এফেসাসে – ২

fish

পাথরে খোদাই চক্র দেখেই গাইডের মুখ বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। বারকতক বিড়বিড় করে কিসব বললেন, হাবেভাবে বুঝলাম ‘অকালকুষ্মান্ড’ ধরণের কিছু বলছেন, কাকে বলছেন সেটাই এখন প্রশ্ন। ভদ্রলোক আরকিওলজিতে দস্তুরমতন পি-এইচ-ডি করেছেন, তার পরেও পেটের দায়ে ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্টে একটা ডিগ্রী নিতে হয়েছে। সেই কারণেই কিনা কে জানে, সামান্য রগচটা আছেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “বুঝলেন তো, গ্রীকরা আমার কাছে ধাঁধা বিশেষ।” স্টেটমেন্টটা নিজেই আমার কাছে একটা  ধাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল কিন্তু ততক্ষণে দেখি ক্যাথলিক সহযাত্রীরা ভারী চঞ্চল হয়ে পড়েছেন। বাক্যবাগীশ গাইডের সামনে এতক্ষণ মুখ খোলার কেউ সাহস দেখান নি, এখন হঠাৎ চতুর্দিক থেকে জার্মান, স্প্যানিশে প্রচুর কিচিরমিচির। নেটিভ ইংলিশ স্পীকার কেউই নন, তবুও ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংলিশ থেকে বুঝলাম ক্রসের আগে খৃষ্টধর্মের প্রতীক ছিল মাছ; পাথরের ওপর মাছ দেখতে পেয়ে সবাই ভারী আহ্লাদিত। তার মধ্যেই গাইড বজ্রনিনাদে হাঁক ছাড়লেন “খামোশ”; সবাই তাকাতে প্রায় দাঁত খিঁচিয়ে বললেন “অত্ত মাছ মাছ করে লাফাবেন না, গ্রীক জেলেগুলোর ফাঁদা জালে পা দিলেই সর্বনাশ ।” “ভালো করে দেখুন, চক্রের মধ্যে পাঁচ খানা গ্রীক অক্ষর খুঁজে পাবেন –  আয়োটা, কাই, থীটা, উপ্সাইলন আর সিগমা। প্রশ্নটা হচ্ছে হঠাৎ এই পাঁচটা  অক্ষরকে নিয়ে কেন মাথা ঘামাব? কারণ, এগুলো একসঙ্গে একটা অ্যাক্রোনিম বিশেষ, পুরো কথাটা হল “Iesous Xristos Theou Yios Sotare” যার মানে ঈশ্বরের পুত্র যীশু খৃষ্ট রক্ষাকর্তা। এদিকে ΙΧΘΥΣ নিজে একটা শব্দ-ও বটে, ইকথাস – যার মানে মাছ। ব্যাস, বোকা গ্রীকগুলো যীশুর প্রশস্তিকে ভেবে নিল মাছের মেটাফর, সেই ট্র্যাডিশন এখনো চলছে।” সব্বাই গপ্পো শুনে মুগ্ধ, দলে ইস্ট এশিয়ান কেউ না থাকলেও ভারী হুড়োহুড়ি পড়ে গেল গাইডের সঙ্গে ছবি তোলার। তিনি অবশ্য এসব বালখিল্যতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে পা বাড়িয়েছেন  বুলুটেরিয়নের দিকে – যেখানে বসত এফেসাস কাউন্সিলের মীটিং, গানবাজনার আসর এবং সময় সময় নানা সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই সেখানে মাথা উঁচিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তিন পিলার – গ্রীক, রোমান এবং বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্যের তিন প্রতিভূ।

