মার্জিনাল মেন – ২

পঞ্চাশের শুরুতে একাধিক উদ্বাস্তু কলোনি গড়ে উঠেছিল ঠিকই কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের অবিরাম স্রোতকে ঠাঁই দেওয়ার জন্য এইসব কলোনিতেও স্থান ছিল তুলনামূলকভাবে অপ্রতুল। উপরন্তু ষাটের মাঝামাঝি সময় থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ-ও ধৈর্য হারাতে শুরু করেন, সব মিলিয়ে ১৯৬৭-র নির্বাচনে শরণার্থী সমস্যা একটা বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। কংগ্রেস তখনো ক্ষমতায় এবং মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের কাছে সরাসরি কোনো উত্তর ছিল না; পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়া ভালো যে এই এক সমস্যা দেখা দিয়েছিল ১৯৪৭-এও এবং আরেক কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ-ও রাজ্যবাসীকে নিতান্ত নিরাশ করেছিলেন। রাজ্য সরকারের থেকে কোনোরকম সাহায্য বা প্রতিশ্রুতি না পেয়ে মাথা গোঁজার তাগিদে উদ্বাস্তুরাও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানাকে উপেক্ষা করতে থাকেন, ফলত রাজ্য জুড়ে গড়ে উঠতে থাকে একাধিক জবরদখল কলোনি। যে উদ্বাস্তুরা স্বাধীনতার পর পরেই কম্যুনিস্টদের সহ্য করতে পারতেন না, তাঁদের মধ্যেই ১৯৫১ থেকে ১৯৬৭ এর মধ্যে অভূতপূর্ব  সমর্থন খুঁজে পান বামপন্থীরা – প্রথমে সি-পি-আই এবং পরে সি-পি-আই-এম।  শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যেও উদ্বাস্তুরা মিশে যেতে শুরু করায় কংগ্রেসি INTUC এর বিকল্প হিসাবে উঠে আসতে থাকে AITUC, CITU এবং UTUC । বামপন্থীদের জন্য সমর্থন আসতে থাকে অন্য আরেক গোষ্ঠী থেকেও – উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং উড়িষ্যা থেকে আগত অসংখ্য গরীব কৃষক জমিদারদের শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে কাজ নিতে শুরু করেন, একটা সার্বিক মুক্তির স্বপ্ন ছিল এদের চোখেও। আর বামপন্থী ছাড়া কাদের ওপরেই বা এরা ভরসা রাখতে পারতেন?

বামপন্থীদের জন্য এর থেকে ভালো প্রেক্ষাপট কিই বা হতে পারত? এর সঙ্গে জুড়ুন ষাট দশকের খাদ্যশস্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর যোগান সঙ্কট, সত্তরের দশকে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জনবিরোধী দমননীতি – সাতাত্তরের নির্বাচনফল ছিল অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু উদ্বাস্তুদের জন্য সাতাত্তরের নির্বাচন কোন খবর নিয়ে এল? সে উত্তর দেওয়ার আগে আরো দু’চার কথা বলা দরকার পরিপ্রেক্ষিতটা খুঁটিয়ে যাচাই করতে। ২০১১ তে মমতা ব্যানা্র্জ্জীর সরকার ক্ষমতায় আসার সময় বহু চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছিল ভূতপূর্ব সরকার রাজ্যের অর্থনীতির কি হাঁড়ির হাল করে ছেড়েছিল সেই বিষয়ে। সেই একই কথা হয়ত প্রযোজ্য জ্যোতি বসু সরকারের আগে যাঁরা ছিলেন তাঁদের জন্যও। প্রফুল্ল চক্রবর্তী দেখাচ্ছেন আশির দশকের মাঝামাঝি রাজ্যে  রুগ্ন শিল্প সংস্থার সংখ্যা আড়াইশ হাজারের-ও বেশী, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা পঁয়তাল্লিশ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এর সমস্ত দায় বামফ্রন্ট সরকারের  নিশ্চয় নয়, পশ্চিমবঙ্গের অনর্থনীতির ইতিহাস দীর্ঘদিনের। কিন্তু উত্তর খুঁজতে হত বামফ্রন্ট সরকারকেই, সুতরাং বিশ্বাস না হলেও এটা সত্যি কথা যে রাজ্যের বাইরে থেকে রাজ্যে শিল্পে বিনিয়োগ শুরু হয়েছিল সেই আশির দশকেই। ধর্মভিত্তিক দাঙ্গা, সন্ত্রাসবাদ এসব না থাকার ফলে কলকাতা তথা বাংলা আশির শুরুতে কিন্তু গন্তব্যস্থল হিসাবে নেহাত ফেলনা ছিল না, সুতরাং বামফ্রন্ট সরকারের সবুজ সঙ্কেত পেয়ে বহু অবাঙ্গালী শিল্পপতিই উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করলেন রাইটার্সের চত্বরে।  ফল? রিয়াল এস্টেট বুম! জমি বাড়ির দর হল আকাশছোঁয়া, যে প্রসঙ্গে তখন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত অবধি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন “একটা অর্থনৈতিক ভাবে রুগ্ন রাজ্যে রিয়াল এস্টেটের এই বিশাল দামের যুক্তিগ্রাহ্য কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না”। কিন্তু এহেন শর্ট টার্ম ক্ষতি বহু রাজ্য বা দেশই মেনে নিয়েছে লং টার্ম লাভের খাতিরে। বহু বছর অপেক্ষা করেও কেন সেই লাভের মুখ আমরা দেখলাম না সেটা অন্য প্রসঙ্গ। আমরা বরং ফিরে যাই উদ্বাস্তু শরণার্থীদের কাছেই।

সারা কলকাতা জুড়ে জমির চড়া দামের জন্য নতুন শরণার্থীদের জন্য নতুন কোনো কলোনি বানানো সম্ভব হল না, এমনকি পুরনো কলোনিগুলোর কাছাকাছিও তাঁদের মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করা গেল না। বহু বহু উদ্বাস্তুদের জায়গা হতে শুরু করল রেললাইনের লাগোয়া জমি। বহু বছর ধরে উত্তর এবং দক্ষিণ শহরতলীর রেললাইনের পাশে অগুন্তি ঝুপড়ি দেখে দেখে যদি অবাক হয়ে থাকেন, জেনে রাখুন ওনাদের অধিকাংশই উদ্বাস্তু। বলা বাহুল্য যে, ভোটের  খাতিরে ক্ষমতাসীন দল এনাদেরকে রীতিমতন আগলে রাখতে শুরু করল; মনে হতেই পারে যে এরাই তো পঞ্চাশের দশকেও শরণার্থীদের দেখেছিলেন, সুতরাং এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দেখা আর এই দেখার মধ্যে পার্থক্য আছে। আগেরবার-ও ভোটের চাহিদা ছিল কিন্তু তারপরেও উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য একটা আন্তরিক তাগিদ ছিল। সত্তরের শেষে কিন্তু সেই তাগিদ আর দেখা গেল না। কুড়ি বছর ধরে একই সমস্যা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকলে তাগিদ কমা স্বাভাবিক কিন্তু আরো কিছু কারণ আছে, যেমন সত্তরের রাজনৈতিক সন্ত্রাস। নকশালদের মোকাবিলা করার জন্য কংগ্রেস এবং সি-পি-এম দু দলই  গোটা সত্তরের দশক ধরে ক্যাডার তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। নকশাল আন্দোলন মিলিয়ে গেলেও দুই দলের মধ্যে সংঘর্ষ চলতেই থেকেছে, আর সত্তরের শেষ থেকেই কলেজ পড়ুয়া তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের জায়গায় ক্যাডার হিসাবে আসতে শুরু করেছে তথাকথিত ‘রিফিউজি’ রা। স্বভাবতই যে রাজনৈতিক আদর্শ থেকে পঞ্চাশের শুরুতে গড়ে উঠেছিল একাধিক কলোনি, সেই আদর্শ সত্তরের শেষে আর ছিল না  – ফলত বহু শরণার্থীই রাজনৈতিক কারণেও রেললাইন সংলগ্ন ঝুপড়ি থেকে আর বেরিয়ে উঠতে পারেননি।

