জানেন হান্সের জীবনে একটা পরিবর্তন আসতে চলেছে,  ফ্রলাইনকে যতটা চিনেছেন তাতে অনুমান করতে পারেন  যে নিজের ছেলের জীবনের থেকে ধার্মিক অনুশাসনকে তিনি বড় হয়ে উঠতে দেবেন না।

“সুইট ড্রীমস হান্স”, ডায়েরী বন্ধ করলেন ফ্রয়েড। কাল সকালে ইটালী যেতে হবে, ট্রেনের ঝাঁকুনির কথা ভেবে আজকে রাতে নাও ঘুম আসতে পারে।

sigmund-freud

Advertisements

পরিচয়পর্ব – ২

“রথসচাইল্ড কি বলেছে দেখেছেন?” হাতের স্টেটসম্যানটা মুড়ে রাখতে রাখতে জিজ্ঞাসা করলেন চারু দত্ত।

“ব্যাঙ্কার?”

“আরে না মশাই, ইনি ইন্ডোলজিস্ট।”

শ্যামলকান্তি জিভ কেটে চুপ করে গেলেও সুধীন এগিয়ে এসেছেন, “আপনার দোষ নেই শ্যামলবাবু, রথসচাইল্ডদের চোদ্দ গুষ্টি ব্যাঙ্কিং এর বাইরে কিছু করেছে বলে জানতাম না। তা দৈত্যকূলে প্রহ্লাদ কি বলছেন?”

“বলছেন গণেশ নাকি একটা লোকের নাম।”

“বাঁচালেন। ময়মনসিংহে আমাদের এক পরিচিত ভদ্রলোক ছেলের নাম গণেশ রাখবেন না কার্ত্তিক তাই নিয়ে ভারী সমস্যায় পড়ে গেছেন। চাঁদপানা মুখ দেখে ভারী ইচ্ছে নাম কার্ত্তিক রাখার, সেই শুনে ইস্তক গিন্নী ছেলের কপালে কাজলের টিপ লাগাতে লাগাতে গণেশের নাম নিচ্ছেন। কড়ে আঙুল-ও কামড়িয়েছেন বার কয়েক কিন্তু কর্তা প্রায় নাছোড়বান্দা; এদিকে সাহেবসুবোরা যে এখনো কার্ত্তিককে মানুষ ঠাউরে উঠতে পারেননি সে কথা জানায় কেডা?”

চারু দত্ত রাগত স্বরে বললেন, “তোমাদের সবটাতেই ঠাট্টা। সিদ্ধিদাতা গণেশের কথা হচ্ছে এখানে – রথসচাইল্ডের বক্তব্য আর্যদের মধ্যে এরকম কোনো দেবপূজার চল ছিল না। দ্রাবিড়দের কোনো একটা গোষ্ঠী হাতিমুখো দেবতার পুজো করত, গণেশ নামের কোনো আর্য ভদ্রলোক সুযোগ বুঝে নিজের নামে সেই দেবতাকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন হিন্দু ধর্মে।”

সুধীন মুচকি হেসে বললেন, “তাহলে কি আর ভদ্রলোক বলা যায়? কি বলো সুশোভন?”

সুশোভন মাথা নাড়লেন, “সত্যি কথা বলতে কি, আর্যদের মধ্যে ছোটলোক খুঁজতে বসলে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। আর্য শব্দটাই আসলে সেলফ-কন্ট্র্যাডিকটরী – ধর্ম নিয়ে যা পরিমাণ আলোচনা রামায়ণ-মহাভারতে রয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনো এপিকে ওরকমটি পাবে না অথচ এ বই দুটোর নির্মাণে যে পরিমাণ অধর্ম হয়েছে তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক কোনো মহৎপ্রাণা মানুষের পক্ষে এ কাজ করা অসম্ভব।”

সত্যেন বোস চশমাটা খুলে বললেন, “দ্যাখ সুশোভন, তুই যদি ফের স্বর্ণকেশী-নীলনয়নাদের গাল পাড়িস আমি কিন্তু আড্ডা ছেড়ে উঠে যাব। আমার বছরে একবার সাত সমুদ্দুর পেরিয়ে ওদেরকে দেখে না এলে ভাত হজম হয় না। গণেশের অরিজিন নিয়ে কিছু বলার থাকে তো বল্।”

সুশোভন এবার হেসে ফেললেন, “সত্যেনদা, চিন্তা নেই – সব আর্য স্বর্ণকেশী-নীলনয়না নয়; ইন ফ্যাক্ট, এরা ভারতে আদৌ ঢুকেছিল কিনা সে নিয়ে বিস্তর সন্দেহ আছে। যাই হোক, গণেশের কথায় ফিরি – এই দেবতাটির অরিজিনটি সত্যিই বড় গোলমেলে। রথসচাইল্ড সাহেবের নাম সংক্রান্ত থিয়োরিটি এক্কেরে নতুন হলেও দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহাসিক এবং নৃতত্ববিদরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন গণেশ দ্রাবিড় সভ্যতার ধারক। আদি রূপে গণেশের দাঁতটি কিন্তু ভাঙ্গা, সেটা জানেন? তা এঁদের বক্তব্য হল ওটি যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রতীক।”

চারু দত্ত বললেন, “হ্যাঁ, বাপ-ছেলের যুদ্ধ। মাথাটাই যখন কাটা গেল, দাঁত ভাঙ্গলে কি যায় আসে?”

