কোণার ঘর

কোণার ঘরটায় ঢুকতে ইতস্তত করি,  না ঢুকে বাইরের রেলিং টা ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। এরকম নয় যে কোণার ঘরটা আমার অপছন্দের, দিব্যি লাগে ঘরটা – ঘরটা আমার নয়, যে বাড়ির মধ্যে এই ঘর সেটাও আমার নয়, যে পাড়ার মধ্যে এই বাড়ি সেটাও আমার নয় কিন্তু সব কিছুই বড় টানে, মনে হয় এই ঘর, এই বাড়ি সব কিছুর সঙ্গেই একটা আত্মিক টান আছে। কিন্তু তাও ঢুকতে ইচ্ছে করে না, ইচ্ছে করেই একটু সময় নিই; চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি তিনতলার ছাদে শিউলিফুল ঝেঁপে এসেছে, চোখ নামিয়ে দেখি উঠোনের মধ্যেও কিভাবে যেন একটা কলাগাছ উঠে পড়েছে,  এদিকে তাকাই, ওদিকে তাকাই, সময় নিতে থাকি। ভেতরের ঘর থেকে শ্লেষ্মাজড়িত ঘড়ঘড়ে গলাটা অধৈর্য হয়ে উঠতে থাকে, “কোথায় গেলি? অপু, অপু?”  ঢুকি, গলার কাছটা ব্যাথা ব্যাথা করতে থাকে, ভাবি একবার জড়িয়ে ধরি শুকিয়ে আসা এই ছোট্টখাট্টো শরীরটাকে। কিন্তু জানি যে মানুষটা সারা জীবন আবেগে চলেছে তার কাছে আবেগ এখন দু’চক্ষের বিষ। বরং বলি “প্রমিস করেছিলে দাড়ি কেটে রাখবে, বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে, সত্যি বিচ্ছিরি।” সেই পুরনো হাসি যা আজকাল শুনতে পাই না, ফিরে আসে “কি যে বলিস অপলাস, কে দেখছে আমার খোঁচাখোঁচা সাদা দাড়ি? একটা বিয়ে করলে নয় তাও কথা ছিল, করব নাকিরে একটা  বিয়ে? লিখে দেব আটষট্টি বছরের বুড়ো, একটু সেবা চায়, বদলে না  থাকার মতন যেটুকু টাকাপয়সা আছে সেটা লিখে দেব।” এ ঠাট্টা আজকের নয়, তিরিশ বছরের পুরনো; কুড়ি বছর আগে হলেও ঘুষি পাকিয়ে বলতাম “নাহ, খবরদার বিয়ে করবে না মেজজেঠু; তুমি আমার কাছে থাকবে।” আজ কিছু বলে উঠতে পারি না, হাসতেও ইচ্ছে করে না, রসিকতা থেকে কোনো রস পাই না, অফুরন্ত মন খারাপ হতে থাকে।

