রোববার, বেড়া টপকিয়ে

ওই দেখুন, নায়িকা সবুজ লনে পাতা চেয়ারে বসে আড়চোখে কটাক্ষ হানছেন! মধ্যবয়সী নায়ক সেসব দেখেও খেলা আরো জমানোর জন্য নায়িকার বন্ধুর চেয়ারে হাত রেখে একটু  ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছেন। গেম থিয়োরীতে যাকে বলে কমন বিলিফ, এ হল তাই। নায়িকা জানেন গোপন খবরটি, নায়ক জানেন যে নায়িকা জানেন, নায়িকা জানেন যে নায়ক জানেন যে নায়িকা জানেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তাবৎ দর্শককুল যাতে এত কমপ্লিকেটেড ব্যাপারস্যপার বুঝতে পারেন, সেটা জলবৎ তরলম করার জন্য ডিরেক্টর বা সিনেমাটোগ্রাফার মাঝে মাঝেই ক্লোজ-আপে নিয়ে আসছেন নায়িকার থরোথরো মুখটি, নিচের ঠোঁটটি আলতো করে কামড়ে ধরে তিনি ফুঁসে উঠছেন থেকে থেকে।

যদিও নায়িকা রেগে আছেন কিন্তু ওই থরোথরো ভাব দেখে আপনার মনে পড়ে যাবে ‘যব যব ফুল খিলে’-র নন্দাকে, যেন ছুঁলেই উত্তেজনার আধিক্যে এক্ষুনি মাটিতে লুটিয়ে পড়বেন; যদিও নায়কের মুখমন্ডলে উত্তর ভারতীয় সুলভ পৌরুষের আধিক্য একটু বেশিই (আমাদের নরমসরম ঠাকুমা-দিদিমারা যা দেখে মুখ সেঁটকাতেন “কি খোট্টা বাপু”/ “ম্যাগোঃ কি হিন্দুস্তানী দেখতে”), কিন্তু যা দরদ দিয়ে গাইছেন তাতে চট করে সঞ্জীবকুমারকে মনে পড়ে যাবে, ঘুরে ঘুরে গেয়ে চলেছেন “মেরি ভিগি ভিগি সি।” কিন্তু মুশকিল হল,  অভিনেতা যুগলের (জানেন নিশ্চয় অ্যাকট্রস বলাটা এখন আউট অফ ফ্যাশন) কাউকেই আপনি চিনতে পারছেন না। সেটাই স্বাভাবিক কারণ জেবা এবং মহম্মদ আলি দু’জনেই পাকিস্তানের স্বর্ণযুগের নায়ক-নায়িকা! আমাদের চেনার কথা নয় যদিও ওপারে দিলীপ কুমার থেকে শুরু করে হালের রাজ কুমার যাদব সব্বাই বেজায় পরিচিত। কিন্তু একবার চোখ বন্ধ করে শুনুন ” অ্যায়সে ভি হ্যায় মেহেরবান, জিন্দেগী কি রাহো মেঁ/ যব মিলে তো ইয়ু মিলে য্যায়সে জানতে নহিন”। কি আশ্চর্য,  এত চেনা ভাষাতেই এরা কথা বলে? সুরটাও কি ভীষণ চেনা না? যেন শঙ্কর-জয়কিষেণের খাতা থেকে উঠে এসেছে। লিরিসিস্ট মসরুর আনোয়ারের কথা নাই শুনে থাকতে পারেন, সুরকার নিসার বাজমিই বা কে অথচ যিনি গান গাইছেন সেই আহমদ রুশদি কিন্তু পাকিস্তানের রফি, কি জানি কেন অত সুরেলা গলা এপারে এসে পৌঁছল না।

‘উর্দু’ শুনলেই এতদিন ধরে ঘাড় কিরকম ভয়জনিত শ্রদ্ধায় নুইয়ে যেত, ও বাবা – সহির লুধিয়ানভি, হসরত জয়পুরী, মজরু সুলতানপুরী, শাকিল বদায়ুনীদের ভাষা। ও ভাষায় লেখার জন্য নামটাও জবরদস্ত হওয়া দরকার, শুনলেই মনে হবে নিদেনপক্ষে একটা পারসিয়ান গালচে থাকা চাই, আর সঙ্গে ‘শাম কি দাওয়াই’; খাবারদাবার না জুটলেও চলবে (সহিরদের কথা আলাদা হতেও পারে তবে দু দেশেই উর্দু কবিরা মুঘল আমলের পর থেকে ঠিকঠাক খেতে পেতেন কিনা সে ব্যাপারে আমার  ঘোর সন্দেহ আছে)। আহমদ রুশদির গান শোনার পর থেকে সেই ভয়টা  অনেক কেটেছে, শুনলেই মনে হচ্ছে এ ভাষা শুধু  গুরু দাতের (আই মীন ‘দত্ত’) পরিশীলিত পার্সোনার সঙ্গেই ভালো যায় না, জয় মুখার্জ্জী সুলভ ক্ষ্যাপামোর জন্যও হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্বাস না  হলে, পাকিস্তানের প্রথম প্ল্যাটিনাম জুবিলী হিট সিনেমা ‘আরমান‘ এর গান ‘বেতাব হো উধার তুম’ শুনে নিন,

মনে হচ্ছে না, যেন পঞ্চাশ-ষাটের ভারতীয় সিনেমাই দেখছি? প্লটেও কি অসম্ভব সাদৃশ্য, মায় নায়কের ক্যাবলা বন্ধুর ক্যামিও পর্যন্ত (ভদ্রলোকের নাম নিরালা;  যারা হাসছেন প্লীজ ভুলে যাবেন না জয় মুখার্জ্জীর ছেলের নাম বয় মুখার্জ্জী)। ইউটিউব চালিয়ে অন্য ট্যাবে কাজ করতে করতে শুনুন, দিব্যি মনে হবে জয় বা ‘ফর্জ’-এর জিতেন্দ্র ঠোঁট নাড়িয়ে চলেছেন রফির জোশিলা গানের সঙ্গে।  আদতে কাজটা করেছেন পাকিস্তানের ‘এলভিস’, সুপারস্টার ওয়াহিদ মুরাদ 

zeba-waheed

তাই বলছিলাম  সিগারেট-বাট জুতোয় পেষণরত দেব আনন্দ, বরফে মোড়া ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া শাম্মী কাপুর কি স্টীয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে নৃত্যরত রাজেন্দ্রকুমারকে লক্ষ কোটিবার দেখে বোর হয়ে গেলেও চিন্তা নেই,  একটা অদেখা জগৎ এখনো অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। একটু কষ্ট করে বেড়াটা টপকাতে হবে, এই যা।

(স্থিরচিত্র উৎস – Cineplot.com)

