মার্জিনাল মেন – ২

পঞ্চাশের শুরুতে একাধিক উদ্বাস্তু কলোনি গড়ে উঠেছিল ঠিকই কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের অবিরাম স্রোতকে ঠাঁই দেওয়ার জন্য এইসব কলোনিতেও স্থান ছিল তুলনামূলকভাবে অপ্রতুল। উপরন্তু ষাটের মাঝামাঝি সময় থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ-ও ধৈর্য হারাতে শুরু করেন, সব মিলিয়ে ১৯৬৭-র নির্বাচনে শরণার্থী সমস্যা একটা বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। কংগ্রেস তখনো ক্ষমতায় এবং মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের কাছে সরাসরি কোনো উত্তর ছিল না; পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়া ভালো যে এই এক সমস্যা দেখা দিয়েছিল ১৯৪৭-এও এবং আরেক কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ-ও রাজ্যবাসীকে নিতান্ত নিরাশ করেছিলেন। রাজ্য সরকারের থেকে কোনোরকম সাহায্য বা প্রতিশ্রুতি না পেয়ে মাথা গোঁজার তাগিদে উদ্বাস্তুরাও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানাকে উপেক্ষা করতে থাকেন, ফলত রাজ্য জুড়ে গড়ে উঠতে থাকে একাধিক জবরদখল কলোনি। যে উদ্বাস্তুরা স্বাধীনতার পর পরেই কম্যুনিস্টদের সহ্য করতে পারতেন না, তাঁদের মধ্যেই ১৯৫১ থেকে ১৯৬৭ এর মধ্যে অভূতপূর্ব  সমর্থন খুঁজে পান বামপন্থীরা – প্রথমে সি-পি-আই এবং পরে সি-পি-আই-এম।  শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যেও উদ্বাস্তুরা মিশে যেতে শুরু করায় কংগ্রেসি INTUC এর বিকল্প হিসাবে উঠে আসতে থাকে AITUC, CITU এবং UTUC । বামপন্থীদের জন্য সমর্থন আসতে থাকে অন্য আরেক গোষ্ঠী থেকেও – উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং উড়িষ্যা থেকে আগত অসংখ্য গরীব কৃষক জমিদারদের শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে কাজ নিতে শুরু করেন, একটা সার্বিক মুক্তির স্বপ্ন ছিল এদের চোখেও। আর বামপন্থী ছাড়া কাদের ওপরেই বা এরা ভরসা রাখতে পারতেন?

বামপন্থীদের জন্য এর থেকে ভালো প্রেক্ষাপট কিই বা হতে পারত? এর সঙ্গে জুড়ুন ষাট দশকের খাদ্যশস্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর যোগান সঙ্কট, সত্তরের দশকে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জনবিরোধী দমননীতি – সাতাত্তরের নির্বাচনফল ছিল অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু উদ্বাস্তুদের জন্য সাতাত্তরের নির্বাচন কোন খবর নিয়ে এল? সে উত্তর দেওয়ার আগে আরো দু’চার কথা বলা দরকার পরিপ্রেক্ষিতটা খুঁটিয়ে যাচাই করতে। ২০১১ তে মমতা ব্যানা্র্জ্জীর সরকার ক্ষমতায় আসার সময় বহু চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছিল ভূতপূর্ব সরকার রাজ্যের অর্থনীতির কি হাঁড়ির হাল করে ছেড়েছিল সেই বিষয়ে। সেই একই কথা হয়ত প্রযোজ্য জ্যোতি বসু সরকারের আগে যাঁরা ছিলেন তাঁদের জন্যও। প্রফুল্ল চক্রবর্তী দেখাচ্ছেন আশির দশকের মাঝামাঝি রাজ্যে  রুগ্ন শিল্প সংস্থার সংখ্যা আড়াইশ হাজারের-ও বেশী, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা পঁয়তাল্লিশ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এর সমস্ত দায় বামফ্রন্ট সরকারের  নিশ্চয় নয়, পশ্চিমবঙ্গের অনর্থনীতির ইতিহাস দীর্ঘদিনের। কিন্তু উত্তর খুঁজতে হত বামফ্রন্ট সরকারকেই, সুতরাং বিশ্বাস না হলেও এটা সত্যি কথা যে রাজ্যের বাইরে থেকে রাজ্যে শিল্পে বিনিয়োগ শুরু হয়েছিল সেই আশির দশকেই। ধর্মভিত্তিক দাঙ্গা, সন্ত্রাসবাদ এসব না থাকার ফলে কলকাতা তথা বাংলা আশির শুরুতে কিন্তু গন্তব্যস্থল হিসাবে নেহাত ফেলনা ছিল না, সুতরাং বামফ্রন্ট সরকারের সবুজ সঙ্কেত পেয়ে বহু অবাঙ্গালী শিল্পপতিই উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করলেন রাইটার্সের চত্বরে।  ফল? রিয়াল এস্টেট বুম! জমি বাড়ির দর হল আকাশছোঁয়া, যে প্রসঙ্গে তখন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত অবধি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন “একটা অর্থনৈতিক ভাবে রুগ্ন রাজ্যে রিয়াল এস্টেটের এই বিশাল দামের যুক্তিগ্রাহ্য কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না”। কিন্তু এহেন শর্ট টার্ম ক্ষতি বহু রাজ্য বা দেশই মেনে নিয়েছে লং টার্ম লাভের খাতিরে। বহু বছর অপেক্ষা করেও কেন সেই লাভের মুখ আমরা দেখলাম না সেটা অন্য প্রসঙ্গ। আমরা বরং ফিরে যাই উদ্বাস্তু শরণার্থীদের কাছেই।

