বেবেক

আমার ঘরের ঠিক পাশেই বেবেকের ঘর, তাতে বড় বড় করে লেখা “শ…শ…শ – বেবেক ঘুমোচ্ছে”। একমাস ধরে  আমি মন দিয়ে সে কথা মেনে চললেও বেবেকের দিক থেকে কোনো রেসিপ্রোসিটি দেখতে পাচ্ছি না। বেবেক জাগে ঠিক রাত তিনটের সময়, ব্রাহ্মমুহূর্তের ক্যালকুলেশনটা দেখছি ঠিকঠাক করে উঠতে পারছে না। বেবেকের মা অবশ্য বিস্তর প্রস্তুতি নিয়েছেন এ ব্যাপারে, ফলত ওনার-ও ঘুম ভাঙ্গে রাত তিনটে; বেবেকের মা প্রফেসর কিন্তু নিজের ছেলে মানুষ হলে তবে না বাকি ছেলেপুলেদের নিয়ে মাথা ঘামাবেন। সুতরাং, তিনি ঘুমোতে চলে যান সন্ধ্যা আটটা নাগাদ। ইউনিভার্সিটি প্রেসিডেন্টের বাড়িতে বারবিকিউ পার্টিই থাকুক কিম্বা কো-অথরের সঙ্গে শলাপরামর্শ, সাতটার মধ্যে সব কাজ শেষ হওয়া দরকার – বেবেকের অর্ডার। সাতটা থেকে আটটা অবধি যুদ্ধকালীন তৎপরতা চলে, প্রথম আধ ঘন্টা তিনি মোহন হাসি হেসে চার হাত-পায়ে লিভিং স্পেসের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন। মাঝরাস্তা অবধি গিয়ে তারপর থপ করে বসে পড়েন, বেবেকজননীর তখন কাজ হচ্ছে কোলে করে তুলে এনে আবার স্টার্টিং পয়েন্টে ছেড়ে দেওয়া। এরকম করে বিস্তর ক্যালরি খরচা হয়, সুতরাং পরের আধ ঘন্টা বেবেক-ন্যানী তাকে কোলে দুলিয়ে দুলিয়ে বিস্তর বেবেকপরিজ জাতীয় জিনিস খাওয়ান। বেবেকপরিজের অল্টারনেটিভ ফাংশনটা আফিমের ড্যালা বা সিদ্ধির গুলির কাজের সঙ্গে সমতুল্য। খেয়েই ঝিমুনি আসে, তারপর একটা স্বর্গীয় হাসি, শেষে বনগাঁবাসী মাসি-পিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ। এনারা চলে এলেই প্রফেসরও সময় নষ্ট না করে শুয়ে পড়েন। মুশকিল হল, বেবেকের শত ইচ্ছা সত্ত্বেও এহেন রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি। তাই রাত তিনটে থেকে খোলা জানলা দিয়ে বেবেকের থটপ্রসেস ভেসে আস্তে শুরু করলেই নিদ্রাদেবীও চম্পট দ্যান। আমিও চুপ করে শুনি চাঁদ কিরকম গব-গব-গবাস শব্দে ডুবে যাচ্ছে। আরো ঘন্টা দুয়েক পরে যখন চোখ সত্যি বুজে আসতে চায়, তখনও বেবেকের কলকলানি শুনে মনে হয় বিটলেটার সঙ্গে এবার একটা সামনাসামনি মোলাকাত হওয়াটা নিতান্তই দরকার। ওহ, আপনাদের বলা হয়নি বেবেকের দর্শন পাওয়ার সৌভাগ্য এখনো হয়নি, বেবেকজননীর থেকেই যা গল্পগাছা শুনেছি।