“না চারুদা, পৌরাণিক যুদ্ধের কথা হচ্ছে না এখানে। এ যুদ্ধ আর্য এবং অনার্য সভ্যতার, গণেশকে ধরে নিন একটা দ্রাবিড়িয়ান টোটেম। অনার্যরা হেরে গেলেও দয়ার প্রাণ আর্যরা তাদেরকে নিজেদের সভ্য জগতে স্থান দিয়েছে, গণেশকে সুদ্ধ। ভাঙ্গা দাঁত আর হাতির মাথাটা খালি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য – ভবিষ্যতে বেশি ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই করিস না বাপু, মনে আছে তো হাতে মাথা কাটা কাকে বলে।”

সুশোভন একটু দম নেওয়ার জন্য থেমেছিলেন, চারু দত্ত এই ফাঁকে ঢুকে পড়লেন, “তা যাই বলো, মায়ের অনারে বাপকে ফাইট দিচ্ছে এরকম গপ্পোটা আমার বেশ লাগে। নাদুসনুদুস গণেশ ওরকম উগ্রচন্ডা শিবের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে, এ ভাবতে গিয়েই আমবাংলার সব মায়েদের চোখ ছলছল – কার্ত্তিক বেচারা ইন্দ্রকে হারিয়েও বাংলাদেশে ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াল স্রেফ ওই ইমোশনাল সাপোর্টটা নেই বলে।”

“চারুদা, ওখানেও একটা যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা আছে। দ্রাবিড়ীয় সভ্যতা প্রথম থেকেই মাতৃতান্ত্রিক, মায়ের আদেশ মানে সেখানে দলপতির আদেশ। দেবাদিদেব মহাদেব  হোক কি দিগ্বিজয়ী সিকন্দর, দলপতি যাকে অনুপ্রেবেশকারী বলবে তাকে রুখতে তো হবেই। আরেক দিক থেকে ভাবলে এটা আর্য ট্র্যাডিশনের অ্যান্টিডোট বলতে পারেন – পরশুরাম যেমন বাবার আদেশে মাকেও খুন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।”

সুধীন স্বভাববিরুদ্ধ কাজ করছিলেন অর্থাৎ একটুও টিপ্পুনি না কেটে মন দিয়ে সুশোভনের কথা শুনছিলেন। এবার বললেন, “কিন্তু সিদ্ধিদাতার কনসেপ্টটা গণেশের নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেল কি করে?”

সত্যেন বোস ধুতির খুঁট দিয়ে চশমাটা মুছতে মুছতে বললেন, “সুধীন, ওটা তো ফিজিক্সের প্রশ্ন হে।”

ধুতির খুঁটেও ঠিক জমছিল না বলে মুখের সামনে কাঁচটা রেখে একটু গরম ভাপ দিতে যাচ্ছিলেন। খেয়াল হল দশ জোড়া চোখ ওনার দিকেই তাকিয়ে, মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন, “তাকিয়ে থেকে লাভ নেই, উত্তর পেতে পেতে আরো বছর পঞ্চাশ লাগতে পারে”।

সুধীন অধৈর্য হয়ে পড়েছেন, “সত্যেনদার এই এক বদ অভ্যাস – রহস্যের ক্লাইম্যাক্সে তুলে দিয়ে মইটি নিয়ে কেটে পড়া”।

“শোন্, হিন্দু শাস্ত্রমতে গণেশ আটটি সিদ্ধি অর্থাৎ সুপারপাওয়ারের অধিকারী। এবং শুধু তাই নয়, এই আটটি সুপারপাওয়ারের একটিও পেতে গেলে ভরসা ওই গণেশই। এবার ক্ষমতাগুলো কি কি? অণিমা, মহিমা, গরিমা, লঘিমা, প্রাপ্তি, প্রকাম্য, ইষ্ট আর বাস্তব – সব নিয়ে ডিটেলসে জানতে চাইলে সত্যেন বোস নয়, নগেন বোসের দ্বারস্থ হতে পারো, শুনলাম বিশ্বকোষের কাজ শেষ হয়েছে। আমি শুধু প্রথম দুটোর কথাই বলছি।”

“অণিমা সিদ্ধি লাভ করলে নিজের শরীরকে অণুপরিমাণ করে ফেলা যায় আর মহিমা সিদ্ধি লাভ করলে হয় ঠিক উল্টোটা অর্থাৎ শরীরকে করে তোলা যায় ব্রহ্মান্ডব্যাপী। তো যিনি দুটো সিদ্ধিই লাভ করেছেন তিনিই কেবল বলতে পারেন একটা সামান্য অণু কি করে হয়ে উঠতে পারে গোটা ব্রহ্মান্ড বা উল্টোদিক থেকে দেখলে গোটা ব্রহ্মান্ড কি করে মিলিয়ে যেতে পারে ফের ওই একটা অণুতেই। বুঝতেই পারছিস, দুয়ে মিলে এ এক ইউনিফায়েড থিয়োরীর সন্ধান – হল? এবার উঠি গে।”

সুশোভন বলে উঠলেন, “আরে দাঁড়াও দাঁড়াও! এই ইউনিফায়েড থিয়োরীর নাম কি হবে?”

