মার্জিনাল মেন – ১

“I have lived the better part of my life in the most refugee-concentrated area of West Bengal and I was associated with Dr. B.C. Roy in doing whatever I could for the educational upliftment of the refugees. But I was never aware of what was happening in the entrails of the vast and apparently moribund human mass around me. The book came to me like a revelation : even in the midst of suffering, starvation and death the human spirit remains imperishable.”  – Triguna Sen

যাকে বলে ক্যাথলিক কনফেসন এ হল তাই। অথচ ত্রিগুণা সেন ছিলেন বিধান রায়ের সরকারে শিক্ষামন্ত্রী, যাদবপুর  বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা যায় নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন কিন্তু কি আশ্চর্য তিনিও নাকি বলছেন যে এ বই পড়ার আগে তাঁরও সম্যক ধারণা ছিল না উদ্বাস্তু মানুষগুলি ঠিক কিভাবে আছেন। যে বইয়ের ‘foreward’ পড়েই এরকম ধাক্কা খেতে হয়, অনুমান করা উচিত যে এ বই রীতিমতন শোরগোল ফেলে দিয়েছিল বিদ্বজন মহলে, সাধারণ মানুষের কথা যদি ছেড়েও দি। কিন্তু না, ‘মার্জিনাল মেন’ কোনো আলোড়নই ফেলেনি কারণ বইটিকে পাঠকদের কাছে পৌঁছতেই দেওয়া হয়নি। অথচ স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে উৎসাহী যে কোনো গবেষকের কাছে এ বই হয়ে উঠতে পারত প্রামাণ্য দলিল;  ‘সুবর্ণরেখা’ কি ‘মেঘে ঢাকা তারা’ দেখে যদি কারোর ইচ্ছে করত ফেলে আসা সেই ভয়াবহ দিনগুলোকে আরেকটু ভালো ভাবে জানতে,  এ বই হয়ে উঠতে পারত রেডিমেড রেফারেন্স – কিন্তু তা হয়নি। ‘মার্জিনাল মেন’ স্রেফ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। হাতে গোনা কিছু লোক জানেন এ বইয়ের অস্তিত্ব, তাঁদের অধিকাংশই লেখকের গুণমুগ্ধ ছাত্র কি সহকর্মী বা সহমর্মী। কপালজোরে তাঁদের সঙ্গে কখনো যদি আপনার দেখা হয়, তাঁরা বিস্তর আনন্দিত হবেন আপনার মুখে এ বইয়ের নাম শুনে; কেউ কেউ হয়তো শোনাতে পারেন অনেক না-জানা ষড়যন্ত্রের কাহিনী, কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে সে যাচাই করাও হয়ত এখন সম্ভব নয়। কিন্তু একটা কথা নিয্যস সত্যি, আর তার জন্য হাঁড়ির খবর জানার দরকার নেই –  এ বই মস্ত অবিচারের শিকার, আর আমরা যারা পড়ে উঠতে পারলাম না এ বই, তাদের জন্য বাংলার ইতিহাস রয়ে গেল অনেকাংশেই অপঠিত।

