পরিচয়পর্ব – ১

স্বপ্ন

“আপনাদের শান্তিনিকেতনে স্বপ্ন দেখা যায় চারুবাবু?” মিটিমিটি হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করলেন অপূর্ব চন্দ।

চারু দত্ত বয়সে প্রবীণ, চায়ে চুমুক দিতে দিতে সজনীকান্তর গুষ্ঠীউদ্ধার করছিলেন। অপূর্বর বেমক্কা প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে বললেন “কি বলছ ঠিক বুঝলাম না হে। স্বপ্ন না দেখার কি আছে?”

“সব স্বপ্নই কি আর স্বপ্ন, ম্যাক্সিমামই তো খোঁয়াড়ি; আমি সুধীন যেরকম স্বপ্ন দেখে সেরকম স্বপ্নের কথা বলছি – ‘একদা এমনই বাদলশেষের রাতে, মনে হয় যেন কত জনমের আগে, সে এসে সহসা হাত রেখেছিল হাতে’… পড়েছেন তো?”

চারু দত্ত মজলিশি মানুষ, ছেলেছোকরাদের সঙ্গে দিব্যি জমিয়ে নেন তবে আচম্বিতে লেগ পুলিং করলে একটু দিশাহারা বোধ করতে থাকেন। ওনার থমথমে মুখ দেখে সুধীনের একটু করুণাই হল, অপূর্বর দিকে একটু তির্যক দৃষ্টি হেনে বললেন, “ওই অক্সফোর্ডীর কথা ধরবেন না চারুবাবু, সর্বসাকুল্যে পড়েছে একটিমাত্র বাংলা কবিতা, বিদ্যে জাহির করার জন্য যেখানে সেখানে টেনে আনবে”।

সুশোভন সরকার প্রাউস্তের নতুন জীবনীটা উল্টেপাল্টে দেখছিলেন, মুখের সামনে থেকে বইটা নামিয়ে বললেন, “অপূর্বদা ভারী বুঝেছে দেখছি কবিতাটা। ওটা স্বপ্ন হলে পরিচয়ের এই আড্ডাটাও স্বপ্ন, সত্যেনদা্র আইনস্টাইনকে চিঠি লেখাটাও স্বপ্ন”।

ঘরের মধ্যে ভারী চাঞ্চল্য পড়ে গেল, অপূর্ব হাসতে হাসতে বললেন, “তুশেএ, বলটা এরকম সুধীনের কোর্টে গিয়ে পড়বে বুঝিনি তো। অমরাবতীর রহস্যভেদটা তাহলে হয়েই যাক”।

সত্যেন বোস খুব মন দিয়ে বাঁহাতে তুড়ি বাজানোর চেষ্টা করছিলেন এতক্ষণ, হঠাৎ গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বললেন, “আয়, তোদের একটা গল্প বলি”। সত্যেন বোস হলেন আড্ডার রাজা, তিনি গল্প বলতে চাওয়া মানে হাতে চাঁদ পাওয়া কিন্তু অপূর্ব, সুরাওয়ারদিরা সুধীনের শাশ্বতীকে জানতেও ভারী উৎসুক। সুরাওয়ারদি বললেন “শাঁ জুর দ্য সান্স, একেই বলে মেঘ না চাইতেই জল। কিন্তু সত্যেন, সুধীনের গল্পটা শুনে নিলে হত না?”

সুধীন বলতে যাচ্ছিলেন, “আমার কোনো গল্পই নেই” কিন্তু সত্যেন হাত তুলে তাঁকে থামালেন “স্থির ভব, গল্পটা বলতে তো দাও। আমার মন বলছে সুধীন আর আমার গল্প এক, আলাদা করে বলার দরকার পড়বে না”।