সত্যেন ধুতির কোঁচা ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়ালেন, “জ্বালাস নে বাপু। ওসব নাম-টামের আমি কি জানি, আপাতত মাথায় ঘুরছে কেবল স্ট্রিং – তার ছিঁড়ে গিয়ে দু’হপ্তা এস্রাজ বাজাতে পারছি না।” ।

(পরিচয়পর্ব – ১)

নিয়েন্ডারথালের দেশে – ২

Cave1

আলপাইন পাদদেশ এখান থেকেই শুরু, রাত্রের অন্ধকারে সুউচ্চ পাহাড়গুলোকে ঘুমন্ত দৈত্যের মতন দেখতে লাগছে। ঘোড়সওয়ার তাঁর বাহনের বল্গা ধরে থামালেন,  তাঁর পেছনে সার দিয়ে যারা আসছিল নেতার হাতের ইশারায় থেমে  গেছে তারাও। বাঁদিকে একটা চড়াই রাস্তা উঠে গেছে পাহাড়ী গ্রামের দিকে, কয়েক ঘর মাত্র চাষীর বাস সেখানে, বিকাল-সন্ধ্যার মুখেই সে গ্রাম নিস্তেজ হয়ে গুটিয়ে নেয় নিজেকে। সে রাস্তা ধরে নেমে আসছিল আর এক সারি ঘোড়সওয়ারের দল।  মশালের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে অপেক্ষমান  যোদ্ধাদের মুখ, উত্তেজনায় সুস্পষ্ট প্রায় প্রত্যেকটি মুখাবয়ব। নেমে আসা ঘোড়সওয়ারদের কাছেও শুধু ব্যর্থতা সংবাদ, পাওয়া যায় নি তাকে কোথাও। ফেলে আসা গ্রামের সব কটিতেই শোনা গেছে তার নাম কিন্তু কেউই জানে না সে কোথায় থাকে, সংখ্যাগুরু গ্রাম্য চাষীদের কথা ধরলে মেনে নিতে হয় অতিলৌকিক কোনো অস্তিত্বের কথা। কিন্তু অতিলৌকিক সে মোটেই নয়, ভিয়েনার রাজদরবারে খোদ রোমান সম্রাটের আত্মীয়কে খুন করে এসেছে। দূর দূরান্তের জমিদাররাও হলফ করে বলবেন যে অশরীরী আত্মা নয়, যে দস্যুর হাতে বারংবার লুন্ঠিত হয়েছে তাঁদের ধনসম্পত্তি সে দস্তুরমতন মানুষ – রাগী, একগুঁয়ে এবং নিষ্ঠুর। শোনা যায় এই অঞ্চলেই তার দুর্গ কিন্তু কেউ চাক্ষুষ দেখেনি।

শেষবারের মতন চোখ বুলিয়ে পিছু হটলেন সেনাধ্যক্ষ, সম্রাট ফ্রেডেরিকের দরবারে ফিরে যাওয়ার আগে এখনো খানতল্লাশ নেওয়া বাকি আরো কিছু গ্রামের। যেমন অকস্মাৎ ঢুকে এসেছিল ঘোড়সওয়ারের দল, প্রায় ততটাই তাড়াতাড়ি মিলিয়ে গেল তারা। জানতেও পারল না, কাছেই সেই আলপাইন পাহাড়ের মধ্যের একটি গুহা থেকে সারি সারি চোখ নজর রাখছিল তাদের। সারি সারি চোখের পাশেই প্রস্তুত ছিল সারি সারি কামান। স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের ছোট্ট ঘুলঘুলি থেকে নজর সরিয়ে শুরু হল সাময়িক উল্লাস, ইতিউতি স্বস্তির নিঃশ্বাস। গুহার মধ্যেই লুকিয়ে থাকা প্রায় পাঁচতলা সমান কেল্লার এক তলা থেকে আরেক তলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল খবর, শেষ তলার-ও শেষে যেখানে গুহার নীচে শীতের রাত্রে ঘুমিয়ে আছে হাজার হাজার বাদুড়, সেখানেই কোনো ঘরে অস্থির পায়চারি করছেন দস্যুনেতা এরাজেম, কেল্লার মধ্যে অবশ্য তিনি ব্যারন।

প্রেডযামা কেল্লার মধ্যে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য বা বৈভব, ছিল না কোনোটাই কিন্তু সুরক্ষার দিক থেকে এ কেল্লা অতুলনীয়।  প্রেডযামার আক্ষরিক অর্থই হল গুহার সম্মুখবর্তী, অবশ্য বহু বছর ধরে অনেকেই জানতে পারেননি ওই গুহার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি কেল্লা। সম্রাট ফ্রেডেরিকের সৈন্যরাও ব্যতিক্রম নয়। ব্যারন এরাজেম কে বলাই যেতে পারে স্থানীয় রবিনহুড। গোটা অস্ট্রিয়ার বহু ভূস্বামীর কাছে তিনি অতিপরামক্রমী এক দস্যু, স্থানীয় কৃষকদের কাছে মূর্তিমান ভগবান। যদিও আক্ষরিক অর্থে রবিন হুডের যে রোম্যান্টিক ইমেজ ছিল সেজাতীয় কিছু শোনা যায় না এনার ক্ষেত্রে, এবং কেল্লার মধ্যে অবস্থিত টর্চার চেম্বারটি যে শুধু  অপহৃত  ধনী ভূস্বামী বা বিশ্বাসঘাতক সৈন্যদের জন্যই খোলা  থাকত, এমনটাও হলফ করে বলা যায় না। আশ্চর্যের কথা এই যে এরাজেমের তিনশ বছর আগেই তৈরী হয়েছে এ দুর্গ, কিন্তু এ দুর্গের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন খুব কম লোকেই। তাই পনেরশ শতকেও এরাজেমের কেল্লা বার করতে নাজেহাল হয়ে গেছিল ফ্রেডেরিকের সৈন্যরা। অবশ্য খোদ রোমান সম্রাটে যেখানে আদেশ দিয়েছেন, ধরা একদিন না একদিন পড়তেই হত। কিন্তু এক বছর ধরে সেই কেল্লায় ঢুকতে পারেনি রোমান সম্রাটের সৈন্যবাহিনী। আশা ছিল কেল্লা অবরোধ করে বসে থাকলে না খেয়ে মরবে ডাকাতগুলো কিন্তু দিনের পর দিন ধরে এগোতে গেলেই গর্জে উঠেছে কামান। পরে জানা যায় ওই গুহার নিচেই গুপ্তপথে টাটকা খাবার এবং অন্যান্য রসদ যুগিয়ে যেত এরাজেমের সহযোগী হাঙ্গারিয়ান রাজা মাথিয়াস করভিনাসের লোকেরা। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক বীরগাথাই যেভাবে শেষ হয়, এটিও শেষ হয়েছে সেভাবেই – বিশ্বাসঘাতকের ছলনায় মৃত্যু হয় এরাজেমের, শত্রুপক্ষের কামানের গোলায় পতন হয় দস্যু ব্যারন এবং তাঁর গুপ্ত সাম্রাজ্যের।