প্রফুল্ল চক্রবর্তী ছিলেন পেশায় শিক্ষক-গবেষক। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত আগে থেকেই যে অজস্র উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে এসে আশ্রয় খুঁজছিলেন, তাদের হাল-হকিকত জানার জন্য ব্যস্ত ছিলেন বহুদিন থেকেই। ১৯৭৮ সালে তিনি উদ্বাস্তু শরণার্থীদের নিয়ে বই লেখার সিদ্ধান্ত নেন এবং স্বভাবতই প্রথমে খোঁজ পড়ে প্রামাণ্য রেফারেন্সের। বলা বাহুল্য যে, পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু সমস্যা সত্তরের দশকেই প্রথম দেখা দেয়নি, স্বাধীনতার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহু শরণার্থী চলে আসতে শুরু করেন। অথচ প্রায় তিরিশ বছরের ইতিহাসকে জানার জন্য তাঁর কাছে সাকুল্যে রেফারেন্স ছিল তিনটি – ১) হিরণ্ময় ব্যানার্জ্জী, শরণার্থী ত্রাণ বিভাগের পুনর্বাসন কমিশনার হয়ে কাজ করার সময়ে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন , তার অবলম্বনে লিখেছিলেন ‘উদ্বাস্তু’, ২) ১৯৪৮ সালের তথ্য অবলম্বনে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইন্সটিউট থেকে প্রকাশিত একটি সমাজতাত্বিক গবেষণা ‘The Uprooted’, যার লেখক ছিলেন কান্তি পাকড়াশী এবং ৩) উদ্বাস্তু কলোনির ইতিবৃত্ত নিয়ে লেখা ‘পশ্চিম বাংলার জবরদখল উদ্বাস্তু উপনিবেশ’ (অনিল সিনহা)। কিন্তু এগুলোর কোনোটিকেই প্রামাণ্য রেফারেন্স বলা চলে না, এবং সব কটি একত্রে ধরেও সার্বিক চিত্র ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। এমত অবস্থায় একজন গবেষক কি করতে পারেন?  উত্তর পাওয়া সহজ নয় কিন্তু প্রফুল্ল চক্রবর্তী যা করলেন সেটা ভাবাটাও বেশ দুষ্কর ব্যাপার – বারো বছর ধরে উনি চষে ফেললেন সারা ভারত, পূর্ববঙ্গ থেকে আগত শরণার্থীরা যেখানে যেখানে আশ্রয় খুজেছেন তার প্রায় প্রতিটা জায়গায় তিনি গেলেন। দন্ডকারণ্য হোক কি উত্তরপ্রদেশ, দিল্লী হোক কি বিহার বসবাস-অযোগ্য প্রত্যেকটি জায়গায় উদ্বাস্তুদের লড়াইয়ের সাক্ষী থেকেছেন তিনি। নিছক গবেষণার টান থেকে কি এহেন পরিশ্রম বা সাধনা সম্ভব? হয়ত, হয়ত নয়, কিন্তু নিছক গবেষণা থেকে মানবসংগ্রামের এক মরমী দলিলে এভাবেই উত্তোরণ ঘটেছে  ‘মার্জিনাল মেন’-এর।

দলিলটি অনেক কারণেই অবিস্মরণীয়, অন্যতম প্রধান কারণটি হয়ত রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। বইটি যখন (১৯৯০) প্রকাশিত হয়, বামফ্রন্ট সরকার তখন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন, দিল্লীর মসনদ থেকে কংগ্রেস সদ্য ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে (যদিও কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীনই প্রফুল্ল চক্রবর্তী ইউ-জি-সি থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন বইটি লেখার ব্যাপারে) কিন্তু কোনো দলকেই লেখক রেয়াত করেননি, সত্যি কথাগুলো খুব সহজে বলেছেন।  স্বাধীনতার প্রায় পর থেকেই রাজ্য এবং কেন্দ্র দুই সরকারই বহুদিন এক অলীক আশায় দিন গুনছিলেন যে উদ্বাস্তুরা এক সময়ে আবার দেশে ফিরে যাবেন; তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল ঘোষ এবং প্রধানমন্ত্রী নেহরু দু’জনেই এখানে দূরদৃষ্টি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার প্রায় এক বছর পরেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনো পুনর্বাসন দপ্তর ছিল না। অথচ এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে তৎকালীন বহু নেতাই  বিপদের সময় রক্ষাকর্তা হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন পূর্ববঙ্গীয় সংখ্যালঘুদের – সাতচল্লিশের আগে থেকেই । যাই হোক, সেই অলীক  আশা ঘুচে যাওয়ার পর কি হল? লেখক এখানে রীতিমতন আক্রমণাত্মক “Nehru’s reply to Dr. Roy’s letter was a mixture of callous indifference to the East Pakistan refugees and special pleading for refugees from West Pakistan” –  বিধান রায় বারংবার চিঠি লিখেও যে নেহরুর কাছ থেকে প্রায় কোনো সাহায্যই পান নি সে কথা আজ বহু চর্চিত।