Advertisements

মান্না দে

অনেক কিছুর মতনই গানের ব্যাপারেও বাবা আর মার পছন্দের বিস্তর ফারাক দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি। মা নজরুল-গীতিতে রীতিমতন তালিম পেয়েছেন, পূরবী দত্তের গান ওনার ভারী পছন্দের; রান্না করতে করতে হয়ত গুনগুনিয়ে উঠলেন “কাবার জিয়ারতে তুমি কে যাও মদিনায়/ আমার সালাম পৌঁছে দিও নবীজীর রওজায়”। সামান্য বিস্মৃত বাংলা আধুনিক গান-ও মার খুব পছন্দের, সন্ধ্যাবেলায় টিভি দেখতে দেখতে হয়ত দু’কলি গেয়ে উঠলেন “বন্ধু তোমার আসার আশাতে, বসে আছি সাঁঝরাতে, তবু তোমার দেখা মেলে না” ইত্যাদি। বাবা মুড ভালো থাকলে তবেই গান, মেনলি কিশোরকুমার; লিরিক্স প্রায়শই গুলিয়ে ফেলেন (নিজে বানিয়েও নেন কখনোসখনো) কিন্তু ইয়োডলিং টা চমৎকার করেন আর অ্যামেচারিশ গলাতেও ‘মস্তি’টা ভালোই টের পাওয়া যায় – রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে শুনিনি কোনোদিন, নজরুল বা ধ্রুপদী সঙ্গীতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।কিন্তু একজনের গান শুনতে দুজনেই অসম্ভব ভালোবাসেন, তিনি মান্না দে। মান্না দের ক্লাসিকাল গান শুনতে শুনতে মা একশো কোটি বার আক্ষেপ করেছেন “একটা দিনের জন্যও যদি ওনার পায়ের কাছে বসে শুধু গান শুনতে পারতাম”; কলকাতার ঘ্যামপ্যাচপেচে সন্ধ্যায় রেয়ারলি যখন বাবাকে অসম্ভব জোভিয়াল মুডে পেতাম, তখনো সঙ্গে সেই মান্না-ই। “কাশ্মীরে নয় শিলঙে-ও নয়” গানের প্রথম স্ট্যাঞ্জাটা গেয়ে যখন “রয়েছে কাছে এইখানে এই, মনে এই, প্রাণে এই” বলে শেষ করতেন, মুখটা বড্ড খুশী খুশী লাগত।

কিন্তু শুধু পারিবারিক সুখের মুহূর্তগুলো তৈরী করার জন্যই মান্না দে আমার সারাটা জীবন জুড়ে রয়ে যাবেন, একথা বললে সত্যের একটু অপলাপ হবে। মান্না দে কে আমিও খুঁজে পেয়েছি নিজের মতন করে, বারবার। ছ-সাত বছর থেকেই আমি বেজায় ঘরকুনো, ভাড়া বাড়ীর একতলায় এক চিলতে একটা ঘরে বসে শুধু বই পড়তাম, অগুন্তি বই – লীলা মজুমদার, সত্যজিত, শরৎ, বঙ্কিম, লুকিয়ে লুকিয়ে ঠাকুমার জন্য আসা নবকল্লোল। মার নতুন ওয়াকম্যানটা আসার পর ঝোঁক চাপল ওয়াকম্যান কানে গুঁজে বই পড়ার (কম বয়সেই মাল্টিটাস্কিং ভালো পারতাম, সাইকোলজির থিয়োরী অভ্রান্ত প্রমাণিত করে এখন আর পারি না)। গোনাগুনতি কিছু ক্যাসেট ছিল, লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে লতা মঙ্গেশকরের অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং, হেমন্তর “কোনো এক গাঁয়ের বধূ”, বেশ কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত – নজরুল গীতি আর, আর সুধীন দাশগুপ্তের সুরে তৈরী হওয়া মান্না দের গানের সঙ্কলন। ভাগ্যিস! দুপুরের পর দুপুর কেটে গেছে ওই একটা ক্যাসেট শুনে শুনে, যেমনটি করে মান্না আর সুধীন আমাকে হিপনোটাইজড করে ফেলেছিলেন তেমনটি করে কেউ পারেননি। ২০০২-এ হঠাৎ নেট দুনিয়ার খুঁজে পেয়েছিলাম জার্মানি প্রবাসী তিমিরকান্তি গাঙ্গুলীর ওয়েবসাইট, যেখানে তিনি শোনার জন্য তুলে রেখেছিলেন মান্না দের অসংখ্য বাংলা গান। তখনো ইউটিউব দূর অস্ত, মিউজিকইন্ডিয়া অনলাইন বলিউড নিয়েই ব্যস্ত, রাগা-র মতন ওয়েবসাইট তখনো জন্ম নেয়নি, – আমার এক্সাইটমেন্টটা একবার ভাবুন। বহুদিন ধরে তিমিরবাবুর ওয়েবসাইট ভারী আরাম দিয়েছে, সময় কম থাকলে বেছে বেছে মান্না-সুধীনের কম্বিনেশনের গানগুলোই শুধু শুনতাম, ততদিনে মোটামুটি সে লিস্ট আমার কন্ঠস্থ হয়ে গেছে। আমার ব্যক্তিগত মত – ক্যাজুয়াল গান শুনিয়েদের জন্য মান্না আর সুধীনের জুড়ি বাংলা গানের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা। বাঙ্গালী মেলোডি ভালোবাসে, আর সেই মেলোডিকে সুধীন আর মান্না যে উত্তুঙ্গ শিখরে পৌঁছে দিয়ে গেছেন, তাকে স্পর্শ করাও প্রায় কল্পনাতীত ব্যাপার। আর এই কথাটা উঠলেই মনটা আরো একটা কারণে খারাপ হয়ে যায় – পুজোর গান, একটা অসামান্য ঐতিহ্যময় ট্র্যাডিশন যা আমরা ধরে রাখতে পারলাম না।

