নিয়েন্ডারথালের দেশে – ১

Taxidermy - 1

“কি করা হয়?” শুধোলেন মার্টিন, স্টীয়ারিং থেকে হাতটা তুলে চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে।

আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম, কোনো এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই রাস্তার দু’পাশে এত গভীর অন্ধকার আগে কখনো দেখিনি – টিমটিমে হলুদ আলোও দেখা যাচ্ছে না, সূচীভেদ্য অন্ধকার যাকে বলে এ হল তাই। ঘন্টা খানেক আগে যখন প্লেন বেলগ্রেড এয়ারপোর্টে নামছিল, লক্ষ্য করলাম এয়ারপোর্টটা আক্ষরিক অর্থেই চাষের জমি কেটে বানানো – নেহাত টারম্যাক নজরে আসছিল, না হলে ভাবার বিলক্ষণ কারণ ছিল ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং হতে চলেছে। কিন্তু সার্বিয়া বলুন কি স্লোভেনিয়া, সবই তো সেই আদি য়ুগোস্লাভিয়া থেকেই বেরিয়েছে। ইস্টার্ন ব্লক-ইস্টার্ন ব্লক গন্ধটা সহজে গা থেকে মোছার নয়, তাই লুবলানিয়ার এয়ারপোর্টে প্লেন ল্যান্ড করার সময় মনে হতেই পারে সারা শহরটা লোডশেডিং-এ ডুবে।

মার্টিনের প্রশ্নের উত্তর দিতে যাচ্ছি, অন্ধকার রাস্তায় ক্যাঁআআআআচ শব্দ করে ট্যাক্সি থামল।  দেখি দশ-পনের ফুট দূরে এক ঝাঁকড়াচুলো মূর্তি হাইওয়ের ওপরে উঠে এসেছে। মার্টিন অস্ফূটে একটা গালাগালি দিলেন কিন্তু মার্কিনী বা ব্রিটিশ ইংলিশের তাবৎ গালাগালির থেকে একটু আলাদা শোনালো। ঝাঁকড়াচুল ধীরে ধীরে হাইওয়ে ক্রস করছে, মার্টিন পেছনে ফিরে একগাল হেসে বললেন ‘নিয়েন্ডারথাল’। পিচব্ল্যাক অন্ধকারের সিল্যুয়েটে ঝাঁকড়াচুলের পোষাকপরিচ্ছদের ব্যাপারটা ইগনোর করে গেলে একটা নিয়েন্ডারথাল লুক আসে বটে কিন্তু আমি এহেন অ্যানথ্রোপলজিক্যাল গালি শুনে বিলক্ষণ ইম্প্রেসড। দূরে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের মাথায় একাকী এক গির্জা; মনে হল নিয়েন্ডারথালটি যেন গির্জার তালাটি লাগিয়ে, শেষবারের মতন ঘন্টাটি বাজিয়ে ধীরে ধীরে বাড়িমুখো হয়েছেন। কবেকার গির্জা সেটা শুধিয়ে অবশ্য লাভ হল না, আমার ট্যাক্সিচালকটি পরিচয় পেয়ে মহা উৎসাহে ততক্ষণে জানাচ্ছেন ট্যাক্সি চালানোটা নেহাতই তাঁর পার্টটাইম জব, রিয়াল এস্টেটের বিজনেসটাই আসল সুতরাং অর্থনীতি নিয়ে পেশার খাতিরেই তাঁকেও ওয়াকিফহাল থাকতে হয়। নিয়েন্ডারথালকে নিয়ে যে রোমাঞ্চ জেগে উঠেছিল, ইনফ্লেশন এবং রিসেশনের তাড়নায় সেটাকে আপাতত মুলতুবি রাখতে হল।

