সেদিন

অঝোরে বরফ ঝরে চলেছে বাইরে, সাইপ্রেস আর ওয়ালনাট গাছগুলো বরফের ভার সহ্য করতে না পেরে প্রায় নুইয়ে পড়ে পড়ে। ঘরের ভেতর একদল যুবাপুরুষ মুগ্ধদৃষ্টিতে  সেদিকেই তাকিয়ে, ফায়ারপ্লেসের লাল আভায় সবার ত্বকই বড় আশ্চর্যরকম কমনীয় লাগছে। এ তন্দ্রিম আলস্য ভাঙ্গতেই বোধহয় মৃদু স্বরে জানের অনুমতি চাইলেন “বন্ধুগণ, তাহলে আহুতি শুরু হোক?”

“হোক, হোক” ঘরের চারকোণ থেকে ভেসে এল সম্মতি, কিছু যুবা উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ালেন।

জোব্বার ভেতর থেকে, চামড়ার সুদৃশ্য চৌকোণা খাপের অন্দরমহল  থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল একটি-দুটি করে বই। সারি সারি অক্ষর বসানো মালগাড়ীর মতন বয়ে যাওয়া লাইনগুলো দেখে কেউ কেউ ঘৃণায় মুখ বিকৃত করলেন। একজোড়া, দু’জোড়া, বহু জোড়া হাত ফেলে দিতে লাগল সেই সব বই আগুনের মধ্যে।

বুরাক ফিরে এসে আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বসলেন, “শান্তি! সেহফলার চারসিসেতে আর এসব ছিল না। এ আপদ যত কম আসে তত ভালো।” জেনার হাসলেন, “আর এলেও তোমরা জান কি করতে হবে।”   আলতো হাসিতে ঘর ভরে গেল, সবাই সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। দেমিরহান অপেক্ষাকৃত কম বয়সী, তাই অস্থিরতাটাও বেশী। সে বলে উঠল, “আর তাহলে দেরী কেন? এবার শুরু করা যাক।” বুরাক বললেন “সবুর, সবুর। আগে ধোঁয়া উঠিয়ে সে আসুক, এক এক কণায় প্রাণ হয়ে উঠুক মধুময়, রক্তবিন্দুতে ছড়িয়ে পড়ুক উত্তাপ। তবে না শুরু হবে আরাধনা?”

মেহমেতের আজকেই প্রথম দিন , সে চুপি চুপি দেমিরহানকে শুধলো “কি রে, সেই হিন্দিস্থানী চায়?” দেমিরহান মুখ কুঁচকোতে বলল, “তবে কি  ইরানী শরাব?” দেমিরহান হেসে উঠল “শুনুন কথা, মেহমেত  পারস্যের মদ আসবে ভেবেছে।” সবার অল্পবিস্তর বিস্মিত হলেও তখনি খেয়াল পড়ল মেহমেতের আজ প্রথম দিন। জানের প্রশ্রয়ের সুরে বললেন “সে তো থাকলই রাতের জন্য। কিন্তু আরাধনার আগে কি অত উত্তেজনা ভালো?” আর এক প্রস্থ হাসি, আর তক্ষুনি ঘরের বাইরের বিশাল মারবল বারান্দা দিয়ে টুংটাং শব্দ ছড়িয়ে কারা যেন এদিকেই আসতে শুরু করল।

গৃহকর্তার দুই খানসামা ঢুকে ইজমির থেকে আনা পাথরের টেবলে সাজিয়ে রাখতে শুরু করল সুদৃশ্য সব বাটি, আর তার সঙ্গে নিখুঁত কাজ করা ছোট্ট ছোট্ট চামচ। আর নিহাত, জেনারের ‘ম্যান ফ্রাইডে’ এসে তাঁর হাতে তুলে দিল মরোক্কান চামড়ায় বাঁধান ‘ধর্মগ্রন্থ’টি। সুগন্ধী হালোয়ার গন্ধ ঘ্রাণান্দ্রিয়কে উত্তেজিত করে তুলেছিল, জেনারের কথায় সবাই সম্বিত ফিরে পেলেন “মনে আছে তো? এ বছর রুমি দিয়ে শুরু।” সবাই হৈহৈ করে উঠল, দেমিরহান হাত তুলে বলল “আমি পড়ি? আমি?”

মেহমেতের কাঁধে বুরাক হাত রাখলেন। মেহমেত সচকিতে তাকাতেই বললেন “এর অপেক্ষাতেই তো বেঁচেছিলে, তাই না?” ততক্ষণে জানেরের মন্দ্রস্বরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে ভালোবাসার ওম “অ্যায় দোউস্ত, বে-দোউস্তি কারিনিম তো রাহ/ হর যা কে কদম নহি জামিনিম তো রাহ…” বন্ধুর পদক্ষেপের উত্তাপটুকু শুষে নিয়ে গাঢ় হচ্ছে মাটির রং।

আজ ইরমিইকিঞ্জি আরালিক, বাইশে ডিসেম্বর। সাতদিন ধরে চলবে এই হালভা সহবতলেরি, কাব্যচর্চা আর বন্ধুত্বের গুঞ্জন, সঙ্গে রইবে ছোট্ট চামচে করে তুলে নেওয়ার জন্য রাখা মিঠে সঙ্গত। এক এক দিন এক এক বন্ধু ডেকে নিয়ে যাবেন। তারপর বরফ ঝরার দিন শেষ হলে আরেকবার সবাই মিলিত হবেন, এ বছরের গ্র্যান্ড ফিনালের জন্য। কবিতা পড়ে, কবিতা শুনিয়ে  কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যেতে চেষ্টা করবেন নশ্বর জীবনের উপদ্রবগুলিকে, যেমন গদ্য’সাহিত্য’।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s