“এক ছিল কবি, একদিন আচমকা বেচারী প্রেমে পড়ে গেলেন। কোন এক বন্ধুর বিয়েতে গেছিলেন, বেশি কিছু দেখতেও হল না, খোঁপাতে গোড়ের মালা দেখেই বুকটা কিরকম চিনচিন করছিল; তার পর যখন খোঁপার অধিকারিণী মুখ ঘুরিয়ে কবিকে দেখতে পেয়ে ভারী লাজুক হেসে কনের ঘরের দিকে চলে গেলেন, কবির পা’র তলা থেকে মাটি সরে গেল। সমস্ত পৃথিবী কিরকম অসাড় বলে মনে হতে লাগল, জীবনটা ভারী ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করল, স্ত্রী এবং বন্ধুবরের শত অনুযোগেও দাঁতে কুটোটি কাটলেন না। বাড়ি ফিরে এসে সারা রাত্রি জেগে তিলার্ধ ভালবাসাটুকু ভবিষ্যৎ-এর জন্য না রেখে একটা কবিতা লিখে ফেললেন, তার কাছে কোথায় লাগে সুধীনের এসব খটমট কাব্য…”

চারু দত্ত একটু কাশলেন, “সত্যেন, কিরকম পরকীয়া পরকীয়া গন্ধ পাচ্ছি; দিব্যি তো খোঁপায় বেলফুলটুকু রেখেই ছেড়ে দিলে পারতে, বৌয়ের আমদানি আবার কেন?”

সত্যেন মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন “কি করব বলুন, গল্প হলেও সত্যি, ফাঁকি দেবার যোটুকু নেই”।

“যাই হোক, সকালবেলা উঠে দেখলেন খাটের পাশের টি-টেবলের ওপর থেকে কবিতাটি উধাও। ভয়ঙ্কর চমকে গেলেন, কারণ কবিতাটির মধ্যেই সারা জীবন ধরে যতটুকু ভালোবাসা জমিয়েছিলেন সব ঢেলে দিয়েছেন। সে কবিতা উধাও হয়ে গেলে, বেঁচে থাকাই সম্ভব নয়, দেউলিয়া অবস্থায় আত্মহত্যা ছাড়া উপায় নেই –  এদিকে মরতে বড় ভয়। সারা ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজলেন, কোত্থাও নেই। দেরাজের মধ্যে, পাঞ্জাবীর পাশপকেটে, বৈঠকখানা বাজার থেকে মাছ আনার জন্য রাখা ছোট ব্যাগে কোথাও খুঁজে পেলেন না। এমন সময় দরজায় এসে দাঁড়ালেন কবির স্ত্রী, কবির পাণ্ডুর মুখ, ঘামে ভেজা কপাল দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন “ওগো, কি হয়েছে?” কবির খেয়াল পড়ল বাড়িতে আরো একজন প্রাণী আছে, “তুমিই কি নিয়েছ আমার কবিতাটা? প্লীজ, ফেরত দাও”। “কি বলছ তুমি? কোন কবিতা?” “কেন তুমি জানো না? বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পর সারা রাত ধরে যে কবিতা লিখলাম…..” কবির স্ত্রী আরো আশ্চর্য হয়ে বললেন “কি বলছ? কোন বিয়েবাড়ি? সে তো আগামীকাল”। কবি বুঝলেন একটা ষড়যন্ত্র চলছে, আর সেটাই স্বাভাবিক, নিজের সমস্ত সম্পত্তি উজাড় করে দিয়ে এসেছেন গত রাত্রে। স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ছুটে গেলেন পাশের ঘরে, আলমারি খুলে ঘাঁটতে শুরু করলেন যাবতীয় জিনিসপত্র। নিচের তাকে রাখা ছিল লাল বেনারসিটি, অনেক গুলো ন্যাপথলিনের বড়ির মধ্যে। বেনারসির ভাঁজে হাত ঢোকাতেই, ইউরেকা! বেরিয়ে এসেছে সেই কবিতা! আনন্দে বিহবল হয়ে পড়লেন আমাদের কবি, আর তার পরেই ভয়ঙ্কর রাগ হল তাঁর স্ত্রীর ওপর, এ কি মিথ্যাচারণ। পাশের ঘরে দৌড়ে গেলেন, চিৎকার করতে গিয়েও থমকে গেছেন। কবির স্ত্রী আয়নার সামনে বসে চুল ঠিক করছিলেন, ভারী অবাক হয়ে বললেন “ওই দেখো, কবিতাটা খুঁজে পেয়েছ তাহলে। হারিয়ে গেছে ভেবে আমার তো এত মন খারাপ হচ্ছিল, মনে আছে প্রথমবার কবে শুনিয়েছিলে?” কবির অবশ্য কানে কিছুই ঢুকছিল না, তিনি একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন খোঁপাটার দিকে, আর খোঁপায় লাগানো সেই গোড়ের মালা – এ খোঁপা তিনি আগে দেখেছেন, মালাটাও। আস্তে আস্তে গিয়ে চিবুক ধরে মুখটা ঘোরালেন নিজের দিকে, “কি দেখছ? যেন কতদিন দেখোনি…” বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত হওয়ার আগে অবশ্য নজরে ঠিকই পড়ল সেই লাজুক হাসিটা।