শহরের বাইরে আবার সমস্যাটা অন্য। পঞ্চাশের শুরুতে মূলত হিন্দু শরণার্থীরা আসতে শুরু করেছিলেন; সত্তরের শেষে কিন্তু ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ সীমানা টপকেছেন। মূলত দুটি কারণ – প্রথমত, পশ্চিম পাকিস্তানের সেনারা নির্যাতন করার সময় ধর্ম দেখেনি, বাঙ্গালী মাত্রই পাশবিক ভাবে অত্যাচারিত হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের মাপকাঠিতে ভারত এবং পূর্ব পাকিস্তানের বিভেদ দিন আনি – দিন খাই মানুষরাও ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছেন। ভালোভাবে বাঁচার তাগিদে বিমূর্ত ধর্মবিশ্বাস বা প্রচলিত ধর্মাচার ত্যাগ করতে বেশী সময় লাগে না হয়ত – সুতরাং, বহু মানুষই নিশ্চুপে সীমানা টপকে বাংলাতেই আশ্রয় নিয়েছেন। যারা অতটা সহজে মিশে যেতে পারেননি, তারা ঘুরপথে ছড়িয়ে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে – আসাম থেকে দিল্লী, ত্রিপুরা থেকে মুম্বই। কিছুটা ভোটের তাগিদ, কিছুটা ম্যানেজমেন্ট ফেলিওর – শরণার্থী সমস্যা চরমে পৌঁছচ্ছে জেনেও বাম নেতারা বিশেষ কিছু করে উঠতে পারছিলেন না। এতে যেমন বহু আদি পশ্চিমবঙ্গীয়ই (মূলত সীমান্ত এলাকায়) নিজেদের নিজভূমে পরবাসী ভাবছিলেন, বহু উদ্বাস্তু গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগসূত্র-ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল (শুধু ভোটের তাগিদে যে কথাবার্তা চলে বলাই বাহুল্য যে তা কোনোদিনই পুরোদস্তুর রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকল্প হতে পারবে না।)

আর এই প্রেক্ষাপটের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে দন্ডকারণ্য এবং মরিচঝাঁপি ট্র্যাজেডি। ১৯৬১ সালে বিধান রায় বহু উদ্বাস্তুকেই দন্ডকারণ্যে পাঠাতে চেষ্টা করেন। প্রায়, দশ হাজারের মতন মানুষ সেই নির্দেশ অগ্রাহ্য করে থেকে যান পশ্চিমবঙ্গেই। বিধান রায় আর্থিক এবং অন্যান্য সহায়তা বন্ধ করে দিলেও তাদেরকে বাংলাচ্যুত করার চেষ্টা করেননি। প্রফুল্ল চক্রবর্তী মনে করিয়ে দিয়েছেন দন্ডকারণ্যে যারা গেলেন এবং যারা গেলেন না, তাঁদের অধিকাংশই মূলত নমশূদ্র কৃষক; এঁদের অনেকেই স্বাধীনোত্তর পূর্ববঙ্গে নমশূদ্র আন্দোলন গড়ে ওঠার সাক্ষী (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে দেবেশ রায় একটি পূজাবার্ষিকীতে এই নমশূদ্র আন্দোলনের পুরোধাকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলেন ‘বরিশালের যোগেন মন্ডল’, দে’জ সম্প্রতি সেটি বার করেছে বই আকারে) – বাংলার নরম মাটি আর জলের মধ্যে থাকতেই এরা অনেক বেশী স্বচ্ছন্দ। সুতরাং, শ্বাপদসঙ্কুল দন্ডকারণ্য বা রুক্ষ রাজস্থান থেকে এঁরা চলে আসতে চাইবেন সে আর আশ্চর্যের কথা কি। বিহার বা উড়িষ্যাতেও যারা গেছিলেন স্থানীয় মানুষদের প্রবল বিরোধিতার  মধ্যে পড়তে হয়েছে এনাদের বারবার। সত্তরের শেষাশেষি এঁরাই ফিরে আসতে শুরু করেন, আশ্রয় নেন সুন্দরবনের মরিচঝাঁপিতে। মরিচঝাঁপির মানুষদের বামফ্রন্ট সরকার কিভাবে উৎখাত করার চেষ্টা করেছেন, তাতে কত মানুষের রক্ত ঝরেছে, কত মানুষ নির্যাতিত হয়েছেন সে কথা আজ নতুন করে বলার নেই। কিন্তু ‘মার্জিনাল মেন’ এর লেখক অবধারিত প্রশ্নটি তুলতে ভোলেননি – দন্ডকারণ্য থেকে আগত শরণার্থীদের ভোটাধিকার থাকলেও কি ঘটনাপ্রবাহ একই খাতে গড়াত? রেললাইনে ঝুপড়ি বানিয়ে যাঁরা থেকে গেলেন বা নিছক অর্থনৈতিক কারণে যাঁরা সীমানা পেরিয়ে মিশে গেলেন মূল জনস্রোতের সঙ্গে, তাঁদের কে রূঢ় বাস্তব বোঝানোর কোনো প্রয়াসই শাসকদল করেননি কারণ এই মানুষগুলির ভোটাধিকার ছিল। আর এই সময় থেকেই জাল পাসপোর্ট কি জাল র‍্যাশন কার্ডের যে রমরমা শুরু হয় তা এখনো অব্যাহত।