ইউনিভার্সিটি অফ লুবলানিয়া (এ দেশের রাজধানী) থেকে স্লোভেনিয়ার ন্যাশনাল মিউজিয়ম  ট্যাক্সিতে সাকুল্যে দশ  মিনিটের রাস্তা (অবশ্য রেল স্টেশন-ও দশ মিনিট, সিটি সেন্টার-ও দশ মিনিট, শহরের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কোনো প্রান্তে যেতে ওই দশ মিনিটই লাগে) – রিসার্চ সেমিনার দেওয়ার কথা দুপুর একটায়, মিউজিয়ম খোলে সকাল দশটায় সুতরাং ঢুঁ মারাই যায়। গিয়ে চমৎকৃত হলাম, ন্যাশনাল মিউজিয়মে আমি একমাত্র দর্শনার্থী কিন্তু টিকিট যিনি দেবেন তাঁর সন্ধান নেই। প্যালেশিয়াল বিল্ডিং-এর ভেতরে সিঁড়ি দেখেই  মনে হয় এই বুঝি কমল মিত্র গাউন পরে পাইপ চিবোতে চিবোতে নেমে আসবেন। কমল মিত্রের বদলে তড়িঘড়ি নেমে এলেন এক স্বর্ণকেশিনী, সকাল দশটাতেই দর্শনার্থীর আগমনের খবরে একটু বিস্মিত। দিলেন দু’খান টিকেট, সিঁড়িতে উঠে বাঁদিকে বেকে গেলেই ন্যাশনাল মিউজিয়ম আর ডানদিকে ঘুরলে ন্যাচারাল মিউজিয়ম। জাতীয় জাদুঘরটি নিজেই জাদুঘরে স্থান পাওয়ার যোগ্য কারণ কিছু প্রাগৈতিহাসিক ছোরাছুরি, থালাবাটি ছাড়া দেখার কিছু নেই; সব নাকি শহরের অন্যান্য মিউজিয়মে দান করা হয়েছে। কিন্তু তাক লাগিয়ে দিল ন্যাচারাল মিউজিয়ম। ট্যাক্সিডার্মি নিয়ে হরর স্টোরি কম পড়িনি কিন্তু সকাল সাড়ে দশটার সময়েও প্রায়ান্ধকার ঘরের চতুর্দিক থেকে অপলকে তাকিয়ে থাকা হরেক কিসিমের প্রাণীদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি সে সব ভয়াল গল্প পড়েও পাইনি।

taxidermy 2

কথায় বলে ‘মরা মাছের চোখ’ – নিষ্প্রাণ, নির্জীব, অনুভূতিশূন্য। কখনোসখনো মানুষের চোখ দেখেও মনে পড়েছে সেকথা কিন্তু এই বিভুঁই-এ মরা মাছের চোখও কথা বলে, দুটো গভীর কালো কোটর মনে করিয়ে দেয় গভীর জলের রহস্য আমাদের এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

Taxidermy 3

কিন্তু না,  শ্বদন্ত বার করে থাকা নেকড়ে কি সারি সারি বয়ামে ডুবে থাকা বিষাক্ত সরীসৃপ কিম্বা জলশূন্য জলাধারে রাখা গভীর সমুদ্রের বিস্ময় নয়,  গা শিউরে ওঠানোর জন্য আপনাকে যেতে হবে মিউজিয়মের বাইরে। লুবলানিয়া থেকে আরো দক্ষিণে পোস্তায়না গুহায়, পাঁচশ হাজার বছরের পুরনো অগুন্তি স্ট্যালাগমাইটের থামের নীচে সেখানে অপেক্ষা করছে লর্ড অফ দ্য রিংসের স্মিগোল। পোশাকি নাম ওম, ইংরেজিভাষীদের সুবিধার্থে ডাকা হয় ‘হিউম্যান ফিশ’ নামে। গোলাপী মসৃণতার এই হিলহিলে শরীরে চোখের কোনো জায়গা নেই, মাছের থেকে সাপের সঙ্গেই মিল বেশী হয়ত। পাখনার জায়গায় পা,  জলজ উদ্ভিদের মত কানকো বেরিয়ে রয়েছে মাথার দুদিকে থেকে।  স্লোভেনিয়া, বসনিয়া কশ্চিৎ ইটালির কোনো গুহার অতলে দেখা পেয়ে যেতে পারেন এই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর।

Human Fish

ওহ, প্রাগৈতিহাসিক বললাম কি? সেই অ্যানথ্রোপলজিক্যাল গালির-ও রহস্যভেদ হল যে। চারশ হাজার বছর আগে এই স্লোভেনিয়াতেই ঘাঁটি ছিল সেই আদিম মানুষের। এ দেশ থেকেই শুরু করেই ধীরে ধীরে বাকি ইয়োরোপ হয়ে মধ্য এশিয়া অবধি ছড়িয়ে পড়ে এদের বিস্তার।  স্লোভেনিয়ার ন্যাশনাল মিউজিয়মে দেখা পাওয়া যাবে নিয়েন্ডারথাল ফ্লুটের।  প্রায় পঞ্চাশ হাজার বছর আগেও ইয়োরোপের গুহায় বাঁশি বেজেছে ভাবলেই অবাক হতে হয়, তাই না? নিয়েন্ডারথাল আর নেহাত তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শব্দ নয় তাহলে, স্পষ্টতই  দেখা যাচ্ছে তারাও সংবেদনশীল মানুষ ছিল, কে জানে ওই প্রিমিটিভ বাঁশির মধ্যেই হয়ত লুকিয়ে আছে আদি ভাষাবিস্তারের রহস্য।

Neanderthan Flute

গুহার সঙ্গে স্লোভেনিয়ার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। না মানুষী হিউম্যান ফিশ কি আদি মানব নিয়েন্ডারথালরাই নয়, এ দেশের গুহার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক শিভ্যালরাস গল্পও – পরের দিন জানাবো সেই স্থানীয় রবিন হুডের কথা।

(দ্বিতীয় পর্ব)

Advertisements

2 thoughts on “নিয়েন্ডারথালের দেশে – ১

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s