সুধীন দাশগুপ্তের সুরে মান্না প্রথম গান গেয়েছিলেন ১৯৫৯ এর পুজোতে, বেরিয়েছিল “একই অঙ্গে এত রূপ” আর “মেঘলা মেয়ে মেঘেরই”। ষাট দশকটা ছিল সত্যিই সোনার সময়, সুধীনের সুরে ওনার থেকে পেয়েছি বহু গান, “এক ঝাঁক পাখিদের মতো কিছু রোদ্দুর”, “আমি তার ঠিকানা রাখিনি”, “কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায়” ইত্যাদি। মান্না দের নিজের প্রিয় গান ছিল অবশ্য “চার দেওয়ালের মধ্যে নানান দৃশ্যকে”। বহু বছর ধরে অবাক হয়ে দেখেছি নতুন শোনা যে গানের মেলোডি মনকে মাতিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, তার প্রায় প্রত্যেকটার সুর (কখনো কথা-ও) সুধীনের, আর অফ কোর্স মান্না ছাড়া কে গাইবেন সেই গান?  বাংলা রোম্যান্টিক গানের ইতিবৃত্ত লিখতে বসলে বলা বাহুল্য যে মান্না-সুধীনের গানগুলো অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকবে। হয়ত কবীর সুমনের মতন নতুনধারার রোম্যান্টিক গান তখনও ওনারা দিতে পারেননি কিন্তু যে গানগুলো দু’জনে মিলে তৈরী করেছেন সেগুলো ফুল-চাঁদ-পাখির বাইরে গিয়েই করা। আর যদি নিতান্তই কিছু ট্যাগ লাগাতে হয় তাহলে হয়ত বলতে হবে আদিগন্ত আকাশ, হারিয়ে যাওয়া রাস্তা, নিভৃতে নীরবে –  ক্ষতি কি? এসব তো আর ফিরে পাব না, ওনাদের গানেই একরাশ স্মৃতিমেদুরতা নিয়ে বেঁচে থাকুক। বেঁচে থাকুক তিন ভুবনের পারে, প্রথম কদমফুল, ছদ্মবেশী, পিকনিক এর গান, আমার মতন নিশ্চয় আরো অনেক বাঙ্গালী আছেন যাঁরা মেলোডির জন্য বাঁচেন। আর মেলোডির কথা বাদ দিলেও মান্না দের কাজের ধারা বহুবিস্তৃত, সে নিয়ে বিশদে যাওয়ার দরকার দেখি না এহেন ছুটকো এবং উটকো স্মৃতিতর্পণে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা অবশ্য না লিখে পারছি না, পড়োশনের ‘এক চতুরনার’ বলতেই আমরা যেরকম কিশোরের কাজ নিয়ে হইহই করে উঠি, সেটা নিতান্তই আনফেয়ার; মান্না দে-র ওই অসাধারণ ধ্রুপদী সঙ্গত না থাকলে আমার ধারণা গানটা এরকম কালজয়ী হয়ে হয়ত উঠত না। মনমেজাজ খারাপ থাকলে ক্লাসিক বলিউড হেনতেন ভুলে রাগটা গিয়ে পড়ে মেহমুদের অবিশ্বাস্য রকম খারাপ ভাঁড়ামো কিম্বা সায়রা বানুর গায়ে রি-রি ধরানো ন্যাকামোর ওপর(সময় সময় কিশোরের লম্পট চুল কি সুনীল দত্তের কদমছাঁট দেখেও), তখন একমাত্র সেভিং গ্রেস মান্নার গলা। ভাগ্যিস, সুলোচনা রাজি করিয়েছিলেন গানটা গাওয়ার জন্য! মুডি মান্না প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না কিশোরের সঙ্গে ডুয়েট গাইতে, দৃশ্যায়ণটি নিয়ে বেশ আপত্তি ছিল ওনার।

বই-খবরের কাগজ-জনশ্রুতি থেকে মান্না দে কে আমার একটু উন্নাসিক মনে হয়েছে, মনে হয়েছে একটু দূরত্ব রেখে চলতে ভালোবাসতেন। রাজা ভোজ হোক কি গঙ্গু তেলি, সবাই যখন উত্তম-উত্তম করে হেদিয়ে মরছে, মান্না দে কোনোদিন ‘উত্তমবাবু’ ছাড়া অন্য কোনো সম্বোধনের মধ্যেই যান নি। সুধীন প্রসঙ্গে মান্নার বাইট পাওয়ার জন্য এত বছরের আকুতি শুনে শুনেও শুধুই বলেছেন “সুধীনবাবু অভিজ্ঞ এবং গুণী মানুষ ছিলেন”। ইমোশনের বাহুল্য কোনোদিন খুঁজে পাইনি মান্না দের ইন্টারভিউয়ে (একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ওনার স্ত্রীর প্রসঙ্গ, এবং যথার্থ কারণেই; আর পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মহত্যা করার পরেও একটা হাহাকার খুঁজে পেয়েছিলাম), তাই আলাদা সম্ভ্রম-ও তৈরী হয়েছিল ওনার জন্য। একবার, শুধু একবারই সেটা একটু টাল খায় মান্না দের একটা সাক্ষাৎকার পড়ে, যেখানে হেমন্তকে নিয়ে সামান্য অসূয়ার আভাস খুঁজে পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল কোনো দরকার ছিল না, মনে হয়েছিল বলি আপনি হয়ত এখনো জানেন না কতটা ভালোবাসা বাঙ্গালী (এবং বাকি ভারতীয়রাও) রেখে দিয়েছে আপনার জন্য, মনে হয়েছিল মার অভিজ্ঞতাটা একবার ওনার ৯ মদন ঘোষ লেনের বাড়িতে চিঠি লিখে জানাই – নেতাজী ইন্ডোরে আপনার গানের প্রোগ্রাম ক্যান্সেল হয়ে গেলে কত মানুষ আক্ষরিক অর্থে কাঁদতে কাঁদতে ফিরেছেন শুধু আপনার গান শুনতে পাননি বলে; জলে যাওয়া টাকা, দূরত্ব, লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা কোনোকিছুই এর থেকে বেশী অসহনীয় ছিল না তাঁদের কাছে।

মান্না দের আরো কিছু সাক্ষাৎকার পড়ে সাম্প্রতিক কালে আরো মনে হয়েছে টলিউডে ওনার জয়যাত্রা খুব স্মুদলি হয়ে ওঠেনি, আর সে নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ ওনার মধ্যে অনেককাল ছিল। অবাক হয়ে ভেবেছি এরকম একজন শিল্পীকেও কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাহলে, পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থা তাহলে প্রায় সর্বজনসত্য। কিন্তু ‘Bitterest man in the living room’ –ও যদি একজন শিল্পী হন, শিল্পসৃষ্টির কালটিই তাঁর সব থেকে মহৎ মুহূর্ত। আমি নিশ্চিত মান্না দে শেষ জীবন অবধি বেঁচে ছিলেন এরকম মুহূর্ত গুলোতেই, কদাচিৎ ক্ষোভপ্রকাশ গুলো ধর্তব্যের মধ্যে আসে না। আর যদি নেহাতই তর্কের খাতিরে ধরতে হয়-ও, তাহলে অমিয়নাথ সান্যালকে (‘স্মৃতির অতলে’)স্মরণ করতে হয় – “অহঙ্কার আর অভিমান আছে বলেই দলিল লিখে যেতে পেরেছি”।

আজ অনেক বাড়িতেই প্রায় নিরম্বু উপবাস, কিন্তু অতিলৌকিক জগতের অস্তিত্ব থাকলে কে জানে মান্না হয়ত জমিয়ে মাংসই রেঁধে ফেলতেন, আর ডাইনিং টেবলে সোৎসাহে অপেক্ষা করতে করতে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়  গল্প  জুড়তেন সুধীন দাশগুপ্তের সঙ্গে – বহুদিন পর ‘ভজহরি মান্না’ ফিরেছেন যে,  টুপি সমেত।

msp

(স্থিরচিত্র উৎস – ‘কথায় কথায় রাত হয়ে যায়’ – পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়; আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৯)

