কাগজফুলের শহর

“আমার একটা মজার গল্প আছে,
মজাটা এই গল্পটা নেই কাছে।

জামার পকেটে গল্পটা ছিল গোঁজা,
একদিন গেল ধোপার বাড়িতে সোজা।

এখন  দেখছি গল্পটা ফুটে আছে,
সিঁড়ির নিচেই কাগজফুলের গাছে।”   (তারাপদ রায়)

আমার গল্পদেরকেও দেখলাম কাগজফুল হয়ে ফুটে থাকতে।  এসেছি ঘুমিয়ে পড়া গ্রীক ভিলেজ আলতেনকমে, বহু প্রাচীন অ্যাপোলো মন্দিরের কাছেই। পশ্চিম তুরস্কের এক প্রান্তে, গ্রীস-তুরস্কের সীমানার কাছেই এই গ্রাম। ইংরেজী কায়দায় হয়ত লোকে বলবে ‘টাউন’ কিন্তু সেকথা ধরবেন না। লোকে এখানে আসে সমুদ্র দেখতে, টারকোয়েজ রঙ্গীন জল আর সোনালী হলুদ বালির জন্য। দুপুরের খামোখা খেয়ালে মনে হল গ্রামটা ঘুরে দেখি। একজন পর্যটককেও চোখে পড়ল না, কিন্তু ভারী অবাক হয়ে দেখলাম সারা রাস্তা জুড়ে স্থানীয় লোকজনদেরও দেখা যাচ্ছে না। সমুদ্রের দিকটা কয়েকটা ছোট্ট জেলে-বোট জেটিতে আটকে থেকে অলস হাওয়ায় দুলছে। একটার মাস্তুলে দুখানা সী-গাল চুপটি করে বসে শুধু জল দেখছে, ভাবটা খানিক টুরিস্ট সুলভ-ই। দোষ দেওয়া যায় না,  ভারী মিঠে একটা রোদের সঙ্গে সমুদ্রের হাওয়ার এমন মজলিশি যুগলবন্দী তৈরী হয়েছে, মনে হবে এই শেষ স্টপ, সব ভুলে থেকে যাই। তবে দু’পেয়েদের কথা আলাদা, তারা একটু এবড়োখেবড়ো বীচের ওপরেই পিচ ঢালা মসৃণ রাস্তা ধরে হাঁটতেই থাকবে, হাঁটতেই থাকবে। আর কখনো সমুদ্রের দিক থেকে চোখ সরিয়ে রাস্তার উল্টোদিকে গ্রীক ভিলাগুলোর দিকে তাকালে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠতে পারে, কাশফুল। তখন হয়ত কিছুক্ষণের জন্য মনটা একটু আকুলিবিকুলি করতে পারে, চার’হাজার মাইল দূরের কোনো জনাকীর্ণ শহরে একবারের জন্য হলেও ছুটে যেতে, বারো বছর ধরে সে শহরে যাওয়া হয়নি এ মরশুমে।