প্রফুল্ল চক্রবর্তী আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ  প্রশ্ন তুলেছেন, উদ্বাস্তু সমস্যাকে বিশ্লেষণ করেছেন নতুন কিছু আঙ্গিকে। সেই সব কিছুই বহু মানুষকে ক্রোধান্বিত করতে বাধ্য, যার ফল হয়ত পেতেও হয়েছে (শুধু প্রফুল্লবাবুকে নয়, অল্পবিস্তর আমাদের সবাইকেই)। সেরকমই কিছু প্রশ্ন, কিছু আঙ্গিক নিয়ে আলোচনা থাকবে ‘মার্জিনাল মেন ‘ এর শেষ কিস্তিতে।

Advertisements

মার্জিনাল মেন – ১

“I have lived the better part of my life in the most refugee-concentrated area of West Bengal and I was associated with Dr. B.C. Roy in doing whatever I could for the educational upliftment of the refugees. But I was never aware of what was happening in the entrails of the vast and apparently moribund human mass around me. The book came to me like a revelation : even in the midst of suffering, starvation and death the human spirit remains imperishable.”  – Triguna Sen

যাকে বলে ক্যাথলিক কনফেসন এ হল তাই। অথচ ত্রিগুণা সেন ছিলেন বিধান রায়ের সরকারে শিক্ষামন্ত্রী, যাদবপুর  বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা যায় নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন কিন্তু কি আশ্চর্য তিনিও নাকি বলছেন যে এ বই পড়ার আগে তাঁরও সম্যক ধারণা ছিল না উদ্বাস্তু মানুষগুলি ঠিক কিভাবে আছেন। যে বইয়ের ‘foreward’ পড়েই এরকম ধাক্কা খেতে হয়, অনুমান করা উচিত যে এ বই রীতিমতন শোরগোল ফেলে দিয়েছিল বিদ্বজন মহলে, সাধারণ মানুষের কথা যদি ছেড়েও দি। কিন্তু না, ‘মার্জিনাল মেন’ কোনো আলোড়নই ফেলেনি কারণ বইটিকে পাঠকদের কাছে পৌঁছতেই দেওয়া হয়নি। অথচ স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে উৎসাহী যে কোনো গবেষকের কাছে এ বই হয়ে উঠতে পারত প্রামাণ্য দলিল;  ‘সুবর্ণরেখা’ কি ‘মেঘে ঢাকা তারা’ দেখে যদি কারোর ইচ্ছে করত ফেলে আসা সেই ভয়াবহ দিনগুলোকে আরেকটু ভালো ভাবে জানতে,  এ বই হয়ে উঠতে পারত রেডিমেড রেফারেন্স – কিন্তু তা হয়নি। ‘মার্জিনাল মেন’ স্রেফ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। হাতে গোনা কিছু লোক জানেন এ বইয়ের অস্তিত্ব, তাঁদের অধিকাংশই লেখকের গুণমুগ্ধ ছাত্র কি সহকর্মী বা সহমর্মী। কপালজোরে তাঁদের সঙ্গে কখনো যদি আপনার দেখা হয়, তাঁরা বিস্তর আনন্দিত হবেন আপনার মুখে এ বইয়ের নাম শুনে; কেউ কেউ হয়তো শোনাতে পারেন অনেক না-জানা ষড়যন্ত্রের কাহিনী, কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে সে যাচাই করাও হয়ত এখন সম্ভব নয়। কিন্তু একটা কথা নিয্যস সত্যি, আর তার জন্য হাঁড়ির খবর জানার দরকার নেই –  এ বই মস্ত অবিচারের শিকার, আর আমরা যারা পড়ে উঠতে পারলাম না এ বই, তাদের জন্য বাংলার ইতিহাস রয়ে গেল অনেকাংশেই অপঠিত।

প্রফুল্ল চক্রবর্তী ছিলেন পেশায় শিক্ষক-গবেষক। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত আগে থেকেই যে অজস্র উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে এসে আশ্রয় খুঁজছিলেন, তাদের হাল-হকিকত জানার জন্য ব্যস্ত ছিলেন বহুদিন থেকেই। ১৯৭৮ সালে তিনি উদ্বাস্তু শরণার্থীদের নিয়ে বই লেখার সিদ্ধান্ত নেন এবং স্বভাবতই প্রথমে খোঁজ পড়ে প্রামাণ্য রেফারেন্সের। বলা বাহুল্য যে, পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু সমস্যা সত্তরের দশকেই প্রথম দেখা দেয়নি, স্বাধীনতার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহু শরণার্থী চলে আসতে শুরু করেন। অথচ প্রায় তিরিশ বছরের ইতিহাসকে জানার জন্য তাঁর কাছে সাকুল্যে রেফারেন্স ছিল তিনটি – ১) হিরণ্ময় ব্যানার্জ্জী, শরণার্থী ত্রাণ বিভাগের পুনর্বাসন কমিশনার হয়ে কাজ করার সময়ে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন , তার অবলম্বনে লিখেছিলেন ‘উদ্বাস্তু’, ২) ১৯৪৮ সালের তথ্য অবলম্বনে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইন্সটিউট থেকে প্রকাশিত একটি সমাজতাত্বিক গবেষণা ‘The Uprooted’, যার লেখক ছিলেন কান্তি পাকড়াশী এবং ৩) উদ্বাস্তু কলোনির ইতিবৃত্ত নিয়ে লেখা ‘পশ্চিম বাংলার জবরদখল উদ্বাস্তু উপনিবেশ’ (অনিল সিনহা)। কিন্তু এগুলোর কোনোটিকেই প্রামাণ্য রেফারেন্স বলা চলে না, এবং সব কটি একত্রে ধরেও সার্বিক চিত্র ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। এমত অবস্থায় একজন গবেষক কি করতে পারেন?  উত্তর পাওয়া সহজ নয় কিন্তু প্রফুল্ল চক্রবর্তী যা করলেন সেটা ভাবাটাও বেশ দুষ্কর ব্যাপার – বারো বছর ধরে উনি চষে ফেললেন সারা ভারত, পূর্ববঙ্গ থেকে আগত শরণার্থীরা যেখানে যেখানে আশ্রয় খুজেছেন তার প্রায় প্রতিটা জায়গায় তিনি গেলেন। দন্ডকারণ্য হোক কি উত্তরপ্রদেশ, দিল্লী হোক কি বিহার বসবাস-অযোগ্য প্রত্যেকটি জায়গায় উদ্বাস্তুদের লড়াইয়ের সাক্ষী থেকেছেন তিনি। নিছক গবেষণার টান থেকে কি এহেন পরিশ্রম বা সাধনা সম্ভব? হয়ত, হয়ত নয়, কিন্তু নিছক গবেষণা থেকে মানবসংগ্রামের এক মরমী দলিলে এভাবেই উত্তোরণ ঘটেছে  ‘মার্জিনাল মেন’-এর।