ঘুম যখন ভাঙ্গল, তখন দেখলেন হাতের কলমটি তখনো ধরা, কবিতার শেষ শব্দটি থেকে কালির ভেজা ভাবটা তখনো মোছেনি, পাশের ঘর থেকে স্ত্রী বলছেন “এখনই না বেরোলে তো বরযাত্রীদের সঙ্গে যাওয়া যাবে না। কবিতা লেখা হল?”  সত্যেন থামলেন।
সুশোভন বললেন “আজকের মতন এই যথেষ্ট সত্যেন দা, মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। তোমার গল্প শুনে মনে পড়ল মিশরের লোকেরাও স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে তফাত বার করতে পারত না বা চাইত না। তাই কোনটা স্বপ্ন আর কোনটা বাস্তব, বলবে কে? কিভাবে প্রমাণ করবে জেগে ওঠাটাই স্বপ্নের শুরু নয়?” সুরাওয়ারদি বললেন “মেটাফিজিক্স-ও তো তাই বলে, অক্সফোর্ডে মরিস সাহেব পড়াতেন আমাদের – বাস্তব যেটাকে বলছি সেটা বাস্তব কিসে হচ্ছে, না কয়েকজনের সম্মিলিত কনশাসনেসে, কিন্তু সম্মেলনটা না ঘটলে স্বপ্নই বলো আর বাস্তব, আলাদা করা মুশকিল”।

অপূর্ব চন্দ তন্ময় হয়ে ভাবছিলেন, এবার মুখ তুলে বললেন “ভাবুন, এমনটাও তো হতে পারে – তিন কবিই আছেন, তবে কিনা তাঁদের আলাদা আলাদা জগত। গল্পকার হোল ট্রুথ ইচ্ছাকৃত ভাবে রিভীল করছেন না, একটা জগতের সঙ্গে আরেকটা জগত ইচ্ছাকৃত ভাবে মিশিয়ে দিচ্ছেন”।

চারু দত্ত বললেন, “না হে, এখানে একটা ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যান আছে; ওই কবিতাটা হল এসকেপ রুট, অসুখী দাম্পত্য জীবন থেকে মুক্তির পথ, ওটা দিয়েই শুরু।তাই তিন নম্বরটাই সত্যি, বাকি দুটো রেড হেরিং”।

ভারী জমাটি একটা আলোচনা শুরু হয়ে গেল।

সত্যেন ফিসফিস করে সুধীনকে বললেন “নাও, বাঁচিয়ে দিলাম। এবার বলো তো বাপু, ইউরোপে ঠিক কি ঘটেছিল?”

Advertisements

4 thoughts on “পরিচয়পর্ব – ১

  1. সত্যেন ফিসফিস করে সুধীনকে বললেন “নাও, বাঁচিয়ে দিলাম। এবার বলো তো বাপু, ইউরোপে ঠিক কি ঘটেছিল?”

    এইটে বড্ড বেশি রকমের ভালো লাগলো ।
    এই পরিচয়পর্ব series-টা কিন্তু বেড়ে হচ্ছে….খালি সত্যেন বাবুকে বার করিস না, বাকি যা ইচ্ছে কর্ ।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s