এফেসাসে – ১

“অ্যামাজন ডট কম নামটা বেশ মজার,  বোকা বোকাও বলতে পারেন। আপনার কি মনে হয়?” শুধোলেন আমাদের গাইড। তাঁর অবিরাম বাক্যস্রোতে বেশ দিশাহারা বোধ করছিলাম, আকস্মিক এহেন প্রশ্নে থতমত খেয়ে বললাম, “কই না তো, সেরকম কিছু মনে হয় নি কখনো।” বলেই বুঝলাম এসব হল টোপ প্রশ্ন,  কিন্তু ততক্ষণে ভদ্রলোক বঁড়শিতে খপাত করে গেঁথে ফেলেছেন। বেশ আত্মপ্রসাদী একটা হাসি হেসে বললেন “আপনার দোষ নেই,  ওটার জন্য একটু ইতিহাস জানতে হবে।” শুনে একটু রাগ হল, যতই হোক ইতিহাস একমাত্র বিষয় যে পরীক্ষার খাতায় জীবনে আমাকে নিরাশ করেনি (যদিও সাল-তারিখ টারিখ বিশেষ মনে থাকে না, তাই ক্লাস টেনের টেস্টে প্রবালবাবু লিখে দিয়েছিলেন “আই ওয়ন্ট হিস্ট্রি, নট লিটারেচার”)। তেতো মুখ করে বলতে হল, “তাই নাকি? কিরকম?” বাকি সব শ্রোতার দিকে একবার চোখ  বুলিয়ে বললেন “অ্যামাজন কথাটার মানে হল উইদাউট এ ব্রেস্ট, একটি স্তনবিহীন মহিলা। নিশ্চয় ভাবছেন এরকম উদ্ভট মানে কেন?” বেঁচে থাকুক ভারতীয় ক্যুইজ ক্লাব, এবার আমার আপারহ্যান্ড নেওয়ার পালা “ওহ, তাই বলুন! আরে এ তো সেই দুর্ধর্ষ মহিলা যোদ্ধাজাত অ্যামাজনিয়ানদের নামে। যাঁরা তাঁদের তীরের নিশানা অভ্রান্ত করার জন্য একটি স্তন কেটে ফেলতেন, যাতে ধনুকের ছিলা টানার সময় হাত বুকের ওপর দিয়ে পিছলে চলে না যায়।” গাইড মোটেও প্রসন্ন হলেন না, “ও, জানেন তাহলে। কিন্তু এটা কি জানেন যে অ্যামাজনিয়ানরা মোটেও অ্যামাজন নদীর ধারেকাছে থাকতেন না, তাঁরা থাকতেন ব্ল্যাক সীর কাছে? আর তাঁদেরই গড়ে তোলা প্রথম উপনিবেশ দেখতে চলেছেন আপনারা, এফেসাস। তাহলে সুদূর দক্ষিণ আমেরিকায় নামটা গেল কি করে?” চিত্রালী পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, “হল এবার শান্তি? মিছিমিছি তুর্কীদের সঙ্গে টক্কর দিতে যাওয়া কেন বাপু?” বলতেই হল সে ব্যাপারে সম্যক ধারণা নেই। “শুনুন তাহলে – অন্ধ কবি হোমার জন্মেছিলেন শহর ইজমিরে, যেখান থেকে আপনারা রওনা দিলেন। এখন সেটা টার্কির মধ্যে হলেও বহু বহু বছর ধরে গ্রীক সাম্রাজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ শহর বলে পরিগণিত হত। এখানেই লিখেছিলেন (আক্ষরিক অর্থে অবশ্য হোমার লেখালেখির কাজটা করতে পারতেন না, অন্য কেউ সেটা করেছিল নিশ্চয়) ইলিয়াড আর ওডিসি। আর এই ইলিয়াডেই হোমার উল্লেখ করেছিলেন লেজেন্ডারি অ্যামাজনিয়ানদের,  লিখেছিলেন সমুদ্রের কাছেই গভীর জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ে কিভাবে তারা দিন গুজরান করতেন। স্প্যানিশ নাবিকরা যখন দক্ষিণ আমেরিকা অভিযানে বেরোন, তখন জাহাজে সময় কাটানোর জন্য তাদের পড়তে দেওয়া হয়েছিল হোমারের ইলিয়াড। অ্যামাজনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের মনে হয় আরে, এরকম জায়গাতেই তো অ্যামাজনিয়ানরা থাকত। সদ্য পড়ে উঠেছে ইলিয়াড, অ্যামাজন নদের নাম আর কিই বা রাখতে পারত তারা?”