দলিলটি অনেক কারণেই অবিস্মরণীয়, অন্যতম প্রধান কারণটি হয়ত রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। বইটি যখন (১৯৯০) প্রকাশিত হয়, বামফ্রন্ট সরকার তখন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন, দিল্লীর মসনদ থেকে কংগ্রেস সদ্য ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে (যদিও কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীনই প্রফুল্ল চক্রবর্তী ইউ-জি-সি থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন বইটি লেখার ব্যাপারে) কিন্তু কোনো দলকেই লেখক রেয়াত করেননি, সত্যি কথাগুলো খুব সহজে বলেছেন।  স্বাধীনতার প্রায় পর থেকেই রাজ্য এবং কেন্দ্র দুই সরকারই বহুদিন এক অলীক আশায় দিন গুনছিলেন যে উদ্বাস্তুরা এক সময়ে আবার দেশে ফিরে যাবেন; তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল ঘোষ এবং প্রধানমন্ত্রী নেহরু দু’জনেই এখানে দূরদৃষ্টি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার প্রায় এক বছর পরেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনো পুনর্বাসন দপ্তর ছিল না। অথচ এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে তৎকালীন বহু নেতাই  বিপদের সময় রক্ষাকর্তা হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন পূর্ববঙ্গীয় সংখ্যালঘুদের – সাতচল্লিশের আগে থেকেই । যাই হোক, সেই অলীক  আশা ঘুচে যাওয়ার পর কি হল? লেখক এখানে রীতিমতন আক্রমণাত্মক “Nehru’s reply to Dr. Roy’s letter was a mixture of callous indifference to the East Pakistan refugees and special pleading for refugees from West Pakistan” –  বিধান রায় বারংবার চিঠি লিখেও যে নেহরুর কাছ থেকে প্রায় কোনো সাহায্যই পান নি সে কথা আজ বহু চর্চিত।

কম্যুনিস্ট পার্টির ভূমিকাও কম বিস্ময়কর নয় – পূর্ব পাকিস্তানের কমরেডদের রীতিমতন ম্যান্ডেট দেওয়া হয় ভারতবর্ষে না আসার ব্যাপারে। কিছু কমরেডকে পাঠানো হয় পশ্চিম পাকিস্তানে, পূর্ব পাকিস্তানে যারা থেকে যান তাঁদের অনেককেই রাজনৈতিক শত্রুতায় জেলে যেতে হয় আর পার্টির ম্যান্ডেট অগ্রাহ্য করে যারা প্রাণের দায়ে ভারতে আসেন তাদের প্রায় সবাইকে বহিষ্কার করা হয়। কেন? সব থেকে সহজ উত্তর – ধর্মভিত্তিক দাঙ্গাকে অস্বীকার করার ফল। তবে একথা সত্যি যে নেতারা ঠেকে শিখেছিলেন তাই দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের রাজত্বে ধর্মভিত্তিক দাঙ্গা দমনে কম্যুনিস্টদের সাফল্য চোখে পড়ার মতন। কিন্তু এই জবরদস্তি অস্বীকার বেশিদিন করা যায়নি। প্রফুল্ল চক্রবর্তী দেখিয়েছেন ৪৮ সালে মাণিকতলার বহু কারখানার মালিকরা শ্রমিক ধর্মঘট চলার সময় বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে বহু কম টাকায় চাকরি দিতে থাকেন উদ্বাস্তুদের। স্বভাবতই, ধর্মঘট বিফলে যাওয়ার আশঙ্কায় কম্যুনিস্ট পার্টি নড়েচড়ে বসেন। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে প্রায় একটা পলিটিক্যাল থ্রিলারই বলা যায়। উদ্বাস্তুদের মধ্যে   কম্যুনিস্টদের প্রতি চরম বৈরীভাব কাটানোর জন্য একটা স্ট্র্যাটেজী ঠিক করতেই হত; সি-পি-আই এর সৎ এবং পরিশ্রমী নেতা বিজয় মজুমদারকে কংগ্রেসী সাজিয়ে পাঠানো হয় লেক ক্যাম্প কলোনিতে (কম্যুনিস্ট হিসাবে পাঠালে বিজয়বাবুর উদ্বাস্তুদের নিয়ে কাজ করাই সম্ভব হত না)।

ছ মাসের মধ্যে বিজয় মজুমদার উদ্বাস্তু আন্দোলনের ওপর থেকে কংগ্রে্সী আধিপত্য হটিয়ে কিভাবে র‍্যাডিকাল মুভমেন্ট শুরু করেন, তার এক অনবদ্য ইতিহাস উঠে এসেছে ‘মার্জিনাল মেন’-এর পাতায়। মাণিকতলা শ্রমিক ধর্মঘট বানচাল হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যে , ১৯৪৯ এর লক্ষ্মী পুজোর দিনে তৈরী হয় বৃহত্তম কলোনি – কাকতালীয় ভাবেই যার নাম রাখা হয় ‘বিজয়গড়’ (সর্বপ্রথম কলোনিটি অবশ্য তার আগেই তৈরী হয়েছে সোদপুরের কাছে দেশবন্ধুনগরে)। ১৯৫০-এর জানুয়ারী থেকে মে’র মধ্যে দক্ষিণ শহরতলীতে তৈরী হয় আরো একাধিক  কলোনি – পোদ্দারনগর, বাঘা যতীন, বিদ্যাসাগর, রামগড়। কিছু জায়গাতে কংগ্রেসী নেতারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিলেও কম্যুনিস্ট নেতাদের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতন। দেশবন্ধুনগরে সি-পি-আই, বাঘা যতীন এবং বিদ্যাসাগরে আর-এস-পি, রামগড়ে ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন।

কুড়ি বছর পরের ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করেছিল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখার জন্য। দেখা কি গেছিল? সে কথাই বলব পরের কিস্তিতে।

MM

টানেল

“বিওয়্যার অফ দ্য ব্লব, ইট ক্রীপস
অ্যান্ড লীপস, অ্যান্ড গ্লাইডস  অ্যান্ড স্লাইডস
অ্যাক্রস দ্য  ফ্লোর
রাইট থ্রু দ্য ডোর
অ্যান্ড অল অ্যারাউন্ড দ্য ওয়াল,
আ স্প্লচ, আ ব্লচ
বী কেয়ারফুল অফ দ্য ব্লব”