Cave 2

প্রেডযামা ক্যাসল অবশ্য টিঁকে যায়, ১৫৮৩ তে কাউন্ট ইভান কবেনজল আরো বাড়ান কেল্লাটিকে – তৈরী করেন একটি টাওয়ার সদৃশ প্রবেশপথ। কাউন্টের পছন্দের স্থাপত্যই রয়ে গেছে এখনো, তবে যে অ্যাডভেঞ্চারাস ব্যাপারস্যাপারের সঙ্গে প্রেডযামা প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল সেসবে ইতি পড়ে। শেষ শ’তিনেক বছর ধরেই দুর্গের মালিকানা বদলাতে থাকলেও প্রায় সবাই কেল্লাটিকে হান্টিং লজ হিসাবেই ব্যবহার করে এসেছেন। তার সাক্ষী কেল্লার প্রায় প্রতিটি প্রাঙ্গণ।

Cave 3

যদি কখনো ব্যাকপ্যাকিং করতে করতে একা একাই পৌঁছে যান স্লোভেনিয়া, পোস্তায়না গুহায় যেতে ভুলবেন না – যে গুহার কথা লিখেছিলাম আগের কিস্তিতে। সেখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাগমাইটের অবিস্মরণীয় স্থাপত্য সৌন্দর্য, প্রাগৈতিহাসিক ‘হিউম্যান ফিশ’ আর বাস ভর্তি চাইনীজ এবং কোরিয়ান সহপর্যটক। সে ভিড় থেকে বেরিয়ে একটু একা হতে চাইলে অবশ্যই যেতে হবে প্রেডযামা ক্যাসলে। ভরসা একটিমাত্র ট্যাক্সিই কারণ আপনার মতন ইম্প্রম্পটু ঘুরতে বেরনো পর্যটকের সংখ্যা হাতে গোণা, খরচ-ও একটু আছে কিন্তু তারপরেও কার্পণ্য না করে চলে যাবেন। আটশ বছরের ইতিহাসকে একটা নিভৃত দুপুরে নিজের কল্পনায় বর্তমান করে তুলতে পঁচিশ ইউরো নাহয় বেশী পড়ল; ভেবে নিতে পারেন ও আপনার প্রায়শ্চিত্তের খরচ। কিসের প্রাচিত্তির? বাহ, যে অনর্থক, অচেতন, অবিবেচক ইতিহাস পড়ে এসেছেন স্কুলের সাত-আটটা বছর ধরে, সেটার গুনাগার গুনে দিতে হবে না?

Cave 4

তবে সব ক্যাসলে গিয়েই ইতিহাসের সঙ্গে রোম্যান্স করবেন ভাবলে কিন্তু স্লোভেনিয়ানরা আবার অ্যানথ্রোপলজিক্যাল গালি দিতে পারে, মনে আছে তো? যেমন ধরুন ব্লেড ক্যাসলের কথা। লোনলি প্ল্যানেট থেকে শুরু করে অমরেন্দ্র চক্রবর্তী (আমি পড়িনি কিন্তু ধারণা করছি ভ্রমণের কোনো একটা সংখ্যায় নিশ্চয় লেখা আছে) অবধি বলছেন লেক ব্লেডের নীল রঙ দেখে না থাকলে আপনার জীবন বৃথা, এমনকি অরেগনের পৃথিবীবিখ্যাত ক্রেটার লেক দেখে প্রক্সি দিলেও চলবে না। তো লুবলিয়ানা থেকে ঘন্টাখানেকের ট্রেনজার্নি  করে পৌঁছলেন ব্লেড স্টেশনে (আগের দিন লিখেছিলাম লুবলিয়ানার মধ্যে সব জায়গা যেতে লাগে দশ মিনিট, আর আজকে জানিয়ে রাখি লুবলিয়ানা থেকে স্লোভেনিয়ার বাকি যে কোনো জায়গা যেতে মোটামুটি এক ঘন্টা) – ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে খেজুরে করতে করতে আরো মিনিট পনেরো পরে পৌঁছে  তো গেলেন লেকে। কিন্তু মন তো কিছুতেই ভরছে না; মনে হচ্ছে এ আর কি লেক, এমনটা তো হামেশাই দেখে থাকি – জলের রংটাও খাস কিছু লাগছে না । একবার মনে পড়ে গেল ট্যাক্সি ড্রাইভার বলছিল য়ুগোস্লাভিয়া হয়ে থাকার সময় এ চত্বর অত বিখ্যাত হয়নি অথচ ইনকাম ইনইকুয়ালিটি ছিল বিস্তর কম – তাহলে কি সবই ক্যাপিটালিস্ট চক্রান্ত? জার্মান  ব্যাটারা ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে ঢুকিয়ে দিয়ে মার্কিনী কায়দায় আউট্রাম ঘাটকে হর কি পৌরী বলে চালিয়ে দিচ্ছে? সবুর, সবুর।

