মেডুসা এবং আরো কয়েকজন

Medusa

সুলতানআহমেতের ট্রাম স্টপটায় নামলেই আপনার চোখে পড়বে না গির্জা, না মস্ক জাতীয় একটা স্ট্রাকচারের সামনে মস্ত লাইন, তামাম দুনিয়ার কাঁহা কাঁহা থেকে লোকজন এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে সেখানে। সপ্তাহের কোন দিন সে নিয়ে না ভাবলেও চলবে, দশটা পাঁচটা একই লাইন – কেউ ছাদখোলা ডাবল ডেকার বাসে ট্যুর নিতে নিতে টুক করে নেমে পড়েছেন, বাস ড্রাইভার এক ঘন্টা সময় দেওয়ায়  বেজায় চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে, কেউ বা আবার গাইডেড ট্যুর নিয়ে দরাদরিতে ব্যস্ত, আবার হয়ত দেখবেন কোন মধ্যবয়স্কা বিপুল খুশীতে উচ্ছ্বসিত হয়ে সর্বসমক্ষেই তাঁর হৃদয়বল্লভকে ফরাসী কায়দায় চুম্বন দিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছেন। এত খুশীর কারণ আছে, আয়া সোফিয়া দেখা  তো আর রোজ রোজ হয়ে ওঠে না। আর শুধু কি সেই পনেরশ বছরের পুরনো গির্জা কাম মস্ক, ওখান থেকে কোণাকুণি এগোলেই পৌঁছে যাবেন ব্লু মস্কে, শুধু নীল নয় রকমারি রঙের সে কি সূক্ষ্ম কারুকাজ সে মসজিদের সিলিং-এ। আবার আয়া সোফিয়ার ডান দিকে ঘুরে পেছনে চলে যান, অপেক্ষা করছে টোপকাপি প্যালেস। সুলতানদের রাজকীয় দরবার, হামাম, হারেমের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যদি তুরস্ক তথা মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে হঠাৎ আগ্রহান্বিত হয়ে পড়েন তবে টোপকাপির পাশেই ঢুকে পড়তে পারেন ইস্তানবুল আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়মে, ঘন্টা তিনেক কোথা দিয়ে চলে যাবে টের-ও পাবেন না। এত সব কিছু কভার করতে করতে রাস্তার ওদিকে যাওয়ার হয়ত সময়ই হবে না, আর গিয়ে করবেনই বা কি – বেবাক রেস্তরাঁ ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে আছে। আর যদি বা গেলেন, চোখে পড়তে বাধ্য গ্র্যান্ড বাজার যাওয়ার নির্দেশিকা বোর্ড। বিশ্বের বৃহত্তম ঘেরা বাজারটিকে চাক্ষুষ দেখতে এমন অধীর হয়ে ছুটবেন যে মোটেই চোখে পড়বে না আয়া সোফিয়ার ব্যস্ত চৌহদ্দি ছেড়ে দু এক জন গুটিগুটি পায়ে রাস্তার উল্টোদিকে কোথায় যেন চলেছেন।