সারা কলকাতা জুড়ে জমির চড়া দামের জন্য নতুন শরণার্থীদের জন্য নতুন কোনো কলোনি বানানো সম্ভব হল না, এমনকি পুরনো কলোনিগুলোর কাছাকাছিও তাঁদের মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করা গেল না। বহু বহু উদ্বাস্তুদের জায়গা হতে শুরু করল রেললাইনের লাগোয়া জমি। বহু বছর ধরে উত্তর এবং দক্ষিণ শহরতলীর রেললাইনের পাশে অগুন্তি ঝুপড়ি দেখে দেখে যদি অবাক হয়ে থাকেন, জেনে রাখুন ওনাদের অধিকাংশই উদ্বাস্তু। বলা বাহুল্য যে, ভোটের  খাতিরে ক্ষমতাসীন দল এনাদেরকে রীতিমতন আগলে রাখতে শুরু করল; মনে হতেই পারে যে এরাই তো পঞ্চাশের দশকেও শরণার্থীদের দেখেছিলেন, সুতরাং এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দেখা আর এই দেখার মধ্যে পার্থক্য আছে। আগেরবার-ও ভোটের চাহিদা ছিল কিন্তু তারপরেও উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য একটা আন্তরিক তাগিদ ছিল। সত্তরের শেষে কিন্তু সেই তাগিদ আর দেখা গেল না। কুড়ি বছর ধরে একই সমস্যা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকলে তাগিদ কমা স্বাভাবিক কিন্তু আরো কিছু কারণ আছে, যেমন সত্তরের রাজনৈতিক সন্ত্রাস। নকশালদের মোকাবিলা করার জন্য কংগ্রেস এবং সি-পি-এম দু দলই  গোটা সত্তরের দশক ধরে ক্যাডার তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। নকশাল আন্দোলন মিলিয়ে গেলেও দুই দলের মধ্যে সংঘর্ষ চলতেই থেকেছে, আর সত্তরের শেষ থেকেই কলেজ পড়ুয়া তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের জায়গায় ক্যাডার হিসাবে আসতে শুরু করেছে তথাকথিত ‘রিফিউজি’ রা। স্বভাবতই যে রাজনৈতিক আদর্শ থেকে পঞ্চাশের শুরুতে গড়ে উঠেছিল একাধিক কলোনি, সেই আদর্শ সত্তরের শেষে আর ছিল না  – ফলত বহু শরণার্থীই রাজনৈতিক কারণেও রেললাইন সংলগ্ন ঝুপড়ি থেকে আর বেরিয়ে উঠতে পারেননি।

শহরের বাইরে আবার সমস্যাটা অন্য। পঞ্চাশের শুরুতে মূলত হিন্দু শরণার্থীরা আসতে শুরু করেছিলেন; সত্তরের শেষে কিন্তু ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ সীমানা টপকেছেন। মূলত দুটি কারণ – প্রথমত, পশ্চিম পাকিস্তানের সেনারা নির্যাতন করার সময় ধর্ম দেখেনি, বাঙ্গালী মাত্রই পাশবিক ভাবে অত্যাচারিত হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের মাপকাঠিতে ভারত এবং পূর্ব পাকিস্তানের বিভেদ দিন আনি – দিন খাই মানুষরাও ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছেন। ভালোভাবে বাঁচার তাগিদে বিমূর্ত ধর্মবিশ্বাস বা প্রচলিত ধর্মাচার ত্যাগ করতে বেশী সময় লাগে না হয়ত – সুতরাং, বহু মানুষই নিশ্চুপে সীমানা টপকে বাংলাতেই আশ্রয় নিয়েছেন। যারা অতটা সহজে মিশে যেতে পারেননি, তারা ঘুরপথে ছড়িয়ে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে – আসাম থেকে দিল্লী, ত্রিপুরা থেকে মুম্বই। কিছুটা ভোটের তাগিদ, কিছুটা ম্যানেজমেন্ট ফেলিওর – শরণার্থী সমস্যা চরমে পৌঁছচ্ছে জেনেও বাম নেতারা বিশেষ কিছু করে উঠতে পারছিলেন না। এতে যেমন বহু আদি পশ্চিমবঙ্গীয়ই (মূলত সীমান্ত এলাকায়) নিজেদের নিজভূমে পরবাসী ভাবছিলেন, বহু উদ্বাস্তু গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগসূত্র-ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল (শুধু ভোটের তাগিদে যে কথাবার্তা চলে বলাই বাহুল্য যে তা কোনোদিনই পুরোদস্তুর রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকল্প হতে পারবে না।)