ওই দেখুন, পাহাড়ের ওপরে দেখা যাচ্ছে ব্লেড ক্যাসল। কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগে খাড়াই রাস্তা ধরে একটু কষ্ট করে ঘুরতে ঘুরতে উঠে পড়ুন। ক্যাসলের ভেতরে ঢুকে আদ্যিকালের ছাপাখানা পাবেন, ওয়াইনারি পাবেন, একটা মিউজিয়ম-ও পাবেন। কিন্তু কোন টুয়েলফথ সেঞ্চুরিতে কোন জর্মন রাজা প্রথমবারের জন্য ব্লেড ক্যাসলের কথা বহির্বিশ্বকে জানান সেসব জানতে আপনি এত ক্যালরি খরচ করেননি, ওসব উপলক্ষ্য মাত্র।  আপনি এসেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্রকে ঝালিয়ে নিতে, সুধীন দাশগপ্তের সুর মনে না থাকলেও চলবে।

নীল, নীল!
সবুজের ছোঁয়া কিনা তা বুঝিনা
ফিকে গাঢ় হরেকরকম কম-বেশী নীল

তবে লেক কিনা, শূন্যে আনমনা গাঙচিলদের দেখতে পেলে অবাকই হবেন।

Lake Bled

তাই বলছিলাম, সব দুর্গপ্রাকারেই কি আর কামান গর্জন করবে ? কিছু প্রাকার থেকে জয়মালা-ও ফেলা যায়, হাতে  হাতে তালি মেরে উড়ে যাওয়ার আগে কিছু প্রাকারে দেখা দিয়ে যায় কম পড়ে যাওয়া রাজকন্যারা আবার কিছু প্রাকারের পাশে হাতে গড়া রুটির মতন ফুলকো এবং গরম পাউরুটি ছিঁড়ে হরিণের মাংস খেতে খেতে মনে হয় গলা ছেড়ে বলে উঠি “অগর ফিরদৌস বারুয়ে জমীন অস্ত/ হামিনস্তো, হামিনস্তো, হামিন অস্ত্”।

ভয়াল ভয়ঙ্কর ভৈরব মন্ত্র ও অন্যান্য অত্যাশ্চর্য উপাখ্যান

হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন………

সে কথা মেনে নি, ফের ভুলে যাই, আবার ধাক্কা খেয়ে মনে পড়ে – চিরন্তন প্রবাহ। কিন্তু পরিমল রায় আর কাজী অনির্বাণ এমন একটি কাজ করে ফেলেছেন যে এখন বেশ কিছু বছর মন আনচান করতেই থাকবে, খ্যাপা যেরকম পরশপাথর খুঁজে ফেরে সেরকম ভাবেই অন্তর্জালের দুনিয়া তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকব এহেন রত্ন্ররাজি। অন্তর্জাল একটি অতীব বিস্ময়, পদে পদে ভুল প্রমাণিত করে একটা কথা মগজে ঢুকিয়েছে যে হাল ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না – আজ থেকে দশ এগারো বছর আগে, তখন ফেসবুক তো কোন ছাড়, অর্কুট-ও আসেনি, নেট দুনিয়ার কিছু বন্ধু মিলে হারিয়ে যাওয়া সিনেমার লিস্টি তৈরি করতে বসেছিলাম – ‘জিঘাংসা’ এল, ‘ এক যে ছিল দেশ’ এল, দীপঙ্কর দে’র কথা প্রসঙ্গে ‘সুবর্ণগোলক’ এল। মিউজিক ওয়ার্ল্ড থেকে মেলোডি –  সবাই এসব সিনেমার নাম শুনলেই হাসতেন, বলতেন “ক্ষেপেছেন নাকি? ওসব হারিয়ে গেছে মশাই, স্রেফ হারিয়ে গেছে; কোনো কপিই নেই বাজারে”। সেকথা সত্যি, উৎসাহীরা ভিডিও ক্যাসেট অবধি খুঁজে পাননি। কিমাশ্চর্যম, ২০০৭-এ কোথা থেকে এসে গেলে জিঘাংসা, বছর কুড়ি পর জলার ডাইনীর চিৎকার শুনতে পেয়ে বেজায় খুশী। কোত্থেকে সব অজানা আপলোডাররা নিয়ে আসতে থাকলেন হারিয়ে যাওয়া চুলের ওষুধ কিম্বা খোদ হিমালয় থেকে গড়িয়ে আসা সোনার বল। বাবার কাছে শুনেছিলাম ‘কঙ্কাল’ সিনেমায় ধীরাজ ভট্টাচার্যের ভয় পাওয়ার অভিব্যক্তি নাকি কোটিতে এক, সেও দেখা হয়ে গেল (বাবা স্লাইট বাড়িয়ে বলেছেন কিন্তু সিনেমাটি স্ট্রংলি রেকমেন্ডেড)। বিচ্ছিরি সাউন্ড কোয়ালিটি নিয়ে আরো বছর খানেক পর দেখা দিল ‘ছুটির ফাঁদে’ – অসমের রিজিওনাল টেলিভিশনে নাকি একদিন দিয়েছিল, কোন সহৃদয় অসমবাসী বাঙ্গালী টিভিরিপ ভার্সনটি তুলে দিলেন। সেসব অদেখা বন্ধুদের শতকোটি ধন্যবাদ, আশায় আছি একদিন না একদিন ‘শজারুর কাঁটা’ কি ‘পদিপিসীর বর্মীবাক্স’-এরও দেখা পেয়ে যাব।