এফেসাসে – ২

fish

পাথরে খোদাই চক্র দেখেই গাইডের মুখ বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। বারকতক বিড়বিড় করে কিসব বললেন, হাবেভাবে বুঝলাম ‘অকালকুষ্মান্ড’ ধরণের কিছু বলছেন, কাকে বলছেন সেটাই এখন প্রশ্ন। ভদ্রলোক আরকিওলজিতে দস্তুরমতন পি-এইচ-ডি করেছেন, তার পরেও পেটের দায়ে ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্টে একটা ডিগ্রী নিতে হয়েছে। সেই কারণেই কিনা কে জানে, সামান্য রগচটা আছেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “বুঝলেন তো, গ্রীকরা আমার কাছে ধাঁধা বিশেষ।” স্টেটমেন্টটা নিজেই আমার কাছে একটা  ধাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল কিন্তু ততক্ষণে দেখি ক্যাথলিক সহযাত্রীরা ভারী চঞ্চল হয়ে পড়েছেন। বাক্যবাগীশ গাইডের সামনে এতক্ষণ মুখ খোলার কেউ সাহস দেখান নি, এখন হঠাৎ চতুর্দিক থেকে জার্মান, স্প্যানিশে প্রচুর কিচিরমিচির। নেটিভ ইংলিশ স্পীকার কেউই নন, তবুও ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংলিশ থেকে বুঝলাম ক্রসের আগে খৃষ্টধর্মের প্রতীক ছিল মাছ; পাথরের ওপর মাছ দেখতে পেয়ে সবাই ভারী আহ্লাদিত। তার মধ্যেই গাইড বজ্রনিনাদে হাঁক ছাড়লেন “খামোশ”; সবাই তাকাতে প্রায় দাঁত খিঁচিয়ে বললেন “অত্ত মাছ মাছ করে লাফাবেন না, গ্রীক জেলেগুলোর ফাঁদা জালে পা দিলেই সর্বনাশ ।” “ভালো করে দেখুন, চক্রের মধ্যে পাঁচ খানা গ্রীক অক্ষর খুঁজে পাবেন –  আয়োটা, কাই, থীটা, উপ্সাইলন আর সিগমা। প্রশ্নটা হচ্ছে হঠাৎ এই পাঁচটা  অক্ষরকে নিয়ে কেন মাথা ঘামাব? কারণ, এগুলো একসঙ্গে একটা অ্যাক্রোনিম বিশেষ, পুরো কথাটা হল “Iesous Xristos Theou Yios Sotare” যার মানে ঈশ্বরের পুত্র যীশু খৃষ্ট রক্ষাকর্তা। এদিকে ΙΧΘΥΣ নিজে একটা শব্দ-ও বটে, ইকথাস – যার মানে মাছ। ব্যাস, বোকা গ্রীকগুলো যীশুর প্রশস্তিকে ভেবে নিল মাছের মেটাফর, সেই ট্র্যাডিশন এখনো চলছে।” সব্বাই গপ্পো শুনে মুগ্ধ, দলে ইস্ট এশিয়ান কেউ না থাকলেও ভারী হুড়োহুড়ি পড়ে গেল গাইডের সঙ্গে ছবি তোলার। তিনি অবশ্য এসব বালখিল্যতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে পা বাড়িয়েছেন  বুলুটেরিয়নের দিকে – যেখানে বসত এফেসাস কাউন্সিলের মীটিং, গানবাজনার আসর এবং সময় সময় নানা সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই সেখানে মাথা উঁচিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তিন পিলার – গ্রীক, রোমান এবং বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্যের তিন প্রতিভূ।

P

এর মধ্যেই দেখি সামনে এক খোদাই করা নারীমূর্তি , ঠিক যেন টেক-অফের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আর কয়েক সেকন্ডের মধ্যেই উড়ে যাবেন। নিশ্চয় ভাবছেন যে ইনি কোনো গ্রীক দেবী? ঠিকই ধরেছেন তবে নামটা শুনলে একটু চমকাতে পারেন। এনার নাম নাইকি! হ্যাঁ, এনার নামেই সেই বিখ্যাত জুতোর ব্র্যান্ড, যাকে ড্যান ওয়েইডেন (এবং অফ কোর্স মাইকেল জর্ডন) বিশ্ব জুড়ে চিনিয়েছেন ‘জাস্ট ডু ইট’ বলে। নাইকি কিন্তু শুরু হয়েছিল ‘ব্লু রিবন স্পোর্টস’ নাম দিয়ে;  সত্তর সালে এক জুতসই ব্র্যান্ডনেম খুঁজতে এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, কোনো প্রত্নতত্ত্বের ছাত্রের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে এবং জয়ের দেবী নাইকির নামে রাখা হয় ব্র্যান্ডের নাম। নাইকি হাঁটেন না, উড়েও বেড়ান না; জিরো গ্র্যাভিটিতে লাফিয়ে চললে যেরকম দাঁড়াবে, খানিকটা সেই ভঙ্গীতে মাটি ছুঁয়েই আবার সুপারম্যানের মতন শাঁ করে বেরিয়ে যান। মারভেল কি ডিসি কমিকস যদি একটা গপ্পো খাড়া করতে পারে, হলিউডের নজর এদিকে পড়তে বেশী দেরি হবে না। অ্যাডেড অ্যাডভান্টেজ, নাইকি প্রডিউসার-ও হয়ে যেতে পারে!

Nike

এর পরেই অবশ্য যাঁকে দেখলাম, তিনি বহুপরিচিত হলেও আরাধ্য দেবী হয়ে কোনোকালে বিরাজ করতেন একথা কস্মিনকালেও মনে হয়নি। আরাধনা বলতে চিরাচরিত অর্থে যা বুঝি তা না হলেও, যদি দেখেন যে সম্রাট হেড্রিয়ানের সম্মানে তৈরী মন্দিরের মূল তোরণে নানারকম ফুল এবং অ্যাকান্থাস লতার মধ্যে এনার মুখটি ফুটে আছে তবে আপনিও নিয্যস চমকাবেন। দূর থেকে হয়তো বুঝতেও পারবেন না, তারপর ক্যামেরার লেন্সে ফোকাস রেখে জুম করতে গিয়ে চমকে উঠবেন – আরে, চুলগুলো কিরকম যেন কিলবিলিয়ে নেমেছে! এনার চুল অবশ্য সর্বদা কিলবিলিয়ে নামত না, রেগে গেলে তবেই মাত্র।

medusa

মেডুসার রাগী মুখ তন্ময় হয়ে দেখতে গিয়ে ইঁটের পাঁজার ওপর একটু বেশীই ভর দিয়ে ফেলেছিলাম বোধহয়, বিজাতীয় ভাষায় প্রতিবাদ শুনে মাথা ঘুরিয়েই চক্ষুস্থির! তুর্কীর সর্বত্রবিরাজমান বেড়ালদের গল্প এই ব্লগেই আগে করেছি, কিন্তু তা বলে তাঁদের ঐতিহাসিক শহর এফেসাসেও খুঁজে পাব এতটা ভেবে উঠতে পারিনি। এলই বা কোত্থেকে, কিই বা খায় সে সব প্রশ্ন অবশ্যই মাথায় এল কিন্তু সবার আগে যেটা চোখে পড়ল সেটা হচ্ছে তাদের রাজকীয় মেজাজ, এফেসাসেস সার্বিক ভাবগম্ভীর পরিবেশে দিব্যি খাপ পেয়ে গেছে।

C

বেড়ালদের ছবি তুলতে গিয়ে একটু দেরি হচ্ছিল বোধহয়, গাইড দৌড়ে এলেন “চলুন চলুন, আপনার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে ওদিকে।” ভারী অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “কারা?” কারণ গাইডের আঙ্গুল যে দিকে দেখাচ্ছে, আমার সহযাত্রীরা তার ঠিক উল্টোদিকে রীতিমতন পোজ দিয়ে ছবি তুলছেন। গাইড হাসলেন, ভারী রহস্যময় হাসি “সেই তারা, যারা প্রত্যেকে আপনার জন্য হৃদয়ে ঠিক এক চিলতে জায়গা রেখে দিয়েছে। শুধু ওয়ালেটটা আনতে ভুলবেন না।”