আমার ধারণা ছিল টানেলটা বহু লম্বা হবে, যেদিক দিয়ে ঢুকব সেদিকেই সোজা এঁকেবেঁকে সাপের মতন চলবে তো চলবেই। ভুল – দেখছি এর বিস্তৃতি চতুর্দিকে। ডাইনে, বাঁয়ে, ঈশানে, নৈঋতে এ সুড়ঙ্গ ইশারায় ডাকছে তো বটেই আবার গহীনে হারিয়ে যাওয়া পাতকুয়োর  তলের মতন নিচে নেমে গেছে এক দিক থেকে, নীচে নামতে ইচ্ছে না করলে ওপরেও ওঠা যায়, যদিও ওপরের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে – বহু, বহু ওপরে এক বিন্দু আলো। অবশ্য সিঁড়ি বেয়েই উঠতে হবে এরকম কোনো কথা নেই, এলিভেটর আছে, তাতে চড়তে টাকাও লাগবে না। কিন্তু যে দু’একটা কালো অবয়বে কে ওপরে উঠতে দেখলাম, কারোরই দেখলাম বেশী তাড়া নেই, ধীরেসুস্থে দেওয়ালের প্রতিটা খোঁদল দেখে নিয়ে উঠছে। “সমস্যা?” শব্দটা কোনো ধ্বনিতরঙ্গ তোলার বদলে এক ঝলক গরম হাওয়া হয়ে কানে ঢুকল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম – না ছোপ ছোপ ধরা দাঁত নেই, কন্ঠা বার হয়ে নেই, হাতে কোনো ছবিও নেই। রোগা ছিপছিপে চেহারা, হাতে ট্যাবলেট, গায়ে সোয়েটশার্ট , সঙ্গে ডেনিম জীনস। “কোথায় যেতে চান বলুন, আধ ঘন্টার মধ্যে ডিশিসন নিতে না পারলে আপনাকে রি-এন্ট্রি নিতে হবে, তবে সেটাও কয়েক মাসের আগে সম্ভব নয়;  সরি অ্যাবাউট দ্যাট।” ট্যাবলেটের পর্দায় ফুটে উঠল একটা ভার্চুয়াল ট্যুর ভিডিও, “বুঝতেই পারছেন  প্যানোরামিক মোড আপনাকে শুধু ব্রড ক্লাসিফিকেশন টুকুই দেখাতে পারে এই মুহূর্তে, সমস্ত অ্যাক্টিভিটিজ দেখানোর মতন কোনো প্রযুক্তি এখনো তৈরী হয়ে ওঠেনি।” ডায়গনালি চলে যাওয়া একটি সুড়ঙ্গ-শাখা থেকে ভেসে এল শকুনের চিৎকার, কিন্তু মিথ্যে স্তোকবাক্য দেওয়ার দরকার নেই, সোয়েটশার্টও জানে, আমিও জানি শকুন নয়, কচি বাচ্চার কান্নাই। মেটাফর, অ্যালিগরির স্থান নয় এ জায়গা, মিরাজ-ও তৈরী হয় না। “আপনি জানেন এই মুহূর্তে আমাদের কিছু ফাইন্যান্সিয়াল কন্সট্রেন্টস আছে, সেটা মিটে গেলেই অবশ্য আমরা ওই শাখাটি বন্ধ করে দিতে পারি। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমরা গ্যারান্ট দি, পুরোটাই সিমুলেশন।” আমি তাকিয়ে ছিলাম অপলকে, চোখাচোখি হতেই সরিয়ে নিলাম চোখ, মনে হল একটা হাল্কা হাসি ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।  জিজ্ঞাসা করলাম ভার্চুয়াল ট্যুরের জায়গায় স্বচক্ষে দেখা সম্ভব কিনা। “আধ ঘন্টায় কতটুকুই বা দেখতে পাবেন? আমাদের হিসেব অনুযায়ী এক বছরের প্রতিটি দিন চব্বিশ ঘন্টা করে দেখে গেলেও আপনি টানেল ঘুরে শেষ করতে পারবেন না।” আমি তার পরেও তাকিয়ে আছি দেখে বলল “ঠিক আছে, আপনার জন্য স্পেশ্যাল ছাড়, আসুন। তবে একটা কথা লুকোছাপা করে লাভ নেই, স্বচক্ষে দেখছেন দেখুন কিন্তু আগামী এক বছরের জন্য আপনার গতিবিধি আমাদের নখদর্পণে থাকবে।”

বাঁদিকে প্রথম মোড়টা ঘুরতেই দেখলাম একটা রঙচটা দরজা, তাতে কালচে সবুজ শ্যাওলার আস্তরণের পর আস্তরণ – ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলতে যেতে বাধা পেলাম। “আপনি নিজেই কি চান খুলতে? আপনার হয়ে আমিও খুলে দিতে পারি।” কি ভেবে নিজেই ধাক্কা দিলাম, ভেতরের বিলাসবহুল বিশ্রামাগার, অজস্র জীব মাটিয়ে শুয়ে, কুঁকড়ে আছে, দুমড়ে আছে, মুখগুলো সেকন্ডে সেকন্ডে বিকৃত থেকে বিকৃততর হচ্ছে । ক্রিস্ট্যাল মেথের ধোঁয়ার মধ্যে একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছিল, একটু সরে দাঁড়িয়ে দেখলাম – না, মানুষ-ই। বেরিয়ে এসে সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম মেজানিন ফ্লোরে, একটা সাদা কিউবের মধ্যে একটা টেবল, সেখানেও আরেক সোয়েটশার্ট – এটার নাম শুধুই “সার্ভিস সেন্টার”। চোখে পড়ল মাইকেল পাওয়েলের সেই বিখ্যাত পোস্টার,

pt

“আপনি নাম, আই-পি অ্যাড্রেস দিয়ে দিলে আমরা আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে ডেলিভারী দিয়ে দেব। ওয়েবক্যাম থাকলে আমাদের কোডিং-এ অনেক সুবিধা হয়, আপনার কাজটাও স্মুদলি হবে। না থাকলেও অসুবিধা নেই, তবে টাকা এবং সময় দুটোই বেশী পড়বে।” ঘুরে ডানদিকে যেতেই একদল টীন-এজার, সবাই সোয়েটশার্ট পড়ে, তারা ছবি মরফ করে চলেছে। মরফিং সেন্টারের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলাম, আমার গাইডের ইঙ্গিতে চোখ রাখতে হল দেওয়ালে রাখা পঞ্চান্ন ইঞ্চির পর্দায়। মেরুদন্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল – আমার বোন, আমার দিদি, আমার স্ত্রী। “চিন্তা করবেন না, এক মাসের মধ্যেও যদি আপনি ওয়ার্ক- অর্ডার দিতে পারেন, পাঁচ বছরের মধ্যে কারোর জিম্মায় এগুলো যাবে না – আপনি জানেন এ গ্যারান্টি একবার পেয়ে গেলে টানেলের-ও কারোর পক্ষে সেটা রিভোক করা সম্ভব নয়।” কপালটা ঘেমে উঠেছিল, মুছতে গিয়ে দেখি হাতের আঙ্গুলগুলো চটচট করছে, সেই অদ্ভুত কালচে সবুজ শ্যাওলাটা কখন জানি লেগে গেছে হাতে। একটা গমগমে আওয়াজ শুনে ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখি টানেল-ট্রেন রিসিভিং স্টেশনে এসে পৌঁছল – ক্রেট ক্রেট মাল স্টেশন লাগোয়া এলিভেটর দিয়ে সোজা ওপরে উঠতে লাগল, সেই এক বিন্দু আলোর দিকে।  “মিলিটারী ডিলস, এর বেশী কিছু বলা যাবে না; আসুন বরং প্লেরুমে যাই, নেক্সট রাউন্ড আর দু মিনিটে শুরু হবে।”