যাই হোক, আসল কথায় ফেরা যাক। পরিমল রায় এবং কাজী অনির্বাণের সম্পাদনায় গত বছর বেরিয়েছে ‘A Directory of Bengali Cinema’, আনন্দবাজার থেকে শুরু করে টাইমস অফ ইন্ডিয়া, একাধিক কাগজে রীতিমতন ভালো রিভিউ পেয়ে অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে ছিল বইটি নেড়েচেড়ে দেখার, সম্প্রতি সে আশা সফল  হয়েছে। প্রায় ন’শ পাতার বইটি কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই ডিরেক্টরি, অর্থাৎ আলোচনা-সমালোচনা-বিশ্লেষণের কোনো স্থান নেই – ঐ ন’শ পাতা ধরেই শুধুই বাংলা চলচ্চিত্র, কলাকুশলীদের নাম, প্রকাশকাল ইত্যাদির তালিকা, ১৯১৭-র ‘সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র’ দিয়ে শুরু, শেষ ২০১১-র ‘উনিশ কুড়ির গল্প-এ। কিন্তু সমঝদারো কে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়, সিনেরসিকরা ওই আপাতনিষ্প্রাণ তালিকার মধ্যে থেকে খুঁজে পাবেন হাজার এক রাত জাগার খোরাক। আপনি যদি ট্রিভিয়া কালেক্টর হন তাহলে তো পোয়া বারো কিন্তু ট্রিভিয়ারসে বঞ্চিতদের জন্যও রয়েছে একটি অসামান্য রসদ – বাংলা সিনেমার পোস্টার-আর্টের স্বর্ণযুগের একটা প্রামাণ্য দলিল এই বইটি। তাসকেন  (Taschen) এবং অন্যান্য ইউরোপীয় বা আমেরিকান পাবলিশিং হাউস থেকে বের হতে দেখেছি ইটালিয়ান, মেক্সিকান বা হলিউডি সিনেমার পোস্টারের কফি টেবল বুক। বাংলা সিনেমার পোস্টার নিয়েও সেরকমটি কিছু নিয্যস ভাবা যায়, শিল্পকলা হোক কি ইন্ট্রিগ কোশেন্ট কোনোদিক থেকেই কম পড়বে না।

১৯৪৩ এর সিনেমা ‘কাশীনাথ’ এর কথাই ধরুন, পোস্টার জোড়া শরৎচন্দ্রের ছবি – একজন লেখকের খ্যাতি কোন জায়গায় পৌঁছলে সিনেমার প্রমোশনে নায়ক-নায়িকা, পরিচালক, প্রযোজক সবার নাম বা ছবি বাদ পড়ে! কিন্তু ভাববেন না এটা নিউ থিয়েটার্সের একচেটিয়া স্ট্র্যাটেজী। নারায়ণ পিকচার্সের ১৯৫০ সালের ‘মেজদিদি’ কি এস-বি প্রোডাকশনের ‘শুভদা’ (১৯৫২) বা ‘মন্দির’ (১৯৫২) এর পোস্টারেও শুধুই শরৎচন্দ্র। বঙ্কিম (‘রাজমোহনের বউ’, ১৯৫১) কি রবীন্দ্রনাথ-ও (‘মালঞ্চ’, ১৯৫৩) আছেন, কিন্তু শরৎচন্দ্রের থেকে কয়েক মাইল দূরে। ইন ফ্যাক্ট, চল্লিশ কি পঞ্চাশের  দশকে ‘শরৎবাবু’র গল্প-উপন্যাস নিয়ে যা সিনেমা হয়েছে তার ৮০-৯০% পোস্টারেই দেখছি শুধু লেখকের মুখ! কথায় কথায় মনে পড়ল দেখছিলাম আর্লি ফিফটিজে বায়োপিকের প্রায় বন্যা বয়ে গেছে, বিদ্যাসাগর-মধুসূদন-রামকৃষ্ণ থেকে শুরু করে এমন কি তুলসীদাস-ও বাদ পড়েননি।