কম্যুনিস্ট পার্টির ভূমিকাও কম বিস্ময়কর নয় – পূর্ব পাকিস্তানের কমরেডদের রীতিমতন ম্যান্ডেট দেওয়া হয় ভারতবর্ষে না আসার ব্যাপারে। কিছু কমরেডকে পাঠানো হয় পশ্চিম পাকিস্তানে, পূর্ব পাকিস্তানে যারা থেকে যান তাঁদের অনেককেই রাজনৈতিক শত্রুতায় জেলে যেতে হয় আর পার্টির ম্যান্ডেট অগ্রাহ্য করে যারা প্রাণের দায়ে ভারতে আসেন তাদের প্রায় সবাইকে বহিষ্কার করা হয়। কেন? সব থেকে সহজ উত্তর – ধর্মভিত্তিক দাঙ্গাকে অস্বীকার করার ফল। তবে একথা সত্যি যে নেতারা ঠেকে শিখেছিলেন তাই দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের রাজত্বে ধর্মভিত্তিক দাঙ্গা দমনে কম্যুনিস্টদের সাফল্য চোখে পড়ার মতন। কিন্তু এই জবরদস্তি অস্বীকার বেশিদিন করা যায়নি। প্রফুল্ল চক্রবর্তী দেখিয়েছেন ৪৮ সালে মাণিকতলার বহু কারখানার মালিকরা শ্রমিক ধর্মঘট চলার সময় বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে বহু কম টাকায় চাকরি দিতে থাকেন উদ্বাস্তুদের। স্বভাবতই, ধর্মঘট বিফলে যাওয়ার আশঙ্কায় কম্যুনিস্ট পার্টি নড়েচড়ে বসেন। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে প্রায় একটা পলিটিক্যাল থ্রিলারই বলা যায়। উদ্বাস্তুদের মধ্যে   কম্যুনিস্টদের প্রতি চরম বৈরীভাব কাটানোর জন্য একটা স্ট্র্যাটেজী ঠিক করতেই হত; সি-পি-আই এর সৎ এবং পরিশ্রমী নেতা বিজয় মজুমদারকে কংগ্রেসী সাজিয়ে পাঠানো হয় লেক ক্যাম্প কলোনিতে (কম্যুনিস্ট হিসাবে পাঠালে বিজয়বাবুর উদ্বাস্তুদের নিয়ে কাজ করাই সম্ভব হত না)।

ছ মাসের মধ্যে বিজয় মজুমদার উদ্বাস্তু আন্দোলনের ওপর থেকে কংগ্রে্সী আধিপত্য হটিয়ে কিভাবে র‍্যাডিকাল মুভমেন্ট শুরু করেন, তার এক অনবদ্য ইতিহাস উঠে এসেছে ‘মার্জিনাল মেন’-এর পাতায়। মাণিকতলা শ্রমিক ধর্মঘট বানচাল হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যে , ১৯৪৯ এর লক্ষ্মী পুজোর দিনে তৈরী হয় বৃহত্তম কলোনি – কাকতালীয় ভাবেই যার নাম রাখা হয় ‘বিজয়গড়’ (সর্বপ্রথম কলোনিটি অবশ্য তার আগেই তৈরী হয়েছে সোদপুরের কাছে দেশবন্ধুনগরে)। ১৯৫০-এর জানুয়ারী থেকে মে’র মধ্যে দক্ষিণ শহরতলীতে তৈরী হয় আরো একাধিক  কলোনি – পোদ্দারনগর, বাঘা যতীন, বিদ্যাসাগর, রামগড়। কিছু জায়গাতে কংগ্রেসী নেতারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিলেও কম্যুনিস্ট নেতাদের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতন। দেশবন্ধুনগরে সি-পি-আই, বাঘা যতীন এবং বিদ্যাসাগরে আর-এস-পি, রামগড়ে ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন।

কুড়ি বছর পরের ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করেছিল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখার জন্য। দেখা কি গেছিল? সে কথাই বলব পরের কিস্তিতে।

MM

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s