প্লেরুম দোতলায়, কিন্তু সেখানে ঢোকার উপায় নেই, বাইরে থেকেই দেখতে হবে। লালচে নিওন লাইটে দেখা গেল পাঁচজন লোক গাই ফকসের মুখোশ পরে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে, বাইরে থেকে তাদের কাঁধের ওপর থেকেই শুধু দেখা যাচ্ছে। বাইরে অবশ্য অস্বাভাবিক ব্যস্ততা, কম্পিউটারের স্ক্রীনে স্ক্রীনে ফুটে উঠছে টাকার অঙ্ক, স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যস্ততায় সোয়েটশার্টরা অর্ডার নিতে ব্যস্ত। “বেটিং, লাইভ” গাইডের কথা শেষ হতে না হতেই একটা গং আওয়াজ কানে ভেসে এল। ভেতর দেখা গেল পাঁচ মুখোশধারী একে অপরের মাথায় নিশানা করেছে মসৃণ পালিশের আগ্নেয়াস্ত্র। “রাশিয়ান রুলেট নিশ্চয় আগে দেখেছেন, অ্যাড্রিনালিন টাইম।” তিন নম্বর লুটিয়ে পড়ল, আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। “আজকের গেমটা একটু স্পেশ্যাল ছিল, ফিক্সড, প্লীজ এদিক দিয়ে আসুন”, আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে উত্তর এল “স্পাইদের নিয়ে খেলতে কার না ভালো লাগে বলুন?” দোতলায় মিনিট দশেক আরো হাঁটার একটা চকিত বাঁক, আরো একটা দরজা। “আসুন, এখানে দেখতে পাবেন আমাদের ক্রেম ডেলা ক্রেমদের।” আরো এক ঝাঁক সোয়েটশার্ট, দ্রুতগতিতে চলছে কোডিং, সামনের বিশাল স্ক্রীনে ফুটে উঠছে ডিজিট্যাল লেজারের হিসেবনিকেশ। “জানেন নিশ্চয়, টানেলে ডলার, ইউরো, পাউন্ড কিছুই চলবে না, চলবে শুধু বিটকয়েন। কম্পিটিশন এত বেড়ে গেছে, দিনে তিনটের বেশী বিটকয়েন বানানো বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। আমাদের পারফরম্যান্স অবশ্য মাচ বেটার, বিটকয়েনের হিসাবে বেশ কিছু বিলিয়ন ডলার আমাদের কাছে মজুত। সুতরাং, আপনি কোনো কাজ করতে চাইলে ফাইন্যান্সিয়াল কারণে সেটা না হওয়ার চান্স প্রায় নেই।” বলতে বলতে হাতের ট্যাবলেটে বেজে উঠেছেদ, সময় শেষের সঙ্কেত।

আমি ঘাড় নাড়লাম, বাঁদিক থেকে ডানদিকে, ডানদিক থেকে বাঁদিকে। সোয়েটশার্ট হাসল, এক ঘন্টা আগেই জানত আমি কিরকম ভাবে ঘাড় নাড়াব। কিন্তু হাসিটা সেজন্য নয়, ও জানে আলোয় ফিরে গিয়েও স্বস্তি নেই,  কালচে সবুজ শ্যাওলায় টানেল ছেয়ে গেলেও আবার কোনো একদিন অন্ধকারের মুখোমুখি হতে মন ছটফট করবে। কোনো এক দুঃস্বপ্নের রাত্রে শকুনের চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেলেও শরীর জুড়ে চটচটে অস্বস্তি মনে করিয়ে দেবে বহু নীচে চলছে অমানুষী মাইটোসিস, আরেক পৃথিবী বেড়ে চলেছে অস্বাভাবিক দ্রুততায় ।

(কৃতজ্ঞতা – http://content.time.com/time/magazine/article/0,9171,2156271,00.html?pcd=pw-edit)

টার্কিশ কোলাজ – ৫

বসন্তের শুরুই বলা যায়, ইরাণীরা যাকে বলে বাহার। গালাতা টাওয়ারের ওপরে একটা কালো চিল চক্কর কেটেই চলেছে, শহরের  দেড় কোটি লোক বহাল তবিয়তে আছে কিনা সেটা জানতেএকটা বার্ডস-আই ভিউ থেকে কড়া নজর রাখছে। ওই জায়গায় পৌঁছনোর উপায় থাকলে দেখা যেত ত্রিভুজাকৃতি শহরটার পূবের দিকের বাহুটি হঠাৎ যেন সমতল থেকে একটু উঁচিয়ে উঠে গন্ডারের শিঙ -এর মতন একটা আকার ধারণ করেছে, আর সেই শিঙ এর দু পাশে সমুদ্র। উত্তর দিকে বসফরাসের একটা শাখা ঢুকে এসেছে, দক্ষিণে মর্ম্মর  সাগর – সারাক্ষণ একটা অনর্থক ভরসা যুগিয়ে চলেছে এ শহরের মানুষদের, মাভৈঃ, কেউ আসবে না উৎপাত করতে, আঁচড়টুকু পড়বে না এ শহরের গায়ে। সেই অলীক ভরসাতেই বোধহয় মানুষজন দিব্যি খোশমেজাজেই আছে অথচ শেষ তিনশ বছরে তেইশবার শত্রুপক্ষ এ শহরকে আক্রমণ করেছে, যদিও কব্জা করতে পেরেছে একবারই – পরাক্রমী আরবরা নয়, দুর্দান্ত ভবঘুরে জাত বুলগাররা-ও নয়, শেষবার এ শহরের পতন হয়েছিল চতুর্থ ক্রুসেডের নাইটদের হাতে। মার্চ মাসের শুরুতে, যখন শীত তার শেষ কামড় দিয়ে সদ্য বিদায় নিয়েছে এসব পুরনো কথা ভেবে কেউই মন ভারী করতে চান না, গুপ্তচররাও উৎকণ্ঠায় পড়ার মতন কোনো খবর আনছে না তাই সম্রাট প্যালিওলোগোস খোশমেজাজেই আছেন। কিন্তু রজার ক্রাউলের মনে কু ডেকেছে ওই কালো চিল!