চোখের কোণে একটু পিচুটি জমেছে, জানি ঠান্ডা লাগার ফল কিন্তু এই সামান্য জিনিস-ও কেন জানি একটা ভয়ঙ্কর বিচ্যুতি হয়ে ধরা পড়ে আমার কাছে। কাশতে কাশতে পিঠটা বেঁকে তুবড়ে যায়, আমি তড়িঘড়ি করে খুঁজতে থাকি আশির কোলাজ, নব্বইয়ের কোলাজ – সেই কনফিডেন্ট হাঁটা  যার জন্য পাঁচ পাঁচের কম হাইটেও কেন জানি না বেঁটে লাগত না, সেই খোশমেজাজ যার জন্য জ্যৈষ্ঠের গরমে হাইকোর্ট থেকে বাস চেপে টালিগঞ্জে এসে নামলেও মনে হত আদ্দির পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে একটু পাউডার ঢেলে  সন্ধ্যার আড্ডায় চলেছে। কিন্তু কোলাজ আসার আগেই খেই হারিয়ে ফেলি, অতর্কিতে প্রশ্ন আসে, ” আর সব খবর কি?” ভয়টা ফিরে আসে – কেন সেই এক প্রশ্ন জেঠু, তুমি তো জানো উত্তর, কি করবে শুনে। আস্তে আস্তে মাথা নাড়ি, “না জেঠু, কারোর খবর নেই।” মুখে একটা অদ্ভুত হাসি দেখতে পাই, তারপর একটু যেন জোর করে একটা বিষণ্নতা এনে তারপর বলে “সেই! তুই তো বিদেশে থাকিস, আমি কলকাতায় বসেই কারোর খবর পাই না। ।” আমি তাড়াতাড়ি কথা ঘোরাবার চেষ্টা  করি, “করেণুমতীর পর মহাভারত কেন্দ্রিক আরেকটা যে উপন্যাস লিখবে বলেছিলে, সেটা কতদূর এগোলো?” ।” ওসব গেছে, ওসব গেছে – এই ক্রুয়েল সোসাইটিতে বেঁচে থাকতে গেলে  সাহিত্যকর্ম হয় না, আর প্রকাশকগুলোর মতন তিলে খচ্চর কে আছে?”। গেছে যে সে আমিও জানি,  এ প্ল্যানটাও অন্তত পাঁচ-ছ বছরের পুরনো, কিন্তু কিছু দিয়ে তো ঠেকাতে হবে – তিক্ততায় আচ্ছন্ন  একজন মানুষকে একটু সাময়িক রেহাই দেওয়া, কিন্তু সে নিতে চাইলে তো। আমারও স্বার্থ আছে, অবশ্যই আছে;  এত নেগেটিভিটিতে পাগল পাগল লাগে, পালিয়ে যেতে চাই, উঠে পড়তে চাই বড় প্রিয় এক মানুষের সান্নিধ্য পেতে পেতেও। আবার কথা ঘোরাতে যাই, ” কিন্তু বৈষ্ণব হেলিওডোরাস কে নিয়ে যে উপন্যাসটা লিখেছিলে সেটার তো ম্যানুস্ক্রিপ্ট রেডি, ওটা অন্তত বই হয়ে বেরোতে দাও। আমি প্রুফরীডিং………”

কথা শেষ হয় না, কাশির দমকে আমরা দু’জনেই চমকে উঠি, মনে হয় চোখ এবারে ঠেলে বেরিয়ে আসবে। আমার রুমালটা এগিয়ে দি, “ন্না, ন্নাহ্‌………এত ভালো রুমাল নষ্ট করব না।” “রুমাল আবার খারাপ ভালো কি জেঠু, নাও………” মাথা নাড়তে নাড়তে উঠে দাঁড়ায় মা্নুষটা, খানিকটা টলতে টলতে বাথরুমের দিকে চলে যায়। আমি বসে আকাশপাতাল ভাবতে থাকি,  পি-এইচ-ডি না করে ফিরে আসাটা কি কোনো অপশন ছিল? ।”নাহ”………”আর পারছি না” জেঠু ফিরে এসেছে। “তুমি চলো, এখনই চলো একবার ডাক্তারের কাছে……”

“দূর, ডাক্তারের কথা কে বলেছে? আর এখানে থাকতে পারছি না, সবাই হাসছে, কতদিন আশ্রিত হয়ে থাকা যায়?”

“কিন্তু কার কাছে আছো ভেবে দেখ, তোমার কোনো ভাই কি বোন-ও পারত তোমাকে এভাবে রাখতে?”

চোখটা অস্বাভাবিক জ্বলজ্বল করতে থাকে, “ডিগনিটি, অপু ডিগনিটি। ডিগনিটির থেকে বড় কিছু নেই, ষাট বছরের বন্ধুত্ব হোক কি রক্তের টান।”

আমি চুপ করে যাই,  তারপর ভাবি ডিগনিটি যখন এসেছে তখন বংশগরিমা-ও আসুক,  অন্তত  কথাটা ঘুরে থাকবে। “কৃষ্ণমোহন না শ্রীশ, কে কলকাতার শেরিফ হয়েছিলেন যেন? আরেকবার বলো তো………”

নিঃস্পৃহ এক মানুষ চুপচাপ বসে থাকে, মনে হয় না আমার কথা আদৌ শুনবে, “কারোর মনে পড়ে না অপু, একটা কারোর ? এও কি সম্ভব?”