এফেসাসে – ১

“অ্যামাজন ডট কম নামটা বেশ মজার,  বোকা বোকাও বলতে পারেন। আপনার কি মনে হয়?” শুধোলেন আমাদের গাইড। তাঁর অবিরাম বাক্যস্রোতে বেশ দিশাহারা বোধ করছিলাম, আকস্মিক এহেন প্রশ্নে থতমত খেয়ে বললাম, “কই না তো, সেরকম কিছু মনে হয় নি কখনো।” বলেই বুঝলাম এসব হল টোপ প্রশ্ন,  কিন্তু ততক্ষণে ভদ্রলোক বঁড়শিতে খপাত করে গেঁথে ফেলেছেন। বেশ আত্মপ্রসাদী একটা হাসি হেসে বললেন “আপনার দোষ নেই,  ওটার জন্য একটু ইতিহাস জানতে হবে।” শুনে একটু রাগ হল, যতই হোক ইতিহাস একমাত্র বিষয় যে পরীক্ষার খাতায় জীবনে আমাকে নিরাশ করেনি (যদিও সাল-তারিখ টারিখ বিশেষ মনে থাকে না, তাই ক্লাস টেনের টেস্টে প্রবালবাবু লিখে দিয়েছিলেন “আই ওয়ন্ট হিস্ট্রি, নট লিটারেচার”)। তেতো মুখ করে বলতে হল, “তাই নাকি? কিরকম?” বাকি সব শ্রোতার দিকে একবার চোখ  বুলিয়ে বললেন “অ্যামাজন কথাটার মানে হল উইদাউট এ ব্রেস্ট, একটি স্তনবিহীন মহিলা। নিশ্চয় ভাবছেন এরকম উদ্ভট মানে কেন?” বেঁচে থাকুক ভারতীয় ক্যুইজ ক্লাব, এবার আমার আপারহ্যান্ড নেওয়ার পালা “ওহ, তাই বলুন! আরে এ তো সেই দুর্ধর্ষ মহিলা যোদ্ধাজাত অ্যামাজনিয়ানদের নামে। যাঁরা তাঁদের তীরের নিশানা অভ্রান্ত করার জন্য একটি স্তন কেটে ফেলতেন, যাতে ধনুকের ছিলা টানার সময় হাত বুকের ওপর দিয়ে পিছলে চলে না যায়।” গাইড মোটেও প্রসন্ন হলেন না, “ও, জানেন তাহলে। কিন্তু এটা কি জানেন যে অ্যামাজনিয়ানরা মোটেও অ্যামাজন নদীর ধারেকাছে থাকতেন না, তাঁরা থাকতেন ব্ল্যাক সীর কাছে? আর তাঁদেরই গড়ে তোলা প্রথম উপনিবেশ দেখতে চলেছেন আপনারা, এফেসাস। তাহলে সুদূর দক্ষিণ আমেরিকায় নামটা গেল কি করে?” চিত্রালী পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, “হল এবার শান্তি? মিছিমিছি তুর্কীদের সঙ্গে টক্কর দিতে যাওয়া কেন বাপু?” বলতেই হল সে ব্যাপারে সম্যক ধারণা নেই। “শুনুন তাহলে – অন্ধ কবি হোমার জন্মেছিলেন শহর ইজমিরে, যেখান থেকে আপনারা রওনা দিলেন। এখন সেটা টার্কির মধ্যে হলেও বহু বহু বছর ধরে গ্রীক সাম্রাজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ শহর বলে পরিগণিত হত। এখানেই লিখেছিলেন (আক্ষরিক অর্থে অবশ্য হোমার লেখালেখির কাজটা করতে পারতেন না, অন্য কেউ সেটা করেছিল নিশ্চয়) ইলিয়াড আর ওডিসি। আর এই ইলিয়াডেই হোমার উল্লেখ করেছিলেন লেজেন্ডারি অ্যামাজনিয়ানদের,  লিখেছিলেন সমুদ্রের কাছেই গভীর জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ে কিভাবে তারা দিন গুজরান করতেন। স্প্যানিশ নাবিকরা যখন দক্ষিণ আমেরিকা অভিযানে বেরোন, তখন জাহাজে সময় কাটানোর জন্য তাদের পড়তে দেওয়া হয়েছিল হোমারের ইলিয়াড। অ্যামাজনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের মনে হয় আরে, এরকম জায়গাতেই তো অ্যামাজনিয়ানরা থাকত। সদ্য পড়ে উঠেছে ইলিয়াড, অ্যামাজন নদের নাম আর কিই বা রাখতে পারত তারা?”

মানতে হল জেফ বেজোস একটা ‘ ফ পা‘ করে ফেলছেন। কিন্তু তাতেই কি আর রেহাই মিলল? ভদ্রলোক মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন “আপনি অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন বললেন না? বলুন তো পৃথিবীতে সবথেকে লাভজনক কাজ কোনটা?” আবারো পরাজয় স্বীকার করতে হল। গাড়ীর জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন “কি দেখছেন?” “কেন, অলিভ গাছ।” “এই অলিভ চাষীরা বছর কতদিন কাজ করে জানেন? স্রেফ এক থেকে দু’মাস। আর অলিভের পৃথিবীজোড়া চাহিদার কথা নিশ্চয় জানেন,  তার সঙ্গে জেনে রাখুন টার্কি প্রথম তিনটে অলিভ উৎপাদনকারী দেশের অন্যতম। ফলে এই ক্ষেতখামারির মধ্যে হামেশাই বি-এম-ডব্লিউ, মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবেন।” আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবরে সত্যিই দরকার নেই তাও না জিজ্ঞাসা করে পারলাম না ” আর বছরের বাকি দশ মাস কি করেন ওঁরা?” ভদ্রলোক ব্যাজার মুখ করে বললেন “আর বলবেন না। এরা সবাই বংশানুক্রমে সুফী, দশ মাস ধরে ভালো ভালো কবিতা পড়ে; সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার মশাই। কে শুনেছে দশ মাস ধরে কাজ না করে কবিতা পড়া হচ্ছে?” আমিও শুনিনি কোনদিন, কিন্তু যারপরনাই চমৎকৃত  হলাম। অলিভ চাষীদের সৌভাগ্যের কথা ভাবতে ভাবতে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম, সেটা কাটল পাশের সুইস মহিলার “মা, মাগো” আর্তস্বর শুনে। চোখ খুলে দেখি এফেসাসে ঢোকার ঠিক আগে আমরা উপস্থিত হয়েছি পাহাড়ের ওপর ভার্জিন মেরীর মন্দিরে।