কালো চিলের তাৎপর্য কি সেটা ভালো করে বোঝার আগেই কানের কাছে বেশ হেঁড়ে গলায় কেউ ‘ইয়াসিম’ বলে ডাক ছাড়লেন। দেখি এক স্বর্ণকেশী যুবা তাঁর বান্ধবীকে প্রায় দৌড়ে আসতে বলছেন কারণ সাতটা বিশাল হল ঘুরে শেষমেশ নপুংসক গোয়েন্দা ইয়াসিমের দেখা পেয়েছেন ‘ইনসান কিতাপ’ এর স্টলে। ব্যাপারস্যাপার আরো গুলিয়ে যাওয়ার আগে বলে নি, এসেছিলাম ইস্তানবুলের আন্তর্জাতিক বইমেলায় ঘুরতে। আমার অবস্থা সেই নর্ডিক দেবতার (লোকি বোধহয়) মতন যাকে বাকি দেবতারা হাত-পা বেঁধে পাতালে ফেলে রেখেছিলেন, আর শাপ দিয়েছিলেন জল খেতে গেলেই মুখের সামনে থেকে জল সরে যাবে। চতুর্দিকে থরে থরে বই সাজানো, যেমনি ঝকঝক করছে প্রচ্ছদ তেমনি খোশবাই ছড়াচ্ছে নতুন পাতার গন্ধ কিন্তু বিধি বাম, সাত খানা হলের সর্বত্রই শুধু তুর্কী বই। ইংলিশ বই স্রেফ নেই, ঘন্টা দেড়েক খুঁজে খুঁজে বার করেছিলাম একটিমাত্র স্টল যেখানে সর্বসাকুল্যে দশ থেকে বারোটি ইংলিশ বই বিক্রি হচ্ছে। তারই একটি হল রজার ক্রাউলের “কনস্ট্যান্টিনোপল, দ্য লাস্ট গ্রেট সিইজ” – ১৪৫৩ সালের আঠাশে আর ঊনত্রিশে মে, এই দু’দিনে কিভাবে বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করে নেন অটোমান সম্রাট দ্বিতীয় মেহমেদ, তারই ইতিবৃত্ত। তার পাশেই সার দিয়ে দাঁড় করানো অরহান পামুকের ইংলিশে অনূদিত সব কটি বই – ‘স্নো’, ‘ব্ল্যাক বুক’, ‘রেড’, ‘মিউজিউয়াম অফ ইনোসেন্স’ ইত্যাদি। ব্রিটিশ যুগল যে বইটি দেখে আহ্লাদিত হয়ে পড়েছিলেন সেটিরও আন্তর্জাতিক বাজারে রীতিমতন ভালো কাটতি –  জেসন গুডউইনের একমেবাদ্বিতীয়ম নপুংসক গোয়েন্দা ইয়াসিম প্রথম আবির্ভাবেই জিতে নিয়েছিল গোয়েন্দা সাহিত্যের শ্রেষ্ট পুরস্কার ‘এডগার অ্যাওয়ার্ড’; ঊনবিংশ শতকের ইস্তানবুলে সুলতানের রাজপ্রাসাদে আচম্বিতে খুন হয়ে যান এক হারেমসুন্দরী, প্রায় একই সময়ে উধাও হন একাধিক রাজ-অফিসার। সুলতানের হুকুমে রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব পড়ে ইয়াসিমের ওপর, সাধারণ খুনের মামলা কিভাবে যোগসূত্র হয়ে দাঁড়ায় একাধিক ষড়যন্ত্রের মধ্যে তাই নিয়ে বেশ টানটান একটা উপন্যাস লিখেছেন জেসন। কিন্তু এডগার পুরস্কার পাওয়া বইয়ে খুন আর ষড়যন্ত্রের বাইরেও কিছু থাকতে হবে, আর সেই কারণেই পুরনো ইস্তানবুলের গলি, বাজার, প্রাসাদ, মসজিদকে চোখের সামনে জ্যান্ত হয়ে উঠতে দেখাটা একটা উপরি পাওনা। কিন্তু রহস্যকাহিনীর ভক্তদের কাছে জেসন গুডউইন চেনা নাম, আমাকে টানল এমন একটা সিরিজ যেটা টার্কি না এলে জানা যেত না। আহমেত উমিতকে বলা যায় তুরস্কের উম্বেরতো একো। অবশ্যই আসল উম্বেরতো একজনই, ‘নেম অফ দ্য রোজ’ লেখা একজনের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু আহমত উমিত-ও হেলাফেলা করার মতন লেখক নন। আজ অবধি খান কুড়ি বই লিখেছেন, সবগুলোই প্রায় সুপারহিট! ইতিহাসের পাতা থেকে রহস্য খুঁজে বার করতে (এবং সমাধান করতেও) এনার জুড়ি নেই। ইংলিশে সর্বসাকুল্যে খান তিনেক বই বেরিয়েছে। তারই একটা হল ‘দ্য দরবিশ গেট’ – পটভূমিকা জুড়ে রয়েছেন জালালউদ্দিন রুমি এবং রুমির স্পিরিচুয়াল গুরু শামস তাব্রিজি । আজ থেকে সাতশ বছর আগে  ইরাণের তাব্রিজ শহর থেকে হঠাৎ একদিন হারিয়ে যান শামস। বহু লোকের বিশ্বাস রুমি এবং শামসের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সহ্য না করতে পেরে রুমিরই কাছের লোকেরা গুমখুন করেন শামসকে, কিন্তু প্রামাণ্য ইতিহাস কিছুই নেই (পড়তে গিয়ে শ্রীচৈতন্যর অন্তর্ধান রহস্য মনে পড়ছিল); এই বই সেই রহস্য নিয়েই। রহস্যের আনাচেকানাচে চমৎকার ভাবে সুফিসাধনার ইতিহাসকে নিয়ে এসেছেন, সিরিয়াস বিবলিওফাইলদের জন্য রেখে গেছেন প্রাচীন সব বইয়ের সূত্র ধরে জাল গোটানোর ইঙ্গিত – আর কি চাই!

jt-dg

ক্লাসে ঢুকেছি, উল্টোদিকে থেকে অ্যাকিলে প্রায় হাঁইমাই করে উঠলো “খাতা, খাতা”। অ্যাকিলে মানে অ্যাকিলিস আর কি, ইটালির ছেলে – ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, ইংলিশ, স্প্যানিশ এর পরেও আরো খান  দুয়েক ভাষা জানে। কিন্তু ওর ধারণা গ্রীক বীরের গোড়ালির মতনই তুর্কী হচ্ছে ওর প্রাণঘাতী জায়গা। এক্সপেকটেশন্স ছিল মাস দুয়েকের মধ্যে কথ্য তুর্কীতে রীতিমতন সড়গড় হয়ে যাবে  – আমি অবশ্য এহেন এক্সপেকটেশন্স শুনে হাঁ, তারপর হরিনাথ দে বা নরসিমহা রাও সুলভ জিনের কথা ভেবে চুপ করে গেছিলাম, কিন্তু সে আর হচ্ছে কই?  তারমধ্যে বান্ধবীকে ইস্তানবুল ঘোরাতে গিয়ে আগের ক্লাস মিস হয়েছে। সুতরাং, খাতা খুলে বোঝাতে হল রবিবারের নাম পাজার (রবিবার বোধহয় ছিল এদের হাটবার), রবিবারের পরেই সোমবার আসে বলে সেটা পাজারতেসি, মঙ্গলবার সালে , এই অবধি বেশ তুর্কী নাচন চলছিল। বেমক্কা বুধ আর বৃহস্পতিবারে ফারসি চলে এসেছে – চারসাম্বা আর পারসাম্বে। শুক্রবার অবশ্য ইউনিভার্সাল জুমা, শুক্রের পরেই শনি বলে সেটা দাঁড়াল জুমারতেসি। “গ্রাতসিয়ে, গ্রাতসিয়ে” বলে চলে গেল যদিও ক্লাসের নিয়ম অনুযায়ী বলার কথা তেশেক্কুরলার, কিন্তু বান্ধবীকে সদ্য এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে এসেছে, তাই আর উদব্যস্ত করলাম না। তুর্কী ভাষী শিক্ষিকার আর মিনিট দশেকের মধ্যেই ক্লাসে ঢুকে যাওয়ার কথা এবং শুরুতেই ক্যুইজ, তাই খাতায় চোখ বোলাচ্ছিলাম হঠাৎ কানের কাছে ভারী সুরেলা কন্ঠে কেউ ‘পারদন’ বলে উঠল। এখানে বলে রাখা ভালো আতাতুর্ক তুর্কী ভাষাকে আধুনিক রূপ দেওয়ার জন্য বহু বিশেষজ্ঞকে সংস্কৃতির পীঠস্থান  ফ্রান্সে পাঠিয়েছিলেন, লাটিন আলফ্যাবেট এবং বহু ফ্রেঞ্চ শব্দ তারই ফলশ্রুতি।