মাঝে মাঝে অবশ্য ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ির দিকে হয়ে যায়।আজ যেমন ঠিক রাত দুটো থেকে তারস্বরে চিৎকার ভেসে আসতে শুরু করল। বিলক্ষণ বুঝলাম, তরুণ তুর্কী ব্যাপারটা নেহাত কথার কথা নয়, ফ্রেজটার মধ্যে একটা সার্থক জোশ আছে। একবার ভাবলাম, যে রামচিমটিটা আমিই এতদিন কাটবো বলে ভাবছিলাম সেটা প্রফেসর কেটে ফেলেছেন কিনা। যতই হোক, তিনিও মানুষ আর আমেরিকাতেও বসবাস করেন না, যে চিমটি  কাটলেই গুয়ান্টানামো ভ্রমণ নিশ্চিত হবে। একবার অবশ্য মনে হল, পেট কামড়াচ্ছে না তো? কিম্বা কান কটকট? স্কুল অফ ল্যাঙ্গুয়েজে পড়ালেও প্রফেসরের বেবেকভাষা এখনো ঠিক আয়ত্তে আসে নি, সুতরাং কমিউনিকেশন নিয়ে একটা প্রব্লেম থেকেই যায়। কারণ যাই হোক না কেন, ঘুমের দফারফা হল। ঘন্টাতিনেক ধরে ভাবতে চেষ্টা করলাম নন্দ ঘোষের পাশের বাড়ির বুথ সাহেবের বাচ্চার এতটাই দম ছিল কিনা। ভেবে ভেবে মাথা গরম হয়ে গেল, চোখেমুখে জল ছিটিয়ে প্রাতর্ভ্রমণে যাওয়াটাই উচিত হবে বলে সাব্যস্ত করলাম। আর বেরোতে বেরোতে খেয়াল করলাম, বেবেকও ট্যাঁ-ফো করছে না। সেটাই স্বাভাবিক, তার কাজ হয়ে গেছে – আমাকে বিছানাচ্যুত করা।

মিনিট পাঁচেক হেঁটে প্রথম পমেগ্রানেট গাছটার সামনে এসে ভারী চমকে গেলাম, দেখি গুগলে কর্মরত সেই খিটকেল ভদ্রলোক গাছের নিচের বেঞ্চে চুপটি করে বসে আছেন। কয়েকদিন আগে কে যেন আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, ইনি  গুগলের মাউন্টেন-ভিউ অফিসে বছর আষ্টেক কাজ করে আপাতত ইস্তানবুলের গুগল অফিসে আছেন। আলাপের মুহূর্তে আমার দিকে লাল লাল চোখে এমন রাগমাগ করে তাকালেন আমি আর পালাবার পথ পাই না। প্রথমে ভাবলাম বিদেশী দেখে রেগে গেলেন কিনা, তারপর মনে হল মাউন্টেনে-ভিউয়ের অমন খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে আসতে হলে যে কারোরই চোখ অমন লাল হয়েই থাকবে। ইউনিভার্সিটি ফ্যাকাল্টি হাউসিং-এ থাকেন মানে নিশ্চয় গিন্নীর জন্য গ্রীন কার্ড জলাঞ্জলি দিয়ে আসতে হয়েছে।  ভাবছিলাম পাশের সরু শর্টকাটটা দিয়ে টুক করে সরে পড়ব, এমন সময় ভদ্রলোক চোখ তুলে তাকালেন। আর স্পষ্ট দেখলাম খুব হাসছেন, চোখমুখ হাসছে, সারা শরীরে একটা পরিতৃপ্তির ছোঁয়া। আমাকে দেখে বেশ আহ্লাদিত গলায় বললেন, “আরে আপনি, আসুন আসুন।” আমিও হেসেই উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকিয়ে সিঁটিয়ে গেলাম। চোখ দুটো এখনো লাল, টকটকে। ভদ্রলোক বোধহয় বুঝতে পারলেন, ঈষৎ করুণ হেসে বললেন “বছর খানেক হতে চলল, এখনো অভ্যাসটা হয়ে ওঠেনি।” আর তক্ষুনি টের পেলাম পাশেই একটা প্র্যাম, আর সঙ্গে সঙ্গে সব জলবৎ তরলম হল। দুরুদুরু বুকে আঙ্গুল তুলে জিজ্ঞাসা করলাম, “বেবেক?” ভদ্রলোক একটু অবাকই হলেন বটে, তাই ‘হ্যাঁ’ বলে আবার জুড়ে দিলেন “আমার’। আমি আর কি করে বোঝাই, আমার কাছে বেবেক এক জনই। ততক্ষণে প্র্যামের কভা্র খুলে ফেলেছি, আর কি বলব আমাকে দেখেই নেড়াচুল খাড়া করে সে কি মিষ্টি হাসি,  দেখা হল শেষমেশ। আর ছোট্ট মুঠোর মধ্যে আমার তর্জনীটা সেঁধিয়ে যেতেই বুঝলাম ‘Enchanted’ কাকে বলে।

“When you touch a star
Then you really are enchanted
Find a seed and plant it
Love will make it grow”

পুনশ্চ : বেবেক শব্দটা কি সুন্দর না? ব্যক্তিগত, রিদমিক।

Advertisements

4 thoughts on “বেবেক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s