কোনো উত্তরের প্রত্যাশা নেই, কথোপকথন গড়ে তোলার কোনো স্পৃহা নেই………কিছু স্বগতোক্তি মাত্র। আমিও নির্বাক বসে থাকি, বহুক্ষণ………

তারপর কখনো আস্তে আস্তে বলি, “জেঠু, মেট্রো” …..একবারের বেশী দু’বার বলতে হয় না, “আয়।”  জেঠু জানে আমি কি ভাবছি, ছেড়ে দেয় বাঁধন খুলে, পৃথিবীর এই একটা মানুষকে জেঠু সজ্ঞানে কিছুতেই কষ্ট দিতে পারবে না।

আজ-ও দশটা টাকা নিতেই হয়, বলতে হয় বাড়ি পৌঁছেই ফোন করে দেব। নিচে নেমেও দেখি কোণার ঘরটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে জেঠু, এত অন্ধকারেও ঠিক দেখতে পাই অনামিকায় সেই পোখরাজটা ঝলমল করছে – কিছু সুখস্মৃতির ঝলক।  স্প্লিট সেকন্ডের জন্য ভাবি ফের উঠে যাই, বলি “আজকের রাতটা থেকে যাব তোমার সঙ্গে………”

আবেগ আর ডিগনিটি মস্ত দেওয়াল তুলে দাঁড়ায়।

Advertisements

8 thoughts on “কোণার ঘর

  1. Eta pore ekta kobitar line mone pore gelo ….”ja jay ta ar fire asena kokhono/ thik agekar moto…” Monta kemon kharap hoe gelo. Koekta line likhte ichhe korche, jodio toto prasongik noy. Lekhatay kichu “chena dukhho/ chena sukh/ chena chena hashi mukh/ chena alo chena andhokar’ dekhe kichu antabri likhte ichhe holo

    Purono dingulor abar jonmo hoy amader smrite te…re-telecast hote thake majhe majhei. ar advut sob anubhutir chemistry… sara jibon boye nie jaoa aswasti, abhiman, ba valo lagar utsho. Smriti khub jotil maanasanko. Kirom advut vabe kuri bochor ager kono khub sadharon, purono fan er shobdo -ola grishmer dupur ar ghughur daak mone ele advut romancho hoy. koto na haoa kothopokothon chole, koto vul sudhre nite ichhe hoy. Slideshow er moto kichu ghotona advut vabe somosto sense guloke narie die jay. Majhe majhe mone hoy smriti emon ekta durmulyo jinis, eta ke aro jotno, aro tartaja, aro sposhto keno kora jayna? Etato ekta bishmaykar process- ja ar nei athocho virtually present hoe jay. Memory gigabyte ta khub alpo

    Like

  2. স্বাতী, মনে হয়। কিন্তু তার সব থেকে বড় কারণ খুব কড়া কড়া পরীক্ষায় ডাহা ফেল করে যাই বলে; বার বার ফেল করতে আর কার ভালো লাগে বল?

    পৌলমী – সমস্ত সত্যি কথা বললি তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে। খাঁটি স্মৃতি বলে কি সত্যিই কিছু হয়? আমার কেমন জানি মনে হয় অবচেতনেও একটা স্মৃতি-নির্মাণ চলতে থাকে, সেটাকে এড়িয়ে যাওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

    অরিজিত – আর বলবেন না, মায়ার বাঁধনটাই সবথেকে যন্ত্রণাদায়ক।

    Like

  3. Porikkhay pass fail niye dukkho nei amar. hariye jawa manush gulo ke boddo miss kori, aar buro hote thaka bakider dekhe haar heem hoye ashe. eder kauke chherei jeebon hote pare konodin bhabini, ekhono bhabte parina. boddo miss kori sob kichhu. oi je mayar badhon. koto bochhor hoye gyalo onekei chole gyachhe kintu emon shorojontro kore gyachhe ekhono badhon ektuo aalga hote pareni. 😦

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s