VM

ক্যাথলিক জনশ্রুতি অনুযায়ী যীশু ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর ইওহান (সেন্ট জন) মেরীকে নিয়ে আসেন করেসস পাহাড়ে এবং পাহাড়ের ওপর এক পাথুরে ঘরে মেরী আমৃত্যু থেকে যান। বুঝতেই পারছেন ‘আমৃত্যু’ ক্যাথলিকদের কাছে উপযুক্ত শব্দ নয়, তাঁদের কাছে এর নাম ‘Assumption‘। মেরীর ঘর বলে কথা, অলৌকিক কাহিনী এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। ছোট্ট পাথুরে ঘরের অনেকটা জুড়ে এক প্রার্থনা গৃহ (আপনি ধর্মবিশ্বাসী হোন বা না হোন,  যে কোনো চার্চে গেলেই যেরকম একটা প্রাণ জূড়নো শান্তি খুঁজে পান, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি), আর তার বাইরে বেশ যত্ন করে সাজিয়ে রাখা আছে অগুন্তি ক্রাচ। মেরীর আশীর্বাদে যেসব প্রতিবন্ধীদের আর ক্রাচের দরকার পড়েনি,  তাঁরা সেগুলো এখানে দিয়ে গেছেন – শেষটি নাকি জমা পড়েছে এই ২০০৬-এ। এমত অবস্থায় “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু” বলে ঘুরে দেখে নেওয়াটাই স্বাভাবিক; যুক্তিবাদী মন যাই বলুক না কেন নিজের ইচ্ছেয় যখন ঘুরতে এসেছি তখন অবশ্যম্ভাবী প্রশ্নগুলো ওখানে দাঁড়িয়ে তোলার সত্যিই কোনো অর্থ হয় না। বিশ্বাসের ব্যাপারটা আরোই জোরদার হয়ে দেখা দিল ‘উইশিং ওয়াল’ দেখে – কতশত মানুষ তাঁদের ইচ্ছাপূরণের জন্য চিলতে খানেক কাগজে কয়েক লাইন লিখে সেটা আটকে দিয়ে গেছেন এই দেওয়ালে। ছবি তুলতে গিয়ে খানিকটা আচম্বিতেই চোখে পড়ল কিছু আকুতি, প্রিয়জনের দুরারোগ্য ব্যাধিযন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছেন কেউ কেউ।

ww

উইশিং ওয়ালটা সহযাত্রীদের সবাই দেখেছেন, ফলত মুডটা একটু গ্লুমি। সেটা আন্দাজ করেই গাইড ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন “মনে করুন খ্রিষ্টপূর্বাব্দ দশম শতকে আপনি গ্রীক শহর এফেসাসে বসবাস করছেন। আপনার অবস্থাপত্র ভালোই, আপনাকে সেবা করার জন্য একজন ভৃত্য রয়েছে। বেজায় ঠান্ডার দিন, আপনার চাকরকে দিয়ে কোন কাজটা প্রথমে করাবেন আপনি?” কেউ বললেন সুপ বানাতে বলবেন, কেউ চাইলেন জল গরম করতে; কলম্বিয়ান এক মহিলা বললেন “তখনকার দিনে ডু নট ডিস্টার্ব বোর্ড ছিল? তাহলে ওটাই বেডরুমের দরজায় লাগিয়ে দিতে বলব।” গাইড বললেন “করতে পারেন এসব, তবে আদি অকৃত্রিম গ্রীকদের চাকরদের থেকে একটি বিশেষ সার্ভিসের দরকার ছিল।  মনে রাখা ভালো শীত হোক কি গ্রীষ্ম, গ্রীকরা মার্কেটপ্লেসে সময় কাটাতে বড্ড ভালোবাসতেন। তাই  বাজারের লাগোয়া ছিল পাবলিক টয়লেট, সারি সারি সিট এবং পাশাপাশি। কিন্তু শীতকালে মারবল পাথর পশ্চাৎদেশে ভালোই ছ্যাঁকা দেয়। সুতরাং, কি করণীয়?” হতভম্ব মুখগুলো দেখে নিজেই উত্তর দিলেন “চাকরদের আদেশ দেওয়া হত মনিবরা যাওয়ার আগে সিটে বসে সিট গরম করে দিতে হবে।” সারা গাড়ী জুড়ে রাম-রাম আর তওবা-তওবা। তারই মধ্যে আরো জানা গেল শৌখিন গ্রীকদের জন্য সেখানে মজুত থাকতেন মিউজিসিয়ানরা, উল্টোদিকে মুখ করে তারা বাজিয়ে চলতেন সুরেলা সব গত। ভেতরে থাকত লম্বা লম্বা থাম, আর থামের ওপরে থাকত লতিয়ে ওঠা সুগন্ধী সব ফুল। প্রাতঃকৃত্যতেও যে বেশ কিছু ইন্দ্রিয়ের আরাম  দরকার সেটা বলাই বাহুল্য, এবং গ্রীকরা বেশ বুঝেছিলেন সে কথা!

গ্রীকদের আদিখ্যেতা নিয়ে সাতকাহনের মধ্যেই পৌঁছে গেছি এফেসাস। যত সহজে লিখে ফেললাম ব্যাপারটা, তত সহজেও কিন্তু হৃদয়ঙ্গম হয়নি এফেসাসেস সামনে দাঁড়িয়ে, সত্যি পৌঁছলাম? সত্যিই দেখছি? সুমেরিয়ান, লিডিয়ান, পারসিয়ান, ভূকম্প সব সহ্য করে প্রায় তেরশ বছর ধরে ইতিহাসে ইতিহাসে সমৃদ্ধ হয়েছে এই শহর, শেষমেশ  ২৬২ খ্রীষ্টাব্দে গথদের আক্রমণে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বাইজান্টাইন এবং অটোমান রাজত্বের সময়েও এ শহরকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্ট হয়েছে কিন্তু আলেকজান্ডারের সোনার এফেসাসকে আর ফিরে পাওয়া যায়নি। পনেরশ শতক থেকে সেইসব প্রচেষ্টাও থেমে যায়। প্রত্নতাত্বিকরা নতুন করে একে খুঁজে পান আঠারশ শতকের শেষে। কাজ এখনো চলছে, পুরো এফেসাসেস দশ শতাংশ-ও ট্যুরিস্টদের আওতার বাইরে। এফেসাসেস রুক্ষ চালচিত্র দূর থেকে দেখেই মনে হল রাস্তার শুরুতেই একাকী গাছটার নিচে একটিবারের জন্য দাঁড়িয়ে নি। জানা গেল গাছটা মালবেরি, অনাদিকাল ধরে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে রেশমের গুটি চাষ উপলক্ষ্যে। আমার অবশ্য শুধুই মনে পড়ল মণীন্দ্র গুপ্তের অবিস্মরণীয় স্মৃতিকথা ‘অক্ষয় মালবেরি’। পাঠক, যদি বাংলা ভাষা আপনি ভালোবাসেন এ বই আপনাকে পড়তেই হবে। মণীন্দ্র গুপ্ত কবি, তিনি এ বইয়ে গদ্য লিখলেও আদতে বুনেছেন কবিতার জাল,  এঁকেছেন হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার মিঠে ছবি। কিন্তু অক্ষয় মালবেরি নিয়ে বিশদে যেতে পারলাম না এখন, কারণ মালবেরির নিচে দাঁড়াতেই চোখে পড়েছে গ্রীক অগোরা – কয়েকশ বছর ধরে ধার্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্যা-সুরাহায় গ্রীকরা মিলিত হতেন এখানে।

agora

সেই গ্রীক অগোরা – ডেমোক্র্যাসির আঁতুড়ঘর।

কাগজফুলের শহর

“আমার একটা মজার গল্প আছে,
মজাটা এই গল্পটা নেই কাছে।

জামার পকেটে গল্পটা ছিল গোঁজা,
একদিন গেল ধোপার বাড়িতে সোজা।

এখন  দেখছি গল্পটা ফুটে আছে,
সিঁড়ির নিচেই কাগজফুলের গাছে।”   (তারাপদ রায়)