ঘুরে দেখি একটি মেয়ে ভারী কুন্ঠিত হেসে খাতাটি চাইছে, অ্যাকিলের মতন সেও ক্লাস মিস করেছে আগের সপ্তাহে। এ অবশ্য দেখলাম তুর্কী ভাষায় ওস্তাদ, সপ্তাহের বিভিন্ন দিনের নামগুলো আগেই জানে, খাতা দেখে একবার চেক করে নিল ঠিক জানে কিনা। তারপর ভারী মোলায়েম হেসে বলল “এক থেকে নয় অবধি মুখস্থ করেছি, ধরবে্ন প্লীজ?” ধরলাম, আট’কে ঠিকঠাক বলল সেকিজ, দশ আর নয় দিয়ে ঊনিশ হয় বলে দিব্যি বলে দিল ওন-দোকুজ, দেড় মানে যে বের বুচুক সেও চকিতে বলে দিল।  আমি এহেন পারদর্শিনী (এবং পারদর্শী) দের ভারী ডরাই, তাই তাড়াতাড়ি অজুহাত দেখিয়ে  খাতায় মুখ গোঁজার আগেই দেখি ফস করে ক্রিয়াপদ নিয়ে প্রশ্ন করছে, আফটার অল আমাকেও ক্যুইজ দিতে হবে কিনা। ওড়া আর জল খাওয়া এক করে দিলাম, গাড়ী চালানোকে বলে দিলাম ব্রেকফাস্ট করছি, জেগে উঠতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম – সে এক নাজেহাল কান্ড। আমার আসন্ন সর্বনাশে তার মুখে ছায়া ঘনাচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি প্রশ্ন ঘোরাতে হল – “তুমি কি ফ্রেশম্যান নাকি সফোমোর?” প্রশ্ন শুনে কুটিপাটি অবস্থা , বলল “ঈশ্বর মঙ্গল করুন তোমার, আমি পি-এইচ-ডি’র ছাত্রী।” জানতাম প্রতিপ্রশ্ন আসবেই, অ্যাকিলে যাকে বলে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’, “তুমি কি সিনিয়র ইয়ার?” বলতে বলতেই বোধহয় চোখ গেছে খোঁচা খোঁচা হয়ে থাকা দুইখান সাদা দাড়ির ওপর “নাকি মাস্টার্স?” তাতেও নিরুত্তর দেখে চোখ আরো বড় “ওঃ, আপনিও পি-এইচ-ডি?” এইবার বলতেই হল “নাহ, আমি হলাম গিয়ে পাজারলামা হোজা।” পাঠক, ঘাবড়াবেন না –  পাজার মানে তো বুঝতেই পারছেন আর হোজাও চেনা শব্দ, সেই যে হোজা নাসিরুদ্দীন যাকে সত্যজিৎ মোল্লা বলে পরিচয় করিয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে – অর্থাৎ কিনা, মার্কেটিং এর প্রফেসর। ‘লামা’টাও বুঝে ফেলেছেন নিশ্চয়, হ্যাঁ ‘বাবরনামা’ কি ‘বাঙ্গালনামা’ র নামা, মানে বিষয়।

সে বেচারি দেখি ভারী কাঁচুমাচু হয়ে পড়েছে, প্রফেসরকে ক্রিয়াপদ জিজ্ঞাসা করার মতন ঘোরতর অপরাধ খুব কমই আছে। মাফটাফ চেয়ে বলল “আমি কিন্তু হিন্দী সিনেমা ভয়ঙ্কর ভালোবাসি, শাহরুখের কোনো সিনেমাই ছাড়ি না।” আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম “নাহ, আমি ওকে টলারেট করতে পারি না।” ভারী অবাক হচ্ছিল কিন্তু হোজার ব্যাপারটা খেয়াল ছিল তাই একটু চুপ করে থেকে বলল “মিস্টার রওশনকেও আমার বেশ লাগে”। বুঝলাম হৃত্বিকের কথা হচ্ছে, আমি তাতেও ঘাড়া নাড়াতে এবার সূচীভেদ্য স্তব্ধতা – বোধহয় ভাবছে কি কুক্ষণে সিনেমার কথা আরম্ভ করেছিলাম। আমার এবার মায়া হল, বললাম “আ্মার ভালো লাগে আমিরকে”। চোখ পুরো জ্বলজ্বলিয়ে উঠল “তাই বলুন। অফ কোর্স, আমিরকে কার না ভালো লাগে। আমার তো ওকে মিস মুখার্জ্জীর কাজিনের সঙ্গে সিনেমাটাতে দারুণ লেগেছিল।” পাঠক, আমার এতক্ষণে খেয়াল পড়ল মেয়েটি ভারতীয় নয়, পাকিস্তানী-ও না। মিস মুখার্জ্জীর কাজিন শুনে এত অবাক হলাম বোধহয় পাক্কা মিনিট খানেক বাদে প্রশ্নটা বেরোল, “এক্সকিউজ মী, তুমি কোন দেশের?” ভারী সপ্রতিভ হেসে বলল “আমি ফারাহ, তেহরানে বাড়ি – আঃ, এতক্ষণে নামটা মনে পড়েছে, কাজল, কাজল।” আমি এত ইম্প্রেসড কি বলব, নিজের স্টুডেন্ট হলে এক্সট্রা ক্রেডিট দিয়ে দিতাম! ওকে আর বললাম না, ‘ফনা’ খুব একটা সুবিধের লাগেনি, ততক্ষণে কানে আসছে “আর রনবীর সিং কে আজকাল আমার দারুণ লাগছে, সোনাক্ষী কি লুটেরা-তে ওজন একটু কমাল?”

থ্যাঙ্ক ইউ বলিউড, অগুন্তিবারের সঙ্গে আরো একবার।