আর এই প্রেক্ষাপটের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে দন্ডকারণ্য এবং মরিচঝাঁপি ট্র্যাজেডি। ১৯৬১ সালে বিধান রায় বহু উদ্বাস্তুকেই দন্ডকারণ্যে পাঠাতে চেষ্টা করেন। প্রায়, দশ হাজারের মতন মানুষ সেই নির্দেশ অগ্রাহ্য করে থেকে যান পশ্চিমবঙ্গেই। বিধান রায় আর্থিক এবং অন্যান্য সহায়তা বন্ধ করে দিলেও তাদেরকে বাংলাচ্যুত করার চেষ্টা করেননি। প্রফুল্ল চক্রবর্তী মনে করিয়ে দিয়েছেন দন্ডকারণ্যে যারা গেলেন এবং যারা গেলেন না, তাঁদের অধিকাংশই মূলত নমশূদ্র কৃষক; এঁদের অনেকেই স্বাধীনোত্তর পূর্ববঙ্গে নমশূদ্র আন্দোলন গড়ে ওঠার সাক্ষী (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে দেবেশ রায় একটি পূজাবার্ষিকীতে এই নমশূদ্র আন্দোলনের পুরোধাকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলেন ‘বরিশালের যোগেন মন্ডল’, দে’জ সম্প্রতি সেটি বার করেছে বই আকারে) – বাংলার নরম মাটি আর জলের মধ্যে থাকতেই এরা অনেক বেশী স্বচ্ছন্দ। সুতরাং, শ্বাপদসঙ্কুল দন্ডকারণ্য বা রুক্ষ রাজস্থান থেকে এঁরা চলে আসতে চাইবেন সে আর আশ্চর্যের কথা কি। বিহার বা উড়িষ্যাতেও যারা গেছিলেন স্থানীয় মানুষদের প্রবল বিরোধিতার  মধ্যে পড়তে হয়েছে এনাদের বারবার। সত্তরের শেষাশেষি এঁরাই ফিরে আসতে শুরু করেন, আশ্রয় নেন সুন্দরবনের মরিচঝাঁপিতে। মরিচঝাঁপির মানুষদের বামফ্রন্ট সরকার কিভাবে উৎখাত করার চেষ্টা করেছেন, তাতে কত মানুষের রক্ত ঝরেছে, কত মানুষ নির্যাতিত হয়েছেন সে কথা আজ নতুন করে বলার নেই। কিন্তু ‘মার্জিনাল মেন’ এর লেখক অবধারিত প্রশ্নটি তুলতে ভোলেননি – দন্ডকারণ্য থেকে আগত শরণার্থীদের ভোটাধিকার থাকলেও কি ঘটনাপ্রবাহ একই খাতে গড়াত? রেললাইনে ঝুপড়ি বানিয়ে যাঁরা থেকে গেলেন বা নিছক অর্থনৈতিক কারণে যাঁরা সীমানা পেরিয়ে মিশে গেলেন মূল জনস্রোতের সঙ্গে, তাঁদের কে রূঢ় বাস্তব বোঝানোর কোনো প্রয়াসই শাসকদল করেননি কারণ এই মানুষগুলির ভোটাধিকার ছিল। আর এই সময় থেকেই জাল পাসপোর্ট কি জাল র‍্যাশন কার্ডের যে রমরমা শুরু হয় তা এখনো অব্যাহত।

প্রফুল্ল চক্রবর্তী আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ  প্রশ্ন তুলেছেন, উদ্বাস্তু সমস্যাকে বিশ্লেষণ করেছেন নতুন কিছু আঙ্গিকে। সেই সব কিছুই বহু মানুষকে ক্রোধান্বিত করতে বাধ্য, যার ফল হয়ত পেতেও হয়েছে (শুধু প্রফুল্লবাবুকে নয়, অল্পবিস্তর আমাদের সবাইকেই)। সেরকমই কিছু প্রশ্ন, কিছু আঙ্গিক নিয়ে আলোচনা থাকবে ‘মার্জিনাল মেন ‘ এর শেষ কিস্তিতে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s