আমার গল্পদেরকেও দেখলাম কাগজফুল হয়ে ফুটে থাকতে।  এসেছি ঘুমিয়ে পড়া গ্রীক ভিলেজ আলতেনকমে, বহু প্রাচীন অ্যাপোলো মন্দিরের কাছেই। পশ্চিম তুরস্কের এক প্রান্তে, গ্রীস-তুরস্কের সীমানার কাছেই এই গ্রাম। ইংরেজী কায়দায় হয়ত লোকে বলবে ‘টাউন’ কিন্তু সেকথা ধরবেন না। লোকে এখানে আসে সমুদ্র দেখতে, টারকোয়েজ রঙ্গীন জল আর সোনালী হলুদ বালির জন্য। দুপুরের খামোখা খেয়ালে মনে হল গ্রামটা ঘুরে দেখি। একজন পর্যটককেও চোখে পড়ল না, কিন্তু ভারী অবাক হয়ে দেখলাম সারা রাস্তা জুড়ে স্থানীয় লোকজনদেরও দেখা যাচ্ছে না। সমুদ্রের দিকটা কয়েকটা ছোট্ট জেলে-বোট জেটিতে আটকে থেকে অলস হাওয়ায় দুলছে। একটার মাস্তুলে দুখানা সী-গাল চুপটি করে বসে শুধু জল দেখছে, ভাবটা খানিক টুরিস্ট সুলভ-ই। দোষ দেওয়া যায় না,  ভারী মিঠে একটা রোদের সঙ্গে সমুদ্রের হাওয়ার এমন মজলিশি যুগলবন্দী তৈরী হয়েছে, মনে হবে এই শেষ স্টপ, সব ভুলে থেকে যাই। তবে দু’পেয়েদের কথা আলাদা, তারা একটু এবড়োখেবড়ো বীচের ওপরেই পিচ ঢালা মসৃণ রাস্তা ধরে হাঁটতেই থাকবে, হাঁটতেই থাকবে। আর কখনো সমুদ্রের দিক থেকে চোখ সরিয়ে রাস্তার উল্টোদিকে গ্রীক ভিলাগুলোর দিকে তাকালে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠতে পারে, কাশফুল। তখন হয়ত কিছুক্ষণের জন্য মনটা একটু আকুলিবিকুলি করতে পারে, চার’হাজার মাইল দূরের কোনো জনাকীর্ণ শহরে একবারের জন্য হলেও ছুটে যেতে, বারো বছর ধরে সে শহরে যাওয়া হয়নি এ মরশুমে।

c1

আর তক্ষুনি চোখ পড়বে কাগজফুল হয়ে ফুটে থাকা গল্পদের ওপর আর চিনচিনে ব্যথাটাও কোথায় হারিয়ে যাবে। বুগেনভিলিয়া এ শহরের প্রিয় ফুল, প্রত্যেকটা ভিলার সামনে-পিছনে কোথাও না কোথাও ঈষৎ গোলাপি আভা নিয়ে তারা ঝেঁপে এসেছে। পাঁচিল মানেই তো একটা অধিকারের প্রতীক, একটু দূরত্ব গড়ে দেওয়ার অদম্য চেষ্টা, একটা বিভাজন দাখিল করার অবিনম্র প্রয়াস। এই মানুষী ট্রেটগুলোকে ভুলিয়ে দিতে, বিত্তজনিত মালিকানাকে ক্যামোফ্লাজ করতে আপনার বেস্ট বেট ওই বুগেনভিলিয়া। বিশ্বাস করুন, সত্যি কাজ দেয়। তাই যে দু’পেয়ে সবজে নীল জলের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল আদেখলের মতন, সেও গুটি গুটি পায়ে রাস্তা ক্রস করে চলল তার গল্পদের কাছে। এক গল্প নিয়ে যায় আরেক গল্পের কাছে; এক গল্প দূরে দেখায় স্তব্ধ দুপুরে ইস্তানবুল থেকে ছুটি কাটাতে আসা দুই কিশোরী তাদের সামার রিসর্টের সামনে দোলনা বানিয়ে দুলছে। কিশোরী সুলভ বেণী মোটেই নেই, কিন্তু তাদের থেকে থেকে অযথা হাসি চিরকালীন। ক্ষণিকের আগন্তুককে দেখে তারা থমকায়, তারপর মোটেই পাত্তা না দিয়ে শুরু হয় কথা চালাচালি, কত্ত কত্ত কথা – সব রাখা ছিল ছুটির দিনের এই নিশ্চুপ দুপুরের জন্য। আরেক গল্প ভালোবাসে একটু সাসপেন্স তৈরী করতে, পাতা ঝরঝরিয়ে বলল বাড়ির পেছনের চড়াই-উতরাই এর দিকে যেতে, ব্যাস শুধু ওইটুকুই। হাঁটতে হাঁটতে এল এক ঝুরঝুরে বাড়ী, তার ঘুলঘুলি দেখলেই বোঝা যায় এ গ্রামের প্রাচীনতমদের মধ্যে পড়ে সে, হাল ফ্যাশনের লাল টালিওলা ভিলারাও জানে তার কথা। উঠোনের দু’দিকে তার দুই দেওয়াল, একটা জালি জালি ফ্রেম আটকে রয়েছে দুই দেওয়ালের মধ্যে। আর তাতে লতিয়ে লতিয়ে উঠেছে আঙ্গুর গাছ, থোকা থোকা কালো আঙুর। কৌতূহলী চোখ দেখে প্রাচীন বাড়ীর প্রাচীনা মালকিন বেরিয়ে এসেছিলেন। চুপ দুপুরের মায়াবী রূপকথা সত্যি করে তিনি সেই দেশী ঠাকুমা, সেই অজস্র বলিরেখা, সেই ফোকলা হাসি, আর সেই প্রশ্রয়দাত্রী চাউনি। আমি চিনি সেই চাউনি, গলা ব্যথা ব্যথা হওয়ার আগেই তাই  ঢালু রাস্তা দিয়ে নেমে গেলাম। রাস্তা দিয়ে নামতে নামতে শুনি আবার কিসের ফিসফাস, ঝেঁপে ওঠা কাগজফুলদের গল্প ফুরনোর নয় । চোখে পড়ল বাতাসবাড়ির গম্বুজ।