মানতে হল জেফ বেজোস একটা ‘ ফ পা‘ করে ফেলছেন। কিন্তু তাতেই কি আর রেহাই মিলল? ভদ্রলোক মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন “আপনি অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন বললেন না? বলুন তো পৃথিবীতে সবথেকে লাভজনক কাজ কোনটা?” আবারো পরাজয় স্বীকার করতে হল। গাড়ীর জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন “কি দেখছেন?” “কেন, অলিভ গাছ।” “এই অলিভ চাষীরা বছর কতদিন কাজ করে জানেন? স্রেফ এক থেকে দু’মাস। আর অলিভের পৃথিবীজোড়া চাহিদার কথা নিশ্চয় জানেন,  তার সঙ্গে জেনে রাখুন টার্কি প্রথম তিনটে অলিভ উৎপাদনকারী দেশের অন্যতম। ফলে এই ক্ষেতখামারির মধ্যে হামেশাই বি-এম-ডব্লিউ, মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবেন।” আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবরে সত্যিই দরকার নেই তাও না জিজ্ঞাসা করে পারলাম না ” আর বছরের বাকি দশ মাস কি করেন ওঁরা?” ভদ্রলোক ব্যাজার মুখ করে বললেন “আর বলবেন না। এরা সবাই বংশানুক্রমে সুফী, দশ মাস ধরে ভালো ভালো কবিতা পড়ে; সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার মশাই। কে শুনেছে দশ মাস ধরে কাজ না করে কবিতা পড়া হচ্ছে?” আমিও শুনিনি কোনদিন, কিন্তু যারপরনাই চমৎকৃত  হলাম। অলিভ চাষীদের সৌভাগ্যের কথা ভাবতে ভাবতে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম, সেটা কাটল পাশের সুইস মহিলার “মা, মাগো” আর্তস্বর শুনে। চোখ খুলে দেখি এফেসাসে ঢোকার ঠিক আগে আমরা উপস্থিত হয়েছি পাহাড়ের ওপর ভার্জিন মেরীর মন্দিরে।

VM

ক্যাথলিক জনশ্রুতি অনুযায়ী যীশু ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর ইওহান (সেন্ট জন) মেরীকে নিয়ে আসেন করেসস পাহাড়ে এবং পাহাড়ের ওপর এক পাথুরে ঘরে মেরী আমৃত্যু থেকে যান। বুঝতেই পারছেন ‘আমৃত্যু’ ক্যাথলিকদের কাছে উপযুক্ত শব্দ নয়, তাঁদের কাছে এর নাম ‘Assumption‘। মেরীর ঘর বলে কথা, অলৌকিক কাহিনী এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। ছোট্ট পাথুরে ঘরের অনেকটা জুড়ে এক প্রার্থনা গৃহ (আপনি ধর্মবিশ্বাসী হোন বা না হোন,  যে কোনো চার্চে গেলেই যেরকম একটা প্রাণ জূড়নো শান্তি খুঁজে পান, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি), আর তার বাইরে বেশ যত্ন করে সাজিয়ে রাখা আছে অগুন্তি ক্রাচ। মেরীর আশীর্বাদে যেসব প্রতিবন্ধীদের আর ক্রাচের দরকার পড়েনি,  তাঁরা সেগুলো এখানে দিয়ে গেছেন – শেষটি নাকি জমা পড়েছে এই ২০০৬-এ। এমত অবস্থায় “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু” বলে ঘুরে দেখে নেওয়াটাই স্বাভাবিক; যুক্তিবাদী মন যাই বলুক না কেন নিজের ইচ্ছেয় যখন ঘুরতে এসেছি তখন অবশ্যম্ভাবী প্রশ্নগুলো ওখানে দাঁড়িয়ে তোলার সত্যিই কোনো অর্থ হয় না। বিশ্বাসের ব্যাপারটা আরোই জোরদার হয়ে দেখা দিল ‘উইশিং ওয়াল’ দেখে – কতশত মানুষ তাঁদের ইচ্ছাপূরণের জন্য চিলতে খানেক কাগজে কয়েক লাইন লিখে সেটা আটকে দিয়ে গেছেন এই দেওয়ালে। ছবি তুলতে গিয়ে খানিকটা আচম্বিতেই চোখে পড়ল কিছু আকুতি, প্রিয়জনের দুরারোগ্য ব্যাধিযন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছেন কেউ কেউ।