কিন্তু যদি দৈবাৎ চোখে পড়ে, তাহলে ওদের পেছনে পেছনেই চলবেন। গ্র্যান্ড বাজারে আপনার গলাটি নিবেদন করার জন্য সময়ের কমতি হবে না, একটু গোয়েন্দাগিরিতে ক্ষতি কি? আপনি আরো কৌতূহলী হয়ে পড়লেন কারণ যাঁদেরকে ফলো করছিলেন তাঁরা অল্প একটু চড়াইয়ে উঠে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তড়িঘড়ি দৌড়ে গিয়ে উতরাই ধরে নেমে আপনি থ, ওহ শেষে কিনা ‘সুলভ’! সুলতানআহমেতে এসে ইস্তক আপনার এমনিই মনে হচ্ছে ইউরোপের কোথাও তো নয়, নতুন দিল্লীর পালিকা বাজার থেকে শুরু করে পুরনো দিল্লীর দরিয়াগঞ্জের মধ্যেই চক্কর কেটে চলেছেন। সেখানে সুলভের মতন বিল্ডিং দেখে খুব একটা চমকাবেন না হয়ত কিন্তু ভালো করে তাকালে আবার কৌতূহল ফিরে আসবে। বিস্তর লোকজনকে ঢুকতে দেখছেন কিন্তু বেরোচ্ছে না কেউই। এরকম-ও নয় যে তার জন্য বাইরে লাইন পড়ে গেছে। একটু তা না না করে হয়ত ঢুকেই পড়লেন, দশ টার্কিশ লিরা গুনে দেওয়ার সময়ে এমনিই বুঝতে পারবেন যে সুলভের থেকে বেদরকারী কোনো জায়গাতেই হয়ত ঢুকছেন। তারপর ঘোরানো সিঁড়ি ধরে যেই নামতে শুরু করবেন তক্ষুনি দেখবেন অবাক কান্ড, টাইম আর প্লেস দুয়েরই ডিসপ্লেসমেন্ট ঘটছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে পাতালপ্রবেশ সম্পূর্ণ, আর আপনারও চক্ষুস্থির। কি কান্ড, আপনি পৌঁছে গেছেন সেই ‘সাঙ্কেন প্যালেসে’, চোদ্দশ বছর আগে বাইজ্যান্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ন রাস্তার এদিকেও মন দিয়েছিলেন যে। যে বিশাল পাতালপুরী থেকে জল যেত কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাসাদে, সেই ব্যাসিলিকা সিস্টার্নের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন আপনি।

অল্প আলো আর অনেকটা আঁধারির মধ্যে ঘুরে বেড়াবেন আপনি; দেখবেন তিন শতাধিক মার্বল থামের নীচ এখনো জলমগ্ন, সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে অগুন্তি মাছ, কিছু  দৈত্যাকৃতি। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে কি? আলো জ্বললেও কি একটু অস্বস্তি লাগছে? মনে হচ্ছে মাটির ওপরের স্বতঃস্ফূর্ততাটা পাচ্ছেন না? ভাবতেই ভাবতেই চোখ চলে গেছে এক কোণে, আর কিরকম মন্ত্রমুগ্ধের মতন এগিয়ে চলেছেন আপনি। কেন? কেন? উত্তর খুঁজে পাওয়ার জন্য মার্বল থামের দিকেই তাকিয়েছেন আর মেরুদন্ড দিয়ে ঠিক শীতল স্রোত না বয়ে গেলেও, বেশ কিছুক্ষণ বাক্যস্ফূর্তি ঘটেনি। আপনার সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছে আরো কিছু চোখের, না দু’জোড়া নয়, তার থেকে অনেক বেশী।  থামের নীচে কাত হয়ে শুয়ে আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে সে, যার কথা না জানি কত হাজারবার পড়ে এসেছেন –  গ্রীক পুরাণ থেকে শুরু করে আধুনিক গ্রাফিক নভেল,  সত্যজিতের গল্পে প্রথমবারের জন্য জেনেছিলেন এই না মানুষীর রক্ত থেকেই জন্মেছিল গ্রীক পক্ষীরাজ পেগাস্যাস। বাইজ্যান্টাইন সম্রাটের আদেশে কোন রোমান শহর থেকে কারা একে নিয়ে এসেছিল, কেনই বা নিয়ে এসেছিল সে এক রহস্য, উত্তর কেউই দিতে পারেননি। তাই ইতিহাস আর পুরাণের যাবতীয় রহস্যানুভূতি অক্ষুণ্ণ রেখে ব্যাসিলিকা সিস্টার্নের ভেতর আজও রয়ে গেছে মেডুসার দুটি মাথা, পাশাপাশি থামে।