অতি পুরনো বাংলা হরর, থ্রিলার, ফ্যান্টাসি ফিকশন নিয়ে আমার ফ্যান্টাসি বহুদিনের, ওই গোত্রের ভালো সিনেমা (অবশ্যই রেফারেন্স পয়েন্ট টিকে যথাযথ জায়গায় নিয়ে গিয়ে) খুঁজে বার করতে গিয়ে বেশ থ্রিল-ও অনুভব করি। তাই ‘ঝড়ের পর’ (১৯৪৭) এর পোস্টার দেখা ইস্তক মন উচাটন। প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায় সুলভ অলঙ্করণে দেখতে পাচ্ছি অবিশ্রান্ত বৃষ্টি ও ঝড়ের রাতে চাপদাড়ি এবং চশমা সমেত কেউ একজন আশ্রয়ের খোঁজে অজানা পথে এগিয়ে চলেছেন, বাঁ হাতটি কপালের কাছে তোলা বৃষ্টির ছাঁট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য, আর সিনেমাটিক ব্যাকগ্রাউন্ডে অলক্ষ্যে এই রাত্রীর যাত্রীর প্রতি নজর রাখছে দুটি রক্তবর্ণ, জিঘাংসামাখা চোখ। ডেস্ক্রিপশন তো পড়লেন, বলুন তো শুনেই মনে হচ্ছে না কালবৈশাখীর রাতে বসে পড়ি ঝড়ের পর এক্স্যাক্ট কি হয়েছিল জানতে? ১৯৪৯-এর ‘কুয়াশা’র পোস্টারে দেখা যাচ্ছে ধীরাজ আপাতনির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, টপ লেফট কর্নার থেকে একটি মাকড়শা জাল  বুনতে বুনতে এগিয়ে আসছে, জালের বিস্তার ফলো করতে করতে একসময় আপনার নজর চলে যাবে বটম রাইটে, দেখতে পাবেন আপনার উৎসাহ উদ্দীপনাকে দ্বিগুণ করে তোলার জন্য কাহিনী ও পরিচালনার ভার নিয়েছেন স্বয়ং প্রেমেন্দ্র মিত্র। আবার যদি ভেবে থাকেন শুধু হলিউডই ‘not for the fainthearted’  জাতীয় ট্যাগলাইন ব্যবহার করে এসেছে, বসুমিত্রর ভয়াল ভয়ঙ্কর ‘ভৈরব মন্ত্র’ (১৯৫১) আপনার সে ভুল ভাঙ্গিয়ে দেবে – নিকষ কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে ফুটে উঠেছে আলো আঁধারি মাখা এক কাপালিকের মুখ, মর্মভেদী দৃষ্টিতে তিনি আপনার দিকে তাকিয়ে। একটু শিউরে উঠে চোখ সরিয়ে নিয়ে নীচের দিকে গেলেই দেখতে পাবেন লেখা রয়েছে ‘কাপুরুষের জন্য নয়’। একদম ওপরে হরর ফন্টে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে ফুটে উঠেছে ‘ভৈরব মন্ত্র’, পাশে বিশেষণ ভয়াল ভয়ঙ্কর; টাইটলের ঠিক নিচে ক্ষুদি ক্ষুদি অক্ষরে ব্যাপারটা অবশ্য প্রাঞ্জল করে বোঝানো হয়েছে – শবসাধনার মন্ত্র। ভীতু মানুষদের জন্য ১৯৫১ সাল যে ঠিক এন্টারটেইনিং ছিল না তার আরো প্রমাণ পাওয়া যায় ‘সংকেত’ ছবিতে, লাল-কালো পোস্টারের ওপরে বাঁদিক জুড়ে একটি সাদা নরকরোটি, সেখানে স্পষ্টাস্পষ্টি লেখা ” আপনি কি দুর্বলচিত্ত? তবে এ ছবি আপনার জন্য নয়”। এর পরেও যদি সামান্যতম কনফিউশন থেকে থাকে, তা দূর করার জন্য আরো লিখে দেওয়া হয়েছে শ্রেষ্ঠাংশে ‘অশরীরী প্রেত’। বসুমিত্রকে নিয়ে আরেকটু গবেষণা হওয়া দরকার, একটা হিন্ট পাওয়া যাচ্ছে যে র‍্যামসে ব্রাদার্সের বহু আগেই পথ দেখিয়ে গেছেন উনি, আফটার অল ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ‘সাদা কালো’র (১৯৫৪) পোস্টারে  পাঁশুটে  লালের আধিক্যই বেশী, শিশির মিত্রর পাসপোর্ট সাইজ ফটোগ্রাফের পাশেই সেখানে দেখা পাওয়া যাচ্ছে এক না-মানুষী বিভীষিকার, দু’দিক থেকে ভ্যাম্পায়ার সুলভ দুই তীক্ষ্ণ দাঁত বার হয়ে আছে, কোন অভূতপূর্ব অ্যান্টিগ্র্যাভিটির টানে তার মাথার সব চুল খাড়া।

বাংলা সিনেমার ফেল্ট হ্যাট নিয়ে ফ্যাসিনেশন-ও বহুদিনের, এ নিয়ে আগেও একটা ব্লগ পোস্টে লিখেছিলাম। ১৯৪৭ সালেই দেখছি ফেল্ট হ্যাট দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে চিত্রবাণীর ‘রহস্যময় চিত্র ‘রাত্রি’ তে’। কুয়াশামাখা রাত্রির নিঃঝুম রাস্তায় ও কোন আগন্তুক? ফেল্ট হ্যাট পরে কোন রহস্য ঘনীভূত করতে এগিয়ে চলেছে? এর মধ্যে আবার একটা নয়ার (Noir) ফিলিং এসেছে জনবিহীন রাস্তার মোড়ের গ্যাসবাতিগুলোর জন্য। ১৯৫০-এর ‘জীবন সৈকত’-এও দেখছি রাধামোহন ভট্টাচার্য মাথায় ফেল্ট হ্যাট, মুখে পাইপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। সিনেমার নামের আপাত-রহস্যহীনতা (বা ক্ষীণতা) কে নিগেট করার জন্য এখানেও রাত্রির পটভূমিকায় গ্যাসলাইটের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। ‘জিঘাংসা’ (১৯৫১)-র পোস্টারে তো ফেল্টহ্যাট থাকতেই হত, সাদা কালোর ম্যাট ফিনিশে সেখানে নেমে এসেছে বটের ঝুরি; আগাছায় ছেয়ে থাকা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সেই ফেল্টহ্যাটের চোখে পড়েছে এক রহস্যময় নারীমূর্তি। ১৯৫১-রই ‘সে নিল বিদায়’-এও ফেল্টহ্যাট, ডানদিকের শাড়ী পরা পাশের বাড়ির মেয়েটিকে বাদ দিলে মনে হবে পোস্টারটি উঠে এসেছে আমেরিকান পাল্প ফিকশন থেকে, হাতে রিভলভার এবং মাথায় ফেল্ট হ্যাট নিয়ে যিনি দাঁড়িয়ে তাকেও আদৌ বাঙ্গালী দেখতে লাগছে না।