ww

উইশিং ওয়ালটা সহযাত্রীদের সবাই দেখেছেন, ফলত মুডটা একটু গ্লুমি। সেটা আন্দাজ করেই গাইড ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন “মনে করুন খ্রিষ্টপূর্বাব্দ দশম শতকে আপনি গ্রীক শহর এফেসাসে বসবাস করছেন। আপনার অবস্থাপত্র ভালোই, আপনাকে সেবা করার জন্য একজন ভৃত্য রয়েছে। বেজায় ঠান্ডার দিন, আপনার চাকরকে দিয়ে কোন কাজটা প্রথমে করাবেন আপনি?” কেউ বললেন সুপ বানাতে বলবেন, কেউ চাইলেন জল গরম করতে; কলম্বিয়ান এক মহিলা বললেন “তখনকার দিনে ডু নট ডিস্টার্ব বোর্ড ছিল? তাহলে ওটাই বেডরুমের দরজায় লাগিয়ে দিতে বলব।” গাইড বললেন “করতে পারেন এসব, তবে আদি অকৃত্রিম গ্রীকদের চাকরদের থেকে একটি বিশেষ সার্ভিসের দরকার ছিল।  মনে রাখা ভালো শীত হোক কি গ্রীষ্ম, গ্রীকরা মার্কেটপ্লেসে সময় কাটাতে বড্ড ভালোবাসতেন। তাই  বাজারের লাগোয়া ছিল পাবলিক টয়লেট, সারি সারি সিট এবং পাশাপাশি। কিন্তু শীতকালে মারবল পাথর পশ্চাৎদেশে ভালোই ছ্যাঁকা দেয়। সুতরাং, কি করণীয়?” হতভম্ব মুখগুলো দেখে নিজেই উত্তর দিলেন “চাকরদের আদেশ দেওয়া হত মনিবরা যাওয়ার আগে সিটে বসে সিট গরম করে দিতে হবে।” সারা গাড়ী জুড়ে রাম-রাম আর তওবা-তওবা। তারই মধ্যে আরো জানা গেল শৌখিন গ্রীকদের জন্য সেখানে মজুত থাকতেন মিউজিসিয়ানরা, উল্টোদিকে মুখ করে তারা বাজিয়ে চলতেন সুরেলা সব গত। ভেতরে থাকত লম্বা লম্বা থাম, আর থামের ওপরে থাকত লতিয়ে ওঠা সুগন্ধী সব ফুল। প্রাতঃকৃত্যতেও যে বেশ কিছু ইন্দ্রিয়ের আরাম  দরকার সেটা বলাই বাহুল্য, এবং গ্রীকরা বেশ বুঝেছিলেন সে কথা!

গ্রীকদের আদিখ্যেতা নিয়ে সাতকাহনের মধ্যেই পৌঁছে গেছি এফেসাস। যত সহজে লিখে ফেললাম ব্যাপারটা, তত সহজেও কিন্তু হৃদয়ঙ্গম হয়নি এফেসাসেস সামনে দাঁড়িয়ে, সত্যি পৌঁছলাম? সত্যিই দেখছি? সুমেরিয়ান, লিডিয়ান, পারসিয়ান, ভূকম্প সব সহ্য করে প্রায় তেরশ বছর ধরে ইতিহাসে ইতিহাসে সমৃদ্ধ হয়েছে এই শহর, শেষমেশ  ২৬২ খ্রীষ্টাব্দে গথদের আক্রমণে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বাইজান্টাইন এবং অটোমান রাজত্বের সময়েও এ শহরকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্ট হয়েছে কিন্তু আলেকজান্ডারের সোনার এফেসাসকে আর ফিরে পাওয়া যায়নি। পনেরশ শতক থেকে সেইসব প্রচেষ্টাও থেমে যায়। প্রত্নতাত্বিকরা নতুন করে একে খুঁজে পান আঠারশ শতকের শেষে। কাজ এখনো চলছে, পুরো এফেসাসেস দশ শতাংশ-ও ট্যুরিস্টদের আওতার বাইরে। এফেসাসেস রুক্ষ চালচিত্র দূর থেকে দেখেই মনে হল রাস্তার শুরুতেই একাকী গাছটার নিচে একটিবারের জন্য দাঁড়িয়ে নি। জানা গেল গাছটা মালবেরি, অনাদিকাল ধরে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে রেশমের গুটি চাষ উপলক্ষ্যে। আমার অবশ্য শুধুই মনে পড়ল মণীন্দ্র গুপ্তের অবিস্মরণীয় স্মৃতিকথা ‘অক্ষয় মালবেরি’। পাঠক, যদি বাংলা ভাষা আপনি ভালোবাসেন এ বই আপনাকে পড়তেই হবে। মণীন্দ্র গুপ্ত কবি, তিনি এ বইয়ে গদ্য লিখলেও আদতে বুনেছেন কবিতার জাল,  এঁকেছেন হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার মিঠে ছবি। কিন্তু অক্ষয় মালবেরি নিয়ে বিশদে যেতে পারলাম না এখন, কারণ মালবেরির নিচে দাঁড়াতেই চোখে পড়েছে গ্রীক অগোরা – কয়েকশ বছর ধরে ধার্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্যা-সুরাহায় গ্রীকরা মিলিত হতেন এখানে।

agora

সেই গ্রীক অগোরা – ডেমোক্র্যাসির আঁতুড়ঘর।

Advertisements