c1

আর তক্ষুনি চোখ পড়বে কাগজফুল হয়ে ফুটে থাকা গল্পদের ওপর আর চিনচিনে ব্যথাটাও কোথায় হারিয়ে যাবে। বুগেনভিলিয়া এ শহরের প্রিয় ফুল, প্রত্যেকটা ভিলার সামনে-পিছনে কোথাও না কোথাও ঈষৎ গোলাপি আভা নিয়ে তারা ঝেঁপে এসেছে। পাঁচিল মানেই তো একটা অধিকারের প্রতীক, একটু দূরত্ব গড়ে দেওয়ার অদম্য চেষ্টা, একটা বিভাজন দাখিল করার অবিনম্র প্রয়াস। এই মানুষী ট্রেটগুলোকে ভুলিয়ে দিতে, বিত্তজনিত মালিকানাকে ক্যামোফ্লাজ করতে আপনার বেস্ট বেট ওই বুগেনভিলিয়া। বিশ্বাস করুন, সত্যি কাজ দেয়। তাই যে দু’পেয়ে সবজে নীল জলের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল আদেখলের মতন, সেও গুটি গুটি পায়ে রাস্তা ক্রস করে চলল তার গল্পদের কাছে। এক গল্প নিয়ে যায় আরেক গল্পের কাছে; এক গল্প দূরে দেখায় স্তব্ধ দুপুরে ইস্তানবুল থেকে ছুটি কাটাতে আসা দুই কিশোরী তাদের সামার রিসর্টের সামনে দোলনা বানিয়ে দুলছে। কিশোরী সুলভ বেণী মোটেই নেই, কিন্তু তাদের থেকে থেকে অযথা হাসি চিরকালীন। ক্ষণিকের আগন্তুককে দেখে তারা থমকায়, তারপর মোটেই পাত্তা না দিয়ে শুরু হয় কথা চালাচালি, কত্ত কত্ত কথা – সব রাখা ছিল ছুটির দিনের এই নিশ্চুপ দুপুরের জন্য। আরেক গল্প ভালোবাসে একটু সাসপেন্স তৈরী করতে, পাতা ঝরঝরিয়ে বলল বাড়ির পেছনের চড়াই-উতরাই এর দিকে যেতে, ব্যাস শুধু ওইটুকুই। হাঁটতে হাঁটতে এল এক ঝুরঝুরে বাড়ী, তার ঘুলঘুলি দেখলেই বোঝা যায় এ গ্রামের প্রাচীনতমদের মধ্যে পড়ে সে, হাল ফ্যাশনের লাল টালিওলা ভিলারাও জানে তার কথা। উঠোনের দু’দিকে তার দুই দেওয়াল, একটা জালি জালি ফ্রেম আটকে রয়েছে দুই দেওয়ালের মধ্যে। আর তাতে লতিয়ে লতিয়ে উঠেছে আঙ্গুর গাছ, থোকা থোকা কালো আঙুর। কৌতূহলী চোখ দেখে প্রাচীন বাড়ীর প্রাচীনা মালকিন বেরিয়ে এসেছিলেন। চুপ দুপুরের মায়াবী রূপকথা সত্যি করে তিনি সেই দেশী ঠাকুমা, সেই অজস্র বলিরেখা, সেই ফোকলা হাসি, আর সেই প্রশ্রয়দাত্রী চাউনি। আমি চিনি সেই চাউনি, গলা ব্যথা ব্যথা হওয়ার আগেই তাই  ঢালু রাস্তা দিয়ে নেমে গেলাম। রাস্তা দিয়ে নামতে নামতে শুনি আবার কিসের ফিসফাস, ঝেঁপে ওঠা কাগজফুলদের গল্প ফুরনোর নয় । চোখে পড়ল বাতাসবাড়ির গম্বুজ।

IMG_5911

সেই নাম না জানা কোন কালে তৈরী হয়েছিল এ গম্বুজ, মান্ধাতার আমলের স্পিনিং হুইলে বয়ে যেত মৃদুমন্দ হাওয়া। এখন আর কোন কাজে লাগে তাকে? শুধোলাম, কোনো উত্তর এল না। পাতা ঝরার বেলায় মনে হল কাগজফুলদের গল্প বলা শেষ হয়েছে। একটু বিসদৃশ ঠেকল, কিন্তু কি আর করা। বাতাসবাড়ির গম্বুজকিনারে এসে বুঝলাম ভুল হয়েছে, দোষ আমার। বাতাসবাড়ির সত্যিই কোনো কাজ নেই, এখন-ও নেই, তখন-ও ছিল না। কিন্তু সব স্থাপত্য কি কাজ মাপার জন্য হয়?  পাহাড়চূড়ায় লম্বা লম্বা গাছেদের মধ্যে বাতাসবাড়ি রয়ে গেছে শুধু রোমান্সের জন্য। কবি, ভাবুক, ক্ষণিকের অতিথিদের মনগড়া রোমান্স নয়,  এ আক্ষরিক, খাঁটি  রোমান্স। তরুণীর একঢাল পিঠখোলা চুল রেড ফ্ল্যাগ তুলে রেখেছে, তাই জন্যই তার পিঠ আমার দিকে; তার সঙ্গী কি করছে সে কথা আমার জানার নয়, কারোরই জানার নয় – এ দুপুরটা শুধুই তাদের। ঘুমিয়ে থাকা আলতেনকমে তারা পড়ে পাওয়া সুযোগ নেয় না,  তাদের গন্তব্য অন্যত্র।

কাগজফুলের শহর অপেক্ষা করে আছে এখনো, চলে যান। অন্তত একটা দুপুরের জন্য হলেও,  তাড়াতাড়িই – কে জানে কখন কর্মব্যস্ত পৃথিবীর খেয়ালে আরেকটা গ্লোবালাইজড টুরিস্ট স্পটের আইডিয়া ভেসে আসে টারকোয়েজ জল ধরে সোনালী বালির তীরে।

Advertisements