P

এর মধ্যেই দেখি সামনে এক খোদাই করা নারীমূর্তি , ঠিক যেন টেক-অফের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আর কয়েক সেকন্ডের মধ্যেই উড়ে যাবেন। নিশ্চয় ভাবছেন যে ইনি কোনো গ্রীক দেবী? ঠিকই ধরেছেন তবে নামটা শুনলে একটু চমকাতে পারেন। এনার নাম নাইকি! হ্যাঁ, এনার নামেই সেই বিখ্যাত জুতোর ব্র্যান্ড, যাকে ড্যান ওয়েইডেন (এবং অফ কোর্স মাইকেল জর্ডন) বিশ্ব জুড়ে চিনিয়েছেন ‘জাস্ট ডু ইট’ বলে। নাইকি কিন্তু শুরু হয়েছিল ‘ব্লু রিবন স্পোর্টস’ নাম দিয়ে;  সত্তর সালে এক জুতসই ব্র্যান্ডনেম খুঁজতে এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, কোনো প্রত্নতত্ত্বের ছাত্রের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে এবং জয়ের দেবী নাইকির নামে রাখা হয় ব্র্যান্ডের নাম। নাইকি হাঁটেন না, উড়েও বেড়ান না; জিরো গ্র্যাভিটিতে লাফিয়ে চললে যেরকম দাঁড়াবে, খানিকটা সেই ভঙ্গীতে মাটি ছুঁয়েই আবার সুপারম্যানের মতন শাঁ করে বেরিয়ে যান। মারভেল কি ডিসি কমিকস যদি একটা গপ্পো খাড়া করতে পারে, হলিউডের নজর এদিকে পড়তে বেশী দেরি হবে না। অ্যাডেড অ্যাডভান্টেজ, নাইকি প্রডিউসার-ও হয়ে যেতে পারে!

Nike

এর পরেই অবশ্য যাঁকে দেখলাম, তিনি বহুপরিচিত হলেও আরাধ্য দেবী হয়ে কোনোকালে বিরাজ করতেন একথা কস্মিনকালেও মনে হয়নি। আরাধনা বলতে চিরাচরিত অর্থে যা বুঝি তা না হলেও, যদি দেখেন যে সম্রাট হেড্রিয়ানের সম্মানে তৈরী মন্দিরের মূল তোরণে নানারকম ফুল এবং অ্যাকান্থাস লতার মধ্যে এনার মুখটি ফুটে আছে তবে আপনিও নিয্যস চমকাবেন। দূর থেকে হয়তো বুঝতেও পারবেন না, তারপর ক্যামেরার লেন্সে ফোকাস রেখে জুম করতে গিয়ে চমকে উঠবেন – আরে, চুলগুলো কিরকম যেন কিলবিলিয়ে নেমেছে! এনার চুল অবশ্য সর্বদা কিলবিলিয়ে নামত না, রেগে গেলে তবেই মাত্র।

medusa

মেডুসার রাগী মুখ তন্ময় হয়ে দেখতে গিয়ে ইঁটের পাঁজার ওপর একটু বেশীই ভর দিয়ে ফেলেছিলাম বোধহয়, বিজাতীয় ভাষায় প্রতিবাদ শুনে মাথা ঘুরিয়েই চক্ষুস্থির! তুর্কীর সর্বত্রবিরাজমান বেড়ালদের গল্প এই ব্লগেই আগে করেছি, কিন্তু তা বলে তাঁদের ঐতিহাসিক শহর এফেসাসেও খুঁজে পাব এতটা ভেবে উঠতে পারিনি। এলই বা কোত্থেকে, কিই বা খায় সে সব প্রশ্ন অবশ্যই মাথায় এল কিন্তু সবার আগে যেটা চোখে পড়ল সেটা হচ্ছে তাদের রাজকীয় মেজাজ, এফেসাসেস সার্বিক ভাবগম্ভীর পরিবেশে দিব্যি খাপ পেয়ে গেছে।

C

বেড়ালদের ছবি তুলতে গিয়ে একটু দেরি হচ্ছিল বোধহয়, গাইড দৌড়ে এলেন “চলুন চলুন, আপনার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে ওদিকে।” ভারী অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “কারা?” কারণ গাইডের আঙ্গুল যে দিকে দেখাচ্ছে, আমার সহযাত্রীরা তার ঠিক উল্টোদিকে রীতিমতন পোজ দিয়ে ছবি তুলছেন। গাইড হাসলেন, ভারী রহস্যময় হাসি “সেই তারা, যারা প্রত্যেকে আপনার জন্য হৃদয়ে ঠিক এক চিলতে জায়গা রেখে দিয়েছে। শুধু ওয়ালেটটা আনতে ভুলবেন না।”

Advertisements