IMG_5911

সেই নাম না জানা কোন কালে তৈরী হয়েছিল এ গম্বুজ, মান্ধাতার আমলের স্পিনিং হুইলে বয়ে যেত মৃদুমন্দ হাওয়া। এখন আর কোন কাজে লাগে তাকে? শুধোলাম, কোনো উত্তর এল না। পাতা ঝরার বেলায় মনে হল কাগজফুলদের গল্প বলা শেষ হয়েছে। একটু বিসদৃশ ঠেকল, কিন্তু কি আর করা। বাতাসবাড়ির গম্বুজকিনারে এসে বুঝলাম ভুল হয়েছে, দোষ আমার। বাতাসবাড়ির সত্যিই কোনো কাজ নেই, এখন-ও নেই, তখন-ও ছিল না। কিন্তু সব স্থাপত্য কি কাজ মাপার জন্য হয়?  পাহাড়চূড়ায় লম্বা লম্বা গাছেদের মধ্যে বাতাসবাড়ি রয়ে গেছে শুধু রোমান্সের জন্য। কবি, ভাবুক, ক্ষণিকের অতিথিদের মনগড়া রোমান্স নয়,  এ আক্ষরিক, খাঁটি  রোমান্স। তরুণীর একঢাল পিঠখোলা চুল রেড ফ্ল্যাগ তুলে রেখেছে, তাই জন্যই তার পিঠ আমার দিকে; তার সঙ্গী কি করছে সে কথা আমার জানার নয়, কারোরই জানার নয় – এ দুপুরটা শুধুই তাদের। ঘুমিয়ে থাকা আলতেনকমে তারা পড়ে পাওয়া সুযোগ নেয় না,  তাদের গন্তব্য অন্যত্র।

কাগজফুলের শহর অপেক্ষা করে আছে এখনো, চলে যান। অন্তত একটা দুপুরের জন্য হলেও,  তাড়াতাড়িই – কে জানে কখন কর্মব্যস্ত পৃথিবীর খেয়ালে আরেকটা গ্লোবালাইজড টুরিস্ট স্পটের আইডিয়া ভেসে আসে টারকোয়েজ জল ধরে সোনালী বালির তীরে।

সেদিন

অঝোরে বরফ ঝরে চলেছে বাইরে, সাইপ্রেস আর ওয়ালনাট গাছগুলো বরফের ভার সহ্য করতে না পেরে প্রায় নুইয়ে পড়ে পড়ে। ঘরের ভেতর একদল যুবাপুরুষ মুগ্ধদৃষ্টিতে  সেদিকেই তাকিয়ে, ফায়ারপ্লেসের লাল আভায় সবার ত্বকই বড় আশ্চর্যরকম কমনীয় লাগছে। এ তন্দ্রিম আলস্য ভাঙ্গতেই বোধহয় মৃদু স্বরে জানের অনুমতি চাইলেন “বন্ধুগণ, তাহলে আহুতি শুরু হোক?”

“হোক, হোক” ঘরের চারকোণ থেকে ভেসে এল সম্মতি, কিছু যুবা উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ালেন।

জোব্বার ভেতর থেকে, চামড়ার সুদৃশ্য চৌকোণা খাপের অন্দরমহল  থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল একটি-দুটি করে বই। সারি সারি অক্ষর বসানো মালগাড়ীর মতন বয়ে যাওয়া লাইনগুলো দেখে কেউ কেউ ঘৃণায় মুখ বিকৃত করলেন। একজোড়া, দু’জোড়া, বহু জোড়া হাত ফেলে দিতে লাগল সেই সব বই আগুনের মধ্যে।

বুরাক ফিরে এসে আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বসলেন, “শান্তি! সেহফলার চারসিসেতে আর এসব ছিল না। এ আপদ যত কম আসে তত ভালো।” জেনার হাসলেন, “আর এলেও তোমরা জান কি করতে হবে।”   আলতো হাসিতে ঘর ভরে গেল, সবাই সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। দেমিরহান অপেক্ষাকৃত কম বয়সী, তাই অস্থিরতাটাও বেশী। সে বলে উঠল, “আর তাহলে দেরী কেন? এবার শুরু করা যাক।” বুরাক বললেন “সবুর, সবুর। আগে ধোঁয়া উঠিয়ে সে আসুক, এক এক কণায় প্রাণ হয়ে উঠুক মধুময়, রক্তবিন্দুতে ছড়িয়ে পড়ুক উত্তাপ। তবে না শুরু হবে আরাধনা?”

মেহমেতের আজকেই প্রথম দিন , সে চুপি চুপি দেমিরহানকে শুধলো “কি রে, সেই হিন্দিস্থানী চায়?” দেমিরহান মুখ কুঁচকোতে বলল, “তবে কি  ইরানী শরাব?” দেমিরহান হেসে উঠল “শুনুন কথা, মেহমেত  পারস্যের মদ আসবে ভেবেছে।” সবার অল্পবিস্তর বিস্মিত হলেও তখনি খেয়াল পড়ল মেহমেতের আজ প্রথম দিন। জানের প্রশ্রয়ের সুরে বললেন “সে তো থাকলই রাতের জন্য। কিন্তু আরাধনার আগে কি অত উত্তেজনা ভালো?” আর এক প্রস্থ হাসি, আর তক্ষুনি ঘরের বাইরের বিশাল মারবল বারান্দা দিয়ে টুংটাং শব্দ ছড়িয়ে কারা যেন এদিকেই আসতে শুরু করল।

গৃহকর্তার দুই খানসামা ঢুকে ইজমির থেকে আনা পাথরের টেবলে সাজিয়ে রাখতে শুরু করল সুদৃশ্য সব বাটি, আর তার সঙ্গে নিখুঁত কাজ করা ছোট্ট ছোট্ট চামচ। আর নিহাত, জেনারের ‘ম্যান ফ্রাইডে’ এসে তাঁর হাতে তুলে দিল মরোক্কান চামড়ায় বাঁধান ‘ধর্মগ্রন্থ’টি। সুগন্ধী হালোয়ার গন্ধ ঘ্রাণান্দ্রিয়কে উত্তেজিত করে তুলেছিল, জেনারের কথায় সবাই সম্বিত ফিরে পেলেন “মনে আছে তো? এ বছর রুমি দিয়ে শুরু।” সবাই হৈহৈ করে উঠল, দেমিরহান হাত তুলে বলল “আমি পড়ি? আমি?”

মেহমেতের কাঁধে বুরাক হাত রাখলেন। মেহমেত সচকিতে তাকাতেই বললেন “এর অপেক্ষাতেই তো বেঁচেছিলে, তাই না?” ততক্ষণে জানেরের মন্দ্রস্বরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে ভালোবাসার ওম “অ্যায় দোউস্ত, বে-দোউস্তি কারিনিম তো রাহ/ হর যা কে কদম নহি জামিনিম তো রাহ…” বন্ধুর পদক্ষেপের উত্তাপটুকু শুষে নিয়ে গাঢ় হচ্ছে মাটির রং।

আজ ইরমিইকিঞ্জি আরালিক, বাইশে ডিসেম্বর। সাতদিন ধরে চলবে এই হালভা সহবতলেরি, কাব্যচর্চা আর বন্ধুত্বের গুঞ্জন, সঙ্গে রইবে ছোট্ট চামচে করে তুলে নেওয়ার জন্য রাখা মিঠে সঙ্গত। এক এক দিন এক এক বন্ধু ডেকে নিয়ে যাবেন। তারপর বরফ ঝরার দিন শেষ হলে আরেকবার সবাই মিলিত হবেন, এ বছরের গ্র্যান্ড ফিনালের জন্য। কবিতা পড়ে, কবিতা শুনিয়ে  কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যেতে চেষ্টা করবেন নশ্বর জীবনের উপদ্রবগুলিকে, যেমন গদ্য’সাহিত্য’।