রোববার, বেড়া টপকিয়ে

ওই দেখুন, নায়িকা সবুজ লনে পাতা চেয়ারে বসে আড়চোখে কটাক্ষ হানছেন! মধ্যবয়সী নায়ক সেসব দেখেও খেলা আরো জমানোর জন্য নায়িকার বন্ধুর চেয়ারে হাত রেখে একটু  ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছেন। গেম থিয়োরীতে যাকে বলে কমন বিলিফ, এ হল তাই। নায়িকা জানেন গোপন খবরটি, নায়ক জানেন যে নায়িকা জানেন, নায়িকা জানেন যে নায়ক জানেন যে নায়িকা জানেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তাবৎ দর্শককুল যাতে এত কমপ্লিকেটেড ব্যাপারস্যপার বুঝতে পারেন, সেটা জলবৎ তরলম করার জন্য ডিরেক্টর বা সিনেমাটোগ্রাফার মাঝে মাঝেই ক্লোজ-আপে নিয়ে আসছেন নায়িকার থরোথরো মুখটি, নিচের ঠোঁটটি আলতো করে কামড়ে ধরে তিনি ফুঁসে উঠছেন থেকে থেকে।

যদিও নায়িকা রেগে আছেন কিন্তু ওই থরোথরো ভাব দেখে আপনার মনে পড়ে যাবে ‘যব যব ফুল খিলে’-র নন্দাকে, যেন ছুঁলেই উত্তেজনার আধিক্যে এক্ষুনি মাটিতে লুটিয়ে পড়বেন; যদিও নায়কের মুখমন্ডলে উত্তর ভারতীয় সুলভ পৌরুষের আধিক্য একটু বেশিই (আমাদের নরমসরম ঠাকুমা-দিদিমারা যা দেখে মুখ সেঁটকাতেন “কি খোট্টা বাপু”/ “ম্যাগোঃ কি হিন্দুস্তানী দেখতে”), কিন্তু যা দরদ দিয়ে গাইছেন তাতে চট করে সঞ্জীবকুমারকে মনে পড়ে যাবে, ঘুরে ঘুরে গেয়ে চলেছেন “মেরি ভিগি ভিগি সি।” কিন্তু মুশকিল হল,  অভিনেতা যুগলের (জানেন নিশ্চয় অ্যাকট্রস বলাটা এখন আউট অফ ফ্যাশন) কাউকেই আপনি চিনতে পারছেন না। সেটাই স্বাভাবিক কারণ জেবা এবং মহম্মদ আলি দু’জনেই পাকিস্তানের স্বর্ণযুগের নায়ক-নায়িকা! আমাদের চেনার কথা নয় যদিও ওপারে দিলীপ কুমার থেকে শুরু করে হালের রাজ কুমার যাদব সব্বাই বেজায় পরিচিত। কিন্তু একবার চোখ বন্ধ করে শুনুন ” অ্যায়সে ভি হ্যায় মেহেরবান, জিন্দেগী কি রাহো মেঁ/ যব মিলে তো ইয়ু মিলে য্যায়সে জানতে নহিন”। কি আশ্চর্য,  এত চেনা ভাষাতেই এরা কথা বলে? সুরটাও কি ভীষণ চেনা না? যেন শঙ্কর-জয়কিষেণের খাতা থেকে উঠে এসেছে। লিরিসিস্ট মসরুর আনোয়ারের কথা নাই শুনে থাকতে পারেন, সুরকার নিসার বাজমিই বা কে অথচ যিনি গান গাইছেন সেই আহমদ রুশদি কিন্তু পাকিস্তানের রফি, কি জানি কেন অত সুরেলা গলা এপারে এসে পৌঁছল না।

‘উর্দু’ শুনলেই এতদিন ধরে ঘাড় কিরকম ভয়জনিত শ্রদ্ধায় নুইয়ে যেত, ও বাবা – সহির লুধিয়ানভি, হসরত জয়পুরী, মজরু সুলতানপুরী, শাকিল বদায়ুনীদের ভাষা। ও ভাষায় লেখার জন্য নামটাও জবরদস্ত হওয়া দরকার, শুনলেই মনে হবে নিদেনপক্ষে একটা পারসিয়ান গালচে থাকা চাই, আর সঙ্গে ‘শাম কি দাওয়াই’; খাবারদাবার না জুটলেও চলবে (সহিরদের কথা আলাদা হতেও পারে তবে দু দেশেই উর্দু কবিরা মুঘল আমলের পর থেকে ঠিকঠাক খেতে পেতেন কিনা সে ব্যাপারে আমার  ঘোর সন্দেহ আছে)। আহমদ রুশদির গান শোনার পর থেকে সেই ভয়টা  অনেক কেটেছে, শুনলেই মনে হচ্ছে এ ভাষা শুধু  গুরু দাতের (আই মীন ‘দত্ত’) পরিশীলিত পার্সোনার সঙ্গেই ভালো যায় না, জয় মুখার্জ্জী সুলভ ক্ষ্যাপামোর জন্যও হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্বাস না  হলে, পাকিস্তানের প্রথম প্ল্যাটিনাম জুবিলী হিট সিনেমা ‘আরমান‘ এর গান ‘বেতাব হো উধার তুম’ শুনে নিন,

মনে হচ্ছে না, যেন পঞ্চাশ-ষাটের ভারতীয় সিনেমাই দেখছি? প্লটেও কি অসম্ভব সাদৃশ্য, মায় নায়কের ক্যাবলা বন্ধুর ক্যামিও পর্যন্ত (ভদ্রলোকের নাম নিরালা;  যারা হাসছেন প্লীজ ভুলে যাবেন না জয় মুখার্জ্জীর ছেলের নাম বয় মুখার্জ্জী)। ইউটিউব চালিয়ে অন্য ট্যাবে কাজ করতে করতে শুনুন, দিব্যি মনে হবে জয় বা ‘ফর্জ’-এর জিতেন্দ্র ঠোঁট নাড়িয়ে চলেছেন রফির জোশিলা গানের সঙ্গে।  আদতে কাজটা করেছেন পাকিস্তানের ‘এলভিস’, সুপারস্টার ওয়াহিদ মুরাদ 

zeba-waheed

তাই বলছিলাম  সিগারেট-বাট জুতোয় পেষণরত দেব আনন্দ, বরফে মোড়া ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া শাম্মী কাপুর কি স্টীয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে নৃত্যরত রাজেন্দ্রকুমারকে লক্ষ কোটিবার দেখে বোর হয়ে গেলেও চিন্তা নেই,  একটা অদেখা জগৎ এখনো অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। একটু কষ্ট করে বেড়াটা টপকাতে হবে, এই যা।

(স্থিরচিত্র উৎস – Cineplot.com)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s