স্রেফ জড়বস্তুর ব্যবহার-ও বেশ মন দিয়ে দেখার মতন। ১৯৫৩-এর ‘মহারাজা নন্দকুমার’-এ দেখতে পাচ্ছি ফাঁকা সিংহাসন, ভূলুণ্ঠিত মুকুট এবং বুটজোড়া পা (সম্ভবত ব্রিটিশ), ১৯৪৮-এর ‘অঞ্জনগড়’-এ আবার শুধুই দুর্গের ছবি, স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে অঞ্জন নামক গড়টিই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র। ‘অপরাজিতা’ (১৯৫১) তে আবার সবুজ ব্যাকগ্রাউন্ডে, হলুদ লাইমলাইটে ফুটে উঠেছে একটি নীল অপরাজিতা ফুল, দূর থেকে দেখলে হঠাৎ মনে হতে পারে জোনাথন লিভিংস্টোন সীগাল প্রথম উড়তে শেখার আনন্দে গোঁত খেয়ে নিচে নামছে। ‘অপরাজিতা’-র কিন্তু স্টার-স্টাডেড কাস্ট, “মুখ্যভূমিকায় অভিনয় করেছেন” পাহাড়ী সান্যাল, ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্র, মলিনা দেবী প্রমুখ। জরাসন্ধের ক্লাসিক উপন্যাস অবলম্বনে বানানো তপন সিংহের ‘লৌহকপাট’-এ আবার জেলের দরজা নয়, জেলরের চাবিটিকেই দেখা যাচ্ছে পোস্টারের সিংহভাগ দখল করে থাকতে।

‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’য় বাংলা সিনেমা নিয়ে কথা হচ্ছে আর উত্তমকুমারের কথা উঠবে না তাও কি হয়? উত্তমপ্রেমীদের জন্য কিছু পোস্টার ষোলা আনা কালেক্টর’স আইটেম,  যাকে বলে অতি উত্তম কথা। যেমন ধরুন ১৯৫৮-র ‘শিকার’ ছবির পোস্টার, ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যাচ্ছে জঙ্গল এবং পাহাড়, তার মধ্যে দিয়েই হাওদা পিঠে চলেছে কুনকি হাতি। ফোরগ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে স্বয়ং উত্তম – মাথায় টুপি, এক হাত কোমরে (যেখানে কার্তুজের বেল্ট ঝুলছে), আরেক হাতে ধরা বন্দুক, প্যান্ট গুটিয়ে ঢোকানো হয়েছে বুটের মধ্যে তাই একটা প্রক্সি ব্রিচেস ব্যাপার তৈরি হয়েছে। মুখে পাইপ, চোখে জিজ্ঞাসা, অল্প ভুরূ কুঁচকে নায়ক তাকিয়ে, গোঁফ দেখে মনে হচ্ছে ওটা নিয়েই এক বছর পরে ‘বিচারক’ এর শুটিং করতে যাবেন। সব থেকে বড় কথাটা হল, আমি জানতামই না উত্তম এরকম একটা সিনেমা করেছেন। ‘নাইট অফ দ্য হান্টার’-এ রবার্ট মিচামকে মনে আছে? বাঁ হাতের আঙ্গুলের গাঁটে গাঁটে লেখা ‘Hate’ আর ডান হাতে ‘Love’, ওরকম আইকনিক একটা পোজ হলিউডেই বা আর কটা? তাই সমরেশ বসু যদিও ‘নাইট অফ দ্য হান্টার’ অবলম্বনেই ‘কুহক’ এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, উত্তমের মধ্যে রবার্ট মিচামকে খুঁজতে যাওয়ার মানে হয় না। অথচ যেই মুহূর্তে ডান চোখ বন্ধ, বাঁ চোখ খোলা উত্তমকে একটা ডেজড লুকে দেখলাম সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল সেই লাভ-হেট এর অবিস্মরণীয় কনট্র্যাস্টকে। জানতেন কি তারাশঙ্করের উপন্যাস অবলম্বনে অগ্রগামী ১৯৬২তে বানিয়েছিল ‘কান্না’? সেখানেও উত্তম –  ক্লান্ত, বিদ্ধস্ত, অসহায়; একটা বিরাট অক্ষিকোটরের মধ্যে নন্দিতা বোসের মুখ, আর সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে উত্তমের ওপর। জানতাম না, সলিল সেনের ‘অসাধারণ’ (১৯৭৭)-এও উত্তম ছিলেন, সেখানে আবার পরিচালক উত্তমকে দিয়ে টানিয়েছেন রিক্সা!

আই-এম-ডি-বি  ফেল মেরে গেলেও পরিমল-অনির্বাণরা আছেন, জয়তু টলিউড!