এই যে সম্মোহনী শক্তি নিয়ে এত গল্প, মেডুসার চোখে চোখ পড়লেই মানুষ পাথর হয়ে যেত – এই নিয়ে ভাবছেন আপনি। ভাবছেন এই লেজেন্ডগুলো তৈরী হয় কি ভাবে, কোন প্রাগৈতিহাসিক ডাইনিকে জীবদ্দশায় তিষ্ঠোতে না দিয়ে পুরাণ শেষমেশ বানিয়ে দিল দানবী – ভাবনার তাড়নায় অন্যমনস্ক হয়ে হোঁচট খেয়েছেন আপনি। ‘উফ’, মুখ তুলতেই চোখে পড়েছে অন্ধকারে এক কোণে মার্বল স্লেটে কি যেন লেখা। দেখবেন নাকি একটু? পড়তে পড়তে অবাক হয়ে গেছেন, একি, এ কার কথা! এ তো অপরূপা, প্রাণোচ্ছল এক তরুণীর কথা। কিন্তু তার সুখের কথা নিয়ে বেশী কিছু বলার নেই লিপিকারের, অজ্ঞাত লিপিকার জানিয়েছেন সে তরুণীর রূপে পাগল হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ নর থেকে দেব সবাই। মিলনেচ্ছায় মানুষ তো কোন ছাড়, স্বয়ং দেবতাও পিশাচ হয়ে উঠতে পারেন। দেবী এথেনার মন্দিরে সমুদ্রের দেবতা পজিডন মেডুসাকে ধর্ষণ করেন। কিন্তু ট্র্যাজেডি কি শুধু সেখানেই, তার থেকেও বড় ট্র্যাজেডি নেই? মন্দিরের পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার দরুণ কাউকে তো শাস্তি পেতে হবে। কে পাবে? আপনা মাংসে হরিণা বৈরী – তাই এথেনার অভিশাপে মেডুসার চুলের জায়গায় দেখা দিল অযুত নিযুত সাপ, মুখের অবয়বে স্থান পেল অভূতপূর্ব  বিভীষিকা। সুন্দরী তরুণীর মুখের বীভৎসতায় মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গেল, শুধু স্তম্ভিত বললেও বুঝি বলা হয় না, বলতে হয় প্রস্তরীভূত হয়ে গেল। পাতালপুরীর নির্জনতা আপনার মনকে আরো দ্রবীভূত করে ফেলেছে; ভাবছেন পুরাণ, ইতিহাস, বর্তমান  নির্বিশেষে এই অকল্পনীয় বিচারের প্রহসনকে কি নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছি আমরা, বারে বারে – রূপ, গুণ, বিদ্যা, স্বাধীনেচ্ছা কোনোকিছুই বাঁচাতে পারেনি আমাদের মেয়েদের।  আপনার মনে পড়ে যাবে পঞ্চবটী বনের মধ্যে অনার্য শূর্পণখাকে কি নিদারুণ শাস্তি পেতে হয়েছিল আর্যপুত্রের থেকে,  মনে পড়ে যাবে আলেকজান্দ্রিয়া শহরে নেকড়ের দল কিভাবে ছিঁড়ে খেয়েছিল হাইপেশিয়াকে, হয়ত মনে পড়বে পার্ক স্ট্রীটের সুজেট জর্ডানকেও। যে পশুদের শাস্তি দেওয়ার জন্য শুধু মানবজনমই যথেষ্ট ছিল, দেবমাহাত্ম্যে তারাই ঘুরে বেড়িয়েছে নখদাঁত বার করে, লাঞ্ছিতার লাঞ্ছনা বেড়েই চলেছে আমৃত্যু।

চলে আসার আগে আর একবার খুঁটিয়ে দেখে নিন রাক্ষুসীর মুখ, সম্মোহনী দৃষ্টি নজরে পড়ল? আমি তো দেখলাম ক্লান্ত দুটো চোখ, অপার শূন্যতা।

পুনশ্চ – মার্বল স্লেটটা পুরোটা পড়তে ভুলবেন না। দ্বিতীয় লেজেন্ড অনুযায়ী, মেডুসার ওই কদাকার রূপের কারণ মেডুসার নিজের যৌনঈর্ষা, যার দরুণ চেহারায় ওই বীভৎসতা এবং পরিশেষে প্রণয়ীর ষড়যন্ত্রেই মৃত্যু। সতত ট্র্যাজিক এমন একটি চরিত্র কিভাবে ফ্যান্টাসি ফিকশনের ভ্যাম্প হয়ে দাঁড়াল সেটাও ভাববার ব্যাপার।

Advertisements